ভূত অদ্ভুত

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

আমার ঠাকুরদা যখন বাড়িটা কিনছিলেন, তখন তাঁর বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন সকলেই বলেছিলেন, কাজটা ভালো হচ্ছে না। বাড়িটা ঐতিহাসিক, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ওলন্দাজ গভর্নরের কুঠিবাড়ি। কিন্তু, যেখানেই ইতিহাস, সেইখানেই তো ভূত। ইতিহাসের আর-এক নাম ভূত বললেই বা ক্ষতি কী! বাড়িটায় যেমন অনেক রহস্য আছে, সেইরকম অনেক ভূতও আছে। তা না হলে এতদিন খালি পড়ে থাকে!

ঠাকুরদা বলেছিলেন, ‘মশা তাড়াবার যেমন ধূপ আছে, আমার কাছে সেইরকম ভূত তাড়াবার ধুনো আছে। ভূতকে আমি তেমন ভয় পাই না, ভয় পাই মানুষকে।’

আমার ঠাকুরদা ছিলেন নামকরা শিক্ষক। আমাদের পরিবারের লোকসংখ্যাও কিছু কম ছিল না। সকলেই বিজ্ঞানচর্চা করতেন। ভূত, প্রেত, ভগবান, কোনোটাই মানতেন না। বাড়িটা কেনা হল প্রায় জলের দামে। বিশাল এক দোতলা বাড়ি। দু-মহলা। সামনের দিকটা পুব থেকে পশ্চিমে প্রসারিত। পেছনের মহল দক্ষিণ থেকে উত্তরে। ‘এল’ শেপ। পেছনে একটা বারান্দা। পুবে শুরু হয়ে দক্ষিণ বরাবর পশ্চিম হয়ে উত্তরে ঘুরে গেছে। এই উত্তরটাই ছিল ভয়ংকর। নিরালা, নির্জন। গাছপালা-ঘেরা। মনে হত ভূতের আড়ত।

নানা জনের নানা কথায় ওই বাড়িতে ভূতের যে তালিকা পাওয়া গিয়েছিল, তা ছিল এইরকম:

এক, গভীর রাতে বাড়ির ন্যাড়া ছাত থেকে কেউ একজন বিশাল একটা ঘুড়ি ওড়াত। কালো রঙের ঢাউস ঘুড়ি। অন্ধকার আকাশ। জ্বলজ্বলে তারা। কালো একটা ঘুড়ি প্রেতাত্মার মতো লাট খাচ্ছে, টাল খাচ্ছে। গোত্তা খেয়ে নীচে নামছে, পড়পড় শব্দে উঠে যাচ্ছে আকাশের টঙে। যাদের ঘুম ভেঙে যেত, তারা শব্দটা শুনতে পেত। সাহসী যারা তারা বারান্দায় বেরিয়ে এসে আকাশের দিকে তাকালে ঘন কালো ছায়ার মতো একটা কিছু দেখতে পেত।

দুই, কুয়োর সঙ্গে একটা হ্যাণ্ড-পাম্প লাগানো ছিল। গভীর রাতে কেউ সেটাকে পাম্প করত। হ্যাচাং-হ্যাচাং শব্দ শুনতে পেত প্রতিবেশীরা। তালাবন্ধ খালি বাড়ি অথচ জল পাম্প করার শব্দ। সাহসীরা তিনতলার ছাত থেকে এই বাড়ির পাতকো তলায় টর্চলাইট ফেলত। লোক নেই, জন নেই। পাম্পের হাতল ওঠানামা করছে।

তিন, মাঝরাতের ন্যাড়া ছাতে জলের মূর্তি। একটা মূর্তি চলে-ফিরে বেড়াচ্ছে, কিন্তু জল টলটলে। যেমন, এক বালতি জল। বালতিটা নেই, জলটা বালতির আকার ধরে আছে। সেইরকম মানুষের আকারে জল। ছাতে টলে-টলে বেড়াচ্ছে। মাঝে-মাঝে আকাশে হাত তুলছে।

চার, সার্চলাইট। হঠাৎ একটা তীব্র আলোর রেখা অন্ধকার চিরে আকাশের দিকে ছুটে যেত। গোল হয়ে ঘুরত। সেই আলোর উৎস এই বাড়ির ছাত।

পাঁচ, একবার এক যাত্রার দল এই পাড়ায় তিনদিন ধরে যাত্রা করতে এসেছিল। সেই দলকে এই বাড়িতে থাকতে দেওয়া হয়েছিল। প্রথম রাতের অভিনয়ের পর দলের নায়িকা সকাল দশটার সময় ছাত থেকে ভেতরের উঠোনে পড়ে গিয়ে হাত-পা ভেঙে হাসপাতালে পড়েছিলেন এক মাস। তিনি বলেছিলেন, অদৃশ্য কেউ ছাত থেকে ঠেলে ফেলে দিয়েছিল।

ছয়, একবার এক ভবঘুরে মানুষ এই বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। ভীষণ সাহসী। সারা পৃথিবী ঘুরেছিলেন তিনি। যাওয়ার আগে পাড়ার লোককে বলেছিলেন, এই বাড়িটায় অদ্ভুত একটা কিছু আছে। প্রবল বাতাস যখন কোনো ফাঁক-ফোকর দিয়ে বইতে থাকে তখন শিস দেওয়ার মতো একটা শব্দ হয়। সারা রাত এই বাড়িতে সেইরকম শব্দ হয়। বাইরে বাতাস নেই, ভেতরে বাতাস কেঁদে কেঁদে ফেরে।

সাত, বাগানের মাটি খুঁড়ে একটা কঙ্কাল পাওয়া গিয়েছিল। কোনো মহিলার। হাতে বালা ছিল।

আট, রান্নাঘরের বাইরের দেওয়াল বেয়ে একটা পোড়া মাটির নল সোজা উঠে গেছে তিনতলার ছাতে। খালি বাড়ি। তালা বন্ধ। কেউ কোথাও নেই। প্রতিবেশীরা দেখেছে, গলগল করে ধোঁয়া বেরোচ্ছে।

আমার ঠাকুরদা এর সব ক-টাই লিখে রেখেছিলেন। নাম দিয়েছিলেন ‘ভূতের লিস্ট’। বাড়ির দখল নিয়ে বললেন, ‘দেখা যাক, কোনো ভূত কখন দর্শন দেয়। ভূতের দর্শন পেলে ভগবানেরও দর্শন পাব।’ আমরা তখন খুবই ছোটো। আমি আর আমার দিদি সন্ধে হলেই দুজনে ভয়ে সিঁটিয়ে থাকতুম। এ-মহল থেকে ও-মহলে যেতে ভয়ে বুক কাঁপত। বারান্দার ঘুরপাক। বাঁ দিক দিয়ে একটা সিঁড়ি নেমে গেছে নীচে। আর-একটা সিঁড়ি উঠে গেছে ছাতে। ডান দিকে বাগান থেকে উঠে এসেছে ঝোপঝাপ, গাছপালা। রেলিং-এ ঝুঁকে নীচের দিকে তাকালে পাতকো তলা। হ্যাণ্ড-পাম্পের হাতলটা অন্ধকারে নিরেট এক অন্ধকার। ঝিঁঝির ডাক। পাতার ফাঁকে ফাঁকে চিকচিকে জোনাকি। কে আবার শিখিয়ে দিয়েছিল, জোনাকিরা সব প্রেতাত্মা। তাই সন্ধেবেলা দিদি আর আমি যেন অবিচ্ছেদ্য দুই প্রাণী। দিনের বেলা যত ঝগড়া, রাত্রির হলেই গায়ে গা লাগানো গলায়-গলায় ভাব। মা কি জ্যাঠাইমা হয়তো উত্তর মহলের রান্নাঘর থেকে ডাকলেন, ‘উমা, শুনে যা।’ আমরা অমনই দুজনে জড়াজড়ি করে হাজির হলুম।

মা আমাকে বললেন, ‘তোকে কে ডেকেছে! পড়া ছেড়ে উঠে এলি কেন?’

জ্যাঠাইমা মাকে বললেন, ‘বুঝলি না, সব ভূতের ভয়ে জুজু হয়ে আছে।’

আমি আর দিদি দুজনে যে ঘরে বসে পড়তুম, সেই ঘরের দুটো জানলা। হা-হা করছে। জানলা মানেই ভূত। লম্বা লম্বা হাত বাড়ালেই হল। জানলার দিকে পেছন ফিরে বসা চলবে না। ভূত পিঠে সুড়সুড়ি দিতে পারে। দুজনে মাথা খাটিয়ে বের করলুম, দুজনে পিঠে পিঠ দিয়ে বসব। একজনের মুখ এ-জানলার দিকে, আর-একজনের মুখ ও-জানলার দিকে। ভূত যদি হাত বাড়ায়, দেখতে পাব আর চিৎকার করে উঠব। একটু করে পড়ি আর ভয়ে-ভয়ে তাকাই। তাকাই আর পড়ি, পড়ি আর তাকাই।

আমি যে জানলাটার দিকে তাকাতুম, তার ওপাশেই ছিল বাইরে যাওয়ার সিঁড়ি। বাড়িটার দুটো সিঁড়ি ছিল। একটা খিড়কির, আর-একটা সদরের। ওটা ছিল সদরের সিঁড়ি। একদিন আমরা দুজনে পড়তে বসেছি। পড়া বেশ কিছুটা এগিয়েছে, এমন সময় জানলায় একটা মুখ। সাদা লম্বা দাড়ি, চুল। ধকধকে দুটো চোখ। সঙ্গে সঙ্গে আমার চিৎকার, ‘দিদি রে! ভূত।’ বলা মাত্রই দিদির এক লাফ। দুজনে বইপত্তর উলটে, জড়াজড়ি করে দৌড় মারলুম উত্তর মহলের রান্নাঘরের দিকে। জ্যাঠাইমা ময়দা মাখছিলেন। সোজা তাঁর ঘাড়ে। তিনজনেই চিতপাত। জলের ঘটি উলটে গেল। উলটে গেল দুধের ডেকচি। মা আলুর দমের আলুর খোসা ছাড়াচ্ছিলেন। তিনি ভাবলেন, ভূমিকম্প হচ্ছে। মা ভয় পেলে ইংরেজি বলেন। চিৎকার করতে লাগলেন, ‘আর্থকোয়েক, আর্থকোয়েক। শাঁখ বাজাও, শাঁখ বাজাও।’

জল, ময়দা, ডাল, দুধ সব মেখে আমরা উঠে দাঁড়িয়ে বললুম, ‘আমরা ভূত দেখেছি।’

‘সন্ধে সাতটার সময় ভূত!’

না, ভূত নয়। এক ভদ্রলোক। আশুবাবু, আমার ঠাকুরদার বন্ধু। কবি। ভদ্রলোকের পেছন-পেছন ঠাকুরদাও উঠছিলেন সিঁড়ি দিয়ে। তিনি হুটোপটির শব্দ শুনছিলেন। রান্নাঘরে এসে বললেন, ‘ছি ছি! কী লজ্জার কথা। আশুবাবু বলছেন, ‘‘আমার চেহারাটা কি এতই ভয়ংকর যে, ছেলেমেয়ে দুটো ওইভাবে ছুটে পালাল। এ দাড়ি তো আমার অনেক দিনের। কবিতায় তেমন ফোর্স আসছিল না বলেই দাড়ি রাখতে বাধ্য হয়েছি, কবিগুরুর অনুপ্রেরণায়’’।’

মা বললেন, ‘বাবা, এ দুটো হল রামভিতু। দিনরাত, চলতে-ফিরতে ভূত দেখছে।’

পরে দিদিতে-আমাতে একটা গবেষণা হল। যতই হোক আমরা তো অপমানিত হয়েছি। ভয়ংকর অপমান। ঠাকুরদার কবি-বন্ধুকে ভূত ভেবেছি।

দিদি বললে, ‘বিলু, ভূত সম্পর্কে তোর কোনো আইডিয়া আছে, কেমন দেখতে, না দেখতে?’

আমরা দুজনেই তো দেখিনি কখনো। কেবল শুনেছি। ভূত দেখা যায় না। ভূত কেবল কর্ম। কর্ম বললে ভুল হবে। ভূত হল অপকর্ম। নানারকম অদ্ভুত-অদ্ভুত কাজ করে। দিদি বললে, ‘একটা লিস্ট কর। এক নম্বর, ভূত অদ্ভুত-অদ্ভুত শব্দ করে। দুই, ঘাড়ের কাছে ঠাণ্ডা নিশ্বাস ফেলে। তিন, যেকোনো জিনিসকে শূন্যে উঠিয়ে দেয়। চার, শুয়ে থাকলে ঠ্যাং ধরে ঘুরিয়ে দেয়। পাঁচ, বন্ধ জানলা-দরজা খুলে দেয়। ছয়, হা হা করে হাসে। সাত, পিঠে সুড়সুড়ি দেয়। আট, ঝড় হয়ে বয়ে যায়। নয়, মেজাজ ভালো থাকলে জিনিসপত্তর হাতের কাছে এগিয়ে দেয়। দশ, জিনিসপত্তর অদৃশ্য করে দেয় আবার জিনিস রেখেও যায়। এগারো, ঘুমন্ত মানুষের বুকের ওপর চেপে বসে। বারো, কখনও অস্পষ্ট সাদা মূর্তির মতো কাউকে কাউকে দর্শন দেয়। নাকিসুরে কথা বলে।’

লিস্ট শেষ হওয়ার পর দিদি বললে, ‘শোন বিলু, এর পর থেকে কোনো লোক দেখলে ভূত-ভূত করে চেঁচাবি না গাধার মতো। আমাদের একটা প্রেস্টিজ আছে। ছোটো হলেও খুব ছোটো নই। ভূতের কোনো চেহারা থাকে না। ভূত হল বাতাস, ভূত হল ধোঁয়া, ভূত হল শব্দ।’

বেশ চলছিল হেসে-খেলে আমাদের সংসার। মা আর জ্যাঠাইমা যেন দুই বোন। ঠাকুরদা যেন মহাদেব। বাবা আর জ্যাঠামশাই যেন হলায় গলায় দুই বন্ধু। আর আমরা, ভাই-বোন, কেউ কাউকে ছেড়ে এক মুহূর্ত থাকতে পারি না। দুজনে সকালে স্কুলে যাওয়ার সময় রোজ কী মন খারাপ! অনেকক্ষণ দেখা হবে না দুজনের। স্কুল থেকে ফেরার সময় দিদির স্কুলের সামনে গিয়ে দাঁড়াতুম। দুজনে একসঙ্গে গল্প করতে করতে ফিরতুম। দিদি ভীষণ বেড়াল ভালোবাসত। পথে কোনো বেড়াল দেখলেই থমকে দাঁড়াত। বলত, বিলু, দেখ, কী সুন্দর মা-লক্ষ্মীর মতো বেড়াল। চুক-চুক করে ডাকত। বেড়াল অমনই লেজ তুলে নির্ভয়ে দিদির কাছে এসে পায়ে গা ঘষত। আমার একটু দুষ্টুমি করার ইচ্ছে হত। লাফিয়ে গাছের ডাল ধরে টানছি। বুটজুতো দিয়ে পাথরের টুকরোয় শট মারছি। আর দিদি আমাকে সাবধান করছে। যখন শুনছি না, কান ধরে বলছে, বানর ছেলে। আমি হিহি করে হাসছি। দিদি ভয় দেখাচ্ছে, ‘বাড়ি চলো না, তোমার হবে।’ বাড়ির কাছাকাছি এসে আমাদের দুজনের দৌড় শুরু হত। রেস। দিদিকে খুব ফরসা আর সুন্দর দেখতে ছিল। যখন ছুটত, ফিতে-বাঁধা বিনুনি পিঠে দুলত। সপাত-সপাত শব্দ করত। ফরসা গাল দুটো গোলাপের মতো লাল হয়ে যেত। আর আমি তখন দিদিকে আরও ভালোবেসে ফেলতুম।

এই সময় মা একদিন ভীষণ ভয় পেলেন। রাত এগারোটা নাগাদ কাজকর্ম শেষ করে রান্নাঘরের পাট চুকিয়ে দক্ষিণের মহলে আসছেন, ডান দিকে ছাতে ওঠার সিঁড়ি। জায়গাটা অন্ধকার-অন্ধকার। হঠাৎ দেখলেন, লালপাড় শাড়ি পরে কে একজন ছাতে উঠে যাচ্ছে। মা ভেবেছিলেন, জ্যাঠাইমা। জিজ্ঞেস করলেন, ‘এত রাতে ছাতে যাচ্ছ কেন?’ কিন্তু ঘরে এসে জ্যাঠাইমাকে দেখে ভীষণ ভয় পেয়ে গেলেন। মায়ের কথা কেউ বিশ্বাস করতেই চাইলেন না। শেষ বাবা আর জ্যাঠামশাই টর্চ নিয়ে ছাতে গেলেন। কিছুই দেখতে পেলেন না।

ঠাকুরদা বললেন, ‘কিছুই না, চোখের ভুল, অমন হয়। ভূত তো বাইরে নেই, আছে মানুষের মনে।’

সবাই সায় দিলেন, ‘ঠিকই তো, ঠিকই তো।’

মা কিন্তু পর-পর তিনদিন একই সময় সেই মূর্তিকে ছাতে উঠে যেতে দেখলেন। জ্যাঠাইমা ছাড়া কেউই তেমন পাত্তা দিলেন না মায়ের এই দেখাটাকে। ঠিক সাতদিনের মাথায় ছাতে কাপড় শুকোতে দিতে গিয়ে মায়ের পায়ের তলায় একটা মাছের কাঁটা ফুটে গেল। হয় কাকে এনেছিল, না হয় বেড়ালে। কাঁটাটা টেনে খুলে ফেলে দিয়েছিলেন। নীচে নেমে এসে জ্যাঠাইমাকে একবার বলেছিলেন। জ্যাঠাইমা আয়োডিন লাগিয়ে দিয়েছিলেন। জিনিসটাকে কেউই তেমন ভয়ের চোখে দেখেননি, কিন্তু সেইদিনই সন্ধেবেলা মায়ের কেঁপে জ্বর এল। ডাক্তার এলেন। পরীক্ষা করে বললেন, ‘আর কিছু করার নেই, ধনুষ্টঙ্কার হয়ে গেছে।’ চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে মা চলে গেলেন।

দিদি আর আমি হাঁ করে তাকিয়ে থাকি আকাশের দিকে। মনে মনে ভাবি, মা হয়তো কোথাও বেড়াতে গেছেন। হঠাৎ ফিরে আসবেন একদিন। দু-হাতে জড়িয়ে ধরবেন আমাদের দুজনকে। আমি দিদির দিকে তাকাই। দিদি আমার দিকে। দুজনেই কেঁদে ফেলি।

দিদি বলে, ‘মায়ের মতো মা কি আর পাওয়া যাবে রে বিলু! আর বেঁচে থেকে কী হবে? জ্যাঠাইমাও আমাদের মা। তা হলেও, মা একটা আলাদা জিনিস।’

পাড়া-প্রতিবেশীরা বলতে লাগল, তখনই বলেছিলুম, বাড়িটা হানাবাড়ি। শুনলে না তোমরা! এখনও সময় আছে। সংসারটা চুরমার হয়ে যাওয়ার আগে পালাও। কেউই সে কথা শুনলেন না। বাবা বললেন, ‘এদের মা যেখানে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন, আমার কাছে সেই জায়গাটা তীর্থ।’

জ্যাঠামশাই বললেন, ‘ঠিকই তো, ঠিকই তো!’

ছটা মাস কোথা থেকে কেটে গেল। শীতের মুখে দিদি একদিন সেই মূর্তি দেখতে পেল সিঁড়িতে। লালপাড় শাড়ি পরে ছাতের সিঁড়ি দিয়ে নি:শব্দে উঠে যাচ্ছে ওপরে। দিদি ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল, ‘বিলু, এইবার আমার মরার পালা।’

সকলে দিদিকে জেরা শুরু করলেন, ‘তুই কী দেখেছিস, ঠিক করে বল।’

দিদি বললে, ‘বলে আর কী হবে! আমি যা দেখেছি তা দেখেছি। এইবার আমাকে নিয়ে যাবে। আমাকেও চলে যেতে হবে মায়ের কাছে।’

আমি আর দিদি এক বিছানায় পাশাপাশি শুতুম। চাঁদের আলো এসে পড়েছে দিদির মুখে। দিদি অনেকক্ষণ জেগে শুয়ে ছিল কপালে হাত রেখে। হঠাৎ আমার দিকে পাশ ফিরে বললে, ‘শোন বিলু, আমি তো চলে যাচ্ছি, আমার যা আছে সব একটা বাক্সে ভরে তোর কাছে রেখে দিবি। কাউকে দিবি না। বাক্সটার ওপর বড়ো বড়ো করে লিখে রাখবি, ‘আমার দিদি’। যখন তুই অনেক অনেক বড়ো হয়ে যাবি, তখনও বাক্সটা তোর কাছে রেখে দিবি। মাঝে-মাঝে খুলে দেখবি। যখনই খুলবি আমার গলা শুনতে পাবি, বিলু।’

সে-রাতে দুজনেই জেগে রইলুম। কারও চোখে ঘুম নেই। সকালে সারা বাড়িতে ভীষণ উত্তেজনা। আমাদের ছাতে আমাদেরই সাদা ধবধবে বেড়ালটা মরে পড়ে আছে। সুস্থ-সুন্দর বেড়াল। আগের রাতে জ্যাঠাইমার হাতে মাছ-ভাত খেয়ে গেছে। এমন তো হওয়ার কথা নয়। ফুলের মতো সাদা একটা বেড়াল দলা পাকিয়ে পড়ে আছে ছাতের এক কোণে। কাল রাতে কাগজের একটা দলা নিয়ে কত খেলেছে! দিদির কোলে শুয়ে ঘড়ঘড় করেছে। জ্যাঠাইমা যখন রান্নাঘরে রাঁধছিলেন, পিঠে গা ঘষেছে।

দিদি ঘরে গিয়ে চুপ করে বসল। আমাকে বলল, ‘বড়ো ভয় করছে রে বিলু! আমার মৃত্যুটা কীভাবে হবে! ছাতে, না ঘরে!’

আমার ঠাকুরদা সেদিন আর স্কুলে গেলেন না। কোথায় যেন বেরিয়ে গেলেন। যাওয়ার সময় বাবা আর জ্যাঠামশাইকে বলে গেলেন, ‘তোমরা উমাকে ঘিরে বসে থাকো, যেন নিয়ে না যেতে পারে!’ কোথায় যাচ্ছেন, কেন যাচ্ছেন, কিছুই বললেন না।

অনেকক্ষণ পরে ফিরে এলেন একটা লরি চেপে, সঙ্গে তিনজন লোক। সেইদিনই আমরা বাড়িটা ছেড়ে দিলুম। সব জিনিসপত্তর নিয়ে আমরা আর-একটা বাড়িতে এসে উঠলুম। ভূত আছে কি না জানি না, কিন্তু ভূত যেন একালের টেররিস্ট। দিদির বুকে বন্দুকের নল ঠেকিয়ে সেদিন বলেছিল, ‘বাড়িটা ছাড়, নয়তো একেও মারব!’

শুধু একটাই দুঃখ, বাড়িটায় না এলে মা হয়তো আজও বেঁচে থাকতেন!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%