পরের ঘরে রুনু

শ্যামদাস দে

এক

গোপালগঞ্জে দুটো হাইস্কুল—পাবলিক স্কুল আর মিশন স্কুল।

প্রাইমারি পরীক্ষার সেন্টার প্রতি বছরই পড়ে পাবলিক স্কুলে। প্রতি বছরই শ্রীনাথ পণ্ডিতের পাঠশালার এক বা একাধিক ছাত্র সে পরীক্ষায় বৃত্তি পায়। বৃত্তি পাওয় ছাত্রদেরই নয় কেবল, শ্রীনাথ পন্ডিতের পাঠশালার যে-কোনো ছাত্রকেই পাবলিক স্কুল বিনাবিচারে ভর্তি করে নেয়। ও স্কুলের সব শিক্ষক চেনেন পণ্ডিত মশাইকে। বিশেষ সম্মান করেন হেডমাস্টার নরেশ সেনগুপ্ত মশাই। বৃত্তি পাওয়া ছাত্র রুনুকে এই স্কুলে ভর্তি করে দিলেন ষষ্ঠ শ্রেণীতে শ্রীনাথ পণ্ডিত।

যদিও ভর্তির সময় পরীক্ষা করে নেবার প্রশ্নই ওঠেনি, তবু পন্ডিত মশাই রুনুকে সঙ্গে করেই সেদিন এসেছিলেন হেডমাস্টার মশাইয়ের কক্ষে।

'এই আমার ছোট পুত্তুর। গতবার প্রাইমারিতে বৃত্তি পাইছিল। একটা বছর বাজুনে মাইনর স্কুলে পড়িছে। এবার আপনার কাছে নিয়ে আলাম নরেশবাবু। ক্লাস সিক্সে ভর্তি হবে।'—বললেন শ্রীনাথ পণ্ডিত।

নরেশ বাবুকে দেখেই চিনেছে রুনু। সঙ্গে সঙ্গে প্রণাম করল। এসব আর এখন বলে দিতে হয় না। এই স্কুলেই তো সেবার বৃত্তি পরীক্ষার সেন্টার হয়েছিল। তখনই দেখেছিল, এঁর সঙ্গে বাবার খুব আলাপ আছে।

ছিপছিপে কালো মানুষটি। চোখে-মুখে একটা প্রতিভার দীপ্তি। প্রথম দর্শনেই একটা সশ্রদ্ধ ভীতির সঞ্চার হয় যে-কোনো ছাত্রের মনে। শ্রীনাথ পণ্ডিতের বয়স ছিয়াত্তর, এঁর বয়স চল্লিশের বেশি নয়। এঁরা যে পরস্পরকে শ্রদ্ধা করেন সেটা নরেশবাবুর অভ্যর্থনার আন্তরিকতা দেখেই বুঝতে পেরেছে রুনু। এই শ্রদ্ধার ভাবটি কিন্তু দেখেনি রুনু বাজুনীয়া স্কুলের হেডমাস্টারের মধ্যে। শ্রীনাথ পণ্ডিত তাঁর কাছে কেবল একজন পাঠশালার পণ্ডিত, নরেশবাবুর কাছে একজন পরম শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি—এ জেলার শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত।

'একটু পরীক্ষা-টরিক্ষা করে দেখুন না।'

'আপনার ছেলেকে আর কী পরীক্ষা করব?—হেসে বলেন নরেশবাবু, কী নাম তোমার?'

নাম বলল রুনু।

কথায় কথায় একটু পরীক্ষা করলেন।

'ক্লাস ফাইভে ইংরাজিটা পড়েছ তা ভালো করে?'

মাথা নাড়ল রুনু। তার দুরকম অর্থই হতে পারে বুক কাঁপছে ওর।

'টেন্স ক-রকম বলো তো?'

উত্তর ঠিকই দিল রুনু।

'ফিউচার বানান করো।'

এইখানেই হোঁচট খেল রুনু। দু'-তিন রকম বানান করে বসল।

নরেশবাবু গম্ভীরমুখে আবার প্রশ্ন করলেন, 'জেন্ডার পড়েছ?'

'হ্যাঁ স্যার।'

'ক' রকম? কী কী?'

এবারও উত্তর ভুল হল না, কিন্তু ঠেকে গেল 'নিউটার' বানান করতে।

গম্ভীরমুখে হেডমাস্টার মশাই ওকে দুটো শব্দেরই শুদ্ধ বানান শিখিয়ে দিয়ে বললেন, 'আচ্ছা যাও, ক্লাসে গিয়ে বোসো।'

রুনু চলে যেতে উনি মৃদু হেসে বললেন শ্রীনাথ পণ্ডিতকে, 'আপনার পাঠশালার ছাত্রদের ইংরাজি নিয়ে আমাদের বেশ বেগ পেতে হয়। তবে ওর স্মরণশক্তি ভালো, উচ্চারণও ঠিক আছে। হয়ে যাবে।'

বাইরে এসে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে রুনু। ক্লাস সিক্সের ঘরটা অবশ্য খুঁজে বের করা কঠিন নয়, প্রত্যেক ঘরের দরজার মাথায় ক্লাস লেখা আছে। কিন্তু পিতার অনুমতি ছাড়া ওর ক্লাসে যাবার সাহস হচ্ছে না। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছে। বাজুনিয়া স্কুলে ভর্তির সময় ফাদার-মাদার বানানে ঠেকেছিল, এখানে ঠেকে গেল ফিউচার-নিউটারে। অদ্ভুত এই ইংরাজি ভাষাটা। দুটো শব্দেরই উচ্চারণ প্রায় একরকম অথচ বানান আলাদা। Future ফিউটার, আর Neuter নিউটার—এর কোনো মানে হয়? এ যে কী করে ঠিক রাখা যায়, ও ভেবেই পেল না। হঠাৎ রুনুর খেয়াল হলঃ কেন, বাংলাতেও তো এরকম আছে। যদি—নদী, হাঁস-বাঁশ, ভুবন-ভূষণ। এগুলো তো খেয়াল থাকে। ওগুলো যে কেন ভুল হয়ে যায়।

রুনুকে সেদিন ক্লাসেও পৌঁছে দিলেন শ্রীনাথ পণ্ডিত। যাবার সময় কড়া ধমকের সুরে বললেন, 'ইংরাজি তো কিচ্ছু শিখতি পারোনি। একটা বছর তোমার জলে গেছে! ছিঃ ছিঃ, লজ্জায় আমার মাথা কাটা গেছে! এই ছাত্র নিয়ে অহঙ্কার করে গিছিলাম হেডমাস্টার মশায়ের কাছে! খাটতি হবে, প্রাণপণে খাটতি হবে। ইংরাজিতে ফার্স্ট হতিই হবে, না হলি বাড়ি যাবার নামও মুখি আনতি পারবা না। আমি যোগেন ডাক্তাররে বলিছি, ইংরাজিডা তোমারে দেখায় শুনোয়ে দেবে। ওদের বাড়িতে ভালোভাবে থাকবা। সবাইরে মান্য-ভক্তি করবা। মন দিয়ে পড়বা। কোনো নিন্দে-মন্দ যেন না শুনি। আবার শেষ কথা কয়ে যাই—সব বিষয়ে ফার্স্ট হতি হবে। না হলি বাড়ি যাওয়া বন্ধ।

অপরাধী পুত্রকে কঠোর দণ্ডাদেশ দিয়ে গেলেন পিতা। রুনুর মুখে কোনো কথা নেই। কেবল চোখ দুটি ছলো ছলো করে উঠেছে। মনে মনে একটা দুর্জয় শপথ নিয়ে সেদিন ক্লাসে ঢুকল রুনুঃ ইংরাজিতে ও ফার্স্ট হবেই। বাজুনিয়া স্কুলে হতে পারেনি। কিন্তু এখানে হতেই হবে। না হলে ও আর বাড়িই যাবে না কোনো দিন। বাবাও তো বলে গেলেন সেই কথাই।

বাড়ি ফিরে আসবার পথে শ্রীনাথ পণ্ডিতের চোখ দুটোও মাঝে মাঝে ঝাপসা হয়ে আসছে। পুত্রের প্রতি ওঁর শেষ কথা গুলি যেন বড় বেশি নির্মম, বড় হৃদয়হীন পিতার মতো হয়ে গেল। একটু নরম সুরেও তো বলা যেত। কিন্তু ছেলে মানুষ করতে হলে স্নেহের দৌর্বল্যকে প্রশ্রয় দেওয়া ঠিক নয়, জানেন অভিজ্ঞ পণ্ডিতমশাই। ইন্দ্রর কিছু হল না। শ্রীনাথ পণ্ডিতের বড় ছেলে, হয়ে রইল একটা গণ্ডমূর্খ। রুনুকে নিয়েই ওঁর যত আশা-ভরসা। একে মানুষ করতেই হবে। ম্যাট্রিকে বৃত্তি না পেলে কলেজ পড়ানো তো হবেই না। সে ব্যয় উনি বহন করবেন কী করে? ঈশ্বরই জানেন সে পর্যন্ত উনি বেঁচে থাকবেন কিনা! সেই সাফল্য যেদিন লাভ করবে রুনু, সেদিন বুঝবে পিতার এই নিষ্ঠুরতার মূল্য। সেদিন বুঝবে কতখানি স্নেহ উনি করেন রুনুকে। আজ ভাবুক নিষ্ঠুর। শ্রীনাথ পণ্ডিত গোপনে চোখের জল ফেলবেন, তবু রুনুকে দেখতে দেবেন না সে স্নেহ-কোমল রূপটি। তাহলে ওর ভয় ভেঙে যাবে, প্রতিজ্ঞায় অটল থাকবার জিদ থাকবে না।

দুই

যোগেন ডাক্তারের বাড়ি চিনে যেতে সেদিন রুনুর কোনো অসুবিধে হয়নি। প্রায় আধ ঘণ্টা আগে পৌঁছেছিলেন শ্রীনাথ পণ্ডিত।

রাস্তার উপরই ডাক্তারবাবুর বাড়িটা। দক্ষিণমুখী বৈঠকখানা ঘরে বসে ডাক্তারবাবুর সঙ্গে গল্প করতে করতে পথের দিকেই চেয়ে ছিলেন শ্রীনাথ পণ্ডিত।

জানুয়ারির শীতেও চার মাইল পথ হেঁটে দস্তুরমতো ঘেমে গেছে রুনু। ঘেমে গেছে নগরবাসীও। নগরবাসীর মাথায় রুনুর সুটকেস-বিছানা ছাড়াও মস্ত এক বস্তা ভর্তি বাড়ির খেতের আনাজপাতি। মাছের হাঁড়িটা বয়ে আনতে হয়েছে রুনুকেই। হাঁপিয়ে গেছে ওরা দুজনেই।

'এইখেনেই নামাও নগরবাসী।'—বলতে বলতে পণ্ডিতমশাই নিজেই উঠে বোঝা নামাতে সাহায্য করলেন নগরবাসীকে।

বস্তাটা খুলতে খুলতে অমায়িক হাসি হেসে বললেন, 'বাড়ির কিছু তরিতরকারি শাক-পাতা আনাইছি যোগেন। সরমাকে ডাকো। দেখে খুশি হবেনে। এই বয়সে নিজি তো আর বয়ে আনতি পারিনে, তাই ভাবলাম এই সুযোগে...'

'দেখে অবশ্য আমিও খুশি হয়েছি। কিন্তু এত আনবার কী দরকার ছিল বলুন তো? এ লোকটার তো দেখছি একেবারে কালঘাম ছুটেছে! ইশ! বোসো বোসো কত্তা। একটু জিরিয়ে নাও। ও হাঁড়ির মধ্যে আবার কি এনেছ রুনু?'

রুনু কিছু বলবার আগেই পণ্ডিতমশাই বললেন, 'আমি হলাম জাল্যে পাড়ার পণ্ডিত। মাছ তো আর বড় পয়সা দিয়ে কিনতি হয় না। তাই ভাবলাম, শীতির কই কিছু খাওয়াই তোমাগে। বাছাই কই আনিছি দুই কুড়ি। তাই প্রায় সের দশেক।'

'কী সর্বনাশ, ওইটুকু ছেলে সারা পথ মাথায় করে এনেছে এই বোঝা!'

ইতিমধ্যে পর্দা সরিয়ে ভিতর থেকে এঘরে প্রবেশ করলেন ভারী লাবণ্যময়ী একটি বউ। গায়ের রঙটা যদিও কালো, কিন্তু বড় উজ্জ্বল কালো।

'এই যে, আসো সরমা। রুনু, ইনি তোমার মাসিমা হন।'

সঙ্গে সঙ্গে প্রণাম করল রুনু। মনে পড়ল, এই সুন্দর কালো বউটাকে আগের বারও দেখেছিল সে। রুনুকে লোকের কাছে টেনে নিয়ে তিনি আদর করে বললেন, 'আহা, এ যে এখনও সেইটুকুই আছে, গতবার যেমন দেখিছিলাম। তুমি মারে ছাড়্যে থাকতি পারবা তো রুনু?'

এবারও রুনু উত্তর দেবার আগেই পণ্ডিতমশাই সহাস্যে বলেন, 'বলো কী সরমা! ছেলে এখন আরে ছোট নাই। এই তো একবচ্ছর বাজুনে একেবারে একটা পরের বাড়িতি থাকে আলো। তোমরা তো আপনজন। এ ওর নিজির বাড়ির মতো। খুব পারবে থাকতি।'

আপনজন যে সে কথা মিথ্যে নয়। সরমা শ্রীনাথ পণ্ডিতের স্ত্রীর পিসতুতো বোন। পণ্ডিতমশাইয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক শালি-ভগ্নিপতির। কিন্তু বয়সের ব্যবধান বিস্তর। অনেকটা বাপ ও মেয়ের মতো। সরমার বয়স তিরিশও হয়নি। সরমা তাই পণ্ডিতমশাইকে বাপের মতোই শ্রদ্ধা করেন, মান্য করেন! তিনিও কন্যাবৎ স্নেহ করেন সরমাকে।

সরমা কিন্তু রুনুর মুখ থেকেই উত্তরটা শুনতে চান।

'কী বল রুনু, থাকতি পারবা তো আমাদের কাছে?'

রুনু মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়।

পণ্ডিতমশাই তখনই রুনুকে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন স্কুলে ভর্তি করতে। সরমা প্রায় ধমকের সুরে বলেন, 'পণ্ডিত হলি কি মানুষের মায়া-দয়া থাকতি নাই? দেখতিছেন ছেলেডার চোখ-মুখ লাল হয়ে গেছে অতবড় এক হাঁড়ি মাছ বয়ে আনতি। না আনলি কী হতো? ওর কী যে সে কষ্ট হইছে? এখেনে কি মাছ পাওয়া যায় না?'

'অমন কই মাছ কিন্তু যখন তখন পাওয়া যায় না সরমা।'—হেসে বলেন পণ্ডিতমশাই, 'দেখলিই বুঝতি পারবানে।'

পণ্ডিতমশাইয়ের এই স্বভাব। খালি হাতে কারও বাড়ি যান না। নিজে খাওয়ার চেয়ে পরকে খাইয়েই আনন্দ পান বেশি। সেই কথাটাই বললেনঃ 'এইসব সদ্য-তোলা শীতের তরকারির সোয়াদই আলাদা সরমা। চরের মাটির লাউ, কুমড়ো, পুঁই, পালং, লঙ্কা, বেগুন তুমি এখেনে কি আর নিত্যি পাবা? কষ্ট ওর হইছে ঠিক, তা বুঝি সরমা। কিন্তু তোমাদের কিছু খাওয়াতি পারাটা যে বড় সুখের। এই বয়সে একটু কষ্ট করুক না। মানুষ হতি গেলি কষ্টকে ভয় করলি তো চলবে না। দুঃখের আগুনে পুড়িয়ে পুড়িয়েই তো ঈশ্বর খাঁটি সোনা তৈরি করেন। আশীর্বাদ করো ও মানুষ হোক।'

'আপনার ছেলে মানুষ হবেই।'—বললেন ডাক্তারবাবু ও সরমা একসঙ্গে।

শেষ পর্যন্ত সরমার জিদই বজায় রইল। তিনি খবর পেয়ে আগেই রাঁধা-বাড়া সেরে রেখেছিলেন। এবার কেবল কয়েকটা কই মাছ ভেজে ফেললেন চটপট করে। হাত-মুখ ধুল রুনু, ধুতে হল পণ্ডিতমশাইকেও নগরবাসীও বাদ গেল না। সকলকে পরিতোষ করিয়ে খাইয়ে হেসে বললেন সরমা, 'এবার যান ধীরে সুস্থে ছেলেরে ভর্তি করেন গিয়ে। ওরে তো যে-কোনো স্কুল লুফে নেবে। বৃত্তি পাওয়া ছাত্র। আবার আপনার ছেলে!'

তিন

ক্লাস সিক্সের কক্ষে প্রবেশ করে রুনু বেশ ঘাবড়ে গেল। এ যে মস্ত হলঘর। বাজুনিয়া স্কুলের ঘরে প্রায় দশ গুণ বড়। তখন টিফিন চলছে। প্রায় জনা পঞ্চাশ ছেলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে গুলতানি করছে। এখনও অনেক সিট খালি।

রুনু আশা করেছিল সামনের বেঞ্চেই হরেকেষ্টকে দেখবে। সে তো এবার থার্ড হয়ে ক্লাসে উঠেছে। সামনেই তো বসবার কথা। কিন্তু সারা ঘরে কোথাও দেখা গেল না হরেকেষ্টকে। ও বোকা-বোকা বিব্রত চোখে চারিদিকে তাকাচ্ছে। সামনের বেঞ্চ থেকে একটা লম্বা ছেলে ওকে বার বার দেখছিল। এবার সে হাতের ইশারার ওকে ডাকল।

রুনু কাছে যেতেই বলল, তুমি শ্রীনাথ পণ্ডিতমশাইয়ের ছেলে না?'

'হ্যাঁ। আপনি আমারে চেনেন?'

'চেনব না? একসঙ্গেই তো আমরা বৃত্তি পরীক্ষা দিছিলাম গত বছর। তুমি কি এই স্কুলে পড়বা?'

'হ্যাঁ, আজই ভরতি হলাম।'

'গত বছর কোথায় পড়িছিলে?'

'বাজুনে স্কুলে। এবারে এখেনে পড়ব। আপনিও কি এবার ভরতি হলেন?'

'না, আমি ক্লাস ফাইভেই ভরতি হইছিলাম। আমি তোমারে দেখেই চিনিছি। আমার পণ্ডিতমশায় তোমার দেখায়ে বলিছিলেন, ওই দ্যাখ সেই বিখ্যাত শ্রীনাথ পণ্ডিতের ছেলে। দেখিস নির্ঘাৎ বৃত্তি পাবে। তা, তেনার কথা ঠিক ফলে গেল। তুমি তো বৃত্তি পাইছিলে।'

'আর আপনি?'

'আমিও বৃত্তি পাইছিলাম।'—মুচকি হেসে বলে ছেলেটি, 'তোমার থেকে মাত্র দুই নম্বর বেশি পাইছিলাম।'

'তাই নাকি! কী সর্বনাশ!'—চমকে ওঠে রুনু—'আপনি সেই ফার্স্ট বয় হারান বিশ্বাস? কোটালপাড়া পাঠশালার ছাত্র? আপনারে আমার বাবা চেনেন। আপনাদের পণ্ডিতমশায়ের নাম দ্বারিকবাবু না? বাবা আপনার কথা কতবার বলিছেন! নাকি দারুণ ছাত্র! কিন্তু আপনিও যে এই স্কুলে পড়েন তা তো বলেননি বাবা।'

'দারুণ ছাত্র, না ঘোড়ার ডিম! কপালজোরে কেবল দুই নম্বর বেশি পাইছিলাম। পরীক্ষার কথা কিছু কওয়া যায় না। এবার হয়তো তুমি আমারে—'ও প্রসঙ্গ এড়িয়ে রুনুর হাত ধরে পাশে বসিয়ে হারান বলে, 'আচ্ছা, তুমি আমারে আপনি আপনি বলতিছ ক্যান? আমরা তো এক ক্লাসের ছাত্র।'

এক ক্লাসের ছাত্র হলেও হারানকে দেখতে রুনুর থেকে বেশ বড়সড়। বয়সও কয়েক বছর বেশি। ওকে হঠাৎ 'তুমি' বলতে ভরসা পায়নি রুনু।

কথায় কথায় ওদের বেশ ভাব হয়ে গেল। হারানকে রুনুর খুব পছন্দ হয়েছে। বৃত্তি পরীক্ষায় ফার্স্ট হয়েছিল, ফাইভ থেকেও ফার্স্ট হয়ে উঠেছে, তবু এতটুকু অহঙ্কার নেই। ভারী অমায়িক ছেলে।

হারানের মতে, হরেকেষ্ট থার্ড হলে কী হবে, সে-ও খুব ভালো ছাত্র। তার সঙ্গেও হারানের খুব ভাব। সে মাঝে মাঝেই স্কুল কামাই করে, তার মায়ের নাকি খুব অসুখ। ঘরে অনেক কাজ করতে হয়, তাই বেশি পড়াশোনা করতে পারে না।

রুনু বুঝল, হরেকেষ্টর সব খবরই রাখে হারান, কিন্তু বুঝতে পারছে না, বাবা কেন বলেননি যে, সেই ফার্স্ট বয় হারানের সঙ্গেই এবার ওর পাল্লা দিতে হবে। হঠাৎ ওর খেয়াল হল, এইজন্যেই হয়তো বাবা ওকে বার বার বলেছেন, ফার্স্ট হওয়া চাই। কিন্তু তা কি পারবে রুনু? কী একটা অজ্ঞাত ভয়ে রুনু যেন ক্রমেই আড়ষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

হরেকেষ্ট আজ কেন এল না সে কথা হারানই জিজ্ঞাসা করল রুনুকে।

'তোমাগে তো এক গ্রামে বাড়ি। আজ হরেকেষ্ট যে আসল না? কী হইছে ওর?'

'আমি তো জানি নে। আমি এখেনেই থাকি।'

'তাই নাকি? কোথায়?'—জিজ্ঞাসা করল পাশের ছেলেটি।

'যোগেন ডাক্তারবাবুর বাড়ি।'

'আরে, তাহলি তো আমাদের বাসার খুব কাছে! আগে দেখিনি তো?'

'আজই আইছি সে বাড়িতে।'

'তাই বলো।'—বলল সেই ছেলেটি। তার নাম সুবিমল।

আলাপ হল সুবিমলের সঙ্গে। ডাক্তারবাবুর বাড়ির দুটো বাড়ি পরেই গোপালগঞ্জ পোস্ট অফিস। সুবিমলের বাবা সেখানকার পোস্টমাস্টার। চার বছর ধরে ওরা গোপালগঞ্জ আছে। রাস্তাঘাট দোকান বাজার সব ওর চেনা। গাঁয়ের ছেলে রুনুকে শহর সম্বন্ধে জ্ঞান দান করবার দায়িত্ব সানন্দে গ্রহণ করল সুবিমল।

'আপনি কোথায় থাকেন হারানদা?'

'আমি থাকি উকিলপাড়ায় আমাগে এক আত্মীয় বাড়িতে।'

'সে কোন দিকে?'

'স্টেশানের দিকে। কিন্তু তুমি আমারে দা-টা বলবা না। নাম ধরে ডাকবা। না হলি আমি কথাই কবো না।'

হাসল রুনু। প্রায় তো দাদার মতোই বয়স। দেখতেও অনেকটা দাদার মতো। দাদার সঙ্গে তো তুমি-আমি করেই বলে রুনু। 'তুমি'-ই বলবে, কিন্তু নাম ধরে ডাকতে যে বড় লজ্জা করে। তাই বলল, 'তুমি বলব, হারানদাও বলব। তোমারে দেখতি ঠিক আমার দাদার মতো।'

'আচ্ছা তা-ই সই।'—হাসল হারান।

স্কুল ছুটির পরে সুবিমলের সঙ্গে বাসায় ফিরছিল রুনু। 'বাসা' আর 'বাড়ি'-র তফাতটা সুবিমলই শিখিয়ে দিয়েছে ওকে।

সুবিমল ওকে বড়রাস্তা দিয়ে না এনে নিয়ে এল ভিতর দিকের একটা সরু কাঁচা রাস্তা দিয়ে। এ রাস্তার দুধারে গাছপালা বন-জঙ্গল। মাত্র দু-একখানা ঘর মাঝে মধ্যে। একেবারে গ্রামের রাস্তা। শহর বলে মনেই হয় না। কাঁচা রাস্তা থেকে পাকা রাস্তায় উঠতেই হঠাৎ চিনে ফেলল রুনু ডাক্তারবাবুর বাসাটা। মাত্র বিশ-ত্রিশ হাত দূরে।

'আরে, এই তো আইসে পড়িছি। ওই তো ডাক্তারবাবুর বাসা।

'আর ওই যে বড় টিনের ঘর, লম্বা বারান্দা, ওই হল পোস্ট অফিস। ওর পিছনেই আমাগে বাসা। গরমেন্ট কোয়াটার। এ রাস্তাটা খুব শর্টকাট, না?'

সুবিমল গোটা কয়েক ইংরাজি কথা বলল যার মানে রুনু জানে না। কিন্তু প্রশ্ন করে ও সুবিমলের কাছে বোকা সাজতে রাজি নয়।

'এ পথটা তো খুব সোজা! এখন থেকে আমি এই পথেই স্কুলে যাব।'

'যাবাই তো। আমরা একসঙ্গে যাব। দিলীপদাও তো যায় এই পথে।'

'দিলীপদা কে?'

'ও মা, দিলীপদারে চেনো না! তুমি তো তাগে বাসায়ই থাকো। ডাক্তারবাবুর ছেলে ক্লাস এইটে পড়ে। দারুণ ফুটবল খেলে।'

সেই মুহূর্তে হঠাৎ রুনুর মাথায় এক চাঁটি পড়ল পেছন থেকে। কে যেন বলল, 'এই পুঁচকেটা কে রে বিমল? এ পাড়ায় তো দেখিনি আগে। এই পুঁচকে, কী নাম তোর?'

বলতে বলতে বিমলের পাশে এসে দাঁড়ায় এক স্বাস্থ্যবান কিশোর।

'বারে, আপনিও চেনেন না? ভারী মজা তো? ও তো আপনাগে বাসায়ই থাকে দিলীপদা।'

'আমাগে বাসায়? তার মানে?...ও-ও, বোঝলাম। আজই আইছিস। তাই না?'

'হ্যাঁ!'—আড়ষ্টভাবে বলে রুনু।

'শুনিছি তোর কথা। নাকি দারুণ ভালো ছাত্র। তুই সেই দাড়িওয়ালা পণ্ডিতের ছেলে না?'

শ্রীনাথ পণ্ডিতের এক বোঝা পাকা দাড়ি সমস্ত বুকটা ঢেকে রাখে তা সত্যি। তাতে তাঁকে মুনিঋষির মতো দেখায়, একথাও অনেককে বলতে শুনেছে রুনু। কিন্তু তাঁকে 'দাড়িওয়ালা পণ্ডিত' বলতে এই প্রথম শুনল। ভীষণ রাগ হল ওর। কথার জবাব না দিয়ে গম্ভীরভাবে চলতে থাকল শুধু।

'কি রে, কথা কোস না ক্যান? কী নাম তোর?'

নাম বলল রুনু।

'ওরে বাবা, একেবারে যে দেড়গজী নাম! ও সব আমার মনে-টনে থাকবে না। তোর নাম রাখলাম পুঁচকে।'

'পুঁচকে নামটা রুনুর মোটেই পছন্দ হল না। ও গম্ভীর গলায় বলে, 'আপনি আমারে রুনু বলে ডাকবেন। সবাই তা-ই ডাকে।'

'রুনু না বলে রেণু বললিও তো হয়। তা হলি বেশ মেয়ে হয়ে যাবি। আমাদের পাড়ায় একটা দুষ্টু রেণু আছে। তুই কিন্তু ভালো মেয়ে হবি।' বলতে বলতে রুনুর থুতনি নেড়ে দিল দিলীপ।

এই দিলীপদাকে একটুও ভালো লাগছে না রুনুর। অথচ প্রতিবাদেরও সাহস নেই। কেবল যে ওর পাকানো হাতের মাসল আর ডানপিটে চেহারা দেখেই সয়ে যাচ্ছিল ওর এই ব্যবহার তা নয়, রুনুর আসল ভাবনা এই দিলীপদাদের বাড়িতেই তো থাকতে হবে তাকে। এমন একটি রত্নের সঙ্গে এক বাড়িতে ও থাকতে পারবে কি? বাবা ওকে বাড়ি থেকে নির্বাসন দিয়ে এ কোথায় এনে ফেলে গেলেন!

দিলীপের পেছনে পেছনেই ওদের বাসায় এল রুনু।

ঘরে ঢুকেই টেবিলের উপর হাতের বইখাতা ছুড়ে ফেলে দিয়ে রুনুকে হুকুম করল দিলীপ, 'নে, ভালো করে গোছায় টোছায় রাখ, দেখি। তোর বইটই কোথায়?'

'ওই ঘরে আছে আমার সুটকেসে।'—বৈঠকখানা ঘরটা দেখিয়ে দিল রুনু।

'তুই শুবি কোথায়?'

'জানি না তো।'

'ঠিক আছে। এই ঘরেই শুবি। এডা আমার পড়ার ঘর। রাখ, তোর জন্যি একখান খাটের ব্যবস্থা করি। তুই তো পুঁচকে। বৈঠকখানা ঘরের ছোট খাটটা হলিই চলবে। তোর বিছানা আছে না?'

'আছে ওই ঘরে।'

'নিয়ে আয়। আচ্ছা চল, দুইজনে ধরাধরি করে নিয়ে আসি।'

রুনুকে নিয়ে দিলীপ বীরদর্পে চলে এল বৈঠকখানা ঘরে। দুই ঘরের মাঝে কেবল একটা দরজার ব্যবধান। সেই দ্বারপথে নিঃশব্দে এ-ঘর থেকে ও-ঘরে চলে গেল রুনুর সুটকেস বিছানা। তারপর খাটখানা টানাটানি করতেই বহুবিধ শব্দ শুরু হল। সেই শব্দে আকৃষ্ট হয়ে ভিতরের ঘর থেকে পর্দার পাশ দিয়ে কয়েকটি বাচ্চা মুখ উঁকি দিল। পরক্ষণেই দিলীপের এক কড়া ধমকে সবাই ছুটে পালাল। একটু পরে দেখা গেল সরমা মাসির গম্ভীর মুখ। দিলীপ ফিরেও তাকাল না। সে সমানে রুনুকে হুকুম করে যাচ্ছে—'এখানটা ধর, ওদিকটা তোল, এবার ঠেলা লাগা ইত্যাদি।

'এসব কী হচ্ছে?'—প্রশ্ন করলেন মাসিমা।

দিলীপ সে কথার উত্তর দিল না। ঠেলতে ঠেলতে খাটখানা নিয়ে গেল ওর ঘরে।

পড়ার ঘরখানাও দক্ষিণমুখী। পূব দিকে ছিল দিলীপের খাট এবং খাটসংলগ্ন পড়ার টেবিল, পশ্চিম দিকে একটা মাদুর পাতা। মাদুরটা এক লাথিতে সরিয়ে দিয়ে সেইখানে পাতা হল রুনুর খাট।

পরিশ্রান্ত দিলীপ এবার টান টান হয়ে শুয়ে পড়ল তার বিছানায়। তারপর ঘরের কোণের ঝাঁটাটা দেখিয়ে বলল, 'নে ভালো করে ঘরটা ঝাঁট দে। তারপর খাটের উপর তোর বিছানা পাত।'

বাধ্য বালকের মতো ঘর ঝাঁট দিতে শুরু করল রুনু। হঠাৎ এক লাফে উঠে এ-ঘর ও-ঘরের মাঝের দরজাটার খিল এঁটে দিল দিলীপ। এ-ঘরে অবশ্য আরও দুটো দরজা আছে। একটা রাস্তার দিকে, একটা ভিতরের দিকে। দু-ঘরের মাঝের দরজা বন্ধ থাকলেও সেই উত্তর দিকের দরজা দিয়ে ভিতরের উঠোন হয়ে আসা যায় এ-ঘরে।

দিলীপ আবার তার বিছানায় শুয়ে পড়ে বলল, 'ব্যাস, নিশ্চিন্দি। শুধু তুই আর আমি পড়ব এ-ঘরে। ওসব বাচ্চা-কাচ্চা আর আসতি দেব না। ওরা বড় ডিসটার্ব করে।'

রুনু এতক্ষণ ভেবে যাচ্ছিল, দিলীপ সরমা মাসির ছেলে, আর ওই বাচ্চারা ওর ছোট বোন। কিন্তু দিলীপের কথার ধরন থেকে কেমন সন্দেহ হল। জিজ্ঞাসা করল, ওরা কারা?'

'কিচ্ছু জানিস নে দেখতিছি। জানবিই বা কী করে? আজই তো আইছিস। কালে কালে সব জানবি।'—রহস্যজনকভাবে বলে দিলীপ।

'কী জানব? বলেন না।'—কেমন যেন একটা রহস্যের গন্ধ পেয়ে কৌতূহলী হয়ে ওঠে রুনু।

'তয় শোন। একদিন তো সবই জানবি। আজই জানতি আর দোষ কী!'

বেশ একটা গল্পের মতো করে বলল দিলীপ।

'এ-বাড়ির রাজার নাম যোগেন ডাক্তার। তার দুই রানি, সুয়োরানি আর দুয়োরানি। ওই যে বাচ্চাগুলোন দেখলি ওরা হল সুয়োরানির, আর সুয়োরানির তো দেখলিই এই মাত্র, বাচ্চাদের পিছনে পিছনে দর্শন দিয়ে গেল।'

'উনি তোমার মা না?'

'দূর! আমি হলাম দুয়োরানির ছেলে। এ-বাড়ির একমাত্র রাজপুত্র। চল, এবার দুয়োরানিকে দেখবি।'

দিলীপের কথাবার্তা অদ্ভুত লাগছে রুনুর। নিজের বাপ-মা সম্বন্ধে কোনো ছেলে যে এভাবে কথা বলতে পারে, এ ও ভাবতেও পারে না। তবে রূপকথার গল্পে এমনটা শুনেছে মাঝে মাঝে।

চার

ডাক্তারবাবুর বাড়ির সামনেই রাস্তার পাশে একটা টিপ-কল আছে। মাসিমা ওই কলটাই তখন দেখিয়ে দিয়েছিলেন নগরবাসীকে হাত-মুখ ধোবার জন্য। দিলীপ রুনুকে নিয়ে গেল সেই জলের কলটার কাছে। ওরা হাত-মুখ ধুয়ে এল। এসে ওদের ঘরের রাস্তার দিকের দরজাটা বন্ধ করে ভিতর দিকের দরজা খুলে চলে এল ভিতরের উঠোনে।

চৌকো উঠোনটা বেশ বড়সড়। উঠোনের দক্ষিণ দিকে পড়ছে বৈঠকখানা ঘর আর ওদের পড়ার ঘর। পুব দিকে উঁচু দেওয়াল ঘেঁষে কয়েক ঝাড় কলাগাছ, কিছু লঙ্কা ও বেগুনের গাছ। আবার গাঁদা-রজনীগন্ধা-বেলফুলের ঝাড়ও আছে কয়েকটা। পশ্চিম দিকে লম্বা বারান্দা সংলগ্ন পর পর তিনটে কোঠা। বারান্দাটা ইংরাজি 'এল'-এর আকারে ঘুরে গেছে। ফলে উঠোনের উত্তর দিকেও দেখা যাচ্ছে বারান্দা সংলগ্ন একটা কোঠা।

পশ্চিমদিকের প্রথম কোঠাটা বেশ বড় আর বেশ সাজানো-গুছোনো। দরজা- জানলার পর্দা আছে। এখন দরজার পর্দাটা গুটোনো। সেই দরজা দিয়ে দেখা যাচ্ছে ঘরের ভিতরটা। দেখা যাচ্ছে, মাসিমা মেঝেয় বসে গম্ভীর মুখে একটা বাচ্চাকে দুধ খাওয়াচ্ছেন। দেখা যাচ্ছে আরও দু-একটা বাচ্চাকে আশে-পাশে। ওই ঘরের পাশের ঘরটাই রান্নাঘর। আজ সকালে সেই রান্না ঘরেই তো খেতে বসেছিল ওরা, নগরবাসী বসেছিল ওই বারান্দায়।

মাসিমাকে দেখে রুনু বিব্রতভাবে দাঁড়িয়ে পড়ে। দিলীপ ওকে একটা ঠেলা মেরে বলল, 'কী দেখতিছিস? চল, খাবি নে?'

ওকে নিয়ে গেল দিলীপ সেই উত্তর দিকের ছোট কোঠাটায়।

ছোট্ট একটু ঘর, কিন্তু বেশ ছিমছাম। রুনুর মনে পড়ল সুশীলাদির ঘরের ছবিখানা। সে ঘরের একপাশে ছিল বাঁশের মাচা, এ-ঘরের একপাশে সস্তা দামের একখানা তক্তাপোশ। তার উপর সাধারণ একটা বিছানা। শিয়রের দিকে একটা ঝুলনো বাঁশের আড়ার উপর দু-একখানা সাধারণ শাড়ি, সেমিজ আর দিলীপের দু-একটা প্যান্টশার্ট। এক কোণে তোলা উনুনে রান্নার ব্যবস্থা। এনামেলের হাঁড়ি-কড়াই, সামান্য কিছু বাসন-কোসন। তবে সব কিছু বেশ সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা।

'এই হল দুয়োরানির ঘর।'—বলল দিলীপ।

তখন ঘরে কেউ নেই। দিলীপ গলা ছেড়ে ডাকতে শুরু করল, 'ও মা, মা গো। তুমি কোথায়? আমাগে খাতি দিয়ে যাও।'

একটু পরে কাঁখে একটা মাটির কলসি আর হাতে কিছু ধোয়া বাসন নিয়ে প্রবেশ করলেন এক বয়স্কা মহিলা। বেশ শীর্ণ চেহারা। দেখে বয়স বোঝা শক্ত। চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ যে-কোনো বয়স হতে পারে।

'এই আমার মা।'—বলল দিলীপ।

পরিচয় না দিলে রুনু হয়তো এঁকে এ-বাড়ির ঝি ভাবত। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে প্রণাম করল রুনু।

'বাসনগুলন ধর তো বাবা?'—বললেন তিনি দিলীপকে।

দিলীপ ওঁর হাত থেকে বাসন নামিয়ে রাখতে উনি কাঁখ থেকে কলসটা নামালেন। তারপর রুনুকে টেনে নিলেন কোলের কাছে।

'কী নাম তোমার বাবা?'

নাম বলল রুনু।

'কই আমাগে খাতি দেবা না?'—আবার তাড়া লাগায় দিলীপ।

দিলীপের মায়ের মুখখানা ম্লান হয়ে গেল। ভার গলায় বললেন, 'ওরে ক্যান এ-ঘরে টানে আনলি দিলু? উনি শুনলি রাগ করবেন। উনি কয়ে গেছেন ও ছোটর ঘরে খাবে আর তার বাচ্চাগে পড়াবে।'

'কয়ে গেছে তো বয়ে গেছে!'—গর্জে উঠল দিলীপ—'ওই তো তোমার ছোট তেনার বাচ্চারে দুধ গেলাচ্ছেন। আমরা তো সামনে দিয়েই আলাম। ওরে ডাকল না ক্যান? উনি থাক ওনার মেয়ের পাল নিয়ে। ও আমাগে ঘরে খাবে, আমার ঘরে শোবে। ব্যস, এই আমার সাফ কথা।'

সারা গায়ে থর থর করে কেঁপে উঠল রুনু। হোক না সৎমা, তবু মা তো। তার সম্বন্ধে এভাবে যে কথা বলতে পারে কেউ, ভাবতেও পারে না সে।

'ওরে শত্তুর, তুই কি আস্তে কথা কতি পারিস নে?'

'ক্যান, কার ভয়ে আস্তে কথা কব?'—আর এক পর্দা গলা চড়াল দিলীপ।

'ওরে নিব্বংশে, চুপ কর। দাঁড়া, আমি ছোটরে জিজ্ঞাসা করে আসি।'

উঠতে যাচ্ছিলেন তিনি। দিলীপ তাঁর হাত ধরে জোর করে বসিয়ে দিল—'না তোমার কারো কাছে যাতি হবে না। ও তো শত্তুর। তুমি আমাগে খাতি দেবা কিনা কও?'

'আচ্ছা এখন তো এট্টু জল-টল খাক।'—ম্লান মুখে বললেন তিনি—'তারপর দেহি উনি আস্যে কী ব্যবস্থা করেন।'

দুজনের সামনে দুবাটি তেলমাখা মুড়ি দিলেন দিলীপের মা।

'তোমারে এট্টু গুড় দেব বাবা? দিলু তো মিষ্টি ছুঁতি চায় না। ওর তো তেল মাখাই পছন্দ।'

'আমারও ভালো লাগে ঝাল মুড়ি।' —বলল রুনু।

সত্যিই ভালো লাগছে। আয়োজন তুচ্ছ, কিন্তু স্নেহের মাধুর্ষ দিয়ে সব তুচ্ছতাকে ঢেকে দিয়েছেন বড় মাসিমা। রুনু মনে মনেই এঁকে বড় মাসি আর ওঁকে ছোট মাসি করে নিয়েছে।

'ছোট মাসিরে আপনি কী বলে ডাকেন দিলীপদা?'—হঠাৎ প্রশ্ন করে বসল রুনু।

'আমি ওর সাথে কথাই কই নে। ও আমার কে? ওরে আমি চিনি নে!' চিৎকার করে বলে দিলীপ।

রুনু দারুণ অপ্রস্তুত।

'ছিঃ ছিঃ দিলু। তোর জ্বালায় আমার মরণ হবে! এমন কথা কতি আছে? তোর বাবা যখন ওরে বিয়ে করিছেন, তখন উনিও তোর মা।'—নরম গলায় বলেন বড় মাসি।

'ইশ, মা না হাতি! ও সব আইন-টাইন আমারে শুনোবা না। বাবা তোমারেই বিয়ে করিছে আগে। তুমিই আমার মা। ও আমার কেউ না!'

'ওরে মুখপোড়া, এট্টু আস্তে কথা ক! সরো শুনলি কুরুক্ষ্যাত্তোর করবেনে। তুই মরিস না ক্যান মুখপোড়া! মরলি আমার হাড়-জুড়োয়!'

দিলীপ আস্তে কথা বলতে জানে না। ওদের সব কথাই যে ছোট মাসি শুনেছেন তা বোঝা গেল পরমুহূর্তেই।

বাচ্চা কোলে নিয়ে তিনি আগুনভরা চোখে এসে দাঁড়ালেন ওদের ঘরের দরজায়। কঠিন ব্যঙ্গের সুরে বললেন, 'ছেলেরে আর ঢঙের শাসন করতি হবে না দিদি। আদর দিয়ে দিয়ে তো নিজিরডির মাথা খাইছো, এখন বুঝি এই ছেলেডারও মাথা খাতি চাও?'

'ও কথা কবা না সরো।'—মর্মাহত গলায় বললেন বড় মাসি, 'ও নতুন আইছে, ও কিছু জানে না। দিলুর সাথে সাথে চলে আইছে। নিয়ে যাও না তোমার ঘরে। আমার এখেনে খাবে কোন ছাই?'

'না, ও যাবে না। নেহি যায়েঙ্গা!'—গলা ফাটিয়ে গর্জে ওঠে দিলীপ—'ও আমাগে সাথেই খুদ-কুঁড়ো খাবে। রাজভোগ খাকগে তোমার রাজকন্যেরা।'

বলতে বলতে শক্ত করে রুনুর হাত চেপে ধরে দিলীপ।

'ওরে দস্যি, থাম থাম!'—ব্যাকুলভাবে কেঁদে ফেলেন বড়মাসি, দিলীপের মুখে পিঠে ঠাস ঠাস করে চড় মারতে থাকেন।

দিলীপের সেদিকে ভ্রুক্ষেপও নেই—যেন হাতির পিঠে মশা। ও চিৎকার করে বলতে থাকে, 'জানিস রুনু, ওই যে খাট পালঙ্ক বাক্স ডেক্স আলনা আলমারি দিয়ে সাজানো বড় ঘর, ও-ঘর ছিল আমার মায়ের। ওই রাক্কুসী আস্যে আমার মারে তাড়াইছে! ও ডানির সাথে তুইও কথা কবি নে। ওর জন্যিই তো আমার মা-র...' অমন ডানপিটে ছেলে দিলীপের চোখেও জল এসে গেল।

'শোনো, শোনো দিদি, তোমার গুণধর পুত্তুরির কথা শোনো। ওই ডাকাতরি যদি আমি এ-বাড়িত্তে না তাড়াই তো...। আজই আমি এর একটা হেস্তনেস্ত করে ছাড়ব।'

দুপদাপ শব্দ করে ছোটমাসি ছুটে গেলেন তাঁর ঘরে। দড়াম করে দরজা বন্ধ করে জুড়ে দিলেন কান্না।

রুনু লক্ষ্য করেছে দিলীপের দিকে একবারও তাকাননি ছোটমাসি, একটা কথাও বলেননি ওর মুখে-মুখে। তাঁর সব নালিশ বড়মাসির কাছে।

ওদিকে ছোটমাসি কেঁদে চলেছেন কান্নার সঙ্গে অনেক অভিশাপ জুড়ে জুড়ে। এদিকে বড়মাসি সমানে মেরে চলেছেন দিলীপকে আর বলছেন, 'ওরে লক্ষ্মীছাড়া আপদ, তুই মর মর মর!'

এই পারিবারিক নাটকে রুনুর কোনো ভূমিকাই নেই। ও কেবল হতভম্বের মতো দেখছে আর শুনছে।

এক সময় বড় মাসি এ-ঘর থেকে বললেন দিলীপকে, 'তুই মরলিই আমি রক্ষে পাই!'

হঠাৎ ও-ঘর থেকে ছোটমাসিও চেঁচিয়ে বললেন, 'আমিও রক্ষে পাই।'

'কী বলল রে ও!'—রুখে উঠল দিলীপ ঘুষি বাগিয়ে—'তুমি শুনলে মা? তুই শুনলি তো রুনু? আসুক বাবা, তুই সাক্ষী। রাক্কুসীডা আমারে মরতি কয়! শুনলি তো? বাবা আসলি সত্যি কবি তো?'

এতক্ষণ রুনু ছিল নির্বিকার দ্রষ্টা। এবার দিলীপ ওকে সাক্ষী মানায় ও সচকিত হয়ে উঠল।

পাঁচ

খেলার মাঠ থেকে ফিরবার পথে কথা হচ্ছিল দিলীপ আর রুনুর।

আগে নাকি খুব সুখের সংসার ছিল ওদের। একমাত্র ছেলে দিলীপের আদরের সে কী ঘটা! প্রতিদিন ছেলেকে নিয়ে নদীর পাড়ে বেড়াতে যেতেন ডাক্তারবাবু। ওকে খাওয়ানো শোওয়ানো সাজানো নিয়ে বাপ-মা এমনই মেতে ছিলেন যে, অনেক জরুরি রুগিকেও ঘণ্টায় পর ঘণ্টা বসে থাকতে হতো। এখনও সে সব স্পষ্ট মনে আছে দিলীপের।

দিলীপের বয়স পাঁচ বছর হল, তবু আর ছেলেপুলে হয় না ওর মায়ের। তখন ডাক্তার দেখানো হল। ডাক্তার রায় দিলেন, আর হবে না। ব্যস, অমনি ডাক্তারবাবুর মন খারাপ হয়ে গেল। শেষে নাকি ওর মায়ের ইচ্ছাতেই আর একটা বিয়ে করলেন ডাক্তারবাবু।

'জানিস, আমার এখনও সবে মনে আছে। সে বিয়ের রাত্তিরটা মা সারারাত কাঁদিছেল। মায়ের কোলে বসে কাঁদিছিলাম আমিও। সে কান্না কেউ শুনল না। কেউ খবরও নিল না। সেই থেকে ওই যে ঢেঁকি-ঘরে ঠাঁই নেছে মা, তার আর নড়ন-চড়ন হল না।'

'ঢেঁকি-ঘর?'

'ওডা তো আগে ঢেঁকি-ঘরই ছিল। এখন ঢেঁকি নাই। সুয়োরানি তো আর ঢেঁকি পাড় দিতি পারে না। সেই থেকে মারণ শরীর ভাঙল। মা-ও পারে না।'

'সেই থেকে ডাক্তারবাবু একবারও...' কথাটা মুখ ফুটে বলতে পারল না রুনু।

'পেথম পেথম মাঝে মাঝে আসত, খবর-টবর নেত।'—দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে দিলীপ,—'কিন্তু আস্তে আস্তে রাক্কুসীডা সব বন্ধ করে দেলো। বাবারে আর ও ঘরে যাতি দেয় না। এট্টা কথা কতি গেলিই চোখ পাকায় চায়। মায়ের রান্না বাবারে খাতি দেয় না, বলে, মা নাকি বাবারে বিষ খাওয়ায়ে মারবে! এমন কথা শুনিছিস! আসলে ও-ই আমারে বিষ খাওয়ায়ে মারতি চায়। তাই তো আমি ওর হাতের জলটুকুও ছুঁইনে।'

'কেন, তোমারে মারবে কেন?'

'তাও বুঝিস নে ক্যাবলাকান্ত? আমিই তো বাবার একমাত্র ছেলে। সব সম্পত্তি আমি পাব। আমি মরলি তো ওর পোয়া বারো। শুনলি না তখন বললা?'

'ছোটমাসির ছেলে নাই?'

'তয় আর কচ্ছি কী? ওর কেবল মেয়ে। চার-চারডে মেয়ে। মেয়েরা পাবে কলা! আমি সব আইন-টাইন শুনছি।'—দক্ষ আইনজ্ঞের মতো বলে দিলীপ।

'কিন্তু উনি যদি আজ আপনার নামে নালিশ করেন ডাক্তারবাবুর কাছে?'

'সে তো করবেই। প্রতিদিনই করে। করুক না। আমার হবে কচু!'

'উনি যে বললেন এ-বাড়িতে আপনারে তাড়ায় দেবেন?'

'আমারে তাড়াবে বাবা? তাড়ালি আমি মারে নিয়ে কোর্টে কেস করব না?'

এ সব বড় বড় কথা বোঝে না রুনু। কী একটা দুর্জ্ঞেয় ভয়ে ওর গা শিউরে ওঠে।

একসময় দিলীপ চোখের জল মুছতে মুছতে বলে, এখন তো দুঃখে দুঃখে ওই রকম বুড়ি-বুড়ি চেহারা হয়ে গেছে মা-র। আগে কী সুন্দর ছিল জানিস? সারা গোপালগঞ্জে অমন সুন্দর বউ একটাও ছিল না। মায়ের সেই বউ-বয়সের ফটো তোরে দেখাবানে।'

একটু পরে রুনুর কানে কানে বলে দিলীপ, 'জানিস বাবা এখন মনে মনে পস্তাচ্ছে। ওরে আর দেখতি পারে না।'

'কেন?'

'ওর তো ছেলে হবে না। খালি মেয়েই হবে। আর ওই সব কালো মেয়ে বিয়ে দিতি গিয়ে বোঝাবে ঠ্যালা।'

কথাটা মিথ্যে নয়। ছোটমাসির স্বাস্থ্য ভালো, চেহারাও ভালো, কিন্তু বেশ কালো। বাচ্চা যে-ক'টা চোখে পড়েছে রুনুর, তারাও কালো। দিলীপের মতো ফর্সা সুন্দর স্বাস্থ্যবান কেউ নয়।

'ছোটমাসির ছেলে হবে না কেন?'—প্রশ্ন করে রুনু।

'ছেলে অমনি হলেই হল! আমি কালিবাড়িতে মানত করিছি না? আরও অনেক কম্ম করিছি।'—চোখ টিপে একটা রহস্যময় ইঙ্গিত করে দিলীপ।

দিলীপকে অনেক বড়, অনেক বিজ্ঞ বলে মনে হল রুনুর। কেবল গায়ের শক্তি নয়, কী যেন একটা শক্তি আছে ওর মধ্যে, সে শক্তির কাছে বশ্যতা স্বীকার করা ছাড়া উপায় নেই। সেটা ও মর্মে মর্মে বুঝল। বুঝে একটা অজানা আশঙ্কায় অস্থির হয়ে উঠল ও।

ও দিলীপের দলে ভিড়লে ছোটমাসি নিশ্চয়ই ওকেও শত্রু ভাববেন। তাহলে? তাহলে কি আর এ-বাড়িতে থাকতে পারবে ও? পারবে শান্তিতে পড়াশুনা করতে? অথচ ক্লাসে প্রথম না হতে পারলে তো নিজের বাড়িতেও স্থান হবে না ওর।

দিলীপের নির্দেশে পড়ার পরে হ্যারিকেন জালাল রুনু। দিলীপ তার বন্ধুদের সঙ্গে আজকের ম্যাচ খেলা প্রসঙ্গে আলোচনা করতে করতে সামনের দিকে এগিয়ে গেল। কতক্ষণে সে পড়ার ঘরে ফিরে আসবে, কে জানে!

হ্যারিকেন জ্বেলে দুহাতের উপর মুখ রেখে ভাবতে বসেছে রুনু। বইটই বের করতে আর ইচ্ছে হচ্ছে না। ডাক্তারবাবু কল থেকে ফিরে এলে কী আছে ওর ভাগ্যে, কে জানে। হয়তো, আজই এখানকার পাট শেষ হয়ে যাবে।

বেলা প্রায় এগারোটার সময় এখানে পৌঁছেছিল, এখন প্রায় সন্ধ্যা ছ'টা। এইটুকু সময়ের মধ্যে এখানে কত কাণ্ড হয়ে গেল। রুনু এখানে না এলে হয়তো এর কিছুই হতো না। আসলে ওকে নিয়েই তো হল গণ্ডগোলটা। অথচ ওর কিছুই করবার ছিল না।

ওর মন বলছে, এ-বাড়িটা বড় অশান্তির। এর চেয়ে অনেক শান্তি ছিল বাজুনীয়ার সেই ঠাকুরবাড়িতে। কেন যে বাবা ওকে নিয়ে এলেন সেখান থেকে! পরীক্ষায় প্রথম হলে হয়তো আনতেন না। শেষ পর্যন্ত রাগ হল ওর নিজের উপরই। ও কেবল চুয়াকেই বেশি ভালোবেসেছে, তাকেই পড়িয়েছে বেশি। পড়িয়েছে দিপু-নিপুকেও। কেবল ও নিজের পড়াটাই পড়েনি ভালো করে। তাই ও ফার্স্ট হতে পারেনি। কীভাবে হবে? ও খারাপ ছেলে হয়ে গেছে। নিশ্চয়ই খারাপ ছেলে। বাবা সব বুঝতে পারেন। তাইতো ওকে এই শাস্তি দিয়ে গেছেন।

মনে মনে দৃঢ় শপথ নিল রুনু। ও আবার ভালো ছেলে হবে। আবার ফার্স্ট হবে। সব বিষয়ে ফার্স্ট। হোক না এখানে কষ্ট অশান্তি, সব সহ্য করবে ও ভরতের মতো। তখন বাবা আর শান্তি দেবেন না। দিলীপদাও উপেক্ষা করবে না পুঁচকে বলে।

ছয়

বেশ সেজেগুজে তিনটি মেয়ে লাইন দিয়ে প্রবেশ করল ওদের পড়ার ঘরে। ছোটটির বোধ হয় পাঁচও পোরেনি, বড়টির বয়স নয়-দশ, মাঝেরটি মাঝামাঝি।

ওদের দেখেই তাড়া করে উঠল দিলীপ—'ভাগ, ভাগ। এ-ঘরে আসবি নে। এখানে আমরা পড়ব।'

'তবে আমরা পড়ব কোথায়?'—ভয়-ভয় চোখে বলল ওদের বড়টি।

'কেন, নিজিগে ঘর নাই? সে ঘরে পড়া যায় না? এ ঘর আমার।'

ব্যাপারটা সহজে মিটল না। দিলীপ দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে এক ধমক লাগাতেই ছোটটি জুড়ে দিল কান্না—'ও মা দাদা আমারে...'

কান্না শুনে উঠোনের ওদিকের দরজা দিয়ে প্রবেশ করলেন বড়মাসি, বৈঠকখানার দিকের দিয়ে ছোটমাসি। মঞ্চ পূর্ণ হল। নাটক জমে উঠল।

দিলীপ কারও দিকে না তাকিয়ে প্রবল বেগে পড়তে শুরু করল, 'লেট এ বি সি বী এ ট্র্যাঙ্গল, লেট এ বি সি বী...'

রুনু ভয়ার্ত চোখে একবার এ-মাসির দিকে একবার ও-মাসির দিকে তাকায়।

কাঁদুনে মেয়েকে কোলের কাছে টেনে নিয়ে প্রশ্ন করেন বড় মাসি, 'কী হইছে রে মা? কাঁদিস ক্যান?'

'ও মারিছে।'—দিলীপকে দেখিয়ে দেয় আঙুল দিয়ে।

বড়মাসি আর কোনো কথা না বলে দুম দাম কিল মারতে থাকেন দিলীপের চুলের মুঠি ধরে। আর সমানে মুখ চলতে থাকে, 'মর, মর, তুই মর।'

ছোটমাসি যে চোখে দিলীপের দিকে তাকালেন তাতে ওর ভস্ম হয়ে যাবার কথা। কিন্তু দিলীপের একটা চুলও নড়ল না। ওর মায়ের হাত দুখানা চেপে ধরে ও জেদি গলায় বলে, 'ওই মিথ্যুকটার কথা তুমি বিশ্বাস করলে মা! শোনো তো রুনুর কাছে আমি ওরে মারিছি নাকি?'

রুনু দারুণ বিব্রত। সত্যি কথা বললে যে ছোটমাসি চটে যাবেন। ওর ভাগ্য ভালো। ওকে প্রশ্ন না করেই ছোটমাসি গম্ভীর গলায় বললেন, 'না মারলি কেউ খালি খালি কাঁদে?'

বড়মাসি যেন পাগল হয়ে গেছেন। জোর করে একখানা হাত ছাড়িয়ে আবার চড়-কিল চালাতে লাগলেন।

'থাক আর সোহাগ দেখারে ছেলে মারতি হবে না দিদি। ও ডাকাতির হাতে কবে যে কোনডা মারা পড়বে, কে জানে! আমার মেয়েগে পড়াবার জন্যিই ওরে রাখা। তোমার সুপুত্তুর যদি ওগে পড়তিই না দেয়, তয় আর ওরে রাখ্যে কী হবে? আসুক উনি, আজই ঝামেলা চুকোয় দেব। আমার মেয়েদের পড়াশুনোর দরকার নাই, মাস্টারও দরকার নেই। একা তোমার ছেলেই লায়েক হোক পড়ে পড়ে। তাও যদি বছরে বছরে ফেল না করত?'

কথা শেষ করেই তিনি মেয়েদের সঙ্গে নিয়ে প্রস্থান করলেন।

শেষ কথাটার জবাব দিল দিলীপ আকাশকে শুনিয়ে, 'ফেল করি তো ওই গুষ্টির জন্যিই। ওগে কিচির-মিচিরের ঠ্যালায় কেউ পড়তি পারে; আজ মারি নাই, কিন্তু এর পরে আমার ঘরে কেউ আসলি আমি চাঁটির চোটে খুলি উড়োয়ে দেব। কয়ে দেলাম।'

'এ ঘর কি তোর বাপের ঘর রে হারামজাদা! '—বড়মাসি আর এক চাঁটি লাগলেন দিলীপের মাথায়।

হো হো করে হেসে পড়ল দিলীপ—'আমার বাপের ঘর না তো কি তোমার বাপের ঘর?'

'মর লক্ষ্মীছাড়া! কথার ছিরি দেখ না। আজ বুঝবিনি মজা!'—বলতে বলতে প্রস্থান করলেন তিনিও।

মঞ্চ প্রায় শূন্য। দুটি চরিত্র মুখোমুখি বসে। কারও মুখে কথা নেই।

রুনু ভাবছে, ওর গোপালগঞ্জের পাট চুকল। আবার ফিরে যেতে হবে সেই বাড়িতে, যে বাড়ি ওর কাছে কারাগার হয়ে উঠেছিল, যে বাড়ি থেকে মনে মনে ও জন্মের মতো বিদায় নিয়ে এসেছে আজ সকালে।

ভাবছে দিলীপও! এ যুদ্ধে কি ও জিততে পারবে? ভরসা নেই। বাবা হয়তো ওই রাক্কুসীর কথামতো রুনুকে তাড়িয়েই দেবে। ক্ষতি হবে একটা ভালো ছেলের। ছেলেটাকে সত্যিই একদিনেই ভালোবেসে ফেলেছে দিলীপ। ভারী নরম স্বভাব। ওর ক্ষতি করা কি উচিত হবে?

'তোর কম্ম সারা!'—হঠাৎ কথা করে উঠল দিলীপ।

শিউরে উঠল রুনু! চোখে জল এসে গেল। মুখে কথা নেই।

দিলীপ আবার বলল, 'ওই গুষ্টিরে পড়ানোর জন্যি তোরে রাখিছে? তা তো জানতাম না। দুই-দুই জন বুড়ো মাস্টারই পালায় গেল, তুই তো একটা পুঁচকে! তুই পারবি?'

'পারতিই হবে।'—সাহস পেয়ে বলে রুনু, 'আমি তো আগেও কয়েকজন ছোট ছেলেমেয়ে পড়াইছি। তারা আমারে খুব ভালোবাসত। ওদেরও পড়াব, না হলি ডাক্তারবাবু যে আমারে তাড়ায়ে দেবেন!'

'বোঝলাম। তাহলি যাও পণ্ডিতমশায়, ওগে ঘরে যাইয়ে পড়াও গে। আমার ঘরে ওগে আর ঢুকতি দেব না। এই আমার সাফ কথা।'

'যাব? কিন্তু ছোটমাসি যদি রাগ করে তাড়ায় দেন?'—ভয়ে ভয়ে বলে রুনু।

'কার বাপের সাধ্যি তোরে তাড়ায়!'—বুক টান করে গর্জে ওঠে দিলীপ—'তুই দিলীপ পালের আশ্রয় নিছিস, সে-ই তোরে রক্ষে করবে। দিলীপ পাল কারও পরোয়া করে না।'

দিলীপের হম্বিতম্বি দেখে মনে হচ্ছে, ও-ই এ বাড়ির অভিভাবক। দিলীপের অভয় আশ্রয় লাভ করেও ভয় কাটে না রুনুর। মিন মিন করে বলে, 'আমি যাব ওদের পড়াতে?'

'যাও না। আমি কি তোমারে ধরে রাখিছি?'

'তুই' থেকে 'তুমি' সম্বোধনেই দিলীপের অভিমানটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এক-পা এক-পা করে রুনু এগিয়ে গেল ছোটমাসির ঘরের দিকে। ও-ঘর থেকে তখন সমবেত কণ্ঠে পড়া শোনা যাচ্ছে। দরজার পাশে দাঁড়াল রুনু। পর্দার পাশ দিয়ে দেখা গেল, মাদুর পেতে বসেছে সেই তিনটি। বড় দুটি যে যার বই থেকে কবিতা পড়ে যাচ্ছে মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে। ছোটটি প্রচুর কাপড়ের টুকরো, দেশলাই বাক্স আর গোটাকয়েক পুতুল নিয়ে গভীর মনোযোগে গৃহকর্ম করছে। কনিষ্ঠাটিকে কোলে নিয়ে ওদের পাশে বসে আছেন ছোটমাসি।

পর্দার পাশ দিয়ে মুখ বাড়াল রুনু। একটু পরে চোখাচোখি হল ছোটমাসির সঙ্গে।

'ও মা, তুমি আইছো? আসতি পারলে গুণ্ডোটায় হাত ছাড়ায়ে?'—স্নেহমাখা একটু হাসি দেখা গেল ছোটমাসির মুখে। সাহস পেয়ে এগিয়ে এল রুনু। ওরা কটিতে পড়া এবং খেলা বন্ধ করে তাকিয়ে আছে তার দিকে।

'বসো বাবা, বসো।'

আদেশ পেয়েই প্রণাম করল রুনু ছোটমাসিকে, তারপর ছোটমেয়েটির পাশে বসেই তাকে কোলে টেনে নিল। ভারী মিষ্টি টলটলে মুখখানা। প্রথম দর্শনেই ভালো লেগেছিল তার, ইচ্ছে হয়েছিল একটু আদর করতে। এবার মুখ টিপে মাথায় হাত বুলিয়ে প্রাণভরে আদর করল তাকে। সে-ও বিনাপ্রতিবাদে গ্রহণ করল রুনুর আদর।

ছোটমাসি অভিমানভরে বললেন, 'আইছো পরেত্তেই তো গুন্ডোটা তোমারে পাহারা দেচ্ছে। তোমার সাথে তো একটা কথাও কতি পারলাম না। কোন ক্লাসে ভরতি হলে?'

'ক্লাস সিক্স।'

'শুনিছি, তুমি খুব ভাল ছাত্র, কিন্তু ওর সাথে মিশলি তুমি বেশি দিন ভালো থাকতি পারবা না বাবা। ওর হাতেত্তে তোমারে বাঁচাতি পারব না আমরা। ওরে আমরা যমের মতো ভয় করি।'

যমের মতো ভয় করতে শুরু করেছে তো রুনুও প্রথম দর্শনাবধি। খেলার মাঠেও, দেখা গেল, ওকে ভয় করে ওর ডবল বয়সের উঁচু ক্লাসের ছেলেরাও। এবার যদিও ফেল করে ক্লাস এইটেই রয়ে গেল দিলীপ, তবুও ওই এইটের ছেলেই স্কুল টিমের ক্যাপ্টেন। দিলীপের কবল থেকে মুক্তি পাবে কি সে? কিন্তু তার যে ভালোও লাগছে এই শক্তিমান জেদি ছেলেটাকে। কেন যে ভালো লাগছে তার ব্যাখ্যা সে করতে পারে না। কেবল মনে হয়, দাদার সঙ্গে ওর কোথায় যেন মিল আছে।

আবার অদ্ভুত ভালো লাগছে এই ছোট মাসিকেও। ওঁর প্রতিটি কথার কানের মধ্যে বাজতে থাকে একটা চেনা সুর। কার সঙ্গে যেন এই ছোট মাসির খুব মিল। মিল চেহারায়, এমনকী গলার স্বরেও। হঠাৎ মনে পড়ে গেল—হ্যাঁ, ঠিক ঠিক। সেই চুয়ার মা, রুনু যাকে দিদি বলে ডাকত। খোকাদার দিদি। দিদির কথাগুলিও ছিল এমনি মিষ্টি, স্নেহমাখা। বোকার মতো ছোট মাসির মুখের দিকে তাকিয়ে শৈলদিকে খুঁজতে থাকে সে, ওর মনটা চলে গেছে বাজুনিয়ায় চুয়াদের বাড়িতে।

'কী দেখতিছ আমার মুখির দিকি?'—হেসে প্রশ্ন করেন ছোটমাসি।

লজ্জা পেয়ে মাথা নোয়ার রুনু। লাজুক গলায় বলে, 'আপনারে দেখতি না, ঠিক একজনের মতো।'

'কার মতো?'

'আপনি তারে চেনেন না। বাজুনের একজন। আমি দিদি বলতাম। আমারে খুব ভালোবাসতেন।'

'আমিও তোমারে খুব ভালোবাসব।'—হেসে বলেন ছোটমাসি—'যদি এগে ঠিকমতো পড়াতি পারো।'

'দেখবেন, আমি ঠিক পারব। আমি আগেও তো পড়াইছি ছোট ছোট কয়েকজনরে বাজুনেয়।'

'তাই নাকি?'

বাজুনিয়ায় দিপু-নিপুকে পড়াবার গল্প, তাদের ক্লাসে ফার্স্ট-সেকেন্ড হবার গল্প সবিস্তারে শোনাল সে ছোটমাসিকে।

ওর বর্তমান ছাত্রীদের সঙ্গেও অনেক কথা বলল। ছোটটি আগাগোড়াই ছিল ওর কোলে বসে। তার নাম পুষ্পরানি। সবাই ডাকে 'পুষি' বলে, ও বলে 'পুছি' বড়টি কমলা, মেজোটি প্রমীলা। সংক্ষেপে কুমু, পমি, পুষি। কুমু এবার ক্লাস ফাইভে উঠল, পমি উঠল থ্রিতে, আর পুষি এখনও বই যত না পড়ে তার চেয়ে বেশি ছেঁড়ে। এই তিনটিকে ওর পড়াতে হবে। রুনুই শিখিয়ে দিল ওদের 'রুনুদা' বলে ডাকতে, যেমন ডাকত দিপু-নিপু।

সাত

রাত্রে ছোটমাসির ঘরে ছাত্রীদের সঙ্গেই খেতে বসল রুনু। ডাক্তারবাবু তখনও ফেরেননি কল থেকে। মাঝে মাঝেই এমনি রাত হয়ে যায় ফিরতে। মাসিমা জেগে থাকেন। ছোটদের খাইয়ে দেন আটটার মধ্যেই।

খেতে বসে রুনু ভাবছে, মাসিমাকে যেমন প্রসন্ন এবং প্রফুল্ল দেখাচ্ছে তাতে মনে হয়, ডাক্তারবাবু ফিরে এলে আজ রাত্রে হয়তো ঝগড়া হবে না। কিন্তু এ-ঘরে এদের সঙ্গে ভাব করে এদের সঙ্গেই খেতে বসে ও কি কাজটা ভালো করল? দিলীপদা নিশ্চয়ই দারুণ রেগে যাবে। হয়তো ওকে তাড়িয়েই দেবে ও-ঘর থেকে। কিন্তু কী করবে ও? দিলীপদার কথায় ছোটমাসিকে যেমন মনে হয়েছিল, দুষ্টু মনে হয়েছিল মেয়েগুলিকে, তা তো এখন মনে হচ্ছে না ওর। ভালোই তো ওরা। তাছাড়া ওদের পড়াবার জন্যেই ওকে রেখেছেন ডাক্তারবাবু।

এখন সমস্যা হলঃ কী করে দিলীপদাকে প্রসন্ন রাখা যায়?

বারান্দায় মুখ ধুতে এসেই চোখে পড়ল, বড়মাসির ঘরের দরজাটা একটু ফাঁক করা। ঘরে আলো আছে, কিন্তু একটুও শব্দ নেই। শব্দ নেই পড়ার ঘরেও। তাহলে কি দিলীপদা খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়ল? এখন ওঘরে গেলে দিলীপদা কি ওকে তাড়িয়ে দেবে?

আর এক সমস্যা বড়মাসি। বড়মাসির মনে এতটুকু দুঃখ দিতে চায় না রুনু। অথচ এই যা করল, এতে কি বড়মাসিও দুঃখ পাবেন?

কী জানি কী মনে করে বড়মাসির দরজায় চলে এল রুনু।

একটু উঁকি মেরে যে দৃশ্য দেখল, তাতে ও ভীষণ ঘাবড়ে গেল। মহাগম্ভীরভাবে খেয়ে চলেছে দিলীপদা। পাশে বসে আছেন মাসিমা। তিনিও গম্ভীর।

ছোটমাসির ঘরের মূল্যবান আসবাব আর বড়মাসির ঘরের জীর্ণ বিছানাটা দেখে রুনুর বুকের মধ্যে একটা ব্যথা মোচড় দিয়ে উঠল। 'আমার মা এ-বাড়ির দুয়োরানি।'—বলেছিল দিলীপদা। কথাটা মিথ্যে নয়। সত্যিই তো এ অন্যায়। দিলীপদার তো অভিমান হবেই। রুনু যদি বড়মাসির ছেলে হতো, ওরও কি অভিমান হতো না এই অবিচার দেখে? কে করেছে এই অবিচার? করেছেন তো ডাক্তারবাবু। বড়মাসি কত ভালো! কেন তাঁকে এই কষ্ট দেওয়া?

গল্পের দুয়োরানিদের প্রতি বরাবর ওর সমবেদনা। বড়মাসির প্রতিও একটা গভীর সমবেদনা বোধ করল রুনু। ও হঠাৎ ঘরে ঢুকে একেবারে বড়মাসির পাশটিতে বসে পড়ল।

'আপনি আমার উপর রাগ করিছেন মাসিমা?' কাঁদো-কাঁদো গলায় বলে, 'আপনার ঘরে যাইনি বলে?'

'রাগ কেন করব বাছা। আমি দাসী বাঁদি। আমার ঘরের খুদ-কুঁড়োয় তোমার প্যাটও ভরত না, শান্তিও হতো না। যা করিছ ভালোই করিছ। ও মুখপোড়াডা বোঝে না, তাই...'

বড়মাসির গলায় অভিমানের সুর। দিলীপ মুখও তুলছে না রুনুর দিকে। দিলীপদা বলেছিল, ডাক্তারবাবুর প্রশ্রয়েই ছোটমাসির অত সাহস। ছোটমাসি প্রায়ই নাকি নানা মিথ্যা নালিশ করেন বড়মাসির নামে, তা-ই শুনে নাকি ডাক্তারবাবু মাঝে মাঝে মারধোরও করেন ওঁকে। কত রাত যে না খেয়ে থেকেছেন বড়মাসি। সারারাত কেঁদে কাটিয়েছেন, কেউ খবরও নেয়নি। বড়মাসির কত দুঃখ! রুনু অন্তত ওঁকে দুঃখ দেবে না। ওঁর ঘরেই খাবে। হোক না খুদকুঁড়ো, তা-ই খেয়েই তো দিলীপদার অমন স্বাথ্য। ও-ও তা-ই খাবে। অবশ্য ছোটমাসির মেয়েদেরও ঠিকই পড়াবে।

মনের ইচ্ছাটা হঠাৎ ওর মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল—'কালকেত্তে আমি আপনার ঘরেই খাব মাসিমা।'

'থাক, তোমার আর বাহাদুরি দেখাতি হবে না।'—খাওয়া ফেলে চিৎকার করে উঠল দিলীপ—'তুমি যাও তোমার বড়লোক মাসির পা চাটো গে, আমার মারে আর মাসিমা ডাকতি হবে না!'

মুহূর্তে মুখখানা কালো হয়ে গেল রুনুর। দিলীপ ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে। বাঁ-হাতে প্রায় ঘাড়ধাক্কা দিয়েই বের করে দিল রুনুকে ঘর থেকে। তারপর দড়াম করে দরজা বন্ধ করে দিয়ে বলল, 'আমি আর ও-ঘরে শোব না মা। তোমার কাছে শোব। দিলীপ পালরে যে অপমান করে, সে ছোটলোকের সঙ্গে আমি কথা কই নে?'

'ওরে মুখপোড়া, ও ছ্যামড়া কী দোষ করল? ওর গায়ে তুই কোন সাহসে হাত তুললি! ও কি যে-সে মানষির ছেলে? পণ্ডিত দাদা জানলি...'

রুনুর আর কোনো কথা কানে গেল না। দুঃখে অপমানে সে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। কাঁদতে কাঁদতে চলে এল ওদের পড়ার ঘরে। এসে দরজা বন্ধ করে দিল। ওর সঙ্গে যে আর একঘরে শোবে না দিলীপদা কোনো দিন, সেটা ও বুঝতে পেরেছে। কিন্তু ও যে সত্যিই দিলীপদাকে অপমান করতে চায়নি, দুঃখ দিতে চায়নি বড়মাসিকে, এ কথা যে কী করে ওদের বোঝাবে।

অনেকক্ষণ ধরে ফুলে ফুলে কাঁদলেন রুনু। অতীতের অনেক দুঃখ-রাতের কান্নার কথা মনে পড়ছে। কিন্তু এমন করে বুঝি আর ও কাঁদেনি কোনো দিন।

সকালবেলা রুনুর ঘুম ভাঙল প্রমীলার ডাকে—'ও রুনুদা। ওঠবা না? কত বেলা হল!'

ধড়মড় করে উঠে বসল রুনু লেপ ছেড়ে। শিয়রের জানলাটা খুলতেই ঘর ভরে গেল একঝলক কাঁচা-সোনা রোদে। চমকে উঠল রুনুঃ ইশ, কত বেলা হয়ে গেছে। আসলে ও তো সারারাত ঘুমোয়ইনি। বোধ হয়, ঘুমিয়ে পড়েছিল ভোরের দিকে। তা না হলে এত বেলায় ও কোনো দিন ওঠে না।

উত্তর দিকের দরজাটা খুলে দিতেই প্রমীলা ঘরে ঢুকল। তার হাতে একঘটি জল।

'এই নেও জল। তাড়াতাড়ি মুখ ধোও। আমি বিছানা তুলে ঘর ঝাঁট দিয়ে দিচ্ছি।'

'না, না, ওসব আমিই করতি পারি। তোমার করতি হবে না।' বলল রুনু।

'বাঃ! তুমি আমাগে মাস্টার না? মাস্টার বুঝি ঘর ঝাঁট দেয়।' গিন্নি-গিন্নি গলায় বলে প্রমীলা।

হেসে ফেলল রুনু। তাকিয়ে রইল আট বছরের গিন্নি মেয়ে প্রমীলার দিকে।

'কী দেখতিছ? মুখ ধোও। চা হয়ে গেছে। মা তোমারে চা খাতি ডাকতিছে।'

'চা! আমি চা খাব?' পরম বিস্ময়ে প্রশ্ন করে রুনু।

ড্রইং খাতায় চায়ের কাপ-ডিশের ছবি এঁকেছে রুনু। কিন্তু আজ পর্যন্ত চা জিনিসটা চোখে দেখেনি। ওর ধারণা, চা খায় বড়লোকেরা।

'কেন, তুমি চা খাওনা? আমরা তো সব্বাই খাই।' বলতে বলতে বিছানাটা বেশ পাট করে তুলল প্রমীলা, তারপর শুরু করল ঘর ঝাঁটা দিতে। রুনু বিস্ময়-ভরা চোখে ওর-কাজ কর্ম দেখছে।

ঝাঁট দেওয়া শেষ করে আর এক ধমক লাগাল প্রমীলা—'ও মা, এখনও দাঁড়ায়ে রইছ? মুখ ধোবা না?'

যে মুহূর্তে জলের ঘটি হাতে দরজার দিকে গেছে রুনু, তখুনি দিলীপের সঙ্গে একেবারে মুখোমুখি। কারও দিকে না তাকিয়ে টেবিলের উপর থেকে রুনুর বইগুলি চতুর্দিকে ছড়িয়ে ফেলে দিয়ে টেবিলটা টানতে টানতে বের করতে থাকে দিলীপ। ইচ্ছায় কি অনিচ্ছায় কে জানে, টেবিলের একটা ধাক্কা লেগে গেল প্রমীলার পায়ে। চিৎকার করে কেঁদে উঠল প্রমীলা।

কান্না শুনে ছুটে এলেন ছোটমাসি। এলেন ডাক্তারবাবু। পেছনে পেছনে এল পুষিও।

'দ্যাখো মা, দিলীপদা ইচ্ছে করে আমারে টেবিল দিয়ে গুঁতো মারল! আর রুনুদার সব বই...ওই দ্যাখো...আমি এত কষ্ট করে ঘর ঝাঁট দেলাম!' কথা বলছে আর কাঁদছে প্রমীলা।

দিলীপ কারও দিকে না তাকিয়ে টেনে-হিঁচড়ে বাইরে বের করল টেবিলটা।

'এসব কী হচ্ছে?' চিৎকার করে উঠলেন ডাক্তারবাবু।

দিলীপের মুখে জবাব নেই।

'বই-টইগুলো ওভাবে ছড়িয়ে ফেললি কেন?'

'আমার ইচ্ছে।' গোঁয়ার গলায় বলল দিলীপ।

'হারামজাদা শুয়োর!' বলতে বলতে প্রচণ্ড এক চড় কষালেন ডাক্তারবাবু। দিলীপের মাথাটা ঠুকে গেল টেবিলের সঙ্গে। আবার হাত তুললেন ডাক্তারবাবু, ছোটমাসি তাঁর হাত টেনে ধরে বললেন, 'থাক থাক, সকালবেলায় আর মারামারি করতি হবে না।'

'আন, টেবিল ঘরে আন। তোল, সমস্ত বই যেমন ছিল, তেমনি সাজিয়ে রাখবি টেবিলে।' কড়া হুকুম করলেন ডাক্তারবাবু।

হুকুম তামিল করবার কোনো লক্ষণই দেখা গেল না দিলীপের। ও অটল দৃঢ়তায় টেবিল ধরে দাঁড়িয়ে রইল।

'যাক না ওর টেবিল নিয়ে।' বললেন ছোটমাসি, 'এ ঘরের জন্যি আর একখান টেবিল কেনা যাবে।'

'আমি মেঝেয় বসেও পড়তি পারব। আমার টেবিল লাগবে না।' হঠাৎ বলল রুনু।

'ঠিক আছে। যা তোর যেখানে খুশি। এ-ঘরে আর কক্ষনো পা, দিবি না তুই।' বললেন ডাক্তারবাবু, 'এ-ঘরে ওরাই পড়বে।'

'কী মজা, কী মজা!'—হাততালি দিয়ে নেচে উঠল পুষ্প—'কাল আমাগে পড়তি দেয়নি এ-ঘরে। আজ কেমন মজা!'

মুহূর্তে ঠাস করে একটা চড় পড়ল পুষ্পর কচি মুখের উপর। মাটিতে গড়িয়ে পড়ল পুষ্প। শুরু করল গগনবিদারী কান্না। ডাক্তারবাবু আবার ছুটে যাচ্ছিলেন, মাঝখানে টেবিলটা থাকায় একটু বাধা পড়ল। ছোটমাসি আবার টেনে ধরলেন তাঁর হাত। এই সুযোগে টেবিল মাথায় করে দৌড় দিল দিলীপ।

ওদিকে পুষ্প কেঁদে ভাসিয়ে দিচ্ছে। দেখতে দেখতে ওর মুখখানা ফুলে উঠল। স্পষ্ট হয়ে উঠল পাঁচটা আঙুলের দাগ।

পুষ্পকে একটু সামলে যখন অপরাধীর খোঁজ পড়ল, তখন শোনা গেল, ও-ঘর থেকে তারস্বরে দিলীপ পড়ছে—'লেট এ বি সি বী এ ট্র্যাঙ্গল।' দুয়ার রুদ্ধ।

ডাক্তারবাবু সেই রুদ্ধ দ্বারের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'ও শুয়োরটাকে আমি আজই তাড়াব বাড়ি থেকে।'

'কার সাধ্যি আমারে তাড়ায়!'—পড়া বন্ধ করে ও-ঘর থেকে চেঁচিয়ে উঠল দিলীপ,—'এ বাড়ি আমার মায়ের। তাড়াতি হলি যেন তাগেই তাড়ায় যারা উড়ে আস্যে জুড়ে বইছে। আমি আইন-কানুন জানি। মায়ের নামে দলিল। এ-বাড়ির মালিক এখন আমি!'

'শুনলে, শুনলে তোমার গুণধরের কথা! দুধ দিয়ে কালসাপ পুষিছো। এখন মানে মানে বিদায় করো। তা না হলি ও গুন্ডেটা কখন যে কারে খুন করে বসবে, কে জানে! মেয়েডারে তো এখনি খুন করিছিল।'—খর কণ্ঠে বললেন ছোটমাসি।

এই আকস্মিক ঘটনার সবচেয়ে বেশি ভয় পেয়েছে রুনুই। ও ভাবছে, হঠাৎ সবার সামনে কী সাহসে এমনি করে পুষ্পকে চড় মারতে পারল দিলীপ? পুষির উপর অবশ্য কালই রাগ হয়েছিল মিথ্যে নালিশ করার জন্যে। আজ আবার পুষি হঠাৎ হাততালি দিয়ে ওঠায় খেপে যাবারই কথা। তা বলে ডাক্তারবাবুর সামনেই? অবশ্য ডাক্তারবাবুই একটা সাংঘাতিক চড় মেরেছেন দিলীপকে। সেই চড়টাই কি ও শোধ দিয়ে গেল পুষির পিঠে?

'তুমি যদ্দিন ওরে না তাড়াচ্ছ, তদ্দিন কারও শান্তি নাই এ-বাড়িতে।' আবার বললেন ছোটমাসি।

'তাড়াও বললেই তো তাড়ানো যায় না সরমা।' কেমন যেন দুর্বল গলায় বললেন ডাক্তারবাবু, 'আইনের কথা তো শুনলে। ছেলে আমার আইন-টাইন শিখে ফেলেছে।'

'তুমি দেখতিছি ভয়েই অস্থির!'

'ভয়ের কথা নয়। কথাটা হচ্ছে অধিকারের। এ-বাড়িতে ওর তো একটা অধিকার আছেই।'

'ও-সব আইন-টাইন আমি বুঝি নে। তুমি ওরে বিদেয় করবা কিনা কও।'

দেখছি একটা ব্যবস্থা-ট্যাবস্থা। ম্যাট্রিকটা পাশ করলেই...'

'ও আর পাশ করিছে। ও একেবারে বয়ে গেছে। দেখলে না তোমার মুখের উপর কী সব কথা বলে গেল। ও কাউরে গেরাজ্যি করে?'

'তবু তো বংশে ছেলে বলতে ওই একটাই। ও যদি তোমার ছেলে হতো সরমা, পারতে এমন কথা বলতে? ছেলেটা গোঁয়ার, ছেলেটা অবাধ্য তা সত্যি, তবু আমি তো ওর বাবা। ওকে মানুষ করতে চেষ্টা করতে হবে না?'—করুণ গলায় বললেন ডাক্তারবাবু।

রুনু যেন নতুন করে চিনছে ডাক্তারবাবুকে। তবে তো দিলীপদা ঠিকই বলেছিল— ডাক্তারবাবু মনে মনে ওকে আজও স্নেহ করেন।

ডাক্তারবাবু যেতে যেতে বললেন, 'রাগ না লক্ষ্মী! পড়ুক, একা-একাই পড়ুক দেখি। কিন্তু তুমি একা একা এ-ঘরে শুতে পারবে তো রুনু? ভয় করবে না তো।'

'না। আমি তো কাল একা-একা শুইছিলাম।'

'বেশ, তাহলে তুমি এ-ঘরেই পড়ো।'

'হ্যাঁ, আমি পড়ব আর ওদেরও পড়াব।'

'ওদের সঙ্গে তোমার আলাপ হয়ে গেছে?'

'হ্যাঁ, আমি তো কাল থেকেই শুরু করেছি।'

'বেশ বেশ।'—ডাক্তারবাবু সস্নেহে হাত রাখলেন রুনুর মাথায়।

ছোটমাসি পুষ্পকে কোলে নিয়ে ভীষণ গম্ভীর মুখে বেরিয়ে গেলেন ওঘর থেকে। ডাক্তারবাবু সেদিকে তাকিয়ে অল্প একটু হাসলেন। হাসলেন যেন দিলীপের ঘরের দিকে তাকিয়েও।

আট

ভোরে ওঠা রুনুর বরাবরের অভ্যাস। ও লক্ষ্য করেছে, ভোরে ওঠেন বড়মাসিও। প্রতিদিন ভোরে তিনি একটি পিতলের কলসী কাঁখে নিয়ে শীতে কাঁপতে কাঁপতে নদীতে যান স্নান করতে।

ভোরে উঠে মধুমতীর তীরে একটু বেড়ানো রুনুর শৈশবের অভ্যাস। বাজুনিয়ায় নদী না থাকলেও ঠাকুরবাড়ি থেকে উত্তর-দক্ষিণে প্রবাহিত একটা খাল ছিল। মাঝে মাঝে সেই খালের পাড়েই বেড়াত সে। গোপালগঞ্জ এসে আবার দেখা হল মধুমতীর সঙ্গে। এ মধুমতী যদিও মরা গাঙ, তবু একদা তো বহতা নদী ছিল। এখন আসল মধুমতী অনেক পশ্চিমে সরে গেছে। তার সঙ্গে এ মধুমতীকে যোগ করতে হয়েছে খাল কেটে।

এ নদীতে ঢেউ নেই, স্রোত নেই, ভাঙ্গান নেই, নেই কুমীর-কামট। এ বড় শান্ত নদী। এর সমস্ত তীরটা ইটের বাঁধাই। মাঝে মাঝে এক-একটা ঘাটলা। ডাক্তারবাবুর বাড়ির সামনে রাস্তাটা সোজা পশ্চিমে গিয়ে মিশেছে একটা ঘাটলায়। সেই ঘাটলাতেই স্নান করতে যান বড় মাসি। সেখান থেকে সোজা দক্ষিণে প্রায় মাইলখানেক বাঁধানো তীর। বেশ চওড়া রাস্তা। শহরের অনেক বৃদ্ধ লাঠিহাতে প্রাতঃভ্রমণ করেন নদীর তীরে। শহরের দক্ষিণ প্রান্তে স্টেশন। স্টেশন পর্যন্ত একটানা রাস্তা বেড়াবার পক্ষে চমৎকার।

সেই ঘটনার পর থেকে রুনু দিলীপের সঙ্গে কথা বলতে তো সাহসই পায় না, ভরসা হয় না বড়মাসির সঙ্গে কথা বলতেও। বস্তুত ডাক্তারবাবু যতক্ষণ বাড়িতে থাকেন। বড়মাসির মুখে একটি কথাও শোনা যায় না। সেদিন সকালের ঘটনায় বড়মাসি যে নীরব ছিলেন তার কারণ ডাক্তারবাবু তখন উপস্থিত।

এক-এক দিন বড়মাসির সঙ্গে চোখে চোখও পড়ে যায় রুনুর। সে চোখে কোনো রাগ বা অভিমান আছে বলে তো মনে হয় না। বরং মনে হয়, একটু স্নেহই যেন প্রচ্ছন্ন রয়েছে সে চোখে।

সেই প্রচ্ছন্ন স্নেহটাই একটা ঘটনায় বড় নিবিড়ভাবে অনুভব করল রুনু। সেই পরমাশ্চর্য অনুভবের স্মৃতি ও কি ভুলতে পারবে এ জীবনে!

সেদিনও এসেছে ভোরে নদীর পাড়ে। রাস্তা তো একই। ওই রাস্তায় আসেন বড়মাসিও। সেদিন আর পথে দেখা যায়নি বড়মাসিকে। ঘাটলায় ও যখন পৌঁছল, তখন দেখে, বড়মাসি গলাজলে দাঁড়িয়ে আর্তনাদ করছেন। তাঁর পিতলের কলসিটা মাঝনদীতে। আরও দুজন বুড়ি আছেন ঘাটলায়। এছাড়া আশপাশে আর কেউ নেই। তখনও তো শহরের ঘুম ভাঙেনি। বুড়ি দুজন পাড়ে উঠে নানা রকম পরামর্শ দিচ্ছেন। ওদিকে কলসি ভেসেই চলেছে আর বাড়িমাসি আর্তনাদ করেই চলেছেন। বোঝা গেল, সাঁতার ওঁরা কেউ জানেন না।

মুহূর্তে গায়ের চাদরটা ঘাটলায় ফেলে রুনু ঝাঁপিয়ে পড়ল জলে কলসি বরাবর দৌড়ে গিয়ে। কয়েক মিনিট সাঁতার দিয়ে পলায়মান কলসিকে পাকড়ে ফেলল রুনু। তারপর সাঁতরে চলে এল বড়মাসির কাছে কলসিসহ।

এতক্ষণে বড়মাসি চিনতে পেরেছেন এই দুঃসাহসি ছেলেটাকে।

'ও মা রুনু! তুই! আমি তো চিনতিই পারি নাই। ভাবলাম, কোন এমন বান্ধব আস্যে হট করে ঝাঁপায়ে পড়ল এই বরফগোলা জলে! কী সব্বনাশ, শীতির ভয়ে এট্টা নৌকোয় মাঝিরিও নড়াতি পারলাম না, আর তুই একফোঁটা বাচ্চা...ওরে আমার সোনা!'

বড়মাসি দুহাতে জড়িয়ে ধরলেন রুনুকে। যেন বুকের উত্তাপ দিয়েই ওর ঠান্ডা শরীরটাকে গরম করে দিতে চাইছেন।

তাড়াতাড়ি পাড়ে উঠে নিজের গামছা দিয়ে ওর সর্বাঙ্গ মুছে দিয়ে বললেন, 'নে, আমার এই শাড়িখানই পর।'

'তারপর আপনি পরবেন কী? ভিজে কাপড়ে আপনার শীত করবে না?'

'আমার শীত-গিষ্মি সয়ে গেছে বাবা। আমি বাড়ি যাইয়ে কাপড় ছাড়বানে।'

'আমিও। আমার শীত করতিছে না।' বীর পুরুষের মতো বলে রুনু।

'আহা, এমন সোনার চাঁদ ছলডারে এট্টু প্রাণ ভরে আদর করতি পারলাম না।' দু'চোখ ছল ছল করে উঠল বড়মাসির—আজম্মে তুই যেন আমার প্যাটে হোস বাবা।'

চোখের জল ফেলতে ফেলতে এক নাগাড়ে অনেক দুঃখের কথা বলে গেলেন মাসিমা। শুনতে শুনতে চোখে জল এসে গেল রুনুরও। 'আজ্জন্মে তুই যেন আমার প্যাটে হোস বাবা'—কথাগুলি যেন একটা প্রিয় কবিতার কলির মতো বারে বারে মনে মনে উচ্চারণ করল সে।

'আপনারে আমার খুব ভালো লাগে মাসিমা। ঠিক আমার মায়ের মতো।' সঙ্কোচে আবেগে এর বেশি আর কিছু ফুটল না তার মুখে।

কিন্তু সেই আশ্চর্য স্নেহ-স্পর্শ কেবল ওই একটি দিনই লাভ করেছে রুনু। তারপর অবশ্য যখনই চোখে চোখ পড়েছে, স্নিগ্ধ হাসিটুকু ঠিকই পেয়েছে, তবে সে স্পর্শ আর পায়নি। একবারও ডাকেননি বড়মাসি ওকে তাঁর ঘরে। রুনুও নিজে যাবার সাহস পায়নি।

নয়

স্কুলে ভরতি হবার পর থেকেই একটা নাম বার বার কানে এসেছে রুনুর। বিশেষ করে খেলাধুলোর কথা উঠলেই অনেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছে, 'হায়, নরেনবাবু স্যার নেই। এবার আমাদের স্কুল টিম নির্ঘাত কুপোকাত।'

এর-ওর কাছে শুনে শুনে নরেনবাবু সম্বন্ধে অনেক কথা জেনে ফেলেছে রুনু। তিনি ছিলেন গেম টিচার। সব ছাত্রকেই খুব ভালোবাসতেন তিনি, আর স্বভাবে ব্যবহারে নাকি একেবারে ছেলেমানুষের মতো। সব সময়ই মুখে হাসি। ছেলেদের সঙ্গে সমানে ফুটবল, হাডুডু, ভলি বল, এমনকী দেড়ে বাঁধা পর্যন্ত খেলতেন। গত বছর পূজার কিছুদিন আগে থেকেই তিনি আর স্কুলে আসছেন না। ডাক্তাররা বলেছেন, তাঁর নাকি যক্ষ্মা হয়েছে।

যক্ষ্মা মানে ক্ষয়রোগ। ওদের স্বাস্থ্য বইতে পড়েছে, রোগটা নাকি ভীষণ মারাত্মক। বাবা বলেন, 'উদরী ভাদরী যক্ষা, এ তিনেতে নাই রক্ষা।' তাই 'যক্ষ্মা' শব্দটা শুনেই রুনুর বুক কেঁপে ওঠে। হায়, তাহলে কি আর রক্ষা নেই নরেনবাবুর।

সবার কাছে শুনে শুনে, যত বারই সেই না-দেখা নরেনবাবুর ছবি এঁকেছে মনে, তত বারই বাজুনিয়া স্কুলের নরেনদার ছবিটা ভেসে উঠেছে রুনুর চোখে। তিনিও তো ছিলেন সবসময় হাসি-খুশি, তিনিও তো ভালোবাসতেন সবাইকে। নরেনবাবু নামটাই যেন একটা মিষ্টি স্বভাবের নাম, একটা ভালোবাসার নাম। হায়, সে নরেনদা যেমন ইংরাজের জেলখানায় পচছে, এ নরেনদাও তেমনি অসুখে পচছে! সেই নরেনদার সঙ্গে একাত্ম করে এই না-দেখা নরেনদাকেও ভালোবেসে ফেলল রুনু।

নতুন স্কুলে নতুন নতুন সহপাঠীদের চিনতে চিনতে দিনগুলি যে কীভাবে কেটে গেল! ওদের ক্লাসে রুনু এখন একটা প্রিয় নাম, পরিচিত নাম। প্রথম বেঞ্চের হারান, হরেকেষ্ট, সুবিমল তো ওর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। এছাড়া অনেকের সঙ্গেই ভাব হয়ে গেছে ওর।

ওদের ক্লাসের পাঁচজন শিক্ষকই হারান এবং রুনুর মধ্যে প্রতিদ্বন্দিতাটা উপভোগ করেন। পরীক্ষায় কে যে কাকে পেছনে ফেলবে বোঝা যাচ্ছে না। দুজনেই ভালো ছাত্র। আজ এ পিরিয়ডে রুনু বাহবা পেল তো পরের পিরিয়ডে বাহবা পায় হারান। কাল এ পিরিয়ডে হারান এক ধমক খেল তো পরের পিরিয়ডে রুনু। এমনি চলছে ওদের পাল্লা।

দেখতে-দেখতে এসে গেল প্রথম টার্মিনাল পরীক্ষা। গ্রীষ্মের ছুটির আগের পরীক্ষা। পরীক্ষা দিল রুনু ওর প্রতিজ্ঞাটা স্মরণ রেখেই। কিন্তু ফল যে কী হবে শেষ পর্যন্ত কে জানে। হারানকে জিজ্ঞাসা করলে বলে, তেমন ভালো হয়নি, রুনুও বলে তা-ই; কিন্তু আসল কথা বোধহয় ওরা কেউই বলে না পরস্পরকে। বন্ধু হলেও পরীক্ষার ব্যাপারে কেউ যে কারও জন্যে এক নম্বরও ছেড়ে দেবে না, সেটা তো জানা কথা।

'সামনের ছুটিতে বাড়ি যাবা না?' পরীক্ষার শেষ দিন জিজ্ঞাসা করল হরেকেষ্ট।

'ছুটির আগে কি পরীক্ষার ফল জানা যাবে?' পাল্টা প্রশ্ন করে রুনু।

'দূর, তা-ই যায় নাকি!' হেসে বলে হরেকেষ্ট, 'এই ছুটির মধ্যিই তো পরীক্ষার খাতা দেখবেন স্যাররা। ফল জানা যাবে স্কুল খুললি।'

'তাহলি এ ছুটিতি বাড়ি যাব না।'—এক কথায় জবাব সারে রুনু।

'কেন?'

'পরীক্ষার ফল না জানা পর্যন্ত...'

'তোমার ভয় কী? তুমি তো ফার্স্ট হবাই।'

হরেকেষ্ট অভয় দিলেও রুনুর ভয় কাটে না। বাবা বলেছেন, ইংরেজিতে প্রথম না হতে পারলে ও যেন বাড়ি যাবার নামও না করে। ইংরেজি পরীক্ষাটা যদিও ভালোই দিয়েছে, কিন্তু বানানে কোথায় কী কেলেঙ্কারি করেছে, কে জানে! ইংরেজির বানান-ভীতি ওর কিছুতেই কাটছে না, অথচ কঠিন শব্দগুলিকে যে ও কত বার লিখে লিখে মুখস্থ করেছে!

পরীক্ষা শেষ হতেই কিন্তু বাড়ির জন্যে, বিশেষ করে মায়ের জন্যে, ওর প্রাণ পুড়তে শুরু করেছে। মনে পড়তে শুরু করেছে মধুমতীকে, ছোট গাঙকে, ওদের সমস্ত গ্রামটাকে। পুরো এক মাস ছুটি, এর মধ্যে একটা দিনের জন্যেও বাড়ি যাবে না? দাদাও কি একবার আসবে না ওকে নিয়ে যেতে? দাদাকে মনে পড়তেই ওর প্রতিজ্ঞার জোরটা ক্রমেই দুর্বল হয়ে আসছে। একে একে মনে পড়ছে গোবরার কত ছবি, কত ঘটনা। গোবরা এত কাছে, অথচ কত দূরে!

অনমনস্কভাবে চলতে চলতে ডাক্তারবাবুর বাড়ির দরজার কাছে আসতেই বাবার গলা পেয়ে চমকে উঠল রুনু। দেখা গেল, বৈঠকখানা ঘরে পিতৃদেব বেশ জমাট গল্পের আসর বসিয়েছেন। বক্তা তিনিই, শ্রোতা ডাক্তারবাবু, ছোট মাসি এবং বাচ্চারা। পুষ্প অবশ্য গল্প শুনছে না, পণ্ডিতমশাইয়ের কোলে বসে তাঁর তুষার-শুভ্র দাড়ি নিয়ে গভীর গবেষণায় রত সে।

রুনু ঘরে ঢুকে প্রণাম করল বাবাকে।

'তোগে তো আজই পরীক্ষা শেষ হয়ে গেল, তাই না?'

'হ্যাঁ।'

'কেমন দিলি পরীক্ষা?'

'ও তো ভালো পরীক্ষা দেবেই। খুব পড়েছে।' উত্তরটা দিলেন ডাক্তারবাবু।

'শোন, হরেকেষ্টর কাছে খবর শুনে আজই চলে আলাম।'

'কেন?' প্রশ্ন করে উৎসাহভরে। ওর ধারণা, বাবা ওকে নিতে এসেছেন।

'বলতি আলাম, এ ছুটিতি তুই বরং বাড়ি না গেলি।'

আশার বাতিটা যেন এক ফুঁয়ে নিবিয়ে দিলেন পণ্ডিতমশাই। মুখখানা ম্লান হয়ে গেল রুনুর।

কারণটাও ব্যাখ্যা করলেন পণ্ডিতমশাই। মধুমতীর ভাব-সাব নাকি ভাল নয়। আসছে বর্ষায় হয়তো ওদের বাড়িঘর বাগান-টাগান সব ভেঙে যাবে। তাই খানিক পুবে সরে ডিস্ট্রিক বোর্ড রাস্তার পুবদিকে একটু জমি কেনা হয়েছে। এই ছুটির মধ্যেই নাকি বাড়ি ঘর ভেঙে নিয়ে সেখানে নতুন করে ঘর তুলতে হবে। সে অনেক ঝামেলা। তার মধ্যে রুনুর পড়াশুনোর খুব ক্ষতি হবে।

ব্যাখ্যা শুনেও খুশি হতে পারে না রুনু। ওর বিমর্ষ মুখ দেখে ছোট মাসি বললেন, 'তোমার কি খুব মন খারাপ হয়ে গেল রুনু?'

ও পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। মুখে কথা নেই।

'আমাগে সঙ্গে থাকতি কি তোমার কষ্ট হচ্ছে?'

'না।' এবার স্পষ্ট উত্তর দেয় ও, 'আমার এখানেই ভালো লাগে, বাড়ি একটুও ভালো লাগে না। আমি যাব না বাড়ি।'

রাগ, না অভিমান, বোঝা মুশকিল।

ডাক্তারবাবু হেসে বললেন, 'ছেলে আপনার বলে কী।'

'ও মিথ্যে বলেনি যোগেন। বাড়িতে ও বড় নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে। এখানে তোমাদের ছেলেমেয়েদের নিয়ে ও বেশ আছে।' বলেন পণ্ডিতমশাই।

'আমার মেয়েরা তো ওর দারুণ ভক্ত।' বলেন মাসিমা, 'ও চলে গেলি তো পুষিটা কান্দে ভাসাবে।'

দাড়ি গবেষণা ফেলে পুষি বলে, 'তাই বলে আমি অত কাঁদি নে। মেজদিই বেশি কাঁদে।'

প্রমীলা নামক মেজদির জবাবও প্রস্তুত ছিল। সে বলে, 'কে বেশি কাঁদে তা বুঝি রুনুদা জানে না? তবে ও চলে গেলি আমি কিন্তু একটুও পড়ব না বলে দিচ্ছি।'

হাসলেন এবার সকলেই।

'আমিও না।' কোণ থেকে বলল পুষি।

'ইশ! তুই কত পড়িস! তুই তো পড়তি বসিস পুতুল নিয়ে।' বলে প্রমীলা।

'আর তুই যে পড়তি বসে ঘুমোস?' চোখ পাকিয়ে বলে পুষি।

'মিথ্যুক, অসভ্য, নালশে বুড়ি!' খেপে যায় প্রমীলা ওর গোপন কথা দাদুর সামনে প্রকাশ হয়ে যাওয়ায়।

পুষি আক্রমণাত্মক ভঙ্গি নিয়ে নেমে পড়ে দাদুর কোল থেকে। ছুটে গেল প্রমীলার দিকে কিল উদ্যত করে। 'নালশে বুড়ি' বললেই ও অমনি খেপে যায় বরাবর। মাঝপথে ওকে ছোঁ মেরে কোলে তুলে নিল রুনু। তারপর ওকে কোলে নিয়েই চলে গেল ওর পড়ার ঘরে।

রুনু চলে যেতে পণ্ডিতমশাই হেসে বললেন, 'ও তো এখেনে স্বর্গসুখে আছে সরমা। তোমার এই মিষ্টি মেয়েটিই ওরে টান্যে রাখবে। দেখিছি, ছোট বাচ্চাদের ও বড় ভালোবাসে। আমাগে বাড়ির ছাগল-কুকুরের বাচ্চারাও ওর বড় ভক্ত।'

ওখানে বৈকালিক জলযোগ সেরে চলে গেলেন পণ্ডিতমশাই। যাবার সময় বললেন, 'বাড়ির আম কাঁঠাল লিবু টিচু কিছু পাঠায়া দেবানে যোগেন। ছেলেও খাবে, তোমরাও খাবা। এই বোধ হয় শেষ খাওয়া। মা মধুবতীর এবার আর মায়া-দয়া হবে না বোধ হয়। স-অ-ব যাবে।'

'নদীর মতি-গতির কথা কিছু বলা যায় না পণ্ডিতমশাই। আগে থেকে অত কু ভাবছেন কেন?' ভরসা দিলেন ডাক্তারবাবু।

দশ

সেই প্রথম দিনের ঝগড়ার পর দিলীপ একমাত্র ওর মা ছাড়া এ-বাড়ির আর কারও সঙ্গেই কথা বলে না। ফলে বাড়িটা বেশ শান্ত হয়ে গেছে। সকলের সঙ্গে অবশ্য দিলীপ ছাড়া, কথা বলে একমাত্র রুনু।

সেই কলসি উদ্ধারের পর থেকে বড় মাসির সঙ্গে কিছুদিন চোখে চোখে ভাব বিনিময় হতো রুনুর। চোখে চোখ পড়লেই উনি মিষ্টি করে একটু হাসতেন। হাসত রুনুও। তারপর কোন শুভক্ষণে কে প্রথম কথা বলতে শুরু করেছিল মনে নেই, কিন্তু এক সময় দেখা গেল, দিলীপের অনুপস্থিতি কালে মাঝে মাঝে রুনু যাচ্ছে বড় মাসির ঘরে। ধীরে ধীরে একটা মধুর সম্পর্ক গড়ে উঠছে ওদের মধ্যে সবার চোখের আড়ালে। দিলীপ আর কতক্ষণই বা ঘরে থাকে? ওর বন্ধুর সংখ্যা অসংখ্যা। কেবল পাবলিক স্কুলের নয়, মিশন স্কুলেরও অনেক ছেলে ওর বন্ধু। সে সবই অবশ্য খেলার মাঠের বন্ধু।

গ্রীষ্মের ছুটির দিনগুলিতে দিলীপ খাওয়া এবং ঘুমোনোর সময় ছাড়া বাড়ি প্রায় থাকেই না। আর রুনু প্রায় সব সময় বাড়ি থাকে। এই ছুটির মধ্যেই বড় মাসির সঙ্গে ওর বন্ধুত্বটা পাকা হয়ে গেল। ব্যাপারটা ছোট মাসির, ডাক্তারবাবুর, এমনকী ছোটদেরও চোখে পড়ল। কিন্তু রুনুর স্বভাবের মধ্যে এমন একটা নম্র বিনয় এবং গুরুজনের প্রতি সহজাত শ্রদ্ধার ভাব আছে যে, এ নিয়ে ওকে কেউ কোনো প্রশ্ন করেনি।

কমলা, প্রমীলা আর পুষির সঙ্গে খেলাধুলো আর গল্প করে, মাঝে মাঝে কোলের বাচ্চা টুলুকে আদর করে কোথা দিয়ে কীভাবে যে ছুটিটা কেটে গেল, টেরই পেল না রুনু।

এই ছুটিতে সুবিমল গেছিল ওর মামাবাড়ি—খুলনা জেলার নন্দনপুর গ্রামে। ওর মামাবাড়িতে নাকি প্রচুর আম কাঁঠাল। রুনুকেও ক'দিনের জন্যে ওর মামাবাড়িতে নিয়ে যাবার জন্যে কেবল সুবিমলই নয়, তার বাবা মিহিরবাবুও অনুরোধ করেছিলেন ডাক্তারবাবুকে। ওদের বাড়ির সকলেই দারুণ ভালোবাসে রুনুকে। প্রায়ই ওদের বাড়ি যায় রুনু। কিন্তু শ্রীনাথ পণ্ডিতের সম্মতি ছাড়া রুনুর যে এখান থেকে একপাশ বাড়াবার উপায় নেই, তা বুঝতে পেরেছিলেন ডাক্তারবাবু। স্টিমারে চড়ে খুলনা যাবার জন্যে কী লোভ যে হয়েছিল রুনুর। অনেক গোপন অশ্রুপাত করে সে লোভ ও দমন করেছিল।

বাজুনিয়ার কাকিমাও ওকে একবার আশা দিয়েছিলেন, তাঁর বাপের বাড়ির নারকেল-সুপারির বাগান দেখাতে ওকে নিয়ে যাবেন সেই বরিশাল জেলার কোন এক গ্রামে। হায়, সে আশাও পূর্ণ হল না! এমনি কত আশা, কত আনন্দময় প্রত্যাশা ওর অপূর্ণ রয়ে গেল কেবল ভালো ছেলে হবার জন্যে। ওকে শুধু ক্লাসে ফার্স্ট হতে হবে। তাহলেই শ্রীনাথ পণ্ডিত খুশি। ওর আর কোনো সাধ-আহ্লাদ থাকতে নেই!

স্কুল খোলার তিন দিন আগে ফিরে এল সুবিমল। মামার বাড়ি অনেক রকম ফলমূল, আচার, কাসুন্দি ইত্যাদি নিয়ে এসেছে ওরা। রুনুকে ডেকে নিয়ে ওকে প্রাণভরে সব কিছু খাওয়ালেন সুবিমলের মা। তাঁকে রুনু ডাকে মাসিমা বলে আর ওর বাবা মিহিরবাবুকে বলে মেসোমশাই।

'মামাবাড়ি যাইয়ে তোমার কথা আমার খুব মনে পড়ত।' বলল সুবিমল, 'তোমার মনে পড়তো না আমার কথা?'

রুনু স্মরণ করতে পারে না এই ছুটির মধ্যে কবার ওর সুবিমলকে মনে পড়েছে।

স্কুল খোলার পর প্রথম দেখা হতে হরেকেষ্টরও সেই একই কথা।

'এই ছুটির মধ্যি আমি প্রতিদিন পথের দিক চাইয়ে থাকতাম। ভাবতাম, তুমি একদিন ঠিকই বাড়ি আসবা। তোমার কথা আমার সব দিন মনে পড়িছে। তোমার মনে পড়ত না আমার কথা?'

কী বলবে রুনু? মনের মধ্যে হাতড়ে দেখে যদি সত্যি কথাটা বলতে হয়, তবে হরেকেষ্ট দুঃখ পাবে। ও কি সত্যিই অকৃতজ্ঞ? নতুন সঙ্গীদের পেয়ে ও কি ওর পুরোনো বন্ধুদের ভুলে যাচ্ছে?

'কী ভাবতিছ? আমার কথার জবাব দিলে না না তো?'

'ভাবতিছি, তুমি কত ভালো হরেকেষ্ট,' ভারী গলায় বলে রুনু, 'আমি না খুব খারাপ ছেলে।'

'ও কথা বলতিছ ক্যান?'

'দ্যাখো না, সারা ছুটির মধ্যি একবার আমার মারেও দেখতি গেলাম না।'

'খুব পড়িছ বুঝি?'

'ছাই পড়িছি। জানো, আমার না, বাবার উপর খুব রাগ হইছিল, তাই বাড়ি গেলাম না।'

'কেন?'

'বাবা যে ছুটির আগেই একদিন আস্যে আমারে বাড়ি যাতি বারণ করে গেল। আমাগে বাড়ি নাকি ভাঙে-চুরে আর এক জায়গায় তুলতি হবে। সত্যি নাকি?'

হরেকেষ্টর কাছেই খবর পাওয়া গেল, হাউজের দক্ষিণে একটা খোলামাঠের মধ্যে বড় ঘরটা ইতিমধ্যে উঠে গেছে। রান্নাঘর, গোয়ালঘর, দাদার দোকানঘর—একে একে ভাঙা হচ্ছে। আরও জানা গেল, সেজদির বর নাকি এই বাড়ি ভাঙা আর তোলার ব্যাপারে দারুণ খাটছে। লোকটা বুড়ো বটে, কিন্তু খুব খাটিয়ে লোক। এখন তো ইন্দ্রর সঙ্গে তার খুব ভানবে। কবে যে বিয়ে হল, সেটা অবশ্য হরেকেষ্টও জানে না, তবে সেজদি এখন কপালে সিঁদুর পরে এবং বরকে দেখলে ঘোমটা দেয়। সেজদিও নাকি খুব খাটছে। আর ইন্দ্রকে তো খাটতে হবেই।

এত কাজের মধ্যেও কিন্তু দাদা তার দোকান ছাড়েনি। প্রত্যেক সোমবারে নাকি গোপালগঞ্জ আসে দোকানের মালপত্র কিনতে। রুনু বিস্মিত হয়ে ভাবে, এই ক'মাসে কত সোমবার এল গেল, একটা দিনও দাদা ওর সঙ্গে দেখা করল না। দাদা বলেছিল, ও গোপালগঞ্জ আসবে এমন সময় যখন রুনু স্কুলে থাকে। কিন্তু এই ছুটির মধ্যেও তো কয়েকটা সোমবার পড়ল, কই, কোথাও তো দাদাকে দেখা গেল না কোনো সোমবার। দাদা ঠিক তার কথা রেখে যাচ্ছে। রুনুকে সে এখানে দেখা দেবে না। তবু কেন যেন হরেকেষ্টর কাছে দাদার কথা শুনে একটা ব্যথাভরা অভিমানে ওর বুকে ভরে যায়।

স্কুল খুলতেই ফুটবল টিম গঠন করার ব্যাপার নিয়ে আবার নরেনবাবুর কথা মুখে মুখে। ওদের ক্লাসের সেরা খেলোয়াড় দবিরউদ্দিন। নরেনদার দারুণ ভক্ত। নরেনদার কথা উঠতেই দবিরের চোখ ছল ছল করে ওঠে। তার কাছেই নরেনবাবুর অনেক খবর পেল ও। ওঁর চিকিংসার খরচ নাকি সাঙ্ঘাতিক। মাসদুই-এর মধ্যে নরেনবাবুর স্ত্রীর গয়না-গাঁটি যা ছিল সব গেছে। তারপর স্যাররা চাঁদা করে কিছুদিন চালিয়েছেন। এখন যেটুকু চিকিৎসা হচ্ছে সে কেবল হেড স্যারের দয়ায়। ওঁর এক আত্মীয় ডাক্তার বিনা পয়সায় দেখেন। কেবল ওষুধটা কিনতে হয়। সে টাকাও প্রায় হেড স্যারই দেন। হেড স্যার এখনও দেখতে যান মাঝে মাঝে। ওঁর দয়াতেই এখনও স্কুলের খাতায় নরেনবাবুর নামটা কাটা যায়নি।

সুবিমলের কাছে শুনেছে, নরেনবাবুর বাড়িতে এক সময় স্কুলের সব ছাত্রই ভিড় জমাত। সকলকেই দারুণ ভালোবাসতেন উনি। বউদিও (ওরা নরেনবাবুর স্ত্রীকে বউদি বলে) যে-কোনো ছাত্র বাড়ি গেলেই কিছু না কিছু খাওয়াতেন। এখন আর কেউ যায় না ও-বাড়ি। গেলেও কাউকে ভিতরে যেতে দেন না বউদি। কেউ চাইলেও একগ্লাস জল পর্যন্ত দেন না সংক্রমণের ভয়ে। এখন আর নরেনবাবু নাকি কথা বলেন না কারও সঙ্গে।

রুনু মনে মনে ঠিক করল, একবার ও নরেনবাবুকে দেখবেই। মিলিয়ে দেখবে এ নরেনদা আর বাজুনিয়ার সেই নরেনদাকে। কথা বলবেন না? নাই বা বললেন। রুনুকে তো তিনি চিনবেনই না। চিনবেন না বউদিও। যে ঘরে তিনি সবসময় শুয়ে থাকেন, সে ঘরটা তো সুবিমল ওকে একদিন চিনিয়ে দিয়েছে। ও-বাড়িতে ওরা দুজন ছাড়া আর কেউ থাকে না। ওদের একটা ছোট ছেলে ছিল, তাকে নাকি কোন আত্মীয়র বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে, রুনু ঠিক করল একদিন হঠাৎ গিয়ে ঢুকে পড়বে। ওকে দেখে তারা নিশ্চয়ই আশ্চর্য হবেন, নানা প্রশ্ন করবেন। সেই পরিচয় নেবার ফাঁকেই তো ও দেখতে পারে নরেনবাবুকে, দেখবে ওর কল্পনার মূর্তিটার সঙ্গে মেলে কিনা। তারপর একটা প্রণাম করতে পারবে না টুক করে? একটামাত্র প্রণাম!

আজ-কাল যাব-যাব করে অনেকগুলি দিন পার হয়ে গেল। এসে পড়ল সেকেন্ড টার্মিনাল পরীক্ষা।

প্রথম টার্মিনালে রুনু প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতে পারেনি। টোটালে যদিও প্রথম হয়েছে, কিন্তু ইংরেজিতে হারানই ফার্স্ট হয়েছে। এবার ওর ইংরেজিতে প্রথম হতেই হবে।

পড়ার চাপে ভুলে গেল নরেনবাবু কথা। ভুলে গেছে বোধ হয় সারা স্কুলটাই তাঁকে। ভুলিয়ে দিয়েছেন নতুন স্যার এসে।

স্কুল কমিটির চাপে পড়ে শেষ পর্যন্ত নতুন একজন গেম টিচার নিতেই হল। নরেনবাবু যে আর কোনো দিন সুস্থ হবেন, এ ভরসা হয় না কারও। পূজার ছুটির মাসখানেক আগে এলেন নতুন গেম টিচার। একেবারে অল্প বয়স। ক্লাস টেনের কেউ কেউ তো ওঁর সমবয়সি। তারা ওকে ডাকতে শুরু করল নতুনদা বলে। তাই দেখে নীচু ক্লাসের ছেলেরা বলত নতুন স্যার।

একমাসের মধ্যেই তিনি একেবারে ভোজবাজি দেখিয়ে দিলেন। ছুটির আগে যেখানে যে-কোনো খেলায়—ফুটবল, হাডুডু, ভলি, ব্যাটমিন্টনে—অংশ গ্রহণ করেছে পাবলিক স্কুল, সেখানেই জয়! জয়ের পর জয়। দেখতে দেখতে বিখ্যাত হয়ে পড়লেন নতুন স্যার। এমন তুখোড় প্লেয়ার নাকি ইতিপূর্বে কেউ দেখেনি গোপালগঞ্জে।

নতুন স্যারের খাতির আড়ালে ধীরে ধীরে হারিয়ে গেলেন নরেনবাবু। একদিন স্কুলের খাতা থেকে তাঁর নামও কাটা গেল।

এগারো

শেষ হয়ে গেল সেকেন্ড টার্মিনাল পরীক্ষা। এবার হবে পূজার ছুটি।

যেদিন স্কুল ছুটি হবে, ঠিক তার আগের দিন স্কুলে একটা খবর পৌঁছল বেলা প্রায় বারোটার সময়। খুশি-খুশি ছুটির মেজাজটা মুহূর্তে চিড় পেয়ে গেল। সকলে ছুটতে শুরু করল নরেনবাবুর বাড়ির দিকে।

দলে ভিড়ে গিয়ে ছুটতে পারছে না কেবল রুনু। একটা অসহ্য আত্মাধিক্কারে ওর বুকটা ফেটে যাচ্ছে। সংবাদটা পেয়ে মনে হচ্ছে, সেই বাজুনিয়ার নরেনদাই মরে গেছেন। হায়, কত আশা করেছিল রুনু, একটিবার তাঁকে দেখবে, সে দেখা আর হল না। হল না ওরই দোষে। নিজেকে বড় অপরাধী মনে হচ্ছে ওর। জীবনে এই প্রথম একটি প্রিয়জনের মৃত্যুশোক উপলব্ধি করল ও। যে প্রিয়জনকে ও কোনো দিন চোখেও দেখেনি, তাঁরই শোকে ও কেঁদে কেঁদে সারা হয়ে যাচ্ছে।

দলছাড়া হয়ে একাকী চলে এল ও নদীর পাড়ে। কতক্ষণ যে ছন্নছাড়ার মতো এদিক-ওদিক হেঁটে বেড়িয়েছে আর মাঝে মাঝে চোখ মুছেছে, সে খেয়াল নেই। একসময় চমকে উঠল পেছন থেকে সম্মিলিত হরিধ্বনি শুনে। ফিরে দেখল, দীর্ঘ প্রসেশান আসছে নদীতীরে দিয়ে। কাছে আসতেই বুঝল, নরেনবাবুর শবযাত্রা। সবই যে ওদের স্কুলের ছাত্র শিক্ষক। তাছাড়া মিশন স্কুলের ছেলেরাও আছে, আছে গোপালগঞ্জের আরও অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি।

যে মানুষটিকে এত দিন সবাই ভুলে ছিল, মৃত্যুর মাধ্যমে তিনি কি আবার সকলের মনে স্থান পেলেন? একটু আড়ালে সরে দাঁড়াল ও। 'জীবনে যারে তুমি দাওনি মালা, মরণে তারে তুমি দিতে এলে ফুল!' গ্রামোফোন রেকর্ডে শোনা সেই বিখ্যাত গানের প্রথম কলি মনে পড়ল রুনুর, আবার চোখ ফেটে জল এল তার।

দলের মধ্যে দেখা গেল, দিলীপদা একেবারে গলা ফাটিয়ে কাঁদছে। মাঝে মাঝে হরিধ্বনিতেও গলা মেলাচ্ছে। কাঁদছে আরও অনেক ছাত্র। রুনুর কেন যেন মনে হল, এ কান্নার হৃদয় নেই। একবারও তো নরেনবাবুর কথা শোনেনি দিলীপদার মুখে আগে। অবশ্য কদিনই বা কথা বলেছে ওরা!

শববাহী দলটা ঠিক ওর সামনে দিয়ে যাবার সময় ও প্রাণপণে গলা বাড়িয়ে দেখতে চেয়েছিল মানুষটাকে। না, দেখা গেল না। সাদা চাদরের উপর প্রচুর ফুল আর ফুলের মালাই শুধু ওর চোখে পড়ল।

ওরা এগিয়ে যাচ্ছে স্টেশনের দিকে। স্টেশন ছাড়িয়ে আরও প্রায় একমাইল দূরের শ্মশানটা রুনু দেখেছে ওদের বাড়ি যাতায়াতের পথে। এক-আধবার চোখে পড়েছে শবদাহ করার দৃশ্য। রুনু একপলকও তাকিয়ে থাকতে পারেনি। সেইখানেই তো আজ পুড়ে ছাই হয়ে যাবেন সকলের প্রিয় নরেনদা। আর কোনো দিন কেউ তাঁকে দেখতে যাবে না; দেখতে পাবে না! মৃত্যু যে এমন করে এক-একটা মানুষকে চিরকালের মতো নিশ্চিহ্ন করে দেয় পৃথিবী থেকে, এ ধারণাই ছিল না ওর। এ এক নতুন অনুভূতি।

জলভরা চোখে ও তাকিয়ে রইল মধুমতীর ওপারে অস্তগামী সূর্যের দিকে। আজকের আকাশে নেই একটুও রঙের খেলা। একটা করুণ ছাই-রঙ মেঘে ছেয়ে আছে পশ্চিম আকাশটা। মধুমতীর বুকে নেমে এসেছে একটা বিষণ্ণ ছায়া। যেন মধুমতীও কাঁদছে।

আজ নাম ডেকেই ছুটি হয়ে যাবার কথা। অনেক ছাত্রই আজ আসেনি ক্লাসে। আসেননি কয়েকজন শিক্ষকও।

নরেনবাবুর মৃত্যুতে স্কুলে শোকসভার অনুষ্ঠান হল সেই দিনই। হেডমাস্টার মশাই প্রত্যেক ক্লাসে গিয়ে সবাইকে হলঘরে শোকসভায় উপস্থিত হতে বললেন।

সভা শুরু হল নাম ডাকার প্রায় আধঘণ্টা পরে। দেখা গেল, প্রায় চারশো ছাত্রের মধ্যে উপস্থিত আছে মাত্র পঞ্চাশ-ষাট জন। শিক্ষকদেরও প্রায় অর্ধেক নেই। সভায় কয়েকজন শিক্ষক অনেক বড় বড় কথা বললেন, নরেনবাবুর অনেক গুণ বর্ণনা করলেন। কেউ কেউ কথা বলতে বলতে চোখের জলও মুছলেনঃ

সবশেষে হেডস্যার উঠে গম্ভীরভাবে মাত্র কয়েকটি কথা বললেন।

'তিনি এখন সমস্ত নিন্দা-প্রশংসার ঊর্ধ্বে। তাঁকে আমরা আর পাব না, কিন্তু তিনি যাদের অসহায় করে করে রেখে গেলেন, তাদের সম্বন্ধে আমাদের কিছু কর্তব্য আছে। আসুন, আমরা সকলে মিলে কিছু চাঁদা তুলে সাধ্যমতো তাদের সাহায্য করি।'

ছাত্রদের বললেন, 'তোমরা যারা আজ কিছু দিতে পারো, আমার ঘরে গিয়ে দিয়ে যেও এখুনি। যারা আজ পারছ না এবং যারা আজ অনুপস্থিত রয়েছ, তারা দিও ছুটির পরে। সকলকেই কিন্তু কিছু কিছু দিতে হবে।'

সভাকক্ষে একটা গুঞ্জন শুরু হল। শিক্ষকদের মধ্যে কেউ কেউ বললেন, 'এই পূজার মাসে স্যার...কেউ বললেন, 'মাইনে যা পেয়েছিলাম তা তো ইতিপূর্বেই শেষ।'

শেষ পর্যন্ত হেডস্যারের কাছে সেদিন কত চাঁদা জমা হয়েছিল, রুনু জানে না। তবে সভা শেষ হতেই ও ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটল বাসার দিকে। ওর টিনের সুটকেস খুলে খুঁজে বের করেছিল সুশীলাদির দেওয়া সেই আস্ত একটা রুপোর টাকা যে টাকার উপর মহারানি ভিক্টোরিয়ার মুখখানা প্রায় সুশীলাদির মুখের মতোই। রুনুর জীবনের মহার্ঘতম সঞ্চয়। টাকাটা হাতে নিয়েই আবার দৌড়। সারা পথ একটানা ছুটে এসে ও যখন হেডস্যারের টেবিলে টাকাটা রাখল, তখন ও দারুণ হাঁপাচ্ছে। ঘেমে-নেয়ে একাকার।

'কী হল, এত হাঁপিয়ে গেছ যে?' প্রশ্ন করলেন হেডস্যার।

'আমার কাছে কিছু ছিল না তো, তাই বাসায় গিছিলাম।'

'তারপর বুঝি দৌড়েছ সারা পথ?'

মাথা নাড়ল রুনু। হেডস্যার স্নিগ্ধ হেসে বললেন, 'কত রাখব?'

প্রশ্নটা বুঝতে পারে না রুনু। বোকার মতো তাকিয়ে থাকে।

'চার আনা রাখব? তোমাদের ক্লাসের কেউ কেউ চার আনাও দিয়েছে।'

'না স্যার, ওই টাকাটাই রাখেন।'

'এক টাকা রাখব?' হেড স্যার যেন বিশ্বাস করতে পারছেন না। শ্রীনাথ পণ্ডিতের অবস্থা তাঁর অজানা নয়। তাঁর ছেলের কাছ থেকে এক টাকা চাঁদা নেওয়াটা অন্যায় হবে। ও না হয় ছেলেমানুষ, একটা টাকার মূল্য বোঝে না, জানে না, এক টাকায় এক জোড়া ধুতি কেনা যায়, কেনা যায় আধমণ চাল।

'হ্যাঁ স্যার।' হাঁপাতে হাঁপাতে বলে রুনু।

'এ টাকা তুমি কোথায় পেলে?'

'আমার এক দিদি দিচ্ছিল মিষ্টি খাতি। অনেক দিন আগে। কেউ জানে না। বাবাও না। আমি খরচ করিনি অ্যাদ্দিন। আজ আনে দেলাম।'

হেড স্যার প্রশংসাভরা চোখে ওর দিকে তাকিয়ে বললেন, 'আচ্ছা আট আনাই রাখছি। এর চেয়ে বেশি কেউ দেয়নি। বাকিটা তুমি নিয়ে যাও। মিষ্টি কিনে খেও।'

'না স্যার, ও টাকা দিয়ে আমি কোনো দিনও মিষ্টি খাতাম না। চিরকাল পড়ে থাকত। তার চে এই ভালো। টাকাটা একটা ভালো কাজে...'

বেশি কথা গুছিয়ে বলতে পারে না রুনু। হেড স্যার উজ্জ্বল চোখে ওর মাথায় হাত রেখে বললেন, 'থ্যাঙ্ক ইউ!'

হেড স্যারকে এই প্রথম হাসতে দেখল রুনু। আনন্দে আবেগে ওর চোখে জল এসে গেল। ঢিপ করে একটা প্রণাম করেই ছুটে পালাল।

বারো

এবারেও ছুটির আগে পরীক্ষার ফল জানা গেল না। জানা গেল না ইংরাজিতে রুনু প্রথম হল কিনা। তবে? বাড়ি যাবে কী করে ও? অথচ হরেকেষ্টর কাছে মা বিশেষ করে বলে দিয়েছেন এবার পূজার ছুটিতে রুনু যেন অবশ্য বাড়ি যায়। এবার অবশ্য ছুটির আগের দিনই বাবা আসেননি ওর বাড়ি যাওয়া বন্ধ করতে। কিন্তু বাবা তো বলেননি বাড়ি যেতে। বাবা যদি হরেকেষ্টকে বলতেন সে কথা, তবে আর কোনো ভয় ছিল না।

একটা দ্বিধাগ্রস্ত মন নিয়েই বাড়ি যাবার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছে রুনু। ওর বাড়ি যাবার আসল কারণ দাদার নতুন দোকানঘরটা দেখা। দাদা নাকি নতুন বাড়িতে একেবারে রাস্তার উপরেই খুব সুন্দর করে দোকানঘর তুলেছে। এখন দোকানে অনেক মালপত্র। খুব নাকি বিক্রি-বাটা হচ্ছে।

রুনুর প্রস্তুতি দেখে ছোট মাসি বললেন, 'সার ছুটিডা কিন্তু বাড়িতি কাটায়ে না রুনু। তাছাড়া তোমাগে গেরামে তো পুজোয় তেমন আমোদ-টামোদ নাই। এখেনে থাকলি দেখতে কত্ত আমোদ। তুমি না থাকলি পমি-কুমিগেও মন খারাপ হয়ে যাবে।'

রুনু তখনও মনস্থির করতে পারেনি ক'দিন বাড়িতে থাকবে। বলল, 'দেখি কী করি।'

সেদিন ও রওনা হল না। স্কুল থেকে ফিরে আসতে বিকেল হয়ে গেছে। এখন কিছু খেয়ে-টেয়ে রওনা হলে বাড়ি পৌঁছতে রাত হয়ে যাবে। ঠিক করল, কাল দুপুরে খেয়েদেয়ে, একটু বিশ্রাম করে রওনা হবে।

তখন ঠিক দুপুর। ছোট মাসির ঘরে সবাই ঘুমোচ্ছে। ডাক্তারবাবু তখনও ফেরেননি, দিলীপদা বাড়িতে নেই। এমন সময় চুপিচুপি বড় মাসি এলেন রুনুর পড়ার ঘরে। দরজাটা ভেজানো ছিল। উনি ঢুকবার সময় সামান্য একটু শব্দ হতেই রুনু পেছন ফিরে বড় মাসিকে দেখে একেবারে চমকে উঠল।

'ও মা, মাসিমা!' কী ভাগ্যি! ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরল বড় মাসিকে, ঠিক যেমন আদুরে ছেলে জড়িয়ে ধরে তার মাকে।

এ-ঘরে বড় মাসির আবির্ভাব সত্যিই অপ্রত্যাশিত। মাঝে মাঝে রুনুই যায় ওঁর ঘরে। আজ পর্যন্ত এ ঘরে বড় মাসিকে পা দিতে দেখেনি রুনু।

ওর বুক দুরু দুরু করছে। কি জানি, ছোট মাসি যদি দেখে ফেলেন! নাকি দিলীপদাই এসে পড়ে হঠাৎ!

সে ভয় দেখা গেল বড় মাসিরও আছে। তিনি নিজেই রাস্তার দিকের জানালাটা বন্ধ করলেন, তারপর প্রায় কানে কানে বলার মতো ফিস ফিস করে বললেন, 'তোরে এটা কথা কবো বলে এই ফাঁক বুঝে চুপিচুপি আইছি।'

'কী কথা?' চাপা গলায় বলে রুনুও।

'এই ছুটিতি তুই বাড়ি যাসনে বাবা। তুই না থাকলি একা একা আমি দম বন্ধ হয়ে মারা যাব!' করুণ গলায় বলেন বড় মাসি।

'একা একা বলতিছেন ক্যান? দিলীপদা তো থাকবে।'

'না রে, ও আর এহানে থাকবে না। তা-ই কতিই তো আলাম বাবা।' ফিস ফিস করে বললেন বড় মাসি, 'খুব গোপন কথা। কাউরি কবি নে কিন্তু।'

'কোথায় যাবে দিলীপদা?'

'যাবে মাদারীপুর। আমার বাপের বাড়ির দ্যাশ। আসলে মামার বাড়ির নাম করে ও যাচ্ছে পুণ্য দাসের কাছে। নাম শুনিসনি পুণ্য দাসের? খুব নামকরা লোক। আমাগে আত্মীয় হন।'

'তার কাছে যাবে কেন?'

'তিনি যদি ওরে মাদারীপুর ইস্কুলি ফিরি পড়াবার ব্যবস্থা করতি পারেন, তয় এই পোড়া শ্মশানে আমরা আর থাকব না। এহানে কী সুখেই আছি, তুই তো দেখতিছিস!' বলতে বলতে ঝর ঝর করে কেঁদে ফেলেন বড় মাসি।

'আপনি এখানে না থাকলি আমিও থাকব না।' বড় মাসির গলা জড়িয়ে ধরে বলে রুনু, 'আমিও চলে যাব।

চোখে জল এসে যার ওর।

'ষাট ষাট। তুই যাবি ক্যান? তোরে ওরা কত ভালোবাসে। ওগে শত্তুর তো আমি। আমি গেলিই দেখবি ওরা সুখিশান্তিতি থাকবে। থাক, ওরা সুখি থাক, আমি আমার বাপের বাড়ির ভিটেয় পড়ে থাকব। খুদ-কুঁড়ো যা জোটে তা-ই খাব।'

'কেন, দিলীপদা যে বলে এ-বাড়ি আপনার?'

'কী হবে এই পোড়া বাড়ি দিয়ে? কী হবে এই যক্ষের ধন আগলায়? যাওয়ার সময় সব দলিল-পত্তর আমি পোড়ায়ে দিয়ে কয়ে যাব, এই রলো তোমাগে বাড়ি, তোমরাই সুখি ভোগ করো। আমার দুঃখির কপাল...।' কান্নার বেগে আর কথা শেষ করতে পারেন না বড় মাসি।

এই বড় মাসিকে খুশি রাখতে এই মুহূর্তে প্রাণ দিতে পারে রুনু। ও সঙ্গে সঙ্গে বলে বসল, 'আমি বাড়ি যাব না মাসিমা, তুমি কান্দ্যে না।'

'আহা, কী মিষ্টি সোনা আমার! তুই আমারে আর আপনি কবি নে। তুমি কলি কত মিষ্টি লাগে দ্যাখ তো। বুক জুড়োয়ে যায় রে! আজন্মে যেন তোর মতো এট্টা ছেলে হয় আমার।'

নির্দ্দিষ্ট দিনেই মামাবাড়ি চলে গেল দিলীপ।

ছুটির দিনগুলিতে মধুর একটা লুকোচুরি খেলা শুরু হল দুই অসমবয়সি বন্ধুর মধ্যে। রুনু পথ চেয়ে বসে থাকে কখন সবাই ঘুমোবে, কখন বড় মাসি আসবেন ওর ঘরে। বড় মাসিও পথ চেয়ে থাকেন কখন কোন ফাঁকে রুনু চুপিচুপি হাজির হবে ওর ঘরে।

ওদের মেলামেশার সবচেয়ে ভালো সময় হল ভোর বেলা। রুনুর ঘরের রাস্তার দিকের জানলাটা সবসময় খোলাই থাকে। বন্ধ হয় কেবল বড় মাসি ওর ঘরে এলে। ভোরে বড় মাসি ওর জানালার কাছ এসে হয় খুক করে একটু কাশেন, না হয় ঝনাৎ করে আঁচলে বাঁধা চাবির গোছাটা পিঠে ফেলেন। সেইটুকু শব্দই যথেষ্ট। ও তো জেগে কান খাড়া করেই থাকে। শব্দ পাওয়ামাত্র যথাসম্ভব নিঃশব্দে দরজা খোলে। নিঃশব্দে তালা লাগায়। ও ঘরের একক দখল পাবার পর থেকেই ছোট মাসি ওকে একটা তালাচাবি দিয়েছিলেন। সেই থেকে নিজেই ঘরদোর ঝাঁট দেয়। ঘরখানাকে ও দারুণ ভালোবেসে ফেলেছে। হয়তো বড় মাসির চেয়েও বেশি ভালোবাসে ওর পড়ার ঘরখানাকে। এই ঘরের মায়াতেই কি ওর বাড়ি যাওয়া হল না এ ছুটিতেও?

দরজা খুলে ওদের চোখাচোখি হতেই সুন্দর একটু হাসি বিনিময় হয় ওদের মধ্যে। ঠিক যেন সমবয়সি দুটি বন্ধু।

এক-এক দিন অনেক রাত থেকেই জেগে থাকে রুনু। প্রত্যাশিত শব্দটা আর হয় না। অস্থির হয়ে ওঠে। অভিমান হয়। সেই অভিমানের শোধ নেয় তার পরের দিন। কাশি শোনে, তবু দরজা খোলে না। আবার কাশি, আবার চাবির শব্দ। অনেক দেরি করে দরজা খুলেই হেসে ফেলে। হাসতে হাসতে বলে 'কেমন জব্দ। কাল কেন দেরি করলে? জানো আমি কত রাত থাকতি উঠে বসে ছিলাম?'

'ওরে বজ্জাত ছেলে। আমি তাই ভাবি। তোর এত ঘুম।' হাসেন বড় মাসিও।

প্রায়ান্ধকার নির্জন পথে পাশাপাশি চলতে চলতে দুটি বন্ধু ওদের মনের কথা কয়। সুখ-দুঃখের কথা কয়।

এই ছুটির মধ্যেই রুনু জেনে ফেলল বড় মাসির অনেক কথা। বড় মাসিও জানলেন রুনুর অনেক কথা। ওর সুশীলাদি, দাদা, হরেকেষ্ট ওর মধুমতী, ছোট গাঙ—সব চেনা হয়ে গেল বড় মাসির। বাজুনিয়ার ওর কাকিমা, ঠাকুমা, দিপু, নিপু, নরেনদাকেও চিনলেন তিনি।

শ্রীনাথ পণ্ডিত এলেন মহাষ্টমীর দিন।

এবারও নগরবাসীর মাথায় মস্ত এক বোঝা। গোটা কয়েক কাঁঠাল, বারোজোড়া নারকেল আর কিছু নদীর মাছ। এবার আর তরি-তরকারি নেই। দুঃখ করে বললেন, 'খেত-খামার সব এখন মা গঙ্গার গর্ভে। তরকারি আর খাওয়াতি পারব না শিগগির। বাগানও অনেকখানি চলে গেছে। এখনও যা দুটো চারটে গাছপালা আছে, তাও যাবে। এই বোধ হয় আমার বাগানের শেষ ফল যোগেন। নতুন বাড়িতি জায়গা কম। তা ছাড়া এ বয়সে নতুন করে আর কিছু করারও শক্তি নাই।'

রুনুকে দেখেই তাঁর প্রথম প্রশ্ন, 'এবার ইংরাজি পরীক্ষা কেমন হল?'

'ভালো হইছে।'

'ফার্স্ট হবি তো?'

উত্তর দেয় না রুনু। মাথা নীচু করে থাকে।

'বাড়ি যাবি নে?'

এবারও মাথা নীচু করে থাকে রুনু।

উত্তর দিলেন ছোট মাসি আর ডাক্তারবাবু। ওঁরা বললেন, রুনু এখানে বেশ পড়াশোনা করছে, ওর দেখাদেখি বাচ্চাগুলিও একটু পড়ছে-টড়ছে। তাছাড়া ওরা বেশ আনন্দে আছে।

ডাক্তারবাবু বললেন, 'এসময় আপনাদের ওদিকে খুব ম্যালেরিয়া। আমার অনেক রোগী আসে গোবরা, ঝোনাপাড়া, সোনাকোড় থেকে। এসময় না যাওয়াই ভালো।'

'তা সত্যি কথা', বলেন পণ্ডিতমশাই, 'এবছর তো খুব ম্যালেরিয়া। ঘরে ঘরে সব শোয়া। আমার বাড়িতিও একা আমি ছাড়া আর সবাই প্রায় শোয়া।'

গোপালগঞ্জ থেকেই রুনুর পূজার জামাকাপড় কিনে দিয়ে গেলেন শ্রীনাথ পণ্ডিত। পূজার জামা-কাপড় অবশ্য ডাক্তারবাবুও দিয়েছেন ওকে। সে সব খুব দামি জিনিস। জামাটা তো রুনুর দারুণ পছন্দ। শীত আসন্ন বলে ডাক্তারবাবু ওকে দিয়েছেন গরম কাপড়ের একটা ফুলশার্ট। এ জিনিস ও কেবল বড়লোকের ছেলেদেরই পরতে দেখেছে। সে জামা-কাপড় দেখে শ্রীনাথ পণ্ডিত খুব উচ্ছ্বাসিত, 'আমি তো বাবা এ সব জামা-কাপড় এ জীবনে তোরে দিতি পারব না, তোর সাত জন্মের পূণ্যির ফলে এমন মেসো-মাসি পাইছিস।'

মাসিমাকে বললেন, 'তোমাগে আত্মা কত বড়। ঈশ্বর তোমাগে চিরসুখী রাখুন সরমা।'

পণ্ডিতমশাই চলে যেতেই রুনু মিন মিন করে ছোট মাসিকে বলে, 'ছোট দেখে একটা কাঁঠাল দিয়ে আসব বড় মাসিরে?'

ছোট মাসি মুচকি হাসলেন, 'শুধু কাঁঠাল দিবি ক্যান রে? কাঁঠাল দিবি, মাছ দিবি, একজোড়া নারকেলও দিস। রাখ, আমি গোছায়ে দিচ্ছি।'

ছোটমাসির মুখে হাসি দেখে রুনু নেচে উঠল উচ্ছ্বাসে, আনন্দে।

দিলীপ চলে যাবার পর থেকেই এটা লক্ষ্য করছিল রুনু, তাই তো সাহস করে আজ এ কথা বলতে পারল।

একটা ঝুড়িতে সব সাজিয়ে দিলেন ছোট মাসি। রুনু ঝুড়িটা মাথায় করে প্রায় নাচতে-নাচতেই প্রকাশ্যে আজ প্রবেশ করল বড় মাসির ঘরে।

'এই দ্যাখেন আমাগে বাড়ির গাছের কাঁঠাল, কলা, নারকেল। আর এই আমাগে নদীর মাছ। বাবা আনিছেন। আপনারে খ্যাতি দেছেন।'

'কে দিলেন?' মিটি মিটি হেসে বলেন বড় মাসি, 'তোর বাবা, তোর ছোট মাসি, না তুই?'

'আমি!' বড় মাসির কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল রুনু।

তেরো

স্কুল খোলার এক সপ্তাহের মধ্যেই জানা গেল সেকেন্ড টার্মিনাল পরীক্ষার ফল। না, এবারেও বাড়ি যাবার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি রুনু। ইংরেজিতে যদিও প্রথম হয়েছে, কিন্তু প্রথম হয়েছে হারানও, অর্থাৎ ব্র্যাকেটে ফার্স্ট। অন্যান্য বিষয়ে? এবার কয়েকটা বিষয়েই হারান রুনুকে ছাড়িয়ে গেছে। ফলে টোটালেও সেই ব্র্যাকেটে ফার্স্ট। নাঃ, এ রেজাল্ট দিয়ে শ্রীনাথ পণ্ডিতকে প্রসন্ন করা যেত না। পূজার ছুটিতে ও যে বাড়ি যায়নি, ভালোই করেছে।

কিন্তু কী করে কাটাল ও এ ছুটিটা? প্রায়ই তো ওর ছাত্রীদের সঙ্গে খেলাধুলো করে আর বড় মাসির সঙ্গে ভাব করেই কাটাল। পড়ল আর ক'দিন কতক্ষণ?

কদিন বাদেই পাওয়া গেল অ্যানুয়াল পরীক্ষার নোটিশ। কী সর্বনাশ, আর মাত্র একমাস সময়! না এ সময়টা আর গল্প নয়, খেলা নয়। এবার যেন শ্রীনাথ পণ্ডিতের কাছে প্রতিশ্রুতির চেয়ে হারানকে পরাজিত করার ঝোঁকটাই ওর বড় হল। গত পরীক্ষায় তবু হারান টোটালে ওর থেকে ১০-১২ নম্বর নীচে ছিল, এবার ব্র্যাকেটে এসে গেছে। এখন থেকেই আদা-জল খেয়ে না লাগলে শেষ পরীক্ষায় নির্ঘাত হারান ওকে ছাড়িয়ে যাবে। আর তাহলে হয়তো ওর পড়াই বন্ধ হয়ে যাবে। দাদাকে দোকানদার করে দিয়েছেন বাবা। ওকেও হয়তো তেমন একটা কিছু...। ভাবতে গা শিউরে ওঠে।

এদিকে স্কুল খোলার পরই এর-ওর মুখে ঘুরতে ঘুরতে রুনুর সেই চাঁদা দেবার ঘটনাটা ওকে রাতারাতি বিখ্যাত করে দিল সারা স্কুলে। সেদিন ছাত্রদের মধ্যে রুনুর দানই নাকি সর্বোচ্চ দান।

চাঁদা দিতে যাদের বাকি ছিল, এমনকী আগে যারা দু-এক আনা চাঁদা দিয়েছিল, তাদের মধ্যে রুনুকে হারাবার একটা তীব্র প্রতিযোগিতা দেখা গেল। ফলে উপরের ক্লাসের অনেকেই এক টাকা, এমনকী কেউ কেউ দু-তিন টাকাও দিল। এই সানন্দ প্রতিযোগিতায় নরেনবাবুর স্মৃতি-তহবিলে সেবার যে টাকা সংগ্রহ হয়ে গেল, তার পরিমাণ অভাবনীয় বেশি দিয়েও কিন্তু রুনুর প্রথম কৃতিত্বটা ম্লান করতে পারল না কেউ। ফলে ওর যত না বন্ধু লাভ হল, তার চেয়ে শত্রু লাভ হল অনেক বেশি। ওর নাম হয়ে গেল 'দাতা কন্ন'। শত্রুপক্ষ ওকে পথে-ঘাটে খ্যাপাতে শুরু করল 'দাতা কন্ন' বলে। উঁচু ক্লাসের কে যেন আবার আর-এক রঙ চড়িয়ে বলল, 'দাতা কর্ণ নয়, লম্বকর্ণ।'

'লম্বকর্ণ' মানে যে গাধা, সেটা রুনু জেনেছিল অনেক পরে।

এইটুকু জীবনে বার বার দেখল রুনু, খ্যাতির সঙ্গে বেদনাটা যেন জড়িয়ে থাকে। যখনই কোনো কারণে একটু খ্যাতি এসেছে, তার পেছনে পেছনেই এসেছে ব্যথা-অপমান-উপহার। মনে পড়ল বাজুনিয়া স্কুলের সেই কবিখ্যাতির কথা।

'দাতা কর্ণ-লম্বকর্ণ' রুনুকে কেবল ছাত্রই নয় চিনলেন এবার স্কুলের সমস্ত শিক্ষকও। গল্পটা হয়তো হেডস্যার বলেছিলেন তাঁদের কাছে। তাঁরাও এ-ওঁকে বলেন, 'দরিদ্র এক পণ্ডিতের ছেলে বটে, কিন্তু ছেলেটার দিলটা দরিদ্র নয়।'

এইসব প্রশংসা পাবার লোভে যে ওর শ্রেষ্ঠ সঞ্চয়টা ও দান করেনি, দান করেছ একটা আন্তর প্রেরণায়—নরেনবাবুর আত্মার আশীর্বাদ ও ক্ষমা পাবার কামনায়, এ কথা ও কী করে বোঝাবে সবাইকে।

অ্যানুয়াল পরীক্ষায় একটা কাণ্ডই করে বসল রুনু। কেবল ইংরাজিতে প্রথম নয়, সমস্ত বিষয়েই সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছে রুনু। এত বেশি নম্বর নাকি আজ পর্যন্ত কোনো ছাত্র পায়নি এ স্কুলে।

রুনুর এই অসাধারণ রেজাল্ট দেখে ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে কে কতটা বিস্মিত হয়েছিল সেটা বড় কথা নয় সবচেয়ে বিস্মিত হয়েছিল রুনু নিজেই। সন্দেহ জেগেছিল হয়তো হেডস্যারের মনেঃ কোনো কোনো ক্লাস-টিচার হয়তো ওর প্রতি পক্ষপাতিত্ব করেছেন। তিনি উপর দিকের তিনটি ছাত্রের সবক'টা খাতাই দ্বিতীয় বার দেখলেন নিজে। না, রুনুর খাতার এক নম্বরও কাটা গেল না, বরং কয়েক নম্বর কাটা গেল হারানের খাতা থেকেই।

ব্যাপারটা ও নিজেই বুঝে উঠতে পারছে না। এবার পরীক্ষা দিতে আসার সময় প্রতিদিন ও নরেনবাবুর বাড়ির সামনে দিয়ে এসেছে এবং তাঁর উদ্দেশ্যে প্রণাম জানিয়ে তাঁর আশীর্বাদ প্রার্থনা করেছে।

পরীক্ষা দিতে বসেই ও অনুভব করেছে সেই আশ্চর্য ব্যাপারটা। যে নরেনবাবুকে ও কোনো দিন দেখেনি, বাজুনিয়ার নরেনদার সঙ্গে যাঁকে ও কল্পনায় একান্ত করে নিয়েছে, সেই ছবিটাই যেন প্রতিদিন দাঁড়াত এসে ওর সামনে পরীক্ষার সময়। যখনই কোনো প্রশ্নের উত্তর লিখতে একটু দ্বিধা এসেছে, সেই অদেখা মূর্তি ওকে সাহস দিয়েছে, ওকে যেন উত্তরও বলে দিয়েছে। পরীক্ষাটা যেন ও নিজে দেয়নি, যেন পরীক্ষা দিয়েছে সেই ছায়ামূর্তিই ওর হাত দিয়ে। পরীক্ষার হলে অন্যের কাছে শুনে উত্তর লেখায় যে অপরাধ, তেমন একটা অপরাধ-বোধও জেগেছে ওর মাঝে মাঝে। এ কথা তো কাউকে বলা যাবে না। বোঝানোও যাবে না। কিন্তু রুনু জানে, এ কৃতিত্ব ওর একার প্রাপ্য নয়।

চোদ্দো

সিক্স থেকে সেভেনে উঠল রুনু।

সেভেন থেকে উপরের চার ক্লাস বলে মেন বিল্ডিং-এ। এবার রুনু এল মেন বিল্ডিং-এ। এই বিল্ডিং-এরই মাঝের টিনের পার্টিশান তুলে ফেললেই বিরাট হলঘর। সেই হলে বসেই তো সেবার উচ্চ প্রাইমারি পরীক্ষা দিয়েছিল রুনু। ম্যাট্রিক পরীক্ষার সেন্টার যখন হয়, তখনও তুলে দেওয়া হয় পার্টিশান।

ক্লাস সেভেনের বেঞ্চে এলোমেলোভাবে বসে রুনু, হারান, হরেকেষ্ট, সুবিমল গল্প করছিল। রেজাল্ট জানানো হয়ে গেছে। আর দু-একদিন পরেই দেওয়া হবে বুকলিস্ট। তারপর বড়দিনের ছুটি। এ ছুটিতে ও নিশ্চয়ই বাড়ি যাবে।

ওদের কথা হচ্ছিল এবার যারা ফেল করে সেভেনেই রয়ে গেল তাদের নিয়ে। তারা কেউ আসেনি আজ। তারা কী চোখে দেখবে ওদের?

হঠাৎ রুনুর ডাক পড়ল হেডস্যারের ঘরে।

এখন আর ও ঘরে ঢুকতে ভয় নেই রুনুর।

হেডস্যারের ঘরে ঢুকেই চমকে উঠল রুনু বাবাকে দেখে। প্রণাম করল বাবাকে। প্রণাম করল হেডস্যারকেও।

'তুমি এক বছরের মধ্যে এক বারও বাড়ি যাওনি রণজিৎ?'—প্রশ্ন করলেন হেডস্যার।

ইতিমধ্যে শ্রীনাথ পন্ডিত রুনুকে বুকে জড়িয়ে ধরেছেন আঃ, কী উষ্ণ সে বুক। এত দিনের এত অভিমানের বরফ এইটুকু উষ্ণ স্পর্শেই জল হয়ে গেল রুনুর।

'এবার আমার মুখ রাখিছিস বাবা, এবার আমার কথা রাখিছিস!' রুনুকে সস্নেহে বুকে জড়িয়ে রেখে বলেন, 'আশীর্বাদ করুন পরেশবাবু, এ উদ্যম যেন ওর বরাবর থাকে।'

'সে কি আর আপনাকে বলতে হবে পণ্ডিতমশাই?' স্নিগ্ধ হেসে বলেন হেডস্যার, 'ভাল ছাত্রদের প্রতি শিক্ষকের আশীর্বাদ আপনিই বর্ধিত হয়। সে তো আপনিও জানেন। আপনি তো একজন আদর্শ শিক্ষক। কিন্তু ও অ্যাদ্দিনে একবারও বাড়ি গেল না কেন?'

'বাড়ি যায়নি আমার উপর অভিমান করে।' হেসে বলেন শ্রীনাথ পণ্ডিত, 'আমি বলিছিলাম, ইংরাজিতে প্রথম না হতি পারলি বাড়ি যাওয়া চলবে না। বলিছিলাম, সব বিষয়ে ফার্স্ট হতি হবে। ওদিকি ওর মা'র কত কান্নাকাটি। এবার আমিই ওরে বাড়ি নিয়ে যাব নাচতি নাচতি। আমার যে আজ কী আনন্দ!'

এত দিন পরে রুনুর নতুন করে যেন মনে পড়ল ওর মায়ের কথা। মুহূর্তে দু-চোখ ছলছল করে উঠল।

মনে পড়ল অনেকদিন আগের একটা ঘটনা।

রামায়ণ-এ রামচন্দ্রের বনবাস অধ্যায় পড়তে পড়তে মা খুব কাঁদছিলেন। রুনু জিজ্ঞাসা করেছিল, 'তুমি কি রামের দুঃখে কাঁদতিছো মা?'

চোখের জল মুছতে মুছতে মা বলেছিলেন, 'আমার কান্না পায় মা কৌশল্যার দুঃখে। হায়, অমন বুক-জুড়োনো ছেলে রাম, তারে কোলছাড়া করে কী করে যে কৌশল্যার দিন কাটত, সে যে কী কষ্ট কী দুঃখ, তা তুই বুঝবি নে বাবা। সে বোঝে কেবল মায়েরা। বুকখান যেন ভাঙে চৌচির হয়ে যায় রে! সারাডা দিনমান পথের দিকি চাইয়ে থাকে মা। কেবল পথ চাওয়া আর কাঁদা। মায়ের এই কষ্টডা কেউ বোঝে না রে। বনবাসে রামচন্দ্রের কী দুঃখু? তার সঙ্গে সীতা ছিল, ভাই লক্ষ্মণ ছিল। চৌদ্দ বছরে কয় বার তার মার কথা মনে পড়িছে? এদিকে কৌশল্যার খাওয়া, নাই, নাওয়া নাই, চোখে ঘুম নাই—কেবল এক কান্নাঃ ওরে রাম, ফিরে আয়, ফিরে আয়। কৌশল্যার প্রতিটি মুহূর্ত রামময় তুই যখন বাজুনে ছিলি, তখন আমার ঠিক এই রকম...'

মায়ের সঙ্গে সেদিন কেঁদেছিল রুনুও।

সেই কৌশল্যারূপিনী মায়ের মুখখানা এই মুহূর্তে মনে পড়ল রুনুর। হায়, রুনুর কৌশল্যা জননীও তো এই একটা বছর ধরে সারাটা দিনমান পথ চেয়ে চেয়ে...

পিতার আলিঙ্গন ছাড়িয়ে নিজেকে মুক্ত করে রুনু রুদ্ধশ্বাসে বলে ফেলল, 'আমি এখুনি বাড়ি যাব বাবা।'

বলেই বেরিয়ে এল ঘর ছেড়ে।

'ওরে, শোন শোন, দাঁড়া। একসাথে যাব আমরা। কিছু মিষ্টি টিষ্টি কিনে নিয়ে যাব তো।'

পেছন থেকে বাবার স্নেহমাখা কথাগুলি কানে আসছে, কিন্তু ওর আর সবুর সইছে না। জননী কৌশল্যা যে কেঁদে কেঁদে সারা হয়ে যাচ্ছেন বনবাসী পুত্রের কথা ভেবে ভেবে, তাঁর যে রাতে চোখে ঘুম নেই, কোনো কাজে মন নেই।

সমস্ত রাস্তাটাই প্রায় দৌড়ে এসেছে রুনু। রাস্তাও তো কম নয়। চার মাইল পথ। ওদের গ্রামের কাছে আসতেই দূর থেকে যে দৃশ্য চোখে পড়ল, তাতে একেবারে থমকে দাঁড়িয়ে গেল সে।

কোথায় গেল বুড়ো বট, কোথায় হাটখোলা আর ভাসাদার ঘানিঘর? সামনেটা একেবারে মহাশূন্য! একেবার দু-মাইল দক্ষিণের মোল্লাহাট পর্যন্ত কেবল নীল জল আর নীল আকাশ। নদীটা মোল্লাহাটের কাছে পুবে বাঁক নিয়েছে, আর সেইখানে গিয়েই আকাশটা মিশে গেছে নদীর বুকে।

কায়েতপাড়াটা একেবারে নিশ্চিহ্ন। তার দক্ষিণে কাপালীপাড়া-বুনোপাড়ার দু-চারটে খেজুর গাছ, বাবলা গাছ এখনও রাক্ষসী মধুমতীর তীরে দাঁড়িয়ে ভয়ে কাঁপছে। কাঁপছে ছোট গাঙটাও। হাটখোলার গা ঘেঁষেই ছিল ডিস্ট্রিক বোর্ডের রাস্তা। এখন নদী এসে প্রায় রাস্তা ছুঁয়েছে। দেখা যাচ্ছে, রাস্তাটা এখনও ঠিক আছে। ঠিক আছে রাস্তার পূবধারে বড়কাছারী বাড়িটা। কিন্তু পাঁচমুহুরীর সে ছোটকাছারীর চিহ্নও নেই।

মধুমতীর রুদ্ররূপ দেখে হঠাৎ রুনুর গতিটা মন্থর হয়ে গেছিল। যেখানে ওদের আগের বাড়ি ছিল সেই বরাবর এসে ওর কান্না পেয়ে গেল। রাস্তায় দাঁড়িয়ে দেখা যাচ্ছে, কয়েকটা কাঁঠাল, কলা, বাবলা গাছ আর ন্যাড়ামুণ্ড নারকেল গাছ মাথা তুলে যেন আকাশের দেবতাকে ধিক্কার জানাচ্ছে। কোথায় গেল দাদার অত সাধের দোকানঘর, ওদের অত সাধের আমবাগান? রাক্ষসী মধুমতী সব গিলে খেয়েছে। তবু কি তার ক্ষুধা মিটেছে? ওই গাছকটাও খাবে, তারপর খাবে হয়তো রুনুর আজন্ম খেলার সাথী অনেক সুখ-দুঃখের স্মৃতি মাখানো এই ছোট গাঙটাকেও।

মধুমতীর দিকে আর তাকাতে পারছে না ও। এ মধুমতী ওর অচেনা। ওপারে অপরাহ্নের আকাশে আজও চলেছে নানা রঙের খেলা। আজ আর সে রঙের খেলা দেখবার উৎসাহ নেই রুনুর। ভারাক্রান্ত মন নিয়ে ধীরে ধীরে সামনের দিকে এগুচ্ছে ও।

কাছারী বাড়িটা ছাড়িয়ে আসতেই ওর খেয়াল হল সারা পথ ও ছুটে এসেছে মাকে দেখবার জন্যে। অথচ নিষ্ঠুরা মধুমতীর কথা ভাবতে ভাবতে ও এতখানি সময় নষ্ট করে ফেলল। মাকে মনে পড়তেই আবার দৌড় শুরু হল। ওদের নতুন বাড়ি কোথায় হয়েছে সে তো হরেকেষ্টর কাছে শুনেছেই। হাউজবাড়ি ছাড়িয়ে কাঠের সাঁকোটা পার হলেই ওদের বাড়ি। ওই তো দেখা যাচ্ছে ওদের বড়ঘরের উঁচু চাল।

মা তখন উঠোনের এক কোণে বসে পুরোনো বাড়ি থেকে আনা শুকনো ডালপালা কেটে জড়ো করছিলেন। বাড়িতে আর কেউ আছে বলে তো মনে হয় না। রুনু পেছন থেকে গিয়ে মাকে প্রবলভাবে জড়িয়ে ধরল। উচ্ছ্বসিতভাবে বলল, 'মা, আমি এবার ফাস্ট হইছি। একেবারে সব বিষয়ে ফার্স্ট।'

ওর কৃতিত্বের কোনো কথাই হয়তো কানে যায়নি মায়ের, কিংবা কানে গেলেও কোনো গুরুত্ব দেননি। সামলে উঠেই তিনি বাঁ-হাতে রুনুর একটা কান ধরে ডান হাতে ওকে এলোপাথাড়ি চড় মারতে শুরু করলেন মুখে পিঠে মাথায়। মারছেন অরদ্ধা বলছেন, 'হতভাগা লক্ষ্মীছাড়া পাজি! মা-রে জন্মের মতো ভুলিছ? মা-ই তোমার বড় শত্তুর!'

রুনু বিনাপ্রতিবাদে মার খেয়ে যাচ্ছে, আর বলছে, 'আর মার্যে না মা, আর করব না, আর করব না।'

'এই পুরো এট্টা বছরের মধ্যি এট্টা দিনও তোর আমার কথা মনে পড়ল না। ওরে নেমকহারাম, শহরে যাইয়ে বাবু হইছ? মায়া-মমতা একেবারে বিসজ্জন দেছ্যে। লক্ষ্মীছাড়া ভূত!'

প্রায় মিনিটখানেক ধরে পাগলের মতো হাত আর মুখ শান্ত হলেন মা। তারপর রুনুকে বুকে জড়িয়ে ধরে সে কী কান্না!

'ওরে নিষ্ঠুর, ওরে নিষ্ঠুরির বংশ...'

কাঁদছে রুনুও! কাঁদতেও যে এত ভালো লাগে, এত মিষ্টি লাগে গালাগালি, আর এত সুখ যে আছে মার খাওয়ায়, এই অদ্ভুত ব্যাপারটা যতই অনুভব করছে রুনু, ততই যেন বেশি করে কাঁদছে।

কিশোর ভারতী। এপ্রিল-মে ১৯৭৫

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%