দ্বৈতা হাজরা গোস্বামী

ভীষণ শীত পড়েছে। আমার তো ঘুম ভাঙতেই চায় না। বাবাকে একবার সকালবেলা বলতে শুনলাম— “অপু কি উঠল? এই ছেলেটার জীবনে কিচ্ছু হবে না। ঘুমিয়ে ঘুমিয়েই ও নিজের ভবিষ্যত ঝরঝরে করে দিচ্ছে।”
আমি একবার বাবাকে ব্যাখ্যা করে বলতে গিয়েছিলাম যে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে প্যারালাল ইউনিভার্সে আমি অনেক কাজ করে থাকি। এইজন্যই মনে হয় ঘুম থেকে উঠেও আমার খুব ক্লান্ত লাগে।
এই প্যারালাল ইউনিভার্সের ব্যাপারটা বাবা বোধহয় বুঝতে পারেনি। এমন একটা কানমলা দিয়েছিল! বাবা সায়েন্স ফিকশন পড়ে না। একমাত্র মেজকাই আমার এইসব কথা বুঝতে পারে। আজ সেই মেজকার— “বাবাগো, মা গো” চিৎকারে দৌড়ে গিয়ে দেখি কফির কাপটা মেজকার মাথার ওপরে টুপির মতো শোভা পাচ্ছে। আর পুরো মাথা, মুখ, জামা ভেসে যাচ্ছে গরম কফিতে।
মেজকা “বাবাগো, মা গো জ্বলে গেল” চিৎকার করতেই আমাদের রোবোট মমারো আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠেছে।
আসলে হয়েছে কী মমারো এখন দিনে দশবার মেজকাকে কফি করে দিচ্ছে। ও বোধহয় জিজ্ঞেস করেছে— “কাপটা কোথায় রাখব?”
মেজকা বিরক্ত হয়ে বলে ফেলেছে— “আমার মাথায়!”
আর এই কাণ্ড!
মমারোর জায়গায় একটা কাকিমা থাকলে মেজকার এই অবস্থা হতো না। আমারও এই শীতকালে একটা ভালো ভোজের ব্যবস্থা আর বেশ কয়েকদিন পড়াশোনা থেকে ছুটি হয়ে যায়। কিন্তু মেজকা সেসবে মোটেই আগ্রহী নয়। প্যারালাল ইউনিভার্সে গিয়ে একবার অন্যরকম ভবিষ্যৎটা দেখে ফেলেছিল। তারপর এই অবস্থা।
মমারোর এদিকে ভুলভাল জায়গায় হাততালি দেওয়ার অভ্যেস বেড়েই চলেছে।
মেজকা বলে উঠল— “মমারো কে দিয়ে আর চলবে না। আরেকটু বুদ্ধিমান রোবট তৈরী করতে হবে।”
মেজকা সেইমতো তৈরী করল এক ভারী বুদ্ধিমান ঝাঁ চকচকে রোবট। তার নাম রাখলো বৃহস্পতি।
হা বললে সে হাওড়া না হাতি বুঝে ফেলে। সকালে উঠেই সেই শাস্ত্রীয় সঙ্গীত চর্চা করে, যোগব্যায়াম করে, এতো কঠিন সংস্কৃত ভাষা যাতে আমি বিয়াল্লিশ পেয়ে কোনোমতে পাশ করেছি সেটা আয়ত্ত করে ফেলেছে। দাদুকে সব শ্লোকের অর্থ ব্যাখ্যা করে শোনায়। নিমেষে কঠিন কঠিন অঙ্ক করে দেয়। দাবা খেলায় জেঠুকে হারিয়ে দেয়। বাড়িতে শুধু তারই জয়জয়কার।
এমনকী বৃহস্পতি আজকাল গল্প, কবিতাও লিখছে। নামকরা পত্রিকা ‘মিহিদানা’তে তার লেখা প্রকাশিতও হয়েছে যা আমার কখনো হয়নি।
তাই নিয়ে মেজকার কী আহ্লাদ কী বলবো! আমাকে বলছে— “দ্যাখ অপু বৃহস্পতি যে এমন লিখতে পারবে আমি স্বপ্নেও ভাবিনি। এই যে কল্পনা করে নতুন সৃষ্টি করা এটাই তো সবথেকে উচ্চমানের মেধার পরিচয়।”
এই শুনে মমারো আবার মূর্খের মতো হাততালি দিল।
আমি চোখ উল্টে বললাম— “বৃহস্পতি যেটা লিখেছে সেটা একেবারে আজগুবি। বাস্তবে ওরকম হয় নাকি? উন্মাদের মতো যা খুশি তাই লিখলেই হলো।”
বলেই দেখলাম পর্দার আড়ালে কে যেন সরে গেল। সন্ধ্যেবেলায় বাড়ির সবাই দল বেঁধে একটা বাংলা থ্রিলার সিনেমা দেখতে গেল।
সিনেমার নাম “ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি।”
এই রকম একটা অদ্ভুত বিচ্ছিরি নাম শুনে আমি আর যাইনি।
মেজকার ঘরে বসে টিনটিন পড়ছিলাম। হঠাৎ দেখি লাইট অফ হয়ে গেল। লোডশেডিং তো এখন চট করে হয়না। দেখি বৃহস্পতি এসে হাজির। ওর চোখের আলো দুটো জ্বলছে।
ও বলছে— “অন্ধকার ঘরে তোমরা ইঁদুরের মতো দৌড়োবে কিন্তু একজনকেও ছাড়বো না।”
এই কথাগুলো খুব চেনা চেনা ঠেকছে। কোথায় একটা পড়েছি যেন।
হ্যাঁ মনে পড়েছে বৃহস্পতির নতুন গল্প — “নিশির নিশাচর” এ তো এই সংলাপটাই ছিল। এটা ওর গল্পে পাগল খুনীর সংলাপ ছিল।
— “কে ওটা বৃহস্পতি? এসব কী হচ্ছে হ্যাঁ?” মেজকা বলে উঠল।
“আলোগুলো বন্ধ হলো কেন?”
— “আমি বন্ধ করেছি।” বলে বৃহস্পতি ‘ঠঙ ঠঙ খ্যান খ্যান’ করে হাসল।
“এবার তোমাদের নিস্তার নেই।
আমার গল্প আজগুবি বলা, এইবার তবে টিপে ধরি গলা!”
এইসব আতঙ্কের ছড়াও কাটছে বৃহস্পতি। বেশ বুঝতে পারলাম কল্পনা করে করে কল্পনা বাস্তবের খেই হারিয়ে ফেলেছে।
ঘরে ঢুকতেই ও বন্ধ করে ফেলল দরজাটা।
বাড়িতে কেউ নেই যে ডাকবো।
দিব্যি বুঝতে পারছি বৃহস্পতি আমাদের দিকে আস্তে আস্তে এগিয়ে আসছে।
ওর হাত দুটো সাঁড়াশির মতো আমার গলাটা চেপে ধরতেই মেজকা এদিকে এগিয়ে এল। কিন্তু ওর গায়ে আসুরিক জোর এক ঝটকায় মেজকাকে ছিটকে ফেলে দিল।
এর মধ্যে কী ঘটল জানিনা, হঠাৎ বৃহস্পতি আমার গলা ছেড়ে দিয়ে দুম করে উল্টে পড়ল।
অমনি ঘরের আলো জ্বলে উঠল। দেখলাম মমারো আনন্দে হাততালি দিচ্ছে।
মেজকা ওর কানে কানে বলেছিল— “বৃহস্পতির মাথায় মশা।”
আসলে তো মমারো মশা মারা রোবট সেই উদ্দেশ্যেই ও তৈরী হয়েছিল তাই এক চাঁটিতে বৃহস্পতির মাথার মেইন সুইচ অফ করে ওকে মামারবাড়ি দেখিয়ে দিয়েছে।
মেজকা এগিয়ে এসে মমারোর কাঁধ চাপড়ে বলল— “সাবাশ মমারো”
ততক্ষণে বাড়ির সবাই ফিরে এসেছে সিনেমা দেখে।
জেঠু জিজ্ঞেস করল— “হ্যাঁ রে মেইন সুইচ কে অফ করেছিল?”
মেজকা সবাইকে বোঝালো কিভাবে বৃহস্পতি আমাদের খুন করার পরিকল্পনা করেছিল। তাই শুনে তো সবার মাথায় হাত।
জেঠিমা বলল— “ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি সিনেমাটাও যে কী ভয়ঙ্কর।”
দাদু বলল— “খুবই ইন্টারেস্টিং সিনেমা কিন্তু শেষটা একেবারে জলের মতো পরিষ্কার। খুনগুলো করছিল একজন মা প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য। শেষে ভিলেন কেঁদে ক্ষমা চেয়ে বেঁচে গেল।
মেজকা আমার দিকে তাকিয়ে বলল— “নারে অপু মমারো কে দোষ দেওয়া যায়না।”
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন