শৈলেন ঘোষ

এতবড় রাজপ্রাসাদের যেখানে খুশি সে যেতে পারে। কেউ তাকে বারণ করবে না। বাধা দেবে এমন সাধ্যি কার! কারণ আলা-ইজা রাজকন্যা। সাত বছর ধরে সে এই প্রাসাদের সব মানুষের চোখের সামনে একটু একটু করে বড় হয়েছে। এক-পা এক-পা করে হাঁটতে শিখেছে। হাঁটতে-হাঁটতে পড়েছে। উঠেছে। কেঁদেছে। আবার হেসেছে। একটি-দুটি কথা বলেছে। তারপর অনেক কথা বলতে শিখেছে। এখন এইকথা সেইকথা কত কথা যে বলে সবার সঙ্গে! মুখে যেন খই ফুটছে। সেইসব কথা শুনতেও যেমন মজা, তেমনই হাসতে-হাসতে তাকে আদর করতে কী আনন্দই না লাগে!
কেন জানি, মেয়েটার কিছু হলে সে সকলের আগে ছুটবে উজ্জুর কাছে। সর্বপ্রথম উজ্জুর কাছে সবকথা না-বললে যেন তার শান্তি হয় না। উজ্জু যেন ওর বন্ধু। অনেক কাছের, অনেক আপন। এত-এত গল্প দিয়ে তার বুকের ভেতরটা কে যেন ভরে দিয়েছে। তার মুখে হাসি দেখলে আলা-ইজা ভাবে এমন হাসি আর কেউ হাসতে পারে না। তাই উজ্জু হাসলে আলা-ইজা খুশিতে চেঁচাবে। লাফাবে। আর উজ্জুকে আনন্দে জড়িয়ে ধরবে। উজ্জু যখন গল্প বলবে, আলা-ইজা তখন তার কোলে মাথা রেখে অবাক-চোখে উজ্জুর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকবে। তখন গল্পের কথাগুলো আর কথার মানুষগুলো যেন ছবির মতো আলা-ইজার চোখের ওপর ভেসে ওঠে। সে যেন গল্পের স্বপ্ন দেখা।
নামটা কী অদ্ভুত বলল, উজ্জু। নামটা যেমন অদ্ভুত, তেমনই মানুষটাও। তার যে বয়েস হয়েছে অনেক, সেটা সবাই জানে। কিন্তু কত হল, কেউ জানে না। রেশমের মতো সাদা চুলের ঝাঁক তার মাথায় ঝলমল করছে। টিকলো নাক। কপালটা এতখানি চওড়া। আর বুকখানা তো এতবড়। কী শক্ত-সমর্থ চেহারা। দেখলে, তার বয়েসের হিসেব করে কার সাধ্যি। উজ্জু এখনও একটা হিংস্র বুনো-কুকুরের সামনে চোখ পাকিয়ে দাঁড়ালে, পালাবার পথ পায় না কুকুর। একটা বিষাক্ত সাপ উজ্জুকে দেখলে ফণা তোলবার আগেই গর্তে সেঁদিয়ে হাঁপ ছাড়ে। উজ্জু যখন প্রথম এই রাজপ্রাসাদে আসে তখন সে কত ছোট। বাবার সঙ্গে এসেছিল বাগানের মালী হয়ে। আসলে তার বাবা ছিলেন রাজপ্রাসাদের বাগানের মালী। সেই থেকে উজ্জু রয়ে গেছে রাজপ্রাসাদে। তারপর থেকে কত কাণ্ডই না সে দেখেছে। তার বাবা তাকে রাজপ্রাসাদে রেখেই চলে গেছেন স্বর্গে। আগের রাজাও চলে গেলেন তার বাবার ক’দিন পরেই। তারপর আরও দু’জনের পর রাজসিংহাসনে বসলেন আজকের রাজা আলা-ইজার বাবা। তাঁর অভিষেকের দিন সে কত গান-বাজনা, কত আলো আর রঙের উৎসব! কত মানুষের ভিড়। কত আনন্দের হইহল্লা। আর সেইসঙ্গে, কত জীবন্ত হরিণের যে রক্ত ঝরল! কে আর তা গুনে রেখেছে। তারপর মালীর ছেলে উজ্জু রাজার দূত হয়েছে। রাজদূত। এ-দেশ ও-দেশ, কত দেশে রাজার এ-খবর সে-খবর, কত খবর পৌঁছে দিয়েছে। এরই ফাঁকে একদিন আলা-ইজার জন্ম হল। সেও এক আনন্দ-উৎসব। সেও ছিল আলোর দিন, রঙের ছড়াছড়ি। ধীরে-ধীরে বয়েসটা কেমন করে এত বেড়ে গেল, খেয়াল করতে পারে না উজ্জু। আসলে তার উজ্জু নামটা তো আর আসল নাম নয়। তার বাবা নাম রেখেছিলেন আকুলিক্কা। সেই আকুলিক্কা যে কেমন করে উজ্জু হয়ে গেছে, তারও ঠিক-ঠিক কারণ জানা নেই তার। তা সে যাই হোক, রাজকন্যার মুখে কিন্তু উজ্জু নামটা শুনতে ভারী মিষ্টি লাগে এই বৃদ্ধ আকুলিক্কার।
রাজকন্যা ছুটতে-ছুটতে, অনেক ঘর পেরিয়ে উজ্জুর ঘরেই ঢুকে পড়ল। বলা নেই, কওয়া নেই আলা-ইজা সটান তার কোলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে হাউ-হাউ করে কেঁদে উঠল। বৃদ্ধ মানুষটা তখন সবে দু’ মুঠো ভুট্টা মুখে দিয়ে সামনের গাছে দুটো পাখির কলকলানি শুনছিল। চমকে উঠেছিল আলা-ইজাকে অমন করে, আছড়ে পড়ে কাঁদতে দেখে। কিন্তু পরক্ষণেই সামলে গেছে বৃদ্ধ মানুষটা। অবাক হয়ে তার মুখখানা নিজের চোখের সামনে তুলে ধরে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে আলা-ইজা?”
আলা-ইজার তখন চোখ উপচে জল গড়াচ্ছে। কান্নার শব্দটা আলা-ইজার গলায় কেমন যেন অদ্ভুত শুনতে লাগছে। রাজকন্যা আলা-ইজা কাঁদছে, এ যেন বিশ্বাসই হয় না এই বৃদ্ধ মানুষ উজ্জুর। তার আরও আশ্চর্য লাগল, আলা-ইজা তার কথার কোনও উত্তরও দিল না, কান্নাও থামাল না। কেন? কী হল মেয়েটার! তাকে তো কোনওদিন কাঁদতে দেখেনি উজ্জু!
আল-ইজার চোখের জলে ভিজে গেল উজ্জুর দু’ হাতের আঙুলগুলো। বুকখানা। শত চেষ্টা করেও সে রাজকন্যা আলা-ইজার চোখের একফোঁটা জলও মুছে দিতে পারল না। থামল না তার কান্নাও। কেমন যেন ছটফট করে উঠল উজ্জুর মনটা। সে আর কিছু ভেবে না-পেয়ে ভাবল, বোধ হয় মাকে খুঁজে পাচ্ছে না মেয়েটা। তাই ছুটে এসেছে তার কাছে। এই ভেবে বৃদ্ধ-উজ্জু এই ছোট্ট মেয়েটার চিবুক ছুঁয়ে আদর করল। বলল, “ঠিক আছে, আমি তোমায় মায়ের কাছে নিয়ে যাচ্ছি।”
হঠাৎ মেয়েটা এমন চেঁচিয়ে উঠল, মনে হল যেন ঝাপটা মেরে একটা ঝড়ের দত্যি ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। মেয়েটা গলা ফাটিয়ে জানিয়ে দিল, না, সে মায়ের কাছে যাবে না!
“কেন? কী করেছেন মা? বকেছেন?” জিজ্ঞেস করল উজ্জু।
“না।” কান্না-ভেজা গলায় উত্তর দিল আলা-ইজা।
“তবে?” আবার জিজ্ঞেস করল উজ্জু।
আলা-ইজা এবার আর থাকতে পারল না। কাঁদছে সে যেমন, তেমনই কান্নার ফাঁকে-ফাঁকে সে কুঁতিয়ে-কুঁতিয়ে বলতে লাগল, “আমার কিচ্ছু হয়নি, কোনও অসুখও করেনি, আর দ্যাখো না, বাবা বলেছে আমার অসুখ হয়েছে। কী বিচ্ছিরি কথা, অসুখ! সেইজন্য একটা ছোট্ট হরিণ ধরে এনে, বাগানে বন্দি করে রেখেছে। আমি আজ সারাদিন হরিণটার সঙ্গে খেলা করেছি বলে বাবা আমায় কত বকল। মা বলল, হরিণটার প্রাণ গেলেই নাকি আমার অসুখ সেরে যাবে! আচ্ছা, তুমিই বলো উজ্জু, আমার যদি সত্যিই অসুখ করে থাকে, তবে, তাতে হরিণের কী দোষ! তার প্রাণ গেলে আমার অসুখ সারবে কেন? হরিণের জন্য তো আর আমার অসুখ করেনি। সত্যি বলছি উজ্জু, আমি কিছুতেই হরিণছানাকে মরতে দেব না। সে আমার বন্ধু। কই সে তো একবারের জন্যও আমাকে গুঁতিয়ে দেয়নি! সে তো আমায় ভালবেসেছে। তাই তো আমি তার নাম রেখেছি, আমনা।”
উজ্জু নামে এই বৃদ্ধ মানুষটা এতক্ষণে বুঝতে পারল, কেন কাঁদছে আলা-ইজা নামের এই রাজকন্যা। বুঝতে পারল, রাজজ্যোতিষী হয়তো রাজার কানে রাজকন্যার এই অসুখের কথাটা ঢুকিয়ে হরিণছানাটাকে মারবার পরামর্শ দিয়েছেন। এই রাজ্যে তাই হয়। রাজজ্যোতিষীর কথা, ফেলার কথা নয় কারও। এমনকী, তিনি রাজা হলেও না। সেই ছোট্টবেলা থেকে আজ এই বৃদ্ধ বয়েস পর্যন্ত একই ঘটনা সে দেখে আসছে। কত জ্যোতিষী গেলেন, কত এলেন, কিন্তু নিয়ম পালটাল না। অভিষেক হবে রাজার, প্রাণ নাও নিরীহ প্রাণীর। যুদ্ধে যাবেন রাজা, নিস্তার নেই নিরীহ প্রাণীর। অসুখ করল রাজার, ওষুধের বদলে রাজাকে দাও নিরীহ প্রাণীর তাজা রক্ত। আরও কত কী! দেখতে-দেখতে মাথার চুল পেকেছে। চোখের দৃষ্টি কমেছে। রাজজ্যোতিষীর কোনও কথাটাই যে সত্যি কথা নয়, সেটা উজ্জু বুঝতে পেরেছে। কিন্তু এরাজ্যের কোনও রাজাই তা বোঝেননি। আজও বোঝেন না আলা-ইজার বাবাও। এমন একটা তরতাজা মেয়ের নামে রোগের মিথ্যে ভয় দেখিয়ে রাজজ্যোতিষী নিজের কেরামতি দেখাতে চান। যার শরীরে রোগের কোনই চিহ্ন নেই, তার রোগ হতে পারে বলে ভয় দেখালে রাজা যে কেমন করে ভয় পান। সেই কথাটা ভাবতে-ভাবতে আলা-ইজাকে আদর করে তার কান্না থামায় উজ্জু। তারপর তার চাপা-রাগটা যাতে আলা-ইজা বুঝতে না-পারে তাই সহজ গলায় বলে, “ছিঃ ছিঃ, বোকা মেয়ে, এইজন্যে কাঁদে বুঝি। আমি রাজামশাইকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে বলব, আলা-ইজার কিচ্ছু হয়নি। কোনও অসুখই করেনি। শুধুমুধু তার বন্ধু হরিণের প্রাণ নেওয়ার কোনও দরকারই নেই। বরঞ্চ হরিণ আপনার বাগানে থাক। রাজকন্যা তার সঙ্গে খেলা করবে।”
আলা-ইজা মাথা নাড়ল। তারপর বলল, “বাবা তোমার কথা কিছুতেই শুনবে না।”
“ওরে মেয়ে, আমি জীবনভর এই রাজপ্রাসাদে কাজ করছি। রাজসিংহাসনে যত রাজা বসলেন, তাঁদের হুকুম শুনে কখনও ব্যাজার হইনি। হাসিমুখে তাঁদের কথা শুনেছি। শুনতে-শুনতে আমি বৃদ্ধ হয়ে গেলুম। আর, আজ তোর একটা আবদার যদি আমি রাজামশাইকে জানাই, তবে, এই বৃদ্ধ লোকটার কথা কি তিনি শুনবেন না মনে করছিস!”
“যদি না শোনে?” আলা-ইজার গলায় ভয়।
“তখন দেখা যাবে।” উত্তর দিল উজ্জু।
“কী দেখবে তখন?” আলা-ইজার গলায় উৎকণ্ঠা।
“দেখব, যাতে আলা-ইজার ছোট্ট হরিণ আলা-ইজারই বন্ধু হয়ে, আলা-ইজার সঙ্গে রাজপ্রাসাদের বাগানেই খেলা করে।”
“না উজ্জু।” আতঙ্কে আলা-ইজার গলা যেন জড়িয়ে এল।
“না! কেন?” একটু অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করল উজ্জু।
“রাজপ্রাসাদের বাগানে থাকবে না আমার বন্ধু। রাজপ্রাসাদের বাগানে থাকলে, আমার বন্ধুকে বাবা ছেড়ে দেবে না। মারবেই। বরং আমার বন্ধু যেখানে ছিল, সেই গভীর বনেই তাকে আমি রেখে আসব।” উত্তর দিল আলা-ইজা।
উজ্জু আর কোনও কথাই বলতে পারল না। কেননা, শোনা গেল কোলাহল। মনে হল, রাজকন্যাকে খোঁজাখুঁজি শুরু করে দিয়েছে সবাই। হবেই তো! যেরকম রাগ করে সে মায়ের হাত ছাড়িয়ে পালিয়ে এসেছে, তাতে রাজবাড়ি জুড়ে শোরগোল হওয়াটা এমন কিছু আশ্চর্যের নয়। বুঝতে পারা যাচ্ছে, রাজকন্যার নাম ধরে ডাকাডাকি শুরু হয়ে গেছে এধারে-ওধারে।
দুরুদুরু করে উঠল রাজকন্যা আলা-ইজার বুকের ভেতরটা। সে ভয়ে জড়িয়ে ধরল উজ্জুকে। তারপর ব্যস্ত গলায় জিজ্ঞেস করল, “এবার কী হবে উজ্জু?”
“কিচ্ছু হবে না।”
“আমাকে ওরা দেখতে পেলে যে ধরে নিয়ে যাবে!” উত্তেজনায় আলা-ইজার যেন দমবন্ধ হয়ে আসে।
“ওরা কেউ তোমাকে দেখতে পাবে না।” সাহস দিল উজ্জু।
“সবাই জানে আমি তোমার ঘরে আসি। তুমি আমায় ভালবাসো।” ভয়ে যেন দলা পাকিয়ে গেল আলা-ইজা।
“আসতে দাও! তারপর দ্যাখা যাবে।”
“না-আ-আ! আমি তোমাকে ছেড়ে এখন কোথাও যাব না।” দাঁতে-দাঁত চেপে শিউরে উঠল আলা-ইজা।
“ঠিক আছে। তুমি আমার কাছেই থাকবে।”
“তবে আমায় লুকিয়ে রাখো!” পীড়াপীড়ি করতে লাগল আলা-ইজা।
শোরগোলটা একেবারে কাছেই এগিয়ে এসেছে। আলা-ইজার আর সবুর সইছে না। সে আকুল স্বরে জিজ্ঞেস করল, “আমি কোথায় লুকোব?”
“এই দরজাটার আড়ালে লুকিয়ে পড়ো।” যতটা ব্যস্ত হয়ে উজ্জু কথাগুলো বলল, তারও দ্বিগুণ ব্যস্ততায়, পলকের মধ্যে লুকিয়ে পড়ল আলা-ইজা। মস্ত গাছের পাতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা ছোট্ট পাখির মতো।
কোলাহলটা উজ্জুর ঘরের প্রায় দোরগোড়ায় এসে পড়লে উজ্জু দরজার ফাঁক দিয়ে মুখ বাড়াল। জিজ্ঞেস করল, “কী হল হে? এত চেঁচামেচি কেন?”
একজন উত্তর দিল, “রাজকন্যাকে খুঁজছি।”
“মানে?” ভণিতা করে জিজ্ঞেস করল উজ্জু।
“মায়ের ওপর রাগ করে রাজকন্যা কোথায় ছুটে পালাল, তারই তল্লাশ করছি আমরা।” উত্তর দিল সেই লোকটি।
এবার একেবারেই কিছুই না-জানার ছল করে উজ্জু বলল, “বাব্বা! বলো কী, ওইটুকু মেয়ের তা হলে তো খুব জেদ। কেন, কী হয়েছিল?”
“জানি না।” সেই লোকটি উত্তর দিল। তারপর জিজ্ঞেস করল, “এদিকে আসেনি তো?”
উজ্জু ন্যাকা সাজল, “এদিকে এলে সে আমার ঘরে নিশ্চয়ই আসত। কিন্তু কই, আসেনি তো?”
“আশ্চর্য!”
“আমিও যাব নাকি তোমাদের সঙ্গে তল্লাশ করতে?” জিজ্ঞেস করল উজ্জু। কী চালাক!
“না, না। তুমি বৃদ্ধ মানুষ, তোমাকে আর কষ্ট করতে হবে না। আমরাই খুঁজে বের করছি। যাবে আর কোথায়! এই রাজপ্রাসাদের কোথাও-না-কোথাও লুকিয়ে আছে।” বলতে-বলতে তারা উজ্জুর ঘরের সামনে থেকে চলে গেল। উজ্জু যেমন হাঁপ ছেড়ে বাঁচল, তেমনই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল আলা-ইজা।
কোলাহলটা আরও একটু হালকা হলে, আলা-ইজার সাহস হল দরজার আড়াল থেকে বেরিয়ে আসার। উজ্জুও ঘরের দরজাটা এবার বন্ধ করে দিল। কিন্তু এর পর? এর পর কী করবে উজ্জু?
উজ্জুর ভাবনাটা যখন তার চোখ থেকে আলা-ইজার চোখের ওপর গিয়ে পড়ল, তখন আচমকা আলা-ইজা বলে বসল, “আমি তোমার এখান থেকে আর যাব না।”
উজ্জু বলল, “না, না, তুমি আর কোথাও যাবে না।”
আলা-ইজাকে আদর করে এই সাহসটা দিলেও, উজ্জুর ভেতরটা কিন্তু আনচান করে উঠল। খবরটা তো আর চাপা রাখা যায় না। রাজকন্যা আলা-ইজা তার ঘরে লুকিয়ে আছে, আর উজ্জু সেই কথা রাজামশাইকে না-জানিয়ে মুখ বুজে বসে আছে, এই কথাটা জানাজানি হতে বেশি সময় লাগবে না। সুতরাং একটা কিছু করতে হয়। কিন্তু কী করবে সে? আলা-ইজাকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে আবার তার মায়ের কাছে পৌঁছে দেওয়াটাই তো এখন সবচেয়ে জরুরি। কিন্তু কোন কথাটা কেমন করে বললে যে আলা-ইজার মন পাওয়া যাবে, সেটা ঠিক এখনই বুঝে উঠতে পারছিল না উজ্জু।
“কী ভাবছ তুমি?” উজ্জুর মুখখানা দেখতে-দেখতে আলা-ইজা হঠাৎ জিজ্ঞেস করল।
সত্যি কথা বলতে কী, প্রথমটা আলা-ইজার হঠাৎ ওই কথা শুনে উজ্জু একটু থতমত খেয়ে গেছল। নিমেষে নিজেকে সামলে নিয়ে আমতা-আমতা করে বলে উঠল, “আলা-ইজার এখন নিশ্চয়ই খিদে পেয়েছে।”
আলা-ইজা কিচ্ছু বলল না। শুধু মুখে “ধ্যাত” করে একটা শব্দ করল।
উজ্জু হা-হা করে হেসে উঠল আলা-ইজার মুখখানা দেখে। কেননা, আলা-ইজা তখন উজ্জুর চোখের ওপর থেকে নিজের মুখখানা সরিয়ে নিয়েছে। লজ্জা পেয়েছে।
উজ্জু হাসতে-হাসতেই বলল, “ধ্যাত কী! তবে শুনি তোমার মুখখানা কেন শুকিয়ে গেছে?”
আলা-ইজা সঙ্গে-সঙ্গে ছুট্টে গিয়ে উচ্ছ্বর বিছানার মধ্যে মুখখানা লুকিয়ে ফেলল। কোনও কথাই সে বলতে পারল না আর।
উজ্জু এগিয়ে গেল তার কাছে। আলা-ইজার মুখখানা আলতো করে তুলে ধরল নিজের মুখের কাছাকাছি। তার মুখখানা তুলে ধরলে কী হবে, আলা-ইজা কিন্তু নিজের চোখ দুটি খুলল না। শক্ত করে বুজে রইল। না, আর সে এখন উজ্জুর মুখের দিকে চোখ খুলে তাকাবে না। এবারও লজ্জায়। কেননা, তার যে সত্যি-সত্যি খিদে পেয়েছে, এটা সে ছাড়া আর কাউকে জানতে দেবে না। নিজের চোখ খুললে যদি বুঝতে পারে উজ্জু!
কিন্তু ধরা পড়ে গেল আলা-ইজা। চোখের পাতা না-খুললেও ছোট্ট মেয়েটার ঠোট দুটি যে মুচকি হাসির ছোঁয়ায় ছটফট করছে, সেটা স্পষ্ট দেখতে পায় ওই বৃদ্ধ মানুষটা। তক্ষুনি আলা-ইজাকে বুকে তুলে নিল উজ্জু। তারপর হেসে উঠল এমন যে, ঘরটা গমগম করে উঠল।
কিন্তু উজ্জু হাসলেও আলা-ইজা হাসল না। সে ততক্ষণে চোখের পাতা খুলে ফেলেছে। আতঙ্কে সে চিৎকার করে উঠেছে, “না-আ-আ, আমি যাব না। আমি তোমার কাছে থাকব।”
উজ্জু সঙ্গে-সঙ্গে আলা-ইজার মুখখানা চেপে ধরেছে। তারপর নিজেও ভয় পেয়ে চাপা স্বরে আলা-ইজাকে সাবধান করে বলে উঠল, “আল-ইজা, চুপ, চুপ! এক্ষুনি কেউ শুনতে পেলে আর রক্ষে নেই! তোমাকে তো ধরে নিয়ে যাবেই, আমাকে পর্যন্ত হেনস্থা করতে ছাড়বে না।”
আলা-ইজার গলার স্বর সঙ্গে-সঙ্গে থমকে থেমে গেছে। বুঝতে পেরেছে তার অমন করে চিৎকার করাটা বোধ হয় ঠিক হল না। তাই এবার সে একেবারে মিনমিনে গলায় বলল, “তবে, তুমি, আমায় কেন অমন করে ধরে তুলে নিলে? আমি ভাবলুম, তুমি আমায় বাবার কাছে নিয়ে যাবে বলেই অমন করে ধরে তুলেছ।”
“আলা-ইজা, লক্ষ্মী রাজকন্যা,” আদর করল উজ্জু। তারপর বলল, “তোমার যে খিদে পেয়েছে, আগে বলোনি কেন?”
আলা-ইজা এবার লজ্জায় উজ্জুর বুকের মধ্যে মুখ লুকিয়ে ফেলল। উজ্জুও আর দেরি করল না। নিজের কোলের ওপর থেকে আলা-ইজাকে নামিয়ে, বিছানার ওপর বসিয়ে দিল। বলল, “চুপটি করে বোসো। একদম কথা বলবে না। আমার ভাঁড়ার ভর্তি খাবার। আর তুমি যে কী খেতে ভালবাসো, তাও আমি জানি।”
আলা-ইজা এবার বলল, “তুমি কেমন করে জানলে আমি কী খেতে ভালবাসি?”
“রাজার মেয়ে কী খেতে ভালবাসে, সেটা তোমার এই বৃদ্ধ উজ্জু জানবে না তো, আর-কে জানবে!”
“বলো শুনি, আমি কী খেতে ভালবাসি?”
ঘাড় নেড়ে উজ্জু বলল, “না, এখন বলব না। নিয়ে এলেই বুঝতে পারবে।” বলতে-বলতে উজ্জু তার ভাঁড়ার ঘরে দরজা ঠেলে ঢুকে গেল খাবার আনতে। আর আলা-ইজা চুপটি করে উজ্জুর আসার পথের দিকে চেয়ে রইল উৎসুক হয়ে।
বেশি দেরি করল না উজ্জু। বলতে পারো, গেল আর এল, তার হাতে বাটিভর্তি খাবার। আলা-ইজা বাটির দিকে তাকিয়ে দেখার আগেই উজ্জু খাবারটা তার পেছন দিকে লুকিয়ে ফেলল। তারপর হাসতে-হাসতে বলল, “কী এনেছি, বলো?”
আলা-ইজাও হাসতে-হাসতে উত্তর দিল, “লুকিয়ে ফেললে কেউ বলতে পারে নাকি? দেখাও, তবে তো বলব।”
“উঁ-হুঁ! আগে বললে তবে দেখাব।”
“আর না-বলতে পারলে?” জিজ্ঞেস করল আলা-ইজা।
“হেরে যাবে।” উত্তর দিল উজ্জু।
“তার মানে, আমি হেরে গেলে আমার জন্য খাবার এনে তুমি নিজেই খেয়ে ফেলবে বুঝি?”
আলা-ইজার কথা শুনে হেসে ফেলল উজ্জু। হাসতে-হাসতে বলল, “ওমা! রাজকন্যা এ কী কথা বলে!” বলতে-বলতে লুকিয়ে রাখা হাতের বাটি সামনে ধরে আদর করে গুন্গুন করে উঠল:
রাজকন্যা খায় না কিছুই
খায় যে শুধুই কিশমিশ,
গাছের ডালে দেখলে আঙুর
জিভ করে তার নিশপিশ!
হেসে উঠল দু’জনেই। বলতে-বলতে উজ্জু হাসল। হাসতে-হাসতে একটি কিশমিশ আলা-ইজার মুখে তুলে দিয়ে উজ্জু জিজ্ঞেস করল, “ঠিক বলিনি?”
আলা-ইজা উত্তর দিল:
ঠিক বলেছ উজ্জু তুমি
ঠিক বলেছ ঠিক,
তাই তো পাখি ডাকছে গাছে
চুক চিকির-র চিক!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন