সপ্তম অধ্যায়

শৈলেন ঘোষ

বোধ হয় ভোর হতে আর বেশি দেরি ছিল না। যদিও কয়েদের মধ্যে একফোঁটাও ঘুম উজ্জুর চোখের পাতা ছুঁতে পারেনি, তবু, একনাগাড়ে কতক্ষণ আর একটা বৃদ্ধ মানুষ জেগে থাকতে পারে! কিন্তু আশ্চর্য কথা, রাজার কাছে বিদায় নিয়ে সে যখন ধীরে-ধীরে বনের ভেতর প্রথম পা দিল, তখনও পর্যন্ত যেমন তার ঘুমও ছিল না চোখেতে, তেমনই এককণা, ভয়ও ছিল না মনেতে। কিন্তু ভোরের প্রথম আলো ঘন বনের বাধা ডিঙিয়ে যখন এদিকে-ওদিকে উঁকি দিতে শুরু করল, তখনই কেমন যেন ধাঁধা লেগে গেল উজ্জুর। কেননা, এতক্ষণ তার মনে হচ্ছিল, সে বোধ হয় অন্ধকার ভেঙে ঠিক লক্ষ্যের দিকেই চলেছে। কিন্তু আলো দেখে তার মুখখানা কালো হয়ে গেল। বনে যে সে কতবার এসেছে, তা হাতে গোনা যায় না। উজ্জুর বাবা যখন ছিলেন, সেই তখন থেকে বন তার চেনা। কিন্তু এখন সে যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, এ-বন কিন্তু তার সেই চেনা বন নয়। এই মস্ত বনের সবটা যে তার চেনা হবে, এমন কথা ভাবাও বোকামি। তবে এ-বোকামি তাকে হয়তো করতে হত না, যদি উজ্জু অন্ধকার রাতেই সাতপাঁচ না ভেবে ঢুকে পড়ত বনের ভেতর। আর রাজাকেও বলি, তুমিও তো লোকটাকে বারণ করবে! রাতটাকে কাটতে দাও না! তারপর খোঁজাখুঁজি করলে কী এমন ক্ষতি হত? যা হওয়ার সে তো হয়েই গেছে। এখন অত তড়বড় করলেই কি আলা-ইজা চোখের পলকে তোমার চোখের সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ে জিজ্ঞেস করবে, “এখানে কেন দাঁড়িয়ে আছ বাবা?” অত সহজ নয়।

থাক সে-কথা। কিন্তু এখন উজ্জু কী করবে শুনি? কোথায় যাবে রাজকন্যাকে খুঁজতে? উজ্জুর মতো এমন বুদ্ধিমান লোকের এখন কী অবস্থা!

একটা মানুষের পেটে যদি অনেকক্ষণ থেকে একটি দানাও না-পড়ে, কিংবা সেই মানুষটিকে যদি সারারাত জেগে-জেগে বনবাদাড়ে রাজকন্যা আলা-ইজার মতো একটি ছোট্ট মেয়েকে খুঁজে-খুঁজে চিৎকার করতে হয়, তবে মানুষটার শরীরের হাল যে কী হতে পারে, সে-কথা খুলে না-বললেও কে না বোঝে! তার ওপর সে যদি উজ্জুর মতো বৃদ্ধ মানুষ হয়, তবে তো আর কথাই নেই। ভাগ্য ভাল যে, তাকে সাপে কাটেনি। কিংবা বুনো-কুকুরে তাড়া করেনি। সে ভয়টা যে এখনও নেই, তা যেন ভেবে বোসো না। কারণ, উজ্জু এখন যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে সাপ আর বুনো-কুকুর তো কোন ছার, বাঘ-ভাল্লুকও থাকতে পারে! কিন্তু থাকলেই বা কী করা! আর যে পা চলে না উজ্জুর। শরীর বয় না। মনে হয়, এখানেই একটু গাছের গায়ে ঠেসান দিয়ে জিরিয়ে নিলে ভাল হয়। অবশ্য চোখের সামনে আঙুরগাছে থোকা-থোকা আঙুর ঝুলছে। কাজেই একেবারে উপোস করেও থাকতে হবে না। খালি পেটে যা হোক একটু রসদ তো পড়বে!

সত্যি-সত্যিই এগিয়ে গেল উজ্জু ওই গাছটার নীচে। রস-টুসটুস একথোকা আঙুর পেড়ে নিল। তারপর দেখেশুনে একটা গাছের নীচে বসে পড়ল। আঃ! পা দুটো যেন তার রেহাই পেল এতক্ষণে। তারপর আঙুরের থোকা থেকে একটি-একটি আঙুর মুখে পুরে একটানা অনেকক্ষণের উপোসটা ভেঙে ভাবতে লাগল, না জানি এই বনের কোলেই তাকে শেষ হয়ে যেতে হয়! সত্যিই তো! এ তো আর যেমন-তেমন বন নয়। তুমি যত গভীর ভাবছ, তার চেয়ে আরও গভীর এক অরণ্য। এখানে পথ হারালে, কেউ বলে দেওয়ার নেই পথের নিশানা। এখন তো সেই হালই হয়েছে উজ্জুর। কে তাকে পথের হদিস বলে দেবে! কোনদিকে আছে এই বন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পথ?

একটি-একটি করে অনেক ক’টা আঙুর খিদের চাপে খেয়ে ফেলল উজ্জু। আর ভাল লাগছে না। একসঙ্গে এত রসালো আর মিষ্টি ফল খেলে গা গুলিয়ে ওঠে। তাই হাতে তখনও বাকি যে ক’টা আঙুর ছিল, বনের ঝোপে ছুড়ে ফেলে দিল। যাক, তবু ভাল যে খিদেটা খানিক বাগে এসেছে। খিদে মিটলেও গাছের নীচে বসার এই আরাম ছেড়ে এখন আর উঠতে ইচ্ছে করছে না। সে তো বটেই। সারারাত ঘুম নেই চোখে। তাই এখন যদি ঘুমের আবেশে তার চোখ জড়িয়ে আসে, তা হলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। বলতে-না-বলতেই হাই উঠল উজ্জুর। চোখ দুটোও বুজে গেল। গাছের গায়ে ঠেসান দিয়েই ঘুমিয়ে পড়ল উজ্জু। আর কিচ্ছু জানে না সে। ঘুমটা কেমন যেন একটা অদ্ভুত ঘটনা! ঘুমিয়ে পড়লে মানুষের কোনও ভাবনাও থাকে না, কিছু মনেও পড়ে না। ঘুম মানে শুধু আরাম। অকাতরে ঘুমোলে এই আরামটাও যে কী, তারও খেয়াল থাকে না। অবশ্য যখন ঘুমের ঘোরে আমরা স্বপ্ন দেখি, সে অন্য কথা। কিন্তু এখন উজ্জুকে দেখলে তোমার কিছুতেই মনে হবে না, মানুষটা স্বপ্ন দেখছে। কোনও সাড়ই নেই। ডাকলে হয়তো সাড়া পাবে। কিন্তু তাকে দেখে ভেংচি কাটো, কি মুচকি হাসো, বয়েই গেছে। চোখ ঘুমে যেমন বুজে আছে, তেমনই থাকবে, চোখও খুলবে না। মানুষটাও নড়বে না, চড়বে না। তোমার ভেংচি কাটাই সার। কাজেই, কে এমন বোকা আছে যে, ঘুমন্ত মানুষকে ভেংচি কাটে!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%