সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
ক্লাসে ঢোকা মাত্রই একটা হইচই—‘এসেছে, এসেছে হানাবাড়ির হাওয়া।’ গঙ্গার ধারে ক্লাইভের আমলের জগদ্দল একটা বাড়ি। আমার গ্র্যাণ্ডফাদার কোনো এক জমিদারের কাছ থেকে জলের দামে কিনেছিলেন। অনেকই বারণ করেছিলেন। ঠাকুরদা বলেছিলেন, ‘মানুষের কাছ থেকে দুঃখ ছাড়া কিছু পাইনি। দেখি ভূতের কাছ থেকে কী পাওয়া যায়!’ একরোখা একগুঁয়ে মানুষ। নিজের খেয়ালে চলতেন। নামকরা অধ্যাপক জ্ঞানতপস্বী। পথেঘাটে দেখা হলেই সবাই প্রণাম করেন। একপাশে সরে গিয়ে তাঁকে চলে যেতে দেন। গম্ভীর মুখ। ঠোঁটের ওপর চওড়া গোঁফ। চোখে গোল সোনার চশমা। দীর্ঘ দেহ। সব সময় হাতে একটা চামড়া দিয়ে বাঁধানো বই। শক্ত শক্ত বিষয়। ভূত ভয়ে আসে না। এলেই তো পড়াতে শুরু করবেন। পাঁচটা বাজে, কথায় সময় নষ্ট করার সময় তাঁর ছিল না।
আমার বাবাটিও ঠিক তাঁর বাবার মতোই হয়েছেন। একটা বাড়তি গুণ—রাগ। কোনো কারণে রেগে গেলে আর রক্ষা নাই। ভূতেরা রাগী মানুষদের অসম্ভব ভয় পায়। ঠক ঠক করে কাঁপে। একবার অপঘাতে মরে ভূত হয়েছে। আর একবার মরতে ভয় পায়।
আমাদের ক্লাসের রঘু সব ব্যাপারেই ভীষণ পন্ডিত। খবরও রাখে তেমনি। খবরের কাগজওয়ালারা রঘুর কাছে খবর নিতে আসে। গঙ্গার ইলিশ, পুরোনো বাড়ির পাঁচিল, পাঠাগারের পুথি চুরি, মন্দিরে মূর্তি চুরি ইত্যাদি। আমাদের বিদ্যালয়ের গর্ব। ‘দিশি রয়টার’। পঞ্চাননতলায় এ-বছর তাকে সম্বর্ধনা দেওয়া হবে। আমাদের স্কুলের ফাউণ্ডার জমিন্দার জানকী বাহাদুরের সুযোগ্য পুত্র রামচন্দ্র রায়বাহাদুর যদি বিছানা ছেড়ে উঠতে পারেন, তাহলে সভার সভাপতি হবেন, আর আমাদের হেডস্যার হবেন প্রধান অতিথি। সদরে পরিচালনায় আমাদের স্কুলব্যাণ্ড মাঝে মাঝে বেজে উঠবে, ব্যাগপাইপ, পিকলু, কেটল ড্রাম, সবই থাকবে। এই সম্বর্ধনার আয়োজক বিশ্বদর্পণ সংঘ। না, রঘুর এতটুকু অহংকার নেই, একেবারে অন্যরকমের ছেলে। গত এক বছরে খবর সাপ্লাই করে চল্লিশ টাকা রোজগার করে আমাদের স্কুলের অ্যামিউজ ফাণ্ডে জমা করে দিয়েছে। পিকনিক হবে।
রঘুর কথা এতখানি করে বলার কারণ, রঘু আমার বেস্ট ফ্রেণ্ড। আমাকে সাইকেল চড়া শিখিয়েছে, হাতছিপে মাছধরা শিখিয়েছে। পরীক্ষার আগে ভয় পেলে রঘু সর্বক্ষণ সাহস দেয়। সেই রঘুকেই জিজ্ঞেস করেছিলুম, ভূত মরে কি না। বললে, মরে। পৃথিবীতে চিরকাল কোনো কিছু বাঁচে না, বাঁচতে পারে না। তবু এইরকম একটা ব্যাপারে পন্ডিতমশাইয়ের কথা শেষ কথা।
বুড়ো শিবতলায় পন্ডিতমশাইয়ের বাড়ি। সে যে কতকালের পুরোনো কোনো হিসেব নেই। স্রেফ ব্যালেনসের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। একটু টলে গেলেই ঘাড়ে পড়তে। শুধু হাতে যাওয়া উচিত নয়। রঘুদের গাছের একটা কাঁঠাল ঘাড়ে করে সকাল আটটায় গিয়ে উপস্থিত। যেকোনো কারণেই হোক, সেই সময় তিনি খুব রেগে ছিলেন। বিরাট শরীর। মোটা পইতে চওড়া বুকের ওপর আড়াআড়ি পড়ে আছে। বড়ো বড়ো চোখ। কাঁঠালটা দেখে কিছুটা শান্ত হলেন। পেল্লায় কাঁঠাল।
‘কী কারণে সাতসকালে দুই জাম্বুবানের আগমন! বই-পত্তরের সঙ্গে সম্পর্ক আছে, না গেছে?’
‘অবশ্য আছে। লেখাপড়া না শিখলে মানুষ মানুষ হতে পারে না। ছাগল হয়ে থাকে।’
‘বুঝেছি। এসব হল ভন্ডামি।’
‘দেখবেন, পরীক্ষার ফল দেখবেন। বিদ্যালয়ের মুখ আমরা উজ্জ্বল করব আপনার আশীর্বাদে।’
‘কাঁঠাল একটা আনলি কেন? মেয়ের বাড়িতে কী পাঠাব?’
‘আপনি ঠিকানাটা দিন, কাল সকালেই পৌঁছে যাবে।’
খসখস করে ঠিকানা লিখে, কাগজটা রঘুর হাতে দিয়ে বললেন, ‘তোরা তাহলে এখন বিদেয় হ।’
‘আমাদের একটা প্রশ্ন আছে। প্রশ্নটা হল, ভূত মরে কী হয়?
‘মানুষ মরে ভূত হয়, ভূত মরে কী হয়? এ প্রশ্নের উত্তর আপনি ছাড়া কেউ দিতে পারবে না। আপনার মতো জ্ঞান কার আছে?’
‘মানুষ মরে ভূত নয় প্রেত হয়।’
‘ভূত আর প্রেতে তফাৎ কী?’
‘আত্মা কাকে বলে জানিস?’
‘শুনেছি গীতায় আছে।’
‘এই একটা ছাগলের মতো কথা বললি। আত্মা আমাদের ভেতরে আছে। আমের যেমন আঁটি। আমাদের সেইরকম আত্মা। মানুষ যেই মারা গেল আত্মাটা দেহ ছেড়ে বেরিয়ে এল, তখন সে প্রেত। এইবার শ্রাদ্ধ হল, গয়ায় পিন্ড দেওয়া হল, প্রেত উদ্ধার পেল। প্রেত যদি আটকে যায় তাহলেই ভূত হয়। জেনে রাখ, প্রত্যেকটা ভূতের পেছনে একটা করে মানুষ আছে, অর্থাৎ প্রত্যেকটা মানুষের সঙ্গে একটা করে ভূত। মানুষ থেকে ভূত বেরোয়, ভূত থেকে মানুষ বোরোয় না। হঠাৎ এইসব জিগ্যেস করছিস কেন?’
‘এই যে, এদের বাড়িতে ভূতের উপদ্রব। রাত্তিরে ঘুমোতে দিচ্ছে না।’
‘দেখা দিচ্ছে?’
‘খালি শব্দ করছে, নানারকম শব্দ।’
‘কানে তুলো গুঁজে শুলেই তো হয়। আমি তো তাই করি।’
‘এ-বাড়িতেও ভূত?’
‘ভূত কোথায় নেই? চলন্ত রেলগাড়ির কামরায় ভূত। আমার পাশে বসে হরিদ্বার পর্যন্ত চলে এল।’
‘কী করে বুঝলেন ভূত?’
‘রাত্তির বেলা। আমি বললুম, মশাই এইবার যে আমি শোবো।’ তখন বলে কি, শুয়ে পড়ুন না, কোনো অসুবিধে নেই। আমি বলুলম, আপনি বসে থাকলে শোওয়া যায়? তখন বলে কি শুলেই বুঝতে পারবেন, আমি বসে নেই। বোঝো একবার ফচকেমি। দেখছি, জায়গা জুড়ে বসে আছে!’
‘কী রকম দেখতে?’
‘সুন্দর চেহারা। খাড়া নাক, কোঁকড়া কোঁকড়া চুল। ভালো পোশাক।’
‘ভূত এসব পায় কোথা থেকে?’
‘সব ধার করা। শরীর, পোশাক, চশমা, জুতো।’
‘কথা কি নাকি সুরে বলছিল?’
‘না না, পরিষ্কার গলা। গানও গাইছিল। শোন, গল্পের ভূত আর সত্যিকারের ভূতের মধ্যে অনেক তফাত।’
‘তারপর কী হল?’
‘আমি দিব্যি শুয়ে পড়লুম। মাথাটা ঢুকে গেল ভূতের কোলে।’
‘বালিশের মতো নরম?’
‘না না, শক্ত। ট্রেনের আসন যেমন হয়।’

‘তাহলে ব্যাপারটা কী হল?’
‘কী আবার হবে, ঘুমিয়ে পড়লুম।’
‘আপনার ভয় করল না?’
‘ও সব আমার নেই। নৃসিংহ কবচ ধারণ করে আছি। রোজ চন্ডীপাঠ করি। তবে খুব উপকারী ভূত। বড়ো বংশের ছেলে তো! হরিদ্বার থেকে হৃষীকেশে গেছে। ধর্মশালায় উঠে মাথায় হাত। একটা ব্যাগ নেই। সেই ব্যাগেই আমার টাকা-কড়ি, জপের মালা, ফেরার টিকিট। খুব বিপদে পড়ে গেলুম। কে আছে এখানে, আমাকে টাকা দেবে! হঠাৎ দেখি আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে ঝুলছে আমার সেই ব্যাগটা। আমি আনন্দে তাকে আলিঙ্গন করতে গেলুম। দেখি ঘরের মাঝখানে ব্যাগটা বুকে জাপটে ধরে চোখ বুজে দাঁড়িয়ে আছি।’
‘তা হলে?’
‘কী তাহলে?’
‘এদের বাড়িটা নিয়ে কী করা যায়? এর বাবা ভূত বিশ্বাস করেন না।’
‘না করেন না করেন, তাতে ভূতের কিচ্ছু এসে যায় না। জেনে রাখ ভূত দেখারও একটা ক্ষমতা থাকা চাই। সে ক্ষমতা সকলের থাকে না।’
ভূতের মৃত্যু সম্বন্ধে কোনো সঠিক খবর পন্ডিতমশাইয়ের কাছ থেকে পাওয়া গেল না।
রঘু বললে, ‘কী সাংঘাতিক মানুষ। গল্প শুনিয়ে দিলেন। শুধু শুধু অত বড়ো একটা কাঁঠাল গচ্চা গেল!’
‘আবার মেয়েকে দিতে হবে?’
‘কথা দিলে কথা রাখতে হয়, তা না হলে লোকে জোচ্চোর বলবে।’ আর একটা মাঝারি সাইজের কাঁঠাল ঘাড়ে করে পন্ডিতমশাইয়ের মেয়ের বাড়িতে। সামান্য খোঁজাখুঁজি করতে হল। বাড়িটা খুব সুন্দর জায়গায়, একেবারে গঙ্গার ধারে। পাশেই একটা মন্দির। যেন তীর্থস্থান। পুরোনো বনেদি বাড়ি। ফুটফুটে সুন্দর একটি ছেলে বেরিয়ে এল।
‘কী চাই?’
পন্ডিতমশাইয়ের হাতে লেখা কাগজটা দেওয়া হল। দেখে বললে,
‘দাদু পাঠিয়েছেন?’
‘হ্যাঁ, বললেন, আমার মেয়েকে দিয়ে এস।’
‘আমার মা আজ তিন বছর হল মারা গেছেন, সে-কথা উনি কিছুতেই বিশ্বাস করবেন না। মা মারা যাওয়ার পর মামার বাড়ির সঙ্গে আর তেমন সম্পর্ক নেই। আমার বাবাও বিদেশেই থাকেন।’
কাঁঠালটা একপাশে নামিয়ে রেখে গঙ্গার ঘাটে এসে বসলুম। ভরা গঙ্গা। ওপারে সূর্য অস্ত যাচ্ছে। মিষ্টি একটা বাতাস। রঘুর চোখে জল, ‘বুঝলি সুমন, পন্ডিতমশাইকে আমাদের খুব সেবা করা উচিত। কী ভালোবাসা বল তো! মেয়ে মারা গেছে, বিশ্বাসই করছেন না। অত বড়ো একটা বাড়িতে একা থাকেন। কেউ দেখার নেই।’
পন্ডিতমশাই বলেছিলেন, মেয়ের কাছ থেকে একটা চিঠি লিখিয়ে আনবি। রঘু বললে, ‘চিঠিটার কী করা যায়। তুই একটু মেয়েলি অক্ষরে লেখ না—বাবা! তোমার পাঠানো কাঁঠাল পেয়েছি। তুমি ভালো আছ তো? আমরা ভালো আছি।’
‘এ তো চিটিং। এটা ঠিক হবে না।’
‘তা বটে। তা হলে ছেলেকে দিয়ে এক কলম লেখালে কেমন হয়!’
‘ও বাড়িতে আমার আর যেতে ইচ্ছে করছে না। কীরকম যেন।’
‘তা হলে?’
‘চল, বাড়িটার সামনে দিয়ে একবার ঘুরে চলে যাই।’
সন্ধে হয়ে এল। রাস্তাঘাটে লোক চলাচল বেড়েছে বেশ। বাড়িটার সামনে গিয়ে অবাক দৃশ্য। কাঁঠালটা বাইরের রকের একপাশে অনাদরে পড়ে আছে।
রঘু বললে, ‘কী আশ্চর্য! নিলে না, কেন বল তো?’
‘আমার মনে হচ্ছে ছেলেটার বাবা আবার বিয়ে করেছে। তাই সৎমা আগের মায়ের কাঁঠাল বাড়িতে ঢুকতে দেয়নি।’
‘বাবা, সে কী রে? এই জগতে আমরা বাস করি!’
ময়লা ফ্রক পরা সাত-আট বছর বয়েসের একটা মেয়ে, রুক্ষ চুলের বিনুনি দুলিয়ে নাচতে নাচতে আসছে। রঘু বললে,
‘দাঁড়াও, তোমার নাম কী?
‘ঘুড়ি।’
‘কোথায় যাচ্ছ?’
‘কোথাও না।’
রঘু কাঁঠালটা তার হাতে দিয়ে বললে, ‘যাও বাড়ি নিয়ে যাও।’
‘আমাদের বাড়ি নেই তো, ফুটপাথে থাকি। এটা আমাকে দিলে?’
‘হ্যাঁ, তোমাকে।’
‘তাহলে বোঝো।’
‘কী বুঝব?’
‘যা বোঝার।’
মেয়েটা নিমেষে অদৃশ্য। রাস্তা ফাঁকা। কেউ কোথাও নেই। রঘু বললে, ‘ব্যাপারটা কী হল বল তো?’
ঠ্যাং ঠ্যাং করে একটা টানা রিকশা বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়াল। এক মহিলা খটমট করে নামলেন। আমরা পালিয়ে এলুম।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন