নবম অধ্যায়

শৈলেন ঘোষ

কেমন যেন হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল উজ্জু, অন্ধকার থেকে আলোয় বেরিয়ে এসে। এতক্ষণ কি তবে সে স্বপ্ন দেখছিল! না, না। তা কেমন করে হবে! অন্ধকারটা এখনও যে তার চোখে চমকে-চমকে ভেসে উঠছে। এখনও তার কানে মৃত্যুদূতের গলার স্বর গমগম করে বেজে উঠছে। হ্যাঁ, আর মাত্র তিনদিন সে বেঁচে থাকবে। মাত্র তিনদিনই। জানে না সে, এই তিনদিনে বনের কোনদিকে গেলে বনদেবীর দেখা পাবে। জানে না, কোনদিকে রাজকন্যা আলা-ইজা বনদেবীর শাপে হরিণের সঙ্গে হরিণ হয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে। কেমন করে সেই হরিণরূপী আলা-ইজাকে দেখতে পাবে উজ্জু, তারও ঠিকানা তার জানা নেই। তা ছাড়া কোনদিকে যাবে সে!

না, আর সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই তার। এখনই ঝোপঝাড় ডিঙোতে হবে। কাজেই যেদিকে চোখ যায় সেইদিকেই হাঁটে উজ্জু। মাঝে-মাঝে থমকে থামে। চেয়ে দেখে এদিক-ওদিক। কোনও শব্দ কি ভেসে আসে তার কানে! না তো! বোধ হয় একটি কাঠবেড়ালি ছুটে যায়। ঝরাপাতায় তার পায়ের ছোঁয়াচ লাগে। কিংবা হয়তো গাছের ফাঁকে কোথাও হিসহিস করে ফুঁসে ওঠে সাপ। বানর লাফায় এ-ডাল থেকে ও-ডালে। উড়ে যায় পাখি গাছ থেকে গাছে। কিন্তু দেখা যায় না কোনও হরিণ। শোনা যায় না একটি হরিণেরও ছুটন্ত পায়ের দুরন্ত আওয়াজ। থামে না উজ্জু। সজাগ তার চোখ। হুঁশিয়ার তার মন।

হঠাৎ চমকে দাঁড়ায় উজ্জু।

কেন? কী দেখল?

একটি ফুল। রঙিন। বনের ছায়ায় ফুটে আছে। চোখ জুড়িয়ে গেল উজ্জুর। এগিয়ে যায়। ফুলের সামনে এসে দাঁড়ায়। এমন ফুল সে তো দেখেনি আর কোনওদিন। তুমি দ্যাখো, কী নরম তার ফুটে-ওঠা পাপড়িগুলি। কে রাঙিয়েছে এমন রঙের বাহারে ফুলের পাতাগুলি। হাত বাড়াল উজ্জু ফুলের দিকে।

না, না। ছিঁড়ো না!

হাত সরিয়ে আনল উজ্জু নিমেষে। এ কী! অমন করে একটি সুন্দরকে কেন ছিনিয়ে আনতে তার লোভ হল! কে জানে, ওই ফুলের আড়ালেই বুঝি বনদেবী আছে। বনদেবী বুঝি ফুলের মতোই সুন্দর!

লজ্জা পেল উজ্জু। ধীরে-ধীরে তার হাঁটু দুটি কে যেন আপনা থেকে মুড়ে দিল। হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল উজ্জু ওই ফুলের সামনে। তারপর দুটি হাত ফুটন্ত ফুলের সামনে ছড়িয়ে দিয়ে কাতর স্বরে বলে উঠল, “ও আমার রঙিন ফুল, যাকে আমি খুঁজে বেড়াচ্ছি তুমি কি সেই বনদেবী?”

ফুলের কোনও উত্তর পেল না উজ্জু।

“ওগো ফুল, তুমিই যদি সেই বনদেবী হও, তবে বলে দাও, কোথায় আমার সেই ছোট্ট বন্ধু আলা-ইজা আছে! ওগো বনদেবী, মৃত্যুদূত আমায় বলে গেল, তোমার শাপে আমার রাজকন্যা-বন্ধু হরিণ হয়ে বনে-বনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বললা বনদেবী, সে কী পাপ করেছে যে, তাকে তুমি এমন শাস্তি দিলে। একটি ছোট্ট হরিণ-শিশুকে তার মায়ের কোলে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্যই তো সে বনে এসেছিল। তুমি কি শোনোনি আলা-ইজার কান্নার শব্দ? তুমি কি জানো না, রাজজ্যোতিষী, আলা-ইজার অসুখ হয়েছে বলে মিথ্যে-মিথ্যে সেই হরিণ-শিশুর প্রাণ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল রাজাকে। বনদেবী, সেই হরিণ-শিশুটি আলা-ইজার খেলার সঙ্গী হয়েছিল। সে যখনই জেনেছে তারই জন্য তার সেই ছোট্ট বন্ধু হরিণের প্রাণ নেওয়া হবে, তখনই তো আলা-ইজার কান্নার শব্দ বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছিল। সে-কান্না কি তোমার কানে পৌঁছয়নি বনদেবী? বাতাসও কি তবে একটি ছোট্ট মেয়ের ভালবাসাকে তুচ্ছ করেছে! ওগো বনদেবী, আমার ভালবাসার আলা-ইজাকে তুমি ফিরিয়ে দাও ! আর তিনদিন পরে মৃত্যুদূত আসবে আমায় নিয়ে যেতে। তিনদিন পরে এই পৃথিবীর এত ভালবাসা, এত আনন্দ, এত আলোর উৎসব সব হারিয়ে যাবে। ওগো বনদেবী, সব কিছু হারাবার আগে আমি আমার আলা-ইজার কপালে একটি চুমো দিয়ে বলে যেতে চাই, ‘ও আমার ছোট্ট বন্ধু আলা-ইজা, তোরা আছিস, তবু পৃথিবীতে এত হিংসা কেন? মানুষ কেন মানুষকে মারে? কেন মারে জীবন্ত ওই পশু-পাখিদের? তোদের দেখেও কি তারা কিছু শেখে না?’ ওগো বনদেবী, শুধু এইটুকু বলেই আমি বিদায় নেব। তোমার কাছে আর কিছু চাইব না। কোনওদিনও না।” বলতে-বলতে উজ্জুর চোখ দুটি কেমন যেন ছলছল করে উঠল।

হয়তো উজ্জুর গাল বেয়ে দু’ চোখ উপচে অশ্রুর ফোঁটাগুলি মাটিতেই ছড়িয়ে পড়ত। কিন্তু না, উজ্জুর চোখের জল উপচে পড়ল না। হঠাৎই একঝলক বাতাস বয়ে গেল উজ্জুর গা ছুঁয়ে ওই ফুলের পাপড়িগুলির ওপর। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ফুলের পাপড়িগুলি বাতাসের ছোঁয়া লেগে ঝুরঝুর করে ঝরে পড়ল মাটিতে। থতমত খেয়ে গেল উজ্জু। চোখের দৃষ্টি তার স্থির হয়ে গেল। একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল পড়ে-থাকা ফুলের সেই পাপড়িগুলির দিকে। পাথরের মতো। আর মুখে কথা নেই তার। চোখে জলও নেই। শুকিয়ে গেছে। নিমেষে হতাশায় ছেয়ে গেল তার চোখ দুটি। উঠে দাঁড়াল সে। তারপর আচমকা চিৎকার করে ডাক দিল সে, “আ-লা-ই-জা! আ-লা-ই-জা।” তার চিৎকারের আওয়াজটা আর্তনাদ করতে করতে বনের গাছে-গাছে, পাতায়-পাতায় দোলা দিয়ে মিলিয়ে গেল।

উজ্জু আবার তারস্বরে ডাক দিল, “ব-ন-দে-বী, কোথায় তুমি? সাড়া দাও! সাড়া দাও!”

কারও সাড়া পেল না সে। এবারও তার গলার স্বর বনের বাতাসে ভাসতে-ভাসতে কোথায় যে উধাও হয়ে গেল, কে জানে! হয়তো শুনতে পেয়েছিল বুনো-কুকুরের দল। একসঙ্গে অনেক কুকুর ডেকে উঠল। কী হিংস্র তাদের ডাক। অনেক বানর গাছের এ-ডাল থেকে ও-ডালে লাফালাফি লাগিয়ে দিলে। একঝাঁক উড়ন্ত পাখির ডানার শব্দ শোনা গেল শূন্যে। উজ্জুর ভয় নেই কাউকেই। শুধু ওই বুনো-কুকুরের চিৎকারটাই তার কানে ভয়ঙ্কর ঠেকল। যদিও সে জানে, এখনই কেউ তার প্রাণ নিতে পারছে না। তিনদিন, এখনও তিনদিন বেঁচে থাকার সময় পেয়েছে সে। তবুও ভয় তার, যদি ওই হিংস্র কুকুরগুলো তাকে দেখতে পায়! যদি তাকে কামড়ে-ছিঁড়ে কুটিকুটি করে ফেলে! তখন? তখন তো সে আর আলা-ইজাকে খুঁজতে পারবে না। এইখানে পড়ে ধুঁকিয়ে-ধুঁকিয়ে যদি তার তিনদিন কেটে যায়!

মনে হচ্ছে, কুকুরগুলো এইদিকেই তেড়ে আসছে। মনে হয়, উজ্জুর গায়ের গন্ধ তাদের জিভের লালা ঝরাচ্ছে। এখানে আর দাঁড়ানো ঠিক নয়। কিন্তু কোথায় যাবে সে? যেদিকে তাকাও ঘন বনে ছেয়ে আছে চারদিক। সেই ঘন বনের আড়ালে-আড়ালে লুকিয়ে-ছাপিয়ে উজ্জু পথ খুঁজতে লাগল। বুনো-কুকুরের গলার খ্যাঁকানিও এক ঝোপের আড়াল থেকে আর-এক ঝোপের আড়ালে আওয়াজ তুলল। শিকারের গন্ধ তাদের নাকে। সেই গন্ধ শুঁকে-শুঁকে তারা ঝোপ ডিঙোয়। আর উজ্জু তাদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে পালাবার পথ খোঁজে। কখনও উজ্জু ছোটে। অবশ্য তেমন করে তো আর ছোটা যায় না এই গহন বনে। উজ্জু ঝোপঝাড় মাড়িয়ে-ডিঙিয়ে ছোটার চেষ্টা করে শুধু। হাঁপিয়ে পড়ে উজ্জু। কুকুরেরও জিভ লকলক করে ওঠে।

তারপর হঠাৎ কী করে যে কী হল কে জানে, সেই বনের ঝোপের ঘুপচিতে কিসের যেন ঝটাপটি লেগে গেল। সেই বুনো-কুকুরগুলো যত চিৎকার করে, ততই বনের ঝোপ কেঁপে ওঠে।

থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে উজ্জু। দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে হাঁপায়। আর আতঙ্কে এদিক-ওদিক তাকায়। কিছুই দেখতে পায় না সে। শুধু শুনতে পায়, সেই ঝোপ তোলপাড় করে কারা যেন সেই হিংস্র কুকুরগুলোকে আক্রমণ করেছে। কেননা, এখন আর কুকুরগুলোর গলায় সেই ভয়ঙ্কর ডাক নেই। আঘাতে-আঘাতে নাস্তানাবুদ হলে যেমন লেজ গুটিয়ে চেঁচায়, তেমনই কিঁউ-কিঁউ করতে-করতে কুকুরগুলোও বোধ হয় লেজ গুটিয়ে চেঁচাচ্ছে। ভারী দেখবার ইচ্ছে হল উজ্জুর। কাদের আঘাতে বুনো-কুকুরের এই হাল, সেটা কার-না-আর দেখতে ইচ্ছে করে! কিন্তু সাহস হল না। সে যেমন ঝোপের আড়ালে সিঁটিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, তেমনই চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। মনে হল, তার চোখের পাতাও যেন পড়তে চাইছে না।

ঝোপের মধ্যে সেই তোলপাড়-করা কাণ্ডটা কতক্ষণ ধরে চলল, তার ঠিক-ঠিক সময় কেমন করে আর ঠাওর করবে উজ্জু আর-এক ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে? তবে অনেকক্ষণই হল। অনেকক্ষণ পরে কুকুরের কিঁউ-কিঁউ শব্দ কিংবা লাফালাফি ও ঝাঁপাঝাপির সেই তুলকালাম আওয়াজটা আর তার কানে এল না। মনে হয় কুকুরগুলো পালিয়েছে। এবার হয়তো একটু সাবধানে উঁকি মারা যেতে পারে।

হ্যাঁ, উঁকি মারল উজ্জু। উঁকি মেরেই তার চোখে ধাঁধা-লেগে গেল। সে দেখল, একপাল হরিণ রক্তে-রাঙা শিং উঁচিয়ে ছুটে পালাচ্ছে। তবে কি এতক্ষণ এই হরিণগুলোর সঙ্গেই কুকুরগুলোর মারামারি হচ্ছিল! তাই হবে। নইলে হরিণের শিং-এ কেন রক্ত লেগে থাকবে! বোধ হয় ওই শিং ঢুঁসিয়ে বুনো-কুকুরের, পেট ফাঁসিয়ে দিয়েছে ওই হরিণের দল। কুকুরও মরেছে যেমন, তেমনই যে দু-একটা হরিণও ঘায়েল হয়নি, তা তুমি বলতে পারো না।

ধক করে কেঁপে উঠল উজ্জুর বুকের ভেতরটা। এই হরিণের দলে তার আলা-ইজা নেই তো! সে আর লুকিয়ে থাকতে পারল না। এই ঝোপ থেকে সে ওই ঝোপে হুড়মুড় করে ছুটে গেল। না, কিছুই তো সে দেখতে পেল না। তবে কি এই ঝোপে নয়, অন্য ঝোপে। আর-এক ঝোপে সে ছুট দিল। না, এখানেও তো কিছু নেই। এখান থেকে ওখানে। ওখান থেকে আরও অন্যখানে। হায় রে, কোথাও সে কিছুই দেখতে পেল না! তবে? কী হল এতক্ষণ! কোথায় গেল সেই কুকুরের চিৎকার! কোথা থেকে ছুটে গেল সেই হরিণের দল! তবে সবই কি ধাঁধা! আবার সে গলা ফাটিয়ে ডাক দিল, “আ-লা-ই-জা, আ-লা-ই-জা!”

এবারও কেউ সাড়া দিল না। শুধু শোনা গেল পাখিদের কাকলি গাছে-গাছে অনেক সুরে বেজে উঠেছে। বোধ হয়, সাঁঝ নামছে। পাখিরা ঘরে ফিরছে। তবে কি একটা দিন শেষ হয়ে গেল! আর কিছুক্ষণ পরেই তো বনে ঘন অন্ধকার নেমে আসবে। তখন কী করবে উজ্জু! বনের অন্ধকারে কোথায় সে থাকবে! বড্ড ক্লান্ত এখন সে। আর বোধ হয় আলা-ইজাকে হাঁক দিয়ে ডাকতেও পারবে না। ডাকলেই-বা কী! সাড়া দেবে কে? কোথায় আলা-ইজা!

“কে এখানে এমন করে দাঁড়িয়ে আছ বাবা? কে তুমি?”

কে ডাকল তাকে! চমকে উঠল উজ্জু। এ যেন এক বৃদ্ধার গলা। ফিরে তাকাল। হ্যাঁ, একেবারেই তার সামনে দাঁড়িয়ে সেই বৃদ্ধা। তবে বলতে পারো না, সে উজ্জুর মতো বয়সের ভারে অতখানি নুয়ে পড়েছে। তার মাথায় একবোঝা কাঠ। দিনের শেষে কাঠ কুড়িয়ে ঘরে ফিরছে। কিন্তু আশ্চর্য, বনের এত গভীরে, এই সময়ে কাঠ কুড়িয়ে পথ হাঁটতে তার ভয় করছে না? কিছু না থাক, বুনো-কুকুরের পাল্লায় পড়লে যে নিস্তার নেই, সেটা কি জানা নেই বৃদ্ধার!

“চুপ করে আছ যে! বুঝি আমায় দেখে অবাক হচ্ছ?”

এবার উজ্জুর চমক ভাঙল। বলল, “আমি বড় বিপদে পড়েছি।”

“কিসের বিপদ?”

“একদল বুনো-কুকুর আমাকে তাড়া করেছে।” উত্তর দিল উজ্জু।

বৃদ্ধা বলল, “তা বনের ভেতর এই সময়ে কেউ ঢোকে! এখনও যে প্রাণে বেঁচে আছ, এই যথেষ্ট।”

উজ্জুর বলবার ইচ্ছে ছিল, ‘তুমিও তো একা-একা বনে ঢুকেছ। তোমারও তো বিপদ হতে পারে।’ কিন্তু না, এই কথা সে মনে-মনে ভাবল বটে, কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারল না। শুধু অবাক হয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

“ও, বুঝতে পেরেছি, অমন করে তুমি কেন আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছ। ভাবছ বোধ হয়, আমিও তো একা-একা মাথায় কাঠ নিয়ে ঘরে ফিরছি। আমারও তো বিপদ হতে পারে!” বলতে-বলতে বৃদ্ধা হেসে ফেলল। হাসতে-হাসতেই বলল, “আমায় কেউ কিছু করবে না। আমাকে সবাই চেনে। আমি তো এই বনেই থাকি। এখানেই আমার ঘর। তা, তুমি কে, তা তো বললে না?”

“আমার নাম উজ্জু।”

“কোথায় থাকো তুমি?”

“রাজপ্রাসাদে।”

“রাজপ্রাসাদে!” অনেকটা অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করল সেই কাঠকুড়ানি বৃদ্ধা। তারপর জিজ্ঞেস করল, “রাজপ্রাসাদ ছেড়ে এই বনে এসেছ কেন? কিছু অন্যায় করে পালিয়ে এসেছ নাকি?”

“না,” দৃঢ় গলায় উত্তর দিল উজ্জু। তারপর বলল, “তোমার কি মনে হচ্ছে, আমার মতো একজন বৃদ্ধ মানুষ অন্যায় করার জন্য বেঁচে আছে?”

“রাগ করছ কেন?” ভারী ভালমানুষের মতো নরম গলায় বৃদ্ধা জিজ্ঞেস করল। “তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে, তোমার খুবই কষ্ট হচ্ছে। মনে হচ্ছে অনেকক্ষণ তোমার পেটেও কিছু পড়েনি। তা উপোস করে একটা মানুষ যদি বনের ঝোপ ডিঙিয়ে এদিক-ওদিক করে, তবে আমার মতো একজন কাঠকুড়ানি বৃদ্ধার কী মনে হতে পারে বলো? তা ছাড়া একটা কথা বলি বাছা, যে অন্যায় করে সে বৃদ্ধই হোক, কি জোয়ান, সে করবেই।” বলতে-বলতে বৃদ্ধা একটু থামল। উজ্জুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল, হয়তো, উজ্জু কী বলে তা শোনার জন্য। কিন্তু উজ্জু কোনও কিছুই বলল না। তখন বৃদ্ধাই আবার বলল, “রাত নামছে, তুমি যদি কিছু মনে না করো, একটা কথা বলতে পারি, এখন আর এই বনে তোমার ঘোরাঘুরি করাটা ঠিক হবে না। তুমি আমার সঙ্গে চলো। আজ রাতটা আমার ঘরে থাকতে তোমার যদি আপত্তি না-থাকে, তবে আমি খুবই খুশি হব।”

সেই বনে সাঁঝের আবছা-আলো, আবছা-আঁধারে উজ্জু কাঠকুড়ানি বৃদ্ধার মুখটা ভাল করে দেখবার চেষ্টা করল। ভাল করে আর কতটুকু দেখতে পাবে! তবু যদি চোখে চশমা থাকত, তা হলে না-হয় কথা ছিল। এখন তাই যতটুকু দেখা যায়, ততটুকু দেখতে না-দেখতে সেই বৃদ্ধা আবার কথা বলল, “আমার মুখখানা দেখে তোমার কি মনে হচ্ছে, আমার কোনও মতলব আছে?”

লজ্জা পেল উজ্জু। সত্যি, অমন ড্যাবড্যাব করে দেখলে মানুষ যে মনে-মনে দুঃখ পেতে পারে, এটা তার মতো একটা সমঝদার লোকের বোঝা উচিত ছিল। তাই সঙ্গে-সঙ্গে কেমন যেন আমতা-আমতা করে বলে উঠল, “তুমি মনে কোরো না আমি তোমাকে সন্দেহ করছি। আমি শুধু ভাবছি, এই গভীর বনে এতক্ষণ আছি, কোনও ঘর তো আমার নজরে পড়ল না। তুমি কি তবে বনের বাইরে অনেক দূরে থাকো?”

বৃদ্ধা বলল, “অনেক দূরে থাকলে তোমার কোনও অসুবিধে আছে নাকি?”

“অসুবিধে মানে, হ্যাঁ, তা একটু আছে।” উত্তর দিল উজ্জু থমকে-থমকে।

“কিসের অসুবিধে?” বৃদ্ধা জিজ্ঞেস করল।

“না, এখন থাক সে-কথা। চলো, তোমার ঘরেই যাই। ঘরে গিয়ে বলব। আমাদের দুজনেরই যা অবস্থা, তাতে আর একটু দেরি করলে দু’জনই আর কিছু দেখতে পাব না। অন্ধকারটা বৃদ্ধদের যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলাই ভাল।”

বৃদ্ধা উত্তর দিল, “তোমার ভয় নেই। ঘর আমার খুবই কাছে। তার ওপর চোখের দৃষ্টিও আমার বেশ ভালই। অন্ধকার এখনও পর্যন্ত আমায় কাবু করতে পারেনি। অবশ্য বলতে পারো, আমি তোমার চেয়ে বয়সে ছোটই। কাজেই দৃষ্টিটাও আমার ছোট মনে করে, তুমি যেন আমায় ছোট ভেবো না।”

উজ্জু বলল, “ছিঃ ছিঃ! এ কী বলছ? আজ রাতটা তুমি যে আমায় আশ্রয় দিতে চেয়েছ, এতেই তো বুঝছি তুমি কত বড়, কত দয়ালু। চলো, আজকের রাতটুকুই শুধু তোমার ঘরে থাকার পরামর্শ আমি মেনে নিলুম। তবে, কাল ভোর হলেই আমায় বিদায় নিতে হবে। তাতে কিন্তু তুমি আপত্তি কোরো না।

“না, না। তাতে আমি কেন আপত্তি করব?” উত্তর দিল বৃদ্ধা।

কাজেই সেই কাঠকুড়ানি বৃদ্ধা মাথায় কাঠ নিয়ে এগিয়ে-এগিয়ে চলল। আর ঠিক তার পিছু-পিছু পায়ের ব্যথা নিয়ে বৃদ্ধ উজ্জু হাঁটা দিল।

চলতে-চলতে কাঠকুড়ানি বৃদ্ধা গলা চেপে ফিসফিসিয়ে বলল, “আর কথা বোলো না। চুপচাপ হেঁটে চলো। সাঁঝের বন ভীষণ ভয়ের।”

উজ্জুও গলার স্বর একেবারে নামিয়ে উত্তর দিল, “না, না, কথা বলছি না। ভয়ও পাচ্ছি না। তবে তোমায় একটা অনুরোধ করতে ইচ্ছে করছে।”

“কী অনুরোধ?”

“তোমার মাথার কাঠগুলো তুমি একা কেন বইবে। আমিও তো খানিকটা বইতে পারি।”

বৃদ্ধা উত্তর দিল, “তা পারো। তবে এই একটা দিন বয়ে, আমার কষ্টের তুমি আর কতটুকু আসান করতে পারবে? থাক। কাল যখন তুমি থাকবে না, সে তো আমাকেই বইতে হবে।”

সুতরাং উজ্জু আর কথা বাড়াল না। চুপচাপ এগিয়ে চলল।

আশ্চর্যের কথা, ক’ পা হাঁটতেই বৃদ্ধার ঘরটা একেবারে নাক-বরাবর সামনেই দেখা গেল। অথচ দ্যাখো তখন থেকে কতবার যে উজ্জু এদিক-ওদিক করল, একবারও ঘরটা নজরে পড়ল না! বনের ভেতরে একা এক বৃদ্ধার ঘর যেমনটি ভাবা যায়, ঠিক তেমনটি। বনের ডালপালা ভেঙে-ভেঙে সাজানো হয়েছে দেওয়াল। মাথার ওপর ছাউনি, তাও পাতার। এককথায় বলতে পারো পর্ণকুটির। ধরো, যদি বাঘ-ভাল্লুক লাফিয়ে পড়ে, তবে এক লাফেই খড়মড় করে ভেঙে তছনছ হয়ে যাবে বৃদ্ধার ঘর। আর সেইসঙ্গে মরধে বৃদ্ধাও।

দরজা বলতে যেমন বোঝো, মোটেই তেমনটি নয়। পাতায় ঢাকা। যেমন পলকা, তেমনই নড়নড়ে। ঠেলা মারতেই দরজা খুলে গেল। বৃদ্ধা বলল, “এসো!”

সুড়সুড় করে ঘরের ভেতর ঢুকে উজ্জু বলল, “এইটা তোমার ঘর?”

“গরিবের ঘর তো! এর চেয়ে ভাল আর কী হবে! তুমি থাকো রাজপ্রাসাদে। এখানে থাকতে কষ্ট হবে না তো?” জিজ্ঞেস করল বৃদ্ধা।

উজ্জু বলল, “রাজপ্রাসাদের চেয়ে এ-ঘর ভাল কি মন্দ সে-কথা আমি বলছি না। আমি বলছি, এই গা-ছমছম বনে তুমি এমন একটা ঘরে নির্বিঘ্নে থাকো কী করে? কেউ নেই কোত্থাও, না আছে কাছেপিঠে আর কোনও ঘর-দোর। তোমার তো যে-কোনও সময়ে, যে-কোনও বিপদ ঘটতে পারে!”

বৃদ্ধা হাসল। হাসতে-হাসতে বলল, “জীবনটা তো কেটে গেল এইখানেই। এতখানি বয়েস হল, কোনও বিপদ তো হল না। আর হবেই-বা কেন! আমি তো কারও কোনওদিন ক্ষতি করিনি।” বলতে-বলতে বৃদ্ধা ঘরে ঢুকল। মাথার কাঠ এককোণে ফেলে একটা কুপি জ্বালাল। ঘরের ভেতরের আঁধারটা অনেকখানি কেটে গেল সেই কুপির আলোয়। ঘরে দেখার মতো কিছুই নেই। কিন্তু তবুও কেমন যেন একটা খুশি-ছোঁয়া ভাললাগার বাতাস সারা ঘর ভরে আছে। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল উজ্জু।

বৃদ্ধা বলল, “তোমায় যে কোথায় বসতে বলি! রাজপ্রাসাদের মতো মখমল-বিছানো বসার জায়গা তো আমার নেই। পাতায় বোনা এই আমার বিছানা। এইখানেই তোমায় বসতে হবে। আপত্তি নেই তো?”

উজ্জু উত্তর দিল, “রাজপ্রাসাদের মখমলের চেয়ে এই পাতায়-ছাওয়া কুটির, আর এই পাতায়-বোনা বিছানাই আমার ভাল। এইখানেই আমি বোধ হয় আমার আলা-ইজাকে খুঁজে পাব।” বলতে-বলতে উজ্জু পাতার বিছানায় বসে হাঁপ ছাড়ল।

বৃদ্ধা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “আলা-ইজা! সে আবার কে?”

“তোমায় বলব, সব বলব। এখন আমায় একটু যদি খাবার জল দাও তো বাঁচি। আমার গলা শুকিয়ে গেল।”

বৃদ্ধা জল আনল। ঘরের কলসিতে ভর্তি ছিল ঠাণ্ডা জল। আর সেইসঙ্গে আনল একবাটি মিঠাই। তার কী সুগন্ধ! উজ্জুর হাতে মিঠাই-এর বাটিটি দিয়ে বলল, “খাও! আমারই হাতের তৈরি। বুঝতে পারছি, তোমার অনেকক্ষণ খাওয়া হয়নি। ক্লান্তি আর খিদেয় তোমার মুখখানা কালো হয়ে গেছে।”

উজ্জু কেমন যেন হতচকিত হয়ে বলল, “না, না। মিঠাই না হলেও চলবে। জলটুকু পেলেই আমার চলে যায়। অনেকক্ষণ থেকে গলায় একফোঁটা জল পড়েনি। আমার শুধু তেষ্টাই পাচ্ছে। খিদের কথা তো বলিনি। আর তো মাত্র আজকের রাত। তারপরে বাকি থাকবে আর দুটো রাত।”

বৃদ্ধা একটু অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করল, “তুমি যে কী বলতে চাও কিছুই বুঝছি না। হয়তো কখনও-কখনও বলতে গিয়ে আমায় সন্দেহ করছ। বলতে সাহস করছ না।”

উজ্জু মুখে মিঠাই পুরল। বিশ্বাস করো, একবাটি মিঠাই সত্যিই যেন সে একটা রাক্ষসের মতো গপগপ করে খেয়ে ফেলল। তারপর একঘটি জল ঢকঢক করে গিলে প্রাণে বাঁচল। আঃ!

বৃদ্ধা জিজ্ঞেস করল, “আর-একটু জল দেব?”

“না। আর লাগবে না।” উত্তর দিল উজ্জু। তারপর বৃদ্ধার মুখের দিকে তাকিয়ে খানিক অবাক সুরে বলল, “দ্যাখো, অনেকক্ষণ থেকে ভাবছি, একটা কথা তোমায় জিজ্ঞেস করি।”

“কী কথা?”

“সত্যি করে বলো তো তুমি কে?”

বৃদ্ধা চমকে মুখ ফেরাল।

উজ্জু ভ্যাবাচাকা খেয়ে সঙ্গে-সঙ্গে বলে উঠল, “না, বিশ্বাস করো, আমি অন্য কিছু বলতে চাইনি। তোমাকে দেখে বারবার আমার মায়ের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, তুমি ঠিক আমার মায়ের মতন। মা ছাড়া এমন যত্ন আর কে করত বলো! কে আমায় বিপদ থেকে উদ্ধার করে এনে নিজের ঘরে আশ্রয় দিত! মাকে আমার মনে পড়ে। স্পষ্ট মনে পড়ে। তোমার মনে পড়ে না?”

“পড়ে।” কেমন যেন একটু অন্য সুরে উত্তর দিল বৃদ্ধা।

উজ্জু একটু থমকে গেল। তারপর জিজ্ঞেস করল, “তোমার মায়ের কথা জিজ্ঞেস করতে তুমি কি কষ্ট পেলে?”

“হ্যাঁ।”

বৃদ্ধার ‘হ্যাঁ’ শুনে থতমত খেয়ে গেল উজ্জু। তারপর যে কী জিজ্ঞেস করবে উজ্জু বুঝতে না-পেরে চুপ করে বৃদ্ধার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর বৃদ্ধা নিজেই বলল, “হ্যাঁ, মায়ের কথা মনে পড়লেই আমার কষ্ট হয় উজ্জু। আমি যেমন তার মেয়ে, তেমনই তার আর-একটি মেয়ে ছিল উজ্জু। সে-মেয়ে তার নিজের মেয়ে নয়, একটি হরিণ। বনের হরিণ। সেই হরিণটিকে আমার সঙ্গেই মা, আমারই মতন করে পালন করত। তখন আমি খুবই ছোট। আমি এই বনেই সেই হরিণের সঙ্গে খেলা করতাম। গাছের ফাঁকে-ফাঁকে লুকিয়ে থাকত সে। আমার সঙ্গে সে লুকোচুরি খেলত। তারপর একদিন কী হল, আমরা সেদিনও খেলাই করছিলাম। খেলতে-খেলতে সেদিন সে যে কোথায় লুকলো, আমি আর খুঁজেই পেলাম না। আমি ছুটতে-ছুটতে এ-গাছের ফাঁকে, ও-ঝোপের আড়ালে তাকে খুঁজে বেড়াই। কিন্তু সে থাকলে তবে তো খুঁজে পাব! শেষমেশ তবে কি সে গভীর বনে হারিয়ে গেল!

“হ্যাঁ, সে হারিয়েই গিয়েছিল। তবে বনে নয়, রাজপ্রাসাদের অন্ধকারে। রাজার লোকেরা তাকে জ্যান্ত ধরে নিয়ে গিয়েছিল। দেবতার কাছে তার প্রাণ উপহার দেবে বলে। আচ্ছা, বলো তো উজ্জু, একজন মানুষের কাছে তার নিজের প্রাণের যত দাম, তেমনই একটি হরিণের কাছেও তো তাই। একটি হরিণ যেমন বেঁচে থাকবে বনে, তেমনই মানুষও বেঁচে থাকতে চায় পৃথিবীর আলো-বাতাসে। রাজার শক্তি আছে, অনেক ধন-দৌলত আছে বলেই কি পৃথিবীর সৌন্দর্যকে ধ্বংস করে দেবে? কিছু লোকের মিথ্যে আশ্বাসকে বিশ্বাস করে একজনের প্রাণ বাঁচাতে অন্যের প্রাণ নেবে?”

উজ্জু বৃদ্ধার কথা শুনে যেন বোবা হয়ে গেল। তার মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়েই থাকল শুধু। একটি কথাও আর বলতে পারল না। মনে-মনে ভাবল, বৃদ্ধার এই কথাটা যে তারও কথা। তবে কি বৃদ্ধা তার কথা জানে! তবে কি জানে, উজ্জু কেন বনে-বনে ঘুরে বেড়াচ্ছে!

বৃদ্ধা উজ্জুর মুখের দিকে তাকিয়ে চুপ করে গেল। তারপর জিজ্ঞেস করল, “তুমি অমন চুপ করে আছ কেন? তুমি তো এক রাজারই আশ্রয়ে ছিলে। তোমার কি মনে হয় আমি মিথ্যে কথা বলছি?”

উজ্জু থতমত খেয়ে গেল হঠাৎ বৃদ্ধার কথা শুনে। তারপর আমতা-আমতা করে বলল, “না, না। তুমি কেন মিথ্যে বলবে! আমার অবাক লাগছে। তুমি যেন আমারই কথা বলছ। মনে হচ্ছে আমারই মনের কথাটা তুমি যেন কেমন করে জেনে ফেলেছ।”

বৃদ্ধাও অবাক হল। বলল, “তোমার মনের কথা? আমি জানি? না, না। কিচ্ছু জানি না। শুনি, কী সেই কথা!”

“জানো না যখন, তখন বলতে আমার আপত্তি নেই। আমার রাজাও তোমার কথামতোই এক নিষ্ঠুর মানুষ ছিল। আমার রাজাও অনেক প্রাণীর রক্ত নিয়েছে। তাই আজ আমার রাজার মেয়ে রাজকন্যা আলা-ইজা বনদেবীর শাপে হরিণ হয়ে বনে-বনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমি তাকে এই বনে খুঁজতে ঢুকে মৃত্যুদূতের মুখে এই কথা শুনেছি। মৃত্যুদূত আমায় স্বর্গে নিয়ে যেতে এসেছিল। আমায় সে তিনদিন বাঁচার সুযোগ দিয়েছে। এই তিনদিনে হরিণরূপী রাজকন্যা আলা-ইজা আমাকে যদি দেখতে পায়, তবেই ভাল। সে-ই আমার কাছে ছুটে আসবে। আমি তো আর কোন হরিণটি আলা-ইজা, তা চিনতে পারব না। এখন তাই তোমার কাছে আমার একটি অনুরোধ, তুমি কি আমায় একটু সাহায্য করবে? তুমি বিশ্বাস করো, আমার রাজা আমায় কথা দিয়েছে, সে আর কারও প্রাণ নেবে না। তুমি বিশ্বাস করো, বনের সৌন্দর্য সে আর নষ্ট করবে না। সে শুধু তার মেয়েকে ফিরে পেতে চায়।”

উজ্জুর কথা শুনে কেমন যেন একটা রহস্যের হাসিতে বৃদ্ধার মুখখানা ঝলসে উঠল। বৃদ্ধা উজ্জুর অনুরোধের কথায় কোনও সায় দিল কিনা, বোঝা গেল না। বৃদ্ধা শুধু বলল, “তোমার জন্য আমার দুঃখ হচ্ছে।”

“কেন?” ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল উজ্জু।

“তিনদিন পর, তোমার মতো একজন মানুষকে পৃথিবী হারাবে,” উত্তর দিল বৃদ্ধা।

আর উজ্জু বলল, “আমি চলে গেলে তোমার মতো মানুষ তো থাকবে। তোমরাই তো পৃথিবীর মা। এইটুকু বলে একটু থামল। বৃদ্ধার মুখের দিকে তাকাল। তারপর আবার বলল, “মা আমার, মরতে আমার কষ্ট নেই। শুধু একটিবার আলা-ইজাকে দেখতে চাই। তোমার কোলে। তুমি কি রাখবে না আমার কথা?”

না, বৃদ্ধা উজ্জুর সে-কথার কোনওই উত্তর দিল না। শুধু বলল, “রাত হয়েছে অনেক। এবার তোমার জন্য কিছু খাবার করে আনি।”

“কোথায়?”

“এই তো, দ্যাখো না। যাব আর আসব। তবে তুমি যেন ঘরের বাইরে কোথাও যেয়ো না। আমার পাতায় সাজানো বিছানায় বিশ্রাম করো।” বলতে-বলতে বৃদ্ধা ঘর থেকে হনহন করে বেরিয়ে বনের অন্ধকারে কোথায় যে খাবার আনতে গেল, কে জানে!

এখন একা, এই বনে, একটা ছোট্ট পর্ণকুটিরে বসে আছে উজ্জু। রাত্তির। বাইরে অন্ধকার। ভেতরে কুপির আলোয় ছায়ার দোলন। মানুষের কী থেকে যে কী হয়, কে বলতে পারে। কোথায় রাজপ্রাসাদ, আর কোথায় এই পাতায় ছাওয়া পর্ণকুটির। আচ্ছা, এখনই যদি এই আলো-আঁধারে আবার মৃত্যুদূত এসে হাজির হয়! না, এখন তার আসার কথা নয়। আর তিনদিন সময় আছে তার জীবনের। তিনদিনের একটা দিন তো কেটেই গেল। আর মাত্তর দুটো দিন বাকি। দু’ দিন পরে উজ্জু স্বর্গে যাবে। স্বগের কত গল্পই না শুনেছে সে! এবার নিজের চোখে দেখবে। দেখবে আলোর বাহার। রঙের রামধনু। কত ফুল। কত গান। কত অপ্সরা, কত নাচ। আর দেখবে পৃথিবীর ভালমানুষের দল হ্যাঁ, স্বর্গে তো পৃথিবীর ভালমানুষেরাই থাকে। কিন্তু উজ্জু ভেবে পায় না, সে কেন স্বর্গে থাকবে! সে কি তবে ভালমানুষ! তা যদি হয়, তবে তো সেখানে তার মা আর বাবাও আছেন। কে না জানে কত ভালমানুষ ছিলেন তাঁরা। রাজপ্রাসাদের বাগানের মালী, সারাজীবন শুধু গাছকে ভালবেসেছেন। গাছে-গাছে কত যে ফুল ফুটিয়েছেন তার বাবা। আর তার মা? বাবার সঙ্গে সেই ফুলের গাছে জল ছড়িয়ে তাদের প্রাণ রক্ষা করেছেন। সব মা-ই বুঝি তাই করেন। নিজের ছেলেকে তো তিনি এমনই করে বাঁচিয়ে রাখেন। বুকের কাছে আগলে। স্নেহ দিয়ে। আদর করে। আচ্ছা, উজ্জুর মনে-পড়া মা আর বাবার মুখ দু’খানি কি এত বছর ধরে এখনও তেমনই আছে! কে জানে! কে জানে, উজ্জুকে তাঁরা চিনতে পারবেন কিনা! এখন উজ্জু কত বৃদ্ধ হয়ে গেছে। তার ওপর আজ সারাটা দিন রাজকন্যা আলা-ইজাকে খুঁজতে-খুঁজতে কী চেহারা হয়েছে দ্যাখো!

ওমা! এ কী! উজ্জু তো ঘুমিয়ে পড়েছে! কখন ঘুমোল! গাছের পাতার নরম বিছানায় কেমন নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে মানুষটা!

ঘুমোক, ঘুমোক, ঘুমোতে দাও! সেই কখন থেকে মানুষটার জেগেই কেটেছে। এখন যদি তার চোখের পাতা দুটি ঘুমের ছোঁয়ায় বুজে আসে, তবে তো দোষ দিতে পারো না। আমরাও কি পারব এই বয়সে এত ধকল সইতে! আহা! মানুষটাকে দেখলে কষ্ট হয়। অথচ দ্যাখো তুমি, কেমন নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে। তোমার কি মানুষটার মুখ দেখে একবারও মনে হচ্ছে মৃত্যুর ছায়া পড়েছে ওই মুখে?”

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%