সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
দাদার ওপর বাবা ভীষণ রেগে গেছেন। পড়াশোনায় তেমন মন নেই। সারাদিন শুধু খেলা খেলা। হাফ-ইয়ারলি পরীক্ষায় সব বিষয়েই কম কম নম্বর পেয়েছে। রেজাল্টের কাগজটা মেঝের ওপর ছুড়ে ফেলে দিয়ে বললেন, ‘তুমি কী ভেবেছ? জীবনটা এইভাবেই চলবে? আমি চিরকাল বেঁচে থাকব, আর তোমাদের বসিয়ে খাওয়াব। পড়তে ভালো না লাগে লেখাপড়া ছেড়ে দাও।’ মাকে ডেকে বললেন, ‘সংসারে একটা বাঁদর জন্মেছে। বাঁদরের সঙ্গে যেমন ব্যবহার করা উচিত আজ থেকে ঠিক সেইরকম ব্যবহারই করবে। আমার কথা হল, তুমি ছাত্র, ছাত্র ছাত্রর কাজ দেখাক, আমরা আমাদের কাজ দেখাব। যে গরু দুধ দেবে না তার জন্যে আবার ভাবনা কীসের!’
মা সকালে জলখাবার এনেছিলেন—দুধ, রুটি, ডিমসেদ্ধ। বাবা চড়া গলায় বললেন, ‘নিয়ে যাও ওসব। অত আদর চলবে না। সারা জীবন জোটাতে পারবে ওইসব খানা? করতে হবে তো মুটেগিরি, মজুরগিরি। চায়ের দোকানে বয় হয়ে কাপডিশ ধুতে হবে। হটাও ওসব। দিনে দুবার খেতে দেবে ডাল, ভাত, যেকোনো একটা তরকারি।’
মা খুব আস্তে আস্তে বললেন, ‘নাম করে এনেছি, আজকের দিনটা খেয়ে নিক।’
মেঝেতে রেজাল্টের কাগজটা হাওয়ায় উড়ছিল। বাবা নীচু হয়ে সেটা কুড়িয়ে নিয়ে মায়ের চোখের সামনে নাচাতে নাচাতে বললে, ‘এ যার রেজাল্ট তার জন্যে ডিমও নয়, দুধও নয়, মোটা মোটা রুটি আর আর ডেলা ডেলা ভেলি গুড়। ভস্মে ঘি ঢেলে কী হবে?’
রেজাল্টের কাগজটা দাদার মুখের ওপর ছুড়ে ফেলে দিয়ে বাবা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। দাদা গুম হয়ে বসে আছে। মা পড়েছেন মহা বিপদে। খাবার নিয়ে কী করবেন ভেবে পাচ্ছেন না। চোখ দুটো যেন ছলছল করছে। খাবারের প্লেট আর দুধের গ্লাসটা দাদার সামনে রাখতে রাখতে বললেন, ‘একটু ভালো করে চেপে পড় না বাবা। দেখছিস তো কী দিনকাল পড়েছে। ভালো ভালো ছেলেরাই চাকরি-বাকরি পাচ্ছে না। তোর বাবারও বয়েস বাড়ছে। চিন্তায় চিন্তায় মাথার চুল সব পেকে যাচ্ছে। আজ থেকে একটু ভালো করে লেখাপড়া কর। নে, খেয়ে নে।’
দাদা উঠে দাঁড়াল। বেশ লম্বা হয়েছে। উঠে দাঁড়ালে মায়ের মাথায় মাথায়। কপালের ওপর চুল ঝুলছে।
‘খাবি না?’
‘না। ওসব খাবার আমার জন্যে নয়।’
মা দাদার চুল সরিয়ে দিতে দিতে বললেন, ‘তোর রাগের কোনো মানে হয় না। সত্যিই তো লেখাপড়া ছেড়ে দিয়েছিস। লেখাপড়া করলে কার উপকার হবে, আমাদের না তোর নিজের। বলতে গেলে রেগে যাস। সব কথা এ-কান দিয়ে ঢোকাস ও-কান দিয়ে বের করে দিস। খাচ্ছিস দাচ্ছিস, বেশ মজায় আছিস।’
‘তুমি বেশি বকবক কোরো না তো। যা করছ তাই করো।’
দাদার কথা শুনে মা হাঁ হয়ে গেলেন। চোখ বেয়ে দু-ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। ধরা-ধরা গলায় বললেন, ‘তুই একেবারে উচ্ছন্নে গেছিস শুভো। সঙ্গ ছাড়তে না পারলে ভবিষ্যতে তোর অনেক দুর্ভোগ আছে।’
‘আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে তোমাদের আর চিন্তা করতে হবে না।’ দাদা বেরিয়ে গেল।
এক হাতে দুধের গেলাস, আর এক হাতে প্লেট, দাদার চলে যাওয়ার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে মা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইলেন।
আমি জানি দাদা এখন কোথায় যাবে। প্রথমে পার্থদের বাড়ি। সেখানে একটা ছোটো দল তৈরি হবে। কিছুক্ষণ ক্যারাম পিটবে, তারপর যাবে স্বপনদের বাড়ি। সেখানে আজ ফ্ল্যাগ রং হবে। ময়দানে লীগের খেলা আছে। স্কুলে আজ যেতেও পারে, না-ও যেতে পারে। যদি না যায়, দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর বিছানায় আড় হয়ে শুয়ে কিছুক্ষণ গল্পের বই পড়বে। তারপর যেই তিনটে বাজবে, বইটাকে টান মেরে ফেলে দিয়ে আবার বেরিয়ে যাবে। কখন ফিরবে কেউ জানে না। সাতটা হতে পারে, সাড়ে সাতটা হতে পারে। কতদিন এমন হয়েছে, মাস্টারমশাই বসে থেকে থেকে এক সময় বিরক্ত হয়ে চলে গেছেন। সন্ধেবেলা যেদিন পড়তে বসে সেদিন পড়ার চেয়ে ঢুলটাই বেশি হয়। ঢুলে ঢুলে মাথাটা টেবিলের দিকে ঝুঁকে পড়ে, মাস্টারমশাই মাঝে মাঝে ঠেলে ওপর দিকে তুলে দেন।
মা চিৎকার করে বললেন, ‘আজ তুমি খাবার সময় বাড়ি ঢুকো, ভালো করে খাইয়ে দোব।’
দূর থেকে দাদা বলল, ‘দেখা যাবে!’
বাবা বাথরুমের সামনে জানালার গ্রিলে আয়না ঝুলিয়ে দাড়ি কামাচ্ছিলেন, মাকে বললেন, ‘দাও, আরও আদর দাও।’

সারা বাড়িতে অদ্ভুত একটা বিষণ্ণতা নেমে এল। বাবার মুখ গম্ভীর, মার চোখ ছলছলে, এমন কী কুকুরটা পর্যন্ত ঘেউ ঘেউ করতে ভুলে গেছে। একটা কাক কেবল পাঁচিলে বসে খা-খা করছে। মা বললেন, ‘অলক্ষুণে কাকটাকে তাড়া তো।’
বাবা চান-টান করে বেরোতে যাচ্ছিলেন। কোনোরকমে খাওয়া সেরেছেন। জুতো-মোজাও পরা হয়ে গেছে। হঠাৎ কী হল, মাকে ডেকে বললেন, ‘আজ আমি বেরোব না। একটা হেস্তনেস্ত করে ছাড়ব! ও কত বড়ো লায়েক হয়েছে আমি দেখতে চাই।’
মা যেভাবে আমাদের ভোলান সেইভাবে বাবাকে ভোলাতে চেষ্টা করলেন, ‘বেরোবার সময় মাথা গরম কোরো না। তুমি বেরিয়ে পড়ো। ও এলে আমি আজ ওর চামড়া খুলে নোব। কত বাড় বেড়েছে দেখব!’
বাবার মুখে ব্যঙ্গের হাসি, ‘তোমার কম্ম নয়। যা করার আমিই করব।’
জামা-জুতো খুলে সারা বাড়িতে বাবা যেন জল্লাদের মতো ঘুরতে লাগলেন। চেয়ারের পেছনে সরু একটা বেল্ট ঝুলছে সাপের মতো। বেল্টটা অপেক্ষা করে আছে, দাদা একবার এলে হয়। আমি যেন মনের চোখে দেখতে পাচ্ছি দাদার ফর্সা পিঠে একটা একটা করে বেল্টের সোঁটা-সোঁটা দাগ ফুটে উঠছে।
মায়ের রান্নায় তেমন মন নেই আজ। উদাস চোখে তাকিয়ে আছেন জানালার বাইরে আকাশের দিকে। সাদা শরতের মেঘ তুলোর পাহাড়ের মতো ক্রমশই মাথা টেনে উঠছে। একটা বিশাল মুখ তৈরি হয়েছে, যেন দেবতার মুখ। পাশে ছোট্ট একটা লোমওলা কুকুর ল্যাজ তুলে ভেসে চলেছে। আকাশের মুখটাকে মনে মনে বলি, হে ঠাকুর, দাদাকে বাঁচাও।
পাশের রাস্তা দিয়ে শঙ্কর যাচ্ছিল আপন মনে। ভারী ভালো ছেলে। আমার দাদা যদি শঙ্করের মতো হত! সব পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করে দাদার ক্লাসেই পড়ে। জানালায় দাঁড়িয়ে ডাকলুম, ‘শঙ্কর-দা, শোনো।’
প্রথমে আমাকে দেখতে পায়নি। দেখতে পেয়ে এগিয়ে এল, ‘কী বলছ।’
‘তোমার সঙ্গে দাদার দেখা হবে?’
‘জানি না তো।’
‘যদি দেখা হয় তুমি বলবে ও যেন বাড়িতে এখন না আসে। এলেই বাবার হাতে ভীষণ মার খাবে। আমার মনে হয় ও পার্থদের বাড়িতে আছে। তুমি একটু বলে দেবে লক্ষ্মীটি।’
‘আচ্ছা,’ বলে শঙ্কর চলে গেল। শঙ্কর মাথা নীচু করে রাস্তায় হাঁটে। ভালো ছেলে কিন্তু কোনো অহংকার নেই। দাদার কথা উঠলেই বাবা শঙ্করের তুলনা দেন। দাদা তখন বাবার সামনে দাঁড়ায় না। মুখ গম্ভীর করে উঠে চলে যায়। একটা বাজল, দাদা তখনও ফিরল না। বাবা শুয়ে শুয়ে কাগজ পড়লেন। মার খাওয়া-দাওয়া মাথায় উঠে গেছে। আমাকে বললেন, ‘তুই খেয়ে নে, আমি ওদিকটা দেখে আসি।’ দাদা আর আমি রোজ পাশাপাশি খেতে বসি। খেতে বসে দুজনের মধ্যে প্রায়ই একটু ঝামেলা হয়। তোর মাছের দাগাটা যেন একটু বড়ো মনে হচ্ছে, দাদা টপ করে আমার মাছটা তুলে নিল। তোর চাটনিটা বেশি মনে হচ্ছে, আমি চাটনির বাটিটা অদলবদল করে নিলুম। পাশাপাশি খেতে বসে এই ঝগড়ার মধ্যেই আমাদের সবচেয়ে বড়ো মজা। বড়োরা রেগে গেলেও আমাদের কিছু করার উপায় ছিল না। মা বলে গেলেও আমি খেতে বসতে পারলুম না। একলা একলা খাওয়া যায় নাকি। দেখি না দাদা কখন আসে। উঁকি মেরে দেখলুম, বাবার মুখের ওপর কাগজ, একটু বোধ হয় ঘুমিয়ে পড়েছেন! ভালোই হয়েছে। ইস দাদাটা যদি এই সময় আসত!
বেলা তিনটের সময় মা ফিরে এলেন শুকনো মুখে, হাওয়ায় চুল উড়ছে। এক-পা ধুলো, চটি খুলতে খুলতে জিজ্ঞেস করলেন, ফিসফিসে গলায়, ‘এসেছে নাকি রে?’
‘না, আসেনি তো।’
কল খোলা ছিল। ছড়-ছড় করে জল পড়ার শব্দ হচ্ছে। কলটা তাড়াতাড়ি বন্ধ করে দিয়ে এলুম। মা হতাশ হয়ে পা ছড়িয়ে বসে পড়েছেন। দাদা স্কুলে যায়নি! পার্থদের বাড়িতে নেই, মাস্টারমশাইয়ের বাড়িতেও নেই, কোথাও নেই।
বিকেল গেল, সন্ধেয় শাঁখ বেজে উঠল, একটা দুটো করে তারার চোখ ফুটতে থাকল আকাশে। রাত ঘন হয়ে এল। দাদা কিন্তু এল না। বাইরের তারে দাদার জামাকাপড় শুকোচ্ছিল, সব তুলে এনে পাট-পাট করে রাখলুম। একটা খরগোশ পুষেছিল। সেটা সারাদিন ছাড়া না পেয়ে ছটফট করছিল। কুচো কুচো ঘাস খেতে দিলুম। একটা গোলাপ গাছ পুঁতেছিল। আমাকে বলেছিল, ‘শুভা, গোড়ায় একটু করে চায়ের পাতা দিয়ে দিস তো।’ এতদিন গ্রাহ্য করিনি, আজ দিয়ে দিয়েছি। দাদার গাছে বড়ো বড়ো ফুল ফুটবে। পেনসিল-কাটা কলটা নিয়ে রোজ লাঠালাঠি হত, আজ নিজে থেকে দাদার বইয়ের বাক্সে রেখে দিলুম। দাদা তবু ফিরে এল না। কত রাত হয়ে গেল, তাও এল না।
পুজো চলে গেল। শীত এল। দাদার গাছে শীতের ফুল ফুটল। খরগোশটা একদিন সকালে মারা গেল। তবুও দাদা এল না। মায়ের চোখে চশমা উঠল। বাবার সব চুল পেকে গেল। দাদার বুটজুতো শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। তবু দাদা এল না। শঙ্কর কলেজে ভরতি হয়েছে। পার্থ ইঞ্জিনীয়ারিং পড়তে গেছে। ন্যাপথালিন দিয়ে রাখা হয়েছে, তাও দাদার জামা পোকায় কেটেছে। তবু দাদা এল না। সেই বেল্টটা যেটা দিয়ে বাবা দাদাকে মারতে চেয়েছিলেন, সেটা আলনায় এখনও ঝুলছে, গায়ে সাদা ছাতা ফুটেছে। দাদা কিন্তু ফিরে এল না।
হঠাৎ একদিন এক সন্ন্যাসী এলেন। মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তুমি বীরপুত্রের জননী।’ মা কেঁদে ফেললেন। সন্ন্যাসী বললেন, ‘কাঁদছিস কেন বোকা? তোর ছেলে ঠিকই আছে। বিরাট দেশ, কত মানুষ, তাদের মধ্যে মিশে গেছে। দেখবি, সময় হলে ঠিক ‘মা’ বলে এসে দাঁড়াবে। সে যে তোদের বড়ো ভালোবাসে।’
সন্ন্যাসী যেদিন এলেন, তার তিন দিনের দিন বাবা হঠাৎ মারা গেলেন। মা আর আমি রাস্তার দিকের ঘরে মেঝেতে শুয়ে আছি। গভীর রাত। ঘুমটা হঠাৎ ভেঙে গেল। সত্যের মতো স্বপ্ন দেখলুম, একটা বনপথ ধরে বাবা আর দাদা পাশাপাশি হাঁটছেন। বাবার ডান হাত দাদার কাঁধে। দাদা হাসতে হাসতে বলছে, ‘এই দেখ শুভা আমি কত ভালো ছেলে হয়ে গেছি।’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন