শ্যামদাস দে

গ্রামের পাঠশালার পড়া সাঙ্গ করে রুনু গিয়েছিল ওদের গোবরা গ্রাম থেকে বারো মাইল দূরবর্তী বাজুনিয়া গ্রামের মাইনর স্কুলে পড়তে। পিতা শ্রীনাথ পণ্ডিতের আশা ছিল মাইনর স্কুলে ফাইভ সিক্স দু-বছর পড়ে মাইনরে বৃত্তি পেয়ে রুনু পড়বে গোপালগঞ্জ হাইস্কুলে। বাজুনিয়ায় রুনুর থাকার ব্যবস্থা করেছিলেন তারই এক প্রাক্তন ছাত্র সোমনাথ চক্রবর্তীর বাড়িতে। বাড়িটি বাজুনিয়া স্কুলের খুব কাছে। সবাই বলে 'ঠাকুরবাড়ি'।
ঘটনাচক্রে বাজুনিয়া স্কুলে মাত্র এক বছর পড়ার পরেই রুনুকে ওখান থেকে নিয়ে আসতে হল। গোপালগঞ্জ হাইস্কুলে রুনু ভর্তি হল ক্লাস সিক্স-এ। সেখান থেকেই এবার ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিল রুনু।
বাজুনিয়ায় থাকাকালীন 'খোকাদা' নামে সমস্ত শিশুর পরমপ্রিয় এক কুড়ি-বাইশ বছরের তরুণের সঙ্গে রুনুর খুব ঘনিষ্ঠ পরিচয় হয়েছিল। খোকাদা করের বাড়ির ছেলে হলেও জমিদার করবাবুদের কেউ নয়। খোকাদার বিধবা বোন শৈলদি এবং তাঁর (শৈলদির) একমাত্র কন্যা চুয়া। বাজুনিয়ায় যখন পড়ত রুনু তখন ওর বয়স এগারো বৎসর; চুয়ায় নয়-দশ বৎসর। চুয়া ছিল রুনুর প্রাণের বন্ধু।
ঠাকুরবাড়িতে দীপু ও নিপু নামক দুটি ছোট ছেলেকে পড়াত রুনু। তাদের প্রতিও ছিল রুনুর বুক ভরা স্নেহ-মমতা। আর ঠাকুরবাড়িতে রুনুকে সবচেয়ে বেশি স্নেহ করতেন বৃদ্ধা ঠাকুমা। ঠাকুমার বাইরের আচরণ ছিল খুব রুক্ষ। অত্যন্ত মুখরা ছিলেন তিনি। সেই রুক্ষতার মধ্যেও তাঁর অন্তঃসলিলা ফল্গুধারার মতো স্নেহধারাটির স্বাদ পেয়েছিল রুনু।
তারপর পাঁচ বছর কেটে গেছে। রুনুর বয়স এখন ষোলো। ম্যাট্রিক পরীক্ষা যেদিন শেষ হল, সেইদিন রুনু খোকাদার একখানা চিঠি পেল। রুনুর জীবনে প্রথম ডাকে পাওয়া চিঠি। খোকাদা রুনুকে পরীক্ষার পরে বাজুনিয়ায় বেড়াতে যাবার জন্য নিমন্ত্রণ করেছেন।
সেই নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে পাঁচ বছর পরে আবার বাজুনিয়ায় চলেছে রুনু...চলেছে, ওদের সেই ছোট্ট ডিঙিতে চড়ে, যে ডিঙিতে নগরবাসী বুনো ওকে অতীতেও কয়েকবার আনা-নেওয়া করেছে...।
গোপালগঞ্জের ঘাট থেকে বেলা প্রায় বারোটায় রুনুকে নিয়ে নগরবাসী ওদের ছোট্ট ডিঙিখানা ছেড়েছিল। প্রথম কিছুক্ষণ কমলা, প্রমীলা আর পুষির ছলছল চোখের বিদায় দৃশ্যটি ওকে বড় মুহ্যমান করে রেখেছিল। ওরও বুক ফেটে আসছিল এই বিচ্ছেদ-জনিত একটা গুমরানো বেদনায়। কে জানে আবার কবে দেখা হবে ওদের সঙ্গে। গোপালগঞ্জের পাঁচটা বছর রুনুর বুকে অক্ষয় হয়ে রইল ওদের মধুর স্মৃতিতে। বিশেষ করে কমলার শেষ ক'টি দিনের প্রাণঢালা সেবা ওকে যেন নবজন্ম দান করেছিল। কমলাকেও কথা দিয়েছিল পরীক্ষার পরে যে তিন মাসের মতো সময় পাওয়া যাবে তখন ও কমলাকে খুব যত্ন করে পড়াবে। সেই ভাবেই ও শোধ করবে তার সেবার ঋণ। হায়, সে প্রতিশ্রুতি আর রাখা হল না! খোকাদার চিঠিখানা ওর সব পরিকল্পনা উল্টোপাল্টা করে দিল। কমলার সে ঋণ ও কি আর শোধ করতে পারবে এ জীবনে!
প্রায় এক মাইল উত্তরে এগিয়ে, গোপালগঞ্জের স্লুইস-গেট পার হয়ে ডিঙিখানা যখন পূর্বমুখী গোলাবেড়ের খালে পড়ল, তখন থেকেই ওর সমস্ত চিত্তটা বাজুনিয়া অভিমুখী হয়ে গেল।
পাঁচ বছর পরে আবার চলেছে রুনু বাজুনিয়ায়। খালের দুধারের ছবিগুলি চোখে দেখছে, আর মনের পরদায় ভেসে উঠেছে পাঁচ বছর আগের বাজুনিয়ার ছবিগুলি। কী আশ্চর্য, বাজুনিয়ার সেই দীপু-নিপু-ঠাকুমা-কাকিমা, সেই নরেনদা-খোকনদা, সেই শৈলদি আর চুয়া যে ওর মনটাকে এমন করে অধিকার করে রয়েছে, এতদিন তো বুঝতেই পারেনি। বিশেষ করে চুয়ার সেই দুষ্টু-দুষ্টু হাসিভরা চোখ দুটি যেন এই মুহূর্তে ওর চোখের সামনেই ঝিকমিক করছে। তারপর চুয়ার সেই শেষ দিনের কাণ্ড, যেদিন রুনু চলে এসেছিল বাজুনিয়া ছেড়ে। সে মোটে এলই না ঘাটে। শৈলদি বলেছিলেন, কাঁদতে কাঁদতে সে নাকি নীলবর্ণ হয়ে গেছে! সেই নীলবর্ণ হয়ে যাওয়া চুয়াকে মনে মনে কল্পনা করেই রুনু বুক ভাসিয়ে দিয়েছিল কেঁদে। সে কথা কি আজ মনে আছে চুয়ার?
কি ছেলেমানুষ ছিল তখন চুয়া। ছেলেমানুষ ছিল তো রুনুও। গোপালগঞ্জের পাঁচটা বছরের বিচিত্র অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে ওর জীবনে যেন একটা যুগান্তর ঘটে গেছে। ও এবার ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিল। ওর বয়স এখন ষোলো বছর। আজকের রুনু, সেদিনের ছোট্ট রুনুকে নিজের থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখছিল যেন সেদিনের ছোট্ট চুয়ার পাশে। সে রুনু যেন আর কেউ।
চুয়ার সঙ্গে মানস-সংলাপ রচনা করছিল রুনু। তার কোনও প্রশ্নের ও কী জবাব দেবে? ওর প্রাইজের বইগুলি আর সেই সোনার মেডেল দেখে কী বলবে চুয়া, কেমন হতে পারে তার চোখ দুটি,—এই সবই ভাবছিল রুনু নৌকার ছইয়ের মধ্যে চোখ বুজে শুয়ে শুয়ে। ওর ধ্যানভঙ্গ হল নগরবাসীর কথায়।
—ও ছোটকত্তা, আর কত ঘুমোবি? বাজুনে পেরায় আইসে গেলাম।
তাই নাকি?—বলতে বলতে একলাফে ছইয়ের বাইরে এল রুনু।
অপরাহ্নের ম্লান সূর্যালোকে চারিদিকটা অপরূপ দেখাচ্ছে। এখন বোধহয় বিকেল চারটে হবে। ওই তো সামনে দেখা যাচ্ছে ভোজেরগাতির সেই বাঁশের সাঁকো। ওই সাঁকোর তলা দিয়েই তো উত্তরমুখী সরু খালটায় পড়বে ডিঙিখানা আর কয়েক মিনিটের মধ্যেই। তারপর তো পাঁচ-সাত মিনিটের মধ্যেই ঠাকুরবাড়ির ঘাট।
পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে এবার বাজুনিয়া স্কুলটা। ওই স্কুলেই তো রয়ে গেছে রুনুর একটা বছরের হাসি-কান্নার ইতিহাস।
স্কুলের ডানদিকে দেখা যাচ্ছে ঠাকুরবাড়ির আমবাগান। ওই আমবাগানেও কী কম কাহিনী জমে আছে? হয়তো ওই সব আমগাছেরা মনে রেখেছে সে সব কথা! হয়তো ওরা আজও চিনতে পারবে রুনুকে দেখেই।
আমবাগানের মধ্যে ঠাকুরবাড়ির ছবিটা, যে বাড়ির ঠাকুমা, কাকিমা, দীপু-নিপু সকলের ছবিই ভেসে উঠছে ওর চোখের সামনে। কি জানি আজ পাঁচ বছর পরে সে ছবিগুলি কতখানি বদলে গেছে! কত বড় হয়ে গেছে দীপু-নিপু। দীপুর এবার নাইনে পড়ার কথা, নিপুর এইটে। ওরা নিশ্চয়ই বাজুনিয়া হাইস্কুলে পড়ছে। প্রতিদিন তিন-তিন ছয় মাইল হাঁটতে হচ্ছে ওদের।
কী আশ্চর্য, নিজের মনের গভীর ডুব দিয়ে দেখছে রুনু, এই পাঁচ বছরে ঠাকুরবাড়ির এই মানুষগুলির কথা তো ওর প্রায় মনেই পড়েনি। অথচ সেদিন মনে হতো দীপু-নিপুকে ছেড়ে ও থাকবে কী করে? কী করে ছেড়ে থাকবে ঠাকুমাকে, যে ঠাকুমা পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে রুনুকে। ও কি অকৃতজ্ঞ?
হয়তো অকৃতজ্ঞ নয়। এই ভুলে যাওয়াটাই সত্য। মানুষ হয়তো এমনি করে পেছনটাকে ভুলতে ভুলতেই সামনের দিকে এগোয়!...এইসব কথা ভাবছিল রুনু বাজুনিয়া গ্রামটার দিকে চেয়ে চেয়ে।
ভোজেরগাতির সাঁকোর তলা দিয়ে এসে ওদের ডিঙিখানা সরুখালে পড়ে উত্তর দিকে এগুতেই ও পড়ল একটা নতুন ভাবনায়।
নগরবাসীকে না বললে ওতো নিশ্চয়ই ঠাকুরবাড়ির ঘাটেই ডিঙি ভিড়াবে। অথচ ওকে চিঠি লিখে নিমন্ত্রণ করেছেন খোকাদা। ও এবার খোকাদারই অতিথি। সে ক্ষেত্রে ডিঙিখানা ভিড়াতে হয় ঠাকুরবাড়ির ঘাট ছাড়িয়ে আরও একটু উত্তরে করের বাড়ির ঘাটে।
কিন্তু কি একটা সঙ্কোচে সে কথা ও বলতেই পারল না নগরবাসীকে। রুনু বাজুনিয়া এসে ঠাকুরবাড়ি ছাড়িয়ে করের বাড়ির ঘাটে নেমেছে একথা শুনলে ঠাকুমাই বা কী ভাববেন? হয়তো বলেই বসবেন, 'দাদা এহেনি পাশ দিয়ে বড়বাবু হইছেন, গরিবির বাড়িতি পা দিতি তো ঘেন্না হবেই।' হয়তো মুখ খিস্তি করে বলে বসবেন আরও কোনো কঠিন কথা। মুখের তো লাগাম নেই ঠাকুমার। তাছাড়া দীপু-নিপুরও নিশ্চয়ই খুব অভিমান হবে। এইসব ভেবেই চুপ করে রইল রুনু। ভাবল, নগরবাসী ওকে ঠাকুরবাড়ির ঘাটেই নামিয়ে দিক। তারপর ওদের কাছে সব কথা বলে চলে যাওয়া যাবে খোকাদাদের বাড়িতে।
যথারীতি ঠাকুরবাড়ির ঘাটেই ডিঙি ভিড়াল নগরবাসী। তখন সবে সন্ধ্যা হয়েছে।
সময়টা তুলসিতলায় সন্ধ্যা দেবার সময়। আশা করছিল হয়তো দেখবে কাকিমা ঘাড়ের উপর দিয়ে আঁচলটা ঘুরিয়ে গলবস্ত্র হয়ে তুলসিতলার সন্ধ্যাবাতি দিচ্ছেন। একহাতে সন্ধ্যাদীপ, অন্য হাতে তাঁর শাঁখ।
তুলসি পিড়িটার দিকে চোখ পড়তেই চমকে উঠল রুনু। এ কী? তুলসিবেদিটা সারাক্ষণ ঝকঝকে তকতকে থাকত। তুলসি গাছটা নিত্য জল-সিঞ্চনে সারাবছরই নধরকান্তি হয়ে উঠোনের শোভাবর্ধন করত। সে তুলসিবেদি ভেঙে পড়েছে উঠোনে। গাছটা মরে কঙ্কালসার হয়ে আছে। ঠাকুমা যে উঠোন দিনে দশবার ঝাঁট দিতেন, সে উঠোন আবর্জনাময়।
বাড়িটা আশ্চর্য রকম নিঃশব্দ। সারাবাড়িতে কেমন একটা বিষাদের ছায়া পড়েছে। রান্নাঘরে মস্ত একটা তালা ঝুলছে। বারান্দার মাটি খসে খসে পড়েছে উঠোনে। বড় ঘরের সেই তিন-চার হাত উঁচু মাটির দাওয়াও ভেঙে ভেঙে পড়েছে চারিদিকে। যেন একটা পরিত্যক্ত ছাড়া বাড়ি। কিন্তু বড় ঘরের দরজাটা সামান্য ফাঁকা দেখা যাচ্ছে, এবং সেই ফাঁকা দিয়ে সামান্য একটু অস্পষ্ট আলোর রেখাও পড়েছে বারান্দায়। তাহলে কি এখন সবাই রয়েছে ওই ঘরের মধ্যে? কিন্তু বাড়িটার এ দশা কেন?
নিঃশব্দে বারান্দায় উঠল রুনু। পেছনে নগরবাসীর মাথায় রয়েছে ওর স্যুটকেসটা। আস্তে দরজাটা একটু ফাঁক করে ভিতরে উঁকি দিতে যাচ্ছিল রুনু। ঘরেই যদি আছে সবাই তবে সাড়াশব্দ নেই কেন? একটা অজানা ভয়ে ও নিজেই কোনও সাড়া দিতে পারছে না। তাইতো চেয়েছিল উঁকি মেরে ব্যাপারটা বুঝতে। কিন্তু দরজাটায় ক্যাঁচ করে একটু শব্দ হল। সে শব্দে ভয় পেয়ে গেল রুনুই। কাঁপাগলায় ডাকল, ও ঠাকুমা, ঠাকুমা।
ভিতর থেকে ক্ষীণ কণ্ঠস্বর ভেসে এল—কেডা রে?
এ যে শৈলদির গলা!
শৈলদি কালিপড়া একটা হ্যারিকেন হাতে করে নিঃশব্দে এলেন দরজার কাছে। রুনুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে হ্যারিকেনের অস্পষ্ট আলোয় শৈলদি ওকে দেখলেন আপাদমস্তক খানিকক্ষণ ধরে। তারপর সবিস্ময়ে বললেন, ওমা! রুনু নাকি? ইশ, তোরে যে চিনতিই পারি নাই। কত বড় হয়ে গিছিস। তোর গলার আওয়াজ বদলে গেছে।
রুনু প্রণাম করল শৈলদিকে। রুনুও দেখল শৈলদিকে। শৈলদির গলার আওয়াজটাই কেবল ঠিক আছে, আর সবই বদলে গেছে। সেই একপিঠ ঘন কৃষ্ণ চুল কোথায় গেল? মাথায় প্রায় পুরুষলোকের মতো করে ছাঁটা মাত্র এক ইঞ্চি চুল রয়েছে। তাও প্রায় সাদা হয়ে গেছে, সেই হাসিভরা মায়াময় চোখ দুটিতে আজ এ কি বিষাদের কালিমা। সেদিনের সেই স্বাস্থ্যবতী উজ্জ্বল শৈলদি এই কবছরেই এমন বুড়িয়ে গেছেন? মুখখানা হয়ে গেছে এমন তোবড়ানো? এ কী চেহারা হয়েছে শৈলদির?
মনের চিন্তাটাই প্রশ্নরূপে বেরিয়ে এল ওর মুখ দিয়ে এ কী চেহারা হইছে আপনার শৈলদি!
আমার আর চেহারা দিয়ে কি হবেরে রুনু—ম্লান হেসে বলেন শৈলদি। —সব মানুষই একদিন বুড়ো হয়। আমিও বুড়ি হয়ে গেছিরে ভাই। আয়, ভেতরে আয়।
কার সাথে কথা কচ্ছিস লো শৈলী?—ভিতর থেকে এবার ঠাকুমার ক্লান্ত কণ্ঠ শোনা যায়। গলাটা ভাঙা ঘরঘড়ে। তবু বোঝা যায় এ ঠাকুমারই গলা।
ভিতরে ঢুকে আর একবার চমকায় রুনু! কাকিমার সেই বড় খাটখানা দেওয়ালের সঙ্গে খাড়া করা রয়েছে। নীচে কেবল একটা মাদুর পাতা সেখানে। ঘরে তৈজসপত্র বিশেষ কিছু নেই। সেই মস্ত বড় কাঠের সিন্দুক, বড় বড় দুটো ট্রাঙ্ক, বিছানাপত্র, হাঁড়ি-কলসি, বাসন-কোসন প্রায় কিছুই নেই। কেবল সামান্য টুকিটাকি জিনিস রয়েছে ঠাকুমার সেই ছোট খাটের তলায়।
ঠাকুমা শুয়ে আছেন তার সেই খাটেই। বিছানাটা দারুণ নোংরা। শিয়রের কাছে একটা খালি কেরোসিন টিনের উপর ভাঁজ করা একটা চটের বস্তা। ওইটের উপরেই বোধহয় বসেছিলেন শৈলদি।
ঠাকুমার শয্যালীনা শরীরটার দিকে তাকিয়ে রুনুর হঠাৎ মনে পড়ল একটা দৃশ্য। একবার বাজপড়া একটা কাঁঠালগাছ দেখেছিল রুনু গোপালগঞ্জ যাবার পথে। যেদিন বাজ পড়ল তার দু-তিন দিনের মধ্যেই কি আশ্চর্যভাবে শুকিয়ে গেল গাছটা। সবুজ পাতাগুলি একদিনেই লাল হয়ে গেল, দেখতে দেখতে শুকিয়ে ঝরে গেল সব পাতা। গাছটা হয়ে গেল একটা কঙ্কাল। তারপরেও সে দাঁড়িয়েই রইল মাটির উপর কিন্তু মাটির সঙ্গে রসঃসংযোগ আর রইল না। ঠাকুমাও যেন তেমনি একটা বাজপড়া কঙ্কাল হয়ে গেছেন। এ পৃথিবী থেকে রস গ্রহণের আর শক্তি নেই তাঁর।
সেই কেরোসিন টিনটাই দেখিয়ে বলেন শৈলদি, বয় রুনু, একটু সময় বয় ওনার কাছে। দুডো কথাটথা ক। আমি যাই খোকারে খরবডা দিই গে। খোকার চিঠি পাইছিলি তো?
—সেই চিঠি পাইয়েই তো আইছি।
শৈলদি বাইরে আসতেই নজরে পড়ল নগরবাসী তখনও দাঁড়িয়েই আছে উঠোনে রুনুর স্যুটকেসটা মাথায় করে। এ ব্রাহ্মণবাড়ির বারান্দায় যে উঠবার তার অধিকার নেই, তা সে জানে।
—ওমা! তুমি দাঁড়িয়েই রইছ বোঝাডা মাথায় ধরে? চলো, চলো, আমার সাতে চলো। এই রুগির ঘরে রুনু থাকতি পারবে না। ও আমাগো বাড়ি থাকবে।
এ বাড়িতে যে একটা অসুখ-বিসুখের ব্যাপার ঘটেছে তা অভিজ্ঞা নগরবাসী অনুমান করতে পেরেছিল। সে নিঃশব্দে শৈলদিকে অনুসরণ করল।
রুনু এবার ঠাকুমার পাশটিতে বসে তাঁর মাথায় হাত রেখে বলল, আপনার কী হইছে ঠাকুমা?
—আমারে ছুঁসনে দাদা, ছুঁসনে। ওই এক শৈলী ছাড়া এ সংসারে কেউ আমারে ছোঁয় না। তা ওর তো ঘেন্না-পিত্তিও নাই, মিত্যু-ভয়ও নাই।
—ঘেন্না আমারও নেই ঠাকুমা।
কথাটা যদিও বলল রুনু, কিন্তু ঠাকুমার এই অসহ্য দুর্গন্ধময় ময়লা বিছানাটায় বসতে ওর মনের মধ্যে একটু খুঁৎখুঁৎ করতে লাগছিল বইকি। বলল, কিন্তু আপনার অসুখটা কী?
সোংসারে আমার সুহির কপালে নুড়ো জ্বালে দেছে, তাই অসুখ। এ আমার মরণ বেয়াধিরে দাদা। এই আমার শেষ শোয়া।—কথাগুলি অবশ্য একটানা বলতে পারেননি ঠাকুমা। অনেকবার দম নিয়ে এক একটা করে শব্দ উচ্চারণ করেছেন।
ঠাকুমার শণের নুড়ির মতো চুলের মধ্যে কোমল ভাবে বিলি দিতে থাকে রুনু। ঠাকুমা তাঁর একখানা শীর্ণ হাত দিয়ে যেন রুনুর সর্বাঙ্গ জরিপ করতে চাইছেন। মুখে, মাথায়, বুকে, পিঠে হাত বুলিয়ে খানিকপরে প্রশ্ন করেন, তুই চলে গিছিলি কয় বছর হলোরে দাদা?
—পাঁচ বছর।
—পাঁ-আ-চ বছ-অ-র!। তাইতো দেখতিছি কত বড় হয়ে গিছিস। ও আমার পোড়া কপাল, দেখতি আর পারলাম কইকি। এ জেবনের দ্যাহা-শুনো শ্যাষ করে দিছি। চোহি আর দেহি না কিছু।
—একটুও দেখতি পান না?
—দিনির বেলায় আফছা-আফছা এট্টু দেহি। রাত্তিরে এহেবারে অন্দ। এহোন কত রাত হল ক দেহি দাদা।
বলতে-বলতে হাঁপাতে থাকেন ঠাকুমা। এখন যে কেবল সন্ধে সে কথা বলল না রুনু। বলল, আপনি আর বেশি কথা কবেন না ঠাকুমা। আপনার কষ্ট হচ্ছে।
—কথা তো কই-ই না। সারা দিনমান মুখ বুজে পড়ে থাহি, আর ঈশ্বরের ডাহি—এবার আমারে ন্যাও হরি, এবার পার হরো, তা সে পোড়ামুহো কি আমার দাক শোনে? এট-এট্টা রাত্তির আর কাটতি চায় না।
—আমি আপনার গায়ে হাত বুলোয়ে দিচ্ছি, আপনি ঘুমোন ঠাকুমা।
—ঘুমোব দাদা...এবার আমি ঘুমোব জন্মের মতো। জানিস দাদা, এবার আমি মরণরে দেহিছি, তার সাথে কথা কইছি। সেবার তুই আমারে যোমের হাতেত্তে টান্নে অনিছিলি, এবার আর পারবি না রে দাদা; এবার আর পারবি না। এবার ধানের ভাত মুহি তিতে নাগিছে। তাইতেই বুঝিছি...
ভাত মুখে তিতো লাগলে যে কি বুঝতে পারা যায় রুনু জানে না। এ কথাটা ও এই প্রথম শুনল।
খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে ঠাকুমা বলেন, জানিস দাদা, আর সারাডা দিন তোর কথা খুব মনে পড়িছে। অথচ ও পোড়ার মুহোগে কথা আমার একবারও মনে পড়ে না।
কথাটা শুনে চমকে উঠল রুনুঃ একজনের মনের চিন্তা তাহলে আর একজনের মনে অনুরণিত হয়? তা না হলে বিশেষ করে আজ ঠাকুমার ওর কথা মনে পড়বে কেন? ও-ও যে সারাদিনে অনেকবার ঠাকুমার কথা ভেবেছে।
ওরা কোথায়? দীপু-নিপুরা? কাকিমাই বা কোথায়?—প্রশ্ন করে রুনু।
—ও আমার পরমেশ্বার! তুই জানিস না? ও মুখ পোড়ারা তো আমারে জন্মের শোধ বিদেয় দিয়ে এ দ্যাশ ছাড়্যে চলে গেছে।
কোথায়?—রুনু বিস্ময়ে হতবাক। এমন একটা অসুস্থ মানুষকে এই বাড়িতে একা রেখে সবাই চলে গেছে। তাই বুঝি শৈলদি—।
কোথায় গেছে ওরা?—আবার প্রশ্ন করে রুনু।
—ওই সোম যেহানে চাকরি হরে! রাক্ষসীটা আমার নামে সাত-সাতেরো নিন্দে হরে হরে সোমের কানডা বিষেয়ে দিছিল। তারপর ছেলেগে বড় ইস্কুলি পড়ানোর উজোৎ (অজুহাত) দিয়ে সোম তাগে নিয়ে গেছে।
—কবে গেছে?
—সে পোড়াছাই কি আমার মনে আছে? দীপুডা এক বছর কাজুলে ইস্কুলি পড়িছিল। তারপরের বছর নিপুরও কাজুলে ইস্কুলি যাওয়ার কথা। তেনার নাকি অত পথ হাটতি পায়ে ফোস্কা পড়বে। তিনি বায়না ধরলেন বাবার ইস্কুলি পড়বেন। বোধহয় রাক্ষসী শিখেয়ে দিছিল। তা সেই বছরই সোম বউ, ছেলে-মেয়ে নিয়ে আমারে শূন্য পুরীতে ফেলায়ে—
রুনু হিসেব করে দেখল ওরা তাহলে দুবছর হল চলে গেছে! এই দুবছর ঠাকুমা একাই রয়েছেন এ বাড়িতে! তাইতো বাড়িটার এই দশা।
ঠাকুমা-কাকিমার অর্থাৎ শাশুড়ি-পুত্রবধূর সম্পর্কটা যে কোনওদিনই খুব ভালো ছিল না, সে তো রুনুও জানে। লোকে অবশ্য ঠাকুমারই দোষ দিত উনি অসম্ভব মুখরা বলে। তাই বলে সোমকাকু তাঁর নিজের মাকে এভাবে...
ভাবতে গিয়ে সোমকাকুর উপরই দারুণ অভিমান হল রুনুর। সোমকাকু এত নিষ্ঠুর!
—আপনার এই অসুখ কদ্দিনের?
—অসুখ ওরা যাওয়ার পরেত্তেই। তয় এবার পৌষসংক্রান্তির দিনিত্তে খুব বাড়াবাড়ি। সেইদিনই রানতি বসে মাথা ঘুরে পড়ে যাই উনোনের কাছে তার পরেত্তে আর মাথা তুলতি পারি না। শৈলী কয় বেলাড পেসার। আবার কয় ক্যাঞ্ছার। আরও কি সব কয়টয় শুনি ওয়ার কাছে।
—সোমকাকুরে এই অসুখের খবর দেছেন?
—ক্যান, ওরে খবর দেব ক্যান? ও আমার কেউ না। আমি পিতিজ্ঞে হরিছি ও নিব্বুংশের মুখ আর দ্যাখপোনা এ জেবনে। বউয়ের কথায় যে আমারে ত্যাগ করিছে, তারে আমিও ত্যাগ করিছি। দ্যাখ পরমেশ্বারের কি লীলা! আমি ভাবিছি এ সময় সেই ছ্যামড়া থাকলি সে আমার মুহি আগুন দিলি আমি সুহি মরতি পারতাম। তা দ্যাখ, ঠিক সময় মতো তোরে আনি দিছে পরমেশ্বার। আর আমার ভাবনা নাই। তুই আমার মুহি আগুন দিলিই আমি সগ্গে যাব। তুই কি যে সে মানুষের ছল? তুই ছিন্যাথ পণ্ডিতির ছল। সাতটা বামুনের পুণ্যি তার শরীলে। তোর শরীলেও মায়াদয়া আছে। তোরও পুণ্যির শরীল। তোরে আমি চিনিছি দাদা। এই যে আমার গায়ে এট্টু হাত বুলোয়ে দিচ্ছিস, শরীলডা জুড়োয়ে যাচ্ছে। পুণ্যির শরীল না হলি এমন হয় না।
ঠাকুমার এই মনগড়া 'সেই ছ্যামড়াকে' চেনে না রুনু। কেবল ঠাকুমার এই আশ্চর্য কথাগুলি শুনতে শুনতে ওর গায়ের লোম কাঁটা দিয়ে ওঠে। বুকটা দশ হাত ফুলে ওঠে একটা অভাবনীয় গর্বে।
শৈলদি একটা পরিষ্কার হারিকেন হাতে করে এলেন। হারিকেনটা ঠাকুমার শিয়রে রেখে কালিপড়া হারিকেনটা নিবিয়ে দিলেন। তারপর রুনুকে বললেন, আমার এট্টু দেরি হয়ে গেল। তোর মাঝিরে খাওয়াইয়ে দাওয়াইয়ে বিদেয় করে দিয়ে আসলাম। খবরটবর যা দেবার আমিই দিছি তারে। সে রওনা হয়ে গেছে। এবার তুই ওঠ। যা, হাত-মুখ ধুয়ে খাওয়া-দাওয়া করে নে গে। আমি সব গুছোয়ে রাখ্যে আইছি। খোকা তোর জন্যি বসে আছে। জানিস আজকাল খোকাই রান্না করে।
—কেন?
তাছাড়া আর উপায় কি? আমি তো প্রায় সব সময়ই এখানে থাকি। রাত্রিও থাকতি হয়। এ রুগিরে তো একা ফেলায়ে যাওয়া যায় না।—কথা বলতে বলতে শৈলদি তাঁর সেই নির্দিষ্ট কোরোসিন টিনের ওপর বসে পড়লেন।
এখানে কোথায় শোন আপনি?—প্রশ্ন করে রুনু।
—ওই যে মাদুর পাতা দেখতিছিস না, ওপর উপরই এট্টা বালিস ক্যাথায়ে শুয়ে পড়ি।
—শুধু ওই মাদুরের উপর! কোনো বিছানা-টিছানা—
বেশি আয়েস করে শুলি যদি বেশি ঘুমোয়ে পড়ি।—হেসে বলেন শৈলদি—যদি বুড়ি ডাকলিও সাড়া দিতি না পারি, তাই—
জানিস দাদা, বলেন ঠাকুমা—আজম্মে শৈলী আমার মা ছিল। এ জম্মেও সেই মায়ের কোলে মাথা দিয়ে মরব। আমার আর দুঃখু নাই। শৈলী আমার মা, শৈলী আমার সোনা—
ওমা বুড়ির যে খুব মুখ খুলেছে আজ।—হেসে বলেন শৈলদি।
আমার সঙ্গেও ঠাকুমা এতক্ষণ অনেক কথা বলেছেন।—বলল রুনু।
—তাই নাকি? তা হলি তো আজ রাতে বুড়ি বড় জ্বালাবে। বেশি কথা বললি সেদিন আর ঘুমই আসে না বুড়ির।
জানিস শৈলী,—প্রায় স্বাভাবিক গলায় বলেন ঠাকুমা,—অ্যাদ্দিন পরে আমার দাদার সাথে পান খুলে কথা কয়ে পানডা বড় হালকা হয়ে গেছে। আমার আর দুঃখু ভাবনা নাই। দেহিস, তোগে আর ভোগাব না বেশিদিন। হয়তো আজ রাতিই—
শৈলদি ঠাকুমার মুখে হাত চাপা দিয়ে বলেন, আর এট্টাও কথা না। তুই এবার যা রুনু।
চারিদিকে আম-কাঁঠাল গাছে ঘেরা ঠাকুরবাড়ির ভিতরটা যেমন অন্ধকার লাগছিল, বাইরে এসে কিন্তু অন্ধকারটা তেমন ঘন বলে মনে হল না রুনুর। এখনও পশ্চিম দিগন্তে সামান্য আলোর আভাস রয়েছে।
পাঁচ বছর পরে আজ আবার সেই পুকুরপাড় দিয়ে করের বাড়ি অভিমুখে যেতে যেতে অতীতের অনেক স্মৃতি ভিড় করে এল ওর মনে। ওই তো সেই বকুল গাছটা। আজও গাছের তলাটা তেমনই অন্ধকার রয়েছে। কিন্তু আজ আর ভয় নেই রুনুর।
যেতে যেতে ভাবছে রুনু, এতক্ষণ ধরে শৈলদি তো একবারও চুয়ার নাম করল না। কেবল খোকাদার কথা। চুয়াও তো খবর পেয়েছে নিশ্চয়ই। হয়তো এই রুগির ঘরে চুয়াকে আসতে দিতে চান না শৈলদি।
বকুলতলায় পৌঁছতে আজও পাওয়া গেল মৃদু মিষ্টি একটা গন্ধ। সেই গন্ধের সঙ্গে সঙ্গে অতীতের সেই মধুর স্মৃতিগুলি ওকে যেন আবিষ্ট করে ফেলল। তাকিয়ে রইল সেই জায়গাটার দিকে, যেখান দিয়ে গড়িয়ে পড়েছিল চুয়া পুকুরের মধ্যে রুনুর এক ধাক্কায়। অকারণ একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল রুনুর। সে দিনগুলি চলে যায়, তারা আর ফিরে আসে না।
খোকাদার মুখোমুখি হয়ে আর এক বিস্ময়।
খোকাদার সেই ছেলেমানুষ চেহারা আর নেই। অস্পষ্ট অন্ধকারে প্রথম দেখে তো চমকেই উঠেছিল রুনু। ভেবেছিল উনি বুঝি খোকাদার সেই বড়দা, যিনি কলকাতার এক কলেজের প্রফেসর। বারান্দার সেই কোণটিতে সেই ইজিচেয়ারখানায় তেমনই গা এলিয়ে রয়েছেন খোকাদা। হাতে একখানা মোটা বই। বইটা অবশ্য পড়ছিলেন না তখন। পড়া সম্ভবও নয়। হয়তো যতক্ষণ বই পড়ার মতো আলো ছিল, ততক্ষণ পড়েছেন। বড়দার মতই গুরু-গম্ভীর একটা মোটাসোটা মানুষ হয়ে গেছেন খোকাদা।
ঘরের আধভেজানো দরজা দিয়ে একটা আলোর রশ্মি এসে পড়েছে খোকাদার পায়ের উপর। উঠোনের ও-প্রান্ত থেকেই দেখছিল রুনু খোকাদাকে।
উঠোন পেরিয়ে বারান্দার কাছাকাছি আসতেই খোকাদা ওকে দেখলেন সঙ্গে সঙ্গেই একটা উল্লাস-সূচক শব্দ করে উঠে দাঁড়ালেন।
এসো বৎস, স্বাগতম।—হেসে বললেন খোকাদা।
রুনু প্রণাম করতেই সস্নেহে ওর পিঠে হাত রেখে বললেন, আয় ঘরে আয়। তোর জন্যেই এতক্ষণ বাইরে বসে আছি। ভালো আছিস? পরীক্ষা ভালো দিয়েছিস তো?
কথাগুলি অবশ্য আগের মতোই মিষ্টি আছে। কিন্তু এই খোকাদা। যেন আগের সেই খোকাদা নয়। কই সে উচ্ছ্বাসিত হাসি? কই সে প্রত্যাশিত আলিঙ্গন? এই কবছরে খোকাদা যেন অনেক বড় হয়ে গেছেন। এঁকে আর আগের মতো সমবয়সি বন্ধু ভাবা যাচ্ছে না।
ঘরে এল রুনু। বসল খোকাদার গা ঘেঁষে। খোকাদার একখানা হাত এখনও রয়েছে ওর কাঁধে। ওদের কথাবার্তায় নিশ্চয়ই ওর আগমনটা আর চুয়ার কাছে অঘোষিত নেই। কিন্তু কই? এখনও তো এল না চুয়া? রান্নাঘরেও তো কোনও সাড়া-শব্দ নেই। তাহলে এ সময়ে কোথায় রইল চুয়া?
প্রশ্নটা ওর বুকের মধ্যে তোলপাড় করছে। খোকাদার কুশল প্রশ্নের জবাব দিয়ে যাচ্ছে রুনু একে একে, কিন্তু মনের মধ্যে একটা অদ্ভুত অস্থিরতা। এমনকী মাঝে মাঝে অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছে। খোকাদার প্রশ্নের উল্টোপাল্টা জবাব দিয়ে বসছে।
খোকাদা যেন অন্তর্যামির মতোই ওর মনের কথাটা বুঝে ফেলে আস্তে আস্তে বললেন, চুয়া যে এখানে নেই রে।
কোথায়?—চমকে প্রশ্ন করে রুনু।
—ও তো দাদার বাসায় থেকে কলকাতায় পড়ছে। এবার নাইনে উঠল।
রুনু যেন কাটা বেলুনের মতো চুপসে গেল মুহূর্তে। মুখখানা কালো হয়ে গেল। একটা অদম্য কান্নার বেগ বুঝি আর সামলাতেই পারবে না।
হায়! কী বোকা, কী বোকাই আমি!—নিজেকে বারে বারে ধিক্কার দিল রুনু। চুয়ার তো এইবার নাইনেই উঠবার কথা। ও তো করের বাড়িরই মেরে। করের বাড়ির মেয়েরা কবে গ্রামের পাঠশালার পড়া সাঙ্গ করে ঘরে বসে থাকে ওদের গ্রামের মেয়েদের মতো? তারা তো তাদের আত্মীয়-স্বজনদের বাসায় থেকে কলকাতা, দিল্লি, খড়গপুর বেনারস আরও কত দূর দূর দেশে গিয়ে পড়াশুনো করে। স্কুলের পড়া শেষ করে কেউ কেউ কলেজেও পড়ে। তারাই তো পুজোর ছুটিতে দেশে এসে বিশাল করের বাড়িটা ভরে ফেলে। কী তাদের সাজগোজ, কী তাদের কথা বলার ঢঙ—এ দৃশ্য তো একবার দেখেও গেছে রুনু। অথচ চুয়া যে কলকাতায় পড়তে যেতে পারে, এ কথাটা একবারও মনে আসেনি ওর। চুয়াকে ওর প্রাইজের বইগুলি দেখাবে, সোনার মেডেল দেখাবে, চুয়াকে শোনাবে সেই প্রাইজ ডিস্ট্রিবিউশনের গল্প—এইসব স্বপ্ন দেখতে দেখতেই তো ও এবার এল বাজুনিয়ায়। এ বাড়িতে চুয়াকে দেখতে পাবার আশাটা এত তীব্রভাবে ওর মনকে অধিকার করেছিল যে, চুয়ার অনুপস্থিতির সংবাদটা যেন একটা ভয়ঙ্কর দুঃসংবাদের মতো ওর সমস্ত সত্তাকে মথিত ব্যথিত করে তুলল। ও আর মুখ তুলতে পারে না। মুখ তুললেই হয়তো খোকাদা দেখে ফেলবে ওর চোখের জল।
এবারও ঠিক অন্তর্যামির মতো ওর বেদনাটা বুঝতে পেরে সান্ত্বনার সুরে বলেন খোকাদা, তুইতো রেজাল্ট বেরোবার আগে পর্যন্ত এখানেই থাকবি, তাই না? রুনু কেবল মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়।
—তার আগেই ওরা এসে পড়বে। মে-তেই ওদের গ্রীষ্মের ছুটি হয়ে যাবে। ধর, আর মাস খানেকের মধ্যেই।
এ আশ্বাসেও বিশেষ কিছু সান্ত্বনা পেল না রুনু। ওর মুখে আর একটা কথাও নেই। কেবল দুচোখে দুটি অশ্রু বিন্দু টলটল করছে।
—নে হাত-মুখ ধুয়ে নে। এই দ্যাখ বারান্দায় দিদি তোর জন্যে জল, সাবান-টাবান রেখে গেছে। তারপর বৎস, আমার রন্ধন শিল্পের পরীক্ষা হবে তোমার কাছে। ফুল মার্কস দিতে হবে কিন্তু আগেই বলে রাখছি।
শেষ কথাগুলি বললেন খোকাদা একেবারে সুর পাল্টে। ঠিক যেন আগের সেই হাসিখুশি খোকাদা। বলতে বলতে রুনুর পিঠে একটা আদুরে চাপড় কষিয়ে দিলেন তিনি।
এইটুকুতেই অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে গেল রুনু।
রুনু বারান্দায় এসে হাত-মুখ ধুচ্ছে। খোকাদা হারিকেন হাতে দাঁড়িয়ে আছেন অদূরে, আর কথা বলছেন ঠিক সেই আগের খোকাদার মতো।
—জানিস রুনু, তোর জন্যে অনেক কথা জমিয়ে রেখেছি। আমরা শুয়ে শুয়ে আজ সারারাত গল্প করব। আমার সঙ্গে জাগতে পারবি না সারারাত?
খুব পারব।—হেসে বলে রুনু। হাসতে পারছে এবার রুনু স্বাভাবিক ভাবে।
—শোনো বৎস, আজকের খানায় মৎস্য কিন্তু নেহী মিলেগা। দিদির সাথে আমিও এখন নিরামিষ সেবন করি। তবে তোমার অনারে কাল আমরা মৎস্য শিকার অভিযানে বেরুব।
—দিদি কি অনেকদিন ধরেই ঠাকুমার কাছে থাকেন?
—সে গল্প হবে শুয়ে শুয়ে। চল আগে আমরা খেয়ে নি। তোর তো নিশ্চয়ই খুব খিদে পেয়েছে।
—একটুও না।
—সে কী, ঠাকুরবাড়িতে কিছু জুটেছে বুঝি?
—না!
—তবে? কখন বেরিয়েছিলি বাড়ি থেকে?
—বাড়ি থেকে রওনা হইছিলাম অনেক সকালেই তবে দুপুরের খাওয়া হইছে গোপালগঞ্জে প্রায় বারোটার সময়।
—গোপালগঞ্জে? কোথায়, হোটেলে?
—না, গোপালগঞ্জে যে বাসায় ছিলাম এই পাঁচ বছর। এক ডাক্তারবাবু।
—আচ্ছা। তাহলে তো তোর গোপালগঞ্জ লাইফের কাহিনীটা শুনতে হবে। সেখানেও কী পেয়েছিলি দু-চারটে খোকাদা?
কি বলবে রুনু। খোকাদা তো সংসারে এই একজনই আছে। এমন আর একটা মানুষও তো এই পাঁচ বছরে রুনু দেখল না কোথাও।
চুপ করে আছিস যে? বুঝতে পারছি,—হেসে বলেন খোকাদা, সেই আগের চেনা হাসি,—বুঝতে পারছি নতুন খোকাদাদের পেয়ে পুরোনো খোকাদাকে বেমালুম ভুলে গেছিলে। তাইতো চিঠি লিখে ডেকে আনতে হয়। আমি না ডাকলে বোধহয় এজন্মে আর এমুখো হতে না।
এ কথারও কোনোও জবাব নেই রুনুর। একটু পরে আবার বলেন খোকাদা, আচ্ছা; সেই ছড়াটা লিখে তোকে মার খাইয়েছিলুম বলে তুই বোধহয় আজও আমাকে ক্ষমা করতে পারিসনি। তাই না?
মুহূর্তে খোকাদাকে জড়িয়ে ধরে ছেলেমানুষের মতো কেঁদে পড়ল রুনু, না, না! একটুও না...একটুও না..., আপনার উপর আমার...
কথা গুছিয়ে বলতে পারে না রুনু কান্নার বেগে।
এই দ্যাখো বোকা ছেলে,—রুনুকে পরম স্নেহে জড়িয়ে ধরে বলেন খোকাদা—কাঁদছিস কেন রে?
কেন যে কাঁদছে তাও কি ব্যাখ্যা করতে পারবে রুনু। কাঁদতে যে ওর ভালো লাগছে।
একটু পরে গম্ভীর ব্যথাভরা গলায় বলেন খোকাদা, তুই ক্ষমা করলেও আমি যে আমাকে ক্ষমা করতে পারি নি আজও। তাই তো তোকে ডেকেছি, তোর কাছে ক্ষমা চাইব বলে।
খোকাদার মুখে হাত চাপা দিয়ে রুনু বলে, ও কথা যদি আর বলেন তো আমি চলেই যাব। থাকব না, কিছুতেই থাকব না। ওই কবিতাটা যে আমাকে সবার চোখে কতখানি বড় করিছিল, তা যদি বুঝতেন।
—তুই আমাকে বাঁচালি রুনু। এতদিনে সেই পুরোনো মর্মদাহ থেকে মুক্তি পেলুম আমি।
ছড়া প্রসঙ্গেই মনে পড়ল নরেনদার কথা। খোকাদাকে জিজ্ঞাসা করল, নরেনদা তো নিশ্চয়ই জেল থেকে ছাড়া পেয়ে এখন আবার—
ছাড়া অবশ্য পেয়েছিলেন,—দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন খোকাদা,—কিন্তু সরকার তাঁকে বোধহয় আর বাজুনিয়ায় আসতে দেবেন না। নরেনদাকে তারা 'ডেটিনিউ' করে রেখেছে বিহারের একটা থানায়। অর্থাৎ জেলের বাইরে থেকেও জেলেই আছেন। আছেন থানার দারোগার চোখের উপর নজরবন্দী হয়ে। অবশ্য আমাকেও...
—আপনাকে?
—আমাকে করেছে 'হোম-ইনটার্নড'। অর্থাৎ গৃহবন্দী। মাসে মাসে থানায় দর্শন দিতে হয়। মাঝে মাঝে পুলিশও আসে খবর নিতে। আমিও কয়েদি, তবে জেলের বাইরে আছি।
বলতে বলতে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন খোকাদা, বড় নিঃসঙ্গ হয়ে গেছিরে, তাইতো তোকে ডেকেছি।
—কেন, আপনার সেই সবুজ সংঘ?
—পুলিশের ভয়ে তারা কেউ আর আমার ছায়াও মাড়ায় না।—অদ্ভুত ভাবে হাসলেন খোকাদা।
রুনুর বুক ফেটে এল কান্নায়। দেশকে ভালোবাসার এই কি পুরস্কার! এতক্ষণে বুঝল রুনু, কেন খোকাদা এত গম্ভীর, কেন এত বিষাদিত।
খেতে বসে ঠাকুমার প্রসঙ্গ উঠল। ঠাকুমার কথা বলতেই আবার রুনুর চোখে জল এল।
—হায়, কী চেহারা হয়ে গেছে ঠাকুমার! এবার বোধহয় আর...
—কেঁদে লাভ কি বল। কেন দুঃখ করব আমরা? অনেক তো বয়েস হয়েছে, জীবনে দুঃখ-কষ্টও কম পাননি। এখন তো মরে যাওয়াই শান্তির।
রুনু সবিস্ময়ে তাকায় খোকাদার চোখের দিকে। কত সহজে ঠাকুমার মরার কথা বলতে পারছেন খোকাদা।
—এমন করে তাকাচ্ছিস কেন? ভাবছিস, আমি খুব নিষ্ঠুর? না রে, তোর মতো আমিও ভালোবাসি বামুনমাসিকে। এ সংসারে এখন বোধহয় দিদি ছাড়া কেবল আমরা দুজনেই ওর কথা ভাবি। আর কেউ নয়।
—কেন সোমকাকু? সোমকাকুকে খবর দিলে তো...
সে-ও আর এক কাহিনী। বলব এক সময়। মায়ে-ছেলেতে বোধহয় এ জীবনে আর দেখা হবে না।—ভারী গলায় বলেন খোকাদা,—তাইতো বলছিলুম, এ সংসারে এখন দিদি ছাড়া আর কেউ নেই ওঁকে দেখবার। এ কি বুড়ির কম অভিমান! এই অভিমানটাই এবার ওঁর মৃত্যুকে নিশ্চিত করেছে। এবার বুড়ি মরবেই।
মর মুখপোড়া মর আসিসনে আমার কাছে। ছুঁসনে আমারে। তোগে বংশের মুখ দেখলিও পাপ। আমারে নিচিন্তে মরতি দে। মরণ কালে উনি আসলেন সোহাগ দেহাতি। যা তোর বউয়ের পা চাটগে। মর...মর...
প্রলাপ বকছেন ঠাকুমা। শৈলদি পাশের মাদুরের উপর শুয়ে শুয়ে শুনছেন। প্রায়ই এমনি তন্দ্রার ঘোরে প্রলাপ বকেন ঠাকুমা। সে প্রলাপের অধিকাংশই সোমনাথের সঙ্গে কলহ। মাঝে মাঝে অসহ্য মুখ খিস্তি করেন।
শৈলদি একবার নাকি বলেছিলেন সোমনাথকে আসবার জন্যে চিঠি লিখবেন। ঠাকুমা কদর্য গালাগাল দিয়ে বলেছিলেন, সেই নিব্বুংশেরে চিঠি নেখলি তুইও নিব্বুংশ হবি। যদিও মৃত্যুশয্যাশায়ী রুগির প্রলাপোক্তি, তবুও কথাটা শুনে শৈলদির বুকের মধ্যে হু-হু করে উঠেছিল চুয়ার কথা ভেবে। চুয়া যে তার একমাত্র সন্তান। সেই থেকে তিনি তার সামনে সোমনাথের নামও উচ্চারণ করেন না।
আজও প্রলাপ শুনতে শুনতে মনে হচ্ছে, হয়তো সোমনাথকে সংবাদটা দেওয়াই উচিত ছিল। হয়তো বুড়ির মনের গভীরে একমাত্র পুত্রের প্রতি মমতাটা এখনও আছে। আবার মনে হয়, কি জানি তার ফল কি হতো। হয়তো তাকে দেখামাত্রই অতিরিক্ত উত্তেজনায় বুড়ি হার্টফেল করত, যে মৃত্যু হতো আরও শোকাবহ।
খানিকপরে আবার কথা কয়ে উঠল বুড়ি।
—ও শৈলী, ওঠ ওঠ আলো জ্বাল, ঘরে মানুষ!...ও পোড়ামুহো এদ্দিনি আমারে মোনে পড়ল? কি নিয়ে আইছ? সোনার রথ আনিছ তো? কথা কও না ক্যান? আমার হাঁটার খ্যামতা নাই দেখতিছ না? সোনার রথ ছাড়া আমি নড়ব না।...ও বউ শাঁখ বাজা। ও শৈলী উঠিস না ক্যান?...ও শৈলী...
এ 'পোড়ামুহো' সোমনাথ নয়। এ কী তার দীর্ঘকাল আগের বিগত স্বামী, নাকি স্বয়ং মৃত্যু দেবতা?
শৈলদি নিঃশব্দে উঠে আলোটা বাড়িয়ে এলেন ঠাকুমার বিছানার কাছে। এ কী অদ্ভুত দৃশ্য! সর্বাঙ্গে থরথর করে কেঁপে উঠলেন অমন দুঃসাহসী শৈলদিও।
ঠাকুমা বিছানার ওপর উঠে বসেছেন। একেবারে উলঙ্গিনী। অন্ধ চোখ দুটো আকাশের দিকে তুলে বলছেন,—'কই কথা কওনা ক্যান? আমার সোনার রথ আনিছ? আহা, আবার মিটিমিটি হাসা হচ্ছে।'—বলতে বলতে খল-খল অট্টহাস্যে দুহাত তুলে যেন নাচছেন। সে এক ভয়ংকর দৃশ্য! হাতের ইশারায় মহাশূন্য থেকে কাকে যেন ডাকছেন।
এই একটা মাস ধরে যার পাশ ফেরারও শক্তি ছিল না, সে কোথায় পেল এই শক্তি!
আস্তে ঠাকুমার গায়ে হাত দিতেই যেন আগুনের ছ্যাঁকা লাগল হাতে। মানুষের দেহের উত্তাপ যে এত বেশি হতে পারে এ ধারণাই ছিল না হোমোপ্যাথিতে অভিজ্ঞ শৈলদির। কর্তব্য স্থির করতে পারছেন না।
শৈলদির হাতের ছোঁয়াতেই ঘটল আর এক কাণ্ড। যেন বিদ্যুৎ স্পৃষ্টের মতো মুহূর্তে নেতিয়ে পড়লেন ঠাকুমা বিছানায়। সঙ্গে সঙ্গে কাঁথাখানা গায়ের ওপর টেনে দিলেন শৈলদি। ঠাকুমা একদম নিশ্চুপ।
রুগির এ অবস্থায় কি করণীয় তা শৈলদির সামান্য হোমোপ্যাথি বিদ্যায় আজ অনধিগত। নিরুপায় হয়ে তিনি সেই পরমেশ্বরেরই শরণ নিলেন। মনে মনে ইষ্টমন্ত্র জপতে শুরু করলেন।
শৈলদির ব্যাকুল প্রার্থনার জোরেই হয়তো সেই পরমেশ্বরই এই মুহূর্তে দর্শন দিলেন খোকাদার বেশে। খোকাদার সঙ্গে রুনুও।
—দরজা খোল দিদি, তোর খবর নিতে এলাম।
খাওয়া-দাওয়া শেষ হতেই রুনু বলেছিল, 'চলুন না খোকাদা, একবার শৈলদির খবর নিয়ে আসি।' খোকাদা সঙ্গে সঙ্গে রাজি। তাই এ অপ্রত্যাশিত আগমন।
খোকাদার গলা পেয়েই কাঁপতে কাঁপতে এসে দরজা খুললেন শৈলদি। তাঁর চোখমুখ দেখেই চমকে উঠলেন খোকাদা!
কী ব্যাপার? বুড়ি কি ইতিমধ্যেই অক্কা পেয়ে গেল নাকি?—হেসে বলেন, খোকাদা, বুঝি শৈলদিকে অভয় দেবার জন্যেই।—তোর যে দু-চোখ ভরতি ভয়।
—সত্যি আজ ভয় পাইছিরে খোকা। এ সময় তোরা না আসলি আমি একা একা যে কী করতাম।
—কী হল? নতুন কোনো উপসর্গ?
—নতুন মানে? একেবারে কল্পনারও অতীত। সেই থেকে আমার যে কাঁপুনি শুরু হইছে...
আস্তে আস্তে এইমাত্র শোনা প্রলাপ এবং দেখা দৃশ্যটা বর্ণনা করলেন শৈলদি। শেষে কাঁপতে কাঁপতে বললেন, মানুষের শরীল যে অত গরম হতি পারে... আয় দেখবি!
বর্ণনাটা শুনেই কাঁপন হয়েছিল রুনুর বুকেও। নিঃশব্দে ওরা তিনজন এল ঠাকুমার বিছানার কাছে।
ঠাকুমা যেন আরামে ঘুমোচ্ছেন। গায়ের কাঁথাখানা কখন সরিয়ে ফেলেছেন হয়তো অজ্ঞাতসারেই। খোকাদা আস্তে আস্তে হাত রাখলেন ঠাকুমার বুকে।
কই তেমন গরম তো নয়।—ফিসফিস করে বললেন খোকাদা।
গলায় হাত দিয়ে দেখলেন শৈলদিও। চোখ গোল করে ভয় পাওয়া গলায় বলেন, এ কী কাণ্ড! এই খানিক আগে দেখলাম...
আস্তে আস্তে কোমর থেকে পায়ের দিকে হাত বাড়ালেন শৈলদি। হাঁটুর নীচে পর্যন্ত পৌঁছেই চমকে বললেন, ওমা এ যে বরফ।
—সোম আলি?... ও নিব্বুংশে, এতদিনি মোনে পড়ল...
অস্পষ্ট ঘড়ঘড়ে গলায় কথা কয়ে উঠলেন ঠাকুমা।
হ্যাঁ মা, আমি সোম। আমি আইছি। আর ভয় নাই। আমি তোমারে পেনাম করছি মা। আমারে ক্ষমা করো। মা, মাগো, আমারে ক্ষমা করো।—ঠিক সোমনাথের মতো গলা করে বলেন খোকাদা।
খোকাদার অনেক ক্ষমতার কথা জানে রুনু। কিন্তু এমন আশ্চর্যভাবে যে গলাও বদলে ফেলতে পারেন তা কে জানত? সবিস্ময়ে তাকিয়ে আছেন শৈলদিও খোকাদার দিকে।
ঠাকুমা তাঁর একখানা শীর্ণ হাত তুলবার ব্যর্থ চেষ্টা করতে করতে তেমনই জড়িত কণ্ঠে বলেন, বাঁচ্যে থা-আ-ক বাবা, সু-সু-হি থা-আ...
আর কিছু শোনা গেল না। আবার নিশ্চুপ ঠাকুমা। খানিক বাদে সে কী চিৎকারঃ
—ছুঁসনে ছুঁসনে আমারে ওরে নিব্বুংশে...মর...মর... আমি তোর কেউ না...সর ...সর....আমার মুহি আগুন দেবে ওই ছিনাথের ছল। তুই আমার কেউ না... কেউ...
মাথাটা বালিশ থেকে ইঞ্চি খানেক উঠে আবার ধড়াস করে পড়ে গেল।
মা মাগো, আমারে ক্ষমা করো।—আবার বলছেন খোকাদা আশ্চর্য কোমল কণ্ঠে কান্না জড়িয়ে। —মা, আমি তোমার মুখি এট্টু গঙ্গাজল দেই। মা, মাগো, হাঁ করো।
বাধ্য শিশুর মতো হাঁ করলেন ঠাকুমা। খোকাদা এটু গঙ্গাজল দিলেন মুখে। অনেকটাই তার গড়িয়ে পড়ল।
...বুকটা জুড়োয়ে গেলরে বাবা...বাঁচ্যে থাক...ধনে...পুত্তে সুহি...
কথা বলতে বলতেই সজ্ঞানে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন ঠাকুমা।
তিনটি অনাত্মীয় মানুষ নিঃশব্দে বসে রইল শবের পাশে।
অনেকক্ষণ পর মৃদু কণ্ঠে বলেন শৈলদি, এ ডা কি তুই ভালো করলি খোকা? এ সময়ে এ ছলনাটুকু না করলি কি—
—এই ছলনাটুকুর জন্যেই তো শেষ মুহূর্তে সোমনাথকে ক্ষমা করে গেল বুড়ি। এই তো হল শান্তির মরণ। তুই জানিস না দিদি, এইটুকুর জন্যেই বুড়ির প্রাণটা অ্যাদ্দিন টিঁকে ছিল। এইটুকু না হলে বুড়ি মরেও শান্তি পেত না। এবার ওঁর 'সোনার রথে' চড়তে আপত্তি হবে না।
খোকাদা, আমার আশ্চর্য লাগছে।—বলল রুনু,—যে এই বিশেষ দিনটিতেই আমি বাজুনিয়া আসলাম।
—তুই কি ভাবছিস, তুই নিজে এসেছিস? একজন আছেন সবার ঊর্ধ্বে, সবার আড়ালে, কলকাঠি তারই হাতে। বিশ্বের সমস্ত ঘটনা ঘটে তাঁরই ইচ্ছায়। তিনিই এনেছেন তোকে এই বিশেষ দিনটিতে। এনেছেন বলেই তো লাভ করলি শূদ্রের ছেলে হয়েও ব্রাহ্মণের অধিকার। এ যে কত বড় অধিকার।
—একথা উনি আমারে আগেও বলিছেন। যখন শৈলদি আমারে এখানে রাখে বাড়ি গেলেন তখন। কিন্তু আমি মুখাগ্নি করলি যদি এখানকার ব্রাহ্মণেরা...
—এইতো ঠাকুরবাড়ি। অন্তত দশ ঘর ব্রাহ্মণ বাস করে এ-বাড়িটায়, সে তো তুই জানিসই। কোন বাড়ির কোন ব্রাহ্মণ সন্তানটাকে দেখছিস। এর খবর নিতে? অথচ বুড়ির গাছের আম খায়নি, আপদে-বিপদে বুড়ির সাহায্য পায়নি, এমন একটা পরিবারও নেই ঠাকুরবাড়িতে। ওঁর বাইরের শুষ্ক মরুভূমির মাঝে যে একটা স্নিগ্ধ মরূদ্যান ছিল, তার সন্ধান তুই তো ঠিক পেয়েছিলি। আর পেয়েছিল দিদি। আমিও পেয়েছি বইকি ছিটে-ফোঁটা। সোমটা সত্যিই হতভাগা। দুটো অভিশাপ আর গালাগাল শুনেই মাকে ত্যাগ করে গেল। আরে মুখ্যু, বাইরের পাথরটাই দেখলি, একটু খুঁড়লেই যে প্রাণ জুড়োনো মন্দাকিনী ধারা স্নানে ধন্য হয়ে যেতিস।
ঠাকুমা সত্যি অদ্ভুত!—বলে রুনু।
অদ্ভুত নয়রে, অসাধারণ। —বলেন খোকাদা,—সারাজীবন এই পাড়া-গাঁয়ে বাস করেও ওর মধ্যে অসাধারণ তেজ ছিল, সেটা লক্ষ্য করেছিস কি? সে তেজ সমদর্শিতার শক্তি থেকে আসে। এই তেজ ছিল ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের মধ্যে। মাত্র নয় বছর বয়সেই উপনয়নের সময় তিনি ধনী কামারণীকে ভিক্ষামাতা রূপে বরণ করেন। ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের সমস্ত প্রতিবাদ উপেক্ষা করে সেই শূদ্রাণীর কাছেই তিনি প্রথম ভিক্ষাগ্রহণ করেন। বুড়িও সে সজ্ঞানে তোকে মুখাগ্নি করার অধিকার দিয়ে গেল, সে কী কম তেজের কথা? এত সংস্কারের মধ্যে জীবন কাটিয়েও কতখানি সংস্কার মুক্ত ছিলেন বামুন মাসি ভাবলে বিস্ময়ের অবধি থাকে না। এ বুড়িকে কয়জনে চিনতে পেরেছে? সোম যে চিনতে পারেনি সেটা বড় কথা নয়। চিনতে আমরা কেউই পারিনি তাঁকে সবটুকু। তিনি হয়তো শেষ মুহূর্তে আত্মোপলব্ধি করেছিলেন। তাই তো সোনার রথ ছাড়া তিনি চড়বেন না। তিনি যে সোনার রথেরই যাত্রী। মৃত্যুকালে প্রলাপ তো অনেকেই বকে, এমন প্রলাপ বকতে পারে কয়জনে? এই আশ্চর্য মৃত্যুর মধ্যে বামুন মাসি আমার কাছে একটা পরম বিস্ময় হয়ে রইলেন। সোমনাথের নকল প্রণাম নয়, তোমার পাগলা মুখপোড়া খোকার সশ্রদ্ধ প্রণাম তুমি গ্রহণ করো বামুন মাসি!
বলতে বলতে খোকাদা চোখের জলে ভাসিয়ে দিলেন ঠাকুমার পা দুখানা।
শৈলদি আর রুনু বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে রইল খোকাদার জলভরা চোখের দিকে। ঠাকুমাকে যেন নতুন করে চিনল রুনু। চিনলেন শৈলদিও।
রুনুর জ্যেষ্ঠভ্রাতা ইন্দ্রজিতের বয়স এবার কুড়ি বছর পূর্ণ হল। ইতিমধ্যে তার দোকানের যথেষ্ট শ্রীবৃদ্ধি হয়েছে।
গোপালগঞ্জ থেকে গিরিশনগর, এই আট মাইল রাস্তার মধ্যে, গোপালগঞ্জ শহর ছাড়িয়ে রাস্তার পাশে এত বড় দোকান আর একটিও নেই। এ দোকানে এখন সত্যিই 'যাবতীয় বেনেতি ও মুদীদ্রব্য' পাওয়া যায়। ছয়-সাত বছর আগে লাগানো সেই অশ্বত্থ গাছটি ইন্দ্রর নিত্য সেবায় পরিপুষ্ট হয়ে এখন নধরকান্তি ধারণ করেছে। সেই গাছের তলায় বাঁশের মাচার বেঞ্চিগুলিতে ক্লান্ত পথিকেরা বিশ্রাম করে। ওর দোকান থেকেই চিঁড়ে, মুড়ি, গুড়, বাতাসা কিনে ফলার করে। আশপাশের কয়েকটা গ্রামের অনেকগুলি পরিবার এখন ওর বাঁধা খদ্দের। যাবতীয় বেনেতি ও মুদীদ্রব্য ছাড়া গত দুবছর হল গোবরা পাঠশালার ছেলেদের আর বই-খাতা, শ্লেট-পেনসিল নিতে গোপালগঞ্জ যেতে হয় না। সমস্ত বই এখন এই দোকানেই পাওয়া যায়। বইয়ের জন্য একটা আলাদা আলমারি করা হয়েছে।
শ্রীনাথ পণ্ডিতমশায় রুনুর ম্যাট্রিক পরীক্ষার পরই ঊনআশি বছর বয়সে স্কুল থেকে অবসর নিয়েছেন দুই ছেলের দারুণ পীড়াপীড়িতে, আরও বিশেষ করে দৃষ্টি শক্তির অভাবে। কী দরকার এই বয়সে ওই দশটি টাকার জন্য এত পরিশ্রম করার। এখন তো ইন্দ্রর দোকানের আয় থেকেই সংসার চলছে স্বচ্ছন্দে।
অবসর নিয়ে অবসর কাটাবার জন্য উনি আবার সেই পুরোনো নেশা সখের কবিরাজি করতে শুরু করেছেন ঘরে বসে। বাইরে যান না, পয়সা-কড়িও বড় একটা নেন না। দরিদ্র রুগিদের কাছ থেকে ওষুধের দাম নেন না। কেউ কেউ তাদের বাড়ির কলাটা, কচুটা, অথবা দুটো মাছ ভক্তিভরে দিয়ে যায় ওষুধের দাম বাবদ। উনি তাতেই খুশি। ওষুধ তৈরি করার প্রয়োজনীয় মালপত্রও ইন্দ্রকে এনে দিতে হয় গোপালগঞ্জের বড় কবিরাজি দোকান থেকে। শক্তি ঔষধালয় থেকে কিছু কিছু তৈরি ওষুধও এনে রাখেন।
গোপালগঞ্জের শক্তি ঔষধালয়ের মালিকের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ দিনের বন্ধুত্ব।
দোকান থেকে এবং কবিরাজি থেকে কত আয় হয় সেটা না জানলেও সম্প্রতি দেশে একটা রব উঠে গেছে, বাপ-ব্যাটায় এখন প্রচুর টাকা কামাচ্ছে। কারও মতে মাসে দু-তিনশো, কারও মতে পাঁচশো-র কম নয়। অর্থাৎ শ্রীনাথ পণ্ডিতের এখন দুদিন, স্বচ্ছল অবস্থায়।
ইন্দ্রজিৎ উপার্জনক্ষম ছেলে, সুন্দর স্বাস্থ্যবান চেহারা ভার-ভারিক্কি চালচলন। বিয়ের বাজারে নিশ্চয়ই সুপাত্র। ইতিমধ্যেই দূরের অদূরের কয়েকটা সম্বন্ধ এসে গেছে। কিন্তু সব কনের বাপই একটা ব্যাপারে খুঁত খুঁত করছে। এ গ্রামে কায়স্থ বলতে এই এক ঘরই মাত্র আছে। তাও একটা মাঠের মধ্যে বাড়ি। এক ডাকের মধ্যে আর কোনও বাড়িঘর নেই। সব চাইতে কাছে উত্তরদিকে, রাস্তার পুবপাড়ে আছে একটা বুনো পাড়া। পুবে একটা মজা বিল, তার ওধারে জেলেপাড়া, আর উত্তর-দক্ষিণ দুদিকেই তো মুসলমান। আর পশ্চিমে? পশ্চিমে তো ডিস্ট্রিক বোর্ডের রাস্তার ওধারেই মধুমতী। এ বাড়িতে মেয়ে এলে যে একেবারে বনবাসে পড়বে। কথা কওয়ার একটা মানুষও পাবে না ধারে কাছে। জীবন তো কেবল খাওয়া-পরা নয়, একটু সমাজ সামাজিকতাও চাই। তা এখানে সমাজ কোথায়? তাই কোনো সমাজের মেয়েকেই আজ পর্যন্ত পাননি শ্রীনাথ পণ্ডিত, যাকে পুত্রবধূরূপে বরণ করা যায়। কনে পক্ষের লোক এসেছে, আর দেখে শুনে ফিরে গেছে।
ভিন গাঁয়ের লোকের পক্ষে তো বোঝা সম্ভব নয়, এইসব জেলে মালো, জোলা তাঁতী, বুনো কাপালী আর মুসলমানদের সঙ্গে কতখানি একাত্ম হয়ে গেছেন শ্রীনাথ পণ্ডিত। এদের নিয়েই তার সমাজ। এই সমাজে শ্রীনাথ পণ্ডিতের যে কতখানি মর্যাদা, তা তারা একদিন হঠাৎ এসে বুঝবে কী করে?
এদিকে গৃহিণী অধীর হয়ে উঠেছেন। দু-বছর আগে থেকেই তিনি ইন্দ্রর বিয়ে দিয়ে একটি কর্মঠ মেয়েকে এনে তার উপর সংসারের ভার চাপিয়ে দেবার কথা ভাবছেন। সম্বন্ধ তো অনেক এল। পছন্দ যাদের হয় তারা যে পছন্দ করতে পারে না এই নির্বান্ধব পুরীকে। ছেলে অবশ্য সকলেরই পছন্দ হয়, তবু পাকা কথা দিতে পারে না কেউ। যারা এসব দেখেও মেয়ে দিতে রাজী হয়, সে মেয়ে আবার এঁরা কেউ পছন্দ করতে পারেন না।
এই যখন পরিস্থিতি তখন খুলনা জেলার এক গ্রাম থেকে এল একটা সম্বন্ধ। সম্বন্ধটা এনেছে ইন্দ্রজিতেরই এক দোকানদার বন্ধু। গোপালগঞ্জের একটা বড় দোকানে সে খাতা লেখে। ইন্দ্র সেই দোকানের নিয়মিত খরিদ্দার। আলাপ সেই সূত্রেই। ছেলেটির নাম অমূল্য। ভারী শান্ত নম্র স্বভাব। পাত্রী তার ভাগ্নী। মেয়ে রূপসী। বয়েস চোদ্দো-পনেরো। গ্রামের পাঠশালায় ক্লাস ফোর পর্যন্ত পড়েছে। বিধবার একমাত্র কন্যা। তবে অত্যন্ত গরিব। এক পয়সাও খরচ করবার ক্ষমতা নেই। তাইতো অমন লেখাপড়া জানা, অমন সুন্দরী মেয়ের বিয়ে হল না এতদিনে। মেয়েটি নাকি ইন্দ্রর সঙ্গে চমৎকার মানাবে। এখন পণ্ডিতমশায় যদি দয়া করে বিধবাকে কন্যাদায় থেকে উদ্ধার করেন। তবে মেয়েটির একটা সংসারকে মাথায় করে রাখার মতো যোগ্যতা আছে। খুবই কর্মঠ স্বভাব।
মেয়ের বর্ণনা শুনে গৃহিণী খুব লব্ধ হয়ে উঠলেন। এমন একটি মেয়েই তো তিনি খুঁজেছেন এতদিন। বিধবার যখন একমাত্র মেয়ে, তখন মেয়ের মাকে শুদ্ধ এখানে এনে রাখলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়। বেয়ান একসঙ্গে থাকলে কাজকম্মেও কি একটু সাহায্য করবেন না।
গৃহিণী মৃদু কণ্ঠে ভিতর থেকে বলেন, মাইয়েডা আপনি যদি একবার দেখে আসতি পারেন...
অমূল্য সঙ্গে সঙ্গে হাতজোড় করে বলে, আমি বলতি সাহস পাচ্ছিলাম না মা। ওনার মতো মানুষ সেই গরিবির বাড়ি...তা আপনি যখন সাহস দিলেন, তখন আর ভয় নাই। একবার যদি দয়া করে পায়ের ধুলো দ্যান, আমি নিজি সঙ্গে হরে নিয়ে যাব। কোনও অসুবিধা হবে না।
কিন্তু বাবাজি, তোমার মুখি পথের যা বর্ণনা শুনলাম,—দ্বিধাভরে বলেন শ্রীনাথ পণ্ডিত,—স্টিমারে খুলনে পর্যন্ত, তারপর খানিক রেলে, আবার মাইল চারেক হাঁটা পথ—এত হাঙ্গামা করে কি আমার এ বয়সে...তার চেয়ে আমি বলি কি তুমি ইন্দিররেই নিয়ে যাও। ও তো আর ছেলেমানুষ নেই, বুদ্ধি বিবেচনা হইছে। ওর বউ ও নিজিই দেহে শুনে আনুক। আমি আর কয়দিন আছি! সংসারতো ওরই করতি হবে।
ইন্দ্র তার দোকানেই ছিল। প্রস্তাবটা তো অমূল্য তার কাছেই করেছে প্রথম। সে-ই তো পাঠিয়ে দিয়েছিল বাবার কাছে। এবার পিতার আহ্বানে ইন্দ্র এল।
পিতার আদেশে ইন্দ্র সম্মত হল কনে দেখতে যেতে।
কিন্তু যাই বললেই তো চট করে যাওয়া যায় না। দোকানে যখন প্রায় হাজার দুই টাকার মাল। নগদ ক্যাশ যা আছে তা না হয় বড়ঘরে সাবধানে কোথাও রেখে যাওয়া যাবে। কিন্তু রাত্রে দোকান পাহারা দেবে কে? নগরবাসী থাকলে না হয় তাকে বলা যেত রাত্রে দোকানে শোবার জন্যে। কিন্তু বুনোপাড়ায় জোয়ান মর্দ পুরুষ ছেলে বলতে কেউ নেই। নগরবাসীই বুনোপাড়ার মোড়ল। শীতের শেষে প্রতি বছরই ওরা কোনো দূর দক্ষিণ দেশে যায় শিকার করতে। রুনুকে বাজুনিয়া রেখে এসেই নগরবাসী তার দলবল নিয়ে বেরিয়ে গেছে শিকারে। মাস খানেকের আগে ফিরবার আশা নেই। তবে? দোকানে মাল রেখে যাবে ও কার দায়িত্বে? দেশে আজকাল খুব চুরি-ডাকাতির কথা শোনা যাচ্ছে প্রায়ই। খুলনা জেলার সেই সুদূর মৌভোগ গ্রাম থেকে মেয়ে দেখে ফিরে আসতে অন্তত একটা দিন দুটো রাত্রি তো যাবেই। বেশিও হতে পারে।
বিষয়টা নিয়ে অনেকক্ষণ আলোচনা হল। শেষপর্যন্ত পণ্ডিতমশাই বললেন, তুই যে বাড়ি নাই এডা কাউরে না জানালিই ভালো হয়। আমরা কব তুই গোপালগঞ্জ গিছিস মাল আনতি। প্রতি সোমবারেই তো যাচ্ছিস দোকান বন্ধ করে। এ সপ্তাহে না হয় সোম-মঙ্গল দুইদিন বন্ধ থাকবে। আগামী সোমবারই না হয় চলে যা।
অমূল্যের সঙ্গে নানাভাবে পথের হিসাব নিয়ে দেখা গেল বুধবার বেলা গোটা এগারোর আগে কিছুতেই ফেরা সম্ভব নয়। রাতও হয়ে যেতে পারে।
শেষপর্যন্ত দোকানের মালপত্র যথাসাধ্য সামলে সুমলে সেই সোমবারই গোপালগঞ্জ যাবার নাম করে দুর্গা বলে যাত্রা করল ইন্দ্রজিৎ।
কই ইন্দির আসেনি এখনও? কডা মাল ভারি দরকার ছেল।—রাস্তা থেকে সাড়া দিতে দিতে একটা মানুষ চলে এল বাড়ির মধ্যে। তখন কেবল সন্ধ্যা হয়েছে। তার পেছনে পেছনে এল আরও কয়েকজন।
শ্রীনাথ পণ্ডিত তখন সন্ধ্যা আহ্নিকের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন। উঠোনের এক কোণে একটা জলচৌকির উপর বসে হাতমুখ ধুচ্ছিলেন।
পিছন না ফিরেই বললেন, কাল সকালে আসিস বাবাজি। ইন্দির এখনও ফেরেনি। কি জানি আজ কেন অ্যাত দেরি হচ্ছে।
—ও পনিমশায়, ইন্দিরের ডিঙি যে ঘাঁটে বাঁধা। তয় কী হাট্যে গেছে আজ।
—হয় হাট্যেই গেছে। আজ বোধহয় অল্প সল্প মাল আনবে।
—তয় এত দেরি হচ্ছে কেন? সেই সকাল থেকেই দেখছি দোকান বন্ধ। কয়বার ঘুরে গেলাম।
অত কৈফিয়ত দিতে পারি না বাবাজিরা। তোমরা এখন যাও।—বিরক্ত রুক্ষ স্বরে বলেন পণ্ডিতমশায় বক্তার দিকে না ফিরেই।
বস্তুত মিথ্যে কথায় শ্রীনাথ পণ্ডিত আদৌ অভ্যস্ত নন। যারা এসেছিল তাদের দেখতে না পেলেও, যে ছেলেটি কথা বলেছিল তার গলা ওঁর চেনা। একদা ওঁরই, ছাত্র ছিল। পাশ করতে পারেনি। নাকি চুরি-ডাকাতি-গুন্ডামি করে বেড়ায়।
মনে মনে একটু যেন ভয় পেলেন শ্রীনাথ পণ্ডিত।
সম্প্রতি দেশে একটা নতুন হাওয়া বইতে শুরু করেছে। হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে অতীতের সদ্ভাবটা যেন দিনে দিনে কমে যাচ্ছে। যেখানে হিন্দু প্রবল, সেখানে হিন্দুরা মুসলমানদের কোণঠাসা করে রাখতে চাইছে, আর যেখানে মুসলমান প্রধান, সেখানে হিন্দুরা ভয়ে জুজু হয়ে আছে। গোবরা এবং তার আশেপাশের আট-দশটা গ্রাম তো প্রায় মুসলমানেই ভরা। ওদিকে কয়েক ঘর জেলে, সেদিকে কয়েকঘর বুনো কাপালী ছাড়া গোবরায় তো হিন্দু প্রায় নাই-ই। যাও ছিল আগে, তাদের সব ঘর ছাড়া করেছে মধুমতী। এই হাওয়াটা গোবরার মুসলমান পাড়ার উঠতি বয়সের ছেলেদের মধ্যেও সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে। তা না হলে এইসব উড়ুনচণ্ডী ছেলেরা শ্রীনাথ পণ্ডিতের বাড়ির মধ্যে ঢুকতে সাহস পেত না আগে। অবশ্য ইন্দ্রর সঙ্গে এদের মোটামুটি সদ্ভাব আছে, এবং সে মেলামেশা দোকান ঘর পর্যন্তই।
সেদিন সন্ধ্যা আহ্নিকের সময় বারে বারেই অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছিলেন শ্রীনাথ পণ্ডিত। একটা উৎকণ্ঠা এবং দুশ্চিন্তা তাঁকে পেয়ে বসেছে সন্ধ্যার ঘটনাটায়। একটা ভুলও হয়ে গেছে ইন্দ্রর। ডিঙিখানা বুনোপাড়ার খালে ডুবিয়ে রেখে যাওয়াই উচিত ছিল। ওই ঘাটে বাঁধা দেখে ওরা কী ভাবল কে জানে?
উত্তরের পোতার বড়ঘরের বারান্দায় শোন শ্রীনাথ পণ্ডিত। সে বারান্দা অবশ্য খোলা বারান্দা নয়। শক্ত টিনের বেড়া ঘেরা। সামনের দরজাখানাও শাল কাঠের। বারান্দা পেরিয়ে ঘরে ঢোকবার দরজাখানাও বেশ মজবুত। সেই ঘরের মধ্যেই ওঁদের সংসারের যাবতীয় মূল্যবান সামগ্রী থাকে। কিছু আছে গোটা দুই স্টিলের বাক্সে, কিছু আছে বস্তাবন্দী বাসন-কোসন, আর কিছু আছে বড় একটা কাঠের সিন্দুকে। গৃহিণী শোন সেই ঘরের মধ্যে। তাঁর খাটের তলায়ও আছে নানা জিনিসপত্র।
সারারাত ধরে ঘরে বারান্দায় স্বামী-স্ত্রী দুজনেই সজাগ ছিলেন। না, কিছুই ঘটল না। তারপর আর কেউ আসেনি ইন্দিরের খবর নিতে। সকালে উঠে প্রথমেই এলেন দোকানটা দেখতে। না, দোকানের ডবল তালা ঠিকই আছে। ডিঙিখানাও ঘাটে বাঁধা আছে। আশ্বস্ত হলেন পণ্ডিতমশায়।
ইন্দ্র যাবার আগেই দোকানের সব ভারী মালপত্র বড় ঘরে তুলে রেখে গেছে। তুলে রেখে গেছে ক্যাশবাক্সও। দোকানের মাচার নীচে অবশ্য অনেকদিনের সঞ্চিত বহুবিধ মালপত্র বাসন-কোসন আছে, কিছু খুচরো মালও আছে।
আজ মঙ্গলবার। দুর্গা-দুর্গা বলে আজকের রাতটা পার করতে পারলেই নিশ্চিন্ত। মা দুর্গতিনাশিনী রক্ষা করো মা—মনে মনে প্রার্থনা জানান পণ্ডিতমশায়। গৃহিণী সোয়া পাঁচ আনার হরির লুট মানসিক করেন। আজ কিন্তু সারা দিনে কেউই এল না বাড়ির মধ্যে ইন্দ্রের খবর নিতে। হয়তো যারা এসেছিল, তারা দোকানের তালা দেখেই চলে গেছে।
কিন্তু দোকানে ডবল তালাটাই যে একটা সন্দেহের ব্যাপার এ কথাটা মনে হয়নি কারও। কেবল সন্দেহ যাদের হবার কথা তাদের ঠিকই সন্দেহ হয়েছিল। খবর যাদের নেবার তারা ঠিকই নিয়েছে। তাদের একজন দেখেছে ইন্দ্রকে কাল গোপালগঞ্জের ঘাট থেকে খুলনাগামী স্টিমারে চড়তে। কিন্তু খুলনা যেতে হলে গোবরার মানুষ গোপালগঞ্জ যাবে কেন চার মাইল ঠেঙিয়ে, এক মাইল দূরেই তো মোল্লার হাট স্টেশন। ধারে কাছে কোথাও গেল কিনা সেইটুকু বুঝতেই তারা কাল সন্ধ্যায় খবর নিতে এসেছিল। তারা জানে শ্রীনাথ পণ্ডিত এখন আর ভালো চোখে দেখতে পান না। পাঁচ-সাত হাত দূরের মানুষও চেনেন না। তবু তারা এসেছিল সন্ধ্যার অস্পষ্ট অন্ধকারে এবং দাঁড়িয়েছিল প্রায় দশ-বারো হাত দূরে।
আজ মঙ্গলবার। আজ যদি ইন্দ্র মোল্লার হাট হয়ে ফেরে তো বেলা এগারোটা হবে, আর গোপালগঞ্জ হয়ে ফিরলে বিকেল চারটে। দুদিকেই তারা নজর রেখেছিল। না, ইন্দ্র আজ সকালেও এল না, বিকেলেও না। সুতরাং একটু দূরেই গেছে। হয়তো খুলনা ছাড়িয়ে বড় বন্দর কলকাতাও যেতে পারে। যেখানেই যাক, বুধবার এগারোটার আগে আর ফেরা সম্ভব নয়। নির্বিঘ্নে কাজ হাসিল করতে হলে আজ রাত্রিই প্রশস্ত। বাড়িতে তো রয়েছে কেবল বুড়ো-বুড়ি। অবশ্য বুনোরা বুড়োর জন্য জান দিতে পারত। কিন্তু বুনো পাড়া তো শূন্য। তবে আর ভাবনা কী? খান-কয়েক রামদাও হলেই যথেষ্ট। বুড়োটা হুজ্জোৎ করতে গেলে রামদার এককোপেই...
মঙ্গলবার রাত্রেও স্বামী-স্ত্রী দুজনেই সজাগ ছিলেন। বড় ঘরের একটা জানলা দিয়ে ওঁরা ভিতরে বাইরে বেশ কথা বলতে পারেন শুয়ে শুয়ে। মাঝে মাঝে সেভাবে ওঁরা গল্প-সল্পও করেন।
রাত তখন কত কে জানে! প্রথম কথা বললেন গৃহিণী। জানলার কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলেন, শোনছেন, আমি যেন উঠোনে মানুষের সাড়া পাচ্ছি।
পণ্ডিমশায়ের বোধহয় একটু তন্দ্রামতন এসেছিল। গৃহিণীর ফিসফাস শুনতে পেলেন না। গলা চড়াতে হল,—শোনছেন,—ভয়ার্ত গলায় বলেন গৃহিণী,—শীগগির ওঠেন, বাড়ির মধ্যি মানুষ!
—কী বললে? ঘরের মধ্যি মানুষ!
অজন্ম সাধা গলা। আচমকা সে গলা দিয়ে সেই সাধা আওয়াজটাই বেরিয়ে এল। নিশুতি রাতে বাড়িটা যেন কেঁপে উঠল সে আওয়াজে।
ওঁর বালিশের নীচে সব সময় একটা দুই ব্যাটারির টর্চ থাকে। রাতে বার কয়েক বাইরে যেতে হয় বলে ইন্দ্রই একবার কিনে দিয়েছিল। এবার সেই টর্চ জ্বেলে আবার চিৎকার করে বলেন, কই, কোনদিকে?
টর্চটা জানলা দিয়ে ঘরে মধ্যে একবার ঘুরিয়ে দেন চারিদিকে। ইতিমধ্যে গৃহিণীও বিছানা ছেড়ে উঠে ডিম করা হারিকেনটা বাড়িয়ে দিয়েছেন।
ঘরে না, বাইরে। উঠোনে।—বললেন গৃহিণী।
এবার বাঁদিকের জানলা দিয়ে টর্চ ফেললেন উঠোনে। মুহূর্তে একটা কাণ্ড ঘটে গেল!
বার থেকে একটা মানুষ হেড়ে গলায় ধমক দিয়ে উঠল, এই শালা শুয়োরের বাচ্চা বুড়ো, গলার আওয়াজ দিবি তো এই রামদা দেহিছিস?
টর্চের আলোয় ঝিলমিল করে উঠল একখানা পাঁঠা বলি দেওয়া বিশাল রামদা!
রামদা উঁচিয়ে লোকটা দৌড়ে এল জানালার কাছে। হাত বাড়িয়ে একটানে কেড়ে নিল টর্চটা শ্রীনাথ পণ্ডিতের চোখের ওপর। যেটুকু সামান্য দৃষ্টিশক্তি ছিল তাও আর রইল না। দুহাতে চোখ ঢেকে স্থাণুর মতো বসে রইলেন বিছানার উপর।
আজীবন মানুষের শ্রদ্ধাই পেয়ে এসেছেন শ্রীনাথ পণ্ডিত। মানুষের প্রণাম পেতেই তিনি অভ্যস্ত। তাঁকে যে কেউ গালাগাল দিতে পারে, বলতে পারে 'শুয়োরের বাচ্চা', এ ধারণাই ছিল না। ওই একটা গালাগালই তার সবটুকু শক্তি হরণ করল। একটা জড়বস্তু হয়ে গেলেন যেন।
—দরজা খুলবি রে বুড়ো, না আমরা ভাঙব?
শ্রীনাথ পণ্ডিতের গলা শুকিয়ে কাঠ। কথা বলার আর শক্তি নেই।
কয়েক সেকেন্ড পরে কে যেন হুকুম করল, যা তো ঢেঁকিডা নিয়ে আয়, ঢেঁকিশালেত্তে।
ঢেঁকিশালটা রান্নাঘর সংলগ্ন পুব পোঁতায়।
একটু পরেই ঢেঁকির এক প্রচণ্ড আঘাতে দরজার হুড়কোটা ভেঙে গেল। ঢেঁকি সমেত জনা-চারেক লোক ঢুকে পড়ল বারান্দায়। সেই ঢেঁকিরই আর এক ঘায়ে ভেঙে গেল বড় ঘরের দরজাও। দলটা হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল ঘরের মধ্যে। দুজনের হাতে রামদা। কয়েক জনের হাতে টর্চ। আর একজন রামদা হাতে দাঁড়িয়ে রইল পণ্ডিত মশায়ের শিয়রে।
গৃহিণীর হাতে তখনও রয়েছে হারিকেনটা। সেই হারিকেনের আলোতেই তিনি দেখলেন মুখোসধারী দলটাকে। ওদের মুখোমুখি হয়েও তিনি কিন্তু সাহস হারাননি। নরম গলায় বলেন, দরজাগুলোন ভাঙল ক্যান বাবাজিরা? আমি তো দরজা খুলতিই যাচ্ছিলাম। বাড়িতে কেবল বুড়ো-বুড়ি আছি আমরা। আমাগো মারতি এত অস্তরপাতি লাগবে ক্যান? এত মানুষই বা লাগবে ক্যান? দুডোরে গলা টিপে মারে ফ্যালো না।
—আমরা কাউরে খুন হরতি আসিনি ঠাইরেন। মেলা বাক্যি ঝাড়ার কাম নাই। সোনা-দানা, টাহা-পয়সা যা আছে বার হরে দ্যাও দেহি।
সোনা-দানা দেখতিছ তো সচাক্ষে।—একটু যেন হাসলেনও মা।—এই তো দুগাছা শাঁখা সম্বল। এই নিতি আইছ?
বাইরে লোকটা তখন হুঙ্কার দিয়ে উঠল।
—নে শালারা, তোরা যে বুড়ির বাক্যিতি ভিজে গেলি, কোহানে কি আছে টানে-টুনে বার কর।
ভিতরের দলটা মুহূর্তে কাজে হাত লাগাল। এক কোণ থেকে স্টিলের ট্রাঙ্ক বের হল, খাটের তলা থেকে বের হল ইন্দ্রের ক্যাশ বাক্স আর এক বস্তা বাসন। ওদিকে দেয়াল ঘেঁষে বস্তাবন্দী ছিল দোকানের চাল, ডাল, নুন, চিনি, টিনে টিনে ছিল সরষের তেল, নারকেল তেল, প্যাকেটে প্যাকেটে আরও নানা দোকানের সামগ্রী। সব একে একে বের হল উঠোনে, উঠোন থেকে মাথায় মাথায় চলে গেল ঘাটে বাঁধা ডিঙিখানার উপর। চোখ মেলে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে দেখছেন মা। মুখে কথাটি নেই, কারণ কথা কয়ে যে লাভ নেই তা এবার তিনি বুঝেছেন।
বস্তুত, পণ্ডিতমশায় ও মা দুজনেই একেবারে হতভম্ব হয়ে গেছেন। ওঁদের এই বয়স পর্যন্ত অভিজ্ঞতায় চুরির ব্যাপারটাই জানা ছিল। চুরির ভয়েই এই দুইরাত্রি ওঁরা জেগে থাকতে চেয়েছিলেন। বাড়ির লোকের সাড়া পেলেই চোর পালায়, এই ওঁদের জানা। ওঁদের বাড়িতে যে ডাকাতিও হতে পারে এ ওঁদের সুদূর কল্পনাতেও ছিল না। ঘটনার আকস্মিকতায় তাই ওঁরা দুজনেই দিশেহারা।
বাঁশের আড়ায় রাখা কয়েকখানা ধুতি, শাড়ি, গামছাও ওরা পুরে নিল একটা বস্তায়। বারান্দায় পণ্ডিতমশায়ের খাটের তলায় থেকে রাত্রে এঁটো বাসন। সে বস্তুও ওরা আবিষ্কার করে ভরে নিল বস্তায়। সেই সঙ্গে নিল পণ্ডিত মশায়ের তিরিশ বছর ব্যবহার করা ভারী গাড়ুটাও। অমন ভারী ভরণ কাঁসার গাড়ু আজকাল আর পাওয়াই যায় না।
শেষ পর্যন্ত সমস্যা হল বিশাল কাঠের সিন্দুকটা নিয়ে। ওটাকে তো আর টেনে নেওয়া যায় না। এবার দেখা যাক ওটার মধ্যে আছে কি সম্পদ।
সিন্দুকির চাবিডা দাও ঠাইরেন।—সরাসরি হুকুম করে হাত বাড়াল লোকটা।
—ওডায় তো তালা চাবি নাই, খোলাই তো পড়ে রইছে।
—কী আছে ওর মধ্যি?
—নিজিরাই দ্যাহো না বাবা। কিছুতো আর থুয়ে গেলে না। ওই পুরোনো কাঁথা কোম্বালগুলাই বা থুয়ে যাবা ক্যান?
সত্যিই ওটায় তালা চাবি দেওয়া ছিল না। বস্তুত সিন্দুকের তালাটা ইন্দ্রই নিয়ে নিয়েছিল তার দোকানঘরে ডবল তালা লাগাবার জন্যে। তবু ওটাকে খুলে টর্চ ফেলে দেখা হল। না, ওর মধ্যে পুরোনো লেপ, তোষক, কাঁথা ও কম্বল ছাড়া আর মূল্যবান কিছু নেই।
প্রায় ঘণ্টা খানেক ধরে নির্বিঘ্নে কাজ সমাধা করে দলটা চলে গেল। তখন রাত বেশি বাকি নেই।
ওরা চলে যাবার পরেও অনেকক্ষণ ধরে কেউ কথা বলতে পারেননি। কেবল দুইজোড়া অসহায় চোখ পরস্পরের দিকে তাকিয়ে এই ভয়ঙ্কর রাত্রিটির অবসান কামনা করছিল।
দীর্ঘক্ষণ পরে একসময় একেবারে হু হু করে কেঁদে পড়লেন মা।
—কাল ছান করে পরবার কাপড়খানাও থুয়ে গেল না, থুয়ে গেল না ভাত খাবার একখানা বাসনও! কাল ইন্দির আস্যে কী দ্যাখবে? হায় পরমেশ্বর, আমাকে অদেষ্টে এ-ও ছিল! এহেবারে যথা সর্বস্ব নুটে নিয়ে গেল যে। শোনছেন, এট্টা কথা কন। এ কী সর্বনাশ হল আমাগে?
কাঁদে আর লাভ কী বল?—ভগ্ন কণ্ঠে এবার কথা বললেন শ্রীনাথ পণ্ডিত,—যা গেল তা জন্মের মতোই গেল, কাঁদলি তো আর ফিরে পাব না। মালক্ষ্মী দেছেলেন, মা লক্ষ্মীই নিয়ে গেলেন। তাই ভাবে মনের বুঝ দ্যাও। এইবার আমরা লক্ষ্মীছাড়া হলাম।
বলতে বলতে শ্রীনাথ পণ্ডিতের গলায়ও কান্নার সুর বাজে।
নিশুতি রাতের এই অসহায় কান্না শুনবার মতো কেউ নেই আশেপাশে। শ্রীনাথ পণ্ডিত তখনই সংকল্প করলেন, এ গ্রাম থেকে এবার চিরবিদায় নিতে হবে। বাস করতে হবে এমন কোথাও যেখানে প্রতিবেশী আছে। রাত-বিরেতে ডাকলে সাড়া পাওয়া যায় এমন মানুষ আছে।
শ্রীনাথ পণ্ডিত নিজের ধুতির খুঁট দিয়ে গৃহিণীর চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে ব্যথাভরা গলায় বলেন, কাঁদবার কথা তোমার নয় গিন্নি, কাঁদবার কথা আমার। ওরা তোমাকে তো তবু 'ঠাইরেন' বলে সম্বোধন করিছে। তোমার মান রাখিছে। তোমার সঙ্গে আগাগোড়া তুমি-আমি করে কথা বলিছে। কিন্তু আমারে বলিছে 'শুয়োরের বাচ্চা'! এ শাস্তি হয়তো আমার পাওনাই ছিল। ওদের সবাই না হলিও কয়েকজন তো আমার ছাত্রই ছিল। রহিম সেখের গলা তো আমি পষ্টই চিনিছি। সেই গুন্ডোটা। ওদের লেখাপড়া শিখেয়ে মানুষ করতি চাইছিলাম। মানুষ করতি পারিনি বলেই তো ডাকাত হইছে। তাই বোধহয় ওদের হাত দিয়েই এ শাস্তি আমারে ঈশ্বরই দিলেন। থাক, আর কাঁদো না।
পরামাশ্চর্য এক সান্ত্বনায় শ্রীনাথ-গৃহিণী হাতজোড় করে কার উদ্দেশ্যে প্রণাম জানালেন কে জানে!
একটু আলো হতেই পণ্ডিতমশায় বাইরে এলেন। প্রথমেই গিয়ে দেখলেন দোকানের ডবল তালা ঠিকই আছে। এটু যেন আশ্বস্ত হলেন। কিছু তবু আছে।
ভোরহতেই বুনোপাড়ার কিছু বুড়ো-বুড়ি এল তাদের পণ্ডিত-এর খবর নিতে। তাদের সঙ্গে কয়েকজন বাচ্চা-কাচ্চাও এসেছিল কৌতূহলী হয়ে। তাদের কেউ কেউ নাকি এ-বাড়িতে রাত্রে কিছু চেঁচামেচি শুনেছে, তাই ভোরে এসেছে খবর নিতে।
খবর তো তারা স্বচক্ষেই দেখছে, দরজা ভাঙা। দেখছে বারান্দার মধ্যে ঢেঁকিটাও। বুড়ো-বুড়িরা মায়ের চোখে-মুখের চেহারা দেখেই আর্তনাদ করে উঠল।
—এ কী সব্বনাশ। তোদের ঘরে ডাকাতি!
এহেবারে যথা সব্বস্ব নিয়ে গেছেরে বাবা।—আর্তনাদ করে ওঠেন মা।—ঘরে একখানা গামছা পর্যন্ত নাই। নাই একখান বাসন-কোসন।
তারা বুক চাপড়াল, হা-হুতাশ করল। তাদের আর কিই-বা করার আছে। তারা অক্ষম হয়ে গেছে বলেই তো শিকারে যেতে পারেনি।
বাচ্চারাই আবিষ্কার করল যে পণ্ডিতমশায়ের ডিঙিখানা কাল সন্ধ্যার সময়ও ঘাটে ছিল, কিন্তু এখন নাই।
শালা হারামীরা কি তোর ডিঙিতে করেই তোর সর্বস্ব নিয়ে গেল তালি?—প্রশ্ন করে এক বুড়ো।
শ্রীনাথ পণ্ডিত আবার ভাবলেন ডিঙিখানা ঘাটে বেঁধে রেখে যাওয়া মস্ত ভুল হয়েছিল ইন্দ্রর।
একটু বেলা হতেই বুনোদের মুখে মুখে খবরটা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল। ছড়িয়ে পড়ল গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। মিয়াপাড়া, জেলেপাড়ার কারও আর জানতে বাকি রইল না যে, কালরাতে একদল সশস্ত্র ডাকাত শ্রীনাথ পণ্ডিতমশায়কে একেবারে সর্বস্বান্ত করে গেছে। অনেকেই এল খবর নিতে। সকলেই হায় হায় করল। কেউ কেউ যেতে চেয়েছিল গোপালগঞ্জ থানায় খবর দিতে। শ্রীনাথ পণ্ডিত বারণ করলেন তাদের।
বেলা সাড়ে দশটায় মোল্লার হাট স্টেশনে নেমে বাড়ি আসার পথেই কার মুখে যেন খবরটা পেল ইন্দ্র। খবর শুনেই ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে শুরু করেছিল।
ইন্দ্রকে দেখেই মা হাউমাউ করে কেঁদে পড়লেন। কান্নার পর মোটামুটি ঘটনার একটা বিবরণ দিলেন।
বাবার সঙ্গে একটু আলোচনা করতেই ইন্দ্রের গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। মুহূর্তে যেন দূয়ে দুয়ে চার মিলে গেল। তাহলে এটা রহিম সেখের দল। সেদিন গোপালগঞ্জ ঘাট থেকে স্টিমারে উঠবার সময় রহিমকে সে দেখেছিল ঘাটে। সে ওকে প্রশ্নও করেছিল ও কোথায় যাচ্ছে। ও যেন শুনতেই পায়নি এমনি ভাব করে তরতর করে স্টিমারে উঠে গেছিল। রহিম সেখের দলের কয়েকজনকে তো ইন্দ্র চেনেই। ও লাফিয়ে উঠল।
—আমি এখুনি থানায় যাব। রহে শালারে জেল খাটায়ে ছাড়ব এবার। এই তো কেবল মাস দুই হল ছাড়া পাইছে। শালা এরি মধ্যি আবার...তা আবার আমাগে বাড়ি! শালা আপনার ছাত্তোর ছিল না?
ছিল বলেই তো,—শান্ত গলায় বলেন শ্রীনাথ পণ্ডিত—আমি থানা-পুলিশ করতি বারণ করে দিছি সবাইরে। যা গেছে তা তো আর পাব না অথচ শত্রু বৃদ্ধি হবে।
তাই বলে এহেবারে চুপ করি থাকব!—রুখে ওঠে ইন্দ্র।
—এই তো কেবল বাড়ি আলি বাবা। হঠাৎ উত্তেজনাবশে কিছু করতি নাই। ও বিষয় আমরা পরে ভাবে দ্যাখব। এখন দ্যাখ তোর দোকানে কী আছে। দোকানডা যে লুট করে নাই, সে-ও তো ভাগ্যি।
—দোকানে আর আছে কোন ঘোড়ার ডিম। দামি মাল তো সব বড় ঘরে তুলে রাহিছিলাম। স-অব গেছে, বাবা, স-অ-ব গেছে। ক্যাশবাক্সে প্রায় আটশো টাকা ছিল এ সপ্তাহের মাল কেনার জন্যি। দোকান এবার জন্মের মতো লাটে উঠল।
বুকফাটা আর্তনাদ করতে থাকে ইন্দ্র।
পণ্ডিতমশায় সস্নেহে ইন্দ্রর মাথায় হাত রেখে বলেন, শোন বাবা, এডা ঈশ্বরেরই ইঙ্গিত। যাদের মায়ায় এদেশের মাটি কামড়ায়ে পড়েছিলাম, তাদের হাত দিয়েই আমারে নিঃস্ব করে ঈশ্বর আমারে মায়া মুক্ত করে দিলেন। মাঝে মাঝে মানুষকে তিনি এমনি আঘাত দিয়েই শিক্ষা দেন। ঈশ্বর যা করেন, ভালোর জন্যিই করেন, এ বিশ্বাস আমি আজও হারাই নাই। এই আপাতঃ অমঙ্গলের পিছনে তার কী মঙ্গল অভিপ্রায় আছে জানি না, তবে সেই ডাকাত দলডা চলে যাবার পরেত্তেই আমার মন বলতিছে, এ আমাদের দেশত্যাগী হবার ইঙ্গিত। আমি পাঠশালা ছাড়িছি, মূল শিকড় তো ছিঁড়েই গেছে। যেটুকু অবশিষ্ট ছিল তাও ছিঁড়ে গেল এবার।
আপনার না হয় মায়া কাটিছে—অভিমানী গলায় বলে ইন্দ্র,—কিন্তু আমি যে অ্যাদ্দিন ধরে বুকের রক্ত জল করে এই দোকানডারে গড়ে তুলিছি, এডার মায়া ছাড়া কি সোজা? না, না, আমি পারব না, পারব না...
আবার আর্তনাদ ওঠে ইন্দ্র।
বাবার সঙ্গে এভাবে মুখে মুখে তর্ক করেনি ইন্দ্র কোনোওদিন। বাবার কথা বেদবাক্য বলে মেনে নিয়েছে বরাবর। কিন্তু আজ বাবার এই জেনেশুনেও রহিমকে ছেড়ে দেওয়া এবং দেশত্যাগের সংকল্প, এর কোনোটাই মেনে নিতে পারছে না ইন্দ্র।
এমন সময় মা এসে ওর হাত ধরে তুলে বলেন, এসব পরামর্শ পরে করা যাবে বাবা। আয় হাত-মুখ ধো। দেহি ঘরে চাড্ডে চিড়ে-মুড়ি আছে নাকি...
—রাহো, আগে দেহি দোকানের কী অবস্থা।
প্রায় জোর করেই মায়ের হাত ছাড়িয়ে ইন্দ্র এসে তার দোকান খুলল। চারিদিকটা তাকিয়ে তাকিয়ে আন্দাজ করতে চেষ্টা করল কী কী আছে। হঠাৎ নজর পড়ল মাচার নীচে সেইসব বন্ধকী জিনিসগুলির দিকে। এইতো একটা সম্পদ রয়েছে, মনটা যেন একটু হালকা হল। সেই মন নিয়ে দোকানের জিনিসগুলির মোটামুটি একটা হিসাবে নিয়ে বুঝল বাজারের দেনা হয়তো এতে শোধ হয়ে যাবে। তারপর? তারপর যে কি হবে সে আর ভাবতে পারে না ইন্দ্র।
মা-ও এসেছিলেন ইন্দ্রের পিছনে পিছনে। তিনিও দেখলেন চারিদিক তাকিয়ে; একসময় বললেন, মালপত্র তো কম নাই দেখতিছি। মা লক্ষ্মী রক্ষা করিছেন।
বলতে বলতেই হঠাৎ তাঁর একটা কথা মনে পড়ে গেল। দৌড়ে এলেন বড়ঘরে। সেই কাঠের সিন্দুকের তলায় হাতড়ে হাতড়ে টেনে বের করলেন ন্যাকড়ায় বাঁধা একটা বড় সড় পুঁটুলি। উল্লাসে অধীর হয়ে বাইরে ছুটে এলেন যেন এক কিশোরী কন্যা।
বাইরে একটা মোড়ায় বসে পণ্ডিতমশায় অন্যমনস্ক ভাবে তামাক খাচ্ছিলেন উদাস চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে।
মা সেই পুঁটুলিটা তাঁর চোখের সামনে ধরে বললেন, শুনিছেন, সোনা-রূপো যা ছিল তাও ছুঁতে পারেনি নিব্বুংশেরা। এই দ্যাহেন।
তাই নাকি? কোথায় ছিল?—সাগ্রহে বলেন পণ্ডিতমশায়।
সেই সোমবার রাত্তিরি কি মনে করে তুলে রাহিছিলাম বড় বাক্সরতে ওই কাঠের সিন্দুকের তলায়। সেইসব কাঁথা কম্বলের নীচে। এই মাত্তোর মনে পড়ল।
মায়ের উল্লাস চিৎকারে ইন্দ্রও ছুটে এসেছিল। সে-ও দেখল মায়ের গোপন সম্পত্তির পুঁটুলিটা।
মা আফশোস করে বলেন, ইশ, তোর নগদ টাহাডা যদি আমার কাছে দিয়ে যাতি, আমি তো এই পুঁটুলিতেই রাখতাম, তালি সেডাও রক্ষে পাতো।
মায়ের কথা শেষ না হতেই ইন্দ্র ছুটে এল বড় ঘরে। মনে পড়েছে তারও। পরমুহূর্তে সে-ও একটা লাফ দিয়ে বেরিয়ে এল বাইরে বাবার কাছে একখানা খাম হাতে করে। ঠাস করে মায়ের পায়ে একটা প্রণাম করে বলে, মা, তুমি সাক্ষাৎ লক্ষ্মী। লক্ষ্মীর পায়ের কাছে—মানে তোমার বিছেনার পায়ের দিকে থুয়ে গেছালাম এই পাঁচশো টাকা। এই দ্যাহো। এতক্ষণ আমার খেয়ালই ছিল না। ক্যাশ বাক্সডা রাখলাম তোমার খাটের তলায়। তার মধ্যি খুচরো-খাচরা নিয়ে বেশি কিছু ছিল না। খা, শালারা, কলা খা!
টাকাটা হাতে করে প্রায় নাচতে শুরু করল ইন্দ্র।
শ্রীনাথ পণ্ডিতের মুখে অদ্ভুত একটু হাসি।
—জানিস ইন্দির, ঝড় থামে গেলি মানুষ প্রথমে চারিদিক ঘুরে দেখে ক্ষতির পরিমাণটা। তারপর একটা সময় আসে যখন সে খুঁজে দেখে ক্ষতির পরেও অবশিষ্ট কিছু আছে কিনা। যেটুকু থাকে সেটুকুকে সে ঈশ্বরের দান বলেই গ্রহণ করে।...এই তো ঈশ্বরের দান, এই তো তাঁর কৃপার পরিচয় পালাম। আর আমার দুঃখ নাই।
দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর বাড়ির তিনটি মানুষই যেন কি এক নিগূঢ় শান্তিতে কয়েক ঘণ্টা ঘুমিয়ে নিল। সর্বাগ্রে ঘুম ভাঙল ইন্দ্রর। সে মালো পাড়ার মধ্যে যে কয়েক ঘর ছুতোর মিস্ত্রি থাকে তাদের একজনকে ডেকে এনে দরজা দুটো সারিয়ে ফেলল। মা শুরু করলেন ঘর-দোর গুছোতে।
বিকেলে আবার তিনটি মানুষ বারান্দায় বসল মুখোমুখি একটা মাদুর পেতে। এমন দৃশ্য এর আগে এ-বাড়িতে আর কেউ দেখেনি কোনওদিন। শ্রীনাথ পণ্ডিতের সঙ্গে একাসনে স্ত্রী আর পুত্র! এ একটা দেখবার মতো ছবি।
যে প্রশ্নটা সর্বাগ্রে করার কথা ছিল ইন্দ্রকে, সেই প্রশ্ন এবার করলেন মা।—মেয়ে কেমন দেখলি বল।
ওসব কথা এখন আর তুলো না মা। যে মাইয়ে দেখতি যাইয়ে আমাগে এই সব্বনাশ হল, সে মাইয়ে অলুক্ষুণে। ঘর পা দেবার আগেই ঘর শূন্য হয়ে গেল। —অভিমানী গলায় বলে ইন্দ্র।
যতটা শূন্য হইছে ভাবিছিলাম প্রথমে,—শ্রীনাথ পণ্ডিত তামাক খেতে খেতে শান্ত ভাবে বলেন,—ততোটা শূন্য তো হয়নি বাবা। ঘরে এখনও নগদ পাঁচশো টাকা রইছে। জীবনে তো একখানা একশো টাকার নোটও হাতে করে দেখি নাই। দেখাতো একখানা নোট।
ইন্দ্র খামখানা শুদ্ধই তুলে দিল বাবার হাতে। তিনি এক একখানা নোট ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলেন খানিকক্ষণ ধরে। তারপর হেসে বললেন, গৃহিণীকে, দেখি এবার তোমার সম্পত্তি বার করো তো।
পুঁটুলিটা খোলা হল তিনজনের মধ্যিখানে। দেখা গেল গৃহিণীর ষাট বছরের সঞ্চয়ের পরিমাণও সামান্য নয়। পাঁচ বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল, এখন তাঁর বয়েস পঁয়ষট্টি। এক-একটা জিনিস হাতে করে এখনও বলতে পারেন, কে কখন কোনটা দিয়েছিল। কোনটার কি ওজন! বিয়ের সময়ের আটগাছা রূপোর মল ষোলো ভরি। প্রথম সন্তান হবার পর স্বামীর উপহার বিশ ভরি রূপোর কোমর বিছে। তারপর সেই প্রথম যুদ্ধের সময় হঠাৎ যখন পাটের দাম খুব চড়ে গেল তখন সে বছরের ভাগে পাওয়া পঁচিশ মণ পাট বিক্রি করে মোটা টাকা পেয়ে গেলেন পণ্ডিতমশায়। সেবারই করে দিয়েছিলেন সাত গিনির সোনার হার। সবচেয়ে সম্প্রতি কালের জিনিস হল চার ভরি সোনার অনন্ত। সে-ও পাঁচ-ছ-বছর হল বইকি। ওটা অবশ্য পণ্ডিতমশায়ের করে দেওয়া নয়, ওটা একজন কৃতি ছাত্রের উপহার। সেবার উনি জজের জুরি হয়ে জেলা শহর ফরিদপুর গেছিলেন। খবর পেলেন, সেখানকার পুলিশের বড় সাহেব ওঁরই ছাত্র। দেখা করতে গেছিলেন তার বাসায়। তিনি উচ্ছ্বসিত অভ্যর্থনা করলেন তার শৈশবের গুরুকে। প্রায় সপ্তাহ খানেক তার বাসায় রাখলেন গুরুদেবের মতো সেবা যত্ন করে। আসবার সময় পণ্ডিতমশায়কে উপহার দিলেন মূল্যবান ধূতি, শাল, আর গুরুমাকে লাল পাড় শাড়ি-সহ এই চার ভরি অনন্ত। ও জিনিস জীবনে মাত্র একদিনই পরেছেন মা। যেদিন উপহারটি পণ্ডিতমশায় ওঁর হাতে তুলে দিয়েছিলেন, জিনিসটা এখনও ঝকঝকে রয়েছে।
জিনিসগুলো নাড়াচাড়া করতে করতে মা বলেন, তোর বউরি দেব বুলে এই অনন্ত জোড়া, আর ওই আটগাছা মল রাহিছি। আর এই সোনার হার গাছা ভাঙ্গে দুই ভাগ করে দুই বউরি দেব। আজকাল তো এত ভারী হার...আচ্ছা, এহোন সোনার দর কত জানিস ইন্দির?
না, সোনার দর জানার প্রয়োজন ঘটেনি ইন্দ্রের আজও পর্যন্ত।
আপনি জানেন সোনার দর?—প্রশ্ন করেন পণ্ডিত মশায়কে।
খু-উ-ব জানি। —ছেলেমানুষি গলায় বলেন পণ্ডিতমশায়।
—কত কন দেহি।
লক্ষ টাহা।—হেসে বলেন পণ্ডিতমশায়,—তুমিই তো আমার সোনা। তোমার দাম লক্ষ টাহারও বেশি।
ছেলের সামনে এমন রসিকতায় পঁয়ষট্টি বছরের মা-ও লজ্জায় রাঙা হয়ে ওঠেন। প্রসঙ্গান্তরে যাবার জন্যে বলেন, ছেলের বিয়ের কথা যে কিছু কলেন না।
ওটা আমি ঠিক করি ফেলিছি।—গম্ভীর ভাবে বলেন শ্রীনাথ পণ্ডিত,—ওই মা লক্ষ্মীকেই আমি পূত্রবধূ রূপে ঘরে আনব। দেখতিছ না, তার জিনিস তিনিই রক্ষা করিছেন। তিনিই হবেন আমার ঘরের নবলক্ষ্মী। মেয়েটা দেখতি শুনতি ভালো তো? তোর আপত্তি নাই তো ইন্দির?
—আপনি যদি বলেন...
বাক্যটা অসমাপ্ত রেখেই স্থান ত্যাগ করল ইন্দ্র।
দুঃখের মধ্যেও যিনি এমন আনন্দের হাসি হাসতে পারেন, তেমন পিতার সন্তান হয়ে নিজেকে আজ গর্বিত মনে হল ইন্দ্রর। পিতাকে যেন আজ নতুন করে চিনল ইন্দ্রজিৎ। না, পিতার কোনও পরিকল্পনায় আর প্রতিবাদ করবে না ইন্দ্র। সেই ভালো, ভাবল ইন্দ্র, এ নিমকহারামের দেশ ত্যাগ করাই ভালো।
'বাড়িতে সম্প্রতি একটি বিশেষ দুর্ঘটনা ঘটিয়া গিয়াছে। তুমি পত্রপাঠ অবিলম্বে বাড়ি চলিয়া আসিবা। তোমার খোকাদা ও তাঁহার দিদিকে আমার স্নেহাশীর্বাদ জানাইবা। সোমনাথদের বাড়ির সকলকে আমার আর্শীবাদ জানাইবা ও সোমনাথের মাতৃদেবীকে আমার ভক্তিপূর্ণ প্রণাম জানাইবা। আমরা সকলে একরূপ আছি। ইতি, নিত্য আর্শীবাদক তোমার পিতৃদেব।'
বাবার হাতের লেখা চিঠি এই প্রথম পেল রুনু। চিঠিটা বার বার পড়ে একটা অজানা ভয়ে অস্থির হয়ে উঠল। কী দুর্ঘটনা ঘটল বাড়িতে?
চিঠিখানা খোকাদার হাতে দিয়ে বলল, ও খোকাদা, পড়েন তো চিঠিখানা। আমি যে কিছুই বুঝতি পারতিছি না। বাড়িতে কার কী হল?
খোকাদাও পড়লেন চিঠিখানা বার দুই। তারপর বললেন দুর্ঘটনাটা যে শারীরিক নয়, সেটা বুঝতে পারছি। তবে তোমাকে অবিলম্বে বাড়ি যেতেই হবে। হয়তো এমন কিছু ঘটেছে যা উনি চিঠিতে জানাতে চান না, অথবা বাজুনিয়াকেই জানাতে চান না।
পরের দিনই খোকাদা একখানা নৌকা ঠিক করে দিলেন। নিজে সঙ্গে সঙ্গে ভোজেরগাতী পর্যন্ত এসে রুনুকে বিদায় জানলেন। রুনুকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, মন খারাপ করিস নে রুনু। বাড়ি গিয়েই চিঠি লিখবি। জ্যাঠামশায় যতটুকু জানাতে বলেন, ততটুকুই জানাবি।
খোকাদা ধীরপদে ফিরে যাচ্ছেন। নৌকার সামনে দাঁড়িয়ে খোকাদার দিকে তথা বাজুনিয়া গ্রামটার দিকে তাকিয়ে রুনুর বুকের মধ্যে যেন একটা সব হারানোর কান্না গুমরে গুমরে উঠছে।
অন্তত তিনমাস এখানে থেকে খোকাদার সঙ্গে পড়াশুনো করবে, চুয়ার সঙ্গে প্রাণ ভরে গল্প করবে, তাকে দেখাবে ওর প্রাইজ বই, সোনার মেডেল, এমনি কত পরিকল্পনা ছিল ওর মনে। মাত্র কয়েক লাইনের একখানা পোস্টকার্ড ওর সব স্বপ্ন শূন্যে মিলিয়ে দিল!
যেতে যেতে ওর মনে পড়ছে ঠাকুমার দাহ করার ঘটনাটা। সেই একটা দিনেই যেন ও একটা পরিণত মানুষ হয়ে গেছে। অনেক বড় হয়ে গেছে। ও আর এখন ছেলেমানুষ নেই।
হ্যাঁ, ঠাকুরবাড়ির বুড়ো-বুড়িরা, রায়পাশা গ্রমের ঠাকুরমার সেই মেয়ের ছেলেমেয়েরা আপত্তি তুলেছিল বইকি। শূদ্র রুনুকে দিয়ে একজন আজীবন শুদ্ধাচারী ব্রাহ্মণীর মুখাগ্নি করালে নাকি সেটা হবে মস্ত পাপ। সেই পাপের ফলে ওই শূদ্রের নাকি অনন্ত নরকে গতি হবে, আর ব্রাহ্মণীর আত্মারও শান্তি হবে না।
আশ্চর্য দৃঢ়তার সঙ্গে একা খোকাদা সমস্ত ব্রাহ্মণকে বির্তকে পরাস্ত করে শেষ পর্যন্ত রুনুকে দিয়েই প্রথম মুখাগ্নি করালেন। তারপর করলেন নিজে। শেষে উপস্থিত ব্রাহ্মণদের বললেন, এই শূদ্র ছেলেটিই মৃত্যুকালে তার মুখে গঙ্গাজল দিয়েছে। এ অধিকার তিনিই ওকে দিয়ে গেছেন মৃত্যুকালে। সেই পুণ্যবতীর শেষ ইচ্ছা পূর্ণ করে এই শূদ্র ছেলেটি। যে মহাপূণ্যের কাজ করল তার জন্যে একে আপনারা আশীর্বাদ করুন।
—এ অনাচার। এ ধর্মে সইবে না খোকাবাবু।
—এই অনাচারীদের হাতের সেবা, হাতের গঙ্গাজল যখন সেই 'আজীবন শুদ্ধাচারী' সানন্দে সয়েছেন, তখন এই অনাচারেই তাঁর আত্মার তৃপ্তি হবে। ইচ্ছে হলে আপনারা এবার মুখাগ্নি করুন প্রাণ ভরে।
উদাস সুরে বলেছিলেন খোকাদা।
না, তারপর আর কোনও পবিত্র ব্রাহ্মণই ও 'অপবিত্র' স্থানে থাকেননি। খোকাদার নেতৃত্বে রুনু এবং করের বাড়ির কয়েকটি ছেলে মিলেই দাহক্রিয়া সম্পন্ন করেছিল।
মনে পড়ছে দীপু-নিপুর কথাও। ওদের সঙ্গে হয়তো এ জীবনে আর দেখা হবে না। ওরা নাকি পাশ করে বরিশাল বি. এম কলেজে পড়বে। রুনু তো পড়বে খোকদার দাদার বাসায় থেকে কলকাতার কলেজে। সেই ব্যবস্থাই করবেন খোকাদা। সে বাড়িতে তো চুয়াও থাকে। শৈলদি সেবার চুয়ার মাস্টারি করার জন্য রুনুকে পাঁচ টাকা দিতে চেয়েছিলেন। এবার বলেছেন, চুয়াকে ও যেন যত্ন করে পড়ায় সেই আগের মতো, তাহলে শৈলদি ওকে মাসে পনেরো টাকা করে দেবার ব্যবস্থা করবেন। তাতে ওর হাত খরচ চলে যাবে। কলকাতায় গিয়ে আবার চুয়ার সঙ্গে মিলিত হবার একটা আনন্দময় সম্ভাবনায় রুনু এক কথায় রাজি হয়েছে। অবশ্য বাবাও এতে সম্মত হবেন রুনুর তাই বিশ্বাস।
বিচিত্র অভিজ্ঞতাপূর্ণ এই অল্প কটি দিনের কথা ভাবতে ভাবতে বাড়ির কথা প্রায় ভুলেই গেছিল রুনু। গোপালগঞ্জের স্লুইসগেট পার হয়ে মধুমতীতে পড়তেই ওর মনে হল বাড়ির কথা। আবার একটা অসহ্য উৎকণ্ঠা ওকে পেয়ে বসল। তাড়াতাড়ি বাড়ি পৌঁছাবার জন্যে ও নিজেও বসে গেল একখানা বৈঠা নিয়ে।
রুনুর বাড়ি আসার জন্যেই অপেক্ষা করছিল ইন্দ্র। ডাকাতির ঘটনার চেয়ে বাবা যে দৃষ্টিতে ঘটনাটিকে নিয়েছেন সেইটেই রুনুকে বিস্মিত করল বেশি। ইন্দ্র একে একে সবই বলল রুনুকে। বলল কেন রুনুকে অবিলম্বে আসতে বলা হয়েছে। ও না এলে যে বাবা-মাকে একা ফেলে ইন্দ্র বের হতে পারছে না। কতদিন ওকে বাইরে থাকতে হবে কে জানে! বাবা আদেশ দিয়েছেন, এবার বাড়ি করতে হবে একটা সমাজের মধ্যে। বাবার ইচ্ছা খুলনা জেলার নন্দনপুর গ্রাম, যেখানে ওদের কয়েক ঘর আত্মীয়ও আছে। সেই গ্রামেই যাবেন এবার। বাড়ির জন্যে জমির খোঁজেই এবার ইন্দ্রকে যেতে হবে বাইরে। গাছপালা সমেত অন্তত তিনবিঘে জমি পেলেও ইন্দ্র যেন একেবারে বায়নাপত্র করে আসে।
এদিকের সব গোছগাছ করে দিয়ে কিছু পয়সাকড়ি সঙ্গে নিয়ে ইন্দ্র যাত্রা করল বাবা-মাকে প্রণাম করে।
যাত্রার মুখে বলে, জমি যদি পছন্দ হয়, আপনি নিজি একবার দ্যাখবেন তো বাবা? তা আগে বায়না করা কি...
তুই বড় হইছিস,—ইন্দ্রর মাথায় হাত রেখে বলেন পণ্ডিতমশায়,—বুদ্ধি বিবেচনা হইছে। এখন তো তুই-ই বাপ, আমরা দুই বুড়োবুড়ি তোর দুটি সন্তান। তুই দেখেশুনে যা পছন্দ করবি, আমরা বুড়োবুড়ি তাতেই খুশি হব। আমার কেবল একটা কথা, বাড়িডা যেন নদী থেকে বেশি দূরে না হয়। নদীর মায়া বড় মায়া।
ওখানেও নদী আছে না কি?—প্রশ্ন করে রুনু।
—আছে না? রূপসা নদী। খুলনা শহর তো রূপসার তীরে। খুলনার উল্টোদিকেই নন্দনপুর। আচ্ছা রুনু, তোর পরীক্ষার ফল বার হতি আর কত দেরি আছে?
—প্রশ্ন করেন পণ্ডিতমশায়।
—এখনও প্রায় দুইমাস।
তবে তো আর সময় নাই। শোন বাবা ইন্দির, আর এক মাসের মধ্যিই আমরা এ দ্যাশ ছাড়তি চাই। এর মধ্যি জমি কিনেই ফেলতি হবে। তারপর আবার এখানতে ভাঙেচুরে নিয়ে ওখানে সব খাড়া করতি প্রায় একমাস লাগে যাবে। তারপরেই তো আবার রুনুরি কলেজে ভরতি করার ব্যাপার আছে।—আদেশের সুরে বলেন পণ্ডিতমশায়।
নন্দনপুরি বাড়ি হলিতো রুনুর খুব মজা হবে।—বলল ইন্দ্র।—ও তো বাড়িত্তেই দৌলতপুর কলেজ করতি পারবে। নদীডা পার হয়ে খুলনায় ট্রেনে চাপবে, গোটা দুই স্টেশন পরেই দৌলতপুর।
সেডা আমিও ভাবিছি,—বললেন পণ্ডিতমশায়,—দেখা যাক ঈশ্বরের কী ইচ্ছা। শোন আর এট্টা কথা।
—বলেন।
এবার জমি কিনবি তোগে দুই ভাইয়ের নামে।
তাই হয় নাকি?—প্রতিবাদ করে বলে ইন্দ্র—আপনি থাকতি...
আমার পালা সাঙ্গ হইয়ে গেছে। এবার থেকে তোদের পালা। আমি আর কদিন। না, না, আমারে আর জড়াসনে সম্পদের মধ্যি। —নিরাসক্ত গলায় বলেন পণ্ডিতমশায়।
তাহলে মায়ের নামে কেনা যায় না?—বলল রুনু।
—ঠিক, ঠিক। ঠিক কথা বলিছে রুনু। উনিই তো এ-বাড়ির গৃহলক্ষ্মী। আমি যেদিন থাকব না, সেদিন দেখবি উনিই তোদের সবদিক থেকে রক্ষা করবেন। এই ডাকাতির ব্যাপারেও তো দেখলি, ওনার কল্যাণেই আমরা লক্ষ্মীছাড়া হলাম না।
সেই কথাই সাব্যস্ত হয়ে গেল। মায়ের নামেই জমি কেনা হবে।
মাকে আর একবার প্রণাম করে রওনা হল ইন্দ্র।
ইন্দ্র চলে যেতেই রুনু আর একবার দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আর একটা স্বপ্ন ভঙ্গ হল ওর। কলকাতায় চুয়ার সঙ্গে এক বাসায় থেকে ওর আর পড়া হবে না এ জীবনে। বাড়ির কাছে কলেজ পেলে কি আর অতদূরে ওকে যেতে দেবেন বাবা?
তবু কথাটা একবার বলেছিল রুনু। পণ্ডিতমশায় এক কথায় খারিজ করে দিয়েছেন। কলকাতা নাকি অতিশয় খারাপ জায়গা। ওখানে পড়তে গিয়েই নাকি গোপালগঞ্জের কয়েকটা ভালো ছেলেই কুসংসর্গে পড়ে গোল্লায় গেছে। না, রুনুকে কুসংসর্গে পড়বার সুযোগ উনি দেবেন না। যদি নন্দনপুরে শেষপর্যন্ত বাড়ি করা যায়।
হাজার মনী বজরাখানা বায়না করে এসেছিল ইন্দ্র নন্দনপুর থেকে ফিরবার পথেই। জমির ব্যাপারটাও একেবারে পাকাপাকি করে এসেছে। হ্যাঁ, কিছু আম, কাঁঠাল, নারকেল-সুপারিগাছ সমেত প্রায় পাঁচ বিঘে জমিই পাওয়া গেছে দুশো টাকায়। ইন্দ্র অন্তত আড়াইশো পর্যন্ত দিতে প্রস্তুত ছিল। নন্দনপুর থেকে চিঠিতে জমির বর্ণনা দিয়ে পত্রযোগে পিতার সম্মতি নিয়েই জমির বায়না করেছে ইন্দ্র। এদেশ থেকে রওনা হবার দিনটিও বাবা জানিয়ে দিয়েছিলেন চিঠিতে। পঞ্জিকা দেখেই শুভদিন স্থির করেছিলেন পণ্ডিতমশায়।
নির্দিষ্ট দিনের আগের রাত্রেই এসে নোঙর করল বজরাখানা।
আজ দিনটি শুভ। সর্বসিদ্ধ শুক্লা ত্রয়োদশী। বিকেল তিনটের পরে মাহেন্দ্রক্ষণে যাত্রা করতে হবে।
সকাল থেকেই মালপত্র তোলা শুরু হয়ে গেল। মালপত্র তো কম নয়, তাইতো প্রয়োজন হয়েছে হাজার মনী বজরা।
চারপোতার চারখানা ঘর। তার মধ্যে পশ্চিমপোতার দোকানঘর অবশ্য ভাঙা হবে না। ওটা মালপত্র সমেতই বিক্রি হয়ে গেছে গিরিশ নগরের এক নমঃশুদ্র ব্যবসায়ীর কাছে। পণ্ডিতমশায়রা চলে গেলে সে নতুন করে এ দোকান চালু করবে তার এক বেকার ভাইপোকে দিয়ে।
আর তিনখানা ঘরই ভাঙা হচ্ছে চালগুলিকে যথাসাধ্য আস্ত রেখে। বড় ঘরখানার টিনের চাল, টিনের বেড়া। আর দুখানার টালির চাল এবং মুলিবাঁশের বেড়া। টালিগুলি খুলে তোলা হবে। টিনের চালগুলি আস্তই তোলা হবে। বেড়াগুলি যথাসম্ব আস্তই রাখা হবে। দরজা, জানলা, খুটি, আড়া ইত্যাদি কাঠের সরঞ্জাম খুলে খুলে তোলা হবে। দুজন মিস্ত্রি কাল থেকেই লেগে গেছে এই বাড়ি ভাঙার কাজে। মিস্ত্রি দুজন পণ্ডিতমশায়ের প্রাক্তন ছাত্র। গতবার পুরোনো বাড়ি ভেঙে আনার কাজ তারাই করেছিল। তারা একাজে অভিজ্ঞ। কথা হয়েছে তারাও যাবে এই সঙ্গে। নতুন দেশে গিয়ে তারাই আবার এইসব জোড়াতাড়া দিয়ে যত শীঘ্র সম্ভব ঘর তুলে দিয়ে আসবে।
সকাল থেকেই এ-বাড়িতে যেন একটা উৎসব শুরু হয়েছে। ঘর-দোর ভাঙা, মালপত্র বজরায় তোলা বাবদ পণ্ডিতমশায়ের এক পয়সাও খরচ নাই। বুনোপাড়া, জেলেপাড়া, মিয়াপাড়ায় ওঁর যত প্রাক্তন ছাত্র সবাই দল বেঁধে এসেছে ওদের গুরুমশায়ের প্রতি, যে গুরুমশায় সম্প্রতি যথা সর্বস্ব হারিয়েছেন ডাকাতের হাত, তাঁর প্রতি ওদের শেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে। কাজ করছে তারাই। কাজে হাত লাগিয়েছে পাঠশালার ছোট ছোট ছেলেরাও। সমস্ত ব্যাপারটা পরিচালনা করছে মালোপাড়ার একটি সদ্য বি.এ. পাশ করা ছেলে। নাম নকুল মালো। নকুল মালো ছিল অসাধারণ ভালো ছাত্র। পণ্ডিতমশায়ের পাঠশালা থেকে বৃত্তি পেয়েছিল জেলার মধ্যে প্রথম হয়ে। বৃত্তি পেয়েছিল ম্যাট্রিকেও। বি.এ. পাশ করার সঙ্গে সঙ্গেই কোথায় নাকি শীঘ্রই মুন্সেফ হতে যাচ্ছে। সেই ছেলে খালি গায়ে, কোমরে গামছা বেঁধে কুলির মতো খাটছে। কয়েকজন আবার মিস্ত্রিদের সাহায্যও করছে।
ওদের সমবেত চেষ্টায় দুপুরের আগেই ভারী মালপত্র সব বজরায় উঠে গেল। তিনটে পোতা শূন্য খা খা করছে তখন। এবার নকুনলই তার দলকে ছুটি দিল খেয়ে আসার জন্যে।
এখন এদিক সেদিকে পড়ে আছে কিছু টুকিটাকি মাল। এসব জিনিস মায়ের বুকের রক্ত। এগুলিকে উনি কাউকে হাত দিতে দেননি। ঠিক করেছেন ভিড় কমে গেলে এগুলি উনি নিজে হাতে তুলে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখবেন। নামাবেনও নিজে, যাতে এসব না এলোমেলো হয়ে যায়।
নকুলের দলটা চলে যেতেই ইন্দ্র আর রুনু নদীতে ঝপাঝপ দুটো ডুব দিয়ে এসে বলে, মা ওসব থুয়ে এখন খাতি দ্যাও।
অসম্ভব ক্লান্ত হয়ে পড়েছে ওরাও। বাজরার মধ্যে সমস্ত মালপত্র কায়দা করে সাজিয়ে রাখার কাজটা করছিল ওরা দুজনে। ওগুলিতো আবার ওদেরই নামাতে হবে। তাই কোনটা কোথায় রইল খেয়াল রাখছিল।
কাল থেকে এ সংসারের রান্নার কাজটা চলছে দোকান ঘরের এক কোণে। মা পণ্ডিতমশায়কে যথা সময়ে বাইরে হুঁকোটি হাতে ধরিয়ে দিয়ে এসে কাজে হাত দিয়েছেন। তিনি বললেন, তোগে ভাত বাড়ি রাহিছি। এ বেলাডা নিজিরা নিয়ে থুয়ে খাগে বাবা। আমি এগুলান এট্টু সামলায়ে...
ওর মধ্যি আছে কোন ঘোড়ার ডিম,—বিরক্ত গলায় বলে ইন্দ্র, —কতগুলি খালি শিশি-বোতল আর ভাঙা হাঁড়ি কুড়ি। ও ছাই গঙগায় বিসজ্জন দিতি পারো না? আর কত মায়া করবা।
জিনিসগুলি সত্যিই এমন মূল্যবান কিছু নয়। এটা আড়ায় গোটা পঁচিশ-তিরিশ ছোট-বড় শিকেয় ঝুলোনো থাকে জিনিসগুলি মায়ের শয়ন ঘরের এক ধারে। আগের বাড়িতেও ছিল। এ বাড়িতেও ছিল ঠিক আগের মতো করে সাজানো মায়ের বিছানার বাঁ-দিকের বেড়ার সঙ্গে একটা বাঁশের আগায়। ওর মধ্যে যে কী আছে, আর কী না আছে একমাত্র মা ছাড়া আর কেউ জানে না। সংসারে বাস করতে হলে ওর কোনওটাই ফেলে দেওয়া যায় না। ওর মধ্যেই রয়েছে মায়ের বীজ-ভান্ডার। লঙ্কা, বেগুন, পালং, ডাঁটা, লাউ, কুমড়ো, ঢ্যাঁড়স, পেঁপে ইত্যাদি সবজির বীজই শুধু নয়; হাঁড়ি-কলসিতে রয়েছে তিল, সরষে, বীজ সুপুরি এবং আরও যে কত কিছুর বীজ কে জানে! আবার কোনও শিশিতে রয়েছে শুয়োরের তেল, কোনও বোতলে রয়েছে কিছু সজারুর কাঁটা, (বুনোদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা, ওগুলি কাঁথা সেলাইয়ের কাজে ভারি প্রয়োজনীয়।) কোনোটায় দশ বছরের পুরোনো তেঁতুল, কোনটায় পুরোনো ঘি ইত্যাদি।
রুনুও মায়ের কাণ্ড দেখে বলে, কী হবে ওসব হাবিজাবি দিয়ে?
বলতে বলতে একটা ভাঙা হাঁড়ি কে লাথি দিয়ে ভেঙেই ফেলল। হায় হায় করে উঠলেন মা, কল্লি কি পোড়া মুহো। ওর মধ্যি রইছে মুড়ি ভাজা বালি। অমন বালি কি সব দ্যাশে পাওয়া যায়?
আবার বালিটুকু কুড়িয়ে আর একটা শূন্য হাঁড়িতে তুলতে শুরু করলেন মা। বোঝা গেল এ পর্ব শেষ না করে মা খেতে যাবেন না।
সারদিনের এত কর্মব্যস্ততার মধ্যে পণ্ডিতমশায় ছিলেন আশ্চর্য নির্বিকার। তিনি যেন এ-বাড়ির কেউ নয়। একজন আগন্তুক মাত্র। উদাস চোখে দেখছেন সমস্ত ব্যাপারটা, আর মাঝে মাঝে তামাক খাচ্ছেন ওঁর প্রিয় মোড়াটিতে বসে। সংসারটাকে দেখলেন তো উনি প্রায় এক শতাব্দী ধরে। এখানে কোনও কিছুই চিরকাল আঁকড়ে রাখা যায় না। যেখানেই মায়ার বন্ধন, সেখানেই হারানোর ভয়। মায়া যেখানে নেই, সেখানে হারানোর উৎকণ্ঠাও নেই। এই ডাকাতিটা ওকে একটা আশ্চর্য অভিজ্ঞতা দান করেছে।
যাত্রার লগ্ন এবার আসন্ন।
ছেলেরা এবং গৃহিণী শেষবারের মতো চারিদিকটা দেখে নিচ্ছেন। শ্রীনাথ পণ্ডিত শেষবারের মতো দেখে নিচ্ছেন তার আয়ুর্বেদ গ্রন্থখানা, ভারী একটা উৎকণ্ঠা ওঁর বুকে কাঁটার মতো বিঁধছে কদিন যাবৎ। নগরবাসীর বউকে প্রায় তিন মাস ধরে উনি চিকিৎসা করছেন। কিন্তু আশানুরূপ উন্নতি হচ্ছে না। সকালেবেলায় একসময় বউটা ওঁকে বিদায় প্রণাম জানতে এসে হাউ হাউ করে কেঁদে পড়েছিল। বলেছিল, পণ্ডিত তুই চলি যাবি, হামি মরি যাব। তুর মতো আর তো কেউ বিনি পয়সায় ওষুধ না দিবেক।
—ভয় নাই মা, আমি তোকে এবার এমন ওষুধ দিয়ে যাব, যাতে তুই একদম ভালো হয়ে যাবি।
কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেও আবার কেঁদে পড়েছিল প্রৌঢ়া রুগ্না বউটি।
সেই থেকেই কয়েকবারই খুলে বসেছিলেন আয়ুর্বেদ গ্রন্থখানা। কিন্তু সব লক্ষণ মিলিয়ে ঠিক মতো দাওয়াইটির সন্ধান পাচ্ছিলেন না। তখন বাড়ির মধ্যে একটা হট্টগোল চলছিল। এখন নিরালায় অশ্বত্থ গাছের ছায়ায় মোড়াটি পেতে আবার চলছিল সেই সন্ধান। হঠাৎ একসময় প্রায় চিৎকার করে ডাকলেন ইন্দ্রকে।
কী বাবা, আমারে ডাকলেন?—ডাক শুনে ছুটে এসেছে ইন্দ্র।
—দশটা টাকা দিবি বাবা?
হঠাৎ এসময়ে বাবার দশটা টাকার কী দরকার হল বুঝতে না পেরে ইন্দ্র প্রশ্ন করে, কেন?
ইতিমধ্যে আবার ডাক পড়ল রুনুর।
—এক্ষুণি যা তো বাবা, নগর কিংবা তার বউ যারে বাড়ি পাস, ডাকে আন।
ইন্দ্র ভাবল, হয়তো দীর্ঘদিনের অকৃত্রিম সেবক নগরবাসীকে এ টাকাটা বাবা বকসিস দিতে চান। তাড়াতাড়ি সে একখানা দশ টাকার নোট দিল বাবার হাতে।
নগরবাসীকে ডাকতে যেতে হল না। চোখ তুলতেই দেখা গেল কড়া প্রহরীর মতো সে বসে আছে বজরায়। পণ্ডিতের বাড়ি ডাকাতি হবার পর থেকে এ সংসার কাউকে। আর সে বিশ্বাস করে না। মাঝিদেরই বা বিশ্বাস কি?
রুনুর ডাকে নগরবাসী নেমে এল। এতক্ষণ সে এদিকে পিছন ফিরে উদাস চোখে দেখছিল নিষ্ঠুরা মধুমতীকে, আর নির্বাক আকাশখানাকে। এই শূন্য বাড়িটার দিকে সে তাকাতে পারছিল না।
পণ্ডিতমশায়ের কাছে এসে সে আর আবেগ সামলাতে পারল না। একেবারে ধড়াস করে ওঁর পায়ের উপর পড়ে বুক ফাটা কান্না জুড়ে দিল। সে কান্না আর থামে না।
পণ্ডিতমশায়ও চোখ মুছলেন কাপড়ের খুঁটে। খানিকপরে ওকে হাত ধরে তুলে, সেই হাতের উপর দশটা টাকা দিলেন।
ইন্দ্র বলল, বাবা তোমারে বকসিস দেলেন নগর কাকা।
না, না, না। তোর টাকা হামি নাই লিব। না, না, না...আর্তনাদ করে ওঠে নগরবাসী।
শ্রীনাথ পণ্ডিত ওর কাঁধে হাত রেখে বলেন, নগর, তোকে আজ বকসিস দিয়ে আর ছোট করব না বাবা। তোকে আমি...তোদের আমি ভুলব না কোনোদিন। শোন, এই কাগজে আমি ওষুধের নামডা লেখে দিচ্ছি। তুই কালই গোপালগঞ্জ যাইয়ে শক্তি ঔষধালয় থেকে আমার নাম করে ওষুধটা আনবি। প্রতিদিন সকালে, দুপুরে, রাত্রে তিন মাত্রা করে নিয়মিত খাওয়াবি বউমারে। দেখবি দিন পনেরোর মধ্যিই মা আমার ভালো হয়ে যাবে। এতে একমাসের ওষুধ পাবি। ভালো হয়ে গেলিও একমাস নিয়মিত খাওয়াবি।
—না, না, ওষুধ আর নাই লাগবেক। উ এবার মরবেক।
—ছিঃ, ও কথা বলতি নাই। বউমা তোর ঘরের লক্ষ্মী। আমি প্রাণভরে আশীর্বাদ করলাম। বউমা ভালো হয়ে যাবে।
নগরবাসী তখনও কাঁদছিল। এমন সময় দূর থেকে সোরগোল শোনা গেল। রাস্তা থেকেই দেখা গেল বিশাল এক জনতা নকুল মালোর নেতৃত্বে এগিয়ে আসছে এদিকে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের রাস্তা দিয়ে।
দেখতে দেখতে মিছিলটা পৌঁছে গেল পণ্ডিতমশায়ের বাড়িতে।
দেখা গেল, নকুল মালোর হাতে একখানা নতুন কাঁসার থালার উপর সুন্দর করে সাজানো এক জোড়া নতুন ধুতি ও একখানি উত্তরীয়। তার উপর একটি ফুলের মালা।
তার পেছনে তার সদ্য বিবাহিত কিশোরী বধূ। তার হাতেও অনুরূপ একখানা কাঁসার থালার ওপর একটি রুপোর সিঁদূরের কৌটো, এবং এক গাছি ফুলের মালা।
একটি থালা পণ্ডিতমশায়ের পায়ের কাছে, ও দ্বিতীয় থালাটি গুরুমায়ের পায়ের কাছে রেখে তারা প্রণাম করল। জেলেপাড়ার দুটি পাঠশালার ছাত্র মালা দুটি পরিয়ে দিল ওঁদের গলায়। তারপর শুরু হল প্রণামের পালা।
ছেলেপাড়ার ছেলে-মেয়ে, বুড়ো-বুড়ি কেউ বোধহয় বাকি ছিল না। আসবার পথে মিয়াপাড়া, জোলাপাড়া, বুনোপাড়ার ছেলেরাও যোগ দিয়েছিল দলে।
নকুল মালো ছোটখাটো একটা বক্তৃতাই দিয়ে ফেলল। কলকাতার কলেজে পড়া ছেলে। এসব আধুনিক প্রথার সম্বর্ধনা ইত্যাদি ওরা বোধহয় সেখানেই দেখেছে-টেখেছে। পণ্ডিতমশায় এসব জানতেনও না। প্রস্তুতও ছিলেন না। ব্যাপারটার আকস্মিকতায় উনি একেবারে অভিভূত হয়ে গেছেন।
'স্বদেশে পূজ্যতে রাজা, বিদ্বান সর্বত্র পূজ্যতে'—একথা আপনার মুখ থেকেই শিখেছি আমরা। সেই কথাই আজ আমাদের অন্তরের কথা। দীর্ঘকাল ধরে এদেশে অসংখ্য মানুষের পূজা আপনি পেয়েছেন। যে দেশে যাচ্ছেন, সে দেশেও যেন এমনি করে সমস্ত মানুষের পূজা পান, এই কামনা করি। যাবার আগে আমাদের আর্শীবাদ করে যান, আমরা যেন আপনার আদর্শকে ধরে রাখতে পারি।—ইত্যাদি অনেক বড় বড় কথা বলল নকুল মালো। সব শেষে বলল, আমাদের একমাত্র অনুরোধ, আমাদের ভুলে যাবেন না। এবার আমরা আপনার মুখ থেকে দুটি কথা...
অনেকক্ষণ ধরে শ্রীনাথ পণ্ডিত একটা কথাও বলতে পারছেন না। একটা অভাবনীয় আবেগে তাঁর যেন কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে গেছে। শেষে কাঁপা গলায় কেবল বলতে পারলেন, তোদের ভুলব! তোরা যে আমার সমস্ত বুকটা জুড়ে আছিস। এই সব সোনা-সোনা কচি মুখ...আর দেখতি পাব না...
কান্নায় ভেঙে পড়লেন শ্রীনাথ পণ্ডিত।
হাজার মনী বজরাখানা আট দাঁড়ের টানে মন্থর গতিতে এগিয়ে চলেছে দক্ষিণ দিকে। শেষদিকে ওই অনুষ্ঠানটার জন্য যাত্রা করতে একটু দেরি হয়ে গেল। সূর্য যখন ঠিক পাটে বসেছেন মধুমতীর ওপারে, মাঝিরা গেরাফী তুলল ঠিক তখনই। তীরে তখন সারা গ্রামের প্রায় হাজার খানেক মানুষ দাঁড়িয়ে আছে সাশ্রু নেত্রে। নগরবাসী আর তার বউ তো একেবারে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েছে। তাদের বুঝি দাঁড়াবারও শক্তি নেই। তাদের চোখের জল গড়িয়ে গড়িয়ে হয়তো মিশে যাচ্ছে মধুমতীর স্রোত ধারার সঙ্গে। অনুসরণ করছে বজরাখানাকে। তীরের দিকে তাকিয়ে আশীর্বাদী হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছেন পণ্ডিত মশায়। তাঁর চোখেও জল।
চোখে জল আজ ইন্দ্ররও। সে তাকিয়ে আছে তার বুকের রক্ত দিয়ে গড়ে তোলা দোকান ঘরখানার দিকে। এ জীবনে আর কি এমন একটা দোকান গড়া যাবে? কে জানে কী লেখা আছে ওর ভবিষ্যতে?
রুনুর চোখের জলও অবিরল ধারায় মিশে যাচ্ছে মধুমতীর বুকে। ওর বেদনাটা কেউ বুঝবে না। ওর বুক ফেটে যাচ্ছে একটা অসহ্য বিচ্ছেদ বেদনায়। এই মধুমতীর তীরে কত সকাল, সন্ধ্যার আনন্দ, শিহরণ, কত ভালোবাসার স্মৃতি। মুঠো মুঠো ভালোবাসার স্মৃতি ছড়িয়ে আছে ওর বাড়ি থেকে পাঠশালায় যাবার পথটুকুতে, সুশীলাদির সেই ছোট্ট কুঁড়ে ঘরখানার কোণে কোণে, আর হরেকেষ্টদের ছোট্ট ঘরখানা ঘিরে।...আবার গোপালগঞ্জের সেই ডাক্তারবাবুর বাড়িতে সেই পাঁচ বছরের কত মায়াময় স্মৃতিময় দিনগুলি! সবশেষে বাজুনিয়া, খোকাদা, শৈলদি, চুয়া, ঠাকুমা। গোবরা, গোপালগঞ্জ, বাজুনিয়া এই নিয়েই ছিল ওর এই ষোলো বছর জীবনের পৃথিবীটা। সেই পৃথিবী থেকে বিচ্যুত হয়ে কোন গ্রহান্তরের পথে আজ যাত্রা করল রুনু? এই পুরাতন পৃথিবীতে আর কি কোনও দিন ফিরে আসতে পারবে ও!
এই যে একটা গৃহহারা পরিবার ভেসে চলল মধুমতীর ভাটির টানে, কে জানে কতদিনে কোথায় হবে এদের পুনর্বাসন। রুনুর বুকের মধ্যে কেবল একটি শব্দই বারে বারে ধ্বনিত হচ্ছে—বিদায়, বিদায়, এতদিন ধরে যাদের চিনেছি, যাদের ভালোবেসেছি, তাদের সবার কাছ থেকেই বিদায়, চিরবিদায়।
শারদীয়া কিশোর ভারতী ১৯৭৭
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন