শান্তনু বসু

বাসবের চাকরিটা কলকাতা থেকে অনেক দূরে কনকপুর নামে ছোট্ট এক মফসসল শহরে। একটা নামজাদা রং কোম্পানির সেলস রিপ্রেসেন্টেটিভ সে। রং বলতে ঘরবাড়ি, জানলা দরজার রং। এই কোম্পানিতে বছর তিনেক হল বাসব চাকরি করছে। অল্প সময়ের মধ্যেই কাজের ক্ষেত্রে বেশ সুনামও অর্জন করেছে সে। মাসমাইনে মন্দ নয়। তাছাড়া রয়েছে বিক্রির উপরে কমিশন। সব মিলিয়ে তার রোজগার ভালোই।
কনকপুরে কোম্পানির একটা দোতলা বাড়ি আছে। উপরের তলায় কোম্পানির গেস্ট হাউস। নীচের তলায় বাসবের কোয়ার্টার। রান্নাবান্না করে দেয় অফিসের আরদালি পঞ্চানন। খুব করিৎকর্মা ছেলে। তাই কনকপুরে খাওয়া থাকা নিয়ে বাসবের তেমন কোনও অসুবিধা নেই। সমস্যা তার একটাই। বাবা-মা, বন্ধুবান্ধব, পাড়ার আড্ডা, রকের গুলতানি এসব ছেড়ে দূরে পড়ে থাকা।
বাসবের বাবা ও মায়ের বয়স হয়েছে। তাঁদের দেখার কেউ নেই। তাই এখন বাড়ির কাছাকাছি কোনও জায়গায় বদলি হওয়াটা তার একান্তই দরকার। সেই চাকরিতে জয়েন করার পর থেকে তিন বছরের উপর হয়ে গেল, বাসব কনকপুরে পড়ে আছে। কলকাতার কাছাকাছি একটা জায়গায় বদলির দাবি সে করতেই পারে।
অফিসে বাসবদের মতো জুনিয়র কর্মীদের বদলির ব্যাপারটা দেখাশোনা করেন, জেনারেল ম্যানেজার রুদ্র রায়। তিনি ভারী কড়া ধাঁচের লোক, বদলি নিয়ে কোনও সুপারিশ, দরবার, দরখাস্ত পছন্দ করেন না। কেউ যদি দরখাস্ত করে বসে তাহলে তাকে পত্রপাঠ বদলি করে একশো আশি ডিগ্রি বিপরীত দিকে পাঠিয়ে দেন। একমাত্র তিনি মনে করলে তবেই কারও বদলি হয়। অতএব বাসবের বদলিটা রুদ্র রায়ের মরজির উপর ঝুলে আছে।
কনকপুরে দিনের বেলাটা কাজকর্মের মধ্যে দিয়ে বাসবের একরকম কেটে যায়। কিন্তু সন্ধের পর অফিস থেকে ফিরে বড্ড একলা লাগে তার। কথা বলার একটা লোক পর্যন্ত নেই। কলকাতায় পাড়ার রকের আড্ডা, ফুটবল, ক্রিকেট, সিনেমা নিয়ে গরমাগরম আলোচনা, বন্ধুদের সঙ্গে সন্ধেয় চুটিয়ে ক্যারাম খেলা এসবের জন্য বাসবের মনটা বড্ড টনটন করে। কী আর করা যাবে, মনের দুঃখ ভুলতে অফিস থেকে বাড়ি ফিরে একগাদা খবরের কাগজ, মাসিক পত্রিকা, গল্পের বই এসবের মধ্যে ডুব মেরে পড়ে থাকে বাসব।
আজ আকাশের মুখ ভার। দুপুর থেকে বৃষ্টি পড়ছে। সবে বিকেল চারটে। আকাশের রং ঘন কালো। চারিদিকে যেন আঁধার ঘনিয়ে এসেছে। মন খারাপ করে অফিসের জানালা দিয়ে বাইরের দিকে চেয়েছিল বাসব। মন চলে গিয়েছে পাড়ার রকে। আহা এই আবহাওয়ায় পাড়ায় থাকলে তেলেভাজাসহ জমাটি আড্ডা হতো।
হঠাৎ মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল। ফোনের স্ক্রিনে রুদ্র রায়ের নাম ভেসে উঠতে দেখে চমকে উঠল বাসব। তাদের অরগানাইজেশনে রুদ্র রায়ের মতো পদাধিকারীরা তার মতো জুনিয়র সেলস রিপ্রেসেন্টেটিভের সঙ্গে সচরাচর কথা বলেন না। কালেভদ্রে তেমন দরকার পড়লে ল্যান্ডলাইন থেকে ফোন করে তাঁর সেক্রেটারি। যাই হোক, ফোন রিসিভ করে ব্যস্ত হয়ে বাসব বলল, 'গুড ইভনিং স্যার!'
রুদ্র রায় গম্ভীর গলায় বললেন, 'পরশু একবার হেড অফিসে এসো তো! ফার্স্ট আওয়ারে এলে ভালো হয়। বিষয়টা জরুরি।'
এই বলে ফোন ছেড়ে দিলেন রুদ্র রায়। বাসব ভাবতে বসল। হঠাৎ এই তলবের কারণ? জরুরি বিষয়টা কী হতে পারে, আন্দাজ পাওয়ার জন্য হেড অফিসের দু-একজন কলিগকে ফোনে বাজিয়ে দেখল বাসব। তারা এ ব্যাপারে কোনও আলোকপাত করতে পারল না। বাসব গভীর চিন্তায় পড়ে গেল। তার মতো সামান্য একজন কর্মচারীর সঙ্গে রুদ্র রায়ের কী এমন জরুরি দরকার থাকতে পারে।
একরাশ উৎকন্ঠা নিয়েই পরশু সকাল সকাল কলকাতার হেড অফিসে পৌঁছে গেল বাসব। রুদ্র রায়ের ঘরে ঢুকতেই উষ্ণ গলায় তিনি বললেন, 'এসো এসো। তোমার কথাই ভাবছিলাম।'
বাসব জড়সড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে ঘরে। রুদ্র রায় আন্তরিকতার সঙ্গে বলেন, 'দাঁড়িয়ে কেন, বোসো বোসো। চা খাবে তো?' বাসবের মতামতের অপেক্ষা না করে বেল টিপে দু-কাপ চায়ের অর্ডার দিলেন রুদ্র রায়।
ব্যাপার কী? ভিতরে ভিতরে উত্তেজনায় ঘামতে লাগল বাসব। সে শুনে এসেছে রুদ্র রায় খুব রাশভারী মানুষ। অধস্তনদের কখনও ঘরে ডেকে খাতির-টাতির করেন না। অধস্তন কাউকে সামনে বসিয়ে চা খাওয়ানোর তো প্রশ্নই ওঠে না। এমনিতে বাসবের মতো জুনিয়র কর্মচারীদের তার ঘরে ঢোকারই অনুমতি নেই।
বাসব চেয়ারে বসেই বলল, 'স্যার এবারে আমার ওখানে সেলসের ফিগার কিন্তু...'
বাসবকে কথা শেষ করতে না দিয়ে রুদ্র রায় বলে উঠলেন, 'না, নাï ওসব ঠিক আছে। অফিসিয়াল বিষয়ে আলোচনার জন্য তোমাকে ডাকিনি।'
বাসব একেবারে বোমকে বাইশ হয়ে গেল। রুদ্র রায়ের মতো কর্মব্যস্ত লোক কাজের দিনে তিনশো মাইল দূর থেকে তাকে ডেকে পাঠিয়েছেন। তাও আবার আলোচনা কোনও অফিসিয়াল বিষয় নিয়ে নয়। রহস্যটা কী? মাথা ভোঁ-ভোঁ করতে লাগল বাসবের। এর মধ্যে বেয়ারা এসে চা দিয়ে গেল ঘরে।
'নাও চা নাও।' বলে চায়ের কাপে চুমুক দিলেন রুদ্র রায়। তারপর চেয়ারের গায়ে গা এলিয়ে দিয়ে বললেন, 'একটা ছোট পারিবারিক সমস্যায় পড়েছি। তোমার সাহায্য দরকার।' এ আবার কী নাটক? বাসব বোকার মতো চোখ-মুখ করে রুদ্র রায়ের দিকে চেয়ে রইল।
বাসবকে ধন্দের মধ্যে রেখে রুদ্র রায় প্রশ্ন করলেন, 'তুমি বরাহমিহিরের নাম শুনেছ?'
কৌতূহলী গলায় প্রশ্ন করে বাসব, 'প্রাচীন যুগের জ্যোতির্বিদ?'
'উঁহু। আমি এই সময়ের প্রখ্যাত জ্যোতিষী বরাহমিহিরের কথা বলছি।'
আড়ষ্ট গলায় বাসব বলল, 'ওঃ রাস্তায় যাঁর নামে বড় বড় হোর্ডিং দেখা যায়?'
'হ্যাঁ ঠিক বলেছ। বলতে পারো উনি হলেন আমাদের পারিবারিক জ্যোতিষী।'
স্নায়ু টানটান করে একদৃষ্টে রুদ্র রায়ের মুখের দিকে চেয়ে থাকে বাসব। এসব কথার সঙ্গে তার কীসের সম্পর্ক বুঝতে পারছে না সে।
রুদ্র রায় বললেন, 'বিষয়টা একান্তই ব্যক্তিগত। সবাইকে ঠিক খুলে বলা যায় না। তবে তোমাকে বলতে দ্বিধা নেই। কেননা তোমার সাহায্য আমার একান্ত প্রয়োজন। আশা করি তুমি আমাকে সাহায্য করবে।'
'সাধ্যে কুলোলে নিশ্চয়ই সাহায্য করব স্যার।'
'দ্যাট শ্যুড বি দ্য স্পিরিট। এরিয়া ম্যানেজার সুশান্ত বলছিল তুমি খুব কাজের ছেলে। তাই তোমার কথাই মনে হল। তুমি জ্যোতিষ, তন্ত্রমন্ত্রে বিশ্বাস করো?'
ঘাবড়ে গেল বাসব। জ্যোতিষী, হস্তরেখা বিচার, তন্ত্রমন্ত্র এসবে তার মোটেও বিশ্বাস নেই। ছেলেবেলা থেকে বাবার মুখে শুনে এসেছে, এসব হল কুসংস্কার। এখানে ফস করে সত্যি কথাটা বলে বসলে কেলো হতে পারে। বরাহমিহির হলেন রুদ্র রায়ের পারিবারিক জ্যোতিষী। তার মানে জ্যোতিষ, মন্ত্র-তন্ত্রে রুদ্র রায় বিশ্বাস করেন।
ঢোক গিলে বাসব বলল, 'তা খানিকটা করি বই কী।'
টেবিলে চাপড় মেরে রুদ্র রায় বলেন, 'ভেরি গুড। জ্যোতিষশাস্ত্র, তন্ত্রমন্ত্র এসবে তোমার বিশ্বাস আছে জেনে খুশি হলাম। আজকাল তোমার মতো অনেক ইয়ং ছেলেরা আবার এসবে বিশ্বাস করে না। এটা কোনও কাজের কথা নয়। জেনে রেখো জ্যোতিষসম্রাট বরাহমিহিরের কথা মিথ্যে হতে পারে না। তিনি বাকসিদ্ধ তান্ত্রিক।'
খাবি খেতে থাকে বাসব। রুদ্র রায় কী বলতে চাইছেন, কিছুই তার মাথায় ঢুকছে না। রুদ্র রায় ফের বললেন, 'আসলে হয়েছে কী, আমার ছেলেটার একেবারেই লেখাপড়ায় মন নেই। নাইন থেকে টেনে উঠেছে গার্জিয়ান কলে। এ নিয়ে আমার স্ত্রী খুব চিন্তিত। এদিকে আমার প্রোমোশনটাও আটকে রয়েছে। এতদিনে আমার এমডি হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু হচ্ছি কোথায়? আমার স্ত্রীর ধারণা আমাদের পরিবারকে কেউ তুকতাক করেছে।'
ঘোর বিস্ময়ে চোখ তুলে সে বলে উঠল, 'তুকতাক ?'
'যেই করে থাকুক না কেন কাজটা,আমার সঙ্গে পেরে উঠবে না। বরাহমিহিরের মোক্ষম দাওয়াইয়ে ঢিট হবেই। এ জন্য শুধু একটা নিখুঁত খয়েরি রঙের পাঁঠা চাই।'
এবারে বিষম খেল বাসব। যাই হোক নিজেকে দ্রুত সামলে নিয়ে স্বগতোক্তির মতো বলে উঠল, 'খয়েরি রঙের পাঁঠা?'
রুদ্র রায় উত্তেজিত হয়ে সামনে ঝুঁকে পড়ে বললেন, 'ডার্ক ব্রাউন। সারা গায়ে অন্য রঙের ছিটেফোঁটাও থাকলেও চলবে না। কানে ইনসিওরেন্সের মাকড়ি থাকলে সেটা খুঁত হিসেবেই ধরতে হবে।'
'ইনসিওরেন্স? পাঁঠার ?'
'সরকারি অনুদানের পাঁঠার ইনসিওরেন্স হয়। জানা নেই বুঝি?'
দু-দিকে মাথা নাড়ে বাসব।
রুদ্র রায় চেয়ারে গা এলিয়ে ফের বলেন, 'পাঁঠাটা তেল চকচকে স্বাস্থ্যবান হওয়া চাই। হাড়পাঁজরা চামড়ার তলা দিয়ে ফুটে উঠলে চলবে না। বরাহমিহির এমনই বলেছেন।'
বাসব হাঁ হয়ে গিয়ে বলল, 'কিন্তু এ ব্যাপারে আমি আপনাকে কীভাবে সাহায্য করতে পারি?'
রুদ্র রায় বললেন, 'কনকপুরে সিদ্ধেশ্বরী কালী মায়ের মন্দির আছে জানো?'
বাসব বলে, 'শুনেছি স্যার। স্থানীয় অনেকে বলে দেবী খুব জাগ্রত।'
কুলকুল করে খানিকটা হেসে নিয়ে রুদ্র রায় বলেন, 'বিলকুল ঠিক বলেছ। ওখানে নিখুঁত খয়েরি পাঁঠাবলি দিয়ে একটা যজ্ঞ করলেই তুকতাকের দোষ কেটে যাবে। কৌশিকী অমাবস্যায় এ কাজ করলে ফলাফল অব্যর্থ। এরকমই নিদান দিয়েছেন বরাহমিহির। সামনের শনিবার কৌশিকী অমাবস্যা। আমি সপরিবারে কনকপুরে যাব।'
'বেশ তো, গেস্টহাউস রেডি করে রাখব স্যার।'
রুদ্র রায় এবারে বেশ মিনতির সুরে বললেন, 'সেইসঙ্গে একটা নিখুঁত খয়েরি পাঁঠা জোগাড় করে দিতে হবে ভাই।'
এতক্ষণে বিষয়টা খোলসা হল বাসবের কাছে। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সে বলল, 'বেশ চেষ্টা করে দেখি স্যার।'
রুদ্র রায় এবারে মরিয়া হয়ে বললেন, 'চেষ্টা নয়, তোমাকে জোগাড় করে দিতেই হবে। নিখুত পাঁঠা। ডার্ক ব্রাউন। আমি জানি তুমি খুব এফিসিয়েন্ট ছেলে। আর একটা রিকোয়েস্ট, কথাটা খুব বেশি প্রচার কোরো না।'
'ঠিক আছে স্যার।'এই বলে বাসব চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়।
রুদ্র রায় প্রশ্ন করেন, 'কতদিন হল তুমি কনকপুরে রয়েছ?'
'তিন বছরের উপর।'
'বাড়ি কোথায়?'
'কলকাতায়।'
'ও অনেক দিন ঘরছাড়া। এবারে তো তাহলে ঘরে ফিরতে হয়।'
ভিতরে ভিতরে পুলকিত হয়ে উঠলেও বাইরে কোনও উচ্ছ্বাস দেখায় না বাসব। সহকর্মীরা বলে রুদ্র রায়ের কথার পরতে পরতে নাকি প্যাঁচ থাকে। হয়তো সামনাসামনি কথা বলে বদলির ব্যাপারে বাসবের মনের তল পাওয়ার চেষ্টা করছেন রুদ্র রায়। এমন লোকের কাছে মনের ভাব খোলাখুলি না প্রকাশ করাই ভালো। হিতে বিপরীত হয়ে যেতে পারে। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে বাসব।
রুদ্র রায় বলেন, 'ঠিক আছে এই কাজটা ভালোয়-ভালোয় হয়ে যাক, তারপরে তোমার ব্যাপারটা আমি দেখছি।'
মনে-মনে হাসি পেল বাসবের। তার বদলির ভাগ্য নির্ভর করছে একটা হৃষ্টপুষ্ট খয়েরি পাঁঠার উপর। ফরমায়েশ মতো পাঁঠা জোগাড় করতে পারলে রুদ্র রায় খুব খুশি হবেন। সেই পাঁঠা বলি দিয়ে যজ্ঞ করলে রুদ্র রায়ের পরিবারের উপর তুকতাকের দোষ কাটবে। সেইসঙ্গে বাসবেরও বদলির একটা হিল্লে হয়ে যেতে পারে।
কনকপুরে ফিরে পঞ্চাননকে সব খুলে বলতে সে বলল, 'কোনও চিন্তা নেই স্যার। পাঁঠা আমি ম্যানেজ করে দেব।'
'পারবে তো?'
'আপনি একদম ভাববেন না।'
পাঁঠার খোঁজে লেগে গেল পঞ্চানন। তবে পঞ্চাননের ভরসায় হাত-পা একেবারে গুটিয়ে বসে রইল না বাসব। কোম্পানির অত বড় সাহেবের আবদার বলে কথা। তিনি রুষ্ট হলে চাকরির ক্ষেত্রে অনেকরকম বিপদ হতে পারে বাসবের। বাসব নিজেও পাঁঠার সন্ধানে নেমে পড়ল। তবে মাঠে নেমে সে বুঝল, নিখুঁত খয়েরি পাঁঠা জোগাড় করা মোটেই সহজ কাজ নয়।
একজন কসাই দুটো পাঁঠা দেখাল। দুটোরই গায়ের রং খয়েরি। তবে একটার কানের লতি কাটা, পিঠ থেকে এক খাবলা লোম উঠে গিয়েছে। আরেকটা হৃষ্টপুষ্ট হলেও পেটের কাছে অনেকটা জায়গা জুড়ে সাদাটে ছোপ রয়েছে। অতএব কোনওটাই নিখুঁত হল না। আরেকজনের কাছে গিয়ে তৃতীয় একটা খয়েরি পাঁঠার সন্ধান পেল বাসব। কিন্তু সেটার কানে আবার ইনসিওরেন্সের মাকড়ি রয়েছে। কাজেই নিখুঁত নয়। বাতিল।
তন্নতন্ন করে খুঁজেও আর কোনও খয়েরি পাঁঠার খোঁজ পেল না বাসব। কাল রুদ্র রায়ের আসার কথা। কী করা যায়? অনেক ভেবে বাসব স্থির করল, আজ রাতে জানিয়ে দিতে হবে রুদ্র স্যারকে। জুতসই পাঁঠা পাওয়া গেল না। রুদ্র রায় নিশ্চয়ই মনে মনে তার উপরে খুব চটে যাবেন। তাকে অপদার্থ, অকর্মণ্য বলে ভাববেন। বাসবের বদলির ব্যাপারটাও টিকবে না। কালো পাঁঠা হলে চিন্তা ছিল না। পাঁঠার একেবারে প্যারেড লাগিয়ে দেওয়া যেত। খয়েরি রংটাই ঝামেলায় ফেলে দিল। ক্লান্ত ও হতাশ হয়ে সন্ধেবেলা বাড়ি ফিরতেই পঞ্চানন একগাল হেসে বলল, 'মাল জোগাড় হয়ে গেছে স্যার।'
'মাল মানে?'
অন্ধকারে বারান্দার এক কোনায় বসে কাঁঠাল পাতা চিবোচ্ছিল পাঁঠাটা। ব্যা-অ্যা-অ্যা করে ডেকে জানান দিল আমি এসেছি। ব্যা-অ্যা-অ্যা ডাক শুনেই বাসবের চোখে-মুখে খুশি ঝলক দিয়ে উঠল। সারাদিনের ক্লান্তি দূর হয়ে গেল নিমেষে। পাঁঠার বিচ্ছিরি কর্কশ ব্যা-অ্যা-অ্যা ডাক বাসবের কানে খুবই মধুর শোনাল। তবে চতুষ্পদ জন্তুটিকে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে ধপ করে চেয়ারে বসে পড়ল বাসব। হতাশ গলায় সে বলল, 'এ দিয়ে তো কাজ হবে না পঞ্চানন।'
পঞ্চানন বলল,'কেন? রং খয়েরিই তো। দিব্যি পুরুষ্টু পাঁঠা।'
'ধুত্তেরি পেটের কাছে সাদা ছোপ আছে। ঠ্যাংগুলোও তো অর্ধেক সাদা, অর্ধেক খয়েরি।'
ফিক করে হেসে পঞ্চানন বলল, 'চিন্তা করবেন না সবটাই খয়েরি হয়ে যাবে। একেবারে নিখুঁত। নিতাই আসছে।'
বাসব গা ঝাড়া দিয়ে সোজা হয়ে বসে বলল, 'নিতাই আসছে মানে? কে নিতাই?'
'স্টেশনবাজারে চুলদাড়ি কামায়। ছোকরার হাত খুব ভালো।'
ছানাবড়া চোখে বাসব বলল, 'মানে? তোমার মতলব কী বলো তো?'
'সাদা জায়গাগুলো ডাই করে নিতাই নিখুঁতভাবে খয়েরি করে দেবে। বড় সাহেব বুঝতেও পারবেন না।' এই বলে ফের খিকখিক করে হাসল পঞ্চানন।
আঁতকে উঠে বাসব বলে, 'বলছ কী? ধরা পড়লে?'
'পড়বেন না। চিন্তা নেই। নিতাই শিল্পী লোক।'
'কাজটায় বড্ড রিস্ক থেকে যাচ্ছে পঞ্চানন।'
'কালই তো রায়সাহেব আসবেন। জুত মতো পাঁঠা না পেলে করবেন কী? খোঁজাখুঁজি তো আর কম করিনি। আপনিও তো খুঁজেছেন।'
'রায়সাহেব কিন্তু নিখুঁত পাঠার কথা বারবার বলেছেন।'
পঞ্চানন বলল, 'পাঁঠা তো নিখুঁতই হচ্ছে। সাদা রং খয়েরি হয়ে যাবে। নিতাইয়ের হাতের কাজটা আগে দেখুন। নিতাই কি শুধু পরামাণিক নাকি? যাত্রাপার্টির হয়ে মেকআপের কাজও করে।'
বাসব কিন্তু কিন্তু মুখ করে বলে, 'ব্যাপারটা আমার ভালো ঠেকছে না পঞ্চানন। আমি বরং ফোনে এই কথা জানিয়ে দিই রায়সাহেবকে।'
'তাতে কি আপনার কোনও সুবিধে হবে? বদলির লিস্টে আপনার নামের পাশে ঢ্যাঁড়া পড়ে যাবে না? এত ভাবছেন কেন বলুন তো? মনে ভক্তি থাকলে ডাই করা পাঁঠাতেই সাহেবের কাজ হয়ে যাবে।' বলল পঞ্চানন।
মাথা চুলকে ভাবল বাসব। কথাটা পঞ্চানন ঠিকই বলেছে। ডাই করে যদি সমস্যা মেটে সেটা মন্দ কী? রুদ্র রায় জানতে না পারলেই হল। এমনিতেই তো একটা বোগাস ব্যাপার। পাঁঠা বলি দিয়ে তুকতাকের দোষ কাটানো। যতসব কুসংস্কার।
কিন্তু পাঁঠার গা রঙে ছোপালে একটা লোকের বিশ্বাসের সঙ্গে কি তঞ্চকতা করা হবে না? বাসবের ভিতর থেকে কে যেন বলে উঠল, ধুত্তেরি রাখো তোমার এই ছেঁদো সেন্টিমেন্ট। রুদ্র রায় খয়েরি পাঁঠা চান। নিখুঁত। রং ছোপানোর ব্যাপারটা তিনি ধরতে না পারলেই হল। এতে তেমন দোষ হচ্ছে কোথায়? কৌশল খাটাতে গিয়ে স্বয়ং যুধিষ্ঠিরও তো কিঞ্চিৎ মিথ্যের আশ্রয় নিয়েছিলেন।
রাতের দিকে নিতাই তার চুলকাটার বাক্স নিয়ে বাসবের কোয়ার্টারে এসে হাজির হল। পঞ্চাননই নিয়ে এল তাকে। এসব কাজ চুপিসাড়ে করাই ভালো। নিতাইয়ের কেরামতি মন দিয়ে দেখল বাসব। ছেলেটার বাহাদুরি আছে বটে। ডাই করে নিখুঁত ভাবে সাদা রংকে খয়েরি করে দিল। পাঁঠাটাও খুব বাধ্য। ঘণ্টাখানেক ধরে শুধু কাঁঠালপাতা চিবিয়ে গেল। একটুও ছটফট করল না। নিতাইয়ের কাজে কোনও ব্যাঘাত ঘটাল না।
নিতাইয়ের কাজ শেষ হতেই পঞ্চানন বলল, 'এই তো দিব্যি আপনার খয়েরি পাঁঠা তৈরি হয়ে গেল। এখন কেউ বলুক দেখি রং নকল?
নিতাই বলল, 'মানুষের চুলে লাগানোর রং দিয়ে পাঁঠা ছুপিয়ে দিলাম। এ রং পাঁঠার লোমের উপর কতটা কাজ করবে জানি না। দেখবেন বলির আগে চান করিয়ে না দেয়। খানিকটা রং উঠে যেতে পারে।'
বাসব আঁতকে উঠে বলল, 'অ্যাঁ! বলির আগে স্নান করানোই যে নিয়ম।'
পঞ্চানন বলল, 'আপনি চিন্তা করবেন না স্যার। ও আমি ম্যানেজ করে নেব। মন্দিরের পুরুতকে চিনি। পুরুতের হাতে কিছু বাড়তি টাকা গুঁজে দিলেই হল।'
পরের দিন দামি গাড়ি হাঁকিয়ে রুদ্র রায় সস্ত্রীক এসে হাজির হলেন। বাসব দেখল, ম্যাডামের দাপট সাহেবের চেয়েও বেশি। রুদ্র রায়ের মতো দাপুটে লোক বউয়ের সামনে একেবারে জো-হুজুর হয়ে আছেন।
ম্যাডাম এসেই ছাগল দেখে বললেন, 'হাউ সুইট। বেচারা!' বাসবকে জিগ্যেস করলেন, 'ওহে খাঁটি ব্রাউন তো? কোনও খুঁতটুত নেই তো?'
মিথ্যে কথা বলার অভ্যেস বাসবের বিশেষ নেই। তাকে আজ পাঁঠার গেরোয় পড়ে মিথ্যে বলতে হচ্ছে। সে থতমত খেয়ে বলল, 'না ম্যাডাম। একেবারে জেনুইন।'
'হুম।' বাসবের এই কথায় ম্যাডাম বড় একটা সন্তুষ্ট হলেন না। ভালো করে পাঁঠার গায়ে হাত বুলিয়ে, লোমটোম টেনেটুনে সব পরখ করে বললেন, 'কেমন যেন একটা গন্ধ পাচ্ছি?'
বাসবের মাথায় বাজ পড়ার উপক্রম। সে তড়িঘড়ি বলে উঠল, 'বোটকা! বোটকা! পাঁঠার খাঁটি বোটকা গন্ধ।'
একথায় ম্যাডামের প্রত্যয় হল বলে মনে হয় না। তিনি পাঁঠার গায়ে নাক ঠেকিয়ে গন্ধ শুকতে লাগলেন। মনে মনে দুর্গা নাম জপতে লাগল বাসব।
রুদ্র রায় বললেন, 'অত দেখার কিছু নেই। বাসব খুব করিতকর্মা ছেলে।'
রুদ্র রায়কে মৃদু ধমক দিয়ে ম্যাডাম বললেন, 'যা বোঝো না, তা নিয়ে কথা বোলো না তো। ভালো করে সব দেখে নেওয়া ভালো। ছাগলের খুঁত থাকলে কাজ হবে না। গুরুজি স্পষ্ট বলে দিয়েছেন।'
পাঁঠা এবার ম্যাডামের গায়ে সামনের দু-পা তুলে দিয়ে দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে আহ্লাদের সুরে ডেকে উঠল ব্যা-অ্যা-অ্যা—। যেন অভিযোগ জানাতে চাইল, মা আমি খাঁটিই ছিলাম এরাই গায়ে রংটং করে আমাকে ভেজাল করে দিল। ম্যাডাম চতুষ্পদের এই ভাষা বুঝলেন না। তিনি পাঁঠার এক পা ধরে হ্যান্ডশেকের ভঙ্গিতে ঝাঁকিয়ে বললেন 'গুড বয়। মাই সুইটি।'
সিদ্ধেশ্বরী কালী মায়ের মন্দিরে গিয়ে পাঁঠা বলি দিয়ে ঘটা করে যাগযজ্ঞ করে পুজো দিলেন রুদ্র রায় ও তাঁর স্ত্রী। বলির আগে রুদ্র রায়ের স্ত্রী ছাগল স্নান করানোর প্রশ্ন তোলায় পুরোহিত বললেন, কোনও দরকার নেই। এ মন্দিরে পাঁঠা স্নান করানোর রেওয়াজ নেই। সামান্য গঙ্গাজল ছিটিয়ে দিলেই কাজ হয়ে যাবে মা।
ফেরার সময় গাড়িতে ওঠার আগে বাসবের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করে রুদ্র রায় বললেন, 'ইউ হ্যাভ ডান আ সপ্লেনডিড জব।'
সপ্তাহখানেকের মধ্যেই বাসবের ট্রান্সফার অর্ডার এল। তার বদলি হয়েছে কনকপুর থেকে সোজা কলকাতার হেড অফিসে। কলকাতার অফিসে কাজে যোগ দেওয়ার পর মাসদুয়েক বাদে রুদ্র রায় আবার ডেকে পাঠালেন বাসবকে। বাসব ঘরে ঢুকতেই রুদ্র রায় উৎসাহের সঙ্গে উষ্ণ গলায় বললেন, 'আরে এসো! জরুরি কথা আছে তোমার সঙ্গে।'
দুর্ভাবনায় পড়ে গেল বাসব। আবার কি পাঁঠা জোগাড় করতে হবে।
রুদ্র রায় বললেন, 'ভাগ্যিস তুমি নিখুঁত খয়েরি পাঁঠাটা জোগাড় করে দিয়েছিলে—'
বাসব প্রশ্ন করে,'কাজ হয়েছে স্যার?'
'হয়েছে মানে? ছেলেটা মিড টার্মে অঙ্ক ছাড়া সব সাবজেক্টেই পাশ করেছে? যে ছেলে সব বিষয়ে ফেল করতে লেগেছিল, তার পক্ষে তো এ অভাবনীয় উন্নতি। তাছাড়া আজ একটা খবর পেলাম জানো? প্রোমোশনটা মনে হচ্ছে শিগগিরই হয়ে যাবে।'
বাসব ঢোক গিলে বলে, 'হবেই তো। বরাহমিহিরের নিদান কখনও মিথ্যে হতে পারে স্যার?'
রুদ্র রায় বেল টিপে বেয়ারাকে বললেন, 'দু-কাপ চা।'

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন