শৈলেন ঘোষ

বেলা পড়ে আসছে। কে জানে, রাজকন্যা আলা-ইজাকে খুঁজে না-পেয়ে এখন রাজপ্রাসাদের অন্দরমহলে কী কাণ্ডকারখানা হচ্ছে! আলা-ইজার আর যেন কোনও ভয়ডর কিছুই নেই। ভাবনাও নেই। কেননা, সে যে এখন উজ্জুর কাছে। উজ্জুকে কেউ বকতেও পারে না, কিছু বলতেও পারে না। এমনকী আলা-ইজার বাবা, রাজাও না। আর তা ছাড়া আলা-ইজা যে এখানে লুকিয়ে আছে, সে-কথা জানতে পারলে তবে তো বকার কথা উঠবে! তা, লুকিয়ে থাকার কথা কে আর জানতে পারছে! কেউ ভাবতেই পারবে না যে, আলা-ইজা বৃদ্ধ মানুষ উজ্জুর ঘরে এখন ঘাপটি মেরে বসে আছে।
লুকিয়ে থাকাটা ঠিক না বেঠিক, উচিত না অনুচিত, যে ভাববার সে ভাবুক। কিন্তু যতই বেলা পড়ছে, এই বৃদ্ধ মানুষ উজ্জুর বুকের ভেতরটা যেন তই ঢিপঢিপ করছে। তুমি তার মুখ দেখলেই বুঝতে পারবে। সত্যি কথাই, এতক্ষণ এভাবে কাউকে কোনও খবর না দিয়ে কাজটা বোধ হয় ভাল করেনি উজ্জু। বিশেষ করে মেয়েটার যখন এখনও তেমন জ্ঞানগম্যি হয়নি। না, একটা কিছু তাকে করতেই হবে। কিন্তু কী করবে? বড্ড ভাবনায় পড়ে গেল মানুষটা।
ভাবনা যে আলা-ইজারও কম নয়, এটাও তো তোমাকে মানতে হবে। ভাবনা তার মায়ের জন্যও নয়, বাবার জন্যও নয়। ভাবনা তার ওই ছোট্ট হরিণছানার জন্য। মায়ের কাছ থেকে কেড়ে এনে তাকে যদি মেরে ফেলার ফন্দি আঁটা হয়, তবে আলা-ইজাও তার মায়ের কাছ থেকে পালিয়ে এসে কোনও অন্যায্য কাজ করেনি। হরিণের ছানাটাকে সে তার মায়ের কাছে কেমন করে যে পৌঁছে দেবে, সেই সাঙ্ঘাতিক কথাটা ভাবতে-ভাবতেই সে হাই তুলল। নজর এড়াল না উজ্জুর। সে সঙ্গে-সঙ্গে জিজ্ঞেস করল, “ঘুম পাচ্ছে আলা-ইজা?”
“কই না তো!” উত্তর দিল আল-ইজা।
“তবে হাই তুলছ কেন?” জিজ্ঞেস করল উজ্জু।
হাসল আলা-ইজা। কোনও উত্তর দিল না।
উজ্জু বলল, “শুয়ে পড়ো।”
“এখনও তো রাত হয়নি!”
“ঘুম কি শুধু রাতেই পায়! চোখে ঘুম জড়িয়ে এলে সে রাতও মানে না, দিনও জানে না।” উত্তর দিল উজ্জু।
খানিক চুপ করে রইল আলা-ইজা।
উজ্জু আবার বলল, “শুয়ে পড়ো। লক্ষ্মী মেয়ে!”
হঠাৎ সেই লক্ষ্মী মেয়ে আলা-ইজা বলে ফেলল, “আচ্ছা উজ্জু, তুমি যখন আমার মতো ছোট্ট ছিলে, তখন কে তোমাকে ঘুম পাড়াত?”
“মা।” উত্তর দিল উজ্জু।
“তুমিও মায়ের পাশে ঘুমোতে?” জিজ্ঞেস করল আলা-ইজা।
“একথা কেন জিজ্ঞেস করছ?”
“না, এমনই।” বলে থামল আলা-ইজা।
“আমি বুঝতে পেরেছি।” উত্তর দিল উজ্জু।
“কী বুঝতে পেরেছ?” চমকে তাকাল আলা-ইজা উজ্জুর মুখের দিকে।
“তোমার এখন ঘুম পাচ্ছে এটা যেমন ঠিক কথা, তেমনই মায়ের পাশে না শুলে তোমার চোখে যে ঘুম আসে না, এটাও সত্যি কথা।” বলতে-বলতে উজ্জু হাসল। হাসতে-হাসতে জিজ্ঞেস করল, “মায়ের জন্য এবার বুঝি মন-কেমন করছে?”
আলা-ইজার যেন চমক ভাঙল। সে থতমত খেয়ে বলে উঠল, “কক্ষনো না।” তারপর উজ্জুর ঘরের জানলার কাছে ছুটে গেল সে। এখান থেকে রাজপ্রাসাদের বাগানটা স্পষ্ট দেখা যায়। জানলার গরাদে মাথা ঠেকিয়ে সে বাগানটা দেখছে। দেখছে, গাছের পাতায় এখনও রোদ-ঝিলমিল করছে। একটু আগে একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। পাতা-ভর্তি বৃষ্টির ফোঁটাগুলো তখনও টুপুস-টুপুস করে গড়িয়ে পড়ছে। রোদের আলোয় মনে হচ্ছে, একটি-একটি ফোঁটা যেন কার চোখের কান্নার জল। তবে কি তার আমনা নামের ছোট্ট হরিণবন্ধুর মাও অমন করে কাঁদছে। ভারী আনচান করে উঠল আলা-ইজার মন । মনে হল, তখনই সে ছুটে যায় ওই বাগানে। কিন্তু পারল না। তার আগেই উজ্জু চুপিচুপি এসে তার মাথায় হাত রাখল। পেছন থেকে। ফিরে দাঁড়াল আলা-ইজা। এবার তার মুখে হাসির কণামাত্রও দেখা গেল না। ভার হয়ে আছে তার মুখ। উজ্জু আলা-ইজার চিবুকে হাত দিয়ে জিজ্ঞেস করল, “রাগ করলে?”
আলা-ইজা জানলার সামনে থেকে এগিয়ে গেল বিছানার কাছে। বসে পড়ল বিছানার ওপর। তারপর কী মনে হল, শুয়ে পড়ল। শুয়ে-শুয়ে বলল, “উজ্জু, আমার ছোট্ট হরিণ আমনার জন্য আমার মন-কেমন করছে!”
“তোমার কিচ্ছু ভয় নেই।” উত্তর দিল উজ্জু, “কাল সকালেই আমি সব ব্যবস্থা করে দেব।” বলতে-বলতে উজ্জু আলা-ইজার পাশে এসে বসে পড়ল।
আলা-ইজা আবার হাই তুলল।
উজ্জু বলল, “আমি বলি কী, তুমি এখন একটু ঘুমিয়ে নাও।”
আলা-ইজা মুখে টু শব্দটি পর্যন্ত করল না। শুধু একটা বোবা-পুতুলের মতো ফ্যালফ্যাল করে একবার তাকায় বাইরে, ওই জানলাটার দিকে, আর-একবার তাকায় উজ্জুর দিকে। এমনই করে তাকায় কয়েকবার। তারপর বৃদ্ধ মানুষটা, এই ছোট্ট রাজকন্যার মাথায় হাত রেখে, যেই তার চুলের মধ্যে বিলি কাটতে শুরু করল, অমনই আলা-ইজার চোখের পাতায় ঘুমের দোলা লাগল। ধীরে-ধীরে চোখ জড়িয়ে এল আলা-ইজার। আর সে পারল না। ঘুমিয়ে পড়ল। কেমন মুছে গেল তার মুখের ওপর থেকে সব দুশ্চিন্তার ছায়াগুলো। এখন যেন ভারী নিশ্চিন্ত সে। কেমন সুন্দর দেখাচ্ছে এখন মুখখানি তার!
কিন্তু উজ্জুর মুখের আনাচে-কানাচে এখন যে ভয়ানক দৃভাবনার রেখাগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে! এখন সে কী করবে? তবে কি তার এই ছোট্ট ঘরেই সে লুকিয়ে রাখবে রাজকন্যাকে। না, সেটা কখনও ঠিক কাজ নয়। তাকে রাজার কাছে পৌঁছে দিতেই হবে আলা-ইজার খবরটা। তাকে বলে আসতেই হবে, আলা-ইজাকে সে নিজের ঘরে আগলে রেখেছে। কিন্তু তারপর?
তারপর সে আর-এক কাণ্ড শুরু হবে। সারা রাজপ্রাসাদে সাজ-সাজ রব উঠবে। “খুঁজে পাওয়া গেছে, খুঁজে পাওয়া গেছে বলে মন্ত্রি-সান্ত্রী, সিপাই-সেনা হল্লা তুলবে। তারপর রাজামশাই রাজকন্যাকে উজ্জুর এই ছোট্ট ঘর থেকে নিয়ে গিয়ে রানির কোলে শুইয়ে দেবেন। তখন রানি আনন্দে আকুল হয়ে মেয়ের কপালে কতবার যে চুমো দেবেন, তার হিসেব রাখে কার সাধ্যি।
কিন্তু!
কিসের কিন্তু?

আলা-ইজার ছোট্ট হরিণ আমনার কী হবে?
রাজার হুকুমের যেমন নড়চড় হয় না, তেমনই হবে।
তার মানে, আলা-ইজার প্রাণ বাঁচাতে, বনের ওই ছোট্ট হরিণের প্রাণ যাবে?
নিশ্চয়ই। এ যে রাজজ্যোতিষীর আদেশ।
কিন্তু হায় রে, আলা-ইজার ওই ছোট্ট বন্ধু হরিণের প্রাণ গেলে যে ছোট্ট রাজকন্যা আলা-ইজা সেই ভয়ঙ্কর ব্যথা সইতে পারবে না! তখন কী হবে?
কিচ্ছু হবে না। যেমন গাছে ফুল ফুটছে, ফুটবে। যেমন নদীতে জল বয়ে যাচ্ছে, তেমনই যাবে। যেমন অন্ধকার নামে আকাশ থেকে, তেমনই নামবে। যেমন আলোয় ভরে দেয় সূর্য, তেমনই দেবে। গাছে-গাছে পাখিরা যেমন গান গায়, তেমনই গাইবে। শুধু একজন, একজনই শুধু কাঁদবে। সে আর কেউ নয়, একটি ছোট্ট মেয়ে। আলা-ইজা নামে এক রাজকন্যা।
কেন কাঁদবে?
কাঁদবেই তো! কেননা, এই রাজপ্রাসাদের তোরণে দাঁড়িয়ে আলা-ইজা নামে এক রাজকন্যা ওই যে গহন অরণ্যটা দেখতে পায়, সেই অরণ্যের গভীরে থাকে এই ছোট্ট হরিণের মা। এই মাও যে তার ছোট্ট হরিণশিশুর জন্য কাঁদছে। কাঁদছে আর খুঁজছে। সে যে কোনওদিন জানতেও পারছে না, যাকে সে খুঁজছে তার সেই দুধের বাছার প্রাণ গেছে। সে আর কোনওদিনও তার মায়ের কাছে ফিরে যাবে না। ডাকবে না। ছুটতে-ছুটতে নাচবে না। ফুলের গন্ধ গায়ে মেখে খুশিতে লুটোপুটি খাবে না।
ভাবতে-ভাবতে উজ্জুর হঠাৎ মনে হল, মেয়েটা এবার সত্যিই ঘুমিয়ে পড়েছে। খুব ধীরে, আরও ধীরে নিজের হাতটা সরিয়ে নিল আলা-ইজার ঢেউভাঙা চুলের ওপর থেকে। খুব সাবধানে। যেন তার ঘুম না ভাঙে।
না, আলা-ইজার ঘুম ভাঙল না।
এবার? এবার তা হলে কী করবে উজ্জু? সে কি ঘুমন্ত রাজকন্যাকে তার বুকের মধ্যে আগলে নিয়ে তার মায়ের কাছে পৌঁছে দেবে? না, না। যদি ঘুম ভেঙে যায়! যদি মেয়েটা আচমকা চিৎকার করে কেঁদে ওঠে! যদি সে এই বৃদ্ধ মানুষটার বুকের ওপর থেকে লাফিয়ে পড়ে আবার ছুট দেয়! আবার কোথাও লুকিয়ে পড়ে, তখন! তখন যে এই বৃদ্ধ মানুষটাকেই সবাই দুষবে। রাজকন্যাকে লুকিয়ে রাখার অপরাধে যে তার মাথাটা কাটা যাবে না, এমন কথা কেউ বলতে পারে না। মেয়েটা ঘুমিয়ে থাকুক। নিশ্চিন্তে। সেই ভাল। এখন বরং তার আদরের হরিণছানা আমনার প্রাণটা কেমন করে রক্ষা করা যায়, সেই উপায়টা বের করা যায় কিনা, তাই ভাবা যাক!
হয়তো রক্ষা করা যায় না।
কেননা, এ যে রাজার আদেশ।
ঠিক কথা, রাজার আদেশ। কিন্তু কার কথা শুনে রাজা এ-আদেশ দিয়েছেন?
তিনি হলেন রাজজ্যোতিষী।
এমনও তো হতে পারে, রাজজ্যোতিষী ভুল করছেন।
ভুলই তো! নইলে রাজকন্যার অসুখই যদি করে, তবে উজ্জু নামে এই বৃদ্ধ মানুষটা এতক্ষণে এতটুকু টের পেল না। সেই কখন থেকে মেয়েটা তার কাছে আছে। অসুখ করলে একবারও তো সে মুখে বলবে, ‘ভাল লাগছে না।’ কই, তেমন কথা তো উজ্জু শোনেনি রাজকন্যার মুখ থেকে। এখনও দ্যাখো, মেয়েটা কেমন অকাতরে ঘুমোচ্ছে। দ্যাখো কী মিষ্টি দেখতে লাগছে! না, না, এ-আদেশ রাজাকে ফিরিয়ে নিতেই হবে। অকারণে একটা ছোট্ট হরিণের প্রাণকে ছিনিয়ে নেওয়া, এ যে বড় নিষ্ঠুর কাজ। উজ্জু যাবে রাজার কাছে। রাজাকে বলবে, এ-কাজ বন্ধ করতে! রাজকন্যার বন্ধু হরিণকে বাঁচাতে।
না, আগে রাজার কাছে যাওয়া নয়। যার উপদেশ শুনে রাজার এই হুকুম, সেই রাজজ্যোতিষীর কাছে আগে যেতে হবে। তাঁকেই আগে জিজ্ঞেস করতে হবে, সত্যিই কি রাজজ্যোতিষী রাজকন্যার বিপদ দেখেছেন!
বৃদ্ধ মানুষ উজ্জু এই কথা ভেবে রাজজ্যোতিষীর কাছেই আগে ছুটল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন