সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
বড়োমামা বসে আছেন তাঁর সাধের গোয়ালঘরের সামনে। ভীষণ চিন্তিত। কপালে তিনটে ভাঁজ। গোয়ালে তিনটে বিশাল আকারের জার্সি গোরু মশমশ শব্দ করে তাদের খাবার খাচ্ছে। গোরু তিনটে বেশ আদুরে-আদুরে দেখতে। যত্নে থাকে, ভালো খায়। ক্ষীরের মতো শরীর। দুধও দেয় তেমনই। দুধের বন্যা বয়ে যায়। বড়োমামা দুধ বিক্রি করেন না। বিলিয়ে দেন। এক বালতি হাসপাতালে। এক বালতি আশ্রমে। এক বালতি স্কুলে। বিলোবার পরও অনেকটা থেকে যায়।
বড়োমামার কুকুরের সংখ্যা এখন দশ। তারা দুধ খেয়ে-খেয়ে এক-একটা কেঁদো বাঘ। মেজোমামা দুধ ভালোবাসেন না। তাঁর জন্য পায়েস হয়। মাসিমা ভালোবাসেন সন্দেশ। ছানা কাটিয়ে সন্দেশ তৈরি করেন। আর বড়োমামা! দুধে অ্যালার্জি। খেলেই পেট খোলে। তিনি দুধ দেখে আনন্দ পান। বালতি-বালতি সাদা দুধ।
বড়োমামার একপাশে আমি বসে আছি। আমার মুখে কোনো কথা নেই। কথা বলার ইচ্ছেও নেই আমার। কাল রাতে মশারি ফেলা নিয়ে বড়োমামার সঙ্গে আমার ঝগড়া হয়ে গেছে। একই বিছানায় আমরা দুজনে শুই। মশারিটা আমাকেই ফেলতে হয়। আমি একটু আগেই শুয়ে পড়ি। বড়োমামার শুতে বেশ রাত হয়। ডাক্তার তো! রুগিরা ছেঁকে ধরে থাকে। চেম্বার থেকে উঠতে দেয় না। কাশি, জ্বর, পেট ব্যথা, মাথা ঘোরা। মানুষের অসুখের শেষ নেই। তার ওপর বড়োমামার গল্প করার বাতিক আছে।
কেউ কিছু বললেই হল। শুরু হয়ে গেল যুক্তি, তর্ক, গল্প। সে চলছে তো চলছেই। আর রুগিরা নানা সুরে শব্দ করছে ‘ও ডাক্তারবাবু!’ কে কার কথা শোনে! নেহাত খুব হাতযশ, তাই সব ছুটে আসে।
কাল বড়োমামা কত রাতে ফিরেছিলেন জানি না। মাঝরাতে মশারির একপাশের দড়ি খুলে চাল ঝুলে গিয়েছিল। বড়োমামার আবার ভীষণ ভূতের ভয়। তাঁর আবার একটা ভূতের ডিকশনারি আছে। মশারির চালেও নাকি ভূত থাকে। বড়োমামার গোঁ গোঁ শব্দ শুনে ঘুম ভেঙে গেল। চালটা ঝুলছে দেখে আমারও ভয় লেগে গেল। অন্ধকার ঘর। ভুসভুস বাতাসের শব্দ। ঘড়ির টিকটিক। বাইরে বেড়ালের ঝগড়া। কোথায় একটা বাচ্চা ওঁয়া-ওঁয়া করে কাঁদছে। ভয় তো পেতেই পারে। তবে আমি তেমন ভিতু নই। আমার মাস্টারমশাই বলেছেন, ‘ভূত বলে কিছু নেই। ভূত আছে মানুষের মনে। আর কোনো কোনো মানুষ আছে ভূতের মতো, তাদের বলে অদ্ভুত।’
শুয়ে-শুয়ে ভাবলুম অনেকক্ষণ, ব্যাপারটা কী হতে পারে! মশারির একপাশের দড়িটা ছিঁড়ে গেছে। ছিঁড়েছে বড়োমামারই জন্য। খুব খারাপ শোয়া। দুড়ুম-দাড়াম হাত-পা ছোড়েন। খাটের বাইরে পা ঝুলে যায় কোনো-কোনোদিন। ধাক্কা-টাক্কা মেরে জাগাতেই ভীষণ রেগে গেলেন আমার ওপর, ‘তোর কোনো কান্ডজ্ঞান নেই। ভগবানের সঙ্গে আমার ডায়ালগ চলছিল, দিলি তো সব বারোটা বাজিয়ে!’
আমি বললুম, ‘মশারির দড়িটা যে ছিঁড়ে বসে আছেন।’
বড়োমামা বললেন, ‘এ তো তোর রোজের কেস। মশারিটাও ভালো করে খাটাতে পারিস না! অপদার্থ! তুই তা হলে তাঁবু খাটাবি কেমন করে! মশারিতেই যার এই অবস্থা!’
‘তাঁবু খাটাতে যাব কেন?’
‘ধর যদি কোনোদিন এভারেস্ট যাস একসপিডিশানে!’
‘আপনার মতো শোয়া হলে তাঁবু কেন, পাকা দেওয়ালও ধসে পড়ে যাবে। আপনি তো শুয়ে-শুয়ে ব্যালে নৃত্য করেন।’
‘যে-কোনো জ্যান্ত মানুষ এইভাবেই শোয়। শোয়া মানে তো আর মরে যাওয়া নয়। তোরা যাকে শোয়া বলিস, সেটা আসলে আর-একটা প্লেনে দাঁড়ানো। প্লেন বুঝিস না, অ্যাঙ্গল বুঝিস না, ডাইমেনশান বুঝিস না। টপ থেকে একটা ছবি তুলে খাড়া করে দিলে কী দেখবি, আমি দাঁড়িয়ে আছি খাটের ব্যাকগ্রাউণ্ডে।’
শেষে বললেন, ‘কাল থেকে আমি আমার বিছানা আলাদা করে নেব। একটু খেলিয়ে শোওয়ার স্বাধীনতা নিশ্চয় আমার আছে! আমি অমন মড়ার মতো কাঠ হয়ে শুতে পারব না। আমি কি কফিনে শুয়ে আছি! চিতায় শুয়ে আছি!’
রাত আড়াইটের ঝগড়া তিনটেয় শেষ হল। গজগজ চলল আরও কিছুক্ষণ। ‘শুয়ে-শুয়ে ভাবতে হবে অপারেশান টেবিলে অ্যানাসথেসিয়া নিয়ে পড়ে আছি চিতপাত। এর নাম দেশ স্বাধীন হয়েছে। কাল থেকে আমি মেঝেতে শোব!’
গম্ভীর গলায় বললুম, ‘আপনি কেন মেজেতে শোবেন! আমিই শোব।’
‘তুই কেন শুবি! তোর তো এটা মামার বাড়ি, আমার তো আর মামার বাড়ি নয়।’
সকালবেলা ব্যাপারটা আমি ভুলেই গিয়েছিলুম। শুধু মেজোমামা একবার চা খেতে-খেতে জিজ্ঞেস করলেন, ‘মাঝরাতে কি শুম্ভ-নিশুম্বের লড়াই চলছিল! বাড়িতে আরও দুটো প্রাণী যে ঘুমোচ্ছে, সেটুকু সিভিক সেন্স তোদের এখনও হল না? একজনের তো আর আশা নেই। পাকা বাঁশ। ও আর নুইবে না। তা ছাড়া সঙ্গ দোষ! কুকুর, বেড়াল, ছাগল, গোরুর সঙ্গে মিশলে মানুষের কি আর মনুষ্যত্ব বলে কিছু থাকে! কিন্তু তোমার ওপর আমার একটা হাই হোপ ছিল। তা তুমি তো আবার বড়োমামা ছাড়া দুনিয়ায় আর কাউকে চেনো না ভাই!’
মেজোমামা অধ্যাপক। অধ্যাপকের মতোই কথা। কয়েকদিন আগে বিলেত ঘুরে এসেছেন। সেখানে নাকি হর্ন থাকলেও গাড়ি হর্ন দেয় না। মানুষ কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শোনে। কেউ চিৎকার করে কাউকে ডাকে না। মেজোমামার এমনই একটু অহংকার আছে, সেই অহংকার আরও কয়েক ডিগ্রি চড়েছে। মেজোমামার ক্যাঁটক্যাঁট কথায় বড়োমামার ওপর আমার ভালোবাসা আরো বেড়ে গেল। সহজ-সরল, আত্মভোলা। সমবয়সি এক বন্ধুর মতো।
চেম্বার থেকে ফিরে গোরুদের খেতে দিয়ে বসে আছেন। বিষণ্ণ। ভীষণ ভাবনা।
বড়োমামা অনেকক্ষণ পরে বললেন, ‘কী রে, আমার সঙ্গে ঝগড়া! কথা বলবি না!’
হেসে ফেললুম, ‘আপনার সঙ্গে কথা না বলে থাকা যায়! ইউ আর মাই ফ্রেণ্ড, বেস্ট ফ্রেণ্ড।’
বড়োমামার চোখে জল এসে গেল, এই সামান্য কথায়। বললেন, ‘তা হলে বোস আমার পাশে।’
‘এত কী ভাবছেন তখন থেকে!’
‘জানিস তো, আমার মাথাটাই হল উচ্চ ভাবনার বাসা। মন সব সময় গবেষণার দিকে ছুটছে। বিরাট কোনো আবিষ্কার! যে আবিষ্কারে জগৎ স্তম্ভিত হয়ে যাবে। সৃষ্টি থমকে যাবে। স্বয়ং বিধাতা নড়েচড়ে বসবেন। বিশ্বব্রহ্মান্ডের মানুষ একসঙ্গে এমন হাততালি দেবে, মনে হবে প্রলয় এসে গেছে।’
‘তা সেটা হবে কীভাবে!’
‘অ্যায়! সেই আইডিয়াটাই আমার মাথায় স্ট্রাইক করেছে, বজ্রের মতো, বিদ্যুতের মতো, গোলার মতো, স্কাড মিসাইলের মতো।’
‘জিনিসটা কী?’
‘তোর মনে আছে, নিউটন আপেল পড়া দেখেছিলেন।’
‘মনে আছে।’
‘তারপর! তিনি আপেলটা তুলে কচকচ করে খেয়ে রুমালে মুখ মুছে বাড়ি চলে গেলে মানুষ চাঁদে যেতে পারত! মহাকাশে পাড়ি দিতে পারত! আবিষ্কারের আগে দর্শন, দর্শনের পর ভাবনা। আমি এখন সেই ভাবনার স্টেজে আছি।’
‘আপনি কী পড়তে দেখলেন? তাল, না নারকেল?’
‘পড়াপড়ির ব্যাপার শেষ। ও-পথে আর নো হোপ।’
‘তা হলে?’
‘আমি আজ ক্ষেত্রবাবুর বাড়িতে রুগি দেখতে গিয়েছিলুম। সেখানে আর-একটা জিনিস দেখলুম। বললে বনসাই। একটা ছোট্ট টবে বটগাছ। বললে ছ-সাত বছর বয়স। এই এতটুকু, এক ফুটের মতো বড়ো। মোটা গুঁড়ি। ঝুরি নেমেছে ঠিক বটের মতো। ডালপালায় ছোট্ট একটা পাখির বাসা বসিয়েছে। ফ্যান্টাসটিক!’
‘ও-আবিষ্কার তো হয়ে গেছে বড়োমামা!’
‘আরে ধুর, ওইটা থেকেই তো আমার আইডিয়াটা এল। সামনে কী দেখছিস?’
‘তিনটে জবরদস্ত গোরু।’
‘এক-একটা কতটা জায়গা নিয়েছে! লম্বায় ফুট ছয়েক তো হবেই। গোল ব্যারেলের মতো পেট। হাইট পাঁচ ফুট তো হবেই। পৃথিবী কী ক্রাউডেড! মানুষেরই থাকার জায়গা নেই। কিলবিল করছে পোকার মতো। তার মাঝখানে বিশাল-বিশাল শরীর নিয়ে ভোঁস-ভোঁস করছে। কোনো মানে হয়! তাও যদি মানুষের মতো, গাছের মতো খাড়া ওপর দিকে উঠত তা হলে কিছু বলার থাকত না। এরা সব শুয়ে-শুয়ে পেল্লায় হচ্ছে। এ আর চলে না। অসহ্য!’
‘তা এর আপনি কী করবেন? আপনার হাতের বাইরে। ভগবান যেমন করেছেন!’
‘সে তো বটগাছকেও ভগবান বিশাল বড়ো করেছেন। মানুষ তাকে কায়দা করে ছোটো করেছে। খোদার ওপর খোদকারি। আমিও সেইরকম ‘বনসাই গোরু’ করব।’
বড়োমামা ভাবের জগতে চলে গেলেন। নিজের মনেই বলতে লাগলেন, ‘এই দু ফুট সাইজের ধবধবে সাদা গোরু আমাদের ঘরময় ঘুরে বেড়াবে। বড়ো-বড়ো চোখ। লোটা লোটা কান। কালো ঝকঝকে খুর। মাঝে-মাঝে পালিশ করে দেব।’
বড়োমামার ভাব চটকে দিয়ে বললুম, ‘সে গোরু দুধ দেবে তো!’
‘আফকোর্স! গোরুর ধর্ম দুধ দেওয়া। দুধ দেবেই। বালতি-বালতি দেবে না। তবে এমন কায়দা করে দেব, কল ঘোরালেই জলের মতো গেলাস ধরলেই দুধ। আর পরিমাণে কম বলে আরও ঘন, একেবারে ক্ষীরের মতো। আর তেমনই মিষ্টি। এই গোরুর জন্য গোয়ালের প্রয়োজন হবে না। আমরা আমাদের বিছানায় নিয়েও শুতে পারব। সে এক বিপ্লব! সে এক রেভলিউশান।’
‘হবে না বড়োমামা। এ হতে পারে না। অসম্ভব!’
‘দাঁড়া, দাঁড়া। তোর গলায় সন্দেহবাদীর সুর। মেজোটার সঙ্গে বুঝি খুব মিশছিস। ও তোর ফিউচার ক্র্যাক করে দেবে। শোন, নেকড়েবাঘ থেকে মানুষ তৈরি করল শেপহার্ড ডগ, অ্যালসেশিয়ান। তারপরে যেমন-যেমন প্রয়োজন হল করে নিল সেইরকম কুকুর। মানুষ পাখি মারবে গুলি করে, সেই পাখি পড়বে জলায়। উদ্ধার করে আনতে হবে। তুলে আনবে, কিন্তু খাবে না। এসে-গেল গোল্ডেন রিট্রিভার। সাইবেরিয়ার তুষার প্রান্তরে রাতের অন্ধকারে বরফচাপা পড়ে আছে পথিক। পথ ভুলে গিয়েছিল, এল সেন্ট বার্নার্ড কুকুর। বিশাল তাগড়াই, প্রায় ঘোড়ার মতো। বরফ থেকে উদ্ধার করে আনবে মানুষকে। চার্চের ফাদার তার গলায় লণ্ঠন ঝুলিয়ে দেবেন। সাইবেরিয়ায় রাতের বেলা পাল-পাল নেকড়ে বেরোয় শিকারের সন্ধানে। ঝোড়ো বাতাস, মাইনাস তিরিশ-চল্লিশ টেম্পারেচার। অসহায় মানুষ দেখছে, লণ্ঠনের আলো দোলাতে-দোলাতে আসছে সেন্ট বার্নার্ড। নেকড়েরা থমকে গেছে। কুকুর এসে মানুষটিকে পিঠে তুলে নিল। আরও বড়ো-বড়ো কুকুর আছে, গ্রেট ডেন, পেরিয়ার মাউন্ট। আবার কোলে-কোলে থাকবে, আদর খাবে, এল ল্যাপ ডগ, পিকিনিজ, পুডল। কুকুর যদি বড়ো-ছোটো করা যায়, গোরু কেন যাবে না! জানিস, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যাণ্ডে ছোটো-ছোটো ঘোড়া তৈরি হয়েছে। মানুষের বৈঠকখানায় খুটখুট করে ঘুরে বেড়ায়। ছোটো-ছোটো ছেলেরা পিঠে চেপে এ-ঘর, ও-ঘর করে। হবে না বলে কোনো শব্দ মানুষের অভিধানে নেই। এই তো সেদিন ওড়িশায় গিয়ে দেখে এলুম। প্রথমটায় বুঝতে পারছিলুম না, ঠিক ভেড়াও নয়, ছাগলও নয়। একজনকে জিজ্ঞেস করলুম। বললে, ভ্যাগোল। ভেড়ার ভ্যা আর ছাগলের গোল মিলিয়ে তৈরি। আমিও ওইরকম ছাগলের ছা আর গোরুর রু যোগ করে তৈরি করব ছারু। করব চুরগি।’
‘চুরগিটা কী বড়োমামা?’
‘সে এক মজার প্রাণী। চড়াইয়ের চু আর মুরগির রগি নিয়ে চুরগি। ছোটো-ছোটো টেবিল, চেয়ারে ঘুরবে। ড্রয়ারে থাকবে। রোজ সকালে টেবিলের ওপর পুটপুট করে মুক্তোর মতো এক ডজন ডিম পেড়ে দেবে। সে-ডিমের সবটাই হবে হলদে, সাদা একদম থাকবে না।’
‘তা কি সম্ভব বড়োমামা!’
‘আবার সন্দেহ! তিমির মতো বড়ো মাছ যেমন আছে আবার জিরের মতো ছোটো মাছও আছে। হাতি যেমন আছে, ছুঁচোও তেমনই আছে। ছুঁচো হল ছোটো হাতি। শোন, কল্পনা থেকেই আসে আবিষ্কার। আমি এখন কল্পনার স্তরে আছি।’
মাসিমা কখন পেছনে এসে দাঁড়িয়েছেন খেয়াল করিনি আমরা। মাসিমা বেশ রাগের গলায় বললেন, ‘বা:, বেশ আছ তোমরা! বেলা তিনটে হয়ে গেল, আর কখন খাবে! আমি বসেই আছি, বসেই আছি, আর দুই পাগলে মুরগি, চুরগি হচ্ছে। দয়া করে খেয়ে নিয়ে আমাকে উদ্ধার করো।’

বড়োমামা উদার গলায় হেসে বললেন, ‘আজ আমাদের এমন তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করছিস তো, পরে পস্তাবি। যখন সারা বিশ্বের মানুষ এই বাড়িতে এসে ভিড় করবে। হই হই পড়ে যাবে। ছাদে এসে নামবে হেলিকপ্টার। সেই দিন আসছে, যখন আজ আমি আমেরিকায়, তো কাল আমি ভিয়েনায়।’
মাসিমা বললেন, ‘সে যখন হবে তখন হবে। তখন তোমাকে আমরা উঠতে-বসতে সেলাম করব। হ্যাঁ, শুনে রাখো, তোমার পেয়ারের পঞ্চাননের মা এসে যা-তা বলে গেছে।’
‘কী যা-তা?’
‘তুমি নাকি এত দুধ পাঠাচ্ছ, সেই খেয়ে হোল ফ্যামিলির পেট ছেড়েছে। যাও, পরোপকার করো। পরসেবা, পরপ্রেম।’
বড়োমামা বললেন, ‘আমি মহাপ্রভুর চেলা। মেরেছ কলসির কানা, তা বলে কি প্রেম দেব না! মানে দুধ দেব না। আচ্ছা, দুধ যখন সহ্য হচ্ছে না, তখন ছানা করে পাঠালে হয় না! খাঁটি দুধ অনেকেরই সহ্য হয় না।’
মাসিমা রেগে চলে গেলেন।
রাত্তির বেলা। বড়োমামা আজ সকাল সকাল প্রÉ¡কটিস থেকে ফিরেছেন। মনে হয় অনেক রুগিকে ভাগিয়ে দিয়েছেন। টেবিলে বসে আছেন, টেবিলল্যাম্প জ্বলছে। আমি পড়ছি। বড়োমামা ভীষণ চিন্তিত। হঠাৎ বললেন, ‘তোর কোনো আইডিয়া আছে?’
‘কী আইডিয়া!’
‘মানে কীভাবে করা যায়! বড়োকে কতভাবে ছোটো করা যায়! এক, ধর, কেটে করা যায়, সেটা চলবে না। মরেই যাবে। আর এক, যদি বাড়টা কোনোভাবে বন্ধ করে দেওয়া যায়! ধর বাছুর। বাছুরটাকে যদি আগাপাশতলা ব্যাণ্ডেজ কি প্লাস্টার করে দেওয়া হয়। কী ধর, খাপে ভরে রাখা হল।’
‘খুব অবৈজ্ঞানিক হয়ে যাচ্ছে বড়োমামা। মানে খুবই বোকা-বোকা। তা ছাড়া এক-একটা বাছুরের সাইজ দেখেছেন। আপনি তো জিনিসটাকে ছাগলছানার সাইজে আনতে চাইছেন।’
‘তা অবশ্য ঠিক।’
‘তা হলে!’
‘ও হবে না বড়োমামা। হলে এতদিনে হয়ে যেত। বৈজ্ঞানিকরা কি এতদিন বসে থাকতেন!’
‘একবার নিউজিল্যাণ্ড গেলে কেমন হয়। ওরা তো ঘোড়াটাকে বাগে এনেছে।’
‘কী দরকার বড়োমামা! যে যেমন আছে সেইরকম থাক না!’
বড়োমামা উঠে সারা ঘরে পায়চারি করলেন কয়েকবার, তারপর বললেন, ‘শোন, সমস্ত বড়ো আবিষ্কারই হয়েছে হঠাৎ। এক করতে গিয়ে আর-এক হয়েছে। অনেক সময় স্বপ্নেও অনেক কিছু পাওয়া যায়। চল, আমরা শুয়ে পড়ি। স্বপ্নে কিছু আসে কি না দেখা যাক।’
আমরা শুয়ে পড়লুম। মশারির দড়ি আজ আরও দুর্বল। জপের মালার মতো গাঁটের মালা। যতবার ছিঁড়েছে ততবার একটা করে গিঁট পড়েছে। মাসিমার কাছে দড়ি চেয়ে বকাঝকা খেয়েছি, ‘আমার দড়ির কারখানা নেই। এইবার তোমার বড়োমামাকে বলো, চেন কিনে আনতে।’
বড়োমামা দুবার এপাশ-ওপাশ করে ঘুমিয়ে পড়লেন। ফুরফুর করে নাক ডাকছে। বড়োমামার নাকডাকার শব্দটা ভারী সুন্দর, যেন নাকের ফুটোয় কেউ পাতলা কাগজের পরদা ঝুলিয়ে দিয়েছে। খুলছে আর বন্ধ হচ্ছে। আমিও ঘুমিয়ে পড়লুম। ঘুম বললে ভুল হবে, চলে গেলুম আবিষ্কারের জগতে। স্বপ্নের ল্যাবরেটরিতে। বড়োমামা আগেই চলে গেছেন সেখানে। হয়তো শুরু করে দিয়েছেন পরীক্ষা।
কতক্ষণ ঘুমিয়েছিলুম জানি না। হঠাৎ ঢিপ করে একটা শব্দ হল। শব্দটা এত জোরে হল যে, ঘুম ভেঙে গেল। অন্ধকারে কিছুই বুঝতে পারছি না। মশারির চালটা মুখে নেমে এসেছে। মশারি আর মশারি নেই। জাল হয়ে গেছে। বড়োমামার দিকটা চলে গেছে মেঝেতে। সেখানে জালে জড়ানো মাছের মতো বড়োমামা। ঘুমের ঘোরে বলে চলেছেন, ‘ইউরেকা, ইউরেকা।’
ঘরের বাইরে থেকে মেজোমামা আর মাসিমা চিৎকার করছেন, ‘কী হল! কী হল! আজকের খেলাটা কী? বুড়ো খোকা!’
কোনোরকমে নিজেকে জালমুক্ত করে প্রথমে আলো জ্বাললুম। তারপর দরজা খুলতেই প্রথমে ঢুকলেন মাসিমা, পেছনে মেজোমামা। মশারি-ফসারি নিয়ে বড়োমামা মেঝেতে। খাটের একটা ছতরি টিভির এরিয়েলের মতো হেলে গেছে একপাশে। একটা টুল ছিল, উলটে গেছে। টুলের ওপর ছিল রেডিয়ো। ছিটকে চলে গেছে ঘরের কোণে। কীভাবে সুইচ অন হয়ে গিয়ে কড়াইভাজার মতো আওয়াজ করছে। আর বড়োমামা নাগাড়ে বলে চলেছেন, ‘ইউরেকা, ইউরেকা।’
মেজোমামা প্রথমেই বললেন, ‘এ তো আর্কিমিডিস কেস! একে এখনই তুলে বাথটবে ফেলে দাও।’
মাসিমা বড়োমামাকে ভীষণ ভালোবাসেন। মুখে খ্যাচরম্যাচর করলে কী হবে। নীরবে জাল ছাড়িয়ে বড়োমামাকে তুলে বসালেন। বড়োমামা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘আমি কোথায়?’
মেজোমামা বললেন, ‘তুমি এখন রোমে ভাই! রোমিং ইন রোম। আস্ত আছ না ভেঙে গেছ!’
বড়োমামা ছেলেমানুষের মতো হেসে বললেন, ‘পেয়ে গেছি।’
মেজোমামা বললেন, ‘কী দুর্লভ জিনিস পেলে ভাই?’
বড়োমামা মাসিমার হাত দুটো ধরে বললেন, ‘ভালোবাসা! তোমাদের ভালোবাসা।’
মাসিমা ঝাঁ-ঝাঁ করে বললেন, ‘কাল থেকে তোমাদের বিছানা হবে মেঝেতে। এই বোম্বাই খাট আমি বিদায় করে দেব বাড়ি থেকে।’
সব শান্ত হয়ে যাওয়ার পর বড়োমামাকে জিজ্ঞেস করলুম, ‘আসল জিনিসের কী পেলে?’
বড়োমামা বললেন, ‘জানিস, বিদ্যাসাগর এসেছিলেন। তিনি বললেন, ‘এত ভাবছ কেন? সমাধান তো খুবই সহজ। গোরুটাকে বাঙালি করে দাও। তা হলে দেখবে নিজের চেষ্টাতেই ছোটো হয়ে যাবে। আর কিচ্ছু করতে হবে না তোমাকে। লিখে রাখো, ছোটো যদি হতে চাও বাঙালি হও তবে।’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন