ষষ্ঠ অধ্যায়

শৈলেন ঘোষ

আশ্চর্য, ফটকটা অমন খোলা পেয়েও উজ্জু পালাল না! আবার ঢুকে পড়ল কয়েদের ভেতরে। আবার সে বসে পড়ল নোংরা ধুলো-ভর্তি কয়েদের মেঝের ওপর। তবে কি উজ্জু মরতেই চায়! এমন বোকা মানুষ কেউ দেখেছে কোথাও, কখনও। বাঁচবার এমন মস্ত সুযোগ হাতছাড়া কেউ করে?

না, পালাবে না উজ্জু। সে তো চোর নয়! সে তো কোনও অন্যায় করেনি। এই কয়েদের খোলা ফটকের দিকে জুলজুল করে তাকিয়ে সে চুপচাপ বসে রইল। হাসি পেল তার। মনে-মনে ভাবল, কী বেকুব রাজামশাইয়ের লোকগুলো। আসামিকে কয়েদখানায় ভরল, অথচ ফটকে যে তালা পড়ল না সেটা তাদের খেয়ালই হল না! থাক, ফটকটা খোলাই থাক। অমনই হাট করে খোলা থাক! উজ্জু তো পালাবার জন্য জন্মায়নি। রাজামশাইকে সে কোনওদিন ফাঁকি দেয়নি, আজও দেবে না। মরবার তো বয়েস তার হয়েই গেছে। এই বয়েসে সে কোন ভাল কাজে লাগবে মানুষের? বরং সে মরলে পৃথিবীতে আর-একজন নতুন মানুষের জায়গা হবে। তার কাজ তো শেষ হয়েই গেছে। তবে পৃথিবীর ভার বাড়ানো কেন?

কে বলেছে উজ্জু ভার বাড়িয়েছে! কে বলেছে উজ্জুর কাজ শেষ হয়ে গেছে! শেষ হয়নি উজ্জুর কাজ। এখনও শেষ হয়নি উজ্জুর মতো মানুষের দিন। চারটে হাত-পা থাকলেই তো আর মানুষ হয় না। কিংবা যদি থাকে ঘাড়ের ওপর একটা মস্ত মাথা, তবে, তাকেও কি মানুষ বলব! বুকে হাত দিয়ে দ্যাখো! বুঝতে পারছ, ওটাই আমাদের প্রাণকে বাঁচিয়ে রেখে দিনরাত ধুকপুক করে আমাদেরই অজান্তে কেমন দুলে চলেছে! বুকের এই দোলন যেদিন থেমে যাবে, সেদিন আমাদেরও কাজের শেষ হবে। কিন্তু বুকের ওই প্রাণের মধ্যে যদি মায়া-মমতা আর ভালবাসা ভরিয়ে দিতে পারি, তবে কে বলবে আমরা ভার বাড়াচ্ছি! সেদিন একটি বৃদ্ধ মানুষও কেমন সুন্দর হয়ে ওঠে! এমন সুন্দর যতই দেখি, ততই মনে হয় পৃথিবীও কী সুন্দর! হ্যাঁ, সত্যিই তাই। উজ্জুকে দেখলে তোমারও তাই মনে হবে। মনে হবে, উজ্জু বেঁচে থাকুক তোমার-আমার জন্য। বেঁচে থাকুক আলা-ইজার জন্য। কেননা, উজ্জু যেমন ভালবাসতে জানে, তেমন আলা-ইজারও যে প্রাণভর্তি মমতা উছলে পড়ে। নইলে, একটি ছোট্ট হরিণের প্রাণ বাঁচানোর জন্য তার প্রাণ কেন কাঁদে! বুঝি-বা সে হারিয়ে গেছে ওই তার ছোট্ট হরিণ আমনার প্রাণ বাঁচাতে! রাজার মেয়ে যে এমন একটি তুচ্ছ প্রাণীর জন্য নিজের বিপদকে তুচ্ছ করতে পারে, এই ভেবে উজ্জুর গায়ে কাঁটা দেয়।

কে বলেছে রাজকন্যার ওই ভালবাসার ছোট্ট হরিণ তুচ্ছ? বনের সবুজে-সবুজে যখন সে ছুটে যায় খেলতে-খেলতে, কিংবা তার মায়ের গায়ে-গায়ে মুখটি ঠেকিয়ে আনন্দে লাফ দেয় প্রজাপতি দেখে, তখন মনে হয়, একটি ছোট্ট হরিণ না-থাকলে, কিংবা ওই প্রজাপতি রঙের বাহার ছড়িয়ে বাতাসে না ভেসে বেড়ালে, পৃথিবী বুঝি এত সুন্দর হত না। তেমনই রাজকন্যা আলা-ইজার মতো একটি ছোট্ট মেয়ে তার অমন সুন্দর বন্ধুর প্রাণ বাঁচাবার জন্য কাঁদে বলেই না, তার কান্না-ভেজা চোখ দুটি অমন মিষ্টি লাগে! অমন চোখে জল দেখে আমাদেরও চোখ ভিজে যায়! এও যে আরও সুন্দর!

“উজ্জু!” হঠাৎই একটা ছায়া যেন কয়েদের ফটকের সামনে এসে দাঁড়াল, ডাক দিয়ে।

“কে?” উজ্জু থতমত খেয়ে গেল। এখন রাত কত গভীর, জানে না উজ্জু। কিন্তু রাত যে বেড়েছে, সেটা বুঝতে তার অসুবিধে হওয়ার নয়। এত রাতে কে ডাকে তাকে?

যে ডাকল, সে খোলা ফটকের সামনে দাঁড়াল। তারপর কিছু ভাবল। কয়েদের সিঁড়ি বেয়ে ক’পা উঠতে-উঠতে বলল, “আমি উজ্জু, আমি।”

“রাজামশাই!” উজ্জুর গলার স্বরটা যেন আপনা থেকেই গলায় আটকে গেল।

“হ্যাঁ, উজ্জু। আমি।” রাজা উত্তর দিলেন।

উজ্জু ব্যস্ত হয়ে উঠল। অস্থির গলায় সে বলল, “কয়েদের ফটকটা আমি খুলিনি রাজামশাই।”

“আমি জানি।” ধীর গলায় উত্তর দিলেন রাজা। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কয়েদের ফটক খোলা দেখেও পালালে না কেন? তুমি তো জানো, কাল আমি তোমায় মৃত্যুদণ্ড দেব।”

“পালাব কেন রাজন! আমি তো কোনও অন্যায় করিনি। আমার রাজামশাইয়ের চোখে আমি নিজেকে এত ছোট করতে শিখিনি কখনও। আমার মনে হয়েছে, ফটকের তালায় চাবি দিতে ভুল হয়ে গেছে আপনাদের।” উত্তর দিল উজ্জু।

“ভুল নয় উজ্জু,” জবাব দিলেন রাজা। “আমি ইচ্ছে করেই ফটকের তালায় চাবি লাগাতে বারণ করেছিলুম। আমি দেখতে চেয়েছিলুম, প্রাণের ভয়ে সত্যি তুমি পালাও কিনা।”

“হুজুর, আমি জীবনে কখনওই পালাইনি। পালাতে শিখিনি।” আর পালিয়েই বা কী হবে! ক’টা দিনই বা পৃথিবীর বাতাসে আর শ্বাস নেব। দু’দিন আগে আর পরে।” উজ্জু উঠে দাঁড়াল।

“উজ্জু, আমি লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছিলুম তোমাকে। দেখছিলুম, পৃথিবীতে এখনও মানুষ আছে কি না। যে-মানুষ ভয়ে পালায়, তাকে কি মানুষ বলতে পারা যায়!” বলতে-বলতে রাজার গলা নরম হল।

উজ্জু রাজার কথা শুনে মাথা হেঁট করল।

“উজ্জু,” রাজা আবার বললেন, “আমি নিজেই ভুল করেছি। রাজজ্যোতিষীর কথা যদি সত্যিই হয়, সত্যিই যদি আমার মেয়ের অসুখ করে, তবে একটা ছোট্ট হরিণকে তার মায়ের কাছ থেকে কেড়ে এনে হত্যা করলে, তার যে সে-অসুখ সারতে পারে না, এ আমি বুঝতে পেরেছি। উজ্জু, ছোট্ট হরিণের মাকে কাঁদিয়ে, আমার নিজের মুখে হাসি ফোটাতে গিয়ে আজ মেয়ের জন্য আমাকেই কাঁদতে হচ্ছে। উজ্জু, আমার মেয়ে হারিয়ে গেছে, এ আমি বিশ্বাস করতে পারছি না।” বলতে-বলতে রাজা যেন এক অসহায় মানুষের মতো আর্তস্বরে চিৎকার করে উঠলেন।

উজ্জু এবার চোখ তুলে রাজার মুখের দিকে তাকাল। অন্ধকারে যতটুকু দেখা যায়, তার চেয়ে আরও একটু ভাল করে দেখবার চেষ্টা করল। তারপর বলল, “রাজকন্যা আলা-ইজা হারিয়ে যায়নি রাজামশাই। সে তার বন্ধু খুঁজে পেয়েছে। ওই ছোট্ট হরিণটি আলা-ইজার বন্ধু। সে তার বন্ধুর প্রাণ বাঁচানোর জন্য নিশ্চয়ই তার ছোট্ট হরিণ-বন্ধুকে নিয়ে গভীর বনে তার মাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে।”

রাজা আঁতকে উঠলেন। ভয়ে তাঁর গলা কেঁপে উঠল, “কী বলছ তুমি উজ্জু!”

“আপনি তো রাজামশাই তন্নতন্ন করে তাকে খুঁজেছেন। কোথাও তো তার দেখা পাননি। এখন ওই গভীর বন ছাড়া সে আর কোথাও যেতে পারে না বলেই আমার মনে হয়।” শান্ত গলায় উত্তর দিল উজ্জু।

“কী ভয়ঙ্কর কথা!” রাজা অস্থির হয়ে উঠলেন।

“আমার আন্দাজ যদি সত্যি হয়, তবে ভয়ঙ্কর তো নিশ্চয়ই!” উত্তর দিল উজ্জু।

“তা হলে তো জ্যোতিষীর কথা ফলতে চলেছে।” আতঙ্কে গলা শুকিয়ে এল রাজার।

উজ্জু বলল, “আপনি অত উতলা হবেন না রাজামশাই।”

রাজা উত্তর দিলেন, “সে আমার মেয়ে। আমার মেয়ে এই অন্ধকার রাতে বনে-বনে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর আমি উতলা না হয়ে চুপচাপ বসে থাকব, এ কেমন কথা তোমার?”

উজ্জু জবাব দিল, “এখন তো আর আমরা কিছুই করতে পারি না।”

“কেন পারি না! আমার শক্তি কম কিসে! আমি এখনই ওই বন কেটে ফেলব। আমার কি লোক কম আছে?” এবার দম্ভে যেন রাজার গলা গর্জে উঠল।

উজ্জু তেমনই সহজ, শান্ত গলায় বলে গেল, “আমি জানি না আপনার এই সিদ্ধান্ত কতখানি ঠিক। আজ্ঞে রাজামশাই, এই গভীর বনই তো আমাদের বন্ধু। একটি গাছই তো আমাদের প্রাণ। আর তা ছাড়া এই গভীর বনের অসংখ্য গাছপালা কি কাটা যায়! যদিও-বা যায়, তাতেও কি রাজকন্যা আলা-ইজাকে খুঁজে পাওয়া যাবে? সে যদি অন্য কোথাও, অন্য দেশে চলে যায়! তবে তো এমন সুন্দর যে বনের সংসার, সে তো ধ্বংস হবেই, সেইসঙ্গে যে শেষ হয়ে যাবে বনের যত ফুল, যত পাখি, যত পশু—সব। কে বলতে পারে, সেখানে যদি সত্যিই রাজকন্যা আলা-ইজা আশ্রয় নেয়, আশ্রয় নেয় কোনও গাছের ছায়ায়, তবে শেষ হয়ে যাবে তার আশ্রয়ও। হয়তো-বা তাকেও আর আমরা খুঁজে পাব না কোনওদিন।”

উজ্জুর কথা শুনে কেমন যেন থমকে গেলেন রাজা। আমতা-আমতা করে বললেন, “তা হলে কী করব?”

উজ্জু খানিক চুপ করে রইল রাজার কথা শুনে। হয়তো কিছু ভাবল। তারপর বলল, “হুজুর যদি সাহস দেন তো একটা উপায় আমি বলতে পারি।”

“কী উপায়? কী উপায়?” ভারী উৎসাহে রাজা জিজ্ঞেস করলেন।

“আমি নিজে চেষ্টা করতে পারি। চেষ্টা করতে পারি তাকে খুঁজে আনার।” উত্তর দিল উজ্জু।

“তুমি?” রাজা অবাক হলেন। “তোমার এই বয়েসে সাধ্যে কুলোবে কেন?”

“রাজামশাই, সময় আমার এখনও ফুরোয়নি। যেদিন ফুরিয়ে যাওয়ার সময় আসবে, সেদিন আমায় কেউ আটকাতে পারবে না। মরতেই হবে। কিন্তু রাজামশাই, আমার মরবার আগে জ্যোতিষমশাইয়ের গণনাটা যে ঠিক নয়, এটা যদি প্রমাণ করে যেতে পারি, তবে বোধ হয় আমাদের রাজ্যের অনেক উপকার হয়। একটি নিরীহ হরিণশিশুর জীবন না নিয়ে যদি আলা-ইজা নামের এক রাজকন্যার সঙ্গে সেই ছোট্ট হরিণের বন্ধুত্ব হয়, যদি একটি ছোট্ট হরিণের পিছু ছুটতে-ছুটতে এক ছোট্ট রাজকন্যা খেলা করে, খেলতে-খেলতে হাসিতে-খুশিতে যদি লুটোপুটি খায়, তবে কি রাজামশাই আনন্দে আপনারও বুকের ভেতরটা দুলে উঠবে না? সেই ছোট্ট হরিণটিকে হত্যা করার জন্য আপনি কি হাতে অস্ত্র তুলে নেবেন?”

“না-আ-আ-আ!” আচমকা এমন চিৎকার করে উঠলেন রাজা যে, বৃদ্ধ উজ্জুরই বুকের ভেতরটা ধড়াস করে চমকে উঠল। তখনই রাজার যেন মনে হল, অসাবধানে কিছু একটা করে ফেলেছেন, তাই কেমন যেন মুখ কাঁচুমাচু করে উজ্জুর মুখের দিকে তাকাবার চেষ্টা করলেন। অবশ্য অন্ধকারে কেউই কারও মুখ স্পষ্ট দেখতে পেল না। তবে বোঝা গেল, উজ্জু যেমন রাজার এই হঠাৎ-চিৎকারে অবাক হয়েছে, তেমনই রাজাও আচমকা চিৎকার করে লজ্জায় পড়ে গেছেন। কিন্তু কতক্ষণ আর অন্ধকার কয়েদের মধ্যে চুপ করে থাকতে পারেন রাজা! কতক্ষণ আর লজ্জাটাকে লুকিয়ে রাখতে পারেন অন্ধকারে! তাই খুবই আফসোসের সুরে রাজা বললেন, “আমি নিজেকে ঠিক রাখতে পারিনি উজ্জু। আমি একটু চিৎকার করে ফেলেছি। তুমি বিশ্বাস করো, আমি তোমার ওপর রাগ করে চিৎকার করিনি। আমি বলতে চেয়েছি, আর নয়, আর আমি কোনওদিনও হরিণ-শিশুর সঙ্গে খেলা করতে বারণ করব না আমার মেয়েকে। তুমি বিশ্বাস করো, আমি তার জন্য হরিণের উদ্যান গড়ে দেব। সেখানে হরিণ আসবে অগুন্‌তি। গাছের ডালে-ডালে পাখি ডাকবে অসংখ্য। ফুলে-ফুলে প্রজাপতি উড়বে দলে-দলে, আর আমার মেয়ে আলা-ইজা তাদের সঙ্গে খেলতে-খেলতে হাসবে, গান গাইবে। নাচবে। আমরা আড়াল থেকে দেখব। আমি আর রাজরানি। সে কী মজার হবে বলো!”

উজ্জু বলল, “হ্যাঁ রাজামশাই, সত্যিই সে খুব মজার হবে। কিন্তু…”

“তোমার সন্দেহ কিসের?” জিজ্ঞেস করলেন রাজা।

“যদি রাজজ্যোতিষী আপত্তি করেন?”

“আমি মানব না।” উত্তর দিলেন রাজা।

“রাজজ্যোতিষীই যদি আপনাকে অমান্য করেন?” জিজ্ঞেস করল উজ্জু।

“তেমন সাহস যদি তাঁর হয়, তবে তাঁকে শাসনের নিয়ম মানতে বাধ্য করা হবে। তখনও তিনি যদি তা না মানেন, তবে, তাঁর শাস্তি হবে।” উত্তর দিলেন রাজা।

“কী শাস্তি দেবেন?”

“রাজাকে অমান্য করলে যে শাস্তি সবাই পায়। মৃত্যুদণ্ড।”

“আবার বোধ হয় ভুল করলেন রাজামশাই।” শান্ত গলায় উত্তর দিল উজ্জু।

“কেন?” ব্যস্ত গলায় জিজ্ঞেস করলেন রাজা।

“একজন মানুষকে মেরে ফেললে তো সবই শেষ হয়ে গেল। রাজামশাই, প্রাণ তো ইচ্ছে করলেই আপনি নিতে পারেন। কিন্তু তাতে লাভ কী? রাজার শাস্তি কি শুধুই প্রাণ নেওয়া? একটি হরিণ-শিশুর প্রাণ নিতে গিয়ে, আপনি যে আজ নিজেই আপনার নিজেরই শিশুকন্যার জন্য কী ভয়ঙ্কর বিপদের মধ্যে পড়েছেন, তা কি এরই মধ্যে ভুলে গেলেন?”

রাজা অস্থির হয়ে অন্ধকারে উজ্জুর হাতটি ধরার জন্য নিজের হাত বাড়িয়ে উজ্জুর হাত খুঁজতে লাগলেন। খুঁজতে-খুঁজতে ব্যস্ত গলায় বলে উঠলেন, “উজ্জু, তুমি ঠিকই বলেছ। তোমার হাতটা আমায় ধরতে দাও! তুমি কোথায়? তুমিই আমার সত্যিকারের বন্ধু!”

অন্ধকারে উজ্জুও তার হাত বাড়িয়ে দিল। অন্ধকার কয়েদখানায় আবছা-আবছা দুটি মূর্তি দু’জনের কাছাকাছি এগিয়ে এল। তারপর দু’জনেই দু’জনের হাত ধরে ফেলল। একটা অদ্ভুত শব্দ করে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন রাজা। ঝোধ হয় তাঁর মনে হল, পৃথিবী ঢুঁড়ে এমন বন্ধু আর একটিও খুঁজে পাওয়া যাবে না। রাজা যেন জয়ের আনন্দে হাঁপাচ্ছেন। তেমনই হাঁপাতে-হাঁপাতে রাজা বললেন, “চলো উজ্জু, আমরা এই অন্ধকার কয়েদখানা থেকে বাইরে যাই। বলতে বলতে রাজা বৃদ্ধ মানুষটার হাত শক্ত করে ধরে, কয়েদের খোলা ফটক ডিঙিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন।

রাত যে অনেক গভীর হয়েছে, সে তো দূর আকাশের চেহারা আর বাতাসের গা-শিরশির ভাব দেখলেই বোঝা যায়। চেপে ধরলেন রাজা উজ্জুর পুরুষ্টু হাতটা। মনে হল তাঁর, এ-হাত আর কোনওদিনই ছাড়বেন না। কেননা, বাইরে বেরিয়েই ওই আকাশের দিকে চেয়েই তাঁর মেয়ের মুখখানি স্পষ্ট মনে পড়ে গেল। মনে হল, আহা রে! সারা আকাশটাই যদি একটা মস্ত আয়না হত? তা হলে হয়তো তাঁর হারিয়ে-যাওয়া মেয়ের সন্ধান পেয়ে যেতেন ওই আয়নার ছায়ায়। কিন্তু যা নয়, তা ভেবে মনকে আর কত কষ্ট দেবেন রাজা! তাই বন্ধুরা যেমন করে বন্ধুদের বলে, তেমনই করে রাজা উজ্জুকে বললেন, “চলো উজ্জু, আমরা দু’জনেই ওই বনের মধ্যে আলা-ইজাকে খুঁজতে যাই।”

উজ্জু রাজার কথা শুনে কেমন যেন থমকে গেল। তারপর অবাক স্বরে বলল, “এ কী বলছেন আপনি? রাজা তাঁর রাজকাজ ছেড়ে যদি নিজের হারানো মেয়ের খোঁজে বেরিয়ে পড়েন, তবে যে, রাজ্যে অনাসৃষ্টি হতে পারে, এ-কথা কি আপনি ভাবছেন না? রাজকন্যা আলা-ইজা কোথায় গেছে, আমরা কেউই জানি না। সে বনেও যেতে পারে, বা অন্য কোথাও। তাকে সহজেই খুঁজে পাওয়া যেতে পারে, আবার খুঁজে পাওয়া সহজ নাও হতে পারে। সে যদি বনে যায়, তবে নির্ঘাত কষ্টসাধ্য খুঁজে পাওয়া। আপনি অবশ্য একটি কাজ করতে পারেন, আমি বনে-বনে যখন সন্ধান করব, আপনি তখন শহর-রাজধানীতে তার খোঁজে আপনার গুপ্তচরদের কাজে লাগাতে পারেন। রাজপ্রাসাদ ছেড়ে আপনার কখনওই অন্য কোথাও রাজকন্যার সন্ধানে যাওয়া ঠিক হবে না। তখন কে বলতে পারে, ওই রাজজ্যোতিষীই হয়তো রটিয়ে দেবেন, আপনার মৃত্যু হয়েছে। তখন জ্যোতিষমশাই নিজেই হয়তো সিংহাসনটা দখল করে ফরমান জারি করে দেবেন, “রাজার মৃত্যু হয়েছে। এখন এই রাজ্যের অধীশ্বর আমি। কেননা, রাজ্যের ভাল-মন্দের বিচার করার ক্ষমতা আমার হাতে। আমার প্রজাদের ভাগ্য ফেরাবার কবজ-তাবিজ আমিই দিতে পারি। সুতরাং আমাকে তোমরা রাজা বলে স্বীকার করে নাও। আমার জয়ধ্বনি করো। ভাবুন তো, তখন রানিমার কী অবস্থা হবে।”

এবার রাজা বৃদ্ধ উজ্জুকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, “ঠিক বলেছ, ঠিক বলেছ উজ্জু। এতদিন আমি কেন আমার পাশে-পাশে তোমাকে রাখিনি! এতদিন আমি কেন তোমার কথা শুনে রাজকাজ চালাইনি! তা হলে বোধ হয় আমার আলা-ইজাকে আমি এমন করে হারাতুম না! তাই হোক উজ্জু, তুমি তোমার ইচ্ছেমতো বনেই যাও! আমি সন্ধান করি শহরের আনাচে-কানাচে। এমনও তো হতে পারে, রাজকন্যা আলা-ইজা যখন তোমার ঘরে ঘুমোচ্ছিল, আর তুমি তার খবর আমাকে দিতে এলে, তখন কেউ তাকে হরণ করেছে!”

“হতে পারে রাজামশাই।” উত্তর দিল উজ্জু। তারপর আবার বলল, “তা যদি হয়, তবে সেই দুশমন এখনও নিশ্চয়ই শহরেরই কোথাও-না-কোথাও আছে। আর সে যদি বনে লুকিয়ে থাকে, তবে তো আমি আছি।”

রাজা যেন খানিক হকচকিয়ে গেলেন উজ্জুর কথা শুনে। নিমেষে সামলে নিয়ে বললেন, “তেমন যদি কিছু ঘটে, কেউ যদি বনের গভীরেই আমার মেয়েকে নিয়ে পালায়, তবে, তুমি তার সঙ্গে পারবে কী করে? তোমার এই বয়েসে সেই কাজটা কি খুবই দুঃসাহসিক হয়ে যাবে না? তাও যদি তোমার সঙ্গে অস্ত্র থাকত!”

“অস্ত্রের দরকার নেই রাজামশাই, এই বুদ্ধের হাতদুটোই যথেষ্ট। দুশমনদের হাতে নিজে মরার আগে একটা-দুটোকে ঘায়েল করার মতো গায়ের তাগত আমার আছে।” বলতে-বলতে যেন বুকটা ফুলে উঠল উজ্জুর। গলার স্বরটা একটা শিকার-খোঁজা বাঘের মতো গর্জন করে উঠল। সেই স্বর শুনে রাজার নিজেরই বুকটা হয়তো কেঁপে ওঠে। রাজা আর কথা বাড়ান না। বিদায় জানালেন উজ্জুকে। যাওয়ার সময় দুটো যে পয়সা গুঁজে দেবেন উজ্জুর হাতে, তেমন সাহসও হল না। উজ্জু বনের উদ্দেশ্যে সেই গভীর রাতেই পা বাড়াল। খানিক হাঁটলেন রাজা তার সঙ্গে। খানিক হেঁটে দাঁড়ালেন। তারপর রাজা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলেন, একটা ছায়ার মতো অস্পষ্ট হয়ে ধীরে-ধীরে সেই রাতের আঁধারেই উজ্জু হারিয়ে গেল। রাজা ফিরে গেলেন তাঁর প্রাসাদে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%