সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
মাঠের ধার ঘেঁষে ছোট্ট একটি বন। সেই বনে ছোট্ট একটি কুঁড়েঘর। সেই ঘরে একজন সাধু বাস করেন। গেরুয়া বসন। গলায় গোটা গোটা রূদ্রাক্ষের মালা। মাথায় বিশাল জটা, গায়ের রং যেন পাকা পেয়ারার মতো। টানা টানা দেবতার মতো চোখ। খাড়া নাক।
একদিন দাদার সঙ্গে বেড়াতে বেড়াতে সেই কুটিরের ধারে গিয়ে পড়েছিলাম। সন্ধে হতে তখনও অনেক দেরি। পাতার ফাঁক দিয়ে বেলা শেষের রোদ সোনার শালপাতার মতো চারপাশে ছড়িয়ে আছে। সন্ন্যাসী একপাশে বসে হোমের কাঠ কাটছিলেন। আমাদের পায়ের শব্দে মুখ তুলে তাকালেন। এক মুখ হেসে বসলেন, ‘কী গো, শ্যামল, তমাল বেড়াতে বেরিয়েছ বুঝি।’
দাদা অবাক হয়ে বললে, ‘আপনি আমাদের নাম জানলেন কী করে?’
সন্ন্যাসী বললেন, ‘কী জানি, আমার মনে হল, বড়োটি শ্যামল, ছোটোটি তমাল।’
দাদা নীচু হয়ে পায়ের ধুলো নিতেই, আমিও পায়ের ধুলো নিলুম। সন্ন্যাসী মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করলেন। সারা শরীর যেন জুড়িয়ে গেল।
সন্ন্যাসী বললেন, ‘বোসো, তোমাদের ফল খাওয়াব। কী ফল খাবে বল?’
আমার ভীষণ আম খেতে ভালো লাগে। চট করে বলে ফেললুম, ‘আম খাবো।’
দাদা বললে, ‘কী বোকা ছেলে! এ সময় আম পাওয়া যায়? এই সবে শীত শেষ হল।’
সন্ন্যাসী বললেন, ‘ইচ্ছে যখন হয়েছে, তখন দেখা যাক চেষ্টা করে। ভগবানের ইচ্ছে হলে সবই সম্ভব।’
সমস্ত কাঠ গুছিয়ে রেখে সন্ন্যাসী উঠে দাঁড়ালেন। কী সুন্দর বলিষ্ঠ চেহারা! তেমনি লম্বা। সন্ন্যাসী বললেন, ‘তোমাদের সাহস আছে? ভয় পাবে না তো?’
দাদা বললে, ‘কী করবেন আপনি?’
‘তা হলে দেখ কী করি।’
সন্ন্যাসী দু-পাশে দু-হাত মেলে দাঁড়িয়ে পড়লেন। চোখ দুটি বোজানো। ধীরে ধীরে এক আশ্চর্য কান্ড ঘটে গেল। তিনি একটি গাছে রূপান্তরিত হলেন। চারপাশে অসংখ্য ডালপালা বেরুলো। সবুজপাতা বাতাসে দুলছে।
দাদা ফিসফিস করে বললে, ‘কী আশ্চর্য! আমগাছ!’
ডালে ডালে ঝুলছে, একটি দুটি করে পাকা আম। দাদার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছি। ভীষণ ভয় করছে। গাছের ভেতর থেকে সন্ন্যাসীর গলা ভেসে এল, ‘ভয় পেও না তমাল। এগিয়ে এসো। সব আমই তোমাদের নাগালের মধ্যে। একটা করে পেড়ে নাও।’
দাদা আর আমি দুজনেই হাঁ করে দাঁড়িয়ে রইলুম। ভয়ে হাত-পা নড়ছে না। দাদা কাঁপা কাঁপা গলায় বললে, ‘আপনি আবার মানুষ হয়ে যান। আমরা আম খাব না। আমাদের ভীষণ ভয় করছে।’
হাসির শব্দ শোনা গেল। সন্ন্যাসী বললেন, ‘এই আম খেলে তোমাদের ভালো হবে। সব অসুখ সেরে যাবে। শরীর ভালো হবে। কখনও কারুর কাছে পরাজিত হবে না। কোনো দুঃখ-কষ্ট থাকবে না। এসো, এগিয়ে এসো। আম খাও।’
সব শুনেও আমাদের সাহস হল না। আমগাছ অদৃশ্য হল। সন্ন্যাসী সামনে দাঁড়িয়ে দু-হাত তুলে হাসছেন। দাদা আমার হাত ধরে টান মারল। দুজনেই ভয়ে ছুটতে শুরু করলুম বাড়ির দিকে। ছুটতে ছুটতে শুনতে পেলুম সন্ন্যাসী বলছেন, ‘ভয়কে জয় করো, জীবন অনেক বড়ো।’
কী যে এর মানে কিছুই বুঝলাম না। আমরা অনেক দূরে চলে এসেছিলুম বেড়াতে বেড়াতে। বাড়ি ফিরে আসতে প্রায় এক ঘণ্টা সময় লেগে গেল।
সেদিন রাতে খুব বাতাস উঠল। গাছের পাতা কেঁপে কেঁপে উঠছে। আমাদের শোবার ঘরের পাশে বেশ বড়ো একটা জাম গাছ ছিল। বাতাসে তার ডালপালা মাঝে মাঝে নুয়ে এসে জানালা ছুঁয়ে যাচ্ছে। শুয়ে শুয়ে দাদা আর আমি গল্প করতে করতে এক সময় বোধহয় ঘুমিয়েই পড়েছিলুম। স্বপ্ন কি-না জানি না, হঠাৎ দেখি জানালার বাইরে সেই সন্ন্যাসী এসে দাঁড়িয়েছেন। এই দোতলার ঘরে জানালার বাইরে তিনি কেমন করে এসে দাঁড়ালেন! কীসের উপর দাঁড়ালেন! শূন্যে ভাসছেন ফানুসের মতো। বাতাসে তাঁর গেরুয়া চাদর উড়ছে, জটা পাক খাচ্ছে। আমি কি স্বপ্ন দেখছি!
নিজের হাতে নিজেই একটা চিমটি কাটলুম। বেশ ব্যথা লাগল। তাহলে তো জেগেই আছি। দাদা বলে একবার ডাকলুম। ভয়ে গলা দিয়ে কোনো স্বর বেরলো না।
সন্ন্যাসী হাত নেড়ে আমাকে ডাকলেন। বেগুনি আকাশে অ্যালুমিনিয়ামের পাতের মতো অসংখ্য তারাকে যেন আঠা দিয়ে আটকে দিয়েছে। ঝলমল ঝলমল করছে। সন্ন্যাসীর সোনার বরণ জটা বাতাসে উড়ছে।
আমি মনে মনে বললুম, না, আমার ভীষণ ভয় করছে, আমি যাব না।
আমার শরীর হালকা মেঘের মতো বাতাসে ভেসে উঠল। আমি কিছু একটা ধরার চেষ্টা করলুম। আমার ধরার শক্তি চলে গেছে। ধোঁয়ার মতো পাকিয়ে পাকিয়ে আমার শরীর জানলার গরাদ গলে বাইরে বেরিয়ে গেল। সন্ন্যাসীর মতো আমিও ভাসতে লাগলুম বাতাসে।
সন্ন্যাসী বাতাসের শব্দে হু হু করে হেসে উঠলেন, ‘তোমার কীসের ভয় তমাল? আমি তো তোমার পাশে রয়েছি! এই বিশাল পৃথিবীর দিকে একবার তাকিয়ে দ্যাখো, আমরা কত উঁচুতে উঠে এসেছি।’
এখন আমার আর কোনো ভয় নেই। বেশ মজা লাগছে। হালকা মেঘের মতো বেগুনি আকাশে ভেসে চলেছি। আধফালি চাঁদ আমার কত কাছে! তারারা কত বড়ো হয়ে উঠেছে; ছোটো ছোটো মুক্তোর দানার মতো কী সব জিনিস মাঝে মাঝে ঝলমল করে উঠছে।
সন্ন্যাসী বললেন, ‘সারাদিন, নদী আর সমুদ্র থেকে যত জলকণা মেঘ হয়ে আকাশে ভেসে উঠেছে, তারই ওপর চাঁদের আলো পড়ে অমন ঝলমল করছে। এরই একটি দুটি দানা শেষ রাতে সমুদ্রে ঝরে পড়বে মুক্তো হয়ে। এরাই পৃথিবীর বুকে ফুল ফোটাবে। ধানের দুধ হয়ে জমে চাল হবে। তোমার কেমন লাগছে তমাল?’
‘ভীষণ ভালো। আমি আর পৃথিবীতে ফিরে যেতে চাই না।’
‘তাকি হয়? ফিরতে আমাদের হবেই, যে সব কাজ করার জন্যে ভগবান আমাদের পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন, সেই সব কাজ শেষ না হলে পৃথিবী ছেড়ে যাবার উপায় নেই।’
আকাশের গায়ে হিরের পাহাড় ঝলসে উঠল। চতুর্দিক রুপোর মতো হাসছে। আনন্দে বলে উঠলুম, ‘সন্ন্যাসী মহারাজ, ও কী?’
‘ওই তো তোমার হিমালয়? হিরের মতো ঝলমল করছে এভারেস্ট।’
মেঘগর্জনের মতো গুড়ু গুড়ু শব্দ হচ্ছে। হিল হিল করে সাপের মতো বিদ্যুৎ খেলে যাচ্ছে।
‘ও কীসের শব্দ! কী হচ্ছে ওখানে?’
‘ভালো করে দেখে নাও তমাল। নদীরা সব এখানেই জন্মায়। ওই দ্যাখো হোমের ধোঁয়া উঠছে। চারপাশে শক্তি ছুটে যাচ্ছে বিদ্যুতের মতো। ওই দ্যাখো, এভারেস্টের মাথায় মহাদেবের বিশাল ত্রিশূলটি কেমন পোঁতা রয়েছে।’
‘কই, কোনো অভিযাত্রী তো ওই ত্রিশূল কোনো অভিযানে দেখতে পাননি।’

‘দেখার চেষ্টা করেননি।’
‘আপনি আমাকে কোথায় নিয়ে চলেছেন? কেনই বা নিয়ে চলেছেন?’
‘তোমাকে অনেক বড়ো হতে হবে তমাল, তাই বড়ো, কত বড়ো হতে পারে, তোমাকে দেখবার জন্যে তুলে এনেছি। মানুষের আসল ঠিকানা জানতে চাও? কোথা থেকে এসে কোথায় যায়?’
‘হ্যাঁ, আমার ভীষণ ইচ্ছে করে জানতে।’
‘বেশ, চলো তা হলে।’
হু হু বাতাসে আমরা একটা সুড়ঙ্গে ঢুকে পড়লুম। ‘আকাশে সুড়ঙ্গ থাকে না কি?’
সন্ন্যাসী বললেন, ‘এই তো রয়েছে। মর্ত্য যেখানে শেষ আকাশ আর পৃথিবী যেখানে মিশেছে সেইখানেই আছে দেবলোকে যাবার এই পথ।’
‘কীসের তৈরি এই সুড়ঙ্গ, সন্ন্যাসী মহারাজ?’
‘জ্যোতি দিয়ে তৈরি, দেখছ না! বহু বর্ণের আলো খেলে যাচ্ছে।’
সেই অদ্ভুত পথ ধরে আমরা যেতে যেতে হঠাৎ এমন এক জায়গায় এসে পড়লুম, যেখানে কোনো দিক নেই, আকাশও নেই, শুধু সোনালি আলো ধূ ধূ করছে তেপান্তরের মাঠের মতো, কোথাও কোনো জনপ্রাণী নেই। চারদিক নির্জন।
সন্ন্যাসী বললেন, ‘এই সেই জায়গা। এখানে সময় নেই, ঘড়ি নেই, সূর্য নেই, চন্দ্র নেই, তারা নেই, কাজ নেই, অকাজ নেই।’
‘তা হলে কী আছে!’
‘দেখতে চাও? তা হলে তোমার যাঁরা মারা গেছেন, তাঁদের একে একে ডাকো।’
আমি ডাকলুম, ‘দাদু, তুমি কোথায়?’
উত্তর ভেসে এল, ‘আছি, আছি।’
‘ঠাকুমা, তুমি কোথায়?’
‘আছি, আছি।’
আমার ছোটো বোন শ্যামা তিন বছর আগে মারা গিয়েছিল, ডাকলুম, ‘শ্যামা, তুমি কোথায়?’
‘আছি, আছি।’
সন্ন্যাসী বললেন, ‘এবার তোমার নাম ধরে ডাকো।’
‘তমাল!’
কোথা থেকে আমারই কন্ঠস্বর ভেসে এল, ‘আছি, আছি।’
‘সে কি, আমি এখানেও আছি, ওখানেও আছি।’
‘আরে সেইটাই তো মজা! কোনো কিছুর শেষ নেই, শুরুও নেই।
নাও চলো, এবার ফিরে যাই। একটু পরেই সাত ঘোড়ার রথে চেপে সূর্যদেব আকাশে উঠবেন।’
‘কেমন করে আমরা ফিরব?’
‘কেন, শিশির হয়ে ঝরে পড়ব। বলো, আমি শিশির।’
‘আমি শিশির।’
গোলাপ বাগানে মা দাঁড়িয়ে আছেন, সবে ভোর হয়েছে। চারদিকে পাখি ডাকছে। মা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি রে, তুই আজ এত ভোরে উঠে পড়েছিস! কোনো দিন তো উঠিস না!’
‘দাঁড়াও মা, আমি এখুনি আসছি।’
তাড়াতাড়ি নিজের ঘরের দিকে ছুটলুম। যা ভেবেছি তাই, আমি আমার খাটে শুয়ে আছি। ঘুমে বেহুঁশ। জল যে ভাবে গর্তে ঢোকে, ‘ধোঁয়া যে ভাবে শিশিতে ঢোকে, আমিও সেই ভাবে ফুর ফুর করে আমাতে ঢুকে গেলুম।
অনেক বেলায় মা দেখি আমাকে ডাকছেন, ‘ওঠ, ওঠ, ভোরবেলা আবার এসে শুলি কেন?’
‘ভোরের ঘুম কি সহজে ভাঙে!’
চাঁদের দেশের বাসিন্দা দৈত্য দানো পরীর দল সব পালিয়ে যাবে ঠিক করেছে। অনেক দূরে আর এক সূর্যের দেশে তারা এক নতুন রাজ্য বানাবে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন