রায়পরিবারে রুনু

শ্যামদাস দে

পত্র-পর্ব

অনেক উৎকণ্ঠাভরা দিন কাটিয়ে শেষ পর্যন্ত বরিশাল ব্রজমোহন কলেজের বিজ্ঞান শাখায় প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছে রুনু। ফ্রিশিপের ব্যবস্থাও হয়ে গেছে। এবার নিশ্চিন্ত মনে চিঠি লিখতে বসল রুনু।

বাড়ি থেকে এসেছে আজ প্রায় একমাস হল। ইতিমধ্যে এক লাইন চিঠি লিখে পৌঁছ-সংবাদ পর্যন্ত জানায়নি বাড়িতে। দাদা বলেছিল পৌঁছেই চিঠি লিখতে। বাবা বলেছিলেন কোথায় থাকার ব্যবস্থা হল, কবে ভর্তি হল, ভর্তি হতে কত টাকা লাগল ইত্যাদি সব খবর বিস্তারিত লিখে জানাতে। মা যদিও চিঠির কথা কিছু বলেননি, কিন্তু রুনু জানে, এতদিন ওর কোনও খবর না পেয়ে মা হয়তো কেঁদে-কেটে একটা কাণ্ডই করে বসেছেন!

কিন্তু ভর্তি না হওয়া পর্যন্ত কী সংবাদ ও দেবে বাবাকে? কেন? ও যে রাত্রে বরিশাল পৌঁছল তার পরের দিনই তো রায় পরিবারে ওর থাকার ব্যবস্থা পাকা হয়ে গেছে। এটাও তো একটা সুখবর। এ খবরটা অন্তত দাদাকে জানাতে পারত ও সেইদিনই। তাতে দাদার কথাও রাখা হতো, মা-বাবাও খানিকটা নিশ্চিন্ত হতেন।

বস্তুত রায় পরিবারের এতগুলি নতুন মানুষের মধ্যে পড়ে এই বিচিত্র পরিবেশটাকে হজম করে নিতে ও এতই ব্যস্ত ছিল যে, বাড়ির কথা ওর মনেই পড়েনি। তারপর আর এক দুর্ভাবনা ছিল ভর্তি হওয়া নিয়ে। ও আদৌ বি. এম. কলেজে ভর্তি হতে পারবে কিনা সেটাই তো শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ছিল একটা মস্ত ধাঁধা। তখন মাঝে মাঝে বাবার কথা মনে পড়েছে বইকি। মনে যখন পড়েছে তখন ভয় আর উৎকণ্ঠা আরও বেড়ে গেছে। সত্যিই যদি ও ভর্তি হতে না পারে, তবে তো কালো মুখ করে ফিরেই যেতে হবে বাড়িতে। বাড়িতে গিয়ে তো সব বলতেই হবে। তার আগে ওই আশাবাদী বৃদ্ধকে এই নৈরাশ্যজনক খবর দিয়ে লাভ কি? শুনে তো হতাশই হবেন। ভাববেন, রুনুর জীবনে যখন নিজের দায়িত্ব নিজের হাতে নেবার প্রথম সুযোগ এল, তখনই সে ব্যর্থ হল।

সারারাত ধরে চিঠি লিখল রুনু। প্রথম চিঠিটা লিখল দাদাকে। পুরো আট পৃষ্ঠার এক সুদীর্ঘ চিঠি। এই চিঠিতেই লিখল স্টিমারে সেই পরিবারটির সঙ্গে পরিচয় থেকে শুরু করে একেবারে কলেজে ভর্তি হওয়া পর্যন্ত সব কথা। রায় পরিবারের রায়মশাই, মাসিমা, ঠাকুমা, পিসিমা, রাঙাবউদি, খগেনদা, ওর দুই ছাত্রছাত্রীর কথাই নয় শুধু, লিখল হারানদাদের কথাও। বরিশালে হারানদার মা-ই ওর প্রথম মাসিমা। হারানদাই ওর প্রথম বন্ধু। তার কথা সবিস্তারেই লিখল দাদাকে। হোক না হারানদা খগেনদার শত্রু, কিন্তু তার যেটুকু পরিচয় রুনু পেয়েছে একরাতে, সেটুকু তার চরিত্রের মহৎ এবং মধুর অংশ। সে হারানদাকে দেখেছে ওর দাদার সঙ্গে একাত্ম করে। এই বাড়ির খগেনদার মধ্যে সেই দাদাকে ও পায়নি।

বাবার চিঠিটা কিছুতেই ওর মনমতো হচ্ছে না। বারবার করে লিখছে আর ছিঁড়ে ফেলছে। বিখ্যাত উকিল দুঃখীরাম বিশ্বাসের কথা কীভাবে যে লেখা যায় বাবাকে, বুঝতেই পারছে না। সত্যি কথা জানালে ভীষণ মর্মাহত হবেন বাবা। তাঁরই একজন প্রাক্তন ছাত্র যে তাঁকে এমন প্রতারণা করেছেন এত দিন ধরে, সামান্য এক উকিলের মুহুরী হয়ে নিজেকে বিখ্যাত উকিল রূপে পরিচয় দিয়েছেন এতদিন, এ সত্যটুকু বাবাকে জানিয়ে কেবল তো দুঃখই দেওয়া হবে। শেষ পর্যন্ত ও প্রসঙ্গ একেবারে বাদ দিয়ে কেবল ভর্তি হবার কাহিনীটা যথাসাধ্য সংক্ষেপে লিখল। লিখল, ভর্তি হতে যখন এক পয়সাও লাগেনি, ফ্রিশিপের ব্যবস্থাও যখন হয়ে গেছে এবং খগেনদার আই. এস. সি-র বইগুলি যখন সবই পাওয়া যাবে, তখন বই কিনতেও বিশেষ কিচ্ছু খরচ হবে না। বাবা যে পঞ্চাশ টাকা দিয়েছিলেন তাতে ওর এক বছরের হাত খরচ চলে যাবে। সুতরাং ওর হাত খরচের টাকা পাঠাবার জন্য বাবা যেন ব্যস্ত না হন। কথা ছিল, ওর হাতখরচ বাবদ মাসে মাসে পাঁচ টাকা করে ওকে পাঠাবেন। সে টাকা পাঠাতে ও বারণ করে দিল। এইসব টাকা-পয়সার হিসাব দিয়ে ও বাবাকে নিশ্চিন্ত করতে চায়। বোঝাতে চায়, ও এখন থেকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চেষ্টা করবে।

চিঠি লিখতে লিখতেই রুনুর মনে পড়ে যায় খোকাদার কথা। সেইসঙ্গে মনে পড়ে চুয়ার কথাও। বড় আশা ছিল রুনুর, কলকাতার খোকাদার দাদার বাসায় থেকে চুয়ার সঙ্গে পড়াশুনা করবে ও। চুয়া এবার নাইনে উঠল। এ চুয়াকে দেখেনি ও। ও দেখেছে সেই ক্লাশ থ্রি চুয়াকে। সেই দুষ্টু হাসি ভরা মিষ্টি মুখখানাই ভেসে ওঠে ওর স্মৃতিতে। হয়তো এ জীবনে আর দেখাই হবে না চুয়ার সঙ্গে। এমনি করে কত মানুষ যে হারিয়ে যায় মানুষের জীবন থেকে! গোবরার হরেকেষ্ট, সুশীলাদি, গোপালগঞ্জের দিলীপদা, বড়মাসি, কমলা, প্রমীলা—সব যেন আস্তে আস্তে কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে। আর তাদের স্থান দখল করছে এই রায় পরিবারের মানুষগুলি। ইতি মধ্যেই তো খগেনদা ওর মনের অনেকখানি জায়গা জুড়ে বসেছেন। ওর শ্রদ্ধার ভাণ্ডারে ভাগ বসিয়েছেন ঠাকুমা, মাসিমা, রায়মশাই। আর রাঙাবউদি? রাঙাবউদি এক আশ্চর্য চরিত্র। যেন এক সহস্রদল পদ্ম তার সমস্ত পাপড়িগুলি গুটিয়ে রেখেছে। মাঝে-মাঝে কেবল একটি-দুটি পাপড়ি একটু করে উন্মুক্ত হয়, আবার গুটিয়ে যায়।

কিন্তু সবার উপরে খোকাদা। ইংরাজিতে একটা কথা আছে—ফ্রেন্ড, ফিলজফার অ্যান্ড গাইড, অর্থাৎ বন্ধু, গুরু এবং পরিচালক। রুনুর জীবনে খোকাদার হল সেই ভূমিকা। খোকাদাকে ও ভুলতে পারবে না কোনও দিন। সবশেষে খোকাদাকেও একখানা দীর্ঘ চিঠি লিখল রুনু। প্রায় সব কথাই লিখল যেমন লিখেছিল দাদাকে।

পত্র-পর্ব চুকিয়ে যখন ঘুমোবার কথা মনে পড়ল রুনুর, তখন হারিকেনটা নিভিয়ে দিল ও। হারিকেন নেভাতেই সামনের জানালা দিয়ে দেখা গেল পুব আকাশের রক্তিম আভাস। দূরে কোথাও ডেকে উঠল ঘুমভাঙা পাখিরা। একটু পরেই ঘুম ভাঙতে শুরু করবে রায়বাড়িরও। পাশের ঘরে খগেনদার অ্যালার্ম ঘড়ি বেজে উঠবে। রুনু আর শুল না। কান পেতে রইল কখন ঘড়িটা বেজে ওঠে।

রুনুর পাঠশালা

কথা ছিল, বড়দার (রায়মশাইয়ের বড় ছেলে দিব্যেন্দু নারায়ণ) দুই ছেলে-মেয়ে গোপাল আর মাধুরী পড়বে রুনুর কাছে। মাধুরী পড়ে ক্লাস এইটে, গোপাল থ্রি-তে। গোপাল এবার ফেল করে একই ক্লাসে রয়েছে। রুনু প্রথম দিনই কথা দিয়েছিল, গোপালকে ও ভালোভাবে পাশ করিয়ে দেবে। খগেনদা অবশ্য বলেছিলেন, গোপাল আসলে একটি গো অর্থাৎ গোরু। ওর কিচ্ছু হবে না। কেবল গো হলে ভয় ছিল না কিন্তু ও যে একটা গোঁয়ারও সেটা বুঝতে একটু সময় নিল।

প্রথম কয়েক দিন গোপল মাধুরীর সঙ্গে এসেছিল ঠিকই ওর বই, স্লেট ইত্যাদি নিয়ে। কিছুটা পড়ানোও ওকে গেছিল। তারপর দেখা গেল, গোপাল প্রায়ই অনুপস্থিত থাকছে। মাধুর কাছে জিজ্ঞাসা করে এক-এক দিন এক-এক রকম জবাব পায় রুনু। কোনও দিন শোনে, ওর পড়ায় মন নেই, ওর কিচ্ছু হবে না—কোনও দিন শোনে, ও নাকি মায়ের কাছে কান্নাকাটি করছে পড়তে আসবে না বলে।

একদিন রুনু নিজেই গেল গোপালকে ধরে আনতে। বড়বউদি অর্থাৎ গোপালের মা তখন ঘরে ছিলেন না। গোপাল একহাতে একখানা হকিস্টিক আর অন্য হাতে একটি হকিবল নিয়ে বাইরে বেরুবার জন্য রেডি। এমন সময় রুনুর মুখোমুখি। রুনু ওর হাত থেকে বলটা ফেলে দিয়ে সেই হাত ধরে বলে, এখন তো খেলার সময় নয় গোপাল, এখন পড়তি হবে। খেলা হবে বিকেলে। এখন পড়তি বসো। তোমার বই-টই কোথায়?

জানি না। ...মুখ গোমড়া করে বলে গোপাল।

রুনু এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখে, আলমারির মাথায় রয়েছে ওর বই-স্লেটের ব্যাগটা। গোপালের হাত ছেড়ে দিয়ে বইয়ের ব্যাগটা আনতে যেই হাত বাড়িয়েছে রুনু, সেই মুহূর্তে পাখি হাওয়া—ঊর্ধ্বশ্বাসে ঘর থেকে ছুটে বেরুল গোপাল হকিস্টিক হাতে নিয়ে। রুনু দৌড়ে গেল তার পিছনে পিছনে। গেটের কাছে গিয়ে ধরেও ফেলল ওর শার্টটা। সঙ্গে সঙ্গে ফিরে দাঁড়িয়ে গোপাল সেই হকিস্টিক দিয়ে রুনুর ডানহাতের কবজির উপর মারল প্রচণ্ড এক বাড়ি। হাত চেপে ধরে বসে পড়ল রুনু আর্ত চিৎকার করে। ততক্ষণে গোপাল গেট পেরিয়ে উধাও।

রুনুর এ এক নতুন অভিজ্ঞতা। যত না দৈহিক ব্যথা, তার চেয়ে অনেক বেশি অপমানের বেদনা। দৃশ্যটা পড়ার ঘর থেকে দেখেছিল মাধু। সে তো হায় হায় করে ছুটে এল। ব্যস্তভাবে ছুটতে গিয়ে শাড়িতে পা জড়িয়ে সেও আছাড় খেয়ে পড়ল উঠোনের মধ্যিখানে। দারুণ ব্যথা পেয়ে কান্না জুড়ে দিল মাধুরী। তার চিৎকারে ছুটে এলেন বড়বউদি, মাসিমা(রায়গৃহিণী), আরও অনেকে। রুনুর কিছু বলতে হল না, মাধুই সবিস্তারে বর্ণনা করল গোপালের কীর্তি-কাহিনী। বড়বউদির তো লজ্জায় একেবার মাটিতে মিশে যাবার দশা। মাসিমাও কম অবাক হননি। গোপাল গোঁয়ার বটে, কিন্তু তা বলে রুনুকে অমন মেরে বসবে, তা কেউ ভাবতেও পারেন নি। আঘাতটা সে সমস্ত শক্তি দিয়েই করেছিল। প্রায় দু-সপ্তাহ ধরে হাতে ব্যান্ডেজ বেঁধে ক্লাস করতে হল রুনুর।

সেদিন গোপালকে অনেক জেরা করে জানা গেল, সে এই নতুন মাস্টারের কাছে পড়বে না। কারণ এ তো মাস্টারই নয়, এত ছোট ছেলে কখনও মাস্টার হতে পারে? এ তো ছাত্র বই বগলে করে স্কুলে যায়।

যুক্তিটা দারুণ। বই বগলে করে যে স্কুলে যায়, সে আবার মাস্টার হয় কী করে? গোপাল মাস্টার বলতে বোঝে ওর পাঠশালার গুরুমশাইয়ের মতো টাকপড়া, শীর্ণকায়, চশমাপরা বুড়োদের। তেমন একজন মাস্টার ওকে পড়াচ্ছিলেন গত কয়েকবছর। শেষ পর্যন্ত তিনিও হাল ছেড়ে পালিয়েছেন। ভবিষ্যতে আবার তেমন একজন মাস্টার না পাওয়া পর্যন্ত আপাতত খগেনদা যদি ওকে দেখিয়ে শুনিয়ে দেয়, তাহলে মন্দ হয় না। প্রস্তাবটা করলেন বড়বউদি। খগেনদাকেই এ-বাড়িতে যা একটু ভয় করে গোপাল।

প্রস্তাব শুনে হাত জোড় করে খগেনদা বলেন, গোপালের মায়েরে পড়াইতে রাজি আছি, কিন্তু তোমার ওই গোপাল সোনারে পড়ানো আমার কম্ম নয়, বউদি।

বড়বউদি হেসে বলেন, মোরে পড়াইবা? হে ক্ষ্যামতা নাই। তোমাদের দাদারে পড়ায় কে তা জানো?

তা বটে। দাদারে পড়াইতে পড়াইতে তো দ্যাশ ছারা করছ।—দেবরসুলভ ঠাট্টার সুরে বলেন খগেনদা, অখন তুমিও তোমার গোপালেরে লইয়া কইলকাতার বাসায় যাইয়া ওঠতে পারলেই নিশ্চিন্দি।

কলকাতার বাসায় যাবার একটা গোপন বাসনা আছে বড়বউদির মনে। বড়দা ছুটিছাটায় বাড়ি এলেই নাকি তাঁকে নানাভাবে পটাতে চেষ্টা করেন বউবউদি। সে বাসনা আজও পূর্ণ করতে পারেননি বড়দা। কারণ, তাঁর আয় অতি সামান্য, তাতে কলকাতায় সংসার করা চলে না। এসব কথা শুনেছে রুনু খগেনদার কাছে। আজও দেখল, খগেনদার কথায় বড়বউদির মুখখানা রাঙা হয়ে গেল। মুখঝামটা দিয়ে উনি বললেন, থাউক, আমার গোপালেরে কারও পড়াইতে লাগব না। অয় তো গুন্ডা আছেই। মনে কইরা দেখ, ওই বয়সে তুমিও কম গুন্ডা আছিলা না ঠাকুরপো।

—গুন্ডা আমি অখনও আছি, তয় তোমার পোলার মতো মাস্টারের গায়ে হাত তুলুম না কোনও দিন। ওডি যা তৈরি হইতে আছে, একখান মার্কামারা চিজ হইব! তোমার কপালে অনেক দুঃখু আছে।

হয়, তাইলে তো তোমাগো খুব সুখ হয়। —ভারী গলায় বলেন বউদি।

রুনুর পাঠশালা থেকে গোপালের নাম কাটা যেতেই সেই শূন্যস্থান পূরণ করল আর একটি ছাত্রী নাম প্রতিমা। পিসিমার দ্বিতীয়া কন্যা। এ ও পড়ে ক্লাস এইটে মাধুরীর সঙ্গে। পড়ানোর দিক থেকে সুবিধাই হল রুনু। ভিন্ন ভিন্ন ক্লাসের দুজনকে পড়ানোর চেয়ে এক ক্লাসের একাধিক ছাত্রকে পড়ানো সহজ।

গোপালকে পড়াবার দায় থেকে রুনু নিষ্কৃতি পাওয়ায় খুশি হলেন খগেনদা, খুশি হলেন বাড়ির আর সকলেও, কেবল মুখ ভার করে রইলেন বড়বউদি।

এই পরিবর্তনে যিনি সব থেকে বেশি খুশি হলেন তিনি পিসিমা। নাবালক পুত্র নিখিল আর দুই কন্যা নীলিমা-প্রতিমাকে নিয়ে রায়মশাইয়ের দূর সম্পর্কে এই আত্মীয়টি বিধবাবেশে যেদিন এই রায় পরিবারে আশ্রয় নিয়েছিলেন, সেদিন তাঁর বয়স চব্বিশ-পঁচিশের বেশি নয়। সেই থেকে পনেরো-ষোলো বছর এই পরিবারে উনি আশ্রিতা হয়ে আছেন। এখন অবশ্য তাঁকে আর আশ্রিতা ভাবে না কেউ, ভাবে রায়মশায়ের আপন বোন, যেমন ভেবে ছিল রুনু প্রথম দিকে। সেদিনের সেই নাবালক নিখিল আজ ম্যাট্রিক পাশ করে কোথায় কী একটা সামান্য কেরানির চাকরি করে। বড় মেয়ে নীলিমা পড়ে ক্লাস টেনে। নীলিমা-প্রতিমার কোনও দিনই কোনও টিউটর ছিল না। ছাত্রী ওরা কেউ খারাপ নয়, নিজের চেষ্টাতেই বরাবর পাশ করে এসেছে। টিউটর থাকলে নিশ্চয়ই আরও ভালো রেজাল্ট করত ওরা। এ নিয়ে পিসিমার মনে একটা অভিমানও আছে, কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারেননি কোনও দিন। এবার রুনুর পাঠশালায় মাধুর সঙ্গে এক-ক্লাসে পড়া প্রতিমাকে জুড়ে দেবার সুযোগ আসতেই তিনি মাসিমাকে সহজেই রাজি করে ফেললেন। এ ব্যাপারে মাসিমার কথাই যে শেষ কথা তা জানে এ বাড়ির সকলেই। সুতরাং গোপালের পরিবর্তে প্রতিমা ভর্তি হয়ে গেল রুনুর পাঠশালায়।

এই পরিবর্তনে কিন্তু সবচয়ে বড় আঘাত পেল রুনু নিজেই। এ যেন ওর একটা মস্ত পরাজয়। নয়-দশ বছরের একটি বালকের কাছে শিক্ষকের ভূমিকায় এ-ই ওর প্রথম পরাজয়। এ পর্যন্ত যেখানেই যাকে পড়িয়েছে ও, কোনও ছাত্রই ওকে এমন করে উপেক্ষা করতে পারেনি। ছাত্রের মনে জয় করতে কোথাও ব্যর্থ হয়নি রুনু। শিশুদের মন জয় করার যে সহজাত শক্তি ছিল ওর মধ্যে, সে শক্তি কি হারিয়ে ফেলল ও এই বড় শহরে এসে? নাকি শহরের শিশু আর গ্রামের শিশুর চরিত্র আলাদা? ওর মধ্যে যে গ্রাম্যতা রয়েছে, তাই দেখে কি শহুরে গোপাল ওকে অবজ্ঞা করল!

এই গোপালকে জয় করতে না পারলে কিছুতেই ওর মনের অস্বস্তি কাটবে না। কিন্তু কোন রণ-কৌশলে এই যুদ্ধে বিজয়ী হওয়া যাবে, ওর মাথায় আসছে না। মনের গভীরে ও হাতড়ে দেখছে, সেখানে গোপালের উপর ওর আর একটুও রাগ নেই; যত রাগ ওর নিজের অক্ষমতার উপর।

মাধুরী আর প্রতিমা

মাধুরী বড়দার প্রথম সন্তান, রায়মশাইয়ের প্রথম নাতনি। স্বভাবতই এ-বাড়ির সকলের কাছেই তার দারুণ আদর। চোদ্দো-পনেরো বছরের বছরের মেয়ে। সুন্দর স্বাস্থ্য, বাড়ন্ত গড়ন, তাই বয়সের তুলনায় তাকে দেখায় আরও বেশি বড়, মনে হয় রুনুর সমবয়সি। মাথায় সে ইতিমধ্যেই তার মায়ের সমান হয়ে উঠেছে। একালের মতো তখন মেয়েদের ফ্রক পরার প্রচলন ছিল না। শৈশব থেকেই শাড়ি পড়তে হতো। মাধুরীর এখন নিত্য নতুন শাড়ি পরা চাই। সাজগোজের দিকে ওর খুব নজর। এই মেয়ে কিন্তু মাসিমার কাছে এখনও কচি খুকি। তিনি ডাকেনও ওকে খুকি বলে। তাঁর কাছে খুকির সাতখুন মাপ। সারা বাড়িতেই তাই খুকির দারুণ প্রভাব-পতিপত্তি। অমন গুরুগম্ভীর রায়মশাই পর্যন্ত খুকির সঙ্গে মাঝে মাঝে হালকা রসিকতা করেন। এ মেয়ে খগেনদাকেও তুড়ে দুকথা শুনিয়ে দিতে ভয় পায় না। খগেনদাকে ডাকে ছোটকা বলে, কিন্তু সম্বোধন করে তুই। কাকাকে কেউ যে তুই তোকারি করতে পারে, এ ধারণা ছিল না রুনুর।

একদিন কথাটা তুলল রুনু। জানতে চাইল ও কেন ওর বয়ঃজ্যেষ্ঠ কাকাবাবুকে তুই সম্বোধন করে। মাধুরী সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিয়েছিল অয় কেন মোরে তুই কয়?

—বাঃ, উনি তো বয়সেও বড়, সম্পর্কেও বড়।

আর আমি যে বড়দি! অরে তো সবাই ছোটদা ডাকে।—সতেজে বলল মাধুরী।

এত বড় মেয়ের মুখ থেকে এই ছেলেমানুষি যুক্তি শুনে হেসে ফেলল রুনু।

হাসস ক্যান? না, না, থুড়ি,—জিভ কেটে বলে মাধুরী, আপনে মাস্টোর। আপনার লগে তুই-তুকারি করলে দিদায় বকব।

যেন দিদার বকার ভয়েই রুনুর সঙ্গে আপনি করে কথা বলছে ও। না হলে খগেনদার মতো রুনুকেও তুই সম্বোধন করত। মাস্টার হওয়ার এই এক বিষম সম্মান লাভ করে রুনু সেদিন মাধুরীর কাছে যেন একটা ধাককা খেল। খগেনদাকে যে তুই বলে, সে যে ওর মতো একটা পুঁচকে ছেলেকে আপনি বলছে, সে যেন ওর অসীম কৃপা।

এসব অনেক পরের কথা।

প্রথম দিন গোপাল আর মাধুরীকে রুনুর পড়ার ঘরে পৌঁছে দিয়ে মাসিমা বলেছিলেন, এ-ই তগো নতুন মাস্টোর। কাইল তো এরে দ্যাখছই আর এই দুডি হইল তোমার ছাত্তর। কাইল কেবল মুখ-চেনা হইছে, আইজ নিজেরা পরিচয় করিয়া লও। অরে গোপাইল্যা, মাধু, প্রণাম কর প্রণাম কর। মাস্টোরের প্রণাম করতে হয়।

কী জানি সেদিন মাধুরী সত্যিই ওকে প্রণাম করত কিনা। রুনু অবশ্য সেদিন ওদের কাউকেই প্রণাম করার সুযোগ দেয়নি। ওরা ঘরে ঢুকতেই সে সসম্ভ্রমে উঠে দাঁড়িয়েছিল। মাসিমার কথা শেষ হবার আগেই সে গোপালের হাত ধরে একটা চেয়ারে বসিয়ে দিয়েছিল, আর সন্ত্রস্তভাবে মাধুকে বলেছিল, না, না, প্রণাম করতি হবে না, প্রণাম করতি হবে না!

কথা শেষ করেই চলে গেছিলেন মাসিমা। মাধুরী তখনও দাঁড়িয়ে আছে টেবিলের সামনে। হয়তো সকৌতুকে দেখছে তার নতুন 'মাস্টোর'-কে। বইয়ের বোঝাটা ও রেখেছে টেবিলের উপর, আর সেই বইয়ের উপর রেখেছে দুখানা হাত। রুনু দেখছে মাধুরীর দুহাতে বেশ চওড়া দুখানি স্বর্ণালঙ্কার ঝকমক করছে। এ অলঙ্কার ইতিপূর্বে দেখেনি রুনু। কী জানি এর কী নাম। দেখছে তার বাঁহাতের অনামিকায় একটা পাথর বসানো আংটি, টকটকে লাল পাথরখানা হ্যারিকেনের আলোয় ঝিকমিক করছে। কী একটা দুর্জ্ঞেয় সঙ্কোচে রুনু মুখ তুলতে পারছে না। মাথা নত রেখেই বলল, আপনিও বসুন।

কথাটা শুনেই মাধুরীর সে কী খিলখিল হাসি!

হাসস ক্যানরে পোড়ারমুখী? উঠোন থেকে ধমকে উঠেছিলেন মাসিমা।

—শোনছনি দিদা হিঃ হিঃ হিঃ...তোমার মাস্টোরে মোরে কয় 'আপনে বসুন'! হিঃ হিঃ হিঃ!

ভুলটা বুঝেছিল রুনু। পরমুহূর্তেই নিজের ভূমিকায় সচেতন হয়ে চেয়ারে বসে প্রায় ধমকের সুরে বলেছিল সেদিন, বসো। আমার কাছে পড়তি আইছ, বাচালতা করতি না। একটা ভুল হয়ে গেছে, তাতে অত হাসার কী আছে?

বসেছিল মাধুরী। একটু যেন গম্ভীর। আবার একটা হাসির গমক। হাসি চেপে বলছিল, আপনেরা কন 'খাতি নাতি বেলা গেল', না? হিঃ হিঃ হিঃ!

কই-ই তো—কড়া গলায় বলেছে রুনু, যে দেশের যে ভাষা। তা বলে আমরা তো কই না 'জ্যাডা গো জ্যাডা, মোরে দুগা কাডালের আডি!' আমরা তো কই না, 'খামু, লমু, যামু।' তোমাগো কথা শুনে তো আমারও হাসি পায়। আমি তো হাসি না। ইয়ার্কি আমি পছন্দ করি না।

গুরুগম্ভীর পণ্ডিতি গলায় কথাগুলি শেষ করে ওর বইয়ের বোঝাটা কাছে টেনে নিয়েছিল রুনু। তখনও পর্যন্ত তাকায়নি মাধুরীর মুখের দিকে। এ রুনু শ্রীনাথ পণ্ডিতের ছেলে। এর বয়স কম হলেও ব্যক্তিত্ব কম নয়। এইটুকু ছেলের তেজ দেখে মাধুরী যেন থমকে গেছিল। একটু যেন লজ্জাও পেয়েছিল। নরম গলায় বলেছিল, মোরে ক্ষমা করেন মাস্টোরমশায়। আর করুম না।

এইবার রুনু চোখ তুলে তাকিয়েছিল মাধুরীর মুখের দিকে। মিস্টি করুণ ক্ষমাপ্রার্থী একখানা মুখ। এই মুখেই তো একটু আগে কত হাসি ছিল! এবার রুনুই হেসে বলেছিল, আমারে মাস্টারমশাই ডাকতি হবে না। আমারে ডাকবা কাকু।

শুধু কাকু? ঠাকুমা তো আপনেরে রাঙাদাদু ডাকে, আমরা ডাকুম রাঙাকাকু। হেইডা ভালো না?...মুচকি হেসে বলেছিল মাধুরী।

না, ওসব রাঙা-ফাঙা না। শুধু কাকু ডাকবা।—মাস্টারি গাম্ভীর্যে বলেছিল রুনু।

তারপর থেকে রুনুর সামনে মাধুরীকে আর বাচালতা করতে দেখা যায় নি। হয়তো সে সুযোগই দেয়নি রুনু।

গোপালের পরিত্যক্ত চেয়ারে যেদিন প্রতিমা এসে বসল, সেদিন তাকে কেউ প্রণাম করতে বলেনি। সে তার বইয়ের বোঝাটা টেবিলে নামিয়ে রেখে নম্রভাবে রুনুকে প্রণাম করল। টেবিলের তলায় পায়ের পাতায় ভারী কোমল স্নিগ্ধ একটু স্পর্শ। সরে যাবার অথবা পা সরিয়ে নেবার কোনও সুযোগই পেল না রুনু। এই নম্র প্রণামটি বড় ভালো লাগল রুনুর।

নতমুখে পাথরের প্রতিমার মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল প্রতিমা। পাশের চেয়ার থেকে খিলখিল করে হেসে উঠল মাধুরী। কারণে-অকারণে যখন-তখন উচ্চ হাসি ওর একটা স্বভাব-দোষ। বাড়ির মধ্যেও প্রায়ই শুনতে পাওয়া যায় ওর হাসির ঝরনাধারা। এ হাসিতে কিন্তু সেই পাথরের প্রতিমা একটুও টলল না। মাধুর দিকে তাকাল না পর্যন্ত।

আবার হাসার কী হল?—ধমক লাগায় রুনুর গম্ভীর গলায়।

ধমক খেয়েও মাধুর হাসি থামে না। হাসতে হাসতে বলে, পিসির যা ভক্তি, অয় নিঘঘাত ফাস্টো হইব এবার। প্রণাম কইরাই আপনেরে...হিঃ হিঃ হিঃ...

যাঃ, অসভ্য! —মৃদু গলায় মাধুকে ধমক দিল প্রতিমা—মাস্টোর মশায়রে তো প্রণাম করতেই হয়।

—আচ্ছা কাকু, আমি তো আপনেরে কাকু ডাকি, অয়, কী বলিয়া ডাকব?

মহাসমস্যায় পড়ল রুনু। মাধু যাকে পিসি বলে ডাকে, সে ওকে কী বলে ডাকতে পারে? রুনু একটু বুদ্ধিখাটিয়ে বলল, খগেনদাকে যা বলে ডাকে, আমাকেও তাই-ই ডাকবে।

বাঃ, তারে তো ছোটদা ডাকে, আপনেরেও তা-ই ডাকব? তবে তো দুইজনেই এক ডাকে...হিঃ হিঃ হিঃ...

—না, না, ছোড়দা নয়, আমারে ডাকবে রুনুদা বলে। বাজুনিয়ায় আমার দুজন ছাত্র ছিল, তারা আমারে রুনুদা বলে ডাকত।

ছিঃ। —লজ্জারাঙা মুখে বলে প্রতিমা, আমি মাস্টোরমশায়ের নাম ধরিয়া ডাকতে পারুম না। আমি ডাকুম রাঙাদা। মায় শিখাইয়া দিছে।

এবার আর 'রাঙা' বিশেষণে আপত্তি করতে পারল না রুনু। মৌন সম্মতি জানাল। জিগ্যেস করল কী নাম তোমার?

—প্রতিমা। কুমারী প্রতিমা গুহ।

—তোমরা দুজনেই কি এক স্কুলে পড়ো? এক ক্লাশে যে পড়ো সে তো জানিই।

—হ্যাঁ।

—গত পরীক্ষায় কে বেশি নম্বর পাইছিলে?

প্রতিমার মাথাটা আরও নত হল। বিব্রত ভাবে বলল, আমার তো কোনও টিউটর ছিল না, আমি নিজে নিজেই পড়া করছি। সব সাবজেক্টে পাশও করছি। মাধু তিনডা বিষয়ে আমার থনে বেশি নম্বর পাইছে।

এবার তো তোমারও মাস্টার হল।—হেসে বলে রুনু, এবার দেখি কে বেশি নম্বর পায়।

প্রতিমা কথা বলে না। মাধুরী বলে, অয় নিঘঘাত বেশি পাইব। এবারও তো টোটালে আমার থনে বেশি পাইছিল।

—আমার ছাত্ররা কিন্তু বরাবর ক্লাশে ফার্স্ট-সেকেন্ড হয়। তোমরা হতি পারব না?

ওরে ব্বাবা!—মাধুরী বলে, ফার্স্ট হওন আমার কম্ম না। তপতী যা দারুণ ছাত্রী! সব সাবজেক্টে পাকা। অঙ্কে তো বরাবর একশো পায়।

অঙ্কে একশো পাওয়া কঠিন নয়।—গম্ভীর গলায় বলে রুনু, তুমি কত পাইছিলে এবার?

কমু না। —মিটিমিটি হাসে মাধুরী—পিসিও কিন্তু অঙ্কে দারুণ। অয় পাইছিল সত্তর। তাইতেই তো টোটালে আমারে মাইরা দিল।

তা-ই নাকি?—সোৎসাহে বলে রুনু, তবে তো এবার তোমার একশো পাতি হবে প্রতিমা। তা না হলি যে আমারই মান থাকবে না! কিন্তু তুমি কত পাইছিলে বলো তো মাধু?

—অর ঠিক অর্ধেক।

একথা বলতেও মাধুরীর ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি।

দুজনেই এক স্কুলে এক ক্লাশে পড়ে, এইটুকুই যা মাধুরী আর প্রতিমার মধ্যে মিল। এ ছাড়া মিল নেই আর কোথাও। মাধুরী সদাচঞ্চল, প্রতিমা শান্ত-নম্র। মাধুরী ফরসা, উজ্জ্বল স্বাস্থ্যবতী, প্রতিমা ময়লা, ম্লান, নিষ্প্রভ। মাধুরীর কথায় কথায় প্রাণখোলা হাসি, প্রতিমা হাসতে জানে বলেই মনে হয় না। প্রতিমা নাকি মাধুরীর থেকে দুই বছরের বড়। অথচ রোগা ও বেঁটে বলে তাকে দেখায় অন্তত দু-তিন বছরের ছোট। তবে ওর চোখ দুটি সত্যিই অপরূপ। যেন কোনও শান্ত শীতল সরোবরে ফুটে আছে দুটি নীল পদ্ম। মুখখানিতে ওর একটা বিষণ্ণ কোমলতা। মাধুরী কথার ফুলঝুরি, প্রতিমা স্বল্পবাক। মাধুরী সারাক্ষণ সেজেগুজে থাকে, প্রতিমার সাজ অতি সাদাসিধে। এমন কি ওর স্কুলে যাবার সাজও আটপৌরে।

এই বিপরীত চরিত্রে দুটি ছাত্রীকে নিয়ে রুনুর পাঠশালা যেদিন নতুন করে শুরু হল, সেদিন রায়পরিবারের এই উপেক্ষিতা মেয়েটির প্রতি একটা কোমল মমতায় বুক ভরে উঠল রুনুর।

অপ্রত্যাশিত আবির্ভাব

ভোরে ওঠার অভ্যাস রুনুর বরাবরের। ভোরে ওঠেন খগেনদাও। খগেনদা ভোরে উঠে গুনে গুনে একশো ডন, দুশো বৈঠক আর নানারকম ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ করেন প্রায় ঘণ্টাখানেক ধরে। তারপর আসে ওর জিমন্যাস্টিক ক্লাবের কয়েকটি ছাত্র। তারা খগেনদার খাটের তলা থেকে ডাম্বল, মুগুর, চেস্ট এক্সপ্যান্ডার ইত্যাদি নানা যন্ত্রপাতি নিয়ে যায়। খগেনদা যান তাদের পিছনে পিছনে দু-পকেটভর্তি ভিজে ছোলা নিয়ে ক্লাবঘরে। ক্লাবঘর মানে রায়বাড়ির পিছন দিকে একটা ছোটখাটো টিনের শেড। সেটা ওদের গ্রিনরুম। সেই ঘরে ওরা ধুতি-জামা ছেড়ে রেখে ব্যায়ামের পোশাক পরে। সামনের প্রাচীর-ঘেরা খোলা মাঠটায় শুরু হয় তাদের বিবিধ ব্যায়াম। সেখানে খগেনদা ওদের গুরু।

এই কটি চেলা খগেনদার দারুণ ভক্ত। প্রায় প্রত্যেকেরই চেহারা বেশ শক্ত-পোক্ত। তাদের তৈরি করছেন খগেনদা। কালক্রমে তারাও নাকি খগেনদার মতোই দর্শনীয় সুগঠিত দেহ লাভ করবে। বিভিন্ন স্কুলের বিভিন্ন ক্লাশের ছাত্র ওরা। ওদের নিয়েই খগেনদার জিমন্যাস্টিক ক্লাব। রুনুকেও তাঁর ক্লাবে ভর্তি করে নিয়েছেন খগেনদা।

সকালে কিন্তু হাত-মুখ ধুয়েই পড়তে বসে যায় রুনু। ও সময়টা ও কিছুতেই ব্যায়ামচর্চায় দিতে রাজি হয়নি। তবে বিকেলে রুনুকে যেতেই হয়। দু-চারটে কসরতও করতে হয় দলে পড়ে। এক-একদিন আনাড়ি হাতে ব্যাডমিন্টনও খেলতে হয় রুনুকে।

প্রায় মাসখানেক রুনুকে নানাভাবে তালিম দিতে দিতে খগেনদা আবিষ্কার করলেন, হাইজাম্পে ওর উন্নতির সম্ভাবনা খুব উজ্জ্বল। তবে নিয়মিত প্র্যাকটিস করতে হবে। তা, প্র্যাকটিসের ঠেলায় পিঠ, কোমর, হাঁটু ব্যথা হয়ে গেল রুনুর, হাঁটতে লাগল খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। তবু ওর দুর্দশা দেখে দয়া হল না নির্দয় গুরু খগেনদার। কয়েক দিন নানা কায়দায় ম্যাসাজ করে ওর ব্যথা সারিয়ে দিলেন তিনি।

অল্পদিনের মধ্যেই হাইজাম্পে রুনুর উন্নতির প্রমাণ পাওয়া গেল। কোনও কোনও দিনও তো ফাস্টই হয়ে যেত। ওর দেহের গঠনেও দেখা গেল উন্নতির লক্ষণ। খগেনদার ঘরে আছে এককানা মস্ত আয়না। তার সামনে দাঁড়িয়ে মাঝে মাঝে নিজের শরীরটার দিকে চেয়ে বেশ উত্তেজিত বোধ করে রুনু, নিজেকে এখন বেশ শক্ত-সমর্থ এক তরুণ বলে মনে হয়। রুনুর এই শারীরিক উন্নতি নজরে পড়ে সকলের। প্রচুর বাহাদুরি নিলেন খগেনদা এবং সেই সুযোগে সকালেও রুনুকে দিয়ে কিছু ডন-বৈঠক আর ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ তালিম দিতে শুরু করলেন।

রুনুর ছাত্রীরা পড়তে আসে সকাল আটটায় মেসোমশাই বেরিয়ে যাবার পর। তার আগেই প্রায় দুঘণ্টা পড়া হয়ে যায় রুনুর। সন্ধ্যায় ওরা পড়তে আসে সাড়ে ছটা থেকে সাতটার মধ্যে। ও সময়টা রুনুর নিজের পড়া এবং ওদের পড়ানো, দুটো কাজই চলতে থাকে একসঙ্গে। চলতে থাকে রাত সাড়ে নটায় খাবার ডাক পড়ার আগে পর্যন্ত। তারপর খেয়ে এসে পড়তে পারে ও যতক্ষণ খুশি।

ফার্স্ট ইয়ারের প্রথম দিকে পড়ার বেশি তাড়া ছিল না। রুনু সকালে যেটুকু পড়ত, তাতেই কাজ চলে যেত। ও সময়টা নাকি, খগেনদার ধারণা, আর্টস-এর ছেলেরা বই ছোঁয়ও না, কেবল আড্ডা মেরে বেড়ায়। কিন্তু সায়েন্সের ছেলেদের কেমিস্ট্রির ফর্মূলা আর ট্রিগনমেট্রির সূত্র মুখস্থ করতে করতে প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়। কেমিস্ট্রিকে সত্যিই একটা বিপজ্জনক বিষয় মনে হচ্ছে রুনুর। ফর্মূলাগুলি ভীষণ প্রতারণা করে, দুদিনও মুখস্থ থাকে না। ফিজিক্স আর ম্যাথামেটিক্স নিয়ে ওর মাথাব্যথা নেই। অঙ্কে ও বরাবরই ভালো। ফিজিক্সও বেশ ভালো লাগছে। ভয় কেবল কেমিস্ট্রিকে নিয়ে।

রবিবার ওর ছাত্রীরা পড়তে আসে না, তাই রবিবারগুলোর পুরো সদ্ব্যবহার করে রুনু। এমনই এক রবিবারের দুপুরে ও মাথা ঝুলিয়ে ঝুলিয়ে কেমিস্ট্রির ফর্মূলা মুখস্থ করছে, এমন সময় ওর ঘরের দরজায় সামান্য একটু শব্দ হতেই ও চোখ তুলল। দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন রাঙাবউদি হাসিকে কোলে নিয়ে। তাঁর ঠোঁটের কোণে মিটিমিটি হাসি।

প্রায় তিন মাস হল এ-বাড়িতে এসেছে রুনু। সেই প্রথম দিন ঠাকুমার দরবারে বসে যা দু-একটা কথা হয়েছিল রাঙাবউদির সঙ্গে। তারপর আর একটা কথা বলারও সুযোগ আসেনি। অবশ্য ঠাকুমার দরবারে তারপরও কয়েকবার ওঁকে দেখেছে রুনু। দেখেছে হাসিকেও এর-ওর কোলে। দু-একদিন হাসি কৃপা করে রুনুর কোলেও কিছুক্ষণ থেকেছে। ওকে ডাকতে শুরু করেছে তাতা বলে। কিন্তু সেই প্রথম দিনের পরে রাঙাবউদি নিজে যেমন রুনুর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেননি, রুনুও তেমনি কী যেন একটা সঙ্কোচে উপযাচক হয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে পারেনি।

রাঙাবউদি আর হাসি, এই দুটি মানুষ এই বাড়িতেই আসে সর্বক্ষণ, তবু রুনুর কাছে ওরা যেন দূর আকাশের জ্যোতিষ্ক। কী নিঃশব্দ ওদের অস্তিত্ব! তিন বছরের হাসিকে অবশ্য আদর করে সকলেই। সে তার অনবদ্য নিজস্ব ভাষায় কথাও বলে সবার সঙ্গে। কিন্তু তার গলার আওয়াজ এত মৃদু যে, দুহাত দূর থেকেও শোনা যায় না। তেমনি মৃদুভাষী রাঙাবউদিও। তিনি হয়তো বাড়ির মধ্যে কখনও কখনও কথা বলেন, কিন্তু সে গলার আওয়াজ রুনুর পড়ার ঘর থেকে কোনও দিনও শোনা যাবে না। প্রথম দিনের সেই উজ্জ্বল রাঙাবউদি যেন দিনে দিনে ম্লান নিষ্প্রভ হয়ে গেছেন, রুনুর কাছ থেকে অনেক দূরে সরে গেছেন। দিনে দিনে কেবল অভিমানই সঞ্চিত হয়েছে রুনুর বুকে। ওর মাঝে মাঝে মনে হয়েছে, সেই প্রথম দিনের স্নিগ্ধ রাঙাবউদি বুঝি একটা স্বপ্ন।

সেই স্বপ্ন আজ মূর্তিমতী হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন ওর দোরগোড়ায়। দেখা যাচ্ছে সেই অপরূপ হাসিটুকু ওঁর ঠোঁটের কোণে। যেন একখানা জীবন্ত সরস্বতী প্রতিমা। গ্রামের পাঠশালায় সরস্বতী পুজোর দিনে মনে মনে যে সরস্বতী-মূর্তি রুনু কল্পনা করত, সেই কল্পনাই যেন আজ বাস্তব রূপ গ্রহণ করেছে। সে সরস্বতীর কোলে বীণা, এ সরস্বতীর কোলে যেন দেবশিশু—এইটুকুই যা তফাত।

সারা বাড়িটা এখন দিবানিদ্রায় নিথর। খগেনদাও খাওয়া-দাওয়া সেরে বেরিয়ে গেছেন ক্রিকেট খেলতে কলেজ মাঠে। ডাকাডাকি করেছিলেন রুনুকেও। কিন্তু এই দুপুর রোদে পড়া ফেলে খেলা দেখার শখ নেই রুনুর। ও হাত জোড় করে বলেছিল, আমার এখন পড়তি হবে। মাপ করুন খগেনদা রবিবারটা মাটি করতি চাই নে।

বস্তুত খগেনদা চলে যেতেই পড়তে বসেছিল রুনু। নিস্তব্ধ দুপুরে পড়াটা জমেওছিল ভালো। এমন সময় 'দুয়ারে আজ এ কী আবির্ভাব!'

কি জানি, রাঙাবউদির চোখে তখন কী দেখেছিল রুনু। পুলকিত বিস্ময়ে অপলক চেয়ে রইল সে সেই হাসিভরা চোখদুটির দিকে। রাঙাবউদি তেমনি দাঁড়িয়ে আছেন দরজার একটা পাল্লা ধরে রণুর চোখে চোখ রেখে। প্রথম কথা বলল হাসি। ও রাঙাবউদির কোল থেকে দুহাত বাড়িয়ে বলে, তাতা দাব্ব।

মুহূর্তে বিছানা থেকে লাফ দিয়ে নামল রুনু। রাঙাবউদির কোল থেকে লুফে নিল হাসিকে। হাসির পরনে ছোট্ট একটা ইজের, দুপায়ে চারগাছা রূপোর মল। রুনু কোলে নিতে একবার ঝুমঝুম করে বেজে উঠল সেগুলি। গলায় সরু একগাছা সোনার হার চিকচিক করছে। মাথায় বোধ হয় আজ সাবান দিয়েছে। রেশমের মতো চুলগুলি ফুলে-ফেঁপে দুকান ঢেকে কাঁধের উপর নেমে এসেছে একটা ছন্দিত তরঙ্গে। এ মূর্তিতে ইতিপূর্বে হাসিকে দেখেনি রুনু। যখনই দেখেছে ঠাকুমার দরবারে, তখনই সে সুসজ্জিতা, মাথার চুল থেকে পা পর্যন্ত তার বিচিত্র সাজ। গায়ে মূল্যবান সেন্টের গন্ধ। আজকের এই খালি-গা হাসির গায়েও একটা ভারী মিষ্টি গন্ধ। এই বুঝি স্বর্গীয় পারিজাতের গন্ধ। ওর গায়ের রঙটি যাকে বলে দুধে-আলতায়। ওকে দুহাতে বুকে জড়িয়ে ধরে মধুর একটা সুখস্পর্শে রুনু একেবারে বিহ্বল হয়ে গেল যেন। জীবনে অনেক শিশু ও কোলে করেছে, কিন্তু এমন কুসুম কোমলতা, সুগন্ধ, সুখস্পর্শ, স্বর্গীয় সুষমা, সব মিলিয়ে এমন একটা বুক জুড়োনো অনুভূতি ও আর কখনও পায়নি। হাসিও যেন বুঝতে পেরেছে রুনুর এই আবেগটুকু। সে-ও তার সোনার কঙ্কন পরা ফুলের মতো কোমল হাতদুখানি দিয়ে জড়িয়ে ধরেছে রুনুর গলা। কতক্ষণ যে এমনিভাবে বুকে জড়িয়ে রেখেছিল হাসিকে, রুনুর খেয়াল নেই। চমক ভাঙল রাঙাবউদির কথায়—দুটিতে যে দারুণ ভাব হয়ে গেল দেখছি! তা হলে ও রইল তোমার কাছে। আমি যাই।

না না না, যাবেন না, যাবেন না রাঙাবউদি!— উচ্ছ্বসিতভাবে বলে রুনু, আপনি আসবেন আমার ঘরে, ভাবতিও পারি নাই। আমার যে কী আনন্দ হচ্ছে। কী বলে যে আপনাকে...

কথা শেষ না করেই রাঙা হয়ে উঠল রুনু।

—আমাকে ধন্যবাদ দিতে চাও? আচ্ছা, তোমার ধন্যবাদ আমি গ্রহণ করলাম। এবার দয়া করে তুমি বোসো, নাহলে যে আমিও বসতে পারছি না।

—কেন?

—বাঃ, তুমি হলে এ-বাড়ির মাস্টারমশাই, তুমি দাঁড়িয়ে থাকলে আমি বসি কী করে?

—ছিঃ, ছিঃ, কী যে বলেন! বসুন, বসুন এই বিছানায় ...না, না, ওই চেয়ারটায়।

—আগে তুমি বোসো।

হাসিকে কোলে নিয়ে রুনু বসে পড়ল বিছানার উপর। সঙ্গেসঙ্গে রাঙাবউদিও বসলেন ওর পাশে। সেই মিষ্টি গন্ধটা আসছে রাঙাবউদির গা থেকেও।

বিছানায় বসতেই হাসি বলে, তাতা বিতানে তোব্ব।

ওর দেবভাষার ব্যাখ্যা করে দিলেন রাঙাবউদি—ও তোমার বিছানায় শোবে। এতক্ষণ আমাকে কী ভীষণ জ্বালিয়েছে মেয়ে! কিচ্ছুতেই শোবে না। তাই তো বিরক্ত হয়ে বেড়াতে বেরিয়েছি। তোমার পড়ার ডিসটার্ব হল তো?

—একটুও না, একটুও না। আমার খুব ভালো লাগছে।

রুনুর কোলের মধ্যে মোচড় দিয়ে উঠে আবার বলে হাসি, আমি তোব্ব।

এখন দেখো, মেয়ের আবার শোবার বাতিক হল। শ্রীমতীর মতি বোঝা দায়!—হেসে বলেন রাঙাবউদি।

রুনুর কোল থেকে হাসিকে নিয়ে ওকে শুইয়ে দিলেন রাঙাবউদি রুনুর বিছানায়। বসা অবস্থাতেই শরীরটা একটু বেঁকিয়ে মেয়ের গায়ে আস্তে আস্তে চাপড় দিতে লাগলেন। কী আশ্চর্য সারা দুপুর যে মেয়ে জ্বালিয়েছে, মাত্র মিনিটখানেকের মধ্যেই সে মেয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। মেয়ের কাণ্ড দেখে রাঙাবউদি হেসে বলেন, তুমি আমার মেয়েকে এইটুকু সময়ের মধ্যে কী দিয়ে গুণ করলে বলো তো রাঙাঠাকুর?

রাঙাঠাকুপো না বলে রাঙাঠাকুর সম্বোধন করলেন উনি। সম্বোধনের এই সংক্ষেপনে রুনু একটু অবাকই হল, তখুনি রাঙাবউদির কথার জবাব দিতে পারল না ও।

যাক, রক্ষে পাওয়া গেল। শ্রীমতী এবার ঘুমোলেন। উঃ, কী জ্বালাতন করেছে এতক্ষণ! কিন্তু তুমি আমার প্রশ্নের জবাব দিলে না যে!—হাসি হাসি মুখে বললেন রাঙাবউদি।

কী প্রশ্ন।

কী মন্তরে তুমি বশ করলে আমার মেয়েকে?

আমি জানি না। —বোকার মতো বলে রুনু।

তুমি নিশ্চয়ই ঘুম পাড়ানো মন্ত্র জানো। ও, দেখছি, তোমার দারুণ ভক্ত। ওকেও ভর্তি করে নাও না তোমার পাঠশালায়।

নিলাম। ...এতক্ষণে স্বাভাবিক হাসি হাসতে পারল রুনু—আজিই ওকে ভর্তি করে নিলাম।

এ তো দেখছি খুব উদার মাস্টার! তাহলে আমি আর বাদ থাকি কেন? আমাকেও নিয়ে নাও। —মিষ্টি হেসে বলেন রাঙাবউদি।

কী যে বলেন!

—না, সত্যি বলছি। তাহলে হয়তো প্রাইভেটে ম্যাট্রিকটা ...শেষ দিকে গলাটা হঠাৎ ভারী হয়ে আসা রাঙাবউদির একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হঠাৎ থেমে যান।

—সে কী! আপনি ম্যাট্রিক পাশ করেননি? আমি তো ভাবতাম...

—কী ভাবতে? বি. এ. পাশ?

—না, মানে আপনি ঠিক খোকাদার মতো কথা বলেন তো। আমাদের কোনও কোনও প্রফেসরও কথা বলেন ওই ভাষায়। খোকাদা এম. এ. পাশ। আমি ভাবতাম, আপনিও...

খোকাদা কে?—প্রশ্ন করেন রাঙাবউদি।

অনেকক্ষণ ধরে খোকাদার গল্প বলল রুনু। গভীর আগ্রহে শুনলেন রাঙাবউদি। গল্প শেষ করে রুনু বলে, অথচ কী দুঃখের জীবন খোকাদার! পুলিশের নজরবন্দী হয়ে আছেন। জীবনটা হয়তো অমনি ঘরে বসে বসে আর থানায় হাজিরা দিয়েই শেষ হয়ে যাবে! জানেন, খোকাদা কী সুন্দর চিঠি ল্যাখেন। অনেক চিঠি লেখিছেন আমার কাছে। প্রায় চিঠিতেই থাকে সুন্দর সুন্দর কবিতা।

তুমি তো দারুণ ভাগ্যবান দেখছি? এমন একজন কবি-বন্ধু আছে তোমার। তুমিও কবিতা লেখো নিশ্চয়ই? —সাগ্রহে বলেন রাঙাবউদি।

—ধুত, খোকাদার কবিতা দেখে দেখে মাঝে মাঝে এক-আধবার...সে সব একদম বাজে।

—আচ্ছা, সেই বাজে কবিতাই দেখব আমি। দেখাবে না আমাকে?

—না, না, ও আমি কাউকে দেখাই না, দেখাব না। খগেনদা বলিছেন, আপনি নাকি খুব পড়েন। খোকাদাও খুব পড়েন, সব সময় পড়েন। আপনার কথা শুনে আমার খোকাদার কথাই মনে পড়ত। না, না, আমি বিশ্বাস করি নে। আপনি মিথ্যে কথা বলতিছেন। আপনিও নিশ্চয়ই খোকাদার মতো খুব বিদ্বান। আপনিও খোকাদার মতো—

না রে ভাই, সে সব আর হল কই?—বিষাদভরা গলায় বলেন রাঙাবউদি, ম্যাট্রিক পাশ করার আগেই যে 'বিয়ে' পাশ করে বসলাম! নরোত্তমপুরের জমিদার বাড়ির বউ হয়ে তো আর বই-বগলে স্কুলে যাওয়া চলে না! ওইখানেই সব ইতি হয়ে গেল। তোমার খোকাদার যেমন পুলিশের কাছে হাজরে দিতে হয়, আমিও তেমনি এই সংসারটার কাছে...

রাঙাবউদির কথা শেষ হল না, ঠিক তখুনি জেগে উঠল হাসি। পশ্চিমের জানালা দিয়ে তখন অপরাহ্নের ম্লান আলো এসে পড়েছে টেবিলের উপর। পড়েছে রাঙাবউদির বিষণ্ণ মুখখানার উপর। ঘুম-ভাঙা হাসিকে কোলে নিয়ে নম্র পায়ে চলে গেলেন রাঙাবউদি।

আজকের দুপুরটা তোমার মাটি হল তো? যেতে যেতে বলেন রাঙাবউদি।

'আজকের দুপুরটা আমার জীবনের একটা অবিস্মরণীয় দুপুর।' এই কথাগুলি বুকের মধ্যে নড়েচড়ে ওঠে রুনুর, কিন্তু মুখে একটা কথাও ফুটল না তার। সে কেবল দুচোখ মেলে চেয়ে রইল একটি চলন্ত বিষাদ প্রতিমার দিকে।

ওরা চলে যাবার পরেও সেই অদ্ভুত মিষ্টি গন্ধটা ওর ছোট্ট ঘরখানাকে সুবাসিত করে রেখেছিল সারারাত। বারে বারে নাক টেনে সেই গন্ধটার স্বাদ নিতে নিতে রুনু ভেবেছে এই আশ্চর্য দুপুরটার কথা। একসময় যেন স্বতঃস্ফূর্তভাবেই একটা কবিতা ওর কলম থেকে বেরিয়ে এসে ভরে ফেলল ওর কবিতার খাতার কয়েকটি পৃষ্ঠা। সেটাই বোধ হয় রুনুর প্রথম সার্থক কবিতা। কবিতার নাম—'একটা আশ্চর্য দুপুর'।

ছবিঘরে

রায়মশাইয়ের বড় ভাই অনিন্দ্যনারায়ণ রায় থাকেন দেশের বাড়ি নরোত্তমপুরে। রায়বংশের পৈতৃক জমিদারি তিনিই পরিচালনা করেন। দেশের প্রজারা তাঁকেই চেনে। ডাকে বড় রায়কর্তা বলে। এ বাড়ির ছেলেমেয়েরা তাঁকে ডাকে কর্তাবাবা বলে। এ বাড়িতে তাঁর জন্য একটি কক্ষ নির্দিষ্ট আছে। চেয়ার টেবিল আলমারি আলনা সব সময় সাজানো-গোছানো থাকে। মাঝেমধ্যে তিনি দু-চার দিনের জন্য শহর বেড়িয়ে যান খুব জাঁকজমক করে। তখন এ-বাড়িতে যেন একটা উৎসব লেগে যায়। এসব শুনেছে রুনু খগেনদার কাছে। আজও পর্যন্ত তাঁকে দেখেনি রুনু।

একদিন তাঁর ছবি দেখাবার জন্য খগেনদা রুনুকে নিয়ে এলেন সেই কক্ষে। মস্ত বড় ঘর, প্রচুর মূল্যবান আসবাবপত্র আর তিন দেয়াল জুড়ে অনেক বাঁধানো ছবি। অধিকাংশই এনলার্জ-করা ফটো। কয়েকখানা দামি ল্যান্ডস্কেপও আছে। ঘরে প্রবেশ করতেই ঠিক সামনের দেয়ালে রয়েছে একখানা বিশাল অয়েল পেন্টিং। উজ্জ্বল স্বাস্থ্যবান পরম সুপুরুষ এক যুবক শিকারের সাজ পরে দাঁড়িয়ে আছেন হাতে বন্দুক নিয়ে। সেই ছবিটির দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে রুনু জিগ্যেস করে, উনি কে?

—আমাগো ঠাকুদ্দা। আর ডান দিকের ওই মালাপরাযুগল ফটো হইল ঠাকুদ্দা আর ঠাকমার বিয়ার ফটো।

ঠাকমা কী সুন্দরী ছিলেন!—সবিস্ময়ে বলে রুনু, ঠিক যেন রাজা আর রানি!

রাজা-রানিই তো। জোর দিয়ে বলেন খগেনদা, রাজার মতোই প্রতাপ, রাজার মতোই হালচাল ছিল ঠাকুদ্দার। ঠাকমাকে দেশের মানুষ ঠিক দেবীর মতো ভক্তি-শ্রদ্ধা করত। ঠাকুদ্দা উপার্জন করতেন, ঠাকুমা দান করতেন। এখনও যখন ছোটকা, মানে আমাদের সন্ন্যাসী কাকা স্বামী দিব্যাত্মানন্দ মহারাজ, ঠাকুমারে নিয়ে যান দ্যাশে, তখনও দ্যাশের মানুষ স্বামীজির থিকা ঠাকমারেই বেশি ভক্তি জানায়। অখনও দান করেন ঠাকমা প্রাণ ভরিয়া স্বামীজির ভক্তদের টাকার অভাব নাই, ঠাকমারও দানের কৃপণতা নাই। তিন মাস মাতৃপূজার শেষ দিনে হয় সেই দানযজ্ঞ। সে এক এলাহি কাণ্ড!

মাকে সাক্ষাৎ ভগবতী জ্ঞানে স্বামীজির মাতৃপূজার কথা আগেও শুনেছে রুনু। স্বামীজি বছরে একবার আসেন মাতৃপূজার জন্য। মাস তিনেক থাকেন। এবারও নাকি আসবেন যথাসময়ে।

অয়েলপেন্টিং-এর বাঁদিকে রয়েছে আর একটি যুগল ফটো। সেটি দেখিয়ে খগেনদা বলেন, এ হল আমাগো কর্তাবাবা আর জেঠিমার বিয়ার সময়ের ফটো।

এ ছাড়াও অন্য দেয়ালগুলিতে আরও অনেক ফটো সেদিন দেখল রুনু। দেখল রায়পরিবারের তিন ভাইয়ের তরুণ বয়সের ছবি, ছোটকার বি.এ. পাশের পরে গাউনপরা কনভোকেশানের ছবি, মেসোমশাই ও মাসিমার বিভিন্ন বয়সের ছবি, স্বামী দিব্যাত্মানন্দ মহারাজের ছবি ইত্যাদি।

সেইদিনই জানল রুনু যে, রায়কর্তার বিয়ের প্রায় দশ বছর পরে বিয়ে হয়েছিল রায়মশাইয়ের, কিন্তু রায়মশাইয়েরই ছেলে হয় আগে। তিনিই এ-বাড়ির বড়দা। তার দু-তিনবছর পরে হয় বড় রায়কর্তারে প্রথম ছেলে। সেই ছেলেই রাঙাদা। তারপর নাকি আরও কয়েকটি সন্তান হয়েছিল জেঠিমার, কিন্তু রাঙাদা বাদে আর কেউই বাঁচে নি। সেই রাঙাদার বউ ই এ-বাড়ির রাঙাবউদি।

রাঙাদার ফটো আছে না এ-ঘরে?—প্রশ্ন করে রুনু।

—আছে না আবার! একা রাঙাদারে লইয়াই একখান পুরা অ্যালবাম আছে। কর্তাবাবাই তো আসল জমিদার, তাঁর একমাত্র ছেলে রাঙাদা। নানাবয়সের নানাসাজের ফটো আছে রাঙাদার। আবার স্কুল-কলেজের বন্ধুবান্ধবদের ইয়া গ্রুপ ফটোও আছে। সব মিলাইয়া তিরিশ-চল্লিশখানা হইব। আবার বিয়ার পরে রাঙাবউদিরে লইয়া আছে আরেকটা অ্যালবাম। হাসির জন্মের পর এক বৎসর পর্যন্ত মোটামুটি তিন বৎসরের ছবি, দেশ-বিদেশে তোলা নানান পোজের ছবি আছে হেইডায়।

—সেসব অ্যালবাম কোথায় আছে?

—আছে রাঙাবউদির কাছেই, কিন্তু দ্যাখতে বোধহয় পাইবা না আর।

—কেন?

সে অনেক কথা!—দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন খগেনদা।

—এ-ঘরে রাঙাদার ছবি কোনটা?

ওই যে, ওদের বিয়ার রাইতের ফটো।—একটি বিশেষ ছবির দিকে আঙুল দেখালেন খগেনদা।

রুনু অনেকক্ষণ ধরে একদৃষ্টিতে দেখল ছবিখানা। ঠাকুমা আর ঠাকুরদার ছবির সঙ্গে এই যুগল ছবিটির আশ্চর্য মিল, অথচ তেমন মিল নেই জ্যাঠাবাবু জেঠিমার যুগল ছবির সঙ্গে। ঠাকুরদার মতোই এক পরম রূপবান উজ্জ্বল যুবক রাঙাদা। চেহারার অদ্ভুত মিল। তেমনি মিল দেখা যাচ্ছে কনেবউরূপে ঠাকুমার সঙ্গে কনেবউবেশে রাঙাবউদিরও। রাঙাবউদিরও রাজরানি বেশ। মাথায় সোনার মুকুট, সর্বাঙ্গ সোনা-জহরৎ-হীরে-মানিকে মোড়া। ওই সুসজ্জিতা রাঙাবউদির সঙ্গে আজকের সাদাসিধেবেশের রাঙাবউদিকে কিছুতেই মেলাতে পারছে না রুনু। এ-বাড়িতে যে রাঙাবউদিকে ও দেখছে তার পরনে সাধারণ শাড়ি, দুহাতে কেবল একগাছি শাঁখার সঙ্গে অতিসাধারণ একগাছি করে সোনার চুড়ি। ওই রাঙাবউদির 'আজ কেন দীনে বেশ!' উনিই তো আসল জমিদার বড়রায়কর্তার একমাত্র পুত্রবধূ। তবে কেন উনি রয়েছেন এ-বাড়িতে। কেন খগেনদা রাঙাবউদি আর রাঙাদার প্রসঙ্গ উঠতেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে থেমে গেলেন? 'অনেক কথা' বলতে কী কথা বোঝালেন উনি? কোনও দিনই তা কি জানতে পারবে না রুনু? রুনুর বুকের মধ্যে অনেক প্রশ্ন ভিড় করে আসে, অথচ এর পারিবারিক প্রশ্ন করতে সাহসও হয় না খগেনদাকে।

—কী দ্যাখতে আছ অমন একনাগাড়ে?

খগেনদার প্রশ্নে চমক ভাঙে রুনুর। অভিভূত গলায় বলে, কী সুন্দর, কী সুন্দর মানাইছে রাঙাদা আর রাঙাবউদিকে।

—বেশ মানাইছে, তা-ই না?

—সত্যি! যেন এ পৃথিবীরই মানুষ নয়। যেন কোনও অভিশপ্ত দেব-দম্পতি মর্তে আগমন করিছে।

ওই যে অভিশপ্ত কথাডা কইলা না, একবার খাডি কথা।—কেমন একরকম বিষাদভরা গলায় বলেন খগেনদা।

কেন? —সভয়ে প্রশ্ন করে রুনু।

—ছবি তো দ্যাখলা সব। এখন ঘরে চলো। কমুহানে। মতডা কওন যায়। সে এক করুণ কাহিনী!

'করুণ' শব্দটা যেন রুনুর বুকের মধ্যে একটা আঘাত হানল। রাঙাবউদিকে দেখা অবধি ওরও যে ওই কথাটাই মনে হয়েছে বার বার। মনে হয়েছে, ওঁর ঠোঁটের কোণে একটু হাসি লেগেই থাকে, কিন্তু সেই হাসির অন্তরালে একটা গোপন বেদনা যেন লুকিয়ে রাখার প্রয়াস আছে বলে মনে হয়েছে রুনুর। মনে হয়েছে, ও হাসি যেন কান্নার আর এক রূপ।

রাঙাবউদি

কর্তাবাবার ঘর থেকে বেরিয়ে রুনুর পড়ার ঘরে এসে ওরা দুজনে বসল মুখোমুখি।

খগেনদা একটানা বলে যাচ্ছেন রাঙাদা আর রাঙাবউদির কাহিনী। বলতে বলতে মাঝে মাঝে খগেনদার দুচোখ ছলোছলো হয়ে উঠছে, শুনতে শুনতে রুনুরও। মনে মনে রামায়ণের সীতার সঙ্গে তুলনা করে যাচ্ছে রুনু রাঙাবউদির। সীতার জীবনে কতটুকু সময় আনন্দে কেটেছিল? ওই বনবাসের কয়েকটা বছর মাত্র। আর রাঙাবউদির জীবনে আনন্দের বান এসেছিল বিবাহের রাত থেকেই। মাত্র তিনটি বছর সে বন্যা তাঁকে প্লাবিত, অভিভূত করে দিয়ে, চিরকালের মতো তাঁকে নিঃস্ব, শূন্য মরুভূমি করে রেখে গেছে। দুঃখের দিনে সীতার অবলম্বন ছিল লব-কুশ। রাঙাবউদির আছে হাসি।

কলকাতায় এম.এ. পড়তে পড়তেই রাঙাদা একটা বিলিতি ব্যাঙ্কের কলকাতা শাখায় ভালো চাকরি পেয়ে যান। যেমন রাজপুত্রের মতো চেহারা, তেমনি তীক্ষ্ন মেধাবী। ইন্টারভিউ নিয়েছিলেন খাস বিলিতি সাহেবরা। কয়েকশো ছেলের মধ্যে রাঙাদা হলেন প্রথম। একডাকে চাকরি হয়ে গেল।

ছাত্র-জীবনে যে হস্টেলে ছিলেন, সেই হস্টেল থেকেই চাকরি করতে করতে এম. এ. পরীক্ষা দিলেন রাঙাদা। তারপর খুঁজতে শুরু করলেন একটা নিজস্ব বাসা। ইচ্ছা, দেশ থেকে মাকে নিয়ে আসবেন কলকাতার বাসায়। কালীঘাট, দক্ষিণেশ্বর দেখবার সাধ মায়ের দীর্ঘদিনের। এবার রাঙাদা পূর্ণ করবেন মায়ের সেই সাধ।

ব্যাঙ্কের এক সহকর্মীর চেষ্টায় দুই কক্ষের একটি ছিমছাম বাসা জুটে গেল রাসবিহারী অ্যাভিন্যুয়ে। বাড়িটা দোতলা। উপরে থাকে একটি ছোট পরিবার—স্বামী, স্ত্রী ও একটি মাত্র মেয়ে। মেয়েটি সবার ম্যাট্রিক পরীক্ষার জন্য তৈরি হচ্ছে। একতলায় রাঙাদা নিয়েছেন দুখানা শোবার ঘর, একটি রান্নাঘর, বাথরুম। উপরের ভাড়াটের সঙ্গে নীচের ভাড়াটের কোনও যোগাযোগ নেই। কেবল সিঁড়ির নীচে কয়লা-ঘুঁটে রাখার ব্যবস্থা থাকায় সিঁড়ি দিয়ে উপরের কেউ ওঠা-নামার সময় নীচের ভাড়াটে ঘুঁটে কয়লা আনতে গেলে মুখ-দেখাদেখি হতে পারে।

নীচে একটি পরম সুদর্শন যুবক ভাড়াটে এসেছে। একটি ভৃত্য ছাড়া তার সঙ্গে আর কেউ নেই। প্রতিদিন সকাল ন'টায় সে বেরিয়ে যায়, ফেরে সন্ধ্যার পর। তার সাজ-পোশাক যেমন আভিজাত্য, চাল-চলনেও তেমনি ব্যক্তিত্ব। দেখেই মনে হয়, বড় ঘরের ছেলে, বড় চাকরি করে। উপরের বারান্দা থেকে মাঝে মাঝে এই রাজপুত্রের মতো ছেলেটিকে দেখেছে সেই ম্যাট্রিক পড়া মেয়েটি, দেখেছে তার মা বাবাও। যাতায়াতের পথেও মাঝে মাঝে উপরের ভদ্রলোকের মুখোমুখি হয়েছেন রাঙাদা। রাঙাদার গাম্ভীর্য অটুট। ফলে আলাপ হয়নি ওদের।

একদিন দুজনে একসঙ্গে অফিসে বেরুবার পথে বাড়ির গেটের সামনে প্রথম কথা বললেন সেই উপরের ভদ্রলোক।

—আপনি নীচতলার নতুন ভাড়াটে, আমি থাকি ওপরে।

—ওঃ, নমস্কার। আপনি কদ্দিন আছেন এ-বাড়িতে?

—তা ছ-সাত বছর হল। আপনি তো এই সেদিন এলেন।

—হ্যাঁ, প্রায় দু-সপ্তাহ।

আমারই অন্যায় হয়েছে।—'লজ্জিতভাবে বলেন প্রৌঢ় ভদ্রলোকটি, আমার প্রথম দিনই আলাপ করা উচিত ছিল। আপনি একা থাকেন, কখন কী প্রয়োজন...তা দেখুন, সাহস পাইনি। আমি সামান্য কেরানি। আপনার চাল-চলন দেখেই বুঝেছি, আপনি মস্ত অফিসার।

—না, না, আমারও সামান্য চাকরি। একটা ব্যাঙ্কের জুনিয়ার অফিসার।

—কোনও ব্যাঙ্ক?

ব্যাঙ্কের নাম শুনেই ভদ্রলোক চমকে উঠলেন,—বাপরে, সে যে মস্ত বড় বিলিতি ব্যাঙ্ক! ওখানে বাঙালি অফিসার বড় সহজে নেয় না। শুনেছি হাজার দশেক টাকা নাকি সিকিউরিটি ডিপজিট লাগে।

তা লেগেছে। —মৃদু হেসে বলেন রাঙাদা, বাবার জমিদারি আছে, অসুবিধা হয়নি।

—তা-ই বলুন জমিদারের ছেলে আপনি! চেহারা দেখেই বুঝেছি। একদিন আসুন না ওপরে। আলাপ হবে আমাদের সঙ্গে। এক বাড়িতে থাকতে হলে পরস্পরের আলাপ থাকা ভালো। কখন কার কী বিপদ-আপদ...। তা, বউমাকে কবে আনবেন? গৃহিণী না থাকলে গৃহ তো শূন্য!

—আমি তো বিয়ে করিনি। আশা করছি, মাকে নিয়ে আসব শীগগিরই।

ক্রমে ক্রমে আলাপ হল উপরের পরিবারটির সঙ্গে। ভদ্রলোকটির স্ত্রীর ব্যবহারটি ভারি চমৎকার। দুদিনেই একেবার আপন করে নিলেন রাঙাদাকে। সেই আলাপের পরিণতিতেই ছমাসের মধ্যে উপরের সেই ম্যাট্রিক পড়া মেয়েটি হয়ে গেল রাঙাবউদি। এত দিনে মাকে আনবার কথা আর একবারও মনে পড়েনি রাঙাদার। এবার একেবারে বিয়ের দিনক্ষণ স্থির করে বাবা-মাকে চিঠি লিখলেন রাঙাদা।

খবর পেয়ে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসেছিলেন বড় রায়কর্তা। নরোত্তমপুরের নামজাদা জমিদার অনিন্দ্যনারায়ণ রায়ের একমাত্র পুত্রের বিবাহ। কত বড় বড় ঘরের মেয়ে দেখা হয়ে গেছে এর মধ্যে। হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই হুট করে একেবারে বিয়ের নিমন্ত্রণ করে বসল ছেলে! কেমন মেয়ে, কার মেয়ে, কী তার বংশ-পরিচয় সেসব দেখতে হবে না?

মেয়ের বংশ-পরিচয় জানার বিন্দুমাত্র কৌতূহল নেই রাঙাদার। ওরা যে হিন্দু এবং কায়স্থ, এইটুকুই যথেষ্ট। ভিন্ন জাতের হলেও আপত্তি ছিল না রাঙাদার। ও মেয়েকে ছাড়া বিয়েই করবেন না রাঙাদা। একেবারে ভীষ্মের পণ।

তা-ই বলিয়া রায় বংশের মুখে চুনকালি দিবি তুই!—গর্জন করে উঠেছিলেন বড় রায়কর্তা—চাল নেই, চুলো নেই একটা ওছা কায়েত, তায় আবার কেরানির মাইয়া! ওই মাইয়ারে বিয়া করলে তরে আমি ত্যাজ্যপুত্র করুম।

ভয় পাবার ছেলে নন তেজি পিতার তেজি পুত্র রাঙাদা। তিনিও গলা চড়িয়ে বলেছিলেন, করো না ত্যাজ্যপুত্র। আমি মাইনে যা পাই তাতে আমার সংসার চলবে। চাইনে তোমার সম্পত্তি।

—চাকরি পাইয়া খুব লায়েক হইয়া গেছ, তা-ই না? রাখ, তর মায়েরে আর ঠাকমারে আনাইতে আছি। দেখি তাদের তুই কি জবাব দিস।

টেলিগ্রাম পেয়ে ঠাকুমাকে আর জেঠিমাকে নিয়ে এসেছিলেন রায়মশাই স্বয়ং। ঠাকুমাকে অমান্য করার সাহস নেই রায়বংশের কারো। তার উপর রাঙাদা ঠাকুমার সবচেয়ে আদরের নাতি। ঠাকুমাকে নানাভাবে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে তো নিয়ে আসা হল কলকাতায়। ঠাকুমা আসতেই কিন্তু চাকা উল্টে গেল—মেয়ে দেখেই ঠাকুমার সব রাগ জল!

রাঙাবউদির বিয়ের ফটো তো এইমাত্র দেখে এল রুনু। ঠিক যেন ঠাকুমারই প্রতিবিম্ব। এ মেয়েকে ঠাকুমাতো পছন্দ করবেনই।

ঠাকুমা নাকি রাঙাবউদিকে (তখনও অবশ্য 'রাঙাবউদি' হননি) দেখেই বুকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, এ যে সোনার পিতিমে! এ-ই আমার যুগ্যি নাতবউ। এরেই বরিয়া লও নারু আর বাগড়া দিও না।

বিজয়ী রাঙাদা সেদিন নাকি ঠাকুমাকে পাঁজাকোলা করে তুলে বাপ-মায়ের সামনেই এক পাক নেচেছিলেন।

বেশ ঘটা করেই বিয়ে হয়ে গেল জমিদার নন্দন তথা বিলিতি ব্যাঙ্কের বড় অফিসার দীপ্তেন্দুনারায়ণ রায়ের সঙ্গে অজ্ঞাত কুলশীলা এক কেরানি কন্যা লাবণ্যময়ী পালের। লাবণ্য পাল দোতলা থেকে একতলায় নেমে এসে হলেন লাবণ্য রায়, হলেন ঠাকুমার অতি আদরের নাতবউ লাবু।

জানো, ঠাকমা অখনও এ-বাড়িতে সবথিকা বেশি ভালোবাসেন রাঙাবউদিরে। —বললেন খগেনদা।

বিয়ের পর কী হল বলুন না।—অসীম কৌতূহল প্রশ্ন করে রুনু।

বিয়ের পরের ইতিহাস খুবই সংক্ষিপ্ত। ও-বাড়ি ছেড়ে এলগিন রোডে বেশ ভালো একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ বাড়ি ভাড়া নিয়েছিলেন রাঙাদা। বড় রায়কর্তা, রায়মশাই, ঠাকুমা ফিরে গেছিলেন যার যার নিজের জায়গায়। অর্থাৎ বড়রায়কর্তা গেলেন নরোত্তমপুর আর ঠাকুমাকে নিয়ে রায়মশাই এলেন কাউনিয়ার এই বাড়িতে। রাঙাদার নতুন সংসার গুছিয়ে দেবার জন্য জেঠিমা রয়ে গেলেন। রাঙাবউদি তাঁর প্রাণ ঢালা সেবা, নম্র ব্যবহার আর মিষ্টি হাসি দিয়ে দুদিনেই জয় করে ফেললেন জেঠিমাকে।

পরিপূর্ণ আনন্দের সংসার। রাঙাদা মাঝে মাঝেই ছুটি নিয়ে মাকে আর স্ত্রীকে নিয়ে অনেক তীর্থস্থান ঘুরে আসেন। গয়া, কাশী, পুরী, ভুবনেশ্বর, হরিদ্বার, মথুরা বৃন্দাবন প্রয়াগ কিছুই বাদ রইল না। যেখানেই গেছেন, সেখানেই রাঙাদা মাকে ও রাঙাবউদিকে নিয়ে অসংখ্য ফটো তুলিয়েছেন। পুরো একখানা অ্যালবাম ভরে ফেলেছেন সেই-সব ছবিতে। তীর্থ-পরিক্রমা শেষ করে পুত্র আর পুত্রবধূকে প্রাণভরে আশীর্বাদ করেছিলেন জেঠিমা।

বিয়ের দুবছর পর হল হাসির জন্ম। ঠিক সেই জন্মদিনেই এল সুখবরটা—রাঙাদার প্রমোশন হয়েছে ব্রাঞ্চ-ম্যানেজার পদে। রাতারাতি মাইনে প্রায় ডবল হয়ে গেল। সংসারটা তো আনন্দের সংসার ছিলই, এবার ভরে গেল হাসিখুশিতে। মায়ের মুখে হাসি, রাঙাবউদির মুখে হাসি, রাঙাদা তো হাসতে হাসতেই এক হাঁড়ি মিষ্টি নিয়ে এসেছিলেন। সবার মুখে এত হাসি ফুটিয়েছে যে আগন্তুক তার জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই, সেই পয়মন্ত মেয়ের নাম হাসি ছাড়া আর কী হতে পারে? জেঠিমাই নাম রাখলেন হাসি।

হাসির বয়স হল এক বছর। ওই বয়সেই হাসির ঝরনা ধারায় সারা বাড়ি সারাক্ষণ মাতিয়ে রাখে সে। এমন দিনে এল আর এক খবর-রাঙাদার ট্রান্সফার হয়েছে ওঁদের ব্যাঙ্কের হেডকোয়ার্টার লন্ডনে। এ এক দুর্লভ সুযোগ। এমন সুযোগ জীবনে বার বার আসে না।

রাঙাবউদি কাঁদছেন, জেঠিমা কাঁদছেন, রাঙাদার ভ্রূক্ষেপও নেই। তিনি কলকাতার নামকরা টেলারকে দিয়ে বিলেতে যাবার সাজগোজ তৈরি করার নেশায় মশগুল। সময়মতো ওদের নরোত্তমপুর পাঠিয়ে দিয়ে রাঙাদা একদিন সমুদ্রে পাড়ি জমালেন।

রাঙাদা-রাঙাবউদি কাহিনীর শেষ দিকে চোখের জল মুছতে মুছতে বললেন খগেনদা, রাঙাবউদি কাইন্দা কাইন্দা অসুস্থ হইয়া পড়লেন, জেঠিমা অন্ন ত্যাগ করলেন, অমন যে আদরের হাসি, তার দিকেও কারো নজর নাই। রাঙাদার সেই এক কথা—যামুই, এই চান্স একবার ছাড়িয়া দিলে আর পামুনা। রাঙাদা নাচতে নাচতে চলিয়া গেলেন। সেই যে গেলেন...

—তারপর আর আসেননি?

—আওন তো দূরস্থান, ওখানে জয়েন কইর‌্যা কেবল একখান পৌঁছা-সংবাদ দিছিলেন, ব্যস ওইখানেই ইতি!

—সে কত দিনের আগের কথা?

—হাসিরে দেইখ্যাই তো হিসাব করতে পারো। অর এক বছর বয়সে বাপছাড়া হইছে, অখন অর বয়স তিন বছর পার হইয়া গেল। হায়, ওই মাইয়া বড় হইয়া যখন সব বোঝবে শোনবে তখন কি ও বাপেরে...

হঠাৎ থেমে গেলেন খগেদদা। রুনুর বুকখানাও ভরে উঠেছে একটা অসহ্য গুমরোনো বেদনায়। ও আর প্রশ্ন করতে পারছে না। প্রশ্ন করবার আর আছেই বা কী। রাঙাবউদির কপালে সিঁদূর হাতে শাঁখা দেখেইতো বোঝা যায় রাঙাদা বেঁচে আছেন। হয়তো সুখেই আছেন বিলেতে।

অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে আবার এক সময় নিজেই শুরু করেছিলেন খগেনদা।

রাঙাবউদি নাকি তারপর ছমাস ধরে প্রতি সপ্তাহে একখানা করে চিঠি লিখেছিলেন নিয়মিত। আহার-নিদ্রা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন। চেহারা হয়ে গেছিল কঙ্কালসার। যত্ন-আত্তি হচ্ছিল না হাসিরও। জেঠিমা ওদের দুটিকে সামলাতে প্রায় পাগল হবার দশা। লন্ডনে থাকে ওদের পাশের গ্রাম বানরীপাড়ার দুটি ছেলে। তারাও বড় চাকরি করে ও-দেশে। প্রতি পুজোয় দেশে আসে তারা। প্রায় বছর খানেক বাদে তাদের একজনের কাছে খবর পাওয়া গেল, রাঙাদা ওখানে এক মেমকে বিয়ে করে সুখে আছেন। ও দেশেই স্থায়ী বসবাস করবার ব্যবস্থাও পাকা হয়ে গেছে। এদেশে নাকি আর আসবেন না।।

সংবাদটা বিশ্বাস করতে পারেননি জ্যাঠামশাই। এ সংবাদের সত্যতা যাচাই করার জন্য একটা টেলিগ্রাম করেছিলেন তিনি। রাঙাদা একটিমাত্র শব্দ ব্যবহার করে তার উত্তর দিয়েছিলেন। শব্দটি ছিল YES

জ্যাঠামশাই এবার কাগজে-কলমেই রাঙাদাকে ত্যাজ্যপুত্র করে সম্পত্তিতে তাঁর প্রাপ্যাংশ লেখাপড়া করে দিলেন রাঙাবউদির নামে। তারপর একদিন নিজেই রাঙাবউদিকে এনে রেখে গেলেন এই বাড়িতে। এ-বাড়িতে অনেক লোকজনের মধ্যে বিশেষ করে ঠাকুমার কাছে, থাকলে হয়তো একটু ভালো থাকবেন রাঙাবউদি, ভেবেছিলেন জ্যাঠামশাই।

ঈশ্বরই জানেন,—দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন খোকাদা, রাঙাবউদির প্রার্থনার জোরে না আইলেও হয়তো জ্যাডার মৃত্যু-সংবাদ পাইলে সম্পত্তির লোভে একবার দ্যাশে আইতেও পারেন। জ্যাডা তো সাফসোফ সব কথা তাঁরে চিঠিতে লিখ্যা দিয়াই কর্তব্য শ্যাষ করছেন। তিনি যে এ জীবনে আর ওই সুপুত্তুররে মুখ দর্শন করবেন না, তা রাঙাদাও বোঝেন। বাপ, ব্যাটা দুই-ই তো সমান জেদি। এই দুই জেদির মাঝখানে পইড়া রাঙাবউদির কী ভাগ্য, ভাব তো!

রাঙাবউদি তাহলে এখন অনেক সম্পত্তির মালিক?— প্রশ্ন করে রুনু।

—সম্পত্তি মানে তো একখান কাগজ। তার উনি মানেও বোঝেন না, খবরও নেন না। সংসারের কোনও কিছুরই খবর নেন না উনি। খাইতে হয়, খান, পরতে হয়, পরেন। আর নিজের ঘরডির মইধ্যে সারাক্ষণ বন্দি হইয়া থাকেন। তবে একটা নেশা আছে, বই পড়েন প্রচুর। মাঝে মাঝে ল্যাখতেও দেখি। কী ল্যাখেন কে জানে! ওই ল্যাখা পড়ার নেশাডা আছে বলিয়াই হয়তো বাঁইচ্যা আছেন। জানো, সম্পূর্ণ গীতাখান বাবার মুখস্থ। মাঝে মাঝে আমাদের ব্যাখ্যা করিয়া শোনান। ছোটকা মানে আমাদের সেই সন্ন্যাসী কাকু আইলেও গীতার অনেক কথা বলেন। শোনতে শোনতে একটা জিনিস আগে বোঝতাম না, অনাসক্ত হইয়া কর্ম করাডা কেমন? অখন রাঙাবউদিরে দেখিয়া বুঝি কারে কয় অনাসক্তি। রাঙাবউদি হলেন অনাসক্তির প্রতিমূর্তি।

আমার মনে হয়, রাঙাবউদি হলেন পবিত্রতার প্রতিমূর্তি।—উচ্ছ্বসিতভাবে বলে রুনু, জানেন, রাঙাবউদির দিকে তাকালিই আমার মনে পড়ে রামায়ণের সীতার কথা।

—হায় জনমদুখিনী সীতা! তুমি হয়তো ঠিকই কইছ রুনু, ওনার জীবনডাও হয়তো...

কথা শেষ না করেই উঠে পড়েছিলেন খগেনদা।

খগেনদা চলে গেলেও একা অনেকক্ষণ ধরে রুনু মনে মনে রোমন্থন করে চলল রাঙাবউদি-রাঙাবউদি কাহিনী। সে ভাবছে, সীতার জীবনটা একটা অন্তহীন অশ্রুধারা; রাঙাবউদির জীবনটাও কি তাই হবে? রামের তবু সীতাকে বর্জনের পশ্চাতে ভিন্নতর একটা আদর্শ কাজ করেছিল, কিন্তু রাঙাদার? ভাবতে আশ্চর্য লাগে, এই রাঙাদাকে নাকি এখনও সমস্ত অন্তর দিয়ে ভালোবাসেন রাঙাবউদি, প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে এবং শোবার আগে এখনও নাকি প্রণাম করেন রাঙাদার ফটো। রাঙাবউদির প্রতি একটা অকৃত্রিম শ্রদ্ধায় মনে মনে তাঁকে সহস্র প্রণাম জানায় রুনু। রাঙাবউদি নিঃসন্দেহে সীতা-সাবিত্রী-দময়ন্তীর সগোত্রা।

পড়ার পথ বেয়ে

বিজ্ঞানের ছাত্র হলেও রুনুর পড়ার ঝোঁক সাহিত্যের দিকে। পড়ার নেশাটা ওকে ধরিয়ে দিয়েছিলেন খোকাদা। বি. এম. কলেজ লাইব্রেরিতে বাংলা-ইংরেজি দুটো ভাষাতেই অসংখ্য বই। রুনু প্রথম থেকেই দুটো ভাষারই বিখ্যাত বইগুলি পড়তে শুরু করেছিল। ইতিমধ্যেই ইংরাজি সাহিত্যের সমারসেট মম আর অস্কার ওয়াইল্ড ওর প্রিয় লেখক হয়ে উঠেছেন, বাংলায় যেমন শরৎচন্দ্র।

সেদিন ওর টেবিলে ছিল শরৎচন্দ্রের 'দেবদাস' উপন্যাসখানা। সেদিনও রবিবার। দুপুর বারোটা থেকে দুটো পর্যন্ত ক্লাসের পড়া পড়ে ও বসেছিল 'দেবদাস' নিয়ে। চারটে বাজতেই একটু বেড়াতে বেরুবার জন্য ও প্রস্তুত হচ্ছে, এমন সময় রাঙাবউদি এলেন হাসিকে কোলে নিয়ে।

—নাও, এবার তোমার ভক্তটিকে সামলাও। কী গুণ করেছ, কে জানে! সেই যে দুপুর থেকে 'তাতা যাব' বায়না ধরেছে, আমি বাবু পাগল হয়ে গেছি। কী কুক্ষণে যে সেদিন ওকে নিয়ে বেড়াতে বেরিয়েছিলে! এখন ঠ্যালা সামলাও।

রাঙাবউদির কথা চলতে চলতেই হাসিভরা মুখে হাসি উঠে এসেছে রুনুর কোলে, জড়িয়ে ধরেছে ওর গলা এবং একটানা বলে চলেছে, বেলা দাব্ব, বেলা দাব্ব।

অর্থাৎ উনি এখন তোমার স্কন্ধে ভর করে 'বেলাতে দাব্বেন'! ...হেসে বলেন রাঙাবউদি, শুনে তুমি বাধিত হলে নিশ্চয়ই? অবশ্যই। ...হাসে রুনুও—হাসিকে কোলে করতে আমার ভীষণ ভালো লাগে। কী নরম! মনে হয়, একমুঠো ফুল।

—ফুলে আবার কাঁটাও থাকে রাঙাঠাকুর। সাবধান থেকো।

—আচ্ছা, আপনি আমাকে রাঙাঠাকুর বলেন কেন? আমার ভারি লজ্জা করে। নাম ধরে ডাকতে পারেন না?

—তাতে যে আবার আমার লজ্জা করে! তুমি যে 'মাস্টোর'। তাহলে কি 'মাস্টোর' বলে ডাকব পিসিমার মতো?

—দূর! আপনি তো রুনু বলে ডাকতি পারেন।

ও নাম তুমি দেশে ফেলে এসেছ ভাই। এখানে তুমি 'রনো', তুমি 'মাস্টোর', তুমি 'রণোদা'। আমি নাহয় আরেকটা নাম দিলাম।

—আপনার সঙ্গে কথায় পারব না। তার চে আমার হাসুমাকে নিয়ে—

ও মা, আবার 'দেবদাস' পড়া হচ্ছে!—বইখানা হাতে নিয়ে চোখ পাকিয়ে বলেন রাঙাবউদি, হু, বুঝলাম। সারাদিন মাথা গুঁজে কেবল পার্বতী-দেবদাসকে নিয়েই...

—না, না, সত্যি বলছি গল্প-উপন্যাস পড়ি মাত্র ঘণ্টাদুই। বাকি সময়—

—এসব বই পাও কোথায়?

—কেন, আমাদের কলেজ লাইব্রেরিতে। শরৎবাবুর পুরো সেট আছে। আমি সব পড়ব। ইতিমধ্যে প্রায়—

—'গৃহদাহ' পড়েছ?

—এখনও পড়িনি।

বইটা আমাকে এনে দিও তো ভাই। 'দেবদাস' আমি নিয়ে নিচ্ছি। দিনদুই পরে পাবে। এখন তোমার এই পার্বতীকে সামলাও। লক্ষ্মীছাড়া মেয়ে এখন কেমন চুপটি করে আছে! তুমি সত্যি ওকে গুণ করেছ। —হেসে বলেন রাঙাবউদি।

—জানেন, আমার মানে বলেন, 'ঝি পুত বোঝে মন, রাজায় বোঝে ধন।' ও আমার মন বুঝতি পারে, আমি যে ওরে ভীষণ ভালোবাসি! তা-ই না হাসুমা?

হুঁ, তাতা বালো।—সেই অনবদ্য অনভিধানিক ভাষায় বলে হাসে।

—আর আমি বুঝি ভালো না?

না মা বালো না। —সঙ্গে সঙ্গে জবাব দেয় হাসি।

ওরে সর্বনাশী মেয়ে! রাখ, দেখাচ্ছি মজা!—হাত বাড়ালেন রাঙাবউদি।

কি জানি কী শাসন করতেন অকৃতজ্ঞ কন্যাকে। কিন্তু রুনু সে সুযোগই দিল না—ওকে কোলে নিয়ে ছুটে পালাল।

সেই থেকে বিকেলে হাসিকে নিয়ে বেড়ানো রুনুর একটা নিত্যকর্ম হয়ে দাঁড়াল, সেইসঙ্গে হাসিকে ফিরিয়ে দিতে গিয়ে রাঙাবউদির সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করাটাও। গল্পের বিষয় অবশ্য পড়া নিয়েই। রুনুর পড়া কোনও ইংরেজি বইয়ের গল্প কিংবা রাঙাবউদির পড়া একআলমারি বইয়ের থেকে কোনও গল্প। রাঙাবউদির আলমারিতে রামায়ণ, মহাভারত থেকে শুরু করে প্রচুর ধর্মগ্রন্থ এবং পুরোনো কালের নামকরা উপন্যাস প্রায় সবই আছে। আছে ভারতী, ভারতবর্ষ, প্রবাসী, বঙ্গদর্শন ইত্যাদি পত্রিকার মোটা মোটা বাঁধানো ভলিউম অনেকগুলি। ওইগুলি নিয়েই সময় কাটে রাঙাবউদির। ওই আলমারি থেকেও কিছু বাছাই বই পড়তে শুরু করেছে রুনু। ওদের গল্প হয় পরস্পরের পড়া গল্প, কবিতা নিয়েই। কখনও বা রুনুর স্কুল ও কলেজ জীবনের কোনও গল্প এবং সেই গল্পের ধারার পথে রাঙাবউদির স্কুল-জীবনে কোনও ঘটনাও এসে পড়ে। মাঝে মাঝে ওঘর থেকে ভেসে আসে রাঙাবউদির ছেলেমানুষি হাসি। তখন হয়তো মনে-প্রাণেই তিনি ফিরে গেছেন তাঁর স্কুলজীবনে।

এ-বাড়িতে রাঙাবউদির হাসি একটা দুষ্প্রাপ্য বস্তু। ওই সদাগম্ভীর, সদাবিষণ্ণ মানুষটাকে যে হাসাতে পারে, সে তো অসাধ্য সাধন করতে পারে। এই একটা ব্যাপারে এ-বাড়িতে রুনুর মর্যাদা যেন বেড়ে গেল। একদিন তো স্বয়ং মাসিমাই ওকে আড়ালে ডেকে বললেন, শোন রনো, দেখতাছি, লাবু তোমার লগে গল্প করতে ভালোবাসে। হাসিও তোর খুব বাধ্য হইছে। তুমি বাবা অপসর পাইলেই অর ওই জেলখানাডার মধ্যে যাইয়া অর লগে গপ্প-টপ্প কইবা অর মনডারে যদি একটু খুশি রাখতে পারো, তাইলে...সারাডা দিন মনমরা হইয়া পড়িয়া থাকে তো, বড় কষ্ট হয়। খগেইন্যার কাছে তো অর ভাইগ্যের কথা সবই শোনছ।

রুনু যেন কৃতার্থ হয়ে গেল। রাঙাবউদিকে খুশি করা যেন ওর একটা সাধনা হয়ে দাঁড়াল তারপর থেকে।

এরপর থেকে কলেজ লাইব্রেরি বই আসত রাঙাবউদির চাহিদামতো। রাঙাবউদির পূর্ণ অধিকার কায়েম হল রুনুর ছুটির দিনগুলির উপর। রাঙাবউদির টুকিটাকি কেনাকাটাগুলিও গৃহভৃত্য বটুকদার হাত থেকে চলে এল রুনুর হাতে। কেবল রাঙাবউদিকে পড়াবার জন্যেই ফ্রাঁস-এর 'থেইজ' বইখানা রুনু অনুবাদই করে ফেলল। ইংরাজি সাহিত্যের যা কিছু ও পড়ে, তার গল্প বাংলা করে রাঙাবউদিকে শোনানো চাই। কখনও বা দুজনেরই পড়া কোনও বই নিয়ে বসত ওদের আলোচনা-সভা। 'থেইজ'-এর অনুবাদ পড়ে রাঙাবউদির উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেছিলেন, কী আশ্চর্য ভালো বই! বাংলায় তো এত ভালো বই একখানাও পড়িনি। তোমার এই অনুবাদ দেখেই বুঝিছি ঠাকুরপো, তুমি একদিন একজন বড় সাহিত্যিক হবে। তুমি কেন সায়েন্স পড়তে গেলে? তোমার পড়া উচিত ছিল আর্টস। তোমার বি. এ.-তে নেওয়া উচিত ইংরাজিতে অনার্স।

—সত্যি বলিছেন রাঙাবউদি, বিজ্ঞানের থেকে আমার সাহিত্যই বেশি ভালো লাগে। কিন্তু এখন তো আর ছাড়া যায় না। একটা কথা বলব?

—বলো।

—আপনার সঙ্গে সাহিত্য-আলোচনা করে বুঝিছি, আপনিও একজন সাহিত্যিক। খগেনদা বলিছেন, আপনি লেখেনও। কী লেখেন? গল্প, না, কবিতা?

—দূর পাগল! আমার পেটে নেই এককলম বিদ্যে, আমি আবার কি লিখব? তোমার কবিতা কিন্তু আমায় দেখতে দিতে হবে।

—দিতে পারি, যদি আপনার লেখাও আমাকে দেখতে দেন।

না বাপু, অমন কোনও চুক্তিপত্রে আমি সই করতে রাজি নই।—হেসে বলেন, রাঙাবউদি। আর তাঁর সেই হাসির মধ্যেই ধরা পড়ে যায়, রাঙাবউদিও লেখেন।

এমনি করে লেখা আর পড়ার পথ বেয়ে দুটি অসমবয়সী মানুষের মধ্যে একটি মধুর বন্ধুত্বের বন্ধন দিনে দিনে দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হতে থাকে।

'তুমি চলে যাবে'

ফার্স্ট ইয়ার থেকে সেকেন্ড ইয়ারে ওঠার পরীক্ষা সমাপ্ত হল। পরীক্ষা রুনু ভালোই দিয়েছে। রেজাল্ট নিয়ে কোনও উৎকণ্ঠা নেই। প্রথম তিনজনের মধ্যে না হলেও প্রথম দশ জনের মধ্যে ও থাকবে শিওর।

পুজোর ছুটিতে বাড়ি যাওয়া হয়নি। কারণ, ওই ছুটিটাই ছিল ওর হাফ-ইয়ার্লি পরীক্ষার প্রিপারেশানের সময়। তখন রায় বাড়ি প্রায় ফাঁকা। বাড়িতে ছিলেন কেবল ঠাকুমা, পিসিমা, রাঙাবউদি হাসি আর দু-তিনজন দাস-দাসী। আর সকলেই চলে গেছে নরোত্তমপুর। দেশের বাড়িতে পূজা হয় খুব ধূমধাম করে। ওরা সব ফিরে আসে একেবারে কালীপূজা শেষ করে। অবশ্য রায়মশাই আর মাসিমা দুর্গাপূজা শেষ করেই ফিরে আসবেন। এ-বাড়িতে আবার লক্ষ্মীপূজার আয়োজন করতে হবে যে!

এবার পরীক্ষার পরে প্রায় দুমাস ফাঁকা সময় পাওয়া যাচ্ছে। এবার ও বাড়ি যাবে।

পূজার ছুটিতে বাড়ি না যাওয়ার জন্যে লম্বা কৈফিয়ৎ দিতে হয়েছে দাদাকে। বাবাকে অবশ্য পরীক্ষার প্রস্তুতির কথা বলেই খুশি করা গেছে। শেষ পর্যন্ত হাফ-ইয়ার্লি পরীক্ষা ওর ভালোভাবেই উতরেছিল। অবশ্য কেমিস্ট্রিতে কম নম্বর পাওয়ায় টোটালে ওর স্থান দাঁড়িয়েছিল চতুর্থ সে তুলনায় অ্যানুয়ালে কেমিস্ট্রি অনেক ভালো হয়েছে।

রুনুর হাফ-ইয়ার্লি শেষ হতেই এসে গেল ওর ছাত্রীদের অ্যানুয়াল পরীক্ষা। সে পরীক্ষায় ওর ছাত্রী দুটিও মান রেখেছে রুনু। প্রতিমা তো ক্লাশে থার্ডই হয়ে গেল। মাধুরীও অঙ্কে পেয়েছিল পঞ্চান্ন। আর সব বিষয়েও মাধুরীর নম্বর, খগেনদার মতে, আশাতীত। ইতিপূর্বে নাকি কোনও ক্লাশেই এত ভালো নম্বর পায়নি মাধু।

এবার ওরা দুজনেই উঠল নাইনে। নাইনে উঠবার মাস খানেকের মধ্যেই মহা ধূমধাম করে মাধুর বিয়ে হয়ে গেল। আর প্রতিমা? এই স্বল্পবাক কালো মেয়েটির মনের কথা কোনও দিনই বুঝতে পারল না রুনু। পরীক্ষার রেজাল্ট বেরুবার পর প্রতিমা ওকে প্রণাম করে বলেছিল, আমি যে থার্ড হমু, তা স্বপ্নেও ভাবি নাই, আপনে না পড়াইলে।

—তোমারে আর কতটুকু পরাইছি আমি? তুমি থার্ড হইছ তোমার ব্রেনের জোরেই। এবার কিন্তু ফার্স্ট হতি হবে।

—আপনে যদি পড়ান... মাধুর তো বিয়া ঠিক হইয়া গেছে। অয় তো আর পড়ব না।

দুদিন বাদে হয়তো তোমারও বিয়ে হয়ে যাবে। তখন আমার পাঠশালা শূন্য। —হেসে বলে রুনু।

আমার মতো কালো মাইয়ারে তো কেউ বিয়া করব না।—দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে প্রতিমা, মামায় কইছেন বি. এ. পাশ করতে পারলে আমারে একটা চাকরির ব্যবস্থা করিয়া দিবেন।

মামা মানে এ-বাড়ির রায়মশাই। সারা শহরে তাঁর দারুণ প্রতিপত্তি। ইচ্ছা করলে তিনি হয়তো প্রতিমাকে একটা চাকরি জোগাড় করে দিতেও পারবেন। কিন্তু বি. এ. পাশ করে কোনও অফিসের কেরানি বা স্কুলের দিদিমণি হতে পারলেই কি এই কালো মেয়েটির সব দুঃখ ঘুচে যাবে? বুঝতে পারে না রুনু।

এই একটা বছরে রায়পরিবারের সঙ্গে এমন নিবিড় ভাবে জড়িয়ে গেছে রুনু যে, ওকে আর বাইরের লোক বলে কেউ ভাবেই না এখন। হাসি আর রাঙাবউদি তো এই বাইরের ছেলেটিকে। আপনজনদের চেয়েও বেশি আপন ভাবেন।

কিন্তু ওর মন এ-বাড়ির কে সবচেয়ে বেশি অধিকার করেছে, এই প্রশ্নটার কোনও সদুত্তর ও আজও পেল না। কখনও মনে হয় হাসি, কখনও মনে হয় রাঙাবউদি। রাঙাবউদি এখন ওকে ডাকেন ভাই বলে, ব্যবহার করেন একেবারে সহপাঠী বন্ধুর মতো। ওদিকে আবার একটি দিন হাসিকে একটু আদর করতে না পারলে আবার ওর পড়ায় মন বসে না। এই হাসি, এই রাঙাবউদিকে ছেড়ে ও বাড়ি গিয়ে থাকবে কী করে?

এক বছর পর আজ ও বাড়ি যাচ্ছে, কিন্তু কই, বাড়ির কাউকে মনে করে তো ও কোনও ব্যাকুলতা বোধ করছে না; বরং এদের ছেড়ে যেতে হবে—এই বিচ্ছেদ-বেদনাটাই ওকে বেশি ব্যাকুল করে তুলেছে।

কাল সারারাত ও ঘুমোতে পারেনি। আজও বইপত্র গুছোতে গুছোতে আর বিছানাপত্র বাঁধতে বাঁধতে কেবল মনে পড়ছে এঁদের কথাটা, মনে পড়ছে এই একটা বছরের অনেক দিনের অনেক টুকরো টুকরো ঘটনার স্মৃতি।

একদিন ও বলেছিল, জানেন রাঙাবউদি, আমার মাথার মধ্যি না অনেক গল্পের প্লট মাঝে মাঝে গিজগিজ করে। বিশেষ করে কয়েকটা ভালো ভালো ইংরাজি উপন্যাস পড়ার পর। ভাবছি, এবার ছুটিতি বাড়ি যাইয়ে আরম্ভ করে দেবো একটা বড় গল্প।

—আমার মাথার মধ্যে কেবল একটা গল্পেরই প্লট আছে ভাই। মস্ত বড় গল্প।

বলুন না সে গল্পটা। আমি লিখব। আপনার প্লট নিয়েই লিখব আমার প্রথম গল্প। সোৎসাহে বলেছিল রুনু।

না রে ভাই, সে গল্প তোকে বলাও যাবে না, এ জীবনে আমার লেখাও হবে না! ভারী গলায় বলেছিলেন রাঙাবউদি। কবে থেকে যে রাঙাবউদি ওকে তুই সম্বোধন করতে শুরু করেছিলেন, সে আর এখন মনেও নেই রুনুর।

খানিক পরে প্রায় স্বগতোক্তির মতো বলেছিলেন রাঙাবউদি, হায় যদি লিখতে পারতাম, সে বই তোর শরৎ চাটুজ্জের সব বইকে ফেল মেরে দিত। আজ যদি শরৎ চাটুজ্জে শুনতে চাইতেন, তাঁকে হয়তো বলতুম। তিনি বুঝতেন। তুই তো ছেলেমানুষ, তুই বুঝবি নে।

রীতিমতো কলেজে পড়ি। এখন আর ছেলেমানুষ নই। সব বুঝি।—মেজাজী গলায় বলেছিল রুনু।

তোদের শরৎবাবু কিন্তু কলেজে পড়েননি রবীন্দ্রনাথও না। তাহলে তো তুই তাঁদেরও উপরে উঠে গেছিস। তাই না!—খিলখিল করে হেসে উঠেছিলেন রাঙাবউদি। স্তব্ধ হয় গেছিল রুনুর সব বাচালতা।

—অমন করে তাকিয়ে আছিস কেন? লিখতে পারবি একটা 'নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ' অথবা একটা 'রামের সুমতি'?

হিঃ হিঃ, আর লজ্জা দেবেন না রাঙাবউদি।—ভারী গলায় বলেছিল রুনু। মনে মনে সে শপথ নিয়েছিল, সে লিখবে, লেখাই হবে তার জীবন-সাধনা।

রাঙাবউদির আর একটা পরিচয় পেয়েছে রুনু মাত্র তিন দিন আগে। সেদিন বিকেলে হাসিকে নিয়ে বেড়িয়ে ঘরে ফিরতে সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হয়ে গেছিল। রাঙাবউদি তখন ঘরে ছিলেন না। টেবিলে একটা হ্যারিকেন জ্বলছে। হ্যারিকেনের সামনে একখানা মোটা খাতা খোলা রয়েছে। দেখা যাচ্ছে মুক্তোর মতো অক্ষরে লেখা একটা অসমাপ্ত কবিতা। এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলল রুনু। কী চমৎকার, কী বিষাদময় ক'টি লাইন! যেন রবীন্দ্রনাথের কোনও কাব্যাংশ। এমন একটা লাইনও তো লিখতে পারেনি রণু আজও পর্যন্ত। দ্রুত হাতে চলে এল খাতার প্রথম পৃষ্ঠায়। ছাব্বিশ পৃষ্ঠা একটানা চলেছে কবিতাটা। কবিতাটার শিরোনাম—'যে কথা হল না বলা' এ কবিতা আরও কত পৃষ্ঠা ধরে চলবে কে জানে! হয়তো এই মোটা খাতাটাই ভরে যাবে। একখানা কাব্যগ্রন্থ লিখছেন রাঙাবউদি। গভীর আগ্রহে প্রথম থেকেই পড়তে করেছিল রুনু প্রথম পৃষ্ঠাটা ওলটাবার মুহূর্তে পিছন থেকে রাঙাবউদির ধমক শুনে চমকে উঠল সে।

তিনি ঘরে ঢুকেই একটানে খাতাটা ছিনিয়ে নিলেন রুনুর হাত থেকে। রুনু সবিস্ময়ে চেয়ে থাকে রাঙাবউদির মুখের দিকে। সে মুখে কপট গাম্ভীর্য।

—কী হল? একেবারে যে হাঁ হয়ে গেলি!

—কী আশ্চর্য! আপনার লেখা এত সুন্দর! ভাবতিই পারিনি!

—কী সুন্দর? হাতের লেখা, না, যা লিখেছি?

—দুই-ই।

—কিন্তু তুমি অন্যায় করেছ। গোপন কারও লেখা পড়া অন্যায়।

—কোনও কাগজে ছাপা হলি তো আর পড়তি দোষ নাই। আপনার এ কবিতা যে-কোনও কাগজে ছাপা হতি পারে।

—তা হয়তো হতে পারে, কিন্তু সে আমার মৃত্যুর পরে।

মানে! কেন? ছিঃ, ছিঃ, ও-কথা বলে না—বলতে বলতে রুনুর চোখ ছল ছল করে ওঠে।

ওর মাথায় সস্নেহে হাত বুলিয়ে রাঙাবউদি বলেছিলেন, তুই সত্যি ছেলেমানুষ ভাই। আরে আমি কি আজই মরতে যাচ্ছি? আচ্ছা, সত্যি বলছিস, আমার লেখা তোর ভালো লেগেছে?

—দারুণ! আপনি কবি। এ গ্রেট পোয়েট! আমারে কিন্তু পড়তি দিতি হবে।

—দেখা যাক, আগে শেষ তো করি। একমাত্র তোকেই হয়তো পড়তে দিতে পারি শেষ পর্যন্ত, কারণ এটা তুই-ই লিখিয়েছিস আমাকে দিয়ে।

—মানে?

—তোর খোকাদার গল্প বলতে বলতে সেদিন বলেছিলি না আমাকে লিখতে? তাঁর 'নির্বাসিত' কবিতাটা আমাকে শুনিয়েছিলি মনে আছে? বলেছিলি, এ হল খোকাদার আত্মকথা। ওই আত্মকথা শব্দটা আমাকে ভারি নাড়া দিয়েছিল। সেই রাতেই বসেছিলাম আমার আত্মকথা লিখতে। কী মাথামুন্ডু লিখেছি একটানা!

—এ-ই আপনার প্রথম কবিতা!

—একেবারে প্রথম বললে মিথ্যে বলা হবে। তোর কাছে মিথ্যে বলতে পারি না। এখানে তো দেখেছিস, এই ঘরখানার মধ্যে আমিও নির্বাসিত হয়ে আছি। এ-ও তো এক জেলখানা! এখানে আমার অনন্ত অবসর। তাই অবসর কাটাই বই পড়ে আর একটু-আধটু কলমচর্চা করে।

—কী কাণ্ড! খগেনদা তাহলে সত্যি বলিছে। সেগুলি দেখতি দেবেন তো?

—না। জানাজানি হলে ঠাট্টার চোটে মারা যাব আমি।

—আমি কাউকে বলব না।

—ঠিক তো?

—নিশ্চয়ই। আপনি দেখবেন?

—তাহলে দেব ঠিক তোর বাড়ি যাবার সময়। এখানে বসে পড়া চলবে না।

সেই প্রতিশ্রুতি স্মরণ করিয়ে দিতেই বাড়ি রওনা হবার দিন ওর জিনিসপত্র সব গুছিয়ে, এ-বাড়ির সব গুরুজনদের প্রণাম করে সবশেষে এসেছে রুনু রাঙাবউদির ঘরে।

তখন বিকেল তিনটে। দোরে দাঁড়িয়ে পর্দাটা তুলতেই দেখা গেল, হাসি ঘুমোচ্ছে। ও ঘুমিয়ে থাকতে থাকতেই রুনুর রওনা হবার ইচ্ছা। জেগে উঠলে ওর কাছ থেকে বিদায় নেওয়া সহজ হবে না। কেবল হাসিই নয়, কেঁদে কেটে ও নিজেই হয়তো একটা কাণ্ড করে বসবে। এই একটা বছরে ওইটুকু মেয়ে যে কী মায়ার বাঁধনে বেঁধে ফেলেছে ওকে! ও বাড়ির কথা ভুলেছে, ভুলেছে অতীতের অনেক মিষ্টি মুখ, অনেক স্নেহের স্মৃতি।

আর এক কঠিন বন্ধন রাঙাবউদির অকৃত্রিম স্নেহ। একদা ওর জীবনে খোকাদার ছিল যে ভূমিকা আজ রাঙাবউদি নিয়েছেন সেই ভূমিকা। ওই হাসি, এই রাঙাবউদি, এদের ছেড়ে বাড়িতে যে কী করে ওর দিন কাটবে ভাবতেই পারছে না রুনু। বুক ভেঙে আসছে কান্নায়। কিন্তু না, রাঙাবউদির সামনে ও আজ চোখের জল ফেলবে না। বরং তাঁকে হাসিয়ে যাবে এবং সেই হাসিমুখের স্মৃতিটুকু বুকে এঁকে নিয়ে ও বাড়ি যাবে। কেবল একটি প্রণাম করে সেই কবিতার খাতা নিয়েই চলে আসবে ও। রাঙাবউদি নিশ্চয়ই হাসিমুখে আশীর্বাদ করবেন। ও আর দাঁড়াবে না।

মৃদু পায়ে ঘরে প্রবেশ করল রুনু।

রাঙাবউদি পিছন ফিরে তাকিয়ে আছেন সেই জানালাটা দিয়ে কাউনিয়া রোডের দিকে। প্রতিদিন কলেজ থেকে ফিরবার সময় ওই জানালায় ওই মুখখানা রুনুর একবার দেখা চাই। চোখে চোখ পড়ামাত্র রাঙাবউদির ঠোঁটের কোণে মিষ্টি একটু হাসি দেখা যেত। হাসত রুনুও। ওইটুকু হাসিতেই সারা দিনের ক্লান্তি ওর ধুয়ে-মুছে যেত। আজও রুনু আশা করেছিল ওর চোখে চোখ পড়ামাত্র রাঙাবউদি তেমনি করে হাসবেন। সেই হাসিমুখের কাছ থেকেই বিদায় নেবে ও।

ওর পায়ের শব্দে মুখ ফেরালেন রাঙাবউদি। সে মুখের দিকে তাকিয়ে হাসতে ভুলে গেল রুনু। হঠাৎ গভীর কণ্ঠে বলে বসল, বিদায় নিতি আলাম!

শত চেষ্টা করেও ওর চোখ দুটি রাখতে পারল না স্বাভাবিক।

প্রণাম করতে হাত বাড়াতেই ওর হাত দুখানা ধরে ফেললেন রাঙাবউদি। হেসে বললেন, তুইতো আমার ভাই, আমার বন্ধু! প্রণাম নয়, হ্যান্ডশেক করব আমরা।

ফুলের মতো নরম হাতে রুনুর হাতদুখানা ধরে রাখলেন রাঙাবউদি কিছুক্ষণ। তারপর ওর দু-কাঁধে হাত রেখে বললেন, বাড়ি পৌঁছে চিঠি দিস।

বুকের মধ্যে অবরুদ্ধ বেদনাটা রুনুকে অস্থির করে তুলেছে। ও আর একমুহূর্ত দাঁড়াতে পারল না। ওর মনেও পড়ল না কবিতার খাতার কথা। কেবল একদৌড়ে হাসির ঘুমন্ত মুখে ছোট্ট একটি চুমু খেয়ে ছুটে গিয়ে উঠে পড়ল অপেক্ষামান ঘোড়ার গাড়িখানায়।

ঘণ্টা বাজিয়ে কাউনিয়া রোডে সাড়া জাগিয়ে ছুটতে শুরু করল গাড়িখানা।

শারদীয়া কিশোর ভারতী ১৯৭৯

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%