দ্বৈতা হাজরা গোস্বামী

"বিজ্ঞানী বি.বি বসুকে অপহরণ বা হত্যার চেষ্টা হতে পারে।"
আমার মোবাইলে একটা আননোন নাম্বার থেকে এই মেসেজ পেয়ে খুব চিন্তিত হয়ে পড়লাম। বিজ্ঞানী বি.বি বসু মানে বিদ্যাবিনোদ বসু, আমার মেজকার কাছে দৌড়ে গেলাম তক্ষুণি। মেজকা দেখি পুরস্কার প্রাপ্তির অনুষ্ঠানের বক্তৃতা প্র্যাকটিস করছে। বক্তৃতা শেষ হতেই হাততালির আওয়াজ পাওয়া গেল। মমারো হাততালি দিচ্ছে।
মমারো নামটা ফরাসী নয়। মেজকা মশা মারার জন্য ওকে বানিয়েছিল। মশা মারা রোবট থেকে মমারো। এখন হাততালি দেওয়ার কাজ করে। এতে নাকি কাজে উৎসাহ পাওয়া যায়।
মেজকা বিমর্ষ গলায় বলল— “আমার সঙ্গে দিল্লী তো কেউ যাবে না। ভাবছি মমারোকেই নিয়ে যাবো। কেউ তো হাততালি দেওয়ার জন্য থাকবে যখন আমি স্পিচ দেব। তাই কখন ক'বার, কোন কোন বাক্যের শেষে হাততালি দিতে হবে তাই প্র্যাকটিস করাচ্ছি।”
আমি আর বললাম না অপহরণের কথাটা। শেষে যদি না যায়। আমাদের বংশে ভীতুর জিন আছে। আমার ঠাকুর্দার জেঠু বিদেশে থাকত। প্লেনে চড়তে ভয় পেত তাই নোবেল পুরস্কার পেয়েও আনতে যায়নি। আমার ঠাকুর্দা হনুমানের চড় খেয়ে ভয়ে কোনোদিন ছাতে উঠতেন না। আমার বাবা হাইটের ভয়ে কোনোদিন দার্জিলিং যায়নি।
তাই আমি গলায় সাহস এনে বললাম— “চিন্তা করছ কেন? আমি যাবো তোমার সঙ্গে। তোমার অ্যাসিটেন্ট অপূর্ব বসু ওরফে অপু।”
মমারো এই কথায় হাততালি দিল, হাঁফ ছেড়ে বাঁচল যেন।
আমি মেজকাকে আগেরদিন রাত থেকে জ্ঞান দিতে শুরু করলাম— “শোনো মেজকা, রাস্তায় কারোর সঙ্গে কথা বলবে না। কাউকে নিজের পরিচয়, কোথায় কবে কেন এত বলার দরকার নেই।”
কিন্তু সকাল হতেই মেজকা সব ভুলে গেল। আমাদের পাড়ার মুদির দোকানি তরুণ কাকু। কে কবে কোথায় যাচ্ছে সবার হাল হকিকত তার জানা চাইইই চাই।
জেঠু বলেছে একদম জবাব দিবি না। কী করে এমন লোকদের এড়িয়ে যেতে হয় জেঠু শিখিয়ে দিয়েছে।
“এইযে একটু” বলে স্রোতে গা ভাসানোর মতো এগিয়ে যেতে হয়।
কিন্তু মেজকা সে সুযোগ দিলে তো!
ট্যাক্সি ড্রাইভারকেও এক মাস চান না করে, ওট সেদ্ধ খেয়ে কী করে গবেষণা পত্র জমা দিল, সে কথাও বলতে লাগল।
ড্রাইভার বলল— “সবই ভগবানের ইচ্ছে। তাঁর ইচ্ছে ছাড়া গাছের একটা পাতাও নড়ে না।”
মেজকা আবার ভগবান মানে না। ব্যাস! অমনি তর্ক জুড়ে দিল, কেমন করে গাছের পাতা নিজের ইচ্ছেয় নড়তে পারে। কোনোরকমে আলোচনা অন্যদিকে ঘুরিয়ে তবে শান্তি হলো।
মেজকা এয়ারপোর্টেও নিজের গল্পের ঝুলি খুলে বসল, তাও পাবলিক টয়লেটে।
ভেতরে বসেই শুনলাম কাদের সব বলছে— “দিল্লী যাতি, প্রাইজ লাতি!”
বাইরে বেরিয়ে দেখি মেজকা-কে ঘিরে কারা সব দঁড়িয়ে আছে। ষণ্ডা ষণ্ডা চেহারা। জোব্বা পরা। মনে হলো আরব থেকে এসেছে।
“আল হাবিবি, আল হাবিবি”— বলে তারা মেজকা কে জড়িয়ে ধরছে।
বেগতিক দেখে আমি— “মেজকা চলো দেরি হয়ে যাবে।” বলে তাড়া দিলাম।
কিন্তু কপালে থাকলে খণ্ডাবে কে! সেই লোকগুলোই ঠিক একঘণ্টা পরে প্লেনটাকেই নিয়ে নিয়েছে নিজেদের দখলে।
প্লেনটা যে হাইজ্যাক হবে এই আশঙ্কাই করছিলাম।
প্লেনের মধ্যে একটা হুলুস্থুল আয়োজন লেগে গেছে। সবাই ইষ্টনাম জপ করছে। আমার পেটে সকালের খাওয়া কাজুগুলো নাচানাচি করছে। মেজকা দেখি খুব মনখারাপ করে সায়েন্স ম্যাগাজিনটা হাতে নিয়ে বসে আছে। আমাকে বলল— “ঠিক সময়ে তো পৌঁছতেই পারব না রে অপু।”
আমি বললাম— “কী বলছ! আমরা এখন প্রাণে বাঁচলে হয়।”
এর মধ্যে গুড়ুম করে একটা গুলি চলার শব্দ। প্লেনটা একদিকে বেঁকে গেছে। লোকগুলো এবারে এগিয়ে এসে মেজকাকে উদ্দেশ্য করেই বলছে— “সায়েন্টিস্ট কাম হিয়ার। প্লেন চালানা জানতি?”
মেজকা আমার দিকে তাকিয়ে বলল— “অনেকদিন আগে শিখেছিলাম। ভুলেও যেতে পারি। দেখি কী হয়!”
আমি আতঙ্কে চোখ ঢেকে বসে রইলাম। এই অস্ত্রের মুখে তো আমার কুংফু, ক্যারাটে কিছুই কাজে আসবে না।
তারপর প্লেনটা আস্তে আস্তে সোজা হলো। মেজকা ঠাকুর না মানলেও আমি তো মানি। মনে মনে স্মরণ করে বললাম— “ঠাকুর এ যাত্রা বাঁচিয়ে দাও। আর কখনো তোমার ভোগ চুরি করে খাবো না।”
ওই লোকগুলোর মধ্যে একজন আমার দিকে এগিয়ে এসে বলল— “সায়েন্টিস্ট আচ্ছা প্লেন চালাতি!”
ভাবলাম নিশ্চয়ই প্লেনটাকে ওরা মুখ ঘুরিয়ে অন্য কোথাও নিয়ে যেতে বলবে। মুভি গুলোতে তো সেটাই হয়। কিন্তু দেখলাম যে না তা তো নয়। প্লেন তো দিল্লিতেই ল্যান্ড করল। লোকজন দৌড়ে দৌড়ে এ ওকে ঠেলে প্লেন থেকে নামতে শুরু করল। কিন্তু এগিয়ে গিয়ে মেজকাকে খুঁজে পেলাম না। ওই লোকগুলোর আসল উদ্দেশ্য তো মেজকাকে অপহরণ করাই ছিল। মেজকা কীসব সিক্রেট মিশনে যুক্ত আছে। আমি দৌড়োতে দৌড়োতে বাইরে এসে দেখি সেই লোকগুলো মেজকার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করছে।
আমাকে দেখে মাথায় হাত বুলিয়ে বলল— “ভেরি গুড বয়।”
ট্যাক্সিতে উঠেই মেজকা বলল— “আরে ওরা তো ক্রাইম ব্রাঞ্চের লোক। পাইলট আর কো-পাইলটই এইসব চক্রান্তের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তাই ওদেরকে নিকেশ করা হলো। তারপর ওরা জানত আমি কী পারি না পারি।”
— “আর তোমার অপহরণের কথাটা? তুমি জানতে?”
— “ওটা আমিই তোকে পাঠিয়েছিলাম। দেখছিলাম তুই আমার সঙ্গে যাবি কিনা।”
এরপরে মেজকা পুরস্কার নিল। আমিও সব বড়ো বড়ো বিজ্ঞানীদের সঙ্গে ছবি তুললাম।
সেই ছবি মমারোর সামনে বের করতেই মমারো এক চড়ে আমার চোয়াল নড়িয়ে দিল।
মেজকা হেসে বলল, “ওর ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স একটু বাড়িয়েছি। নতুন সংযোজন হিংসে।”
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন