ঘটেশ্বরের কৃপা

দ্বৈতা হাজরা গোস্বামী

Logo

আমার ছুটির দিনগুলো এইভাবে মাঠে মারা যাবে ভাবিনি। বাড়িতে কেউ কোত্থাও নেই, শুধু কিনা আমি আর হাড়জ্বালানো ছোড়দা। আর আছে দাদু। দাদুর ঘরে দাদু বসে থাকে সারাদিন বইটই পড়ে।

দাদুর একটা আলাদা টিভি আছে সেটাই দেখে। মাঝে মাঝে গান শোনে। তাই দাদুকে নিয়ে অসুবিধে নেই। কিন্তু ছোড়দা মানেই সাংঘাতিক। আমি যা করি, তাতেই ব্যাগড়া দেবে। পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়ে যাবে। এই যেমন টিভিতে একটু কার্টুন দেখব, ছোড়দা এসে চ্যানেল ঘুরিয়ে যা কোনোদিন দ্যাখে না সেইসব দেখতে শুরু করবে। তারপর হয়তো কমিক্স পড়ছি। “দে তো দেখি” বলে ছোঁ মেরে নিয়ে আর ফেরত দেবে না। গোয়েন্দা উপন্যাস পড়ছি পাশ থেকে এসে চুল মুছতে মুছতে অবলীলায় বলে দেবে— “ছেলেটার মামাই তো খুনটা করেছে।”

তারপর ওই ভেজা তোয়ালেটা আমার মাথায় দিয়ে চলে যাবে।

কাঁহাতক আর সহ্য করা যায়। বাড়ির লোকেরা বলে— “অপু তুই খুব ভালো ছেলে। লক্ষ্মী ছেলে।” কিন্তু কারোর বাড়ি বেড়াতে গেলেই ছোড়দার গুনগান করে আসে। সেই কবে যেমন খুশি সাজো তে মায়াক্ষেপী সেজে প্রাইজ পেয়েছিল। সেটাও ফলাও করে শোনায়। আমি যে অঙ্ক দৌড়ে ফার্স্ট প্রাইজ পেয়েছিলাম সেটা কেউ বলে না। না হয় সবার শেষে পৌঁছেছিলাম কিন্তু অঙ্কটাতো ঠিক হয়েছিল। এসব কথা ভাবলে চোখে জল এসে যায়।

আমি দাদুর ঘরে বসে বসে চিনেবাদাম চিবোচ্ছিলাম। দাদু এসে মাথায় হাত দিয়ে বলল— “কী হয়েছে অপু। মন খারাপ?”

— “কী করে বুঝলে?”

— “মন খারাপ না থাকলে কেউ চিনেবাদাম চেবোয় নাকি?”

— “আমার সঙ্গে সবাই যাচ্ছেতাই ব্যবহার করে। কেউ রেস্পেক্ট অব্দি করে না।”

— “কেন, তুই যে ক্লাস টু-এর ছাত্রটাকে পড়াস?”

— “ও তো ক্লাস টু, রেস্পেক্ট এর মানেই বোঝে না।"

— “করবে করবে, একদিন সবাই করবে, তার জন্য আত্মশক্তিতে বলীয়ান হয়ে বড়ো বড়ো কাজ করতে হবে। সেই যে ইংরেজ আমলে আমি পাঞ্জাবী সেজে লুকিয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করতাম।”

দাদু একশো উনিশ বার এই গল্পটা বলেছে। আমি থামিয়ে দিয়ে বলি— “আহা আত্মশক্তিটা কী করে বাড়াব তাই বলো।”

— “আত্মশক্তি বাড়ে দুঃসাহসিক কাজ করে। যেমন সেই যে আমি জাহাজে ঝড়ের মধ্যে আন্দামান থেকে ফেরার সময়।”

এই গল্পটাও দাদু বিরাশি বার বলেছে। থামিয়ে দিয়ে বলি— “সহজ কোনো মন্ত্র তন্ত্র নেই? এই ধরো যা বললাম তাই হয়ে গেল।”

দাদু গম্ভীর হয়ে বলল— “লোকে বলে আমি নাকি বাকসিদ্ধ। তা ভুল কিছু বলে না। তুই মাধ্যমিকে কত নম্বর পাবি তা আমি এখনই বলে দিতে পারি। কিন্তু এই উপলব্ধি, এই জ্ঞান, তো এক দিনে আসে না। তার জন্য ধ্যান করতে হয়। মনে মনে আত্মশক্তিকে একজায়গায় করে ঘটনাঘটন ঘটেশ্বরের সাধনায় নিজেকে নিবেদন করতে হয়।”

— “তা এই ধ্যানটা কোথায় করতে হবে?”

— “ধ্যান হয় তিন জায়গায় মনে, বনে, আর ঘরের কোনে। বনে যাওয়ার তো উপায় নেই, তাই মনে মনেই ঘরের কোনে ধ্যানে বসলাম। আধঘন্টা পর মনে হলো যেন বুকের মধ্যে বেশ বল পাচ্ছি। কপালের মধ্যিখানটা চিন চিন করছে।”

এই সময় ছোড়দা হাসতে হাসতে ঘরে ঢুকে আমার ধ্যানভঙ্গ করার উদ্দেশ্যে কিছু একটা বক্রোক্তি করতে যাচ্ছিল। আমি মনে মনে চাইলাম ওপরের তাক থেকে কাঠের বাক্সটা যেন ছোড়দার মাথার ওপর পড়ে যায়।

অদ্ভুত ভাবে সেটাই হলো। ওপর থেকে বাক্সটা ধপ করে ছোড়দায় মাথায় পড়তেই ছোড়দা মাটিতে বসে পড়ল।

ঘটনা ঘটন ঘটেশ্বরের কৃপায় যে আমার দ্বারা এমন একটা অপরাধ সংঘটিত হবে ভাবতে পারিনি। তাড়াতাড়ি উঠে ছোড়দার কাছে গেলাম।

যা নিরেট মাথা একটুও ফেটেছে বলে মনে হলো না। তবে আমার দিকে ভ্যাল ভ্যাল চোখে চেয়ে ছোড়দা বলল— “আমি কোথায়? আমি কে? তুমি কে?”

— “সে কী! তোমার কিছুই মনে পড়ছে না নাকি?”

পরীক্ষা করার জন্য বললাম— “তোমার যেমন খুশি সাজার প্রাইজটা। ওই প্যাঁচার মূর্তিটা আমিই ভেঙেছি। তোমার অঙ্ক খাতায় গোটা দশেক ভূতের উদ্দাম নৃত্যের ছবি আমারই আঁকা। তোমার স্যারের বইয়ে ‘উল্লুক’ শব্দটা আমিই লিখেছিলাম।”

কিন্তু ছোড়দার মুখের কোনো পরিবর্তন হলো না। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বলল— “তুমি কে? আমি কে?”

এই সুযোগ তো আর বারবার আসে না। ঘটেশ্বর দেবের কৃপায় এসেছে। আমি তাঁর উদ্দেশ্যে নমস্কার জানিয়ে ছোড়দাকে বললাম— “তুমি আমার, আমাদের বাড়ির সবার সেবক। সেবাই তোমার ধর্ম। তোমার নাম চরণদাস। তা চরণদাস, যাও গিয়ে আমার জন্য শরবত বানিয়ে নিয়ে এস। আর দাদুর জন্য চা। বাড়িতে কোনো অতিথি এলে যেন দেখি তুমি তার সেবা করছো।”

এভাবে ছোড়দা ওরফে চরণদাসের সাহচর্যে আমার ছুটির দিনগুলো আবার মধুর হয়ে উঠতে লাগল।

তার মধ্যে কোথা থেকে বাড়িতে উদয় হলো নারকেলডাঙার পুলু পিসি। পুলু পিসির মেয়ে গিনি। আগেরবার সে আমাকে গিনিপিগ বানিয়ে নানা কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছিল। সে বড়ো হয়ে নাকি মস্ত বড়ো ডাক্তার হবে। তাই আমি খুব একটা তার ধারে কাছে থাকিনা। আধ কাপ রক্ত চাইতে এসেছিল আগের বছর। আরেকবার আকুপাংচার করবে বলে পায়ের তলায় ছুঁচ ফোটাতে এসেছিল। এবার না জানি কী চাইবে!

তবে এবারে পুলু পিসি একাই এসেছে দাদুকে দেখতে।

পুলু পিসির দেখাশোনার সমস্ত দায়িত্ব আমি চরণদাসকে দিলাম। পুলু পিসির ঘর ঝুল ঝেড়ে, ঝকঝকে তকতকে করে যেন রাখা হয়। পুলুপিসি আয়না দেখতে খুব ভালোবাসে তাই আয়নায় একটুও ধুলো যেন না থাকে। পুলু পিসি পান খেতে খুব ভালোবাসে তাই খাওয়ার শেষে ছোড়দা ওরফে চরণদাস পান সেজে এনে দিল।

পুলু পিসি যে শাড়িটা পরে এসেছে সেটাও ইস্ত্রি করে দিল। পুলু পিসি তো খুব খুশি। আমাকে ডেকে বলল— “অপু তুইও তো একটু কাজটাজ করতে পারিস। সব কিছু ওই ছেলেটার ঘাড়ে পড়েছে। নিরীহ গোবেচারা ছেলেটা মুখ বুজে সব কিছু করে যাচ্ছে।”

— “হ্যাঁ নেকড়ে এখন ভেড়া হয়ে গেছে।” বলতেই যাচ্ছিলাম কিন্তু নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম— “ছোড়দা বরাবরই কাজের মানুষ। কাজ নিয়েই থাকতে ভালোবাসে। আমাকে কিছু করতেই দেয় না আমি ছোটো বলে।”

পুলু পিসি দু' দিন থেকে বকবক করে দাদুর কানের পোকা বের করে দিল। আমি দিব্যি কমিক্স কার্টুন নিয়ে থেকে গেলাম। যাওয়ার দিন পুলু পিসিকে বাসে তুলে দিয়ে এল ছোড়দা। আমি যথারীতি ঘুমোচ্ছিলাম। ঘুম থেকে উঠে দাঁত মেজে গিয়ে দেখি দাদুর ঘর থেকে ছোড়দা বেরোচ্ছে হাসি হাসি মুখে। তারপর নিজের ঘরে গিয়ে ঢুকল। আমিও পেছন পেছন ঢুকে বলি— “চরণ দাস আমার সকালের চা কই?”

ছোড়দার রূপ অমনি পাল্টে গিয়ে করাল মূর্তি হয়ে গেল। আমার চুল গুলো হাতে পেঁচিয়ে বলতে লাগল— “চরণদাস? আমি চরণদাস? আমি তোর সেবা করব? আয়, ভালো করে তোর সেবা করি।”

এরকম আধ ঘন্টা ভয়ানক সেবার পর সকালের আড়মোড়া ভেঙে অঙ্গে অঙ্গে ব্যথা নিয়ে দাদুর কাছে গিয়ে শুনি পুলু পিসি এখন আর নারকেল ডাঙায় থাকেনা। আন্দামানে থাকে। ছোড়দাকে সেখানে নিয়ে যাবে বলেছে দু'সপ্তাহের জন্য।

আন্দামানে যাওয়ার কী ভীষণ ইচ্ছে ছিল আমার। জীবনে তো ঘুঘুডাঙার বাইরে কোথাও যাইনি। ঘটেশ্বরের ধ্যান করতে গিয়ে এই ছিল কপালে!

দাদু বলল— “মন খারাপ করিস না। আন্দামান ভীষণ খারাপ জায়গা। সেই একবার জাহাজে প্রবল ঝড়ে, সেই গল্পটা বলি শোন..।”

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%