সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
মানুষের উপকার করলে কী হয়! একে একে দেখা যাক। মানুষের মধ্যে কিছু মানুষ সম্পর্কসূত্রে আমাদের আত্মীয়। বিদ্যাসাগর মশাই ছিলেন দয়ার সাগর, করুণাসাগর, এমন উপকারী মানুষ দুর্লভ। রাস্তায় এক পাগলকে দেখে সবাই হাসছে, মজা করছে, বিদ্যাসাগর মশাই কাঁদছেন। বিদ্যাসাগরের জীবনের একটি ঘটনা অথবা কার্মাটারে তাঁর দৈনন্দিন জীবনের একটি চিত্র হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর লেখা থেকে উদ্ধৃত করছি। হরপ্রসাদ তখন কার্মাটারে বিদ্যাসাগরের অতিথি। ‘‘রৌদ্র উঠিতে না উঠিতেই একটা সাঁওতাল গোটা পাঁচ-ছয় ভুট্টা লইয়া উপস্থিত হইল। বলিল—‘ও বিদ্যাসাগর, আমার পাঁচগন্ডা পয়সা নইলে আজ ছেলেটার চিকিৎসা হইবে না, তুই আমার ভুট্টা-কটা নিয়া আমায় পাঁচগন্ডা পয়সা দে।’ বিদ্যাসাগর মহাশয় তৎক্ষণাৎ পাঁচ আনা পয়সা দিয়া সেই ভুট্টা-কটা লইলেন, ও নিজের হাতে তুলিয়া রাখিলেন। তারপর আর একজন সাঁওতাল—তার বাজরায় অনেক ভুট্টা ; সে বলিল, ‘আমার আট গন্ডা পয়সা দরকার।’ বিদ্যাসাগর মহাশয় আটগন্ডা পয়সা দিয়াই তাহার বাজরাটি কিনিয়া লইলেন। আমি বলিলাম—‘বারে, এ তো বড়ো আশ্চর্য! খরিদ্দার দর করে না—দর করে যে বেচে!’ বিদ্যাসাগর মহাশয় একটু হাসিলেন। তারপর দেখি, যে যত ভুট্টা আনিতেছে, আর যে যত দাম চাহিতেছে, বিদ্যাসাগর মহাশয় সেই দামে সেই ভুট্টাগুলি কিনিতেছেন আর তাকে রাখিতেছেন। আটটার মধ্যে চারিদিকের তাক ভরিয়া গেল, অথচ ভুট্টা কেনার বিরাম নাই। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম—‘এত ভুট্টা লইয়া আপনি কী করিবেন?’ তিনি বলিলেন, ‘দেখবি রে দেখবি।’
এরপর হরপ্রসাদ শাস্ত্রী কী দেখলেন।
‘বাংলায় (বাংলো) আসিয়া দেখি, বাংলার সম্মুখের উঠান সাঁওতাল ভরিয়া গিয়াছে—পুরুষ মেয়ে ছেলে বুড়ো—সবরকমের সাঁওতালই আছে। তারা দল বাঁধিয়া বসিয়া আছে—কোনো দলে পাঁচজন, কোনো দলে আটজন, কোনো দলে দশজন। প্রত্যেক দলের মাঝখানে কতকগুলো শুকনো পাতা ও কাঠ। বিদ্যাসাগরকে দেখিয়াই তাহারা বলিয়া উঠিল, ‘বিদ্যেসাগর আমাদের খাবার দে।’ বিদ্যাসাগর ভুট্টা পরিবেশন করিতে বসিলেন। তাহারা সেই শুকনো কাঠ ও পাতায় আগুন দেয়, তাহাতে পঞ্চতন্ত্রের ভুট্টা সেঁকে, আর খায়—ভারি স্ফূর্তি। আবার চাহিয়া লয়—কেহ দুটা, কেহ তিনটা, কেহ চারটা ভুট্টা খাইয়া ফেলিল। তাকের রাশিকৃত ভুট্টা প্রায় ফুরাইয়া আসিল। তাহারা উঠিয়া বলিল, ‘খুব খাইয়েছিস বিদ্যেসাগর।’ ক্রমে চলিয়া যাইতে লাগিল। বিদ্যাসাগর রকে দাঁড়াইয়া দেখিতে লাগিলেন। আমিও আশ্চর্য হইয়া দেখিতে লাগিলাম। ভাবিলাম—এরকম বোধহয় আর দেখিতে পাইব না।’
জীবনের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে বিদ্যাসাগর বলেছিলেন, ‘বড়লোকের বাটীতে যাওয়া অপেক্ষা এ সকল লোকের (সাঁওতালদের) কুটীরে যাইতে আমার ভালো লাগে, ইহাদের স্বভাব ভালো ইহারা কখনো মিথ্যা কথা বলে না ইত্যাদি কারণে এখানে (কার্মাটারে) থাকিতে ভালোবাসি।’ পিতাকে লিখছেন, ‘সাংসারিক বিষয়ে আমার মতো হতভাগ্য আর দেখিতে পাওয়া যায় না। সকলকে সন্তুষ্ট করিবার নিমিত্ত প্রাণপণে যত্ন করিয়াছি, কিন্তু অবশেষে বুঝিতে পারিয়াছি, সে বিষয়ে কোনো অংশে কৃতকার্য হইতে পারি নাই। যে সকলকে সন্তুষ্ট করিতে চেষ্টা পায়, সে কহাকেও সন্তুষ্ট করিতে পারে না। এই প্রাচীন কথা কোনোক্রমেই অযথা নহে, সংসারী লোকে যে সকল ব্যক্তির কাছে দয়া ও স্নেহের আকাঙ্ক্ষা করে, তাঁহাদের একজনের অন্তঃকরণেও যে আমার উপর দয়া ও স্নেহের লেশমাত্র নাই, সে বিষয়ে আমার অণুমাত্র সন্দেহ নাই।’
কেউ একজন বিদ্যাসাগরের নামে নিন্দা করেছেন। বিদ্যাসাগর শুনে বললেন, ‘রও, ভেবে দেখি, সে আমার নিন্দা করবে কেন? আমি তো কখনো তার কোনো উপকার করিনি।’
ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় যথার্থই লিখেছেন, ‘আসলে বিদ্যাসাগর দেবত্ব ও ব্রাহ্মণ্যের সকল গৌরববর্জিতভাবে মানুষকে মানুষরূপেই মহৎ ও মহনীয় দেখিতে চাহিয়াছিলেন বলিয়াই এই গুরু ও শালগ্রামশিলার দেশে তাঁহাকে অপরিসীম লাঞ্ছনা ভোগ করিতে হইয়াছিল।’
তাহলে সেই গল্পে আসি, এক কুঁড়ে ব্রাহ্মণ ব্রাহ্মণীর তাড়া খেয়ে ভাগ্যের সন্ধানে বনের পথ ধরে চলেছে। কোথায় যাবে কোনো পরিকল্পনা নেই। চলতে চলতে ক্ষিদে আর জলতেষ্টা দুটোই পেয়েছে। প্রথমে তেষ্টা। জলের খোঁজে একটা পাতকুয়ার দেখা মিলল অবশেষে। কিনারে এসে উঁকি মেরে দেখে কী, কুয়োর মধ্যে একেবারে তলায় পড়ে আছে, একটা বাঘ, একটা বাঁদর, একটা সাপ আর একজন মানুষ। ব্রাহ্মণ মুখ বাড়াতেই তারাও ব্রাহ্মণকে দেখে ফেলেছে।
বাঘ তখন উদ্ধারের আশায় চিৎকার করছে, ‘হে দয়ালু, জ্ঞানী ব্রাহ্মণ একটি জীবন রক্ষার মতো পুণ্যকর্ম আর নেই, তুমি অবশ্যই জান, অতএব আমাকে টেনে তুলে সেই পুণ্য অর্জন কর।’
ব্রাহ্মণ বললে, ‘তোমার নামেই মানুষের হৃদকম্প হয়, তোমাকে আমি উদ্ধার করব! বাঘের সঙ্গে মানুষের কী সম্পর্ক আমি কি তা জানি না!’
বাঘ বললে, ‘আমি তিন সত্যি করছি, তোমাকে আমি খাব না।’
ব্রাহ্মণ বাঘটাকে টেনে তুলল। বাঘ জলটল ঝেড়ে বললে, ‘ব্রাহ্মণ এই উপকারের প্রতিদান আমি দিতে চাই। ওই যে দূরে দেখছ পর্বতশৃঙ্গ। ওর সর্বোচ্চ চূড়ায় আমার বাস। তুমি যত তাড়াতাড়ি পার, উত্তর ঢালে আমার গুহায় এস। মরবার আগে তোমার ঋণ শোধ করে যেতে চাই। পরের জন্মে টেনে নিয়ে যেতে চাই না।’ বাঘ ধন্যবাদ জানিয়ে চলে গেল।
বাঁদর তখন চিৎকার করছে, ‘আমার কী অপরাধ! ব্রাহ্মণ আমাকেও উদ্ধার করো।’
বাঁদর উদ্ধার পেল। যাবার সময় বলে গেল, ‘বাঘের গুহার কাছেই ঝরনার ধারে আমি থাকি। অবশ্যই এই উপকারের প্রতিদানে আমি কিছু করতে চাই।’
বাঁদর চলে গেল। এইবার সাপের প্রার্থনা। ব্রাহ্মণ বললে, ‘পাগল হয়েছ! তোমাকে কে না চেনে! এক ছোবলেই মানুষ খতম। মাপ করো ভাই।’ সাপ তিন সত্যি করে বললে, ‘এইটাই মানুষের ভুল ধারণা। কারণ না থাকলে আমরা ছোবল মারি না। তুমি আমাকে উদ্ধার করে দেখ। বিপদে পড়লে আমিও উপকার করব।’
ব্রাহ্মণ তিনটি প্রাণীকেই উদ্ধার করল। প্রত্যেকেই যাওয়ার সময় একই সাবধানবাণী শুনিয়ে গেল, ‘ব্রাহ্মণ, ওই মানুষটি সম্পর্কে খুব সাবধান। ওটি হল পাপের আড়ত, উদ্ধার করেছ কী মরেছ। ওর কথা শুনো না।’ কুয়োর লোকটা ততক্ষণে কাকুতিমিনতি শুরু করেছে। ব্রাহ্মণ ভাবলে, তিনটে পশুকে উদ্ধার করলুম, আর আমার জাতভাইটা পড়ে থাকবে! ব্রাহ্মণ এই ভেবে লোকটিকেও টেনে তুলল।
ভদ্রলোক উঠেই বললে, ‘ব্রাহ্মণ তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। শোনো আমি স্বর্ণকার। পাশের শহরেই আমার সোনার দোকান। যখনই প্রয়োজন হবে আমার কাছে এস। তোমাকে সাহায্য করতে পারলে বিস্তর খুশি হব।’ লোকটি বিদায় নিয়ে চলে গেল।
ব্রাহ্মণ এইবার তার ভাগ্যের সন্ধানে দিগ্বিদিক ঘুরতে লাগল। কোথায় কী! কিছুই আর জোটে না। শেষে সে সেই ঝরনার ধারে বাঁদরের কাছে গেল। কৃতজ্ঞ বাঁদর ব্রাহ্মণকে প্রচুর ফল দিয়ে বললে, ‘এই শেষ নয়, তোমার যখনই ফলের প্রয়োজন হবে তখনই চলে আসবে।’
ব্রাহ্মণ বললে, ‘বাঘ তো তোমার কাছাকাছিই থাকে, তার সঙ্গে একটু পরিচয় করিয়ে দাও।’
বাঘ তো মহাখুশি, ‘উপকারী বন্ধু তুমি এসেছ। এই নাও কিছু স্বর্ণালঙ্কার। পাকা সোনায় তৈরি। কয়েক দিন আগে এই রাজ্যের রাজার পুত্র দলছাড়া হয়ে ঘোড়ার পিঠে চড়ে এইদিকে চলে এসেছিল। আমারও খুব ক্ষিদে পেয়েছিল। এই অলংকারগুলো তার শরীরে ছিল। নিয়ে যাও। তোমার কাজে লাগবে।’
ব্রাহ্মণ সেইসব অলংকার নিয়ে এল সেই স্বর্ণকারের কাছে এই ভেবে, স্বর্ণকার গহনাগুলো বিক্রি করে দিলে অনেক টাকা নিয়ে ব্রাহ্মণ ব্রাহ্মণীর কাছে ফিরে যেতে পারবে।

স্বর্ণকার মহাসমাদরে ব্রাহ্মণকে পাদ্য অর্ঘ দিয়ে বসালেন, উপহার দিলেন, খাদ্য পানীয়ে তৃপ্ত করে প্রশ্ন করলেন, ‘কী করতে পারি আপনার?’
‘আমি কিছু সোনার গয়না এনেছি। যদি বিক্রি করে দেন অনুগ্রহ করে, অর্থের বড়ো প্রয়োজন।’
স্বর্ণকার গয়নাগুলো দেখেই চিনতে পেরেছে। এগুলো তো সে রাজপুত্রের জন্যেই বানিয়েছিল।
স্বর্ণকার বললেন, ‘আপনি একটু বসুন। এগুলো আমি একজন উপযুক্ত লোককে দেখিয়ে আনি।’
ব্রাহ্মণ বসে আছে। স্বর্ণকার সোজা রাজদরবারে। রাজা তো দেখেই চিনেছেন।
‘কোথায় পেলে তুমি এই গয়না?’
‘এক ব্রাহ্মণ বিক্রি করার জন্যে আমার দোকানে এনেছে।’
‘কোথায় সে?’
‘বসিয়ে রেখে একটা ছুতো করে চলে এসেছি আপনার কাছে।’
‘এই ব্রাহ্মণই তাহলে খুনী, রাজপুত্রকে হত্যা করেছে। এই কে আছিস...।’ রাজকোটাল সঙ্গে সঙ্গে হাজির।
‘যাও ব্রাহ্মণকে বেঁধে এনে শূলে চড়াও।’
ব্রাহ্মণকে চেন দিয়ে বাঁধা হয়েছে। প্রাণদন্ডের আদেশ। মনে মনে সাপের কথা ভাবছে। সে যদি এসে আমার এই বন্ধন দশা মুক্ত করত। সঙ্গে সঙ্গে কৃতজ্ঞ সাপ এসে হাজির।
‘ব্রাহ্মণ কিচ্ছু ভেব না, তোমার মুক্তি আমার হাতে।’
‘কী ভাবে? আমাকে ছোবল!’
‘না, রানিকে ছোবল মারব, মরে যাবে। কেউ বাঁচাতে পারবে না। কিন্তু যেই তুমি গায়ে হাত দেবে রানি জীবন ফিরে পাবে। দেখ না মজাটা।’
সাপ তক্ষুনি রানিকে গিয়ে দংশন করল। রানির মৃত্যু। ওঝারা সব ব্যর্থ। রাজা তখন ঢেঁড়া দিলেন, ‘যে রানিকে বাঁচাতে পারবে...’
বন্দি ব্রাহ্মণ বললে, ‘অনুমতি করুন, আমি একবার চেষ্টা করি, মনে হয় পারব।’
ব্রাহ্মণ হাত ছোঁয়ানো মাত্র রানি চোখ মেলে তাকালেন। ধন্য ধন্য পড়ে গেল।
কৃতজ্ঞ রাজা তখন জানতে চাইলেন ঘটনাটা কী?
‘কোথায় পেলেন রাজপুত্রের অলংকার।’
ব্রাহ্মণ তখন সব বললে, গোড়া থেকে শেষপর্যন্ত।
কতোয়ালকে হুকুম হল, ‘বাঁধ ওই স্বর্ণকারকে। আর ব্রাহ্মণকে দান করো এক হাজার গ্রাম ও প্রচুর ধনরত্ন।’
রাজানুগ্রহে ব্রাহ্মণ হল সম্পন্ন জমিদার।
গল্পের কুচক্রী শাস্তি পায় এবং উপকারী রাজত্ব পায়। বাস্তব জীবনে এর বিপরীতটাই সত্য।
রাজনারায়ণ বসুকে বিদ্যাসাগর একটি ছড়ায় লিখলেন,
পৃথিবীতে যত বেটা, সব বেটা গোরু।
যে যারে ঠকাতে পারে, সেই তার গুরু।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন