দিদি আর পিকলু

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

সব সময় তো মানুষের সময় ভালো যায় না! সেই গানে আছে না, আজ যে রাজা কাল সে ফকির। দশ বছর আগে আমাদের সময়টা খুব খারাপ যাচ্ছিল! কেন? তা আমি বলতে পারব না। দশ বছর আগে আমি দশ বছর ছোটো ছিলুম তো! সহজ হিসেব। মানুষের অবস্থা যখন খারাপ যায়, তখন খুব টানাটানি হয়। এই নেই, ওই নেই। এ-ও তো সকলেরই জানা। নতুন করে কী আর বলব। ঠিক সেই সময় আমার দিদি কোথা থেকে একটা বাচ্চা কুকুর কোলে করে বাড়ি ঢুকল। লোটা লোটা কান। গুলি গুলি চোখ। বাচ্চাটা দিদির বুকে একেবারে লেপ্টে আছে।

আমাকে ইশারায় ডাকল। ফিস ফিস করে বলল, ‘শোন বিলু, ডাক্তার মাসির কুকুরের ছটা বাচ্চা হয়েছে। চাইতেই আমাকে তিন নম্বরটা মানে, দাঁড়া, বড়ো, মেজ, সেজ। হ্যাঁ সেজটা দিয়ে দিল।’

‘সে কী রে দিদি? তুই চাইলি কেন?’

‘যা, আমি তো টাকা চাইনি, খাবার চাইনি, তাহলে তো ভিক্ষে করা হত। কুকুর চাইলে কিছু হয় না।’

‘ধুর বোকা! আমি সেজন্যে বলিনি। কুকুর যে খুব মাংস খায় রে দিদি। কোথায় পাবি? আমরাই তো সেই মাংস খেয়েছিলুম ডিসেম্বর মাসে, বড়োদিনে। সে তো প্রায় একবছর হয়ে গেল! এটা কী কুকুর রে দিদি?’

‘গোল্ডেন রিট্রিভার। দেখবি বড়ো যখন হবে, একেবারে সোনার মতো হবে। মিষ্টি মুখ। ঝোলা ঝোলা কান? স্বপ্নের মতো চোখ। বাবা কোথায় রে?’

‘বাবা অফিসে বেরিয়ে গেছেন। কটা বেজেছে জানিস? সাড়ে এগারোটা।’ আমাদের মা তো প্রথমে রেগে গেলেন। ‘তোদের কোনো বোধ-বুদ্ধি নেই। কুকুর পোষে বড়োলোকে। আমরা কি বড়োলোক। কুকুর কি কুমড়োর ঘ্যাঁট দিয়ে রুটি খাবে?’

মা বসেছিলেন। দিদি কোল থেকে কুকুরটাকে নামিয়ে দিয়েছিল। কুকুরের কী বুদ্ধি! থুপুর থাপুর পা ফেলে ফেলে, সোজা মায়ের কোলে উঠে নিমেষে ঘুমিয়ে পড়ল। চোখ দুটো বুজে গেল। মুখে যেন একটু হাসি ফুটে উঠল! মায়েরা তো এইতেই কাবু হয়ে যান। মা সেই শিশুটির নরম-নরম লোমে হাত বোলাতে কেমন যেন হয়ে গেলেন। তাঁর মুখটা কোমল হয়ে এল। কুকুরটা নিশ্চিন্ত আরামে শুয়ে রইল।

ভয় ছিল বাবাকে। অফিস থেকে ফিরে এসেই হয়তো বলবেন, ‘কুকুর দিয়ে এস। আমাদের এখন ভয়ংকর দুঃসময় যাচ্ছে।’ বাবা এলেন। ঘরে ঢুকলেন। কুকুরটার ততক্ষণে নাম রাখা হয়ে গেছে, ‘পিকলু’। আমাদের বাড়িটা পিকলুর ভালো লেগে গেছে। সে অমনি নেচে নেচে বাবাকে আদর করতে ছুটল। মা তার আগেই বলেছিলেন, ‘আমি কিছু বলতে পারব না। পিকলু নিজের হিম্মতে থাকার জায়গা করে নিক। পারে থাকবে, না পারে দিয়ে আসবে।’

বাবা যে মনে মনে কুকুর এত ভালোবাসতেন আমাদের জানা ছিল না। বাবা বললেন, ‘আরে, আরে, এটা কে রে? কোথা থেকে এল! কে নিয়ে এল?’

উত্তরের অপেক্ষা না করেই কোলে তুলে নিলেন। পিকলু প্রথমেই বাবার গলাটা চুকচুক করে চেটে দিল। তারপর বাবার আঙুল কামড়াতে লাগল কুড়কুড় করে। নতুন দাঁত উঠছিল তো! বাবা পিকলুকে কোলে করে সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠতে উঠতে বললেন, ‘এ তো গোল্ডেন রিট্রিভার, আমার অনেকদিন পোষার শখ ছিল।’

দিদি তো আনন্দে নাচতে নাচতে মাকে জড়িয়ে ধরল। মা কেঁদে ফেলেছেন। খুব একটা চিন্তা ছিল তো! দুপুরবেলা আমরা ভাইবোন লেখাপড়া করছিলুম, তখন পিকলু মায়ের কাছে ছিল। ছোটোখাটো দুষ্টুমি করছিল। উলের বল নিয়ে পালাচ্ছে। বোনার কাঁটা চিবোচ্ছে। মায়ের আঁচল কামড়ে ধরে টানাটানি করছে। পাশে শুয়ে কচি কচি পা দিয়ে লাথি মারছে। একবার ছুটে এসে দিদির ইরেজারটা মুখে নিয়ে পালাল।

দুপুরেই দিদিতে আমাতে একটা প্ল্যান হয়েছিল—আমরা দু-বেলা জলখাবার আর খাব না। আর আমাদের জামাকাপড়ের প্রয়োজন নেই। যে পয়সাটা বাঁচবে তাই দিয়ে রোজ পিকলুর জন্যে কিমা আসবে। আর একটা চিন্তা করলুম, আমরা যদি খুব ভালো করে লেখাপড়া করে ফার্স্ট হতে পারি, তাহলে আমাদের পড়বার খরচ আর লাগবে না। টাকাটা বেঁচে যাবে।

সেই সময় আমাদের বাড়িটা নিয়ে কী একটা মামলা চলছিল। অতশত জানি না ব্যাপারটা কী! তবে দেখতুম বাবা দলিল হাতে উকিলের বাড়িতে ছুটছেন। সেই মামলাটায় বাবার জিত হল। সে কী আনন্দ! কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা নাকি খরচ হচ্ছিল। আমি আর দিদি, ‘জিতেছি, জিতেছি’ বলে নাচতে লাগলুম। পিকলুও আমাদের সঙ্গে নাচছে, সামনের পা দুটো তুলে। বাবা বললেন, ‘সাত বছরের মামলা, জেতার কোনো আশাই ছিল না, জিতে গেলুম, আশ্চর্য! এ পিকলুর পয়ে হয়েছে। পিকলু খুব পয়মন্ত।’ তার আদর বেড়ে গেল। মামলাটা মিটে যাওয়ায় বাবাও স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে পারলেন।

এর কিছুদিন পরেই বাবার একটা প্রোমোশান হল। বাবা বললেন, ‘কুড়ি বছরের চাকরিতে এক ইঞ্চিও নড়তে পারিনি হঠাৎ একফুট ওপরে উঠে গেলুম কী করে! পিকলুর ব্যবস্থা পিকলুই করে নিচ্ছে।’

দেখতে দেখতে পিকলু বড়ো হয়ে উঠল। ভারি ভালো ছেলে। মুখ দেকলেই মনে হত মনে কোনো কুচিন্তা নেই। এক গা সোনালি চুল। বড়ো বড়ো কান দুটো লটকে আছে। টানাটানা চোখ। আমার দিদিকেও খুব সুন্দরী দেখতে। ভাই হিসেবে ওকেই যেন দিদির পাশে বেশি মানায়।

দিদি বলত, ‘দেখ, পিতা-মাতাকে যারা ভক্তি করে, সব কথা শোনে তারাই হল সুসন্তান! সেই দিক থেকেই পিকলু সবচেয়ে সুসন্তান। ও আমাদের হারিয়ে দিয়েছে। আমরা মাঝে মাঝে অবাধ্য হই। ও কিন্তু হয় না।’

দিদির কথাটা আমার মনে ধরল। সত্যিই তাই। মা একটা আঙুল নাড়লে পিকলু বুঝতে পারে। যেখানে মা সেখানেই পিকলু। বাবা বাইরে থেকে ফিরে এলেই, পিকলু যেখানেই থাক ছুটে আসবে।

দিদি ভাবতে বসল, ‘আমরা কেন পারি না! আমরা কেন একটু একটু অবাধ্য হই। মাঝে মাঝে তর্ক করি। ঝাঁঝ দেখাই।’ সেদিনের মিটিং-এ আমরা প্রস্তাব নিলুম—সব ব্যাপারেই পিকলু আমাদের আদর্শ হবে। বাবার বন্ধু সৌম্যকাকু পিকলুর একটা রঙিন ছবি তুলে দিয়েছিলেন। ছবিটা বাঁধিয়ে আমাদের পড়ার টেবিলের সামনে ঝোলানো হল। পিকলু আমাদের গুরু। দিদি বললে, ‘তুই আমার ওপর নজর রাখবি, আমি তোর ওপর। ভুল হলেই ধরিয়ে দিবি! মানুষ তো সব সময় নিজেকে বুঝতে পারে না। ক্ষণে ক্ষণে পালটায়। লোভ হলে একরকম, রাগ হলে আর একরকম। আনন্দ হলে একরকম, দুঃখ হলে আর একরকম। আমরা দুজনে দুজনকে ধরিয়ে দেব।’

দিদি কিন্তু পরীক্ষায় সত্যিই ফার্স্ট হল। আমি হলুম থার্ড। দিদি বললে, ‘আমাদের প্রতিজ্ঞা তুই কিন্তু রাখলি না। খেলাটা একটু কমা না।’ থার্ড হয়েছি বলে আমি তখন কাঁদছি। খেলার কথায়, আমার খেলার পুরস্কারের কথা মনে আসছে। দিদি সবার ওপরে গলায় সোনা। তার পরের ধাপে রূপো। শেষ ধাপে আমি, ব্রোঞ্জ।

আমাকে কাঁদতে দেখে পিকলু আমার গায়ে গা ঘষে, গোল হয়ে ঘুরছে। ঘাড়ে, গালে চেটে দিচ্ছে। একটা উ উ শব্দ করছে। পিকলুও কাঁদছে। শেষে আমার সামনে গ্যাঁট হয়ে বসে নরম গলায় ভৌ, ভৌ করতে লাগল।

দিদি বললে, ‘কী বলছে জানিস! বোকা কাঁদছিস কেন? পরের বারের জন্যে উঠে পড়ে লাগ। বুদ্ধি আছে সব আছে যখন, কেন তোর হবে না!’ সত্যিই আমার খুব একটা জিদ চেপে গেল। দিদি গোল্ড আর আমি ব্রোঞ্জ! আমি হেরে যাব? পিকলু মনের কথা ধরতে পারে! আশ্চর্য! সে অমনি লেজ নাড়ল। ঠিক, ঠিক। প্রতিজ্ঞা ইজ প্রতিজ্ঞা? পারবি না বলে তো কিছু নেই। কেন পারিবে না, তাহা ভাবো একবার? আমাদের কুকুর জগতের দিকে একবার তাকিয়ে দেখ। কোনো বাবা কুকুর কি দুঃখ করে বলে, আমার ছেলেটা নষ্ট হয়ে গেল, বখে গেল। হেরে গেল! মানুষ বলবে, হায়রে! মানুষ আর আগের মতো নেই। যা ছিল আগে, আজও তাই আছে। সব কুকুরই সমান বিশ্বাসী, সমান প্রভুভক্ত, সমান বুদ্ধিমান, সমান বিচক্ষণ, সমান বাধ্য। শেখালে আমি যা শিখব, আমার ভাইয়েরাও তাই শিখবে! তবে।

আমি যখন পড়তে বসে অন্যমনস্ক হয়ে যেতুম, পিকলু অমনি আমার গায়ে গা ঘষত। যেন বলতে চাইত, ‘ও কী হচ্ছে! অন্য কথা ভাবছ কেন? মন দিয়ে পড়ো।’ সারাটাক্ষণ আমার সামনে, কখনো আমার পাশে বসে চুপ করে আমার দিকে চেয়ে থাকত। আমার খুব লজ্জা করত অন্যমনস্ক হতে। অন্য কিছু ভাবতে।

পরের বছরের পরীক্ষায় আমি মাত্র এক নম্বরের জন্যে প্রথম হতে পারিনি।

সেই পিকলু বড়ো হতে হতে বুড়ো হয়ে গেল। বাবারও সব চুল পেকে গেছে। দিদি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। আমি কলেজে পড়ছি। সময় কেমন নদীর মতো হু হু করে বয়ে গেল। পিকলু ভীষণ অসুস্থ। তার পায়ে আর তেমন জোর নেই তবে সোনালি লোম বিবর্ণ হয়ে গেছে। অমন সুন্দর চোখ দুটো গঙ্গার জলের মতো ঘোলাটে। দোতলা থেকে একতলায় নামার সময় হঠাৎ গড়াতে গড়াতে পড়ে যায়। আমরা ছুটে যাই। ধরে তুলি। মা আর দিদি কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘কেন, পিকলু তুমি ওপর-নীচ করছ? তুমি আমাদের কাছে নীচেই থাক না বাবু।’

পিকলু করুণ মুখে তাকিয়ে থাকে। বুঝতে পারে না, কী হচ্ছে। কী হয়েছে তার। মা বলেন, ‘কী দেখছ অমন করে, আমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে, তাকিয়ে। সময় চলে গেছে তোমাকে মাড়িয়ে। তোমার যে এবার সময় হয়েছে, আমাদের ছেড়ে চলে যাবার।’

দিদি মায়ের মুখ চেপে ধরে, ‘ও মা, ও কথা বোলো না।’

বাবা একটা ইংরেজি কবিতার লাইন বলেন, ‘টাইম ইউ ওল্ড জিপসিম্যান!’

একদিন পিকলুর সামনের পা দুটো একেবারেই পড়ে গেল। সে আর দাঁড়াতে পারে না। পা দুটো সামনে মাথার দু’পাশ দিয়ে সটান ছড়িয়ে দিয়ে মুখ থুবড়ে শুয়ে পড়ল। শুরু হল দিদির সেবা। ঠিক যেভাবে একজন বৃদ্ধ মানুষকে সেবা করে, দিদি ঠিক সেইভাবে পিকলুর সেবা শুরু করে দিল। পুরু একটা বিছানা হল মেঝেতে। তার ওপর অয়েলক্লথ। সেই ওয়েলক্লথে পাউডার দিয়ে পিকলুকে শোয়ানো হল। বেডপ্যান এল। ইউরিন্যাল এল। পিকলু তো উঠতে পারে না একেবারে, প্যারালিসিস হয়ে গেছে। দিদি প্রায় সারাদিন, সারারাত বসে আছে তার পাশে। মাঝে, মাঝে একটু করে শুয়ে নিচ্ছে খাটে। পিকলুর সারা শরীরে অস্বস্তি। একটা পায়ে ছোট্ট একটু ঘায়ের মতো হয়েছে। সেটাকে বলে না কি বেডসোর। দিদির এতটুকু ঘেন্না নেই। দেখি, পিকলু দেখি সোনা বলে, তার পাটা টেনে নিয়ে ‘ড্রেস’ করতে বসবে। ব্যাণ্ডেজ খুলবে। ওষুধ লাগাবে। ব্যাণ্ডেজ পালটাবে। একটা পাত্রে গ্লুকোজের জল, আর একটাতে সন্দেশ গোলা দুধ, আর একটায় স্যুপ। দিদি জানে কখন কোনটা খাওয়াতে হবে। যেমন বাচ্চাকে ঝিনুকে করে দুধ খাওয়ায়, দিদি সেইভাবে পিকলুকে খাওয়ায়। মুখ মুছিয়ে দেয়। পিকলুর সব দাঁত পড়ে গেছে। কোনোরকমে মুখটা মাটি থেকে অল্প একটু তুলতে পারে। দিদি সেই অবস্থাতেই কায়দা করে ঠিক খাইয়ে দেয়।

মা বলেন, ‘আমরা হলে পারতুম না।’

আমরা ঘিরে বসে থাকি। বাবা বলেন, ‘রাইপ ওলড এজ।’ চোখ মোছেন। কেউ কোথাও যাবার নিমন্ত্রণ করতে এলে স্পষ্ট বলে দেন, ‘উপায় নেই। আমার বাড়িতে ভীষণ অসুখ চলেছে।’

‘কার?’

‘আমার এক পরম আত্মীয়ের।’

দিদি অল্পক্ষণের জন্যেও কোথাও গেলে পিকলুর কাছে আমাকে পাহারা রেখে যায়। পিকলুর কোনো কিছু পেলেও ঠিক মানুষের মতো ডাকে, ‘ওমা! ওমা!’

দিদি অমনি দূর থেকে সাড়া দেবে, ‘যাই বাবা যাই।’ ছুটে আসবে পড়ি কি মরি করে। এসে বলবে, ‘কী পেয়েছে সোনা? বড়ো বাইরে? না ছোটো বাইরে।’ পিকলু ঠিক বুঝিয়ে দেবে। দিদিও ঠিক বুঝতে পারবে। পিকলু ছিল আমাদের ভাই। এখন, যেন আমাদের দাদু। দিদি মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে ঘুম পাড়াবে। গান গেয়ে শোনাবে, বলবে, ‘তুমি একটু ভালো হয়ে ওঠো, তোমাকে আবার বেড়াতে নিয়ে যাব ওই মাঠটায়। মাঠের পাশে একটা নতুন বাড়ি হয়েছে গো, সিংহদের। দেখবে, বাগানে কেমন ফুল ফুটেছে।’ বলতে বলতে দিদির চোখ দিয়ে জল গড়াবে ফোঁটা ফোঁটা। আমি পেছন থেকে দিদির চোখ মোছাব। দিদির বড়ো বড়ো চুল পিঠ ছাপিয়ে মেঝেতে লুটোচ্ছে। নীল ফিকে শাড়ি। সাদা ব্লাউজ। সোনার মতো গায়ের রং। মা দুর্গার মতো মুখ। আমার দিদি যেন জীবন্ত মা দুর্গা। আমাদের বাড়ির দুটো গর্ব, আমার দিদি আর পিকলু। পিকলুকে জড়িয়ে ধরে দিদির একটা রঙিন ছবি আছে। দেখলেই বলতে ইচ্ছে করবে সোনার কোলে সোনা। দিদির কাছে যতক্ষণ থাকি মনে হয় আমি স্বর্গে আছি। দিদি পিকলুকে গল্প বলতে বলতে কেন কাঁদে জানি, যা আশা দিচ্ছে, তা কোনো দিনই হবে না। পিকলু আর কোনো দিনই ভালো হবে না। পিকলু যাবেই, নদী যাবে জানিই আমি সাগরের পানে।

ডাক্তারবাবু এসে শেষ কথা বলে গেলেন একদিন, ‘এইভাবেই ফেলে রেখে কষ্ট দিয়ে কী হবে! ইউথেনেসিয়া করে দি।’

সবাই বললেন, ‘সে কী?’

‘একটা ইঞ্জেকশান করে দি। পিসফুলি চলে যাক, উইদিন ফাইভ মিনিটস।’ দিদি চিৎকার করে উঠল, ‘না। কক্ষনো না। তা আমি হতে দেব না। মানুষ হলে আপনি করতে পারতেন! আমি সেবা করব। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমি সেবা করব। ও যাবে আমার কোলে মাথা রেখে।’

ডাক্তারবাবু চলে গেলেন। পিকলু আধচোখে একবার দেখার চেষ্টা করল। পিকলুর কানেও বোধহয় কথাটা গিয়েছিল। সেই রাতে নামল প্রচন্ড বৃষ্টি। তখন রাত প্রায় দশটা। দিদি পিকলুকে খাওয়াল। আমাকে বললে, ‘মুখটা একটু উঁচু করে ধরতো ভাই।’ গ্লুকোজ মেশানো দুধ ফোঁটা ফোঁটা ড্রপারে করে মুখে দিতে লাগল। কিছু গেল, কিছু গেল না। ছোট্ট তোয়ালে দিয়ে মুখ মোছালো। আদর করে একটা চুমু খেল মুখে। ব্যান্ডেজটা পরিষ্কার করে বদলে দিল। একটু জল বিয়োগ করাল। বাইরে তখন অসীম ধারায় বৃষ্টি ঝরছে। দিদির একটা হাত পিকলুর পিঠে। আমি বসে আছি সামনে। পিকলু হঠাৎ মাথা তুলে, কী যেন দেখার চেষ্টা করতে লাগল। পারছে না। ঘাড়ে সে শক্তি নেই। তবু আপ্রাণ চেষ্টা! দিদি ঝুঁকে পড়ল, ‘কী খুঁজছ সোনা? এই তো আমি।’ শেষ চেষ্টায় সে টান টান করে মাথা তুলে দিদির মুখের দিকে একপলক তাকিয়ে করুণ গলায় বলল, ‘ও মা!’ পরক্ষণেই মাথাটা পড়ে গেল দিদির কোলে, পাথরের মতো হয়ে গেল দিদি। ওইভাবে কিছুক্ষণ থাকার পর দিদি চিৎকার করে উঠল, ‘ও মা পিকলু যে চলে গেল।’

সেই গভীর বৃষ্টি ঝরা রাতে আমাদের নীরব শোক মিছিল এগিয়ে চলল অদূর গঙ্গার দিকে। আমার দু-হাতের ওপর সাদা চাদর জড়ানো পিকলুর দেহ। ঝিপ ঝিপ অঝোর ধারার দিকে আমাদের লক্ষ নেই। খেয়ালই নেই। দিদি খুব চেষ্টা করছে কান্না চাপবার, পারছে না। এত রাতে পথঘাটে কারোর থাকার কথা নয়। নেইও কেউ। এই ঝড়ের রাত। ঘন কালো অন্ধকার।

গঙ্গা ভরে আছে। জোয়ার এসেছে। বৃষ্টির পর্দার আড়ালে পরপার হারিয়ে গেছে। জলের কিনারায় নেমে গেছি। বৃষ্টির পুটপাট শব্দ। বাবা বলছেন,

‘ধীরে, ঈশ্বরের নাম নিয়ে ফেলে দাও জলে।’

আমার হাত জলের দিকে নামছে। আমি বোকার মতোই প্রশ্ন করলুম ‘ফেলে দেব?’ দিদি আমার পেছনে। আমাকে ছুঁয়ে আছে। বাবা বললেন, ‘দাও বিসর্জন দাও। চেপে বৃষ্টি আসছে।’

আমার হাত থেকে জলের বুকে নেমে গেল পিকলু।

সেই ঘরে, সন্ধ্যায় আজও ধুপ জ্বলে সেই ছবিটার সামনে। দিদি আর পিকলু।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%