দ্বৈতা হাজরা গোস্বামী

“দুপুর বারোটার পর ভিক্ষে দিতে নেই।”
— “কেন?”
“দুপুর বারোটার পর যারা বাড়িতে আসে তারা মানুষ নয়।” অন্ন দিদি বলল।
এমনিতে আমাদের বাড়িতে একজনই ভিখিরি আসে ফর্সা ফর্সা গোলগাল চেহারা, চোখদুটো টানাটানা। তেল দিয়ে মাঝে সিঁথি করা পাটপাট চুল। তাকে দেখে কেউ ভিখিরি বলে বিশ্বাস করে না বলে সে একটা অ্যালবাম নিয়ে ঘোরে। সেখানে সব বড়ো বড়ো মানুষের হাত থেকে তার ভিক্ষে নেওয়ার ছবি। নেতা, অভিনেতা সব্বাই আছে। তাকে কি দশটাকার কম দেওয়া যায় নাকি?
সে এলেই মা দুদ্দাড় করে দৌড়ে যায়। আর সে বলে— “আস্তে আস্তে এস মা, আমি কি কষ্ট করে দু মিনিট দাঁড়াতে পারব না?”
সে আবার আমার গাল টিপে দিয়ে বলে, “খোকন সোনা তুমি মস্ত বড় স্টার হবে।”
আর আমি ঘাড় ঝাঁকিয়ে বলি— “এহ আমি স্টার হতে চাইনা। আমি সিন্দবাদের মতো অভিযানে যাব।”
— “খুব বিখ্যাত লোক বুঝি? কই, নাম শুনিনি তো? ভিক্ষে টিক্ষে দিলে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলে দিও।
“আমি ‘আমি ভিখিরি’ নামে ফেসবুকে আছি।"
দুপুর বারোটার পর আমাদের বাড়িতে কেউই ভিক্ষে চাইতে আসে না। আমি অপেক্ষায় থাকি। এখন তো গরমের ছুটির সময়। ‘পিশাল আইসক্রিম’ বলে একটা লোক হাঁক দিতে দিতে আমাদের গলির মধ্যে দিয়ে যায়। ডাক শুনি, তাকে কমদিনই দেখতে পাওয়া যায়।
তিনতলার ছাতে তিনতলার ছাতে বসে আছি, ঘন্টি শুনে লাফাতে লাফাতে এসে দেখি, সে হাওয়া। তাই ‘পিশাল আইসক্রিম’ আমার কোনোদিন খাওয়া হয় না।
সেদিন দুপুর দুটোর সময় একটা ঝাঁকড়াচুলো, ঝাঁটাগুঁফো লোক এল আমাদের দরজায়। আমি কী আর এমন সুযোগ হাতছাড়া করি। বললাম — “এই যে শুনছ? তুমি তো মানুষ নও।”
সে একগাল হেসে বলল— “সবাই তাই বলে। তুমি কী করে জানলে?”
— “দুপুর দুটোর সময় এসেছো যে। তাতেই বোঝা গেল।”
সে ঠোঁটে আঙুল দিয়ে বলল— “কাউকে বোলো না যেন! ভুতুমপুর থেকে অনেকটা পথ হেঁটে হেঁটে আসছি।”
— “কেন? হাঁটবে কেন? ভূতেরা তো উড়ে উড়ে আসে!”
— “তাহলেই হয়েছে! জনমানুষের মাথার উপর দিয়ে উড়ে উড়ে এলে সাংঘাতিক কাণ্ড হবে।”
— “তোমার হাতের ওই বস্তাটা?”
— “আমি তো ওর মধ্যেই থাকি। বুঝলে?”
— “তা তুমি আমাদের বাড়িতে এই সময়ে না এসে আরেকটু আগে আসলে একটা দারুণ জিনিস পেতে।”
— “কী বলত?”
— “ক্ষীরের পাটিসাপটা, আর মালপোয়া।”
— “ইসস! শুনেই খিদে পেয়ে গেল! আর তো পাবো না!” বলে সে মুখটা বেজার করল।
আমি বললাম, “দাঁড়াও দাঁড়াও! আমার ভাগেরটা তো আমি খাইনি। রোজ রোজ কি আর ভালো লাগে?”
— “তোমরা রোজ রোজ পাটিসাপটা খাও বুঝি?”
— “একদিন মা করে, একদিন জেঠিমা করে, তারপর একদিন ঠাকুমা করে কম্পিটিশন দিয়ে। আমার কাজ শুধু খেয়ে খেয়ে বলা কারটা ভালো হয়েছে।”
এই শুনে সে দুঃখু দুঃখু মুখে বলল— “আমার তো মা নেই, জেঠিমাও নেই, ঠাকুমাও নেই। ছিল শুধু এক দূর সম্পর্কের কাকা। খুব মারত। তারপর একদিন এমন মারল.."
ওর করুণ কাহিনি শুনে মনটা বড়ো খারাপ হলো। পাটিসাপটা এনে দিলাম, আর দুটো মালপোয়া।"
তারপর বললাম— “আমাকে তোমাদের ভূতুমপুর নিয়ে যাবে? বাড়িতে একা একা বসে থাকতে কী আর ভালো লাগে?”
সে এদিক সেদিক তাকিয়ে বলল— “কিন্তু তোমার বাড়ির লোকজন। কেউ দেখতে পাবে না?”
— “বস্তাটায় ভরে নিয়ে গেলে কেউ দেখতেও পাবে না।”
— “আর তুমি যদি তারপর ভয় পেয়ে চিল্লামিল্লি করো?”
আমি হাঁ করে আলজিভ অব্দি দেখালাম। বললাম— “রবীন্দ্রসঙ্গীত শেখাবে বলে মা রোজ গার্গেল করায়। আমার এমনি এমনি সারাবছর রোজ সকালে গার্গেল করে করে গাৰ্গেলাইটিস হয়ে গেছে। আমি চেল্লাতেই পারি না।”
— “আর যদি হাত পা ছোঁড়ো?”
— “দূর আমি বলও ছুঁড়তে পারি না। কাজ করতে হয় না বলে আমার হাতে পায়ে জং পড়ে গেছে। মা তো বলে অপু, তুই কুটো ভেঙে দুটো করিস না!”
সে বস্তাটার দিকে তাকিয়ে বলল— “যাবে?”
তারপর আবার মুখটা বেজার করে বলল— “না থাক। ভূতুমপুর খুব খারাপ জায়গা। লক্ষ্মী ছেলেদের যেতে নেই। ওখানে ভালো পাটিসাপটাও পাওয়া যায় না।”
এই বলে সে হনহন করে হাঁটা দিল।
ধুর! এই সুযোগটাও আমার হাতছাড়া হলো। মা যে বলে ছেলেধরারা খুব খারাপ হয়।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন