দ্বৈতা হাজরা গোস্বামী

ভীষণ ভিড় ঠেলাঠেলি, ট্রেনে চড়ে বাড়ি ফিরছি। মহামারীর খবর সবে ছড়িয়েছে। চারপাশে দেখি সবাই খুক খুক খক খক করে কেশে যাচ্ছে। ভয়ে সিটের মধ্যে সিঁটিয়ে আছি। মাঝে মাঝেই গত বছরে কেনা স্যানিটাইজার মাখিয়ে নিচ্ছি হাতে। কেউ গামছা, কেউ রুমাল যে যা পারে মুখে বেঁধেছে। হঠাৎ দেখি ঘুটেদা। সবুজ রঙের একটা সানগ্লাস আর গোলাপী রঙের একটা টি-শার্ট পরে এসে হাজির।
বললাম— “কোথায় যাচ্ছ ঘুটে দা।”
ঘুটেদা সানগ্লাসটা নামিয়ে ইশারায় বলল— “ওরে অপু কতবার বলেছি যে ওই নামে ডাকবি না আমাকে। আসলে ঘুটেদার আসল নামটা যে কী তাই ভুলে গেছি।
ঘুটেদা আঙুলগুলোকে চিরুনির মতো জড়ো করে সামনের চুলটাকে বারতিনেক ওপরের দিকে আঁচড়ে নিয়ে বলল— “বেড়াতে যাচ্ছি মাসির বাড়ি, শান্তিনিকেতন।
আমি অবাক হয়ে বললাম— “চারদিকে যে ভাইরাস থৈ থৈ করছে এ সময় কেউ বাইরে যায় নাকি?”
— “তুই যে বেরিয়েছিস, তার বেলা?”
— “বা-রে আমার তো ক্লাস শেষ তাই বাড়ি ফিরছি। বাড়ি ফিরেই একেবারে ঘরবন্দী হয়ে যাব।”
— “ওই সব ভাইরাস-ফাইরাস এই শর্মার কিচ্ছু করতে পারবে না।”
চোখ কপালে তুলে বললাম— “দেশে বিদেশে হাজার হাজার লোক মারা গেল। তোমার কি প্রাণের ভয় নেই?”
— “শোন আমার গুরুদেব অনেক আগেই এই ভাইরাসের কথা বলেছিলেন।”
“খুসখুসে কাশি
ঘুষঘুষে জ্বর
ফুসফুসে ছ্যাঁদা...”
আমি বাধা দিয়ে বললাম— “এটা তো সুকুমার রায়ের লেখা।”
— “আবোল তাবোল বকিস না তো, আমার গুরুদেব কোথায় থাকতেন জানিস? যেখানে ওই ভাইরাসের উৎপত্তি। ওখানে চীনাদের সঙ্গে অনেক চেনাজানা ছিল। গুরুদেব কে চিনতে আমার ভুল হয়নি, দেখা হতেই আমার সব চিন্তা দূর করে চিন্তামণি বটিকা দিলেন।
“আমার আর কোনো অসুখবিসুখের ভয় নেই। তুই মনে করে দ্যাখ গত সেপ্টেম্বর মাস থেকে আমাকে কি একবারও হাঁচতে দেখেছিস? একবারও কাশতে দেখেছিস?”
আমি অবাক হয়ে বললাম— “গত সেপ্টেম্বর কী গো? এই তো দু বছর পরে তোমার সঙ্গে আমার দেখা হলো। আমি কী করে জানবো?”
“অত জানতে হবে না। আমার কথায় বিশ্বাস নেই তোর? এই জন্যই তোদের কিছু হলো না। শুধু তর্ক করে গেলি সারাজীবন। চীনের চিন্ময়ানন্দ বাবার চিন্তামণি বটিকার কোনো তুলনাই হয়না।”
— “এত চেষ্টাচরিত্র করে টীকা আবিষ্কার হচ্ছে না, আর তোমার বটিকায় কাজ দেবে বলছো?”
— “আলবাত দেবে” বলে বলে ঘুটেদা আমার পাশ দিয়ে জানলায় তাক করে থু করে একটা থুতু ছুঁড়ে দিলো। তারপর হাত দিয়ে মুখ মুছে হাতটা প্যান্টের পকেটে মুছে নিল।
বাঁ দিকে মুখ ঘুরিয়ে— “এই পেয়ারা ইধার আও” বলে ডাক দিলো। হিন্দিতে কেন বললো কে জানে? তারপর বলল— “একটু বেশি করে ঝাল দেগা, লেবুর রস দেগা, আচ্ছা সে মাখায়েগা। সমঝা?”
তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল— “তুই খাবি?”
আমি প্রবল বেগে মাথা নাড়লাম।
— “তুই যা পেটরোগা। তোকে খেতে হবেনা।” বলে ঘুটেদা চোখ বন্ধ করে কচমচ করে খেতে শুরু করল।
তারপর বলল— “খেয়েই এক চামচ বটিকা গুঁড়ো খাব। এই দ্যাখ প্যাক করে এনেছি।”
এই বলে ঘুটে দা কাঁচের শিশিটা আমার নাকের সামনে তুলে ধরল, আবার পকেটে ভরে রাখল।
পেয়ারা মাখা লোকটাকে বলল— “কেয়া বানায়া হ্যায়? কষকষে করে লঙ্কা নেহি দিয়া। পয়সা নেহি দেগা হাম।”
লোকটা বিরক্ত হয় লঙ্কার গুঁড়ো ঢালতে শুরু করল ঘুটেদার পেয়ারা মাখায়।
হঠাৎ কৌটোর ফুটো ঢাকনাটা খুলে গিয়ে লঙ্কাগুঁড়ো ছড়িয়ে পড়ল। ঘুটেদা তড়াক করে দাঁড়িয়ে এমন প্রবল হাঁচতে আর কাশতে শুরু করল যে পকেট থেকে পড়ে সেই সর্বরোগহর চিন্তামণি বটিকা চূর্ণের শিশি গড়িয়ে গিয়ে চূর্ণ চূর্ণ হয়ে গেল।
তারপর ঘুটেদার হাঁচি কাশি কান্নার অদ্ভুত সংমিশ্রণ শুরু হলো।
বেগতিক দেখে একটা বাঁদিপোতার গামছা দিয়ে ঘুটেদার মুখ বেঁধে দেওয়া হলো।
আর ঘুটেদা ক্রমাগত হাতজোড় করে আমার কাছে স্যানিটাইজার ভিক্ষা করতে শুরু করল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন