দ্বৈতা হাজরা গোস্বামী

সেদিন হঠাৎ মায়ের হাঁকডাকে আমার ঘুম ভাঙল। “অপু, তাড়াতাড়ি ওঠ। গিরিডি থেকে গোপাল মামা এসেছে।”
গোপাল মামা! এতদিন পর। সেই কবে নিরুদ্দেশ হয়েছিল। আমি তড়িঘড়ি দৌড়ে যাই। আমাদের বৈঠকখানা ঘরের চেয়ারে বসে আছে গৌরবর্ণ, দীর্ঘদেহী গোপাল মামা। নিরুদ্দেশ হওয়ার আগে বেশ নাদুসনুদুস ছিল। এখন চেহারাটা কেমন যেন শুকনো।
আমি উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে উঠি— “আরে, গোপাল মামা, কেমন আছো? কী খবর? অনেকদিন পাত্তা নেই। কোথায় ছিলে বলো তো?”
আমি এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে গেলাম। গোপাল মামা শান্ত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় বসতে বলল। মামার হাতে গন্ধরাজ লেবু আর দই দিয়ে ঘোলের শরবত। চারপাশে দেখলাম গদগদ হয়ে দাদু, জেঠু, মেজকা, বেজার মুখে হাড়জ্বালানো ছোড়দা এরা সব বসে আছে।
গোপাল মামা গ্লাসে একটা চুমুক দিয়ে জানলার বাইরে গাছের ডালে এসে বসা ধুমসো এক দাঁড়কাকের সঙ্গে ফিঙের খুনসুটি দেখতে দেখতে বলল— “আমি অনেকদিন..." তিন সেকেণ্ড অপেক্ষা করে বলল— “এ সংসার জগতের বাইরে”
“জাগতিক” আবার তিন সেকেণ্ডের বিরতি “কামনা বাসনা মুক্ত”
“সেই যেদিন” বলে গোপাল মামা আবার চোখ বুজল...কয়েক মুহূর্ত থেমে “বাড়ির বাইরে বেরোলাম” বলতেই, হাড়জ্বালানো ছোড়দা বলে উঠল— “অসহ্য! তোমরাই শোনো!”
ছোড়দাটা ভারী অভদ্র। যাইহোক ছোড়দা প্রস্থান করতেই গোপাল মামা বলে চলল। আমি কিন্তু ধৈর্য ধরে শুনছিলাম। এর থেকে অনেক কিছু শেখার আছে।
আমি অনলাইন ক্লাসে ছোটোদের পড়াই আর মেলট্রেনের গতিতে কথা বলি। আধ ঘন্টার ক্লাস পনেরো মিনিটে শেষ হয়ে যায়। তারপর বলার কিছু থাকেনা। তাই তখন ছাত্রছাত্রীদের নানা রকম আবদার সহ্য করতে হয়।
— “একটা হিন্দি গান করো!” — “একটা ঝাকানাকা নাচ হয়ে যাক!”
তখন মনে হয় এই মেলট্রেনের গতিতেই গাঁট্টা দিই। হেডস্যার ক্লাসে বলেছিলেন— “অপূর্ব, তোমাকে ধীর লয়ে কথা বলা অভ্যেস করতে হবে।”
সেই থেকে বাড়িতে ক্লাস ওয়ান টুয়ের যে ছাত্রছাত্রীদের অনলাইনে টিউশন পড়াই তাদের “সুপ্রভাত” বলে নিমীলিত নেত্রে বসে থাকি। তারপর বলি— “প্রিয় ছাত্রছাত্রীগণ সবাই আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা গ্রহণ করো।” একটা লম্বা বোতল থেকে তারপর অনবরত জল খাই প্রত্যেক বাক্যের শেষে। এসবই গোপাল মামার অনুপ্রেরণায়।
গোপাল মামা একমাস বাড়িতে থাকে তারপর ছয় মাস নিরুদ্দেশ। আবার দু’সপ্তাহের জন্য এসে পিঠেপুলি খেয়ে যায়। তখন যা তোয়াজ হয় ভাবাই যায় না। দিদা রূপোর থালা বের করে। রূপোর বাটি চামচ। সব থেকে সুন্দর হাতে বোনা আসনটা আলমারি থেকে বেরোয়। আমারও তখন মনে হয় এই কিছুদিনের নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়াটা মন্দ নয়। আমাকে বাড়িতে কেউ সেরকম সম্মান খাতির যত্ন করে না। সেই যে কবিতাটা পড়েছিলাম— “যার যত ফরমাস সব তুমি করো। তাতে তুমি বিমলাটি বাঁচো আর মরো!”
আমার দুঃখের কাহিনি শুনলে রামছাগলটারও চোখে জল আসে। তাই একদিন আমি নিরুদ্দেশে যাবই। কেউ আটকাতে পারবে না। অবশ্য আটকাতে চাইবেও না কেউ।
একদিন এই কথা বলতে হাড়জ্বালানো ছোড়দা বলল— “মাঝে মাঝে মনখারাপ করলে চলে আসিস। বাড়িতে পাঁঠার মাংস লুচি হলে তো তুই জানতেও পারবি না তখন।”
তা একদিন গোপাল মামা আমাকে ডেকে উপদেশ দিল— “শোন অপু... একটা... কথা বলি শোন… বেশি কথা.. কখনো খরচ করবি না… নীরবতা… মানুষকে.. অন্তর্দর্শনে ...সাহায্য করে। এই যে… হড়বড়িয়ে। ...এতোগুলো...কথা ...বলিস একসঙ্গে এর জন্য...কতটা ...প্রাণবায়ু। ...খরচ হয়... জানিস?
আয়ু কমে যায়... মৌনব্রত.. অভ্যেস কর..ঋষিরা একশো, হাজার ..বছর কী করে বাঁচতেন? বেশি কথা .. খরচ ..করতেন না। একটিই বাক্য ..ন’ মাসে, ছয় মাসে বলতেন ..সেটিই ব্রহ্মবাক্য।
তাই আমি ঠিক করলাম মনে মনে যে মৌনব্রত অবলম্বন করব। একদিন ঘুম থেকে উঠেই মনে হলো আজকেই আদর্শ দিন। আজকেই সেই দিন।
একটা শ্লেট নিয়ে তাতে লিখে ফেললাম— “আজ আমার মৌনব্রত সকাল আটটা থেকে বিকেল চারটে।” হাড় জ্বালানো ছোড়দা তা দেখেই ভয়ঙ্কর ভাবে হো হো হো হো করে হাসতে লাগল। সে হাসুক। ওসবে আমাকে টলানো যাবে না। ঋষিদের ধ্যান ভঙ্গ করার জন্য অনেক মায়াবী রাক্ষসদের পাঠানো হতো তা আমি মহাভারত, রামায়ণ সিরিয়ালে দেখেছি। বেঁটে বেঁটে কুটকুটে পরচুলা পরা অসুরগুলো ওই ঝাকানাকা নাচ করত। কিন্তু কিছুই করতে পারত না।
তাই ছোড়দার দিকে আমি অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে তাকালাম। ছোড়দা— “ওরেবাবা পুড়ে যাচ্ছি, পুড়ে যাচ্ছি নাটক করতে করতে পালিয়ে গেল।”
বিজ্ঞানী মেজকা এসে বলল— “অত্যন্ত ভালো কাজ। অন্তত একটা দিন প্রশ্নবিচিত্রা হয়ে আমাকে জ্বালাবি না।”
মা না চাইতেই লেবুর শরবত দিয়ে গেল। এদিকে সকাল থেকে কিছু খাইনি। এদের কী করে বোঝাই মৌনব্রত মানে উপোস নয়।
জেঠু এসে বলল— “বাঃ খুব ভালো। তোর জেঠিমাকে একটু শিখিয়ে দিস। এই একটা মাত্র ব্রত কোনোদিন করতে দেখলাম না।”
তাতে জেঠিমা তেলেবেগুনে জ্বলে ধমধম করে রান্নাঘরে চলে গেল।
দাদু এই সুযোগে আমার কাছে বসে “সেই আন্দামানে যখন প্রচণ্ড ঝড়ে জাহাজে আটকে পড়েছিলাম…” সেই হাজারবার শোনা গল্পটা আবার বলতে শুরু করল।
আর কত সহ্য করা যায়! ভাবলাম যাই একটু ঘুমিয়ে পড়ি।
একটু তন্দ্রা মতো আসতেই ফোনের বিকট শব্দে উঠে পড়লাম। দেখি ঘড়িতে ঠিক চারটে বাজে মৌনব্রত ত্যাগ করার সময়। ঠিক সেই সময়েই ফোন করেছে, আইহোর বড়মামা।
— “অপু কেমন আছিস? তোর মৌনব্রত নিশ্চয়ই এখন শেষ হয়েছে। একদম ঠিক সময়ে ঘড়ি মিলিয়ে ফোন করেছি। ভাবলাম অনেকদিন কথা হয়নি।”
বড়মামা ছাড়তেই ফোন করেছে বুঁচকি। “অপুদা, ইজ ইট ট্রু? মাই ব্রো ইজ ডুয়িং সামকাইন্ড অফ ব্রত! আমাকেও একটু শেখাবি? টেল মি ইফ ইট হ্যাজ এনি রিলেশন উইথ ডায়েটিং। আজকাল ওয়েট লস করার ভীষণ চেষ্টা করছি।”
এরপর ঝড়ের গতিতে ফোন আসতেই থাকল। ছোটো খোকন দা, বেহালার তপন দা। এমনকী শেষমেষ গোপাল মামা অব্দি ফোন করে এক ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখল।
কোনোমতে ফোনটা রেখে ল্যাপটপ খুলে দেখি হাড়জ্বালানো ছোড়দা ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছে— “আমাদের প্রিয় অপু আজ মৌনব্রত করছে। কেউ ফোন করে বিরক্ত করবেন না। হ্যাঁ ফোন করা যেতে পারে ঠিক বিকেল চারটের পর।”
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন