সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
আমাদের দক্ষিণ পাড়ায় দুজন সাংঘাতিক ভদ্রলোক আছেন। একজনের নাম নগেন, আর একজনের নাম খগেন। নগেন লম্বা, হিলহিলে চেহারা। যখন হাঁটেন মনে হবে, তারে ভিজে পাজামা বাতাসে দুলছে। লটরপটর, লটরপটর। ঘুরে দাঁড়াতে অনেকটা ‘স্পেস’ লাগে। আমাদের বাড়িতে একবার এসেছিলেন। চলে যাওয়ার পর হিসেব করে দেখা গেল, তিনটে জিনিস খতম—চেয়ারের হাতল, ফুলদানি আর টেবিলের কাচ।
জগদীশকাকু বললেন, ‘খুব সামান্যর ওপর দিয়ে গেছে হে। আমাদের বাড়িতে একবার গিয়েছিল। বড়ো একটা বইয়ের আলমারি উলটে দিয়েছিল। তার তলায় চাপা পড়েছিল আমার বিদ্যাসাগরী চটি। তিন দিন ব্রহ্মদৈত্যের মতো খড়ম পায়ে হেঁটেছি। কোর্টে গেছি খড়ম পায়ে। ওপরে কালো কোট, পদতলে খড়ম। আর একটু হলেই আদালত অবমাননার দায়ে পড়তে হত। আমার সহকারী বললে, স্যার! খড়ম খুলে খালি পায়ে চলুন খুনের মামলা, শেষে আপনার না কিছু হয়ে যায়। পা কেন খালি? জিগ্যেস যদি করে, বলবেন, ঠাকুমা পরলোকে পাড়ি দিয়েছেন, ওল্ড লেডি হেভেনাইজড ইংরিজি শুনে পড়ে যাচ্ছিলুম। জিগ্যেস করলুম, কী পড়েছিস বাপ? উত্তর শুনবে? বললে, যাই পড়ি আপনার মতো পড়ে যাইনি। বুক ইংলিশ আর বুকনি ইংলিশে অনেক তফাত। কথাটা হল, আপনি বুঝলেন কি না! খুব খেয়ে কী বলেন—আই ঢাই। তাহলে, আই খাই মানে কী? আমি খাই। একটা সাহেব এক বাঙালি মেয়েকে বিয়ে করলে। বউকে কী বলা হবে? মেমসায়েব। আবার বাঙালি বিয়ে করল ইংরেজ মেয়ে। বউকে কী বলা হবে? সেই এক—মেমসায়েব। ভাষাও সেইরকম এক ধরনের বিয়ে। আমি বললুম—ওরে! তোর আর উকিল হতে বাকি নেই, চেম্বার খুলে ফেল। সে বললে—পুট ইওর ব্লেসিং অন মাই ব্রহ্মতালু।
খগেন বেঁটে। গাব্দাগোব্দা। কুমড়ো টাইপের চেহারা। গড়িয়ে গড়িয়ে চলেন। আমাদের বাড়িতে একবার এসেছিলেন। হাতলঅলা চেয়ারে বসলেন না। বললেন টুল দাও। চেয়ারের হাতলে আটকে যেতে পারি। একবার এইরকম কেস হয়েছিল। ছুতোর ডেকে আমাকে উদ্ধার করা হয়েছিল। আমি উঠি আমার সঙ্গে চেয়ারও ওঠে। পিতা, পিতামো আমাকে অকারণে খাওয়াননি! জলখাবারে চল্লিশখানা লুচি। আরও দশখানার মতো জায়গা রয়ে গেল পেটে বায়ু চলাচলের জন্যে। নেমন্তন্ন বাড়িতে বাহাত্তরটা পান্তুয়া আমার বাঁধা। আমাকে নেমন্তন্ন করতে এখন আর কেউ সাহস পায় না। মানুষ আর কোথায়, বেশিরভাগই নগেনের মতো—ল্যাংলা-প্যাংলা শয়তান।
নগেন আর খগেনদের তিন পুরুষের বিবাদ। পাশাপাশি ঢিল ছোড়া দূরত্বে বাড়ি। অতীতে খগেনদের ছাগল নগেনদের বেড়া খেয়ে ফেলেছিল। এরপর নগেনরা সেই ছাগলটা খেয়ে ফেলেছিল। শুধু খায়নি, ওস্তাদি করে এক বাটি মাংস খগেনদের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছিল, সঙ্গে এক দিস্তে লুচি। এরপরে লাঠালাঠি, মাথা ফাটাফাটি, ফৌজদারি।
সে এক মহা মামলা। আদালতে পঞ্চার মা এসে খ্যানখ্যানে গলায় জজ-এর সামনেই ফিরিস্তি শুরু করলে—‘কোথায় সেই মুখপোড়া! ঝেঁটিয়ে আমি বিষ ঝেড়ে দোব। আমার একমাত্র ছাগলটাকে গায়েব করে বলে কি না আমার ছাগল। তোর বাপের ছাগল!’ হাতুড়ি ঠোকার শব্দ—‘অর্ডার, অর্ডার!’ ব্যাস, কেস গেল গুলিয়ে। শেষে এমন হল নগেনের ছাগল খগেনের বেড়া খেয়েছে না খগেনের ছাগল নগেনের বেড়া খেয়েছে। এর পর একদিন হাটে দুই উকিলে লাউ, কুমড়ো ছোড়াছুড়ি। এমন যুদ্ধ রামায়ণেও হয়নি। ব্যাপারিদের মাথায় হাত। কেউ কিছু না বুঝেই দুটো দল করে ফেলল—‘কুমড়োর দল’, ‘লাউয়ের দল’। দর্শকও জমে গেল অনেক। হাটের কেনাবেচা সব মাথায় উঠল। নতুন নতুন যোদ্ধারা দলে এসে ভিড়ল। এর পরে গোলাগুলি হল শাঁকালু, পানিফল, কাঁচা আম, লিচু। সেই সময় গ্রামের জমিদার ছিলেন বিখ্যাত রামতারণবাবু। অনেক সৎ কাজ করে খেতাব পেয়েছেন ‘রায় বাহাদুর’। ঘটনার বিবরণ তাঁর কানে গেল। পাঁজি হাতে পন্ডিতমশাই এলেন। দিন, ক্ষণ, তিথি, নক্ষত্র, তারিখ দেখা হল। প্রত্যেক বছর এই দিনে হাটতলায় লাউ ছোড়াছুড়ি উৎসব হবে। মন্দিরে রাধা-গোবিন্দের পূজা ও অষ্টপ্রহর হরিনাম সংকীর্তন। এবং লাউ, কুমড়ো, বেগুন, শাঁকালু, পানিফল, ইত্যাদি ছোড়াছুড়ি। ভক্তরা দুই দলে বিভক্ত হবেন। রাধার দল, গোবিন্দের দল। সেই সময় কাঁসর, ঘণ্টা ঘড়ি, কাড়ানাকাড়া বাজবে। এরপর প্রসাদ বিতরণ। রাত্তিরে হবে যাত্রা সেই উকিল দুজন বিখ্যাত হয়ে গেলেন। একজনের নাম ছিল হরি আর-একজনের রাম। শেষ পর্যন্ত এই উৎসবের নাম হল, ‘রামহরির যুদ্ধ’। বিরাট মেলা বসতে শুরু করল। বাউলরা আসতে শুরু করলেন। সাধু, তান্ত্রিক, সাপুড়ে, ওঝা। অনেকের ভর হতে লাগল। ভাগ্য গণনা। টোটকা, ঝাড়ফুঁক। মামলাটা আদালতে পড়ে থাকতে থাকতে পচে গেল। মামলা যাঁরা করেছিলেন, তাঁরা মরে গেলেন। বংশানুক্রমে শত্রুতাটা কিন্তু রয়েই গেল। রাস্তাঘাটে খগেনকে দেখলে নগেন বলবে, ‘ছাগল,’ ‘ছাগল’। খগেন বলবে, ‘ছিটে বেড়া’। রাস্তায় নগেন দেখলে খগেন আসছে। অমনি অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে অদৃশ্য কারোকে যেন বললে, ‘এই, ছাগল, দেখেছিস! চোরাই ছাগল!’

নগেন আর খগেনের ছেলেমেয়েরা বড়ো হয়েছে, লেখাপড়া শিখেছে। তারা এই তুচ্ছ শত্রুতা একেবারেই পছন্দ করে না। মেলামেশা করে। পুরীতে যায়, দীঘাতে যায়। বাবাদের বলে, তোমরাও একটু খোলা মনে মিশে দ্যাখো না বেশ ভালো লাগবে। কবে কোন পুরুষে কী একটা হয়েছিল, তোমরা সেইটাকেই জিইয়ে রেখেছ। জগৎ এখন কিন্তু অন্যরকম হয়ে গেছে। তোমরা এখনও মধ্য যুগে পড়ে আছ।
এরই মধ্যে একদিন বাজারে একটা ষাঁড় নগেনকে গুঁতিয়ে ফেলে দিল। সেই সময় খগেনও বাজারে ছিল। ছাগল-বেড়া মামলা ভুলে তিনি ছুটে এসে নগেনকে তুললেন। খগেন যখন বাজারে আসেন তাঁর কাঁধে একটা ঝাড়ন থাকে। নগেন অবাক। চিরশত্রু খগেন ধরে ধরে একটা ফাঁকা জায়গায় এসে জিগ্যেস করলেন, ‘কী রে খুব লেগেছে?’
‘না, তেমন লাগেনি। শাকপাতার ওপর পড়েছি তো!’
‘পাঞ্জাবিটায় একটু কাদা লেগে গেছে। দাঁড়া, মুছে দি। যতটা ওঠে।’
‘ছেড়ে দে, কাচতে দিয়ে দোব।’
‘কোথাও কেটে কুটে যায়নি তো! ভালো করে বোঝ। জ্বাল টালা?’
‘না, অক্ষতই আছি।’
‘বেশ বড়ো রকমের একটা ফাঁড়া গেল।’
‘আমি কী বলব জানিস, আজ জীবনের মস্ত শুভ দিন, আমাদের বন্ধুত্ব হল। তোকে কিন্তু আমি ভীষণ ভালোবাসি। তোর কত গুণ!’
‘না রে ভাই, সবাই বলে, আমি এক নম্বরের কৃপণ।’
‘সে তো আমাকেও বলে এক নম্বরের স্বার্থপর, কুচুটে।’
‘তা ভাই, তুই যেন আগের চেয়ে বেশ একটু রোগা হয়ে গেছিস। শরীর এমনি ঠিক আছে তো?’
‘দুশ্চিন্তা!’
‘কী এমন দুশ্চিন্তা?’
‘সাহস করে বলব?’
‘বল না। আমি থাকতে তোর ভয় কীসের?’
‘আমার ছেলে রতন তোর মেয়ে সুভদ্রাকে ভালোবাসে।’
‘আমার মেয়ে সুভদ্রা তোর ছেলে রতনকে ভালোবাসে।’
‘তা হলে?’
‘তা হলে পাঁজি। সাতাশ ফাল্গুন গোধুলি লগ্নে।’
‘তা হলে পাকা দেখা?’
‘আজ। শুভস্য শীঘ্রং।’
‘ঠিক, ঠিক। তা ক-টার সময় আসছ?’
‘সন্ধে সাতটায়।’
‘তা হলে আয়োজন সেরে ফেলি।’
‘তোদের বাড়ির পাকোড়া বিখ্যাত।’
‘কী করে জানলি?’
‘সুভদ্রা।’
দুজনের হাহা হাসি। পথচারীরা অবাক। এ কী দেখছি রে ভাই।
সাপ আর নেউল এক হয়ে গেল!
দেখার তখনও অনেক বাকি। ফাঁকা মাঠে বিশাল প্যাণ্ডেল। আলোর মালা, ফুলের মালা। বাতাসে ফির ফিরে পাতলা কাগজের মতো বসন্ত। সানাই। গাড়ির পর গাড়ি। মাঝে মাঝেই দুজনকে দেখা যাচ্ছে—নগেন আর খগেন। দুজনেই খুব ড্রেস দিয়েছে। একই রকমের ধুতি-পাঞ্জাবি। খাওয়ার জায়গা। দুজনে হাসি হাসি মুখে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে তদারকি করছেন। হঠাৎ গাঙ্গুলিমশাই জিগ্যেস করলেন, ‘হ্যাঁ হে, এই ছাগলটা কি সেই ছাগল, যেটা খাচ্ছি?’
‘না জ্যাঠামশাই, সেটা তো হেস্টিংসের আমলের ঐতিহাসিক ছাগল!’ কথা আর শোনা গেল না। বাজির শব্দ। আকাশ থেকে ঝরে ঝরে পড়ছে আগুনের ফুল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন