দ্বৈতা হাজরা গোস্বামী

আজ রোববার কে বাজারে যাবে এই নিয়ে চলছে জোর তরজা। বাড়ির ইয়ং মেম্বার বলতে আমি, বুঁচকি আর হাড়জ্বালানো ছোড়দা। ছোড়দা কখন ঘুম থেকে ওঠে, কখন ঘুমোয় কেউ জানেনা। শুধু খাবার সময় টেবিলে এসে ব্যাজার মুখে বলে— “আবার পটল, আবার ভেন্ডি, আবার মুলো। নিশ্চয়ই অপু বাজার করেছে।”
বাজার পাড়ায় বাড়ি, কাজের মধ্যে কাজ, আমি বাজারটাই ভালো করি। সেটাকেও খারাপ বলতে হবে।
আমি রেগে গিয়ে বলি— “আমি বাজারটা ভালোই করি।”
— “ওই তো বাজার করিস। সেদিন ব্যালকনি থেকে দেখলাম। দু কিলো আলু, দু কিলো পেঁয়াজ, দুটো ফুলকপি কিনলি। জিজ্ঞেস করলি, সব মিলিয়ে কত দাম হবে গো?
যা বলল, খসখস করে কড়কড়ে নোট দিয়ে দিলি। কোনো দাম দর করা নেই, কিচ্ছু নেই।”
— “ওদের কাছে কী দাম দর করব? ওরা গরীব লোক।”
— “হো হো হো হো” করে হাড়জ্বালানো ছোড়দা পিত্তি জ্বালিয়ে হাসল।
— “গরীব লোক নাকি! মোটা বাবলু, ট্যারা বিপিন, তোতলা তপু ওরা গরীব লোক! চোর বাটপার সব। তোকে মুরগী করেছে।”
— “কী বললে?” আমি তড়াক করে লাফিয়ে উঠলাম।
— “রোজরোজই করে, তুই কিচ্ছুটি বুঝতে পারিস না।”
মা দেখি ছোড়দার পক্ষ নিল— “ঠিকই তো বলেছে। জিনিসপত্রের যা আকাশ ছোঁয়া দাম! এরা তো অপুকে বোকা পেয়ে লুটে নিচ্ছে!”
— “বোকা নয়, সরল। অপুটা খুব সরল সোজা।” জেঠিমা বলল।
মেজকা তখন ওপর থেকে নামছিল, গম্ভীর গলায় বলল— “সরল তো অপু কিছুই পারে না। এই জীবনে কত ঘোড়া পিটিয়ে গাধা থুড়ি গাধা পিটিয়ে ঘোড়া করলাম। অপুকে কিছুতেই পারা যাচ্ছে না।”
— “অঙ্ক, অঙ্ক হলো গিয়ে জীবনের মূল। ছোড়দা আবার একটা মনের মতো বিষয় পেয়েছে। কবিতা লিখে কি আর জীবনে উন্নতি করা যায়? কবিতা তো আমিও লিখতাম একটা সময় কিন্তু সেসব সায়েন্টিফিক কবিতা অপু লিখতে পারবে না।”
প্রথম লাইনে চার অক্ষর দ্বিতীয় লাইনে আট। এভাবে বাড়তেই থাকবে। যাইহোক মোদ্দা কথা হলো যে অঙ্কে কাঁচা সে বাজারেও কাঁচা।”
আমি এর তীব্র প্রতিবাদ করলাম— “এ হতেই পারে না!”
কিন্তু আমার পক্ষে কেউই প্রতিবাদে গর্জে উঠল না। খুব অভিমান হলো। যাদের জন্য রোজ রোজ বাজার করি তারাই কিনা এইরকম। এমনিতে তো আমাকে ছাড়া চলে না। এই অপু টুক করে দাশুর দোকান থেকে পান সেজে নিয়ে আয় তো! এই অপু টপ করে ঠাকুরের নকুলদানা, আর সলতে, ঝপ করে ঝাঁপ মেরে ডাব নিয়ে যায়। ডাব-চিংড়ি হবে। ব্যথার মলম নিয়ে আয়, পরীক্ষার কলম নিয়ে আয়। টুপ্ করে যাবি টপ করে নিয়ে আসবি। আমার যেন দুটো ডানা আছে!
বেশ হয়ে যাক কম্পিটিশন কে কত ভালো বাজার করতে পারে তার।
ছোড়দা বলল— “হয়ে যাক!”
এক রবিবার আমি, আরেক রবিবার ছোড়দা।
বাজারে বেশি সেজেগুজে ভালো জামাকাপড় পরে গেলেই এরা আমাকে বড়লোক ভাববে। সে হতে দেওয়া চলবে না।
একটু কালিঝুলি মাখা পুরোনো জামা কাপড়, উস্কোখুস্কো চুল নিয়ে, মুখে একটু বুট পালিশের কালি মেখে ঢুকলাম। আমি যে সেই ছেলে যে চোখ বন্ধ করে হাসিমুখে টাকা এগিয়ে দিই সেটা জানতে পারলে তো আসল উদ্দেশ্যই সিদ্ধ হবে না।
ঢুকতেই টের পেলাম লোকে সরে গিয়ে রাস্তা করে দিচ্ছে। কেউ কেউ আবার নাক চাপা দিচ্ছে। ন্যাকামির অন্ত নেই। নাহয় দুদিন চান করিনি। ছোড়দা তো কতদিনই করে না। মেজকা তো মানুষের গায়ের ন্যাচারাল গন্ধ এক্সপেরিমেন্ট করার সময় এক মাস চান করেনি।
এখন ভীড় বেশ কম। সস্তায় সব্জি কিনবো বলে দেরিতে ঢুকেছি। ভাবলাম সব থেকে সস্তা সব্জি কী হতে পারে। শাক পাতা দিয়ে শুরু করা যাক।
— “এক আঁটি কত?”
বৌটা নাকে আঁচল চাপা দিয়ে বলল, “দশ টাকা।”
— “দশ, বলো কী? শাক বিক্রি করছ না সোনা? পাঁচ টাকার বেশি আমি দেবই না। পাঁচ টাকা রাখো।”
পাঁচটাকার কয়েনটা যেই রেখে শাকের আঁটিটা তুলেছি। ছোঁ মেরে শাঁকচুন্নির মতো শাকটা ছিনিয়ে নিয়ে মুখ ঝামটা দিয়ে বলল— “যাও তো বাপু, যাও। হবে না।”
এরপরে গেলাম ফুলকপি কিনতে। ফুলকপির কী দাম রে বাবা! একেকটার দাম চল্লিশ টাকা। এতদিন ভেবে দেখিনি।
বললাম— “ফুলকপি দিচ্ছো না ফুলের তোড়া! এত দাম!”
তাতে লোকটা মুখ বেঁকিয়ে বলল— “এই ফুলকপি তোমার দাঁতের থেকেও সাদা। তোমার দাঁতে পোকা থাকতে পারে, আমার ফুলকপিতে একটাও নেই।”
মাথাটা গরম হয়ে গেল, নেহাত আমি রোজ গরমজলে হলুদ দিয়ে গার্গেল করি মায়ের আদেশে তাই দাঁতের রংটা হলুদ হয়ে গেছে। আর দু'পাশে খান চারেক দাঁত খেয়েছে পোকায়। দাঁত নিয়ে কিছু বললেই আমার মাথাটা গরম হয়ে যায়।
না এদের সঙ্গে ঝগড়া না করে উপায় নেই। এদিকে আমি ভদ্র সন্তান, খারাপ ভাষা আমার মুখে জোগায় না।
বললাম— “আপনি একটি আস্ত ফুল আর মস্ত কপি!”
ভেবেছিলাম ইংরেজী, সংস্কৃত মিশিয়ে বললে বুঝবে না। চোখমুখ লাল করে দাঁত কিড়মিড় করে বলল— “তুমি বদ ছোকরা! একটি উন্মার্গগামী শাখামৃগ।”
জাতীয় শিক্ষার এই উন্নতি আমাকে স্তম্ভিত করল। তারপর খেয়াল হলো, এ সংস্কৃত স্যারের বাড়িতে সব্জি দিতে যায়। আর কথা বাড়ালাম না।
অগত্যা আলু কিনতে এগোলাম।
— “আলু পঁচিশ টাকা! মগের মুলুক নাকি। পনেরোর বেশি দেব না। এই বলে দিলাম।”
— “পনেরো টাকায় আলুর চোকা হবে, বুঝলে ছোকরা!” লোকটা বলল।
— “গরীব মানুষকে তো তোমরা লুটে নেবে দেখছি, ডাকাত, বাটপার।” বলে যাবার উপক্রম করছি।
পটলওয়ালা বলল— “আমাদের পাড়ায় একে আগে দেখিনি। কেমন চোর-চোর মুখখানা।”
আলুওয়ালা ভালো করে দেখে বলল— “চোর মানে, ছিঁচকে চোর। এখান থেকে সস্তায় কিনে নতুন বাজারে বেচে দেবে। আর গায়ের গন্ধটা তো চেনা চেনা লাগছেই।”
পটলওয়ালা ভালো করে নাক উঁচিয়ে শুঁকে বলল— “হ্যাঁ চিত্তচোর তেলের গন্ধ। বেশিরভাগ চোর হাত ফসকে পালানোর জন্য এই তেলটাই তো মাখে।”
— “এই ভাইসব এদিকে এসো।” ধীরে ধীরে ভিড় জমে গেল। ফুলকপি ওয়ালা, মাছওয়ালা, চায়ের দোকানী।
হাটুয়ারী মার কাকে বলে তোমরা জানো? হাটের লোকেরা একজোট হয়ে যখন কাউকে মারতে শুরু করে তখন রাস্তা দিয়ে চলে যাওয়া আলপটকা লোকও এসে চড় থাপ্পড় দিয়ে একটু হাতের সুখ করে যায়।
একজন মানিব্যাগটা কেড়ে নিয়ে বলল— “এ তো বেশ দামী। চুরির মাল মনে হচ্ছে।”
হঠাৎ দেখি সবাই সরে যাচ্ছে। বাজার লণ্ডভণ্ড করতে কোত্থেকে একটা পাষণ্ড ষণ্ড এসে জুটেছে। সবাই নিজের নিজের সব্জি বাঁচাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। এই সুযোগে আমি চম্পট দিলাম।
একেবারে সর্বস্বান্ত হয়ে যখন ঘরে ঢুকলাম ছোড়দা দেখি গরম গরম আলুর পরোটা খাচ্ছে।
আমাকে দেখে বলল— “ইসস! এমন অবস্থা কী করে হলো?”
মেজকা আমার কাছে এগিয়ে এসে মাথার কাছে নাক ঠেকিয়ে শুঁকে বলল— “এ তো চিত্তচোর তেলের গন্ধ, আমার আবিষ্কার। ফর্মুলাটা ব্যাকফায়ার করার পর এখন শুধু চোরেরাই এই তেল মাখে। তুই কোথায় পেলি?”
কাল ছোড়দার কাছে যে হেয়ার জেল চেয়েছিলাম সেটা তবে কী? বুঝতে আর বাকি রইল না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন