ঘরে ঘরে রুনু

শ্যামদাস দে

এক

মধুমতীর সাবেক শয্যাটার নাম ছোটগাং। ছোটগাঙের পুব পাড় বরাবর ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের কাঁচা রাস্তা। এই রাস্তা গোপালগঞ্জ থেকে চলে গেছে গিরিশনগর পর্যন্ত। রুনুদের গোবরা গ্রাম থেকে গোপালগঞ্জ চার মাইল উত্তরে, গিরিশনগর দু-মাইল দক্ষিণে। গিরিশনগর স্টেশন হয়েই এদেশের মানুষ বরিশাল মেল স্টিমারে খুলনা-বরিশাল যাতায়াত করে।

সাবেক মধুমতী পশ্চিমে বিশাল চর ফেলে সরে গিয়েছিল পশ্চিমদিকে। সে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগের কথা। নতুন চরের উপর গড়ে উঠেছিল নতুন বসতি। উত্তরে কায়েতপাড়া থেকে শুরু করে ক্রমে দক্ষিণে কাপালিপাড়া, বুনোপাড়া এবং আরও দক্ষিণে একেবারে গিরিশনগরের কাছে মুসলমানপাড়া।

মধুমতী আবার পাশ ফিরেছে এত কাল পরে। ফিরে আসতে চাইছে তার সাবেক শয্যায়। কায়েতপাড়াটা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, কাপালিপাড়াও প্রায় গেছে। বুনোপাড়াটা এখনও খানিকটা আছে।

এপার ভাঙছে তো চর পড়ছে ওপারে। নতুন বসতি শুরু হয়েছে এখন ওপারে। কাপালিরা সব চলে গেছে ওপারে, গেছে বুনোরাও কয়েক ঘর। রাস্তার পূর্বদিকে হাউজের জঙ্গলের মধ্যেও আছে একটা বুনোপাড়া। কিছু কিছু বুনো নতুন ঘর করেছে এসে হাউজের জঙ্গলে।

কায়েতপাড়ার কেবল শ্রীনাথ পণ্ডিত ছাড়া আর সকলে চলে গেছে ভিন গাঁয়ে, যেখানে তাদের আত্মীয়-স্বজন আছে। শ্রীনাথ পণ্ডিতকে যে যেতে দেবে না এদেশের মানুষই! বস্তুত তারাই তদবির করে ওঁর নতুন বাড়ির জন্যে বিঘে খানেক জায়গা কাছারির নায়েকবাবুকে বলে প্রায় বিনামূল্যেই জোগাড় করে দিয়েছে। আগের বাড়িটা অবশ্য পুকুর, বাগান, তরিতরকারির খেত সমেত প্রায় পাঁচ বিঘে জুড়ে ছিল। তেমন সাজানো বাড়ি কি আর এ জীবনে করতে পারবেন? পঞ্চাশ বছর ধরে অনেক যত্নে অনেক শ্রমে অনেক সাধ্য-সাধনায় গড়ে তোলা সেই বাড়ি আজ মধুমতীর খরস্রোতে ভেসে সেই কোন দূর দক্ষিণে সমুদ্রের অতল গভীরে হারিয়ে গেছে!

পরিত্যক্ত পোড়ো ভিটেটার উপর দাঁড়িয়ে বিষণ্ণ মনে চেয়ে আছে রুনু মধুমতীর দিকে। এ মধুমতীর চেহারাই আলাদা। এ মধুমতী নয় ওদের শৈশবের সেই খেলার সাথি। কোথায় হারিয়ে গেল সেই স্নিগ্ধ নরম বালুচর, ঝাউবন, বোরোর খেত? সেই খরলা মাছের দৌড়ের পাল্লা? এর হিংস্র ভয়াল মূর্তি দেখলে বুক কাঁপে। তীরের কাছে যাবার সাহস হয় না। কি জানি, কখন পায়ের তলা থেকে বিরাপ এক চাংড়া মাটি খসে পড়বে গাছপালা সমেত!

ওদের পুরোনো বাড়ির দুটো প্রায় নিষ্পত্র নারকেল গাছ এখনও দাঁড়িয়ে আছে মাথা উঁচু করে। আকাশের দেবতাকে বুঝি ধিক্কার দিচ্ছে ওরা। এখনও ওদের মাথায় আছে দু-চারটে কচি ডাব। যেদিন মধুমতী ওদের গ্রাস করবে, সেদিন হয়তো ওই ফল দিয়েই ওরা রাক্ষসীকে শেষ পুজো দেবে।

ওদের বাড়ির পুব দিকটায় ছিল বাবলা গাছের বেড়া। পঞ্চাশ বছর ধরে বাড়তে-বাড়তে তারা প্রত্যেকে এক-একটা মহীরুহে পরিণত হয়েছে। তার মধ্যেই কয়েকটা কাঁটাল গাছও ছিল। বাবলা গাছগুলি কাটা হয়ে গেছে। গুঁড়িগুলি পড়ে আছে। ছড়িয়ে আছে ডাল-পালাও। এসব দিয়ে এখন জ্বালানি হবে। কাটা পড়বে কাঁটাল গাছেরাও। দাঁড়িয়ে থাকবে কেবল ওই দুটো নারকেল গাছ শূন্যদৃষ্টিতে অতল সমাধি লাভের প্রতীক্ষায়। নারকেল গাছ যে কাটতে নেই।

নদীর দিকে তাকিয়ে-তাকিয়ে রুনু ওদের আমবাগান, পুকুর, বেগুনখেত, রান্নাঘর, পড়ার ঘর, গোয়ালঘর ইত্যাদির অবস্থান অনুমান করে একটা করে ঢিল ছুড়ছিল। ঢিলটা যথাস্থানে পড়লেই মনে-মনে বলছিল, 'ওইখানে ছিল রান্নাঘর'..., 'ওইখানে পড়ার ঘর...'

একমাত্র বড়ঘরের ভিটেরই কিয়দংশ এখনও ভাঙেনি। কত যে অপ্রয়োজনীয় জিনিস ছড়িয়ে আছে এদিকে ওদিকে! ভাঙা হাঁড়ি, ছেঁড়া কাগজ, খেলার তির-ধনুক, দাদার দোকানের পরিত্যক্ত ভাঙা টিনের কৌটো, আরও কত কি! ওর নিজের কোনো জিনিস আছে কিনা খুঁজছিল রুনু। পাওয়া গেল। ওঁর অতি প্রিয় একটা শিমূল কাঁটার সিলমোহর। শিমূল কাঁটার তলার দিকটা পাটার ওপর ঘষে ঘষে সমতল করে তার ওপর অক্ষরগুলি লিখতে হয় উল্টো করে। চাকুর কাজে দাদার পাকা হাত। রুনু সুন্দর করে লিখেছিল ওর নামটা ইংরাজি অক্ষরে। ছাপাটা কেটে কেটে তৈরি করে দিয়েছিল দাদা। ঠিক একটা ডিমের মতো শেপ করে চারিদিকে আবার রুপোর টাকা দেখে দেখে লতাও করে দিয়েছিল দাদা। একটা চমৎকার শিল্পকর্ম! বাজুনিয়া গিয়ে কতবার যে মনে পড়েছে ওর ছাপাটার কথা। কোথায় রেখেছিল কিছুতেই মনে করতে পারেনি। সেই জিনিস এমন মাটিমাখা হয়ে পড়ে আছে!

লুফে নিল ছাপাটা রুনু। কাপড় দিয়ে মুছে-টুছে দেখল, একটুও নষ্ট হয়নি। সযত্নে রেখে দিল পকেটে।

হঠাৎ নজরে পড়ল ছোট্ট একটা পুঁটুলি। বেশ যত্ন করে সুতো দিয়ে জড়িয়ে বাঁধা। নিশ্চয় হীরেমানিকের মতো মূল্যবান কিছু। নাহলে এত যত্ন করে কেউ বাঁধে? দারুণ কৌতূহলী হয়ে তুলে নিল পুঁটুলিটা। কাঁপা হাতে বাঁধন খুলল। একটার পর একটা ন্যাকড়া খুলছে আর ভাবছে, কী জানি কী আছে এর মধ্যে। শেষ পর্যন্ত বের হল শত ভাঁজে ভাঁজ করা এককানা কাগজ। ভাঁজে ভাঁজে দাগ হয়ে গেছে। সাবধানে ভাঁজ খুলে কাগজখানা চোখের সামনে মেলে ধরতেই চমকে উঠল রুনু। অচেনা হাতের লেখা একখানা চিঠি। চিঠিটা আরম্ভ হয়েছে, 'স্নেহের সুমি' দিয়ে। আরে, এ যে সেজদির নাম! শেষ হয়েছে, 'ইতি—তোমার পঞ্চানন'। সারা গায়ে শিউরে উঠল রুনু। এই তাহলে সেই জিনিস যা সেজদি কিছুতেই ওকে দেখাতে চায়নি সেবার। পাঁচু মহুরির চিঠি। হায়, সেই পাঁচু মুহুরি চিরকালের মতো হারিয়ে গেছে এ-দেশ থেকে! ভেঙে গেছে একটা সুন্দর ভালোবাসা। এইটুকু বুঝি ছিল সেই ভালোবাসার শেষ স্মৃতি। আজ কপালে সিঁদুর পরা সেজদির কাছে এর কোনও দাম নেই। দাম নেই সংসারে কারও কাছেই। চিঠিখানা বার কয়েক পড়ে মধুমতীর স্রোতে ভাসিয়ে দিল রুনু। সেই সাথে ভাসিয়ে দিল দু-ফোঁটা চোখের জলও।

দুই

অনেক খেটেখুটে নতুন বাড়িতে এদের গৃহপ্রবেশ করিয়ে দিয়ে সেজদিকে নিয়ে চলে গেছে তার বর। সেই বুড়োমানুষটার ব্যবহার নাকি খুব ভালো। মা তাকে স্বীকার করে নিয়েছিলেন, ইন্দ্রর সঙ্গে তো নাকি খুব ভাবই হয়ে গেছে তার। আর সেজদি? সেজদি কি পাঁচু মুহুরির আশা ছেড়ে দিয়ে এখন সেই বুড়োকেই ভালোবেসেছে? এ প্রশ্নের জবাব কে দেবে? সেজদিই তো বাড়ি নেই। সেজদি না থাকায় বাড়িটা বড় খালি-খালি মনে হচ্ছে রুনুর। একটা মনগুমরোনো দুঃখ। বিশেষ করে সেই চিঠিটা পড়বার পর থেকে সেজদির সঙ্গে যেন অনেক কথা ওর বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল। অথচ ও চিঠির কথা দাদাকেও বলা যাবে না। মা-বাবাকে তো নয়ই।

আগের বাড়ির সঙ্গে নতুন বাড়ির কোনও মিল নেই। কেবল উত্তরের পোতার ঘরখানাই আছে উত্তরের পোতায়। আর সব ওলোট-পালট হয়ে গেছে। উঠোনটা অনেক ছোট। এ-বাড়িতেও বামন রাজার জন্যে একটা ছোটখাট ডোবা করা হয়েছে। ডোবার চার পাড়ে কলাগাছ, ঢ্যাঁড়স গাছ, কিছু লঙ্কা-বেগুনের চারা-টারা লাগিয়েছেন মা। বড় গাছের চারা-টারা একটাও লাগানো হয়নি। বাবার আর ওদিকে কোনও উৎসাহ নেই। বাড়ি ভাঙার পর থেকেই বাবা যেন কেমন নিরুদ্যম মনমরা হয়ে গেছেন। মন ভেঙে গেছে মায়েরও। কেবল দারুণ উৎসাহে নতুন করে দোকান সাজিয়েছে দাদা।

দোকানঘরের পরিবর্তিত চেহারাটা এক নজরেই চোখে পড়ে। রাস্তার ওপর দোকান। দোকানের সামনে খড়ের চালার নীচে বাঁশের মাচা করে বেঞ্চ তৈরি হয়েছে। বারান্দার দুই প্রান্তে রাস্তার গায়ে দুটো বটের চারা লাগিয়ে শক্ত বেড়া দিয়ে ঘিরে দিয়েছে দাদা। কয়েক বছরের মধ্যেই ওরা বড়সড় হয়ে উঠবে। সমস্ত জায়গাটা ঢেকে দেবে স্নিগ্ধ ছায়ায়। তখন পথ চলতি মানুষ দু-দণ্ড গাছতলায় বসে বিশ্রাম করবে। এখনও কেউ কেউ বেঞ্চে বসে দাদার সঙ্গে গল্প করে যায়। সেই সুবাদে কিছু কেনাকাটাও করে। মানুষ যত আসবে, দোকানের শ্রীবৃদ্ধিও হবে। দাদা এসব হিসেব করেই দোকান সাজিয়েছে এবার।

এবার আর খালি কৌটো নেই কোনো তাকে। মাটির মালসার জায়গায় এসেছে ঢাকাওয়ালা বড় বড় কেরোসিনের টিন। সেগুলির আবার একদিকে কাচ লাগানো। এখন আর লেবেল লাগাতে হবে না। কাচের ভিতর দিয়েই দেখা যাচ্ছে কোনটায় কী আছে। প্রায় একটা শহুরে দোকানের মতোই সাজিয়ে ফেলেছে সব। প্রথমদিকের সেই কাঠের ডাণ্ডার সস্তা পালা-পাথর আর নেই। এখন লোহার শিকল পরানো লোহার পালা ওপর থেকে কায়দা করে ঝোলানো। হাতেও ধরতে হবে না। কোন মাল কসের কছটাক চাই বলো না, সঙ্গে সঙ্গে ওজন হয়ে যাবে ঝোলানো তুলাদণ্ডে। একেবারে বড় দোকানের ব্যাপার।

পরিবর্তন হয়েছে দাদারও। বেশ ভার-ভারিক্কি ভাব। দাদার পোশাকও খাঁটি দোকানদারি ফতুয়া। সেই সছিদ্র কাঠের চৌকির জায়গায় এখন দেখা যাচ্ছে নতুন কেনা কাঠের ক্যাশবাক্স। বাক্সের এক পাশে সযত্নে সাদা সুতোয় জড়ানো লাল খেরোয় বাঁধানো দোকানদারি খাতা। এক আনা দামের এক্সারসাইজ বুকে এখন আর হিসেব লেখে না দাদা। দাদা এখন পাকা দোকানদার হয়ে গেছে। বাবা দশ টাকা দিয়ে বলেছিলেন, এক বছরের মধ্যে দশ টাকাকে একশো টাকা করতে হবে। দেখে তো মনে হয় দাদা একশো টাকারও অনেক বেশি করে ফেলেছে।

গম্ভীরভাবে ব্যবসা-কর্মেরত দাদাকে দেখে রুনুর মনে হল, দাদা যেন বড় তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যাচ্ছে। এই এক বছরে ও কতটুকু বড় হয়েছে ঠিক বুঝতে পারে না। কিন্তু দাদা ইতিমধ্যে একটা আস্ত মানুষ হয়ে গেছে। নাকের নীচে গোঁফের রেখা বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ক্রেতাদের সঙ্গে কেমন গম্ভীরভাবে কথা বলছে। কখনও হেসে, কখনও হাত-মুখ নেড়ে কত জ্ঞানের কথা বলছে। সংসারের সব কিছু যেন দাদার জানাশোনা হয়ে গেছে। অথচ রুনু জানে না কিছুই। ও কেবল বই পড়েছে, আর পরীক্ষায় ফার্স্ট হয়েছে।

মনে-মনে হিসেব করে রুনু। আমি এবার ক্লাস সেভেনে উঠলাম। আমার বয়স হল তেরো। দাদার তাহলে সতেরো। সতেরো বছর বয়সে কি আমিও দাদার মতো একটা আস্ত মানুষ হয়ে যাব? হয়তো হব। তার আগেই তো আমি ম্যাট্রিক পাশ করে যাব। ম্যাট্রিক পাশ করলে আর ছেলেমানুষ থাকব না নিশ্চয়।

—দোকানটা তো সুন্দর সাজাইছ দাদা। ঠিক গোপালগঞ্জের দোকানের মতো।

—দূর! এখনও অনেক কিছু করতি হবে। টিনের বেড়া, টিনের ঝাপ দিতি হবে। রাস্তার উপরে দোকান। এই মুলি বাঁশের বেড়ায় চলবে না। হিসেব করে দেহিছি, চার বান্ডিল টিন লাগবে।

—সে তো অনেক টাকা!

বেশি না। শ-খানেক টাকা। মাস তিনিকির মধ্যি হয়ে যাবে।—ভারিক্কি চালে বলে ইন্দ্র।

—তিন মাসেই একশো টাকা লাভ হবে!

—তা তো হবেই। বেশিও হতি পারে। এখন কেনাকাটাডা ভালোই হচ্ছে।

—বাবা যে বলিছিল এক বছরের মধ্যে একশো টাকা...

—দূর, সে তো ছয় মাসের মধ্যিই করে ফেলিছিলাম। তারপর আস্তে আস্তে বাড়াইছি। এখন দোকানের কত টাকার মাল আছে বল তো?

—আমি বুঝি না। একশো, দুশো টাকার হবে নিশ্চয়।

পাঁচশো টাকার কম না।—সগর্বে বলে দাদা।

এই দাদার প্রতি একটা গভীর শ্রদ্ধায় বুকটা দুলে ওঠে রুনুর। দাদা তার কথা রক্ষা করেছে। আর এইটুকু করতে কত বড় বড় বোঝা যে তাকে প্রতি সোমবার গোপালগঞ্জ থেকে মাথায় করে বয়ে আনতে হয়েছে, কে জানে! আশ্চর্য এই একটা বছরে অন্তত পঞ্চাশবার গোপালগঞ্জ গেছে দাদা, কিন্তু একবারও দেখা করেনি রুনুর সঙ্গে। দাদা কি রুনুকে আর ভালোবাসে না?

অভিমানী গলায় প্রশ্ন করে, রুনু—হরেকেষ্টর কাছে শুনিছি দোকানের মাল কিনতি তুমি প্রতি সোমবার গোপালগঞ্জ গেছ। অথচ আমার সঙ্গে একবারও...তুমি আমারে আর একটুও ভালোবাস না।

—দূর বোকাডা! আমি তো ইচ্ছে করেই তোরে দ্যাখা দেইনি। কিন্তু তোরে আমি দেখিছি কত বার ডাক্তারের বাড়ি, ইস্কুলির পথে। তোরে দেখলিই আমি লুকোয়ে পড়িছি।

—কেন?

—তুই হলি একজন পণ্ডিতের ছেলে, কেলাশের ফাস্টো বয়। কত এসডিও, উকিল, মোক্তার, অফিসারের ছেলের সঙ্গে তোর ভাব। তাদের সঙ্গে মিশবি তুই। এট্টা হতভাগা দোকানদারের সঙ্গে তুই মিশবি ক্যান? আর গোপালগঞ্জের রাস্তায় আমি তো চলি-ফিরি এট্টা মুটের মতো। মাথায় থাকে দেড়মনী বস্তা। হাঁটুর উপর কাপড় তোলা। ওই মূর্তিতে তোর সাথে মিশতি পারি? তোর লজ্জা করবে না?

দাদার কথায় খুশি হতে পারে না রুনু। তবু দাদার প্রতি শ্রদ্ধা ওর আরও বেড়ে যায়।

সেজদির বিয়ের কথা উঠতেই দাদা বলে,—যা একখান বিয়ে হল, তুই না দেখিছিস, ভালোই করিছিস। সুমির কান্না, মায়ের কান্না দেখে আমিও কাঁদিছি। সব আমার দোষে হল রে। আমার ভারি দুঃখু হয়।

—কিন্তু হরেকেষ্ট যে বলে সেজদির বরের সঙ্গে তোমার খুব ভাব?

—বুড়ো হলি কী হয়, মানুষটা কিন্তু বড় ভালো রে। তুই দেখলি তুইও ভাব না করে পারতি না। মা-বাবারে দারুণ ভক্তি করে। দারুণ ভালোবাসে সুমিরেও। আর কী খাটতি পারে! নগরবাসীরে পর্যন্ত হার মানায়ে দেয়। সুমির বোধহয় দুঃখু থাকবে না।

সেজদির যেন সত্যিই কোনও দুঃখ থাকে না, মনে-মনে কামনা করে রুনু। একটা দুঃখের স্মৃতিচিহ্ন তো ও আজ মধুমতীর স্রোতে ভাসিয়ে দিয়ে এসেছে। সে কথা ও বলবে না দাদাকে।

মাত্র সপ্তাহ খানেক বাড়িতে ছিল রুনু। প্রতিদিন মা ওকে প্রাণ ভরে ওর সব প্রিয় জিনিস একে একে খাইয়েছেন। মায়ের কাছে কথা দিয়েছে, প্রতি রবিবার ও বাড়ি আসবে। আশ্চর্য, মায়ের এই প্রস্তাব সমর্থন করেছেন বাবাও। এবার বাবা যেন সত্যিই বাবা হয়ে গেছেন, তিনি আর এখন শ্রীনাথ পণ্ডিত নন।

একদিন বাবা ওর পিঠে হাত রেখে বলেছিলেন,—এবার তোর আর আমার বিদ্যা সমান হয়ে গেল। বাংলা ছাত্রবৃত্তি পাশ আমি। অর্থাৎ ক্লাস সিক্স-এর বিদ্যা। তুইও পাশ করলি ক্লাস সিক্স। এখন থেকে আমারে ছাড়ায়ে অনেক উপরে উঠতি হবে বাবা।

আপনাকে ছাড়াতে পারব না আমি এ জীবনে। ওরে বাবা, বাংলা, অঙ্ক, ইতিহাস, ভূগোল, দুনিয়ার সব জ্ঞান আপনার যে মুখস্থ!—বন্ধুর মতো হেসে বলে রুনু।

জ্ঞান অনন্ত। তার কি কূল-কিনারা আছে রে বাবা? নিউটনের মতো বিশ্ববিখ্যাত পণ্ডিত, তিনি বলিছেন, জ্ঞান-সমুদ্রের তীরে দাঁড়ায়ে তিনি কেবল খান কয়েক নুড়ি কুড়োইছেন। আমি তো এক কণা বালিও কুড়োতি পারি নাই। তোমারে কুড়োতি হবে দু-হাত ভরে! শ্রীনাথ পণ্ডিতের অপূর্ণ সাধ পূর্ণ করতি হবে তোমাকে। এখন থেকেই মনে মনে শপথ করো। আমি আর কয়দিন আছি! সাতাত্তর বছর বয়স হল। মৃত্যুর পরে তোমার মধ্যেই আমি বেঁচে থাকব।—অদ্ভুত আবেগভরে বলেন শ্রীনাথ পণ্ডিত।

শুনতে-শুনতে রুনুর চোখে জল এসে যায়। এই বাবাকে সে এতদিন কি নিষ্ঠুরই ভেবেছে! 'আমাকে তুমি ক্ষমা করো, ক্ষমা করো বাবা' কথাগুলি বুকের মধ্যে গুরগুর করল, কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারল না।

বাবার মুখেই শুনেছে রুনু, 'প্রাপ্তেতু ষোড়শে বর্ষে পুত্র মিত্রবদাচরেৎ'। পুত্রের ষোলো বছর বয়স হলেই পিতা তার সঙ্গে মিত্রবৎ আচরণ করবেন। বাবা কি তার আগেই রুনুর সঙ্গে মিত্রবৎ আচরণ করতে শুরু করলেন? ওর তো বয়স কেবল তেরো। বরং এ আচরণ আশা করতে পারে দাদা। দাদার বয়স এখন সতেরো।

দাদা অবশ্য এবার স্বীকার করেছে যে, বাবা নাকি নতুন বাড়িতে এসে একেবারে আলাদা মানুষ হয়ে গেছেন। দোকান সাজাবার ব্যাপারে সব রকম সাহায্য করেছেন, পরামর্শ দিয়েছেন। আর বলেছেন দোকানের আয় থেকে মাতৃপ্রণামী হিসেবে প্রতি বছর মাকে ভালো শাড়ি দিতে। এবার পুজো থেকেই শুরু করেছে দাদাও সানন্দে। চমৎকার একখানা শাড়ি দিয়েছে মাকে।

তিন

রুনুর তিন ছাত্রীঃ কমলা, প্রমীলা, পুষ্প।

পুষ্প অবশ্য ওর ছাত্রী না বন্ধু, না গার্জেন, বলা মুশকিল। ওর কথা থাক।

কমলা এবার উঠল ক্লাস ফাইভে, প্রমীলা উঠল ফোরে।

রুনু নিজেই কেবল ক্লাসে প্রথম হয়নি, ওর ছাত্রী প্রমীলাও এবার প্রথম হয়েছে। গতবার হয়েছিল থার্ড। আর কমলা? অঙ্কেও পাশ করেছে, যা এ পর্যন্ত ও কোনওদিন করেনি। ও যে সব বিষয়ে পাশ করেছে তাতেই ও খুশি। খুশি হয়েছেন ছোটমাসিও। কিন্তু খুশি হতে পারেনি রুনু।

এবার কিন্তু আরও ভালো করে পড়তি হবে কমু। পমীর মতো ফার্স্ট হওয়া চাই।—মাস্টারি চাল বলে রুনু।

পমী তো ফাস্টো হবেই। —মুখিয়ে ওঠে কমলাঃ তুমি যে ওরে বেশি ভালোবাসো, বেশি করে পড়াও।

ভেবে দেখল রুনু, কমুর অভিযোগটা মিথ্যা নয়। ভালো ছাত্রের প্রতি শিক্ষকের পক্ষপাতিত্ব একটু থাকেই। প্রমীলা সত্যিই কমলার তুলনায় অনেক ভালো ছাত্রী। ওর স্মরণশক্তি ভালো। বোঝেও সহজে। অঙ্কের নামে কমলার জ্বর আসে প্রমীলা অঙ্ককে একটুও ভয় করে না।

রুনু ভারিক্কি সুরে বলে—আচ্ছা, এবার তোমারে বেশি করে পড়াব, বেশি ভালোবাসব। তাহলি ফার্স্ট হবা তো?

ইশ, আমার বয়ে গেছে ফাস্টো হতি! অত পড়তি গেলি আমার কাজগুলন করে দেবে কেডা? পমী তো জন্মের আল্লাদি! কমলার দ্বিতীয় অভিযোগ।

এ অভিযোগও মিথ্যা নয়। মাত্র ১০/১১ বছরের মেয়ে কমলা, কিন্তু বাড়ির বড় মেয়ে বলে ওর উপর অনেক কাজের ভার এসে গেছে আস্তে আস্তে। ঘরদোর গুছোনো, দুবেলা লক্ষ্মীর আসনে ফুল-জল দেওয়া, প্রতি বৃহস্পতিবারে লক্ষ্মীর পাঁচালি পড়া এবং দুবেলা রান্নার সময় ছোট বোনকে রাখা, মাঝে মাঝে রান্নার কাজেও হাত লাগানো—এমনই অনেক কাজ কমলার। সকালে তো প্রায় দিনই ওর পড়া হয় না।

কিন্তু পড়লেও কি প্রমীলার মতো ফার্স্ট হতে পারত কমলা? ওর যেন বুদ্ধিটাই কম।

আর একটা কথাও মনে হয় রুনুর। কমলার চেয়ে প্রমীলা অনেক ফর্সা। প্রমীলার চোখমুখ অনেক বুদ্ধিদীপ্ত। বস্তুত চার বোনের মধ্যে কমলার গায়ের রং-ই বেশি ময়লা। তাই কি রুনু একটু উপেক্ষার চোখে দ্যাখে কমলাকে? প্রমীলা চঞ্চল, কমলা শান্ত স্বল্পবাক। সারাদিনে প্রমীলার বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ ওর শুনতে হয়, সে তুলনায় কমলার বিরুদ্ধে অভিযোগ কম। অথচ মায়ের কাছে এবং রুনুর কাছেও কমলাই ধমক খায় বেশি। আর অপরাধ করেও বেকসুর খালাস পেয়ে যায় প্রমীলা প্রায়ই, কেবল ওর মন-ভুলোনো কথা দিয়ে আর হাসি দিয়ে। এক-একবার রুনুর অনুতাপও হয়েছে কমলার প্রতি ওর কোনও-কোনও ব্যবহার স্মরণ করে। কমলা কি তাহলে সত্যি কথাই বলল? ও প্রমীলাকেই বেশি ভালোবাসে? কমলার অভিযোগটা রুনুর মনের একটি কোমল স্থানকে স্পর্শ করল। কমলা সম্বন্ধে যেন নতুন করে সচেতন হল রুনু আজ এক বছর বাদে।

নতুন বই অনেক কেনা হয়ে গেছে, কিন্তু পড়াশুনো ঠিকমতো শুরু হয়নি। শেষ পিরিয়ড পর্যন্ত থাকতেও হয় না সবদিন। প্রায়ই দেড়টা-দুটোয় ছুটি হয়ে যায়।

এমনি একদিন দুটোর সময় বাসায় ফিরে দিবানিদ্রার আয়োজন করছিল রুনু। এমন সময় পোস্ট অফিসের পিয়ন মোহনদা ওর দরজায় এসে টোকা দিল। বাসার পাশেই তো পোস্ট অফিস। সুবিমলের বাবা পোস্টমাস্টার। পোস্ট অফিসে কত বার গেছে রুনু সুবিমলের সঙ্গে! কেবল মোহনদাকে নয়, পোস্ট অফিসের সকলকেই চেনে রুনু। রুনুকেও চেনেন তাঁরা সকলে।

দরজা খুলতেই মোহনদা প্রশ্ন করে—তোমার ভালো নাম কি রণজিৎ?

—হ্যাঁ।

—আমিও তাই ভাবিছিলাম। এই নেও তোমার চিঠি। বোধহয় তোমাগো বাড়ির কেউ লিখিছে।

খামখানা হাতে করে আকাশ-পাতাল ভাবছে রুনু। পোস্ট অফিসের সিল-মারা একখানা খাম যে ওর নামেও আসতে পারে এ কল্পনাই ছিল না ওর। ও তো ছেলে মানুষ, ওকে আবার কে চিঠি লিখবে? খামের উপরের হাতের লেখাটা চেনা নয়। বাবারও নয়, দাদার নয়। তারা কেন ওর নামে ডাকে চিঠি পাঠাবে? কোনও খবর থাকলে তো হরেকেষ্টকে দিয়েই দিতে পারে। ওর ধারণা, ডাকে চিঠি আসে কেবল বড়দের নামে, যেমন ডাক্তারবাবুর নামে প্রায়ই চিঠি আসে।

দরজা বন্ধ করে দারুণ কৌতূহল নিয়ে অত্যন্ত সাবধানে খামখানা খুলল রুনু।

সম্বোধন দেখেই পিত্তি জ্বলে গেল—'শ্রীমান পুঁচকে', পত্রলেখককেও চিনল রুনু। চিঠিখানা পড়ে কিন্তু ওর বড় ভালো লাগল দিলীপদাকে। একই খামের মধ্যে মাকেও লিখেছে আলাদা চিঠি। সে মাত্র দু-লাইন। 'শ্রীচরণেষু মা, আমি ভালো আছি। আমার জন্য ভাবিও না। আমার প্রণাম গ্রহণ করো। ইতি দিলু।'

রুনুকে লেখা চিঠিখানা বেশ বড়। এক্সারসাইজ বুকের পুরো চার পৃষ্ঠা। তাতেও কুলোয়নি। আবার অ্যারো করে মার্জিনেও লিখেছে ঘন-ঘন করে অনেক কথা।

অনেক বড় বড় কথা, অনেক গুরুজন-সুলভ উপদেশ-পূর্ণ চিঠিখানা বারবার পড়ল রুনু। কিছু ব্যাকরণের ভুল, কিছু বানান ভুল-টুল অবশ্য চোখে পড়ল, কিন্তু চিঠির ভিতর দিয়ে যে দিলীপদার ছবিটা ওর মনে ভেসে উঠল তাকে ও মনে-মনে গভীর শ্রদ্ধা না করে পারল না। লিখেছে—'তুমি ভালো ছেলে হইও। আমার মতন গোল্লাই যাইও না। তুমি প্রেত্যেক ক্লাসে ফাস্ট হইয়া ম্যাট্রিক পাশ করিতে হইবে।' নিজের কথাও লিখেছে—'আমি এবারও ক্লাস এইটেই থাকিলাম। নতুন স্কুলের নতুন বই, আমার দ্বারা তিন মাসে পাশ হইবে না। আমি এখানে আসিয়াই পূর্ণদার জিমনাসিয়ামে ভরতি হইয়াছি। খুব নাম করিয়াছি। পূর্ণদা আমাকে অতিশায় সেনেহ করেন। ম্যাট্রিক পাশ করিয়া আমি পূর্ণদার স্বদেশী দলে ভরতি হইব। তখন বন্ধুক, রিবলবার ইত্যাদি শিখাইবে। এখন লাঠিখেলা, জুজুৎসু এইসব শিখিতেছি।'

পূর্ণদার প্রতিষ্ঠান সম্বন্ধে অনেক প্রশংসা করে সবশেষে লিখেছে—'যতদিন ওখানে থাকিবা আমার মাকে দেখিও। তুমি ছাড়া আমার মাকে দেখিবার আর সকলে তো শত্রু। (এখানেও কিছু কথা বাদ পড়ে গেছে)। তুমি আমার সেনেহ ভালোবাসা গ্রোহণ করিবা। মাকে এসব কথা বলিবা না। মা কাঁদিবে। এই চিঠি পড়িয়াই ছিঁড়িবা।'

বড়মাসির কাছে পূর্ণদাসের নামটাই কেবল শুনেছিল রুনু। সে নাকি খুব বিখ্যাত লোক। দিলীপদার বর্ণনা থেকে বুঝতে পারছে না তিনি একজন স্বদেশী ডাকাতদলের নেতা কিনা। 'স্বদেশী ডাকাত' কথাটা তখন অনেকের মুখেই শুনত রুনু। সন্ত্রাসবাদ, সশস্র বিপ্লব আরও কি সব ভয়-ভয় কথা শুনছে রুনু বাজুনীয়ায় নরেনদাদের গোপন বৈঠকে। সেখানেও শুনেছে বন্দুক রিভলভার ছোড়াছুড়ির কথা। তখন কিছুই বোঝেনি। আজও কি বুঝল কিছু? কেবল একটা নতুন রকমের ভয়ে দুঃসাহসী দিলীপদার প্রতি ওর শ্রদ্ধা আরও গভীর হল। মনে হল, দিলীপদা অনেক বড়।

বড় মাসিমার চিঠিখানা নিয়ে ও হাজির হল তাঁর ঘরে।

—মাসিমা, এই দেখুন দিলীপদা চিঠি লিখিছে আপনারে।

উল্লাসে লাফ দিয়ে উঠলেন বিছানা থেকে বড় মাসি।

—দেখি দেখি কি লিখিছে? আচ্ছা পড়, তুই-ই পড়। এক নিশ্বাসে চিঠিখানা পড়ে ফেলল রুনু।

—ওটা, আর কোনও কথা নাই? ও পোড়ামুখো ওই রকম দুই অক্ষরের চিঠিই লেখে, ও চিঠি তুই পালি কোথায়?

—ডাকে আইছিল আমার নামে।

—তোর নামে? তালি তোরেও চিঠি লিখিছে দিলু? সুমতি হইছে? কী লিখিছেরে তোরে? পরীক্ষাতে পাশ-টাশ করল কিনা তা লিখিছে?

ভাবনায় পড়ল রুনু। পাশ যে করেনি সেকথা তো লিখেছে রুনুকে, কিন্তু তা কি বলা যায় বড়মাসিকে? উনি দুঃখ পাবেন। ও বুদ্ধি খাটিয়ে বলে—পাশ তো করবেই। সে সব কিছু লেখেটেখে নাই। আমারেও ওমনি দুই কথায় সারিছে। কেমন আছ, ভালো আছি, এই আর কি। আর লিখিছে, আপনারে যেন আমি মায়ের মতো সেবা-যত্ন করি যদ্দিন দিলীপদা না আসে। আচ্ছা মাসিমা, এট্টা কথা কব? আপনাকে না আমার 'মা' বলে ডাকতি ইচ্ছে করে।

দিলীপদার চিঠির প্রসঙ্গটা ভুলিয়ে দিতে চাইছিল রুনু। ওর শেষ কথায় কাজ হল। বড়মাসি ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেন—ওরে আমার সোনা, কী কথাডাই কলি! বুক জুড়োয়ে যায়, কিন্তু আমার পোড়া কপালে কি আর অত সুখ সবে? ছোট হিংসেয় ফাটে মরবে না? এই যে এট্টু মাঝে মাঝে আসিস-টাসিস তাতেই ওর চোখ টাটায়। আমি সব দেহি, সব বুঝি। থাক বাবা, যেমন মাসি ডাহিস, তাই ডাকবি।

বলতে-বলতে গলা ভারি হয়ে আসে বড়মাসির।

আচ্ছা।—বলে আর দাঁড়াল না রুনু।

চার

অত্যন্ত নিস্তরঙ্গভাবে তিনটে বছর কেটে গেল গোপালগঞ্জ স্কুলে। এখন আর ক্লাসে প্রথম হওয়ার কোনও রোমাঞ্চ নেই। ওটা যেন স্বতঃসিদ্ধ একটা ব্যাপার হয়ে গেছে রুনুর পক্ষে। প্রতি ক্লাসের প্রতি পরীক্ষায় প্রথম হয়ে এবার ক্লাস টেনে উঠল রুনু।

সারা স্কুলে রুনু এখন একটা বিশেষ সম্মানিত পরিচয়। শিক্ষকরা সকলেই ওকে স্নেহ করেন। এই তিন বছরে স্কুল লাইব্রেরি থেকে অনেক বই পড়ে ফেলেছে রুনু। বঙ্কিম চট্টোপাধ্যায়, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর—এসব নাম এবং এঁদের কিছু কিছু বইয়ের সঙ্গে একটা যেন ঘনিষ্ঠ পরিচয় হয়ে গেছে। পড়েছে কিছু কিছু ইংরেজি বইও। গালিভার্স ট্রাভলস, থ্রি মাস্কেটিয়ার্স, লেজেন্ডেস অব গ্রিস অ্যান্ড রোম—এমনি কয়েকখানা ইংরাজি বই সবটা না বুঝলেও ওর মনে একটা গভীর রেখাপাত করেছে। এসব বই পড়ার পরে নিজেকে আর ছেলেমানুষ মনে হয় না ওর।

সেই যে ক্লাস সেভেনে উঠে মায়ের কাছে কথা দিয়েছিল প্রতি রবিবারে ও বাড়ি যাবে, সেকথা ও রক্ষা করেছে। মায়ের আর কোনও অভিমান নেই ওর উপর। কেবল লম্বা ছুটির দিনগুলিতে পুরো ছুটিটা ও বাড়িতে কাটাতে পারেনি কোনও বার। গোপালগঞ্জে ওর পড়ার ঘরখানা। ওর আপন বাড়ির চেয়েও বেশি আপন হয়ে গেছে। সেই ঘরটাতে বসে না পড়লে যেন ওর পড়ায় মন বসে না। বাড়িতে এলে একা হরেকেষ্ট ওর সঙ্গী। দাদা তো দারুণভাবে মেতে আছে তার দোকান নিয়ে। দোকান নাকি এখন কয়েক হাজার টাকার মাল। কেনাকাটা চলছে ভালোই। সংসার খরচের অনেকখানি এখন বহন করে দাদাই। বাবা দাদার সঙ্গে এখন খুব ভালো ব্যবহার করেন।

স্কুলের পরে বাবার অবসর সময় কাটে এখন কবিরাজি বই নিয়ে। দাতব্য কবিরাজির শখ ওঁর ছিল বরাবরই। এবার জমি-জমা সব মধুমতীর পেটে চলে যাওয়ায় কৃষিকর্মের ব্যাপারে আর সময় দেবার প্রয়োজন নেই। বিবিধ রবিশস্য ঝাড়া-পোঁছা নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয় না মাকেও। মায়ের অবসর কাটে এখন রামায়ণ-মহাভারত নিয়ে। সারা বাড়িতে কর্মচাঞ্চল্য একমাত্র দাদার। দাদার আর অবসর নেই। অবসর নেই রুনুর সঙ্গে একটু গল্প করারও। ওই দোকানের আয়টা না থাকলে কী যে হত! এখন যে সব কিনে খেতে হচ্ছে।

দাদা এখন একটা বেশ ভার-ভারিক্কি মানুষ। বস্তুত দাদাই বাড়ির গার্জিয়ান এখন। এই বাড়িতে কতক্ষণ মন টেকে রুনুর!

ক্লাস টেনে উঠে বাড়িতে ওর প্রথম হবার খবর দিয়েছিল রুনু। বাবা ওকে আশীর্বাদ করে অনেক বড় কড় কথা বলেছিলেন। বুকে জড়িয়ে ধরেছিল দাদাও। দুজনেই বলেছিল, এবার ম্যাট্রিকে বৃত্তি পাওয়া চাই। তারপর আর বাড়িতে বিশেষ কোনও কথা বলার নেই কারও সঙ্গে, কেবল দুবেলা খাওয়া আর হরেকেষ্টর সঙ্গে আড্ডা দেওয়া।

সপ্তাহ খানেক পরেই গোপালগঞ্জে চলে এল রুনু, ঠিক স্কুল খোলার দিনই।

কয়েক দিন পরেই একটা বিশেষ ঘটনা সারা স্কুলটাকে আলোড়িত করে তুলল। বিশেষ করে উপরের ক্লাসের ছেলেদের।

কালেক্টর সাহেব আসবেন স্কুল পরিদর্শন করতে। সেই উপলক্ষে তিন বছর পরে একসঙ্গে তিন বছরের প্রাইজ ডিস্ট্রিবিউশান হবে। হবে একটা বিরাট ফাংশান। সারা স্কুলে হইচই পড়ে গেছে সেই ফাংশান নিয়ে। পরিচালনার ভার পড়েছে সেকেন্ড স্যার আর নতুন স্যারের উপর। সর্বোপরি হেডস্যার তো আছেনই।

এক-একদিন এক-এক ক্লাসের ছাত্রদের পরীক্ষা হচ্ছে। দেখা হচ্ছে গান, আবৃত্তি অভিনয়ে কার কেমন দক্ষতা আছে। উপরের চার ক্লাসের পরীক্ষা নিচ্ছেন সেকেন্ড স্যার। নীচের ক্লাসের নতুন স্যার।

এই পরীক্ষার মাধ্যমে বিখ্যাত হয়ে গেল হরেকেষ্ট। ও তো জন্মাবধিই গান গেয়েছে। গানের গলা ওর চমৎকার। কীর্তনের দলে কৃষ্ণের পার্টও করেছে। গানে-অভিনয়ে ও সবার সেরা।

ঠিক হয়েছে দুখানা নাটক অভিনীত হবে। বড়রা করবে 'টাকার পূজা', ছোটরা করবে 'ছুটির বাঁশী'। জানুয়ারির মাঝামাঝি শুরু হয়ে গেল পুরোদমে রিহার্সাল। দুটো বইতেই কয়েকটা করে গান আছে, তাছাড়াও পৃথক ভাবে কয়েকটা গান গাইবে কয়েকজন। গান শেখাবার জন্যে গোপালগঞ্জের নামকরা গায়ক গণপতিবাবুকে বিশেষভাবে আমন্ত্রণ করে এনেছেন হেডস্যার। তিনি সঙ্গীত পরিচালক। হারমোনিয়াম, তবলা, বাঁশী, বেহালা এসবের ব্যবস্থার দায়িত্বও নিয়েছেন গণপতিবাবু।

একটা পর্যন্ত নমো নমো করে ক্লাস সেরেই শুরু হয়ে যায় রিহার্সাল। গাইয়েরা এক ঘরে গান শেখে, আবৃত্তিওয়ালারা আর এক ঘরে মহড়া দেয়, আর দুখানা নাটকের মহড়া হয় অন্য দুখানা ঘরে। মেইন বিল্ডিং-এর চারটে ক্লাসঘরই বিচিত্র সুরে গমগম করে দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত।

প্রায় মাস খানেকের রিহার্সালের পরে মোটামুটি আড়াই ঘণ্টার প্রোগাম তৈরি হয়ে গেল। ইতিমধ্যে কয়েক জনের গলা ভেঙেছে, তারা দিবারাত্র মাফলার গলায় জড়িয়ে রাখে আর মিনিটে মিনিটে লবঙ্গ খায়।

কোনও নাটকেই রুনুর কোনও রোল নেই। অভিনয়ের পরীক্ষায় ওর আনাড়িত্ব প্রমাণ হয়ে গেছে। গানেও ভরসা নেই ওকে দিয়ে। তবে একটা ব্যাপারে ও জিতে গেছে। বাবার মুখে প্রতিদিন শুনে শুনে শিবাষ্টকটা ওর আগাগোড়া মুখস্থ ছিল। উচ্চারণও ছিল শুদ্ধ। গণপতিবাবুর প্রস্তাবে শিবাষ্টক দিয়েই অনুষ্ঠান শুরু হবে। গাওয়া হবে সমবেত কণ্ঠে। রুনুর সঙ্গে থাকবে আরও চারজন। তাদের ওই দীর্ঘ বত্রিশ লাইনের সংস্কৃত শ্লোক মুখস্থ করতে প্রাণ বেরিয়ে যাচ্ছে। এখনও কারও টানা মুখস্থ হয়নি। সুরটা অবশ্য সোজাই। প্রতিটি চার লাইনের স্তবকের একই সুর। স্থির হয়েছে, রুনুর যেহেতু মুখস্থ ঠিক আছে এবং উচ্চারণ আর সুরও নির্ভুল হচ্ছে, ও থাকবে সামনে, আর চারজন থাকবে ওর পিছনে, ডাইনে, বাঁয়ে দুজন করে। এতে রুনু নিজেকে বেশ দলপতি বলে মনে হচ্ছে। নাটকে ওর রোল না থাকলে কী হবে, রিহার্সাল শুনে শুনেই দু-খানা বই ওর মুখস্থ হয়ে গেছে। শেষ দিকে রিহার্সালের সময় কেউ ভুল করলে রুনুই ভুল ধরিয়ে দিত।

ভিতরে-ভিতরে দারুণ একটা উত্তেজনা বোধ করছে রুনু। স্কুলে আসার পর এতবড় একটা ঘটনা আর ঘটেনি।

অনুষ্টানের আগের দিন হেডস্যার নিমন্ত্রণ করলেন সমস্ত ছাত্রকে। নিমন্ত্রণপত্র পাঠানো হল শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের।

সেকেন্ড স্যার বললেন—ফাংশানে যারা অংশ গ্রহণ করছ তারা কাল স্টেজে আসবে এগারটার মধ্যেই। একটার মধ্যে মেক-আপ শেষ করে রেডি হতে হবে। কালেক্টরসাহেব আসবেন ঠিক দুটোর সময়। ওঁদের সময় অত্যন্ত মূল্যবান। উনি আসার সঙ্গে সঙ্গেই যেন আমরা শুরু করতে পারি। ফাংশান এবং পুরস্কার বিতরণ পাঁচটার মধ্যেই শেষ করতে হবে। তারপর আর এক মিনিটও থাকবেন না উনি।

আজও পর্যন্ত কোনও সাহেব দেখেনি রুনু। শুনেছে সাহেবের সঙ্গে নাকি মেমসাহেবও থাকবেন। সাহেব-মেম দ্যাখবার উৎসাহে সে-রাতে আর ভালো করে ঘুমোতেই পারল না রুনু।

পাঁচ

নির্দিষ্ট সময়েই শুরু হল ফাংশান।

মেমসাহেব-সহ কালেক্টরসাহেব হলে প্রবেশ করতেই প্রচুর করতালি পড়ল। রুনুর তখন বাইরে আসার উপায় নেই। ওর যে মেক-আপ হয়ে গেছে।

শিবাষ্টকের পঞ্চশিল্পীকেও পেইন্ট করা হয়েছে। রুনু সামনে থাকবে বলে ওকে একটু বেশি যত্ন করেই মেক-আপ দেওয়া হয়েছে। সকলেরই সন্ন্যাসী বেশ। পরিধানে গৈরিক আলখাল্লা, মাথায় গৈরিক পাগড়ি। রুনুর আবার হাতে-গলায় রুদ্রাক্ষের মালাও দেওয়া হয়েছে। আয়নায় নিজের মেক-আপ দেখে ও নিজেই মুগ্ধ হয়ে গেল। হাতে একখানা লাঠি থাকলেই খোকাদার ঘরের সেই পরিব্রাজক বেশে স্বামীজির মতোই দেখাত ওকে।

হেডস্যার অভ্যাগতদের স্বাগত জানিয়ে শুরু করলেন স্কুলের বিবরণী পাঠ। সেই সময়ে এক ফাঁকে উইংস থেকে মুখ বাড়িয়ে সাহেব-মেম রূপে যাদের কল্পনা করেছিল, তাদের দেখেই রুনু দারুণভাবে চমকে উঠল। এ যে সেই এস. ডি. ও. সাহেব আর কুন্তলা মাসি! বুকের মধ্যে দুরুদুরু করে উঠল।

হেডস্যারের বক্তৃতাতেও শুনল সেই কথাঃ একদা যিনি এই মহকুমার এস. ডি. ও. ছিলেন এবং ন্যায়পরায়ণতা ও কর্মদক্ষতার গুণে আজ যিনি ফরিদপুর জিলার সর্বোচ্চ রাজ-প্রতিনিধিরূপে আমাদের সম্মুখে উপস্থিত...ইত্যাদি।

হেডস্যারের ভাষণ শেষ হতে, অনুষ্ঠান সভাপতি অর্থাৎ কালেক্টরসাহেব ইংরাজিতে কয়েক মিনিট ধরে ছাত্রদের অনেক বড় বড় কথা বললেন। তারপরই শুরু হল ফাংশান। শুরু হল শিবাষ্টক দিয়েই।

কালেক্টর সাহেবকেই 'কল্পতরু শিব' রূপে কল্পনা করে এই প্রারম্ভ সঙ্গীত। কল্পতরু তো বটেই। এ জেলার যার যা কিছু কামনা সে তো ওই কল্পতরুর কাছেই নিবেদন করতে হয়। তিনি প্রসন্ন হলেই বাঞ্ছা পূর্ণ হবে।

প্রথমটায় একটু গলা কেঁপেছিল, হাত-পাও কেঁপেছিল রুনুর, একটু পরেই সামলে নিতেও পেরেছিল। ওপনিং সং ভালোভাবেই উতরে গেল। উতরে গেল দুটো নাটকও। চমৎকার গানে অভিনয়ে হরেকেষ্ট একেবারে মাত করে দিল সকলকে। প্রচুর হাততালিও পেল।

হাততালি আর গুঞ্জরণ থামতেই শুরু হল পুরস্কার বিতরণ।

দুখানা টেবিল ভরতি প্যাকেটে বই-এর পাহাড়। প্রতিটি প্যাকেটে সুন্দর ফিতে দিয়ে বাঁধা। কয়েকটা রুপোর মেডেলও আছে।

হেডস্যার একটি করে ছেলের নাম ডাকছেন, সেকেন্ড স্যার একটি করে প্যাকেট তুলে দিচ্ছেন মেমসাহেবের হাতে। ছাত্রটি এসে প্রথমে হাত জোড় করে নমস্কার করছে, তারপর পুরস্কারটি হাতে নিয়ে আর-একবার নমস্কার করে চলে আসছে। এসব আগে থেকেই শেখানো হয়েছে। প্রতিবারই মেমসাহেব ছেলেটির দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে একটু হাসছেন।

শুরু হল ক্লাস ফাইভ থেকে। গত তিন বছরে ফাইভ থেকে যারা সিক্স-এ উঠেছে তাদের ফার্স্ট, সেকেন্ড ও থার্ড বয়কে দেওয়া হল একটি করে বইয়ের প্যাকেট। তারপর সিক্স। এমনি করে ক্লাস টেন পর্যন্ত।

সেভেন, এইট, নাইন—পরপর তিন বছরের তিনটে প্রথম পুরস্কারই পেল রুনু। প্রতিবারই কুন্তলামাসির হাত থেকে ও পুরস্কার নিল, নমস্কারও জানাল।

তারপরও ছিল শ্রেষ্ট অভিনয়, আবৃত্তি, গান ইত্যাদির জন্য কয়েকটা মেডেল। দুটো মেডেল পেল, হরেকেষ্ট। মেডেল একটা রুনুও পেল গুড কন্ডাক্ট-এর জন্য।

বইয়ের বোঝা ক্রমেই ভারী হল রুনু। শেষ পর্যন্ত গলায় গুড কন্ডাক্টের মেডেলও ঝুলল। প্রচুর হাততালিও পেল। তবু কেন গ্রিনরুমে এসে বইয়ের বোঝা ফেলে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল রুনু?

কেন কাঁদছ রণজিৎ? কী হল?—প্রশ্ন করে একজন।

আরে, আজ তো তুমিই বাজিমাত করিছ!—বলে আর-একজন।

কেন যে কাঁদছে তা কি ও বলতে পারবে কাউকে? ওই যে মেমসাহেব, ওই তো কুন্তলামাসি, যিনি একদিন ওকে কত আদর করেছিলেন। যিনি একদা ছিলেন শ্রীনাথ পণ্ডিতের ছাত্রী, আজ তিনি রুনুকে চিনতে পারলেন না! এতবার তাঁর হাত থেকে পুরস্কার নিয়ে এল রুনু, অথচ একবারও চোখে দেখা গেল না পরিচিতির একটু ইশারা! শুধু সেই মাপা হাসিটুকু! এ অভিমান ও রাখবে কোথায়!

সবাই ভেবেছিল পুরস্কারপর্ব এই বুঝি শেষ হল। হাততালি থামতে হেডস্যার আবার গম্ভীর গলায় ঘোষণা করলেন—আর একটা বিশেস পুরস্কার আছে আমাদের স্কুল প্রতিষ্ঠা থেকে আজ পর্যন্ত ক্লাস-পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বরের জন্য। আমি আনন্দের সহিত ঘোষণা করছি যে, আমাদের প্রিয় ছাত্র শ্রীমান রণজিৎকুমার...

ঘোষণাটা কানে আসতেই রুনুর বুক ধড়ফড় করে উঠল। তাড়াতাড়ি চোখের জল মুছে প্রস্তুত হল। মনে মনে ঠিক করল এবার আর চোখ তুলে তাকাবে না কুন্তলামাসির দিকে। যথা নিয়মে মাথা নীচু করে নমস্কার সারবে। তারপর পুরস্কারটা নিয়ে সোজা চলে আসবে।

হেডস্যার গর্ব ভরে রুনুর সেই আশ্চর্য পরীক্ষায় পাওয়া প্রতিটি বিষয়ের নম্বর বলে গেলেন, যে পরীক্ষা দিয়েছিল ও নরেনবাবু স্যারের আশীর্বাদ ও প্রেরণার জোরে ক্লাস সিক্স থেকে সেভেনে উঠবার সময়।

এবার মেমসাহেব ওর গলায় ঝুলিয়ে দিলেন একখানা সোনার মেডেল। নমস্কার সেরে অজস্র হাততালির মাঝে মাথা নীচু করেই ফিরে আসছিল রুনু।

সাবাস রুনু!—পেছন থেকে মিষ্টি হেসে বললেন কুন্তলামাসি।

চমকে উঠল রুনু। সঙ্গে সঙ্গে ফিরে দাঁড়িয়ে দেখল সেই প্রত্যাশিত হাসি। হাতের ইঙ্গিতে তিনি কাছে ডাকলেন ওকে!

রুনু নম্র পায়ে এবার এসে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল তাঁকে। তিনি ওকে কোলের কাছে টেনে নিয়ে আদর করে বলেন—তুমি আমাকে চিনতে পারোনি রুনু?

মাথা নেড়ে সম্মতি জানায় রুনু। রুনুর কাঁধে হাত রাখলেন কুন্তলামাসি।

ছেলেটিকে তুমি চেনো নাকি?—প্রশ্ন করলেন কালেক্টরসাহেব।

—খুব চিনি। তোমার মনে নেই? সেই আমার গুরু শ্রীনাথ পণ্ডিতমশাইয়ের ছেলে। একবার এসেছিলেন ছেলেকে নিয়ে আমাদের বাংলোয়। এই গোপালগঞ্জ থাকার সময়।

ইয়েস, ইয়েস, মনে পড়েছে। দ্যাট গ্রেট পণ্ডিত! বাপের যোগ্য ছেলে তুমি। ব্রেভো বয়!—রুনুর পিঠ চাপড়ে বললেন সাহেব।

পিতৃগর্বে রুনুর বুকখানা দশ হাত ফুলে উঠল।

আজকের এই অনুষ্ঠানে কালেক্টরসাহেব ও মেমসাহেবের মাঝখানে দাঁড়ানো সোনার মেডেল পরা রুনু একটা যেন বিশেষ মর্যাদা লাভ করল সারা স্কুলে। সব পুরস্কারের গৌরব তুচ্ছ হয়ে গেল এই অপ্রত্যাশিত গৌরবের কাছে।

ছয়

গলায় গুড কন্ডাক্ট আর রেকর্ড মার্কস-এর দুখানা মেডেল ঝুলিয়ে এক বোঝা বই কাঁধে নিয়ে রুনু যখন বাসায় এল, তখন একটা যেন উৎসব শুরু হয়ে গেল ওকে নিয়ে। ওর হঠাৎ মনে হল, ও যেন এই কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ছেলেমানুষ থেকে একটা পুরো মানুষে পরিণত হয়ে গেছে।

ডাক্তারবাবুও নিমন্ত্রিত হয়েছিলেন ফাংশানে। রুনু ফিরবার অনেক আগেই তিনি বাসায় ফিরে এসে সকলের কাছে ওর কৃতিত্বের কাহিনী সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন। এমন একটা ছেলে যে তাঁর বাড়িতে থেকে পড়ছে তাতে তিনিও গর্ব বোধ করছেন।

রুনু এসে একে একে সকলকে প্রণাম করল। বাদ গেল না বড়মাসিও।

ডাক্তারবাবু ওকে বুকে চেপে ধরে বলেন—তোমার উপর অ্যাদ্দিন আমরা খুব অবিচার করেছি রুনু। তোমার অনেক সময় নষ্ট হয়ে গেছে কমু, পমি ওদের পড়াতে। এবার তোমার ফাইনাল ইয়ার। এখন থেকে ওদের আর পড়াতে হবে না। কেবল তুমি সিরিয়াসলি পড়বে। ম্যাট্রিকে স্কলারশিপ পেতেই হবে। ওদের জন্যে না হয় অন্য কাউকে...

তিন মেয়েই কলরব করে উঠল—না, না, আমরা আর কারও কাছে পড়ব না। রুনুদা খুব ভালো পড়ায়।

প্রতিবাদটা অবশ্য বেশি জোর দিয়ে করে প্রমীলা। রুনুর পড়ানোতে প্রতি বৎসর ও ফার্স্ট হচ্ছে ক্লাসে। এবারও সিক্স-এ উঠল। রুনু না পড়ালে ও যদি ফার্স্ট না হতে পারে!

প্রমীলার জিদ দেখে ডাক্তারবাবু হেসে বলেন,—আচ্ছা, তুমি না হয় কেবল পমিকে একটু দেখো। ওটার মাথা আছে। অল্পেই হয়ে যাবে। এই ধরো ঘণ্টাখানেক। কমু আর পুষির জন্য সেই...।

সেই বুড়ো মাস্টারের নাম করার আগেই কেঁদে ফেলল কমলা। ও এবারও সব বিষয়ে পাশ করে এইটে উঠল। অঙ্কে অবশ্য টেনে-বুনে কেবল পঁয়ত্রিশ ছিল। রুনুর কাছে পড়তে বসে ওকে অনেক ধমক খেতে হয়, তবু যেন তার মধ্যে কী একটা আনন্দ আছে। কেমন একটা তৃপ্তি আছে। সেই বুড়ো মাস্টারকে ভাবতেই ওর গা জ্বলে যায়। ও চোখের জল মুছে গম্ভীরভাবে বলে—থাক, আমারে কারও পড়াতি হবে না। আমি তো খারাপ ছাত্র।

দুহাতে চোখ ঢেকে চলে গেল কমলা কাঁদতে কাঁদতে।

দৃশ্যটা রুনুর বুকের মধ্যে একটা বেদনার ঢেউ তুলল। এই আনন্দের দিনে কমলার চোখের জল দেখে ওর দুচোখও ছলছল করে উঠল। ও দৃঢ়স্বরে বলল—আমি ওদের ঠিক পড়াতি পারব। আমার একটুও অসুবিধা হবে না মেসোমশায়। দেখুন তো, আপনার কথা শুনে কমু কাঁদতে কাঁদতে চলে গেল। যাই, ওরে ধরে আনি গে।

থাক, তোমার আর সাধতি হবে না।—বললেন ছোটমাসি, কতক্ষণ আর রাগ করে থাকবে?

সে কথায় কান না দিয়ে রুনু ছুটে গেল ভিতরে। খুঁজতে-খুঁজতে কমলাকে পাওয়া গেল একটা দরজার পাল্লার আড়ালে। তখনও নিঃশব্দে কাঁদছে কমলা।

আমার উপর রাগ করিছ কমু?—দরদভরা গলায় বলে রুনু, রাগ কোরো না লক্ষ্মী। আমি তোমারে পড়াব সত্যি পড়াব।—বলতে বলতে ওর একখানা হাত ধরল রুনু।

একটানে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে পাথর হয়ে রইল কমলা।

রুনু ভারি অপ্রস্তুত। যেমন করে হাত ছাড়িয়ে নিল কমলা তাতে অন্য কোনও সময় হলে ও ভীষণ অপমানিত বোধ করত। ওরও রাগ হত। আজ কিন্তু ওর রাগ হল না। বরং খুব দুঃখ হল কমলার জন্যে। ও যদি এই আনন্দের সময় এমন করে মুখ ভার করে থাকে, তাহলে যেন প্রাইজ পাওয়ার সব আনন্দই মাটি হয়ে যাবে। ওর অভিমান ভাঙাতেই হবে। মনে মনে সঙ্কল্প করল রুনু। আস্তে একখানা হাত রাখল ওর কাঁধের উপর।

কমলা সাপের মতো ফুঁসে উঠে ঘুরে দাঁড়াল রুনুর মুখোমুখি। ওর আদুরে হাতখানা ঠেলে ফেলে দিল কাঁধ থেকে। দুচোখে তার জলের ধারা। মুখ ফুলিয়ে বলল—থাক, আর আদর দেখাতি হবে না। আমি সব জানি।

—কী জানো?

—আমি খারাপ ছাত্তোর, আমি কালো কুচ্ছিৎ...

আমি তোমারে কখনও কালো কুচ্ছিৎ বলিছি? রাগ করো না লক্ষ্মীটি।—আবারও হাত বাড়াতে যাচ্ছিল রুনু।

প্রসারিত হাতখানাকে আবার ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিয়ে অভিমানী গলায় বলে—যাও, যাও, আমি সব জানি।

—কী জানো, বল না।

তুমি আমারে একটুও দেখতি পারো না। একটুও ভালোবাসো না। তুমি খালি পমিরে ভালোবাসো। ওরেই বেশি বেশি পড়াও। তাই তো পিতি বছর ফাস্টো হয়। আর আমারে...—ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল কমলা।

মনে-মনে ভেবে দেখল রুনু কমলার অভিযোগটা মিথ্যা নয়। প্রমীলা ভালো ছাত্রী বলে তার প্রতি সত্যিই ওর বেশি মনোযোগ। ও প্রায়ই বলে কমলার মাথা ভরতি গোবর। ওর তো অভিমান হবেই। আজ এতগুলি প্রাইজ পেয়ে ওর মনটা খুবই উদার হয়ে গেছে। ও আদর করে কমলায় হাত ধরে বলে—এই তোমারে ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা করতিছি, এখন থেকে তোমারেই বেশি করে পড়াব। তুমিও ফার্স্ট হবা। সত্যি বললাম।

—সত্যি!

সত্যি, সত্যি, সত্যি—এই তিন সত্যি করলাম। হল তো?—হাসল রুনু—এখন চলো তো। আমার প্রাইজগুলন দ্যাখবা না?

দ্যাখব বলেই তো সারাদিন পথ চাইয়ে রইছি।—অদ্ভুত নরম মিষ্টি গলায় বলে কমলা, জানি, তুমি কত প্রাইজ পাবা। সোনার মেডেলও যে পাবা তা তো ভাবতিও পারি নাই।

কমলার এই উচ্ছ্বাসটুকু বড় ভালো লাগল রুনুর। এ যেন আর একটা প্রাইজ পেল ও কমলার কাছে। কালো কুচ্ছিৎ কমলাকে সেই মুহূর্তে মনে হল কত সুন্দর। উচ্ছ্বাসে আবেগে ওর বুক ভরে উঠল। মনে-মনে শপথ করল এখন থেকে সত্যিই ও কমলাকে খুব যত্ন করে পড়াবে। যেমন করে সেবার বাজুনিয়া থাকতে পড়িয়েছিল চুয়াকে।

রুনুর পিছনে-পিছনে আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে-মুছতে বৈঠকখানা ঘরে এল কমলা।

মান ভাঙাতে পারলে মেয়ের?—প্রশ্ন করেন ছোটমাসি।

ওকেও আমি পড়াব, সেই কথা বলতে তবে রাগ পড়ল।—হেসে বলে রুনু।

অর্থাৎ তোমার পাঠশালা তাহলে পুরোদমেই চলবে।—বলেন ডাক্তারবাবু, না, না, রুনু, একটা মাস তোমার কাউকে পড়াতে লাগবে না। পরীক্ষার পরে তো লম্বা ছুটি। তখন না হয় আবার ওদের নিয়ে তোমার পাঠশালা বসিও।

আবার মুখিয়ে উঠল কমলা—ঠিক আছে, আমারে কারু পড়াতি লাগবে না। পমিরে যেন খুব করে পড়ায়। তা হলিই হবে।

পড়াবেই তো। রুনুদা ছাড়া আর কারও কাছে আমি পড়বই না। জেদি গলায় বলে উঠল প্রমীলা।

আমুও না।—ঘাড় বেঁকিয়ে বলে পুষি এবং অবিলম্বে রুনুর কোলটা অধিকার করে বসে।

ওর কাণ্ড দেখে হেসে ফেলে সবাই।

পুষি ইতিমধ্যে কান্নাকাটি করে রুনুর দুটো মেডেলই নিজের গলায় ঝুলোবার অধিকার লাভ করেছিল। এবার অধিকার করে নিল রুনুকেও।

প্রাইজ বইগুলি ঘুরছিল সবার হাতে হাতে। মুখ ভার করে থেকেও কিন্তু কমলা প্রতিটি বই ধরে ধরে দেখল। মোটা মোটা ইংরাজি বইগুলি হাতে নিয়ে বলল—ওরে বাবা, এই সব ইংরাজি বই তুমি পড়তি পারবা রুনুদা?

পড়বে বলেই তো ওকে দিয়েছেন হেডমাস্টারমশায় সব ভালো ভালো বই। ও কি তোমার মতো ছাত্র? ও একটা ব্রিলিয়্যান্ট বয়। —বলেন ডাক্তারবাবু।

ইংরাজি কথাটার মানে যদিও বুঝল না কমলা, তবু মনে হল ওর একটা মস্ত মানে আছে। এতদিনের সাধারণ রুনু যেন হঠাৎ একটা অসাধারণ কেউকেটা হয়ে উঠল। বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে ও তাকিয়ে রইল রুনুর দিকে।

এক সময় পুষির ঝোলানো ঝকঝকে সোনার মেডেলটা ধরে বলে—বাঃ, কী সুন্দর! এডা কি জন্যি পাইছ রুনুদা?

রুনুকে কিছু বলতে হল না। ডাক্তারবাবুই সবিস্তারে বর্ণনা করলেন সে গল্প। গল্প শেষ করে বলেন—এ-স্কুলের ইতিহাসে সোনার মেডেল এই প্রথম পেল রুনু।

তাই নাকি রুনুদা?—কমলার চোখেমুখে সশ্রদ্ধ বিস্ময়।

একটা শিহরিত আনন্দে রুনু কেবল তাকিয়েই থাকে কমলার চোখের দিকে। কথা বলতে পারে না। ওর সাফল্যে ওর থেকে যেন কমলাই বেশি উচ্ছ্বসিত।

এমন উচ্ছ্বাস দেখেছিল একবার ও দাদার চোখেমুখে, যেবার ও সব বিষয়ে প্রথম হয়ে বাড়ি গিয়ে দাদাকে প্রণাম করেছিল। উচ্ছ্বসিত আবেগে দাদা ওকে বুকে জড়িয়ে ধরেছিল। ওর সারা গা শিউরে উঠেছিল। সেই গা-শিউরোনো উচ্ছ্বাসটা যেন ঝরে পড়ছে আজ কমলার চোখ থেকে ওর সর্বাঙ্গে।

—কমলা, তুমি কত ভালো, ঠিক আমার দাদার মতো ভালো। দাদাও তো ভালো ছাত্র নয়, কিন্তু দাদার মতো ভালো আমি কাউকে দেখিনি। তুমিও ভালো ছাত্রী নও, কিন্তু তোমার মতো ভালো নয় কেউ এ-বাড়িতে। আমি আগে তোমাকে কত অবজ্ঞা করেছি, কত বকেছি আর বকব না। আর কখনও তোমাকে বকব না কমলা। তুমি খুব ভালো।

কথাগুলি বুকের মধ্যে কেবল গুর গুর করল, মুখ দিয়ে একটা শব্দও বেরুল না রুনুর।

সাত

ডাক্তারবাবু কর্মব্যস্ত মানুষ। সেদিন রুনুকে অবাধে পড়াশুনো করবার যে সুযোগ তিনি দিতে চেয়েছিলেন, সেটা গ্রহণ করতে যখন রুনুরই কোনও গরজ দেখা গেল না, তখন তিনিও নির্ভাবনায় আপন কাজে ডুব দিলেন। ফলে বাড়িতে কোনও বুড়ো মাস্টারের আবির্ভাব ঘটল না এবং রুনুর পাঠশালা পুরোদমেই চলতে থাকল।

কমলাকে পড়ানো যেন একটা নেশার মতো পেয়ে বসল ওকে। প্রমীলা স্বভাবতই ভালো ছাত্রী। ওর ক্লাসে প্রথম হওয়ার মধ্যে রুনুর কোনও বাহাদুরি নেই। রুনুর বাহাদুরি প্রমাণ হত যদি কমলা হত ক্লাসে প্রথম। সেই বাহাদুরিটা প্রমাণ করবার জন্যেই যেন এবার উঠে-পড়ে লেগেছিল ও কমলার পেছনে। কমলার প্রতি পক্ষপাতটা বড় বেশি চোখে পড়ছিল প্রমীলার। এ নিয়ে তার অভিমানী ঈর্ষাটা মাঝে-মাঝে খুব মোটা সুরে বেজে উঠত।

—রুনুদা তো এখন খালি ওরেই পড়াবা, তবে আর আমি শুধু-শুধু বসে থাকি কেন? তুই এবার একাই পড় দিদি, তুই ফাস্টো হলিই রুনুদা খুশি হবে। আমি ফেল করলি কার বা কি আসে যায়! এখন তো আর কারও দিকে চোখও পড়বে না রুনুদার, তাই না? থাক বাবা, আমরা নিজ-নিজিই পড়ি।

বলতে-বলতে একেবারে প্রাণঘাতী পাঠ শুরু করে দিত প্রমীলা আর পুষ্প।

মাঝে-মাঝে প্রমীলা কমলাতে ঝগড়াও বেধে যেত রুনুকে অধিকার করা নিয়ে। সে সব ক্ষেত্রে প্রমীলার প্রতিও নজর দিতে হত। চোখ টিপে আশ্বাস দিতে হত কমলাকেও, অর্থাৎ তোমার কাছে যে প্রতিজ্ঞা আমি করেছি তা আমার মনে আছে। তোমাকে পড়াব পরে। বেশি করেই পড়াব।

এমনি করে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রীর পাল্লায় পড়ে মাস্টারির ভূমিকাটা রুনু যত নিষ্ঠার সাথে পালন করছিল, ততই ওর নিজস্ব ভূমিকাটার প্রতি নিষ্ঠা ঢিলে হয়ে যাচ্ছিল।

একটা যেন উত্তেজনাময় নেশার ঘোরে দিনগুলি কেটে যাচ্ছিল। কেটে যাচ্ছিল মাসের পর মাস। এরই মধ্যে কখন যে এসে পড়ল হাফ-ইয়ার্লি পরীক্ষা, সে খেয়ালই ওর ছিল না। খেয়াল হল ক্লাসে পরীক্ষার নোটিশ শুনে।

মাত্র এক সপ্তাহ পরেই শুরু হবে হাফ-ইয়ার্লি পরীক্ষা।

এই কয়েকমাসের মধ্যে যে কতখানি অধঃপতন হয়েছে রুনুর তার প্রমাণ পাওয়া গেল হাফ-ইয়ার্লি পরীক্ষার রেজাল্ট বেরুতেই। যে ছাত্র সেই সিক্স থেকেই সব বিষয়ে প্রথম হয়ে এসেছে, এবার সে তলিয়ে গেছে চারটে বিষয়েই! যে হারাণের কথা সবাই প্রায় ভুলতে বসেছিল, এবার ফার্স্ট হল সেই হারাণ। টোটালে দুই নম্বর পিছিয়ে রুনু হল দ্বিতীয়। এ সর্বনাশা খবর বাবার কানে পৌঁছলে কী যে হবে ভাবতেও শিউরে ওঠে সারা গা। আর হরেকেষ্টই বা কী কাণ্ড করে বসল এবার! একেবারে রুনুর গায়ে গায়ে এসে পড়েছে। মাত্র এক নম্বরের ব্যবধান।

হারাণের এই অপ্রত্যাশিত সাফল্যে সারা ক্লাস আজ তাকে ঘিরে হইহই করছে। ফিরেও তাকাচ্ছে না কেউ আজ পরাজিত রুনুর দিকে। ফিরে না তাকালেও তাদের টিটকারীগুলি ঠিকই কানে আসছে রুনু। ওকে শোনাবার জন্যেই তো বলা। হাই বেঞ্চে মাথা গুঁজে রয়েছে রুনু এক কোণে, আর পেছন থেকে তাদের মন্তব্যগুলি বিষতিরের মতো বিঁধছে ওর কানে। ওর বুকের মধ্যে।

—রণজিৎ সব রণে জয় করে শেষকালে কাত!

—দেখালি বটে হারাণ। ওস্তাদের মার শেষ রাতে। এবার কেবল দু-নম্বরে বাজিমাত করেছিস, টেস্টে কিন্তু একেবারে তুলোধোনা করা চাই ওরে।

কেউ কেউ আবার হরেকেষ্টকেও জপাচ্ছে।

—আর একটা নম্বর যদি তোর বেশি হত...।

—না, না, এক নম্বর হলে তো ব্রাকেটে সেকেন্ড হত। দু-নম্বর। আর মাত্র দুটো নম্বর পেলি না কেষ্টা? তাহলে সোনার মেডেল পাওয়া ফাস্টো বয় হয়ে যেত থাড্ডো!

—এর মানে কি জানিস? মানে হল অহঙ্কার। সোনার মেডেলের অহঙ্কার।

ফোঁটা ফোঁটা করে জল গড়িয়ে পড়ছে রুনুর দুচোখ বেয়ে মাটিতে। মনে হচ্ছে সেদিন ওই সোনার মেডেলটা ওকে যতখানি গৌরব দান করেছিল, আজ সেই সোনার মেডেলই ওকে তার শতগুণ কলঙ্কে ঢেকে দিল। এই কলঙ্কিত মুখ ও তুলবে কী করে সবার সামনে? কি জানি কী শাস্তি দেবেন ওকে বাবা!

বাবার কথাই ভাবছিল বারবার। একবারও মনে পড়েনি হেডস্যারের কথা। এই সময় নিবারণদা এসে খবর দিল, হেডমাস্টারমশাই ওকে ডাকছেন।

সারা গায়ে শিউরে উঠল রুনু। বুক কেঁপে উঠল থরথর করে। আজ আর মাথা তুলে সে-ঘরে ঢুকবার মুখ নেই ওর। চোখ মুছতে-মুছতে মাথা নত করে হেড স্যারের ঘরে এল রুনু।

অত্যন্ত গম্ভীরভাবে কয়েকটি কথা বললেন হেডস্যার।

—কেঁদে লাভ নেই। ও কান্নায় আমি ভুলিনে। ভেবো না হারাণ অথবা হরেকেষ্ট খুব কিছু এগিয়ে এসেছে। ওরা যথাস্থানেই আছে। কেবল অধঃপাতে গেছ তুমি। কোথায় নেমে এসেছ বুঝতে পারছ?

রুনুর সাড়া নেই।

হায়, আমার সব আশা, সব স্বপ্ন তুই এমনি করে ভেঙে দিলি!—হেডস্যারের গলায়ও যেন কান্নার সুর।

একটা অসহ্য কান্না বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে উঠল রুনুর। ওকে এই মুহূর্তে পা থেকে মাথা পর্যন্ত বেতের চোটে জর্জরিত করে দিলেও বুঝি এতখানি ব্যথা পেত না। একেবারে বাচ্চাছেলের মতো হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলল রুনু।

—বুঝতে পারছি, অনেকগুলি প্রাইজ পেয়ে খুব অহঙ্কার হয়ে গেছে তোমার। ভেবেছ আর পড়াশুনোর দরকার নেই। অহঙ্কারই পতনের মূল—পড়েছ না কথাটা? কথাটা যে কত সত্য তা এবার বুঝতে পারছ?

এই কথাটা ক্লাসের ছেলেরাও বলেছে এইমাত্র। তখন তাদের উপর রাগ হয়েছিল, এবার হেডস্যারের মুখ থেকে সেই কথাটাই শত ধিক্কারে ওকে একেবারে মাটিতে মিশিয়ে দিল।

—হায়, কী আশা করে আমি অতগুলি ভালো ভালো ইংরাজি বই প্রাইজ দিয়েছিলাম তোমাকে? চেয়েছিলাম তোমার মধ্যে ইংরাজি ভাষার প্রতি একটা আকর্ষণ সৃষ্টি করতে। আর সেই ইংরাজিতে তুমি কোথায় নেমে গেছ! সেই বইগুলি পড়েছ?

কী উত্তর দেবে রুনু? এককানা ইংরাজি বইও যে পড়া হয়নি। সেই প্রথম দিকে একটু নেড়ে-চেড়ে সেই যে তাকে সাজিয়ে রেখেছিল, তারপর আর ছোঁয়া হয়নি। লজ্জায় অনুশোচনায় ও মরে যাচ্ছে। এই মুহূর্তে যদিও সীতার মতো পাতাল প্রবেশ করতে পারত!

—কী, কথা বলছ না কেন? বুঝেছি পড়াশুনো ছেড়ে দিয়েছ। হায় রণজিৎ, এ আমি ভাবিনি, এ আমি কল্পনাও করতে পারি না। ছিঃ ছিঃ ছিঃ! তোমার বাবা এ খবর জানলে...

ও আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। প্রায় আছাড় খেয়ে পড়ল হেডস্যারের পায়ের উপর। ভিতর থেকে একটা কঠোর সঙ্কল্প ওর মুখ দিয়ে বের হয়ে এল—এই আপনার পা ছুঁয়ে বলছি স্যার, টেস্ট পরীক্ষায় আমি আবার সব বিষয়ে...

পরম স্নেহে ওকে টেনে তুললেন হেডমাস্টারমশাই। পিঠে হাত রেখে কোমল কণ্ঠে বললেন, —হ্যাঁ, আমি তাই চাই। এই আঘাত যেন তোকে মানুষ করে তোলে। তোকে নিয়ে কি কেবল শ্রীনাথ পণ্ডিতমশাই স্বপ্ন দেখেছেন? আমারও যে অনেক আশা! আমাকে নিরাশ করিস নে বাবা!

মাথা নীচু করে বেরিয়ে এল রুনু। মনে পড়ল, সেবার বাজুনিয়া স্কুলে হেডমাস্টারমশায়ের সেই শাসনের কথা। সেখানে ছিল ঘৃণার শাসন, বেতের শাসন। এখানে অনুভব করল তীব্রতর আর এক শাসন। স্নেহের শাসন। এই শাসনের ধাক্কায় তার সত্তাটাই যেন তোলপাড় হয়ে গেছে। পরমাশ্চর্য একটা প্রেরণায় ওর বুক ভরে উঠেছে। মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে ও অসাধ্য সাধন করতে পারে।

ক্লাসে আর ঢুকল না। পেছন থেকে ক্লাসের ছেলেরা ওকে টিটকারী দিচ্ছিল—ওই যে সোনার মেডেল যাচ্ছে কান্দতি কান্দতি। কেউ বলছিল—দ্যাখ তো ওর কান দুখানা আস্ত আছে কিনা।

কোনও উপহাসই আর কানে যাচ্ছে না রুনুর, ওর কানের মধ্যে ধ্বনিত হচ্ছে সেই আশ্চর্য কথাগুলিঃ তোকে নিয়ে যে আমার অনেক আশা। আমাকে নিরাশ করিসনে বাবা।

না, মনে মনে সঙ্কল্পে দৃঢ় হল রুনু, নিরাশ করবে না ও হেডস্যারকে। নিরাশ করবে না বাবাকেও।

সকলে বলছে, অহঙ্কারেই ওর পতন হয়েছে। মাথা নীচু করে পথ চলতে-চলতে ওর মন বলছে, না অহঙ্কার নয়, ওর পতন ঘটিয়েছে ওর মন। যে মন মনোযোগ দেয় সে মনের অনেকখানিই যে হরণ করেছে কমলার ব্যথাভরা কালো চোখ দুটি। সে মনকে ওর ফিরিয়ে আনতেই হবে নিজের অধিকারে।

বাসায় আসতে আসতেই ও মনস্থির করে ফেলল। এ বাসায় আর নয়। কমলাদের জন্য অন্য মাস্টার রাখবার কথা তো অনেক আগেই বলেছিলেন ডাক্তারবাবু। এবার ও বাড়ি চলে যাবে। চলে যাবে এই মায়ার বেষ্টনির বাইরে। সেখানে ওর পড়ার ঘরটিতে বসলেই ফিরে পাবে ওর মনকে।

আট

রুনুর হাফ ইয়ার্লি রেজাল্ট শুনে মর্মাহত হলেন ডাক্তারবাবুও। তিনি বারবার নিজেকেই অপরাধী করে বলেন—ছিঃ ছিঃ, এ দোষ তোমার নয় রুনু, এ দোষ আমার। ওরাও জিদ ধরল, তুমিও রাজি হয়ে গেলে, তাই আমি আর ওদিকে মাথা ঘামাইনি। শুনেছি তোমার সময় প্রায় সবটুকুই দিয়েছ ওদের। এটা ঠিক হয়নি। না-না, এখন থেকে ওদের পড়ানো একদম বন্ধ। সামনেই তো টেস্ট। এবার কেবল নিজের পড়া।

ডাক্তারবাবুর কথায় রুনুর মনের গ্লানি অনেকখানি কেটে গেল। সাহস করে বলে বসল—পূজার ছুটিতে এবার আমি বাড়িতে একা একা পড়তে চাই। এই ছুটিতেই আশা করছি মেক-আপ করে ফেলতে পারব।

—নিশ্চয়ই করতে হবে। তা না হলে যে পণ্ডিতদাদা আমাকেই অপরাধী ভাববেন। ভাববেন আমাদের মেয়েদের পড়াতেই রেখেছিলাম তোমাকে, তোমার পড়ার কথা একবারও ভাবিনি। ছিঃ ছিঃ, কী লজ্জা! কিন্তু, আমি তো বাবা তোমাকে এ বছরের গোড়াতেই...

—না, না, ওকথা বলবেন না মেসোমশায়। দোষ কারও নয়, দোষ আমার নিজেরই। আপনি তো...আপনাদের স্নেহ আদর...

কথা গুছিয়ে বলতে পারে না রুনু।

ডাক্তারবাবু ওর পিঠে হাত রেখে বলেন—ঠিক আছে, পুজোর ছুটিটা তুমি এবার তোমাদের বাড়িতেই নিরিবিলিতে পড়াশুনো করো। এখানে পুজোর ভিড়ে, হইচই-এর মধ্যে তোমার ডিস্টার্ব হবে।

রুনুর সুটকেস বিছানা ওখানেই রয়ে গেল, রয়ে গেল কিছু অপ্রয়োজনীয় বই-খাতাও, যাতে মনে হবে ছুটির পরেই ও চলে আসবে। তাই ভাবুক ওরা। ওর মনের সঙ্কল্পটা ও বলবে না কাউকে। জানলে হয়তো কমলা কেঁদেই ফেলবে। রুনুর প্রেরণাতেই তো কমলা এবার এত ভালো পরীক্ষা দিয়েছে হাফইয়ার্লিতে। যে কমলা অঙ্কে কোনোক্রমে তিরিশ পেলেই ধন্য হয়ে যেত, সে এবার অঙ্কে পেয়েছে পঁয়ষট্টি। আর সব বিষয়েও আশাতীত ভালো নম্বর পেয়েছে। কতবার যে সেজন্যে আড়ালে ধন্যবাদ জানিয়েছে রুনুকে! মাত্র দুই নম্বর কম পেয়ে সেকেন্ড হওয়ার রুনুর দুঃখটাকে খুব বড় করে ভাবতে পারেনি কমলা। বরং মোটে না পড়েও যে ছেলে সেকেন্ড হতে পারে সে যে কী সাংঘাতিক ভালো ছেলে সেই কথা বলেই উৎসাহিত করেছে ওকে। ওর পরাজয়ের মধ্যেও যে এইটুকু প্রশংসা ওর প্রাপ্য ছিল, সেকথা ভাবেওনি রুনু। কমলার প্রশংসা ওকে কিছুটা সান্ত্বনা দিলেও সঙ্কল্পচ্যুত করতে পারেনি। ও স্থির করেই ফেলেছে, ছুটির পরেও এখানে আর আসবে না। টেস্ট পরীক্ষা দেবে ও-বাড়ি থেকেই। হরেকেষ্টর সঙ্গে আসা-যাওয়া করবে স্কুলে। হরেকেষ্ট ওর প্রথম বন্ধু এবং প্রধান বন্ধু। সেই বন্ধুকে এই ক-বছরে যেন অনেকটা দূরে সরিয়ে দিয়েছিল রুনু। দূরে সরিয়ে দিয়েছিল মধুমতীকেও। সেই মধুমতী, সেই ওর পড়ার ঘর, সেইখানেই ওর আপন জগৎ। সেখানে কোনও কমলা ওকে অন্যমনস্ক করতে পারবে না।

বিদায় মুহূর্তে কমলা এক ফাঁকে নিরালা পেয়ে ফিসফিস করে বলেছিল,—এই একটা মাস তোমারে দেখতি পারব না, ভাবতি আমার বুক ফাটে যাচ্ছে রুনুদা!

ওর দুচোখ ছলছল করে উঠেছিল।

রুনু তাকাতে পারেনি সে চোখের দিকে। ওরও বুকের মধ্যে গুরগুর করে উঠেছিল বইকি। কথা বলতে পারেনি। একটা যেন যুদ্ধ চলছিল ওর মনের মধ্যে। এ-যুদ্ধে ও হারবে না। কিছুতেই না।

বাড়ি এসে ওর মনের কথাটা প্রথম বলল মাকে।

—আমি কিন্তু পুজোর ছুটির পরও ডাক্তারবাবুর বাসায় আর যাব না মা।

কেন রে? ওখানে তোর কোনো কষ্ট হচ্ছে?—ব্যাকুল হয়ে ওঠেন মা।

—না, না, কষ্ট কিছু না। কিন্তু অতগুলন বাচ্চারে পড়ায়ে নিজির পড়ার বেশি সময়ই তো পাই না। ওই জন্যেই তো হাফ-ইয়ার্লি পরীক্ষাটা এবার আমার ভালো হল না। এবার আমার পরীক্ষার বছর। আর যে কয়মাস সময় আছে, একা একা বাড়িতেই পড়াশুনা করব। তুমি যদি বাবারে একটু বলো।

মায়ের কাছে এভাবে মিথ্যা বলতে রুনুর খুব খারাপ লাগছিল। কিন্তু ওছাড়া আর বলবেই বা কি? অমনি মিথ্যা বলতে হল বাবাকেও। শ্রীনাথ পণ্ডিত কিন্তু ওর সময়াভাবের কৈফিয়তে খুশি হতে পারলেন না। তিনি রুক্ষ স্বরে বলেন—সময়ের অভাব? ওকথা বলে আমারে ভুলোনো চলবে না বাপু। সময়কে যে ব্যবহার করতে জানে তার সময়ের অভাব হয় না কোনও দিন। আচ্ছা বাড়িতে থাকতি চাও থাকো। কিন্তু স্কুলে যাতায়াতে চার-চার আট মাইল হাঁটতিও কি কম সময় যাবে?

—বেশিদিন তো আর স্কুলে যাতি হবে না। স্কুল খোলার কদিন বাদেই তো টেস্ট পরীক্ষা। টেস্টের পরে তো আর যাতিও হবে না। তারপর পরীক্ষার কদিন না হয় ডাক্তারবাবুর বাসায়...

আচ্ছা দেখা যাক টেস্টে কি ফল হয়। ফার্স্ট না হতি পারলি পড়া বন্ধ। শুধু তো ফার্স্ট হওয়া নয়, তোমার বৃত্তি পাতি হবে। তা না হলি এই গরিব পণ্ডিত কি আর তোমারে কলেজে পড়াতি পারবে? ওরে রুনু, আমার এতদিনের স্বপ্ন যেন ভেঙে না যায় বাবা!—দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন শ্রীনাথ পণ্ডিত।

এই কথাটা বলেছিলেন হেডস্যারও। তিনিও তো স্বপ্ন দেখেছেন রুনুকে নিয়ে। তাঁদের সব স্বপ্ন কি ভেঙে দেবে রুনু?

না, অত বড় আঘাত সে দিতেই পারে না। এই স্নেহময় পিতাকে, সেই পিতৃতুল্য স্নেহময় হেডমাস্টারমশায়কে। বৃত্তি ওকে পেতেই হবে।

প্রথম দিনেই অনেক রাত জেগে ছুটির মাসের রুটিন করে ফেলল রুনু। কেবল লক্ষ্মী পূজার দিনটা ছাড়া আর সবদিনই দৈনিক চৌদ্দ ঘণ্টা করে প্রোগ্রাম। বাবার কাছে দরবার করে ওঁর পকেট-ঘড়িটা চেয়ে নিল রুনু। একেবারে কাঁটায় কাঁটায় রুটিন ফলো করতে হলে ঘড়ি তো লাগবেই। পুত্রের উদ্যম দেখে তিনি সানন্দেই ঘড়িটি দিয়ে দিলেন ওকে।

ঘড়ির কাঁটার সাথে নিজের সময়টাকে বেঁধে পড়ার মধ্যে যে এমন একটা উত্তেজনাপূর্ণ নেশা আছে, এ তো জানতই রুনু। কোথা দিয়ে কী ভাবে যে পেরিয়ে গেল পূজার দিনগুলি, পড়ার নেশায় ওর খেয়ালেই রইল না। কেবল সন্ধ্যার সময় মধুমতীর ওপার থেকে ভেসে আসা সেই অদেখা পূজামণ্ডপের ঢাকের বাদ্যটা যখন কানে আসত, মনটা বড় উদাস হয়ে যেত। মনে পড়ত অতীতের অনেক পূজার স্মৃতি।

মধুমতীর সেই আগের স্নিগ্ধ রূপটি আর নেই। নেই সে পুরোনো বাড়ির আমবাগান, আম গাছের ডালে বসে গোপন পড়ার ব্যবস্থা। থাকলেও কি এখন আর গাছে চড়ে পড়তে বসতে পারত রুনু? এখন কি আর সেই ছেলেমানুষির বয়স আছে ওর? তবু যেন মনে হয় সেই দিনগুলি আবার যদি ফিরে আসত, যদি আবার তেমন করে চর পড়ত নদীর এপারটায়, সেই বোরো ধানের খেত, সেই ঝাউবন যদি আবার দেখা যেত, তাহলে মধুমতীকে আবার তেমন করে ভালোবাসত রুনু। এ মধুমতীর পাড়ে দাঁড়ালে কেন যেন ওর বুক ফেটে কান্না আসে। হায়, কোথায় হারিয়ে গেল সেই সকলখেলার সাথী, চির সবুজ ছোট গাং! রাক্ষসী মধুমতী তাকে চিরকালের মতো নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে। এখনও টিকে আছে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের রাস্তাটা। এটাও হয়তো একদিন হারিয়ে যাবে মধুমতীর অতল জলে।

বিকেলবেলায় হরেকেষ্টর সঙ্গে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের রাস্তা দিয়েই বেড়াতে বেড়াতে দক্ষিণে অনেক দূর চলে যায় ওরা। আবার ফিরে আসে সূর্যাস্তটা দেখেই। প্রতিদিন সূর্যাস্ত দেখাও যেন ওর একটা রুটিন। শৈশব থেকেই এ নেশাটা ওর আর গেল না।

রুটিন করে পড়ার নেশাটা সংক্রামিত হয়েছে হরেকেষ্টর মধ্যেও। সে-ও একটা রুটিন করে ফেলেছে রুনুর দেখাদেখি, তবে সে অত সময় দিতে পারেনি। তার যে সংসারে অনেক কাজ। তাছাড়া তার ঘড়িও নেই। ওদের বন্ধুত্বের ছিন্নসূত্রটা আবার নতুন করে জোড়া লাগল এবার। প্রতিদিনই বিকেল বেলা ওদের একসঙ্গে বেড়ানো চাই। চলতে চলতে ওদের মধ্যে যে সব কথা হয় সে কেবল পড়াশুনোর কথা। আসন্ন টেস্ট পরীক্ষার কথা।

রুনু বলে তার ভবিষ্যতের কথাও।

পরীক্ষাটা হয়ে যাক, তারপর শুরু হবে আসল পড়া।—উৎসাহভরে বলে রুনু।

—পরীক্ষার পরে আবার কি পড়া?

—বাঃ, সাতখানা মোটা মোটা ইংরাজি বই যে প্রাইজ পাইছিলাম, সেগুলি পড়তি হবে না?

—পড়ে বুঝতি পারবা?

—যতটা বুঝি। থ্রি মাসকেটিয়ার্স বইটা খানিকটা পড়িছিলাম। অনেকটা বুঝতি পারা যায়। খুব ইন্টারেস্টিং। ডিকশনারি নিয়ে বসে যাব।

আমরা একসঙ্গে পড়ব। —বলে হরেকেষ্ট—তুমি আমারে বুঝোয়ে দেবা।

এক ক্লাসেরই ছাত্র ওরা। তবু হরেকেষ্ট বরাবর ওকে গুরু বলে মেনে এসেছে। ও জানে, রুনু ইতিমধ্যে লাইব্রেরি থেকে অনেক বই পড়ে ফেলেছে। সেসব বইয়ের গল্প যখন বলে রুনু, হরেকেষ্ট হাঁ করে শোনে। রুনুকে তখন মনে হয় অনেক উঁচু ক্লাসের ছাত্র।

—প্রাইজের বইগুলো শেষ করে ধরব বাবার আলমারি। বাবা বলিছেন, পরীক্ষার পরে পড়তি দেবেন সে সব বই।

—পণ্ডিতমশায়ের অনেক বই আছে বুঝি?

—আছে না? এক আলমারি ভরতি। মাইকেল গ্রন্থাবলী, বঙ্কিম গ্রন্থাবলী, পাঁচখণ্ড মহাভারত, আরও যেন কী কী গ্রন্থাবলী। তাছাড়া রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্রের বইও আছে অনেকগুলি। সে সব বইও আমরা একসঙ্গে পড়ব।

ভবিষ্যতের অনেক বৃহৎ সঙ্কল্প আর বর্তমানের পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে দুই বন্ধুর দিন কাটে একটা নতুন নেশার ঘোরে। ডাক্তারবাবুর বাসার কথা, কমলা-প্রমীলার কথা ইতিমধ্যেই যেন একটা দূর অতীতের ঘটনা হয়ে গেছে, যেমন অতীত ঘটনা হয়ে গেছে বাজুনিয়ার স্মৃতি।

একটা গভীর তৃপ্তি আর উল্লাস বোধ করল ও লক্ষ্মীপূজার দিন। আজ ওর ছুটি। এই এক সপ্তাহে যতটুকু এগুবে ভেবেছিল রুনু, তার চেয়েও বেশি এগিয়ে গেছে ওর প্রিপারেশান। এই গতিটা রাখতে পারলে ছুটির পরে আবার ও বুক ফুলিয়ে দাঁড়াতে পারবে হেডস্যারের সামনে। সদ্য-পিঞ্জর-মুক্ত একটা পাখির মতো স্বাধীন বোধ করল আজ ও এতদিন পরে। আজ আর বই ছোঁবে না।

ছুটি নিয়েছে আজ দাদাও তার দোকান থেকে। আজ আর হরেকেষ্ট নয়। আজকের এই সুন্দর দিনটা ও দান করবে দাদাকে। গৃহকর্ম করবে দাদার সঙ্গে।

শ্রীনাথ পণ্ডিতের বাড়িতে সারা বছরে একমাত্র লক্ষ্মী পূজাই হত জাঁকজমক করে। কেবল কায়েত পাড়া নয়, নিমন্ত্রিত হত সারা কাপালি পাড়া, বুনো পাড়া। বড়দি, মেজদি প্রতিবার এসময়ে বাড়ি আসত তাদের বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে। দু-তিন দিন আগে থেকেই শুরু হয়ে যেত ধূমধাম। পূজার দিন তো ভোর থেকেই সকলকে কাজে হাত লাগাতে হত। বাদ যেতেন না স্বয়ং পণ্ডিতমশায়ও।

সে সব দিন হারিয়ে গেল মধুমতীর গর্ভে। নিমন্ত্রণ আর কাকে করবে? কায়েত পাড়া তো নিশ্চিহ্ন। ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের রাস্তাটার পুবদিকের বুনো বস্তিটা এখনও অবশ্য আছে। মাত্র তিন-চার ঘর বুনো আছে, আর পড়ে আছে অনেকগুলো ছাড়া ভিটে। দক্ষিণ দিকে কাপালি আছে মাত্র দু-ঘর। আর সব মধুমতীর তাড়া খেয়ে চলে গেছে কোন দেশ-দেশান্তরে। কেউ কেউ ঘর বেঁধেছে নদীর ওপারের নয়া চরে।

এবার তাই পূজার আয়োজন সামান্য। দাদার কাজও সামান্য। এবার আর লুচি-হালুয়া হবে না। প্রসাদ বলতে মুড়ি-মুড়কি, খইয়ের মোয়া, নারকেল নাড়ু, বাতাসা আর কিছু ফলমূল। সে সব কদিন ধরে মা একাই ধীরে-সুস্থে জোগাড় যন্ত্র করে ফেলেছেন। পূজার বাজার-টাজার তো কালই শেষ করেছে দাদা।

দাদার কাজও মিটে গেল বেলা দশটার আগেই। সকালে গিয়ে বুনো পাড়াটা নিমন্ত্রণ করে এসেছে। তারপর কলাবউ বানানো আর গোটাকয়েক নারকেল, ছোলা। ব্যস। দাদার কাজ শেষ।

আমারে আর দরকার নাই তো মা?—বলল দাদা।

—না, এবেলা আর দরকার নাই।

—তাহলি রুনুরে নিয়ে এট্টু মাছ ধরতি যাই। কত কাল ওরে নিয়ে মাছ ধরা হয় না!

তা যাবি যা। সন্ধের আগেই ফিরবি কিন্তু। সকাল-সকাল পূজা হয়ে যাবে এবার। এবার তো আর ভিড়ভাড় নাই।—একটু যেন বিষাদভরা গলায় বলেন মা। হয়তো অতীতের কোনও উজ্জ্বল উৎসবময় লক্ষ্মীপূজার স্মৃতি তাঁর মনকে বিষণ্ণ করে তুলেছে। নতুন বাড়িতে এসে মা বড় নিসঃঙ্গ হয়ে পড়েছেন। কায়েত পাড়ার সব বাড়িতেই মায়ের একটা বিশেষ সম্মান ছিল। কারও মাসিমা, কারও দিদিমা, কারও কাকিমা-জেঠিমা হয়ে সারা পাড়াটাকেই একটা বৃহৎ সংসারে পরিণত করেছিলেন তিনি। কত জনের কত গল্প, কত পরামর্শ, কত সুখ-দুঃখের কাহিনীর মধ্যে জড়িয়ে ছিলেন তিনি। আজ তারা কেউ নেই। আসেনি এবার দিদিরাও। তাই 'ভিড়-ভাড় নাই' কথাটার মধ্যে যেন সেই নিঃসঙ্গতার বেদনার সুর।

রুনু এখন আর ছেলেমানুষ নেই। কথা শুনলেই তার মর্মটা বুঝতে পারে। মায়ের মনোবেদনাটা বুঝতে পেরে রুনু বলে—আমি তোমার কাছে থাকি না মা। নারকেল নাড়ু পাকায়ে দেব।

সে তো সেই বিকেলবেলা। এতক্ষণ একা একা তোর ভালো লাগবে না। এট্টা মাত্র ছুটির দিন। আবার তো কালকেও সারাদিন বই নিয়ে উপুড় হয়ে থাকবি। যা, দাদার সাথে আজ এট্টু বেড়ায়ে-টেড়ায়ে আয়। বেশি দেরি করিস না।—সস্নেহে বলেন মা।

দাদার সঙ্গে মৎস্য-শিকার অভিযানে যাবার লোভটা ছিল রুনুর ষোলো আনাই। এবার মায়ের মত পেয়ে আর সবুর সইল না।

নয়

ইন্দ্রজিতের এবারকার মাছ ধরার পরিকল্পনাটা বেশ রোমাঞ্চকর। পুলকিত হয়ে উঠেছিল রুনু। এবার আর খালে-বিলে খ্যাপলা জালে অথবা হোচা-চালুনী-বঁড়শীর মাছধরা নয়। নয় কই, খলসে, চিংড়ি, পুঁটি ধরা। এবার একেবারে মধুমতীর বুকে ইলিশ মাছ শিকারের আয়োজন। মাছ ধরতে হবে সাংলে জালে।

সাংলে জালে জেলেদের ইলিশ মাছ ধরতে দেখেছে রুনু নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে কত বার। দাদার অসাধ্য অবশ্য কিছু নেই, তা বলে সাংলে জালে ইলিশ মাছও ধরতে পারে দাদা, এ তো ভাবতেই পারেনি রুনু। ও কাজটা একমাত্র জেলেরাই পারে, এতদিন তাই ভাবত রুনু। কিন্তু এ সাংলে জালটাই বা কোথায় পেল দাদা?

এ জাল কোথায় পাইছ দাদা?—প্রশ্ন করে রুনু।

এক জাল্যে একবার পাঁচটা টাকা ধার নিছিল এই জালগাছ বান্ধা রাখে—বলল ইন্দ্রঃ এক বছর হয়ে গেল, নেবার নাম নাই। তাই ভাবছি জিনিসটা যখন পড়েই রইছে, নিজিগো ডিঙ্গিও আছে, জিনিসটা কাজে লাগাতি দোষ কি?

দাদার যে ছোটখাট একটু বন্ধকী কারবারও আছে, সে তো জানতই রুনু। দাদার দোকান ঘরের চৌকির তলায় জমেছে অনেক বন্ধকী জিনিস। থালা, ঘটি, বাটি, এটা-সেটা। কারবারটা নাকি বেশ লাভজনক। মাসে মাসে টাকায় দু-পয়সা করে সুদ। আবার এক বছরের মধ্যে জিনিস ছাড়িয়ে না নিলে সে জিনিসটিও লাভ হয়ে গেল।

—এ জালগাছও কি এখন তোমার হয়ে গেছে?

—দেখি আর কয়েক মাস। এর দাম তো পনেরো-বিশ টাকার কম না। না নেয় তো আমারই হয়ে যাবে।

—এই জালে আগে আর মাছ ধরিছ?

—না রে। একা একা এতবড় জাল সামলানো যায় না। পাকা জাল্যেরাই পারে না। দেহিস নাই, প্রায়ই ওদের ডিঙিতে দুইজন মানুষ থাকে?

তা অবশ্য দেখেছে রুনু। কোনো কোনো ডিঙ্গিতে অবশ্য একজনও থাকে। নদীর বুকে জাল ফেলে ভাটিয়ে যায় ডিঙিখানা। মানুষটার একহাতে জালের দড়ি, অন্য হাতে নৌকোর হাল। যেখানে দুজন থাকে, সেখানে একজনের হাতে জালের দড়ি, হালটা থাকে দ্বিতীয় ব্যক্তির হাতে। প্রায় দু-মাইলের বাঁকটা ভাটিয়ে যেতে আধ ঘণ্টার বেশি লাগে না। এক ভাটিতেই কেউ কেউ দু-তিনটে ইলিশ পেয়ে যায়। কিন্তু বেদম খাটুনি হয় সেই দু-মাইল উজিয়ে আসতে। তখন দুজনকেই বৈঠা ধরতে হয়। কোনও কোনও জেলে সারাদিনে দু-তিন ভাটিও দেয়।

প্রথমেই ওদের নিজেদের ঘাট থেকে প্রায় এক মাইল উজিয়ে গিয়ে ভাটি শুরু করতে হবে। উজান পথটা দু-ভাই-ই বৈঠা ধরেছিল। ভাটি শুরু হতে দাদা নিল জালের দড়ি। রুনুর কেবল হাল ধরে বসে থাকা।

এইটুকু বৈঠা বেয়েই হাঁপিয়ে উঠেছিল রুনু। অনেকদিন অভ্যাস নেই যে। ভাটি শুরু হতেই নিশ্চিন্ত আরামে বিশ্রাম। নদীর বুকের জলসিক্ত স্নিগ্ধ হাওয়ায় যেন ওর প্রাণ জুড়িয়ে গেল কয়েক মিনিটেই। তারপর থেকেই গভীর আগ্রহে দাদার হাতের দিকে চেয়ে থাকা, কখন একটা চকচকে ইলিশ চটাপট লাফাতে শুরু করে ওদের জালে ধরা পড়ে।

ওদের সামনে পেছনে অনেকগুলি জেলে ডিঙি ভাটিয়ে চলেছে জাল ফেলে। মাঝে মাঝেই তাদের এক-একজনে এক-একটা ঝকঝকে ইলিশ মাছ তুলে ফেলছে, আর প্রতিবারই দৃশ্যটা দেখে রুনুর বুকের মধ্যে উত্তেজনার তুফান বইছে। ইতিমধ্যে জালে টান মেরেছে দাদাও কয়েকবার। তখন সে কি ধড়-ফড়ানি ওর বুকে! হায়, শূন্য জাল! কিচ্ছু নেই তার মধ্যে। এমনি উত্তেজনা আর নৈরাশ্য। নৈরাশ্য আর উত্তেজনার মধ্যেই শেষ হল ওদের প্রথম ভাটি। কিচ্ছু পেল না ইন্দ্র।

ইন্দ্রর মুখ ভার। রুনুর তো কান্নাই পেয়ে গেছিল। এ বয়সে কান্নাটা অশোভন, তাই সামলে নিতে হল।

আর এক ভাটি দিতি চাও?—নিরুৎসুক গলায় বলে রুনু।

এহেবারে খালি হাতে বাড়ি যাব পুজোগোণ্ডার দিন?—শুকনো মুখে বলে দাদা।

দু-মাইল উজিয়ে আসতে দুজনেরই দম ফুরিয়ে গেল। ডিঙি অবশ্য ঘাটে বাঁধাই থাকে, কিন্তু বৈঠা বাওয়ার প্রয়োজন যে ইন্দ্ররও তেমন হয় না আজকাল। অভ্যাস ওরও নেই। তাছাড়া মাছ না পাওয়ায় ওদের মন ভেঙে গেছিল বলেই হয়তো ক্লান্তিটা এত বেশি মনে হচ্ছে। রুনুর তো দুহাতেই ফোস্কা-টোস্কা পড়ে একাকার। এখন অবশ্য বৈঠা আর বাইতে হবে না। কেবল ধরে থাকা। সেটুকু সামর্থ্যও আর নেই ওর। ও একবারে হাত-পা ছড়িয়ে দিয়ে শুয়ে পড়ল গলুই-এর উপর।

ওর চোখমুখ দেখেই ইন্দ্র বুঝেছে ওর অবস্থাটা। সমবেদনাভরা গলায় বলে—আহা, তোরে আনে খুব ভুল করিছি রে রুনু! তোর কি আর এসব অভ্যেস আছে, থাক, তুই শুয়ে থাক। ভাটি দিতি একাই পারবানে।

নৌকার খোলটার উপর যথাসাধ্য আরামে রুনুর শোবার ব্যবস্থা করে দিয়ে ভাটি শুরু করল ইন্দ্র ঠিক পাকা জেলের মতোই একহাতে হাল ও অন্যহাতে জালের দড়ি ধরে। তখন প্রায় বিকেল চারটে হয়ে গেছে। তখনও ইন্দ্রর আশাবাদী মন বলছে পুরো ভাটি ওর দিতে হবে না, নিজেদের বাড়ির ঘাট বরাবর যাবার আগেই পেয়ে যাবে একটা বড় ইলিশ। এবং পাওয়া মাত্রই জাল গুটিয়ে চলে যাবে বাড়ি। সন্ধের আগেই পৌঁছবে বাড়ি।

আশা করতে করতে ভাটিয়েই চলেছে ইন্দ্র। ওদিকে ক্লান্তিতে অবসাদে ঘুমিয়ে পড়েছে রুনু। ওদের বাড়ির ঘাট বরাবর এসেও যখন জালে কিছু ধরা পড়ল না এবং রুনুর ঘুমও ভাঙল না, তখন ইন্দ্র ভাবল, থাক, ও যখন আরামে ঘুমোচ্ছে, তখন এ ভাটিটা শেষ করেই যাই।

খালি হাতে বাড়ি ফিরব না, মনে মনে তেমন একটা শপথ ছিল ইন্দ্রর। বস্তুত মাছ ধরতে গিয়ে খালি হাতে কোনওদিনই ফেরেনি ইন্দ্র। মা বলেন, ওরা মাছ-ভাগ্যি আছে। ও মাছ ধরতি গেলি নিশ্চিন্তি মশলা বাটা যায়।

আজও খালি হাতে ফেরেনি ইন্দ্র। আধসেরটাক একটা বাচ্চা ইলিশ হাতে ঝুলিয়ে ওরা যখন বাড়ি ফিরল তখন অনেক রাত। অনাড়ম্বর লক্ষ্মীপূজা অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। প্রসাদ আগলে পিদিম জ্বেলে বসে আছেন মা। মা-র চোখও ঘুমে ঢুলু-ঢুলু। সারাদিন উপোস গেছে, এক হাতে পূজার কাজ, প্রসাদ বিতরণ, সবই তো করতে হয়েছে ওঁকে। এখনও নিশ্চয় উপোস ভাঙেননি। আর বাবা? বাবারও সাড়া নেই। বাবা হয়তো ঘুমিয়েই পড়েছেন।

সেই ছেলেমানুষ বয়স থাকলে রুনু হয়তো বাবার ভয়েই কাঁপতে শুরু করত। কথা ছিল সন্ধের আগে ফিরবে, অথচ ফিরল এত রাতে। কী করে ফিরবে আগে? ওর যে ঘুমই ভাঙেনি। ওকে আরামে ঘুমোতে দেখে দাদাও ডাকেনি ওকে সেই বাচ্চা ইলিশটির মুখদর্শনের আগে পর্যন্ত।

ওদের দেখেই ধমকে উঠলেন মা। আর মায়ের গলা শুনেই ঘুম ভেঙে গেল বাবার। সঙ্গে সঙ্গে তিনি অন্ধকার থেকে গর্জন করে উঠলেন। গালাগালটা দাদাকে উদ্দেশ্য করেই।

—বে-আক্কেল, হারামজাদা! এই কার্তিকের হিমে তুই ওরে নিয়ে রাত দুফর পর্যন্ত মাছ ধরে বেড়ালি? সর্বোনাশ করিছিস তো। ওর তো নির্ঘাত নিউমোনিয়া হবে।

থরথর করে কাঁপছিল রুনু শীতে। ওর আর দাঁড়াবার শক্তি নেই। সেই কাঁপুনির সঙ্গে আর একটা নতুন কাঁপুনি শুরু হল। এবার বাবা ওকে কী শাস্তি দেবেন কে জানে!

কিন্তু না, একটা কথাও বললেন না রুনুকে। কেবল মাকে বললেন—তাড়াতাড়ি এট্টু জল গরম করে রুনুর হাত-মুখ ধোয়ায়ে দেও। তারপর তোমরা প্রেসাদ-টেসাদ খাইয়ে শুয়ে পড়ো। রাত অনেক হইছে।

হাত-মুখ ধোয়া অথবা প্রসাদ খাবার জন্যে আর অপেক্ষা করবার শক্তি নেই রুনুর। ওর সারা শরীর অবশ হয়ে আসছে। ও ধপাস করে শুয়ে পড়ল লেপ মুড়ি দিয়ে। মনে হচ্ছে ওর শরীরের হাড়গোড় সব ভেঙে চূর্ণ হয়ে গেছে।

একটা লেপেও শীত কাটছে না। ও কাঁপা গলায় বলে—মা, আর একটা লেপ-টেপ দিতি পারো? শীতে মলাম!

দ্বিতীয় লেপেও যখন ওর কাঁপুনি থামে না, তখন মা ওর গায়ে হাত দিয়েই আর্তনাদ করে উঠলেন—ওরে আমার পোড়া কপাল! কী ক্ষ্যাণেই মাছ ধরার মতি হল আজ তোর। মরিছিস তো। তোর গা যে আগুনির মতো গরম! জ্বর-টর হল নাকি?

জ্বরটা যে এবার বেশ আয়োজন করেই এসেছে সেটা রুনুও টের পাচ্ছে হাড়ে হাড়ে। ওর মুখে আর কথা নেই।

শ্রীনাথ পণ্ডিতের মুখের কথাটা যে সত্যিই ফলে যাবে তা কি তিনি কল্পনাও করতে পেরেছিলেন? নিতান্তই মুখের কথা। ঠান্ডা-ফান্ডা লাগালে ওকথা তো সব বাবা-মাই বলে থাকেন ভয় দেখাবার জন্যে। জুজুর ভয় আর নিউমোনিয়ার ভয় তাদের কাছে একই অর্থ। কিন্তু হায়, ওই যে বলেছিলেন—নির্ঘাত নিউমোনিয়া হবে, সেই নিউমোনিয়া-জুজু সত্যই ধরে বসল রুনুকে। ওর সেই বৈঠা বাওয়ার গা-ব্যথা রাতারাতি নিউমোনিয়ার দিকে মোড় নিল। সেই যে ধুলো পায়ে ধপাস করে শুয়ে পড়েছিল বিছানায়, সেই শোয়াই চলল দিনের পর দিন, মাসের পর মাস।

প্রথম সপ্তাহটা শ্রীনাথ পণ্ডিত নিজেই আয়ুর্বেদমতে চিকিৎসা চালালেন। কবিরাজির নেশা ওঁর অনেক দিনের। এতদঞ্চলে ওঁর কবিরাজির বেশ হাতযশও আছে। কিন্তু সব বটিকা, পাচন, চূর্ণ ইত্যাদি ব্যর্থ করে দিয়ে রুনুর জ্বরটা অব্যাহতই রয়ে গেল। সকালের দিকে একটু কমে তো সন্ধ্যার দিকে আবার বেড়ে যায়। দিনে দিনে বাড়ছে দুর্বলতা। ক্ষীণতর হয়ে যাচ্ছে গলার আওয়াজ।

ইন্দ্র তো সেই থেকে একেবারে মরমে মরে আছে। কোথায় কোন কুকুরে না বিড়ালে খেয়ে নিল সেই সাধের ইলিশ, কোথায় পড়ে রইল সেই ভিজে জাল স্তূপীকৃত হয়ে, সেকথা আর মনেও পড়ল না ওর। সেই থেকেই ওর সারাদিন সারা রাত কাটে রুনুর পাশে বসে। রুনুর জ্বরটা ছাড়াবার জন্যে যদি কেউ ওকে গন্ধামাদন পর্বতটা মাথায় করে আনতে বলত, ও তখুনি ছুটে যেত; যদি বলত প্রাণ দিতে, ও অনায়াসে প্রাণ দিত। সেই থেকে ওর দোকানের ঝাপ আর খোলেনি। বাবা যখন যেমন অনুপাত জোগাড় করতে বলেছেন ও সব কাজ ফেলে ছুটেছে। যখন যেভাবে যে ওষুধটি খাওয়াতে বলেছেন, ও ঘড়ি দেখে যত্ন করে খাইয়েছে।

এক সপ্তাহ পরে ইন্দ্রই ছুটল গোপালগঞ্জে। একেধারে সঙ্গে করেই ধরে নিয়ে এল যোগেন ডাক্তারকে।

তিনি তো ঘটনা শুনে রুগ্ন রুনুকেই একচোট বকলেন।

—এখন তো আর ছেলেমানুষ নও, বড় হয়েছ, বুদ্ধি শুদ্ধি হয়েছে। এই পড়া পড়তে এসেছিলেন বাড়িতে! ছিঃ ছিঃ, এবার তোমার পরীক্ষার বছর, মাছ ধরার নেশায় সে কথাটাও ভুলে গেলে?

ওরে আর বকবেন না ডাক্তারবাবু!—বলতে বলতে কেঁদে ফেলে অতবড় জোয়ানমর্দ ছেলে ইন্দ্র—ওর কোনও দোষ নাই, ও তো নাওয়া-খাওয়া থুয়ে পড়তি শুরু করিছিল। সব দোষ আমার। এখন ওরে বাঁচান ডাক্তারবাবু! আপনার পায়ে পড়ি!

দাদার কথা শুনে রুনুর বুকের মধ্যে গুমরে ওঠে একটা সুখের কান্না। ওর মন বলে, দাদার এই ব্যাকুলতাই ওকে সুস্থ করে তুলবে। শৈশবে যেমন দাদার উপর সব আপদ-বিপদের দায় চাপিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্তে দাদার সাকরেদি করেছে নানা দুঃসাহসী অভিযানে, এবারও তেমনি ওর সুস্থ হওয়ার দায়টাও দাদার উপর চাপিয়ে দিয়ে শূন্য দৃষ্টিতে শূন্য ভবিষ্যতের পানে তাকিয়ে আছে রুনু। আর কদিন ছুটি আছে, কবে খুলবে স্কুল, কবে শুরু হবে টেস্ট পরীক্ষা, কী হবে সে পরীক্ষার ফল, কে জানে! যা ভাববার ভাবুক দাদা। যা করবার করুক দাদা। ওর কেবল দাদার মুখের দিকে চেয়ে থাকা। ওর আর কিছু ভাববার শক্তি নেই।

খুব যত্ন নিয়েই চিকিৎসা শুরু করলেন যোগেন ডাক্তার। অতদূর থেকেও সপ্তাহে তিনদিন করে আসতে শুরু করলেন অনেক জরুরি কল ফেলে। দেখতে-দেখতে পূজার ছুটি ফুরিয়ে গেল। রুনুর খাড়া হবার কোনও লক্ষণই দেখা গেল না।

হরেকেষ্ট প্রতিদিনই আসে রুনুর খবর নিতে। পড়াশুনোর কথাও মাঝে-মাঝে আলোচনা করে। কিছুই মনে করতে পারে না রুনু। যা পড়েছিল সে সব যেন কোনও এক অতীত যুগের ঘটনা। সব অস্পষ্ট হয়ে গেছে। চোখ বুজে মনে করতে পারে না ভারতবর্ষের ম্যাপটা, অথবা তেরো উপপাদ্যের ছবিটা।

শেষ পর্যন্ত ভয়ে পেয়ে গেলেন যোগেন ডাক্তারও। তিনিই একদিন ডেকে আনলেন গোপালগঞ্জের প্রবীণতম ডাক্তার বিজিতেনবাবুকে। দুই ডাক্তারে পরীক্ষা-পরামর্শ অনেক হল। ইনজেকশান মিকশচার সমানে চলল, কিন্তু রুনু বর্ষাকালে গোড়ায় জলজমা লাউলতার মতো ক্রমেই নেতিয়ে পড়ছে।

স্কুল খোলার পরে হরেকেষ্টর মুখে খবর পেয়ে ওর ক্লাসের সহপাঠীরাও মাঝে-মাঝে ওকে দেখতে আসে। নিয়ে আসে অনেক ফল-টলও। কোনও ফলেই কিছু ফল হল না। তাদের মুখেই খবর পাওয়া গেল, আর এক সপ্তাহ পরেই শুরু হবে টেস্ট পরীক্ষা। খবরটা যেন একটা বজ্রাঘাত!

টেস্ট পরীক্ষার তিনদিন আগে এলেন স্বয়ং হেডস্যার। তাঁর সঙ্গেও এসেছিল কয়েকজন ছাত্র। চার মাইল পথ পায়ে হেঁটে এসেছেন হেডমাস্টারমশায় একজন অসুস্থ ছাত্রের খবর নিতে। এটাও যে একটা খবরের মতো খবর। তাঁকে দেখেই রুনু সন্ত্রস্ত হয়ে উঠতে যাচ্ছিল প্রণাম করতে। হায়, সে শক্তি কি তার আছে! একটু মাথা তুলতেই মাথা ঘুরে আবার শুয়ে পড়তে হল। হেডস্যারই ব্যস্তভাবে তার পাশে বসে ওকে সযত্নে শুইয়ে দিলেন। অনেক সান্ত্বনার কথা বললেন। তিনি যতই অভয় দেন ততই রুনুর চোখের জলের ধারা বেয়ে যায়।

এক সময় শ্রীনাথ পণ্ডিতকে আড়ালে ডেকে নিয়ে কী সব পরামর্শ করলেন। খানিক বাদে আবার ফিরে এলেন রুনুর শিয়রে। ওর গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন—থাক, থাক, কাঁদতে হবে না। কিছু ভাবতে হবে না তোর। টেস্ট পরীক্ষা তোর দিতে হবে না। তোকে অ্যালাউ করে দেব। তারপর সুস্থ হয়ে ফাইন্যাল পরীক্ষা দিবি।

পরীক্ষা দেব। আমার যে কিছুই মনে নেই স্যার!—বলতে-বলতে চোখ মোছে রুনু।

—সে পরীক্ষার এখনও অনেক দেরি আছে। ইতিমধ্যে সুস্থ হয়ে উঠবি।

সুস্থ হব?—ক্ষীণ কণ্ঠে বলে রুনু।

—নিশ্চয় সুস্থ হবি। সুস্থ হলে দেখবি সব আবার মনে পড়বে।

মনে পড়বে? আমি জানি না। আমার কিছু মনে নাই।—ক্ষীণতর হতে-হতে ক্রমে রুদ্ধ হয়ে আসে ওর কণ্ঠ।

ইন্দ্রর ছোটাছুটির আর অবধি নেই। গোপালগঞ্জ যেতে হচ্ছে প্রায় প্রতিদিনই। যখনই অবসর পাচ্ছে ছুটে আসছে রুনুর শয্যাপার্শ্বে। মাঝে-মাঝে ওর কঙ্কালসার শরীরটাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকে। যেন ওর সুস্থ দেহের স্পর্শ দিয়ে সুস্থ করে তুলবে রুনুকে। চুম্বকের স্পর্শে যেমন লোহাও চুম্বক হয়ে যায়।

একদিন ইন্দ্র বলে—আচ্ছা, রুনু, ইতিহাস পড়িছিলাম কোন বাদশার নাকি খুব অসুখ করিছিল, তারপর তার সুস্থ ছেলে সেই অসুখটা নিয়ে নিল, বাদশা সুস্থ হয়ে গেল। তোর অসুখটা যদি দিত আমারে ভগবান! জানিস, আমি দিন-রাত সেই প্রার্থনা করতিছি। তা...

রুনু তার দুর্বল হাত তুলে দাদার মুখে চাপা দেয়। কথা বলতে পারে না। গলা শুকিয়ে আসে আবেগে। অদ্ভুত একটা ভালো লাগার আমেজে চোখ বুজে আসে ওর। দুহাতে দাদার হাতখানা জড়িয়ে ধরে তার তপ্ত বুকের উপর চেপে রেখে মহাশান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ে।

এই রুনুকে দেখে কে বলবে যে ওর বয়স এখন ষোলো বছর! এখনও যেন দাদার উপর সব-দায়-ছেড়ে-দেওয়া সেই ছ-সাত বছরের শিশুটি।

দশ

সেই অক্টোবরের মাঝামাঝি পুজোর ছুটিতে বাড়ি গেছিল সুস্থ রুনু, একটা মস্ত উচ্চাশা আর কঠিন সঙ্কল্প বুকে নিয়ে। ফিরে এল ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি। ফিরে এল হাড়জিরজিরে একটা পিলে-সার শরীর আর ন্যাড়ামাথা নিয়ে। তখন আর সে উচ্চাশার এতটুকু অবশিষ্ট নেই, নেই সেই সঙ্কল্পটাও। তখনও পূর্ণিমা-অমাবস্যায় একটু করে জ্বর আসে, তখনও দুবেলা 'ডি গুপ্ত' খেতে হয়। ম্যাট্রিক পরীক্ষা শুরু হতে তখন পুরো একমাসও বাকি নেই।

যোগেন ডাক্তারের বাসায় ওকে পৌঁছে দিলেন স্বয়ং শ্রীনাথ পণ্ডিত।

নৌকা থেকে নেমে ন্যাড়ামাথা রুনু অবসন্ন পায়ে হেঁটে আসছিল বাবার পিছনে-পিছনে। গায়ের মোটা চাদরে যদিও পিলেটা ঢাকা পড়েছে, কিন্তু ওর কোটরগত চোখ, হাড্ডিসার ফ্যাকাসে মুখ দেখে গোপালগঞ্জের চেনা মানুষেরাও চিনতে পারে না। সকলেরই এক প্রশ্ন,—কি হইছে তোমার?

সারা পথ অসুখের বর্ণনা দিতে-দিতে ডাক্তারবাবুর বাসায় যখন পৌঁছল রুনু, তখন সেখানেও সে একটা দর্শনীয় বস্তু হয়ে উঠল। সংবাদ আগেই দেওয়া ছিল, তাই ডাক্তারবাবুও আজ বের হননি কোনও কল-এ।

ছোটমাসি ওর হাত ধরে নিয়ে বসিয়ে দিলেন ওর জন্যে পেতে রাখা পাট-করা বিছানাটায়। ওর পিঠে হাত রেখে বসলেন পাশে। তারপর কথা বলার আগেই দুচোখ বেয়ে নমে এল অশ্রুধারা। কাঁদতে-কাঁদতে বলেন—কী ক্ষ্যাণেই এবার বাড়ি গিছিলি রে বাবা! তখন ছেলের কী জিদ! কি, না, বাড়িতে পড়াশুনো ভালো হবে। কী পড়াই পড়ে আলি রে বাবা!

তিন মেয়েও ঘিরে বসেছিল রুনুকে। মাকে কাঁদতে দেখে কাঁদতে শুরু করেছে তারাও। একটা সুখের বাড়ি দেখতে দেখতে হয়ে উঠল শোকের বাড়ি। কান্না পাচ্ছে রুনুরও। সে কান্নার সুর আলাদা। সে কান্নায় বেদনার সঙ্গে একটা গভীর তৃপ্তির স্বাদ। সে এক নতুন সুখের কান্না। এত ভালোবাসে এরা সকলে আমাকে!—বলছিল ওর সুখী পরিতৃপ্ত প্রাণটা; অথচ এই ভালোবাসার বন্ধন ছিড়ে কীসের লোভে যে আমি সেবার পালিয়ে গেলাম। গেলাম যে আশা নিয়ে, সে আশাও তো ভেঙে দিল নিষ্ঠুর ভগবান। তখন যদি অমন করে চলে না যেতাম, হয়তো এ দুর্গতি আমার হত না।

এতক্ষণ বাইরের ঘরে বসে ডাক্তারবাবু শ্রীনাথ পণ্ডিতের সঙ্গে রুনুর পরীক্ষার বিষয়ে কথা বলছিলেন। পণ্ডিতমশায় সব দায়টাই ডাক্তারবাবু এবং হেডমাস্টার মশায়ের উপর ছেড়ে দিলেন। ওঁরা যদি রুনুর অবস্থা দেখে মনে করেন ওর পরীক্ষা দেওয়া সম্ভব তো দেবে। না হলে ঈশ্বরের দেওয়া শাস্তি মাথা পেতেই নিতে হবে। ডাক্তারবাবুও এ বিষয়ে হেডমাস্টারমশায়ের সঙ্গে আলোচনা করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিলেন।

ওদের কান্নার আসরে প্রবেশ করেই ডাক্তারবাবু সবাইকে ধমক লাগালেন।

—কী কান্নাকাটি জুড়ে দিলে তোমরা! সবাই ওকে উৎসাহ দেবে, তা না...। দেখি, হাত দেখি।

ডাক্তারবাবু ওর নাড়ি দেখলেন, পিলেটা টিপে দেখলেন, দেখলেন বুক, জিভ চোখের পাতা। তারপর প্রশ্ন করলেন—অমাবস্যা-পূর্ণিমায় এখনও জ্বর আসছে?

—হ্যাঁ, তখন ভারি খারাপ লাগে। তখন একটুও পড়তে পারি না।

—পড়ার কথা তোমার ভাবতে হবে না। আগে সুস্থ হও দেখি। 'ডি গুপ্ত' নিয়মিত খাচ্ছ তো?

—হ্যাঁ।

ঠিক আছে, ওটা চলুক। আর একটা টনিক দেব। আর শোনো—বললেন ছোটমাসিকে—দুবেলা দুধ যতটা খেতে পারে খাওয়াবে ওকে। প্রতিদিন অন্তত দুটো করে কমলা দেবে। আর শোন পুষি, তুই আর পমি প্রতিদিন বিকেলে রুনুদাকে নিয়ে নদীর পাড়ে বেড়াবি তো। চার মাস ধরে শুয়ে থেকে ওর...

শুয়ে থেকে কী যে হয়েছে সে কথাটা না বলেই চলে গেলেন পণ্ডিতমশায়কে যত্ন-আত্তির ব্যবস্থা করতে।

সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই রুনুর স্বাস্থ্যের উন্নতি ধরা পড়ল সকলের চোখে। হাসি ফুটল রুনুর মুখেও। প্রতিদিন বিকেলে পুষি আর পমির সঙ্গে নদীর পাড়ে বেড়াতে-বেড়াতে ছেলেমানুষি গল্প করে। নাকি টনিকের জোরে, না কমলার সারা ক্ষণের আন্তরিক সেবায়, নাকি এই সবেরই সম্মিলিত প্রভাবে এত দ্রুত সেরে উঠল রুনু, কে জানে! ওর মনে হয় কমলার হৃদয়-ঢালা সেবাই ওকে সুস্থ করে তুলল। ওকে নিয়মিত ওষুধ খাওয়ানো, ওর কমলা ছুলে একটা-একটা করে কোয়া ওর মুখে তুলে দেওয়া, ওর স্নানের জন্যে গরম জল করা, মাঝে-মাঝে ওর জামাকাপড় কাচা, বিছানা রোদে দেওয়া—সব কাজ স্বেচ্ছায় গ্রহণ করেছে কমলা। সেবার সুযোগে ওর কাছে থাকতে পারাটুকুই যেন কমলার একমাত্র কাম্য। কমলাই ওকে ভরসা দেয়—পরীক্ষা তুমি নিশ্চয় দিতি পারবা এবং পাশও করতি পারবা, এই আমি কয়ে রাখলাম।

—আমার যে কিছুই মনে নেই কমু।

—পরীক্ষার হলে বসলি দ্যাখবা সব মনে পড়বে। তুমি কি যে সে ছাত্তোর! সোনার মেডেল পাওয়া ছাত্তোর।

আশ্চর্য একটা প্রেরণা পায় রুনু কমলার এসব কথায়। তখন মনে হয় কমলা কত ভালো। রুনুর মনে মনে একটা ভয় ছিল, কমলা বুঝি ওর ওপর খুব অভিমান করবে, হয়তো কথাই বলবে না রাগ করে। কিন্তু একটা দিনও ওর কোনও কথায় বা আচরণে এতটুকু অভিমান প্রকাশ পেল না। সত্যি কী আশ্চর্য মেয়ে কমলা, মনে মনে বলে রুনু।

তুমি যে পড়াশুনো একেবারে ছাড়ে দিলে কমু? নতুন ক্লাসে উঠিছ। এখনেত্তে ঢিলে দিলি...অনুযোগের সুরে বলে রুনু।

ক্লাস নাইনে গোড়ার দিকে কয়জনই বা পড়ে তোমার মতো ভালো ছাত্তোর ছাড়া? এখনও তো বই-টই সব কেনা হয় নাই। সব ক্লাসও হয় না। তাছাড়া আমার ভাবনা কি? —রহস্যজনক হেসে বলে কমলা।

—কেন, এত নির্ভয় হলে কিসি?

—বাঃ, পরীক্ষের পরে তো তোমার লম্বা ছুটি। তখন তোমার কাছে সুদে আসলে পড়ে নেব। তোমার জন্যি এত খাটতিছি কি সাধে?

ওর আন্তরিক সেবাটার একটা স্বার্থপর ব্যাখ্যা দিয়ে কমলা হয়তো ভাবে রুনু বুঝবেই না ওর মনের কথাটা। ওর এই সেবা যে কী আনন্দের সেবা তা কি বুঝবে রুনু কোনোদিন?

হয়তো বোঝে, হয়তো বোঝো না রুনু। বেশি তলিয়ে ভাববার মতো শক্তিও যে নেই ওর মস্তিষ্কে। অসুখের পর ও যেন সত্যিই বড় স্বার্থপর হয়ে উঠেছে। ও ভাবে ওকে সুস্থ করে তোলার দায় বাড়িতে যেমন ছিল দাদার উপর, এখানেও তেমনি কমলার উপর। কেন তারা ওকে সেবা করবে না? বাড়িতে যেমন দাদাকে, এখানেও তেমনি কমলাকেই যে ও সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে।

নির্দিষ্ট দিনে বাসা থেকে ডাক্তারবাবুও ছোটমাসিকে প্রণাম করে, এবং স্কুলে গিয়ে হেডস্যারকে প্রণাম করে যথা সময়ে পরীক্ষার হলে প্রবেশ করল রুনু।

হেডস্যার ওর মাথায় হাত রেখে বললেন—আমি অনেক ভেবেই তোমাকে দিয়ে পরীক্ষা দেওয়াচ্ছি রুনু। হয়তো এবছর ড্রপ করলে সামনের বছর তোমার রেজাল্ট ভালো হত, কিন্তু তাতে একটা ভয়ও ছিল।

—সে ভয় আমারও আছে স্যার। আমি বোধহয় নীচের ক্লাসের ছেলেদের সঙ্গে একসাথে বসে আসছে বছর পড়তেই পারব না।

—ইয়েস, তোমাদের মতো সেন্টিমেন্টাল ছেলেদের সেইটেই প্রবলেম। আমার তো দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা। দেখেছি ভালো ভালো ছেলে একবার মনোবল হারালে জীবনে আর উঠে দাঁড়াতে পারে না। মনোবল হারিও না। পরীক্ষা দাও শান্তভাবে। পাশ তুমি করবেই।

পরীক্ষার হলে কিন্তু মনোবল রক্ষা করেও মস্তিষ্কের বল রক্ষা করা গেল না আশানুরূপ ভাবে। প্রতিদিনই প্রথম পেপারটা মোটামুটি ভালো হয়, কিন্তু বিকেলের পেপারে প্রতিবাদ করে মাথা। সব যেন কেমন গুলিয়ে যায়। মাথার মধ্যে ঝিঁ ঝিঁ করতে থাকে। কোনওক্রমে শেষ করে উঠে পড়তে পারলেই যেন রক্ষা পায়। একটানে একবার যা লিখে গেল, ব্যস, ওই পর্যন্ত। রিভিশানের আর দম থাকে না। কোথাও একবার থেমে গেলে আর এগুবার সাধ্য থাকে না। কোনো কোনো দিন তো ঘণ্টা খানেক আগেই উঠে পড়তে বাধ্য হল মাথার অস্বস্তিতে।

সব মাস্টারমশায়রাই ওকে দু-বেলা উৎসাহ দিয়েছেন। একদিন শ্রীনাথ পণ্ডিতও এসে ওকে আশ্বাস ও আশীর্বাদ জানিয়ে গেছেন। আর ডাক্তারবাবুর বাড়ির সকলেই বিশেষ করে কমলা তো অহরহ ওকে অভয়বাণী শুনিয়ে চলেছে—পাশ তুমি করবেই, পাশ তুমি করবেই।

পরীক্ষা পর্ব কোনো রকমে শেষ করে রুনু হেডমাস্টারমশায়কে প্রণাম করতে এসেই ঝরঝর কেঁদে ফেলল।

—যে উদ্যম নিয়ে এবার পুজোর ছুটিতে শুরু করিছিলাম স্যার, হয়তো আপনার স্বপ্ন সফল হত। সব শেষ হয়ে গেল। কী পরীক্ষাই যে দিলাম!

—এ অসুখটা তোমার অনেক ক্ষতি করল তা সত্যি। তবে পাশ তুমি করবেই। তবে আমার আশা ছিল... থাকগে, ও নিয়ে আর আপসোস করে লাভ নেই। তবে ওই কথাটা কখনও মনে স্থান দিও না রণজিৎ। কিছুই শেষ হয়ে যায়নি।

—না স্যার, জীবনে হয়তো আর...

—ছিঃ, নিরাশ হতে নেই। তোমার সামনে দীর্ঘ পথ। শেষ নয়, এই তো যাত্রা শুরু হল। উচ্চাশা ছেড়ো না। উচ্চাশাই মানুষকে বড় করে। মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে।

আরও অনেক বড় বড় কথা বলেছিলেন সেদিন হেডস্যার। তারপর ওর হাতে একখানা পোস্টকার্ড দিয়ে বলেছিলেন—এই নাও, তোমার একটা চিঠি।

হাতের লেখা দেখেই চিনেছে রুনু। অদ্ভুত একটা উত্তেজনা বুকে নিয়ে প্রায় দৌড়ে বেরিয়ে এল হেডস্যারের ঘর থেকে। বারান্দায় এসেই এক নিশ্বাসে পড়ে ফেলল কয়েক লাইনের পোস্টকার্ডখানা। মনে মনে শিহরিত হলঃ এ চিঠি হয়তো হেডস্যারও পড়েছেন। চিঠি পড়ে কী ভেবেছেন তিনি? তিনি কি চিনতে পেরেছেন খোকাদাকে?

খোকাদার চিঠি পড়ে সমস্ত পরিকল্পনা ওর পাল্টে গেল। গোপালগঞ্জ শহরটাই যেন মুছে গেল ওর মন থেকে। মনের পর্দায় ভেসে উঠল বাজুনীয়ার ছবি, খোকাদার ঘরের ছবি। মনে পড়ল সেই দুষ্টু আর মিষ্টি মেয়েটার হাসিভরা চঞ্চল চোখ দুটি। যে মেয়ে বসুন্ধরাকে বসন্ধরাই পড়বে, কারণ ছাপার অক্ষরে যে বসন্ধরা লেখা আছে!

মনে মনে হিসেব করল রুনু, সেই চুয়াও তো এবার ক্লাস নাইনে উঠল, যেমন ক্লাস নাইনে উঠল কমলা। কমলার মতো চুয়াও নিশ্চয় এখন শাড়ি পরে। সেই শাড়িপরা চুয়ার ছবিটা কল্পনা করতে-করতে ও পাল্টে ফেলল পরীক্ষার পরের লম্বা ছুটির প্রোগ্রামটা।

আগে স্থির ছিল, পরীক্ষা হয়ে গেলে (সে খবর তো হরেকেষ্টর কাছেই পাওয়া যাবে) দাদা এসে ওকে বাড়ি নিয়ে যাবে। বাড়িতে কিছুদিন থেকে ও ফিরে আসবে গোপালগঞ্জ। তারপর রেজাল্ট না বেরুনো পর্যন্ত ডাক্তারবাবুর বাসায় থেকেই ও মেয়েদের পড়াবে, পারলে এক-আধটা টিউশনিও করবে, এবং প্রাইজের বইগুলি একে একে পড়ে ফেলবে।

টিউশনির পরামর্শটা বাবার। এ কমাসে যদি টিউশনি করে কিছু টাকা রোজগার করতে পারে, সেটা খুব কাজে লাগবে ওর কলেজে ভরতি হবার সময়।

এবার ঠিক করে ফেলল, বাড়িতে সপ্তাহ খানেক থেকেই চলে যাবে ও বাজুনিয়া। সেখানে টিউশনিতো ওর বাঁধাই আছে। সেই ক্লাস ফোরের চুয়াকে পড়াতেই ওকে শৈলদি পাঁচ টাকা করে দিতে চেয়েছিলেন, ক্লাস নাইনের চুয়াকে পড়াতে নিশ্চয় আরও বেশি দেবেন।

চিঠিখানা যেন দৈবাদেশের মতো মনে হচ্ছে রুনু। এই মুহূর্তেই যেন এটা ভগবানই তুলে দিলেন ওর হাতে ওর ভবিষ্যতের পথনির্দেশ করতে। ক্ষণপূর্বে যে নৈরাশ্য কাটিয়ে দিয়ে চিঠিখানা একটা উজ্জ্বল ভবিষ্যতের পথ দেখিয়ে দিচ্ছে ওকে। খোকাদাই তো ওর জীবনের সর্বোত্তম বন্ধু। খোকাদার আহ্বান অমোঘ। এ ডাকে সাড়া না দেবার সাধ্য ওর নেই। এই একটি আহ্বান ছিন্ন করে দিল ওর সকল মায়ার বন্ধন। ভুলল বাড়ির কথা, গোপালগঞ্জের কথা, ছোটমাসির কমলার কোমল ভালোবাসাটুকুর কথাও।

আমি কী অকৃতজ্ঞ? আমি কী নিষ্ঠুর?—নিজেকেই প্রশ্ন করল রুনু।

খোকাদার চিঠিখানাই যেন ওর প্রশ্নের জবাব দিল—তুচ্ছ মায়ার বন্ধনে বন্দী হয়ে সময়কে হারিয়ে যেতে দিও না রুনু। সময়কে ধরে রাখতে হয় কাজ দিয়ে।

বাড়ি গিয়ে বাবাকে পড়ে শোনাল রুনু খোকাদার চিঠিখানা। খোকাদাকে বাবা একবারই মাত্র দেখেছেন কয়েক মিনিটের জন্যে। সে অবিস্মরণীয় দর্শনের কথা ভুলে যাননি নিশ্চয়।

খোকাদা লিখেছেনঃ

'পরীক্ষা নিশ্চয় ভালো দিচ্ছিস। দিতেই হবে। (হায়, কী ভালো পরীক্ষাই দিয়ে এল রুনু! প্রথম লাইনটা যত বারই পড়েছে তত বারই ওর চোখ ঝাপসা হয়ে এসেছে। বাবার কাছে পড়তে বসেও চোখ মুছতে হল।) তারপর তো লম্বা ছুটি। কী করতে চাস ও সময়টাতে? আর পাঁচটা ছেলের মতো হেসে-খেলে, আড্ডা মেরে অপচয় করবি সময়টাকে? তার চেয়ে বরং কিছু কাজ কর। চলে আয় আমার এখানে। সেবার তো কেবল আমার বইয়ের বোঝাই দেখে গেলি। এবার পড়বি। আমিই পড়াব তোকে। কত যে পড়বার আছে রে রুনু। একটু সময়ও যেন হারিয়ে না যায়। সময়কে ধরে রাখতে হয় কাজ দিয়ে। না হলে পরে আফসোসের সীমা থাকে না। কলেজে পা দেবার আগের প্রস্তুতিটুকু আমার এখান থেকেই শুরু হয়ে যাক না। কি বলিস? কতদিন তোকে দেখি না আমরা। খোকাদারে ভুলে যাসনি তো?

চিঠির শেষ কথাটাতেও প্রতিবার হোঁচট খায় রুনু। সত্যিই, এই কবছরে কবার মনে পড়েছে ওর খোকাদার কথা? অথচ এমন করে ওকে মনে রেখেছেন খোকাদা! ও কি সত্যিই নিষ্ঠুর? ও কি অকৃতজ্ঞ? আবার সেই প্রশ্নগুলি পীড়া দেয় ওকে।

শ্রীনাথ পণ্ডিত ভোলেননি খোকাদাকে। আজও চিঠিটা শুনে অভিভূত গলায় বলেন—আশ্চর্য একটা ছেলে তোর খোকাদা। মৃদুনি কুসুমাদপি ব্রজাদপি কঠোরশ্চ তার একটা সার্থক উদাহরণ। অমন স্নিগ্ধ, অমন বিনয়ী, অমন অগাধ পণ্ডিত, অথচ প্রয়োজনের মুহূর্তে একটা জ্বলন্ত অগ্নিপিণ্ড। ওরাই যুগাদর্শ। ওদের আমরা কতটুকু বুঝতে পারি? যা রুনু, ওই তোর যোগ্য স্থান। এ যেন ঈশ্বরেরই নির্দেশ। দেখবি তোর কলেজে পড়ার ব্যাপারে উনিই সব ব্যবস্থা করে দেবেন। একবার মাত্র দেখেছি, কিন্তু ওইটুকু দেখেই বুঝেছি, খাঁটি সোনা, কণামাত্র খাদ নেই। বড় ভাবনা ছিল আমার তোর ভবিষ্যৎ নিয়ে। ঈশ্বরই ওঁকে যথাসময়ে দিলেন।

সুটকেসের মধ্যে প্রাইজের বইগুলি ও মেডেল দুটি-সহ কিছু জামাকাপড় সযত্নে গুছিয়ে নিল রুনু। ওগুলির যথার্থ মর্যাদা যেন খোকাদা চুয়া আর শৈলদির কাছ থেকেই পাওয়া যাবে। সেই প্রাইজ ডিস্ট্রিবিউশানের গল্পটা নিশ্চয় শুনতে চাইবে চুয়া। একটা রোমাঞ্চিত পুলকে অস্থির বোধ করছে রুনু সুটকেস গোছাতে-গোছাতে।

আবার সেই করুণ বিদায়ের পালা মধুমতীর তীরে দাঁড়ানো হরেকেষ্টর কাছ থেকে। বড় আশা করেছিল হরেকেষ্ট, এই ছুটির দিনগুলি ওরা দুটিতে অনেক কিছু পড়াশোনা করবে একসঙ্গে। হরেকেষ্টকে সান্ত্বনা দেবার মতো কোনও কথা খুঁজে পায় না রুনু। ছোট্ট ডিঙিখানা ধীরে ধীরে এগিয়ে চলে। হরেকেষ্টর ছলছল চোখের দিকে চেয়ে ওরও দুচোখ ঝাপসা হয়ে আসে।

তেমনই চোখের কোণে অশ্রু জমা হয় গোপালগঞ্জের ঘাটে দাঁড়ানো কমু, পমি আর পুষ্পর ছলছল চোখের দিকে চেয়ে। ওরাও আশা করেছিল, এই লম্বা ছুটিটা রুনুদা ওদের নিয়েই আনন্দ করে কাটাবে।

সব বন্ধন ছিঁড়ে সেই আদি অকৃত্রিম নগরবাসী ওদের ছোট্ট ডিঙিখানা বেয়ে ক্রমেই এগিয়ে যায় বাজুনিয়ার দিকে। ক্রমে অস্পষ্ট হয়ে যায় পেছনে-ফেলে আসা গ্রামখানা।

শারদীয়া কিশোর ভারতী ১৯৭৬

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%