সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
আমাদের পুরোনো বাড়ির উত্তর দিকের জানলাটা আমার একেবারেই ভালো লাগে না। মানুষ জানলা করে আলো-বাতাস আসার জন্যে। অন্ধকারের দিকে কেউ জানলা ফোটায়! ওদিকে একটা রহস্যজনক সিঁড়ি আছে। ঘুরতে ঘুরতে নেমে গেছে নীচের দিকে। দিনের বেলায় আবছা আলো। রাত্তির বেলায় থকথকে অন্ধকার। সিঁড়িটা কেন আছে, কী কারণে আছে কেউ বলতে পারে না। নামতে নামতে কোথায় যাবে তাও জানে না কেউ। আছে, আছে। কেউ গ্রাহ্য করে না। বাড়িটা আমাদের খুবই বড়ো। এত বড়ো যে, অনেক ঘর ব্যবহারই হয় না। বন্ধই থাকে। কেউ খোলেও না। নীচের তলাটা একেবারে বেওয়ারিশ পড়ে আছে।
‘বাড়িটা এত বড়ো কেন মা?’
‘তোমার ঠাকুরদাদা কিনেছিলেন। এই বাড়িটা ছিল ডাচদের।’
‘মানে ওলন্দাজদের।’
‘ঠিক বলেছিস। এই বাড়িটা ছিল তাদের কর্মচারীদের কোয়ার্টার। এই অঞ্চলটা ছিল তাদের অধিকারে। ভারতে তারা ব্যাবসা করতে এসেছিল। ইংরেজদের সঙ্গে পেরে উঠল না। দক্ষিণ ভারতে কিছুকাল রইল। তারপর দেশে ফিরে গেল।’
‘সিঁড়িটা কেন?’
‘সিঁড়ি সিঁড়ি করে পাগল হয়ে গেলি।’
‘তোমরা দেখবে না কেন?’
‘আমাদের ঘেন্না করে। কত দিনের আবর্জনা। ছুঁচো-ইঁদুর। একেবারে তলায় কী আছে কে জানে! নেমে মরব না কি?’
কারুর কোনো কৌতূহল নেই। আমার স্কুলের বন্ধু সুখেনকে বললুম, ‘একদিন নামবি!’

‘সামনেই অ্যানুয়্যাল পরীক্ষা। এখন ওসব করে কাজ নেই। পরীক্ষার পর দেখা যাবে।’
উত্তরের ওই জানলাটা আমার পায়ের দিকে। কাচের পাল্লা দুটো বন্ধই থাকে। মা কিছুতেই খুলতে দেয় না। আমি আর মা একসঙ্গে শুই। মা শুয়েই ঘুমিয়ে পড়ে। আমার আর ঘুম আসে না। জানলাটার দিকে তাকিয়ে শুয়ে থাকি। চোখের ভুল কি না জানি না। মাঝে মাঝে কাচ দুটো দুধের মতো সাদা হয়ে যায়, একদম সাদা। সুন্দর একটা মেয়ের মুখ ফুটে ওঠে। বড়ো বড়ো চোখ কাচের মতো। এক মাথা সোনালি চুল। লাল দুটো ঠোঁট। মুখটা অনেকক্ষণ থাকে, তারপর অস্পষ্ট হতে হতে মিলিয়ে যায়।
কারোকে বলি না, কারণ বিশ্বাস করবে না। মেয়েটা আমাকে কিছু যেন বলতে চায়। কোনো কোনো দিন জানলার কাচ দুটো একেবারে কালো কুচকুচে হয়ে যায়। সাদা হয়ে ফুটে ওঠে একটা ফাঁস লাগানো ফাঁসির দড়ি। ভয়ে মাকে জড়িয়ে ধরি। মা-ও আমাকে জড়িয়ে ধরে। দুজনে জড়াজড়ি করে শুয়ে থাকি। মা আমার পাশে থাকলে পুতনা রাক্ষুসীকেও ভয় পাই না। পাশেই ব্রিজ। বিখ্যাত কালীমন্দির। বিরাট উদ্যান। দ্বাদশ শিবমন্দির। বড়ো, ছোটো দুটো সুন্দর স্নান ঘাট। সকাল থেকে ভক্তদের ভিড়। মহাসমারোহে বাদ্য-বাজনা করে আরতি। গভীর রাতে সব ফাঁকা। বড়ো বড়ো ঝুপসি ঝুপসি গাছ। একটা দুটো জোরালো হ্যালোজেন বাতি। বড়ো বড়ো গাছের লম্বা লম্বা ছায়া। ঝিম মেরে থাকা চৌকিদারের ঘর। বিরাট গেটের বাইরে দুঃখী এক মা তার শিশুটিকে বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে একটা চটের ওপর দুমড়ে মুচড়ে শুয়ে থাকে। আমার বন্ধু সুখেন কেবল কাঁদে। কারো দুঃখ-কষ্ট দেখলেই তার দু-চোখে টসটসে জল। ওই মাকে দুখানা মোটা চট দিয়ে এসেছে। গায়ে দেবার চাদর। একটা বড়ো ছাতা। শিশুটির জন্যে রোজ দুধ দিয়ে আসে। ফিডিং বটল কিনে দিয়েছে। যা করে সব লুকিয়ে করে। কেউ যেন জানতে না পারে। শুধু আমি জানি। আমার আরে সুখেনের অনেক পরিকল্পনা।
ঠিক রাত একটার সময় লম্বা একটা মালগাড়ি। ব্রিজের ওপর দিয়ে গুমগুম শব্দে যেতেই থাকে, যেতেই থাকে। সেই শব্দ শুনতে শুনতে, আমার বুকের ওপর পড়ে থাকা মায়ের সুন্দর গোল হাতটা দু-হাতে আঁকড়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়ি। কোনো কোনো দিন শেষ রাতে হঠাৎ হয়তো ঘুম ভেঙে গেল। মায়ের মুখের ওপর ফটফটে চাঁদের আলো দুধের মতো গড়াচ্ছে। কপালে লাল টিপ। তাকিয়ে থাকি। মা দুর্গাকে যেন কেউ শুইয়ে দিয়েছে। পাতলা পাতলা দুটো ঠোঁট থির থির করে কাঁপে কখনো। একটু হাসি ফুটে উঠে মিলিয়ে যায়। আমার মা স্বপ্ন দেখছে।
‘মা, তুমিও স্বপ্ন দেখ?’
‘দেখি না আবার! জেগেও দেখি, ঘুমিয়েও দেখি। স্বপ্নে আমি তোকেই দেখি।’
গোলোকবাবুর বিরাট বয়েস।
কেউ বলেন নব্বই। কেউ বলেন একশো।
বিশাল জমিদার ছিলেন। এখন একটু পড়তি। বিখ্যাত পন্ডিত। বিশাল লাইব্রেরি। সুন্দর একটা লন। লনের সঙ্গে যেন লেগে আছে লাইব্রেরির রক। মারবেল বাঁধানো। এদিক থেকে ওদিকে দৌড়ে চলে গেছে বারান্দাটা। বাঁক ঘুরে পৌঁছে গেছে লাইব্রেরির পেছন দিকের কুঞ্জবনে। কামিনী, কাঞ্চন, বকুল, মাধবীলতা। বারান্দার ওপর দিকটা রংবেরঙের কাচ দিয়ে ঘেরা। সার সার বেতের গোল চেয়ার।
ফটফটে ফর্সা রং। খাড়া নাক। কৃষ্ণের মতো টানা টানা চোখ। এক মাথা পাকা পাকা চুল। সাদা ধবধবে ফতুয়া। ধুতি। পায়ে শুঁড় তোলা চটি। আমরা বলি, ভগবান দাদু। ভীষণ ভালোবাসেন আমাকে আর সুখেনকে। কালীবাড়ির ওই মাকে সুখেন যা কিছু দেয়, সব চেয়ে নিয়ে যায় ভগবান দাদুর কাছ থেকে।
‘তোমার ঠাকুরদা ছিলেন আমার বেস্ট ফ্রেণ্ড। তোমাদের বাড়িটা ঐতিহাসিক বাড়ি। হরিশঙ্করকে বলেছিলুম, বাড়িটা কিনছিস? সবাই বলে ভূতের বাড়ি। হরিশঙ্কর বললে, মানুষের চেয়ে ভূত ভালো। একটু ট্রেনিং দিয়ে নিতে পারলেই উপকারী বন্ধু। স্কুলে এত ভূত সামলাই, বাড়ির কটা ভূতকে সামলাতে পারব না! নামকরা শিক্ষক ছিল তো।’
‘দাদু! ওই সিঁড়িটা?’
‘পেছন দিকে?’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ।’
‘তা দোতলার বারান্দা থেকে নীচের দিকে তাকালে কী দেখতে পাও?’
‘সিঁড়িটা বেরিয়ে আসেনি। সলিড দেয়াল।’
‘সে কেউ দেয়াল দিয়ে সিঁড়িটা বন্ধ করে দিয়েছে। অনেক কালের ব্যাপার তো! সিঁড়ি নিয়ে আর মাথা ঘামিও না। এমনও হতে পারে তলায় একটা আণ্ডারগ্রাউণ্ড আছে।’
‘ভগবান দাদু! খুব যে জানতে ইচ্ছে করছে। জানলার কাচে সুন্দর একটা মেয়ের মুখ ভেসে ওঠে। মাঝে মাঝে একটা ফাঁস। ফাঁস লাগানো ফাঁসির দড়ি।’
‘ও-সব মনের ভুল। নানা রকম গল্প, উপন্যাস, রহস্য-রোমাঞ্চ পড়ার ফল।’
সামনেই পরীক্ষা। পড়ার চাপে সিঁড়ির চিন্তা ভুলে গেলুম। সেদিন সন্ধেবেলা অনেকক্ষণ আলো ছিল না। রাত আটটায় আলো এল। পড়তে পড়তে বেজে গেল রাত বারোটা। মা বললে, ‘এইবার শুয়ে পড়। খুব ভোরে ডেকে দেব।’
মায়ের বুকে মুখ গুঁজে শুয়ে আছি।
‘ভীষণ ভয় করছে মা।’
‘কীসের ভয়?’
‘সামনে পরীক্ষা।’
‘তুই না আমার ছেলে! আমার ছেলে হয়ে পরীক্ষায় ভয়! সারা বছর যে মন দিয়ে পড়েছে, পরীক্ষা তাকে কী ভয় দেখাবে!’
‘মা! তোমার মতো মা হয় না। জন্ম, জন্ম, জন্ম ধরে তুমি আমার মা হবে তো!’
‘তুই আমার ছেলে হবি তো?’
‘মা, পরীক্ষার পর আমরা সবাই পুরী যাব।’
‘ঠিক বলেছিস। অনেকদিন কোথাও যাওয়া হয়নি।’
‘মা, এত রাতে কোথায় পুজো হচ্ছে গো! ওই শোনো, শাঁখ, ঘণ্টা, কাঁসর বাজছে।’
‘জানিস না, আজ অমাবস্যা। গঙ্গার ধারে রক্ষাকালীর পুজো হচ্ছে।’
‘আরতি হচ্ছে।’
কাঁসর-ঘণ্টার শব্দ শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়লুম।
সেই মেয়েটি ঘরে চলে এসেছে। আমাকে ডাকছে, ‘ওঠো! শিগগির ওঠো।’
‘তুমি কে?’
‘আমার নাম রেবেকা।’
‘কেন এসেছ?’
‘সিঁড়ির তলায় কী আছে দেখবে না! ওঠো ওঠো!’
কী ভীষণ অন্ধকার! পা ঘষে ঘষে নামছি। রেবেকা আমার হাত ধরে আছে। সাপের মতো ঠাণ্ডা। ক্রমশ আমি নিজেকে হারিয়ে ফেলছি। অদ্ভুত একটা টানে নামছি, নামছি। বলছি, ‘রেবেকা! ভীষণ অন্ধকার! আমি ফিরে যাই।’
‘এখান থেকে ফেরা যায় না। নামো, নামো, আরো নামো।’
হঠাৎ মনে হল, আর সিঁড়ি নেই। পা কিছু খুঁজে পাচ্ছে না। রেবেকা হাত ছেড়ে দিয়েছে। আমি একপায়ে টাল খাচ্ছি। সামনে একটা গভীর কূপ। আলকাতরার মতো থকথকে অন্ধকার। চিৎকার করে ডাকলুম, ‘রেবেকা!’
পাতাল থেকে উত্তর এল, ‘চলে এসো।’
ভীষণ একটা হেঁচকা টানে পড়ে যেতে যেতে কী একটা ধরে ফেললুম। মোটা দড়ি। দড়িটা ছিঁড়ে গেল। পড়ে যাচ্ছি। চিৎকার করে উঠলুম, ‘মা!’
একটা ঝাঁকুনি। মা দু-হাতে আমাকে জড়িয়ে ধরে আছে, ‘কী রে! ভয় পেয়েছিস!’
সকালবেলা সব শুনে বাবা বললেন, ‘এই রবিবার আমরা নামব। তোমার ভগবান দাদুও থাকবেন। তারপর মিস্তিরি ডেকে সিল করে দেব।’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন