দ্বৈতা হাজরা গোস্বামী

ছাগলটাকে একদিন প্রশ্ন করলাম— “আচ্ছা এই যে এতো দার্শনিকতা, এ তোমার মধ্যে কী করে এল?”
— “এলো মানে ? এ তো ছিলই।” ছাগলটা প্রসন্ন চিত্তে বলল। পূর্বজন্মের সংস্কারও বলতে পারো। কিন্তু জাবর কাটার মতো ঠেলে জাগিয়ে তোলার জন্য সাধুসঙ্গ করেছিলাম একবার।”
— “সাধুসঙ্গ? সে কীরকম?”
— “শোনো, ইছাপুর স্টেশনে দাঁড়িয়ে মিছা কথা আমি বলিনা। অ জ মানে আমার আর নতুন করে জন্ম হবে না। অজস্র জন্মের পর এই অজ জন্ম আসে। সব জন্মের অভিজ্ঞতা আমার মাথায় গিজগিজ করছে। তা আমি এই স্টেশনেই দাঁড়িয়ে প্রতিদিনের মতোই কলার খোসা, বাদামের খোলা, ঘাসপাতা খাচ্ছিলাম। খাওয়ার সময় জানোই তো আমি চোখ বন্ধই রাখি। তা হঠাৎ করে এক সাধুর দাড়ি চিবিয়ে খেয়ে ফেলাম কয়েক আঙুল।”
— “সে কী! তারপর নিশ্চয়ই অভিশাপ টভিশাপ দিলেন।”
— “একেবারেই না। আসলে হয়েছিল কী, রেল লাইনে সাধুর দাড়ি আটকে গেছিল।”
— “যাহ! এ আবার হয় নাকি? এত লম্বা দাড়ি।”
— “এরম কল্লে আর বলব না। তোমার বড়মামার জুতো যদি আট আঙুল লম্বা হতে পারে...।”
আমি থামিয়ে দিয়ে বললাম— “হ্যাঁ হ্যাঁ তার পর কী হলো?”
— “তারপর তো সাধু বাবা খুব খুশি হয়ে আমায় বগলদাবা করলেন। তখন তো আমি শিশু!”
— “গন্ধরহস্য!” আমি চোখ উপরে তুলে বললাম।
— “কিছু বললে?”
— “না না বললাম রহস্যের গন্ধ পাচ্ছি।”
তারপর তো সাধু আমাকে নিয়ে কোথায় কোথায় না ঘুরলেন। কত দেশ দেখলাম। আটলা থেকে বাড়ালা। কায়দাপুর থেকে ফায়দাপুর। তারাপীঠে তন্ত্র সাধনা।
সাধনা করলে প্রচুর খিদে পেত আর সব কিছু গোগ্রাসে খেয়ে নিতাম তারপর সাধনার সময় যাতে ব্যা ব্যা করে বিরক্ত না করি তাই উনি সংযম অভ্যেস করানোর জন্য মুখটা বেঁধে রাখতেন। তাই অনর্গল বাড়তি কথা এখন আমি বলি না।
সেই থেকে আমার নাম দিলেন মনমোহন। আর মনু বলে ডাকতেন। কী যে স্নেহ করতেন। শক্তিগড়ের ল্যাংচা খাওয়াতেন আদর করে। ল্যাংচার দোকানে গেলে দেখবে আমার ছবিও টাঙানো আছে দেওয়ালে।
তারপর একদিন হিমালয়ে যাওয়ার আগে আমাকে আশীর্বাদ করে বললেন— “যা মনু, তুই এখন থেকে কামছাগল। যে তোর সেবা করবে সে যা চায় তাই পাবে।”
— “কামছাগল?” আমি আকাশ থেকে পড়লাম।
— “কেন? কামধেনু হতে পারে, আর কামছাগল হতে পারেনা?”
— “আচ্ছা, প্রমাণ দাও?” আমি বললাম।
— “বেশ, পিঠটা চুলকে দাও। গা’টা একটু মাসাজ করে দাও।”
কথামতো আমি তাই করলাম। যদি মনের ইচ্ছে পূর্ণ হয়।
পনেরো মিনিট আরামে ছাগলটা ঘুমিয়ে কাদা। ধাক্কা দিয়ে বললাম— “কই কী হলো? কিছুই তো হলো না!”
ছাগলটা চোখ বুজে বলল— “তোমার যে গাড়িটা ধরার ছিল, স্টেশনে এসে গেছে তো।”
“ইছাপুরে ইচ্ছাপূরণ।”
বলে ছাগলটা আবার ঘুমুতে লাগল।
ট্রেন ধরতে ছুটছি তখন। হাতে আর সময় ছিল না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন