শান্তনু বসু

দেখতে দেখতে সবাইকে অবাক করে, সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে প্রূডেনসিয়াল কাপের ফাইনালে পৌঁছে গেল ভারত। প্রূডেনসিয়াল কাপ মানে ক্রিকেটের বিশ্বকাপ। তখন ওই নাম ছিল। স্পনসরের নামে কাপের নাম। সেবার তৃতীয় ক্রিকেট বিশ্বকাপের আসর বসেছিল ইংল্যান্ডে। ফাইনালে কপিলদেবের নেতৃত্বে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে দিয়েছিল ভারত। ১৯৮৩ সালের ২৫ জুন। আমি তখন ক্লাস ফাইভে পড়ি। সে-দিনের সেই খেলাটা আজও স্মৃতিতে দারুণ উজ্জ্বল হয়ে আছে। তোমরা যে খেলার লাইভ দেখোনি, সেই খেলার, সেই বিশেষ দিনের গল্প আজ তোমাদের বলব।
আটের দশকের গোড়া থেকে একদিনের ক্রিকেট খুব ধীরে ধীরে ডালপালা মেলতে শুরু করে। তখনকার ক্রিকেটাররা টেস্ট ম্যাচে অভ্যস্ত। এখনকার মতো ধুমধাড়াক্কা ব্যাটিং-এর চল তখনও একদিনের ক্রিকেটে হয়নি। সবসময় দু-একজন ব্যতিক্রম থাকে, তখনও ছিল। তবে মোটের উপর ক্রিকেট ছিল এখনকার তুলনায় অনেক ধীর লয়ের।
সে সময় একদিনের ক্রিকেট মানে ষাট ওভারের খেলা। কোনো দল মেরে কেটে ওভার পিছু গড়ে চার রান করে করতে পারলেই ধরা হতো, প্রতিপক্ষকে বেশ শক্ত লড়াইয়ের মধ্যে ফেলেছে। এখন এই কথা বললে হাসি পাবে। আজকাল পঞ্চাশ ওভারে হামেশাই সাড়ে তিনশো-চারশো রান উঠে যায়। টি-টোয়েন্টির কথা না হয় বাদই দিলাম।
যাই হোক যে কথা বলছিলাম, আটের দশকের গোড়ায় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মানদণ্ডে, বিশেষ করে একদিনের ক্রিকেটে ভারত ছিল নিতান্ত সাধারণ টিম। ওয়েস্ট ইন্ডিজ, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড—এরা ভারতের চেয়ে অনেক শক্তিশালী। পাকিস্তানও দল হিসেবে আমাদের চেয়ে ভালো। ভারত যে বিশ্বকাপে দারুণ কিছু করবে, টুর্নামেন্টের শুরুতে সে কথা কেউ-ই ভাবেনি।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের তখন ভয়ানক দাপট। ক্রিকেটে তাদের স্বর্ণযুগ চলছে। দলে আছে গ্রিনিজ, হেইন্স, রিচার্ডস, লয়েড, দঁজোর মতো মারকুটে ব্যাটসম্যান। রয়েছে গারনার, রবার্টস, হোল্ডিং, মার্শালের মতো বিশ্বত্রাস বোলার, যাঁরা বল হাতে ছুটে আসলে মনে হয় কোনো দৈত্য যেন ছুটে আসছে সব কিছু ধ্বংস করে দিতে। তাবড় ব্যাটসম্যানদেরও বুকে, হাঁটুতে কাঁপুনি ধরে। ফাইনালে ভারত কি পারবে এদের সঙ্গে লড়তে?
বাবা বললেন,' পারবে না কেন, গ্রুপ লিগে একবার তো ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়েছে।'
বারীনজ্যেঠু বলে ওঠেন, 'ওটা কাকতালীয় ব্যাপার। ওয়েস্ট ইন্ডিজ অনেক শক্তিশালী দল। আগের দুবার বিশ্বকাপ জিতেছে। এবারও মনে হয় জিতে যাবে। দেখ কী হয়?'
'আমরা তো খারাপ খেলছি না। আমাদের কপিল-গাভাসকার আছে। মহিন্দার অমরনাথ আছে। সন্দীপ পাতিল আছে।'
'ভিভিয়ান রিচার্ডস, ক্লাইভ লয়েডের সঙ্গে এদের তুলনা চলে?' এভাবে আলোচনা চলতে থাকে। চা জুড়িয়ে যায়। আমি বসে বসে শুনি। মাঝে মাঝে বিজ্ঞের মতো দু-একটা মন্তব্য করি। পাড়ায়, অফিসে, কাছারিতে, বাড়ির বৈঠকখানায় সর্বত্রই এক আলোচনা। কী হবে ফাইনালের ফলাফল? সবাই ক্রিকেট-জ্বরে আক্রান্ত।
বড়রা খেলা নিয়ে আলোচনায় মেতেছে। আমরা ছোটরাই বা পিছিয়ে থাকি কেন? প্রথম পিরিয়ডের পর মাস্টারমশাই ক্লাস ছেড়ে বেরোতেই খেলা নিয়ে তুমুল হই-চই শুরু হয়ে যায়। আমরা সবাই এক-একজন খুদে বিশেষজ্ঞ, গলার শিরা ফুলিয়ে নিজের মত প্রকাশ করতে থাকি। ক্লাসরুম একেবারে মাছের বাজার। শুনলাম পরের ক্লাসের মাস্টারমশাই আজ আসেননি। আমাদের পোয়াবারো।
'কী ব্যাপার রে, একেবারে মাছের বাজার বসিয়ে দিয়েছিস? এত চিৎকার কীসের?'
হঠাৎ ক্লাসে ঢুকলেন হেডস্যার। এক হাতে গ্লোব ও আরেক হাতে বেত। সবাই চুপ। সহসা যেন কেউ কলকাকলির সব তরল রস ব্লটিং পেপার দিয়ে শুষে নিল। আমরা হুড়োহুড়ি করে যে যার নিজের জায়গায় বসে পড়লাম। হেডস্যারকে দেখলেই আমাদের বুক ধড়াস ধড়াস করে। খুব রাগী মানুষ। কেউ কখনও তাঁকে হাসতে দেখেনি।
স্যার বললেন, 'কী নিয়ে তোদের এত শোরগোল?'
চন্দন ফস করে বলে বসল, 'খেলা নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল স্যার।'
স্যার গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করলেন, 'কী খেলা?'
'কাল স্যার বিশ্বকাপ ফাইনাল।'
আমার দিকে বড় বড় চোখ করে চেয়ে স্যার বললেন, 'খেলাটা কোথায় হবে অরিত্র?'
আমি বললাম, 'লর্ডসের মাঠে।'
নান্টু ক্লাসে ভারি আনমনা থাকে। পাশের ক্লাসের কয়েকজন বাইরে নিল ডাউন হয়ে বসে আছে। দরজা দিয়ে সেদিকে দেখছিল নান্টু। ক্লাসে দুষ্টু ছেলে হিসেবে ভারি নাম-ডাক আছে তার। ওর দিকে তাকিয়ে স্যার বললেন, 'হ্যাঁ রে, কী দেখছিস বাইরে? ওদের সঙ্গে বসবি?'
নান্টু মুখ নীচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
স্যার জিগ্যেস করলেন, 'বল তো লর্ডস কোথায়?'
অবলীলাক্রমে নান্টু বলল, 'হরিতলায়।'
স্যার চোখ বড় বড় করে গর্জন করে উঠলেন, 'কোথায়?'
'হরিতলায়। ওই দোকানের চমচম খুব ভালো খেতে। আমার ছোটকার বিয়েতে ওই দোকান থেকেই তো চমচম এসেছিল।' এক নিশ্বাসে বলে গেল নান্টু।
ভুল কিছু বলেনি। হরিতলায় সত্যি সত্যি 'লর্ডস' নামে বিখ্যাত একটা মিষ্টির দোকান আছে। যাই হোক, হেডস্যার যে প্রশ্ন করেছেন তার উত্তর এটা হয় না। ভাবলাম, নান্টু নিশ্চয়ই এবার কয়েক ঘা বেত খাবে।
আশ্চর্য হয়ে গেলাম হেডস্যারের গোঁফের ফাঁকে হাসির সামান্য রেশ দেখে। তবে মুহূর্তের মধ্যে হাসির ভাবটা ভ্যানিশ করে দিয়ে, নাকের ডগা থেকে গোল ফ্রেমের চশমাটা আঙুল দিয়ে উপরে ঠেলে দিয়ে স্যার বললেন, 'বড় হয়ে তুই যে কলম্বাস হবি দেখছি। নতুন নতুন জায়গা নতুন নতুন দেশ আবিষ্কার করে বেড়াবি।'
কয়েকজন ফিক করে হেসে ফেলল। হাসির শব্দ শুনে হেডস্যার শব্দের উৎসের দিকে হাড়হিম করা চোখে একবার তাকালেন। অপরাধীদের চিহ্নিত করে বেঞ্চের উপর দাঁড় করিয়ে দিলেন।
এরপর চক দিয়ে খসখস করে ব্ল্যাকবোর্ডে পৃথিবীর একটা ম্যাপ এঁকে ফেললেন স্যার। ম্যাপের উপর দ্রাঘিমা রেখা টেনে দিলেন। ভারত, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও ইংল্যান্ড ম্যাপের উপর বিন্দু দিয়ে চিহ্নিত করলেন। আমরা অবাক হয়ে দেখছি। হেডস্যার খেলাধুলো হইচই একেবারেই পছন্দ করেন না বলে জানি। ভারত ফাইনালে ওঠায় স্যার কি খুব খুশি হয়েছেন? তাহলে আজ কি খেলা নিয়ে আলোচনা হবে?
না, খেলা নিয়ে আলোচনা হল না। ভারত, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ইংল্যান্ড—এই কথাগুলো লিখে আমাদের আগ্রহ তৈরি করে, দ্রাঘিমা রেখার সঙ্গে সময়ের সম্পর্কটা স্যার জলের মতো বুঝিয়ে দিলেন। জানলাম, এক ডিগ্রি তফাতের জন্য চার মিনিটের হেরফের হয়। পুব থেকে পশ্চিম দিকে দ্রাঘিমা রেখা ধরে সরে সরে গেলে সেই অনুপাতে সময় কমতে থাকে।
আমাদের দ্রাঘিমা 82.5 ডিগ্রি পূর্ব। ইংল্যান্ডের দ্রাঘিমা শূন্য ডিগ্রি। তাই ইংল্যান্ডে যখন সকাল দশটা, তখন আমাদের ঘড়িতে বিকেল সাড়ে তিনটে। আমাদের ঘড়ি ইংল্যান্ডের ঘড়ির থেকে সবসময় পাঁচ ঘণ্টা তিরিশ মিনিট অর্থাৎ তিনশো তিরিশ মিনিট (82.5x4 = 330) এগিয়ে থাকে। যদিও এটা এক ক্লাস উঁচুতে শেখার বিষয় ছিল, হেডস্যার আমাদের আগেই শিখিয়ে দিলেন।
পরের দিন সকাল থেকে আর সময় কাটতে চায় না। বারবার ঘড়ি দেখছি। কখন সাড়ে তিনটে বাজবে। কারণ ইংল্যান্ডে সকাল দশটায় খেলা শুরু হবে। সে সময় বাড়িতে বসে খেলা দেখা মানে একটা উৎসব।
তখন বাড়িতে বাড়িতে টিভির চল হয়নি। রঙিন টিভি সবে এদেশে এসেছে। সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরে রঙিন টিভির কথা ভাবাই যায় না। আমাদের বাড়িতে একটা সাদা-কালো টিভি ছিল। অনেকে আমাদের বাড়িতে খেলা দেখতে আসত। সবাইকেই খাতির করে বসতে দেওয়া হতো। একসঙ্গে অনেকে বসে খেলা দেখার মজাই ছিল আলাদা।
ফাইনাল খেলা শুরু হল। টসে জিতে ভারতকে ব্যাট করতে দিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। শুরুতেই বিপর্যয়। দু-রানের মাথায় আউট হয়ে প্যাভিলিয়নে ফিরলেন গাভাসকার। এর পর কিছুক্ষণ মারকাটারি ব্যাটিং করলেন শ্রীকান্ত।
টিভির ঘর হাততালিতে ও উৎসাহে ফেটে পড়তে লাগল। ওয়েস্ট ইন্ডিজের দৈত্যাকার বোলারদের ডান্ডা-গুলি খেলার মতো পেটাচ্ছেন শ্রীকান্ত আর ঠাকুমা মালা জপতে জপতে বারবার বলছেন, জয় বজরংবলী।
উইকেটে যখন বেশ জমে গিয়েছেন, তখনই হঠাৎ লেগ বিফোর উইকেট হয়ে ফিরে গেলেন শ্রীকান্ত। সারা ঘর জুড়ে আহা-উহু-যাঃ—এসব আফশোস সূচক শব্দের ভিড়। তারপরেই ঝপ করে টিভি বন্ধ হয়ে গেল। লোডশেডিং, সে সময় দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।
সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজন সাইকেল নিয়ে ইলেকট্রিক অফিসের দিকে ছুটল। তখন ঘরে ঘরে জেনারেটর, ইনভার্টার—এসব ছিল না। অগত্যা ট্রানজিস্টারই ভরসা। সন্ধে তখন হয় হয়। আশেপাশের বাড়ি থেকে শাঁখের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। আমাদের বাড়িতেও ঠাকুর ঘরে গিয়ে শাঁখে ফুঁ দিলেন ঠাকুমা।
ঠিক তখনই রেডিয়ো কমেন্টেটরের গলা থেকে ছিটকে বেরিয়ে এল একটা আর্তনাদ। বো-ও-ও-ল্ড। স্পিকারের কাছে কান পেতে শুনলাম মাইকেল হোল্ডিং-এর বলে বোল্ড হয়ে ফিরে যাচ্ছেন মহিন্দর অমরনাথ। ভারত তিন উইকেটে নব্বই। এর পরেই ধস নামল ভারতের ব্যাটিং-এ। দেখতে দেখতে সাত উইকেট পড়ে গেল একশো তিরিশ রানে।
সবাই হতাশ। এর মধ্যে কখন যেন আলো এসে গেছে। কিন্তু খেলা দেখার উৎসাহ কারও নেই। সবাই ধরে নিয়েছে ভারত অবধারিত হারবে। শেষ পর্যন্ত খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে একশো তিরাশি রান তুলে পাঁচ ওভার বাকি থাকতেই অল আউট হয়ে গেল ভারত।
মন খুব খারাপ। ফাইনালে ভারতের বোধ হয় জেতা হল না। ঘরের এক কোণায় পড়ে রয়েছে বেশ কয়েকটা তুবড়ি। ঠিক হয়েছিল ভারত জিতলে রাতে আতশবাজি পোড়ানো হবে। বাজিগুলো দেখে কান্না পেয়ে গেল। রাতে আর হই-হুল্লোড় হবে না।
যাইহোক, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ব্যাট করতে নামল। যদি অলৌকিক কিছু ঘটে, সেই আশায় আশায় টিভির সামনে গিয়ে বসলাম। ঘরে আমি একা। আর কেউ নেই। দিদি গান করতে বসেছে। মা রান্নাঘরে। বাবা কী একটা বই পড়ছেন। কারোরই খেলা দেখার আগ্রহ নেই।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের তখন সবে পাঁচ রান হয়েছে। বল করছে বলবিন্দর সিং সান্ধু। ভারতীয় ক্রিকেটে তারকা বলতে যা বোঝায়, সান্ধু কোনোদিনই সেই মাপের ক্রিকেটার ছিলেন না। আজকে যারা ছোট, তারা অনেকেই হয়তো তাঁর নাম শোনেনি। কিন্তু মাত্র একটা বলের জন্যই ভারতীয় ক্রিকেটে ইতিহাস হয়ে গেলেন সান্ধু।
বলটা পড়েছিল অফস্টাম্পের বাইরে। বাইরে যাবে ভেবে বলটা ছেড়ে দিলেন গর্ডন গ্রিনিজ। বলটা গোঁত্তা খেয়ে হঠাৎ ভিতরে ঢুকে এসে গ্রিনিজের স্টাম্প নাড়িয়ে দিল। গ্রিনিজ বোল্ড। সোফা থেকে লাফ দিয়ে আমি মাটিতে পড়লাম।
আমার চিৎকার শুনে বাড়ির অনেকে দৌড়ে এল টিভির সামনে। তখন স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে চ্যুইংগাম চিবোতে চিবোতে ব্যাট হাতে মাঠে ঢুকছেন ক্রিকেটের চিরকালের রাজা ভিভিয়ান রিচার্ডস। হঠাৎ ঘর অন্ধকার, আবার লোডশেডিং।
তড়িঘড়ি খুট করে ট্রানজিস্টার খুললেন বাবা। হ্যারিকেনের আলোয় কাঠ হয়ে বসে আছি রেডিয়োর সামনে। আবার যদি ম্যাজিক হয়। যা চাইছিলাম এবার হল তার উলটো। ভারতীয় বোলিংকে দুরমুশ করতে লাগলেন রিচার্ডস ও হেইন্স। মদনলালের এক ওভারে পর পর তিনটে চার হাঁকালেন রিচার্ডস। বুকটা মুচড়ে উঠল।
দিদি বলল, 'ধুর ধুর, এমন চললে তো কিছুক্ষণ বাদেই খেলা শেষ করে দেবে রিচার্ডস। বিরক্তিতে রেডিয়ো বন্ধ করে দিলাম। তবে খানিক পরেই আশেপাশের বাড়ি থেকে একটা সমবেত চিৎকার ভেসে এল—আ-উ-ট। রজার বিনির হাতে ক্যাচ দিয়ে মদনলালের বলে আউট হলেন হেইন্স। ওয়েস্ট ইন্ডিজ দুই উইকেটে পঞ্চাশ।
বাবা বললেন, রিচার্ডসকে আউট করতে না পারলে ও একাই জিতিয়ে দেবে।
মন দিয়ে রিলে শুনছি। মদনলাল দৌড়ে চলেছেন বল করতে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের রান সাতান্ন। ব্যাট করছেন রিচার্ডস। এর পরেই শুনলাম তুমুল হই-চই। পাশের বাড়ি থেকে শোনা গেল টুবুলদার বাজখাই গলায় চিৎকার—আ-উ-ট! আ-উ-ট! রিচার্ডস আ-উ-ট!
রেডিয়োতেও ভয়ানক হট্টগোলের শব্দ। মাঠের দর্শকরাও আনন্দে উত্তাল হয়ে গেছে। ধারাভাষ্যকার কী বলছেন ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। রেডিয়োর সামনে কান পেতে ভালো করে শুনে বাবা বললেন, অসাধারণ ক্যাচ ধরেছে কপিল।
এতক্ষণ ইলেকট্রিসিটি না থাকলেও খেলা দেখার অতটা আগ্রহ ছিল না। এখন মনে হল, ইশ, আউটটা দেখতে পেলাম না। বার বার ফ্যানের দিকে তাকাচ্ছি। যদি দুম করে ঘুরে ওঠে। বাবা বললেন, হৃদয়পুর বাজারে মোতির দোকানে জেনারেটর ভাড়া করেছে। ওখানে গেলে খেলা দেখা যাবে।
দিদি বলল, 'আমিও যাব।'
পথঘাট বনধের মতো ফাঁকা। রিকশা, সাইকেল কিছুই চোখে পড়ছে না। লোডশেডিং চলতে থাকায় চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। শুধু রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কানে ভেসে আসছে খেলার ধারাবিবরণী আর ঝিঁঝি পোকার ডাকের একটানা আওয়াজ।
হৃদয়পুর বাজারে পৌঁছে দেখি মোতিকাকুর ইলেকট্রিকের দোকানের সামনে ভিড় উপচে পড়েছে। ফট-ফট-ফট-ফট শব্দে জেনারেটর চলছে। টিভির সামনে প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়েছে অনেক লোক। ভিড় ঠেলে টিভির দিকে এগোতেই চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। টিভির সামনে চোখে-মুখে উৎকণ্ঠা নিয়ে বসে রয়েছেন হেডস্যার।
ল্যারি গোমস ড্রাইভ করতে গিয়ে মিস করলেন। বল গেল উইকেটকিপার কিরমানির হাতে। জোরালো অ্যাপিল করলেন বোলার রজার বিনি। আম্পায়ার নাকচ করে দিলেন। হেডস্যার হাঁটুর উপর চাপড় মেরে মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন,' ইশ, আরেকটু হলেই গিয়েছিল।'
হেডস্যারের যে খেলা নিয়ে এত উৎসাহ রয়েছে, সেটা আমার কাছে বিস্ময়ের ঠেকল। আমার ধারণা ছিল, স্যার খেলাধুলো একেবারেই পছন্দ করেন না। সারাদিন মোটা মোটা বই পড়েন আর বেত হাতে দুষ্টু ছেলেদের শাসন করেন।

পরের ওভারেই মদনলালের বলে গাভাসকারের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফিরে গেলেন গোমস। হেডস্যারও অন্যদের সঙ্গে ধেই ধেই করে আনন্দে লাফিয়ে উঠলেন। হেডস্যারের চোখ নাচছে, ভুঁড়ি নাচছে, গোঁফ নাচছে।
আমার মুখ হাঁ হয়ে গেল। টিভির পর্দার দিকে নজর যাচ্ছে না। অবাক চোখে হেডস্যারের দিকে চেয়ে আছি। স্যার দেখছি খেলা নিয়ে আমাদের মতোই লাফালাফি করেন। হঠাৎ দুম করে চারদিক আলোয় ঝলমল করে উঠল। আলো এল। অনেকে সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠল, 'এসেছে। এসেছে।'
বাবা বললেন, 'চল আমরা বাড়ি যাই। বাড়ি গিয়ে ভালো করে খেলা দেখা যাবে।' আলো এসে যাওয়ায় মোতিকাকুর দোকানের সামনের ভিড়ও পাতলা হয়ে গেল। হেডস্যার বাজারের কাছেই থাকেন। তিনিও পড়ি-মরি করে বাড়ির দিকে ছুটলেন। বাজারে খেলা দেখতে গিয়ে একটা উপরি পাওনা হল। নতুন হেডস্যারকে আবিষ্কার করলাম। যে রাগী, গম্ভীর হেডস্যারকে স্কুলে দেখি, ইনি তার ঠিক বিপরীত।
হৃদয়পুর বাজার থেকে আমাদের বাড়ি আসার পথে একটা বড় বাঁশবাগান ছিল। ঘন বাঁশের ঝাড় বেশ খানিকটা এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। কিছু গাছ রাস্তার উপর একেবারে নুইয়ে পড়েছে। দিনের বেলাতেই ওখান দিয়ে যাওয়ার সময় গা-ছমছম করত। রাত হলে তো কথাই নেই। অনেকে বলত ওই বাগানে না কি ভূত আছে।
বাঁশবাগানের কাছাকাছি এসে বাবার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরলাম। শনশন করে হাওয়া দিচ্ছে। হঠাৎ কিছুদূর থেকে ভেসে এল কিছু লোকের বাঁধনছাড়া আনন্দের চিৎকার। আ-উ-ট! আ-উ-ট! আ-উ-ট!
আনন্দের সঙ্গে বললাম, 'আরেকটা উইকেট গেল।'
বাবা বললেন, 'মনে হচ্ছে ভারত জিতে যাবে।'
খুব আনন্দ হলে বোধহয় ভূতের ভয় কমে যায়। আমি বাবার হাত ছাড়িয়ে ছুটতে শুরু করলাম। বাড়ি ফিরেই খেলা দেখতে হবে।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ পাঁচ উইকেটে সত্তর। ক্লাইভ লয়েড আউট হয়ে গেছে। এরপর আর টিভির সামনে থেকে চোখ সরাইনি। না, লোডশেডিং-ও আর হয়নি।
খেলার ফাঁকে মাঝে মাঝেই রিপ্লেতে দেখাচ্ছিল কপিলদেবের সেই বিখ্যাত ক্যাচটা। লাইভ দেখতে পারিনি। রিপ্লে দেখে চোখ সার্থক হল। রিচার্ডসের পুল শটটা অনেক উঁচুতে উঠে গিয়েছিল। মিড উইকেট থেকে দৌড় শুরু করলেন কপিল। চোখ আকাশের দিকে। প্রায় বাউন্ডারি লাইনের কাছাকাছি দৌড়ে এসে বলটাকে তালুবন্দি করলেন।
বলা যেতে পারে এই ক্যাচটা ধরে সেবার ক্রিকেটের বিশ্বকাপটা ক্লাইভ লয়েডের হাত থেকে ছিনিয়ে নিলেন কপিলদেব। পরে বিভিন্ন সময় খেলার হাইলাইটসে এই আউটটা অনেকবার দেখেছি। আজও মাঝে মধ্যেই ইউটিউবে দেখি।
ছিয়াত্তর রানে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ছয় উইকেট গেল। এর পরে খানিকটা লড়াই করেছিলেন দুঁজো ও মার্শাল। দু-জনে তেতাল্লিশ রান যোগ করলেন। মনের মধ্যে উৎকণ্ঠা বাড়ছে। উইকেট আর পড়ে না। মহিন্দর অমরনাথ বল করতে এসে এই জুটি ভাঙলেন। অমরনাথের বলে বোল্ড হলেন দঁজো।
ভারত জিততে চলেছে। সবার মধ্যেই দারুণ উৎসাহ। মা, ঠাকুমা, জ্যেঠিমা—সবাই টিভির সামনে বসে পড়েছেন। বাহান্নতম ওভারের শেষ বল। ওয়েস্ট ইন্ডিজ নয় উইকেটে একশো চল্লিশ। দুলকি চালে দৌড়ে আসছেন মহিন্দর অমরনাথ। ব্যাটসম্যান হোল্ডিং। পুল করতে গিয়ে বলের লাইন মিস করলেন। বল লাগল প্যাডে। একেবারে উইকেটের সামনে পা। অ্যাপিল করলেন অমরনাথ। আম্পায়ার সঙ্গে সঙ্গে আঙুল তুলে দিলেন।
ঘরের মধ্যে সবার বাঁধন ছাড়া উল্লাস। টিভির পর্দায় দেখতে পাচ্ছি পিল পিল করে লোক ঢুকে পড়ছে মাঠে। তাদের ভালোবাসার অত্যাচার থেকে বাঁচতে তিরবেগে প্যাভিলিয়নের দিকে দৌড়ে আসছে ভারতের এগারোজন সুঁপারম্যান। ভারত ক্রিকেটে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছে।
দরজা খুলে বাড়ির সামনে উঠোনে জড় হলাম আমরা। চারদিকে তখন উৎসব শুরু হয়ে গেছে। ঘন ঘন পটকা ফাটছে। হুশ হুশ শব্দে হাউই উড়ে যাচ্ছে আকাশে। পথে নেমে এসেছে অনেকে। পাড়ার ক্লাবের বড় ছেলেরা ওই রাতেই খেলোয়াড়দের ছবিতে মালা দিয়ে ঢোল, কাঁসর-ঘণ্টা নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছে। চারদিকে শুধু আনন্দের বন্যা।
পরের দিন ছিল রবিবার। খেলা নিয়ে আলোচনা করেই কেটে গেল গোটা দিন। সোমবার স্কুলে গিয়েই শুনলাম ভারত বিশ্বকাপ জিতেছে বলে আজ প্রথম পিরিয়ডের পর স্কুল ছুটি হয়ে যাবে।
লাড্ডু বোঝাই করা বিরাট একটা ডেকচি ভ্যান রিকশায় চাপিয়ে স্কুলে ঢুকল হেডস্যারের খাস বেয়ারা মদনদা। ব্যাপার কী? জানা গেল ভারত বিশ্বকাপ জিতেছে বলে হেডস্যার আজ সব ছাত্রকে লাড্ডু খাওয়াবেন।
আমাদের ক্লাসের পালা যখন এল, তখন হেডস্যার প্রথমেই নান্টুকে ডেকে বললেন, এই কলম্বাস এদিকে আয়। আমরা ভাবলাম, আজকের এই আনন্দের দিনে নান্টু আবার কী গোলমাল পাকিয়ে বসল!
নান্টুকে ডেকে হেডস্যার জিগ্যেস করলেন, 'বল তো এগুলো কোথাকার লাড্ডু?'
'জানি। লর্ডসের। স্কুলে আসার সময় দেখলাম মদনদা লর্ডস থেকে লাড্ডুর গামলা নিয়ে বেরোচ্ছে।'
সব গাম্ভীর্য ছুড়ে ফেলে ছেলেদের সামনে হো হো করে হেসে উঠলেন হেডস্যার।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন