সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
ঝন্টুর ঠাকুমা আজ ঝন্টুর ছেলেবেলার কথা বলছেন। বলার কারণ আছে খুব। আজ ভোরবেলা আমেরিকা থেকে দুর্দান্ত একটা খবর এসেছে। ঝন্টু মানুষের বয়েস নিয়ে বেশ কিছুদিন গবেষণা করছিল। একটা ওষুধ বের করে ফেলেছে। মানুষের বয়েস আর বাড়বে না। সামনের বছর ঝন্টু সিওর নোবেল পুরস্কার পাবে।
আমরা ঝন্টুদের বৈঠকখানায় জমিয়ে বসেছি। রান্নাঘরে ফুলকপির সিঙাড়া ভাজা হচ্ছে। নাকে গন্ধ আসছে। ডাক নাম ঝন্টু। ভালো নাম মুকুল। ভারী মিষ্টি নাম। চেহারাটাও খুব মিষ্টি। সব সময় মুখে একটা হাসি। ঝন্টু যে বিশ্ববিখ্যাত হবে, প্রথমে বোঝা যায়নি। ঠাকুমা বললেন, ‘কী অসম্ভব বায়না। চাই তো চাই। সেইরকম একগুঁয়ে। করব তো করবই। কিন্তু ওই অল্প বয়সেই অদ্ভুত একটা গুণ দেখা দিয়েছিল—কিছু একটা করেই বিচারে বসত। প্রশ্ন করত, কাজটা কেন করলি? আবার বকত, বল, কেন করলি? আবার নিজেকেই নিজে শাস্তি দিত—যাও ওই কোণে গিয়ে কান ধরে পঞ্চাশবার ওঠ বোস। বড়োদের মুখে মুখে তর্ক করেছ? যাও, দেয়ালে নাক ঘষো। মিথ্যে কথা বলেছে? আজ তোমার জলখাবার বন্ধ।
ঝন্টুর সঙ্গে আমার খুব ভাব ছিল। তার বাড়ির সবাই বলতেন, ঝন্টু আর মন্টু দুই ভাই। ঝন্টুর জন্যে যা কেনা হবে, আমার জন্যেও সেই একই জিনিস আসবে। স্কুলে কেউ বলত, হরিহর আত্মা। কেউ বলত, খোলকত্তাল। প্রাণের বন্ধু, পাশাপাশি বসি, তাহলে কী হবে! দুজনের মাথা দুরকমের। ঝন্টু অঙ্কে একশোয় একশো, আমি কোনোরকমে সত্তর। আমার দুঃখ দেখে ঝন্টু একদিন বলল, ‘শোন, রোজ একটা নির্জন জায়গায় চোখ বুজিয়ে সোজা হয়ে কিছুক্ষণ বসে থেকে দেখ তো কী হয়। ঘুমোবি না কিন্তু। চুপ করে বসে থাকবি। গভীর রাত। শরীরটাকে একেবারে ছেড়ে দিবি। মনে অনেকরকম চিন্তা আসবে, পাত্তা দিবি না।’
প্রথমদিন ব্যাপারটা খুব অদ্ভুত লাগল। কুকুরের ডাক কানে আসছে। হঠাৎ প্যাঁচার চিৎকার। ভীষণ কর্কশ। ছাতে কিছু একটা পড়ে গড়িয়ে গেল। কোনো কারণ নেই। ভীষণ ভয় করতে লাগল। কে যেন কানের কাছে ফিসফিস করে কত কী বলতে শুরু করল। ভুরুর মাঝখানে নাকের ওপর দপ করে একটা অদ্ভুত আলো জ্বলে উঠেই নিবে গেল। আলোটার রং নীল সাদা। মনে হল আমর ভেতরে আর একজন কেউ রয়েছে। ঠক ঠক করে কাঁপছি। হঠাৎ মনে হল আমি নেই। আর তখনই আমি চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লুম।
ঝন্টু সব শুনে বললে, ‘বলিস কী, একদিনেই তুই এতটা এগোলি! এরপর তুই বুঝতে পারবি, আমরা কিছুই করি না, সব করে ওই ভেতরের মানুষটা।’ আশ্চর্য ব্যাপার, এরপর লেখাপড়ায় আমি ঝন্টুকে টপকে না গেলেও পাশাপাশি আসতে পারলুম। ঝন্টুর সে কি আনন্দ! দুপাশে দু-হাত ছড়িয়ে বলতে লাগল ‘পারবি, তুই পারবি। কেউ তোকে আর আটকাতে পারবে না। ক্লাস টেনে উঠে মনে হল, ঝন্টু অন্য মানুষ। বেশি কথা বলে না। সবসময় কী যেন ভাবছে। কে কী বলছে, শুনতেই পাচ্ছে না। স্কুল, কলেজের লেখাপড়া, পরীক্ষা, তার কাছে ছেলেখেলা!
সিঙাড়া এসে গেল। গরম গরম একথালা। ঠাকুমা বিজয় জ্যাঠাকে বললেন, ‘নাও, তুমি সিনিয়ার মোস্ট, তুমিই উদবোধন করো। দিস ইজ ফাস্ট লট। আরো আসবে’। ঠাকুমা শিক্ষিতা। বেথুনের ছাত্রী। সেকালের গ্রাজুয়েট। বাবার সঙ্গে বিলেত গিয়েছিলেন। বিজয় জেঠুর কাছে আমরা ব্যায়াম করেছি। ফুটবল ক্রিকেট শিখেছি। দারুণ সাহসী মানুষ। বিদেশে গেছেন কয়েকবার। দেশের জন্যে অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন। সংসার করেননি। একটা অনাথ আশ্রম করেছেন। কাশীতে তাঁর গুরু থাকেন। জেঠু তাঁর কাছেই যোগ শিক্ষা করেছেন। ঝন্টুকে শিখিয়েছেন। প্রথম বিদেশিরা এসে শিখে যায়। এ-পাড়ার সবাই তাঁকে ভীষণ শ্রদ্ধা করে। বিজয় জেঠু বললেন, ‘ঝন্টুর সবচেয়ে বড়োগুণ কী ছিল জানো, ভেরি সিরিয়াস। একটা কিছু বললে, সে বিশ্বাস করত, আর সেই ভাবে অনুশীলন করত, সময় সময় বিপদেও পড়ত। আমি বলেছিলুম, কোনো একটা শক্ত কাজ করার সময় একাগ্রতা বাড়াবার জন্যে চোখ বুজিয়ে ফেলা ভালো। যেমন ধর শিশির শিল করা ছিপি। সহজে খেলা যায় না। প্যাঁচ ঘুরে যায়। চোখ বুজিয়ে শক্তিকে একাগ্র করলে খুলতে বাধ্য। ভীষণ ভারী একটা কিছু তুলতে হবে! চোখ বুজিয়ে তুলে ফেল। ঝন্টু শুনল। এইবার প্রয়োগ। স্কুল স্পোর্টসে দৌড়চ্ছে। একশো মিটার। সবাই জানে, বিশ্বনাথই চ্যাম্পিয়ন। সেই জিতবে। ঝন্টু অন্যরকম ভেবে বসে আছে। বিশ্বনাথকে সে হারাবেই। দৌড় শুরু করেই সে চোখ বন্ধ করে ফেলেছে। তার ভেতরটা ছুটছে। একেবারে সোজা। আমরা তো অবাক! বিশ্বনাথ-টিশ্বনাথ সব কোথায় কোন পেছনে পড়ে রইল। ঝন্টু যেন উড়ে যাচ্ছে! সীমানা টপকে ঝপাং করে পালধিদের পুকুরে।’ জিগ্যেস করলুম কী হল রে? বললে, ‘স্যার, আপনি শিখিয়েছিলেন, আমি চোখ বুজিয়ে স্পিড বাড়াচ্ছিলুম। সেই কারণে দূরত্বের হিসেবটা রাখতে পারিনি। এই হল ঝন্টু। আমেরিকায় যাওয়ার আগে আমার কাছে বিদায় নিতে এসে একটা সার কথা বললে, ‘যে কথা স্বামীজি বলতেন, মানুষের অসাধ্য কিছু নেই, ইচ্ছে করলে মানুষ সব পারে। স্বামীজির জীবনের একটি ঘটনা তাকে খুব উৎসাহিত করত।’

‘ঝন্টু আমাকেও ওই ঘটনাটি প্রায়ই শোনাত। ঘটনাটি সানফ্রান্সিসকোর কাছে ক্যাম্প আভিং-এ ঘটেছিল। স্বামীজি একটা নদীর ধারে আপন মনে ঘুরছেন। নদীর ওপর একটি সাঁকো। দেখছেন সাঁকোর ওপর কয়েকজন ছেলে। নদীর স্রোতে পরপর ডিমের খোলা ভেসে চলেছে, আর সেই যুবকরা গুলি ছুড়ছে সেই খোলাগুলো তাক করে। দুঃখের বিষয় একটিও গুলি লাগছে না। স্বামীজির মুখে ফুটল মৃদুহাসি। যুবকরা সেই হাসি লক্ষ করেছে। তাদের অভিমানে লাগল। একজন স্বামীজিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বলল, ‘ওহে বাপু, কাজটা যত সহজ মনে করছ, অত সহজ নয়। এসো দেখি একবার এদিকে। দেখাও তোমার টিপ।’
‘নির্বিকার স্বামীজি। ব্যাপারটা তাঁর কাছে যেন কিছুই নয়। যুবকদের পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। দাও বন্দুক। অনায়াসে পরপর বারোটা ডিমের খোলা গুলিবিদ্ধ করলেন। ছেলেরা বাহবা বাহবা করছে। অসাধারণ টিপ। অনেক অভ্যাসের ফল! স্বামীজি বললেন, ‘ভাই! বন্দুকের সঙ্গে কোনোকালেই আমার কোনো সম্পর্ক নেই। আমি একজন ধর্মপ্রচারক। আসল ব্যাপারটা কি জানো? মনসংযম!’
ঠাকুমা বললেন, ‘ছেলেবেলায় সে যযাতির উপাখ্যান বারে বারে শুনতে চাইত। ছেলে পুরুকে নিজের জরা দান করে তার হাজার বছর স্থায়ী যৌবন চেয়ে নিয়েছিলেন। এটা শোনার পর চোখ বুজিয়ে বসে কেবল বলত—বিজ্ঞান কী বলে! বিজ্ঞান কী বলে! নিশ্চয়ই কিছু আছে।’
প্রত্যেক মাসে ঝন্টু আমাকে চিঠি লেখে। ভুলে যায়নি। পালধিদের পুকুরের নাকে নথ পরানো সেই রুই মাছটার খবর নেয়। সাতটা তালগাছের সাতটাই বেঁচে আছে কি না! রাম-সীতার মন্দিরের পূজারি সুরথ ঠাকুর এখনও পূজা করেন কি না! সে কিছুই ভোলেনি। একটা চিঠিতে লিখলে—আমার জীবনের সব চেয়ে বড়ো দুঃখ, তুই আমার কাছে নেই। দুর্গাপুজো, সরস্বতী পুজোয় কত আনন্দ করেছি! সে সব দিন আর ফিরে আসবে না। তারপরে এল সেই চিঠি—ওরে আমি বয়েসের শত্রুকে খুঁজে পেয়েছি, যে আমাদের যৌবন খেয়ে ফেলে, সে একটা জিন। সে ব্যাটাকে আমি কাবু করবই। মানুষ আর বুড়ো হবে না।
আবার একথালা গরম গরম সিঙাড়া এল। আজ কত আনন্দের দিন। ঝন্টু বলত, পড়বি আর ভাববি। পরীক্ষা একটা ছেলে-ঠকানো ব্যাপার। তুই যা জানিস পরীক্ষকরা তা জানতে চান না, তুই যা জানিস না, সেই অজ্ঞতাটাই টেনে বাইরে আনতে চান। আমার কাছে এঁরা জব্দ। আমার ছাত্রজীবনে আমার শিক্ষক ছিল ঝন্টু। সে আমাকে ঋগ্বেদের একটা প্রার্থনা শিখিয়েছিল, বলেছিল রোজ করবি—‘আমার সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যেন ঠিক থাকে, কর্মক্ষম থাকে, আমার আত্মা যেন পরাধীন না হয়ে যায়। আলো যে-আলো থেকে আলো পায় সে-আলো আমার অন্তরে। আমার মন চিন্তার স্রোতে ভেসে যাক দূর থেকে দূরে অপার অনন্তে।’
কালই আমি ঝন্টুর চিঠি পেয়েছি। সেই চিঠির ভেতর আর একটা চিঠি। আমার চিঠিতে একটা নির্দেশ আছে—‘এই চিঠিটা তুই নিজে গিয়ে আরতিকে দিবি।’ আরতিদের বাড়ি মুখুজ্যে পাড়ায়। এক সময় ওরা খুব বড়োলোক ছিল। এখন একটু পড়তির দিকে। আরতি আমাদের সঙ্গেই এক কলেজে পড়ত। ভালো ছাত্রী। রাত নটা বেজে গেছে। এত রাতে যাওয়া উচিত হবে কি! দেখাই যাক।
বাড়িটার খানিকটা নতুন, খানিকটা পুরোনো। দুদিকে দুরকম অবস্থা। একটা মোটর সাইকেল বাড়ির সামনে এসে থামল। হেলমেট পরা এক যুবক। গাড়িটার পেছনে বিরাট এক বাক্স। হেলমেটটা খুলতে চিনতে পারলুম, রঘু। আরতির খুড়তুতো ভাই। ছেলেটা খুব ভালো। একটি সমাজসেবী সংস্থায় আছে। কাজ ছাড়া সে এক মিনিটও থাকে না। জিগ্যেস করলুম, ‘আরতি আছে?’
মাথার চুল ঠিক করতে করতে রঘু বলল, ‘দিদি তো এইমাত্র নর্থ বেঙ্গলে চলে গেল। এই তো ট্রেনে তুলে দিয়ে আসছি।’
‘কবে ফিরবে?’
‘দিদিকে নর্থ বেঙ্গ ইউনিভার্সিটিতে ট্র্যান্সফার করেছে।’
‘সে তাহলে ছুটি না পড়লে আসতে পারবে না।’
‘আপনার কি দরকার ছিল, যদি আমাকে বলেন, আমাকে দিয়ে যদি কিছু হয়।’
এই হল রঘু! তার ব্রত হল, আমাকে দিয়ে তোমার যদি কিছু উপকার হয় তো হইয়ে নাও। কিন্তু এটা এমন ব্যাপার যা রঘুকে বলা যাবে না। দু-প্রান্তের দুজন মানুষের প্রাণের কথা। আমার ছুটি আছে সাত দিন।
ট্রেন ঠিক সময়েই ছাড়ল। মধ্যরাত। নীল আলোয় পথ ঘুমোচ্ছে। ট্রেন ছুটছে সামনের দিকে আর আমি চলেছি পেছন দিকে। আমরা দুজনে একবার জলপাইগুড়িতে এসেছিলুম। ঝকঝকে আকাশের গায়ে ঝকঝকে কাঞ্চনজঙ্ঘা। তিস্তা বয়ে চলেছে পাথর ছড়িয়ে, বড়ো ছোটো গোল।
তখন বিরাট একটা গাছের ছায়ায় বসে ঝন্টু আমাকে বলেছিল, ‘আমি আরতিকে ভালোবাসি।’ শরতের শেষ। ক-দিন পরেই শীত নেমে আসবে পাহাড় থেকে। খস-খস করে পাতা ঝরে পড়ছে মাটিতে মাথা ঠুকে। অন্ধকার বাঙ্কে শুয়ে আছি। ভাবছি। একা আমি। ভাবছি আর মনে মনে হাসছি—যত উঁচুতেই থাক মাটিতে মাথা ঠুকতে হবেই।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন