এলার্জি

দ্বৈতা হাজরা গোস্বামী

Logo

ঠাকুমার সঙ্গে জন্তু জানোয়ারদের খুব একটা বনে না। জন্তু জানোয়ার মানে আমি গরু, ছাগল, কুকুর বেড়াল এর কথা বলছি। গরু এমনিতে বেশ নিরীহ প্রাণী। কিন্তু আমাকে আর ঠাকমাকে দেখলেই কেন জানি ক্ষেপে যায়। এই তো গত মাসেরই ঘটনা। গঙ্গার ঘাট থেকে ফিরছি আমি আর ঠাকুমা । সে এক গরু আমাদের দেখে এমন তাড়া করল, আমি, ঠাকুমা তো গিয়ে লুকিয়ে পড়েছি একটা বাড়ির গেটের ভেতর একটু আড়ালে। এমন বদ এঁড়ে গরু যে সেখানে দাঁড়িয়েই অপেক্ষা করছিল। আমরা ভাবলাম গরুর মন বুঝি আনমনা হয়ে এদিক সেদিক ঘুরতে গেছে। বাঁধাকপির পাতা বা কচি ঘাস দেখে সে আমাদের কথা ভুলে গেছে। কিন্তু যেই না বাড়িটা থেকে বেরিয়েছি অমনি সে ল্যাজ তুলে তেড়েছে।

আর কী ভয়ানক দুটো শিং একেবারে যমরাজের মুকুটে লাগানো শিং-এর মতো দেখতে।

তারপর সে আমাদের বাড়ি পর্যন্ত দৌড় করিয়ে ছাড়ল।

তা হঠাৎ এইসব কথা কেন? সকাল থেকে বসে একটা লিস্ট করছিলাম কার কীসে এলার্জি। আসলে স্যার দশটা অঙ্ক দিয়েছিল। একদম ইচ্ছে করছে না সেগুলো কষতে তাই এইসব কাজ।

আচ্ছা মা কে দিয়ে শুরু করা যাক।

মায়ের এলার্জি নোংরা অগোছালো ঘরদোরে। যেটা আমি প্রায়ই করে থাকি। বাবার এলার্জি ঘরে চুপচাপ বসে থাকায়। কিছু না করতে পারলে রিমোট টিপে টিপে টিভিটার বারোটা বাজাবে। জেঠুর এলার্জি বাইরে ঘুরতে যাওয়ায় সে কথা তোমাদের আগেই বলেছি।

মেজকার এলার্জি ভগবানে। যে যেখানেই ভগবানের নাম করুক মেজকা তাকে বুঝিয়ে দেবে ভগবান বলে কিছু নেই, হতে পারেনা। একটা লোক তিনটে চারটে মুণ্ডু, আঠেরোটা হাত নিয়ে এলিয়েন হতে পারে। ভগবান নয়। তবে ভগবানে বিশ্বাস না করলেও বিজ্ঞানী মেজকা ভূতের গল্প দারুণ ভালোবাসে। ভূতের যাবতীয় সিনেমা আমি আর মেজকা রাত জেগে বসে দেখে ফেলেছি।

হাড়জ্বালানো ছোড়দার কোনো কিছুতেই এলার্জি নেই। দশটা কাঁচালঙ্কা কচমচ করে চিবিয়ে খেয়ে নেবে। যে কোনো প্রাণীকে ঢিল ছুঁড়ে বিরক্ত করে তাড়াবে। হনুমানের সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে চড় থাপ্পড়ও খেয়েছে। কিন্তু একটা জিনিসে তার খুব বিরক্তি তা হলো এই ভূতের কথায়।

ভূতে ভয় পাওয়ার কথা ছোড়দা কোনোমতেই মুখ ফুটে স্বীকার করে না। শুধু বলে এইসব আজগুবি কথায় নাকি তার ভীষণ বিরক্ত লাগে। এই ভাবেই আমার কোনো ভূতের গল্প আজ অবধি ছোড়দা শেষ করতে দেয়নি। সেবারে গিয়েছিলাম লোলেগাঁও বেড়াতে। কটেজের মধ্যে বসে আছি আমি আর ছোড়দা। বাকিরা বাইরে হাঁটতে গিয়েছে। আমি চায়ে চুমুক দিয়ে পকৌড়ায় একটা কামড় দিয়ে শুধু বলেছি— “আচ্ছা এই জায়গাটা দারুণ তাই না। এই যে সন্ধ্যের অন্ধকার চারপাশের গাছপালার মধ্যে দিয়ে কালির মতো গলে গলে গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছে। ঝিঁঝিঁর একটানা ডাক এইরকম একটা জায়গাকে নিয়ে ভূতের গল্প লিখলে কেমন হয়?

“লোলেগাঁও এর জঙ্গলে— গল্পের নাম।" আমি চোখমুখে একটা ভয়াল রহস্য এনে বললাম—

ছোড়দা তাই শুনে এতটাই রেগে গেল যে ধরে পিটিয়ে দিল।

তারপর সেবার নৌকো করে গদাইপুর যাচ্ছি ঠাকুর দেখতে। মাঝির গলার আওয়াজটা যেন কেমন। শুনলে বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। এই অঞ্চলে অনেকেই ভূতুড়ে মাঝিদের কবলে পড়ে প্রাণ হারিয়েছে সেটা সবাই জানে। তাদের নৌকো আর ফিরে আসেনি।

ছোড়দাকে বললাম— “মাঝির মুখটা কিন্তু একবারও দেখা যায়নি। চাদরের ঘোমটা দিয়ে পুরোটা ঢাকা। অন্ধকারে ওর চোখ দুটো লক্ষ্য করেছো?”

— “অপু, আবার শুরু করেছিস!”

ছোড়দা মাথায় এমন একটা গাঁট্টা দিলো, সে ব্যথার কথা এখনো মনে আছে।

এই আজ সন্ধ্যেয় অঙ্ক স্যার আসবে আমাকে আর ছোড়দাকে অঙ্ক করাতে। স্যার গল্প বলতে খুব ভালোবাসেন। একটু উস্কে দিলেই হবে। মনে মনে ছক কষলাম। সুদকষার দশটা অঙ্ক এখনো করা হয়নি। এই প্ল্যানটা মন্দ নয়।

সন্ধ্যেবেলা ব্রজ স্যার এসে বসতেই আমি বলে ফেললাম কথাটা।

স্যারই সুযোগটা দিলেন। এসেই বললেন— “বেরিয়েছিলাম ভদ্রলোকের মতো ভীড় বাসে, রোদে বৃষ্টিতে একেবারে ভূতের মতো চেহারা হয়ে গেল, আমি সোৎসাহে বলে উঠলাম— “স্যার আপনার কী মনে হয়? ভূত কি সত্যিই আছে? মানে আপনি দেখেছেন কখনো?”

ছোড়দা কটমট করে তাকাল আমার দিকে। আমি সেদিকে পাত্তা দিলাম না এক্কেবারে।

স্যার একটু ভ্রু কুঁচকে বললেন— “সে একটা অন্যরকম অভিজ্ঞতা হয়েছিল আমার।”

— “অন্যরকম মানে অলৌকিক কিছু? বাঁকুড়ার গ্রামগুলো তো ভূতেদের আস্তানা!” বলে আমি আড়চোখে ছোড়দার দিকে দেখলাম।

— “তখন আমি বাঁকুড়ায় একটা কলেজে পড়ছি টুকটাক ছাত্র টিউশনি পড়াই।”

— “তা একটা বাড়িতে পড়াতে যেতাম শেকমপুরের দিকে। অনেকটা সাইকেল চালিয়ে যেতে হতো। যেতেও হতো একটা শুনশান এলাকার মধ্যে দিয়ে। পাশেই শ্মশান। আর শেয়ালের ডাক শুনতে পেতাম দূর থেকে।”

— “গ্রামের শ্মশানগুলো খুব ভয়ঙ্কর হয় তাই না স্যার? তা আপনার ভয় করতো না?”

— “ভয় যে করতো না, তা নয়। কিন্তু ভয় কে ছাপিয়ে খুব খিদে পেয়ে যেত।”

যে বাড়িতে পড়াতে যেতাম তারা রোজ দুধ চিনি ছাড়া এক কাপ পানসে চা আর দুটো ন্যাপথলিনের গন্ধে চোবানো ব্রিটানিয়া বিস্কুট দিত। বিস্কুটে ওই ন্যাপথলিনের গন্ধটা পেলেই আমার গা গুলিয়ে উঠত।

তা দুদিন বাদেই বারণ করলাম যে থাক আর চা দিতে হবে না। ওরা যে খুব গরীব ছিল সেটা নয়। ওদের বিশাল ব্যবসা ছিল কাঠের। একমাত্র ছেলে। আদরে একেবারে বাঁদর যাকে বলে।

যেদিন প্রথম গেলাম ছেলের ঠাকুমা আমাকে বলল— “দেখো বাপু আমার শান্তুর গায়ে যেন হাত না পড়ে। একবারও যদি শুনি ওকে মারধোর করেছো তোমার কিন্তু মুণ্ডু থাকবে না।”

যে ছেলেটাকে পড়াতে যেতাম সে ছিল একেবারে গবেট আর বিশ্ব বখাটে। যা পড়া দিতাম রোজ বলত— “পড়া হয়নি স্যার!”

যে অঙ্ক কষতে দিতাম রোজ বলত— “অঙ্কটা হয়নি স্যার।”

তারপর ঠিক ঘড়ি ধরে যেই আটটা বাজত। অমনি ফাজিলের মতো মুখ করে বলত— “আটটা তো বেজে গেছে, এবার কাটুন।”

এমনিতে আমার রাগ খুব একটা হয়না। কিন্তু সেদিন দুম করে গেল মাথাটা গরম হয়ে। একটা জায়গায় মুষ্টিযুদ্ধ শিখতাম। সেখানে একটা বিশেষ চড় দেওয়ার ট্রেনিং পেয়েছিলাম। একটা চড় বাগিয়ে দেখি ছেলেটা জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেছে।

— “তারপর কী হলো স্যার? ছেলেটা কি বেঁচে ছিল?”

— “মিনিট পাঁচেক ছেলেটার জ্ঞান ছিল না। তারপর থেকেই ছেলেটা সিধে হয়ে গেল। ওর বুদ্ধি খুলে গেল। রোজ অঙ্ক করে জমা দিত। কোনো অজুহাত দিত না।”

তারপর থেকে বখাটে গবেট ছেলেদের দেখলেই আমার হাত সুড়সুড় করে ওই স্পেশাল থাপ্পড় মারার জন্য।

কই? সুদকষার অঙ্কগুলো কই?”

বলে স্যার এমন একটা ভয়ঙ্কর মূর্তি ধরলেন তারপরে।

এই প্রথম দেখলাম ছোড়দা আমার জীবনের বাস্তব হরর স্টোরিটা খুব উপভোগ করল। একেবারে শেষ অব্দি না দেখে ছাড়ল না।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%