ঘর ছাড়া রুনু

শ্যামদাস দে

এক

সকাল দশটায় গোবরার ঘাট থেকে ছেড়েছিল ছোট্ট ডিঙিখানা ছোট্ট রুনুকে বুকে নিয়ে। সারাটা দিন কেটেছে নৌকায়। কত গ্রাম পার হয়ে, কত নদী নালা খাল বেয়ে কত দূর যে চলে এসেছে ওরা—রুনুর ভূগোল-পড়া বিদ্যায় মনে হচ্ছে বুঝি উত্তর মেরুর কাছেই চলে এসেছে ওরা। তখন সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হয়ে গেছে।

'ওই যে ঠাকুরবাড়ির ঘাট। ওই ঘাটে ডিঙি ভিড়োও নগরবাসী।' বলতে বলতে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন শ্রীনাথ পণ্ডিত।

একটু বাদেই ছায়া-ছায়া অন্ধকার ঢাকা গাছপালা ঘেরা একটা টিনের ঘর চোখে পড়ল রুনুর। নগরবাসী ডিঙি ভেড়াল সেই বাড়ির ঘাটে। বাড়িটা ঠিক খালের পাড়ে নয়। খাল থেকে একটা সরু নালা গিয়ে মিশেছে একটা পুকুরে। সেই পুকুরপাড়েই গাছের গুঁড়ি-পাতা ঘাটে এসে ভিড়ল ডিঙিখানা।

মালপত্র মাথায় তুলে নিল নগরবাসী। সুশীলাদির দেওয়া মোয়ার হাঁড়িটা কিন্তু হাতছাড়া করেনি রুনু। ও-জিনিস ও হাতছাড়া করতে পারে? ওর মধ্যে যে রয়েছে একটা আশ্চর্য সম্পদ! দুপুরের দিকে পণ্ডিতমশাই যখন ঘুমিয়েছিলেন, রুনুকেও বারবার বলেছিলেন ঘুমোতে তাঁর পাশে। কী সর্বনাশ, বাবার পাশে ঘুমোবে রুনু! এত সাহস ওর হবে না এ জীবনে কোনও দিন। তাছাড়া ঘুম তো এলই না ওর চোখে। ও সারাপথ চোখ মেলে মেলে কেবল দেখেছে। দেখেছে ছবির পর ছবি। একটা দিনেই যেন ওর পৃথিবীটা অনেক বড় হয়ে গেল। দেখতে দেখতে একসময় বাড়ির কথাও ভুলে গেছিল। বিকেলে একসময় ক্ষুধার্ত বোধ করতে খুলেছিল মোয়ার হাঁড়িটা, আর তখনই তো আবিষ্কার করল সেই সম্পদ। হাঁড়ির মধ্যে ভাঁজ করা একখানা কাগজ। ভাঁজ খুলতেই তার ভেতর দেখা গেল চকচকে একটা টাকা। ওরে বাবা, আস্ত একটা টাকা! তারপর আরও বিস্ময়। কাগজখানা একটা চিঠি। সে চিঠি লিখেছে সুশীলাদি রুনুকে। সুশীলাদির গোটা গোটা অক্ষর দেখেই মনে পড়ে গেল সমস্ত পাঠশালার ছবিটা। দু-চোখ ভরে এল জলে। মোয়া খাবার কথা আর মনেও পড়ল না। মাত্র এক লাইনের চিঠি। রুনুর জীবনের প্রথম চিঠি! কত বার যে পড়ল চিঠিখানা। ফোঁটা ফোঁটা চোখের জলে ভিজে গেল চিঠিখানা। কত বার যে স্পর্শ করল টাকাটা। আস্ত একটা টাকা ও এই প্রথম স্পর্শ করল রুনু। এ টাকা ও কাউকে ছুঁতে দেবে না, ছুঁতে দেবে না এ চিঠিও। ভালো করে আবার হাঁড়ির মুখ বেঁধে রেখেছিল রুনু। সেই হাঁড়ি ও নিল নিজ হাতে।

কী লিখেছে সুশীলাদি?

'এই টাকাডা দিয়া মিষ্টি কিনিয়া খাইও। দুঃখী দিদিকে ভুলিও না।'

ইশ ভুলবে! এ জীবনে রুনু কোনওদিন ভুলবে না সুশীলাদিকে।

উঠোনে দাঁড়িয়ে হাঁক দিলেন পণ্ডিতমশাই, 'সোমনাথ বাড়ি আছ?'

গলা পেয়েই একসঙ্গে দুটি মানুষ বেরিয়ে এলেন ঘর থেকে। চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বছরের একটি সুপুরুষ এবং তার পাশে লক্ষ্মীপ্রতিমার মতো একটি বধূ। পুরুষটি ছুটে এসে উঠোনেই প্রণাম করলেন শ্রীনাথ পণ্ডিতকে। বধূটি হারিকেন হাতে দাঁড়িয়ে রইলেন বারান্দায়।

'নিয়ে আলাম সোমনাথ, আমার শ্রীমানরে তোমাদের আশ্রয়ে।' কথা বলতে বলতে সোমনাথকে সস্নেহে আলিঙ্গন করলেন শ্রীনাথ পণ্ডিত। তার কাঁধে হাত রেখেই উঠলেন বারান্দায়। তখন হারিকেন রেখে পণ্ডিতমশাইকে প্রণাম করলেন সেই বধূটি।

'থাক থাক মা, তোমরা হলে বর্ণ-শ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণ, তোমাদের প্রণাম নিলি পাপ হয়। সুখে থাকো মা। কই আমার দাদুরা কোথায়?'

'অরা করের বাড়ি গ্যাছে হরির লুটে। অখনই আইয়া পরবে।'

ভারি মিষ্টি গলায় কেমন যেন এক নতুন ভাষায় কথা বলল বধূটি। রুনু বোকার মতো তাকিয়ে আছে বধূটির দিকে।

'তোমার বউদিকে প্রণাম করো রুনু।'

হাঁড়ি একধারে নামিয়ে রেখে প্রণাম করল রুনু, কল্যাণীকে। প্রণাম করল সোমনাথকেও। কল্যাণী সস্নেহে কোলের কাছে টেনে নিল রুনুকে,—'আহা, অরে বুঝি সারাদিন না খাওয়াইয়া রাখছেন? মুকখান যে একেবারে শুকনা। আও রুনু, হাতমুখ ধুইয়া দুগা খাইয়া লও। আপনেও হাত-মুখ ধুইয়া আহ্নিক সাইরা লন, আমার রান্না হইয়া গেছে।'

'এরই মধ্যে রান্না হল কখন?' প্রশ্ন করেন পণ্ডিতমশাই।

'উনি তো কইলেন দুফরের দিকেই আইবেন ভোরে রওনা হইয়া।'

'আমরা তো তাই ভাবিছি।' বললেন সোমনাথ, 'কখন রওনা হইছিলেন?'

'তা ধরো দশটা-সাড়ে দশটা। খাওয়া-দাওয়া করেই রওনা হলাম যে।'

'বেশ করছেন! আমি সারা দুফর বইয়া রান্দলাম!' মুখ ভার করে বলেন কল্যাণী।

'আমরা সারা রাত ধরে খাব।' হাসতে হাসতে বলেন পণ্ডিতমশাই।

হাসিমুখে রুনুর হাত ধরে ঘরে ঢুকলেন কল্যাণী। যেতে যেতে বললেন, 'আপনারা দুই পণ্ডিতে বইয়া গল্প করেন, আমি অরে দুগা খাইতে দেই।'

প্রায় বারো হাত উঁচু মাটির পোতা। তার উপর মুলি-বাঁশের বেড়া দেওয়া টিনের ঘর। ঘরের মধ্যে। দুখানা কোঠা। বারান্দার এক কোণেও ছোট্ট একটা কোঠা। সেই কোঠায় বসেই এতক্ষণ কথা হচ্ছিল। বউদির সঙ্গে ঘরে গিয়ে রুনু এক কোণে বউদির নির্দেশমতো তার সুটকেস বিছানা আর মোয়ার হাঁড়ি গুছিয়ে রাখল। তারপর বউদির পেছনে-পেছনে চলল গা-ছমছম অন্ধকার একটা পথ দিয়ে পুকুরঘাটে হাতমুখ ধুতে।

অস্পষ্ট অন্ধকারে পুকুরের কালো জল চিকচিক করছে। হাজারো তারার ছায়া ঝিকমিক করছে জলের উপর। কোথায় যেন কি একটা পাখি ডাকছে। ডাকছে অসংখ্য ঝিল্লি। জলের মধ্যে মাছেরা টুপটাপ শব্দ করছে। সব অচেনা শব্দ। কেমন ভয়ভয় করে রুনুর। ওদের গ্রামের অন্ধকারটা তো এত ঘন নয়। হঠাৎ বউদির হাতের টিমটিমে মাটির প্রদীপটা দপ করে নিবে গেল। একেবারে অন্ধকারের সমুদ্রে ডুবে গিয়ে ভয়ার্ত চিৎকার করে উঠল রুনু। দুহাতে সজোরে জড়িয়ে ধরল বউদিকে।

'কী ভীতু পোলা রে বাবা! ওগো শুনছ, আলোটা দেখাও একটু।' বলতে বলতে খিলখিল করে হেসে উঠলেন বউদি।

বারান্দা থেকেই হারিকেনটা উঁচু করে ধরলেন সোমনাথ।

গাছের গুঁড়িপাতা ঘাট থেকে হাত-পা ধুয়ে এল রুনু।

রাত্রে খেতে বসে পরিচয় হল সোমনাথবাবুর দুই ছেলের সঙ্গে।

পণ্ডিতমশাই বললেন, 'এই তোমার দুটি ভাই রুনু। এদের তুমি পড়াবে।'

'ভাই হইব ক্যান,' হেসে বলেন বউদি, 'অরা রুনুরে ডাকব কাকু বইলা। আমি বউদি হইলে...'

ঘর-ফাটানো হাসি হেসে পণ্ডিতমশাই বলেন, 'ভুল ধরেছ ঠিকই, কিন্তু দেখতি তিনটিরে ঠিক আপন ভাই-এর মতো না কি? বউদি বলুক আর যা-ই বলুক, তুমি হবা রুনুর মা-র মতো। কী নাম রাখিছ ছেলেদের?'

'বডডিরে ডাকি দিপু, ছোটটি নিপু।' বললেন কল্যাণী।

'ভালো নাম দীপেন্দ্র আর নৃপেন্দ্র।' বললেন সোমনাথ।

'চমৎকার নাম হইছে।' বললেন শ্রীনাথ পণ্ডিত।

'এক পণ্ডিতের রাখা নাম, আর-এক পণ্ডিত তো ভালো কইবেনই।' হাসতে-হাসতে বলেন বউদি।

রাত্রে খেতে বসে দেখল রুনু, ওর আর ওর বাবার ঠাঁই হয়েছে আলাদা, একটু দূরে। খাওয়া শেষ হতে দেখল, ওই শীতের মধ্যেই বউদি ওদের বাসন ধুয়ে ঘাট থেকে স্নান করে এল কাঁপতে কাঁপতে।

কল্যাণীকে ওই অবস্থায় আসতে দেখে পণ্ডিতমশাই বললেন, 'আজ রাতটা একটু কষ্ট হল মা। কাল থেকে রুনুই পারবে। ওরে সব শিখোয়-টিখোয় দিছি।'

হ্যাঁ, সে সব তালিম পথে পথেই দিয়েছেন পণ্ডিতমশাই। সোমনাথরা ব্রাহ্মণ, রুনুরা কায়স্থ। ব্রাহ্মণের বাড়িতে কায়স্থের এঁটো বাসন কায়স্থকেই ধুতে হয়। না হলে কায়স্থের পাপ হয়। থালা-বাসন ধুতে অবশ্য রুনুর খুব আপত্তি নেই, কিন্তু কায়স্থ-ব্রাহ্মণের এই তফাতটা ওর শিশুমনে একটা দাগ কেটে দিল যেন। আরও শুনেছে রুনু, প্রায় তিরিশ বছর পূর্বে এই সোমনাথ শ্রীনাথ পণ্ডিতের পাঠশালায় পড়েছে। তখন পাঠশালা করতেন তিনি এ-দেশেই। বাজুনিয়ারই লাগোয়া গ্রাম ভোজেরগাতীতে ছিল সে পাঠশালা। আজও আছে সে পাঠশালা। এখন সেখানে অন্য পণ্ডিতমশাই। সে পণ্ডিতমশাইও নাকি ছিলেন একদা শ্রীনাথ পণ্ডিতেরই ছাত্র।

রাত্রে রুনুর শোবার ব্যবস্থা হল দিপুর সঙ্গে। পণ্ডিতমশাই রইলেন বারান্দার সেই ছোট খোপে আর ঘরের মধ্যে অন্য দিকে আর-এক খাটে শুয়েছেন নিপুকে নিয়ে বউদি আর সোমনাথ।

এই খাটে দিপু শোয় তার ঠাকুমার সঙ্গে। ঠাকুমা আজ বাড়ি নেই। তিনি বেড়াতে গেছেন তার এক মেয়ের বাড়ি পাশের গ্রামে। তাই আজকের মতো দিপুর সঙ্গেই রুনুর শোবার ব্যবস্থা হল।

ওইটুকু ছেলে দিপু একটু পরেই বেশ নাক ডাকতে শুরু করল, কিন্তু ঘুম নেই আজ রুনুর চোখে। পরিষ্কার বিছানা। মোটা লেপের তলে উত্তপ্ত আরাম, অথচ কোথায় পালিয়ে গেল রুনুর ঘুম। বিছানায় একটা অচেনা গন্ধ। বিশ্রী গন্ধ। তার চেয়ে ওর নিজের ছোট্ট বিছানায় শুলে হয়তো ঘুম আসত সহজে। কিন্তু সে বিছানা যে খুলতেই দিল না আজ বউদি। ও সব নাকি কাল রোদে দিয়ে, গঙ্গাজলের ছিটে দিয়ে তবে ব্যবহার করা যাবে।

হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ায় একেবারে ঘেমে উঠল রুনু। কী সর্বনাশ! ওর সেই মহাসম্পদই যে অরক্ষিত রয়ে গেছে। সুশীলাদির সেই চিঠি, সেই টাকা। যদি বউদি দেখে ফেলে সেই চিঠি? কী যে সর্বনাশ হবে কে জানে!

আর-এক দুশ্চিন্তা ওর দাদার কথা ভেবে। বরাবর দাদার সঙ্গে এক বিছানায় শুয়েছে রুনু। আজ একা একা শুয়ে আছে দাদা। দাদারও নিশ্চয় ঘুম আসছে না আজ রুনুর কথা ভেবে। সকালে যখন চলে আসে রুনু, সবাই এসেছিল ঘাটে, কেবল দাদা আসেনি। দাদার যে এবার খুব দুঃখ, খুব লজ্জা হয়েছে! কাউকে মুখ দেখায় না দাদা। এবার যে ফেল করেছে দাদা। রয়ে গেল ক্লাস সিক্স-এ। কিন্তু কেবল সেই দুঃখেই কি আসেনি দাদা? না, না, দাদার আরও দুঃখ আছে, রুনু বিদেশে চলে যাবে সেই দুঃখ।

মনে পড়ছে হরেকেষ্টকেও। আহা, হরেকেষ্ট যদি বৃত্তি পেত, তবে তো রুনুর সঙ্গে বাজুনিয়া স্কুলেই পড়ত। থাকত রুনুর সঙ্গে এই বাড়িতেই। কী যে মজা হত তাহলে! যা হলে ভালো হত, তার কিছু হয় না রুনুর কপালে।

মনে পড়ছে সুশীলাদিকে। আচ্ছা সুশীলাদিও কি এখন শুয়ে শুয়ে রুনুর কথা ভাবছে? মুহূর্তে রুনুর মন চলে গেল সুশীলাদির সেই ছোট ঘরে। ও যেন শুয়ে আছে সুশীলাদিরই পাশে। মনে মনে ঠিক করল কালই ও একখানা চিঠি লিখবে সুশীলাদিকে। কী লিখবে? মনে মনে একের পর এক চিঠি লিখতে লিখতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়ল রুনু।

কিন্তু না, ঘুমোয়নি তো। ঘুমোলে এমন পরিষ্কার সব দেখা যায় নাকি? ওই তো দেখা যাচ্ছে ওদের পাঠশালে যাবার রাস্তাটা, পথের দু-ধারে সেই আম, জাম, কুল, বকুল গাছ...ওই তো সাদা পাল তুলে কত নৌকা চলেছে মধুমতীর বুকে দাগ কেটে কেটে...আহা কী সুন্দর সেজেছে আজ সুশীলাদি ঠিক যাত্রাগানের রানির মতো, মধুমতীর পার দিয়ে কোথায় চলেছে...রুনু পাখির মতো হাওয়ায় ভেসে ভেসে যাচ্ছে। ঝিলমিল আকাশ দিয়ে উড়ে যাচ্ছে রুনু নদীর ওপারের সেই ধু-ধু বালুচরটার দিকে...ওপার থেকে ভেসে আসছে সেই পূজামণ্ডপের গুড় গুড় বাজনাটা। সব শুনতে পাচ্ছে রুনু, সব দেখতে পাচ্ছে। ও নিশ্চয় ঘুমোয়নি।

দুই

মাত্র দুটি দিন বাজুনিয়ায় থেকে, রুনুকে বাজুনিয়া মাইনর স্কুলে ভরতি করে দিয়ে শ্রীনাথ পণ্ডিত চলে গেলেন। স্কুলের হেডমাস্টার মশাইয়ের সঙ্গে শ্রীনাথ পণ্ডিতের পূর্ব-পরিচয় ছিল। এদেশে পণ্ডিতমশাইয়ের আর-একটা পরিচয়ও আছে—ওস্তাদজি। যৌবনে তো এদেশেই কাটিয়েছেন, তখন গাইয়ে রূপেই তাঁর খ্যাতি ছিল বেশি। এখন অবশ্য গান প্রায় ছেড়েই দিয়েছেন।

বৃত্তি পাওয়া ছেলে রুনুকে পঞ্চম শ্রেণিতে ভরতি করতেও একটু বেগ পেতে হল, কারণ ইংরাজির বিদ্যা যে ওর ফার্স্টবুকের ঘোড়ার গল্প পর্যন্ত।

যাবার সময় নৌকায় উঠেও রুনুকে বললেন পণ্ডিতমশাই, 'ইংরাজিটা খুব যত্ন করে পড়বি রুনু, মাইনরেও বৃত্তি পাওয়া চাই।'

এসব উপদেশ এখন আর কানে যাচ্ছে না রুনুর। ডিঙিখানা যে এখনই ছেড়ে দেবে নগরবাসী। সোমনাথবাবুও চলেছেন এই সঙ্গে। তিনি বরিশাল জেলার জেলা স্কুলের শিক্ষক। তাঁর স্কুলও খুলে গেছে কয়েক দিন আগেই। অপেক্ষা করছিলেন কেবল পণ্ডিতমশাইয়ের জন্যে। স্কুল খুলে গেছে শ্রীনাথ পণ্ডিতেরও। নতুন বছর শুরু হচ্ছে। ছাত্রদের বই কেনা, বছরের হিসেবপত্র ঠিক করা, নতুন খাতাপত্র তৈরি করা—এখন যে অনেক কাজ!

বিদায় নেওয়া হয়ে গেছে। প্রণাম পর্ব চুকে গেছে। ঘাটে দাঁড়িয়ে আছে দিপু, নিপু, রুনুর সঙ্গে বউদিও। গ্রীষ্মের ছুটিতে যখন আসবেন সোমনাথবাবু, তখন দিপু- নিপুর জন্যে কী কী আনবেন তার ফর্দটা আবার শুনিয়ে দিলেন সোমনাথবাবু। কিন্তু আর কি কেউ আসবে রুনুর জন্যে কিছু নিয়ে কোনও দিন? তেমন কোনও কথা তো বলছেন না শ্রীনাথ পণ্ডিত। তাঁর কেবল পড়ার কথা। বুকটা ফেটে যাচ্ছে রুনুর।

নৌকাটা ধীরে-ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে ছোট খাল দিয়ে দক্ষিণ দিকে। তারপর ওই ভোজেরগাতীর কাছে গিয়ে পড়বে বড় খালে। তারপর সেই দীর্ঘ পথ বেয়ে-বেয়ে আবার পৌঁছে যাবে গোবরার ঘাটে।

একাকী ঘাটে দাঁড়িয়ে আছে রুনু। কখন সে দিপু-নিপু ওরা চলে গেছে, কখন যে অদৃশ্য হয়ে গেছে ডিঙিখানা ওর খেয়ালও নেই। ওর কল্পনার ডিঙি দূর প্রান্তরের ওই ধোঁয়ার প্রাচীরটা ডিঙিয়ে, আকাশের ওপারে সেই সূর্য ডোবা মধুমতীর রাঙা জলের উপর দিয়ে ভেসে চলেছে। মনে-মনে রুনুও পৌঁছে গেছে গোবরার ঘাটে ওর অবাধ্য চোখের জলে মনের ডিঙি ভাসিয়ে দিয়ে।

আজ রাত্রেও শুয়েছে রুনু দিপুর পাশেই সেই ঠাকুমার বিছানায়। দুদিনেই দিপু-নিপুর সঙ্গে ভাব হয়ে গেছে রুনুর। কেটে গেছে বেদনার অস্বস্তিটাও।

ওপাশের কোঠায় শুয়েছেন বউদি নিপুকে নিয়ে। পাশাপাশি দুখানা কোঠা। মাঝের দরজাটা খোলাই থাকে। দরজার পাশে ও-কোঠায় রয়েছে ডিম করা হারিকেনটা। শুয়ে-শুয়ে গল্প হচ্ছে। ওঘরে-এঘরে কথা বলছে রুনু আর বউদি। টুকরো-টুকরো কথার ভিতর দিয়ে পরস্পরের পরিচয় নিচ্ছে দুটি অচেনা মানুষ। প্রথমেই রুনুর ভুলটা সারিয়ে দিলেন বউদি।

'তুমি তো ভারি বোকা। দিপু-নিপু যদি তোমারে দাদা ডাকে, তয় তুমি আমারে বউদি ডাকো কি বলে?'

'কী বলে ডাকব তাহলে?' রুনুর সরল প্রশ্ন।

'তুমি ডাকবা কাকিমা।'

'আচ্ছা।' এক কথায় রাজি রুনু।

কথায়-কথায় কত রাত হল খেয়াল নেই কারও। দিপু-নিপু ঘুমিয়ে পড়েছে অনেকক্ষণ।

রুনু শুনল বরিশাল শহরের কাছেই কীর্তনখোলা নদীর তীরে অসংখ্য নারকেল-সুপারি বাগান ঘেরা একটি পল্লীগ্রামের কথা। সেই গ্রামের মেয়ে কাকিমা। আগে নাকি প্রায়ই যেতেন বাপের বাড়ি। এখন আর যাওয়া হয় না। রুনুকে একবার নিয়ে যাবেন তার বাপের বাড়ি, সে কথাও বললেন কাকিমা।

রুনুও বলল তাদের আম-কাঁঠালের বাগান ঘেরা বাড়ির কথা। মধুমতীর ইলিশ আর ছোটগাঙের উজোনে মাছের কথা। বলল দাদা, হরেকেষ্ট আর সুশীলাদির কথা। কিন্তু প্রাণ গেলেও বলবে না ও সেই টাকা আর চিঠির কথা। কালই ও এক ফাঁকে ওর সেই মহাসম্পদ তুলে রেখেছে ওর সুটকেসে। তারপর হাঁড়িটা নিজেই সগর্বে এগিয়ে দিয়ে বলেছিল, 'এই দেখুন আমার সুশীলাদি কত মোয়া বানিয়ে দিয়েছে।' দিপু নিপুকে নিয়ে সবাই মিলে সেই মোয়া খেয়েছে ওরা। খেয়েছে কাকিমাও।

এক সময়ে ঘুমিয়ে পড়লেন কাকিমা। ডেকে আর সাড়া পেল না রুনু। হঠাৎ কি একটা থমথমে ভয়ে কেঁপে উঠল রুনু। এত বড় বাড়িটায় ও একা জেগে। সেই উৎকট পাখিটা আবার ডাকতে শুরু করেছে। খাটের কাঠ কুটুর কুটুর করে কেটে চলেছে কি একটা পোকা। হতভাগা পোকাটা কি থামবে না? থামবে না ওই বিশ্রী পাখিটাও? এত শব্দ হলে কেউ ঘুমোতে পারে? অথচ সবাই তো ঘুমোচ্ছে।

ওই পাখিটা তো এক সময় ঘুমোবে। দেখা যাক না কবার ডেকে ও ঘুমোয়। গুনতে আরম্ভ করল রুনু। এক দুই তিন...উনিশ কুড়ি...পঁচানব্বই ছেয়ানব্বই সাতানব্বই।

এক সময় আর শোনা গেল না পাখির ডাক, পোকার কুটুর কুটুর, বাঁশ বনের শোঁ-শোঁ...সব্বা-আ-ই ঘুমিয়ে পড়ল।

এক সময় চমকে উঠল রুনু। রুকণী ডাকল না? তাই তো? রুকণীই তো চেটে দিচ্ছে ওর কান! চাটছে হাতের তালু। কেমন শিরশির করছে সারা গা। আদর করে দু-হাতে রুকণীকে বুকে চেপে ধরতেই ঘুম ভেঙে গেল রুনুর।

একটু পরেই ও বুঝল, ও স্বপ্ন দেখছিল। রুকণীকে বুঝি এ জীবনে আর দেখতে পাবে না। কী নিষ্ঠুর রুনু! এত দিনে একবারও মনে পড়ল না রুকণীকে? রুকণী বোধহয় রুনুর জন্যে কাঁদতে-কাঁদতে মরেই গেছে!

একেবারে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল রুনু। কান্না শুনে ঘুম ভেঙে গেল কাকিমার।

'কে কাঁদে রে?'

কথা বলে না, কথা বলতে পারে না রুনু। কান্নায় যে ওর দম বন্ধ হয়ে আসছে! মহা বিরক্ত হলেন কাকিমা। হারিকেনটা বাড়িয়ে নিয়ে এলেন রুনুদের বিছানায়। দেখলেন, রুনু লেপ ফেলে দিয়ে সোজা বসে আছে বিছানায়, আর দু-হাঁটুর মধ্যে মুখ ডুবিয়ে অঝোরে কাঁদছে।

'কাঁদছিস কেন রে? মা-র জন্যি মন কেমন করছে?'

'না।'

কান্নার তোড়ে কেঁপে-কেঁপে উঠছে রুনু।

'আয় শুবি আয় আমার কাছে। আহা, এইটুকু বাচ্চারে মা-ই বা ছাড়ে কোন প্রাণে!'

রুনুর হাত ধরে নিয়ে শুইয়ে দিলেন নিজের বিছানায়। ভালো করে লেপ ঢাকা দিয়ে সস্নেহে গায় মাথায় হাত বুলিয়ে আবার প্রশ্ন করেন, 'কেন কাঁদছ সোনা? মা-র জন্যি পেরাণ পুড়ত্যাছে?'

কাকিমার বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে রুনু বলে, 'না, রুকণী। রুকণী আমারে খুউব ভালোবাসে।'

'রুকণীডা আবার কে রে? এইটুকু বয়সে ভালোবাসার পাত্তোর তো অনেক জোটাইছ দেখছি।'

'আমিও ভালোবাসি খু-উ-ব!' কাঁদতে কাঁদতে বলে রুনু।

'কী সর্বনাশ, এত দূর!' হেসে ওঠেন কাকিমা,—'তোদের সেই পাঠশালার আর এট্টি বুঝি?'

'না, আমাদের ছাগলের বাচ্চা।'

দুপুর রাতে অত বড় ঘরখানাই কেঁপে ওঠে কাকিমার হাসিতে।

'এট্টার শোকেই এত কান্না! কাল তরে তিন-তিনডে রুকণী দিমু। তিনডে বাচ্চা আমাদের ছাগলের।'

এবার খুঁত খুঁত করে উঠল নিপু। কাকিমা নিপুকে সামলাতে-সামলাতে মহা বিরক্ত ভাবে বললেন, 'আমার হইছে মরণ জ্বালা। নিজির দুডি সামলাইতে পরাণ যায়, তারমধ্যি আবার জোটলেন আর এট্টি কাঁদুনে।'

সংকোচে অভিমানে কাকিমার কোলের কাছ থেকে সরে এল রুনু।

'আমি ওই বিছানায় যাই কাকিমা।'

'তা যাবি যা, আবার কাঁদিস না কিন্তু।' ঝাঁঝালো গলায় বললেন কাকিমা।

না, আর কাঁদবে না রুনু। রুকণীর জন্যে নয়, বাড়ির জন্যে নয়, কারও জন্যে নয়। কাল থেকে ও আর কারও কাছে শোবে না। সেকথা তো হয়েই আছে। বারান্দার ওই ছোট খোপে, নিজের ছোট্ট বিছানায় একা একা শুয়ে যদি সারা রাতও কাঁদে, সে কান্না কেউ আর শুনতে পাবে না। ও কাঁদবে মনে মনে। সে কান্না কেউ শোনে না, কেবল নিজের বুকের মধ্যেই অশ্রু ঝরায়।

তিন

বাজুনিয়া স্কুলের পঞ্চম শ্রেণিতে রুনুকে নিয়ে সতেরো জন ছাত্র হল। তার মধ্যে রুনু-সহ নতুন ছাত্র চারজন। আর সকলেই এই স্কুলের চতুর্থ শ্রেণি থেকে প্রমোশান পাওয়া। বৃত্তি পাওয়া ছাত্র অবশ্য একা রুনুই। তাই ইতিমধ্যেই ক্লাসে রুনুর একটা বিশেষ পরিচিতি হয়ে গেছে। রুনুও চিনে ফেলেছে অনেককে।

চতুর্থ শ্রেণি থেকে যে ছেলেটি প্রথম হয়েছিল তার নাম প্রশান্ত। আর থার্ড হয়েছিল ললিত। সেকেন্ড যে হয়েছিল, তার নাম খালেক। সে নাকি খুব রোগা। এখন অসুস্থ বলে ক্লাসে আসছে না। ইতিমধ্যে ললিতের সঙ্গে রুনুর বেশ ভাব হয়ে গেছে। ক্লাসে বসে ওরা দুজনে পাশাপাশি। প্রশান্ত জমিদার বাড়ির ছেলে। স্বয়ং হেডমাস্টারমশায় তাকে প্রাইভেট পড়ান। সে আর সকলের মতো আটহাতি ধুতি কোঁচা দুলিয়ে পরে না। সে পরে মূল্যবান জুতো জামা হাফপ্যান্ট। ক্লাসের কারও সঙ্গে তার তেমন ভাব নেই। কেমন একটা উপেক্ষার চোখে দেখে সকলকে। ভাব করেনি সে রুনুর সঙ্গেও।

ক্লাসে আজকাল পড়াশুনা তেমন হয় না। এক একজন মাস্টারমশায় আসেন, গল্পসল্প করেন, নতুনদের পরিচয় নেন।

অঙ্কের স্যার যেদিন প্রথম এলেন ক্লাসে, তিনি এসেই প্রশ্ন করলেন, 'রণজিৎকুমার কে?'

উঠে দাঁড়িয়েছিল রুনু।

'তুমি উচ্চ প্রাইমারিতে বৃত্তি পেয়েছ?'

মাথা নেড়েছিল রুনু। তখন প্রশান্তর দিকে তাকিয়ে তিনি বলেছিলেন, 'এবার দেখা যাবে, কে ফার্স্ট হয়।'

প্রশান্ত তাচ্ছিল্যের সুরে বলেছিল, ও তো ইংরাজি জানে না একটুও।'

'তাই নাকি? কিছুই ইংরাজি শেখেনি?'

'আমাদের পাঠশালায় তো ইংরাজি নাই। কেবল ফার্স্ট বুকের...' লজ্জায় আর বলতে পারে না রুনু।

'তাতে ভয় কি? শিখে নেবে ইংরাজি। অঙ্ক, বাংলা, ভূগোল, ইতিহাস—এসব তো ভালোই শিখেছ তোমাদের পাঠশালায়। ওটা তো একটা বিখ্যাত পাঠশালা। তোমার বাবা একজন আশ্চর্য পণ্ডিত।'

পিতৃগর্বে বুক ফুলে ওঠে রুনুর।

'আচ্ছা এবার একটা অঙ্ক করো দেখি।' বোর্ডে অঙ্কটি লিখে দিলেন মাস্টারমশাই, 'ক খ ও গ-এর মধ্যে ২৫ টাকা এমন ভাবে ভাগ করিয়া দাও যেন...'

দুবার করে অঙ্কটা পড়ল রুনু। একটুও তো কঠিন নয়। ভেবেছিল ফাইভ-এর অঙ্ক আরও কঠিন হবে। দু-মিনিটেই হয়ে গেল অঙ্কটা। দুবার দেখলও। না, ঠিকই তো আছে। উঠে দাঁড়াল রুনু। কিন্তু পা এগুতে চায় না। আর কেউ যে নড়ে না।

'হয়ে গেছে?'

'হ্যাঁ স্যার।' স্যার কথাটা এখানে এসেই শিখেছে রুনু। শিখেছে আরও অনেক নতুন কথা। পিরিয়ড, রুটিন, ড্রিল, প্রাইভেট টিউশানি ইত্যাদি। শিখিয়েছে ললিত।

'তাহলে দিয়ে যাও।'

কম্পিত পদে এগিয়ে গেল রুনু টেবিলের কাছে।

ক্রমে ক্রমে আরও কয়েকটা খাতা পড়ল টেবিলে। এক সময় প্রশান্তও রেখে এল তার খাতা।

সেদিন 'রাইট' পেয়েছিল একা রুনুই।

'ছিঃ প্রশান্ত, এত সহজ অঙ্কটাও ভুল করলে?' বলেছিলেন স্যার। আর রুনুকে বলেছিলেন, 'থ্যাঙ্ক ইউ।'

এ ইংরাজি কথাটাও ইতিমধ্যে শিখে ফেলেছিল রুনু।

'দেখা যাবে ইংরাজি পিরিয়ডে।' সদম্ভে বলেছিল প্রশান্ত।

ইংরাজি পিরিয়ডের কথায় সত্যিই ভয় পেয়ে যায় রুনু। ইংরাজি পড়ান হেডস্যার। উনি নাকি ভীষণ মারেন। জোড়া বেত। মূর্তিটাও ভয়ঙ্কর। ভর্তির দিন একেবারে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দেখেছিল রুনু। মাথা ভর্তি চকচকে টাক, গোল গোল ভীষণ একজোড়া চোখ, আর ভীষণতর ঝাঁটালো একজোড়া গোঁফ। সেই থেকেই একটা দারুণ ভয় ধরে গেছে ওর। সামনের সোমবার থেকেই নাকি তিনি ইংরাজি পড়ানো শুরু করবেন।

ক্লাসের আর-এক ছেলে অসীম। তাকে না চিনে উপায় নেই। সে নিজেই আত্মপরিচয় ঘোষণা করে সর্বক্ষণ। একদিন রুনুর কানে কানে বলে, 'বাজুনে স্কুলি পড়তি হলি একটা শোলোক মুখস্থ করতি হবে।'

'কী শ্লোক?' কৌতূহলী হয়ে ওঠে রুনু।

'এট্টা কানা এট্টা খোড়া এট্টার লাগছে কানতালি।

আচ্ছা মজার স্কুলে খুলিছে সুরেন্দ্রনাথ গাঙ্গুলি।'

এ শ্লোকটা আগেও শুনেছে রুনু এর ওর মুখে ফিসফিস করে বলতে। মানেটা বোঝেনি। জিজ্ঞাসা করল অসীমকে, 'সুরেন্দ্রনাথ গাঙ্গুলি কে?'

'তা-ও জানিস না? টেকো স্যারের নামই তো সুরেন্দ্রনাথ। এ শ্লোক তো আমিই বান্ধিছি। টেকো তা জানেও।' সগর্বে বলে অসীম।

'কী সর্বনাশ। আপনাকে যদি তাড়িয়ে দেয়।'

'তালি টেকোরেও তাড়াবে আমার বাবা। আমারে ভালো ছাত্তোর বানাতি টেকোরে আমাগো বাড়ি রাখিছে আমার বাবা। আমি খুব ভালো ছাত্তোর, নারে?'

হাসতে থাকে অসীম আর বুক কাঁপতে থাকে রুনুর।

'জানিস ফোর-এ ছেলাম দুই বছর, ফাইভে হল এই তিন বচ্ছর। খুব ভালো ছাত্তোর, না?'

হাসল এবার রুনুও। আর কী আশ্চর্য, এমন সাংঘাতিক ছেলের সঙ্গেও ভাব হয়ে গেল রুনুর। মনে মনে মিলিয়ে দেখল ওর দাদার সঙ্গে অসীমদার অনেক মিল। অসীম সারা স্কুলের অসীমদা। প্রথম পরিচয়ের দিনই সে হয়ে গেল রুনুরও অসীমদা।

স্কুলের আর সব মাস্টারমশায়দেরও চিনে ফেলেছে রুনু। হেডস্যারের পর পণ্ডিতস্যার, তারপর দ্বিজুদা আর নরেনদা। কে কবে কি পড়াবেন, তা-ও রুটিন দেখে সে লিখে নিয়েছে। লম্বা স্কুলবাড়িটার ঠিক মাঝখানের ছোট ঘরটি লাইব্রেরি ঘর। দক্ষিণের বারান্দাটা এপাশ থেকে ওপাশ পর্যন্ত প্রায় ৫০/৬০ হাত লম্বা। ঠিক বারান্দার সামনেই মাত্র ২০/৩০ হাত চওড়া খেলার মাঠ। তারপর থেকেই শুরু হল ধানের খেত একেবারে দক্ষিণের বড় খাল পর্যন্ত। খালের ওপারের গ্রামটাই ভোজেরগাতী। বারান্দায় দাঁড়িয়েই দেখা যায় ভোজেরগাতী গ্রামের গাছপালা-ঘরবাড়ি। খালের উপর বাঁশের পুল পার হয়ে ও-গ্রামের ছেলেরা স্কুলে আসে, খাল দিয়ে নৌকো চলে যায় এদিক-ওদিক—সব দেখা যায় স্কুলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে। রুনু সময় পেলেই কেবল চেয়ে থাকে দক্ষিণ দিকে। এ গ্রামের কেবল ওই দিকটাতেই যা একটু মুক্ত মাঠ। চোখের মুক্তি।

বারান্দায় নোটিশবোর্ড ঝুলোনো। সব ক্লাসের রুটিন লেখা আছে নোটিশবোর্ডে। আর-এক দিকে ঝুলোনো আছে ঘণ্টা। প্রতি চল্লিশ মিনিট পর পর ঘণ্টা পেটায় নিবারণদা। চল্লিশ মিনিটে এক পিরিয়ড।

পশ্চিম দিকের দুটো ঘরে বসে তৃতীয় আর চতুর্থ শ্রেণি, আর পূব দিকের দুটো ঘরে পঞ্চম আর ষষ্ঠ শ্রেণি। প্রতি শনিবারে হাফ স্কুলের পর ড্রিল করান পণ্ডিতস্যার।

প্রথম সপ্তাহে হেডস্যার একদিনও ক্লাসে আসেননি। কেবল শনিবার ড্রিলের পরে বলে দিয়েছিলেন ক্লাস ফাইভ ও সিক্স-এর ছাত্র যেন সোমবার ইংরাজি বইয়ের প্রথম গল্পটা পড়ে আসে।

আজ সেই সোমবার। সকাল থেকেই বুক কাঁপছে রুনুর। সারা রাত ইংরাজি বই আর মানে বই নিয়ে প্রচুর কসরত করেছে রুনু। কিছুই বুঝতে পারেনি তেমন। বাংলা মানেটা অবশ্য মুখস্থ হয়ে গেছে। কিন্তু ইংরাজি যে ও পড়তেই পারে না ভালো করে।

কোঁচার খুঁটে চেয়ারটা ঝেড়ে টেবিলে গোটা দুই ফুঁ দিয়ে মেরুদণ্ড টানটান করে বসলেন হেডস্যার। ভয়ঙ্কর চোখ তুলে একবার দেখে নিলেন সমস্ত ক্লাসটা। তারপর গম্ভীর গলায় বললেন, 'নতুন ছাত্র এবার কে কে ভরতি হয়েছ দাঁড়াও।'

রুনু সমেত চারটি ছেলে দাঁড়াল। তার মধ্যে একজন অসম্ভব লম্বা। বয়সেও সবচেয়ে বড়। বোধ হয় অসীমদার চেয়েও। সেই লম্বাটিকেই জিজ্ঞাসা করলেন হেডস্যার, 'কী নাম তোমার?'

'আইগা জল-অ ধর-অ করম-অ কার-অ।'

নাম বলা শুনেই হেসে পড়ল অনেকে। হেডস্যারের এক ধমকেই আবার সব চুপ।

'কোন স্কুল থেকে এসেছ?'

'আইগা মাজিগাতি ফিরি পেরাইমারি।'

হেডস্যার একে একে পরিচয় নিলেন সকলেরই। তারপর প্রথম প্রশ্ন করলেন রুনুকেই, 'প্রথম গল্পটা পড়েছ?'

রুনুর বুকের মধ্যে যেন ঢেকির পাড় পড়ছে। গলা দিয়ে আর স্বর বেরুল না। কেবল একটু মাথা নাড়ল।

'পড়ো দেখি।'

কাঁপা হাতে বই নিয়ে দাঁড়িয়েই আছে রুনু নীরবে।

'কই, পড়ো।' প্রচণ্ড এক ধমক দিলেন হেডস্যার।

গাড়োয়ানের ধমক খেয়ে যেমন খোঁড়া গরুও চলতে থাকে, তেমনি চলতে শুরু করল রুনুর কাঁপা গলা, 'র‌্যাম গোএজ টু স্কুল...' সঙ্গে সঙ্গে খিলখিল করে হেসে পড়ল প্রশান্ত আর চমকে দেওয়া লজ্জাবতী লতার মতো হঠাৎ গুটিয়ে গেল রুনু। মুখে আর শব্দ নেই।

প্রশান্ত বার বার বলছে, 'র‌্যাম গোএজ র‌্যাম গোএজ' আর হেসেই যাচ্ছে। হাসি দেখা গেল হেডস্যারের ঠোঁটের কোণেও। শেষে তিনি গম্ভীর গলায় বললেন, 'তুমি একটি র‌্যাম।'

এবার একেবারে হাসির ঝড় বয়ে গেল ক্লাসে। আর রুনুর চোখে বয়ে চলল জলের ধারা।

'ওহে জল-অ ধর-অ,' হেডস্যারও উচ্চারণ করলেন ওর নামটা ওর মতো করেই, 'তুমি ইংরাজি বই কিনেছ?'

'আইগে হ।'

'পড়ো দেখি তুমি।'

'রাম-অ গোজ-অ টু স্কুল-অ...' বেশ মোটা গলায় পুরুতঠাকুরি সুরে পড়তে শুরু করল জলধর। আর তার সেই মন্ত্রপাঠ শুনে ক্লাসসুদ্ধ সকলে হেসে লুটোপুটি। জলধর তবুও অটুট গাম্ভীর্যের সহিত পড়ে যাচ্ছে, 'অল-অ দি টিচারস-অ লাভ-অ হিম অ...'

ঠিক এই মুহূর্তে হেডস্যার হেসে বললেন, 'নম-অ, নম-অ, থাম-অঃ থাম-অঃ! তুমি কি তোমার কামারপাড়ার পুরুতঠাকুর?'

'আইগা না।'

'তাহলে এমন মন্ত্রপাঠ শিখলে কোথায়?'

'আইগা কি বললেন?'

'বলি এমন ইংরাজি পড়া শিখলে কোথায়?'

'আইগা নিজি নিজি শিখিচি।'

সব নতুন ছাত্রকেই একটু একটু পরীক্ষা করে শেষে হেডস্যার নিজেই পড়লেন সমস্ত গল্পটা। বললেন, 'সবাই মনোযোগ দিয়ে শোনো। ঠিক এমনি করে পড়তে হবে।'

মনোযোগ দিয়েই শুনল রুনু। জীবনে বোধহয় এত মনোযোগ দিয়ে কিছুই শোনেনি কোনও দিন। হায়, হেডস্যার চলে যেতে আবার নিজে পড়তে শুরু করে, দেখল সে অনেক শব্দেরই উচ্চারণ মনে রাখতে পারেনি। নাঃ, ইংরাজি শেখা বুঝি হবেই না ওর দ্বারা। প্রশান্তর মতো অমন চটপট ইংরাজি কি ও কোনও দিন বলতে পারবে?

চার

বইখাতা বগলে স্কুল থেকে ফিরছিল রুনু। বারান্দায় পা দিতেই পেছন থেকে একটা খরখরে গলা বেজে উঠল, 'এই ছ্যামড়া, কেডা রে তুই?'

পেছন ফিরল রুনু। ঠিক যেন ছবিতে দেখা এক ডাইনিবুড়ি। একখানা লাঠি হাতে মুখ খিঁচিয়ে এগিয়ে আসছে ওর দিকে। গর্তে বসা চোখ দুটো জ্বল জ্বল করছে। সামনের দুটি মাত্র মস্ত মস্ত দাঁতে মুখখানাকে দেখাচ্ছে ভয়ঙ্কর।

রুনুর বুক শুকিয়ে কাঠ। বাড়িতে কেউ আছে বলে তো মনে হয় না। কে ওই বুড়ি? একেবারে যে কাছে এসে পড়ল। বইটই ফেলে দৌড় দেবে কিনা ভাবছে রুনু।

'মুখপোড়াডা কথা কয় না ক্যান? কেডারে তুই?' আবার খিঁচিয়ে উঠল বুড়ি।

রুনু কাঁপা গলায় কেবল বলতে পারল, 'আ-আমি...রুনু।'

'ঝাঁটা মারি তোর রুনু-ফুনুর মুহি। নাম আমার বাড়ি থেকে যত সব চোর-ছ্যাচোড়।'

বাধ্য বালকের মতো নেমে এল রুনু উঠোনে। মাথা নীচু করে দাঁড়াল এক কোণে গিয়ে।

'তবু নড়ে না মুখপোড়া।' বলতে বলতে দড়াম করে এক লাঠির বাড়ি কষিয়ে দিল বুড়ি রুনুর পিঠে। এই মুহূর্তে কলসি কাঁখে কাকিমার আবির্ভাব।

'ও মা করেন কি? কারে মারতে আছেন? ও যে...'

কাকিমা ছুটে এসে বুড়ির হাত থেকে লাঠিখানা কেড়ে নিলেন। বুড়ি গর্জাতে থাকে, 'জানিস বউ, আমি না থাকলি যথাসব্বস্ব যাত আজ। মুখপোড়া চোর হট করে ঘরে ঢুকতি যাচ্ছিল।'

'ছিঃ-ছিঃ, কয়েন কি? ও তো আমাগো বাড়িতেই থাকে।'

'আবার কোন কুটুম জোটালে বউ? তোমার কুটুমির ঠেলায় তো সব্বোসান্ত হলাম।'

এবার রেগে গেলেন কাকিমা। চিৎকার করে বললেন, আমার কোনও কুটুম তো বারো বছরেও পা ছোঁয়ায় না এ-বাড়িতে। আপনার মাইয়া-জামাই নাতি-নাতনির ভাত রানতে রানতেই তো হাতে করা পইরা গেল গা।'

'কি বললি হারামজাদী! রাখ, আসুক সোম...'

রুনু এতক্ষণ স্তব্ধ হয়ে ওদের ঝগড়া শুনছিল। এবার কাকিমা এক ধমক লাগালেন ওকে, 'তুই এখানে সং-এর মতো খাড়াইয়া কি দ্যাখছ? যা বইপত্তোর থুইয়া ছাগলডারে খালপারেতে একটু চরাইয়া আন।'

রক্ষে পেয়ে গেল রুনু। ছুটল পড়ার ঘরে বইপত্র রাখতে।

ইতিমধ্যে তিনটে বাচ্চাই রুনুর ভক্ত হয়ে উঠেছে। তাদের নাম রেখেছে আনি-দুয়ানি আর রুকনি। সবচেয়ে সুন্দরটার নাম রুনুই রেখেছিল রুকনি। আর দুটোর নাম মিলিয়ে রেখেছেন কাকিমা।

পড়ার ঘর থেকে কাকিমার কথা কানে আসছে রুনুর।

'ও আমার কুটুম না। আপনাগোই কুটুম। আপনার সেই গোবরার গুরুভাই শ্রীনাথ পণ্ডিত। তেনার ছেলে। সেবার তো আপনের সঙ্গেই কথাবার্তা ঠিক কইর‌্যা গেলেন। তখন তো মায়ে-পোয়ে খুব সোহাগ দেখাইলেন, অখন চোর চোর কইয়া তারাইতে চান ক্যান?'

'কি বললি, ছিনাথের ছল! ওরে সব্বোনাশী, তা এতক্ষণ কোস নাই ক্যান! হায় হায়, কী সব্বোনাশ করিছি রে, কী সব্বোনাশ...'

হায় হায় করতে করতে বুড়ি ছুটে এল ঘরে। রুনুকে জড়িয়ে ধরে তারপর সে কি কান্না। কাঁদে আর রুনুর পিঠে হাত বুলিয়ে বলে, 'ওরে আমার সোনা, ওরে আমার মানিক, রাগ করিস না, রাগ করিস না দাদা। তুই ছিনাথের ছল, আমার কত আদরের ধন। সব্বোনাশী আমারে আগে কলো না ক্যান।'

রুনু এবার বুঝতে পারছে ইনিই দিপু-নিপুর বর্ণিত 'ঠাকমা' আর অসীমদের বর্ণিত 'ক্যাটকেটে বুড়ি'। এইমাত্র যার লাঠির বাড়ি খেয়েছে পিঠে, যে ব্যথাটা এখনও চিনচিন করছে—সব ভুলে গেল রুনু। মনে হল, এই বুড়িটাই পৃথিবীতে ওকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে। এর লাঠির বাড়িতে একটুও ব্যথা নেই। সেই কথাই বলল রুনু। বলল, 'আমি একটুও ব্যথা পাইনি ঠাকমা।'

'দেহি দেহি,' জামাটা টেনে তুলতে যাচ্ছিল ঠাকমা। রুনু দৌড় দিল ছাগল চরাতে।

এই ব্যথাটুকু যেন একটা মস্ত লাভ। তাড়াতাড়ি এ-ব্যথা ও সারিয়ে ফেলতে চায় না।

পাঁচ

জানুয়ারি মাসটা কেটে গেল শুধু চেনা-শুনা করতে। স্কুলের সব ছাত্রই চেনে এখন রুনুকে। রুনুও চিনে ফেলেছে অনেককে। এ-মাসটায় ক্লাসে পড়াশুনো তেমন হল না। মাস্টারমশাইরা যত না পড়ালেন তার চেয়ে গল্প করলেন অনেক বেশি। আর গল্প শুনতে শুনতেই রুনুর সবচেয়ে ভালো লেগে গেল নরেনদাকে। স্যারদের মধ্যে নরেনদার সবচেয়ে কম বয়স। সবচেয়ে সুন্দর দেখতে। আর নরেনদার পোশাকেও বৈশিষ্ট্য আছে। মোটা খদ্দরের ধুতি আর পাঞ্জাবি। আর কাঁধের উপর ভাঁজকরা খদ্দরের উত্তরীয়। পায়ে সাধারণ স্যান্ডেল। প্রতিদিনই এক বেশ। প্রতিদিনই নরেনদার হাসি মুখ। কেবল রুনু নয়, নরেনদাকে ভালোবাসে স্কুলের সব ছাত্রই। নরেনদাই রুনুদের পড়াবেন অঙ্ক আর ইতিহাস। পণ্ডিতস্যার বাংলা, ভূগোল, ড্রইং আর ড্রিল। দ্বিজুদা কেবল স্বাস্থ্য বিজ্ঞান। দ্বিজুদা থ্রি-ফোরেই পড়ান বিশেষ করে।

ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে সরস্বতী পূজা। করের বাড়িতে নাকি সরস্বতী পূজা হয় বিরাট ধুমধাম করে। সে পূজায় নিমন্ত্রিত হয় সমস্ত স্কুল। আর সেই সরস্বতী পূজার পরেই শুরু হবে আসল পড়া। তখন আর ক্লাসে এসে কোনও স্যার গল্প করতে পারবেন না। এসব শুনেছে রুনু ক্লাসের ছাত্রদের কাছে।

পূজার আগের দিন টিফিন পিরিয়ডে হেডস্যারই জমিদারবাবুর পক্ষ হয়ে নিমন্ত্রণ করলেন সমস্ত ছাত্রকে। ব্যাপারটা পুরোনো, কিন্তু রুনুর কাছে নতুন। হেডস্যার লাইব্রেরি ঘর থেকে তাঁর সেই গগন-বিদারি গলায় বলছেন, 'তোমরা সবাই শোনো, আমাদের স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট শ্রীযুক্ত প্রমথনাথ কর মহাশয় আগামীকাল তাঁর বাড়ির সরস্বতী পূজায় তোমাদের সকলকে নিমন্ত্রণ জানিয়েছেন। তোমরা সকলে সকাল আটটার মধ্যেই স্নান করে পরিষ্কার জামাকাপড় পরে পূজামণ্ডপে হাজির হবে, অঞ্জলি দেবে এবং পূজার পরে প্রসাদ গ্রহণ করবে। কাল তোমাদের ছুটি।'

এত বড় আনন্দের ব্যাপারটাতেও কিন্তু আনন্দ নেই রুনুর মনে। মা বলেছিলেন, সরস্বতী পূজার সময় রুনুকে বাড়ি নেবার ব্যবস্থা করবেন। কিন্তু কই, কেউ তো এল না ওকে নিয়ে যেতে আজও। পশ্চিমের ওই ঝাপসা গাছপালার আড়ালে সূর্যটা ডুবে যাচ্ছে। ধীরে-ধীরে আকাশটা কালো হয়ে আসছে। কালো হয়ে যাচ্ছে রুনুর মনের আকাশটাও। ওর মনে পড়ছে ওদের গোবরা পাঠশালার সেই সরস্বতী পূজার ছবিটা। সে পূজায় জাঁকজমক নেই, হইচই নেই, তবু সে পূজায় সব ছাত্রেরই একটা ভূমিকা ছিল। সে পূজা ছাত্রদের পূজা, জমিদারের পূজা নয়। সে পূজায় কেউ আনত কুল, কেউ দিত ফুল, কেউ দুধ। কেউ বা আর কিছু।

করের বাড়ির বিরাট জাঁকজমকের সরস্বতী পূজা দেখল রুনু। বিরাট তার সব কিছুই। প্রতিমা বিরাট, প্রসাদের পাহাড় বিরাট, আর সবচেয়ে বিরাট ফুলের পাহাড়। এই সব ফল, মিষ্টি ফুল সব নাকি এসেছে কলকাতা থেকে। কত রকম যে ফল এসেছে। আপেল, নেসপাতি, কমলা, কুল সে সব তো আছেই, কিন্তু মাঘ মাসে পাকা আম এল কী করে? কলকাতায় নাকি পয়সা দিলে বাঘের দুধও মেলে।

কেবল ফল মিষ্টিতেই প্রসাদ পর্ব শেষ নয়। এর পরও ছিল মধ্যাহ্ন ভোজ। সে-ও এক এলাহি কাণ্ড। পোলাও বস্তুটার নামই শুনেছিল রুনু, সেবার স্বচক্ষে দেখল।

নাঃ, এত ধুমধাম, এত খাওয়া-দাওয়া, তবু যেন কিছুই ভালো লাগছে না রুনুর। ওর কেবলই মনে পড়ছে ওদের পাঠশালার সেই পূজার প্রসাদের কথা। সেই কড়াইশুঁটির খিচুড়ি আর ইলিশ মাছ ভাজা, সেই সদ্য ভাজা খই-এর মোয়া আর মুড়কি, তার স্বাদই যেন আলাদা। হায়, আজ তো সেই বটতলাতেই বসেছে খিচুড়ি ভোজ। সেখানে তো হচ্ছে সরস্বতী পূজা। সে পূজায় প্রতিমা নেই, তবু অঞ্জলী মন্ত্র পড়তে পড়তে মনে হত মা সরস্বতী যেন নেমে এসেছেন বটতলায়। তার ফুলের মতো কোমল হাতে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছেন সব ছাত্রকে। কই আজ হেডস্যারের গলায় গলা মিলিয়ে অঞ্জলী মন্ত্র পাঠ করতে তো তেমন অনুভূতি হল না।

রুনুর মনে হল, এ পূজায় প্রাচুর্য আছে, প্রাণ নেই। আর সে পূজা যেন ছিল রুনুর প্রাণের পূজা। নিজের পূজা। এ পূজা কেবল করের বাড়ির পূজা।

ছয়

স্কুলে ওর পুরো নামটাই চালু হয়ে গেছে। সবাই ওকে রণজিৎ বলে। একমাত্র অসীমদাই ডাকে 'রণো' বলে। রুনু বলে না কেউ। তারা জানেই না। পুরো নামটা ধরে ডাকলে নিজেকে যেন একটু বড় বড় মনে হয়। বড় তো হয়েইছে রুনু। মাত্র মাসখানেকের মধ্যে জেনে ফেলেছে ও অনেক কিছু। অনেক বড় হয়ে গেছে ওর পৃথিবীটা। অভিজ্ঞতার ভাণ্ডারে বিচিত্র সঞ্চয় করে করে দিনগুলি একে একে কেটে যাচ্ছে।

এক দিন নরেনদা নিজেই বললেন, 'সকালে গিয়ে আমার কাছে ইংরাজিটা পড়ে আসিস।'

নরেনদাও করের বাড়ির ছেলে। করের বাড়ি বলতে তো আর কেবল জমিদার প্রমথবাবুর মস্ত দোতালা দালানটা বোঝায় না। ওখানে ঘন ঘন অনেকগুলি বাড়ি। টিনের ঘর, খড়ের ঘর সবই আছে। আছে ছোট মাঝারি বড় অবস্থার অনেকগুলি পরিবার। একটা মাঝারি অবস্থার টিনের ঘরে থাকেন নরেনদা। রুনু চেনে নরেনদার ঘর। দেখিয়ে দিয়ে ছিলেন একদিন নরেনদাই।

নরেনদার প্রস্তাব শুনে একটু ভাবনায় পড়ে রুনু। সকালে যে ও দিপু-নিপুকে পড়ায়। তাই মিনমিন করে বলে, 'বিকেলে গেলি হয় না, স্কুল ছুটির পরে?'

'দুর! ছুটির পরে খেলা। খুব খেলবি।'

এমন কথাটি আর শোনেনি রুনু কারও মুখে কোনও দিন। ওকে সবাই কেবল পড়তেই বলে। আশ্চর্য ভালো লাগল এই নরেনদাকে।

'তাহলি কখন যাব নরেনদা?'

যাবি যখন খুশি।'

প্রতিদিন অবশ্য সম্ভব হত না। রুনু যেত প্রায়ই শনি-রবিবার বিকেলে। নরেনদার ঘরে যত না ইংরাজি পড়া হত, তার চেয়ে অনেক বেশি হত গল্প। প্রায় প্রতিদিনই সন্ধ্যার পর একদল তরুণ আসত নরেনদার ঘরে। তাদেরও পোশাক নরেনদার মতোই। সাদা খদ্দরের ধুতি-পাঞ্জাবি। মোটা মোটা বই পড়া হত। কোনোদিন ইংরাজি বই, কোনোদিন বাংলা বই। তর্ক হত, আলোচনা হত। দেশের কথা। মানুষের কথা। কান পেতে কেবল শুনত রুনু। বুঝত না বিশেষ কিছু। কত নতুন নতুন নাম, নতুন নতুন শব্দ। স্বাধীনতা, বিপ্লব, আন্দোলন, পিকেটিং, বয়কট, গান্ধীজি, মতিলাল, সুরেন বাড়ুজ্জে, বিপিন পাল, স্বদেশী আন্দোলন। রুনুর মতো হত, কি যেন একটা ভয়ঙ্কর কঠিন কাজ করতে ওরা সংকল্পবদ্ধ। দুঃখ-কষ্ট ওরা গায় মাখে না, ভয় ওরা পায় না, ব্যথায় ওরা কাঁদে না।

ওদের মধ্যে একজনকে সবাই ডাকত খোকা বলে। রুনু ডাকত খোকাদা বলে। খোকাদার মুখে সারাক্ষণ কবিতা। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, মোহিতলাল, ডি এল রায়, মুকুন্দ দাস, এসব নাম খোকাদার মুখেই প্রথম শুনল রুনু। পৃথিবীটা যে কত বড়, আর কত কথা যে জানে এরা—হায়, রুনু জানে না কিছু! ও কেবল জানে ওর বই মুখস্থ করতে। শুনে শুনে কয়েকটা কবিতা মুখস্থই হয়ে গেল রুনুর।

নরেনদাকে ওরাও সবাই ডাকে নরেনদা বলে। সবাই মান্য করে। নরেনদার অবসর নেই একটুও। ঘরের একদিকে লাইব্রেরি, আর একদিকে দোকান। মাঝখানে মস্ত ফরাস পাতা। আড্ডা হয় সেই ফরাসে বসে। ফরাসের উপরও রয়েছে পাঁচ-ছ'টা চরকা। গল্প করতে করতে চরকায় সুতো কাটে প্রায় সকলেই। সুতো কাটতে শিখে ফেলেছে রুনুও।

নরেনদা একাধারে দোকানদার ও লাইব্রেরিয়ান। দোকানে বই-খাতা, স্লেট-পেনসিল, তেল-নুন-মশলা সব আছে। আর আছে খদ্দর। লাইব্রেরিতে আছে তিন আলমারি ভরতি অসংখ্য বই। এ বই যে-কেউ পড়তে পারে। খাতায় বই-এর নাম লিখে যে যেমন বই চায় দিয়ে দেয় নরেনদা। সকালে দোকান, দুপুরে স্কুল, সন্ধ্যায় আড্ডা আর লাইব্রেরি। সব কিছু সামলে যায় নরেনদা হাসি মুখে।

এক রবিবারে একটু বেশি সকালে এসে পড়েছিল রুনু। তখনও কেউ আসেনি। রুনু বসে গেল সুতো কাটতে। তুলো কোথায় থাকে, সে তো জানেই রুনু। সুতো কাটতে কাটতে মনে পড়ে গেল খোকাদার বারবার আবৃত্তি করা 'দুর্গম গিরি কান্তার মরু...' কবিতাটা। আগাগোড়া মুখস্থ হয়ে গেছে রুনুর। একলা ঘরে কি খেয়ালে হঠাৎ চরকা রেখে সে দাঁড়িয়ে পড়ল ফরাসের উপর। তার পর ঠিক খোকাদার মতো করেই শুরু করল চোখ বুজে। প্রায় অর্ধেক আবৃত্তি হয়েছে এমনি সময় হঠাৎ দরজায় উচ্ছ্বসিত হাততালির শব্দে চোখ মেলল রুনু। মুহূর্তে জিভ কেটে বসে পড়ল।

খোকাদা ছুটে এসে ওকে লুফে নিলেন। দুই হাতে শূন্যে তুলে ধরলেন।

'সাববাস রণজিৎ। তুই হবি আমার যোগ্য শিষ্য। আমার অর্জুন। তোকে মেম্বার করে নিলাম আমাদের ক্লাবের। আমাদের 'নবীন সংঘ'-এর। কাল যাবি আমাদের বাড়িতে। আরও অনেক কবিতা শিখিয়ে দেব তোকে।'

'আপনাদের বাড়ি তো আমি চিনি না।'

'চল আজই চিনিয়ে দিচ্ছি।' রুনুর কাঁধে হাত রেখে ওকে নিয়ে চললেন খোকাদা।

না, মোটেই দূর নয় খোকাদাদের ঘর। প্রশান্তদের দালান বাড়িটা ছাড়িয়ে মাত্র দুখানা ঘর বাদেই তাদের বাড়ি। ছোট মাটির বাড়ি। দিপুদের বাড়ির থেকেও ছোট। প্রায় সুশীলাদির ঘরের মতো। তেমনি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন খোকাদাদের সমস্ত ঘরটাই প্রায় বই দিয়ে ঠাসা ভরতি। টেবিলে বই, বিছানায় বই, আলমারিতে বই, আলমারির মাথাও বই। বই দু-একখানা দেখা গেল খাটের তলায়ও।

'আপনি বুঝি খু-উব উঁচু ক্লাসে পড়েন?' সবিস্ময়ে প্রশ্ন করে রুনু।

'তোর থেকে একটু উঁচু বটে।' হেসে বলেন খোকাদা।

'এম.এ.—বি.এ.?' উচ্চতম বিদ্যা বলতে ওই শব্দটাই জানে রুনু।

'এম.এ, বি.এ. নয়—আগে বি.এ, তারপর এম.এ.।' তফাতটা বুঝিয়ে দিলেন খোকাদা, 'আমি এখন এম-এ পড়ছি। একদিন তুইও পড়বি আমার মতো বড় হয়ে।'

খোকাদা আর কতটুকু বড়? দেখতে তো ওদের ক্লাসের অসীমদার মতো। অ্যাদ্দিন তো সেই রকমই ভাবত রুনু। এখন সম্ভ্রমে সংকোচে সরে দাঁড়াল।

'কার সঙ্গে কথা কচ্ছিস রে খোকা?' পাশের ঘর থেকে মিষ্টি গলায় কে যেন প্রশ্ন করল।

'সোমনাথদার বাড়িতে থাকে সেই যে নতুন ছেলেটার কথা বলেছি না তোমাকে? ভারি ভালো ছেলে। প্রাইমারিতে বৃত্তি পেয়েছে।'

আঁচলে হাত মুছতে মুছতে যিনি এলেন, তিনি খোকাদার দিদি। খোকাদা পরিচয় করিয়ে দিলেন। রুনু প্রণাম করল।

দিদির বয়স বছর তিরিশ হবে। বিধবা বেশ। চোখে-মুখে একটা স্নিগ্ধ মমতা মাখানো। কথাগুলি কি মিষ্টি! মানুষের এত মিষ্টি গলা তো শোনেইনি রুনু কোনও দিন। যেমন খোকাদাকে ভালো লেগেছিল রুনুর প্রথম দিনই, তেমনি ভালোবেসে ফেলল দিদিকেও প্রথম দর্শনেই।

রুনুকে কোলের কাছে টেনে নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে অনেক প্রশ্ন করলেন দিদি। তারপর একটা ঝকঝকে কাঁসার বাটিতে করে ওকে চিড়েভাজা, নারকেল কোরা আর চিনি মেখে খেতে দিলেন। দিলেন একখানা চকচকে চামচেও। চামচে দিয়ে খাবার সম্মান ইতিপূর্বে আর পায়নি রুনু।

খেতে খেতে দেওয়ালের ছবিগুলি দেখছে রুনু। একে একে ছবিগুলির পরিচয় দিচ্ছেন খোকাদা। তিলক, শ্রীঅরবিন্দ, স্বামী বিবেকানন্দ, বঙ্কিম চট্টোপাধ্যায় ইত্যাদি। মাত্র একটা ছবিই রুনুর চেনা ছিল। সে ছবি রবীন্দ্রনাথের।

সাত

কিন্তু কী আশ্চর্য, নরেনদার লাইব্রেরি, খোকাদার নবীন সংঘ সব তুচ্ছ হয়ে যায় রুনুর কাছে, যে মুহূর্তে মনে পড়ে মধুমতীর কথা। ছোট গাঙের কথা। ওদের বটতলার পাঠশালার কথা। একেবারে মনমরা হয়ে যায় রুনু। এমনই মনমরা সময়গুলিতে ও একা একা চলে আসে খালের পাড়ে। হাঁটতে-হাঁটতে চলে যায় সেই বাঁশের পুলের কাছে। তারপর তাকিয়ে থাকে পশ্চিম দিকে। ওই দিক থেকেই তো একদিন এই 'পুব দেশে' এসেছিল রুনু। আর কি কোনও দিন ফিরে যেতে পারবে? মাঘ গেছে, ফাল্গুন গেল, চৈত্রও যায় যায়। তবু আজও কেউ এল না, রুনুকে নিয়ে যেতে।

সেদিনটা ছিল শনিবার। সকালেই মনমরা রুনু চলে এসেছে খালের পাড়ে। অন্যমনস্কভাবে এগিয়ে চলেছে খালপাড়ের রাস্তা দিয়ে দক্ষিণ দিকে। ওইতো ভোজেরগাতী গ্রাম। দশ মিনিটেরও পথ নয়। প্রায় আধাআধি পথ চলে এসেছে রুনু। হঠাৎ চোখে পড়ল বাঁশের সাঁকো পার হয়ে ওদিক থেকে যে ছেলেটা আসছে তাকে দেখতে যেন দাদার মতো। দৌড় দিল রুনু। এপারে এসে পড়ল ছেলেটা। তার বগলে বেশ বড়সড় একটা পুটুলি। রুনুকে দৌড়োতে দেখে এবার দৌড় লাগাল সে ছেলেটাও। ওদের মাঝে যখন মাত্র হাত পঁচিশ-তিরিশ ব্যবধান তখন চিৎকার করে উঠল রুনু, 'দাদা!'

চিৎকার করল সে ছেলেটাও, 'রুনু!'

পাগলের মতো দাদার গায়ের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল রুনু। আছাড় খেয়ে পড়ে গেল দুজনেই জড়াজড়ি করে। তারপর রুনুর সে কি কান্না! কান্না আর থামে না।

'কাঁদিস ক্যান রে রুনু? কি হইছে?'

কী যে হয়েছে জানে না রুনু। কেন কাঁদছে তাও জানে না। খানিক কাঁদার পরে বলতে পারল, 'আমি বাড়ি যাব।'

'তাজ্জন্যি কানতি হবে ক্যান? বাড়ি তো যাবিই। তার আগে ঘাগরের মেলা দেখবি না? কালই তো চোত সংক্রান্তি। আজকে ওই মেলা বসিছে।'

কোটালিপাড়ার ঘাগরের মেলা ভুবনবিখ্যাত। কতবার শুনেছে রুনু সে মেলার কথা মেজদির মুখে। সেই ঘাগরের পাশের গ্রামেই যে মেজদির শ্বশুরবাড়ি। কিন্তু আজ ওর কাছে সে মেলাও তুচ্ছ হয়ে গেল। ও সমানে কেঁদে যাচ্ছে আর বলছে, 'বাড়ি যাব—বাড়ি যাব।'

'এই মরিছে। এত ফন্দি-টন্দি করে মেলা দেখার ব্যবস্থা করলাম।' অসহায় ভাবে বলে ইন্দ্র।

সব ফন্দি মাটি করে দিল রুনু কেঁদেই।

আসল ব্যাপারটা গোপন রয়েছে বাবার কাছে। মায়ের সঙ্গে গোপন চুক্তি হয়েছে ইন্দ্রজিতের। ইন্দ্র মেজদির কয়েকটা প্রিয় জিনিস পৌঁছে দেবে তাদের বাড়িতে, তার পারিশ্রমিক বাবদ মা ওকে দিয়েছেন পুরো একটা টাকা। সেই টাকায় ইন্দ্র মেলা থেকে যা খুশি কিনতে পারবে। মা বলে দিয়েছেন ফেরবার পথে রুনুকে সঙ্গে নিয়ে আসতে। ওকে যেন মেলায় নিয়ে না যায়। ও আবার অসুস্থ হয় পড়তে পারে রোদে রোদে ঘুরে। ওর যা দুর্বল শরীর।

ইন্দ্ররও ইচ্ছা ছিল না রুনুকে নিয়ে যাবার। তত সাহসও নেই ওর। কিন্তু হঠাৎ পথেই যে ওর সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে তা ভাবেনি ইন্দ্র। বাজুনিয়ার গা ঘেঁষেই যে ঘাগর যাবার রাস্তা।

মহা ভাবনায় পড়ল ইন্দ্র। শেষে বলল, 'আচ্ছা, তুই না যাস, আমি তো মেজদিরে এইসব জিনিস দিয়ে আসি, তারপর কাল মেলা দেখে পরশু দিন ফেরার পথে তোরে বাড়ি নিয়ে যাব।'

'না, না, কিছুতেই না, আমি এখুনি বাড়ি যাব। এসব জিনিস তুই এই ঠাকুরবাড়িতেই দিয়ে যাও না এবার। দেখি কি জিনিস?'

খালের পাড়েই বসে পড়ল দুজনে। পুটুলি খুলে দেখা গেল রয়েছে এক বোঝা ঠ্যানঠেনে শাক, এক ভাঁড় কুলের আচার, আর নোনা ইলিশ প্রায় সের দুই আন্দাজ। দেখেই লাফিয়ে উঠল রুনু।

'জানো এসব জিনিস এরাও কোনোদিন দ্যাখেনি। জানো এখানে কাকিমা আছে, দিপু-নিপু আছে, তারা তো ইলিশ মাছ দেখলি নাচতি থাকবে। আর এই শাক দেখলি ঠাকমার জিভের জল পড়বে। ঠাকমা যা শাক ভালোবাসে। জানো ওরা খুব ভালো। ওরা সবাই আমারে খুউব ভালোবাসে। ওদের কিছু দেওয়া উচিত না?'

'তোর তো বেশ জ্ঞান-ট্যান হইছে,' হেসে বলে দাদা, 'এসব না হয় দেলাম তোর কাকিমার আর ঠাকমারে, কিন্তু বামুনবাড়ি তো আমি খাব না।'

'কেন?'

'ওদের বাড়ি খালি নাকি থালা বাসন ধুতি হয়।' বিরক্ত হয়ে বলে দাদা।

'তা তো ধুতি হবেই। আমি তো প্রতিদিন ধুই। তোমার থালা-বাসনও আমি ধুয়ে দেব। সঙ্গে সঙ্গে বলে রুনু। আরও কোনও অসাধ্য সাধনও যদি করতে হয় দাদাকে খুশি করতে, তা-ও করতে রাজি আছে রুনু।

নাঃ, রোখা গেল না রুনুকে। ওটা একেবারে নাছোড়বান্দা,—হয়তো ভাবল ইন্দ্র। কথা বলতে-বলতে ওরা এসে পড়ল ঠাকুরবাড়ির উঠোনে।

কাকিমা কলসি কাঁখে যাচ্ছিলেন স্নান করতে।

'ওই যে কাকিমা।' দেখিয়ে দিল রুনু। বামুন-বিদ্বেষী ইন্দ্রজিৎ কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে প্রণাম করল কাকিমাকে।

'আমার দাদা।' সগর্বে পরিচয় করিয়ে দিল রুনু।

'রুনুরে দেখতি আইছি। মা এইসব জিনিস দেছেন আপনাগো জন্যি।' উঠোনে বসেই পোটলা খুলতে-খুলতে বলে ইন্দ্র।

'দাদার কি বুদ্ধি!' রুনু মনে-মনে তারিফ করে দাদাকে।

'কি শাক ওগুলি?' কলসি নামিয়ে কাকিমা বসলেন দাদার পাশে।

'ঠ্যানঠেনে শাক। ইলিশ মাছের কাঁটা দিয়ে খাতি খুব মজা।' পাকা দোকানদারী গলায় বলে ইন্দ্র, 'এই দ্যাহেন কুলের আচার।'

'কুলের আচার! আহা ভারি চমৎকার জিনিস! এ পোরা দ্যাশে তো কুলের নামগন্ধও নাই।' কাকিমার চোখে-মুখে লোভ জ্বল-জ্বল করে ওঠে। 'ওই কাগজের ঠোঙায় আবার কী আনছ?'

'নোনা ইলিশ। মানে তাজা ইলিশ মাছ কাট্যে আজই নুন মাখায়ে দেছে মা। এক সপ্তাহেও নষ্ট হবে না।' ইন্দ্রজিৎ বিজ্ঞ ব্যক্তির মতো জ্ঞান দান করে কাকিমাকে।

কাকিমা হাসতে হাসতে বলেন, 'মোরাও ইলিশের দ্যাশের মানুষ বাবা। এ পোড়া দ্যাশে চউক্ষেও দেখি না।'

ইতিমধ্যে কোথা থেকে এসে পড়লেন ঠাকমা।

'ও ছ্যামড়া কেডা রে বউ?'

'আমার দাদা।' উত্তর দেয় রুনু, 'দেখুন না, দাদা কত সব জিনিস আনিছে আপনাগো জন্যি। আমার মা পাঠায়ে দেছেন।'

ঠাকমাও বসে পড়লেন কাকিমার পাশে।

'আহা কি চোমোৎকার ঠ্যানঠেনে শাক। কত কাল চোখি দেহি না।' হঠাৎ মাছের ঠোঙায় নজর পড়তেই আতকে উঠলেন ঠাকমা, 'এ রাম, এ করিছিস কি মুখপোড়া? এমন নকনকে শাকগুলরে আঁশ করে আনলি!'

অপরাধটা বুঝতে পারে না ইন্দ্র, কিন্তু বুঝে ফেলেছে রুনু। মুহূর্তে ঠাকমাকে আশ্বস্ত করে বলে, 'আমি তো আজই দাদার সঙ্গে বাড়ি যাব। আমি আসার সময় নিয়ে আসব আপনার জন্যি এত্তেও বড় এক বোঝা।'

'তাই আনিস বাছা।' বিরস মুখে উঠে পড়লেন ঠাকমা।

কাকিমা ধমকের সুরে বলেন, 'আপনার শরিলি কি এটু মায়াদয়াও নাই? ও পোরামুখে কি একটা মিষ্টি কথাও নাই। ওইটুকু পোলা এতবড় বোঝাডা এদ্দূরে টাইনা আনছে। কোথায় দুগা মিষ্টি কথা কইবেন, তা না...'

'তুই থাম তো মুখপুড়ি। তোরাই তো সুখ করে খাবি। আমি ও ছাই ছোঁবোও না।'

শাক-ভক্ত ঠাকমা যে এ শাক ছোঁবেন না, তা জানে রুনু। জানে বলেই একটা গভীর ব্যথা ওর বুকের মধ্যে টনটন করে ওঠে। বুদ্ধি করে যদি তখন শাকটাকে আলাদা করে আনত।

ব্যাপারটা বুঝতে বুদ্ধিমান ইন্দ্ররও বেশি সময় নিল না। রুনুর মতো তারও ভারি দুঃখ হল ঠাকমার জন্যে।

হাফ স্কুলের তিনটে পিরিয়ড আর শেষ হতে চায় না সেদিন। শেষ পর্যন্ত যখন ছুটির ঘণ্টা পড়ল, রুনু ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে এল। এসেই শুরু করল দাদাকে তাড়া দিতে।

ইন্দ্র ততক্ষণে খেয়েদেয়ে একটা ঘুম দিয়ে উঠেছে।

রুনু তো না খেয়েই রওনা হতে চায় তক্ষুনি। কাকিমা প্রায় জোর করে ওদের দুজনকেই খাইয়ে দিল মাছ, ভাত আর ছাগলের দুধের দই। গরম কালে নাকি এ দই খুব উপকারী। আর যাবার সময় ওদের সঙ্গে দিল আর-এক পুটুলি বেঁধে। সে পুটুলিতে আছে বরিশালের বিখ্যাত মুসুড়ির ডাল, সের খানেক সুপারি, আর খোসা ছাড়ানো চারটে নারকেল। এসব জিনিস বরিশাল থেকে প্রতিবার নিয়ে আসেন সোমনাথ।

আট

সমস্ত পথটা মুখস্থ করতে করতে চলেছে রুনু। মুখস্থ রাখছে পথের পাশের গ্রামের নাম, পথের বাঁক কোথায় কোথায় পার হতে হবে বাঁশের সাঁকো। বাজুনিয়া থেকে বরাবর পশ্চিমে প্রায় পাঁচ মাইল দূরে গোপালগঞ্জ। ওইটুকু পথে কত যে গ্রাম তারা পার হল, আর কত খাল! সবচেয়ে বড় খাল হল গোলাবেড়ের খাল। সে খাল পার হতে হয় খেয়া নৌকায়। মাথাপিছু এক পয়সা। খেয়া পার হতেও দাদা একটু ব্যবসায়ী বুদ্ধির পরিচয় দিল। মাঝিকে বলল, 'আমরা তো দুজনেই ছোট। ইস্টিমারে হাফ টিকিট, গাড়িতি হাফ টিকিট, তুমি হাফ টিকিট নেবা না ক্যান? আমাদের দুজনের এক পয়সা নিতি হবে আইনত।'

'হাফ টিকিট' নিতে রাজি হয়ে গেল খেয়ার মাঝি হয়তো দয়া বশত, হয়তো আইনত।

গোপালগঞ্জ পৌঁছেই চেনা পথ পেয়ে গেল রুনু। সামনে তাকিয়ে বুকের মধ্যে গুরু গুরু করে উঠল। হায়, যেন কত কাল, কত যুগ পরে আবার দেখছে ওর চেনা জগৎটাকে। ইচ্ছে হচ্ছে পাখির মতো উড়ে যেতে। সত্যি-সত্যিই দৌড় লাগাল রুনু।

'এই মরিছে। এখনও পেরায় চার মাইল। চার মাইল দৌড়তি পারবি?' হেসে বলে ইন্দ্র।

'খুব পারব।' উত্তেজিত ভাবে বলে রুনু।

'পাগল, তুই এট্টা আস্ত পাগল।' বললে ইন্দ্র।

কোথা দিয়ে কী করে যে তিন-তিনটে দিন কেটে গেল, বুঝতেই পারে না রুনু। রবিবার তো ছুটিই। তারপর সংক্রান্তি ও পয়লা বৈশাখ বাবদ ছুটি ছিল সোম আর মঙ্গলবারও। বুধবার ভোরেই ওকে ঘুম থেকে ডেকে তুললেন পণ্ডিতমশাই।

'ওঠো রুনু। চট করে চাট্টি খেয়ে-টেয়ে সকাল সকাল রওনা হয়ে যাও। এখন রওনা হলি স্কুল বসার আগেই পৌঁছতি পারবা।'

রুনু মায়ের আঁচল চেপে ধরে, কিন্তু জানে বাবার এ আদেশের নড়চড় নেই। মায়ের সাধ্যও নেই বাবার বিরুদ্ধে কথা বলার।

ইতিমধ্যে মা আর সেজদি মিলে প্রচুর ঠ্যানঠেনে শাক, ডুমুর, ব্যাতাগ, নদীর চরের মটর ডাল ইত্যাদি দিয়ে বেশ বড় এক পোটলা বানিয়ে ফেলেছে। সেবার ঠাকমা কিছুই ছোঁননি, এবার তাই সব ঠাকমার প্রিয় জিনিসই নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করেছে রুনু। বস্তুত রুনু ভালোবাসে ঠাকমাকেই বেশি। যত রূঢ়ভাষী বাইরেটা—ভিতরটা স্নেহ-মমতায় ভরা। রত্ন তো খনির গভীর তলদেশেই থাকে, তাকে কষ্ট করে খুঁজে বের করতে হয়। রুনু মাঝে মাঝে চকিতে দেখে ফ্যালে সেই রত্নের ঝিকিমিকি। তখন ঠাকমার সব গালাগাল মিষ্টি লাগে। ঠাকমাকে খুশি করতে এ বোঝা কাঁধে করে নয় মাইল রাস্তা ও যেতে পারবে না? খুব পারবে।

মা বোঝাটাকে আরও ছোট করতে চাইছিলেন—ডাল কমিয়ে ডুমুর কমিয়ে। ছোট করতে দিল না রুনুই।

স্কুল বসবার আগেই সেদিন পৌঁছেছিল রুনু। ঘামে একেবারে কাদা কাদা হয়ে গেছে। চোখ-মুখ লাল। তবু ঠাকমা যে জিনিসগুলি দেখে দারুণ খুশি হয়েছেন, নিজেই পাখা নিয়ে বসেছেন রুনুকে হাওয়া করতে, তাতেই সব কষ্ট সব ক্লান্তি দূর হয়ে গেল রুনুর।

নয়

গ্রীষ্মের লম্বা ছুটি আসন্ন। তার আগে অবশ্য একটা পরীক্ষা হবে। প্রথম টার্মিনাল পরীক্ষা। বাজুনিয়া স্কুলে রুনুর প্রথম পরীক্ষা। এই পরীক্ষাতেই প্রশান্তর সাথে একটা বোঝাপড়া হবে রুনুর। ক্লাসে রুনুর সমর্থকই বেশি। দাম্ভিক প্রশান্তকে ভালো নজরে দ্যাখে না প্রায় কেউই। তারা চায় রুনুই ফার্স্ট হোক। প্রশান্তর দম্ভ চূর্ণ হোক। চায় সেটা অবশ্য রুনুও, না হলে যে পিতৃদেবের কাছে মুখ তোলা যাবে না। কিন্তু ইংরাজি? ইংরাজিতে যে ফেল করবে রুনু। এখনও ভালো করে পড়তে পারে না। আর গ্রামার তো একটা সাংঘাতিক জিনিস। গ্রামার বোঝে রুনু। ও তো প্রায় বাংলা ব্যাকরণের মতোই। কিন্তু গ্রামারের বিরাট শব্দের বানান ও কিছুতেই ঠিক রাখতে পারছে না। প্রথমেই আছে ইংরাজি গ্রামারের পাঁচটি ভাগ কী কী? উত্তরটা মুখে ঠিক বলতে পারেঃ অর্থোগ্রাফি, ইটিমলজি, সিনট্যাক্স, পাংচুয়েশান, প্রোসোডি। কিন্তু বানান?

রুনুর পড়ার জায়গা ঠিক হয়েছে ঠাকুরবাড়ির আমবাগানে। গরমের দিনে গাছের ছায়ায় ঠান্ডা হাওয়ায় বসে পড়তে তো ভালোই লাগে। কিন্তু কেবল পড়লে তো চলবে না। রুনুর ওপর দারুণ দায়িত্ব দিয়েছেন ঠাকমা। ওর আসল কাজ হল আমবাগান পাহারা দেওয়া। তার ফাঁকে ফাঁকে যতটা পড়তে পারো পড়ো। রুনুর একটু অসাবধানতায় যদি পাড়ার কোনও দুষ্টু ছেলে একটা ঢিল ছুড়ল, অথবা কোনও দুষ্টু কাক একটা পাকা আম ঠুকরে দিল, এবং তা যদি ঠাকমা জানতে পারেন, তবে ওর আর রক্ষে নেই।

ঠাকমার গালাগালের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ লাগে রুনুর খাওয়ার খোটা দেওয়া। ঠাকমা প্রায়ই বলবেন, 'চারবেলা তো খুব গিলতি পারো, এটু নজর রাখতি পারো না? খাওয়ার বেলায় অষ্টগণ্ডা, কামের বেলায় অষ্টরম্ভা!'

দুঃখে অভিমানে চোখে জল এসে যায় রুনুর।

আবার ধরা পড়া চোর যদি হয় রুনুর ক্লাসের কোনও ছাত্র—ও স্কুলের সব ছাত্রকেই চেনেন ঠাকমা—তবে তো আরও মজা। ঠাকমা বলবেন, 'ওই মুখপোড়ার সাথে তোরও ষড় আছে হারামজাদা। ওসব বজ্জাতি চলবে না। তালি দর-দর করে খেদায়ে দেব আমার বাড়ি থিকে।'

শুধু তো মানুষ চোর নয়, দিনের কাক, রাতের বাদুড়ও ঠাকমার মুখখিস্তির চোটে অস্থির।

পরীক্ষা যখন শুরু হল, তখন ঠাকুরবাড়ির বিখ্যাত আমবাগানের প্রায় সব আমই শেষ হয়ে গেছে। আম আছে কেবল গোটা চারেক গাছে। সব ভালো জাতের আম। রুনুর প্রতি এখন আর পুরোপুরি বিশ্বাস নেই বুড়ির। ওর বিশ্বাসঘাতকতার বেশ কয়েকটা নজির পাওয়া গেছে ইতিমধ্যে। এখন বুড়ি সারাক্ষণ নিজেই পাহারা দেয়, আর রুনুকে প্রাণভরে গালাগাল দেয়। অবশ্য পড়ার জায়গা তখনও আমবাগানেই আছে।

ঘটনাটা ঘটল পরীক্ষা শুরু হবার ঠিক আগের দিন।

স্কুলের সব থেকে নিকটতম বাড়িই হল ঠাকুরবাড়ি। আমবাগানের সামনে দিয়েই করের বাড়ির সব ছাত্র স্কুলে যায়। স্কুলে যান স্যারেরাও ওই পথ দিয়ে। একটাই যে পথ।

ওর পড়ার জায়গা থেকে সব দেখা যায়, সব শোনা যায়।

সেদিনও পড়ছিল রুনু। তখনও ঘণ্টা পড়েনি, তবে অনেক ছাত্র এসে গেছে। ঘণ্টা পড়লেই রুনু যাবে।

হঠাৎ ললিত হাঁপাতে-হাঁপাতে ছুটে এল রুনুর কাছে।

'দেখে যাও কী কাণ্ড। আজ কম্মো সারা।' বলতে-বলতে রুনুর হাত ধরে টেনে নিয়ে চলল ললিত।

লাইব্রেরি ঘরের সামনে প্রচণ্ড ভিড়। সমস্ত ছাত্র নোটিশবোর্ডটাকে ঘিরে হইহই করছে। পণ্ডিতস্যার মস্ত একখানা বেত উঁচিয়ে সকলকে পাহারা দিচ্ছেন। আর কোনও স্যার তখনও আসেননি।

'একজনও নড়বে না এখান থেকে।' বেত নাচিয়ে বলছেন পণ্ডিতস্যার, 'আসুন হেডমাস্টারমশায়, তখন এর বিচার হবে।'

'কীসের বিচার হবে? ভাবছে রুনু।

ভিড় ঠেলে এতক্ষণে দেখতে পেল রুনু নোটিশবোর্ডটা। প্রায় সারা নোটিশবোর্ড জুড়ে মস্ত একখানা কাগজ ঝুলছে। তাতে বড় বড় অক্ষরে একটা পদ্য লেখা। পদ্যটা পড়তেই সারা গা শিরশির করে উঠল রুনুর।

হেড-টাক পাড়ে হাঁক

বনে যেন ডাকে বাঘ।

পোনডিত অকখয়

ঝাড়ে নাক ঝড় বয়।

দ্বিজুদার হ্যাচ-চো

ঘর কাঁপে দ্যাখছ?

রেনদা রাগিলে ঠাৎ

ট্যানসফার নিঘঘাৎ।

রুনুর প্রথমেই মনে হল, এ দুঃসাহস একমাত্র অসীমদারই হতে পারে। সন্দেহটা আরও দৃঢ় হল, অসীমদা আজ আসেনি। কিন্তু ও হাতের লেখা তো তার নয়। হাতের লেখাটা যে ঠিক রুনুর লেখার মতো। ইতিমধ্যে এক দল তো রুনুকেই সন্দেহ করে বসেছে। সে দলের নেতৃত্ব করছে প্রশান্ত।

'তোমার এই কম্মো, ওদিকে কেলাশে তো ভিজে বেড়ালডি।' রুনুকে দেখিয়ে-দেখিয়ে বলছে তারা।

রুনু কেঁদে ফেলল।

প্রশান্ত জোর গলায় বলে, 'ঠিক রণজিতের লেখা। আর কি পাকামি দেখিছ? নরেনদাকে লিখেছে 'রেনদা' কিন্তু শেষের ওই 'ঠাৎ' টা কি রে?

রুনুও ভাবছে 'ঠাৎ' মানে কি?

আর এক দলের ধারণা শ্লোকটার রচয়িতা অসীমই, কিন্তু লিখিয়েছে রুনুকে দিয়ে। রুনুর সঙ্গে যে তার দারুণ ভাব। এখন ভাবের ঠ্যালা সামলাও।

এমন সময় এসে পড়লেন হেডস্যার। তাঁর পেছনে অসীমদা, নরেনদা, আর দ্বিজুদা।

অক্ষয় পণ্ডিত প্রস্তুতই ছিলেন। হেড স্যারকে নোটিশ বোর্ডটা দেখিয়ে বললেন, 'দেখুন স্যার দেখুন, দুর্বৃত্তদের দুঃসাহস দেখুন। যে ইঁচড়ে পক্কটি এই পদ্য লিখেছে, তাকে সমুচিত শাস্তি দিতে হবে।'

দেখলেন হেডস্যার। মুহূর্তে চোখ দুটি আগুনের মতো জ্বলে উঠল। দেখলেন নরেনদা, দ্বিজুদাও। পেছন থেকে গলা বাড়িয়ে দেখল অসীমও।

হেডস্যার একটানে কাগজখানা ছিড়ে নিয়ে অফিস ঘরে ঢুকলেন।

ক্রুদ্ধ পণ্ডিতস্যার সামনে শুদ্ধ ভাষায় গালাগাল করে যাচ্ছেন। হেডস্যার লাইব্রেরি ঘরে চলে যেতেই, নরেনদা মৃদু হেসে বললেন, 'রাগ করছেন কেন পনি'মশায়? ছড়াটা কিন্তু লিখেছে বেশ। এ কবিকে তারিফ করতে হয়।'

'আপনি অতিশয়...উম...আপনার প্রশ্রয়েই সব উৎসন্নে...'

পণ্ডিতসারের বাক্যটি শেষ হবার আগেই হেডস্যারের সিঃহনাদ শোনা গেলঃ 'সব যার যার ক্লাসে গিয়ে বসো।'

মুহূর্তে বারান্দা পরিষ্কার। সারা স্কুল শান্ত। আসন্ন মহাঝটিকার পূর্বাভাস! অভয় আশ্রয় অসীমদার পাশেই এসে বসল রুনু।

'কী হইছে রে?' অসীম ফিসফিস করে বলে রুনুকে, 'টেকোর মেজাজ এত গরম ক্যান? তোরাই বা বারান্দায় ভিড় করছিলি ক্যান?'

'তুমি কিচ্ছু জানো না?'

'না কী। কি একখানা কাগজে কি যেন লেখা ছিল। পড়তি পারলাম না। টেকোডা একটানে ছিঁড়ে নিল।' বলল অসীম।

'সত্যি পড়তে পারোনি?'

'মাইরি না।'

'কে যেন সাংঘাতিক একটা কবিতা লিখিছে। সব স্যারদের নিয়ে ঠাট্টা করে।' কাঁদো-কাঁদো গলায় বলে রুনু, 'কিন্তু হাতের লেখাটা ঠিক আমার মতো। মাইরি বলছি আমি লেখিনি। বিদ্যের কিরে!'

'কী লেখিছে রে?'

মুখস্থ বলে গেল ছড়াটা রুনু। বার দুই পড়েই মুখস্থ হয়ে গেছে।

'চমৎকার লিখিছিস তো। আবার বল, আমি মুখস্থ করব।'

'সত্যি আমি লিখিনি অসীমদা।' ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল রুনু।

'দূর বোকা, কাঁদিস ক্যান? আমি বলব আমি লেখিছি।'

'কিন্তু হাতের লেখাটা যে ঠিক...আচ্ছা ক্লাস সিক্স-এর কেউ...'

'দুর দুর ওগো সব কয়ডারে আমি চিনি। কবিতা ল্যাখার মুরদ নাই কারও। অমন বুদ্ধিও নাই কারও মাথায়। আসলে লিখিছিস তুই-ই। এখন ভয় ধরিছে তাই। আমাগো স্কুলে তুই-ই তো একমাত্র কবি! তোর ভয় নাই। আমিই বাঁচাব তোরে।' রুনুকে অভয় দেয় অসীম।

হ্যাঁ, ও স্কুলে রুনুই যে একমাত্র কবি, সে কথাটাও মিথ্যা নয়। খোকাদার 'নবীন সংঘ'-এর হাতে লেখা কাগজ 'অঙ্কুর'-এ চার লাইনের এক ছড়া লিখে ইতিমধ্যেই বিখ্যাত হয়ে পড়েছে রুনু। খোকাদা লিখতে বলেছিলেন সবাইকে। লিখেছিল মাত্র তিনজন। তার মধ্যে একমাত্র রুনুর কবিতাই খোকাদার কাগজে উঠেছিল। সে কবিতাটা হলঃ

আমাদের ছাগলের তিনখানা বাচ্চা

একানি দুয়ানি আর রুকমিনী নাম

ঘাস খায় কম কম দুধ দেয় সাচ্চা

ছাগলের 'মধুমতী' নাম রাখিলাম।

সেদিন খোকাদা নরেনদা দ্বিজুদা এমনকী পণ্ডিতস্যারও প্রশংসা করেছিলেন রুনুকে। যে ছেলে এই বয়সেই ছাগলের নাম 'মধুমতী' রাখতে পারে, সে যে ভবিষ্যতে একটা সাংঘাতিক কবি হবে, তাতে আর সন্দেহ ছিল না কারও। সেই ভবিষ্যতের সাংঘাতিক কবিই তো লিখতে পারে আজকের এই সাংঘাতিক কবিতা। অসীমের আর সন্দেহ রইল না মনে।

একটু পরে লাইব্রেরি ঘর থেকে হেডস্যার নাম ডাকা শুরু করলেন। থ্রি, ফোর, ফাইভ, সিক্স— পর পর এক এক ক্লাস। নাম ডাকা শেষ হতে শোনা গেল একটা ঘোষণা।

'কাল দশটা থেকে তোমাদের পরীক্ষা আরম্ভ হবে। পরীক্ষার রুটিন বলে দিচ্ছি লিখে নাও।'

একে একে থ্রি ফোর ফাইভ সিক্স সব ক্লাসেরই রুটিন তিনি লিখিয়ে দিলেন লাইব্রেরি ঘর থেকেই। সে কী গলা! এক মাইল দূর থেকেই শোনা যায় নাম ডাকা। শোনা যায় পরীক্ষার রুটিনও।

রুটিন লিখিয়ে দিয়েই তিনি নীচের দু-ক্লাসের ছুটি দিয়ে দিলেন। এবার হুকুম হল, 'ফাইভ সিক্স-এর সব ছাত্র ফাইভ-এর ঘরে এসে বসো।'

এক মিনিটের মধ্যেই সিক্স-এর সব ছাত্র এসে পড়ল রুনুদের ঘরে। সামান্য একটু নড়াচড়া ফিসফাস হল। তারপর আবার নেমে এল সেই অদ্ভুত স্তব্ধতা। সকলেরই চোখে-মুখে ভয়ের ছায়া। স্বাভাবিক নেই দুঃসাহসী অসীমের চোখ-মুখও।

হঠাৎ ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুকেই হেডস্যার প্রথমে টেবিলটাকে গোটাকয়েক কষাঘাত করলেন হাতের জোড়াবেত দিয়ে। তারপর হাঁক পাড়লেন, 'নিবারণ!'

'আজ্ঞে।' মাথা নীচু করে প্রবেশ করল 'ঘণ্টা-পিয়ন' নিবারণদা।

'প্রত্যেককে এক সিট করে কাগজ দাও।'

লাইব্রেরি ঘর থেকে মুহূর্তে কাগজ এল। নিমন্ত্রণের পাতার মতো সবার সামনে একখানা করে দিয়ে গেল নিবারণদা।

'যার যার নাম লেখো কাগজের ওপরের দিকটায়।...হল?...এবার যা বলছি লেখো। ডিকটেশান।'

ক্লাসে ডিকটেশান ইতিপূর্বে সকলেই লিখেছে। ডিকটেশান লিখতে প্রস্তুত হল সকলে।

হেডস্যার পকেট থেকে বের করলেন সেই কাগজখানা। ধীরে-ধীরে পড়ে গেলেন এক একটি লাইন। যথা নিয়মে সমস্তটা আবার পড়লেন দ্বিতীয়বার রিভিশান-এর জন্য।

একে-একে সকলের কাগজই জমা হল হেডস্যারের টেবিলে।

এতগুলি ছাত্রর মধ্যে সেদিন একমাত্র রুনুরই ফুল মার্কস পাবার কথা। একটাও ভুল হয়নি। ঠিক যেমনটি দেখেছিল—একেবারে 'পোনডিত অকখয়' থেকে 'ট্যানসফার নিঘঘাৎ' পর্যন্ত নির্ভুল। আর নির্ভুল ডিকটেশান লিখে সেদিন যা পুরস্কার পেল রুনু, সে পুরস্কারের কথাও কি সে ভুলতে পারবে কোনওদিন!

আজও বুঝতে পারে না রুনু, সেদিন কোথা থেকে সে পেল ওই শক্তি। কী করে শক্ত পায়ে দাঁড়িয়ে এক হাতের উপরই নিতে পারল সেই ভয়ঙ্কর বেতের তিন-তিনটে চাবুক। ঠিক সেই মুহূর্তে নরেনদা এসে ওকে উদ্ধার না করলে ও হয়তো মরেই যেত সেদিন।

নরেনদাকে রাগতে দেখেনি রুনু, কিন্তু শুনেছে। শুনেছে নরেনদা রাগলে নাকি একেবারে আগুন। সেই আগুনের মুখে কবে একটা ছেলে পড়ছিল, এবং সেইদিনই নরেনদার বেতের চোটে সে ট্রান্সফার নিতে বাধ্য হয়েছিল, সে গল্প শুনেছে রুনু। সেদিন দেখেছিল সেই আগুন নরেনদার দু-চোখে। দেখেছিলেন হয়তো হেডস্যারও।

রুনুর এক হাতে তিনটে চাবুক পড়তেই হঠাৎ নরেনদা ছুটে এসে ওকে জড়িয়ে ধরলেন। হেডস্যারের হিংস্র চোখের উপর নরেনদা তুলে ধরলেন তাঁর সেই আগুন চোখ। মাত্র এক মুহূর্ত। তারপর একটি মাত্র কথা, 'থামুন!'

রুনুকে প্রায় কোলে করে বারান্দায় নিয়ে এলেন নরেনদা। তার রক্তাক্ত হাত রুমাল দিয়ে মুছে দিতে-দিতে বললেন, 'ও কবিতাটা সত্যি তুমি লিখেছ রুনু? আমার তো বিশ্বাসই হয় না।'

যে মূল্য দিয়ে এই কবিখ্যাতি ক্রয় করতে হল, তারপর আর অস্বীকার করে লাভ কি। করলে তো বিশ্বাসই করবে না কেউ। রুনু মৃদু মাথা নেড়ে অপরাধী গলায় বলে, হ্যাঁ, স্যার।'

'চমৎকার! সাবাস!!' বুকে জড়িয়ে ধরলেন তিনি রুনুকে। আবেগভরে বললেন, 'তুমি কবি। বরন পোয়েট!'

নরেনদার ইংরাজি কথাটার মানে বুঝল না রুনু। কিন্তু একটা আশ্চর্য আনন্দে আর উত্তেজনায় হাতের ব্যথাটার কথা একেবারই ভুলেই গেল!

বাজুনিয়া স্কুলের সেই সামান্য ঘটনাটা মনে রাখেনি হয়তো কেউ। কিন্তু মুখে-মুখে ঘুরে ঘুরে ছড়াটা মুখস্থ হয়ে গেছে সকলের। তারপর থেকে পণ্ডিতস্যারের নস্যির নাকঝাড়া শুনলেই এ ওর কানে-কানে বলেছে, 'পোনডিত অকখয় ঝাড়ে নাক ঝড় বয়।' দ্বিজু মাস্টারের প্রচণ্ড হাঁচিতে ঘর না কাঁপলেও ওরা বলতে ছাড়েনি, 'দ্বিজুদার হ্যাচ-চো ঘর কাঁপে দ্যাখছ।'

তিন বেতেই বিখ্যাত হয়ে গেল রুনু। অসীমদা আর ভীরু বলে না, প্রশান্ত আর তাকায় না তাচ্ছিল্যের চোখে। আপন মনে রুনুই কেবল ভাবে, কে লিখেছিল ওই কবিতাটা?

দশ

ফার্স্ট টার্মিনাল পরীক্ষা হয়ে গেল। বাজুনিয়া স্কুলে রুনুর প্রথম পরীক্ষা।

গোবরা পাঠশালায় পরীক্ষা হত প্রতি সপ্তাহে। সাপ্তাহিক পরীক্ষা। সে পরীক্ষার এত জাঁকজমক ছিল না। ছিল না ছাপানো প্রশ্নপত্র। ছিল না স্কুলের দেওয়া কাগজ-কালি।

ফার্স্ট টার্মিনাল কথাটা এখানে এসেই শিখেছে রুনু! গ্রীষ্মের ছুটির আগে ফার্স্ট টার্মিনাল, পূজার ছুটির আগে সেকেণ্ড টার্মিনাল, আর সব শেষে ক্লাসে ওঠার পরীক্ষাটার নাম অ্যানুয়াল পরীক্ষা। নতুন শব্দগুলি শুনে-শুনে মুখস্থ তো হয়ে যায়, কিন্তু বানান? ইংরাজি শব্দের বানানের কোনও মাথামুন্ডু নেই। ফাদার লিখতে কেন FA...আর মাদার লিখতে কেন MO...,RAM যদি রাম, তবে RAM আবার র‌্যাম কেন? এ সব প্রশ্নের কোনও জবাব নেই। ইংরাজি পরীক্ষার খাতায় কোনও শব্দর যে কি বানান করেছে রুনু, কিছুই খেয়াল নেই। কি জানি কি হবে ইংরাজির ফল। আর সব বিষয়ে অবশ্য ওর ভাবনা নেই।

পরীক্ষা যেমনই হোক, পরীক্ষাই শেষ হয়ে গেলে রুনুর বরাবরই মনে হয়েছে, বুঝি বুকের উপর থেকে একটা পাষাণ চাপা নেমে গেল। নিজেকে তখন পাখির মতো হালকা মনে হয়।

পরীক্ষার ফল জানা যাবে এক সপ্তাহ পরে। আর তার পরেই তো লম্বা ছুটি। এই এক সপ্তাহ আর পড়াশুনো নেই। কিচ্ছু করবার নেই রুনুর।

পড়া নেই বলে ভোরে ওঠার অভ্যাসটা ছাড়েনি রুনু। সেদিন উঠেছিল ভোরে। এবং সেই ভোরেই হঠাৎ আবিষ্কার করে ফেলল বকুলগাছটাকে। স্কুল থেকে করের বাড়ি যেতে দিঘির পাড়ের ওই কোণে যে ঝাঁকড়া গাছটা অনেকখানি জায়গা অন্ধকার করে দাঁড়িয়ে থাকে সব সময়, যে গাছতলা দিয়ে যেতে রুনুর বুক দুরু দুরু করে সন্ধ্যার পর, সেটা যে একটা বকুলগাছ, তাই তো জানত না রুনু। দূর থেকেই বকুল ফুলের পরিচিত গন্ধ ওর মনকে মুহূর্তে নিয়ে গেল মধুমতীর তীরে। আহা, এই গরম কালের শ্রেষ্ঠ ফুলই তো বকুল ফুল। কত সকাল, কত দুপুর কেটে গেছে রুনুর বকুল ফুলের মালা গেঁথে। ওদের বাড়ির আশেপাশে অনেক বকুলগাছ আছে। কিন্তু এই বিলে দেশেও যে বকুলগাছ থাকতে পারে, তা সে ভাবেইনি।

ইতিমধ্যেই কয়েকটি ছেলেমেয়ে জড়ো হয়েছে বকুলতলায়। তারা কলরব করে ফুল কুড়োচ্ছে। দলের মধ্যে একটি ফুটফুটে মেয়ে, বয়সে ছোট হলেও সর্দারি করছে সে সবার উপরে। কে ওই মেয়েটা? ওকে তো কোনওদিন আগে দেখেছে বলে মনে পড়ে না রুনুর। করের বাড়ির কারও মেয়ে নিশ্চয়। মরুকগে যা। মেয়ে নিয়ে গবেষণা করার সময় নেই রুনুর। ও শুরু করল ফুল কুড়োতে।

মাত্র এক মুঠো ফুল কুড়িয়েছে রুনু, সেই মেয়েটা ওর কাছে এসে লাগাল এক ধমকঃ 'এই ছেলেটা, ফুল কুড়োচ্ছ কেন? এটা তোমার গাছ?'

ওইটুকু মেয়ের ডেঁপোমি দেখে রেগে যায় রুনু। কথার জবাব দেয় না। শক্ত চোখে চেয়ে থাকে তার দিকে।

'হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছ কেন বোকচন্দোর। যাও পালাও। লজ্জা করে না পরের ফুল চুরি করতে!' ভেঙচি কেটে বলে মেয়েটা।

গায়ে যেন অ্যাসিড ছুড়ে দিল ওইটুকু পুচকে মেয়ে। রাগে অপমানে চোখ-মুখ কালো হয়ে গেল রুনুর। হঠাৎ হাতের ফুলগুলি ওর গায়ে ছুড়ে দিয়ে দৌড় দিল রুনু। ছুটতে-ছুটতে বলে, 'চাইনে তোগে ফুল। ও ফুল ভরে আমি...'

পেছন থেকে একটা খিলখিল হাসি শোনা যাচ্ছ। সঙ্গে বিষ মাখানো কথার তির ছুড়েছে মেয়েটা, 'এ রামঃ, ফুল চোর পা-লায়, ফুল চোর পা-লায়।' হাসছে আর হাততালি দিচ্ছে ওরা সকলেই।

হাঁপাতে-হাঁপাতে বাড়ি এল রুনু। মনের জ্বালাটা কিছুতেই মিটছে না। হোক না করের বাড়ির মেয়ে, হোক না ওরা বড়লোক, রুনু এর শোধ নেবেই। ভাবতে-ভাবতে ভালো মতলবও এসে গেল মাথায়। রাত থাকতে উঠে ও সব ফুল কুড়িয়ে আনবে। ওরা এসে পাবে কাঁচকলা!

খুব ভোরেই উঠে ছিল তার পরের দিন রুনু। ওরা পৌঁছবার আগেই কুড়িয়ে ফেলেছিল প্রায় সব ফুল। কিন্তু হঠাৎ...

হঠাৎ যে কাণ্ডটা ঘটল তার জন্যে ও প্রস্তুত ছিল না। মাথা নীচু করে অত্যন্ত দ্রুত হাতে ফুল কুড়োচ্ছিল রুনু। হঠাৎ পেছন থেকে এক প্রবল ধাক্কা। সঙ্গে-সঙ্গে ধমকও, 'এই চোর, আবার এসেছিস আজ?'

তেলের পিপের মতো গড়াতে-গড়াতে ঝুপ করে পুকুরের মধ্যে পড়ে গেল রুনু। পাড়ে দাঁড়িয়ে সেই মেয়ের সে কি হাসি আর হাততালি তখন! হাসছে তার দলবলও।

সারা গায়ে জলকাদা মেখে, কয়েক বোতল কাদাজল গিলে খোঁড়াতে-খোঁড়াতে পাড়ে উঠল রুনু। একবারও আর ফিরে তাকাল না পেছন দিকে। সোজা চলে এল বাড়ি। মনে-মনে কঠোর সংকল্প, এর শোধ আমি নেবই!

শোধ ঠিকই নিয়েছিল রুনু। নিয়েছিল তার পরের দিনই। সেদিন আর ফুল কুড়োনো নয়। সেদিন প্রায় দুপুর রাতেই গিয়ে লুকিয়ে ছিল ওই গাছের আড়ালে। সেদিনও এসেছিল মেয়েটি। একেবারে মোক্ষম মুহূর্তে লাগাল ধাক্কা। ধাক্কাটা বুঝি একটু বেশি জোরেই হয়ে গেল। প্রথমে একটা ডিগবাজি খেয়ে শ্রীমতী গড়িয়ে চললেন জলের দিকে, আর রুনু দৌড়ে চলল বাড়ির দিকে।

পেছন থেকে একটা হই-হট্টগোল কান্নাকাটি শোনা যাচ্ছিল বটে, কিন্তু রুনু আর পেছন ফেরেনি।

সেদিনটা ছিল শনিবার। পরীক্ষার রেজাল্ট কালই জেনেছে রুনু। আজ ছুটি হয়ে যাবে। ঠিক করে ফেলল এখুনি ও বাড়ি রওনা হবে। আজ আর স্কুলে যাবে না। বাড়ির পথ তো ওর চেনাই হয়ে গেছে।

তাড়াতাড়ি বইটই গুছিয়ে এক পুঁটুলি বেঁধে ফেলল রুনু। তারপর পুঁটুলি হাতে বারান্দায় এসেই কাকিমাকে এক প্রণাম।

'কিরে, অখনই পেনাম কিসের?'

'বাড়ি যাব। আজ তো স্কুল ছুটি হয়ে যাবে। পড়াশুনো তো আর হবে না।'

'তা অখনই কিসের। রান্না করি। খাওয়া-দাওয়া করিয়া রওনা হবি।'

'না এক্ষুনি যাব। দেরি করলি রোদ বাড়ে যাবে।' ব্যস্ত হয়ে ওঠে রুনু।

'তয় দুগা পান্তাভাত খাইয়া যা। পোলা তো বাড়ি যাওনের নামে পাগল।'

কাকিমার অনুরোধে শেষ পর্যন্ত নাকে-মুখে এক বাটি পান্তাভাত গুঁজে দিয়ে আবার দৌড় দিতে যাচ্ছিল রুনু। এবার বাধা দিলেন ঠাকমা।

ঠাকমাকে প্রণাম করে উঠে দাঁড়াতেই তিনি বললেন, 'ওরে এটু সবুর কর মুখপোড়া। বাড়ি পলায়ে যাচ্ছে না। দাঁড়া তো বাপ-মারে আর তোগে ভাই বুনগি খানকয় আমসত্ত্ব দেব।'

সারা গ্রীষ্মকালটা রোদে পুড়ে-পুড়ে প্রচুর আমসত্ত্ব করেছেন ঠাকমা। সে জিনিস ওঁর বুকের রক্ত। যে কাঠের সিন্দুকে আমসত্ত্ব থাকে তার চাবি হাতছাড়া করেন না উনি কখনও। রুনুকে দাঁড় করিয়ে রেখে বেশ বাছাবাছা চারখানা আমসত্ত্ব নিয়ে এলেন ঠাকমা পরিষ্কার ন্যাকড়ায় জড়িয়ে। রুনুর পুঁটুলির মধ্যে গুঁজে দিয়ে বললেন, 'পথে যাতি যাতি আবার খাইয়ে শ্যাষ করিস না। বাড়ি নিয়ে তোর মা-র হাতে দিবি। আচ্ছা দাড়া।' আবার ঘরে গেলেন ঠাকমা। এবার আলগা একখানা আমসত্ত্ব এনে রুনুর হাতে দিয়ে বললেন, 'নে এই খেন খাতি-খাতি যাবি।'

রুনু আর একটা প্রণাম করল ঠাকমাকে। তারপর লাগাল দৌড়। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পালাতে চায় ও। সেই মেয়েটার সাথীসঙ্গীরা যেন ওকে ধরতে না পারে।

সেই চৈত্র সংক্রান্তিতে বাড়ি গেছিল দাদার সঙ্গে, আর আজ জ্যৈষ্ঠের মাঝামাঝি। ইতিমধ্যে পথঘাটের চেহারা একেবারে পাল্টে গেছে। তখন ছিল শুকনো পথ, এখন জল কাদার পথ। তখন ছিল চষা খেতের মাটি-মাটি গন্ধ, এখন জোলো-জোলো কাদা গন্ধ। ইতিমধ্যেই অনেক ধান খেতে এক হাত দেড় হাত লম্বা হয়ে গেছে ধান গাছ। কী মিষ্টি একটা গন্ধ ধান খেতের! এ গন্ধ তো আগে আর পায়নি রুনু। দুধারে ধানে খেতের মধ্য দিয়ে সরু আলপথ পড়েছে। আগে ছিল সরাসরি মাঠের মধ্য দিয়ে রাস্তা। অনেক আল ঘুরতে ঘুরতে পথটা এবার খুব দীর্ঘ হয়ে গেছে।

মাঝিগাতি গ্রামের কাছে আসতেই ওর মনে পড়ল জলধরের নিমন্ত্রণের কথা। মাঝিগাতি গ্রামেই সেই লম্বা ছেলে জলধর কর্মকারের বাড়ি। মাঝিগাতি গ্রাম চিনতে কারও কষ্ট হয় না। আধ মাইল দূর থেকেই শোনা যায় কামার পাড়ার ঠাই-ঠাই ঠঙ-ঠঙ শব্দ। দেখা যায় সারা আকাশ কালো ধোঁয়ায় সমাচ্ছন্ন।

জলধর বলেছিল, 'তোমাদের বাটি যাইবার পথে এবার আমাদের বাটি গমন করিও।'

নিমন্ত্রণ শুনেই হেসে ফেলেছিল রুনু।

'হাসিতেছে কেন?' গম্ভীর ভাবে জিজ্ঞাসা করেছিল জলধর।

'আপনি ওভাবে কথা বলেন কেন?'

এক ক্লাসের ছাত্র হলেও অতবড় মানুষটাকে 'তুমি' বলতে সাহস পায় না রুনু।

'কেন আমি কি অশুদ্ধ কথা বলিয়াছি?'

'আমরা যেভাবে কথা বলি সেইভাবে বলতি পারেন না?'

'আমি পুস্তক পাঠ করিয়া শুদ্ধ কথা শিক্ষা করিয়াছি। আমাদের গ্রাম্য ভাষা অতিশয় দূষিত।'

হাসি সামলে রুনু বলেছিল, 'আপনি দাও কাচি এইসব বানাতি পারেন?'

'কেন পারিব না। প্রথমে পৈত্রিক পেশা শিক্ষা করিয়া পরে বিদ্যাশিক্ষা করিতেছি। বিদ্যালাভ না করিলে উন্নতি হয় না। আমি উন্নতি করিব।' উজ্জ্বল চোখে বলেছিল জলধর।

সেই চোখের দিকে তাকিয়ে রুনুরও মনে হয়েছিল নিশ্চয় উন্নতি করবে। স্কুলের সকলের হাসির পাত্র এই 'লম্বু জলধর'-কে সেদিন মনে-মনে শ্রদ্ধা করেছিল রুনু।

'আমি স্বহস্তে নির্মাণ করিয়া তোমাকে একখানা ছুরিকা প্রদান করিব।' বলেছিল জলধর, 'আমাদের বাটিতে চিড়া-মুড়ি খাইতে তোমার আপত্তি নাই তো?'

'না, না, চিড়ে-মুড়ি খাতি আবার আপত্তি কি। নিশ্চয় যাব। নিশ্চয় যাব এবার বাড়ি যাবার পথে আপনাদের বাড়িতে।' নিমন্ত্রণ গ্রহণ করেছিল রুনু।

মাঝিগাতি গ্রামের ঠঙ-ঠঙ আওয়াজ কানে আসতেই রুনুর মনে পড়ল সেই নিমন্ত্রণে কথা। সেই 'ছুরিকা'-র কথা।

জলধরদের উঠোনে এসে আর ডাকতে হল না জলধরকে। দেখা গেল রক্ত-রং এক খণ্ড লোহাকে প্রবল বেশে হাতুড়ি পিটছে জলধর। আর একটা অসুরের মতো মানুষ মস্ত একখানা সাঁড়াশি নিয়ে নেহাই-এর উপর সেই আগুনের দলাটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ধরছে। হাতুড়ি আছে তার হাতেও, আর পায়ের বুড়ো আঙুলে বাঁধা হাপরের দড়ি। এক সঙ্গে দুহাত আর পায়ে কাজ করছে লোকটা।

রুনুকে দেখেই জলধর কাজ থামিয়ে ওকে স্বাগত জানাল।

'আইস রণজিৎ। ইনি আমার পিতা।' জলধর তার পিতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল রুনুর।

ওই ভয়ঙ্কর মানুষটার মুখের হাসিটা কিন্তু একেবারে শিশুর মতো মিষ্টি সরল হাসি।

'বসেন বাবু বসেন।' হাসি মুখে হাতজোড় করে বলছে সেই বিশাল মানুষটি।

'আমাকে আপনি বলেন কেন?' প্রতিবাদ করে রুনু।

'আপনারা ভদ্দোর লোক।' হাসল জলধরের পিতা। ইতিমধ্যে জলধর রুনুর জন্য এককানা ছোট জলচৌকি নিয়ে এসেছে। আর নিয়ে এসেছে একটা আশ্চর্য বস্তু!

'এই দ্যাখো তোমার ছুরিকা। আমি নিজে প্রস্তুত করিয়াছি।'

জিনিসটা দেখে একেবারে চমকে উঠেছে রুনু। কী সর্বনাশ, এত সুন্দর। এত সুন্দর হয় ছুরি! হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছে রুনু। ছুরির উপর খোদাই করেছে 'জলধর কর্মকার' আর কাঠের হাতলের উপর কেটে কেটে লিখেছে 'রণজিৎ'। কী চকচক করছে ছুরির ফলাটা। লোহা কি চকচক করে?

'এটা লোহার না রূপার?' প্রশ্ন করে রুনু।

'লৌহও নয়, রৌপ্যও নয়। উহা ইস্পাত।' গম্ভীর গলায় বলে জলধর।

সেদিন ওদের বাড়িতে বেশ পেট ভরেই চিড়া-মুড়ি খেয়েছিল রুনু। কথা দিতে হয়েছিল ফিরবার পথে আবার ও দেখা করে যাবে।

সেই মহামূল্যবান 'ছুরিকা'-র বিনিময়ে রুনুও দিয়েছিল জলধরকে একটা মূল্যবান জিনিস। দিয়েছিল সেই আস্ত আমসত্ত্বখানা, যেখানা ঠাকমা খেতে দিয়েছিলেন রুনুকে।

এগারো

ছুটি শেষ হবার তিনদিন আগেই পাঠিয়ে দিলেন রুনুকে পণ্ডিতমশাই শুভ দিন দেখে। তখন আর হাঁটা পথ নেই। স্কুল খুলবে আষাঢ়ের বিশ তারিখ। বর্ষায় বিলে দেশ জলে টইটুম্বুর। বাড়িগুলি ভেসে থাকে দ্বীপের মতো। তেমনই একটা দ্বীপ হয়ে গেছে বাজুনিয়া স্কুল বাড়িটা। স্কুলের ঘাটেই নৌকা বেঁধেছিল নগরবাসী। স্কুল থেকে ঠাকুর বাড়ি তো মাত্র এক মিনিটের পথ। সে পথটুকু বর্ষায়ও ডোবে না। যেমন ডোবে না করের বাড়ি যাবার পথটুকু।

বিকেলে একটু বেড়াতে বেরিয়েই অসীমদার কাছে পেল এক সাংঘাতিক খবর। নরেনদা, খোকাদা এবং আরও অনেককে নাকি ধরে নিয়ে গেছে পুলিশ। ভেঙে গেছে খোকাদার নবীন সংঘ, নরেনদার ক্লাব। লাইব্রেরি ঘরে তালা দিয়ে গেছে পুলিশ।

একটা অসহ্য কান্নায় বুক ভেঙে যাচ্ছে রুনুর।

'পুলিশে কেন ধরল? কী করেছিলেন ওঁরা?'

'তা-ও জানিস না?' বিজ্ঞজনের মতো বলে অসীম, 'ওরা তো রাজদ্রোহী। ওরা খদ্দর পরে, বন্দোমাতরম বলে, বিলিতি কাপড় পোড়ায়, আরও কত কী করে।'

'রাজদ্রোহী' শব্দটা পড়েছে রুনু ইতিহাসে। সিপাহি বিদ্রোহের সময় সিপাহিরা নাকি রাজদ্রোহিতা করেছিল। তাই তো ইংরেজ রাজা তাদের সব গুলি করে মারল।

'নরেনদাদেরও কি ইংরেজরা গুলি করে মারবে?' শুকনো গলায় প্রশ্ন করে রুনু।

'মারতিও পারে', নির্বিকার ভাবে বলে অসীম, 'আগে তো জেলে দেবে। জেলে ঘানি টানাবে, আরও কত কি করাবে।'

এত বড় দুঃখের সংবাদটায় অসীমদার যে কেন দুঃখ হয় না বোঝে না রুনু। কিন্তু কত জিনিস জানে অসীমদা। রুনু তো এসব কিছুই জানে না। ওর কেবল কান্না পাচ্ছে খোকাদার কথা ভেবে। খোকাদার দিদির কথা ভেবে।

'খোকাদারে পুলিশে ধরলি দিদি খুব কাঁদিছিল, তাই না?'

'একটুও না। দিদি খুব সাংঘাতিক রে। পুলিশের মুখের উপরই বলে দিল, দেশকে ভালোবাসলি, দেশের মানুষকে ভালোবাসলি যদি জেলে যাতি হয়, তাহলে খোকা শত শত বার জেলে গেলেও আমার দুঃখু নাই। কিন্তু সাবধান, আমার ভাই-এর গায়ে কেউ হাত দেবা না!' নিন্দা করতে গিয়েও অসীম যে দিদির প্রশংসা করল তা বোধহয় ও বুঝল না।

রুনু সবিস্ময়ে ভাবল, সেই স্নিগ্ধ শান্ত দিদির মধ্যে এত সাহসও ছিল! এই দুঃসাহসী দিদিকে নতুন করে দেখতে ইচ্ছা হল রুনুর। ইচ্ছা হল তালা ঝুলোনো লাইব্রেরি ঘরটাও দেখতে। কিন্তু কি যেন একটা ভয় ওকে পেয়ে বসল। করের বাড়িটাই যেন একটা ভয়ের বাড়ি হয়ে গেছে। আরও একটা ভয় আছে, হঠাৎ মনে পড়ল রুনুর। সেই মেয়েটার ভয়। কোন বাড়ির মেয়ে সে, আজও জানে না রুনু।

বিষণ্ণ মনে ঘরে ফিরে এল রুনু। আজ আবার দিপু-নিপুও বাড়ি নেই। তারা বেড়াতে গেছে তাদের পিসিবাড়ি পাশের গ্রামে। কাকিমাকে এক হাতে সব করতে হচ্ছে। ঠাকমা যে হঠাৎ খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।

ঠিক সন্ধের সময় ঠাকমা ডাকলেন রুনুকে।

'যা তো দাদা শৈলীর কাছেতে এট্টু ওষুধ নিয়ে আয়।'

'কী হয়েছে ঠাকমা?'

'সেই দুফরের পরেত্তে দাস্ত হচ্ছে। ক'বি এরি মধ্যি ৮/১০ বার দাস্ত হইছে।'

খোকাদার দিদিকে ঠাকমা শৈলী বলে ডাকেন। দিপু, নিপু বলে শৈলী পিসি। রুনু ডাকে দিদি বলে। দিদির যে একটা হোমোপ্যাথি বাক্স আছে তা জানে রুনু। গ্রামের অনেকেই যায় দিদির কাছে ওষুধ আনতে। ঠাকুর বাড়িতে তো দিদি বাঁধা ডাক্তার। আগেও কয়েকবার দিপু-নিপুর জন্যে সর্দি-কাশি, আমাশার ওষুধ এনেছে রুনু।

একা-একা এই সন্ধের সময় করের বাড়ি যেতে ভয় করছে রুনুর। তা বলে তো ঠাকমার ওষুধ না আনলে চলবে না।

কাকিমা ওর হাতে একটা পরিষ্কার কাচের শিশি দিয়ে বলেন, 'যা বাবা এক দৌড়ে যাবি আর আবি। শৈলদির ওষুধ খুব ভালো। অখনই ওষুধ না খাইলে তোর ঠাকমা হাগতে হাগতেই মরবে।'

না, ঠাকমাকে মরতে দেবে না রুনু। এক দৌড়েই চলে এসেছে একেবারে খোকাদাদের দোর গোড়ায়। বুকের মধ্যে ঢিপ ঢিপ করছে। ঘরের দরজাটা ভেজানো। সরু একটু আলোর রেখা পড়েছে এসে বারান্দায়। ভিতরে একটা শিশু কণ্ঠের পাঠ শোনা যাচ্ছে। দুটি লাইনই বার বার পড়ছে, কিন্তু প্রতিবারই একটা ভুল পড়ে যাচ্ছে। আর প্রতিবারই রুনুর কানের মধ্যে খট করে উঠছে ভুলটা।

সে পড়ছেঃ

ধন ধান্য পুষ্পভরা আমাদের এই বসন্ধরা

তাহার মাঝে আছে দেশ এক সকল দেশের সেরা।

কিন্তু কে? খোকাদার ঘরে ছোট ছেলেমেয়ে অবশ্য অনেক দেখেছে রুনু যখনই এসেছে। বাচ্চাদের নিয়েই তো ছিল খোকাদার 'নবীন সংঘ'। তাদেরই কেউ কি আছে এখন দিদির কাছে খোকাদা চলে যাওয়ায়? কৌতূহল দমন করতে পারছে না রুনু। দরজাটা একটু ঠেলতেই কিচ করে একটু শব্দ হল। খুলে গেল দরজাটা। দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে যে মুখখানা ওর দিকে তাকাল, সে মুখ এখানে দেখবার কথা ও স্বপ্নেও ভাবেনি। এ যে সেই মেয়ে! চমকে উঠল রুনু।

একটু বুঝি চমকে উঠেছিল সে-ও। এক পলক তাকিয়ে রইল রুনুর দিকে। ফিক করে একটু হাসল। তারপর বাঁ-হাতের তালুর উপর ডান হাতের মুঠো দিয়ে গোটা কয়েক কিল দেখিয়ে এক দৌড়ে রান্নাঘর।

ইঙ্গিতটা পরিষ্কার। অর্থাৎ, তোমার পিঠে আজ তাল পড়বে।

যেতে-যেতে চিৎকার করছে মেয়েটা। 'ওমা-আ, মা গো-ও, সেই ছেলেটা এসেছে।'

'মা বলছে দিদিকে? তবে কি ও দিদির মেয়ে? কী আশ্চর্য, কতবার এসেছে এ-বাড়িতে, একবারও তো দেখেছে বলে মনে পড়ে না ওকে।

'কে রে?' রান্নাঘর থেকে দিদির গলা শোনা গেল।

'সেই যে দিপুদের বাড়িতে থাকে একটা ছেলে।'

'ও মা, রুনু আইছিস?' রান্নাঘর থেকে আঁচলে হাত মুছতে-মুছতে এসেই রুনুকে কোলে টেনে নিলেন দিদি। রুনু প্রণাম করল।

'কখন আইছিস রে?'

'আজ দুপুরে।'

'আর দিদির কথা মনে পড়ল বুঝি এই রাত্তিরে?'

'খোকাদা-আ!' বলতে-বলতে একেবারে হু-হু করে কেঁদে পড়ল রুনু।

'ওমা, তুই কাঁদিস ক্যান? কার কাছে শুনলি?'

'অসীমদা।' আরও বেশি চেপে এল কান্না।

'দুর বোকা ছেলে', রুনুর চোখ মুছিয়ে দিয়ে বলেন দিদি, 'কোনও অপরাধ করেনি খোকা। চুরি নয়, ডাকাতি নয়, কিচ্ছু নয়। তাজ্জন্যি কাঁদব ক্যান রে আমরা? সে তো হাসতি হাসতি গেছে। কেবল দেশটারে ভালোবাসে। দেশের শত্রুদের নিপাত করতি চায়। খোকা আমার সোনার ছেলে। সোনার ভাই। আবার ফিরে আসবে। কাঁদে না। সেই খবর নিতি আইছিস এই রাত্তিরি?'

'না।'

'তবে?'

'ঠাকমার ওষুধ নিতি আইছি।'

'কী হইছে?'

'আট-দশবার দাস্ত হইছে আজ।'

হোমোপ্যাথির বাক্স খুলে শিশিতে ওষুধ দিলেন দিদি। তারপর নিজেই শিশিটা হাতে নিয়ে বললেন, 'চল তোরে পৌঁছয়ে দিয়ে আসি। তোর ঠাকমারে দেখেও আসব।' হারিকেনটা হাতে নিয়ে বললেন, 'চুয়াও চলরে। তুই তো আবার একা থাকতি পারবি না।'

ওর পিঠে যে দিদির হাতের তাল পড়বে না সেটা এতক্ষণে বুঝতে পেরেছে রুনু। সাহসও বেড়ে গেল তাই। পথে চলতে-চলতে বলল, 'ও আপনার মেয়ে? আগে দেখিনি তো?'

'ওমা কইস কি? তুই কি কানা? তয় মাঝে মাসখানেক কলকাতায় ছিল ওর জ্যাঠার কাছে। এই তো গরমের ছুটির আগে আগেই আইছে।'

মনে-মনে হিসেব মেলায় রুনু। গরমের ছুটির আগে আগেই তো ঘটল সেই ঘটনা। তাহলে যখন থেকে ও খোকাদার বাড়ি যাতায়াত করছে তখন চুয়া কলকাতায় ছিল। আরও একটা হিসাব মিলিয়ে নিল রুনু। চুয়ার এখন আর রাগ নেই ওর ওপর, তাহলে ওকে দেখেই ফিক করে হাসত না। এবার সাহস করে বলল, 'তুমি ভুল পড়ছিলে। বসন্ধরা নয়, বসুন্ধরা হবে।'

'তোমার আর পণ্ডিতি করতে হবে না। আমি ঠিকই পড়ছি।' ফুঁসে ওঠে চুয়া।

'ছিঃ চুয়া, ভারি অসভ্য তো তুই! রুনু তো ঠিকই বলিছে।'

'ইশ, তুমি দ্যাখো না গিয়ে আমার বইতে।'

রুনুরও জিদ চেপে যায়। তেজের সহিত বলে, 'যদি বসুন্ধরা থাকে, তাহলে?'

'তাহলে তুই ওকে তিন কানমলা দিবি।' বলেন দিদি।

আর রুনু হেরে গেলে কিন্তু আমিও ওকে তিন কানমলা দেব।' তেমনি জেদি গলায় বলে চুয়া।

'ছিঃ ছিঃ ছিঃ চুয়া! রুনু তোমার বড় না?' ধমক দিয়ে বলেন দিদি, 'ওকে রুনুদা বলে ডাকবা।

'ইস রুনুদা না ছাইদা। ও সেদিন আমাকে...'

বুক কেঁপে উঠল রুনুর। বুঝি সেই নালিশটাই করবে এখন। কিন্তু থেমে গেল চুয়া। রুনুর দিকে দুষ্টু চোখে তাকিয়ে গোপনে কিল দেখাল আবার।

পরের দিন সকালেই ছুটে এসেছিল রুনু চুয়ার বই-এর সেই কবিতাটা দেখতে

সেদিন বাজিতে হেরে গেল রুনুই। ছাপার অক্ষরেই লেখা ছিল 'বসন্ধরা'। ছাপার অক্ষরেরও ভুল ধরবে রুনু! ইস, এত বড় পণ্ডিত। রুনু তো ভালো, ওর মাকেও নস্যাৎ করে দিল চুয়া। এর একমাত্র মীমাংসা করতে পারে ওর মামা। অর্থাৎ খোকাদা।

'মামা যে নিজেই বই লেখে। আসুক না মামা।' সগর্বে বলে চুয়া।

সেদিন বাজিতে জিতেও কিন্তু রুনুর কানমলে দিল না চুয়া। বরং ওর ভাগের ঘি-চিনি-মাখা মুড়ি থেকে নিজের হাতেই কয়েক মুঠো তুলে দিল রুনুর বাটিতে।

দুজনের পাশাপাশি বসে মুড়ি খেতে-খেতে রুনু জিজ্ঞাসা করে, 'তুমি আমার উপর খুব রাগ করিছ?'

'তখন খু-উ-ব রাগ করেছিলাম। জানো, আমি কী ব্যথা পেয়েছিলাম।'

'তারপর তো নালিশ করিছিলে খোকাদা আর দিদির কাছে। আমি তো সেই ভয়ে সেই দিনই পালিয়ে গেলাম বাড়িতে।'

চুয়া গম্ভীর হল। মুখ ফুলিয়ে বলল, 'তুমি মিথ্যুক। আমি অত নালিশ করি না। তোমার নামে আমি কাউক্কে নালিশ করিনি।'

'সত্যি বলছ?'

'বিদ্যের কিরে!'

রুনু একেবারে অভিভূত হয়ে গেল। ইচ্ছে হল তখনই চুয়াকে কোলে করে নাচাতে। কিন্তু লজ্জায় তা পারল না। চুয়া এত ভালো মেয়ে।

খানিক পরে চুয়া বলে, 'এই ছুটির মধ্যে না, তোমার কথা আমার খু-উ-ব মনে পড়ত।'

'আমারও।' আবেগ ভরে বলে রুনু।

'সত্যি!' আশ্চর্য একটু হাসি চুয়ার ঠোঁটে, চোখে-মুখে।

'সত্যি। তিন সত্যি। বিদ্যের কিরে।'

'তুমি তো খুব লক্ষ্মী ছেলে।'

'তুমিও খুব লক্ষ্মী ছেলে।' উৎসাহের চোটে বলে ফেলল রুনু।

খিলখিল করে হেসে পড়ল চুয়া। 'এ রামঃ, কী-ই বোকা! আমি বুঝি ছেলে?'

চুয়ার কাছে বারে বারে হেরে যাচ্ছে রুনু। তবু হেরেও যে এত আনন্দ পাওয়া যায়, সে কি জানত রুনু আগে?

এক বুক আনন্দ নিয়ে সেদিন বাড়ি ফিরল রুনু। আসবার সময় দিদি বলেছিলেন, মাঝে মাঝে আসিস রুনু। খোকা নাই তো, ঘরখানা একেবারে খালি হয়ে গেছে।' দুচোখ ছলছল করে উঠেছিল দিদির।

'না এলে কিন্তু বুঝবে মজা।' চোখ পাকিয়ে বলেছিল চুয়া।

'আজ বুঝি খুব ভাব হয়েছে,' হেসে বলেন দিদি, 'আবার কালই ঝগড়া লাগাবি। তুই যা সাংঘাতিক মেয়ে।'

'আমি বুঝি কেবল ঝগড়া করি?' ঝগড়াটে মেয়ের গলায় বলে চুয়া।

'করিসই তো। নিত্যি তোর নামে হাজার নালিশ শুনতি হয় আমার।'

'মিথ্যে কথা, মিথ্যে কথা। তুমি মিথ্যুক। তুমি বলো রুনুদা আমি ঝগড়া করি? আমি নালিশ করেছি তোমার নামে? তুমি যে সেদিন মেরেছিলেন তা বলেছি কাউকে?'

রুনুর চোখমুখ লাল হয়ে উঠল। আর সেই দিকে তাকিয়ে হঠাৎ জিভ কেটে দৌড় দিল চুয়া।

বারো

চুয়াকে, দেখা গেল, দিপু নিপুও চেনে। তাদের পাঠশালাতেই যে পড়ে চুয়া। পড়ে দিপুর ক্লাসেই। ওদের অভিযোগ হল, চুয়া ভীষণ অহঙ্কারী মেয়ে। দারুণ ঝগড়াটে মেয়ে। খুব খারাপ মেয়ে। সবার সঙ্গে ওর ঝগড়া। অথচ পনিমশা ওকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে।

'ক্লাসে পড়াশুনোয় কেমন?' প্রশ্ন করেছিল দিপুকে।

'ইশ, ঘোড়ার ডিম। অঙ্ক পারে না একটুও।'

'আর সব? ইংরাজি, বাংলা?'

'ওসব পারে। খোকাদাই তো শিখোয় দিত। এখন বুঝবে মজা। খোকাদা তো নাই, এখন দ্যাখো ফেল করবে।' মহা উৎসাহে বলে দিপু। চুয়া ফেল করলেই যেন খুশি হয় দিপু।

'করুক গে ফেল, তোমার কিন্তু ফাস্ট হতি হবে।' নিজের ছাত্রকে উৎসাহিত করে রুনু।

শেষ পর্যন্ত কিন্তু সেই অহঙ্কারী চুয়াও একদিন রুনুর ছাত্র হয়ে পড়ল।

'জানো রুনুদা,' একদিন ওর অঙ্কের বই-এর একটা অঙ্ক রুনুকে দেখিয়ে বলে, 'এই অঙ্কটা কেউ পারবে না। পনিমশাও না। কিন্তু মামা পারত। মামা সব অঙ্ক পারে।'

অঙ্কটা পড়ে দেখল রুনু। প্রশ্নটা একটু ঘুরিয়ে দেওয়া আছে বটে, কিন্তু অঙ্কটা তো কঠিন নয়। কৌতূহলবশেই অঙ্কটা করে ফেলল রুনু চুয়ার খাতায়। উত্তর মিলিয়ে দেখল ঠিক আছে। উৎসাহে চিৎকার করে উঠল, 'এই দ্যাখো মিলে গেছে।'

'ইশ, বললেই হল', মুখ বেঁকিয়ে বলে চুয়া, 'বলে পনিমশা পারল না, বলল উত্তর ভুল আছে।'

'না-না, উত্তর ভুল নেই তো।' জোর দিয়ে বলে রুনু।

'তুমি গোঁজামিল দিয়েছ। আমি বিশ্বাস করি না।'

দারুণ রেগে গেল রুনু। বেশ কড়া সুরে কথা কাটাকাটি চলল। শেষ পর্যন্ত হয়তো হাতাহাতিই হয়ে যেত যদি না যথাসময়ে ঘটনাস্থলে হাজির হতেন দিদি।

তিনি উভয়ের মামলা শুনলেন, অঙ্কটা পড়লেন এবং নিজে করলেন, (দিদি সেকালের ছাত্রবৃত্তি পাশ মেধাবী মেয়ে) তারপর দেখলেন রুনুর অঙ্কটা। শেষে রুনুর পিঠ চাপড়ে বললেন, 'বাঃ, রুনুতো ঠিকই করেছে। গুড।'

'সত্যি রাইট হয়েছে মা! কিন্তু পনিমশা যে বলল...'

'বলল নয় ''বললেন'' বলতে হয়।'

'না-না, তুমি রুনুদাকে বেশি ভালোবাসো তাই বলছ ওর পক্ষে। আমি মানি না।' জিদ ধরে বলে চুয়া।

শেষ পর্যন্ত সেই বিকেলেই বাদী-প্রতিবাদীকে নিয়ে দিদি এলেন পণ্ডিতমশাইয়ের কাছে। হেসে বললেন, 'দেখুন তো দাদা মেয়ের কি জিদ, একটা অঙ্ক নাকি ক্লাসে মেলেনি...'

'ও হো হো, মনে পড়েছে। অঙ্কটা খুবই সোজা। ছুটির পরে একটু ভাবতেই ঠিক হয়ে গেল। দে করে দিচ্ছি।

দিদি বুদ্ধি করে চুয়ার খাতায় অন্য একটা পৃষ্ঠা বের করে দিলেন। অঙ্কটা করে দিলেন পণ্ডিতমশায়। উত্তর মিলল।

চুয়া তথাপি বলে, 'তখন যে বললেন উত্তরে ভুল আছে।'

'উত্তরে ভুল নাইরে মা, ভুল আমারই হয়েছিল।' হাসতে-হাসতে বলেন পণ্ডিতমশায়।

চুয়া একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেল। মুখে আর কথাটি নেই।

বাড়ি এসে রুনুর দিকে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে বলল, 'তুমি এত অঙ্ক জানো! পনিমশার চাইতেও বেশি। আমি তোমার কাছে অঙ্ক শিখব। আমি কিচ্ছু অঙ্ক পারি না।'

বিদ্রোহী চুয়া হয়ে গেল ভক্ত চুয়া। রুনু হয়ে গেল ওর মাস্টার।

মাস্টার রুনু হল বটে, কিন্তু দু'দিনেই দেখা গেল চুয়ার মেজাজটা ছাত্রর মেজাজ নয়। বরং প্রভুর মতো। অনুরোধ করে না, হুকুম করে চুয়া। চুয়ার প্রথম মতই হল, 'দিপুকে কিন্তু অঙ্ক শেখাতে পারবে না তুমি।'

'বারে, দিপুকে না পড়ালে যে ওরা আমারে তাড়ায়ে দেবে।'

'তাহলে তো আরও মজা। তুমি আমাদের বাড়িতে থাকবে।' রুনুর মতের অপেক্ষা না করেই চুয়া ছুটে গেল তার মায়ের কাছে।

দিদি কিন্তু এক কথায় চুয়ার প্রস্তাব নাকচ করে দিলেন, 'ওরে পাগলি, রুনু যদি করের বাড়িতেই থাকবে, তাহলে ওর বাবা প্রথমেই এখানে রাখতেন। শ্রীনাথ পণ্ডিতমশায়কে করের বাড়িতে সকলেই চেনে, সকলেই মান্য করে। জমিদারবাবুই তো তাঁর বাল্যবন্ধু। একসঙ্গে পড়েছেন। রুনুকে পেলে তিনি বুকে করে রাখতেন। কিন্তু পণ্ডিতমশায় তা চাননি। তিনি চেয়েছেন গরিবের বাড়িতে রেখেই ওকে মানুষ করতে। সোমনাথ তাঁর ছেলের মতো।'

রুনু সবিস্ময়ে ভাবে, এই জমিদারবাবু তার বাবার বন্ধু! অথচ বাবা তো একবারও করের বাড়ির নাম করেন না।

'বাবা কেন আমাকে করের বাড়িতে রাখলেন না?' প্রশ্ন করে রুনু।

'সে অনেক কথা ভাই। বড় হলি বুঝবি। তোর ভালোর জন্যই ঠাকুরবাড়ি রাখিছেন তিনি। তবে তুই কিন্তু আসিস রুনু। ছুটির পরেই চলে আসবি। আমি তোর গরিব দিদি। আমার কাছে আসতে দোষ নাই।' কেমন একরকম ব্যথাভরা গলায় বলে দিদি।

'প্রতিদিন আসতে হবে কিন্তু।' চুয়ার আদেশ।

প্রায় প্রতিদিনই আসে রুনু। বিকেলে চুয়ার সঙ্গে গল্প করা আর দিদির দেওয়া চিড়ে-মুড়ি অথবা অন্যকিছু খাবার খাওয়া ওর নিত্যকর্ম হয়ে দাঁড়াল। বৃষ্টি বাদলায় যেদিন যেতে পারে না, সেদিন ওর পড়ায় মন বসে না। রাত্রে ভালো ঘুম হয় না।

পথ চেয়ে থাকে চুয়াও। যেদিন রুনুর দেরি হয়, সেদিন চুয়ার কী অভিমান। মুখ ফুলিয়ে থাকে। কথা কয় না রুনুর সাথে। অনেক সেধে মান ভাঙাতে হয় চুয়ার।

কী এক আশ্চর্য আনন্দময় নেশায় দিন কেটে যায়। গল্প করতে করতেই চুয়ার অনেক পড়া মুখস্থ হয়ে যায়। চুয়া বলে, 'বই না পড়তে বলে কেউ যদি এমনি গল্প বলে না, আমার বেশি মনে থাকে। তোমার কি স-অ-ব মুখস্থ। তুমি স-অ-ব বই পড়েছ?'

'না, না, আমিও শুনে শুনে মুখস্থ করেছি। আমার বাবা সব জানেন, যত বইতে যত কিছু আছে।' সগর্বে বলে রুনু, 'বাবা শুয়ে শুয়ে বলে যেতেন, আমি শুনে শুনে মুখস্থ করতাম।'

'আমার তো বাবা নেই,' চুয়ার চোখ ছলছল করে ওঠে, 'ছিল একটা মামা, তাও...' চুয়ার দুচোখে জলের ধারা নামে।

বোকার মতো চেয়ে থাকে রুনু চুয়ার জলভরা চোখের দিকে। আর জল এসে যায় ওর চোখেও।

তেরো

দেখতে-দেখতে এসে গেল পূজা। সেকেন্ড টার্মিনাল পরীক্ষার নোটিশ ঝুলল নোটিশ বোর্ডে।

ফার্স্ট টার্মিনালে ইংরেজিতে চল্লিশের ঘরে পেয়েও প্রথম হয়েছিল রুনুই। আর সব বিষয়েও যে রুনুই প্রথম। টোটালে প্রশান্তর থেকে বত্রিশ নম্বর বেশি পেয়েছিল রুনু। সেই থেকে প্রশান্ত ওর সঙ্গে কথাই বলে না।

প্রশান্ত নাকি এবার দারুণ পড়ছে। রুনুকে হারাবেই। কিন্তু রুনু? রুনু যেন পড়াশুনোর কথা প্রায় ভুলেই গেছিল। একদিকে চুয়াকে পড়ানো আবার বাড়িতে দিপু-নিপুকে পড়ানো। এতেই মেতে ছিল রুনু। পরীক্ষার নোটিশ পড়তেই ও সচেতন হয়। পড়লও খুব করে সপ্তাহ খানেক।

হয়ে গেল সেকেন্ড টার্মিনাল পরীক্ষা। পরীক্ষার দু'দিন বাদেই স্কুল ছুটি। এবার আর ছুটির আগে পরীক্ষার ফল জানা যাবে না। নরেনদা না থাকায় খুব অসুবিধা হচ্ছে। এখনও নতুন কোনও শিক্ষক আসেননি তাঁর জায়গায়। তাই নাকি এত অল্প সময়ে খাতা দেখা যাবে না।

গ্রীষ্মের ছুটিতে বাড়ি যাবার যে ব্যস্ততা ছিল, এবার তেমন কোনও অস্থিরতা বোধ করছে না রুনু। চুয়া বলেছে, দিদি বলেছেন, কাকিমা-ঠাকমাও বলেছেন। অন্তত পূজার ক'দিন এখানে থেকে যেতে। করের বাড়ির পূজায় নাকি খুব আমোদ হয়। থেকে যাবে বলে ভেবেও ছিল রুনু, কিন্তু ষষ্ঠীর দিনই সকালে এসে পড়ল নগরবাসী। মা বলে দিয়েছেন রুনুকে আজই নিয়ে যেতে। তিনি নাকি রুনু সম্বন্ধে খুব একটা খারাপ স্বপ্ন দেখে ভীষণ অস্থির হয়ে উঠেছেন।

মায়ের কথা মনে পড়তেই মনে পড়ল বাড়ির কথা, মধুমতীর কথা; হরেকেষ্ট, দাদা, সুশীলাদি—সবার কথা। মুহূর্তে বাজুনীয়ার সব আকর্ষণ তুচ্ছ হয়ে গেল।

লক্ষ্মী পূজার পরেই কিন্তু আর বাড়িতে মন টিকছে না রুনুর।

মায়ের সব অনুরোধ আগ্রাহ্য করে লক্ষ্মী পূজার দু'দিন পরেই চলে এল রুনু। তখনও স্কুল খুলতে তিন সপ্তাহ বাকি।

দাদা অভিমান করে বলে, 'ও এখন ভালো ছেলে হইছে যে, ভদ্রলোকের দেশে থাকে; আমাদের মতো ছোট লোকের দেশে থাকতি আর মন চায় না। যা, যা, তুই তোর বামুনগে পা চাটগে!'

বাবা ভাবলেন রুনু হয়তো সত্যিই দিপু-নিপুর পড়ার কথা ভেবে তাড়াতাড়ি যাচ্ছে। কাকিমা বলেছিলেন, 'লক্ষ্মীপূজার পরেই কিন্তু চলে আসবি। তুই না থাকলে অরা বই ছুঁবেও না।' বাড়িতে সেই কথাই বলেছে রুনু।

পুত্রের দায়িত্ব বোধ দেখে পিতা নিশ্চয় খুশি হয়েছিলেন। তিনি বললেন, 'যখন ও নিজেই যাতি চাচ্ছে, যাক না, তুমি আর বাদা দিও না। ওর নিজেরও তো পড়াশুনো আছে। এবার কিন্তু ইংরেজিতে ফার্স্ট হওয়া চাই।'

ছুটি ফুরোবার অনেক আগেই রুনুকে আসতে দেখে সোমনাথবাবু খুব খুশি হলেন। আরও খুশি হয়েছেন তিনি, দিপু এবার সেকেন্ড টার্মিনাল পরীক্ষায় প্রথম হয়েছে শুনে। এর জন্য রুনুকেই ধন্যবাদ দিলেন তিনি। রুনুর পিঠ চাপড়ে বললেন, 'তোমার ছাত্রও ফার্স্ট বয়, তুমিও ফার্স্ট বয়। চমৎকার! তোমার কিন্তু মাইনরে বৃত্তি পাওয়া চাই। ওদের পণ্ডিতমশায়ও বলছেন দিপুকে দিয়ে আগামী বছর প্রাইমারি বৃত্তি পরীক্ষা দেওয়াবেন। ওদের পাঠশালায় আজ পর্যন্ত কেউ বৃত্তি পায়নি। দিপুরে যদি বৃত্তি পাওয়াতে পারো, তুমি যা চাও তাই দেব তোমাকে।'

একটা আশ্চর্য প্রেরণায় বুক ফুলে ওঠে রুনুর। মনে মনে প্রার্থনা করে দিপু যেন সত্যই বৃত্তি পায়।

বিকেলেই চুয়াদের বাড়ি গেছিল রুনু। ফিরে এল কাঁদতে কাঁদতে। ওদের ঘর ভরতি লোকজন। বারান্দায় মোটা একটা মানুষ পুরু চশমা চোখে খবরের কাগজ পড়ছেন। ঘরের মধ্যে দেখা যাচ্ছে ছোট ছোট কয়েকটা ছেলেমেয়ে। সকলেরই দারুণ সাজগোজ। কয়েকবার চুয়াকেও দেখল। চুয়াও সেজেছে খুব। রুনু শুনেছিল চুয়ার এক বড় মামা (খোকাদার বড়দা) থাকেন কলকাতায়। তাঁর অনেক ছেলেমেয়ে। ছোটরা সকলেই চুয়ার বন্ধু। দারুণ ভালোবাসে চুয়াকে। এই কি তাহলে সেই বড় মামা? কেউ যে ফিরেও তাকায় না রুনুর দিকে। দিদিকে দেখা যাচ্ছে না কোথাও। দারুণ অভিমানে ফিরে এল রুনু। প্রতিজ্ঞা করল, আর যাবে না চুয়াদের বাড়ি। এখন থেকে ও কেবল পড়বে আর দিপু-নিপুকে পড়াবে।

স্কুল খোলার সপ্তাহ খানেক পরেই জানা গেল সেকেন্ড টার্মিনালের ফলাফল। হ্যাঁ, টোটালে ফার্স্ট হয়েছে রুনু, কিন্তু এবার প্রশান্তর সঙ্গে ওর ব্যবদান মাত্র তিন নম্বর। রুনু অবশ্য ইংরাজিতে খানিকটা এগিয়েছে, কিন্তু প্রশান্ত এগিয়ে গেছে সব বিষয়েই। ইংরাজি ছাড়াও ভূগোল-ইতিহাসে দুটোতেই প্রথম হয়েছে প্রশান্ত। বস্তুত প্রশান্ত যদি অঙ্কে আর মাত্র চার নম্বর বেশি পেত ফার্স্ট হত সে-ই।

প্রশান্তর অগ্রগতি দেখে ভয় পেয়ে গেল রুনু। কিন্তু ভূগোল-ইতিহাসে যে নম্বর পেয়েছে রুনু তা-ও যে বিশ্বাসযোগ্য নয়। বিশেস করে ভূগোলে। ভূগোলে তো ওর এক নম্বরও কাটা যাবার কথা নয়। কী করে ও পঞ্চাশের মধ্যে সাঁইত্রিশ পায়! ভূগোল ইতিহাসের খাতা দেখেছেন অক্ষয় পণ্ডিত স্যার। তাঁকে জিজ্ঞাসা করবার সাহস নেই রুনুর। কেবল মিন মিন করে একবার বলেছিল অসীমদাকে। অসীমদা মুখ ভেঙচে বলেছিল, 'তোর 'পোনডিত অকখয়'' তোর উপর পার্শিআলিটি করিছে। তোরে যে দেখতি পারে না। তাই পেশানরে জিতেয়ে দেছে। নরেনদা থাকলি এসব কম্মো হত না।'

অসীমদার কথায় যেন একটু সান্ত্বনা পায় রুনু। নরেনদার কথা মনে পড়ে বুকটা ভেঙে আসে। সত্যি নরেনদা না থাকায় স্কুলটাই যেন অন্য রকম হয়ে গেছে।

একদিন শৈলদি এসে হাজির ঠাকুর বাড়ি। রুনুকে দেখেই উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেন, 'ওমা, রুনু কবে আইছিস?'

রুনু প্রণামও করে না কথাও কয় না।

'কী হইছেরে?' শৈলদি সস্নেহে রুনুর মুখটা তুলে ধরে। রুনুর দুচোখে তখন জলের ধারা।

'চুয়া বুঝি ঝগড়া করিছে?' হেসে ফ্যালেন দিদি।

'না।' গম্ভীর ভাবে বলে রুনু।

'তবে? যাসনা ক্যান? কবে আইছিস?'

'লক্ষ্মীপূজার তিন দিন পরেই।' রুনু আরও গম্ভীর।

'কী সর্বোনাশ! অ্যাদ্দিন আইছিস? আর চুয়া তোর জন্যি...'

ওর জন্যে যে চুয়া কী করে সেইটুকুই শুনতে চাইছিল রুনু। কিন্তু সেকথা আর বলল না দিদি। বলল, 'জানিস, চুয়া এবার পূজার আগের পরীক্ষায় খুব ভালো করিছে। তোর কথা সব সময় কয়। এখন বুঝি খুব পড়তিছিস? পড়বিই তো। তা বিকেলে এট্টু বেড়াতি যাতি দোষ কি?'

'আপনাদের বাড়িতে খুব মোটা একটা লোক...'

খিলখিল করে হেসে পড়েন শৈলদিঃ 'ও-ও, সেই ভয়তে যাও না। তেনারা তো কবে চলে গেছেন। পুজোর সময় বেড়াতি আইছিলেন আমার ভাসুর। সে তো সেই লক্ষ্মী পূজার কয়েকদিন পরেই চলে গেছেন। চল চল , চুয়া তোর জন্যি...'

'উরে এ বাব্বা! তুমি কি সাঙ্ঘাতিক রুনুদা!' রুনুকে দেখামাত্র চুয়ার প্রথম অভিযোগ।

'কেন?'

'আমি দিপুর কাছে শুনেছি তুমি অনেক দিন আগে এসেছ, অথচ একদিনও...' ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল চুয়া।

সেই থেকে আবার শুরু হল বিকেলে চুয়ার মাস্টারি আর দিদির আদর-মাখা চিড়ে-মুড়ি ইত্যাদি দুজনে ভাগাভাগি করে খাওয়া।

চোদ্দো

বাৎসরিক পরীক্ষা হয়ে গেল রুনুদের।

পরীক্ষা শেষ হয়ে গেছে চুয়াদের পাঠশালারও।

রুনুর মাস্টারি সার্থক হয়েছে। দিপু-নিপু দুজনেই প্রথম হয়েছে তাদের ক্লাসে। এবার দিপু উঠল চতুর্থ শ্রেণিতে, আর নিপু দ্বিতীয় শ্রেণিতে। তার চেয়েও আশ্চর্য ব্যাপার যে চুয়া দিপুর থেকে মাত্র দু-নম্বর কম পেয়ে দ্বিতীয় হয়েছে। যে চুয়া কোনওদিনও অঙ্কে পাশ করে না, সেই চুয়া এবার অঙ্কে পেয়েছে পঁচাশি।

চুয়ার পরীক্ষার ফল শুনে শৈলদি বুকে জড়িয়ে ধরে ছিলেন রুনুকে।

'তুই অসাধ্য সাধন করিছিস রুনু। সামনের বছর তুই ওরে নিয়মিত পড়াবি। আমি তোরে মাসে দশ টাকা করে দেব।'

কী সর্বনাশ, অতখানি মূল্য হয়েছে নাকি রুনুর। পণ্ডিত স্যার নাকি মিত্তির বাড়ির নির্মলকে পড়িয়ে পান মাত্র পাঁচ টাকা। তার চেয়েও বেশি পাবে রুনু!

বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন তাকে কাকিমাও।

'তুই করছ কি রুনু! নিপুডাও যে ফাস্টো হইছেরে। কও কি চাস তুই। যা চাস তাই দিমু। উনিরে লেইখ্যা দিমু এবার তোর জামাকাপড়, জুতা-চাদর সব লইয়া আইবেন।'

আনন্দে আবেগে চোখে জল এসে যায় রুনুর। এর বেশি আর কি চাইবে ও?

ঠাকমা বলেন, 'দাদা আমার ছিলাথ পণ্ডিতির ছল। দেহিস বউ ও-ও এট্টা মস্ত পণ্ডিত হবে।'

এসব তো ভালোই হয়। কিন্তু রুনু নিজে কি কাণ্ডটা করল এবার? কী করে ও মুখ দেখাবে বাবাকে? শুধু টোটালে প্রথম নয়, সর্ববিষয়ে প্রথম হবার কথা যার, সেই রুনু এবার একেবারে থার্ড হয়ে গেল।

আর সেই 'লম্বু জলধর' কি মন্ত্রবলে হঠাৎ এত ভালো ছাত্র হয়ে গেল? সে বলেছিল, 'আমি উন্নতি করিব।' সত্যই উন্নতি করেছে জলধর। প্রশান্তর পরেই এবার জলধরের নাম। তার নীচে নেমেছে রুনু।

রেজাল্ট শুনে ভয় পেয়ে গেছিলেন কাকিমাওঃ 'করছ কি রুনু! তোর বাপে তো তরে আস্ত রাখবে না। তা চুয়ার লগে অত আড্ডা মারলে আর পড়বা কখন? অখন চুয়া-টুয়ারে ছাড়। সামনের বছর ভালো করিয়া পড়বা। কাইন্দো না, কাইন্দো না।'

শুধু আড্ডাই যে মারেনি তার প্রমাণ তো চুয়ার পরীক্ষার ফল। তার প্রমাণ তো দিপু, নিপুর পরীক্ষার ফল। কিন্তু সেকথা তখন আর মনে পড়ল না কাকিমার।

দুঃখ নেই কেবল ঠাকমার। তিনি জোর দিয়ে বলেন, 'আমার দাদা হল সোনার ছল। পোড়া মাস্টাররা তারে দেখতি পারে না হিংসেয়। ওই পেশানডারে ফাস্টো বানাতি রুনুরি কোম কোম নম্বর দেছে। তুই কাঁদিস না দাদা। আসুক নারেন, দেহিস সে তোরে ঠিক ঠিক নম্বর দেবে।'

এই রকম একটা সন্দেহের কথা সেবার বলেছিল অসীমদাও। সেবারও কেমন করে উঠছিল রুনুর বুকের মধ্যে। আজ ঠাকমার কথা শুনেও তেমনই একটা দুর্জ্ঞেয় সান্ত্বনা পেল রুনু। ঠাকমার বুকে মুখ ডুবিয়ে প্রাণ ভরে কাঁদল।

ঠাকমা ওর গায়-মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন, 'কাঁদিস না দাদা, এট্টা পরীক্ষা মন্দ হইছে। তাতে বয়ে গেছে। সারা জীবন কত পরীক্ষা দিবি। দেহিস আমার আশীর্বাদে তুই সব পরীক্ষায় ফাস্টো হবি।'

পরীক্ষার ফল বেরুবার পর রুনু আর যায়নি চুয়াদের বাড়ি। একবারও ভাবেনি বাড়ি যাবার কথা। কিন্তু বাড়ি না গিয়েও রেহাই পেল না বাবার হাত থেকে।

শীতের সকাল। বেলা তখন দশটা হবে। উঠোনে দিপু নিপুর সঙ্গে খেলছিল রুনু। হঠাৎ যেন চোখের সামনে ভূত দেখে আর্তনাদ করে উঠল রুনু, 'বাবা!'

পেছনে নগরবাসী। তার মাথায় মস্ত এক বোঝা।

কোনওরকম প্রণাম সেরে মাথা নিচু করে দাঁড়াল রুনু। দিপু-নিপুও প্রণাম করল। তারপর দুজনে পণ্ডিতমশাইয়ের দুহাত ধরে শুরু করল চিৎকারঃ 'ও মা দাদু আইছে, ও ঠাকমা দাদু আইছে।'

ওরাই হাত ধরে টেনে তুলল বারান্দায়। বারান্দায় পা দিতেই ঠাকমার মুখোমুখী। ঠাকমার পেছনে কাকিমাও।

'কী ভাগ্যি, গরিবের দুয়ারে হাতির পাড়া। সূয্যি কি পশ্চিমি ওঠল আজ!' ফোঁকলা দাঁতের হাসি আর গ্রাম্য রসিকতা দিয়ে ঠাকমা অভ্যর্থনা করলেন শ্রীনাথ পণ্ডিতকে।

'ভাগ্য তো বটেই', হেসে বলেন শ্রীনাথ পণ্ডিত, 'কিন্তু সে আপনার নয় বউদি, আমার। সেবার রুনুকে রাখতি আইসে আপনারে পাইনি। আজ প্রাণ ভরে বউদির নিরামিষ রান্না খাব। সে অমৃতর স্বাদ ভুলিনি আজও।' বলতে বলতে প্রণাম করেন ঠাকমাকে।

রুনু জীবনে এই প্রথম দেখল শ্রীনাথ পণ্ডিতকে একজনের পদধূলি নিতে। ঠাকমার মর্যাদা যেন অনেক বেড়ে গেল রুনুর কাছে।

ঠাকমা হাত জোড় করে কপালে ঠেকিয়ে বলেন, 'থাক থাক, দ্যাহো দেহি কাণ্ড। তুমি হলে মস্ত পণ্ডিত। আমি মুক্যু তোমার পেনাম নিতে পারি?'

'তবু আপনি আমার গুরুজন। এখন তো সংসারে প্রণাম করার মতো আপনি ছাড়া আর কাউরে দেখি না। সব একে একে বিদায় নেছে। আমারও ডাক পড়িছে বউদি। আর বেশিদিন নাই।' ভারী গলায় বলেন পণ্ডিতমশায়।

'ষাট-ষাট, অমন কথা কবা না। তোমার শত বচ্ছর পেরমাই হোক।'

নগরবাসীর মাথা থেকে বোঝাটা নামাতে-নামাতে শ্রীনাথ বলেন, 'বরের দ্যাশের তরিতরকারি আনিছি কিছু। তুলে রাহেন বড়দি। তোমারেও বঞ্চিত করিনি বউমা।' হেসে বলেন কাকিমাকে।

'কী সব্বনাশ ওই শাকপাতার মধ্যি আবার মাছ আনছেন নাকি?'

'দূর পাগলি। আমারে কি তোর ছেলের বয়সি ভাবলি? যাও নগরবাসী, মাছের হাঁড়িডা আনো।'

নৌকা থেকে মস্ত এক নতুন হাঁড়ি মাথায় করে আনল নগরবাসী।

ওদিকে কচি লাউ, মিঠে কুমড়ো, মোটা মোটা লাউ শাক, আর নধরকান্তি ডাঁটা, কাঁচা লঙ্কা, উচ্ছে-টুচ্ছে দেখে যেমন ঠাকমা উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছে, এদিকে তাজা তাজা রায়াক, টাটফেনী, রিঠে মাছ আর চকচকে ইলিশ মাছ দেখে কাকিমারও জিভে জল এসে গেছে।

এই ফাঁকে কখন যে রুনু কোন দিকে পালিয়েছে কেউ জানে না।

ইতিমধ্যে দিপু-নিপু দৌড়ে গিয়ে করের বাড়ি থেকে ডেকে এনেছে সোমনাথবাবুকে।

তেল মাখতে মাখতে সোমনাথের সঙ্গে গল্প চলল অনেকক্ষণ।

দুপুরের খাবার সময় অবশ্য রুনুকে একবার দেখা গেছিল। তখন পণ্ডিতমশাই হাসি গল্পে বাড়িশুদ্ধ সবাইকে মাতিয়ে রেখেছেন। রুনুর সঙ্গে কথা বলার আর সুযোগই হল না।

খাওয়া শেষ করেই দ্বিতীয় বার পলায়ন করল রুনু।

পণ্ডিতমশাইও একটু বিশ্রাম নিয়ে গেলেন ভোজেরগাতি বেড়াতে সোমনাথকে সঙ্গে নিয়ে।

দিনটা তো কাটল রুনুর পালিয়ে পালিয়ে, কিন্তু রাত্রে?

রাত্রে পণ্ডিতমশাইয়ের শোবার ব্যবস্থা হল বারান্দার খোপে সেই রুনুর বিছানাতেই। রুনু শুয়েছে ঠাকমার কাছে ঘরে।

দুই পণ্ডিত খাওয়া-দাওয়ার পরে আবার গল্পের আসর বসিয়েছিলেন সেই ছোট খোপেই। কথাবার্তা হচ্ছিল মৃদু স্বরেই। হঠাৎ এক সময় গল্পের আসরটা যেন ভেঙে চৌচির হয়ে গেল পণ্ডিতমশাইয়ের প্রচণ্ড চিৎকারে, 'কী, কী বললে? রুনু থার্ড হয়েছে? থার্ড!'

লেপের তলায় ঠাকমার কোলের মধ্যেই ঘেমে উঠল রুনু।

সোমনাথবাবু বললেন অনেক কথা। বললেন, 'ও তো প্রতি পরীক্ষাতেই প্রথম হত। এবার যে কী করল। নাকি দুটো অঙ্কই ভুল করে এসেছে। তাছাড়া প্রশান্তর প্রথম হবার কারণ আছে। হেডমাস্টারমশাই ওকে প্রাইভেট পড়ান যে। রুনুকে যে দেখিয়ে শুনিয়ে দেবার কেউ নেই। ওকেও যদি মাস্টারমশাইয়ের কাছে...'

'দ্যাখ সোমনাথ, রুনুকে যদি ওঁরা ভালো ছাত্রই ভাবতেন তাহলে শিক্ষকের দায়িত্বেই ওকে সাহায্য করতেন। আমি তো তাই করি।'

'যুগ পাল্টে গেছে পণ্ডিতমশায়। এখন পয়সা না হলি ছেলে মানুষ করা যাবে না। যদি পারেন তো ওনাকে কিছু দিয়ে এ বছরডা...'

'ছিঃ ছিঃ, বিদ্যার ব্যবসা! যে ছাত্রকে স্নেহবশে ওঁরা সাহায্য করেননি, তাকে অর্থের বিনিময়ে সাহায্য করলেও সে সাহায্যে হৃদয় নেই। তাছাড়া আমার যে অর্থও নেই। কিন্তু একমাত্র ইংরেজি ছাড়া আর কোনও বিষয়ে ওর সাহায্যের প্রয়োজনও তো নেই। সে সব তো আমিই শিখোয় দিছি।'

'রুনু নিজেই খুব লজ্জা পাইছে। ওকে আর কিছু বলবেন না। আসছে বছর দেখবেন ও নিশ্চয় প্রথম হবে। তাছাড়া আর একটা কথাও...'

এ পর্যন্ত সব কথাই শুনতে পেয়েছিল রুনু। কিন্তু এই শেওটায় যে ফিসফিস করে কি বললেন সোমনাথ কিছুই শোনা গেল না। শোনা গেল কেবল পণ্ডিতমশার আর একটা চিৎকার।

'ছিঃ ছিঃ সোমনাথ, বলো কি! ধনীর ছেলে দীনের ছেলের তফাত করবে শিক্ষক? সে সুন্দর না কুৎসিত, রাজপুত্র না ডাব-আলার পুত্র, সেই বিচার করবে আচার্য? শিক্ষক করবে পক্ষপাতিত্ব?'

'সে যুগের দ্রোণাচার্যও কিন্তু অর্জুন আর একলব্যকে সমদৃষ্টিতে—'

'দ্রোণাচার্য আচার্যই নন!' —গর্জন করে উঠলেন শ্রীনাথ পণ্ডিত, 'তিনি একজন কূটনীতিবিদ। দ্রুপদকে পদানত করতেই তাঁর আচার্যত্ব গ্রহণ।'

'কথায় পারব না আপনার সাথে।' —অসহায়ভাবে বলেন সোমনাথ, 'কিন্তু আপনাদের সে যুগ আর নেই। একালের শিক্ষক প্রায় সকলেই আদর্শচ্যুত।'

'আমি একালের মানুষ নই সোমনাথ। একালটাকে আমি বুঝিও না। এই বিশ্বযুদ্ধ গণচেতনা, রাজদ্রোহিতা—এর কিছুই বুঝি না আমি। জানি না মানুষ কোনদিকে যাচ্ছে। জানি না কি এর পরিণতি। কালের গতি কে রোধ করবে? কালস্য কুটিলা গতি!'

অনেকক্ষণ দুজনেই নীরব রইলেন। তারপর সোমনাথ হঠাৎই বলে বসলেন, 'আর একটা কথাও আপনাকে বলা উচিত। এবার দেখলাম, রুনুর উপর মাস্টারমশায়রা খুব অসন্তুষ্ট। কি যেন একটা ব্যাপার হয়েছে।'

'সে কী!'—চমকে উঠলেন পণ্ডিতমশাই। চমকে উঠল রুনুও।

'কারণটা জানি না। নরেনদা তো রুনুর খুবই প্রশংসা করতেন। তা জানেন বোধহয়, নরেনদা এবং এ-গ্রামের আরও কয়েকজনকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। এখন তারা রাজবন্দি। জেলে আছে। স্বদেশী-টদেশী করত তো। কিন্তু নরেনদা চলে যাবার পর থেকেই রুনুকে যেন...'

'কিন্তু রুনু তো আমার অবাধ্য অবিনয়ী ছিল না। তাহলে কি কুসংসর্গে পড়ে গোল্লায় গেল ছেলেটা?'

'আগে থেকেই ওকথা ভাবছেন কেন? চলুন না কাল আমরা হেডমাস্টারমশাইয়ের সঙ্গে দেখা করি।' বললেন সোমনাথবাবু।

'দেখা তো করতিই হবে। আমি জানতি চাই কেন রুনু ওদের স্নেহবঞ্চিত হল। যদি কোনও অন্যায় করে থাকে, তাহলে ও ছেলেরে আমি...'

বাক্যটা আর শেষ করলেন না শ্রীনাথ পণ্ডিত।

সারা গা শিউরে উঠল রুনুর। সে রাতে আর ঘুম হল না তার।

ঘুম হল না হয়তো শ্রীনাথ পণ্ডিতেরও।

পনেরো

অভ্যর্থনার সুরটাই যেন কেমন বেসুরো লাগল শ্রীনাথ পণ্ডিতের।

আসুন শ্রীনাথবাবু, এসো সোমনাথ।' লাইব্রেরি ঘরের দরজায় ওদের দেখেই গম্ভীরভাবে অভ্যর্থনা জানালেন হেডমাস্টারমশাই।

পাশের একটা টেবিলে খাতাপত্র লিখছিলেন অক্ষয় পণ্ডিত। তিনি মাথাও তুললেন না।

ইতিপূর্বে হেডমাস্টারমশাই ওঁকে নাম ধরে 'শ্রীনাথবাবু' বলে ডাকেননি। বস্তুত একমাত্র সোমনাথের মা ছাড়া ওঁর নাম ধরে ডাকার মানুষ এদেশেও নেই। স্বদেশেও নেই। 'পণ্ডিতমশায়' ডাক শুনতেই অভ্যস্ত ওঁর কান।

পণ্ডিতমশাই ও সোমনাথ বসতেই ওদের কথা বলবার সুযোগ না দিয়ে হেডমাস্টারমশাই বললেন, 'ছেলের পরীক্ষার খবর নিতে এসেছেন তো, পরীক্ষা ভালো হয়নি।'

'কিন্তু রুনু তো আমার একমাত্র ইংরাজি ছাড়া...'

কথা শেষ করতে না দিয়েই হেডমাস্টারমশাই বলেন, 'নিজের ছেলে সম্বন্ধে সব বাপেরই একটু উচ্চ ধারণা থাকে। কিন্তু ছেলেটি আপনার...'

'অতিশয় ইঁচড়ে পক্ক।' দাঁত-মুখ বিকৃত করে বললেন অক্ষয় পণ্ডিত। এতক্ষণে মাথা তুললেন তিনি।

শ্রীনাথ পণ্ডিত বজ্রাহত।

এবার কথা বললেন সোমনাথ, 'এ ধারণা আপনার কেন হল অক্ষয়দা? আমি তো রুনুকে যতটুকু দেখেছি ভারি শান্তশিষ্ট ছেলে। তাছাড়া খোকা আর নরেন তো ওর খুবই প্রশংসা করত।'

'তাদের প্রশ্রয়েই তো শ্রীমান একেবারে দিগগজ হয়ে উঠেছে!'

'কী বলছেন অক্ষয়দা! এ আপনার ভুল ধারণা।'

'ধারণার কথা নয় সোমনাথ। চাক্ষুষ প্রমাণিত ব্যাপার। স্বচক্ষে দেখতে চান, আছে না স্যার সে কাগজটা?' হেডমাস্টার মশাইয়ে শুধান অক্ষয় পণ্ডিত।

আছে বইকি। যত্ন করেই রেখে দিয়েছেন সে মূল্যবান দলিল তিনি। আলমারি খুলে বের করলেন দুখানা কাগজ। রুনুর লেখাটাই দিলেন শ্রীনাথ পণ্ডিতের হাতে—'আপনার পুত্রের গভীর পাণ্ডিত্য দেখে নিশ্চয় খুশি হবেন। শ্রীমানের হাতের লেখা তো আপনার চেনাই।'

অনেকক্ষণ ধরে দেখলেন শ্রীনাথ পণ্ডিত। দেখলেন সোমনাথও।

এক সময় কথা বললেন শ্রীনাথ পণ্ডিত, 'তোমার কি বিশ্বাস সোমনাথ, এই কবিতা রুনু লিখিছে?'

'বিশ্বাস হচ্ছে না, তাই না? দেখুন কত বড় প্রতিভাবান পুত্র আপনার।' অক্ষয় পণ্ডিত তাঁর অক্ষয় তূণ থেকে একটার পর একটা শাণিত শর নিক্ষেপ করছেন।

'সত্যি বিশ্বাস হচ্ছে না,' উপহাস গায় না মেখে বলেন শ্রীনাথ পণ্ডিত, 'এই অদ্ভুত বানান, এমন নিখুঁত ছন্দ, তাছাড়া এর অর্থোদ্ধার করাও তো সোজা নয়। এমন বুদ্ধিদীপ্ত ব্যঙ্গ কবিতা লিখিছে রুনু!'

'পুত্রের কবিত্ব দেখে খুব গর্ব হচ্ছে, তাই না?' বললেন হেডমাস্টারমশাই।

'গর্ব নয় সুরেনবাবু (এবার শ্রীনাথ পণ্ডিতও ডাকলেন নাম ধরে) হচ্ছে অবিশ্বাস। তুমি একবার রুনুকে ডাকতি পারো সোমনাথ? আমার কাছে ও মিথ্যে কথা বলবে না।'

সোমনাথবাবু উঠে গেলেন। একটু পরেই চোখের জল মুছতে-মুছতে প্রবেশ করল রুনু সোমনাথের পেছনে পেছনে।

'ভয় নেই,' রুনুর গায়ে হাত বুলিয়ে বলেন শ্রীনাথ পণ্ডিত, 'আমার কাছে সত্যি বল বাবা। এই কবিতা তুই লিখিছিস?'

রুনু নীরব। শুধু সমানে চোখ মুছে যাচ্ছে।

'বল রুনু।' অনুরোধ করলেন সোমনাথ।

'বলবার কি আছে তার?' খেঁকিয়ে উঠলেন অক্ষয়বাবু, 'সেদিন তো ও স্বীকারই করেছে নরেনবাবুর কাছে।'

'তুমি স্বীকার করেছ?' প্রশ্ন করেন সোমনাথ।

রুনু মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়।

'তাহলে তুমিই লিখিছ এই কবিতা!' সোমনাথবাবুর চোখে আগুন জ্বলে উঠল। সেই চোখের দিকে চোখ পড়লে রুনু কি বলত কে জানে? কিন্তু ওর তো তখন দুচোখই দুহাতে ঢাকা। ও শুধু কান্না জড়ানো গলায় বলল, 'হ্যাঁ।'

'শুনলেন?' একসঙ্গে চিৎকার করে ওঠেন হেডমাস্টারমশাই ও অক্ষয়বাবু।

শ্রীনাথ পণ্ডিতের বিস্ময়ের ঘোর তখনও কাটেনি। তিনি অবাক চোখে তাকিয়ে আছেন রুনুর দিকে। ও ছেলে যেন তাঁর ছেলেই নয়। ও আর কেউ।

ঠিক এই মুহূর্তে বারান্দা থেকে একটা আশ্চর্য কোমল কণ্ঠের জবাব এলঃ 'শুনলাম!'

তারপরে ঘরে ঢুকেই রুনুকে শ্রীনাথ পণ্ডিতের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে দুই হাতে তুলে ধরলেন শূন্যে সেই মানুষটি।

'সাবাস! ব্রেভো মাই বয়!' রুনুকে সজোরে বুকে জাপটে ধরে বললেন খোকাদা।

ইতিমধ্যে খোকাদাকে চিনে ফেলেছে সকলেই। চেহারাটা যদিও এই কমাসে অনেক পাল্টে গেছে। দেখাচ্ছে ঠিক সেই ছবিটার মতো—'পরিব্রাজক বেশে স্বামী বিবেকানন্দ।'

রুনুকে কোল থেকে নামিয়ে শ্রীনাথ পণ্ডিতকে প্রণাম করলেন খোকাদা।

'আপনাকে তো চিনলাম না বাবাজি?'

'চিনবেন, আপনিও চিনবেন।' হাসতে-হাসতে বলেন খোকাদা, তুই চিনেছিস তো রুনু?'

ওই পরিস্থিতিতেও ফিক করে একটু হেসে ফেলল রুনু।

'যাও বন্দি, তুমি মুক্ত।' নাটকীয়ভাবে রুনুকে ঘর থেকে বের করে দিলেন খোকাদা।

একটা অভাবনীয় খুশির মত্ততায় রুনু যেন পাখির মতো উড়ে বেরিয়ে গেল।

রুনু চলে যেতেই খোকাদার মুখে এল একটা আশ্চর্য গাম্ভীর্য। কথা বলছেন তিনি শ্রীনাথ পণ্ডিতকেই সম্বোধন করে।

'শুনুন জ্যাঠাবাবু। বারান্দায় দাঁড়িয়ে এতক্ষণ আপনাদের সব কথাই শুনেছি আমি। রুনু থার্ড হয়েছে বলে দুঃখিত হবার কারণ নেই। যে ছেলেটা ফার্স্ট হয়েছে সে আমার খুড়তুতো ভাই। তাকে জন্মাবধি চিনি। রুনুকেও চিনেছি আমি। আপনার রুনু তার থেকে অনেক ভালো ছাত্র। থাক সে কথা। এবার আপনাকে দুটো কথা বলব মাস্টারমশাই।' খোকাদা তাকালেন এবার হেডমাস্টারমশাইয়ের দিকে।

'বলুন। এখন তো আপনাদেরই কাল। যা বলবেন শুনতে হবেই।' নীরস গলায় বলেন হেডমাস্টারমশাই।

'কবিতাটির ছন্দ, বানান, শ্লেষ, ব্যঞ্জনা কিছুই দেখলেন না, দেখলেন কেবল হাতের লেখা? সব শুনেছি আমি নরেনদার কাছে। সন্দেহাতীত রূপে যে ছেলেটি ভালো, আমি তার হাতের লেখাই কপি করেছিলাম আপনাকে পরীক্ষা করবার জন্যে। পরীক্ষা করতে চেয়েছিলাম রুনুকেও।'

'শাক দিয়ে মাছ ঢাকা যায় না খোকাবাবু।' বললেন অক্ষয় পণ্ডিত।

'আপনি থামুন।' প্রচণ্ড ধমকে থামিয়ে দিলেন অক্ষয় পণ্ডিতকে। তারপর শান্ত অথচ ধারালো গলায় খোকাদা বললেন, 'সে পরীক্ষায় আপনি ফেল করেছেন, কিন্তু ফুল মাকর্স পেয়েছে রুনু। দেখেছেন ওইটুকু ছেলের দৃঢ়তা। সে জানে যে ও কবিতা লেখেনি, তবু আপনি যেহেতু তাকে সন্দেহ করেছেন, আপনার অমানুষিক শাস্তি সে গ্রহণ করেছে হাত পেতে। প্রতিবাদ করে আপনার অসম্মান করেনি। এরা আলাদা টাইপ মাস্টারমশাই। এরা করের বাড়ির প্রাইভেট পড়া ছাত্র নয়!

'একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে খোকাবাবু। ওর লেখাটা আপনি দেখবেন?' বললেন হেডমাস্টারমশাই।

'সে কথাও শুনেছি। একেবারে নির্ভুল ডিকটেশান লিখেছিল রুনু। ব্যাপারটা আমিও ভেবেছি। তারপর একটা মীমাংসাও করেছি। চোখের দেখার সঙ্গে যখন মন যুক্ত হয় তখন দৃষ্ট জিনিসের একটা ফটোগ্রাফ উঠে যায় কোনও কোনও মনে। সেই মন দিয়ে দেখেছিল রুনু। তাই ছড়াটার ফটোগ্রাফ তুলে দিয়েছিল তার খাতায়। এ শক্তি সাধারণ নয়। ভেবেছিলাম ওর পরবর্তী আচরণ থেকে আপনাদের ভুল ভাঙবে। তা দেখছি আজও সে ভুল ভাঙেনি আপনাদের। এটা আপনার দুর্ভাগ্য নয় জ্যাঠাবাবু, এটা এই স্কুলেরই দুর্ভাগ্য। এখানে শিক্ষক নেই। আছে কেবল জনাকয়েক প্রাইভেট মাস্টার। ছিলেন, নরেনদা কবে যে তিনি ফিরে আসবেন, এখনও জানি না।' দীর্ঘশ্বাস ফেললেন খোকাদা।

'তিনি এলেও এ-স্কুলে আর তার স্থান হবে না।' বললেন অক্ষয় পণ্ডিত।

'সে দেখা যাবে।' হাসলেন খোকাদা, 'আমার একটা অনুরোধ রাখবেন জ্যাঠাবাবু?'

'বলো বাবাজি।'

'আপনার রুনুকে নিয়ে যান এ-স্কুল থেকে। যে আশায় ওকে এখানে এনেছিলেন তা বোধহয় পূর্ণ হবে না। ভারি গলায় বলেন খোকাদা, 'এখানে ও ফার্স্ট হবে না আর!'

'আমিও তাই ভাবছি বাবাজি। ছাত্র যেখানে শিক্ষকের স্নেহ বঞ্চিত...থাক এসব অপ্রিয় কথা। তবু ঈশ্বরকে ধন্যবাদ যে এই মুহূর্তে তুমি আইসে পড়িছিলে, তা না হলি এ সংশয় আমার কোনও দিনই কাটত না। অমন নিখুঁত ব্যঙ্গ কবিতা—কাব্যের যেটা সবচেয়ে কঠিন রস—ও কবিতা লিখবার বয়সই যে হয়নি রুনুর।'

'অথচ দেখুন সে সন্দেহ এঁদের কারও হল না একবারও!' বলতে বলতে যেমন নাটকীয়ভাবে এসেছিলেন খোকাদা, তেমনি নাটকীয় ভাবেই প্রস্থান করলেন।

বাড়ি ফিরবার পথে খোকাদার পরিচয় দিলেন সোমনাথবাবু। সব শুনে শ্রীনাথ পণ্ডিত বললেন, 'এরা নতুন যুগের নতুন মানুষ। এরাই অগ্নিশিখা। এরাই যুগে যুগে আলো জ্বেলে মানুষকে পথ দেখায়। এদের আমরা চিনি না সোমনাথ, অথচ এদেরই আমরা ভুল বুঝি।

এক বছর আগে এক বিষণ্ণ সন্ধ্যায় একখানা ছোট্ট ভিঙি এসে ভিড়েছিল ঠাকুরবাড়ির ঘাটে। এক বছর পরে আজ আবার সেই ছোট্ট ডিঙিখানা ছেড়ে চলল ঠাকুরবাড়ির ঘাট।

মাইনরে বৃত্তি পাবার আশা, চুয়াকে পড়িয়ে মাসে মাসে দশটাকা পাবার আশা—সব আশায় জলাঞ্জলি দিয়ে বাজুনিয়া ছেড়ে চলল রুনু কেবল একটা কবিতার জন্যে। অথচ আজও জানে না রুনু কে সেই কবিতার আসল রচয়িতা।

সেদিন আপনজনদের ছেড়ে আসতে দুঃখে বুক ফেটে যাচ্ছিল রুনুর। আজ তো ফিরে যাচ্ছে সেই আপনজনদের কাছেই, তবু কেন দুঃখ বুক ফেটে যাচ্ছে! হায়, আজও যে ছেড়ে যাচ্ছে ওর আপনজনদেরই। এই একটা বছর ধরে এই গ্রামেই যে ছড়িয়ে দিয়েছে ওর সবটুকু ভালোবাসা। ওই যে ঘাটে দাঁড়িয়ে কাঁদছে দিপু-নিপু, কাঁদছেন কাকিমা, ঠাকমা, শৈলদি—ওরা সবাই যে ওর আপনজন। সবাইকে ভালোবেসেছে রুনু। আর সবচেয়ে বেশি ভালোবেসেছে একটা ভারি দুষ্টু মেয়েকে। হায়, সেই মেয়েকে আর কি এ জীবনে দেখতে পাবে রুনু।

সেদিন ওকে বিদায় দিতে ঘাটে এসেছিল সব্বাই, আসেনি কেবল দাদা। আজও এসেছে সবাই, আসেনি কেবল চুয়া। কী করে আসবে? সে যে কেঁদেই সারা হয়ে গেল। যারা বেশি ভালোবাসে তারা বুঝি বিদায় দিতে আসে না। বিদায় দেয় না।

সেদিনও যাত্রার সময় ফুলে ফুলে কেঁদেছিল রুনু; কাঁদছে আজও। তবু সেদিনের কান্না আর আজকের কান্নায় কত তফাত!

শারদীয়া কিশোর ভারতী ১৯৭৩

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%