শান্তনু বসু

ক্যাম্বিসের একজোড়া জুতো। সাদা কেডস। ফিতে খোলা। জিভ উলটানো। বারান্দায় তেরছা হয়ে এসে পড়া রোদের মধ্যে দেওয়ালের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড় করানো রয়েছে। টপ টপ করে জল ঝরছে তা থেকে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে সদ্য ধোয়া হয়েছে জুতোজোড়া।
বাঁ-পায়ের জুতো ডান পায়ের জুতো থেকে আকারে প্রায় এক ইঞ্চি বড়। হাঁটুতে হাত রেখে সামনে ঝুঁকে অবাক চোখে জুতোজোড়া দেখছিল কাজু। পিছন থেকে বাচ্চু এসে কাজুর কান পাকড়ে ফ্যানের রেগুলেটর ঘোরানোর মতো মোচড় দিয়ে বলল, 'হাঁ করে দেখছিস কী? প্রণাম কর।'
কানে হাত বুলোতে বুলোতে কাজু বলল, 'খামোখা জুতোকে প্রণাম করব কেন মামা?'
বাচ্চু চোখ পাকিয়ে বললে, 'ডেঁপোমি হচ্ছে? প্রণাম করবি না মানে? এ কার জুতো তুই জানিস?'
'কার আবার? দিদুনের।'
'ডান পায়ের ছোট জুতোটা মায়ের। মানে তোর দিদুনের। আর বাঁ পায়ের বড় জুতোটা?' বাচ্চুমামা চোখ ঘুরিয়ে রহস্য করে বললে, 'জানিস ওটা কার?'
কাজুর এবার কেমন যেন খটকা লাগল। সত্যিই তো। দুটো জুতো এক সাইজের নয়। দিদুনের দু-পায়ের জুতোর মাপ দু-রকম হবে কেন? কাজু বোকার মতো বাচ্চুমামার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, 'কার জুতো মামা?'
বাঁ-হাতের কড়ে আঙুল দিয়ে কান চুলকে বাচ্চুমামা বলল, 'বাঁ-পায়ের জুতোটা মেসির।'
কাজু বলল, 'ধ্যাত! মাসির জুতো হবে কী করে? মাসি তো হাই হিল পরে, যাতে লম্বা দেখায়।'
আবার কাজুর কান ধরার জন্য হাত বাড়াল বাচ্চু। সময়মতো ছিটকে সরে গেল কাজু। বাচ্চু বলল, 'ভিটামিনের অভাব। কানে কম শুনছিস দেখছি আজকাল। বললাম মেসি। শুনলি মাসি।'
'মেসি মানে?'
'মেসি তো একজনই। আর্জেন্টিনার মেসি। লিওনেল মেসি।'
কাজু আবার মেসির দারুণ ভক্ত। তার ঘরে মেসির একাধিক বড় বড় পোস্টার দেওয়ালে সাঁটানো আছে। কাজুর ইচ্ছে বড় হয়ে মেসির মতো ফুটবলার হয়। কাজু বলে, 'ধ্যাত! গুল মারছ। দিদুন তো ওই জুতো পরে চারধাম বেড়াতে গিয়েছিল।'
'ওখানেই তো মজা, মা চারধাম ঘুরে নিজ ধামে ফিরে এসে দেখে বাঁ পায়ের জুতো বদলে গেছে।'
কাজু ক্লাস সিক্স-এ পড়ে। মোটেও কচি খোকা নয়। কলেজে পড়ে বলে বাচ্চুমামা তাকে যা খুশি বুঝিয়ে দেবে, তা হতে পারে না। কাজু বলল, 'জুতো তো বদলে যেতেই পারে। এর মধ্যে মেসি এল কোথা থেকে?'
'আরে বাপু, কেদারনাথের মন্দিরে পুজো দিতে এসেছিল মেসি, যাতে বিশ্বকাপে বেশি গোল পায়। পুজো দিয়ে হুড়োতাড়া করে বেরোনোর সময় নিজের একপাটি রেখে তোর দিদুনের একপাটি পরে চলে গেছে।'
কেমন একটা ধন্দে পড়ে যায় কাজু। মাথা চুলকে বলে, 'আমাদের দেশে মেসি এলে তো খুব হই-চই হতো। কাগজে ছবি ছাপা হতো।'
'তুই দেখছি রামক্যাবলা। মেসি কি সবাইকে জানিয়ে আসবে? তাহলে তো মহা কেলেঙ্কারি হবে।'
'কেন? কেলেঙ্কারি হবে কেন?'
'তোর এইরকম বুদ্ধিশুদ্ধি বলেই তো অঙ্কে ষাটের বেশি পাস না।'
অঙ্কের কথা উঠতেই কাজু দমে গেল। বাচ্চুমামা কলেজে অঙ্ক নিয়ে পড়ে। অঙ্কে দারুণ মাথা। ছেলেবেলা থেকে নাকি একশোর নীচে নম্বর পায়নি। এর ধকল কাজুকে সামলাতে হয়। স্কুলের অঙ্কের টিচার বটুকবাবু মাঝেমধ্যেই কাজুকে বলেন, 'ও হে তথাগত, তুমি যে দেখি মামার নাম ডুবিয়ে ছাড়বে। তোমার বাচ্চুমামা অঙ্কে জিনিয়াস। তোমার এ হাল কেন?'
সবসময় এই তুলনা কাজুর ভালো লাগে না। কী দরকার ছিল বাচ্চুমামার অঙ্কে অত ভালো হয়ে কাজুকে বিপাকে ফেলার! ইউনিট টেস্টে কম নম্বর পেলে মা-ও আক্ষেপ করে বলেন, 'ইশ, তুই যদি বাচ্চুর মতো অঙ্কের মাথা পেতিস, তাহলে কোনো ভাবনা থাকত না। এবারে মামাবাড়ি গিয়ে বাচ্চুর কাছ থেকে ভালো করে সব বুঝে নিস।' শুধু অঙ্ক কেন, সব বিষয়েই বাচ্চুমামার অগাধ জ্ঞান। সারাদিন খালি মোটামোটা বই পড়ে।
কাজুকে বোকার মতো চেয়ে থাকতে দেখে বাচ্চু বলল, 'ও রে বোকা, মেসি এসেছে জানতে পারলে লাখ লাখ লোকে মাছির মতো ছেঁকে ধরত না তাঁকে? তখন ম্যাও সামলাত কে? লক্ষ লক্ষ লোকে যদি মেসিকে ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা করত, তাহলে ইরেজার দিয়ে মোছা পেন্সিলের দাগের মতো মেসি ভ্যানিশ হয়ে যেত। তার আর বিশ্বকাপে খেলা হতো না। কেদারনাথের মন্দিরে মেসি এসেছিল ছদ্মবেশে।'
কাজু ভেবে দেখল কথাটা সত্যি হলেও হতে পারে। কেন না কাগজে সে পড়েছে, বড় বড় খেলোয়াড়, ফিল্মস্টারেরা সব লোকের নজর এড়াতে বোরখা পরে কালীঘাটে যায়। পুজো-টুজো সেরে দিব্যি লোকের নাকের ডগা দিয়ে চলে যায়। কেউ জানতেও পারে না।
কাজু তবু প্রশ্ন করে, 'সত্যি বলছ?'
'সত্যি নয় তো কি মিথ্যে? কেদারনাথের মন্দিরে পুজো দেওয়ার আগে মেসি গিয়েছিল গোলাইবাবার আশীর্বাদ নিতে। গোলাইবাবার আশ্রম থেকেই ফাঁস হয়েছে মেসির আসার খবরটা।'
'গোলাইবাবা? গোলাইবাবা আবার কে?'
'মস্ত মানুষ। সিদ্ধপুরুষ। ফুটবলের সাইজের পাথরের গোলা শট মেরে নাম কিনেছেন গোলাইবাবা।'
'ধুর, এমন হয় নাকি?'
বাচ্চু খেঁকিয়ে উঠে বলে, 'ডেঁপোমি করিস না। হিমালয়ের সাধুরা কত ক্ষমতা ধরে, তুই জানিস? পাহাড়ে রাস্তা তৈরির জন্য গোলাকৃতি বোল্ডারের দরকার। গাড়ি করে পাথর নিয়ে যাওয়ার মতো জুতসই পথ নেই। সে যাত্রা উদ্ধার করে দিলেন এক সাধুবাবা। পাশের পাহাড় থেকে মেসির ফ্রি কিকের মতো বোল্ডারগুলোকে কিক করে কাজের জায়গায় পাঠাতে লাগলেন। একেবারে মাপা শট। অঙ্কের মতো নিখুঁত। ঠিকঠিক জায়গায় গিয়ে বোল্ডারগুলো পড়তে লাগল। ব্যস, কেল্লাফতে। পাথরের গোলা দিয়ে ফ্রি কিক করার জন্য সেই সাধুবাবার নাম হয়ে গেল গোলাইবাবা।'
কিন্তু কিন্তু মুখ করে কাজু বলল, 'পাথরের বোল্ডারে কিক মারলে পা যে নুলো হয়ে যাবে!'
'এ কি আর তোর হাড় ডিগডিগে অপুষ্ট পা? ও হল গোলাইবাবার পা। যোগে সিদ্ধ পা। সাধে কী আর্জেন্টিনা থেকে মেসি ছুটে এসেছিল সেই পায়ের ধুলো নিতে। তোর তো বুদ্ধিশুদ্ধি কম। মেসির জুতোর কথা আবার পাঁচকান করিস না যেন।'
'করলে কী হবে?'
'বাড়িতে ডাকাত পড়বে। মেসির জুতোর বাজার মূল্য কত জানিস?'
মাথা নাড়ল কাজু। কথাটা মিথ্যে নয়। সে জানে বড় ক্রিকেটার, ফুটবলারদের জামা, জুতো, টুপি, ব্যাট এসব চড়া দামে নিলামে বিক্রি হয়।
ঠাকুরঘর থেকে প্রসাদের থালা হাতে দিদিমাকে বেরিয়ে আসতে দেখে কাজু জিগ্যেস করল, 'চারধাম বেড়াতে গিয়ে তোমার জুতো বদলে গেছে দিদুন?'
কাজুর হাতে একটা সন্দেশ দিয়ে দিদিমা বললেন, 'কী আর করা যাবে দাদুভাই।'
দিদিমা চলে যেতেই একটা দৃশ্য দেখে কাজুর চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। মেসির জুতোটা নড়ছে। কাজু বলল, 'মামা নড়ছে।'
'কী নড়ছে?'
'জুতো।'
'নড়বেই তো। মেসির জুতো। মন্ত্রসিদ্ধ জুতো। এ জুতো পায়ে দিয়ে মাঠে নামলে তোকে আর কষ্ট করে দৌড়তে হবে না, জুতোটাই তোর পা-কে দৌড় করাবে। বল নিয়ে পাঁই পাঁই করে ছুটবি কেউ নাগাল পাবে না।'
এবার জুতোটা একটু বেশিই নড়াচড়া করে উঠে হেলান দেওয়া অবস্থা থেকে ধপ করে মাটিতে পড়ে গেল। বাচ্চুর চোখও ছানাবড়া হয়ে গেল। জুতোর ভিতর থেকে আচমকা গোলার মতো বাচ্চুর দিকে ছুটে এল কী একটা বস্তু।
গোলকিপারের মতো লাফ দিয়ে বাচ্চু বাগানে গিয়ে পড়ল, আর আশ্চর্য বস্তুটা তিড়িং করে এক লাফ দিয়ে বাচ্চুর বুকের উপর এসে পড়ল। বাচ্চু আতঙ্কে হাউমাউ করে উঠল।
কাজু খিল খিল করে হেসে বলল, 'মামা, গেছো ব্যাঙ।'
তিড়িং করে পেল্লায় এক লাফ মেরে বেয়াড়া ব্যাঙটা কেয়াগাছের ঝোপের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল।
উঠে দাঁড়িয়ে গায়ের ধুলো ঝেড়ে বাচ্চু বলল, 'ব্যাঙটার কাণ্ড দেখলি?'
'একটা গেছো ব্যাঙ দেখে তুমি অত ভয় পেয়ে গেলে মামা?'
'ভয় পেলাম কোথায়?'
'ওই যে চেঁচিয়ে উঠলে।'
'ও তো ব্যাংটাকে ভড়কি দেওয়ার জন্য। কিন্তু ব্যাটা ভড়কি খেল না। ও ব্যাঙ আর সাধারণ ব্যাঙ নেই রে।'
কাজু অবাক হয়ে বলল, 'মানে?'
'মেসির জুতোয় ঢুকে ওর সিদ্ধিলাভ হয়ে গেছে। ব্যাঙ কখনো অতটা স্পট জাম্প দেয়?'
সত্যিই ব্যাঙটা বিরাট লম্বা লাফ মেরেছে। ব্যাঙ কি অতটা লাফাতে পারে? চিন্তিত মুখে কেয়াগাছের ঝোপের দিকে এগিয়ে গিয়ে ব্যাঙটাকে খুঁজতে লাগল কাজু।
কাজু মোহনপুর হাইস্কুলে পড়ে। মোহনপুরের দুটো নামজাদা স্কুল হল মোহনপুর হাই স্কুল এবং মদনমোহন মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়। দুটি স্কুলের দূরত্ব খুব বেশি নয়। বড়জোর মাইলখানেক হবে। দুই স্কুলেরই দারুণ নামডাক। আরও অন্যান্য স্কুল থাকলেও এ তল্লাটের সব বাঘা বাঘা ছেলেরা ওই দুই স্কুলেই পড়ে।
কাদের স্কুল বেশি ভালো এই নিয়ে ছেলেদের ঝটাপটি, মারামারি তো লেগেই আছে, এমনকী দুই স্কুলের মাস্টারমশাইরাও এ নিয়ে প্রায়ই বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। অনেক সময় হাতাহাতি বাঁধার উপক্রম হয়। দুই স্কুলের হেডমাস্টারমশায় তখন দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসে এই সব ঝামেলা মেটান।
এই তো মাত্র দু-দিন আগে বাজারে গিয়ে মোহনপুর হাইস্কুলের অঙ্কের টিচার বটুকবাবু কথা প্রসঙ্গে কাউকে বলে বসলেন, 'মদনমোহন মেমোরিয়ালের ছেলেগুলো অঙ্কে একেবারে গবেট। মাধ্যমিকের রেজাল্ট বেরোলে বুঝতে পারবেন।' বেগুনের দরদাম করার সময় কথাটা শুনতে পেয়ে 'কী বললেন?' বলে মৃদুলবাবু ঝাঁপিয়ে পড়লেন বটুকবাবুর উপর।
দুই স্কুলের অঙ্কের শিক্ষকের মধ্যে জোর তর্ক বেধে গেল। ব্যাপারটা এমন ঘোরালো হয়ে উঠল যে দু-জনেই হাতের থলে-টলে ফেলে পাঞ্জাবির হাতা গোটাতে শুরু করলেন।
জগাই পাগলা দড়িতে বাঁধা একটা ঢিল হাতে নিয়ে ঘোরাতে ঘোরাতে চেঁচিয়ে উঠল 'আরে লাগ লাগ লাগ লাগ।'
ঘুসোঘুসি আরম্ভ হয় আর কী। ওদিকে মৃদুলবাবুর থলের মুখ খোলা পেয়ে আধহাত লম্বা কই মাছগুলো থলে থেকে বাইরে এসে লাফাতে লাগল। বটুকবাবুর থলে থেকে পাকা কুমড়ো, আলু এসব বেরিয়ে এসে পথে গড়াতে লাগল। সে এক বিতিকিচ্ছিরি কাণ্ড।
ভাগ্যিস সে সময় বাজারে পাঁঠা কিনতে এসেছিলেন দারোগা শশধর শীল। দারোগাবাবুকে দেখেই দুই মাস্টারমশায় ভালোমানুষের মতো মুখ করে সটকে পড়লেন। পাকা কুমড়ো, আলু, কইমাছের কোনো দাবিদার না পেয়ে দারোগাবাবু সেগুলোকে নিজে গ্রেপ্তার করে থলেয় পুরে নিয়ে চলে গেলেন।
এই যদি অবস্থা হয়, তাহলে দুই স্কুলের খেলায় উত্তেজনার পারদ কোথায় উঠবে, তা সহজেই অনুমান করা যায়। গেল বার জেলার সাব জুনিয়র ইন্টার স্কুল ফুটবল লিগে এই দুই বিদ্যালয়ের খেলা নিয়ে মাঠে গোলমাল বেঁধে খেলা পণ্ড হয়ে গিয়েছিল। সে জন্য অবশ্য অনেকটা দায়ী ছিলেন মাধবপুর হাই স্কুলের সংস্কৃতের শিক্ষক ভবানীবাবু।
ভবানীবাবুর মতো নিরীহ লোকও যে খেলার মাঠে উত্তেজনার বশে অমন জঙ্গিপনা করে বসবেন তা কে জানত? গিরিধারী খেপে না উঠলে কখনোই অমন কাণ্ড ঘটত না। যারা নিজের চোখে দেখেছিল, তারা সবাই জানে গিরিধারীকে তাতিয়ে দিয়েছিলেন ভবানীবাবুই।
গিরিধারী হল মাধবপুর হাই স্কুলের নাইটগার্ড রামপিয়ারীর পোষা রামছাগল। ভবানীবাবুর ভারি ন্যাওটা। রোজ টিফিনের সময় ভবানীবাবু নিজে হাতে তাকে কাঁঠালপাতা খাওয়ান। গিরিধারীকে দেখলেই ভবানীবাবু হ্যা হ্যা করে খানিকটা হেসে নিয়ে আমোদ করে বলেন, 'ওই দেখ মৃগ ধায়, মৃগ তৃণ খায়।'
গিরিধারী একথা শুনলে ব্যা-অ্যা-অ্যা করে ডেকে ভবানীবাবুর দিকে তাকায়। মানে, 'ভুল বললেন স্যার। আমি মৃগ নই, রামছাগল।' অমন পাটকিলে রং-এর দাড়িওয়ালা একটা রামছাগলকে দেখে ভবানীবাবুর যে কেন হরিণের কথা মনে পড়ে তা একমাত্র তিনিই বলতে পারেন।
যাই হোক, মোহনপুর হাই স্কুলের মাঠে তখন খেলা চলছে। মদনমোহন মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয় এক গোলে এগিয়ে আছে। মিইয়ে গিয়েছে মোহনপুরের শিবির।
এগিয়ে থাকার আনন্দে সাইড লাইনের পাশে ধেই ধেই করে লাফাচ্ছিলেন মদনমোহনের ভূগোলের টিচার গোপালবাবু। তাঁর ভুঁড়িটা ভূ-গোলকের মতোই বড়সড়। গোপালবাবুকে লাফাতে দেখে ভবানীবাবুর গা জ্বলে গেল। গিরিধারী ছিল হাতের নাগালের মধ্যেই। তার লম্বা, ঝোলা কানদুটো ধরে ভবানীবাবু জোরসে মুচড়ে দিলেন।
ক্লাসের ছেলেদের এসব সহ্য করার অভ্যেস আছে। তা বলে রামছাগল গিরিধারী এই পীড়ন সইবে কেন? রেগেমেগে গিরিধারী 'ব্যা-অ্যা-অ্যা', মানে 'এ ভারি অন্যায়' বলে লাফিয়ে উঠে সামনের দিকে বুলেটের মতো ধেয়ে গেল। তার সঞ্চার পথের মধ্যে পড়ে গেলেন গোপালবাবু। তারপরেই ঝপাং করে একটা শব্দ। গিরিধারীর ঢুঁসো খেয়ে গোপালবাবু মাঠের পাশের পানা পুকুরে পড়ে হাবুডুবু খেতে লাগলেন।
এসব গরম খবর চাপা থাকে না। দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তখন সত্য ঘটনার খানিকটা চাপা পড়ে যায় গুজবে। চাউর হল, মোহনপুরের রামছাগল ল্যাং মেরে গোপালবাবুকে পুকুরে ফেলে দিয়েছে। ব্যস, মার মার, কাট কাট বেঁধে গেল। শেষে শশধর দারোগা শূন্যে গুলি চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনলেন। খেলা ভণ্ডুল হয়ে গেল।
এ বছরেও সাব জুনিয়র ইন্টার স্কুল ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনালে উঠেছে ওই দুই স্কুল। এবারে মোহনপুর হাই স্কুলের টিমে খেলছে কাজু। কাজু মিডফিল্ডার, মেসির মতোই।
কাজুর মা বললেন, 'কাজুকে একটু ইস্কুলে দিয়ে আসিস বাচ্চু, ওর খেলা আছে। যাওয়ার পথে একটা কেডস কিনে দিস, ওর জুতোটা ছিঁড়ে গিয়েছে।'
ক্যালকুলেটর টিপে অঙ্ক করছিল বাচ্চু। সে বলল, 'খামোখা পয়সা খরচ করতে হবে না দিদি। মেসির জুতো বাড়িতেই আছে।'
'ধ্যাৎ, তোর যত ফাজলামি। এই টাকাটা রাখ। আমি চললাম। ওরাল পরীক্ষা আছে। কাজু সাবধানে খেলিস, চোট-টোট লাগে না যেন।' কাজুর মা ইস্কুলে চলে গেলেন। তিনি শশীকলা বালিকা বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান পড়ান।
কাজুর মা চলে যেতেই টাকাটা পকেটে পুরে বাচ্চু বলল, 'বুঝলি কাজু, জুতো কেনার দরকার নেই, মেসির জুতো পরে যা। ওটা মন্ত্রে সিদ্ধ। গোল পাবি।'
কাজু মুখ বেজার করে বলল, 'পায়ে বড় হবে।'
'আমি ফিট করে দিচ্ছি।' জুতোর তাক থেকে সেই বড়-ছোট জুতো জোড়া বের করে ধুলোটুলো মুছে বাচ্চু বলল, 'এবারে চটপট পায়ে গলা দেখি।'
জুলজুলে চোখে বাঁ-পায়ের বড় জুতোটা দেখছিল কাজু। মেসির জুতো বলে কথা। যে সে ব্যাপার নয়। ডানপায়ের জুতোটা মোটামুটি ফিট হয়ে গেল। কাজু বলল, 'এটা ফিট করেছে মামা।'
'চিন্তা নেই। বাঁ-পায়েরটাও ফিট করবে।'
মেসির জুতোয় পা গলিয়ে কাজু দেখল জুতো একেবারে ঢলঢল করছে। গোড়ালির পিছনে প্রায় এক ইঞ্চি ফাঁক। কাজু বললে, 'ঢিলে জুতো, এ হবে না মামা।'
'এই তো টাইট করে দিচ্ছি। গায়ের জোরে কষে ফিতেটা বেঁধে দিল বাচ্চু।'
কাজু একটু হাঁটাচলা করে বলল, 'তাও ঢিলে লাগছে।'
'ঢিলে লাগছে? বললেই হল? কই দেখি?' কাজুর বাঁ-পায়ের গোড়ালির পিছনে আঙুল চালিয়ে একগাল হেসে বাচ্চু বলল, 'তুই কী বোকা রে?'
কাজু বলল, 'কেন?'
'জুতোর পিছনে ওইটুকু ফাঁক থাকবে না? বাঁ-পায়ের পাতাকে খেলাবি কী করে? ফুটবল তোর পায়ের কথা শুনবে কেন? এজন্য মেসি মাঠে নামার সময় পায়ের চেয়ে আধহাত বড় জুতো পরে তুই জানিস?'
'টিভিতে দেখলে তো তা বোঝা যায় না।'
'ও তো ক্যামেরার কারসাজি। ক্যামেরায় দেখালে হাই হিল ছাড়াই তোর মুন্নি মাসিকে ঢ্যাঙা লম্বা দেখাবে।'
কাজু আবার একটু হাঁটাহাঁটি করে বলে, 'মামা, মনে হচ্ছে পা থেকে জুতো খুলে বেরিয়ে যাবে।'
'ভীষণ উছপিছে স্বভাব তোর। মেসির জুতো পায়ে দিয়েছিস এই মনে কর অনেক ভাগ্যি। তোর বয়সে আমি যদি মারাদোনার একপাটি জুতো পেতাম, তাহলে বুকের সঙ্গে সেলাই করে রেখে দিতাম। তাড়াতাড়ি চল। দেরি হয়ে যাচ্ছে। এরপরে খেলা শুরু হয়ে যাবে। দেরির জন্য মাস্টারমশাইরা তোকে না নিলডাউন করে রেখে দেয়।'
'নিলডাউনের কথা শুনে ঘড়ির দিকে তাকাল কাজু। সত্যিই দেরি হয়ে গিয়েছে। খেলার মাঠে দেরি করলে গেমটিচার অরণ্যবাবু খুব রেগে গিয়ে বেতপেটা করতে পারেন।'
রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে কাজু টের পেল, বা পায়ের জুতোটা যে একটু বড় তা নয় কেমন যেন একটু ভারী মনে হচ্ছে। সে বলল, 'জুতোটা কেমন যেন একটু ভারী লাগছে মামা।'
বাচ্চু বলল, 'মেসির জুতোর ভার তো একটু বেশি হবেই।'
কাজু আর কথা বাড়াল না। স্কুলে পৌঁছনোর পর কাজুর পায়ের দিকে তাকিয়ে জোজো আর বুবাইয়ের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। জোজো বলল, এ কী রে দু-পায়ে বড় ছোট জুতো পরেছিস কেন কাজু?
কাজু বলল, 'আস্তে ভাই। কাউকে বলিস না যেন কথাটা।'
বুবাই চোখ গোল করে প্রবল কৌতূহলের সঙ্গে বলল, 'ব্যাপার কী রে?
কাজু গলা নামিয়ে বলল, 'বাঁ-পায়ের বড় জুতোটা হল মেসির জুতো।'
জোজো অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, 'মেসি মানে?'
'মেসি মানে মেসি। লিওনেল মেসি। আর্জেন্টিনার মেসি।'
'গুল মারিস না। মেসির জুতো তুই পেলি কোথা থেকে?'
'আমি কী আর পেয়েছি? পেয়েছেন দিদুন। দিদুন চারধাম বেড়াতে গিয়েছিলেন। কেদারনাথের মন্দিরে দিদুনের একপাটি জুতোর সঙ্গে মেসির একপাটি জুতো পালটাপালটি হয়ে গেছে। মেসি পুজো দিতে এসেছিল ওখানে। বিশ্বাস না হয় তো আমার বাচ্চুমামাকে জিগ্যেস করে আয়।'
জোজো আর বুবাই একথা শুনে হাঁ হয়ে গেল। আর যাই হোক, কাজুর বাচ্চুমামা বাজে কথা বলতে পারে না। জোজো, বুবাই দু-জনেই জানে যে কাজুর বাচ্চুমামা অঙ্কে খুব ভালো। বটুকবাবু বলেন, অঙ্কে যারা ভালো হয়, তারা সত্যবাদী হয়। যারা গোঁজামিল দিয়ে অঙ্ক মেলানোর চেষ্টা করে তারা হয় মহাগুলবাজ।
মোহনপুর হাই স্কুল ও মদনমোহন মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়ের খেলা মানেই একরাশ উত্তেজনা। মোহনপুর হাই স্কুলের মাঠে খেলা। আজ যারা জিতবে, তারা জেলা ইন্টার স্কুল সাবজুনিয়র ফুটবল লিগ চাম্পিয়ন হবে। দুই স্কুলেই আজ হাফ ছুটি হয়ে গিয়েছে। ছেলেরা সব ভিড় করেছে মাঠে।
খেলা শুরুর আগে জোজো আর বুবাইয়ের কানে কানে কাজু বলল, 'আজ আমরা মদনমোহনকে গোহারান হারিয়ে দেব। পায়ে রয়েছে মেসির জুতো।'
খেলা শুরু হল। মাঠে দারুণ হই-চই আর চিৎকার। দু-দলই সেয়ানে সেয়ানে খেলছে। বল সেন্টারলাইনের আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে। কেউই তেমন আক্রমণ করতে পারছে না। কাজু টের পেল, জোরে দৌড়নো যাচ্ছে না। জোরে ছুটতে গেলেই মনে হচ্ছে, বাঁ-পায়ের জুতোটা খুলে বেরিয়ে যাবে। এ তো আচ্ছা গেঁড়াকল হল।
হঠাৎ বুবাই একটা পাস বাড়াল কাজুকে। সামনে ফাঁকা জমি। গতি বাড়িয়ে ছুটলেই গোলকিপারকে একেবারে একা পেয়ে যায় কাজু। কিন্তু জুতো খুলে যাওয়ার ভয়ে সে জোরে ছুটতে পারল না। পিছন থেকে ছুটে এসে মদনমোহনের ডিফেন্ডার বল ক্লিয়ার করে দিল।
বাচ্চুমামার উপর বেজায় রাগ হতে লাগল কাজুর। এই মেসির জুতোই সব বারোটা বাজিয়ে দিল। মেসি পায়ের চেয়ে আধ হাত লম্বা জুতো পরে খেলে, সব বাজে কথা। জুতো পায়ে টাইট ফিট না-হলে মোটেই জোরে ছোটা যায় না। কাজু ভালোই ফুটবল খেলে। আজ সে তার স্বাভাবিক খেলার কানাকড়িও খেলতে পারছে না।
হাফটাইমে খেলার ফলাফল শূন্য-শূন্য। সেকেন্ড হাফের খেলা শুরু হল। এবারে ঝড়ের গতিতে একের পর এক আক্রমণ করতে লাগল মদনমোহন হাই স্কুল। দু-দুবার নিশ্চিত গোল খাওয়ার হাত থেকে বাঁচল মোহনপুর। একবার চমৎকার ডাইভ মেরে গোল সেভ করল জোজো। আরেকবার মদনমোহনের স্ট্রাইকার শিবু গোবরে পা পিছলে পড়ে গেল বলে ফাঁকা গোলে বল ঠেলতে পারল না।
খেলা তখন প্রায় শেষের দিকে। কোনোদলই গোল দিতে পারেনি। ড্র হলে টাইব্রেকার হবে। কে কে টাইব্রেকারে শট মারবে, দু-দলের গেম টিচার তখন সেই লিস্ট তৈরিতে ব্যস্ত।
পেনাল্টি বক্সের বেশ কিছুটা বাইরে বল পেল কাজু। এসব জায়গা থেকে দুর্দান্ত শটে অনেক গোল দিয়েছে মেসি। কাজুও বাঁ-পায়ে জোরে শট মারল। শট মেরেই কাজু বুঝল, শটটা তেমন জুতসই হয়নি, কিন্তু অন্য একটা গন্ডগোল হয়েছে। যাই হোক, বলটা হাওয়ায় ভেসে ধেয়ে যেতে লাগল গোলের দিকে।
মদনমোহন উচ্চ বিদ্যালয়ের ওস্তাদ গোলকিপার তোতন ঘাবড়ে গিয়ে দেখল বলের সঙ্গে উড়োন চাকির মতো কী একটা যেন উড়ে আসছে তার দিকে। মুহূর্তের জন্য ঘাবড়ে গেল সে। সময়মতো লাফ দিতে না পারায় বলটা তার মাথা টপকে গোঁত্তা খেয়ে গোলে ঢুকে গেল। মোহনপুর শিবির গর্জে উঠল, গো-ও-ও-ও-ও-ল। গোলের বাঁশি বাজানোর পরপরই লম্বা বাঁশি বাজিয়ে রেফারি জানিয়ে দিল খেলা শেষ।
ওদিকে শট মারার সময় কাজুর বাঁ-পা থেকে ছিটকে যাওয়া মেসির জুতোটা উলকা বেগে উড়ে গিয়ে গোলপোস্টের পিছনে পড়ল। ওখানে ঘুরঘুর করছিল গিরিধারী। পড়বি তো পড় জুতোটা পড়ল একেবারে গিরিধারীর মুখের সামনে।
আকাশ থেকে ঝরে পড়া অতি সুখাদ্য মনে করে নিমেষের মধ্যে কচমচ করে চিবিয়ে 'মেসির জুতো' খেয়ে ফেলল আহাম্মক রামছাগলটা, তারপরে মনের আনন্দে লাফালাফি করে ব্যা-ব্যা-ব্যা করে ডাকতে লাগল।
'মেসির জুতোটা' চোখের সামনে গিরিধারীকে চিবিয়ে খেতে দেখে কাজুর কান্না পেয়ে গেল। সত্যিই জুতোটা পয়মন্ত ছিল। না হলে তোতনের মতো অমন দুঁদে গোলকিপার অমন দুর্বল শটে কখনোই গোল পেতে পারে না।
ডান পায়ের জুতো হাতে ঝুলিয়ে স্কুল থেকে বেজার মুখে কাজুকে বেরোতে দেখে বাচ্চুমামা বলল, 'হ্যাঁ রে, তোর আরেক পায়ের জুতো কোথায়?'
কাজু শুকনো মুখে বলল, 'মেসির জুতোটা গিরিধারী খেয়ে নিয়েছে।'
'অ্যাঁ? কে খেয়ে নিয়েছে?'
'গিরিধারী। নাইটগার্ড রামপিয়ারীদার পোষা রামছাগল। শট মারতে গিয়ে জুতো খুলে উড়ে গিয়ে গিরিধারীর মুখের সামনে পড়েছিল।'
হ্যা হ্যা হ্যা করে সজোরে হেসে উঠল বাচ্চু।
কাজু বলল, 'রামছাগলে মেসির জুতো খেয়ে ফেলল, আর তুমি হাসছ?'
বাচ্চু বলল, 'পকেটে টাকা আছে। চল, ফেরার পথে তোকে জুতো কিনে দেব।'
আমাদের চারপাশে অনেক ঘটনা ঘটে যার কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। গিরিধারীর পরবর্তী কাহিনিও অনেকটা সেই রকম।
জুতোটা খেয়ে ফেলার পর থেকে গিরিধারীর আচরণে একটা আশ্চর্য পরিবর্তন হল। পায়ের সামনে নুড়ি, পাথর এসব পড়লেই পা দিয়ে খটাস খটাস করে শট মারতে লাগল সে।
গুলতি দিয়ে ছোঁড়া ঢিলের মতো গিরিধারীর কিক মারা নুড়িপাথর সজোরে উড়ে যেতে লাগল এদিকে-ওদিকে। ইস্কুলের দুটো জানালার কাচ ভাঙল। গেমটিচার অরণ্যবাবু আহত হলেন পাথরের টুকরোর আঘাতে। অল্পের জন্য বেঁচে গেলেন হেডস্যার। একটা রসগোল্লার সাইজের পাথর তাঁর কান ঘেষে বেরিয়ে গেল।
এই সব কথা ছড়িয়ে পড়ল চারিদিকে। শেষে নটরাজ সার্কাসের মালিক এসে রামপিয়ারীকে মোটা টাকা দিয়ে গিরিধারীকে নিয়ে চলে গেল। এখন নটরাজ সার্কাসে বল নিয়ে কসরত দেখায় গিরিধারী। তার কীর্তি দেখে হাততালির ঝড় বয়ে যায়।
এ কথা শুনে আশ্চর্য হয়ে গিয়ে বাচ্চু বলল, 'হ্যাঁ রে, ওটা কি সত্যিই মেসির জুতো ছিল?'
কাজু অবাক হয়ে বাচ্চুমামার মুখের দিকে তাকাল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন