দ্বৈতা হাজরা গোস্বামী

“ভ্রমণবিলাসী বাসে ১৪ দিন ভ্রমণ" “বলিস কী অপু!”
কাগজটা দেখেই জেঠিমার চোখ কপালে উঠল। কাকিমা রেগে ফুঁসতে শুরু করল। আজ এই বাড়িতে একটা হুলুস্থুল কাণ্ড শুরু হবেই হবে। মানে দিনটা বোরিং কাটবে না আমার।
আসলে এই বাড়ির লোকেরা কোথাও কখনো ঘুরতে যায় না। ঘুরতে যাওয়া মানেই শরীরের কষ্ট, টাকাও নষ্ট। আর এই নিয়ে কিছু কথা বললেই বাবা, জেঠু, ছোটকা সবাই একই উত্তর দেয়— “আমাদের বংশে কেউ কোনোদিন ঘুরতে যায়নি, যাবেও না।”
এই তো নভেম্বর মাসে আমার বন্ধুরা দার্জিলিং ঘুরে এল। আমাকে কেউ যেতেই দিল না। যাওয়ার কথা বলতেই জেঠু বলল — “বলিস কী অপু! এই ঠাণ্ডায় দার্জিলিং, ভাবলেই তো আমার শিরদাঁড়া কনকন করছে।”
আমি বললাম— “ধুর তুমি কিছু জানো না, নভেম্বর মাসে আকাশ পরিষ্কার থাকে। ঝকঝকে নীল থাকে। কেমন সুন্দর কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়। টাইগার হিল দেখা যায়।”
জেঠু গম্ভীর হয়ে বলল, “টাইগার হিলের ছবি আমি এখানে বিছানায় বসেই, চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতেই দেখতে পারি। তার জন্য অতদূর পাহাড় ঠেঙিয়ে যাওয়ার দরকার কী?”
তারপর শুরু হলো সেই চিরপরিচিত বাণী— “আমাদের বংশে কেউ কোনোদিন…”
দূর দূর! জীবনটা একেবারে পটলের তরকারি, ঝিঙের ঝোল হয়ে গেল।
তাই আজ হঠাৎ পুরোনো ফাইল ঘেঁটে এই কাগজটা পেয়েছি। ঠাকুরদা আর ঠাকুমা একবার অনেক দিনের জন্য ছয় ছেলেমেয়েকে রেখে হাওয়া হয়ে গিয়েছিল। কোথায় গিয়েছিল এই তার প্রমাণ।
গয়া, রাজগীর, কাশী থেকে আগ্রা কিছু বাদ রাখেনি। তাও তখনকার দিনে ৪৫১ টাকা বাসভাড়া দিয়ে।
জেঠু বাড়ি ফিরতেই জেঠিমা কাগজটা দেখাল। তারপর মুখ বেঁকিয়ে বলল— “দ্যাখো, দ্যাখো। বলছে যে তোমাদের বংশে কেউ কোনোদিন কোথাও ঘুরতে যায়নি। এবার? মুখে কোনো কথা নেই কেন?”
জেঠু গম্ভীর হয়ে কাগজটা পড়ল খানিকক্ষণ। তারপর হনহন করে হেঁটে চলে গেল ঠাকুমার ঘরে। ঠাকুমা তখন সবে চান করে গীতা খুলে বসেছিল। জেঠু কাগজটা দেখিয়ে বলল— “মা, এটা কী? তোমরা এটা করতে পারলে? ছোটকু, বুলান, বাবান কত ছোটো ছোটো তখন। আমার কোলে ওদের দিয়ে তুমি আর বাবা ড্যাং ড্যাং করে ঘুরতে চলে গেলে।
ঠাকুমা বাঁধানো দাঁতের পাটিটা পরে নিয়ে বললো— “তা কী করবো? সারাজীবন সংসার সামলাব নাকি? তোদের মতো কোথাও যাব না। তোর বাবা চুপিচুপি বলল বাড়িতে কাউকে জানানোর দরকার নেই। শুধু তুমি আর আমি। খুব মজা হবে।
তখন তো একান্নবর্তী পরিবার তোদের সবাইকে রেখে গেলাম। বড়ো মা, মেজো মা, ছোটো মা-র দায়িত্বে।
জেঠুর চোখ দেখি ছলছল করছে। আমি পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলাম। বললাম — “জেঠু উত্তর ভারত না হয় হয়নি। এখনো তো পূর্ব ভারত, পশ্চিম ভারত, দক্ষিণ ভারত আছেই।”
জেঠু খুব গভীর চিন্তা করতে করতে লাইব্রেরিতে চলে গেল।
ফেরার পথে দেখলাম ভ্রমণের অনেকগুলো ম্যাগাজিন নিয়ে এসেছে। সারাদিন পড়েই যাচ্ছে। মাঝে মাঝে খেতে খেতে বলে উঠছে — “নৈনিতাল, নেদারল্যান্ড.. না না হনোলুলু।”
ঘুমের ঘোরে উজবুক উজবুক বলে চিৎকার করছিল। ঠেলা দিতেই বলল— “উজবেকিস্তান।”
আমি আনন্দের চোটে আমাজন থেকে দুটো নতুন জামা, জুতো অর্ডার দিয়ে দিলাম।
জেঠু সায়েন্টিস্ট মেজকার কাছে বসে রাতদিন খোঁজ নিচ্ছে কোন জায়গার কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ। কোথায় উটপাখির ডিম পাওয়া যায়, কোথায় বাঘের দুধ মিলবে, আমাজনের জঙ্গলে কী কী বিরল প্রজাতির জীব জন্তু আছে। মিশরের মমিদের মামাবাড়ি কোথায়।
ছোটকার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করছে কোথায় কী ভালো খাবার পাওয়া যায়। কারণ খাবারের খবর ছোটকা ছাড়া কেউ রাখে না। ছোটকা জন্ম পেটুক।
বাবার কাছে জিজ্ঞেস করল বেড়াতে গিয়ে কী কী রকমের শরীর খারাপ হতে পারে। তার কী কী ওষুধ আছে যার কোনো সাইড এফেক্ট নেই।
কারণ হাড়জ্বালানো ছোড়দা ইতিমধ্যেই হাজার রকম সিকনেসের লিস্ট শুনিয়ে দিয়েছে জেঠুকে।
তারপর হঠাৎ একদিন জেঠু সাত সকালে ঘুম থেকে উঠে আমার ঘুম ভাঙিয়ে বলল— “চল অপু আজকেই যাবো।”
আমি বললাম— “কোথায়?”
জেঠু মুচকি হেসে বলল— “সারপ্রাইজ!”
— “আর কাউকে সঙ্গে নেবে না?”
— “না শুধু আমি আর তুই। তোর জেঠিমাকে বললাম তো তার বিশ্বাসই হলো না।”
আমি তো ব্যাগপত্র গুছিয়ে নতুন জামা পরে সেজেগুজে এলাম। সঙ্গে একটা সত্যজিৎ সমগ্র, হাঁদাভোঁদা, নতুন ক্যামেরা।
তারপর গাড়ি ধরে জেঠুর সঙ্গে সোজা স্টেশন। একটা করে দূরপাল্লার ট্রেন আসে আর আমি আনন্দে লাফিয়ে উঠি।
আধ ঘন্টা দাঁড়িয়ে থেকে জেঠুর কী জানি কী মনে হলো। আমার দিকে তাকিয়ে বলল— “না রে মনটা কেমন দুঃখ দুঃখ লাগছে। ঘুঘুডাঙা ছেড়ে যাবো? পটলার চা, হাবুলের দোকানের চপ, আদির দোকানের সিঙাড়া। নাঃ যাওয়া ক্যান্সেল।”
আমি তো প্রায় কেঁদেই ফেলছিলাম। কিন্তু সিঙাড়া, সরপুরিয়া, ল্যাংচা পেটে পড়ায় আর কাঁদতে পারলাম না।
বাড়ি ফিরতেই হাড়জ্বালানো ছোড়দা বলল— “এত সেজেগুজে কোথায় গেছিলি অপু? শিমুলতলা? বেলতলা?”
ঠাকুমা ওঘর থেকে উঁকি মেরে বলল— “হালিশহর নাকি?”
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন