শেষ খাওয়া

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

‘বাচ্চা তিনটে আর একটু বড়ো হোক না বউমা তারপর না হয় মাটাকে ছেড়ে আসবে।’ তাকিয়ায় হেলান দিতে দিতে, ডিশ থেকে পান তুলে মুখে পুরতে পুরতে দাদু বললেন।

দাদুর ঘরে জোর মিটিং বসেছে। সভাপতি আমার দাদু। প্রধান অতিথি আমার বাবা উদ্যোক্তা আমার মা। সভ্য হিসেবে উপস্থিত আছেন আমাদের বামুনদি, সুখেনদা, কমলাদি, আর আমার দিদি।

বাবা একপাশে বসে আছেন। হঠাৎ যেন জড়িয়ে পড়েছেন। ইচ্ছে নেই তবু বসে থাকতে হয়েছে। রবিবার দুপুরে আমার যেমন হয় আর কি! ‘বোস অঙ্ক কষতে।’ বাবার আদেশ। আর বাইরে তখন নীল আকাশ। ঝাঁ ঝাঁ রোদ। মনা ঘুড়ি বেড়েছে। বসে বসেই দেখতে পাচ্ছি। লাট খাচ্ছে। পাক খাচ্ছে। বুড়ো সাইকেল শিখছে। দেখছি শুনছি আর বসে অঙ্ক কষছি। বাবার ঠিক সেই অবস্থা। দাদু জোর করে বসিয়ে রেখেছেন ‘না, না, যাবে কোথায়। এ ব্যাপারে তোমার মতামতের যথেষ্ট দাম আছে। থাকবে কি যাবে? আমি ভোট দেব।’

‘এর আবার ভোটাভুটি কি? এ সব মেয়েদের ব্যাপার তারাই ঠিক করুক।’

‘উঁহু উঁহু, গণতন্ত্রের যুগ। সাধারণতন্ত্রী ভারত। কারুর একার কথায় সিদ্ধান্ত হবে না। হতে পারে না।’

‘ওই তো পুঁচকে পুঁচকে তিনটে প্রাণী, আর আমরা এতগুলো ধেড়ে। আমদের কি এমন করতে পারে! আমার বাবা মাথায় আসে না।’

‘আমারও আসে না।’

মা বললেন, ‘কী করে আসবে! আপনারা অন্দরের খবর কতটুকু রাখেন। দেখতো না দেখ। দুধ খোলা রাখার উপায় নেই। ঠিক তিন দিক থেকে তিনজন এসে চকাচক।’

বাবা বললেন, ‘চাপা দিয়ে রাখলেই হয়।’

‘ঠেলে খুলে ফেলে।’

‘থালার ওপর থান ইট চাপা দাও।’

‘গরম দুধ একটু খোলা রাখতে হয়। সঙ্গে সঙ্গে চাপা দেওয়া যায় না। ওরা সেই গরমও মানছে না।’

‘তার মানে, আমরা রোজই বেড়ারে এঁটো খাচ্ছি।’

‘খাচ্ছি তো।’

‘ছি ছি। খুব খারাপ কথা।’

দাদু বললেন, ‘না জেনে খেলে কিচ্ছু হয় না। তুমি বলেই ভুল করলে।’

‘বা:, আমি জেনে শুনে না বলে থাকি কী করে! আমার পাপ হবে না!’

‘তাও তো বটে তুমি বউমা ওসব দেখ কেন? অত খুঁটিনাটি ব্যাপারে নজর দাও বলেই অশান্তি বেড়ে যায়।’

কমলাদি একপাশে ঘুম ঘুম চোখে বেশ বসেছিলেন, হঠাৎ বলে উঠলেন, ‘আজ তো গেছে। ওদের মাটা, এই এতবড়ো একটা রুই মাছ টেনে নিয়ে কুয়োতলায় পালিয়েছে।’

‘তারপর?’ দাদুর খুব উৎসাহ।

‘তারপর সুখেন হেই হেই করে দৌড়ল। বেড়াল মাছ মুখে ছুটছে। সুখেন ছুটছে।’

‘তারপর, তারপর!’ দাদুর ভীষণ উৎসাহ।

‘বেড়াল লফিয়ে উঠতে গেল পাঁচিলে।’

‘তারপর?’

‘পারে না কি? মাছটার কত ওজন!’

‘তারপর!’

‘মুখ থেকে মাছটা পড়ে গেল ওপাশের নর্দমায়।’

‘যা:।’

বাবা বললেন, ‘আজ কি সেই মাছ আমাদের পথ্য!’

মা বললেন, ‘রাম রাম! আজ পেঁপের তরকারি আর রুটি।

‘ছোলা দিয়েছ? ছোলা!’

‘দিয়েছি। বাদামও দিয়েছি।’

‘ওঃ মারভেলাস। তবে আর কী!’

দাদু বললেন ‘সে কী? আজ পেঁপে! আমি যে আবার শাক্ত। আজ তাহলে আমার উপবাস!’

সুখেন বললেন, ‘মা আপনাদের ভয় দেখাচ্ছেন। ভালো ব্যবস্থাই আছে। মাছের কচুরি। কিমা কারি।’ ‘আহা। আহা। সোনায় সোহাগা।’

দাদুর আনন্দ শেষ হয়েছে কী হয়নি রান্নাঘরে ঝনঝন শব্দ।

‘যা: সর্বনাশ হয়ে গেল।’

মা ছুটলেন, পেছন পেছন কমলাদি। তার পেছনে সুখেনদা। সভা ভেঙে গেল। ওধারে মারমার, ধরধর শব্দ। কিছু পরেই আমাদের পুসি ভয়ে ছুটতে ছুটতে এসে সোজা দাদুর কোলে। চোখমুখ লাল করে মা দরজার সামনে,

‘আজ মেরেই ফেলব।’

বাবা শান্ত গলায় বললেন, ‘উত্তেজিত হয়ো না। মাথা ঠাণ্ডা। মাথা ঠাণ্ডা। খ্রাইস্ট বলেছেন, হেট দি সিন, নট দি সিনার।’

‘এক ডেকচি দুধ উল্টে দিয়েছে। আগে বেধড়ক পেটাই তারপর খ্রাইস্ট কি বলেছেন শোনা যাবে।’

দাদু বললেন, ‘বউমা, অপরাধী নিজে ছুটে এসে আদালতে আত্মসমর্পণ করেছে। আর তো মারা যাবে না। দেশে আইন আছে তো! তাছাড়া আমি আবার আইনের ব্যাবসা করি।’

‘দেশে আইন আদালত, গণআদালত দুটোই চলছে। গণআদালতের হাতে ওকে ছেড়ে দিন।’

‘মারলে তোমার দুধ কি ফিরে আসবে মা? ভেবে দ্যাখো। ভেবে দ্যাখো, মানুষ কেন চুরি করে! অভাবে। চুরি করে, ক্ষিধের জ্বালায়। খেতে দাও, চুরি ছিনতাই সব বন্ধ হয়ে যাবে।’

‘স্বভাবেও চুরি করে বাবা। চব্বিশ ঘণ্টা খেয়ে খেয়ে, সব কটা ভুঁয়ো পেটা। তবু ছোঁক ছোঁক। এই মাটা হল সব চেয়ে বড়ো চোট্টা। ওই মায়ের শিক্ষায় ছেলেমেয়ে তিনটেও এই বয়সে পাকা চোর হয়ে উঠছে।’

‘তাহলে?’ দাদু চোখে প্রশ্ন নিয়ে সকলের দিকে তাকালেন।

মা বললেন, ‘আপনার কথামতো বাচ্চা তিনটে আর একটু বড়ো হোক। মাটাকে আজই রাতে বিদায় করা হোক।’

‘আজই রাতে!’

সুখেনদা বললে, ‘লোহা গরম থাকতে থাকতেই হাতুড়ি মারা উচিত। এখন আমরা তেতে আছি, বস্তাফস্তা সব রেডি ডোমবাগানের মাঠে ছেড়ে দিয়ে আসি। রাতেই সুবিধে।’

‘আজ থাক। আহা আজ থাক।’ দাদু করুণ মুখে তাকালেন। ‘দ্যাখো না আমার কোলে শুয়েই কেমন ঘড়ঘড় করছে। মাঠে ছাড়লে মরে যাবে। কামার পাড়ায় ছেড়ে দিও। যেকোনো একটা বাড়িতে ঢুকে যাবে।’

বাবা বললেন, ‘আর না, বেড়ালপর্ব এখানেই শেষ। কালই ছাড়া হবে। আজ সভা ভঙ্গ।’ আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তুমি যে একেবারে শুয়েই পড়লে! একেই বলে, কারুর সর্বনাশ কারুর পোষমাস। গেট আপ। আজ রাত একটার আগে শুতে দিচ্ছি না।’

যা:, উলটো পোষমাস হয়ে গেল। এবারে বেড়ালের পোষমাস আর আমার সর্বনাশ। দাদু গুম মেরে বসেই রইলেন বেড়াল কোলে। ভাবছেন। আইনের প্যাঁচ কষছেন। আমি যাবার আগে বললুম, ‘দাদু কোর্টে আপনি যে মক্কেলের হয়ে দাঁড়ান, সেই তো শুনি ছাড়া পেয়ে যায়। একে দিয়ে মায়ের বিরুদ্ধে কোর্টে একটা কেস ঠুকে দিন না।

হাইকোর্টের ইনজাংসানে কত কি তো বন্ধ হয়ে যায়।

বেড়াল ছাড়া বন্ধ হবে না?’

দাদু নিশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘এটা মানুষ হলে একবার চেষ্টা করে দেখতুম। এটা যে মানুষ হল না।’

পরের দিন সকালে সব নর্মাল। বাবা ঘরে ডনবৈঠক করছেন। দাদু খোলা গায়ে পুজোর আসনে ধ্যানস্থ। গলায় গোটা গোটা লাল রুদ্রাক্ষের মালা। সুখেনদা বাজারে।

কমলাদি ইয়া এক শিল পেড়ে দুলে বাটনা বাটছে। দিদি ফিস ফিস করে ইতিহাস মুখস্থ করছে। পরীক্ষা সামনে। পড়ার ধুম পড়ে গেছে। আর পুষি আছে হাত পা ছড়িয়ে, নিশ্চিন্ত আরামে দাদুর বিছানায়। পুষিটা এমনি খুব ভালোমানুষ। কেবল একটু বোকা চোর। আমার মতো চালাক চোর হলে মাকি ধরতে পারতেন! চুরি করতে গিয়ে সব ফেলেমেলে একসা করে। আরে চোরের কি শব্দ করা উচিত, না করা চলে। এই যে আমি আচার খাই, গুঁড়ো দুধ খাই, শব্দ করে খাই? এমন কি গোঁফে একটু গুঁড়ো লেগে থাকে না। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মায়েরই শাড়ি দিয়ে সব ঝেড়ে ফেলি। হি হি। কোনো দিন দিদি ধরে ফেললে ভাগ দি। দিদির আবার আচার ফেবারিট। ঝাঁটার মতো গোঁফ করেছে পুষি। দুধ খেলেই সর ঝোলে। মেয়েছেলের আবার গোঁফ কি! যেমন কান্ড!

বাবা আর দাদু নটার সময় বেরিয়ে গেলেন। একটু পরে আরও স্কুলে চলে গেলুম। পুষি তখনও ভোঁস ভোঁস ঘুমোচ্ছে। আর কি, সন্ধের পর থেকে তো আর বিছানা জুটবে না। কেউ খেতেও দেবে না। আমি দেখেছি, বেড়ালকে কেউ ভালোবাসে না, সবাই দূর দূর করে। আমার দিদিটার কোনো দুঃখ নেই। বলতে গেলুম, ‘পুষিটাকে আজ একটু ভালো করে খাওয়াস।’

বললে, ‘ভ্যাট ভ্যাট, আমার বলে সামনে পরীক্ষা! এখন বেড়াল মেড়াল আমার মাথায় আসছে না। বিরক্ত করিসনি তো, মাকে বলে দেব।’

আমি বিনুনিটা ধরে একটু ঠানব বলে যেই হাত বাড়িয়েছি, অমনি চেঁচাতে লাগল, ‘ও মা, মা মাগো, দ্যাখো না বুড়ো কী করছে!’

মা তেড়ে আসার আগে পুটুর কাছ থেকে নতুন কায়দায় যে মুখ ভেঙানো শিখেছি, সেইটা প্রয়োগ করে সোজা দে ছুট। কাপুরুষ। নিজে পারে না। সব ব্যাপারে মার সাহায্য!

রাস্তায় বেরিয়ে শুনলুম, ‘তুই ফিরে আয়, তারপর দ্যাখনা, তোকে আমি কেমন পেটাই।’

আমাকে পেটাবে! অ্যায়সা হাত মচকে দোব।

দিদিটা আমার পাগলি। আবার দুর্গা দুর্গা বলছে।

আজ আসার সময় রাক্ষসটার জন্যে হজমি আনব। টকাস টকাস করে খাবে।

সন্ধে তো প্রায় হয়ে এল। গাড়ি থামল বাড়ির সামনে। দাদু নামলেন। চকচকে কালো কোট। ধবধবে সাদা প্যান্ট। হাতে অ্যাটাচি। মুখটা চটককে ফর্সা। এই সময়ে দাদুকে এমন সুন্দর দেখায়। সুখেনদা ছুটে এল। দাদু বললেন, ‘গাড়িতে খাবারের বাক্স আছে। সাবধানে নামাও।’

এই সময়টায় আমিও কাছে থাকি। দিদি বলে, হ্যাংলা।

জানে না, বড়ো হলে আমি কী করে হ্যাংলা থাকব!

সুখেনদা পাশ দিয়ে চলে যাবার সময় গন্ধ পেলুম। অসাধারণ। মনে হয় ফিশফ্রাই।

দাদু যেতে যেতে বললেন, ‘মাকে বলো ফিশফ্রাই আছে।’ তারপর আর একটু এগিয়ে বললেন, ‘আছে না গেছে?’

মা এসে গেছেন, ‘কার কথা বলছেন বাবা?’

‘পুষি। আছে না ছেড়ে দিয়েছ!’

মার কত উৎসাহ! লাফাতে লাফাতে বললেন, ‘এই তো, আর একটু অন্ধকার হলেই। জানেন আজ কী করেছে! এই অ্যাতো বড়ো একটা পায়রা মেরেছে।’

গম্ভীর মুখে একবার ‘হুম’, বললেন দাদু। তারপর বললেন, ‘বিদায় করার আগে আমি ওকে প্রাণ ভরে খাওয়াতে চাই। গোটা একটা ফিশফ্রাই ওকে খাওয়াব। নিজে খাওয়াব।’

দালানে পুষি বসে আছে পা মুড়ে। ধবধবে সাদা তুলোর তালের মতো। আধ বোজা চোখে বাচ্চা তিনটের খেলা দেখছে আয়েস করে। খুব খেলছে। মাঝে মাঝে মায়ের ঘাড়ে এসে পড়ছে। পুষির কোনো ধারণাই নেই একটু পরে কী হবে।

কোর্টের কাপড়জামা ছেড়ে দাদু এলেন। ডাকতেই পুসি এল। মাছ ভাজার গন্ধ, আর থাকতে পারে! ন্যাজ তুলে আদুরে গলায় ‘মিউ’ করল। দাদুর পিঠে গা ঘষল। ঘড়ঘড় শব্দ করছে। দাদু একটু একটু করে ভেঙে ভেঙে দিচ্ছেন ফিশফ্রাই।

খেয়ে দেয়ে পুসি গা চাটছে। বাচ্চা তিনটে মায়ের প্রসাদ খাচ্ছে। দাদু উঠে যেতে যেতে বললেন, ‘না আর মায়া বাড়াব না। তোর বরাতের ওপর ছেড়ে দিলুম, যা।’

সুখেনদা যখন চটের বস্তার মধ্যে পুসিকে ভরছে তখন আমি আর দিদি ছাতের চিলেকোঠায়। দিদি আমাকে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কাঁদছে। আমি তো ছেলে, তাই প্রথমে ভেবেছিলুম কাঁদব না কিছুতেই। অনেকক্ষণ দাঁতে দাঁত চেপে রইলুম। পুসির কথা ভোলার জন্যে কত কি ভাবার চেষ্টা করলুম ; তবু জল এসে গেল চোখে। দুজনে দুজনকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলুম। চোখের সামনে পুষিকে দেখতে পাচ্ছি। থুপপি হয়ে বসে আছে বাগানের পাঁচিলে। আরামসে শুয়ে আছে দাদুর বিছানায়। দুধ খাচ্ছে চকচক করে। বাচ্চাদের গা চেটে দিচ্ছে। যত মনে পড়ছে, তত কান্না বাড়ছে।

দিদি একসময় বললে, ‘চল বুড়ো, আমরা দুজনে আত্মহত্যা করি।’

আমি ছেলে তো, তাই দিদির চেয়ে আমার বুদ্ধি একটু বেশি। আমি পড়েছি, বেড়ালকে যত দূরেই ছেড়ে দাও, ঠিক ফিরে আসবে। কান্নায় গলা বুজে আছে, তাও বললুম অনেক কষ্টে, ‘দেখিস দিদি, ও ঠিক আবার ফিরে আসবে।’

দিদি কাঁদতে কাঁদতে বললে, ‘ঠিক বলছিস।’

‘হ্যাঁ ঠিক। পলাশদের বেড়ালটাকে ডোমবাগানে ছেড়ে এসেছিল। তিন দিন পরে, কাল আবার ফিরে এসেছে।’

দিদি আমাকে খুব জোরে জড়িয়ে ধরল।

একটু পরেই ছাদের ওপাশে কী একটা শব্দ হল, আর অমনি আমার মনে হল ভূত। দিদিরও সেই রকম মনে হল। আমরা তখন গুটি গুটি নেমে এলুম নীচে। দাদু আসনে বসেছেন। ধ্যানে। মা রান্না ঘরে মনের আনন্দে রাঁধছেন। ছ্যাঁক ছোঁক শব্দ হচ্ছে। আমার মা কি খুব নিষ্ঠুর? মনে হয় তা নয়। আসলে মা তো আমাদের চেয়ে অনেক বড়ো, অনেক অনেক বেড়াল দেখেছেন, তাই আর ভালো লাগে না আর কি।

এক সময় কমলাদি হাই তুলতে তুলতে বললে, ‘বাবা, সুখেন তো অনেকক্ষণ গেছে। এখনও আসছে না কেন? পুলিশে ধরলে নাকি! অত বড়ো একটা বস্তা ঝুলিয়ে গেছে। অন্ধকারে ছেলেধরা বলে পেটাতেও পারে।’

দিদি ফিসফিস করে আমাকে বলল, ‘পেটায় তো বেশ হয়!’

সবাই খুব ভেবে পড়ল। দাদু পড়ার ঘরে আইনের বই নিয়ে বসেছেন। চা জলখাবার সব ফিরে এসেছে, গম্ভীর মুখ। আবার বলেছেন রাতে, নো মিল।

এমন সময় বাইরে গলা পাওয়া গেল। আজ বলেই গিয়েছিলেন, ফিরতে রাত হবে। বাবা যেন জোরে জোরে কাকে বলছেন, ‘কী রে তুই এখানে অন্ধকারে একা বসে আছিস কেন?’

সুখেনদার গলা পেলুম কাঁদো, কাঁদো, ‘এমনি বসে আছি!’

‘কাঁদছিস কেন? আর কি তোর কাঁদার বয়েস আছে?’

বাবা আগে আগে, পেছনে সুখেনদা বাড়ি ঢুকলেন। ভেতরে এসে সুখেনদার কান্না আরও বেড়ে গেল। সামনে মা।

‘সর্বনাশ সয়ে গেছে মা।’

‘কি হল?’ মা বেশ ভয় পেয়েছেন।

‘নন্দকুমার স্ট্রিটের কাছে গেছি, বেড়ালটা হাঁচড়পাঁচড় করে বস্তা ফেঁড়ে বেরিয়ে এল।’

‘তা আসুক না। তাতে কাঁদার কী হয়েছে?

সুখেনদা এবার হাউহাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বললে, ‘ছুটে রাস্তা পেরচ্ছে এমন সময় একটা টেম্পো...।’

সুখেনদা আর বলতে পারল না আমারা শুনতে পেলুম না, কী জানি। সবাই চুপ। দাদু উঠে এসেছেন। প্রথমে দিদি কাঁদল। মেঝেতে পড়ে গড়াচ্ছে। তারপরেই মা। তারপর আমি। শেষে সবাই। এরই মাঝে দাদু চাপা গলায় বললেন, ‘বউমা, তুমি মানুষের এত অত্যাচার সহ্য কর আর সামান্য একটা বেড়ালের গোটাকতক উৎপাত সহ্য করতে পারলে না।’

এতসব ঘটছে আর কী আশ্চর্য, যাদের মা মারা গেল তাদের তিনটেতে মিলে সারা ঘরে লাফিয়ে লাফিয়ে খেলা চলেছে। দিদি একবার মাথাটা তুলে বললে, ‘ওই যে, ওই যে, ওই জায়গাটায় বসে পুসি শেষ খাওয়া খাচ্ছিল।’

সেই অদ্ভুত মানুষটি
ড়দা বললেন, ‘তুই জানলার ধারে বসিসনি। আমাকে বসতে দে। পাহাড়ি পথে গাড়ি যখন ঘুরে ঘুরে উঠবে, চক্কর লেগে যাবে।’

বেশ জমিয়ে বসেছিলুম জানালার ধারে। সরে আসতে হল। বড়দার হুকুম। নড়চড় হবার উপায় নেই। কলকাতা থেকে শিলিগুড়ি। শিলিগুড়ি থেকে যাব কালিম্পং। কালিম্পং-এ যাচ্ছি ঠিক বেড়াতে নয়। দাদার কিছু কাজও আছে। দাদা বলবে কাজ বাবা বলবেন অকাজ। দাদার মাথায় অর্কিড ঢুকেছে। গ্যাংটকে কার যেন অর্কিডের চাষ আছে। সেখান থেকে অর্কিড কিনে কলকাতার কাচের ঘরে কী যেন বলে কনট্রেলড আবহাওয়ায় লালনপালন করা হবে। যেমন খরচ তেমনি পরিশ্রমের ব্যাপার।

আমার গাছপাগল দাদা। প্রথমে মাথায় ঢুকেছিল চন্দ্রমল্লিকা। সে এক কুরুক্ষেত্র ব্যাপার। ছোটো টব। বড়ো টব। মেজো টব। ন টব। টবের ছড়াছড়ি। গাছ এ টব থেকে ও টবে যায়। ও টব থেকে সে টবে। কত রকমের খাদ্য। কালো গুঁড়ো গুঁড়ো। সাদা মিহি মিহি। দানা চিনি চিনি। কত রকম ফুলের নাম, টাইগারস নেল, স্নোবল। পাতা থেকে কালোকালো পোকা ঝাড়ার হরেকরকম বরুশ। যত রকমের পুরস্কার আছে ফুলের জন্যে দাদা সব পেয়ে বসে আছে। চন্দ্রমল্লিকার পর এল গোলাপ। ব্ল্যাক প্রিনস, প্রিমরোস, অ্যালবার্ট, ফিলিপস। গোলাপ আবার চন্দ্রমল্লিকার বাবা।

মা বলেছিলেন, ‘বাবা, দু-একটা পুজোর ফুলের গাছ লাগা না, টগর, করবী, অপরাজিতা, জবা।’ দাদা ঠোঁট উলটে বলেছিল, ‘রাবিশ। ও সব ফুলের কোনো আভিজাত্য নেই মা। আমার হল মারিত গুণ্ডার, লুটিত ভান্ডার।’

দাদা এখন সেই গণ্ডার মারতে কি ভান্ডার লুটতে চলেছেন। নেপালি ড্রাইভার গাড়ি ছেড়ে দিয়েছে। দাদা জানালার ধারে বহাল তবিয়তে বসে। কোলের ওপর সোয়েটার, মাঙ্কি ক্যাপ। গাড়ি নাকি ঘুরতে ঘুরতে পাহাড়ি পথে যত ওপর দিকে উঠতে থাকবে ততই শীত করবে এবং তখন একে একে সব পরে নিতে হবে। গরম থেকে ঠাণ্ডা, সে এক সাংঘাতিক ব্যাপার। একটু অসাবধান হলেই গলায় ঠাণ্ডা লেগে যাবে। বুকে সর্দি বসে যাবে। কোনো রকম ঝুঁকি নেওয়া চলবে না।

বুক পকেট থেকে দুটো ট্যাবলেট বেরোল। একটা আমার একটা দাদার। জলের ফ্লাস্ক পাশেই দোলদোল করে দুলছে।

‘নে খেয়ে নে।’

‘কীসের ট্যাবলেটে দাদা? সর্দির?’

‘আজ্ঞে না। বমির।’

‘এখন ট্যাবলেট খেয়ে বমি করতে হবে।’

‘মূর্খ’! গবেট। গাধা।’

বাব্বা এক সঙ্গে তিনটে। গবেট, মূর্খ, গাধা। দাদার গালাগালে সাধারণত পশু-পাখিই আসে। খুব রেগে গেলে, ঘটি, বাটি, ডেকচি, গামলা প্রভৃতি আমাদের স্কুলের সংস্কৃতের মাস্টার-মশাইয়ের ভাষায় যাবতীয় মনুষ্যেতর অপ্রাণী বাচক শব্দ আসতে থাকে। যেমন, কবে যে তোর বুদ্ধি হবে ব্যাটা জামবাটি।

দাদা এক ঢোক জল দিয়ে বড়িটা খেয়ে নিয়ে বললে, ‘এই ট্যাবলেট খেলে বমি বন্ধ হয়ে যাবে।’ কথা না বাড়িয়ে ট্যাবলেটটা গিলে ফেললুম। আরও তো অনেক যাত্রীই আমাদের সঙ্গে পাহাড়ে উঠছেন কই কারুর তো তেমন দাদার মতো বাড়াবাড়ি দেখছি না। বাবা তাই দাদাকে মাঝে মাঝেই বলেন, ‘শঙ্কর অত উতলা নাই বা হলে, ধীরে ধীরে সব কাজ করবে। হুড়ুম হুড়ুম করবে না, বাড়াবাড়ি করবে না। মাথা ঠাণ্ডা করে কাজ করতে শেখ।’

মাথা ঠাণ্ডা দাদা ভাবা যায় না। মা বলেন, ‘এক একটা ছেলে আমার এক এক রকম। বড়োটি আগ্নেয়গিরি, মেজটি ঝড়, ছোটোটি মিটমিটে।’

আমি নাকি মিটমিটে ডান। ডানপিটের কী করি আমি। সাদা ধবধবে বিছানায় ডিগবাজি খাই। বালিশে বকসিং লড়ি। বাথরুমে জল বেরোবার নর্দমার মুখ এঁটে এঁটে জল ছেড়ে সারা গায়ে সরষের তেল মেখে বুকে পিঠে পিছলে পিছলে রুই মাছের মতো খেলে খেলে বেড়াই। ছোটো বলেই তো এসব করি। বাবার মতো যখন বড়ো হযে যাব তখন কি আর বাথরুমে সিলিপ খাব। মা সেদিন বাথরুমের মেঝেতে পা দিয়েই পিছলে দুম করে পড়ে গেল। পড়ে গেলে রেগে যাবার কী আছে? আমি তো সারাদিনে কতবারই দুমদাম করে পড়ে যাই। সিঁড়ি বেয়ে মই থেকে। গাছের ডাল থেকে, খেলার মাঠে। কই আমি তো রেগে যাই না। মা অমনি বাথরুমের মেঝে থেকে তেড়ে এসে আমার কান ধরে দুই থাপ্পড় মেরে বললে, ‘বাঁদরটা বাথরুমে মারবার কল বানিয়ে রেখেছে। কাল থেকে বাইরের কলে চান করবি, বাথরুম আমি তালা দিয়ে রাখব।’

দাদা জানালা আড়াল করে একটা খবরের কাগজ ধরে রেখেছে। চোখ বন্ধ। তুমি জানালার ধারে তাহলে বসলে কেন, যদি চোখ বুজে কাগজ আড়াল দিয়েই থাকবে! কত কি দেখার জিনিস হু হু করে পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে। পাইন গাছ, ধুপি গাছ, সুন্দর সুন্দর নেপালি বাড়ি, পাহাড়ে, রংবেরঙের মানুষ। আশ্চর্য দেশের ভিতর দিয়ে চলেছি ঘুরে ঘুরে। পাক খেয়ে সমতল ছেড়ে উঠে চলেছি হাজার হাজার মিটার উঁচুতে। দাদা সাইডব্যাগ থেকে একটা মোটা অর্কিডের বই বের করে পড়তে শুরু করল। এ তো ভারি মজা। জানালার ধারে বসলে, প্রথমে কাগজ আড়াল চোখ বন্ধ। তারপর যদিও বা চোখ খুললে, চোখের সামনে বই।

‘দাদা আমাকে জানলার ধারে বসতে দাও না! তুমি তো কিছুই দেখছ না? কেবল পড়ছ।’

‘ও নো নো। তোকে কোনো বিপদে ফেলতে চাই না। এটা খুব ভয়ের জায়গা। ঠাণ্ডা, হিম খাড়া পাহাড়, নীচু খাদ। দেখলেই তোর মাথা ঘুরে যাবে। ঘুরে গেলেই তুই অজ্ঞান হয়ে যাবি। আমি তো সেই কারণেই বই খুলে পড়তে শুরু করেছি। তোর তো এমনিই পড়াশোনায় তেমন মনে নেই। তারপর বাঁধা গোরু ছাড়া পেয়েছিস। আর রক্ষে আছে। হাঁ করে তাকাতে তাকাতে হঠাৎ কখন জানালা গলে হয়তো বাইরেই ছিটকে চলে যাবি। নে ঘুমিয়ে পড়।’

‘ঘুমোব কী গো?’

‘না ঘুমোতে চাইলেও ঘুমিয়ে পড়তে হবে। মনে রেখ তুমি একটা ট্যাবলেট খেয়েছ।’ আমাদের সামনের আসনে পাগড়ি মাথার পাশাপাশি দুজন বসে আছেন! আমি এত ছোটো, প্রায় চাপা পড়ে গেছি। সামনে যেন পাঁচিল। কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। দ্যুৎ, কত কি দেখতে দেখতে যাব ভেবেছিলুম। দাদা সব মাটি করে দিলে।

আমার বাঁ পাশে দাদা, ডান পাশে আর এক ভদ্রলোক। জিনের প্যান্ট। জিনের চোরপকেট, চার কলার পুরো হাতা জামা। চোখে বাদামি কাচের চশমা। কপাল ঢাকা সান ক্যাপ। কেমন একটা ভয় ধরিয়ে দেবার মতো চেহারা। ভদ্রলোক পকেট থেকে একটা চুইংগাম বের করে মুখে ফেলে চিবোতে শুরু করলেন। আড় চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছি। বিশাল চেহারা। কোলের ওপর টেলিফটোলেনস লাগান দামি ক্যামেরা। চিবুকে ঠোঁটে কেমন একটা বেপরোয়া ভাব। মাঝে মাঝে আবার হাঁটু নাচাচ্ছেন।

হঠাৎ একবার চোখাচোখি হয়ে গেল। চশমার ভেতরে চোখ। তবু মনে হল চোখ দুটো নেচে গেল। মুখ ঘুরিয়ে নিলুম। চোখ নাচাবার কি আছে। মুখের যতটুকু দেখা গেল তাতে মনে হল ভদ্রলোক বাঙালি। দাদার মুখের দিকে তাকাতেই অবাক হয়ে গেলুম, ঘুমিয়ে পড়েছে। মাথাটা বুকে ঝুলে পড়েছে। বা দাদা বা।

ভদ্রলোকের দিকে আর একবার তাকাতেই মনে হল ঠোঁটের কোণে কেমন একটা কৌতুকের মুচকি হাসি। আচ্ছা বিপদ তো? সামনে সর্দারজিদের পাঁচিল। পাশে জানালা আটকে ঘুমন্ত দাদা। এ পাশে কেমন সন্দেহজনক একজন মানুষ। মুখটা ফিরিয়ে নিয়ে চোখ বুজিয়ে ফেললুম। ডানহাতের কনুইতে একটা খোঁচা খেয়ে চোখ মেলতে হল। চোখের সামনেই একটা হলদে রঙের চুইংগাম।

‘নাও। গাম খাও। বুঝেছি খুব যা তা লাগছে। সুহাস তো দেখছি ঘুমিয়েই পড়ল।’ আশ্চর্য আমার দাদার নাম কী করে জানলেন এই ভদ্রলোক। এঁর দেওয়া চুইংগাম খেয়ে মরব না কি? ‘নো থ্যাংকস। আমি খাব না।’

‘ভয় পাচ্ছ? খুব স্বাভাবিক। অচেনা লোক। তায় তোমার দাদার নাম জানি। তুমি কী ভাবছ তাও জানি।’

‘কী ভাবছি?’

‘ভাবছ আমি একটা ছেলেধরা। তোমাকে ঘুম পাড়িয়ে ঝোলায় ভরে নিয়ে যাব। তারপর তোমার বাবার কাছ থেকে র‌্যানসাম আদায় করব। র‌্যানসাম মানে কী?’

‘র‌্যানসাম মানে মুক্তিপণ।’

‘ভেরি গুড। কিডন্যাপ মানে কী?’

‘জোর করে ধরে নিয়ে যাওয়া।’

‘ভেরি ভেরি গুড।’

‘হাইজ্যাক মানে কী?’

‘ছিনতাই।’

‘ট্রিপল ভেরি গুড।’

‘আপনি কি ইংরেজির মাস্টারমশাই?’

‘কে জানে কে? যদি জানতেই পারতুম আমি কে, তাহলে কি এত খোঁজাখুজির প্রয়োজন হত। তুমি কি জান তুমি কে? জান না। জানলে কি তোমার এই অবস্থা হয়। নাও ঘুমিয়ে পড়।’

‘আমার কি এমন খারাপ অবস্থা হয়েছে!’

‘বুঝবে পরে। তুমি কে কেউ জানে না। তুমিও না, তোমার গার্জেনরাও নয়। এই না জানার ফলে তোমাকে নিয়ে কত কান্ড হবে দেখবে। যেমন আমাকে নিয়ে হয়েছে। যেমন তোমার দাদা সুহাসকে নিয়ে হয়েছে।’

‘আমার দাদাকে আপনি কী করে চিনলেন।’

‘দেখে।’

‘কখন দেখে? ছেলেবেলায়।’

‘না, এখন দেখে। এইমাত্র দেখলুম আর চিনলুম।’

খুব ভয় পেয়ে চুপ করে গেলুম। কী লোকরে বাবা। এমন তো কখনও শুনিনি, কারুর দিকে তাকিয়েই তার নাম জেনে ফেলা যায়, তার ছেলেবেলা জেনে ফেলা যায়। দাদাটাও এমন হয়েছে, এইরকম একজনের পাশে বসিয়ে কেমন দিব্যি ভোঁস ভোঁস করে ঘুমোচ্ছে!

গাড়িটা হঠাৎ ঝাঁকানি খেয়ে থেমে গেল। দাদার মাথাটা ঠাঁই করে সামনের সিটে ঠুকে গেল। ছোট্ট গাড়ি। জন কুড়ি লোক বড়ো জোর ধরে। হঠাৎ আচমকা এত জোরে কেন যে থামল। আমার পাশে বসে থাকা ভদ্রলোক বললেন, ‘জানতাম এইরকমই হবে। হঠাৎ ওপর থেকে একটা বোলডার গড়িয়ে পড়েছে।’

দাদা কপালে হাত বুলোতে বুলোতে বললে, ‘বোলডারটা গাড়ির ছাদে পড়লে কী হত?’

ভদ্রলোক হাসি হাসি মুখে বললেন, ‘গাড়িটা ভেঙে চুরমার হয়ে যেত। টাল রাখতে না পেরে খাদে গিয়ে পড়তে পারত।’

‘তা হলে কী হত?’

‘আমাদের মৃত্যু হত।’

দাদার মুখটা ভয়ে যেন কেমন হয়ে গেল। সত্যি কথা বলতে কি আমার তেমন ভয়টয় করছে না। কী হবে, কী হতে পারত, এসব ভেবে ভেবে মন খারাপ করার কোনো মানে হয় না। গাড়িটা এখন এখানে বেশ কিছুক্ষণ থেমে থাকবে। সামনের পথ পরিষ্কার না হলে যাওয়া যাবে না।

দাদাকে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলুম, ‘তুমি আমার পাশের ভদ্রলোককে চেন?’

ফিস ফিস করে বললে কী হবে ভদ্রলোক ঠিক শুনে ফেলেছেন। দাদা উত্তর দেবার আগেই তিনি বললেন, ‘না না, তোমার দাদা আমাকে চিনবে না। কী করে চিনবে!’

‘তা হলে আপনি কী করে চিনলেন?’

‘আমি চিনতে পারি। আমার অনেক ক্ষমতা।’ বলে তিনি আসন ছেড়ে হাসতে হাসতে উঠে দাঁড়ালেন। বাস! যেমন লম্বা তেমনি চওড়া মানুষ। দেখলেই ভয় করে। দাদার মুখেও বেশ ভয়ের ভাব। চোখ দুটো বড়ো বড়ো হয়ে উঠেছে।

ভদ্রলোক পকেট থেকে একটা ঘড়ি বের করে খুললেন। খুট করে একটা শব্দ হল। সেকেলে পকেট ঘড়ি। এসব জিনিস আজকাল আর সহজে দেখা যায় না। ঘড়িতে কিছুক্ষণ চোখ রেখে ভদ্রলোক বললেন, ‘না, এ-গাড়ি আর পথের শেষ দেখতে পাবে না।’

দাদা জিজ্ঞেস করলেন, ‘কেন?’

‘নিয়তি।’

‘সে আবার কী?’

‘নিয়তির ইংরেজি কি মাস্টার?’ আমাকে প্রশ্ন।

‘ফেট।’

‘রাইট ইউ আর। সেই ফেট এই গাড়িটাকে টানতে টানতে খাদের দিকে নিয়ে যাবে। তারপর তিনশো মিটার নীচে পাশ ফিরে শুয়ে থাকবে, বছরের পর বছর।’

‘কী করে জানলেন?’

‘আমি সব জানতে পারি। আর জানতে পারি বলেই আমি যা করতে চাই তা কোনো দিনই করতে পারি না।’ ঘড়ি পকেটে পুরে, কাঁধে একটা ব্যাগ ঝুলিয়ে ভদ্রলোক নেমে পড়লেন।

আমরা দু-ভাই হাঁ হয়ে বসে রইলুম। ভদ্রলোক গাড়ি থেকে নেমে আমাদের জানালার পাশে এসে দাঁড়ালেন। একটু আগের ঝাপসা কুয়াশা কেটে গিয়ে আবার রোদ উঠেছে। মাথার টুপি হাত দিয়ে কপালের ওপর আরও খানিকটা টেনে নামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘আমার ইনটিউশান বলছে আর চার-পাঁচ কিলোমিটার যাবার পরই এ গাড়ি একটা খাদে গিয়ে পড়বে। বাঁচতে যদি চাও তো নেমে এস। মাস্টার ইনটিউশান মানে কী?’

‘ইনটিউশান মানে মন, মানে সিক্সথ সেনস, মানে ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়।’

‘ব্যাস, ব্যাস, প্রায় কাছাকাছি গেছ। আচ্ছা গুডবাই।’

ভদ্রলোক গটগট করে উলটো দিকে হাঁটতে হাঁটতে পথের ঢাল বেয়ে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। গাড়ির পেছনের কাচ দিয়ে আমরা তাকিয়ে তাকিয়ে সেই রহস্যময় মানুষটির চলে যাওয়া দেখলুম।

‘দাদা।’

‘বল।’

‘কী করব?’

‘বড়ো ভেঙে পড়েছি রে! এখনও ভালো করে ঘুম ছাড়েনি চোখ থেকে। তার ওপর গাড়ি গেছে থেমে। তার ওপর লোকটি সাংঘাতিক ভয় ধরিয়ে দিয়ে চলে গেল। তার ওপর। না, তার আর ওপর নেই। আমার শরীরে শক্তি নেই। থ্যাস থ্যাস করছে। আমি চোখ বুজিয়ে বসে থাকি। যা হয় হবে।’

‘যা হয় হবে কী গো।’

‘হ্যা যা হয় হবে।’

ওদিকে বোলডার সরাবার কাজ শুরু হয়ে গেছে। এ রাস্তায় মিলিটারি ট্রাক চলে। পথ বেশিক্ষণ বন্ধ রাখা চলে না। রাস্তা প্রায় সাফ হয়ে এসেছে। এখুনি আমাদের গাড়ি চলতে শুরু করবে।

‘দাদা কী করবে?’

‘কিচ্ছু করব না। তুই চুপ করে বোস। ভাগ্যে যা আছে তাই হবে। রাখে কেষ্ট মারে কে, মারে কেষ্ট রাখে কে?’

খ্যাঁ খ্যাঁ শব্দ করে গাড়ি স্টার্ট নিয়েই ঘুরে ঘুরে আবার চলতে শুরু করল।

‘কাজটা ভালো করলে দাদা। জেনে শুনে বিপদে পড়বে।’

‘রাখ তোর বিপদ। বিপদ বললেই বিপদ। এতগুলো মানুষেরই কি এক ভাগ্য।’

বেশ কিছুটা যাবার পর আমার ভয় ভয় ভাবটা কেটে গেল। পরিষ্কার রাস্তা। এই রোদ, এই মেঘ। ভয় পাবার মতো কোনো ব্যাপারই নেই। দাদা স্যাণ্ডউইচের প্যাকেট হাতে ধরিয়ে দিয়েছে। ফ্লাক্সে চা আছে। সকলেই গুজগুজ করে কথা বলছেন, নানা ভাষায়।

হঠাৎ আমাদের পাশ দিয়ে চলে গেল ওভারটেক করে। স্পষ্ট শুনলুম জিপের ভেতর থেকে কে যেন চিৎকার করে বললেন, ‘সুহাস নেমে এস। এখনও সময় আছে।’

আমি চমকে উঠে বললুম, ‘দাদা শুনলে?’

‘শুনলুম।’

‘তাহলে?’

‘তাহলে চা খা।’

উঃ কী দাদার পাল্লায় পড়লুম। গলা ছেড়ে মাকে ডাকতে ইচ্ছে করছে। গাড়িটা যতবার খাদের দিকে সরে সরে যাচ্ছে ততবার গলার কাছে একটা শব্দ ঠেলে ঠেলে আসছে, গেল গেল। এই বুঝি গেল।

আমরা দুজনেই কেবল হাঁসফাঁস করছি। গাড়ির অন্য সকলে কেমন নিশ্চিন্তে বসে আছে। ভাগ্য বা ভবিষ্যৎ আগে থেকে জেনে ফেলার এই দুর্ভোগ।

‘দাদা আমরা কত কিলোমিটার এলুম?’

‘কে জানে কত? চুপ করে বসে বসে ভগবানের নাম জপ কর। বাঁচার ওই একটাই রাস্তা।’

‘তোমার কি মনে হয় বাসটা সত্যি সত্যিই খাদে পড়ে যাবে?’

‘যেতেও পারে। মাঝে মাঝে পড়েও তো। নীচের দিকে তাকালে দেখতে পাবি সব পড়ে আছে।’

ভয়ে পেট গুড় গুড় করে উঠল। দাদা এক আশ্চর্য মানুষ! জেনে শুনে কেমন বসে আছে। একেই বলে হাসি হাসি পরব ফাঁসি মা গো।

গাড়িটা একটা বাঁক ঘুরেই খ্যাঁচ করে ব্রেক কষে থেমে গেল। বেশ বড়ো রকমের একটা ঝাঁকুনি খেতে হল। এই রে, এইবার বোধহয় খাদে পড়ছে। চোখ বুজিয়ে মা-কে মাকি। কতক্ষণ চোখ বুজিয়ে ছিলুম জানি না। সমনের দিকে গোলমাল হচ্ছে। চোখ বুজিয়ে জিজ্ঞেস করলুম,

‘দাদা, আমরা কি পড়ে গেছি।’

‘গবেট, পড়ে গেলে আমরা কেউ বেঁচে থাকতুম না কি?’

‘তাহলে!’

ড্রাইভার হিন্দিতে বলছে, ‘আগেওয়ালা যো জীপ ওভারটেক করকে গিয়া না, ও জীপ গির গিয়া।’

দাদা লাফিয়ে উঠল, ‘সে কী? এ কেয়া বাত?’

হুড়মুড় করে আমরা নেমে এলুম। তিন-চারজন হলদে টুপি পরা নেপালি রাস্তার ধারে ঝুঁকে পড়ে নীচের দিকে তাকিয়ে আছে। অনেক অনেক নীচে একটা জিপ চাকা চারটে আকাশের দিকে করে উলটে পড়ে আছে।

‘কত মিটার নীচু হবে দাদা?’

‘আমার মাথা ঘুরছে।’ দাদা পথের পাশে বসে পড়ে বললেন, ‘দাঁড়া একটু বসেনি।’

এক সর্দারজি পাশে দাঁড়িয়েছিলেন বললেন, ‘করিব তিনশত মিটার তো জরুর হোঙ্গে।’

তাঁর কথার রেশ হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে না যেতেই নীচের সেই কুয়াশা ঘেরা উপত্যকা থেকে একটি কন্ঠস্বর যেন ভেসে এল,

‘মাস্টার টার্ন টার্টল মানে কী?’

আমি সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলুম, ‘কচ্ছপের মতো উলটে যাওয়া।’

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%