কর্মবীর ছোড়দা

দ্বৈতা হাজরা গোস্বামী

Logo

“প্রফেসর সাকিনাগা তো ভীষণ ভদ্র শান্ত মানুষ। ওঁর এমন উত্তেজিত হয়ে তোকে আক্রমণ করার কারণ বুঝলাম না।” মেজকা অবাক হয়ে প্রশ্ন করল।

হাড়জ্বালানো ছোড়দা মাথার আবটায় ডেটল লাগাতে লাগাতে বলল— “শুধু কী আক্রমণ! পুরো ঘাড় ধরে বের করে দিলেন। আর যেন কোনোদিন হিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টে না ঢুকি। কী কুক্ষণে যে তোমার কথায় নেচে ওঁকে আমার গাইড বানাতে গিয়েছিলাম।

— “নিশ্চয়ই তুই কিছু করেছিস! তোকে তো আমি হাড়ে হাড়ে চিনি।”

— “ওঁকে খুশি করার জন্য একটা কবিতা শুনিয়েছিলুম। সে কবিতা শুনেই এমন ক্ষেপে গেলেন।”

— “কোন কবিতা?”

— “জাপানিদের সম্পর্কে তো আমি বেশি কবিতা জানিনা। বললাম স্যার আই নো অনলি ওয়ান ভেরিগুড পোয়েম অ্যাবাউট জাপানি। ইটস ইন বেঙ্গলি ল্যাঙ্গুয়েজ।”

— “সারে গা মা পাধানি

বোম ফেলেছে জাপানি,

বোমের ভেতর কেউটে সাপ,

ব্রিটিশ বলে বাপরে বাপ।”

তারপর পোয়েমটার মানে ইংরেজী ভাষায় বোঝানোর চেষ্টা করতেই পেন্সিল বক্স ছুঁড়ে দিলেন মাথা তাক করে।

— “ঠিকই করেছেন। তাছাড়া উনি তোর গাইড হলে তুই মরে যাবি এমনিতেই। উনি জাপানি আর তুই হলি নিপাজা।”

— “কীরকম?”

মেজকা আমার দিকে তাকিয়ে বলল— “অপু, এক্সপ্লেন!”

আমি অদূরেই দাঁড়িয়েছিলাম। সায় দিয়ে বললাম— “উনি হচ্ছেন পরিশ্রমী তুমি তার উল্টো মানে অলস অর্থাৎ নিপাজা।”

ছোড়দা হাঁ হাঁ করে আমার দিকে তেড়ে এল। — “আমি নিপাজা? আমি অলস? তোর মুখ ভেঙে দেবো অপু।”

মেজকা বলল— “তুই যে অলস সেটা প্রমাণ করা যায়। আমার কাছে আলসেমি মাপার যন্ত্র আছে। মাথায় বসিয়ে দিলেই হবে। কাজ করে মানুষ চিন্তা থেকে। এই কাজের পর সেই কাজ করতে হবে এভাবে ব্রেন অ্যাকশন প্ল্যান রেডি করে। তোর ব্রেন শুধু দুটো জিনিসই চিন্তা করে। কী খাবো, আর কখন ঘুমোবো।”

— “আর কী করে অন্যদের কাজের ভুল ধরব” আমি যোগ করলাম।

ছোড়দা তাতে ভীষণ রেগে গিয়ে সেই মুহূর্তেই বিছানা ত্যাগ করল।

বিজ্ঞানী মেজকা আবার মমারো কে ব্যায়াম করানোয় মন দিলো। মমারো মানে আমাদের মশা মারা রোবট এখন রোজ সকালে শীর্ষাসন করে। তাতে কী লাভ হয় মেজকাই জানে। কিন্তু মমারো দিন দিন বেশ চটপটে হয়ে উঠেছে। “ঠঙ ঠঙ খ্যান খ্যান” করে একটু আগেই ছোড়দার কথা শুনে হাসছিল।

আমি মেজকাকে বললাম— “আচ্ছা মেজকা অলস লোককে কোনো ভাবে চটপটে বানানো যায় না?”

— “আইডিয়াটা মন্দ নয়। বুঝলি?” মেজকা একটু চিন্তা করে বলল— “এই ধর সরকারী অফিস-টফিসে যেখানে কাজ খুবই ঢিমেতালে চলে সেখানে প্রয়োগ করা গেল। কীরকম চটপট কাজ হয়ে যাবে।”

আগের যন্ত্রটাই একটু এদিক ওদিক করে দিলে অলস মানুষকে নির্দেশ দিয়ে সিধে করে দেবে।

মেজকা তারপর তিনদিন ওই যন্ত্রটা নিয়ে পড়ে রইল। তারপর একদিন সকাল বেলা আমাকে ডেকে বলল— “দ্যাখ ভালো করে এই যন্ত্রটার নাম দিয়েছি কর্মবীর। একবার মাথায় পরে দ্যাখ।”

আমি ভয়ে তিন হাত তফাতে গিয়ে বললাম— “না বাবা আমি পরবো না। শেষে কী থেকে কী হয়ে যাবে। একবার জন্তু জানোয়ারের ভাষায় কথা বলতে শুরু করেছিলাম। আমি বরং ছোড়দা কে দিয়ে আসি।”

— “রাজি হবে?”

— “আরে কী করে রাজি করাই দেখতেই পাবে।”

ছোড়দা কে ওটা পরাতে বেশি বেগ পেতে হলো না। আমার স্পেশাল তাকে ওটাকে রেখে এসেছিলাম। আমি না থাকলেই ছোড়দা ওখানে হাত দেয়। আমার শখের সমস্ত জিনিস হাপিস করে।

তারপর থেকে ছোড়দা দেখি দোকান গিয়ে গুচ্ছের খাতা পেন্সিল কিনে এনে ঘর বন্ধ করে কী সব লিখেই চলেছে। লিখেই চলেছে। ঘরে গেলেই বলছে— “বিরক্ত করিস না। দেখছিস না কাজ করছি।”

একদিনেই মনে হয় ছোড়দা ইতিহাসের থিসিস নামিয়ে দেবে। উঁকি দিয়ে দেখলাম পেজ নম্বর লিখেছে। ৩০০ পাতা কমপ্লিট। রাতে ছোড়দার খাবারটাও ভয়ে ভয়ে ঘরে রেখে দিয়ে আসা হলো। কেউ ছোড়দাকে বিরক্ত করছে না। এমন রাত দিন জেগে পড়াশোনা ছোড়দা কস্মিনকালেও করেনি। এইরকম দুদিন বসে ছোড়দা হাজার দুয়েক পাতা লিখে সেই পাণ্ডুলিপি ভালো করে মলাট দিয়ে ব্যাগবন্দী করে আমার হাতে দিয়ে বলল— “অপু যা গিয়ে হিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টে দিয়ে যায়। আমার তো ভেতরে ঢোকা বারণ।”

আমারও খুব ইচ্ছে ছিল সাকিনাগা স্যার কে দেখার। উনি শুনলাম নোবেল টোবেল পেতে পারেন এমন সব কাজ করেছেন। অন্তত একটা ছবি তুলে আসব ওঁর সঙ্গে। তাই আর না করলাম না। সোজা গিয়ে ঢিপ করে একটা প্রণাম করে বললাম— “স্যার প্লিজ রিড দিস।”

তারপর কাগজগুলো বের করে মন দিয়ে উনি পড়তে শুরু করলেন। পড়তে পড়তে দেখলাম ওঁর মুখের রং বদলাতে শুরু করল। গোলাপী থেকে লাল হয়ে বেগুনি। হাতের কাছে সেদিন পেন্সিল বক্স পাননি, একটা পেপার ওয়েট ছিল।

বাড়ি ফিরে দেখি ছোড়দা অঘোরে ঘুমোচ্ছে। যন্ত্রটা খুলে এক পাশে রাখা।

ছোড়দার লেখা দু হাজার পাতার থিসিসের প্রত্যেক পাতায় ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ওপরে নিচে ডানে বামে লেখা সেই একই মন্ত্র—

“সারে গা মা পা ধা নি,

বোম ফেলেছে জাপানি”

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%