পঞ্চম অধ্যায়

শৈলেন ঘোষ

রাজকন্যাকে সারাদিন তন্নতন্ন করে খোঁজা হয়েছে। তাকে খুঁজে না-পেয়ে রাজপ্রাসাদে তখন হাহাকার পড়ে গেছে। অথচ কেউ জানতেও পারল না, রাজকন্যা রাজপ্রাসাদেই আছে। সে আছে রাজপ্রাসাদের সকলের চেনা উজ্জু নামে সেই বৃদ্ধ মানুষটার ঘরে। সেই বৃদ্ধ মানুষটাই এখন রাজজ্যোতিষীর ঘর পেরিয়ে, রাজার সঙ্গে দেখা করতে চলল। অবশ্য, অন্য কেউ হলে, এমন সহজে রাজার দেখা পাওয়ার সুযোগ পেত না। তা লোকটা যখন উজ্জু, তখন যতই নজরদারি থাক, কেউ কোনও কথাও বলল না। তার ওপর তো সবাই তখন তটস্থ হয়ে আছে! হারিয়ে গেছে কে? না, রাজকন্যা। এ কী সহজ কথা! কার দোষে এমন একটা অঘটন ঘটল, সেই নিয়ে চারদিকে তখন চলছে কানাঘুষো, ফিসফিস। আর, এ-কথা না-বললেও কে না জানে, তখন রাজার মেজাজটাও ছিল তিরিক্ষি! তেমনই ভাবনায় ভেঙে পড়া চেহারাটাও।

বৃদ্ধ উজ্জু যখন রাজামশাইয়ের সামনে এসে দাঁড়াল, তার অনেক আগেই সেখানে জমায়েত হয়েছে সবাই। মানে, সেই মন্ত্রি-সান্ত্রী থেকে আরম্ভ করে সেনাপতি, বরকন্দাজ পর্যন্ত। সবাই। কোথায়-কোথায় রাজকন্যা থাকতে পারে, সেই নিয়ে নানান জন রাজাকে নানান রকম পরামর্শ দিচ্ছে। ঠিক সেই মুহূর্তে উজ্জু বৃদ্ধকে সেখানে হাজির দেখে সবাই থমকে গেল। অন্য কেউ নয়, রাজামশাই নিজেই কথা বললেন উজ্জুর সঙ্গে। বললেন মানে কী, তিনি প্রায় কাঁদো-কাঁদো হয়ে উজ্জুর কাছে এগিয়ে এলেন। এসেই, উজ্জুর হাত ধরে বলে উঠলেন, “উজ্জু, তোমরা সবাই থাকতে, তোমাদের সবার চোখের সামনে থেকে আমার মেয়েটা হারিয়ে গেল!”

উজ্জু আর অন্য কোনও কথা না-বাড়িয়ে, প্রায় সবাইকে অবাক করে বলে উঠল, “রাজামশাই, না, না, রাজকন্যা তো হারিয়ে যায়নি।”

“তবে?” রাজামশাই ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেলেন।

একঘর লোক একসঙ্গে ঝলকে উঠে উজ্জুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তাদের যেন শ্বাস পড়ে না।

উজ্জু তাদের সবাইকে চমকে দিয়ে বলে উঠল, “আজ্ঞে, রাজকন্যা তো আমার ঘরে আছে!”

“তোমার ঘরে!” হতচকিত রাজা প্রায় চিৎকার করে উঠলেন।

“তবে যে সবাই বলল, তুমি বলেছ, তোমার ঘরেও সে যায়নি!” রাজার গলায় ক্ষোভ।

“আজ্ঞে, কথাটা মিথ্যে নয়। এই মিথ্যে-কথাটা আমিই মিথ্যে-মিথ্যে বলেছি রাজকন্যার হয়ে।” উত্তর দিল উজ্জু।

“কেন?” রাজার গলায় রাগ।

“কেননা, রাজকন্যা আমাদের সবার প্রিয় রাজার মেয়ে বলে।” উত্তর দিল উজ্জু।

“কিন্তু তাই বলে তুমি মিথ্যে বলবে?” ঝাঁঝিয়ে উঠলেন রাজা, “সারাদিন ধরে সারা রাজ্য ঢুঁড়ে ফেলল আমার লোকেরা, অথচ তুমি মুখ বুজে বসে রইলে ঘরের কোণে! একবারের জন্যও খবর পাঠালে না আমার কাছে?”

“রাজামশাই, আমার বেয়াদপি ক্ষমা করবেন।” এইটুকু বলে উজ্জু মাথা নোওয়াল।

“কী বলতে চাও তুমি?” রাজা তেমনই গলা চড়িয়ে কথা বললেন।

“রাজামশাই, আমার তেমন কিছু বলার নেই। আমি রাজবৈদ্যও নই, রাজজ্যোতিষীও নই। আমার বিদ্যে-বুদ্ধিও তাদের মতো নয়। তবে এটুকু আমি বুঝেছি, রাজকন্যা আলা-ইজার শরীরে কোনও ব্যামোর লক্ষণও নেই, কোনও ভয়েরও কারণ দেখি না। শুধুমুধু রাজজ্যোতিষীর কথায় বিশ্বাস করে, একটি বাচ্চা হরিণের প্রাণ নিয়ে রাজকন্যার প্রাণ বাঁচানোর এই চেষ্টার আমি কোনও কারণ খুঁজে পাচ্ছি না। তার ওপর আলা-ইজা নামের এই ছোট্ট মেয়েটি সেই ছোট্ট হরিণটিকে ভালবেসেছে। তার সঙ্গে খেলা করেছে। তার নাম দিয়েছে ‘আমনা’। এখন আপনি যদি জ্যোতিষমশাইয়ের কথা মেনে হরিণের প্রাণ নেন, তবে, আমার মনে হয়, আলা-ইজারই প্রাণ বাঁচানো দায় হবে।” এইটুকু বলেই বৃদ্ধ উজ্জু থামল। তারপর হঠাৎ যেন ব্যস্ত হয়ে বলে উঠল, “রাজামশাই, রাজকন্যা এখন আমার ঘরে ঘুমোচ্ছে। আপনি দয়া করে এখনই তাকে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করুন। তারপর আপনার যদি মনে হয় আমাকে শাস্তি দেবেন, দিতে পারেন। কিন্তু আর দেরি করা ঠিক হবে না। রাজকন্যা আলা-ইজার যদি ঘুম টুটে যায়, আর আমাকে যদি সে দেখতে না পায়, তবে সেও হবে আর-এক বিপদ।”

রাজা কী ভাবলেন, সে রাজাই জানেন। তিনি শুধু এক ঝলক দৃষ্টি হেনে দেখে নিলেন বৃদ্ধ উজ্জুকে। তারপর সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে নিজেই চললেন রাজকন্যাকে ফিরিয়ে আনার জন্য, উজ্জুর ঘরের দিকে।

এখন আলো চাই। কেননা, আকাশে অন্ধকার নেমেছে। যদিও আকাশের বুকে ফুটে উঠেছে অনেক তারার আলো, তবু সে আলোয় উছলে পড়ে না সামনের অন্ধকারটা। তাই রাজপ্রাসাদের দেওয়ালে-দেওয়ালে জ্বলে উঠেছে দেওয়ালগিরি। যেন ঘন অন্ধকারের সঙ্গে যুদ্ধ করছে তারা টিমটিম করে। যুদ্ধ করছে রাজার পথ করে দেওয়ার জন্য। সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে রাজাও যেন যুদ্ধ করতে চলেছেন এখান থেকে উজ্জুর ঘরের দিকে। অবশ্য এই যুদ্ধযাত্রায় কারও মুখে কোনও কথা নেই। আলো-আঁধারিতে শুধু শোনা যাচ্ছে নিশ্বাসের শব্দ। দলটা তো নেহাত ছোট নয়। অত মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দটা গাছ-পাতার ফাঁকে লুকিয়ে থাকা ঝিঁঝিঁর শব্দকেও যতই ছাপিয়ে যাচ্ছে, ততই ওরা উজ্জুর ঘরের দিকে এগিয়ে আসছে।

পৌঁছে গেল তারা উজ্জুর ঘরের দোরগোড়ায়। তারপর থমকে দাঁড়াল। দরজা খোলা! ঘরের ভেতরটা অন্ধকারে ঘুটঘুট করছে। ঘরের প্রদীপ জ্বেলে দিল উজ্জু। ঘরভর্তি আলো ছড়িয়ে গেল। একদঙ্গল লোকের মুখ সেই আলোয় স্পষ্ট হয়ে উঠল। রাজা ঘরে ঢুকলেন। থমকে দাঁড়ালেন রাজা। তার অনেক আগেই প্রদীপ জ্বালিয়ে উজ্জুও থমকে গেছল। কেননা, তারা কেউই ঘুমন্ত রাজকন্যা আলা-ইজাকে দেখতে পেল না ঘরের ভেতরে।

রাজা জিজ্ঞেস করলেন, “কই? আলা কই?”

উজ্জু চিৎকার করে ডাক দিল, “রাজকন্যা!”

ঘরের দেওয়ালে ধাক্কা খেল সেই শব্দ, কিন্তু কেউ সাড়া দিল না।

উজ্জুর মাথায় যেন বাজ পড়ল। সে ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল। এই তো ছিল মেয়েটা! কোথায় গেল! সে ব্যস্ত পায়ে ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে আবার চিৎকার করল, “আলা-ইজা?”

কেউ সাড়া দিল না।

আবার ডাকল সে।

আবার।

অনেকবার।

রাজা তার মুখের দিকে তাকিয়ে-তাকিয়ে দেখতে লাগলেন। একটি কথাও মুখ ফুটে বললেন না। রাজার মতো রাজার সাঙ্গোপাঙ্গরা হতবাক!

উজ্জু চোখের পলকে ছুটতে লাগল। যেমন করে একজন বৃদ্ধ মানুষ ছোটে, ঠিক তেমনই করে।

এবার রাজা কথা বললেন। তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গকে হুকুম করলেন, “বৃদ্ধটার পিছু নাও!”

তারাও বৃদ্ধ উজ্জুর পিছু নিল।

উজ্জু ছুটতে-ছুটতে খানিকটা এসে দেওয়ালগিরির একটি আলো দেওয়াল থেকে খুলে নিল। সেই আলো নিয়ে সে ছুটতে-ছুটতে রাজপ্রাসাদের বাগানে ঢুকে পড়ল। রাজার সাঙ্গোপাঙ্গরাও তার পেছনে-পেছনে তাকে ধাওয়া করল।

সেই রাতের অন্ধকার-জড়ানো রাজপ্রাসাদের বাগানটাকে এখন যেন চেনাই যায় না। শব্দ নেই, কোথাও, কোনও দিকে। পথ আছে গাছের আড়ালে-আড়ালে। দেখা যায় না। মাঝে-মাঝে একটি-দুটি পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ গাছের ডালে। শোনা যায়। ঝিঁঝিঁর শব্দ শুনে-শুনে এমনই সয়ে গেছে, সে-শব্দ যেন আর কানে ঢোকে না। কিন্তু এই বৃদ্ধ মানুষ উজ্জু রাজকন্যা আলা-ইজাকে সন্ধান করতে এই বাগানে ঢুকে ‘আলা-ইজা’ বলে হাঁক দিতেই অনেক পাখির যেন একসঙ্গে চমক ভাঙল। একসঙ্গে অনেক পাখি অন্ধকারে ডানা ঝাপটিয়ে এ-ডাল ও-ডাল ওড়াউড়ি করতে লাগল প্রাণের ভয়ে। কিন্তু উজ্জু সাড়া পেল না রাজকন্যার। দেওয়ালগিরির রোশনাই ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে যতটুকু, তার চেয়ে অনেক বেশি ছায়া অন্ধকারকে আরও ভয়ঙ্কর করে তুলেছে। কে জানে কোথাও সাপ আছে কিনা ঘাপটি মেরে লুকিয়ে। কিংবা কোনও বিষাক্ত কীট! সেসব ভয় এখন উজ্জুর মনে এতটুকুও আঁচ ফেলতে পারেনি। সে জানে, এই বাগানে বন্দি আছে সেই ছোট্ট হরিণ। আলা-ইজার বন্ধু। আলা-ইজা আর কোথাও যাবে না। নিশ্চয়ই সে এই বাগানেই আছে। তার বন্ধুর কাছে। তাই বৃদ্ধ উজ্জু আবার ডাক দিল, “রাজকন্যা-আ-আ-!”

অনেক শুকনো পাতা পড়ে আছে এদিকে-ওদিকে। পা পড়ে যায় বৃদ্ধ উজ্জুর সেই পাতার ওপর। শব্দ ওঠে। কিন্তু রাজকন্যার সাড়া পায় না। গাছের ফাঁকে ফাঁকে আলোর ঝিলিমিলি তার হাতের দেওয়ালগিরির শিখা থেকে ছড়িয়ে পড়ছে। সেই ঝিলিমিলির ওপর পা ফেলে-ফেলে বৃদ্ধ মানুষটা ঘুরপাক খায়! কিন্তু দেখতে পায় না কাউকে। না দেখে আলা-ইজাকে। না তার হরিণ। ওই মস্ত বাগানটা চষে ফেলল সে। ও-প্রান্ত থেকে শেষ প্রান্ত পর্যন্ত। ডাকতে-ডাকতে গলা ভেঙে গেল তার। বুকের ভেতরটা কাঁপতে লাগল। দেওয়ালগিরির শিখাটাও এখন কাঁপছে। কাঁপছে গাছের ছায়া। ডালপালা। বুঝি কাঁপছে ক্লান্তিতে, বৃদ্ধ মানুষটার পা দুটোও। তবু সে হাল ছাড়ে না। চোখের দৃষ্টিকে সে বারবার মুছে নেয়। পা-দুটোকে শক্ত করে কখনও দাঁড়ায় সে। একটু জিরিয়ে নেয়। তারপর আবার চুপিসারে উঁকি মারে এই গাছের আড়াল থেকে আর-এক গাছে। তারপর? তারপর আচমকা ফুস করে নিভে গেল হাতের দেওয়ালগিরি! জমাট অন্ধকারে আবার ঢাকা পড়ে গেল রাজপ্রাসাদের বাগান। সেইসঙ্গে বৃদ্ধ উজ্জুও।

অন্ধকার। সে যে কী ভয়ঙ্কর অন্ধকার, তখন একমাত্র বৃদ্ধ উজ্জু ছাড়া আর কারও জানার কথা নয়। বেচারা উজ্জু তখন কী করবে বলো! কোন্‌দিকে যে বেরিয়ে যাওয়ার রাস্তাটা, তাও সে তখন ঠাহর করতে পারছিল না। পারা সম্ভবও নয়। কেননা, যত বড় সেই বাগান, তার চেয়েও অনেক বড় একটা চশমা তার চোখে। আলোটা নিভে যাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে সেই চশমাটাও অকেজো হয়ে তার নাকের ডগায় ঝুলছে। বিপদ যে এমন করে তার পিছু নেবে, এ-কথা কি একবারও ভাবতে পেরেছিল উজ্জু! কে জানত, রাজকন্যা আলা-ইজাকে একা, ঘরে, অমন করে ঘুম পাড়িয়ে রাজার কাছে ছুটে যাওয়াটা তখন ঠিক হয়নি! সে জানে, এবার রাজার হাতে তাকে মরতে হবে। মরতে তার আপত্তি নেই। বয়েসটা তার এমন কিছু কম নয় যে, মরলে সবাই হা-হুতাশ করবে। কিন্তু তার ভালবাসার ওই ছোট্ট আলা-ইজার যদি সত্যিই কোনও বিপদ হয়ে থাকে, তবে যে সে-বিপদ তারই জন্য, এই গঞ্জনা মাথায় নিয়ে তাকে মরতে হবে যে!

কিন্তু এখন! এই অন্ধকারে সে কী করবে! পা তখন যাও-বা হাঁটছিল, এখন মনে হচ্ছে, তাও বুঝি অচল হয়ে গেছে। সে আর পারছে না। সারা বাগান জুড়ে ঝিঁঝিঁ ডাকার সেই শব্দটা এখন মনে হচ্ছে কান ফাটিয়ে চেঁচাচ্ছে। সে কানে হাতচাপা দিল। তারপর টলতে-টলতে সেই অন্ধকার হাতড়ে পথ খুঁজতে লাগল। সে বুঝতে পারল কাঁটাগাছে পা কাটছে। মাথা ঠুকছে। গলার স্বর ভেঙে শব্দ হারিয়ে গেছে। এমনকী, বুকের ধুকধুকিটাও যেন আস্তে-আস্তে থেমে আসছে। এমন সময়ে সে হোঁচট খেল। আচমকা। মানুষটা পড়ে গেল গাছের গায়ে ধাক্কা খেয়ে। লাগল। হয়তো-বা কাটল। কিন্তু সে আর উঠতে পারল না। বনের সেই শুকনো পাতার ওপর, না কি মাটির শুকনো ঢেলার ওপর সে শুয়ে রইল, সে বোঝার জ্ঞান আর তখন তার নেই। এখন ঝিঁঝিঁর ডাকটা বন্ধ হলে সে একটু ঘুমোতে পারে।

না, ঘুমোতে তাকে হল না। রাজার সাঙ্গোপাঙ্গরা ততক্ষণে আলোর মশাল জ্বেলে ঢুকে পড়েছে রাজপ্রাসাদের সেই বাগানে। উজ্জুকে খুঁজে বের করতে তাদের বেশি সময় লাগল না। মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা মানুষটাকে টেনে-হিঁচড়ে তারা দাঁড় করাল। তারপর টানতে-টানতে বাগান থেকে বৃদ্ধ উজ্জুকে তারা বের করে আনল রাজার সামনে।

রাজা দেখলেন না তার পা কেটেছে। জামা ছিঁড়েছে। দেখলেন না মানুষটা আর নিশ্বাস ফেলতে পারছে না। ধুঁকছে। আধখানা প্রাণ বুকে নিয়ে সে টলছে। রাজা হুকুম করলেন, “লোকটাকে বন্দি করো। কয়েদখানায় পুরে রাখো!”

উজ্জু নামে মানুষটার তখন আর কথা বলার ক্ষমতা নেই। রাজার মুখের দিকে চেয়ে যে সে দেখবে, সেই শক্তিও তার শেষ হয়ে গেছে। মনে-মনে সে ভাবল, তার মৃত্যুর ঘণ্টা বেজে উঠেছে। এবার তাকে মরতে হবে।

উজ্জুকে আটক করা হল কয়েদখানায়। অন্ধকার এখানেও। এটা এমন কিছু আশ্চর্যের নয়। কয়েদখানা আলোর রোশনাইয়ে ঝলমল করবে, এমনটা ভাবাই মিথ্যে। সুতরাং সেই অন্ধকারেই উজ্জুকে পড়ে-পড়ে সময় গুনতে হবে। অবশ্য কখন যে তার গর্দান যাবে, সে একমাত্র রাজা ছাড়া আর কেউ জানে না। গর্দান যখন যায়, যাবে, কিন্তু এখন এই যে বৃদ্ধ মানুষটা অন্ধকারে হাঁপাচ্ছে, কে তার মুখে একফোঁটা জল দেবে! মরা, সে তবু ভাল। কিন্তু যে-মানুষটা অন্ধকার কয়েদখানায় মরার আগে যন্ত্রণায় ছটফট করছে, এখন কেউ তাকে দেখবার নেই। অথচ বলো, তার তো কোনও দোষ নেই। সে তো রাজামশাইকে কোনও কিছু গোপন করতে চায়নি। বরং রাজকন্যা আলা-ইজার খবরটাই রাজামশাইকে দিতে এসেছিল। কিন্তু তাকে শেষমেশ যে এমন এক দুর্বিপাকে ফেলে রাজকন্যা অদৃশ্য হয়ে যাবে, সেটা কেমন করে জানবে বৃদ্ধ উজ্জু!

সে যাই হোক, খানিক পরেই উজ্জু বুঝতে পারল, সে দম ফেলতে পারছে। কষ্টটা অনেকটা সামলাতে পেরেছে সে। তবে তেষ্টায় গলা শুকিয়ে আসছে মাঝে-মাঝে। কিন্তু সে জানে এখানে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করলেও, তার কথা কারও কানে পৌঁছবে না। এখানে কেউ তাকে দয়া করার জন্য জলের পাত্র হাতে নিয়ে ছুটে আসবে না। এখানে কয়েদিকে যে দয়া দেখায় তার কপাল যে কখন ফাটবে, সে-কথা রাজামশাই ছাড়া আর কেউ জানে না। তবে নির্ঘাত মরণ থেকে তার নিস্তার নেই।

এখন একটু উঠে বসবার ইচ্ছে হল উজ্জুর। হ্যাঁ, তার মনে হল, সে বসতে পারবে। কয়েদখানার অন্ধকারে নিজের হাতদুটোকে নিজের চোখে দেখতে না-পেলেও, হাতদুটো নাড়াতে তার তো কোনও অসুবিধে নেই। সে দু’ হাতে চাপ দিয়ে উঠে বসল। মাথাটা অবশ্য একটু ঝিমঝিম করে উঠল। তার বেশি আর-কিছু নয়। ইচ্ছে করল, উঠে দাঁড়ায়। দাঁড়াল সে। পা দুটো টলমল করছে। অন্ধকারে সে বুঝতে পারল কয়েদখানার গরাদে-আঁটা ফটকটা তার চোখের সামনেই দেখা যাচ্ছে। সে কয়েক পা এগিয়ে এসে ফটকের গরাদে ধরে ফেলল। আসলে ফটকের গরাদে মাথা ঠেকিয়ে একটু ঠাণ্ডা হওয়ায় কষ্টটা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করল সে। কিন্তু এ কী! গরাদে-আঁটা ফটকটা কেমন যেন নড়ে উঠল! খোলা নাকি? টান দিল উজ্জু। সত্যিই তো ফটক খুলে গেল! এ কী কাণ্ড! কাছেপিঠে কাউকে তো দেখাও যাচ্ছে না। কেউ থাকলেও অবশ্য দেখা যাবে না। কারণ, এখন রাত বেড়েছে। রাতের সঙ্গে অন্ধকারও ঘন হয়েছে। কী মনে হল উজ্জুর, ফটক ডিঙিয়ে কয়েক পা বেরিয়ে এল সে। এধার-ওধার দেখার চেষ্টা করল। হয়তো কিছু দেখতে পেত। কিন্তু কখন যে তার চোখ থেকে চশমাটা খুলে পড়ে গেছে, সে খেয়াল করতে পারছে না। সে যাক, দেখা কিছু না-গেলেও ক্ষতি নেই, সে জানে কোন রাস্তা দিয়ে হাঁটলে সে পালাতে পারে। কেননা, এই কয়েদখানার পাশ দিয়ে সে কতবার যে যাতায়াত করেছে তার হিসেব করা যায় না। সুতরাং আন্দাজে রাস্তাটা সে ঠিকই ঠাহর কতে পারবে। কাজেই পালাতে যদি হয় এখনই পালাতে হবে। এই অন্ধকারে। অন্ধকারই তো এখন উজ্জুর সবচেয়ে বড় বন্ধু। এমন বন্ধু বুঝি আর হয় না!

কিন্তু?

কিন্তু দু’ পা ফাটকের বাইরে বের করে অন্ধকার রাতটাকে সে যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য চোখ মেলে দেখবার চেষ্টা করল। আকাশটা এত তারার আলো বুকে নিয়ে কেমন করে চুপটি মেরে দাঁড়িয়ে থাকে! আকাশের কি ইচ্ছে করে না, ওই তারার আলোর ফুলকিগুলি এদিক-ওদিক দুলিয়ে-দুলিয়ে নাচায়! উজ্জু যখন ছোট্ট ছিল, মানে, যখন আলা-ইজার মতো অমনই ছোট্ট ছিল, তখন আকাশ দেখলেই ওর দুলতে ইচ্ছে করত। উজ্জু ভাবত ও নিজে দুললে বোধ হয় আকাশও তারাগুলোকে নাচাবে। কিন্তু নাচায় না। শুধু এক-একটা তারা মাঝে-মাঝে চোখ মটকে উজ্জুর সঙ্গে তামাশা করে। কী বজ্জাত! দূর থেকে সবাই তামাশা করতে পারে। এমনকী, ভেংচিও কাটতে পারে। কাছে এসে একবার দেখুক না!

উজ্জুর এসব ভাবনা, সেই কবেকার! ও তো আর তখন জানত না, আকাশের একটা তারা, আকাশ থেকে ভাসতে-ভাসতে যদি পৃথিবীর বুকে লাফিয়ে নেমে আসে, তবে পৃথিবীটাই হয়তো টুকরো-টুকরো হয়ে ছিটকে পড়বে! কোথায়? সেটা অবশ্য কেউ জানে না।

আচ্ছা, আজ কেন হঠাৎ কয়েদের ফটক থেকে চুপিসারে বেরিয়ে এসে তার এসব কথা মনে হচ্ছে? কেন মনে পড়ছে সেই ছেলেবেলার এই আজগুবি কথাগুলো। আজগুবি! তবে কি আলা-ইজার ওই ছোট্ট হরিণের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে খেলা করাটাও আজগুবি! হরিণের প্রাণ বাঁচাবার জন্য আলা-ইজার এত যে কান্না, তবে কি সেটাও মিথ্যে, আজগুবি!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%