শৈলেন ঘোষ

কতক্ষণ পরে যে উজ্জুর জ্ঞান ফিরল, উজ্জু জানে না। হঠাৎই তার কষ্টের শব্দগুলি মুখ দিয়ে যখন বেরিয়ে এল, তখনই কে যেন সাড়া দিল। কে যেন ভারী আদরমাখা স্বরে তাকে জিজ্ঞেস করল, “তোমার কষ্ট হচ্ছে উজ্জু?” সে এক মেয়ের কণ্ঠ।
উজ্জু ধড়ফড় করে উঠতে গেল। তার শক্তিতে কুলোল না। সে শুধু দেখল, তার চারপাশ ঘিরে জমাট অন্ধকারে ঝাঁক-ঝাঁক জোনাকি উড়ছে। যেদিকে তাকাও দেখবে, অসংখ্য জোনাকির আলোর বিন্দুগুলি টুপটাপ নিভছে, জ্বলছে। আর অন্ধকারের বুক ছুঁয়ে-ছুঁয়ে নেচে বেড়াচ্ছে। ছোট্ট জোনাকির একটু-একটু আলোয় কতটুকুই-বা আঁধার কাটে! আবছা আলোয় কাউকে তেমন দেখা যায় না। শুধু ছায়া। সেই ছায়ার দিকেই তার চোখ পড়ে গেল। জিজ্ঞেস করল, “তুমি কে?”
“আমি বনদেবীর রাতের সহচরী।”
“তুমিই বুঝি জোনাকির আলো রাতের বনে ছড়িয়ে দাও?” জিজ্ঞেস করল উজ্জু।
“হ্যাঁ, জোনাকির আলো দেখে-দেখে বনদেবী বাতাসের পাখনায় ভেসে বেড়ান যে!” সে উত্তর দিল।
উজ্জু শুয়ে-শুয়ে কেমন যেন ব্যস্ত হয়ে, এদিক-ওদিক হাতড়ে কিছু খোঁজবার চেষ্টা করল, তারপর আঁতকে উঠে বসে পড়ল। তখনও তার হাত দুটি মাটি ছুঁয়ে ছটফট করছে।
সে জিজ্ঞেস করল, “কিছু খুঁজছ?”
“আমার বুকের শিশুটি কোথায় গেল?” অস্থির হয়ে যেন বুজে আসছে তার গলার স্বর।
সে বলল, “আছে।”
“কোথায়?”
“ওই তো, তোমারই পাশে।”
“আমি দেখতে পাচ্ছি না কেন? আমার কোলে তুলে দাও!”
“এই তো! ধরো!” বনদেবীর রাতের সহচরী উজ্জুর কোলে তাকে শুইয়ে দিল।
“আঃ! মেয়েটি ঘুমোচ্ছে।” একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে উজ্জু তার মুখখানি দেখবার চেষ্টা করল।
“তুমি জানো মেয়েটি কার?” রাতের সহচরী জিজ্ঞেস করল।
“জানি,” উত্তর দিল উজ্জু, “বনদেবীর।”
“তুমি কোথা থেকে পেলে?”
“বন থেকে কুড়িয়ে পেয়েছি।”
“তুমি যদি জানোই মেয়েটি বনদেবীর, তবে তুমি যার মেয়ে তাকে ফিরিয়ে না-দিয়ে, নিজের কাছে লুকিয়ে রেখেছ কেন? লোকে তো তোমায় চোর বলবে।”
চোর! যে-লোকটা কোনওদিন একটিও অসৎ কাজ করেনি, যে-লোকটা ভাল ছাড়া মন্দ জানে না, তাকে চোর বললে সে কি সহ্য করতে পারে! উত্তেজনায় থরথর করে কেঁপে উঠল উজ্জু। বনদেবীর সহচরীর দিকে এক ভয়ঙ্কর দৃষ্টি হেনে রুখে উঠল। জোনাকির ছড়িয়ে-পড়া আবছা আলোয় উজ্জুর সেই চাউনি দেখে, সহচরীর বুকের রক্ত যেন হিম হয়ে যায়। উজ্জু রুক্ষ স্বরে ধমকে উঠল, “তোমায় কে বলেছে আমি চোর? কে বলেছে, এ মেয়েকে আমি নিজের কাছে লুকিয়ে রেখেছি? বনদেবী কি কানে শোনে না? আমি যে তখন অত চিৎকার করে ‘কার মেয়ে, কার মেয়ে’ বলে ডাকাডাকি করেছি, সে কি তার কানে ঢোকেনি? তখন তো কেউ আমার কাছে এসে বলেনি, ‘এ মেয়ে আমার। ফেরত দাও!’ বনদেবীর যদি সাহস থাকত, তবে আমার সামনে এল না কেন? না, সে আসবে না। কারণ সে নিজেই যে রাজার মেয়ে আলা-ইজাকে অভিশাপ দিয়ে হরিণ করে রেখেছে! সে জানে, আমি আলা-ইজাকে উদ্ধার করতে এসেছি। তাই সে ঝঞ্জার তাণ্ডবে আমাকে নাকাল করে তার মেয়েকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিতে চায়। শুনে রাখো বনদেবীর রাতের সহচরী, আমায় তুমি যদি বলো চোর, তবে আমিও তাকে বলি নিষ্ঠুর। তুমি ইচ্ছে করলে তাকে দেওয়া আমার এই অপবাদটা এখনই তার কানে পৌঁছে দিতে পারো। আর সেইসঙ্গে এ-কথাটাও বলে দিয়ো, তাকে নিষ্ঠুর বলে অপবাদ দিতে আমার বুক কাঁপেনি। আমার মৃত্যুর সময় হয়েই এসেছে। আমি মরণকেই ভয় পাই না, তো বনদেবী! ফুঃ! শুধু মরতে-মরতে আমি একটি কথা বলে যাব, ‘অন্যায় আমি কিছুই করিনি। একটি ছোট্ট শিশুকে ভালবাসা যদি অন্যায় হয়, তবে সে-অন্যায় আমি বারবার করব। শিশুকে আমি ভালবাসবই।’ আর এ-কথাটাও তাকে বলে দিয়ো, বনদেবী আমায় যদি দেখা না-দেয়, আমার আলা-ইজাকে যদি শাপমুক্ত করে আবার তাকে মানুষ না-করে দেয়, তবে আমিও বনদেবীর এই কন্যাকে আমার মৃত্যুর সঙ্গী করে নেব।”
উজ্জুর কথা শুনে বনদেবীর রাতের সহচরী আঁতকে উঠেছিল কিনা বোঝা গেল না। তবে কয়েক মুহূর্ত সে কোনও কথাই বলল না। বুঝি-বা উজ্জুর হুঙ্কারে থতমত খেয়ে গেল! হয়তো তাই, কেননা, তখন সেই অন্ধকারে জোনাকির আবছা আলোয় তার মুখখানা দেখলে তোমারও হাসি পেয়ে যেত। সে-মুখ সত্যিই রাতের মতো নিথর।
“আমি এখন কোথায় আছি, জানতে পারি কি?” জিজ্ঞেস করল উজ্জু।
“গহ্বরে।” রাতের সহচরী উত্তর দিল।
“কেন?”
“বনদেবী তোমাকে এখানে বন্দি করেছেন।”
“আমার দোষ?”
“তুমি বনের বাতাস দূষিত করছ। আর সেইসঙ্গে তার মেয়েকে…”
কথা শেষ হওয়ার আগেই উজ্জু বলল, “চুরি করেছি।”
রাতের সহচরী কোনও কথা বলল না।
উজ্জুই জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা দ্যাখো, একটা কথা আমার মাথায় কিছুতেই আসছে না। ঝঞ্ঝার আঘাতে আমি জ্ঞান হারালুম। আমি গহূরে বন্দি হলুম। অথচ বনদেবী আমাকে অজ্ঞান দেখেও, তার মেয়েকে আমার কাছ থেকে উদ্ধার করল না। আমার কাছেই তাকে রেখে দিল। এটার মানে কী?”
“মানে তো খুবই সহজ। তুমি যে তার মেয়েকে হরণ করেছ, এটাই প্রমাণ করা।” উত্তর দিল রাতের সহচরী।
“বাঃ! তা হলে তোমাদের বনদেবী শুধু নিষ্ঠুর নয়, একজন ধূর্তও বলা যায়।” বলতে গিয়ে উজ্জু ভুরু কোঁচকাল।
হঠাৎ বনদেবীর রাতের সহচরী একটা আশ্চর্য কথা জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা উজ্জু, তোমার কি বাঁচতে ইচ্ছে করে না?”
“মানে?”
“ধরো, এখনই যদি তুমি একটি যুবক হয়ে যাও!” জবাব দিল সহচরী। “ধরো, এখনই যদি তুমি ফিরে পাও সেই হারিয়ে যাওয়া শক্তি! তোমার গায়ের পেশীগুলি যদি আবার শক্তিতে ভরপুর হয়ে ফুলে ওঠে! তোমার মুখের বলিরেখাগুলি যদি মিলিয়ে যায় মুহূর্তের মধ্যে! তোমার চোখের দৃষ্টি যদি আবার তুমি ফিরে পাও যুবকের মতো! তুমি যদি ছুটতে পারো, খেলতে পারো, হাসতে পারো, ঝরনার মতো, পাহাড়ি নদীর মতো অথবা ঝড়ের আঘাতে বনের গাছের মতো! তবে, তোমার মৃত্যুর দিনগুলিও তো অনেক পিছিয়ে যাবে! মৃত্যু তোমায় ছুঁতেই পারবে না!”
উজ্জু হাসল। মুচকি।
চোখ এড়াল না সহচরীর। সে বলল, “হাসছ কেন? ভাবছ মিথ্যে?”
“না” উত্তর দিল উজ্জু, “না, মিথ্যে ভাবছি না। ভাবছি এমন দয়া কে আমায় করবে?”
“বনদেবী।” সে উত্তর দিল।
“বনদেবীর এত শক্তি?” উজ্জু জিজ্ঞেস করল।
“শক্তি আছে বলেই তো বনদেবী তোমাকে এ-কথা জিজ্ঞেস করার ভার দিয়েছেন আমাকে।” সহচরী জবাব দিল।
“শুধুমুধু বনদেবী আমাকে যুবক করে দেবে?”
“না। শুধুমুধু নয়। একটা শর্ত আছে।”
“শর্ত!” অবাক হল উজ্জু। জিজ্ঞেস করল, “কী সেই শর্ত?”
সহচরী উত্তর দিল, “আলা-ইজাকে আবার মানুষ করে দেওয়ার আর্জি তোমায় ছাড়তে হবে।”
“চমৎকার! ভারী চমৎকার শর্ত!” একটু যেন রঙ্গ করেই জবাব দিল উজ্জু। তারপর গম্ভীর স্বরে বলল, “শোনো সহচরী, তোমার বনদেবীকে গিয়ে বলো, যৌবন ফিরে পাওয়ার কোনওই লোভ নেই আমার। আমি বৃদ্ধ হয়েছি। তার মানে পৃথিবী ছেড়ে এবার আমার যাওয়ার সময় হয়েছে। আমি না-গেলে পৃথিবীর মাটিতে আর-একটি নতুন মানুষের জায়গা হবে কী করে? ওহে সহচরী, তোমার বনদেবীকে এ-কথাও বলে দিয়ো, তার মেয়েকে আমি ঝঞ্ঝার আঘাত থেকে রক্ষা করেছি এই কারণে। সে এক নতুন মানুষ। আর এও বলে দিয়ো, আলা-ইজার জন্য আমি প্রাণপাত করছি সেই একই কারণে। সেও এক নতুন মানুষ। তাকেও বাঁচাতে হবে আমায়। একটি সবুজ গাছের প্রাণ যেমন অনেক প্রাণের বন্ধু—তেমনই একটি ছোট্ট শিশুর জীবন, অনেক জীবনের আশা। সে মানুষের ভাল করবে। পৃথিবীকে ভালবাসবে।”
এতক্ষণ অত যে আলো ছড়িয়ে অসংখ্য জোনাকি চারদিকে ওড়াউড়ি করছিল, কখন যে তারা একটি-একটি করে হারিয়ে গেল, উজ্জু খেয়ালই করতে পারেনি। এমনকী, এতক্ষণ বনদেবীর রাতের সহচরীর যে আবছা মূর্তি সে দেখতে পাচ্ছিল, তাও আর দেখা যাচ্ছে না। জোনাকির আলোর সঙ্গে-সঙ্গে সেও যেন অন্ধকারে হারিয়ে গেছে। এ কী! এতক্ষণ বনদেবীর যে-মেয়েটিকে সে নিজের বুকের কাছে আগলে রেখেছিল, সেই-বা গেল কোথায়? কথা বলতে-বলতে তবে কি উজ্জু বড্ডই আনমনা হয়ে পড়েছিল?
উজ্জুর বুকটা শিউরে উঠল। সে হাত বাড়াল। অন্ধকার হাতড়ে সে খুঁজতে লাগল বনদেবীর মেয়েকে। তার হদিস পেল না। তারপর সে ডাক দিল। ডাক দিল খুবই নিচু স্বরে, “সহচরী ! বনদেবীর রাতের সহচরী!”
কেউ সাড়া দিল না।
উজ্জু ডাকল। আবার ডাকল। অনেকবার ডাকল। সেই অন্ধকার গহ্বর থেকে এখন কেউ সাড়া দিল না। কেউ এগিয়েও এল না। তবে কি তার সব প্রতিজ্ঞা মিথ্যে হয়ে গেল? এই অন্ধকারেই কি তবে মৃত্যুদূত এসে তার হাত ধরে বলবে, ‘চলো’?
সত্যি বলতে কী, এই অন্ধকার গহূরে আটকে থাকলে, কে বলবে ক’টা দিন কাটল! এখানে দিনের আলোও যেমন দেখা যায় না, তেমনই রাতের তারাও চোখে পড়ে না। মনে হয় যেন আলো-আঁধারের সব পথই বন্ধ। এ যেন অন্ধকারের বন্দিশালা। খানিক পরে হয়তো বাতাসও আর ঢুকবে না। তখন কী হবে?
থাকতে পারল না উজ্জু। ঝঞ্ঝার দাপটে বেচারির সারা শরীরে কী ভীষণ যন্ত্রণা! এতক্ষণ বুঝতে পারেনি। এবার উঠে দাঁড়াতেই টনটন করে উঠল কোমর থেকে পা পর্যন্ত। না, এ যন্ত্রণা গ্রাহ্য করা নয়। তাকে যেমন করেই হোক গহ্বরের বন্দিশালা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আর তাই সে পড়তে-পড়তে কিংবা বলা যায় মরতে-মরতে পথের হদিস করতে লাগল। অন্ধকারে গহ্বরের দেওয়াল ছোঁয়ার সে চেষ্টা করে। পারে না। কখনও সে হামাগুড়ি দেয়। কখনও সে গড়িয়ে-গড়িয়ে নাকাল হয়ে যায় । কখনও তার দম আটকে আসে। তবুও সে একটু আলোও দেখতে পায় না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন