শিকার অভিযানে রুনু

শ্যামদাস দে

সেবার কালিপুজোটা পড়েছিল কার্তিকের শেষ দিকে। তখন সবে পাঁচ পেরিয়ে ছয়ে পা দিয়েছে রুনু। বেশ শীত পড়ে গেছে। রুনুর পরনে পাঁচহাতি ধুতি। গায়ে মোটা গেঞ্জির উপর খদ্দরের চাদর।

বরাবরের মতো সেবারও রুনুর বাবা শ্রীনাথ পণ্ডিতমশাই কালিপুজোর তিন দিন আগেই চলে গেছেন পুব দেশে। সে দেশে ওঁর পরিচয় 'ওস্তাদজি'। সে দেশের বিভিন্ন গ্রামের কোনো না কোনো জমিদার বাড়িতে পুজোর ছুটির সারাটা মাস ধরেই ওস্তাদজির নিমন্ত্রণ থাকে। উনি উপস্থিত না থাকলে কোনো উচ্চাঙ্গের গানের আসরই জমে না। সব নিমন্ত্রণ অবশ্য উনি রাখতে পারেন না। সেবার বেরিয়েছেন মাত্র দিন-দশেকের জন্যে। ফিরবেন কালিপুজোর এক সপ্তাহ পরে।

পণ্ডিতমশাই বাড়িতে না থাকলে সারাটা বাড়িই যেন লাভ করে অবাধ স্বাধীনতা। রুনু-ইনুর তো কথাই নেই, এমনকী তাদের মা-ও মুক্ত-পক্ষ বিহঙ্গীর মতো স্বাধীন হয়ে যান।

রুনুদের কায়েতপাড়ায় কালিপুজো হয় কেবল নালু দাসের বাড়িতে। পাড়ার মধ্যে সবচেয়ে অবস্থাপন্ন গৃহস্থ তারা। পুজোও হয় বেশ জমজমাট। কায়েতপাড়া, বুনোপাড়া, কাপালীপাড়ার সকলেই নিমন্ত্রিত হয়। পুজোর রাতে লুচি, তরকারি, ছোলার ডাল, বেগুনভাজা, হালুয়া ইত্যাদি নিরামিষ ব্যাপার। পরের দিন আবার মধ্যাহ্নভোজে ভাত, মাছ, প্রসাদী মাংস, দই, মিষ্টি ইত্যাদি । দুদিন ধরেই কায়েতপাড়ায় কারও ঘরে হাঁড়ি চড়ে না।

ভিন গাঁয়ের এক কুমোর এসে লক্ষ্মীপুজোর পরের দিন থেকেই কাঠ-খড় দিয়ে নালু দাসের মণ্ডপঘরে প্রতিমা গড়তে লেগে যায়। সেইদিন থেকেই পাড়ার ছেলেমেয়েদেরও ভিড় শুরু হয় ওদের বাড়িতে। কালীপুজোর ভাসান শেষ না হওয়া পর্যন্ত সে ভিড়ের কামাই নেই।

কালিপুজোর দিন বিকেল থেকেই রুনুদের বাড়িতে তালা ঝুলছে। সবাই চলে এসেছে নালু দাসের বাড়ি। রুনু-ইনু আছে মণ্ডপের আশেপাশে, মাকে নিতে হয়েছে। ও-বাড়ির হেঁসেলের দায়িত্ব। বরাবরই নিতে হয়। গ্রামের কোনো ভোজের ব্যাপার থাকলে মাকে ডাকতেই হবে। ওঁর রান্নার খ্যাতি গ্রাম ছাড়িয়ে গ্রামন্তরেও পৌঁছে গেছে। ও কর্মে সারা গ্রামে ওঁর জুড়ি নেই।

তখন সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। মা ব্যস্ত আছেন হেঁসেলে। ওদিক থেকে ভেসে আসছে গাওয়া ঘিয়ে ভাজা লুচির গন্ধ। এদিকে মণ্ডপ থেকে ভেসে আসছে ফুল-বেলপাতা- ধূপ-ধুনোর পুজো-পুজো গন্ধ। আর আসছে উঠোনের ও-প্রান্ত থেকে। সদ্য ফোটা শেফালি ফুলের গন্ধ। অদূরে শরতের মধুমতীর বুক থেকে উচ্ছ্বসিত ভেজা হাওয়ায় মিশে আছে ধানখেতের গন্ধ। এই সবকটি গন্ধ মিলে যেন একটা মিষ্টি-মধুর মাদকতায় ভরে দিয়েছে বিশ্ব-ভুবন।

মণ্ডপের সামনের মস্ত উঠোনটা আজ ঝকঝকে তকতকে। তিন-চার দিন ধরে পুরু করে গোবর দিয়ে লেপা হয়েছে। উঠোনের কেন্দ্রে সুন্দর আলপনায় শতদল পদ্ম। সেই পদ্ম থেকে সমান্তরাল দুটো আলপনার লতা চলে গেছে মণ্ডপের দুয়ার পর্যন্ত। পাড়ার ছোট ছোট ছেলেমেয়ে মণ্ডপের বারান্দায় উঠোনে ঘুরঘুর করছে। বড়দের নিষেধে আলপনায় কেউ পা ছোয়াবে না। তাতে নাকি পাপ হয়। ওরা মণ্ডপের সাজ-সজ্জা দেখছে, আলপনা দেখছে, ঠাকুর দেখছে।

কালিপুজো হয় গভীর রাতে। রুনুর এই বয়স পর্যন্ত একবারও তার নিশুতি রাতের পুজো দেখার সুযোগ হয়নি। ও যে একটু রাত হলেই ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু ঘুম নেই ইনু অর্থাৎ ওর দাদা ইন্দ্রের চোখে। ইন্দ্র রুনুর চার বছরের বড় হলেও সব ব্যাপারে রুনুর গুরু। রুনু দাদাকে অনেক বড় ভাবে—দাদা যে প্রতিবছর কালিপুজোর রাত জাগে, শেষরাতে পাঁঠাবলিও দেখে। সে বস্তুর যা বর্ণনা শুনেছে রুনু, তাতেই ওর চক্ষু ছানাবড়া, বক্ষ দুরুদুরু! সে দৃশ্য ও চোখে দেখতে পারবে না কোন দিন।

মণ্ডপের মধ্যে প্রতিমার দুধারে দুটো আর বারান্দার দুই প্রান্তে দুটো গ্যাসবাতি জ্বলছে। উঠোনের মাঝখানে সামিয়ানার নীচে জ্বলছে প্রকাণ্ড একটা ডেলাইট। আলোয় আলোয় চারদিক দিনের মতো পরিষ্কার। সেই আলোকিত এলাকাটাকে চারদিক থেকে ঘিরে আছে অসংখ্য জোনাকিখচিত অমাবস্যার ঘোর অন্ধকার। এই আলোকিত এলাকাটার মধ্যেই পড়েছে নালু দাসের উঠোনের পূব-দক্ষিণ কোণের শেফালি গাছটা। কত দিন সেজদির সঙ্গে রাত থাকতে এসে রুনু ওই গাছের তলা থেকে ফুল কুড়িয়ে নিয়ে গেছে। তখন তলাটা ছিল আগাছা আর ঘাস-পাতায় ভরা। অস্পষ্ট অন্ধকার ঘাসের মধ্যে সাদা সাদা ফুলগুলো যেন আকাশের তারার মতো ঝিকমিক করত, যেন হাসত খিলখিল করে। আজ এই আলোকিত পরিবেশে গাছটাকে যেন অচেনা লাগছে। ইতিমধ্যে তলায় কয়েকটা মাত্র ফুল পড়েছে আর সারা গাছটা ফুলে ফুলে সাদা হয়ে আছে। গাছটা যেন ওকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে—'এসো, এসো রুনু। আগে তো অন্ধকারে আমাকে ভালো করে দেখতে পাওনি। এবার আলোয় দ্যাখ। দ্যাখ আমি কী সুন্দর!' সত্যি, ও গাছটাই যে এত সুন্দর দেখতে, তা ভাবতেই পারেনি রুনু।

শিউলি ফুলের গন্ধটা রুনুকে বরাবর আকর্ষণ করে। একমুঠো ফুল নাকের কাছে ধরে শুঁকতে কী ভালো যে লাগে! অথচ সেজদি ওকে ফুলের গন্ধ শুঁকতে দেবে না। বলে, গন্ধ শুঁকলে সে ফুল নাকি এঁটো হয়ে যায়, আর পুজোয় দেওয়া যায় না। আজ অবশ্য বাধা দিতে আসবে না সেজদি। ভারী লোভী সেজদিটা। কোথাও খাবার গন্ধ পেলে আর নড়বে না। আজ সে সারাক্ষণ থাকবে হেঁসেলের ধারে-কাছে, মায়ের কাছে কাছে। এই সুযোগে একমুঠো শিউলি ফুল নিয়ে রুনু প্রাণভরে গন্ধ শুঁকবে। পায়ে পায়ে ও এগিয়ে গেল শিউলিতলার দিকে।

প্রায় ওর মুঠো ভর্তি হয়ে এসেছে সদ্য-ঝরা সুগন্ধ শিউলি ফুলে, এমন সময় ওর পিঠের খদ্দরের চাদরে ছোট্ট একটু টান। চমকে উঠল রুনু। হাতের ফুলগুলি ঝরে পড়ল মাটিতে। 'কেডা রে?' বলে মুখ ফেরাতেই ইন্দ্রর চোখাচোখি। চোখ টিপল ইন্দ্র। ও চোখ-টিপুনি রুনুর চেনা। সেই যেদিন প্রথম দাদার হাত ধরে পাঠশালায় গিয়েছিল রুনু। আর ফেরার পথে, সবিস্ময়ে দেখেছিল সর্ববিষয়ে দাদার কী অসীম জ্ঞান, সেদিন থেকেই ও সমস্ত তনু-মন-প্রাণ সমর্পণ করে দাদাকেই গুরু বলে মেনে নিয়েছে। দাদার সঙ্গে আটলান্টিকের অতলে অথবা আফ্রিকার গভীর অরণ্যে প্রবেশ করতেও ওর একটুও ভয় নেই। সব ঝড়ঝাপটা তো যাবে দাদার ওপর দিয়ে। তবে আর ভাবনা কী?

দাদার চোখ-টিপুনির জবাবে রুনু বলল, কোথায়?

আয় না আমার সঙ্গে।—নেতা সুলভ গলায় বলে ইন্দ্র।

দাদার এসব চোখের ডাকে রুনুর 'না' বলার সাধ্য নেই। ভগীরথের পেছনে গঙ্গার মতো, নাকি হ্যামেলিনের সেই বাঁশীওয়ালার পেছনে সুর-মুগ্ধ মূষিকের মতো কী এক অদম্য টানে পায়ে পায়ে এগিয়ে চলল রুনু ইন্দ্রর পেছনে পেছনে।

ব্যবস্থা সব আগেই করে রেখে গেছে ইন্দ্র। বের করে রেখে গেছে খ্যাপলা জাল, লগি, বৈঠা, হ্যারিকেন ইত্যাদি। মাথায় জড়াবার জন্যে দুখানা গামছাও।

এমন একটা সর্বশুভ দিন তো আর পাওয়া যাবে না। বাবা বাড়িতে নেই। মা পুজোবাড়িতে কর্মব্যস্ত থাকবেন সারারাত। সুতরাং পূর্ণ স্বাধীনতা। সে রাত আবার অমাবস্যার রাত। এমন রাতই তো দুঃসাহসিক অভিযান চালাবার পক্ষে আদর্শ।

ছিলনার বিলের জলে পচন ধরেছে। বিলের সমস্ত মাছ নাকি চৌধুরীখাল দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে মধুমতীতে। সেই খালে ক'দিন ধরে নাকি প্রচুর মাছ ধরা পড়েছে। ইন্দ্রর আজকের পরিকল্পনা হলো ওই চৌধুরীখালে মাছ ধরা।

কালিপুজোর ভাসানের পরেই নাকি খালের মুখে জাল পড়ে যাবে। তখন আর একটা মাছও আসতে পারবে না চৌধুরীখালে। প্রাণভরে মাছ ধরবার এই সুযোগ!

পরিকল্পনাটা রুনুকে বুঝিয়ে দিল ইন্দ্র। নিজের মাথায় একখানা গামছা কায়দা করে জড়িয়ে রুনুরও কান-গলা জড়িয়ে বেঁধে দিল আর একখানা।

কান-গলা ঢাকা থাকলি কার্তিকের হিমে কিছু কত্তি পারবে না।—রুনুকে অভয় দিয়ে বলে ইন্দ্র।

চৌধুরীখাল যে অনেক দূর! এই অন্ধকার রাত্তিরি অদ্দূর যাবা মাছ ধরতি?—ভয়ে ভয়ে বলে রুনু—তারচে এই নদীর পাড়ে পাড়ে—

দূর! এখন পাড়ের কাছে আছে নবডাঙ্কা! সব চলে গেছে মধ্যিগাঙে।

আমার যে খুব শীত করতিছে!—মৃদু প্রতিবাদের সুর রুনুর গলায়।

বোটের দুই-চার টান দিতি দিতিই দেখবি শীত কনে পালাবে নে! তারপর চৌধুরীখালের মাছ দেখলি তো...মোক্ষম একটা চোখ-টিপুনি দিয়ে ইন্দ্র বলে আজ নৌকোর খোল দেহিস ভরে ফেলব মাছ দিয়ে! নে চল, বোঠে দুখোন নে।

বলতে বলতে ইন্দ্র জাল কাঁধে ফেলে একহাতে লগি ও অন্যহাতে হ্যারিকেনটা তুলে নিল।

রুনুর বিস্ময় এখনও কাটেনি। সমস্ত ব্যাপারটা রহস্যজনক ঠেকছে ওর কাছে। ও বললে, ঘরে দেহি তালা ঝুলতিছে। তুমি এসব জাল, হ্যারিকেন বার করলে কী করে?

উত্তরে আর একটা চোখ-টিপুনি দিল ইন্দ্র। এবার আর চোখ-টিপুনির মানে করতে পারছে না রুনু। শেষ পর্যন্ত বুঝিয়ে দিল ইন্দ্র। ও নাকি একফাঁকে মায়ের আঁচল থেকে চাবির গোছা এনে ঘর থেকে এসব বস্তু বের করে আর একফাঁকে মায়ের আঁচলে চাবি বেঁধে রেখে এসেছে। মা একদম টের পাননি। মা তো তখন রান্নায় ব্যস্ত।

—তুমি তো সাংঘাতিক! মা যখন জানতি পারবেন—

—তার আগে নৌকো ভরতি মাছ দেখলি মা সব ভুলে যাবে, আয় তাড়াতাড়ি। আমাগে ডিঙি নিয়ে আগে নদীপথে একমাইল উজোয়ে যাতি হবে চৌধুরীখালের মুখি। তারপর খালের মধ্যি যাতি হবে খানিক একেবারে বিলির কাছে তারপর—

কিন্তু এই রাত্তিরি...এই শীতির মধ্যি...

—কলাম না বোঠের দুই-চার টানেই শীত যাবে নে। আর রাত্তিরির ভয় কী? হারিকেন তো নিচ্ছি। রাত্তিরিই তো মাছ। চল, চল।

হুকুম জারি করে ঘাটের দিকে এগিয়ে চলল ইন্দ্র। এ হুকুমের আর নড়চড় নেই। বুঝল রুনু। বৈঠা দুখানা কাঁধে নিয়ে রুনুও চলল পেছনে পেছনে।

প্রায় মাইল খানেক পথ উজিয়ে আসতে দুজনেই গলদঘর্ম। শীত কোথায় চলে গেছে তখন। আসল পরিশ্রমটা অবশ্য ইন্দ্রই করেছে হাল ধরে। রুনুর বৈঠাখানা খুবই ছোট। একটা খেলনাই বলা চলে। তবু ওরও পরিশ্রম কম হয়নি।

একসময় বাঁয়ে বেঁকে চৌধুরীখালে প্রবেশ করল ওদের ডিঙি। এবার রুনুর বিশ্রাম। ইন্দ্র একাই বৈঠা বেয়ে এগিয়ে চলল। খালের মধ্যে ঢুকেই রুনুর গা-টা ছমছম করে উঠল। এতক্ষণ এক আকাশ তারার আলোতে মধুমতীর উন্মুক্ত বুকখানা আলোকিত হয়ে ছিল, অমাবস্যার রাত বলে মনেই হচ্ছিল না। এবার অন্ধকারটা যেন চারদিক থেকে ওদের চেপে ধরতে চাইছে। খালের দুধারে মস্ত মস্ত গাছপালা ঝোপজঙ্গল আকাশটাকে একেবারে আড়াল করে রেখেছে। একটা তারাও দেখা যাচ্ছে না। হ্যারিকেনের ওই সামান্য আলোটুকু এই আলকাতরার মতো ঘন অন্ধকারকে ঘোচাবে কী করে? নৌকোর যে প্রান্তে দাদা, আলোটা সেইদিকে। নৌকোর একটা বাতাস সঙ্গে শক্ত করে বাঁধা। রুনুর দিকটা ঘোর অন্ধকারে ঢাকা।

একসময় বৈঠা থামিয়ে ইন্দ্র বলল, আইসে পড়িছি। এবার এদিকিত্থে আমি জাল ফেলব, আর ওদিকিত্থে লগি দিয়ে তুই নৌকোডারে ধরে রাখবি। পারবি না?

ব্যাপারটা দেখেছে রুনু, কিন্তু হাতে-কলমে করেনি কোনো দিন। ডিঙির একপ্রান্তে থাকে শিকারী। তার কাঁধে থাকে জাল। প্রবল একটা ঝাঁকুনি দিয়ে জাল যখন গোল হয়ে জলে পড়ে, তখন ডিঙিখানা দারুণ কেঁপে ওঠে। তারপর আস্তে আস্তে যখন জালটা টানা হয়, তখন ডিঙির ও প্রান্ত থেকে আর একজন লগির সাহায্যে ডিঙিখানাকে আটকে রাখে। এবার রুনুকে গ্রহণ করতে হবে সেই শিকার-সহকারীর ভূমিকা। ইন্দ্র রুনুকে সব শিখিয়ে পড়িয়ে দিল। বৈঠা বাইতে শিখেছে রুনু, লগিও মোটামুটি ব্যবহার করতে পারে। নদীর পাড়ের মানুষের এ বিদ্যা প্রায় সহজাত। তবু এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ রুনুর জীবনে এ-ই প্রথম। নিজেকে বেশ একটা ভারিক্কি মানুষ মনে হচ্ছে ওর।

প্রথম প্রথম বারকয়েক জাল টানার সময় নৌকোটাকে ঠিক সামলে রাখতে পারল না রুনু, সে বাবদে ধমক-টমকও খেতে হল দাদার কাছে। খানিক বাদে কিন্তু সত্যিই ও আয়ত্ত করে ফেলল কৌশলটা।

এক-একবার জাল উঠছে আর হ্যারিকেনের আলোয় চিকচিক করে উঠছে মাছগুলো। মোটা মোটা রক্তবর্ণ গলদা, চিংড়ি, সোনার বরণ পাবদা-ট্যাংরা, রজত-শুভ্র সরলপুঁটি-পাঙাস, কুচকুচে কালো শোল-মাগুর, আবার মাঝে মাঝে এক আধটা রুই-কাতলাও উঠছে। সে এক দারুণ উত্তেজনা। কখন যে রুনুর ভয় ভেঙে গেছে, কখন যে অন্ধকারটা ওর গা-সওয়া হয়ে গেছে, সে খেয়ালও নেই। মাছগুলি সব জমা হচ্ছে নৌকোর খোলের মধ্যে। জালের বন্ধন থেকে মুক্তি পেয়ে খোলের মধ্যে তখন তাদের কী দাপাদাপি!

মাছ ধরার নেশায় তখন ওরা পাগল। রাত কত হল, চৌধুরীখালের ভিতর কত দূর ওরা এগিয়ে গেছে, কারও হুঁশ নেই। হঠাৎ-ই ঘটল কাণ্ডটা। ঠিক ওদের মাথার উপর একটা শব্দ উঠল।—মড়মড় মড়মড়! কী সব যেন ভেঙে-চুরে পড়ছে ওপর থেকে। বুঝি আকাশখানাই ভেঙে পড়বে ওদের মাথায়। সত্যিই পড়ল। ভয়ংকর শব্দ করে কী একটা বিশাল বস্তু পড়ল এসে ওদের ডিঙির উপরে যে দিকটায় ইন্দ্র বসে সেদিকেই। মুহূর্তে বিশ্ব-চরাচর ঘন ঘোর অন্ধকারে ব্যাপ্ত হয়ে গেল। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই কে যেন ছোঁ মেরে শূন্যে তুলে নিয়ে গেল রুনুকে।

যে বস্তুটা ওদের নৌকোর ওপর পড়েছে আকাশ থেকে, তা ইন্দ্রর মাথায় পড়লে এ কাহিনী আর কেউ জানতে পারত না কোনো দিন। বিশাল একটা গাছের ডাল শাখা-প্রশাখা পত্র-পল্লব সমেত পড়েছিল ওর থেকে মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরে। পাতার তলায় চাপা পড়ায় ও ছিল অক্ষত। ডালের চাপে ওদিকটা তলিয়ে যেতেই রুনুর দিকটা একবার শূন্যে লাফিয়ে উঠে পরক্ষণেই ক্ষুদ্র ডিঙিখানা হারিয়ে গেল জলের তলায়। বিশাল ডালটা পড়ে রইল খালের এপাশ-ওপাশ জুড়ে।

ডিঙিখানা ডুবে যেতেই প্রথমটা ইন্দ্রও জলে ডুবে যায়। তারপর ডালপালার আশ্রয় পেয়ে সে উঠে বসে জলের উপর পিঠ-ভাসা একটা ডালে ঘোড়ায় চড়ার ভঙ্গীতে। নিজের নিরাপত্তালাভের সঙ্গে সঙ্গে ওর মনে পড়ল রুনুর কথা। একবারও মনে পড়ল না কোথায় গেল জাল, হ্যারিকেন, লগি ও বৈঠাসমেত ডিঙিখানা, কোথায় গেল এত মেহনত করে ধরা মাছগুলি। ওসব এখন অতি তুচ্ছ জিনিস। কিন্তু রুনু? ও হলো বাড়ির সেরা ছেলে, বাবার প্রিয়তম পুত্র। ডিঙি, বৈঠা জালটালের সঙ্গে রুনুও যদি! আর ভাবতে পারে না ইন্দ্র, সারা গায়ে ওর কাঁটা দিয়ে উঠল, একটা অজানা ভয়ে। বুকের মধ্যে যেন ঢেঁকির পাড় পড়ছে। দুহাতে বুক চেপে ধরে প্রাণপণে সে ডাকতে শুরু করল রুনুকে। পাশের জঙ্গল থেকে, চারদিকের ঘুটঘুটি অন্ধকারের ভেতর থেকে কেবল একটা ভৌতিক প্রতিধ্বনিই ফিরে এল বারবার। হঠাৎ-ই খেয়াল হলো ইন্দ্ররঃ তাইতো, ঝড় নেই, বাতাস নেই, আচমকা আকাশ থেকে এত বড় একটা গাছ মড়মড় করে ভেঙে ফেলল কে? এ তো মানুষের কর্ম নয়! এ নিশ্চয়ই ভূতের কর্ম। তাইতো, আজ যে কালিপুজোর অমাবস্যার রাত, এই রাতেই তো মা কালির চেলা-চামুণ্ডারা, ভূত-প্রেত-দৈত্য-দানোরা সব পথে বেরিয়ে পড়ে! তবে কি তাদের কারো হাতে পড়ল রুনু? কী সর্বনাশ! এ কথাটা খেয়াল থাকলে আজ রাতে ও রুনুকে সঙ্গে নিত না কিছুতেই, একাই বেরুত। বিপদ-আপদ যা হতো ওরই হতো। ও মরে গেলেও বাবা-মা-র খুব কষ্ট হবে না। ও তো খারাপ ছেলে, ক্লাসে ফেল করে। কিন্তু রুনু হলো ভালো ছেলে, লেখাপড়ায় দারুণ মাথা। তাকে ঘিরে বাবা-মা-র কত সুখ-স্বপ্ন! সেই রুনুকে হারিয়ে ও বাড়ি ফিরবে কোন মুখে? কী বলবে বাবা-মাকে? শোকে-দুঃখে-অনুশোচনায় ওর বুকটা যেন ফেটে যাচ্ছে, মাথা ঘুরছে। গলা শুকিয়ে কাঠ। রুনুকে ডাকার মতো গলার জোরও নেই আর।

গাছটা ভেঙে পড়ায় উপরের খানিকটা আকাশ ফাঁকা হয়ে গেছে। সেই ফাঁক দিয়ে অসংখ্য তারার আলো এসে ইতিমধ্যে অন্ধকারটাকে খানিকটা পাতলা করে দিয়েছে। সেই অস্পষ্ট আলো-আঁধারের মধ্যে ও এদিক-ওদিক রুনুকে খুঁজছে আর সমানে কাঁদছে। কিন্তু কোথায় রুনু?

রুনুর দিকে গলুইটা যখন হঠাৎ শূন্যে উঠে গেছিল, তখন রুনুও একটা ফুটবলের মতো শূন্যে উঠে আবার ঝুপ করে পড়েছিল, জলের মধ্যে। তারপর হাতের কাছেই একটা ডাল পেয়ে সেটা আশ্রয় করে মড়ার মতো পড়েছিল। ঢের তখন জ্ঞান ছিল কি ছিল না, তা ও বলতে পারে না। শুধু এইটুকু মনে আছে যে, দাদার ডাক ও শুনতে পেয়েছিল, কান্নাও শুনেছিল। সে ডাকে সাড়া দেবার মতো শক্তি ছিল না ওর গলায়। ওর মনে হয়েছিল, ও বুঝি মরেই গেছে।

এ-ই যখন রুনুর মনের অবস্থা, তখন হঠাৎ ইন্দ্রর চোখে পড়ল, গাছের ডালপালার মধ্যে কী একটা সাদা মতো জিনিস। কাছে গিয়ে জিনিসটার ওপর হাত রাখতেই সেটা থরথর করে কেঁপে উঠেই একটা অন্তিম চিৎকার করে এলিয়ে পড়ল ইন্দ্রর প্রসারিত হাতের উপর। হাউহাউ করে কেঁদে উঠল ইন্দ্র। হায়, যদিবা একটু প্রাণ ছিল, এই চিৎকারের সঙ্গে সঙ্গে সেটুকুও গেল—ইন্দ্রর হাতের উপরই বুঝি শেষ হয়ে গেল রুনু।

প্রাণভরে খানিক কাঁদল ইন্দ্র। তারপর রুনুর দেহটাকে কাঁধে নিয়ে খাল সাঁতরে পাড়ে উঠল। ভিজে জামা-কাপড়ে দারুণ শীতে তখন ঠকঠক করে কাঁপছে ইন্দ্র। সেই অবস্থায় রুনুর নিস্পন্দ দেহ কোলে নিয়ে সংসারের যত ঠাকুর-দেবতার খবর ওর জানা আছে সবার কাছেই ভাইয়ের প্রাণভিক্ষা চেয়ে মানত করে চলেছে—ও মাকালী, রুনুরি বাঁচায়ে দাও! ও হরিঠাকুর, ভাইরি বাঁচায় দাও! ও শীতলা মা, ও শিবঠাকুর, ও মা দুগ্গা...

শেষ পর্যন্ত দেবদেবীরা ওর প্রার্থনায় বুঝি প্রসন্ন হলেন। রাত তখন কত কে জানে! হঠাৎ দূর অন্ধকারের ভিতর থেকে শোনা গেল একটা চৌকিদারী হাঁক—'জাগো, জাগো হে-এ-এ'...এ হাঁক ইন্দ্রর চেনা। চৌকিদার নগরবাসীর এ হাঁক ও শুনে আসছে জন্মাবধি। ঘুমন্ত পৃথিবীটা যেন মুহূর্তে জেগে উঠল। দূর বনান্ধকারে আকাশে প্রান্তরে চেতনার সাড়া জাগিয়ে প্রতিধ্বনি তুলল সে হাঁক। চেতনা ফিরে এল ইন্দ্রের আড়ষ্ট সত্তায়। সঙ্গে সঙ্গে ও চিৎকার করে উঠল, ও নগরবাসীকাকা-আ-আ-আ।

ইন্দ্র ডেকেই চলেছে সমানে। একসময় ওর চোখে পড়ল, একটা ছুটন্ত আলো ওর দিকে এগিয়ে আসছে। ছুটে আসছে একটা অভয় আশ্বাস একটা ভয়-ভীত প্রাণের কাছে। 'ভয় নাই, ভয় না-আ-ই!' ছুটে আসছে অভয় বাণীটা।

এক হাতে মস্ত লাঠি, আর অন্য হাতে একটি কালিপড়া লন্ঠন নিয়ে এসে দাঁড়াল একবুক সাহস একবুক ভয়ের পাশে। লণ্ঠনের আলোয় ভয়ার্ত প্রাণীটিকে চিনতে পেরে নগরবাসী বলে উঠল, কী সব্বোনাশ! বড় কত্তা ইখেনে! ওয়ে সব্বোনাশ, তোমার কোলে দেহি ছোটকত্তা! কী হইছে?

ও নগরকাকা, রণু মরে গেছে—হু-হু করে কেঁদে ফেলল ইন্দ্র।

—এহানে আইলে কী করে? এডা যে পাগলা বসিরের কবরখানা। এহানে দিনির বেলাতেও কেউ আসে না।

পাগলা বসিরের কবর! সারা গায়ে কাঁটা দিল ইন্দ্রর। বসির ভূতের অনেক গল্প জানে সারা দেশের মানুষ। সে ভূত নাকি কেবল বাচ্চাদেরই ঘাড় মটকায়। বেঁচে থাকতে পাগলা বসিরকে বাচ্চারা খুব ক্ষেপাত। ভূত হয়ে তাই এখন সে নাকি শোধ নিচ্ছে। তাহলে এসব বসির ভূতের কাণ্ড! বসির ভূতের নাম শুনেই ইন্দ্রর অবশিষ্ট চেতনাটুকু নিঃশেষ হয়ে গেল। রুনুর গায়ের ওপর ঢলে পড়ল সে।

সেই রাতে দুটি অচৈতন্য শিশুকে দুইবগলে নিয়ে নগরবাসী দৌড়ে গেছিল তার নিজের বাড়িতে। বাড়ি মানে বুনোপাড়ার মধ্যে ছোটখাট একখানা দোচালা খড়ের ঘর। মাঝে একখানা উঠোন। উঠোনের ওধারে একখানা একচালা গোয়ালঘর।

নগরবাসী বুনোপাড়ার বিখ্যাত ওঝা। ভূত-প্রেতের ভর নামাতে সাপের বিষ নামাতে সারা গাঁয়ে নগরওঝার ডাক পড়ে। ও অনেক ঝাড়ফুঁক মন্তরটন্তর জানে। ওর কোমরে সাপের গাছড়া, ভূতের গাছড়া থাকে সব সময়। ওর যে রাত-বিরেতে পথে-অপথে ঘুরে বেড়াতে হয় চৌকি দিয়ে!

ওদের মাটির দাওয়ায় একটা ময়লা চটের ওপর দুটিকে নামিয়ে রেখে নগরবাসী হাঁক-ডাক করে তার বউকে জাগাল। সে তখন তার কোলের ছেলেটিকে বুকে চেপে ধরে অঘোরে ঘুমাচ্ছিল। হাঁক শুনে বাইরে এল। সঙ্গে সঙ্গে নগরবাসীর হুকুম—আগুন জ্বাল এক্ষুনি। একমুঠো সরষে বার কর।

বাইরে এসে লন্ঠনের আলোয় চটের উপর শায়িত বস্তুদুটির দিকে চোখ পড়তেই বউ হাউমাউ করে কেঁদে পড়ল—ওরে আমার পোড়াকপাল। কী সব্বোনাশ হলো রে! এ দেহি গুরুমশার ছল দুডি। কী হইছে, কী হইছে ওগো?

আরে, থাম দেহি! চুপ মার। সরষে আন, আগুন জ্বাল তাড়াতাড়ি।

কী হইছে ওগো?

শালা বসির ভূত...জানি না পেরান আছে, না নাই। ওগো নিয়ে গিছিল তার কবরকানায়, শালা যখন আমার হাতে পড়িছে, আজ ওরই একদিন কি আমারই একদিন!

কী সব্বোনাশে কথা কও! পেরান নাই?

কথা কবি, না আগুন জ্বালবি!—ধমকে উঠল নগরবাসী। দৌড়ে ঘরে ঢুকে নিজেই নির্দিষ্ট স্থান থেকে একমুঠো সরষে নিয়ে এল একটা পাথরের বাটিতে করে। ইতিমধ্যে তার বউও কাঁদতে কাঁদতে উঠোনের এককোণে শুকনো খড়কুটো দিয়ে আগুন জ্বেলে ফেলেছে।

তারপর কখনও আগুনে সেঁকে, কখনও মন্ত্রপুত সরষে ছিটিয়ে ঝাড়-ফুঁক করে সারারাত ধরে স্বামী-স্ত্রীতে মিলে কী যে চিকিৎসা করল দুটি মৃত শিশুর প্রাণ ফিরিয়ে আনবার জন্যে, সে কাহিনী আজও কেউ জানে না।

খানিক আগুনে সেঁকতেই ইন্দ্রর জ্ঞান ফিরল। জ্ঞান হতেই ওকে কী একটা ওষুধ খাইয়ে দিল নগরবাসী। দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়ল ইন্দ্র। ওকে তখন ঘরে নিয়ে কাঁথা-কম্বলে ঢেকে রেখে এসে এবার রুনুকে নিয়ে চলল ওদের ঝাড়ফুঁক মন্ত্র-তন্ত্র।

রুনুর যখন জ্ঞান হলো, তখন ভোর হয়ে গেছে। পুব দিক ফরসা। নগরবাসীর খোড়ো ঘরের জীর্ণ বেড়ার ফাঁক দিয়ে প্রথম সোনা ঝরা আলোর পরশ পড়েছে বুনো বউয়ের কালোমুখে। প্রথম চোখ মেলতে রুনুর চোখে পড়ল সেই নবারুণ-রক্তরাগ-রঞ্জিত কালো মুখখানা। সেই মুহূর্তে ওর মনে হল, এমন সুন্দর, এমন স্নেহমাখা মুখ ও আর দেখেনি জীবনে।

কালীপুজোর আলোকিত মণ্ডপে মৃন্ময়ী মা কালীকে জীবন্ত মনে হয়েছিল রুনুর। তার পরের ঘটনাগুলি ওর স্মৃতি থেকে মুছে গেছে। চোখমেলার মুহূর্তে আবার যেন দেখল জীবন্ত মা কালীকে অন্য এক পরিবেশে। ছোট ঘড়ের ঘর। মাটির মেঝেতে বসে আছেন মা কালী ময়লা কাঁথা জড়ানো রুনুরকে কোলে নিয়ে। তার দুচোখ থেকে যেন স্নেহধারা ঝরে পড়ছে রুনুর সর্বাঙ্গে। চোখ মেলতে রুনুর ঠোঁটদুটি একটু নড়ে উঠেছিল। মা-কালী ওর মুখের কাছে দুধের বাটি এগিয়ে দিয়ে বলেছেন ভয় নাই বাবা। এই তো ভালো হয়ে গিছিস। খা খা, দুধ খা। গলা শুকোয়ে গেছে তো!

দুধ খেয়ে পরিতৃপ্ত রুনু আবার চোখ মেলল। এবার দেখল মা কালীর স্নেহভরা গভীর কালো চোখে বরাভয়-আশ্বাস। তার কালো ঠোঁটে মধুর হাসি। দুহাতে মাকালীর গলাটি জড়িয়ে ধরে রুনু বলল, তুমি মা-কালী?

অসহ্য উল্লাসে ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে পাগলের মতো ঘরময় নাচতে শুরু করল বুনো বউ।

তার উল্লাস-চিৎকার ঘরে ঢুকল নগরবাসী। ঢুকল বুনোপাড়ার আরো অনেকে। ঘুম ভেঙে গেল ইন্দ্ররও।

দুটিকে দুইবগলে নিয়ে নগরবাসী এবার ছুটল শ্রীনাথ পণ্ডিতের বাড়ির দিকে। এবার বুক ফুলিয়ে সে তার বিজয়কাহিনী বলতে পারবে গুরুমাকে। পণ্ডিত যে বাড়ি নেই, সে তো নগরবাসী জানেই। ছেলেদুটিকে হারিয়ে রাতটা যে কীভাবে কেটেছে গুরুমার কে জানে। অথচ ওদের না বাঁচিয়ে তোলা পর্যন্ত গুরুমাকে কোনো খবরই সে দিতে ভরসা পায়নি।

ইন্দ্রর কাছ থেকে পরে একসময় ওদের সেই রাতের শিকার-অভিযানের কথা শুনছিল নগরবাসী। ডিঙি, জাল, হ্যারিকেন ইত্যাদি সে রাতে নাকি চুরি করে নিয়েছিল এক বদমাস চোর। এমনি একটা কাহিনী প্রচার করে দিয়ে সুদক্ষ চৌকিদার নগরবাসী সেসব চোরাই মালও উদ্ধার করে দিয়েছিল পণ্ডিতমশাই ফিরে আসবার আগেই।

গ্রামবাসীরা বারবার জিজ্ঞাসা করেও চোরের নামটা জানতে পারেনি নগরবাসীর কাছে। ও বলেছিল, সে রেপোট দেব আমি থানার বড়বাবুরি, তোগে কাছে নাম বললি বিপদ হবে।

পরবর্তীকালে ইন্দ্র একদিন বলেছিল রুনুকে, জানিস রুনু সেদিন নগরকাকারে আমার পেণাম করতি ইচ্ছে হচ্ছিল। লজ্জায় পারিনি। খালি কি বসির ভূতের হাতেত্থে বাঁচাইছিল আমাগে? বাঁচাইছিল বাবার হাতেত্থেও। বাবা জানলি আর রক্ষে ছিল না!

আর নগরকাকার বউ? সে তো সত্যি মা কালী! তারে পেণাম করা উচিত ছিল না আমার? —সখেদে বলে রুনু, আমিও পারিনি লজ্জায়।

কিশোর ভারতী। জানুয়ারি ১৯৭৮

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%