শান্তনু বসু

ঠান্ডাটা জব্বর পড়েছে। কুয়াশার ছিটেফোঁটা নেই। সুয্যিমামা প্রাণ খুলে হাসছে। জানালা খুলতেই একমুঠো নরম আলো ঘরের মধ্যে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল। সকালে এমন ঝলমলে রোদ উঠলে ভবানীবাবুর মেজাজটা খুব ভালো থাকে। তবে তিন-চারটে খবরের কাগজ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়া ছাড়া সকালে তাঁর খুব একটা কাজ থাকে না।
ভবানীবাবু দ্রুত হাত-মুখ ধুয়ে খবরের কাগজটা নিয়ে আরামকেদারায় বসলেন। কাগজ খুলতেই চোখে পড়ল একটা রোমহর্ষক ডাকাতির খবর। এসব খবরে ভবানীবাবুর দারুণ আগ্রহ। চুরি-ডাকাতির খবরগুলো তিনি দাঁড়ি, কমা ফুলস্টপ-সহ মুখস্থ করে ফেলেন। আক্রান্তের জায়গায় নিজেকে বসিয়ে ভাবেন, তিনি কী করে ওই পরিস্থিতির মোকাবিলা করতেন।
এমনিতে ভবানীবাবু ভীষণ ভিতু ও সাবধানি লোক। বিশেষ করে চোর-ডাকাতে তাঁর বড় ভয়। তিন পুরুষ আগে পর্যন্ত ভবানীবাবুরা ছিলেন এই মহিষপোতার জমিদার। তাঁর ধারণা, এই বিশাল বাড়িটার আনাচে- কানাচে অনেক ধন-সম্পদ লুকিয়ে আছে, যার হদিশ তিনি জানেন না। আজ না হয় কাল হয়তো সেগুলোর সন্ধান পাওয়া যাবে। কিন্তু চোর-ডাকাতের উপদ্রব হলে তারাই সেসব নিয়ে যাবে। তাঁর বা তাঁর উত্তরপুরুষের জন্য কী পড়ে থাকবে?
যাই হোক, ভবানীবাবু শিরদাঁড়া সোজা করে আরামকেদারায় বাবু হয়ে বসে, ডাকাতির খবরটা পড়তে লাগলেন।
তাঁর অখণ্ড মনোযোগে ছেদ ঘটাল একটা বুক চাপড়ানো কান্নার শব্দ। এদিকে খবরের কাগজে ডাকাতরা সবে বাড়িতে ঢুকেছে। বাড়ির লোকজনকে বেঁধে ফেলে গৃহকর্তার কপালে বন্দুক ঠেকিয়েছে, এমন একটা রোমাঞ্চকর জায়গায় প্রথম পাতার লেখা শেষ। এর পরে ছয়ের পাতায়। কিন্তু ভবানীবাবুর আর পাতা উলটে ছয়ের পাতায় যাওয়া হল না। কান্নার শব্দের সঙ্গে সঙ্গে অনেক মানুষের কলরবও শোনা গেল। দোতলার জানালা দিয়ে ঝুঁকে ভবানীবাবু দেখলেন, মন্টু মিত্তির গায়ে আলোয়ান জড়াতে জড়াতে দৌড়োচ্ছেন।
ভবানীবাবু হাঁক পাড়লেন, 'ও মন্টুবাবু! কী হয়েছে?'
মন্টুবাবু ছুটতে ছুটতেই জবাব দিলেন, বিজয়বাবুর বাড়ি চোরে একেবারে তছনছ করে দিয়েছে।'
ভবানীবাবুর বাড়ি থেকে ঢিল ছোড়া দূরে বিজয় বাচস্পতির বাড়ি। সেখানে যদি চোর হানা দিয়ে থাকে, তাহলে তাঁর বাড়িতেও হামলে পড়তে পারে।
ভবানীবাবু কাগজের ডাকাতদের ফেলে রেখে শশব্যস্ত হয়ে, কোনওরকমে পাম্প শু'টা পায়ে গলিয়ে বাচস্পতিদের বাড়ির দিকে ছুটলেন।
বাড়ির সামনে শান বাঁধানো ব্যাডমিন্টন কোর্টের ওপর একা একা লাট্টু ঘোরাচ্ছিল রনি। চোরের কথাটা তার কানেও এসেছে। কিন্তু একা একা ওদিকে গেলে মা বকবেন। ভবানীবাবুকে সদর দরজা খুলে বেরোতে দেখে লাট্টু ও লেত্তিটা পকেটে ভরে দাদুর পিছু নিল রনি।
দেউড়িতে বসে বিলাপ করছিলেন বিজয় বাচস্পতি। ভিড়ের মধ্যে ভবানীবাবুকে দেখেই বিজয়বাবু ডুকরে কেঁদে উঠে বললেন, 'যা দিনকাল পড়েছে, এ তো দেখছি, গাঁ থেকে বাড়ি বেচে চলে যেতে হবে।'
ভবানীবাবু চোখ বিস্ফারিত করে বললেন, 'চোর ঢুকল কোথা দিয়ে? নিল কী?'
বিজয়বাবু রাগ ও ক্ষোভ গলায় মিশিয়ে বললেন, 'আমার ঠাকুরদার আমলের ট্যাঁকঘড়ি, দোতলায় শোওয়ার ঘরের জানলার কাছে দেরাজের ওপর ছিল।
ভবানীবাবু চোখ বড় বড় করে বললেন, ' চোরে তো সাধারণত একতলা থেকে চুরি করে বলে জানি। এ যে একেবারে দোতলায় হানা দিচ্ছে। দোতলাও তাহলে নিরাপদ নয়?'
বিজয়বাবু বললেন, 'তা হলেই বুঝে দেখুন।
বিজয়বাবুকে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছিল চাকর শিবচরণ। সে হঠাৎ বলে উঠল, 'ঘরটা ভালো করে খুঁজে দেখেন কর্তা। আপনার যা ভুলো মন, চোরের তো আর খেয়ে কাজ নেই, দোতলা বেয়ে উঠে একখানা লজঝড়ে ঘড়ি নিয়ে যাবে—কোথায় রাখতে কোথায় রেখেছেন—'
একথা শুনে একেবারে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন বিজয় বাচস্পতি। 'লজঝড়ে ঘড়ি মানে? ঘড়ির তুই কী বুঝিস হ্যাঁ? ক'টা ঘড়ি দেখেছিস জীবনে? আমি ঘড়ি লুকিয়ে রেখে এতগুলো লোকের সঙ্গে মশকরা করছি?
শিবচরণ মিনমিন করে বললে, 'না, মানে, চোখে চশমা লাগিয়ে সারা বাড়ি চশমা খুঁজে বেড়ান কি না।'
আরও রেগে গেলেন বিজয় বাচস্পতি, 'চশমা আর ঘড়ি এক হল? দেখছেন তো ভবানীবাবু...
এমন সময় শখের গোয়েন্দা পল্লব পাকড়াশি গলায় একরাশ উল্লাস নিয়ে হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল, 'ইউরেকা ইউরেকা।' দোতলার জানালার ঠিক নীচে দাঁড়িয়ে কোমরে হাত দিয়ে, মুখে একটা সবজান্তা মুচকি হাসি নিয়ে, ওপরের দিকে আঙুল তুলে পল্লব পাকড়াশি বলল, 'ওই দেখুন চোরের পদচিহ্ন।'
সবাই দেখল সত্যিই তো। দেওয়াল বেয়ে কতকগুলো কাদার ছাপ ওপরের জানলা পর্যন্ত উঠে গেছে। ফুলকো লুচির সাইজের একটা আতশকাচ পকেট থেকে বের করে, রেনপাইপ বেয়ে কিছুটা ওপরে উঠে গিয়ে দেওয়ালের গায়ের দাগগুলোকে গভীর মনোযোগের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল পল্লব গোয়েন্দা।
সবাই অবাক হয়ে দেখতে লাগল তার কাণ্ড-কারখানা। একটু পরে সড়াৎ করে রেনপাইপ বেয়ে নেমে এসে অপেক্ষমান উৎসুক জনতার দিকে ঘুরে পল্লব পাকড়াশি বলল, 'একটা বিষয় কি আপনারা খেয়াল করেছেন? দেওয়ালে পায়ের দাগ আছে কিন্তু আঙুলের কোনও ছাপ নেই।'
ভবানীবাবু ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, 'সে কি আঙুল কাটা চোর?'
এমন সময় ইঞ্জিনের একটা গোঁ-গোঁ শব্দ হল। তার সঙ্গে হাঁসের ডাকের মতো হর্নের প্যাঁক প্যাঁক আওয়াজ। দারোগা ভুজঙ্গ ভৌমিক এসে হাজির হলেন। কোমরের বেল্টটা ভুঁড়ির ওপর তুলে গাড়ি থেকে নেমে রীতিমতো হাঁকডাক ছেড়ে বললেন, 'কই চোর? কোথায় চোর? আমার এলাকায় অশান্তি বাঁধাতে আসে? এত সাহস কার হল?'
পল্লব পাকড়াশি ভিড় ঠেলে দারোগাবাবুর সামনে এসে বললেন, 'চোর পালিয়েছে, কিন্তু পদচিহ্ন রেখে গেছে। মনে রাখবেন, এই ক্লু-টা কিন্তু এই বান্দার এক্সক্লুসিভ আবিষ্কার।'
দারোগাবাবু চোখ বড় বড় করে বললেন, 'এ আবার কে?'
হাসি হাসি মুখ করে নাটকীয় ভঙ্গিতে পল্লব বলল, 'মহিষপোতায় দারোগার কাজ করছেন, গোয়েন্দা পাকড়াশির নাম শোনেননি?'
দারোগাবাবু জুলজুলে চোখে পল্লবকে একবার মেপে নিয়ে বললেন, 'কেমন যেন চেনা চেনা ঠেকছে। হ্যাঁ, সেই চোখ, সেই চাহনি—ভুজঙ্গ দারোগাকে ফাঁকি দেবে ভেবেছ? ওরে জগন্নাথ পাকড়ে ধর তো ব্যাটাকে, এ মনে হচ্ছে সেই নারানগড়ের সিঁধেল চোর, পুলিশের চোখে ধুলো দিতে ধুতি ছেড়ে প্যান্টুলুন পরেছে।'
পল্লব পাকড়াশি ঘাবড়ে গিয়ে বললে, 'কী মুশকিল, আমি সিঁধেল চোর হতে যাব কোন দুঃখে? এই গাঁয়ে আমার তিন পুরুষের বাস। কত বড় বংশ। সবাইকে জিগ্যেস করে দেখুন না—'
কনস্টেবল জগন্নাথ দড়ি হাতে কবাডি খেলায় প্রতিপক্ষকে জাপটে ধরার ভঙ্গিতে এগোতেই পল্লব চোঁ-চোঁ দৌড় লাগাল। সঙ্গে সঙ্গে দারোগাবাবুও ভুঁড়ি বাগিয়ে ধাওয়া করলেন তাকে। পিছনে জগন্নাথ। সে চেঁচাতে লাগল, 'হল্ট হল্ট।'
ধীরে ধীরে ভিড়টা পাতলা হয়ে গেল। বিজয় বাচস্পতির ঠাকুরদার আমলের ট্যাঁক ঘড়ি চুরি যাওয়ার ব্যাপারটা এখানেই ধামাচাপা পড়ে গেল। ভবানীবাবু বাড়ির পথ ধরলেন। রনিও দাদুর সঙ্গে বাড়ি ফিরল।
বড়রা কত তুচ্ছ জিনিস নিয়ে তুলকালাম করতে পারে, এটা ভেবে হাসি পেল রনির। পল্লব গোয়েন্দা দেওয়ালের গায়ে যে দাগটাকে চোরের পদচিহ্ন বলছিল, সে দাগের ইতিহাস রনি জানে। সেদিন ক্রিকেট খেলতে গিয়ে ক্যাম্বিস বলটা ড্রেনে পড়ে যায়। নিজেদের বাড়ির দেওয়ালে বলটা ছুড়ে ছুড়ে শুকিয়ে নিচ্ছিল পিন্টু। দেওয়ালের গায়ের দাগটা হল ওই বলের ছাপ। মোটেই চোরের পায়ের ছাপ নয়। যাই হোক, রনি ব্যাপারটা ভেঙে আর বলল না দাদুকে।
ভবানীবাবু বাড়ি ফিরেই সব চাকর-বাকরদের ডেকে পাঠালেন। চাকর-বাকর বলতে লক্ষ্মণ, রামরতন আর মিশিরলাল। গম্ভীর গলায় ভবানীবাবু বললেন, 'গাঁয়ে চোরের উৎপাত হচ্ছে। রাতে সজাগ থাকতে হবে। তোদের তিনজনকে পালা করে রাত-পাহারা দিতে হবে। চিলেকোঠার ঘরে কয়েকটা বল্লম আছে, তবে দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় ফলায় জং পড়েছে। একজন এখুনি গিয়ে বাজার থেকে বল্লমে শান দিয়ে নিয়ে আয়।'
লক্ষ্মণ মাথা চুলকে বলল, 'বাবু, রাত জাগলে আমার অম্বল হয়। পরের দিন সব কাজ ভণ্ডুল হয়ে যাবে।'
রামরতন বলল, 'আমার তিনপুরুষে কেউ কোনওদিন লড়াই করেনি। অস্তর চালানোর কায়দা জানা চাই। আনাড়ি হাতে বল্লম চালাতে গিয়ে নিজেই খুন-জখম হই আর কী?'
মিশিরলাল বলল, 'কাল থেকে আমার দু-হপ্তা ছুটি লাগবে। অনেকদিন বাড়ি যাইনি।'
ভবানীবাবু বিরক্ত হয়ে বললেন, 'তোরা সব একেকটা ভিতুর ডিম।'
সেদিন রাতে ভবানীবাবুর ঘুমের তেরোটা বেজে গেল। সামান্য খুটখাট শব্দ কানে এলেই ধড়ফড় করে উঠে বসেন। কান খাড়া রাখেন। না সব চুপচাপ। কোথাও কোনও শব্দ নেই। আবার শুয়ে পড়েন ভবানীবাবু। কিছুক্ষণ পর কোলবালিশটাকে জাপটে ধরে তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় চেঁচিয়ে উঠলেন, 'চোর চোর চোর। ধর ব্যাটাকে। বাঁশডলা দে।'
চেঁচামেচিতে ঘুম ভেঙে যাওয়ায় হেমলতা হাউমাউ করে উঠলেন। ভবানীবাবুকে এক ঠ্যালা মেরে তিরিক্ষি মেজাজে বললেন, 'বলি রাতে একটু ঘুমোতে দেবে তো, না কি? এজন্য রোজ পইপই করে বলি, হজমের বড়িটা খেয়ে শুতে।'
বেকায়দায় পড়ে ভবানীবাবু আর কথা না বাড়িয়ে সটান শুয়ে পড়লেন। তবে নানারকম দুশ্চিন্তায় রাতে আর ঘুম এল না।
পরের দিন সকালে উঠে সদর দরজা খুলতে গিয়ে প্রায় ভিরমি খেলেন ভবানীবাবু। বিশাল চেহারার এক ভয়ংকর দর্শন লোক দরজা আটকে দাঁড়িয়ে আছে। পরনে ফতুয়া ও খাটো ধুতি। বড় বড় চোখদুটো জবা ফুলের মতো লাল। কপালে সিঁদুরের লম্বা টিপ। চোখের দিকে তাকালে বুকের রক্ত হিম হয়ে যায়।
দৈত্যাকার লোকটার মাথায় মিশমিশে কালো ঘন কোঁকড়া চুল। মুখে পুরু চওড়া গোঁফ। রীতিমতো ডন-বৈঠক করা শরীর। হাতদুটো মুগুরের মতো। হাতে মজবুত একটা তেল চকচকে বাঁশের লাঠি।
আগন্তুক এতটাই লম্বা যে মাথাটা প্রায় দরজায় ঠেকে যাচ্ছে। ঘাড় কাত করে মুখের দিকে তাকাতে গিয়ে স্পন্ডেলাইটিসের ব্যথা টের পেলেন ভবানীবাবু। ঘাবড়ে গিয়ে ভবানীবাবু 'ডাকাত! ডাকাত' বলে চেঁচিয়ে উঠতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু আগেই লোকটা গম্ভীর গলা খাদে নামিয়ে বলল, 'আপনি কি ভবানী হালদার?'
'হ্যাঁ। আপনি মানে তুমি—'
লোকটা হঠাৎ সাষ্টাঙ্গে শুয়ে পড়ে ভবানীবাবুকে একটা প্রণাম ঠুকে দিল। ভবানীবাবু মনে মনে খুশি হলেন। লোকটা তো বেশ সহবত জানে।
আগন্তুক প্রণাম সেরে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, 'আমার নাম আবু পাইক। লোকে বলে আবু পালোয়ান। আমার ঠাকুরদাকে আপনি হয়তো চিনবেন। রঘু পাইক। দশ গাঁয়ের লোক বলত রঘু পালোয়ান। অনেকদিন আপনাদের বাড়ির নুন খেয়েছিলেন। আপনার ঠাকুরদা রায়বাহাদুর সীতারাম হালদারের খাস লেঠেল ছিলেন।'
আনন্দ ও বিস্ময়ে ভবানীবাবুর মুখটা দশ টাকার রসগোল্লা খাওয়ার মতো হাঁ হয়ে গেল। 'দেখো দেখো কী কাণ্ড। তুমি রঘুদার নাতি? আগে বলবে তো! এসো এসো ভেতরে এসো।'
আবু পালোয়ান ভারী অথচ মোলায়েম গলায় বলল, 'মারা যাওয়ার আগে ঠাকুরদা বলে যান, কখনও বিপদে পড়লে যেন আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করি। আমার কোনও রোজগারপাতি নেই। বড় অভাব, একটু আশ্রয় দিন। আমি বাড়ি পাহারা দেওয়ার কাজ করব। আসার পথে ইস্টিশনে নেমে শুনলাম ইদানীং আপনাদের এখানে নাকি চোরের বড় উৎপাত হয়েছে?'
ভবানীবাবু যেন হাতে চাঁদ পেলেন। সোল্লাসে বললেন, 'ঠিক শুনেছ। আলবাৎ ঠিক শুনেছ। চোরের চিন্তায় আমার রাতের ঘুম উড়ে গিয়েছে। তোমার মতো একজন আয়রনম্যানকেই আমি খুঁজছিলাম। তা তুমি রঘুদার মতো লাঠির কসরত জানো তো?'
আবু পালোয়ান তার গম্ভীর গলাটা যতটা সম্ভব নরম করে বলল, 'ও নিয়ে ভাববেন না। দশ-বিশ ডাকাতকে ঠেঙিয়ে ঠান্ডা করে দেব। ও আমার বাঁ-হাত কি খেল। শুধু একটা কথা, মাইনে আপনি ভালোবেসে যা দেবেন তাই নেব। তবে আমার চেহারাটা তো দেখছেন—আমার খোরাকিটা কিন্তু বেশ'—পালোয়ানকে বাধা দিয়ে ভবানীবাবু বলে উঠলেন, 'আরে রাখো রাখো! কত খাবে খাও না। ভগবানের দয়ায় আমার তো কিছুর অভাব নেই। তারপরে আমি হলাম রায়বাহাদুর সীতারাম হালদারের বংশধর। একসময় এবেলা-ওবেলা আমাদের বাড়িতে তিনশো পাত পড়ত। যাকগে ওসব কথা, এখন হাতমুখ ধুয়ে একটু জলখাবার খেয়ে নাও দেখি। সকাল থেকে তো পেটে কিছু পড়েনি।...ওরে লক্ষ্মণ, দেখ দেখ। একটু জলখাবারের ব্যবস্থা কর।'
লক্ষ্মণ গলায় বিরক্তি না লুকিয়েই বলল, 'করছি। তার আগে এই যে আপনার নিমপাতার শরবত।'
এক চুমুকে শরবতটা সাবাড় করে দিলেন ভবানীবাবু। রোজ বেজায় তেতো লাগে। আজ মনে হল অমৃত।
মাথা চুলকে খানিক ইতস্তত করে লক্ষ্মণ বলল, 'কাজটা বোধ হয় ঠিক করলেন না কত্তাবাবু।'
ভবানীবাবু হেসে বললেন, 'কেন রে? কী আবার বেঠিক করলাম?'
'ওই খুনে লোকটাকে বাড়িতে ঢুকতে দিলেন?'
'আহা খুনে হতে যাবে কেন?'
'চোখের চাহনিটা খেয়াল করেননি?'
ভবানীবাবু হেসে বললেন, 'করেছি বই কি, চোখদুটো অবিকল রঘুদার মতো, রঘুদার এলেম তো তোরা দেখিসনি? বনবন করে লাঠি ঘুরিয়ে চোখের নিমেষে বিশটা লোককে শুইয়ে দিতে পারত। রঘুদার নাতিকে ভগবানই পাঠিয়ে দিয়েছেন এই বাড়িতে। অমন একটা পালোয়ান হাতের কাছে থাকলে আর চোর-ডাকাতের ভয় কী?'
লক্ষ্মণ বলল, 'সে না হয় বুঝলাম, কিন্তু কোনওদিন যদি বাড়িসুদ্ধু লোকের ঘাড় মটকে রেখে, ও-ই ডাকাতি করে পালায়?'
ভবানীবাবু মৃদু ধমকের সুরে বললেন, 'ওরে, না, না। আমার এত বয়স হল, আমি মানুষ চিনি না?'
লক্ষ্মণ আর কথা না বাড়িয়ে ভেতরে চলে গেল।
একতলায় রামরতনের ঘরের পাশের ঘরে থাকার জায়গা হল আবু পালোয়ানের।
রনি সামনে থেকে এত বড় চেহারার লোক আগে কখনও দেখেনি। দরজার আড়াল থেকে আবু পালোয়ানকে লক্ষ করছিল সে। হঠাৎ আবু পালোয়ানের চোখ পড়ে গেল তার ওপর। রনির বুকটা কেঁপে উঠল।
আবু পালোয়ান হেসে বলল, 'ঘরে এসো খোকাবাবু।'
পা টিপে টিপে ঘরের ভেতরে এল রনি। হঠাৎ রনিকে দু-আঙুলে শূন্যে তুলে নিয়ে হাতের তালুতে লাট্টুর মতো বসিয়ে দিয়ে হা-হা করে হেসে উঠল আবু পালোয়ান। রনির মনে হল আবু পালোয়ান আসলে আলাদিনের দৈত্য।
খোরাকির ব্যাপারে আবু পালোয়ান যা বলেছিল, সেটা যে মোটেও বাড়িয়ে কিছু বলা নয়, দুপুর বেলায় তা টের পাওয়া গেল। এক হাঁড়ি ভাত, যেটা এ-বাড়িতে দশ জনে মিলে খায়, একাই সাবাড় করে দিল আবু। এক গামলা ডালের খানিকটা খানিকটা মেখে খেল, আর বাকিটা চুমুক দিয়ে উড়িয়ে দিল। এর সঙ্গে আধ শিশি ঘি আর টোপা কুলের সাইজের এক মুঠো কাঁচা লঙ্কা।
খাওয়া সেরে পেল্লায় ঢেকুর তুলে আবু পালোয়ান বলল, 'রাতে আমি ভাত খাই না, রুটি খাই। রাতে পাহারার কাজ তো, ভাত খেলে ঘুম আসবে। তা খান চল্লিশেক রুটি আর এক কেজি পাঁঠার মাংস হলেই চলবে।
রামরতন রোজ সন্ধেবেলা কাশীদাসের মহাভারত পড়ে। সে বললে, 'ভায়া, দ্বিতীয় পাণ্ডবের সম্বন্ধী কী তোমার কেউ হয়?
কথাটার মানে বুঝতে না পেরে জুলজুলে চোখে রামরতনের দিকে চেয়ে আবু পালোয়ান বলল, 'মতলব?'
পালোয়ানের ভয়ানক চোখের দিকে চেয়ে কেমন যেন মিইয়ে গেল রামরতন।
লক্ষ্মণ রাগে গজগজ করতে করতে বিড়বিড় করে বলল, 'কালই আমি এ-বাড়ির কাজ ছেড়ে দেশে চলে যাব। রোজ চল্লিশ-পঞ্চাশখানা করে রুটি বেলতে গেলে আমার ড্যানা খুলে যাবে।'
তবে আবু পালোয়ানের খাওয়ার ফিরিস্তি-ফরমায়েশ শুনে খুশিই হলেন ভবানীবাবু। বললেন, 'এ আর এমন কী? এটুকু না খেলে অত বড় শরীরটা টিকবে কেমন করে?'
হেমলতা বললেন, 'লোকটা একেবারে কাঁচাখেগো দৈত্য। ছেলেধরাও হতে পারে। এখনই বিদায় করো ওকে।'
ভবানীবাবু খাটের ওপর কাত হয়ে শুয়ে দাবার ঘুটি সাজিয়ে কঠিন চালগুলোকে সড়গড় করে নিচ্ছিলেন। বিরক্ত হয়ে বললেন, 'বকবক করে দিলে তো চালটা ভন্ডুল করে—'
তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে হেমলতা বললেন, 'নিকুচি করেছে তোমার দাবাখেলার। বলছি পালোয়ানটা বিদেয় করো। না হলে বিপদ হবে। কোনদিন না রনিকে ভুলিয়ে ভালিয়ে ধরে নিয়ে চলে যায়—'
গিন্নির কথায় আমল না দিয়ে ভবানীবাবু বললেন, 'তোমাদের যতসব বাজে চিন্তা।'
হালদার বাড়ির পিছনে মাটি কুপিয়ে, কোপানো মাটিতে টিন টিন সরষের তেল মিশিয়ে কুস্তির আখড়া তৈরি হল। রোজ সকাল-বিকেল এখানে লাফঝাঁপ দিয়ে শরীরের কসরত করে আবু পালোয়ান। পাড়ার লোকজন এসে ভিড় করে আখাড়ার চারপাশে।
আবু পালোয়ানের লাঠি-ঝাঁপ দেখে বিজয় বাচস্পতির চোখ পান্তুয়া হয়ে গেল। লাঠিতে ভর দিয়ে শূন্যে উড়ে দশ হাত দূরে ছিটকে পড়ল আবু। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে মুখ দিয়ে এমন বু-বু-বু-বু শব্দ শুরু করল যে চারিদিক থেকে পটাপট হাততালি পড়তে লাগল। ধুতির খুঁটে চোখের জল মুছে বিজয় বাচস্পতি আক্ষেপের সুরে বললেন, 'আহা, এমন একখানা আয়রনম্যান যদি আমার হাতে থাকত তাহলে আমার ঠাকুরদার আমলের ট্যাঁকঘড়িটা কখনওই চুরি যেত না।'
একদিন সন্ধেবেলা আবু পালোয়ানের ঘর থেকে ভয়ানক ধুপধাপ শোনা গেল। ঘরের দরজা বন্ধ। লক্ষ্মণ, মিশিরলাল, রামরতন সবাই ছুটে এসে দরজায় টোকা দিয়ে বলল, 'পালোয়ানজি, পালোয়ানজি, দরজা খোলো। কী হয়েছে?'
ভেতর থেকে কোনও সাড়া নেই। এদিকে ধুপধাপ শব্দটা হয়েই যাচ্ছে। বেশ কিছুক্ষণ পরে শব্দটা থামল। দরজার হুড়কো খুলে মুখ বাড়িয়ে আবু পালোয়ান বলল, 'কিছু না, একটু হাত-পা নাড়াচাড়া করছিলাম।'
লক্ষ্মণ বলল, 'হাত-পা নাড়ার এই নমুনা? আমরা তো ভাবলাম বাড়ি ভেঙে পড়ল বোধ হয়।'
বোকার মতো একগাল হেসে দরজাটা দড়াম করে বন্ধ করে দিল আবু পালোয়ান। লক্ষ্মণ, রামরতন ও মিশিরলাল ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যে-যার নিজের কাজে চলে গেল। তবে আবুর কথাটা তাদের ঠিক বিশ্বাস হল না। পালোয়ানের মুখ দেখে মনে হল সে বেশ ভয় পেয়েছে।
এই মনে হওয়াটা একেবারেই মিথ্যে নয়। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কী মানুষ-ভূত, চোর-ডাকাত, দৈত্য-দানো কোনও কিছুতেই ভয় নেই আবুর। তা হলে ভয়টা কীসের? সেটা বোঝা গেল আরও কয়েকদিন পরে।
টেবিল চেয়ারে বসে খাওয়াদাওয়া করাটা ভবানীবাবুর পছন্দ নয়। খাওয়ার সময় তিনি কাঠের পিঁড়ি পেতে মাটিতে বসেন। রনিও দাদুর সঙ্গে পিঁড়ি পেতে বসে। আজকাল দাদু ও নাতির সঙ্গে এক পংক্তিতে বসে আহার করে আবু পালোয়ান। বয়স হয়েছে, নিজে তো বেশি খেতে পারেন না, তাই পালোয়ানের ভূরিভোজের দৃশ্যটা বেশ উপভোগ করেন ভবানীবাবু।
আবু পালোয়ানের পাতে থরে থরে সাজানো লুচি। সামনে বড় পাত্রভর্তি মাংস। ঝোল আলু সব পাত্র থেকে উপচে পড়ছে। লুচিগুলো একটার পর একটা থালার উপর চাপিয়ে ছোটখাটো একটা মনুমেন্ট বানিয়েছে আবু। একটা করে টেনে নিচ্ছে আর মাংসের ঝোলে ডুবিয়ে মুখে পুরছে। হুড় হুড় করে লুচির মনুমেন্টটা সাইজে ছোট হয়ে যাচ্ছে।
সহসা ভবানীবাবুর পিঁড়ির নীচে থেকে উঁকি দিল বাদামি রঙের একটা মুখ। মুখের কাছে গোঁফের মতো একটা হলুদ রেখা। লম্বা দুটো শুঁড় এদিক-ওদিক নড়ছে।
হঠাৎ ওদিকে চোখ পড়ে গেল আবু পালোয়ানের। চোখ দুটো বিস্ফারিত হয়ে গেল। গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠল। আরশোলাটা গুটি গুটি দু'পা সামনে এগোল। আবু পালোয়ানের পিঁড়ি থেকে উঠি উঠি ভাব।
ভবানীবাবু বললেন, 'কী হল হে, কিছুই তো খেলে না। লুচি পড়ে রইল যে—'
বাড়ি পাহারা দিয়ে চোর-ডাকাত সামলানো যার কাজ, আরশোলায় ভয় পাওয়া তাকে কি শোভা পায়? আর ভয় পেলেও সেটা গৃহকর্তার সামনে প্রকাশ করা চলে না। তাই পিঁড়িতে কাঠ হয়ে বসে রইল আবু। এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল আরশোলার দিকে। এবার আরশোলাটা একটা কেলোর কিত্তি করে বসল। সে কী করে জানবে যে তার উড়ন্ত চেহারাটা আবুর কাছে দশটা ডাকাতের চেয়েও ভয়ংকর! ফ-র-র-র শব্দ করে আরশোলাটা উড়ে এল সোজা আবুর দিকে।
'উরি বাপরে!' বলে পিঁড়ি ছেড়ে শূন্যে লাফিয়ে উঠল আবু।
রনি চেঁচিয়ে উঠল, 'আরশোলা!'
শূন্যে লাফিয়ে উঠে মাটিতে এসে পড়ল। মাটিতে পড়ল বললে একটু ভুল বলা হবে। পড়ল এসে ভবানীবাবুর ঘাড়ে। ঝনঝনাৎ, ঠনঠনাৎ, ঘড়াং-ঘট শব্দে থালাবাটি জলের গেলাস উলটে পালটে সে এক ভয়ংকর অবস্থা। বিষম-টিষম খেয়ে, মাংসের ঝোলে মাখামাখি হয়ে, মাটিতে চিত হয়ে পড়ে ভবানীবাবু চেঁচাতে লাগলেন, 'ভূমিকম্প! ভূমিকম্প!'
হামাগুড়ি দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে দুদ্দাড় করে নীচে নেমে গেল আবু।
এদিকে হইচই শুনে চাকরবাকরেরা সব দৌড়ে এল। সবাই ভবানীবাবুকে ধরাধরি করে শুইয়ে দিল খাটে। রনির বাবা ডাক্তার। প্রেশার মেপে বললেন ভয়ের কিছু নেই। কী করে দাদুর এই অবস্থা হল, সেটা রনিই সবাইকে খুলে বলল।
রাতে সবাই ভবানীবাবুকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় আবু পালোয়ানের কী হল, সে খবর কেউ আর নিতে পারেনি। পরদিন সকালে আবুকে আর তার ঘরে পাওয়া গেল না। খালি ঘরের চৌকিতে পাওয়া গেল একটা চিঠি। তাতে লেখা, দেশ থেকে খবর এসেছে, বিবির শরীর খারাপ। তাই হঠাৎ দেশে যেতে হচ্ছে। হপ্তা দুয়েক পরে ফিরবে।
সকালে হালদারবাড়িতে দাবা খেলতে এসে এ-কাহিনি শুনে বিজয় বাচস্পতি হেসেই খুন। বললেন, 'আয়রনম্যানে হবে না, বাড়িতে এবার ডোবারম্যান রাখুন। আজ বিজয় বাচস্পতির মেজাজ খুব খুশ। কারণ তাঁর ঠাকুরদার আমলের ট্যাঁকঘড়িটা পাওয়া গেছে। মোটেই সেটা চুরি যায়নি। তিনি আনমনে ঘড়িটাকে ফুলদানির মধ্যে গুঁজে রেখেছিলেন। শিবচরণ বাড়ি ঝাড়া-মোছা করতে গিয়ে খুঁজে পেয়েছে।
তবে ভবানীবাবুর একটা কথা শুনে সবাই তাজ্জব হয়ে গেল। রনির বাবা বললেন, ডাক্তারি শাস্ত্রে এর কোনও ব্যাখ্যা মেলে না। আবু পালোয়ান ঘাড়ের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার পর থেকে ভবানীবাবুর স্পন্ডেলাইটিসের ব্যথাটা না কি একেবারেই সেরে গেছে!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন