পাখার কারিকুরি

শান্তনু বসু

কাশীবাবু সুঁইচ টিপে দেখলেন দোতলায় পুবদিকের ঘরের পাখাটা ঘুরছে না। তা সে না ঘুরতেই পারে। বয়স তো আর কম হয়নি, লম্বা যান্ত্রিক জীবনে অনেক ঘোরাঘুরি সে করেছে। পুরোনো আমলের সাহেব কোম্পানির পাখা, মাঝের গোলাকার অংশটা ভীমের গদার মতো। কবে থেকে যে কড়ি-বরগার ছাতের গায়ের আংটা থেকে লম্বা রড দিয়ে ঝুলে আছে তা বলা মুশকিল। বয়সকালে সবাই শ্লথ হয়ে পড়ে। পাখাটাও ইদানীং ঘুরত খুব ধীরে। এবার বোধ হয় একেবারেই দেহ রাখল।

ঘরের মাঝে দাঁড়িয়ে, পাখার দিকে তাকিয়ে চিন্তায় মাথা চুলকাতে লাগলেন কাশীবাবু। আগামিকাল গুরুদেবের আসার কথা। এ ঘরেই থাকবেন। বৈশাখের শুরু। বেজায় গরম পড়েছে। পাখার অভাবে অত বড় সিদ্ধপুরুষ, শিষ্যের বাড়ি এসে কি গরমে সিদ্ধ হবেন? তাহলে যে বড় বেইজ্জতির ব্যাপার হবে।

নাঃ! সময়টা কাশীবাবুর একেবারেই ভালো যাচ্ছে না। কালো গরুটা ভালোই দুধ দিচ্ছিল। পট করে কোথা থেকে কী হয়ে বাছুরটা মরে গেল। বাছুরের শোক কাটতে না কাটতেই ন্যাড়া নিতাই এসে আচমকা ক্লাব আয়োজিত গাজন উৎসবের খিচুড়িভোগের জন্য দশ বস্তা চাল চেয়ে বসল।

ন্যাড়া নিতাইয়ের খুনে চাহনি দেখে কাশীবাবুর মুখ শুকিয়ে গেল। তবু মনে সাহস এনে বললেন, 'দশ বস্তা চালের বাজার মূল্য মানে ইয়ে—'

ঘরে এবার যেন বাজ পড়ল, 'মাসে কত কামাচ্ছেন তার হিসেব আছে? মনে রাখবেন সবই কিন্তু এই ন্যাড়া নিতাইয়ের দয়া।'

কাশীবাবু দমে গিয়ে নিতাইয়ের কথায় সায় দিয়ে বললেন, 'তা একরকম ঠিকই বলেছ ভাই।'

'সবই যখন বোঝেন তখন ফালতু নখরা করছেন কেন? এই যে আপনাকে পুণ্যি করাচ্ছি, তারও তো একটা খরচ আছে। সে বাবদ ক্যাশ পাঁচ হাজার টাকা দেবেন।'

কাশীবাবু চোখে সর্ষেফুল দেখলেন। মাথা ঘুরতে শুরু করল। বুকের ভিতরটা কেমন যেন খালি বোধ হল। মনে হল মূর্ছা যাবেন। কোনওরকমে নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, 'পাঁ-চ হা-জা-র?'

মাথাটা কাশীবাবুর মুখের কাছে নামিয়ে এনে মোলায়েম গলায় নিতাই বলল, 'আজ রাতে যদি আপনার চালের গুদামটা পুড়ে ছাই হয়ে যায়, তাহলে কত খসবে হিসেব করে দেখেছেন কি?'

আর কথা বাড়ানোর সাহস পেলেন না কাশীবাবু। পাঁচ হাজার টাকা আর দশ বস্তা চাল নিয়ে ন্যাড়া নিতাই চলে গেল।

মানুষের বিপদে সদুপদেশ দেয়, এমন লোক কলিকালে হাতে গুনে পাওয়া যায়। কাশীবাবুর প্রতিবেশী হলধর হাওলাদার হলেন এমনই বিরল প্রকৃতির একজন মানুষ। তিনি বললেন, 'মনে হচ্ছে মশায় আপনার ওপর অপদেবতার কুনজর পড়েছে। আপনার গুরুদেব তো তন্ত্রসিদ্ধ পুরুষ, ওঁকে দিয়ে অবিলম্বে গৃহবন্ধন করান।'

কথাটা কাশীবাবুর মনে ধরল। বিপদের সব খতেন বিস্তারিতভাবে লিখে গৃহবন্ধনের জন্য গুরুদেবকে আমন্ত্রণ জানালেন। গুরুদেবও পত্রপাঠ জানিয়ে দিলেন, শিগগিরই তিনি শিষ্যের অতিথি হবেন।

গুরুদেব আসার ঠিক আগে, এই গরমের সময়ই খারাপ হয়ে গেল পাখাটা। এও তো এক অশুভ সংকেত।

পাখির কিচিরমিচির শুনে জানলার দিকে তাকাতেই কাশীবাবুর বুকটা ছাঁৎ করে উঠল। চোখ বন্ধ করে ফেলেছিলেন, কিন্তু শেষরক্ষা হল না। ঠিক দেখে ফেলেছেন। জানলায় এসে বসেছে একটা শালিক।

কাশীবাবু বেজায় রেগে পাখিটার দিকে তেড়ে গিয়ে বললেন, 'ব্যাটা অপয়া বজ্জাত পাখি, দেখা দেওয়ার আর সময় পেলি না? যাঃ! যাঃ!'

এত অপমান সয়েও বেআক্কেলে, বেহায়া পাখিটা বাইরে না গিয়ে ঘর জুড়ে খানিক উড়ে গিয়ে নিশ্চিন্তে পাখার একটা ব্লেডের ওপর বসল। কিচিরমিচির করে নিজের ভাষায় বাড়ির মালিককে জোর একচোট গালমন্দ করে নিল। কাশীবাবু পাখার দিকে তাকিয়ে হাততালি দিয়ে কেবলই বলতে লাগলেন, 'হুস ফুস যাঃ যাঃ।'

লম্বা ঝুলঝাড়া হাতে ঘরের ঝুল ঝাড়তে ঢুকে অবাক হয়ে গেল ভোম্বল। মামার কি মাথা খারাপ হয়ে গেল? কড়িকাঠের দিকে চেয়ে হাততালি দিয়ে যাচ্ছেন। ভোম্বল জিগ্যেস করল, 'কী হল মামা? ঘরে বাদুড়টাদুড় ঢুকল না কি?'

'বাদুড় নয় রে ভোম্বল, শালিক। দ্যাখ তো তাড়াতে পারিস কি না?'

ঝুলঝাড়াটা দিয়ে পাখার গায়ে খোঁচা দিতেই পাখাটা দুলে উঠল আর পাখিটা ফুড়ুৎ করে উড়ে জানলা দিয়ে বেরিয়ে গেল। কাশীবাবু হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন।

মামার আদেশ পালন করতে পেরে বেজায় খুশি হয়ে ভোম্বল বলল, 'পাখি তাড়ানো সোজা মামা। বাদুড় ঢুকলে মেলা ঝামেলা হত।'

কাশীবাবু চিন্তিত মুখে বললেন, 'ভারী মুশকিল হল রে ভোম্বল।'

'কী মুশকিল মামা?'

'পাখাটা ঘুরছে না।'

এ কথা শুনে ভোম্বলের মনটা আনন্দে তুর্কিনাচ নেচে উঠল। নানারকম বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির কলকবজা নিয়ে নাড়াচাড়া করা ভোম্বলের একটা নেশা। হালে রাধেশ্যামের কাছে পাখা সারানোর কাজটা সে শিখেছে। মামাকে জপিয়ে কিছু মূলধন আদায় করতে পারলে স্বাধীনভাবে ব্যবসা শুরু করা যায়। বাজারে মনের মতো একটা দোকানঘরও সে দেখে রেখেছে।

পাখা নিয়ে মামার উদ্বেগের কারণটা সে জানে। মামার গুরুদেব আসছেন। গরাদহীন জানলাওয়ালা পুবমুখো এই ঘরটা তাঁর খুব পছন্দের। আগেও এ-ঘরে থেকে গিয়েছেন। এবারও এখানেই থাকবেন। কিন্তু অচল হয়ে গিয়ে গোল বাঁধিয়েছে পাখাটা। ওটাকে সচল করতে পারলে, মামা বেজায় খুশি হবেন।

ভোম্বল দুইয়ে দুইয়ে চার করে ফেলল। মামা খুশি হলে মূলধন ছাড়বেন। আর মূলধন মানেই ব্যবসা। সে সোৎসাহে বলল, 'সে কী পাখা ঘুরছে না? মনে হচ্ছে বিয়ারিংটা গেছে। ও সামান্য ব্যাপার!'

ভোম্বল ভেবেছিল তার জ্ঞানের বহর দেখে মামা বোধ হয় তারিফ করবেন।

ভোম্বলের সে আশায় জল ঢেলে পানসে মুখ করে কাশীবাবু বললেন, 'কলকবজা নিয়ে অত কূটকচালি আমার ভালো লাগে না। একবার রাধেশ্যামকে ডেকে নিয়ে আয়।'

ভোম্বল দমে গিয়ে বলল, 'রাধেশ্যামদা এসে কী করবে?'

তিরিক্ষি মেজাজে কাশীবাবু বললেন, 'পাখাটা সারাতে হবে না?

কাল গুরুদেব আসবেন। এ ঘরেই তো থাকবেন। গরম যা পড়েছে, পাখা ছাড়া চলবে কী করে?'

বাঁ-হাত দিয়ে ডান হাতের আঙুল মটকাতে মটকাতে ভোম্বল বলল, 'রাধেশ্যামদা বেড়াতে গেছে।'

'কোথায়?'

'নবদ্বীপে।'

কাশীবাবু পেল্লায় এক ধমক দিয়ে ভাগনেকে বললেন, 'ধ্যাৎ! কালই তো রাধেশ্যামকে বাজারে দেখলাম, বড্ড কুঁড়ে হয়ে যাচ্ছিস। যা সাইকেলটা নিয়ে ওকে একটা খবর দিয়ে আয়।'

'আমার কোনও কথা তুমি বিশ্বাস করো না মামা। গেছে তো আজ সকালে।'

কাশীবাবু হতাশ হয়ে বললেন, 'ওঃ, বিপদের ওপর বিপদ! যখনই এক শালিক দেখেছি ঠিক বুঝেছি, একটা অনর্থ হবে।'

'চিন্তা করছ কেন মামা? পাখাটা আমিই ঠিক করে দিতে পারব।'

ভাগনের কারিগরি বিদ্যার ওপর কাশীবাবুর মোটেই আস্থা নেই। তিনি আঁতকে উঠে বললেন, 'থাক থাক, তোকে আর ওস্তাদি করতে হবে না। শেষে আরও বারোটা বাজিয়ে ছাড়বি।'

অভিমানী গলায় ভোম্বল বলল, 'আমাকে তুমি যে কী ভাবো না মামা! আমি বুঝি কাজ শিখিনি? দু-বেলা রাধেশ্যামদার দোকানে গিয়ে কি এমনি এমনি পড়ে থাকি?'

কাশীবাবু দোটানায় পড়ে গেলেন। এই কাজের দায়িত্ব কি ভোম্বলকে দেওয়া যায়? না দিয়েই বা উপায় কী? বললেন, 'পারবি তুই?'

'দ্যাখোই না!

কাশীবাবুর তবু সন্দেহ যায় না। বলেন, 'দেখিস কিন্তু? গুরুদেবের ব্যাপার, কোনও গড়বড় যেন না হয়।'

ভাগনে ভোম্বলকে তিনি ভালোই চেনেন। গতবার কালীপুজোর সময় টুনি বালব লাগাতে গিয়ে ইলেকট্রিক লাইনের মেল-ফিমেল, ফেজ-নিউট্রাল কী সব গুবলেট করে গোটা বাড়িতে প্রায় আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল।

তবে কাশীবাবু ভেবে দেখলেন, এটাও তো ঠিক, কাজ করতে গিয়ে ভুল কার না হয়, ভুল করতে করতেই তো মানুষ শেখে। ভোম্বল একবার গোল পাকিয়েছে বলে, বারবার যে তালগোল পাকাবে, তার তো কোনও মানে নেই। তাছাড়া ছেলেবেলায় অঙ্কে ফেল করে পরে সে বিষয়ে দিকপাল হয়েছে, এমন নমুনা ভুরি ভুরি আছে। যারা পাহাড়ে চড়ায় দড়, তারা কি কেউ শুরুতে হোঁচট খায়নি?

মাধ্যমিকে ফেল করলে কী হবে, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির ব্যাপারে ভাগনের দারুণ আগ্রহ। কাজ শেখার জন্য রাধেশ্যামের দোকানে দিনরাত পড়ে থাকে। কথাটা মিথ্যে নয়। রাধেশ্যামকে যখন পাওয়া যাবে না, তখন উপায় কি? গাঁয়ে-গঞ্জে তো আর ইলেকট্রিক মিস্ত্রির ছড়াছড়ি নেই, অগত্যা গুরুদেবকে হাওয়া খাওয়াতে হলে ভোম্বলই ভরসা।

দুপুরের দিকে ফুকড়েকে ডেকে পাঠাল ভোম্বল। ফুকড়ে রাধেশ্যামের দোকানে ফাই-ফরমাশ খাটে। ভোম্বলের খুব ন্যাওটা। ফুকড়ে তর তর করে মই বেয়ে উঠে সিলিং থেকে পাখাটা খুলে নামিয়ে আনল। দোতলার লম্বা বারান্দায় কাগজ পেতে জুত করে বসল দুজনে।

পাখার নাটবল্টুগুলোতে জং ধরে বেকায়দা অবস্থা। সেগুলোকে তেলে ভিজিয়ে প্রচুর কসরত করে ঘণ্টাখানেকের চেষ্টায় পাখার ব্লেডগুলো খুলে ফেলল ভোম্বল। গোলাকার বডিটাকে খুলে দু-ভাগ করে নিল। তারপর কনডেনসর, কয়েল, বিয়ারিং, তার এসব নিয়ে টানাটানি শুরু করে দিল। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ভোম্বল বুঝল, সমস্যাটা বিয়ারিং-এরই।

'বুঝলি ফুকড়ে বিয়ারিংটা গেছে। মন দিয়ে দ্যাখ কীভাবে কী করি? ভালো করে কাজ না শিখলে তোকে পার্টনার করে আমার লাভ কী হবে?'

ফুকড়ে অবাক হয়ে বলল, 'তার মানে?'

'শিগগিরই ব্যবসা শুরু করব। তুই আমার পার্টনার হবি।'

'বাজারে দোকান খুলবে?'

ডাইভার দিয়ে পিঠ চুলকাতে চুলকাতে হাসি হাসি মুখ করে ভোম্বল বলল, 'হ্যাঁ রে।'

'পার্টনার মানে তো ঢালতে হবে। আমার পয়সা কোথায়?' স্পিরিট দিয়ে পাখার ব্লেড মুছতে মুছতে হতাশ গলায় বলল ফুকড়ে।

'তোকে পয়সা দিতে হবে না। গায়ে গতরে খাটবি।'

'দোকানের সেলামি কত জানো?'

'মামা দেবে।'

'দেবে তো? সবাই যে বলে তোমার মামা খুব কিপ্টে—'

'এবার যা ফন্দি করেছি না? মামা দরাজ হাতে টাকা ছাড়বে।'

'কী ফন্দি?'

ভোম্বল হেসে বলল, 'পাখা।'

ফুকড়ে চোখ কুঁচকে বলল, 'পাখা? পাখা মানে?'

'পাখাই টাকা দেবে। এই যে পাখাটা সারাচ্ছি, তার একটা মজুরি নেই?'

'পাখা সারানোর মজুরি দোকান ঘরের সেলামি!' খিকখিক করে হাসতে হাসতে প্রশ্ন করল ফুকড়ে।

'হাসছিস যে বড়? কার জন্য পাখাটা সারানো হচ্ছে তুই জানিস? মামার গুরুদেব জটাইবাবা আসছেন। তন্ত্রসিদ্ধ মহাপুরুষ। ডাকিনীবিদ্যা, মারণ উচাটন বশীকরণ সব জানেন। চাইলে তোকে ভ্যানিসও করে দিতে পারেন। পুবের ঘর গুরুদেবের পছন্দ। পাখা না থাকলে উনি যে গরমে ডিমসিদ্ধ হয়ে যাবেন। তখন ঠ্যালা সামলাবে কে শুনি? ঘাম চটচটে হয়ে গুরুদেব যদি চটে যান, তখন মামাকে বাঁচাবে কে? এই ঝামেলা যে সামলে দিচ্ছি, তার একটা মূল্য নেই? তোর পাখা সারানোর মজুরি আর গুরুদেবের পাখা সারানোর মজুরি কোনওদিনও এক হতে পারে? আহাম্মক কোথাকার!'

ভোম্বলের কথার তোড়ে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে ফুকড়ে ফ্যালফ্যাল করে তার দিকে চেয়ে রইল। এমন সময় একটা ছাগল ডেকে উঠল 'ব্যাঁ—অ্যাঁ—অ্যাঁ—'

দুটো তার জোড়া লাগাতে লাগাতে ভোম্বল বলল, 'মামা এলেন বোধ হয়।'

ফুকড়ে ঘাবড়ে গিয়ে বলল, 'মামা কোথায়? ও তো ছাগল।'

ভোম্বল চোখ নাচিয়ে বলল, 'নধর নধর কচি পাঁঠা। মামা হাটে গিয়েছিলেন পাঁঠা কিনতে। গুরুদেবের ভোগ হবে। কাল ভালো খ্যাঁটন আছে।'

ভিতর থেকে কাশীবাবু হাঁক ছাড়লেন, 'ওরে ভোম্বল, কাজ কতদূর এগোল?'

ভোম্বল চেঁচিয়ে বলল, 'এই হয়ে এল মামা।'

ভোম্বলের কাজ যখন শেষ হল, তখন রাত প্রায় দশটা বাজে। পাখার গায়ে জমা ময়লাগুলো স্পিরিট দিয়ে যত্ন করে মুছে দেওয়ায় পাখার চেহারাটা বেশ খোলতাই হয়েছে। কাশীবাবু দেখে তাজ্জব বনে গেলেন। 'চমৎকার হয়েছে রে ভোম্বল, পাখা যে একেবারে নতুন হয়ে গেছে!'

ভোম্বল তৃপ্তির হাসি হেসে বলল, 'তোমাকে বলেছিলাম না মামা, ঝিনচাক করে দেব?'

কাশীবাবু গলায় সহানুভূতির প্রলেপ দিয়ে বললেন, 'তোর তো বেশ পরিশ্রম গেল রে, আজ আর হুড়োহুড়ি করে কাজ নেই। কাল সকালে সিলিং থেকে পাখাটা খাটিয়ে দিলেই হবে। গুরুদেব তো বিকেলে আসবেন।'

সারাদিন ছিল গুমোট গরম। রাতের দিকে ঝড় এল। দশ-পনেরো মিনিটের ঝড়। তাতেই চারিদিক যেন বেসামাল হয়ে গেল। আলো চলে গেল ঝপ করে। পাখা বন্ধ হয়ে গেলেও ভোম্বলের ঘুমের কোনও ব্যাঘাত ঘটল না। গরমের টগবগে ভাবটা ঝোড়ো হাওয়ায় একেবারে মিইয়ে গিয়েছিল।

পরের দিন সকাল হতেই ফুকড়েকে ডেকে নিয়ে আবার কাজে লেগে পড়ল ভোম্বল। ঝটপট সিলিং থেকে ঝুলিয়ে দিল পাখাটা। কাশীবাবু উত্তেজিত হয়ে হাঁ করে সিলিং-এর দিকে চেয়েছিলেন। পাখাটা ঝোলানো হতেই ছুটে গিয়ে সুঁইচ টিপলেন। না পাখা ঘুরল না। তবে এবারে দোষটা পাখার নয়। গতকাল রাতে সেই যে কারেন্ট গিয়েছে, এখনও আসেনি। ইলেকট্রিক অফিসে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, গতকালের ঝড়ে বেশ কয়েক জায়গায় তার ছিঁড়েছে। আলো আসতে সময় লাগবে।

সন্ধের মুখে জটাইবাবা এসে পৌঁছোলেন। উলুধ্বনি হল। ভোম্বলের মামিমা নয়নতারা বুক টেনে দম নিয়ে ভক্তি ভরে শঙ্খ বাজালেন। কাশীবাবু ছুটে এসে ঢিপ করে উপুড় হয়ে শুয়ে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলেন গুরুকে। নয়নতারাও গলায় আঁচল দিয়ে গুরুদেবের পায়ের ধুলো মাথায় নিল।

ভোম্বল রসগোল্লা খাওয়ার মতো মুখ হাঁ করে গুরুদেবকে দেখছিল। জটাইবাবা নামটা একেবারে সার্থক। চুল দাড়ি সব কিছুতেই বেজায় জট পাকিয়ে আছে। দাড়িটা গালের দুদিক থেকে নামার পর যুক্তবেণী হয়ে প্রায় নাভিমূল পর্যন্ত ঝুলে জাঁহাবাজ ভুঁড়িখানার ওপর সুঁড়সুঁড়ি দিচ্ছে। জটাইবাবার পরনে রক্তবসন। গলায় রুদ্রাক্ষের মালা, কপালে ত্রিপুণ্ড্রক। হাতে ত্রিশূল। বড় বড় রাঙা চোখদুটোর দিকে তাকালে ভয় আর ভক্তি একসঙ্গে জেগে ওঠে।

'হাঁ করে দেখছিস কী, বাবাকে প্রণাম কর।'

মামার কথায় ভোম্বলের চটকা ভাঙল। সঙ্গে সঙ্গে নীচু হয়ে জটাইবাবার পা জড়িয়ে ধরল সে। ভোম্বলকে তুলে ধরে, বিস্ফারিত চোখে তার মুখের দিকে একদৃষ্টে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন জটাইবাবা। ভোম্বলের বুক কেঁপে উঠল।

সহসা বড় বড় চোখ দুটোকে ঢুলু-ঢুলু করে ভক্তি দরদর গলায় জটাইবাবা বললেন, 'একে কোথায় পেলি রে কাশী?'

কাশীবাবু ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, 'বাবা, ও তো আমার ভাগনে ভোম্বল।'

'ঠিক যেন হর-উমার বড় পুত্র। যে কাজে হাত দেবে সে কাজে সিদ্ধিলাভ হবে।'

ভোম্বলের চোখদুটো খুশিতে চকচক করে উঠল। কাশীবাবুও গুরুর মুখে ভাগনের প্রশংসা শুনে বেজায় আনন্দিত হয়ে বললেন, 'ও বেশ কাজের ছেলে। আপনার ঘরের পাখাটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। ভোম্বলই সারিয়েছে।'

মাটিতে ত্রিশূল ঠুকে জটাইবাবা বললেন, 'চোখ দেখেই আমি বুঝেছি।' ব্যোম ব্যোম করে একটু গালবাদ্য বাজিয়ে নিলেন জটাইবাবা। তারপর ঘরে ঢুকে ফরাসের ওপর পা ছড়িয়ে বসলেন। চোখ ঘুরিয়ে চারিদিক জরিপ করে নিয়ে বললেন, 'ঘরে পাখা-আলো বন্ধ কেন রে কাশী?'

ভারী অপ্রস্তুত হয়ে প্রবল সংকোচের সঙ্গে কাশীবাবু বললেন, 'কাল রাতের ঝড়ে ইয়ে...তার-টারগুলো ছিঁড়ে গিয়ে...মানে কাল রাত থেকে আলো নেই। তবে আপনি এসে পড়েছেন। এবার এসে যাবে।'

মৃদু হেসে জটাইবাবা খুশি খুশি গলায় বললেন, 'ঝড় হয়েছিল বুঝি?'

কাশীবাবু ঘাবড়ে গেলেন। ঝড়ের সঙ্গে গুরুদেবের আহ্লাদের যে কী সম্পর্ক রয়েছে, তা ভেবে ঠাহর করতে পারলেন না। মহাপুরুষের লীলাখেলা অনুধাবন করা কি তার মতো পাতি গৃহস্থের কম্ম?

জটাইবাবা নিশ্চিন্ত গলায় বললেন, 'এসে পড়েছে তাহলে। কতবার বলেছি যাবি যা, তবে বেশি ঝটাপটি করিসনে। ভক্তের বড় অসুঁবিধা হয়। তা তারা শুনবে আমার কথা?'

কাশীবাবু অবাক হয়ে বললেন, 'কার কথা বলছেন বাবা?'

'আমার সতু-নীতু।'

'কই, কেউ তো আসেনি।'

'আসেনি কী রে? ঝড় কি আর অমনি অমনি এসেছিল? সতু-নীতুই ঝটাপটি করে ঝড় ডেকে এনেছে।'

কাশীবাবু এসব কথার মাথামুন্ডু কিচ্ছু বুঝতে না পেরে ফ্যালফ্যাল করে জটাইবাবার মুখপানে চেয়ে রইলেন। নয়নতারা ভীত কণ্ঠে জিগ্যেস করল, 'সতু-নীতু কারা বাবা?'

চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে তৃপ্তিতে চোখ বুজে জটাইবাবা বললেন, 'আমার পোষা ভূত। সারাদিন ফাই-ফরমাশ খাটে। দেখভাল করে। খাস ভৃত্যও বলতে পারো মা।'

কাশীবাবুর গায়ের রোম খাড়া হয়ে গেল। ভোম্বলের গলা শুকিয়ে কাঠ। নয়নতারার হাত-পা বরফ। 'বড় ন্যাওটা হয়েছে আমার। যেখানেই যাব সেখানে আগে গিয়ে হানা দেবে ওরা। বলে নতুন জায়গায় যাচ্ছ, সেখানকার আয়োজন কেমন একটু দেখে নিতে হবে না? যদি কোনও অসুঁবিধায় পড়ো? আমি বলি সাধুর আবার অসুবিধা কী রে? তাছাড়া যাচ্ছি তো ভক্তের বাড়ি, সে কি আর আমার অযত্ন করবে? কচি পাঁঠা রেখেছিস তো রে কাশী?'

কাশীবাবু হাঁ করা মুখ নিয়ে বিকৃত গলায় বললেন, 'হ্যাঁ।' আর একই সঙ্গে পাঁঠাটা ডেকে উঠল, ব্যাঁ-অ্যাঁ-অ্যাঁ। দুটো শব্দের সমাপতন ঘটল। 'ব্যাঁ' আর 'হ্যাঁ'-কে পৃথক করা গেল না।

পাঁঠার ডাকের উত্তরে জটাইবাবা বললেন, 'আসছি রে বাবা আসছি। ব্যাটা প্রসাদ হওয়ার জন্য অধীর হয়ে উঠেছে। খাঁড়াটা ধুয়ে মুছে রেখেছিস তো রে কাশী? চল এক কোপে গলাটা নামিয়ে দিই। বউমা চট করে ঝোল রেঁধে ফেলুক।' তারপর নয়নতারার দিকে চেয়ে বললেন, 'দেখো বউমা গুরুপাক যেন না হয়। গৃহবন্ধন করতে হবে। কাল বিস্তর খাটুনি আছে।'

কিন্তু কিন্তু করতে করতে কাঁদো-কাঁদো গলায় নয়নতারা বলেই ফেলল, 'সতু-নীতু কি এ বাড়িতেই উঠেছে বাবা?'

জটাইবাবা মৃদু হেসে বললেন, 'আমাকে ছেড়ে আর যাবে কোথায়?'

'ওরে বাবা! ওরা যে অপদেবতা, ঘরে ঢুকলে কোনও অমঙ্গল যদি...'

'সতু-নীতুকে ভয় পাচ্ছ মা? ভয়ের কিছু নেই। তাছাড়া কাঁটা দিয়েই তো কাঁটা তুলতে হবে।'

নয়নতারা বুকের মধ্যে অনেক সাহস জড়ো করে বলল, 'একটু যদি খোলসা করে বলেন—'

'কাশী, তোর বাড়িতে অপদেবতা যে থানা গেড়ে বসেছে, তা টের পেয়েছিস নিশ্চয়ই?'

ভোম্বলের হাত-পা ঠকঠক করে কাঁপছে। কাশীবাবুর চোখ-মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছে। ঢোক গিলে কোনওরকমে তিনি বললেন, 'সে জন্যই তো বাবা আপনাকে ডেকেছি।'

হঠাৎ ছাতের দিকে তাকিয়ে মারমুখী মেজাজে জটাইবাবা গর্জন করে উঠলেন, 'ঝেঁটিয়ে বিষ ঝেড়ে দেব হতভাগা, মুখ ভেংচে শূন্যে দোল খাওয়া হচ্ছে! সাত জম্মের মতো ফাজলামি করা ঘুচিয়ে দেব। সতু-নীতু ঘেঁটি ধরে তুলে নিয়ে যাবে তোকে। তারপর বেগার খেটে মরবি।'

জটাইবাবার দৃষ্টি অনুসরণ করে চকিতে ছাতের দিকে দ্রুত চোখ বোলাল ভোম্বল। কিছুই দেখতে পেল না। সেটাই স্বাভাবিক। বায়ুভূতের দর্শন পেতে হলে অনেক সাধনা করতে হয়, তা ভোম্বল জানবে কেমন করে? কাশীবাবু ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললেন। নয়নতারা বলে উঠল, 'রাম রাম!'

চকিতে মেজাজটা বদলে নরম করে নিয়ে জটাইবাবা বললেন, 'ঠিক সময়ে সঠিক নাম নিয়েছ মা, তুমি যথার্থ বুদ্ধিমতী। ব্যাটা, সাঁৎ করে জানলা গলে পালিয়ে গেল।'

বাসমতি চালের ভাত, সোনামুগের ডাল, বেগুনভাজা, ধোকার ডালনা, রুই মাছের কালিয়া, কচিপাঁঠার ঝোল, এক জামবাটি ক্ষীর ও রাসুঁ ময়রার দোকানের বিখ্যাত জিভে গজা দিয়ে রাজসিক রাতের আহার সেরে, বিছানার ওপর ছড়িয়ে-ছেতরে বসে পেল্লায় একটা তৃপ্তির ঢেকুর তুললেন জটাইবাবা।

কাশীবাবু হাত কচলে জিগ্যেস করলেন, 'আহারাদির ব্যবস্থায় কোনও ত্রুটি হয়নি তো বাবা?'

'পাগল ছেলে কোথাকার? যেখানে ভক্তি সেখানে ত্রুটি হয় না কি?'

'এখনও আলো আসেনি বাবা—পাখা ঘুরবে না, নিদ্রায় হয়তো একটু ব্যাঘাত-ট্যাঘাত—'

'অত ভাবিস নে তো তুই—সতু-নীতু আহার সেরে ফিরে এলে ওরাই সারারাত বাতাস করবে। আপাতত ভোম্বল একটু বাতাস করুক।'

মামার ইশারায় ভোম্বল নতুন হাত-পাখাটা হাতে নিয়ে ঘন ঘন নাড়তে শুরু করল।

'বড় ভয়ে ভয়ে আছি বাবা।'

'আমি থাকতে ভয় কী রে? কাল ঠেঙিয়ে ওই কাঁচাখেগোর গুষ্টি উদ্ধার করে দেব। ত্রিশূল দিয়ে গণ্ডি কেটে দিয়ে যাব তোর বাড়ির চারপাশে। দেখি এর পরে কোন ব্যাটা তোকে বিরক্ত করতে আসে!'

গুরুর পায়ের ধুলো মাথায় নিয়ে নীচে চলে গেলেন কাশীবাবু। জটাইবাবা বিছানার ওপর টানটান হয়ে শুলেন। চোখ দুটো বুজে গেল। বাতাস করতে করতে শব্দ করে পেল্লায় হাই তুলল ভোম্বল।

চোখ বুজেই জটাইবাবা গম্ভীর গলায় বললেন, 'বাবা ভোম্বল, জৃম্ভণ তো ভালো লক্ষণ নয়। রাতে আহারের মাত্রা বোধহয় কিঞ্চিৎ বেশি হয়ে গেছে। জোরে হাত চালাও, আলস্য কেটে যাবে। বহুদিন পাহাড়ের দেশে কাটিয়েছি তো, তাই গরমটা তেমন আমার সহ্য হয় না।'

ভোম্বল প্রাণপণে হাত চালাতে লাগল। তবে বেশিক্ষণ কষ্ট করতে হল না তাকে, খানিক পরেই ঘড়র-ঘড়র শব্দে ভয়ানক নাক ডাকতে শুরু করলেন জটাইবাবা। একা ঘরের মধ্যে ভোম্বলের কেমন যেন ভয় করতে লাগল। বার বার তার দৃষ্টি চলে যেতে লাগল ছাতের দিকে। হ্যারিকেনের আলোয় ছাত থেকে ঝুলন্ত পাখাটাকে দেখে মনে হতে লাগল অতিকায় এক দৈত্য।

হঠাৎ এক ঝলক দমকা বাতাস ছাড়ল। সতু-নীতু ফিরে এল বোধহয়। এ-ঘরে আর একা থাকার সাহস করল না ভোম্বল। হাত-পাখাটা জটাইবাবার শিয়রে রেখে পা টিপে টিপে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

সোজা মামা-মামির ঘরে ঢুকে ধপাস করে মেঝেতে পাটি ও বালিশ ফেলে ভোম্বল বলল, 'আজ ঘরে একা শুতে পারব না মামা। বড্ড ভয় করছে।'

কাশীবাবু জিগ্যেস করলেন, 'দুম করে চলে এলি যে?'

কোলবালিশ জড়িয়ে ধরে ভোম্বল বলল, 'সতু-নীতু এসে গেছে।'

আঁতকে বিছানার ওপর তড়াক করে উঠে বসে কাশীবাবু প্রশ্ন করলেন, 'দেখলি নিজের চোখে?'

'ওদের কি দেখা যায় মামা? লক্ষণে বোঝা যায়।'

কাশীবাবু বড় বড় চোখ করে শুধোলেন, 'কী লক্ষণ?'

'ওই যে দমকা বাতাস ছাড়ল।'

কাশীবাবুর গলা শুকিয়ে গেল। খাটের পাশেই টেবিলের ওপর জলের কুঁজোটা রয়েছে। কাশীবাবু অসহায়ভাবে কুঁজোর দিকে একবার তাকিয়ে ধপ করে আবার বিছানায় শুয়ে পড়লেন। মশারির বাইরে বেরোনোর সাহস হল না।

রাত তখন কত কে জানে? কাশীবাবুর ঘুম ভেঙে গেল। কাশীবাবু খেয়াল করে দেখলেন, শরীরে কেমন যেন আরাম বোধ হচ্ছে। মশারি দুলছে। মাথার শিয়রে টেবিলফ্যানটা বন বন করে ঘুরছে। জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে স্ট্রিট লাইটের আলো চোখে পড়ল। যাক আলো এসেছে।

কিন্তু ঘুমটা হঠাৎ ভাঙল কেন? এবার কারণটা বুঝতে পারলেন তিনি। একটানা একটা শব্দ হয়ে যাচ্ছে। ঘড়াং ঘড়াং ঘটাং ঘট! ঘড়াং ঘড়াং ঘটাং ঘট! ঘড়াং ঘড়াং ঘটাং ঘট।

ভারী আজব ব্যাপার তো! আওয়াজটা আসছে গুরুদেবের ঘরের দিক থেকে।

'ভোম্বল, এই ভোম্বল, একবার ওঠ তো।' বার দুয়েক ডাকলেন কাশীবাবু!

ভোম্বলের দিক থেকে কোনও সাড়া নেই। অঘোরে ঘুমোচ্ছে।

হঠাৎ দোতলায় যেন বড়সড়ো একটা বোমা ফাটল! কাশীবাবুর পিলে চমকে গেল। ভীমনাদে কোনও কিছু যেন আছড়ে পড়ল মাটিতে। ঝনঝন করে কাচ ভাঙার শব্দ কানে এল। এই ভয়ানক তাণ্ডবে ঘুম ভেঙে নয়নতারা ও ভোম্বলও উঠে বসেছে।

এবার শোনা গেল গুরুদেবের ভয়ার্ত আর্তনাদ। 'ভূ-উ-উ-উ-ত! ভূ-উ-উ-উ-ত! ভূ-উ-উ-উ-ত! বাঁচাও! বাঁচাও! ওরে বাবারে! ভূতে খেয়ে ফেলল আমাকে!'

খানিক পরেই ঝপাং করে কী একটা যেন বাড়ির পুবদিকে পুকুরে গিয়ে পড়ল। কাশীবাবু পাঁচ সেলের বড় টর্চ হাতে নিয়ে পড়িমরি করে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। পিছনে ভোম্বল। পুকুর ধারে গিয়ে টর্চের জোরালো আলোয় দেখা গেল, গুরুদেব পুকুর সাঁতরে ওপারে গিয়ে টেনেহিঁচড়ে শরীরটাকে ডাঙায় তোলার চেষ্টা করছেন।

কাশীবাবু দেহের সব শক্তি এক জায়গায় জড় করে হেঁকে উঠলেন, 'গু-রু-দে-ব! গু-রু-দে-ব!'

জটাইবাবা ভক্তের ডাকে কর্ণপাত করলেন না। হাওলাদারদের বাড়ির পাঁচিল বেয়ে উঠে এক লাফে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।

টর্চ হাতে কাশীবাবু, ভোম্বলকে সঙ্গে নিয়ে দৌড়লেন। সারারাত ধরে অনেক খোঁজাখুঁজি করেও জটাইবাবার কোনও সন্ধান পাওয়া গেল না।

জটাইবাবার রহস্যজনক অন্তর্ধানের কারণ অনুসন্ধানের জন্য সিঁড়ি ভেঙে হুড়মুড় করে তিনি দোতলায় উঠে এলেন।

পুবের ঘরে ঢুকে যে দৃশ্য চোখে পড়ল, তাতে কাশীবাবুর চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। অতিকায় প্রাগৈতিহাসিক জন্তুর মতো পাখাটা মেঝের ওপর পড়ে স্থির হয়ে আছে। পাখার একটা ব্লেড দুমড়ে আছে। মেঝের খানিকটা অংশ খুবলে গেছে। ঘরময় ছড়িয়ে আছে কাচ। বোঝাই যাচ্ছে, পাখাটা সিলিং থেকে খুলে গিয়ে উড়ে এসে আঘাত করেছিল দেওয়াল আলমারির কাচের পাল্লার গায়ে।

গরাদহীন খোলা জানালার কাছে গিয়ে নীচের দিকে ঝুঁকে কাশীবাবু দেখলেন পুকুরের জলটা চাঁদের আলোয় চকচক করছে। ভূতের ভয়ে জানালা দিয়েই পুকুরে ঝাঁপ মেরেছিলেন জটাইবাবা। তবে একটা স্মৃতিচিহ্ন রেখে গেছেন তিনি।

ত্রিশূলটা পড়ে আছে ঘরের এক কোণে।

ভোম্বল মাথা চুলকে কাঁদো-কাঁদো গলায় বলল, 'এ নির্ঘাত অপদেবতার কীর্তি মামা। গুরুদেবকেও ঢিট করে ছেড়েছে।'

কাশীবাবু হঠাৎ গর্জন করে উঠলেন, 'বুজরুক! ব্যাটা ঠগ! জোচ্চর! মাঝখান থেকে নধর পাঁঠা বাবদ কিছু গচ্চা গেল।'

ভোম্বল বুঝল, মামা গুরুদেবের ওপর চটেছেন, তার ওপরে নয়। সে সাহস করে ত্রিশূলটা হাতে নিয়ে বলল, 'সবটা গচ্চা যায়নি মামা। এই ত্রিশূল থেকে খানিকটা উশুল হবে। এটা জুত করে বাড়ির মাথায় বেঁধে দিলে বজ্রপাতে বাড়ির কোনও ক্ষতি হবে না।'

পরের দিন সকালে রাধেশ্যাম এসে পাখার ভূপতন রহস্যের সমাধান করল। ভোম্বল পাখাটা সারিয়েছিল ঠিকই, তবে কনডেনসরের তারের সঙ্গে পাখার স্টার্টিং কয়েল ও রানিং কয়েলের সংযোগ উলটে পালটে দেওয়ায় পাখাটা উলটো ঘুরতে শুরু করে। ঘড়াং ঘড়াং করে ওই বিদঘুটে যান্ত্রিক শব্দটা হচ্ছিল বিয়ারিংটা ঠিক মতো আটকাতে না পারার কারণে। পাখার উলটো ঘুর্ণন বেগের জন্য ঝোলানো রড থেকে খুলে গিয়ে আর্মেচার রড বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পাখাটা সশব্দে মাটিতে আছড়ে পড়ে। তার মানে পাখা সারাতে গিয়ে গোলমালটা পাকিয়ে রেখেছিল ভোম্বল-ই।

ভাগনের ওপর তেমন রাগ হল না কাশীবাবুর। ভাগনে তার চোখ খুলে দিয়েছে। ভোম্বল ভুল না করলে জটাইবাবার আসল চেহারাটা প্রকাশ পেত না। পাখা যে মাঝরাতে হঠাৎ ওভাবে ঘড়াং ঘড়াং শব্দ করে ছিটকে পড়তে পারে, এটা ছিল জটাইবাবার কল্পনারও বাইরে। তিনি ভেবেছিলেন এ নিশ্চই ভৌতিক কাণ্ড।

ভালো করে সারিয়ে দেবে বলে রাধেশ্যাম পাখাটা খুলে নিয়ে চলে গেল। হঠাৎ কাশীবাবুর চোখ গেল জানলার দিকে। কাঠের ফ্রেমের ওপর শালিক পাখিটা আবার এসে বসেছে। আজ আর পাখিটা দেখে কাশীবাবুর বিরক্ত লাগল না। পলকহীন চোখে পাখিটাকে দেখতে লাগলেন। ভালো করে চেয়ে দেখে মনে হল পাখিটা বড় সুঁন্দর।

শালিকটা বোধ হয় বুঝতে পারল কাশীবাবুর খুব পছন্দ হয়েছে তাকে। সে এক লাফে ঘরের মেঝের ওপর নেমে এল। তারপর সরু সরু পায়ে লাফাতে লাফাতে কাশীবাবুর কাছে এসে তার মুখের দিকে চেয়ে রইল।

মুচকি হেসে কাশীবাবু ভাবলেন, এত সুঁন্দর পাখি, কেন যে লোকে এক শালিককে অপয়া বলে! সব বুজরুকি।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%