দ্বাদশ অধ্যায়

শৈলেন ঘোষ

এমনই করে বোধ হয় আরও একটা দিন কেটে গেল। বোধ হয় আজকের দিনটাই শেষ দিন। কেননা, আজ যেন তার সব শক্তিই শেষ হয়ে এসেছে। গহ্বরের অন্ধকারে পড়ে আছে একটা পাথরের টুকরোর মতো ছিটকে-ছড়িয়ে। মনে হয়, কষ্ট হচ্ছে শ্বাস নিতে। কথাই-বা বলবে কার সঙ্গে! কাকেই-বা বলবে, ‘একটু জল দেবে আমাকে?’

এখন মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া উজ্জুর আর কোনও কিছুই করার নেই। তার সব আশাই মিথ্যে হয়ে গেল। সে পারল না তার ছোট্ট বন্ধু আলা-ইজাকে উদ্ধার করতে। যে-কথা দিয়ে সে রাজার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এই বনে আলা-ইজাকে খুঁজতে এসেছিল, সেও বুঝি ব্যর্থ হয়ে গেল। কে জানে আর কত দেরি মৃত্যুদূতের আসার । এখন মনে হয়, মৃত্যুদূত যত তাড়াতাড়ি আসে ততই ভাল। এই তিনটে দিন যেন মনে হচ্ছে কত লম্বা, কত দূরের পথ। শেষ হতে চায় না। সব মানুষেরই বোধ হয় এমন হয়। যখন বিফল হয়ে যায় তার সব স্বপ্ন, তার চেষ্টা, তখনই যেন বয়সও তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে। তখন যেতে পারলেই বাঁচে সে। কিন্তু কপালে যদি আরও দুর্ভোগ থাকে, তবে উজ্জু মরতে চাইলেই কি মরতে পারবে? সুতরাং এখন, একা এই অন্ধকারে মৃত্যুদূতের পথ চেয়ে তাকে পড়ে-পড়ে সময় গুনতে হবে।

আচ্ছা, মনে হচ্ছে কি, যেন কারও পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে! মনে হচ্ছে কি, অনেকদূর থেকে অন্ধকার টপকে আবছা-আবছা আলো ভেসে আসছে! এইদিকেই! গহ্বরের অন্ধকার গর্তের এবড়ো-খেবড়ো পথ বেয়ে!

ছটফট করে উঠল উজ্জুর চোখ দুটি। চমকে উঠল তার সারা শরীর। তবে কি মৃত্যুদূত এসে গেল! তবে কি এবার সে একটু উঠে বসবে?

কষ্ট হল তার। তবু উঠে বসল উজ্জু।

আলোর দীপ্তি বাড়ছে।

তুমি কি এবার দেখতে পাচ্ছ উজ্জুর মুখখানা?

এখনও পাচ্ছ না? তবে আর কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করো!

এবার? আলোর রেখা ওই তো এবার সরাসরি উজ্জুর মুখেই এসে পড়েছে ! আহা রে, দ্যাখো, দ্যাখো এই ক’দিনে লোকটার মুখের চেহারা কী হয়েছে? উসকো-খুসকো মাথার চুল। কোটরে ঢুকে গেছে চোখ। চোয়াল ভেঙে বসে গেছে গালের ভেতর। মুখখানা শুকনো এইটুকু।

“উজ্জু!”

কে ডাকল?

চমকে উঠল উজ্জু। ফিরে তাকাতেই তার চোখে যেন সব এলোমেলো হয়ে গেল। সারা গহ্বরটা নিমেষের মধ্যে আলোয়-আলো হয়ে গেছে। এবার জোনাকি নয়। এ যেন সবুজ আলোর ঝলমল-আভা ছড়িয়ে কোনও এক সবুজ সুন্দরী তার সামনে এসে দাঁড়াল। তার পরনে রেশমি সবুজ পোশাক। তার সারা অঙ্গে সবুজ ফুলের গয়না। তার চোখের তারায় আর চলার ছন্দে আলোর রোশনি দোলা দেয়। নিকষ কালো অন্ধকার-ঢাকা গহ্বরটা এখন আলোয় উছলে উঠেছে।

“উজ্জু!” সেই সবুজ সুন্দরীর গলার শব্দে যেন অনেক জলতরঙ্গ একসঙ্গে বেজে উঠল।

উজ্জু ক্লান্ত চোখে তার দিকে তাকাতেই চোখ ঝলসে গেল।

“উজ্জু!” সে আবার ডাকল। তারপর বলল, “তুমি যাকে খুঁজছ আমিই সেই। আমি বনদেবী।”

“বনদেবী!” অস্ফুট স্বরে উজ্জুর মুখ থেকে যেন অনেক বিস্ময় জড়িয়ে কথাটা বেরিয়ে এল, “তুমিই বনদেবী?”

“হ্যাঁ।”

“তুমিই আমার ছোট্ট বন্ধু আলা-ইজাকে হরিণ করে রেখেছ?”

“হ্যাঁ উজ্জু, আমিই।”

“তোমার এত রূপ! তোমার এত আলো! তোমার মুখের শব্দে এত ঝরনা ঝরানো ভালবাসার সুর, তুমি এমন কাজ করতে পারো, এ যে আমি বিশ্বাস করতে পারি না বনদেবী! যে এমন ভালবেসে ডাক দেয় আমার নাম ধরে, সে কেমন করে নিষ্ঠুর হয়!” একেবারে হতবাক হয়ে গেল যেন উজ্জু।

“উজ্জু,” বনদেবী উত্তর দিল, “তোমার রাজার চেয়েও কি আমি নিষ্ঠুর? তোমার রাজার চেয়েও কি আমি নির্দয়? উজ্জু, কোনও রাজা যদি নিজের সন্তানের প্রাণ বাঁচানোর জন্য আমার সন্তানের প্রাণ নেয়, তবে আমি কেমন করে তা সহ্য করতে পারি, তুমি তা বলতে পারো? কী দোষ করেছে আমার হরিণের দল? কী দোষ করেছে আমার গাছগাছালি? কী দোষ করেছে আমার গাছের পাখপাখালি? জীবজন্তু? তারা তো কোনওদিন ভাল ছাড়া মন্দ করে না মানুষের? কেন তাদের কপালে কুড়ুলের কোপ পড়ে? কেন তাদের হত্যা করা হয়? কেন তাদের শিকার করে মানুষ তার শক্তির দম্ভ দেখায়? আমি যদি তার প্রতিশোধ নিই, তবে অন্যায়টা আমার কোথায়? আঘাত আর কতদিন সহ্য করতে পারি আমি? তোমার রাজা কি জানে না, তোমার রাজার প্রজারাও কি জানে না, আঘাত করলে, একদিন সেই আঘাত তাদেরই দিকে ফিরে যায়?”

এবার উজ্জু কথা বলল, “কিন্তু বনদেবী, রাজা দোষ করেছে বলে, তুমি রাজার ছোট্ট মেয়েটিকে অমন করে অভিশাপ দিয়ে হরিণ করে দিলে কেন? এ তোমার কেমন বিচার! বনদেবী, সে তো তোমারই হরিণ-শিশুটিকে ভালবেসেছিল। সে তো তোমারই হরিণ-শিশুটিকে তোমারই কোলে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য সকলের দৃষ্টিকে ফাঁকি দিয়ে এই বনে এসেছিল। কিন্তু তুমি কেন তাকে শাস্তি দিলে? তুমি কেন ভাবলে, রাজা একদিন হরিণরূপী তার মেয়েটিকে ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করলে তোমার প্রতিশোধ নেওয়া সফল হবে?”

“উজ্জু,” উত্তর দিল বনদেবী, “বোধ হয় আমি ঠিক করিনি। উজ্জু, এ-কাজটা বোধ হয় একটি শান্ত, নিরীহ আর দয়ালু রাজকন্যার প্রতি আমার চরম অবিচার হয়ে গেছে। এ আমার ভুল, অত্যন্ত ভুল! আমার দুঃখের শেষ নেই রাজকন্যা আলা-ইজার জন্য।”

“বনদেবী, যে-অভিশাপ দিয়ে তুমি একটি নিরীহ মেয়েকে হরিণ করেছ, সেই অভিশাপ তুমি ফিরিয়ে নাও! তুমি আবার তাকে মানুষ করে দাও! আমার মৃত্যুর আগে এই আমার শেষ অনুরোধ তোমার কাছে।” ভারী আকুল হয়ে বলল উজ্জু।

বনদেবী কোনও কথা বলতে পারল না কিছুক্ষণ। একেবারে নির্বাক হয়ে রইল।।

বনদেবীকে অমন করে চুপ থাকতে দেখে উজ্জুই আবার বলল, “আমার অনুরোধটা কি তোমার পছন্দ হল না বনদেবী?”

“হায়! হায়! হায় রে! উজ্জু, আমি অভিশাপ দিতে পারি, কিন্তু ফিরিয়ে নিতে জানি না যে!” কেমন যেন এক আহত পাখির মতো চিৎকার করে উঠল বনদেবী।

কেঁপে উঠল উজ্জুর বুক। সেও আর্তনাদ করে উঠল, “এ কী বলছ তুমি বনদেবী?”

“হ্যাঁ উজ্জু, আমি ঠিকই বলছি। মানুষকে হরিণ করার অভিশাপ দেওয়ার ক্ষমতা আমার আছে, কিন্তু হরিণকে মানুষ কেমন করে করতে হয়, তা তো আমার জানা নেই?” উত্তর দিল বনদেবী অপরাধীর মতো।

একটি মানুষকে হয়তো আর কিছুক্ষণ পরে মৃত্যুদূত হাত বাড়িয়ে ডাক দেবে। সুতরাং বলতে পারো সে প্রায় আধমরা হয়েই সময় গুনছে। কিন্তু সেই আধমরা মানুষটাই বনদেবীর উত্তর শুনে এমন যে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠবে, এ ভাবা যায় না! দুর্বল শরীরে কত জোরে সে আর চেঁচাতে পারে! কিন্তু শুনলে অবাক হয়ে যাবে, সে হঠাৎ গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে উঠল। বনদেবীকে ধিক্কার দিয়ে বলে উঠল, “ধিক, ধিক তোমাকে। তুমি দেবী নও, তুমি রাক্ষুসী। তুমি এক্ষুনি চলে যাও আমার সামনে থেকে। আমার মরবার আগে তোমার অশুভ মুখ আমায় আর না দেখতে হয়! যাও, যাও! এক্ষুনি তুমি বিদায় হও। ওই ফুলের মতো একটি মেয়ে আলা-ইজার জন্য আমাকে এই গহ্বরের অন্ধকারে একা-একা একটু কাঁদতে দাও! আমার আর কিছু চাইবার নেই তোমার কাছে।” বলতে-বলতে উজ্জু বোধ হয় কেঁদেই ফেলল। কেননা, দেখা গেল তার অশ্রুফোঁটাগুলি বনদেবীর আলোর আভায় তার গালের ওপর মুক্তোর মতো ঝলসে উঠেছে।

সঙ্গে-সঙ্গে গহ্বরে আবার অন্ধকার নেমে এল। চোখের পলকে বনদেবী সেখান থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল। মিলিয়ে গেল তার আলোর ঝলকানি। সেখানে একা পড়ে রইল উজ্জু। একা পড়ে-পড়ে আলা-ইজার জন্য অন্ধকারে চোখের জল ফেলতে লাগল। তারপর যখন তার চোখের সব জলই নিঃশেষ হয়ে গেল, তখন যেন কেমন আচ্ছন্ন হয়ে তার চোখের পাতা মুদে এল। আর বুঝি সে পারছে না। মৃত্যুদূতের আসার সময় এখনও কি হয়নি? এখনও কি তিনদিন সময় কাটেনি? আর কষ্ট না দিলেই কি নয়। মানুষটার বয়েস দেখেও কি তোমাদের দয়া হয় না? এতদিনেও কি তিনদিন শেষ হল না?

অন্ধকার। শুধুই অন্ধকার। অন্ধকারে ডুবে আছে উজ্জু। তার নিশ্বাসের শব্দ ছাড়া আর কোনও শব্দ কানে আসছে না। একটুকরো আলোও আর দেখা যাচ্ছে না কোথাও, কোনওখানে। এমনকী একটি জোনাকিও আর শূন্যে আলোর লুকোচুরি খেলতে-খেলতে ভেসে বেড়াচ্ছে না এই গহ্বরের ভেতরে। তারাও কি তবে জানতে পেরেছে বৃদ্ধ মানুষটার সময় হয়ে এসেছে! হয়তো তাই।

“উজ্জু!”

কে ডাকল! অন্ধকারটা তার গলার শব্দে অমন থিরথির করে চমকে উঠল কেন?

“উজ্জু!”

আবার সে ডাকল। বোধ হয় সে এগিয়ে এল উজ্জুর আরও কাছাকাছি। অন্ধকারে উজ্জুর চোখের দৃষ্টি যেন তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে আঁকপাক করে।

“উজ্জু, আমি এসেছি। আমি মৃত্যুদূত। এবার তোমায় যেতে হবে।”

গহ্বরের অন্ধকারে প্রতিধ্বনি উঠল, যেতে হবে…যেতে হবে…হবে…হবে..।

উজ্জু এবার কথা কইল। ক্ষীণ স্বরে জিজ্ঞেস করল, “মৃত্যুদূত, তুমি এসেছ? তিনদিন কাটতে তোমার এতদিন লেগে গেল?”

মৃত্যুদূত জবাব দিল, “না উজ্জু, তিনদিন কাটতে ঠিক দিনই লেগেছে। মানুষ যখন কষ্টে পড়ে, তখন তার কষ্টের দিনগুলো মনে হয় অনেক বড়, কাটতেই চায় না। এসো, এবার আমার হাত ধরো। তোমার আর কষ্ট থাকবে না।”

উজ্জু তেমনই ক্ষীণ স্বরে বলল, “এই অন্ধকারে তোমার হাত তো আমি দেখতে পাচ্ছি না। ধরব কেমন করে?”

মৃত্যুদূত উত্তর দিল, “এই যে, আমি তোমার হাতে হাত রাখছি।”

মৃত্যুদূত উজ্জুর হাতে হাত রাখতেই, উজ্জুর ক্লান্তি যেন নিমেষে কোথায় দূর হয়ে গেল। মৃত্যুদূতের হাত ধরে উজ্জু নিজেই উঠে দাঁড়াল। এখন কত সহজেই একটি-একটি পা ফেলল উজ্জু। এগিয়ে চলল, অন্ধকার গহ্বর থেকে আলোর দিকে।

কয়েক পা এগিয়েই হঠাৎ আবার মৃত্যুদূতই ডাক দিল, “উজ্জু!”

“কেন?”

“স্বর্গে যাওয়ার আগে পৃথিবীর কাছে তোমার কি কিছুই চাইবার নেই?” জিজ্ঞেস করল মৃত্যুদূত।

“না।” গলা ঝাঁঝিয়ে উত্তর দিল উজ্জু। বলল, “পৃথিবী বড় নির্দয়।”

“নির্দয় কেন বলছ?” জিজ্ঞেস করল মৃত্যুদূত। “তার দয়াতেই তো তুমি এতদিন বাতাসের শ্বাস বুকে নিয়ে বেঁচে ছিলে?”

“আবার তারই আক্রোশে এই গহ্বরে আমায় বন্দি করা হয়েছে। কেন, আমি তো কোনও দোষ করিনি!” উত্তর দিল উজ্জু। “না, আমি পৃথিবীর কাছে কোনও কিছুই চাইব না। তুমি যদি সাহস দাও, তোমার কাছে আমি একটি ছোট্ট ভিক্ষা চাইতে পারি।”

“তোমার প্রাণ?” জিজ্ঞেস করল মৃত্যুদূত।

“না মৃত্যুদূত, প্রাণ নয়। তোমার সঙ্গে স্বর্গে যাওয়ার আগে আমি একটিবার বনদেবীর অভিশাপে হরিণ হয়ে আছে আমার যে ছোট্ট বন্ধু, সেই আলা-ইজাকে একবার দেখতে চাই। এই ভিক্ষা কি তুমি দিতে পারো না?”

“পারি। এসো আমার সঙ্গে।”

মৃত্যুদূতের হাত ধরে উজ্জু যখন গহ্বর থেকে বেরিয়ে এল, তখনও একটি-দুটি তারা আকাশে ফুটে ছিল। আর খানিক পরেই ভোর হবে। সূর্য উঠবে। কিন্তু তবুও এই শেষরাতের আবছা আলোয় উজ্জু মৃত্যুদূতের মুখখানা দেখতে পেল না। শুধু তার হাতের স্পর্শটাই বারবার উজ্জুর হাত জড়িয়ে ধরছিল।

আঃ! এখন ভারী ভাল লাগছে উজ্জুর। গহ্বরের বাইরে এই খোলা আকাশের নীচে মৃদু-মৃদু বাতাস গায়ে লাগছে। শিশিরভেজা ঝরাপাতা পায়ে লাগছে। মনে হচ্ছে, যেন অনেক দুঃখের পর সুখের দিন ফিরে আসছে।

হঠাৎ অদৃশ্য সেই মৃত্যুদূত জিজ্ঞেস করল, “এখন এই খোলা আকাশের বাতাস তোমার কেমন লাগছে?”

“খুব ভাল।” উত্তর দিল উজ্জু।

“এই শিশিরের আলতো ছোঁয়া তোমার কেমন লাগছে?”

“আরও ভাল।”

“বাতাসে সোঁদা মাটির গন্ধ পাচ্ছ?”

“পাচ্ছি।”

“কেমন লাগছে?”

“ভারী মিষ্টি।”

“বুনো ফুলের গন্ধ নাকে আসছে না?”

“হ্যাঁ, আসছে।”

“মনে হয়, তাও ভাল?”

“ভাল, ভাল, সত্যি ভাল।”

“আকাশ দেখতে পাচ্ছ উজ্জু?”

“হ্যাঁ, দেখতে পাচ্ছি। ভোর হয়ে আসছে। ওই দ্যাখো শুকতারা। শোনো মৃত্যুদূত, পাখিরা কাকলি শুরু করে দিয়েছে! আকাশ রঙিন হয়ে উঠছে। আঃ! কী সুন্দর! চারদিক রঙিন আলোয় উপচে উঠছে। মৃত্যুদূত, ওই দ্যাখো ঝাঁক-ঝাঁক মৌমাছি। কেমন গুন্‌গুন করে উড়ে চলেছে। আঙুরলতায় কত আঙুর! আনারদানায় গাছ কেমন ভরে আছে।”

“উজ্জু, তা হলে বোধ হয় তোমার রাগটা ঠিক নয়!” মৃত্যুদূত যেন ঠাট্টার ছলে জিজ্ঞেস করল উজ্জুকে।

“কিসের রাগের কথা তুমি বলছ মৃত্যুদূত?” জিজ্ঞেস করল উজ্জু।

“তুমি যে তখন রাগ করে বললে, পৃথিবী বড় নির্দয়।” উত্তর দিল মৃত্যুদূত। তারপর বলল, “শুনে রাখো উজ্জু, পৃথিবী নির্দয় নয়। কখনওই নয়। পৃথিবীর সব সন্তানের সেরা সন্তান হল মানুষ। পৃথিবী তার সমস্ত সম্পদ উজাড় করে তুলে দিয়েছে মানুষের হাতে। কিন্তু সেই মানুষই এখন নির্দয়ের মতো আঘাত করে পৃথিবীকে ধ্বংস করে ফেলতে চায়। পৃথিবীর ভারী আদরের মেয়ে বনদেবী। তার সংসার সবুজ বন। সেই বনের যত পশু, যত পাখি, যত গাছ, যত ফুল, সব তার সন্তান। সেই বনদেবীর সন্তানকে আঘাত করা মানেই তো পৃথিবীকে কষ্ট দেওয়া! শোনো উজ্জু, নির্দয় পৃথিবী নয়, নির্দয় মানুষ।”

মৃত্যুদূতের কথা শুনতে-শুনতে কেমন যেন আনমনা হয়ে গিয়েছিল উজ্জু মুহূর্তের জন্য। সে খেয়ালই করেনি তার পেছনে ছুটে এসেছে তখন অগুন্‌তি হরিণের দল। তারা ছুটছে, খেলছে, নাচছে। তাদের চোখ-ভর্তি খুশির চাউনি। গা-ভর্তি রঙিন নকশা। মাথায় সাজানো আঁকাবাঁকা শিং।

“ওই দ্যাখো উজ্জু।” মৃত্যুদূতই বলল, “ওই দ্যাখো, তোমার পেছনে কারা!”

“হরিণ!” আনন্দে চিৎকার করে উঠল উজ্জু, “আমার আলা-ইজা কই?”

“ওই দ্যাখো, গাছের ফাঁকে-ফাঁকে সে আসছে।”

“ওই-ই আমার আলা-ইজা? ওর সঙ্গে কে?” জিজ্ঞেস করল উজ্জু।

“বনদেবী।”

“একটু আগে তাকে তো আমি দেখেছি সবুজ পোশাকে।”

“হ্যাঁ, ঠিকই দেখেছ। তারও আগে তুমি বনদেবীকে দেখেছ, এক বৃদ্ধার বেশে। মনে আছে পর্ণকুটিরে এক রাতে, এক বৃদ্ধা তোমায় আশ্রয় দিয়েছিল? সে এই বনদেবী। তখন ছিল তার কাঠকুড়ানি বৃদ্ধার ছদ্মবেশ। এখন সে বনদেবী। দ্যাখো উজ্জু, তোমার আলা-ইজাকে সে কেমন আদর করে তোমার কাছে নিয়ে আসছে!”

আচমকা আনন্দে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল উজ্জু, “আ-লা-ই-জা! আ-লা-ই-জা!”

সঙ্গে-সঙ্গে একটি হরিণ-শিশু খুশিতে উদ্বেল হয়ে বনদেবীর মুখের দিকে তাকাল। যেমন মায়ের মুখের দিকে খুশি হয়ে তাকায় একটি শিশু। বনদেবী হাসল। আলা-ইজার গালের ওপর নিজের হাত রেখে আদর করল। তারপর দেখা গেল, সেই হরিণ-শিশু দুরন্ত পায়ে লাফ দিল। তীরবেগে সে ছুট দিল। ছুটে এল উজ্জুর সামনে।

উজ্জু তার দু’ হাত বাড়িয়ে বসে পড়ল মাটিতে। জড়িয়ে ধরল তার গলাটি। হরিণ-শিশু কখনও লাফায়। কখনও নাচে। কখনও লুটিয়ে পড়ে উজ্জুর কোলে। কিন্তু কথা বলতে পারে না।

উজ্জুর দু’ চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। হরিণও যেমন কথা বলতে পারে না, উজ্জুও পারে না তেমনই। শুধু অস্ফুটস্বরে উজ্জু ডাকে, “আলা-ইজা আমার, আলা-ইজা, আমি তোর উজ্জু। আমার বুকখানি জড়িয়ে তুই যেমন আমায় আদর করতিস, তেমন করে একবার আদর কর! যেমন করে গান গাইতিস, তেমন করে একটি গান শোনা!”

মৃত্যুদূত উজ্জুর হাত ধরে টান দিল। কানে-কানে বলল, “তোমার যাওয়ার সময় হয়েছে উজ্জু!”

“ওগো মৃত্যুদূত, আর-একটু সময় দাও আমায়! আমার ছোট্ট বন্ধুর কপালে আমায় শেষবারের মতো একটি চুমো খেতে দাও!”

মৃত্যুদূত বলল, “তোমার শেষ ইচ্ছাটিতেও আমি সায় দিলাম উজ্জু। আর দেরি নয়।”

উজ্জু এবার তার বুকের সমস্ত স্নেহ উজাড় করে জড়িয়ে ধরল আলা-ইজাকে। তার কপালে শেষবারের মতো একটি চুমো দিল। তারপর?

সঙ্গে-সঙ্গে ভোরের আকাশ আলোয় উছলে উঠল। সমস্ত গাছের পাতায় নূপুর বেজে উঠল। অসংখ্য পাখির গানে ভরে গেল বন। অগুন্‌তি হরিণের দল নেচে উঠল আনন্দে। দেখা গেল সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটি ছোট্ট মেয়ে, একা। এতক্ষণ সে ছিল একটি হরিণ-শিশু। উজ্জুর স্নেহের চুমোটি তার কপাল স্পর্শ করার সঙ্গে-সঙ্গে সে আবার একটি ছোট্ট মেয়ে হয়ে গেল। সে এক রাজার মেয়ে। তার নাম আলা-ইজা।

নিজেকে বিশ্বাস করতে পারে না আলা-ইজা। সে কি তবে সত্যিই এখন মানুষ! সে চিৎকার করে ওঠে। চিৎকার করে ডাক দেয়, “উজ্জু-উ-উ! বনদেবী—”

কেউ সাড়া দিল না। অবাক কাণ্ড!

তাদের বারবার ডাক দিল আলা-ইজা। বারবার হাঁক দিল, “উজ্জু-উ-উ! বনদেবী!” কেউ নেই। সাড়া নেই কারও। এখন সে একা। ভীষণ একা। একলাটি দাঁড়িয়ে আছে এই বনের কিনারে।

কেঁদে ফেলল আল-ইজা। দু’ হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে ফেলল। তবু কান্না তার থামল না। তার ছোট্ট হাতের ছোট্ট আঙুলের ফাঁক দিয়ে আলা-ইজার কান্নার শব্দগুলি জল হয়ে গড়িয়ে পড়ল। টুপটাপ। মাটিতে। এখন এখানে একা সে কী করবে! এখানে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়েই কি কাঁদবে শুধু!

না, তার কান্না শুনে ছুটে এল বনের অসংখ্য হরিণ। আদরে-স্নেহে তার মনটি ভরিয়ে তুলল। তুলবেই তো! তারই জন্য না একটি হরিণ-শিশুর প্রাণ বেঁচেছে! অনেক বিপদ তুচ্ছ করে, আলা-ইজা যদি তার সেই ছোট্ট বন্ধু হরিণটিকে তার মায়ের কাছে পৌঁছে না দিত, তবে কবেই তো শেষ হয়ে যেত তার প্রাণ। ওই দ্যাখো, সেই ছোট্ট হরিণের মা কেমন এগিয়ে এল আলা-ইজার কাছে। উবু হয়ে বসে পড়ল আলা-ইজার পাশে। যেন বলতে চাইল, “আলা-ইজা, তুমি আমার পিঠে বসে পড়ো। তোমার মায়ের কাছে আমি তোমায় পৌঁছে দিয়ে আসি।”

কী বুঝল আলা-ইজা, কে জানে! সত্যি-সত্যিই সে হরিণ-মায়ের পিঠের ওপর বসল। হরিণ-মা আলা-ইজাকে পিঠে নিয়ে পাড়ি দিল সেই রাজ্যে, যেখানে তার মা আছেন, যিনি এক রানি। যেখানে তার বাবা আছেন, যিনি এক রাজা। আর আছে রাজপ্রাসাদ। রাজসিংহাসন। অনেক ধনদৌলত। আর আছে অনেক মানুষ।

সমস্ত বন উজাড় করে হরিণের দল আলা-ইজার সঙ্গী হল। তারা পৌঁছে গেল রাজপ্রাসাদে। ছুটে এলেন রাজা। ছুটে এলেন রানি। ছুটে এল মানুষ আর মানুষ। গোনা যায় না। রানি হরিণ-মায়ের পিঠ থেকে আলা-ইজাকে তুলে নিলেন নিজের কোলে। আলা-ইজা তারপর মায়ের গলা জড়িয়ে কেঁদে ফেলল। মা-ও কাঁদলেন মেয়েকে ফিরে পেয়ে। কাঁদল হয়তো হরিণের দলও। কেননা, তারাও স্থির হয়ে গেল মা আর মেয়ের কান্না দেখে।

সেইদিন থেকে রাজার হুকুমে কেউ আর হরিণের প্রাণ নেয় না। সে-দেশের মানুষ গান গায়, হরিণের জন্য ভালবাসার গান। আলা-ইজা হরিণের সঙ্গে খেলা করে, যখন খুশি, তখন। আর যখন রাতের বেলা মায়ের কোলের কাছে শুয়ে-শুয়ে ঘুমপাড়ানি গান শোনে, তখন উজ্জুর জন্য মনটা তার কেমন যেন কেঁদে ওঠে। আলা-ইজা আজও জানে না, উজ্জু আর ফিরবে না। সে চলে গেছে অনেক দূরে। আর-এক দেশে। সে-দেশের নাম স্বর্গ।

অধ্যায় ১২ / ১২
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%