অষ্টম অধ্যায়

শৈলেন ঘোষ

কতক্ষণ যে উজ্জু গাছের নীচে এমনই করে ঘুমন্ত অবস্থায় পড়ে ছিল, সে যেমন উজ্জু জানে না, তেমনই আমরাও জানি না। ঘুম যখন ভাঙল তখন রাত না দিন উজ্জু খেয়ালই করতে পারল না। কেননা, এখন মাথা উঁচিয়ে চোখ মেলে সে আকাশও দেখতে পায় না, আকাশে এখন আলো, না আঁধার, তাও জানতে পারে না। এমনকী যে-গাছটার গায়ে ঠেসান দিয়ে সে ঘুমিয়ে পড়েছিল, সেই গাছটা হাতড়ে-হাতড়ে খুঁজে তারও পাত্তা করতে পারল না। আশ্চর্য তো! তবে কি উজ্জু স্বপ্ন দেখছে! না, উজ্জু এখন এক গভীর অন্ধকারে বন্দি হয়েছে।

উঠে দাঁড়াল উজ্জু। নিজে এখনও ঘুমোচ্ছে, না জেগে আছে সেটা পরখ করার জন্য দু-দু’বার সে পা ছুড়ল। হাত ছুড়ল, এমনকী নিজের মাথার চুল টেনে দেখে নিল লাগছে কিনা!

লাগছে বটে।

তবে?

সে কথা বলতে পারছে কি! দেখা যাক তো! উজ্জু গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল। প্রতিধ্বনি উঠল ।

এমন তো হওয়ার কথা নয়। এ যেন মনে হয় একটা মস্ত ফাঁকা ঘরের মধ্যে সে এতক্ষণ ঘুমোচ্ছিল! সে পায়ের তলায় মাটি খুঁজতে লাগল। না, মাটি তো নেই। পায়ে যেন শক্ত পাথর ঠেকছে! উজ্জু খানিকটা সামনে হাঁটল। খানিকটা পিছু ফিরে পা ফেলল। যা ভেবেছে ঠিক তাই। যেদিকেই যাও এখন পায়ে তার শক্ত পাথর-ঢালা মেঝে ছাড়া অন্য আর কিছুই ঠেকছে না। এ তো আচ্ছা আজগুবি কাণ্ড! এখানে উজ্জু এল কেমন করে! এই অন্ধকারে কোথাও যদি একটু আলোর চিহ্ন থাকত, তবে হয়তো খানিকটা তালাশ করতে পারত।

তবে কি উজ্জু ঘুমিয়ে অচেতন হয়ে পড়ে ছিল। অচেতন অবস্থায় গাছের নীচ থেকে এই শক্ত পাথর-আঁটা ঘরের ভেতর গড়িয়ে চলে এসেছে!

কিন্তু বনের ভেতর তখন তো সে কোনওই বাড়ি-ঘর দেখেনি! তবে কি কেউ তাকে তুলে এনেছে এখানে?

তাই-ই বা কেমন করে হবে! তাকে তুলে আনল, অথচ উজ্জু টের পেল না একটুও! তার ঘুম ভাঙল না! এ কখনও হয়!

হঠাৎ উজ্জু চিৎকার করে উঠল, “কে আছ হে এখানে?”

কোনও সাড়া পেল না উজ্জু। শুধু তার চিৎকারের শব্দটা অনেকখানি জায়গা জুড়ে ঘুরপাক খেতে লাগল। উজ্জু বুঝতে পারল, ঘরটা যেমন-তেমন ছোট্ট নয়। কারও সাড়া যখন নেই, তখন মনে হয়, ঘরেও এখন কেউ নেই। তা হলে এই অন্ধকারে পড়ে-পড়ে চেঁচিয়ে কী লাভ! বরং এখান থেকে বেরোবার পথটা খুঁজে পাওয়া যায় কিনা সেইটাই শেষমেশ দেখা যাক।

কেমন যেন বেপরোয়া হয়ে গেল উজ্জু হঠাৎ। লাগে ধাক্কা, লাগুক! সেই অন্ধকারের ভেতরেই সে আঁকপাক করে পথ খুঁজতে লাগল। কখনও এদিকে ছুটছে সে, কখনও ওদিকে হাঁটছে। কখনও দম নিচ্ছে, কখনও দাঁড়াচ্ছে।

তারপর?

কে যেন হেসে উঠল, “হা-হা-হা!”

চমকে গেল উজ্জু।

কে হাসল!

ফিরে তাকাল। হাসির প্রতিধ্বনিটা কোনদিক থেকে এসে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল, উজ্জু বুঝতেই পারল না। উজ্জু ভয় পেল না। উজ্জু জানে ভয় পাওয়ার বয়েস তার অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে। আর তা ছাড়া এখন ভয় পেয়েই বা লার্ভ কী! হাসিটা যদি কোনও ভয়ঙ্কর শক্তিশালী কারও হয়, তবে তার সঙ্গে মোকাবিলা করাই এখন বাঁচার সহজ পথ। এ ছাড়া এখন আর অন্য কোনও রাস্তা তার জানা নেই। তাই সেই হাসির রেশটা ধীরে-ধীরে অন্ধকার ঘরের বাতাসে মিলিয়ে গেলে সেও চিৎকার করে উঠল, “কে তুমি, হাসছ?”

“আমি।” অন্ধকারের ভেতর থেকে তার গলার আওয়াজ যেন একটা জ্বলন্ত গোলার মতো ছিটকে পড়ল উজ্জুর কানের ভেতর।

“অন্ধকারে অমন ভিতুর মতো লুকিয়ে-লুকিয়ে সাড়া দিলে আমি যদি মনে করি, তোমার গলার আওয়াজেই যত তেজ, গায়ের জোরে তুমি ফক্কা, তবে হয়তো সেটা ভুল বলা হবে না।” উত্তর দিল উজ্জু।

“ওরে বৃদ্ধ, এই বয়সেও তোর দম্ভ তো কম নয় দেখি! জানিস, এখনই আমি যদি ফুঁ দিই, এক ছুঁয়েই তোর মুণ্ডুটা ঘাড় থেকে উপড়ে হাওয়ায় সাঁতার কাটবে!” বলেই সে আবার হেসে উঠল।

এবার উজ্জুর স্পষ্ট মনে হল, তার হাসির সঙ্গে সেই অন্ধকারটাও কাঁপছে। উজ্জু ধমক দিল, “থামো! তোমার ফুঁয়ে যদি আমার মাথা উপড়ে পড়ে, তবে জেনে রাখো, আমারও ঘুসির জোরটা তোমার চেয়ে নেহাত একটা কম হবে না! এক ঘুসিতেই আমি তোমার ঘাড়টা ভেঙে দিতে পারি।”

অন্ধকারের ভেতর থেকে এবার তার হাসিটা ভীষণ একটা দানবের মতো আওয়াজ তুলে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। সে হাসতে-হাসতেই বলল, “ওরে বৃদ্ধ আর বেশি বড়াই করিস না। আমি কে, তুই কি তা জানিস?”

“জানার দরকার মনে করি না। তবে এটুকু বুঝেছি, কাউকে না-পেয়ে একটা বৃদ্ধ মানুষকে তোমার ডেরায় ধরে এনে, তোমার শক্তির জাঁক দেখাচ্ছ! অথচ আমি তোমার কোনও ক্ষতিই করিনি। তুমি বোধ হয় জানোই না জীবনে আমি কোনওদিনই কারও ক্ষতি করিনি।” বলতে-বলতে থামল উজ্জু। তারপর জিজ্ঞেস করল, “একটা ঘুমন্ত বৃদ্ধ মানুষকে চোরের মতো এখানে ধরে আনার কারণটা জানতে পারি কি?”

এবার সেই অন্ধকারের ভেতরে মিশে থাকা অদৃশ্য মানুষের গলার আওয়াজটা আর তেমন তেজি বলে মনে হল না। খানিকটা যেমন সহজ হয়ে গেল তার গলার স্বর, তেমনই অনেকটা সভ্যভব্যর মতো সে উত্তর দিল, “উজ্জু, আমি চোর নই। আমি মৃত্যুদূত। আমি তোমায় নিয়ে যেতে এসেছি। এই অন্ধকার পেরিয়ে তোমাকে আমি নিয়ে যাব পৃথিবী থেকে স্বর্গে। পৃথিবীতে তোমার কাজ শেষ হয়েছে। আমি জানি, তুমি কোনওদিন কারও ক্ষতি করোনি। তাই তোমার জায়গা স্বর্গে।”

উজ্জুর বুঝতে আর বাকি রইল না, অন্ধকারে কে কথা বলছে। তা হলে এরই নাম মৃত্যুদূত! বুঝতে পারল, ওই অন্ধকারের সঙ্গে অন্ধকার হয়ে মৃত্যুদূত তাকে নিতে এসেছে। তার আয়ু ফুরিয়েছে। এবার তার ডাক পড়েছে। তাকে যেতে হবে। যেতে তার আপত্তি নেই। কিন্তু এভাবে, এখানে সে তো মরতে চায় না। সে যে রাজামশাইকে কথা দিয়ে বনের মধ্যে রাজকন্যা আলা-ইজাকে খুঁজতে বেরিয়েছে। কিন্তু এখনই যদি তাকে যেতে হয়, তবে যে, সে কাজটা সারা হবে না। রাজামশাই ভাবতে পারেন, উজ্জু বুঝি-বা কথার খেলাপ করে তাঁকে ঠকিয়েছে। কাজেই উজ্জু এবার অন্ধকারে মৃত্যুদূতের উদ্দেশ্যে বলল, “তা যদি সত্যি হয়, তুমি যদি সত্যিই মৃত্যুদূত হও, তবে তুমি আমার সামনে এসে দাঁড়াও! আমি তোমায় দেখতে চাই। তোমাকে আমার কিছু বলার আছে।”

মৃত্যুদূত উত্তর দিল, “উজ্জু, আমি তোমার সামনেই দাঁড়িয়ে আছি। আমায় কেউ দেখতে পায় না।”

উজ্জু জবাব দিল, “তোমায় দেখতে না-পেলে, তোমার সঙ্গে যাব কেমন করে?”

“এই অন্ধকারের ভেতর দিয়ে তুমি যেদিকেই যাবে, সেইদিকেই তুমি স্বর্গের রাস্তা খুঁজে পাবে।” উত্তর এল মৃত্যুদূতের।

উজ্জু মুহূর্ত চুপ করে রইল।

অন্ধকারের ভেতর থেকে আবার কথা শোনা গেল, “কী হল তোমার ? চুপ করে আছ কেন? ভয় পাচ্ছ?”

“না,” স্পষ্ট গলায় উত্তর দিল উজ্জু। তারপর আবার বলল, “হে মৃত্যুদূত, মরতে আমার ভয় নেই। কেই-বা চিরদিন বেঁচে থাকে! আমার সময় হয়েছে, তাই তুমি আমায় নিয়ে যেতে এসেছ। কিন্তু একটা কথা কি জিজ্ঞেস করতে পারি তোমাকে?”

“কী কথা?”

“আমি যখন রাজকন্যা আলা-ইজা নামে এক শিশু-কন্যার খোঁজে বনের ভেতর তার সন্ধান করছি, তখনই কেন তুমি আমায় নিয়ে যেতে এলে?” জিজ্ঞেস করল উজ্জু।

উত্তর এল, “তোমার সময় হয়েছে বলে।”

“কিন্তু হে মৃত্যুদূত, রাজকন্যা আলা-ইজাকে যে আমায় খুঁজে বের করতে হবে। আমার বিশ্বাস, গহন বনে আমি যেমন তার খোঁজে এসেছি, তেমনই আলা-ইজা একটি হরিণ-শিশুকে সঙ্গে নিয়ে সেই হরিণ-শিশুর মাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। খুঁজতে-খুঁজতে সেও বোধ হয় পথ হারিয়ে ফেলেছে। হে মৃত্যুদূত, রাজজ্যোতিষী বলেছেন, আলা-ঈজার এক কঠিন অসুখ হয়েছে। একটি হরিণ-শিশুকে প্রাণে না-মারলে রাজকন্যার অসুখ সারবে না। সেইজন্য হরিণ-শিশুকে তার মায়ের কাছ থেকে ছিনিয়ে আনা হল। কিন্তু হে মৃত্যুদূত, পৃথিবীতে যা সুন্দর, যা সত্যি, তাই-ই ঘটল। এক ছোট্ট রাজকন্যার খেলার সঙ্গী হল সেই ছোট্ট হরিণ-শিশু। তাকে ভালবাসল রাজকন্যা নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি। কিন্তু যখনই সে জানতে পারল, তার অসুখ সারাবার জন্য সেই ছোট্ট হরিণ-শিশুর প্রাণ নেওয়া হবে, তখনই রাজকন্যা কেঁদে উঠল, মৃত্যুদূত। কাঁদতে-কাঁদতে আমার কাছে ছুটে এল। আমার ঘরেই ঘুমিয়ে পড়ল সে। রাজকন্যা আলা-ইজা যখন ঘুমে অচেতন, তখনই আমি রাজামশাইয়ের কাছে খবর দিতে গেছি। ফিরে দেখি সে নেই। তার হরিণও নেই। তন্নতন্ন করে খুঁজেও তাকে পাওয়া গেল না। তাই বনেই তাকে খুঁজতে বেরিয়েছি আমি। খুঁজতে-খুঁজতে ক্লান্ত হয়ে আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলুম যখন, তখনই তুমি আমাকে এই অন্ধকারে নিয়ে এসে আমার স্বর্গে যাওয়ার খবর শোনাচ্ছ। শোনো হে মৃত্যুদূত, তুমি যেন ভেবো না, আমি মরণের কথা শুনে ভয় পেয়েছি। না। আমি যাব তোমার সঙ্গে। তবে যাওয়ার আগে তোমার কাছে আমার একটি প্রার্থনা, রাজামশাইকে আমি যে-কথা দিয়ে এসেছি, সেই কথা রাখার সুযোগ আমায় দাও! মৃত্যুর আগে সেই ছোট্ট মেয়ে আলা-ইজার মুখখানি আমি একটিবারের জন্য দেখে যেতে চাই। তাকে খুঁজে পেলেই আমি তোমার সঙ্গে এই পৃথিবীর বাতাসে শেষ নিশ্বাসটি ছড়িয়ে দিয়ে স্বর্গে চলে যাব।” বলতে-বলতে উজ্জুর চোখ দুটো এমন জ্বলজ্বল করতে লাগল, মনে হল, অন্ধকারের কপালে কে যেন দুটি আলোর ফোঁটা সাজিয়ে দিয়েছে।

মৃত্যুদূতের মুখে সঙ্গে-সঙ্গে কোনও উত্তর শুনতে পেল না উজ্জু। তার উত্তর শোনার জন্য উজ্জু রুদ্ধশ্বাসে সেই ছমছমে অন্ধকারের দিকে কান পেতে দাঁড়িয়ে রইল। কিন্তু নিথর হয়ে রইল সেই অন্ধকার।

উজ্জু ব্যস্ত হয়ে আবার জিজ্ঞেস করল, “হে মৃত্যুদূত, তুমি চুপ করে আছ কেন? আমার প্রার্থনায় তোমার কি সায় নেই?”

এবার শোনা গেল মৃত্যুদূতের কণ্ঠস্বর। সেই অন্ধকারের ভেতর থেকে মৃত্যুদূতের দরাজ গলা ভেসে এল। সে বলল, “শোনো উজ্জু, তোমার এ-প্রার্থনা আমার পক্ষে মেনে নেওয়া খুবই শক্ত। তবু তোমার আকুতি আমাকে মুগ্ধ করেছে। রাজকন্যা আলা-ইজাকে খুঁজে বের করার জন্য আমি তাই তোমাকে তিনদিন সময় দিলাম। কিন্তু শুনে রাখো হে বৃদ্ধ উজ্জু, তোমার সেই প্রিয় রাজকন্যা আলা-ইজা যদিও বনেই আছে, কিন্তু তাকে আর মানুষের মূর্তিতে তুমি দেখতে পাবে না। তার ছোট্ট বন্ধু হরিণ-শিশুটিকে মায়ের কাছে পৌঁছে সে দিতে পেরেছে। কিন্তু বনদেবীর শাপে আজ নিজেই সে একটি হরিণ-শিশু হয়ে বনে-বনে ঘুরে বেড়াচ্ছে।”

মৃত্যুদূতের কথা শুনে আঁতকে উঠল উজ্জু, “না-আ-আ। এ হতে পারে না, কক্ষনো না।”

মৃত্যুদূত উত্তর দিল, “তবে কি মনে করছ আমি তোমায় মিথ্যে বলছি! শোনো উজ্জু, এ-সত্যি। যেমন সত্যি তুমি, আর তোমার প্রাণ। যেমন সত্যি আমি, আর তোমার মৃত্যু। ঠিক আছে উজ্জু, আমি তোমার আর বেশি সময় নষ্ট করতে চাই না। এবার আমি যাব।”

উজ্জু ব্যস্ত গলায় বলল, “হে মৃত্যুদূত, তুমি কি আর একটু দাঁড়াবে? তোমাকে আমি কি আর-একটি কথা জিজ্ঞেস করতে পারি?”

“বলো!”

“রাজকন্যা আলা-ইজা কী এমন অন্যায় কাজ করেছে যে, তাকে বনদেবী শাপ দিয়ে হরিণ করে দিল?” জিজ্ঞেস করল উজ্জু।

“রাজকন্যা আলা-ইজা কোনও অন্যায় করেনি। অন্যায় করেছে তোমার রাজা, রাজজ্যোতিষী, রাজপুরোহিত সক্কলে। বৃদ্ধ উজ্জু, শুনে রাখো, বনদেবীর সন্তান হল বনের গাছপালা, বনের পশুপাখি, বনের যত ফুল, যত রং, সবই। কিন্তু মানুষ যদি হিংস্র শয়তানের মতো তার সন্তানদের ধ্বংস করে, ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে, তবে বনদেবীও তো প্রতিশোধ নিতে পারে। রাজকন্যা তার শাপে তাই আজ একটি হরিণ। কে বলতে পারে, একদিন হয়তো তোমাদের রাজাই ওই হরিণটিকে ধরে নিয়ে গিয়ে নিজের হাতেই তার প্রাণ নেবে। জানতেও পারবে না, যে-হরিণটিকে সে মারল, সেই-ই তার আদরের মেয়ে। আলা-ইজা। আর সেটাই হবে বোধ হয় বনদেবীর শেষ প্রতিশোধ।” উত্তর দিল মৃত্যুদূত।

মৃত্যুদূতের কথা শুনে শিউরে উঠল উজ্জু নামে ওই বৃদ্ধ মানুষটা। তার কপাল বেয়ে ঘাম ঝরে পড়ল। হাত-পা যেন অবশ হয়ে এল। মনে হল এখনই বুঝি তার প্রাণটা বেরিয়ে যায়। সে আর্তনাদ করে উঠল, “না মৃত্যুদূত, আমি আলা-ইজাকে বাঁচাব। তুমি আমাকে বাঁচতে দাও। শুধু বলে দাও, অন্ধকারে কোন পথ দিয়ে গেলে আমি বনদেবীর দেখা পাব! বলে দাও, কোথায় আছে আমার আলা-ইজা!”

মৃত্যুদূত উত্তর দিল, “বৃদ্ধ উজ্জু, বনদেবীর তো কোনও আলাদা সৌধ নেই। তার ঠাঁই তো সারা বনে। তুমি তাকে খুঁজে পাবে ফুলের গন্ধে। পাখির কলকাকলিতে। ঝরা পাতার ঝুমঝুমিতে। প্রজাপতির রঙিন পাখায়। মৌমাছির গুঞ্জরনে। হরিণের চোখের দৃষ্টিতে। আর, খুঁজে পাবে বনজুড়ে যত সৌন্দর্য ছড়িয়ে আছে, সেইখানেও। এইসঙ্গে আরও শুনে রাখো উজ্জু, রাজকন্যা আলা-ইজাকে খোঁজবার জন্য তোমায় কোনও চেষ্টা করতে হবে না। সে এখন হরিণ। তাকে তুমি চিনতে পারবে না। কিন্তু সে যদি তোমায় দেখতে পায়, তবে সে-ই তোমার কাছে ছুটে আসবে।” এইটুকু বলেই মৃত্যুদূত থামল। থামল কয়েক মুহূর্তের জন্য। তারপর বলল, “এবার আমি যাই উজ্জু। ঠিক তিনদিন পরে আবার দেখা হবে। আশা করি আমার কথা ভুলে যাবে না।”

মৃত্যুদূতের কথা শেষ হতে-না-হতেই কেমন যেন হঠাৎ সেই ভয়ঙ্কর অন্ধকারটা ধীরে-ধীরে সরে যেতে লাগল। উজ্জুর মনে হল তার চোখের ওপর থেকে একটা মিশমিশে কালো পরদা ভোজবাজির মতো আপনা-আপনি মিলিয়ে যাচ্ছে। কাছ থেকে মিলিয়ে যাচ্ছে দূরে। আরও দূরে। অনেক দূরে। মিলিয়ে যাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে চোখের সামনে ভেসে উঠছে আবার সেই বন। সবুজে-সবুজে চারদিক ছেয়ে গেল। গেয়ে উঠল পাখি। নেচে উঠল গাছের পাতা। বনফুলের গন্ধে ভরে গেল সারা বন। দেখা গেল নীল আকাশ, একটু-একটু ঘন গাছের ফাঁক দিয়ে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%