দশম অধ্যায়

শৈলেন ঘোষ

কী আশ্চর্য! এ কী অদ্ভুত ঘুম! ভোরের আকাশে যখন প্রথম আলোর রোশনাই ফুটে উঠল, তখনই তার ঘুম ভাঙল। সারারাত কী হয়েছে, কী হল না, কিছুই সে মনে করতে পারছে না। অবাক কথা, কোথায় গেল সেই পর্ণকুটির! ভোঁ-ভাঁ। সে তো এখন খোলা আকাশের নীচেই শুয়ে আছে! ধড়ফড় করে উঠে বসল উজ্জু। এদিক-ওদিক ব্যস্ত চোখে তাকিয়ে দেখল। সত্যিই তো! ঘর তো নেই। ঘরের সেই বৃদ্ধা মানুষটাও নেই। তার বেশ মনে আছে, বৃদ্ধা তার জন্য খাবার আনতে গেল। তারপর সে এল কিনা, উজ্জু খাবার খেল কিনা, সে-কথাও তো সে মনে করতে পারছে না। এ তো বড় আজব ঘটনা! তবে কি সবটাই স্বপ্ন! সেই বৃদ্ধা! তার মাথায় কাঠ! সেই গাছের পাতায় সাজানো ঘর! সেই মিঠাই আর জল— সব, সব মিথ্যে? না, না, কক্ষনো না।

তবে, কোথায় গেল সেই ঘর? কোথায় গেল সেই বৃদ্ধা? কেমন করে সারারাত এই খোলা আকাশের নীচে পড়ে-পড়ে সে ঘুমোচ্ছে! এ যেন ঠিক ভোজবাজি!

হঠাৎ একঝলক আলো গাছের ফাঁক দিয়ে উজ্জুর মুখের ওপর চমকে এসে পড়ল। সেই আলোর চমক মিলিয়ে যেতে না-যেতে, মেঘ ডাকল গুড়গুড় করে। উজ্জু উঠে দাঁড়াল। এই ঘন বনের ফাঁকে-ফাঁকে আকাশটা তেমন চোখভরে দেখা না গেলেও, যেটুকু দেখা যায়, তাতে সে বুঝতে পারে আকাশ ঢেকে গেছে মেঘে। উজ্জু উঠে দাঁড়াল। সে বুঝতে পারল ঝড় উঠতে পারে, বৃষ্টিও নামবে হয়তো। তখন কী হবে?

উজ্জু আর দাঁড়াল না।

আবার মেঘ ডাকল।

আবার চমকে উঠল উজ্জু।

না, এবার সে মেঘের ডাকে চমকাল না। একটি কচি গলার কান্না সে শুনতে পেল। কে কাঁদে এই জনমানবহীন বনে! ছুটে যায় উজ্জু। না, ছুটতেও সে পারল না। তার তত ছোটার ক্ষমতা আর নেই। পা যে ছুটতে চায় না। পা যেমন ছুটতে চায় না, তেমনই বুকের ভেতরটাও কেমন যেন ধড়ফড় করে ওঠে। কেমন যেন একটু-একটু করে ভেঙে যাচ্ছে শরীরের জোরটা। তবে কি আলা-ইজাকে খুঁজে পাবে না সে! না কি খুঁজে পাওয়ার আগেই মৃত্যুদূতের আসার সময় হয়ে যাবে!

কান্নাটা শোনা যাচ্ছেই। সেই কচি গলার কান্না। তবে কি এই বনের ভেতরে কাছাকাছি কোথাও মানুষ বাস করে!

কষ্ট হলেও উজ্জু তার ভেঙে-পড়া দেহটা একরকম টানতে-টানতেই সেই কান্নার খোঁজ করতে লাগল।

বিদ্যুৎ চমকাল। ভীষণ শব্দে বন কাঁপিয়ে কোথায় যেন বাজ পড়ল। কচি গলার কান্নার শব্দটাও যেন আর্তনাদ করে উঠল।

আরও একটু জোরে পা ফেলার চেষ্টা করল উজ্জু। কষ্ট হোক। কষ্ট হচ্ছে বলে সে তো আর চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। এ যে একটি ছোট্ট শিশুর কান্না। হঠাৎ-হঠাৎ কেমন সব অবাক-অবাক কাণ্ড ঘটে যাচ্ছে দ্যাখো, উজ্জুর মৃত্যুর আগে: একটা সাজানো পর্ণকুটিরে যে বৃদ্ধা-মানুষটা তাকে আশ্রয় দিল, সেই কুটিরই বা গেল কোথায়? কোথায় গেল সেই দয়ালু বৃদ্ধা? একে তুমি অবাক কাণ্ড না বলে আর কী বলবে?

গাছে-গাছে ঢেকে আছে সামনেটা। আচমকা হোঁচট খায় উজ্জু। একটা গাছের গুঁড়িতে মাথাটা ঠুকে যায় উজ্জুর। সেই গুঁড়িটাকেই সে জড়িয়ে ধরল। বেঁচে গেল। ভাগ্যিস, মুখ থুবড়ে পড়ে যায়নি। সঙ্গে-সঙ্গে সে দেখতে পেয়েছে। দেখতে পেয়েছে যে কাঁদে, এই গভীর বনে পড়ে-পড়ে ! এ যে নেহাতই একটি কোলের শিশু। আগুপিছু আর কিছু ভাবল না সে। গাছের গুঁড়ি ছেড়ে টলতে-টলতে সে এবার এগিয়ে গেল সেই ছোট্ট শিশুটির দিকে। তাকে তুলে নিল মাটি থেকে, বুকে জড়িয়ে ধরল। তারপর চিৎকার করে উঠল, “এখানে কার কন্যা এটি? এ-বনে কার কন্যা ধুলো-কাদায় পড়ে-পড়ে কাঁদছে? কে আছ?”

কেউ সাড়া দিল না।

উজ্জুর বুকের আদরে মেয়েটির কান্নাও আর শোনা গেল না। সে যেন হঠাৎ তার আপনজনকে খুঁজে পেয়েছে! সে আপনজনের নাম মা নয়। বাবাও নয়। তার নাম উজ্জু।

আবার বিদ্যুৎ চমকাল। আবার মেঘ ডাকল। উজ্জুর বুকের মধ্যেই মেয়েটি আঁতকে উঠল। দু’ হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরল উজ্জুর বুকখানা। ভালমানুষের এই এক জ্বালা! সে যে সত্যিই ভাল, সবসময় কে যেন তাকে বিপদে ফেলে সেটাই যাচাই করে চলেছে। বলি, আর কী দরকার? আর অমন করে বারবার তাকে বিপদে ফেলে লাভটা কী হচ্ছে? তার স্বর্গে যাওয়ার রাস্তাটা তো পরিষ্কার হয়েই আছে। কেন আর কষ্ট দেওয়া! এখন একটু শান্তি দাও না তোমরা! বলে দাও না, কোথায় আছে সেই বনদেবী! না পারো তো খুঁজে দাও না সেই হরিণটি। যার নাম আলা-ইজা।

জানি, কারও কানে পৌঁছবে না এ-কথা। কেউ তার পাশে এসে দাঁড়াবে না। সবাই যেন বৃদ্ধটাকে নিয়ে একটু মজা করতে চায়! যে মরবেই, তাকে নিয়ে মজা করতে একটুও বাধে না! কী নির্দয় বলো তো সবাই। বৃদ্ধ উজ্জুকে যে-বৃদ্ধা একটু আশ্রয় দিল তার সবুজ পাতার ঘরে, খাবার আনছি বলে সেও যে কোথায় পালিয়ে গেল! যাক, তাতে কারও কিছু বলার নেই। কিন্তু কেমন করে কে যে উজ্জুর মাথার ওপরের চালাসমেত ঘরটাই নিশ্চিহ্ন করে দিল, কে জানে! মানুষটা সারারাত ভয়ঙ্কর বনের বিপদ মাথায় নিয়ে এই খোলামেলা একটা নোংরা ঝোপের ধারে পড়ে রইল। এ কী তামাশা! লোকটাকে যদি ছিঁড়ে খেত বনের হিংস্র পশু! এমন নিষ্ঠুর তামাশা করতে তোমাদের একটুও বাধল না?

আর-একবার চিৎকার করে উঠল উজ্জু, “কার মেয়ে হারিয়ে গেছে বনে?”

কেউ সাড়া দিল না।

উজ্জুর গলার স্বরটা ভারী ক্লান্ত শোনাচ্ছে! ও বেচারি আর চেঁচাতে পারছে না। তবু তাকে চেঁচাতেই হবে। তবু সে চেঁচাল। তারপর কোনওরকমে বনের এদিক-ওদিকের ঝোপ সরিয়ে আরও ক’পা গেল। ঠিক তক্ষুনি আবার বাজ পড়ল। চমকে উঠল উজ্জুর বুকের শিশুটি। কাঁদল না বটে, কিন্তু ছটফটিয়ে দু’ হাত দিয়ে উজ্জুর গলাটি জড়িয়ে ধরল। উজ্জুও এবার বাজের শব্দে ভয় পেল। তবে কি কাছেপিঠেই কোথাও বজ্রপাত হল!

“কে হে তুমি?” বাজের শব্দের মতোই তার গলার শব্দ।

সেই গলার শব্দে উজ্জু যে একটু থতমত খেয়ে যাবে, এতে আর আশ্চর্য কী! উজ্জু গলার শব্দ শুনে চোখ ফেরাতেই যে-ডাকল তাকে দেখতে পেল। উজ্জু কোনওদিনই দত্যি-দানব দেখেনি। রাক্ষস-খোক্কস, সে-ও তার দেখা নেই। ভূত-প্রেত, সে তো শুধু গল্পের বই-এ লেখা হয়। কিন্তু উজ্জুর এখন সামনে যে-দাঁড়িয়ে, সে ভূতও নয়, প্রেতও নয়। রাক্ষসও বলি না, খোক্কসও নয়। সে এক মস্ত লম্বা আর তেমনই চওড়া এক মূর্তি। তাকে দেখে উজ্জু যে শুধু থতমতই খেয়েছে, এই যথেষ্ট। ভিরমি খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়লেও কিছু বলার ছিল না। যা-ই বলো, উজ্জুর সাহস আছে। ভয় পাওয়া দূরে থাক, অত কষ্টেও তার মুখের সামনে বুক ফুলিয়ে দাঁড়াল উজ্জু। তারপর জিজ্ঞেস করল, “জানতে পারি কি, তুমি কে?”

“তোমার উত্তরটা আগে পেলে, আমার উত্তরটা পেতে তোমার দেরি হবে না।” সে তেমনই গর্জনের মতো গলা চড়িয়ে কথা বলল।

উজ্জু উত্তর দিল, “আমি উজ্জু।”

সেই ভয়ঙ্কর দেখতে লোকটা তখন বলল, “ও, তুমিই উজ্জু? তুমিই রাজার মেয়ে আলা-ইজাকে খুঁজতে বেরিয়েছ ?”

“হ্যাঁ” উত্তর দিল উজ্জু। তারপর জিজ্ঞেস করল, “কই, তুমি তো বললে না, তুমি কে?”

সে বলল, “তার আগে আর-একটা কথা তোমাকে জিজ্ঞেস করতে চাই। তোমার বুকের মধ্যে জড়িয়ে আছে ওই যে মেয়েটি, ওটি কে?”

উজ্জু বলল, “আমি কুড়িয়ে পেয়েছি, এই বনেই।” বলে সঙ্গে-সঙ্গে সে জিজ্ঞেস করল, “আমার উত্তরটা এবার নিশ্চয়ই পাব।”

“পাবে।” উত্তর দিল সেই মূর্তি।

“তবে দেরি কেন?” জিজ্ঞেস করল উজ্জু।

“শোনো উজ্জু, তোমার বুকের মধ্যে ওই যে শিশুটি লুকিয়ে আছে, ওকে আমার চাই। নইলে তুলকালাম কাণ্ড ঘটে যাবে।” যেন তার গর্জনে সারা বন কেঁপে উঠল।

“তুমি ভেবো না, তোমার ওই গর্জনে আমি ভয় পাব। তুমি কে, সেটা আগে আমার জানার কথা। তুমি সেই কথা না জানিয়ে আমাকে শাসাচ্ছ! আমাকে দেখে কি তোমার কোনওই দয়া হচ্ছে না?” জিজ্ঞেস করল উজ্জু।

“না। তোমার তো পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার সময় হয়ে এল। তোমাকে দয়া করে কী লাভ আমাদের!” উত্তর দিল সেই অচেনা মূর্তি।”

এবার উজ্জুর গলাও কর্কশ শব্দে ধমকে উঠল, “তবে তুমিও শুনে যাও নির্দয় মূর্তি, আমিও আমার বুকের আড়াল থেকে ছাড়ছি না এই শিশুকে। যখন তোমার জানাই আছে আমার বিদায়ের সময় এগিয়ে এসেছে, তখন তুমিও জেনে রাখো, পৃথিবীতে এখন এমন কেউ নেই যে মরণের ভয় দেখিয়ে আমাকে কাবু করতে পারে!” বলতে-বলতে উজ্জুর বুকের ভেতরটা থরথর করতে লাগল।

সেই মূর্তি তখন বলল, “তুমি কি জানো এই শিশু কার?”

“তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে তুমি জানো,” জবাব দিল উজ্জু। “যদি তোমার জানাই থাকে এ শিশু কার, তবে যার শিশু তাকে আমার কাছে ডেকে আনো। তাকেই আমি নিজের হাতে তুলে দেব এই শিশুকে।”

“সে কারও কাছে আসে না। সে কারও দয়া ভিক্ষা করে না।” আবার গর্জে উঠল লোকটা।

“তবে ফিরে পাবে না এই শিশু।” এবার উজ্জুর গলা আরও দৃঢ় হল।

“তুমি মরবে উজ্জু।” সে বলল।

উজ্জু হেসে উঠল। উত্তর দিল, “মরেই তো আছি।”

“শুনে রাখো উজ্জু, বনদেবী নিজে আমাকে পাঠিয়েছেন মেয়েটিকে তোমার কাছ থেকে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়ার জন্য। আমি বনদেবীর গুপ্তচর। মেয়েটি তাঁর আপন।” তার গর্জন যেন এবার ভাঙা স্বরে ঘং-ঘং করে উঠল।

উজ্জু মুহূর্তের জন্য হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর হেসে উঠল হঠাৎ। হেসে উঠল ঠিক যেন একটি ছোট্ট শিশুর মতো। সে যেন পেয়ে গেছে তার অনেক খেলার অনেক খেলনা মুঠো-মুঠো। সে যেন আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে লাফাতে চায়। পারে না। তার গলা-ভর্তি খুশির শব্দগুলো টলমল করতে-করতে যেন টাল খেয়ে আটকে যায় গলাতেই! শুধু চোখ দুটি তার ভিজে যায় অশ্রুফোঁটায়। তারপর বলে, “ওহে বনদেবীর গুপ্তচর, বনদেবীকে গিয়ে বলো, আমি যে তারই জন্য অপেক্ষা করছি। তারই জন্য তিনদিনের জীবন ভিক্ষা পেয়েছি মৃত্যুদূতের কাছে। এত তাড়াতাড়ি তার খোঁজ যে তুমি আমায় এনে দিলে, তার জন্য তোমাকে আমার উপহার দেওয়ার মতো যে কিছুই নেই। তাকে গিয়ে বলো, উজ্জু নামে একটা মানুষ তাঁর ছোট্ট মেয়েটিকে বুকে নিয়ে অপেক্ষা করছে বনের এই গভীরে। সেই মানুষটা বনদেবীর মেয়েকে বনদেবীর কোলে দিয়ে তাঁর কাছে একটি ভিক্ষা চাইবে। সেই ভিক্ষার নাম, আলা-ইজা।”

উজ্জুর কথা বোধ হয় শেষ হল না। প্রচণ্ড শব্দে চারদিক কেঁপে উঠল। মনে হল, সারা আকাশ থেকে যেন লক্ষ-লক্ষ আগুনের ফুলকি ছিটকে পড়ছে বনের আনাচে-কানাচে। প্রচণ্ড ঝড়ের হা-হা-কা-র করে উঠল সেই বনের গাছপালা। অঝোর ধারায় নেমে এল বৃষ্টি। আর দেখা গেল না বনদেবীর গুপ্তচরকে। সে যে কোথায় হারিয়ে গেল, বুঝতে পারে না উজ্জু।

এখন উজ্জু একা। এখন উজ্জুর বুকে জড়ানো একটি শিশু। এই শিশুটিকে সে এখন কেমন করে বাঁচাবে? এই ঝঞ্ঝার দাপট আর বৃষ্টির আঘাত থেকে এ-শিশুকে বাঁচাতেই হবে। কিন্তু কেমন করে? সে নিজেই তো এখন ঝড় আর বৃষ্টির আঘাতে বেদম হয়ে হাঁপাচ্ছে।

হাঁপাতে-হাঁপাতেই এই আধমরা মানুষটা ঝড়ের ধাক্কা সামাল দিয়ে ঝোপ ডিঙোয়। বৃষ্টির ঝাপটায় জেরবার হয়ে সে সামনে যে কী আছে আন্দাজ করতে পারে না। তার পোশাকের হালত দেখলে তোমারই মনে হবে, হায় রে, নিজের একটা পোশাক যদি দেওয়া যেত মানুষটাকে! জলে আর কাদায় মানুষটাকে আর উজ্জু বলে চেনাই যায় না। না-ই চেনা যাক। ঝড় তাকে যত পারে আঘাত করুক। বৃষ্টি তাকে ধুয়েমুছে ফেলুক, তবু সে কিছুতেই আঘাত করতে দেবে না শিশুটিকে। নিজের সমস্ত বুকখানা আড়াল করে সে তাকে রক্ষা করার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। কিন্তু তবুও কি পারা যায়? পারা সম্ভবও নয়। এই ঝড় আর বৃষ্টির তাণ্ডব যে কী ভয়ঙ্কর, তা সেই তাণ্ডব যে কখনও চোখে দেখেনি, সে কেমন করে বুঝবে! এই তাণ্ডবের ধাক্কায় উজ্জু কখনও হোঁচট খায়। কখনও কাদায় পিছলে পড়ে। কখনও মেয়েটিকে একহাতে বুকে জড়িয়ে, আর-একহাতে মাটি খামচে গাছের নীচে বসে পড়ে। বসে-বসে অমন করে কেন দম ফেলে উজ্জু! বুকের ভেতরটা কেন বারবার ধড়ফড় করে ওঠে তার! তবে কি মৃত্যুদূতের আসার সময় হয়ে গেছে? এ কী তবে মৃত্যুদূতেরই কারসাজি!

“ওহে উজ্জু, তোমার ওই বুকের শিশুটিকে তোমার বুকের আড়াল থেকে সরিয়ে আমাকে ফিরিয়ে দাও। নইলে আমি থামছি না।” কার গলা যেন গাছের গায়ে ধাক্কা দিয়ে ফিরে এল উজ্জুর কানে।

উজ্জু ফিরে তাকাল। আকাশভাঙা বৃষ্টির দুর্যোগে আবছা হয়ে আছে চারদিক। সে কিছুই দেখতে পায় না। কাউকেও না। তবুও উজ্জু বুকটাকে শক্ত করে চেঁচিয়ে উঠল, “কে তুমি? কে আমাকে ভয় দেখাও! জানো না, আমি ভয়কে গ্রাহ্য করি না!”

সে বলল, “আমার নাম ঝঞ্ঝা। পৃথিবী আমার নামে কাঁপে! আমার আঘাতে আমি চুরমার করে ফেলি পাহাড়। আঘাতে-আঘাতে আমি উত্তাল করি সমুদ্র। সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাসে ভাসিয়ে দিতে পারি শহর, নগর। ভেঙে তছনছ করে দিতে পারি মানুষের অহঙ্কারের তৈরি প্রাসাদগুলো। তুমি এত দম্ভ দেখাও কোন সাহসে? তুমি তো একটা নেহাতই বৃদ্ধ থুত্থুড়ো।”

“ওহে ঝঞ্ঝা, তুমি ঠিকই বলেছ, আমি একটা নেহাতই বৃদ্ধ মানুষ। তোমার যদি এতই শক্তি, তবে দাও না তুমি আমাকে পাহাড়ের মতো টুকরো করে! সমুদ্রের জলোচ্ছাসে আমাকে ভাসিয়ে, ভেঙে তছনছ করে ছুড়ে ফেলে দাও! তবু শুনে রাখো, এই শিশুকে আমার বুক থেকে কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবে না। তুমি যদি পারো তো নিয়ে চলো আমাকে বনদেবীর কাছে। এ-শিশু যদি সত্যিই বনদেবীর হয়, তবে কথা দিচ্ছি আমি, তারই হাতে ফিরিয়ে দেব এই শিশুকে। কিন্তু এক শর্তে। তাকেও ফিরিয়ে দিতে হবে রাজার মেয়ে আলা-ইজাকে। আমি জানি, বনদেবী তাকে মায়াবলে হরিণ করে রেখেছে।”

ঝঞ্ঝা দুরন্ত শক্তিতে বইতে-বইতে বলল, “তবে তাই হোক, তোমাকে আমি নিশ্চিহ্ন করে ফেলব। তোমার দেমাককে আমি ঘুচিয়ে দেব চিরকালের মতো!” বলে শনশন আওয়াজ তুলল ঝঞ্ঝা।

উজ্জু ঝঞ্ঝার শক্তির সঙ্গে লড়াই করার জন্য গাছের আড়ালে-আড়ালে লুকিয়ে পড়ে। ঝঞ্ঝার আঘাতে গাছ ভেঙে যায়। ঝোপের ঘুপচি কোণে গা ঢাকা দেয় উজ্জু। ঝঞ্ঝার দাপটে ঝোপ উড়ে যায়। ছুটতে যায় উজ্জু, পালাতে যায়। ঝঞ্ঝার আঘাতে ছিটকে পড়ে বনের এক ভয়ঙ্কর গর্তে বুকের শিশুটিকে বুকে নিয়েই। তারপর আর কিছু জানে না। সে বোধ হয় জ্ঞান হারাল।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%