প্রথম অধ্যায়

শৈলেন ঘোষ

আলা-ইজার অনেক সকালে ঘুম ভেঙে গেছল। মেয়েটা বোধ হয় সারারাত ঘুমোতেই পারেনি। যখনই চোখের পাতায় ঘুম জড়িয়ে এসেছে, তখনই চমক ভেঙেছে তার। কতবার যে এমনই করে চমকে উঠেছে সে! আর যতবার চমকে উঠেছে, ততবারই চোখের ওপর ভেসে উঠেছে সেই ছোট্ট হরিণের মুখখানা। তার চোখ দুটি। সারাটা দিন তার সঙ্গে খেলা করেছে আলা-ইজা। এই রাজপ্রাসাদের বাগানটা তো আর একটুখানি নয়। দেওদার গাছের ফাঁকে-ফাঁকে কত যে আঙুরগাছের সারি। লুকোচুরি খেলতে কী মজা! বলতে পারো, আলা-ইজা ওই ছোট্ট হরিণটার সঙ্গে লুকোচুরি খেলেছে। এ-গাছ ও-গাছ লুকিয়ে-ছাপিয়ে সে যেই না একটু হাত বাড়িয়েছে, অমনই হরিণ লতাপাতার ফাঁক দিয়ে ছুট দিয়েছে। কী সুন্দর লাফায় হরিণটা। ছোট্ট হলে কী হবে, একনম্বরের চালাক। অবশ্য আলা-ইজার চেয়েও সে চালাক কি না, সে-কথা বলতে পারব না। নইলে একবার কেন আলা-ইজার হাতে ধরা পড়ে গেল! আসলে ছোট্ট হরিণটা আলা-ইজার হাতে ধরা পড়ল, না, আলা-ইজা নামের এই ছোট্ট মেয়েটির হাতে ধরা দিল, সেইটাই হচ্ছে কথা।

দ্যাখো কী সুন্দর দেখতে হরিণছানাটাকে। হলুদ-হলুদ গায়ে বাদাম-বাদাম ছোপ। কেমন নরম দুটি চোখ। ছোট্ট তো, তাই এখনও শিংই ওঠেনি। যা উঠেছে তাও একটু-একটু। সবে উঁকি দিয়েছে। তেমনই ছোট্ট একটুখানি লেজ। তুমি ধরতে যাও, তিড়িং। এমন লাফ দেবে! তোমার সাধ্যি নেই তার নাগাল পাও। আলা-ইজাও যে কতবার চেষ্টা করেছে! কিন্তু শেষকালে হরিণছানাটা এমন কাণ্ড করল! নিজেই দাঁড়িয়ে পড়ল হঠাৎ। আর অমনই ছুট্টে গিয়ে আলা-ইজা জড়িয়ে ধরল হরিণছানাকে। কী বলব, একবারের জন্যও ছানাটা টানামানি করল না। একবারের জন্যও আলা-ইজার দু’ হাতের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টাও করল না। উলটে আলা-ইজার মুখের কাছে মুখ নামিয়ে কেমন আলতো চোখে তাকিয়ে রইল। খুশিতে আলা-ইজারও মুখখানি উছলে উঠল। হরিণছানাকে জড়িয়ে ধরে আলা-ইজা চেঁচিয়ে উঠল, “কী দুষ্টু, আমাকে এমন খাটাল যে, আমি হাঁপিয়ে মরি।” বলতে বলতে আলা-ইজা তার ছোট্ট হাত বাড়িয়ে হরিণছানার গালটা দিল টিপে! তারপর বলল, “আমনা, তোর নাম রাখলুম, আমনা। বুঝলি!” বলে, প্রায় সারাদিন ওই হরিণের সঙ্গে খেলা করতে-করতে তার সময় কেটে গেল। একটি ছোট্ট হরিণের এখন এক ছোট্ট বন্ধু আলা-ইজা। হরিণছানা লাফায়, আলা-ইজাও লাফিয়ে-ছুটে ধরে ফেলে হরিণকে। আবার আলা-ইজা ছুটে পালালে, হরিণও তাকে ধরতে ছোটে। গাছের ডালে ঝুলন্ত থোকা-থোকা আঙুর। দেখতে পায় হরিণছানা। দাঁড়ায়। তাক কষে লাফ দেয়। ছুঁই-ছুঁই করেও তার মুখ ছুঁতে পারে না ওই থোকা-থোকা আঙুর। হেসে ওঠে আলা-ইজা। হাততালি দেয়। তারপর আলা-ইজা নিজের হাতে গাছের ডাল ছুঁয়ে টান দেয়। একটি থোকা ছিঁড়ে ফেলে গাছের ডাল থেকে। রস-টুসটুস একটি-একটি আঙুর হরিণের মুখে দেয়। একটি-একটি নিজে খায়। আঃ! কী মিষ্টি খেতে! হরিণছানা আরও চায়। আরও দাও। আলা-ইজা এ-গাছের আঙুর পেড়ে, ও-গাছে ছোটে। ও-গাছ থেকে আর-এক গাছে। তারপর চুপটি করে বসে পড়ে ঘাসের ওপর। হরিণছানার গলাটি জড়িয়ে ধরে বলে, “আর না। বেশি খাওয়া ভাল নয়।” বলতে-বলতে গল্প জুড়ে দেয়। সে কত গল্প। কখনও সে সুমুদ্দুরের গল্প বলে। কখনও বলে আকাশের। কখনও-বা আগুনের। কোন গল্পটা যে হরিণের ভাল লাগে, সে ঠাহর করতে পারে না। দ্যাখো না, ছানাটা খালি ছটফট করছে। শেষকালে আচ্ছা করে বকা দিল আলা-ইজা। কান মলে দিল। তারপর নিজের কাছে টেনে নিল হরিণছানাকে। তার মাথাটা নিজের কোলে রেখে আদর করে বলল, “আমনা আমার, এবার ঘুমো, লক্ষ্মীটি।”

হরিণছানা ঘুমিয়েছিল কিনা আলা-ইজা জানে না। কারণ আর তো বেশিক্ষণ রাজপ্রাসাদের বাগানে সে থাকতে পারেনি। একটু পরেই তার খোঁজ পড়েছিল। একটু পরেই রাজপ্রাসাদের এ-মহল ও-মহল সব মহলেই আলা-ইজাকে তন্নতন্ন করে খুঁজে বেড়িয়েছেন তার মা। মায়ের সঙ্গে বাবা। বাবার সঙ্গে সারা রাজপ্রাসাদের যত মানুষ, সবাই। তবে কি আলা-ইজা কাউকে না-বলেই রাজপ্রাসাদের বাগানে ঢুকেছিল হরিণছানার সঙ্গে খেলা করতে! তা তো বটেই। নইলে প্রাসাদ জুড়ে এমন হইহই পড়ে যায়! খোঁজ-খোঁজ! কোথায় গেল মেয়েটা! মেয়েটা অবশ্য নিজেই বেরিয়ে এসেছিল বাগান থেকে। তা রাজপ্রাসাদের হাজারখানেক লোক যদি একসঙ্গে ‘আলা-ইজা’, কিংবা ‘রাজকন্যা’ অথবা ‘আলা’ বা ‘ইজা’ বলে ডাকতে শুরু করে দেয়, তখন সে-ডাক আলা-ইজার কানে পৌঁছতে কি বেশি সময় লাগে! আলা-ইজা তো আর কালা নয়। সে বাগান থেকে বেরিয়েই হতভম্ব হয়ে গেছে। কত লোক রে বাবা! মা তো আছেনই। তাঁর সঙ্গে বাবা। বাবার পেছনে একটা গোটা বাহিনী। যুদ্ধে যাওয়ার জন্য তৈরি যেন! মা আলা-ইজাকে দেখতে পেয়েই পড়িমরি করে ছুটে গেলেন। মেয়েকে জড়িয়ে ধরে একবুক নিশ্বাস ফেলে কেঁদে উঠলেন মা। আলা-ইজা ফ্যালফ্যাল করে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আমতা-আমতা করে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে মা?”

মা কিছু লার আগেই আলা-ইজার গালে-কপালে, চোখে-মুখে বারবার চুমো দিতে লাগলেন।

আলা-ইজা তো থ’। তাই এবার মায়ের মুখখানা নিজের দুটি ছোট্ট হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে আবার জিজ্ঞেস করল, “বলো না, কী হয়েছে? বাবার সঙ্গে এত লোকজন কেন?”

মা এবার উত্তর দিলেন, “তুই যে হারিয়ে গেছলি মা। তোকে যে আমরা কখন থেকে খুঁজছি আলা-ইজা।”

আলা-ইজা মায়ের কথা শুনে এবার খিলখিল করে হেসে উঠল। হাসতে-হাসতে বলল, “কে বলল আমি হারিয়ে গেছি! আমি তো বাগানে ছিলুম। খেলা করছিলুম।”

“একা?” উদ্বেগভরা গলায় জিজ্ঞেস করলেন মা।

“একা কেন?”

“তবে?”

“একটা ছোট্ট হরিণছানার সঙ্গে।”

“হরিণছানা? কোত্থেকে এল?”

“আমি কেমন করে জানব! কী সুন্দর দেখতে। আমি তার নাম রেখেছি, ‘আমনা’। দেখবে তো চলো না!” বলে আলা-ইজা মায়ের হাত ধরে টান দিল।

“না।” আলা-ইজার বাবার গলা গমগম করে উঠল। হরিণছানাটা আনা হয়েছে তোমার খেলা করার জন্য নয়। তোমার অসুখ সারাবার জন্য।”

আলা-ইজা চমকে তাকাল বাবার চোখের দিকে। বাবার চোখ যেন জ্বলছে গনগন করে।

বাবার চোখের দিকে তাকাতেই বাবা বললেন, “তুমি এখন মায়ের সঙ্গে অন্দরমহলে নিজের ঘরে যাও! তোমাকে বাগানে যেন আর না ঢুকতে দেখি।”

আলা-ইজার হাসিখুশি মুখখানা হঠাৎ কেমন যেন চুপসে গেল। সে একবার মায়ের মুখের দিকে, আর-একবার বাবার মুখের দিকে চোখ ঘুরিয়ে তাকাল। তারপর অবাক গলায় জিজ্ঞেস করল, “অসুখ কী মা?”

মায়ের বদলে বাবা উত্তর দিলেন, “সে তোমার জানবার দরকার নেই। তোমাকে এখন যা বলছি তাই করো, অন্দরমহলে যাও!”

অগত্যা আলা-ইজা মায়ের সঙ্গে অন্দরমহলেই চলে গেল। ইচ্ছে না-করলেও তাকে যেতে হলই। বাবার হুকুম। কিন্তু অসুখ জিনিসটা কী, সেটা জানার জন্য তখন থেকেই তার মন ছটফট করতে লাগল। আর সেই অসুখ সারাবার জন্য হরিণছানাটাই বা কী কাজে লাগবে, এই কথাটা ভাবতে-ভাবতেও তার বুকের ভেতরটা তোলপাড় শুরু করে দিল। তবু তাকে যেতেই হল নিজের ঘরে, মায়ের সঙ্গে।

আলা-ইজার ঘরখানা কী সুন্দর! ঘর-ভর্তি যত খেলনা, তত ছবি। রঙে-রঙে ঝলমল করছে। ঝলমল করছে তার পোশাক-আশাক। ঝকঝক করছে খাট-বিছানা। তকতক করছে ঘরের মেঝে, দরজা-জানলা। তা একজন রাজকন্যার ঘর এমন হবে না তো কি তোমার-আমার ঘরের মতো হবে?

আলা-ইজা যে রাজকন্যা, সেটা অবশ্য তোমরা অনেক আগেই জানতে পেরেছ। এই রাজপ্রাসাদের মালিক যে তার বাবা, বাবা যে একজন রাজা, সে তো আর বলবার দরকার নেই। একবার ওই রাজপ্রাসাদের তোরণটার দিকে চেয়ে দ্যাখো! দ্যাখো, প্রাসাদের তোরণটা কী ভয়ানক উঁচু। মনে হচ্ছে, তোরণের মাথাটা আকাশে ঠেকে যায় বুঝি। ওই তোরণের নীচে আলা-ইজা দাঁড়ালে, আর তুমি যদি ওই তোরণের ওপর থেকে আলা-ইজাকে দ্যাখো, তখন তোমার ঠিক মনে হবে, আলা-ইজা যেন এইটুকু একটি রাজকন্যা-পুতুল। এমনিতে বয়সেও আলা-ইজা এইটুকু। সবে সাতে পা দিয়েছে। তা হলে কী হয়, আলা-ইজা যখন ইচ্ছে তখন, ওই অত উঁচু তোরণটার অগুন্‌তি সিঁড়ি টপকে, তরতর করে ওপরে উঠে যেতে পারে। একেবারে চুড়োয়। একটুও কষ্ট হয় না তার। তবে একটু হাঁপিয়ে যেতেই পারে। সে সবাই হাঁপায়। তোমাকে তরতর করে উঠতে হবে না। এমনই এক-পা, দু’-পা করে ওঠো, দেখি কেমন পারো! হাঁপ ধরার কথা ছেড়েই দাও, এমন পা টনটনিয়ে যাবে যে, তার ঠেলাতেই অস্থির।

ওই তোরণের চুড়োর ওপর থেকে স্পষ্ট দেখা যায় একটা গভীর বন। যখনই চুড়োয় ওঠে আলা-ইজা, তখন আর কিছু দেখতে ইচ্ছে করে না তার। শুধু অবাক চোখে চেয়ে থাকে ওই বনটার দিকে। ওই বন যেন আলা-ইজাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। ও শুনেছে, ওই বনের গহনে আছে সাপ, ভয়ঙ্কর। আছে অজস্র পোকামাকড়, বিষাক্ত। কত বুনো কুকুর, হিংস্র। আছে জাগুয়ার আর হরিণ। তার দেখতে ইচ্ছে করে। সব দেখতে ইচ্ছে করে। ইচ্ছে করে বনের গভীরে হারিয়ে যেতে। সে যে কী মজার! কিন্তু সে পারে না। বনের ভেতর হারিয়ে যাওয়ার উপায় যে তার নেই! এই দ্যাখো না, বাগানে ঢুকে ছোট্ট হরিণছানাটার সঙ্গে একটু খেলা করেছে, তাই-ই নিয়ে কী কাণ্ড! আলা-ইজার বাবা পর্যন্ত চোখ রাঙিয়ে কত বকাবকি করলেন তাকে। সে অন্যায়টা কী করেছে? একটু খেলা বই আর তো কিছু নয়! তাও কার সঙ্গে, না, একটা ছোট্ট হরিণছানার সঙ্গে। তার বুকটা ছ্যাঁত করে ওঠে। আবার মনে পড়ে যায় হরিণছানাটার মুখখানা। কী যেন নাম রেখেছে তার! হ্যাঁ-হ্যাঁ, আমনা। আশ্চর্য তো! কেমন হঠাৎ এই নামটাই তার মুখে এসে গেল। কেন, অন্য আরও তো অনেক নাম ছিল। অন্য আর-একটা ভাল নাম তো সে রাখতে পারত! কিন্তু আলা-ইজার বাবা যে আরও বিচ্ছিরি একটা কথা বললেন। বললেন, তার অসুখ হয়েছে। শুনি, অসুখ কথাটাই-বা কী এমন শুনতে ভাল! একদম বাজে। অসুখ আবার কী কথা! কস্মিনকালে এ কথা শোনেনি আলা-ইজা। কিন্তু তার বাবা কেন বললেন, হরিণছানাটাকে আনা হয়েছে তার অসুখ সারাবার জন্য? আলা-ইজা একটা কথার সঙ্গে আর-একটা কথার কোনওই মানে খুঁজে পায় না। কাজেই, সে মায়ের সঙ্গে নিজের ঘরে এসে এই কথাটাই বারবার ভাবতে লাগল। ভাবতে-ভাবতে অন্যমনা হয়ে বাইরের জানলায় চোখ মেলে আকাশটার দিকে তাকিয়ে রইল। হয়তো আর খানিক পরে সূর্য অস্ত যাবে। আলা-ইজা জানে, সূর্য দেবতা। এই রাজপ্রাসাদের ঠিক সামনেই একটা মন্দির। সে-মন্দিরে সূর্য-দেবতার মূর্তি আছে। একটা জাগুয়ারের মুখের ভেতর থেকে সূর্য বেরিয়ে আসছেন। লাল টকটক করছে তাঁর সেই মূর্তি। এখন আকাশের গায়ে যে-সূর্য আলো ছড়িয়ে ঝলমল করছেন, একটু পরে তিনিও যখন অস্ত যাবেন, আকাশ উপচে তখন রঙিন আলো ছড়িয়ে পড়বে। ছড়িয়ে পড়বে যেমন এই প্রাসাদের আনাচে কানাচে, তেমনই প্রাসাদের বাগানেও। সেখানে আলা-ইজার বন্ধু আমনা আছে। তার হলুদ-হলুদ গা-টা তখন না-জানি সেই রঙিন আলোর আস্তরণে কী সুন্দরই না দেখাবে! অবশ্য এই জানলার জাফরি দিয়ে যখন সেই আলো আলা-ইজার। মুখের ওপর ছড়িয়ে পড়বে আলপনার আঁকিবুকি কেটে, তখন আলা-ইজাকেও কী সুন্দরই না দেখতে লাগবে!

কিন্তু এ কী! মেঘ দেখা দেয় কেন? হঠাৎ মেঘে-মেঘে আকাশ ছেয়ে গেল কেন? কেন ছেয়ে গেল, সে কথা এই ছোট্ট মেয়েটা এখনও না-জানলেও, এমনটা যে যখন-তখন হয়, সেটা তার জানাই। আলা-ইজার বাবার এই রাজপ্রাসাদটা যেমন বনের কাছাকাছি, তেমনই তাঁর রাজ্যটাও। ওই যে গহন বনটা আলা-ইজা প্রায় দেখতে পায় রাজপ্রাসাদের তোরণে উঠে, সেই বনের আড়ালে-আড়ালে আরও যে কত রাজার রাজপ্রাসাদ আছে, তা জানে না আলা-ইজা। জানে না, সারা বছরের প্রায় সব দিনগুলোই বা কেন বৃষ্টিতে ভিজে থাকে। সে জানে না ওই বন বৃষ্টির দোসর। ওই বনকে বলে বৃষ্টি-বন। বন আছে বলেই বৃষ্টি নামে মেঘের ভেলায় দুলতে-দুলতে । বৃষ্টি বুঝি বনকে ভালবাসে!

হ্যাঁ, সত্যিই বৃষ্টি নামল। আলা-ইজার মনটাও আনচান করে উঠল। আহা রে! তার ছোট্ট হরিণ আমনা যে ভিজে যাবে! কী হবে তখন?

আলা-ইজা জানে না, ওই বৃষ্টিতে তার ছোট্ট বন্ধু আমনার কিচ্ছু হবে না। আমনা যে বনের জীব। তার মতো সে তো রাজপ্রাসাদে থাকে না। রাজপ্রাসাদের জানলা দিয়ে বৃষ্টির যেটুকু ছাঁট আলা-ইজার গায়ে লাগে, সেইটুকু দেখলেই সবাই ‘গেল-গেল’ বলে হল্লা শুরু করে দেয়। সুতরাং এখন, এই বৃষ্টির সময় আলা-ইজার মা তাকে জানলায় দাঁড়াতে দেখে আদর করে ডাক দিলেন, “আলা!”

আলা-ইজা মুখ ফিরিয়ে মায়ের দিকে ঘুরে দাঁড়াল।

মা বললেন, “এদিকে এসো। বৃষ্টির জলে ভিজে যাবে।”

আলা-ইজা উত্তর দিল, “আমি ভিজলে কী হয়েছে! আমার ছোট্ট হরিণ যে ভিজে যাচ্ছে।”

মা বললেন, “বাদলা-বৃষ্টিতে ওদের কিচ্ছু হয় না। তোমায় ভিজতে নেই।”

“কেন মা?” জিজ্ঞেস করে আলা-ইজা।

“বৃষ্টি ভাল নয়।” উত্তর দেন মা।

“বৃষ্টি আমার ভাল লাগে।” বলতে-বলতে জানলার বাইরে হাত বাড়িয়ে দেয় আলা-ইজা। ওর ছোট্ট দুটি হাতের ওপর বৃষ্টির ফোঁটারা ছড়িয়ে পড়ে।

মা ছুটে আসেন। আলা-ইজার হাত ধরে টান দেন। ব্যস্ত হয়ে বলেন, “অমন করতে নেই।”

“কেন করতে নেই?” নরম গলায় জিজ্ঞেস করে মায়ের চোখের দিকে চেয়ে থাকল আলা-ইজা।

মা বললেন, “শুনলে না, তোমার অসুখ হয়েছে।”

এবার জানলার ধার থেকে ছুটে এসে মাকে জড়িয়ে ধরল। তারপর বলল, “অসুখ! হ্যাঁ, তখন বাবাও বলল। তোমরা সবাই অসুখ-অসুখ করছ। সেটা কী, তা তো বলছ না!”

“শুনতে নেই।” মা উত্তর দিলেন।

“তবে আমিও তোমার কথা শুনব না।” বলতে-বলতে আলা-ইজা মায়ের হাত ছাড়িয়ে আবার ছুটে গেল জানলার কাছে। আবার হাত বাড়িয়ে দিল জানলা গলিয়ে বৃষ্টির জলে। বৃষ্টির ফোঁটারা এখন ওর হাতের ওপর নাচছে যেন!

মা এবার একটুখানি গলা চড়ালেন। গলা চড়িয়ে একটু-একটু বকা দিলেন, “কী হচ্ছে কী, আলা! বলছি না, অমন করতে নেই।” বলতে-বলতে আলা-ইজার মা আবার মেয়েকে জানলার ধার থেকে টেনে আনতে গেলেন। পারলেন না। কেননা, তার আগেই আলা-ইজার চোখ ছলছলিয়ে উঠেছে। আলা-ইজা জানলার ধার থেকে নিজেই ছুটে এসে বিছানায় মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলল।

হয়তো মা অতটা বুঝতে পারেননি। আলা-ইজা যে একটুখানি বকা খেয়ে অতখানি কেঁদে উঠবে, এ-আর মা জানবেন কেমন করে! তাই থতমত খেয়ে গেছেন মা আচমকা মেয়ের কান্না দেখে। তাড়াতাড়ি ছুটে এসেছেন মেয়ের কাছে। মেয়ের মুখখানি নিজের কোলে তুলে নিয়ে আদর করতে লাগলেন। মিষ্টি-মিষ্টি গলায় বললেন, “ছিঃ আলা, তুমি না এখন বড় হয়েছ। বড় হলে কেউ কাঁদে না। লোকে কী বলবে!”

আলা-ইজা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়েই উত্তর দিল, “তুমি আমায় বকলে কেন?”

“আচ্ছা ঠিক আছে, আর কখ্‌খনও বকব না।” মা আলা-ইজার চোখের জল মুছে দিতে দিতে বললেন।

আলা-ইজাও উত্তর দিল, “হ্যাঁ, তোমাদের সব মিথ্যে কথা। একটু আগে বাবাও আমাকে বকল। কেন? কেন বলল, আমার অসুখ হয়েছে! আমি যতবার জিজ্ঞেস করছি অসুখ কী, তুমিও বলতে চাইছ না। আমায় এখন না-বললে আমি তোমার কথাও শুনব না। আমি কাঁদব।”

“ছিঃ! আলা, মায়ের কথা অমন করে অমান্য করতে নেই।”

মা আলা-ইজাকে আদর করে আরও কাছে টেনে নিলেন।

“তুমিই বা আমার কথা কেন শুনছ না? কেন বলছ না, আমার কী হয়েছে? খালি বলছ অসুখ হয়েছে। কেন বাবা বলল, হরিণছানাটা আনা হয়েছে আমার অসুখ সারানোর জন্য, খেলা করবার জন্য নয়?”

মা বললেন, “ঠিক আছে, বলছি। তুমি আর কাঁদবে না বলো?”

“আগে বলো!” গোঁ ধরল আলা-ইজা।

মা আলা-ইজার চোখের দিকে একদৃষ্টে তাকালেন। তখনও আলা-ইজার চোখের পাতায় জল ছড়িয়ে আছে। তারপর খুব ভয়ে-ভয়ে বললেন, “আলা আমার, লক্ষ্মী মেয়ে, তোমার অসুখ করেছে মানে, তোমার শরীর ভেঙে যাচ্ছে। তুমি রোগা হয়ে যাচ্ছ।”

আলা-ইজা মায়ের কোল থেকে ছিটকে উঠে, চমকে তাকাল মায়ের মুখের দিকে। তারপর বিছানা ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল মায়ের সামনে। মায়ের চোখের পলক পড়ে না। আলা-ইজা অবাক হয়ে উত্তর দেয়, “ও, এর নাম অসুখ! কই আমার অসুখ করেছে? আমার অসুখ করেছে, অথচ আমি তো কিছু জানি না। আমার তো ছুটতে-হাঁটতে কোনও কষ্ট হয় না। আমি তো তোমাদের কিছু বলিনি।”

“আলা-ইজা, তুমি তো এখন ছোট্ট, তাই বুঝতে পারছ না। তুমি এখন খেলছ, ছুটছ, হাসছ, কথা বলছ। কিন্তু ক’দিন পরে তুমি আর কিছুই পারবে না। তোমাকে শুধু বিছানায় শুয়ে থাকতে হবে।” মা এক নিশ্বাসে গড়গড় করে কথাগুলো বলে গেলেন।

“এমন কথা তোমরা কেমন করে জানলে?” আলা-ইজা জিজ্ঞেস করল মাকে।

“তোমার বাবা জেনেছেন।” উত্তর দিলেন মা।

“কোত্থেকে?” আল-ইজা চোখ ঠেরে জিজ্ঞেস করল।

মা বললেন, “জানি না।”

“তা হলে আমার অসুখ সারাবার জন্য হরিণছানাকে কেন নিয়ে আসা হয়েছে, সেটাও বুঝি জানো না?” বেশ রাগী-রাগী গলায় জিজ্ঞেস করল আলা-ইজা।

“জানি।”

“কী জানো?”

“ওই হরিণছানাটার প্রাণ বেরিয়ে গেলে, তোমার আর অসুখ করবে না। তোমার প্রাণ বাঁচবে।” উত্তর দিলেন আলা-ইজার মা।

“ও! তার মানে আমার অসুখ ভাল করার জন্য ওই হরিণছানার প্রাণ নিতে চাইছ তোমরা! না-আ-আ!” যেন চিৎকার করে ককিয়ে উঠল আলা-ইজা। তারপর হঠাৎই থমকে গেল তার চিৎকার। থমথম করতে লাগল তার মুখখানা। মেয়ের সেই মুখ দেখে ভয় পেলেন মা। মেয়েকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরলেন মুহূর্তে। কেননা, মায়ের নিজেরই বুকখানা তখন ধড়ফড় করছে। মেয়ে তাঁর আচমকা চিৎকার করে হঠাৎ এমন করে চুপ করে গেল কেন! মা আকুল হয়ে আলতো গলায় আদর করে ডাক দিলেন, “আলা আমার, অমন করে রাগ করতে নেই। রাগ করে অমন মুখভার কোরো না আলা। কথা বলো, লক্ষ্মী মেয়ে! আমায় কষ্ট দিয়ো না!”

আলা-ইজা কথা বলল না। মায়ের কোনও কথারই সে উত্তর দিল না। আচমকা যেমন করে সে চিৎকার করে উঠেছিল, ঠিক তেমনই করে সে মায়ের হাত ছাড়িয়ে পালিয়ে গেল। কিন্তু কোথায় পালাল আলা-ইজা?

অধ্যায় ১ / ১২
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%