শ্যামদাস দে

ডাক্তারবাবুর বাড়ি থেকে বিদায় নেওয়ার ব্যাপারটা খুব সহজ ছিল না রুনুর পক্ষে। তবু তো বিদায় নিতেই হবে। ইতিমধ্যেই মাসাধিক কাল কেটে গেছে এ-বাড়িতে। অথচ মায়ের কাছে কথা দিয়ে এসেছিল দিন পনেরোর মধ্যেই ও ফিরে যাবে খুলনার বাড়িতে। সে আর হল কই! অবশ্য বিলম্বের কারণ বিস্তারিত লিখে চিঠি পাঠিয়েছে ও দাদার কাছে।
নদীর ঘাটে যেতে যেতে রুনুর মনে পড়ছিল ক্ষণপূর্বে মাসিমাকে প্রণাম করে ও বলেছিল,—আমি এবার কলকাতা গিয়ে নিয়মিত কমু ওদের কাছে চিঠি লিখব মাসিমা। আগের মতো আর ভুল হবে না।
মাসিমা কান্না ভেজা গলায় বললেন,—সত্যিই লিখবি তো? মনে থাকবে তো? তোকে বিশ্বেস নেই। তুই বড় নিষ্ঠুর রে!
'তুই বড় নিষ্ঠুর'—কথাটা ওর বুকের মধ্যে একটা গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছিল। এই কথাটা ওর এই বিশ বছরের জীবনে অনেকবার অনেকের মুখ থেকে শুনতে হল। দাদা বলেছে, পাঠশালার বন্ধু হরেকেষ্ট বলেছে, বরিশালের বন্ধু হারানদা বলেছে, বলেছে বউদিও। এবার এ বাড়িতে পদার্পণ করতেই পুষ্প বলেছে, বলেছে কমলাও একটু সুস্থ হতেই। শেষ পর্যন্ত বললেন মাসিমাও। অথচ ও আজও বুঝতে পারে না, ও কি সত্যিই খুব নিষ্ঠুর।
বরিশাল থেকে বিদায় নেবার প্রাক্কালে সেনগুপ্ত স্যারের কথাগুলি মনে পড়ল রুনুর। রুনু বলেছিল, আপনার স্নেহ, আপনার দয়ার কথা আমি কোনও দিনও ভুলতে পারব না স্যার। তিনি হেসে বলেছিলেন, ও কথা সবাই বলেরে। শেষ পর্যন্ত মনে রাখার দায়টা পড়ে বুড়োদের উপরেই। তোদের সামনে এখন কত চড়াই উতরাই। কত নতুন নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে করতে এগুতে হবে। সামনে যত এগুবি, পিছনটা তত অস্পষ্ট হয়ে যাবে। এই বর্তমান হয়ে যাবে অতীত। অতীতকে আঁকড়ে থাকা তো জীবন নয়। জীবন মানে গতি, জীবন মানে এগিয়ে যাওয়া। জীবন যে একটা অন্তহীন সংগ্রাম রে। সে জীবনে পিছন ফিরে তাকাবার সময় কোথায়? তাইতো রবীন্দ্রনাথ বলেছিল—'স্মরণের গ্রন্থি টুটে/সে যে যায় ছুটে/বিশ্বপথে বন্ধনবিহীন।' এই তো সত্যি কথা। এই কলেজ তোদের চলমান জীবনের পথে একটা মন্দির, আর আমরা সেই মন্দিরের স্থির বিগ্রহ। এখানে স্মৃতিভারে আমরাই পড়ে থাকব। তোরা ভারমুক্ত হয়ে ছুটে চলবি 'নব নব পূর্বাচলে আলোকে আলোকে।' সেই যাত্রাপথ তোর সুগম হোক, যাত্রা হোক সাফল্যমণ্ডিত। এই আমার আশীর্বাদ। রুনু বুঝতে পারে না, জীবন-যুদ্ধে জয়ী হতে হলে কি নিষ্ঠুর হতেই হবে?
নদীর ঘাটের দিকে যতই এগুচ্ছিল রুনু ততই যেন অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছিল ডাক্তারবাবুর বাড়ির এই এক মাসের স্মৃতি, আর বারে বারে মনে পড়ছিল এবার খুলনা থেকে আসবার সময় দাদার শেষ উপদেশ। দাদা ওকে সাবধান করে বলে দিয়েছিল,—দ্যাখ, রুনু, তুই যে কোহনিতে এই কলকাত্তাই ভাষা শিখিছিস, ওই ভাষায় কথা কলি আমারই পর পর মনে হয়। যাচ্ছিস তো দিদিগি সাথে দেখা করতি। তাগে সাথে আবার ওই ভাষায় কথা কোসনে যেন।
কেন তারা বুঝবে না?—প্রশ্ন করেছিল রুনু।
—হয়তো বোঝবে, কিন্তু তোরে আর আপনজন ভাববে না। প্রাণ খুলে কথাও কবে না। আচ্ছা, তুই কি আমাগে ভাষা একেবারে ভুলে গিছিস?
এট্টুও ভুলিনি। দিদিগি সাথে আমাগে গোবরার ভাষাতেই কথা কবো। এই যে এহোনে কলাম, কিছু কি ভুল হইছে?—হেসে বলেছিল রুনু।
হেসেছিল দাদাও,—এই তো দেখছি ঠিক মোনে আছে। ও দ্যাশের লোকের সাথে এইভাবে কথা কবি। তালি দেখবি তোরে আর কেউ 'ঘটি' ভাববে না। পর ভাববে না।
মনে মনে জন্মভূমির অকৃত্রিম ভাষায় ওদেশের সকলের সঙ্গে কথা বলবার জন্য নিজেকে তালিম দিতে দিতে নদীর ঘাটে এসে পৌঁছল রুনু।
এদেশে থাকাকালে দিদিদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার কাজটা দাদাই করেছে বরাবর। খুলনায় বাড়ি করার পর সে সব বন্ধ হয়ে গেছে। এখন দূরত্ব যেমন অনেক বেড়ে গেছে, দাদাও ব্যস্ত হয়ে পড়েছে সংসার আর চাকরি নিয়ে।
পথের খবর দাদার কাছ থেকেই জেনে এসেছে রুনু। যেতে হবে গোপালগঞ্জ থেকে কেরায়ে নৌকা করে। এ সময়টা যদিও পুরো বর্ষাকাল নয় সবে আষাঢ় শুরু, তবু ও সব বিলে দেশে ছোটখাটো ডিঙি নৌকায় যাতায়াত করা যায় সারা বছরই, যদিও বর্ষাকালের মতো সরাসরি পথে যাওয়া যাবে না এখন। যেতে হবে অনেক ঘুরে। হয়তো গোপালগঞ্জ থেকে হাঁটা পথে দশমাইল দূরের সাতপাড়া গ্রামে নৌ-পথে যেতে হবে প্রায় বিশ-পঁচিশ মাইল এবং একটা পুরো দিনই হয়তো লেগে যাবে।
বড়দি আর সেজদির শ্বশুর বাড়ি সাতপাড়ায়, আর মেজদির শ্বশুর বাড়ি ঘাগরে। একই মহকুমার মধ্যে হলেও গোপালগঞ্জ থেকে সাতপাড়া হল উত্তর দিকে আর ঘাগর পড়ে পুব দিকে। মেজদির ওখানে যেতে হলেও এখন যেতে হবে গোপালগঞ্জ হয়েই। সে দূরত্বও প্রায় পনেরো মাইল। অবশ্য গোপালগঞ্জ থেকে ঘাগরের পথে সারা বছরই নৌকা চলাচল করে একই পথে। বর্ষাকাল হলে নাকি সাতপাড়া থেকেই বিলে পথে সরাসরি যাওয়া যেত ঘাগরে এবং সময়ও লাগত অনেক কম।
রুনুর পরিকল্পনা হল প্রথমে সাতপাড়া যাওয়া। দাদা বলেছিল, সাতপাড়ার বিশ্বেস বাড়ির কথা বললে নাকি সব কেরায়ে মাঝিই চিনবে। ঘাটে পৌঁছে দেখল পাশাপাশি সাত-আটখানা কেরায়ে নৌকা বাঁধা রয়েছে। দাদার শেখানো মতো প্রথম মাঝিটিকেই প্রশ্ন করল,—সাতপাড়া গেরামডা চেনো তো?
—সাতপাড়া চেনবনা? খুব চিনি। ওধারে উলপুর, নারক্যালবাড়ি, আন্দাকোটা, কলপুর, ওড়াকান্দি, ওরগা, দুগগপুর, বৌলপুর, দিঘেলে...
একটানা বোধহয় গোটা পঁচিশ গ্রামের নাম করে একটু দম নিল মাঝি। তারপর জোর দিয়ে বলল,—সাতপাড়া চিনব না? ওধারের সব গেরাম চিনি। আমার বাবা ছেলো কেরায়ে মাঝি। এ নাও তেনার, এ বৈঠও তেনার। সাত বছর বয়সে এই বৈঠে ধরিছি আমি, আর এহোন তো পেরায় তিন কুড়ি কাবার হতি চললো। বয়স ষহোন পনর-ষোলো, সাঁই জোয়ান আমি। বাবা সগগে গেলেন, আমিও নাও নিয়ে জলে ভাসলাম। তোমারে নতুন মানুষ দেখতিছি। না হলি জটিক মাঝিরি এদ্যাশে না চেনে কেডা? সাতপাড়ার তো পেরায় মানসিই চেনে আমারে। ও গেরামে আমাগে আত্ম-কুমুমেও আছে। তা ও গেরামের কোন বাড়িডা তোমাগে কও দেহি ভাইডি?
জটিক মাঝি নামক 'বিখ্যাত' (?) ব্যক্তিটি যে একটু বেশি কথা বলে এবং দু চারটে মিথ্যে কথাও বলে তা প্রথম আলাপের তোড়েই বুঝল রুনু। নাওখানা ওর বাপের আমলের হলেও হতে পারে, কিন্তু ওর হাতের বৈঠাখানা যে সে আমলের নয়, তা অত্যন্ত পরিষ্কার। ওটার বয়স বড়জোর পাঁচ-সাত বছর। কমও হতে পারে। নিজের বয়সটাও একটু বাড়িয়েই বলেছে। তিন কুড়ির ধারে-কাছেও নয়। দেখে তো মনে হল চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশের বেশি নয়, কিন্তু লোকটা অভিজ্ঞ। ওদিকের সব গ্রাম চেনে। পথ-ঘাট চেনে। ওর চোখে-মুখে শিশুর সারল্য। ওর হাসিটা বড় সুন্দর। স্বাস্থ্যখানাও তাকিয়ে দেখবার মতো। হাসবার সময় ওর ঘন কৃষ্ণ গোঁপদাড়ির জঙ্গলের মধ্যে চকচকে দাঁতগুলি ঝিকমিক করে ওঠে। মানুষটিকে প্রথম দর্শনেই ভালো লাগল রুনুর। কিন্তু ভালো লাগেনি ওর 'ভাইডি' সম্বোধন। ও এখন নিজেকে একজন গ্র্যাজুয়েট মনে করে। এখনও যদি নৌকার মাঝিরা ওকে ভাইডি বলে আর 'তুমি' সম্বোধন করে তবে ও 'বাবু' হবে কবে?
বিরক্ত গাম্ভীর্যের সহিত রুনু বলে,—সাতপাড়া আমাদের বাড়ি নয়।
—তাই কও। তুমি সাতপাড়ার মানুষ না, তালি জটিক মাঝি তোমারে ঠিক চিনতি পারত। ভাইডির বাড়ি বুঝি এই গোপালগঞ্জেই?
রুনু আরও গম্ভীর হয়ে কড়া মেজাজে বলে,—আমার বাড়ি কোথায় তা দিয়ে তোমার দরকার কি বলতে পারো? সাতপাড়া যেতে কত নেবে বলো তো?
রেগে যাওয়ায় দাদার সতর্কবাণী ভুলে গেল রুনু। এদেশের মানুষের সঙ্গে যে এদেশী ভাষায় কথা বলতে হবে, সেটা খেয়াল রইল না।
ওর 'কলকাত্তাই' ভাষা শুনে জটিক মাঝিও যেন একটু গম্ভীর হল। সম্বোধনটা হঠাৎই 'তুমি' থেকে 'আপনি' হয়ে গেল।
—একাই যাবেন তো? না আর কেউ সঙ্গে আছে?
আর কাউকে কি দেখছ আমার সঙ্গে?—তেমনই রুক্ষ স্বরে বলে রুনু।
—বোজলাম। একাই যাবেন। তয় আর কত নেব? ছেলেমানুষ। মালপত্তোর বেশি নাই। ওই পাঁচসিহেই দেবেন।
—না, একটাকায় যাবে? যাবে তো বলো। না হলে...
ভাবটা যেন জটিক রাজি না হলে ও অন্য মাঝির সঙ্গে কথা বলবে। আশপাশের কয়েকজন মাঝিও লোভী চোখে তাকিয়ে আছে এই সকালের ছেলেমানুষ খদ্দেরটির দিকে।
আমি বেশি দরাদরি পছন্দ হরি না বাবু।—গম্ভীর ভাবে বলে জটিকঃ যা মোন চায় দেবেন। আপনি আমার আজকের পেথম সোয়ারী। আপনারে ছাড়ব না। গৌরহরি যা দেন তাই হাত পাত্যে নেব। ওঠেন, পায়ের ধুলো দ্যান।
রুনু আর কথা না বাড়িয়ে উঠে পড়ল নৌকায়। সঙ্গে সঙ্গে জটিক মাঝি যুক্ত কর কপালে ঠেকাল। এ প্রণামটি তার গৌরহরির উদ্দেশ্যে না প্রথম খদ্দেরের উদ্দেশ্যে কে জানে।
মনে মনে হাসল রুনু। বুঝল জটিক লোকটি বুদ্ধিমান। ওর মনোভাবটি বুঝতে পেরেই সম্বোধনে 'আপনি' ও 'বাবু' জুড়ে দিয়েছে।
ছই-এর ভিতরে গিয়ে মাঝির দিকে পিছন ফিরে বসল রুনু। 'হরিবোল হরিবোল' ধ্বনি দিতে দিতে শক্ত হাতে বৈঠায় টান লাগাল জটিক। নাওখানা এগিয়ে চলল উত্তর মুখে।
রুনু ওর স্যুটকেসের ভিতর থেকে একখানা ইংরাজি উপন্যাস বের করে বই-এ মনোযোগী হবার ভান করল। আসলে ও মাঝিকে বেশি কথা বলার সুযোগ দিতে চায় না। সুযোগ পেলেই আবার হয়তো 'বাবু' থেকে 'ভাইডি'তে নামিয়ে দেবে।
বস্তুত বই পড়তে চাইছে না রুনু। ও চাইছে সামনে তাকিয়ে এই জলপথের দু ধারের ছবিগুলি প্রাণভরে দেখতে। কানের কাছে একটা মানুষ বকবক করলে সে-দেখা সম্ভবই নয়। এ পথে এই প্রথম যাত্রা ওর। হয়তো শেষ যাত্রাও। হয়তো এ জীবনে আর এসব দেশে আসা হবে না। এর পর তো ও কলকাতা চলে যাবে এম.এ. পড়তে। তারপর হয়তো কর্মক্ষেত্রও হবে কলকাতাই। মনে প্রাণে যে তাই-ই চাইছে রুনু। কলকাতায় যে ওর অনেক আকর্ষণ। ওখানে রাঙা বউদি আছে, হাসি আছে, আছে হয়তো চুয়াও। খোকাদাও আছেন কি? তাঁর শেষ চিঠি তো পেয়েছিল রুনু কলকাতা থেকেই। সে অবশ্য দু-বছর আগের কথা। তারপর অবশ্য ওদের পত্র-প্রবাহটা অকস্মাৎই বন্ধ হয়ে গেছিল রায় বাড়ি থেকে বিতাড়িত হবার পর। ফুট নোট 'বৃন্তচ্চ্যুত রণু' শাকি ভা ১৯৮০
দৃষ্টিটা সামনের চলমান দৃশ্যাবলির দিকে থাকলেও মনটা যে কখন স্মৃতির সাগরে ডুব দিয়ে বরিশাল চলে গেছে সে খেয়ালও নেই রুনুর। বরিশাল থেকে আবার কখনও কখনও চলে আসছে ওর স্বপ্নের পুরী কলকাতায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ভবনের গম্বুজশোভিত গুরুগম্ভীর বাড়িটার কেবল ছবিই দেখেছে ও। এই মুহূর্তে যেন সেই ছায়াছবিটা কায়া গ্রহণ করে ভাসছে ওর চোখের সামনে।
জটিক মাঝি মাঝে মাঝে হরিবোল ধ্বনি দিলেও তার বৈঠার তাল ভঙ্গ হয়নি। জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দের সঙ্গে নৌকাটায় একটা ছন্দময় দোলার সৃষ্টি হচ্ছে। সেই দোলায় আর জলপথের স্নিগ্ধ সিক্ত হাওয়ায় বুঝি ওর একটু ঝিমুনি এসে গেছিল। হঠাৎ ওর কানে এল জটিক মাঝির গলা।
—খোকাবাবুর বুঝি ঘুম নাগিছে? আমার ক্যাঁথা বালিশ আছে। পাত্যে দেব? কয়েক ঘণ্টা বেশ ঘুমোতি পারবা।
এবারের সম্বোধন 'খোকাবাবু'। 'ভাইডির' মতো শ্রুতিকটু নয়। পারবেন না বলে যে পারবা বলল, সেটাও মন্দ লাগল না কানে।
রুনু ফিরে বসল মাঝির মুখোমুখি। ফিরে পেল ওর অকৃত্রিম ভাষা।
—কদ্দূর আলাম আমরা? আর কতক্ষণ লাগবে?
হোহো করে হেসে পড়ল জটিক মাঝি।
—সাতপাড়া কি হাতের কাছে? সে এহোন অনেক দূর। এই তো কেবল হদ্দেশপুর (হরিদাসপুর) আলাম, সামনে ডানপাতি ভ্যাড়ার খালে পড়তি হবে। সারা পথ উজনে যাতি হবে। পেত্থোমে ভেড়ার হাট। তারপর...
অমুক ডাঙ্গা, তমুকপুর ইত্যাদি গোটা দশেক গ্রামের নাম করে শেষে ও বলল, —বৌলতলি পৌঁছয়ে দেখতি হবে সুরগার খালে নাও চলার মতো জল হইছে কিনা। আগে দেহিছি জষ্ঠির মাঝামাঝি নাও চলত। এবার তেমন জল নাই। আষাঢ় পড়লি হবে কি। জল কই?
সে খালে যদি এহোন জল না থাকে?—সভয়ে প্রশ্ন করে রুনু।
—তালি হাঁটতি হবেনে মাইল দুই। ভয় নাই। আপনার ওইতো এক ফোট্টা ছটক্যাস। ও আমি মাথায় হরে বয়ে নিয়ে যাবানে। সাতপাড়ায় কোন বাড়িডায় যাবেন কন দেহি?
—যাব বিশ্বেস বাড়ি। তুমি চেনো?
—বিশ্বেস বাড়ির না চিনি কারে? ও বাড়ির কারা আপনার কুটুম কন দেহি।
—ও বাড়িতে আমার বড়দি আর সেজদির বিয়ে হইছে।
—কী সব্বোনাশ! ভগ্নিপোতগে নাম কি কও দেহি। তেনারা হয়তো আমার চেনাই হবেন।
মনে মনে ভীষণ লজ্জা পেল রুনু। একটা নামও ওর মনে নেই। গত চার বছরের বরিশাল জীবনে এদিকটার সব ভুলে গেছে রুনু। অবশ্য এ নামগুলি জীবনে কবারই বা ও শুনেছে। তা বলে মাঝির কাছে তো বোকা বনা চলে না। ও গম্ভীর ভাবে বলে,—নাম দে তোমার কাম কি কও দেহি? তোমার কাম আমারে বিশ্বেস বাড়ির ঘাটে নামায়ে দেওয়া। ব্যস, তালিই তোমার কত্তব্য শেষ। কতক্ষণে পৌঁছতে পারবে বলো তো?
গম্ভীর হতে গিয়ে ওর ভাষাটা আবার বেসুরো বাজল শেষদিকে।
ওর গাম্ভীর্য দেখে জটিকও সামলে নিল নিজেকে। নরম নিষ্প্রাণ সুরে বলে,—তা ধরেন গে বেলা যাবেনে। তয় সন্দের আগেই পৌঁছব। দ্যাখপেনহানে বিশ্বেস বাড়ির মানুষ জটিক মাঝিরি খুব হেলাছেদ্দা করে না। কতবার বিদ্যাশের সোয়ারি নিয়ে গিছি ও বাড়ি। ও বাড়িতি কয়জন কৈলকাতার চাকরে বাবু আছেন। তেনারা পিতি বছর পুজোর সময় আসেন। আপনার ভগ্নিপোতরাও কি কলকাতার চাকরে?
এ প্রশ্নের কোনো জবাব না দিয়ে আবার পিছন ফিরে বসল রুনু। বিরক্ত সুরে বলল,—ওসব খবরে তোমার দরকার কি বলো তো? তুমি একটু জোরে বৈঠা মারো দেখি।
হরিবোল, হরিবোল।—মুখ ভার করে বলে জটিকঃ বাবুর কথাবাত্তায় বড় চোটপাট দেখতিচি। বড় ঝাল। মনে হয় কৈলকাতার বাবু। কৈলকাতার ভাষায় বড় ঝাল। জয় গৌর, জয় নিতাই!
বলতে বলতে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল জটিক মাঝি।
রুনুর মনটা আবার কোমল হয়ে গেল। মিষ্টি হেসে বলল,—তুমি কি আমার উপর রাগ কল্লে জটিদা? কৈলকাতার বাবুগে উপর তোমার খুব রাগ, তাই না? আমি কিন্তু কৈলকাতার মানুষ না। এই দ্যাশেরই মানুষ। কৈলকাতা এ জীবনে দেহিও নাই।
এইটুকু মিষ্টি কথাতেই সরল মানুষটির মুখে হাসি ফুটল। বলল,—কৈলকাতা আমিও দেহিনাই বাবু। শুনিছি পেল্লায় মোকাম। রাস্তায় নাকি মাটি-চুটি নাই। সব সান বাঁধানো। একবারে আয়নার মতো পালিস। রাস্তায় নাকি চব্বিশ ঘণ্টা মানুষ-জন গাড়ি-ঘোড়ার ভিড়। রাস্তার দুই ধারে বড় বড় চেকনাই দোকানপাট আর হাজার হাজার দশ-বিশ তালা দালান। আমাগে গোপালগঞ্জের মত দশ-বিশটা মোকাম নাকি, কৈলকাতার প্যাটের মধ্যি চলে যাবে। তা বিশ তালা দালান কতো উচো হতি পারে কন দেহি? তিন তালগাছও ছাড়ায়ে যাবে?
জটিক মাঝির কাছে উচ্চতায় সর্বোচ্চ মাপ 'তিন তালগাছ' শুনে হেসে পড়ল রুনু। তবে কলকাতা সম্বন্ধে ওর ধারণাও জটিক মাঝির ধারণা থেকে স্পষ্টতর নয়। ওর কথার প্রবাহ বন্ধ করতে এবার স্যুটকেসের উপর মাথা রেখে আয়েস করে পা ছড়িয়ে দিয়ে বলল,—আমি এবার এট্টু গড়ায়ে নেই জটিকদা। বৌলতলি আলি আমারে ডাইকো।
—আচ্ছা ডাকবানে।
—বৌলতলি পৌঁছতে আর কতক্ষণ লাগতি পারে কও তো?
তা পেরায় ঘণ্টা দুই-আড়াই। নিচ্চিন্দি ঘুমোন। আমিও চাড্ডি চিড়ে মুড়ি খাইয়ে নেই। তার পর এক ছিলিম তামাক খাইয়ে আবার বৈঠে ধরব। আপনিও চাড্ডি চিড়ে মুড়ি স্যারা হরেন না। ছেলে মানুষ, খিদে পাইছে নিচ্চয়। সেই পেরায় আটটা নয়ডায় নায় উঠিছেন। অত সহালে কি আর প্যাট ভরে খাওয়া হইছে? দেব চাড্ডি চিড়ে মুড়ি?—অনুরোধের সুরে বলে জটিক।
—না, না, তোমার খাবার আমাকে দিতি হবে না। আমার সঙ্গে খাবার আছে। খিদে পালি খাবানে। এহোন তো চিড়ে-মুড়ি খাবা, তা তুমি ভাত খাইছো কখন?
—সহালে চাড্ডি পান্তাভাত স্যাবা হরিছি।
—তারপর গরম ভাত খাইছ কখন।
—গরম ভাত দিনমানে একবারই খাই সন্দের পর। তাও কি সবদিন জোটে?
—দুপুরে ভাত খাও না?
—ওই যে কলাম। সহালে দুডি পান্তা ভাত খাই। ভাত আর কয়ডা থাহে। ওই নোমো নোমো হরে খাইয়ে বড় এক ঘটি জল খাই।
—তার পর এখন খাবা চাড্ডি চিড়ে-মুড়ি! এত খাটুনির কাজ। ওতে শরীর থাকে? না, না, ওডা ভালো কথা না। দুপুরেও প্যাট ভরে ভাত খাবা। তার পর বিকেলের টিফিন হিসেবে নাহয় চিড়ে মুড়ি...
হাঃ-হাঃ করে হাসল জটিক মাঝি।
—নিজিই যদি এ্যাত খাই তো আমার বই ছেলেমেয়েরা খাবে কি? আমাগে বড় কষ্টের জীবন বাবু। প্যাট ভরে খাওয়ার ভাগ্যি ভগোবান আমাগে দ্যান নাই। সারা দিনির কামাই তো একটাহা পাঁচ সিহে। তাও কি সব দিন জোটে? পাঁচটা প্যাট চালাতি হয়। বউ আছে, তিনডি ছেলেমেয়ে আছে, আর নিজি। বোজেন ঠ্যালা। বসতবাড়ির পৈতিক ভিটেটুকু ছাড়া জমিজোমা নাই এক ছটাকও। সারা বছর কিনে খাওয়া। সম্বল বলতি তো এই নাওখান।
—এই নাও ছাড়া আর কোনো আয়ের ব্যবস্থা নাই তোমার?
—তয় আর কচ্ছি কি। এই নাওই আমার নককী, আমার সম্পত্তি। এই নককী মা আমার এ্যাদ্দিন তো এক রকম সুহিসচ্ছন্দেই রাহিছিল। কিন্তু কী যে পোড়া যুদ্ধু বাধল। দেখতি দেখতি চাল-ডালির দর বাড়্যে গেল। দর বাড়তিছে সব জিনিসির। বেলাতে আমাগে রাজার সাথে নাকি জার্মানির যুদ্ধু বাধিছে। খুব বড় যুদ্ধু। অনেক সৈন্য-সামন্ত আমাগে রাজার। তাগে খাওয়ানোর জন্যি এ দ্যাশের সব চাল, ডাল, মাছ, মাংস, জাহাজ বোঝাই হয়ে বেলাতে চলে যাচ্ছে। এই যুদ্ধু আরও কিছুদিন চললি আমাগে মতো গরিবরা সব না খাতি পাইয়েই মারা যাবে।
বলতে বলতে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নৌকার খোল থেকে একটা মাটির হাঁড়ি বের করল জটিক। একটা এনামেলের বাটিতে পোয়াটাক মোটা চিড়ে ভেজাল।
সময়টা ১৯৪০-এর মাঝামাঝি। দেশের পরিস্থিতির খবর মোটামুটি রাখে জটিক মাঝি। ইতিপূর্বে ১৯৩৯-এর সেপ্টেম্বর ব্রিটেন নাকি জার্মানীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। তার আগে ইতালি আর জার্মানির দুই দুর্ধর্ষ সাম্রাজ্যবাদী নায়ক ইউরোপে যুদ্ধের আগুন জ্বেলেছিল। ব্রিটিশের যুদ্ধ ঘোষণার ফলে সেই গৃহযুদ্ধ আজ বিশ্বযুদ্ধের রূপ নিয়েছে। সে আগুনের আঁচ লেগেছে সারা ভারতবর্ষে। আর সেই আগুনে সর্বাগ্রে পুড়ছে জটিকের মতো সাধারণ গরিব মানুষ, সর্বহারা মানুষ। এ যুদ্ধ হয়তো একদিন থামবে, কিন্তু তার আগেই জটিক মাঝিরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে না তো!
জটিকের কথায় রুনুর অন্তরটা বেদনাতুর হয়ে উঠল। এই মানুষটি আজ সারাদিন পরিশ্রম করে পাবে মাত্র একটি টাকা। ও চেয়েছিল পাঁচ সিকি। ওর সংসারে পাঁচজন মানুষ। মাথাপিছু পড়ে চার আনা। ও তো মোটেই বেশি চায়নি, তবু রুনু দরাদরি করে চার আনা কমিয়েছে। সেটা ঠিক হয়নি। রুনু ঠিক করল ওকে পাঁচ সিকিই দেবে।
ভেজা চিড়ের সঙ্গে একটু ঝোলাগুড় ও কয়েক মুঠো মুড়ি মিশিয়ে গোগ্রাসে খেতে শুরু করল জটিক মাঝি। দু-মিনিটেই খাওয়া শেষ। ওর ক্ষুধার কাছে সে খাদ্যটুকু যে যৎসামান্য তা ওর চোখে-মুখেই ফুটে উঠেছে।
রুনু এবার ওর স্যুটকেস থেকে বের করল ওর খাবারের পোটলা। দেখা গেল মাসিমা প্রচুর পরিমাণেই পরোটা, আলুর তরকারি, হালুয়া এবং গোটা চারেক সন্দেশও দিয়েছেন।
একটি সন্দেশ, একখানা পরোটা আর একটু হালুয়া রেখে বাকি সবটাই ও ঢেলে দিল জটিক মাঝির শূন্য থালায়।
করেন কি, করেন কি বাবু! আপনার জন্যি রাহেন। আমি তো খালামই।—লুব্ধ চোখে খাবারগুলির দিকে তাকিয়ে উচ্ছ্বাস ভরে বলে জটিক।
এই তো রাখলাম আমার জন্যি। আমার চেয়ে তোমার দরকার বেশি। আমি তো আরামসে বসে আছি। খাটছ তো তুমি। তুমি প্যাট ভরে খাইয়ে নেও জটিকদা।—সহজ আন্তরিকতার সুরে বলে রুনু।
—আহা কি জিনিস। নেমন্তন্ন বাড়িতিও এমন গাওয়া ঘির লুচি হয় না। এমন জিনিস খাইনি জীবনে। কী স্বোয়াদ, কী গন্দ!
লোভীর মত খেতে খেতে কথা কইছে জটিক,—আপনার দিলডা বড় ভালো। গৌরহরি আপনার সব্বমঙ্গল হরবেন।
খাওয়া শেষ করে আয়েস করে তামাক খেল জটিক।
রুনু এবার চোখ বুজে একটু ঘুমোবার উদ্যোগ করল। শুয়ে শুয়েই শুনতে পাচ্ছিল জটিক মাঝির নতুন উদ্যমে বৈঠা টানার শব্দ।
বেলা প্রায় চারটের সময় মুরগার খালের মুখে পৌঁছল ওরা। খাল পাড়ে দুটি মানুষ তখনও ক্ষেতের কাজ করছিল। তাদের কাছে খবর নিয়ে জানা গেল এই খাল পথে সাতপাড়া যেতে তিনটে জায়গায় জল কম আছে। নাও টেনে পার করতে হবে। নাকি এক সঙ্গে তিন চার জনে টেনে পার করতে হয় আজকাল। তবে বর্ষা এসে গেছে। হয়তো সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই জল বেড়ে যাবে। তখন আর টানাটানি করতে হবে না।
খবর নেওয়া হল হাঁটা পথেরও। সে পথও সুবিধের নয়। অনেক জল কাদা ভাঙতে হবে।
কোন ভরসায় জটিক মাঝি জলপথে যাওয়াই সাব্যস্ত করল কে জানে।
আধ মাইলটাক লগি বেয়ে যাবার পরেই পড়ল প্রথম বাধাটা।
শক্ত করে কোমরে গামছা বেঁধে জলে নামল জটিক। রুনুও তৈরি হচ্ছিল নামার জন্য। প্রায় ধমক দিয়েই ওকে থামিয়ে দিল জটিক।
—চুপ মারে বসে থাহেন তো বাবু।
—তুমি একা পারবে এতবড় নাওখানা এতটা পথ টেনে নিতে? খালে তো এক ইঞ্চি জলও নাই। প্রায় শুকনোই বলা চলে।
—পারতিই হবে। গুরুর নাম নিয়ে হাত লাগাই তো!
রুনু সবিস্ময়ে দেখল জটিকের দেহে সত্যিই অসুরের শক্তি। নানা কসরৎ করে জল কাদা মেখে গলদঘর্ম হয়ে প্রায় পঞ্চাশ হাত জায়গা শুকনোর উপর দিয়ে টেনে নিল নৌকাটা।
একই পদ্ধতিতে পার করল দ্বিতীয় ও তৃতীয় বাধা। ওর কষ্ট দেখে শেষ বারটায় রুনু ওর নিষেধ অমান্য করেই নামতে যাচ্ছিল ওকে সাহায্য করতে।
এবার আর ধমক নয়। একজন সন্তান বৎসল পিতার দরদী কণ্ঠে জটিক বলল,—কুটুম বাড়ি যাচ্ছ বাবাজি। তোমার সব্বো অঙ্গে কাদা মাহা দেখলি তেনারা আমারে কি বলবে? পাণ গেলিও তোমারে আমি কাদায় নামতি দেব না বাবা, তাতে তুমি রাগই হরো আর যা-ই হরো।
মানুষটির প্রতি গভীর শ্রদ্ধায় স্তব্ধ হয়ে গেল রুনু। মুখে আর প্রতিবাদের ভাষা জোগাল না। নিঃশব্দে সবিস্ময় শ্রদ্ধার ওর জান-কবুল করা কসরৎ দেখল শেষ বারও।
শেষ বাধাটা পার হতেই অদূরে দেখা গেল অনেকগুলি ঘন সন্নিবিষ্ট ঘরবাড়ি। তখন প্রায় পাঁচটা বাজে।
আস্যে পড়িছি বাবাজি। ওই যে বিশ্বেস বাড়ি। —সহাস্য উল্লাসে বলল জটিক। এক ঘণ্টায় এই অমানুষিক পরিশ্রমটা যেন ওর কাছে কিছুই নয়।
সারা গায়ের কাদা ধুয়ে মুছে আবার লগি হাতে নিল জটিক।
ছই-এর মধ্যে বসেই রুনু তার পোশাক-আশাকটা একটু ঠিকঠাক করে নিচ্ছিল।
ঢিমে চালে নাওখানা এগিয়ে চলেছে বিশ্বাসবাড়ির ঘাটের দিকে।
এ বছর এই খালের পথে এই প্রথম একখানা কেরায়ে নৌকা এল এ গাঁয়ে। সাধারণতঃ পুজোর সময়ই কেরায়ে নৌকাগুলি আসে বিদেশে চাকুরিরত বিভিন্ন বাড়ির মানুষদের নিয়ে। যারা আসে তারা দূর থেকেই ছই-এর বাইরে এসে বাড়ির লোকদের নাম ধরে হাঁক-ডাক শুরু করে। ঘাটে এসে জড়ো হয় বাড়ির লোকেরা। শুরু হয় দুদিক থেকেই উল্লাস কলরব।
কিন্তু এ সময়ে কোন বাড়ির কে এল? এখনও পর্যন্ত যে সে ছই-এর বাইরে এসে মুখটা দেখাচ্ছে না।
ইতিমধ্যে ঘাটে এসে জড়ো হয়েছে অনেক ছেলেমেয়ে, বউ, ঝি, বুড়ো-বুড়ি। এ নৌকায় যাত্রী যে মাত্র একজন ছেলেমানুষ তা বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু ছেলেটি কে? কোন বাড়ির ছেলে? ঘাটের কাছে কাছে যখন এলো নাওখানা তখন ঘাটের মানুষগুলো রুনুর পেছনটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে।
রুনুর ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছে কেন আসবার সময় দাদার কাছ থেকে জামাইবাবুদের নাম জেনে আসেনি। ঘাটে অনেক মানুষের কথাবার্তা ওর কানে আসছে। তাদের মধ্যে এখন বড়দি অথবা সেজদিকে দেখতে পায় তবেই রক্ষে।
এবার ঘাটের দিকে মুখ ফেরাল রুনু। সন্ধানী চোখে খুঁজল দিদিদের। নাঃ, তারা কেউ আসেনি ঘাটে। ছই-এর বাইরে এল রুনু।
ঘাটের মানুষগুলিও দেখছে এবার ওকে সকৌতুকে। কেউ চেনে না ওকে। চিনবে কী করে? এই তো প্রথম এল রুনু সাতপাড়ায়।
নৌকাটা যখন ঘাট থেকে মাত্র ৮/১০ হাত দূরে আছে, তখন একজন বর্ষিয়সী মহিলা জটিককে জিজ্ঞাসা করলেন,—কোন বাড়ির কুটমরে জটিক?
রুনু বুঝল, জটিক মিথ্যা বলেনি। বিশ্বাসবাড়ির মানুষ ওকে চেনে।
জটিক সঙ্গে সঙ্গে সোৎসাহে বলে,—ক্যান, চিনতি ছাচ্ছ না? তোমাগেই তো কুটুম।
মহিলাটি আরও নিবিষ্ট চোখে রুনুকে পর্যবেক্ষণ করে বললেন,—চিনতি পাল্লাম না তো। কোহানতে আসা হচ্ছে বাবাজি? কোন বাড়ি আইছ?
রুনু একটু বুদ্ধি খাটিয়ে বলে,—আমি গোবরার পণ্ডিতমশায়ের ছোট ছেলে। এ দ্যাশে এই প্রথম আলাম আমার বড়দি আর সেজদিরি দেখতি।
—ও মা-আ, তুমি ছিনাথ পণ্ডিতির সেই বিদ্বেন ছেলে! তাইতো ভাবি এমন ফুটফুটে সোনার চাঁদ ছলডি কোন বাড়ির? এহন বোঝলাম। তাইতো তোমার মুখখানায় যেন সুশীর মুহির আদল পাচ্ছিলাম। তুমি সুশীর ভাই? লবীন ঘোষের ছোট শালা? ওরে কেডা আছিস? যা যা তাড়াতাড়ি সুশীরি খবর দে, সুমিরি খবর দে।
নৌকাখানা ঘাটে ভিড়তেই একটা সোরগোল পড়ে গেল। খবর পেয়ে ছুটে এসেছে বড়দি আর সেজদিও। রুনু সাবধানে খেজুর গাছের গুড়ি পাতা কয়েক ধাপ সিঁড়ি পেরিয়ে উপরে উঠে এল। প্রণাম করল দুই দিদিকেই।
সেজদিকে দেখছে রুনু পাঁচ বছর পরে। বিয়ের পরে এই তাকে প্রথম দেখল। আর বড়দিকে দেখছে প্রায় দশ বছর পরে। দুজনেরই চেহারাই এত পরিবর্তন ঘটে গেছে ইতিমধ্যে যে তারা ওকে না চিনলে রুনুর পক্ষে হয়তো চেনাই সম্ভব হতো না।
দুপাশ থেকে দুই দিদি সস্নেহে ওর কাঁধে হাত রেখে যেন একটা প্রশেসান করে এগিয়ে চলল।
পেছনে জটিক মাঝি ওর স্যুটকেস টা মাথায় নিয়ে চলতে চলতে অভিমানী গলায় বলে বড়দিকে,—জানো খুড়িমা, তোমার ভাইডি যে লবীন খুড়োর শালা, এই খবোরডা উনি আমারে সারাপথে জানতি দেলেন না।
জানলি কি সুবিধে হতো?—হেসে বলে রুনু।
—তুমিও আমার কুটুম হয়ে যাত্যে।
—সে তো হয়েই গিছি। তুমি তো আমার দাদা। জটিকদা। জানো বড়দি, জটিকদা সারাপথ আমারে যেভাবে নিয়ে আইছে, ঠিক যেমন বাপ তার একটা ছোট বাচ্চা সামলায়, তেমনি।
জটিক বড় ভালো মানুষ রে,—সস্নেহ কণ্ঠে বলেন বড়দিঃ ও আমাগে অনেক দিনির চেনা। দূর সম্পর্কের আত্মীয়ও। ওরে পালি তোর দাদাবাবু আর কোনো মাঝি নেয় না।
কথা বলতে বলতে ওরা একখানা মস্ত টিনের ঘরের প্রশস্ত বারান্দায় এসে পৌঁছল।
এই হল গে তোমার নবীন ঘোষ মশার বাড়ি। বুঝতি পারছি, এ দ্যাশে এই পেথোম আসা হল।—বলল জটিক রুনুকে। তারপর বড়দিকে বলল,—ভাইডির ছ্যাঁজকাসটা কোহানে রাখব খুড়িমা?
—ঘরে নিয়ে খাটের পাশে থোও তো এখন। তারপর হাত-মুখ ধুয়ে আসো। আমি জল খাবারের ব্যবস্তা হরতিছি।
স্যুটকেস রেখে জটিক এল বারান্দায় গামছায় হাওয়া খেতে খেতে।
সেজদিও এসেছে ওদের সঙ্গে। তাছাড়াও সঙ্গে এসেছে প্রায় জনাবিশেক মানুষ। কয়েকটি বউ-ঝি জনা কয়েক বৃদ্ধা আর একদল বাচ্চা কাচ্চা। সবাই অবাকচোখে দেখছে রুনুকে। অবাক এবং মুগ্ধ চোখে ওকে দেখছে বড়দি-সেজদিও।
এতগুলি অচেনা মুখের সামনে ভারি অস্বস্তি বোধ করছে রুনু।
বারান্দার সামনে মস্ত চৌকো উঠোনের পশ্চিম প্রান্তে একটা কুলগাছ। কুলগাছের পিছনে সূর্য ডুবে যাচ্ছে উন্মুক্ত প্রান্তরের দিগন্ত রেখায়। পশ্চিমাকাশে নানা রঙের খেলা চলেছে, হালকা মেঘের সঙ্গে দিনান্তের ম্লান বিষয় সূর্যালোকের। রুনু দেখল ওই কুলগাছতলায় বসে জনৈক বৃদ্ধ নিরাসক্ত চোখে চেয়ে আছে ঘোষমশায়ের বারান্দার ভিড়টার দিকে আর মৃদু মৃদু টান দিচ্ছে হাতে ধরা হুঁকোটায়।
এক সময় সেই বৃদ্ধটি ডাকল জটিককে,—ও জটিক, এই ধারে আসো। তামুক খাও।
তারপর বাচ্চাদের একটা ধমক দিয়ে বলল,—এই বান্দরগুলন, তোরা অম্বায় আমাগে নূতন কুটুমরি ঘিরে ধরলি ক্যান? যা যা, যার যার ঘরে যা।
বারান্দায় ভিড়টা একটু পাতলা হল সেই বৃদ্ধের ধমকে। জটিক গিয়ে বসল তার তামাকের আসরে।
সেই বৃদ্ধকে দেখিয়ে বড়দি বললেন রুনুকে,—ওনারে চিনিস না?
না তো। কে উনি?—প্রশ্ন করল রুনু।
—ও মা, ওই তো সুশীর বর।
সেজদির বর! অত বুড়ো!—সবিস্ময়ে বলে রুনু।
সেজদি সলজ্জভাবে বলে,—চেনবে কি হরে? ও কি ওনারে দেহিছে কোনোদিন? বিয়ের সময় তো বাড়িই ছেলনা রুনু।
ইতিমধ্যে বৃদ্ধটি আবার কথা কয়ে উঠল,—ও বড়দি, ভাইডিরি আর কতক্ষণ বারান্দায় বসায়ে রাখবা? ওনারে ঘরে নিয়ে বসতি দেও। তারপর কিছু খাতি-টাতি দাও।
—তা নিয়ে তোমার ভাবতি হবে না মিত্তির মশায়, বড়দি বারান্দা থেকেই বলল সেই বৃদ্ধকে,—তুমি এটু এক দৌড়ে হাটে যাও। ওনারে খবর দেও। ভালো দেহে মাছ আনতি কবা, মিষ্টি আনতি কবা।
—আচ্ছা যাতিছি। জটিকও রাত্তিরি খাবে তো?
—তা তো খাবেই। সে তোমার কতি হবে না। তুমি তাড়াতাড়ি যাও। জটিক, তুমিও তাড়াতাড়ি হাত-মুখ ধুয়ে আস। আজ তোমার খুব খাটুনি গেছে।
তারপর রুনুর হাত বড়দি ধরে বলেন,—আয় ভাইডি, ঘরে আয়।
দুই দিদি যেমন রুনুকে এতক্ষণ একদৃষ্টিতে দেখছিল, রুনুও তেমন দেখছিল ওদের।
বড়দি যেন আগের থেকে আরও সুন্দর হয়েছে। হয়েছে বেশ মোটা-সোটা স্বাস্থ্যবতী এক মহিলা। পোশাক-আশাকেও যেন একটা বড়লোকী জৌলুস। হাতে গলায় যে স্বর্ণালঙ্কারগুলি দেখা যাচ্ছে সেগুলি বেশ ভারী এবং দামী।
আর সেজদি? আশ্চর্যভাবে বদলে গেছে সেজদি। বড়দির তুলনায় গায়ের রঙটা ওর একটু ময়লাই ছিল। এখন যেন আরও ময়লা আরও রুক্ষ হয়ে গেছে। মনে মনে হিসেব করে দেখল রুনু সেজদির বয়স এখন বাইশ আর বড়দির চৌত্রিশ। অথচ এখন সেজদিকেই বেশি বয়সের দেখাচ্ছে বড়দির থেকে। ওর চুলে কত্যেকাল তেল পড়ে না, কে জানে। পরনে অতি সাধারণ জীর্ণ মলিন একখানা শাড়ি। কী চকচকে চুল আর কী সুন্দর স্বাস্থ্য ছিল সেজদির। সেই সেজদি এই কবছরে কী হয়ে গেছে।
বড়দি ঘরে নিয়ে এল রুনুকে। পেছনে পেছনে এল সেজদি এবং আরও ক'টি ছেলেমেয়ে।
ঘরখানা মস্ত বড়। এক কোণে দক্ষিণের জানলা ঘেঁসে বিশাল খাট। পরিষ্কার বিছানা পাতা। সে বিছানায় চার-পাঁচটি মানুষ স্বচ্ছন্দে হাত-পা ছড়িয়ে শুতে পারে। ঘরে আলনা, আলমারি, ড্রেসিং টেবল, কাঠের সিন্দুক ইত্যাদি প্রচুর আসবাব সুন্দরভাবে সাজানো, এবং প্রতিটি জিনিসই মূল্যবান। বিছানার বিপরীত প্রান্তে দেয়াল ঘেঁসে একখানা মাঝারি মাপের টেবল ও দুখানা দামি চেয়ারও আছে। টেবলে কিছু খাতাপত্র সযত্নে সাজানো রয়েছে। ঘরের একপ্রান্তে বিছানা, অপর প্রান্তে চেয়ার, টেবল, আলমারি ইত্যাদি। মাঝখানে অনেকটা ফাঁকা পরিষ্কার মেঝে।
রুনু বিছানায় বসতেই সেজদিও বসল তার পাশে।
বড়দি ব্যস্তভাবে বলল,—তুই রুনুর সাথে এট্টু কথা ক সুমি। আমি ওগে জন্যি কিছু জলখাবারের ব্যবস্থা হরিগে।
বড়দি চলে যেতে এবার সেজদির মুখোমুখি হল রুনু। ঘরের মেঝেতে তখনও রয়েছে সেই ছেলেমেয়েগুলি। তারা সকৌতুকে দেখছে রুনুকে।
রুনু বিনা ভূমিকায় বলল, তোর কি হইছেরে সেজদি? তোরে যে চেনাই যায় না। এই কয় বছরে তুই যে বড়দিত্তেও বুড়ি হয়ে গিছিস।
ভাইডি রে। —দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে সেজদি,—তবু তো আমার মুখখান দেখতি পালি। বাবা তো আমারে জন্মের মতো বোনোবাসে দিয়ে থুইছে। আর খবর নেল না। আমার জীবনডা যে...
—বাবার কি আর এখন সে শক্তি আছেরে সেজদি। চোখে তো প্রায় দেখেনই না। শুনিছি তোর বরের নাকি আগেও একটা বিয়ে ছিল।
—মোটে এ্যাট্টা। তিন তিনডে বউ খাইয়ে ওই বুড়োডা আমারে বিয়ে হরিছিল। তা আগের দুডোর কোনো ছেলেমেয়ে নাই। শেষেরডার ছিল তিনডে ছেলেমেয়ে। আবার আমারও হইছে এ্যাট্টা এই বছোর চারিক আগে। ওই দ্যাখ তার চেয়ারা! অভাগীর ঘরে জন্মিছে। প্যাট ভরে তো কোনও দিন খাতি পালো না। বলতে বলতে বাচ্চাদের মধ্যে একটা প্রায় উলঙ্গ মেয়েকে দেখাল সেজদি।
—ওই তোর মেয়ে! এসো এসো সোনামণি।
হাতের ইশারায় রুগ্ন হাড্ডিসার মেয়েটিকে কাছে ডাকল রুনু। সেজদিও তাকে কাছে ডেকে বলল,—আয় মরুণী, তোর মামা। পেন্নাম কর।
মরুণী-নামী মেয়েটি সলজ্জভাবে সেজদির গা ঘেঁসে দাঁড়াল। পরনে তার অতি জীর্ণ একটি ইজের শুধু।
বড়দির ছেলেমেয়েরা কোথায়? শুনিছি বড়দির তিনডি ছেলেমেয়ে।—বলল রুনু।
—ঠিকই শুনিছিস। তার বড়ডি তো বাড়ি থাহে না। সে ছেলের বয়স ১৬/১৭ হবে। উলপুর এক জমিদার বাড়ি থাহে ইস্কুলি পড়ে। এবার ম্যাট্রিক দেবে। আর দুডি তো তোর সামনেই। ওই তো। এই শিবু, টুলু তোরা আয় না। পেন্নাম কর মামারে। তোগে ছোট মামা।
ওরা দুটিতে যেন এতক্ষণ এই ডাকটির অপেক্ষায় ছিল। ছেলেটির বয়স বছর দশেক, মেয়েটির ছয়-সাত। দুজনেরই সুন্দর ফুটফুটে চেহারা। সাজগোজও মার্জিত। ঘরে যে-ক'টি বাচ্চা আছে তার মধ্যে ওরা যেন স্বতন্ত্র।
ওরা সপ্রতিভ ভাবে কাছে এল। রুনুকে প্রণাম করল। দুহাতে ওদের দুজনকে কাছে টেনে নিল রুনু। আলাপ করে জানল ছেলেটি পড়ে গ্রামের পাঠশালার শেষ ক্লাসে এবং মেয়েটি প্রথম শ্রেণীতে।
কথা বলতে বলতে সেজদির মেয়ের দিকে হাত বাড়িয়ে বলল,—এবার তুমি বসবে আমার কোলে।
তার লজ্জা এখনও কাটেনি। সেজদি প্রায় জোর করেই তাকে দিয়ে প্রণাম করাল এবং সেই সুযোগে তাকে কোলে তুলে নিল রুনু।
এ রাম, নামা নামা, ওডার গায়ে সাতরাজ্যির ধুলো। তোর জামাকাপড় নষ্ট হবে।—বলল সেজদি।
রুনু তাকে সজোরে চেপে রাখল বুকের সঙ্গে। হেসে বলল,—এ বয়সে তোর আমার গায়েও সাত রাজ্যির ধুলো থাকত। তোর চুল তো সব সময় কাকের বাসা হয়ে থাকত, তাই তো দাদা তোর নাম দিছিল 'জুঙলী'—মনে নাই?
সব মনে আছেরে ভাই!—বিষাদ ভরা গলায় বলে সেজদিঃ সেই সব দিনির কথা মোনে পড়লি আর চোখির জল থামাতি পারি না। খালি খালি বাবারে দোষ দেই। আসলে যা ভাগ্যি আছে তাইতো হবে। তবু এ দ্যাশে বড়দি ছেলো তাই এহোনো বাঁচ্যে আছি। শুনি, কোন দ্যাশে নাকি যুদ্ধু বাধিছে। এ দ্যাশের সব চাল-ডাল দেখতি দেখতি উধাও। ও বুড়োর তো দিনমজুরীর কাজ। ধান কাটা, নাও বাওয়া, মাল বওয়া এই সব। তা এহন আর সে ক্ষমতা নাই, তাই ওনারে এহন আর কেউ বড় ডাহে না। তবু বড়দি মাঝে মাঝে এডা-ওডা দিয়ে সাহায্য হরে, তাই কোন রকমে টিকে আছি। আমাগে বড় কষ্টের জীবন রে ভাই। বড় দুঃখির।
কথা বলতে বলতে সেজদির দুচোখে নামল জলের ধারা।
প্রসঙ্গ পাল্টাবার উদ্দেশ্যে রুনু প্রশ্ন করে,—আচ্ছা, সেই ওনার আগের পক্ষের ছেলেমেয়েরা তোকে...
—সেদিক দিয়ে ভাই আমার ভাগ্যি বড় ভালো। ছেলেরা তো আমারে মা বলতি অজ্ঞান। আসল মা-র কথা ওগে মনেও নাই।
—এ তো খুব আনন্দের কথারে। ছেলেদের কথা তো বললি। আর মেয়েটা? শুনিছি, একটা মেয়েও ছিল।
—সেডারে তো নয় বছর বয়সেই গৌরীদান হরিছে। তোগে মিত্তির মশায় মূখ্যি কুলিন তো। মাইয়ের দাম আছে। সেই মাইয়ে-ব্যাঁচা টাহায় বেশ কয়দিন ফূর্তি হরে খাওয়া-দাওয়া হল। তারপর আবার যে কে সেই।
—কবে বিয়ে হল?
—আমার বিয়ের বছর দুই পরে। তার ভাগ্যি ভালো। সুহিই আছে। আমি বাঁচ্যে গিছি। এহানে থাকলি তো না খাইয়ে মরত।
—আগের পক্ষের বড় ছেলের বয়স কত?
—বড়ডির বয়স পঁচিশ-ছাব্বিশ হবে। ছোটডি পেরায় আমার বয়সি।
—তারা কী করে?
—তাগে জন্যিই তো এহোনো বাঁচ্যে আছিরে ভাই! বড়ডি উলপুরের এক জোতাদাদের বাড়ি মাস মাইনেয় মজুর খাটে। মাঝেমধ্যি বাড়ি আসে? পাঁচ-দশ টাহা দিয়ে যায়।
—আর ছোটডি?
—সে তার বাবার সাতে খাটে পেটে। ওই কুলিমজুরীর কাজ আর কি।
—এহানে তোর বাড়ি কোনডা? এডা তো বড়দির বাড়ি।
—ওর কি নিজির কোনও ঘর-বাড়ি ছেল রে? ও তো শ্বশুর বাড়িতে ঘরজামাই থাকত। সে বউডা মারা গেলি তারা আর জায়গা দেল না। তহোন এই ঘোষ মশায়ের মাঝিগিরির কাজ নেল। তারপর ঘোষ মশায়ের সাথে ভাব-সাব হল। তিনিই যোগাযোগ করে আমার সাথে বিয়ের ব্যবস্থা করেন। বিয়ের পর বড়দির অনুরোধে বড়দাদাবাবু এট্টু জায়গা দেছে। তার উপর একখান কুঁড়ে বানায়ে কোনওরহমে আছি। দেহিস কাল সকালে। সে দেহার মতো না। তবু তিন বাপ-বেটার আয়ে তার মধ্যি সুহি ছেলাম রে। হঠাৎ এই পোড়া যুদ্ধ নাগল, আর সব সুখ-শান্তি ধুয়ে মুছে গেল!
কথা বলতে বলতে বার বার আঁচল দিয়ে চোখ মোছে সেজদি।
সেজদির প্রতি সমবেদনায় রুনুর বুকের ভিতরটা ভারী হয়ে এল।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে বলল,—এই যুদ্ধটা একটা সর্বনাশা যুদ্ধরে সেজদি! ইংরেজরা আমাগে দেশের ধান চাল সব লুটে নিয়ে আমাগে সব অনাহারেই মারবে। কিন্তু ওরাও কি তাতে রক্ষা পাবে? জার্মান সৈন্যদের হাতে ওরাও সব কচুকাটা হবে।
তুই কৈস কিরে রুনু।—সভয়ে বলে সেজদিঃ ইংরেজরা তো আমাগে রাজা। রুনু তুই কি বন্দেমাতরমের দলে ভিড়িছিস? সাবধান, পুলিশ জানতি পারলি তোরে জেলে দেবে। এ দ্যাশের যারা ল্যাহাপড়া জানা ভালো ছেলে বন্দেমাতরমের দলে ছেল, তাগে সব ধরে নিয়ে জেলে পুরিছে পুলিশ। এ সব শুনেই তো আমাগে বুক কাঁপে।
—সবারই বুক কাঁপে না রে সেজদি। কেউ কেউ আবার পুলিশের লাঠির সামনে বুক পেতেও দেয়। হাসি মুখে জেলে যায়। হাসি মুখে ফাঁসির দড়ি গলায় পরে। তারাইতো এ জাতির ভরসা। আমি তাদের শ্রদ্ধা করি।
হঠাৎ আবেগ বশে ভাষার খেই হারিয়ে ফেলে রুনু। তারপর হেসে বলে,—না রে সেজদি, আমি এখনও ওসব দলে ভিড়ি নাই। তবে ভবিষ্যতে...
—সাবধান, সাবধান! ওসব দলে ভিড়বি না। বুড়ো বাবা-মা তোর মুখির দিকি চাইয়ে রইছে? কত কষ্ট হরে তোরে পড়ায়ে শুনোয়ে মানুষ করিছে। তুই এহোনে জেলে গেলি ওরা তো শোকেই মারা যাবে।
সেই সরল সাধারণ ক্লাশ থ্রি পর্যন্ত পড়া সেজদি যে দেশের এত খবর রাখে, এত কথা এমন করে ভাবতে পারে, এ কল্পনাই ছিল না রুনুর। দুঃখ-কষ্ট মানুষকে অনেক শিক্ষা দেয়। এ হল দুঃখের শিক্ষা, ভাবল রুনু। প্রসঙ্গ পাল্টাবার জন্য বলল,—আচ্ছা, বড়দিদের অবস্থা তো ভালোই মনে হচ্ছে। তাই না?
সেও এই যুদ্ধের দৌলতে। কি ছেল ঘোষমশায়ের? হাটের মধ্যি এট্টা সামান্য মুদি দোকান, আর বিঘে দশেক ধানি জমি। এই যুদ্ধের বাজারে সেইখড়ের চালের দোকানঘর হইছে মস্ত পাকা দালান। আগে ছেল খাতা লেখার জন্যি এট্টা লোক, এহোন দশ-বারো জন কর্মচারী হিমহিম খাইয়ে যাচ্ছে। উনি এহোনে এ দ্যাশের একজন নামকরা বড়লোক। পাঁচ-সাতশো বিঘে জমি। বড়দির বাক ভরতি সোনা-দানা। এহোন ওনার মস্ত কারবার। খুলনে, মাঁদারীপুর, কলকাতা যাচ্ছেন যহোন-তহোন। টাহা কামাচ্ছেন দুই হাতে।—বলতে বলতে উত্তেজিত হয়ে ওঠে সেজদি।
—কীসের কারবার? প্রশ্ন করে রুনু।
—সে সব কি আমি বুঝিরে ভাই। নতুন নতুন কথা শুনি। শুনি, মেলেটারি সাপ্লাই, কন্টোল, রেশোনকাঠ। কোনওডার মানে বুঝি না।
যেটুকু বলল সেজদি, তাতেই ঘোষমশায়ের 'কারবার' টার কিছু আভাস পেল রুনু। বুঝল, এই যুদ্ধটা যেমন সেজদিকে দিয়েছে সর্বনাশ, তেমনি বড়দিকে দান করেছে 'স্বর্ণডিম্ব' প্রসবকারী হংস।
অল্প সময়ের মধ্যেই বড়দি সেদিন বেশ একটি রাজকীয় জলযোগের ব্যবস্থা করে ফেলেছিল রুনু আর জটিকের জন্য। উপস্থিত বাচ্চা-কাচ্চারাও কেউ বাদ গেল না সে রাজকীয় প্রসাদ থেকে।
জলযোগ সেরে বড়দির ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে রুনু গেছিল সেজদির ঘর দেখতে। তখনও দিনান্তের সামান্য আলো আছে। তখনও সন্ধ্যাদীপ জ্বলেনি।
ইতিমধ্যে বড়দির ছেলেমেয়ে দুটির সঙ্গে ভাব করে নিয়েছে রুনু। তাদের কাছেই জেনেছে সেজদির স্বামী মন্মথ মিত্রকে এদেশের মানুষ 'মনা মিত্তির' বলেই জানে। সেই মনা মিত্তিরের প্রথম দর্শন তো পেয়েছে রুনু বড়দির উঠোনের কোণের কুলতলায়।
এই যে মাসির ঘর।—বলল বড়দির ছেলে শিবু।
রুনু দেখছে জরাজীর্ণ একখানা ক্ষুদ্র খড়ের ঘর। সামনে এক চিনতে বারান্দা। সেই বারান্দায় জটিক মাঝি, মনা মিত্তির ও আরও জনাকয়েক বৃদ্ধ তামাক খেতে খেতে গল্পগুজব করছে।
রুনুকে দেখেই ওদের, মধ্যে সবচেয়ে বয়স্ক পক্ককেশ বৃদ্ধটি উঠোনে নেমে এলেন শশব্যস্তে। ইনিই মনা মিত্তির। তিনি রুনুকে সাদর অভ্যর্থনা করে বললেন,—আসেন আসেন ছোড়দা। কী ভাগ্যি। ও ছোট বউ, তোমার ভাইডিরি বসতি দ্যাও।
বৃদ্ধ আবার চিৎকার শুরু করল,—কোহানে গেলে গো, ও ছোট বউ, শোনছ...
—আপনি ব্যস্ত হবেন না দাদাবাবু। সেজদি হয়তো কোনো কাজে...আমি কাল সকালে আসব। এখন কেবল বাড়িডা দেখতি আইছি.—নম্রভাবে বলল রুনু।
—বাড়ি। এরে কয় বাড়ি! এ তো কুঁড়েরও অধম। ঘোষমশায় দয়া হরে একটু থাকতি দেছেন, তাই কোনও ক্রমে মাথা গুঁজে পড়ে রইছি। দয়া করে আসবেন কাল সহালে।
আমারে আপনি কতি হবে না।—হেসে বলে রুনুঃ আমি তো কত ছোট। তাছাড়া সম্পর্কেও আপনি গুরুজন। বলতে বলতে মিত্তির মশায়কে প্রণাম করল রুনু।
—ও সব্বনাশ, করেন কি করেন কি! আমি এ্যাট্টা কুলি-মজুর মানুষ, আমি হব আপনার গুরুজন? এ দ্যাশে কয়ডা বি.এ. পাশ মানুষ আছে যে আপনার গুরুজন হবে?
এই সরল বৃদ্ধের সহজ যুক্তির বিরুদ্ধে অনেক কথাই বলা যেত, কিন্তু তাতেও কি ওর সঙ্কোচ কাটত? রুনু আর কথা বাড়াল না, কিন্তু মানুষটিকে ওর ভালোই লাগল। হেসে বলল,—আচ্ছা বেশ, আমিই হলাম গুরুজন। এবার গুরুজনের আজ্ঞা পালন করতি হবে। আমার সাথে 'তুমি' করে কথা কথি হবে। 'তুই' কলি আরও খুশি হব।
জটিক মাঝি বারান্দা থেকে কথা কয়ে উঠল, এবার তোমার বি.এ. পাশ শালা আচ্ছা চাপান দেছে। জবাব দেও।
তাইকি হয়, তাইকি হয়, আপনি হলেন গে—হাসি মুখে বলেন মিত্তিরমশায়।
ক্যান, হবে না ক্যান?—যুক্তি দেখায় জটিকঃ এক কাটে ধারে, আর এক কাটে ভারে। তোমার শালার না হয় বিদ্যের ধার আছে, কিন্তু তোমার বয়সের ভারডা তো মানতি হবে। আমার সম্পক্কেও তুমি গুরুজন। তুমি ওনারে 'আপনি, আজ্ঞে' হরবা ক্যান?
শুনলেন তো জটিকদার কথা?—হাসতে হাসতে বলে রুনু।
—আচ্ছা, দ্যাহা যাবেনে। কাল সহালে আসবেন তো?
—ওই যে আবার ভুল হল। তাহলে কিন্তু আসব না। ঠিক করে বলুন।
'তুমি' কতি পারি, তুমিও যদি আমারে 'তুমি' কও।—হেসে বলেন মিত্তিরমশাই।
ভালো চাপান দেছো মিত্তরদাঃ বারান্দায় একটা হাসির রোল উঠলঃ —দেহি তোমার বি.এ. পাশ শালা কি কয় এবার।
রুনু সরাসরি উত্তরটা এড়িয়ে, যেতে যেতে বলে,—কাল সকালে আসব। আসি এবার দাদাবাবু।
এক ঝুড়ি ফজলি আম, মস্ত একটা পাকা কাঁঠাল, ছ-সাত সের ওজনের একটি পাকা রুইমাছ, এক হাঁড়ি রসগোল্লা, এক ঝুড়ি তরিতরকারি এবং আরও নানা সামগ্রী নিয়ে সদলবলে যখন হাট থেকে এলেন ঘোষমশায় তখন বেশ রাত হয়ে গেছে। লোকের হাতে একটি জ্বলন্ত হ্যাচাগ। সেটি বারান্দায় রাখতে সারা বাড়ি আলো ঝলমল করে উঠল।
ঘোষমশায় এসেই হাঁক-ডাক করে সারা বাড়িটাকে কর্মব্যস্ত করে তুললেন। কেউ বঁটি নিয়ে বসল মাছ কুটতে, কেউ বসল তরকারির ঝুড়ি নিয়ে, কেউ ব্যস্ত হল আম-কাঁঠালের তদারকিতে।
কে একজন বারান্দায় একটা চেয়ার এনে দিল ভিতর থেকে। ঘোষমশায় বসতে বসতে বড়দিকে ডাকলেন। পাঞ্জাবিটা খুললেন। বড়দি কাছেই ছিল। পাঞ্জাবিটা হাতে নিলেন।
—টাহা পয়সা গুনে-গাথ্যে আলমারিতি তুলে রাহো। কই, আমার ছোট শালাডি কই?
—ওই তো শিবুর পাশে দাঁড়ায়ে রইছে। এরি মধ্যি ওগে সাথে খুব ভাব হয়ে গেছে রুনুর।
আসো আসো, ভাইডি আসো। ভুড়ি দেহে আর মোচ দেহে ভয় পাইচো বুঝি। —হাসতে হাসতে বলেন ঘোষমশায়।
হঠাৎ কোথা থেকে জটিক এসে রুনুর আগেই প্রণাম করল ঘোষমশায়কে। তারপর প্রণাম করল রুনু।
এবার বুঝি বি.এ. পাশ দিলে ভাইডি?—রুনুর কাঁধে হাত রেখে জিগ্যেস করেন ঘোষমশায়।
পরীক্ষা দিছি। পাশের খবর এখনও বার হয়নি। নম্রভাবে বলে রুনু।
—তোমার পাশ ঠেকায় কেডা! পাশ তো হরবাই। তারপর?
—কলকাতায় যাব। এম.এ. পড়ব।
—বেশ, বেশ। পণ্ডিত মশায়ের দ্যাশ জোড়া নাম ডাক। তুমি তেনার উপযুক্ত সন্তান। চেহারা দেখেই বুঝি, এক পাতার মুলো চেনা যায়।
রুনুর চেহারার মধ্যে উন্নতির কি লক্ষণ তিনি দেখলেন কে জানে, কিন্তু ঘোষমশায়ের চেহারাটি যা দেখছে রুনু, তাতে ওর বিস্ময়ের অবধি নাই।
শৈশবে একবার মাত্র ওকে দেখেছিল রুনু। তখন রুনুর বয়স মাত্র ছ-সাত বৎসর। অস্পষ্ট মনে পড়ে সে চেহারাটা। তখন তিনি নতুন জামাই। পরনে কুচোনো শান্তিপুরী ধুতি, গরদের পাঞ্জাবি, চকচকে পাম্পসু। অত্যন্ত সুদর্শন এক যুবক। রুনুর মনে হয়েছিল যেন গল্পের রাজপুত্র। সেই রাজপুত্র সেদিন সর্বাঙ্গে ধুলোমাখা রুনুকে কোলে করে আদর করেছিল। অনেক মিষ্টি মিষ্টি কথা বলেছিল। এইটুকুই মনে আছে।
আজ যাকে দেখছে বড় জামাইবাবু রূপে, এ যেন এক ডাকাতের দলের সর্দার। এর সঙ্গে যে দুজন লেঠেল আর দুজন কুলি এল মালপত্র মাথায় করে, তারা যেন ডাকাত দলের সাকরেদ। এর মেদবহুল চেহারায় যেন রয়েছে একটা কপটতা; নাকি 'টাকার কুমির' বলতে এই চেহারাই বোঝায়?
এই মানুষটির সঙ্গে আলাপ জমাবার কোনও আগ্রহই বোধ করছে না রুনু। তিনি একে একে সকলের খবর নিলেন। যথাসাধ্য সংক্ষেপে তার জবাব দিয়ে গেল রুনু।
একসময় বড়দি এসে বললেন,—তোমার জলখাবার দিচ্ছি। হাত-মুখটা চট করে ধুয়ে আসো।
ঘোষমশায় উঠে পড়তেই রুনু যেন মুক্তি পেয়ে গেল।
সেদিন রুনুর সম্মানার্থে ও-বাড়িতে একটা বিরাট ভোজের আয়োজন হয়েছিল। জটিক মাঝি, চারজন কুলি-পাইক, সেজদির বাড়ির সকলে এবং বিশ্বাস বাড়ির আরও অনেকে নিমন্ত্রিত হয়েছিল।
বড়দির রান্নার লোক তো ছিলই, তার সঙ্গে সমানে খেটেছিল বড়দি সেজদি দুজনেই। তবু আহার পর্ব সমাপ্ত হতে রাত প্রায় এগারোটা হয়ে গেল।
ইতিমধ্যে শিবুর কাছ থেকে রুনু জেনেছে যে, যে দুজনকে ও কুলি মনে করেছিল তারা ঘোষমশায়ের দোকানের কর্মচারী, আর যে দুজনকে ও ঘোষমশায়ের দেহরক্ষী লেঠেল ভেবেছিল তারা সত্যিই তাই। ওরা ঘোষমশায়ের নিত্যসঙ্গী। সর্বক্ষণ আছে সঙ্গে সঙ্গে। কর্মোপলক্ষ্যে যখন বাইরে যেতে হয়, তখনও সঙ্গে থাকে। অনুরূপ আরও দুজন আছে দোকান ঘরের দ্বারোয়ান। তারা নাকি বন্দুকধারী।
রাত্রে রুনুর শোবার ব্যবস্থা হল একখানা আলাদা ঘরে।
সুন্দর পালঙ্কের উপর পুরু গদি। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন বিছানা। এ ঘরেও আছে চেয়ার, টেবিল, আলমারি ইত্যাদি। শিয়রে টেবিলের উপর হারিকেন জ্বলছে। পাশে ঢাকা দেওয়া এক গ্লাস খাবার জল।
ঘর দেখিয়ে বড়দি বলেন,—এঘরডা আমার বড় ছল সুনীলের। এহোন তো বাড়ি থাহে না। সুসির কাছে শুনিছিস না?
—শুনিছি। উলপুরী এক জমিদার বাড়ি থাক্যে স্কুলে পড়ে।
—আমাগে ইচ্ছে ওরেও তোর মতো বি.এ. পাশ করাব। এহানে তো ধারে কাছে বড় ইস্কুল নাই তাই এই বয়সেই তোর মতো ঘরছাড়া করতি হইছে। তুই তো ছোটোকালেতেই বিদ্যাশে বিদ্যাশে থাকলি।
—উলপুর তো বেশি দূরে নয়। শনি-রবিবারেই তো আসা যায়।
—তা খুব যায়, কিন্তু উনি বেশি বাড়ি আসা পছন্দ হরেন না। কন, ওতে পড়াশুনোর ক্ষেতি হবে। বাড়ি আসে সেই পুজোর ছুটি আর গিরিষ্যির ছুটিতি। থাক, আর কথা কবো না। রাত অনেক হইছে। দরজা দিয়ে শুয়ে পড়ো। হরিকেন এহেবারে নেভাসনে, ডিম হরে রাহিস। কাল দিনির বেলায় আমরা প্রাণ ভরে কথা কব। কতো কথা যে জমা রইছে বুহির মধ্যি। সেই যে তোরা গোবরার বাড়ি ভাঙ্গো খুলনেয় চলে গেলি, তার পরেত্তে আর এট্টা খাবারও নাই। ইন্দির আগে কত আসত, চার বছরের মধ্যি তার মুখখানও দেহি নাই। এ জন্মে আর যে তোরা কেউ আসবি, তা তো ভাবিও নাই রে ভাইডি।
কথা বলতে বলতে বড়দির চোখদুটি অশ্রু ভারাক্রান্ত হয়ে এল। যেতে যেতে বললেন,—কয়দিন থাকবি তো?
—দেখি কয়দিন থাকা যায়। এখন শুয়ে পড়ো গে।
এমন আরামের বিছানাতেও কিন্তু ঘুম আসছে না রুনুর। সেজদির বুড়ো বরের দারিদ্র্য দেখে ওর খুব দুঃখ হয়েছিল সত্যি, কিন্তু বড়দির এই বিপুল বপু বরকে দেখেও কেন যেন দুঃখ হচ্ছে ওর। সম্পদ হয়তো ওঁর অনেক হয়েছে, কিন্তু কি যেন ওঁর হারিয়ে গেছে, যা আর এ জীবনে উনি ফিরে পাবেন না। অর্থ ওঁর শত্রু বাড়িয়েছে, দিয়েছে অশান্তি, তাইতো মুখের সেই মিষ্টি হাসিটি হারিয়ে গেছে, সেখানে পড়েছে কপটতার ছাপ।
উনি পেয়েছেন অনেক, কিন্তু হারিয়েছেন তার চেয়েও বেশি।
পরদিন সকালে রুনুর জলখাবারের আয়োজনটাও বেশ রাজকীয় রকমেরই করেছিল বড়দি।
একসঙ্গে খেতে বসেছিল রুনু এবং ঘোষমশায়। সঙ্গে ছিল জটিক মাঝিও। ওই জলযোগের আসরেই জটিকের সঙ্গে কথা পাকা হয়ে গেল ঘোষমশায়ের। স্থির হল পূজা পর্যন্ত জটিক মাসকাবারিতে কাজ করবে এখানে। নৌকায় করে ওঁর মালপত্র আনানেওয়া করবে। গোপালগঞ্জ, ভেড়ার হাট, উলপুর ইত্যাদি মোকামের বড় বড় দোকানের সঙ্গে ঘোষমশায়ের কারবারের জাল বিস্তৃত। সে সব জায়গায় মাল সাপ্লাই, আদায়পত্র ইত্যাদি ব্যাপারে যোগাযোগ রক্ষা করবে। অবশ্য রুনুকে ওর মেজদির বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া এবং যথাসময়ে সেখান থেকে ওকে এনে গোপালগঞ্জে স্টিমারে তুলে দেওয়াও ওকেই করতে হবে। এ বাবদে রুনুকে এক পয়সাও দিতে হবে না।
এহানে মাসখানেক থাকবা তো?—ঘোষমশায় প্রশ্ন করেন রুনুকে।
কী সর্বনাশ, মাসখানেক! এক সপ্তাহের মধ্যেই বাড়ি ফিরে যাতি হবে। বাবা-মায়ের হুকুম। তাই ভাবছি, এখানে দিন চারিক, মেজদির ওখানে দিন দুই...তারপরই। —সংক্ষেপে কথা শেষ করে রুনু।
তুই কৈস কিরে রুনু,—বড়দি সখেদে বলেনঃ এই কতকাল পরে আইছিস, এ-জন্মে হয়তো আর আসা হবে না। কোথায় কোন দ্যাশে চাকরিবাকরি হরবি, তারপর বিয়ে-শাদি, তখন কি আর দিদিগি কথা মোনে পড়বে? অন্তত দিন পনর থাক্য যা।
আচ্ছা দেখা যাবে।—এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল রুনু।
জলযোগ শেষ করে রুনু বেরিয়ে পড়ল শিবুকে সঙ্গে নিয়ে বিশ্বাস বাড়ির চারিদিকটা ঘুরে দেখতে।
এ বিলে দেশের একটা বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করল রুনু। এ গাঁয়ে বিশ্বেস বাড়ি, মিত্তির বাড়ি, ঘোষেগে বাড়ি, দত্ত বাড়ি ইত্যাদি গোটা দশেক বাড়ি আছে। এক-একটি বাড়ি যেন সমুদ্রের মধ্যে এক-একটা দ্বীপ। বাড়ি মানে কোনও এক ব্যক্তির একটি মাত্র বাড়ি নয়। এ নামগুলি বহুকাল ধরে প্রচলিত। এক এক বাড়িতে অন্তত আট-দশটি পরিবার পৃথক পৃথক ভাবে বাস করে। বিশ্বাস বাড়িটিই সবচেয়ে বড়। এখানে বাস করে বিশ-পঁচিশটি পরিবার। প্রত্যেকটি পরিবারের মধ্যেই দূর অথবা নিকট আত্মীয়তা আছে। এইসব বিদেশে বসতি শুরু হয়েছে বর্গীর আক্রমণের সময় থেকে।
তখন ছিল কেবল অন্তহীন বিল আর বিল। শুকনোর সময় অপেক্ষাকৃত উঁচু জায়গায় সামান্য ধান চাষ হতো, বাকিটা সারা বছরই থাকত জলের তলায়। তখন দূর দেশ থেকে পালিয়ে এসে এক-একটা পরিবার এক-একটা উঁচু জায়গায় আশ্রয় করে বসতি শুরু করে। ক্রমে তারা পুকুর কেটে মাটি তুলে এক-একটা ছোটখাটো দ্বীপ তৈরি করে নেয়। কালক্রমে তাদের বংশ বিস্তার হয়েছে, তাদের আত্মীয়স্বজন আশ্রিত জনের সংখ্যা বেড়েছে। এমনি করে সেই সব দ্বীপ আজ বিশ্বাস বাড়ি, মিত্তির বাড়ি ইত্যাদি নাম গ্রহণ করেছে। বর্তমান বিশ্বাস বাড়িতে বিশ্বাস বলতে মাত্র একঘর। আর সব দাস, দত্ত, ঘোষ, বোস, মিত্র ইত্যাদি। আজকের ঘোষমশায়ের পূর্বপুরুষও ছিল সেই আদি বিশ্বাস মশায়ের বাড়ির ঘরজামাই।
এ বাড়ির তিনদিকে তিনটি বড় বড় পুকুর। পশ্চিমের পুকুরটি তো একটি বিশাল দিঘি। সে দিঘিতে নাকি সব শরিকেরই অংশ আছে। এ গ্রামের পাঠশালাটি দিঘির পশ্চিম পাড়ে। বিশ্বাসদের আদি দুর্গা মন্দির পূর্বপাড়ে। উত্তর-দক্ষিণ পাড় প্রায় বিশ হাত উঁচু। সেই পাড়ে দাঁড়িয়ে দেখা যায় সমস্ত গ্রামটা। দেখা যায় আশপাশের আরও কয়েকটা গ্রাম। আর দেখা যায় দিগন্ত বিসারী জলাভূমি যার অধিকাংশই এখন ধানখেতে পরিণত হয়েছে।
রুনু দেখল, শিবু ওইটুকু ছেলে হলেও অনেক খবর রাখে। পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়েই সারা গ্রামটাকে সে চিনিয়ে দিল রুনুকে। দেখিয়ে দিল কোন দিকে সুরগা, বৌলতলি, কোন গ্রামটার নাম নারকেলবাড়ি। এখন যদিও খানিকটা কাপড় তুলে পায়ে হেঁটে এ-গ্রামের প্রায় সব বাড়িতেই যাওয়া যায় কিন্তু শ্রাবণ থেকে অঘ্রাণ পৌষ পর্যন্ত ছ'মাস নৌকা ছাড়া কোনো গতি নাই। অনেক পরিবারেই নিজস্ব ডিঙ্গি আছে। ঘোষমশায়ের নিজেরই আছে ছোট-বড় দুখানা। তাছাড়া জটিকের নাও খানাও তো এবার পুজো পর্যন্ত নিয়ে নিলেন।
সেদিন বিকেলে একাকী দিঘির পাড়ে এসেছিল রুনু। তাকিয়েছিল পশ্চিম দিকে। ও দিকটা একেবারে দিগন্ত পর্যন্ত উন্মুক্ত প্রান্তর—ধান খেত, মাঝে মাঝে টলটলে জলের ঝিলিক। জলের উপর বিচিত্র বর্ণের শেওলা, শাপলা আর হাজারো পদ্মফুল। এক সঙ্গে এত পদ্মফুল ও আর দেখেনি জীবনে।
যদিও আষাঢ়ের আকাশ কিন্তু সেদিনের আকাশ ছিল বড় স্বচ্ছ, গাঢ় নীল, গভীর গম্ভীর। সে নীল রং বড় মায়াময়, বড় মোহময়। দিগন্তে কয়েকখণ্ড পেঁজা তুলো মেঘ যেন সূর্যের সঙ্গে খেলা করছে আর মুগ্ধ চোখে দেখছে শ্যামস্নিগ্ধ পৃথিবীকে।
মেঘের সঙ্গে আর পদ্মফুলের সঙ্গে অস্তমান সূর্যের খেলা দেখতে দেখতে কখন যে আঁধার ঘনিয়ে এল, সে খেয়াল ছিল না রুনুর।
কাব্যগ্রন্থে পড়েছে, আজ চোখের সামনেই দেখল সেই দৃশ্য রুনু। সূর্য ডুবে গেল, পদ্মফুলগুলি আস্তে আস্তে যেন ঘুমিয়ে পড়ল আর ধীরে ধীরে জেগে উঠছে একে একে সাপলা ফুলগুলি। ধীরে ধীরে বিকশিত হচ্ছে তাদের মুদ্রিত দলগুলি।
আবার যখন সূর্যোদয় হবে কাল প্রাতে, কমলদল বিকশিত হয়ে সহাস্য সম্বর্ধনা জানাবে সূর্যদেবকে, আর সূর্যালোকভীতা কুমুদিনীরা সভয়ে মুদ্রিত করবে তাদের পাপড়িগুলি।
ওদের এই ঘুম আর জাগরণের দৃশ্যটা কাল ভোরে আবার দেখতে হবে, মনে মনে স্থির করল রুনু।
দুদিন ধরে বড়দির ঘরে চারবেলা চর্ব্য, চোষ্য, লেহ্য, পেয় চলছিল সমানে। ক্রমে পেট প্রতিবাদ করতে শুরু করল। ও স্থির করল আর এখানে নয়। রাত পোহালেই ও জটিকদাকে নিয়ে রওনা হবে মেজদির বাড়ি।
একটা ব্যাপার স্থির করে ফেললেও আর একটা ব্যাপারে ও কিছুতেই সঙ্কোচ কাটিয়ে উঠতে পারছে না।
বড়দি ও সেজদির জন্যে ও একজোড়া ভালো তাঁতের শাড়ি এনেছিল। দাদা বউদি তো দেখে বলেছিল খুব ভালো শাড়ি। কিন্তু বড়দি যে ইতিমধ্যে এত বড়লোক হয়ে গেছে সে তো ভাবতেই পারেনি ওরা। রুনু দেখছে বড়দি যে সব আটপৌরে শাড়ি পরছে সেগুলিও বেশ দামি। সেক্ষেত্রে রুনুর শাড়ি যদি পছন্দ না হয়। যদি প্রত্যাখ্যান করে হেলাভরে?
অথবা বড়দির যে ব্যবহার দেখছে ও দুদিনে, তাতে তার মধ্যে বড়লোকী অহঙ্কার তো চোখে পড়ল না একবারও। সেই আগের মতোই সেই আগের মতোই মমতাময়ী মিষ্টভাষী আছে এখনও। একেবারে মায়ের মতো আন্তরিকতার সঙ্গে যত্ন করছে রুনুর। ঘোষমশায়ের আচরণে অবশ্য প্রায়ই প্রকাশ হয়ে পড়ছে তার বড়লোকী চালটা। ভয় বড়দিকে নয়, আসল সঙ্কোচ ওর ঘোষমশায়কে নিয়ে। তিনি যদি ও শাড়ি দেখে বলেন দিয়ে দিতে?
বড়দিকে না দিয়েও যদি কেবল সেজদিকেই দুখানা শাড়ি দেয় তাহলে বড়দির আবার অভিমান হবে না তো?
এই সব ভেবেই কতর্ব্য স্থির করতে পারছিল না।
আজ একটা মতলব মাথায় নিয়ে ঘোষমশায়ের অনুপস্থিতিতে ও ডাকল বড়দিকে।
—তোমাকে একটা কথা কব বড়দি। আগে কও দাদাবাবুকে কবা না।
কী এমন গোপন কথা?—হেসে বলে বড়দি।
—হাসলে চলবে না। আগে কথা দাও। তারপর কব।
—আচ্ছা।
রুনু এবার তার স্যুটকেস খুলে বের করল সেই শাড়ি।
—তোমার আর সেজদির জন্যি এক জোড়া শাড়ি আনিছি। তুমি তো খুব বড়লোক, তাই লজ্জায় এ কয়দিন বার করিনি। এই শাড়িখান তুমি পরবা। আমার টিউশনির টাকায় কিনিছি। তোমার পছন্দ হবে না?
বলতে বলতে শাড়িখানা বড়দির পায়ের কাছে রেখে তাকে প্রণাম করল রুনু।
বড়দি সঙ্গে সঙ্গে রুনুকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, —ওরে আমার সোনা ভাইরে, তোর আয় করা টাহায় আমারে শাড়ি দিচ্ছিস, তা পছন্দ হবে না তুই কৈস কি? এ আমার কাছে রাজার ধন।
শাড়িখানা বুকের উপর চেপে ধরল বড়দি।
—সত্যি, পছন্দ হইছে?
—খুব খুব। খুব পছন্দ হইছে। এই জন্যি এত কিরে করালি।
—ভাবছিলাম দাদাবাবু যদি কিছু...
—দূর বোকা, এ তো কত ভালো শাড়ি। তুই আমারে একখানা জোলায়ে শাড়ি দিলিও আমি মাথায় করে নেতাম। তয়, আমি এবার এট্টা কথা কই ভাই।
—কী কথা?
—আমি তোর সামনে এহুনি এই শাড়ি পরব। তারপর, রাগ করিস না ভাই, শাড়িহান আমি সুমিরি দেব। ভগোবান আমারে তো অভাবে রাহেন নাই, কিন্তু ওর বড় অভাব রে। এমন ভালো শাড়ি ও হয়তো জীবনেই পরেনি। মিত্তিরমশায় তো বছোরে দুখান জোলাই শাড়ি দেয়। তা ও সব বছর জোটে না। ও তো আমার পুরোনো-টুরোনো দিয়েই চালায়। এক সঙ্গে ভালো ভালো দুহোন শাড়ি পালি ওর যে কী আনন্দ হবে রে।
সত্যি সত্যি বড়দি তখনই শাড়িখানা পরলেন। তারপর কাপড়খানা খুলে সুন্দর করে ভাঁজ করে রুনুর হাতে দিয়ে বলেন,—যা, এবার সুমিরে দে গিয়ে। এখান যে আমি পরে তারে দেলাম, এ কথা কৈস তারে। দেহিস কী খুশি হবে। ও বড় দুঃখী রে।
—তুমি তো ইচ্ছে করলি সেজদিরে ভালো শাড়ি-টাড়ি...
—ইচ্ছে থাকলিও কি সব সময় সব কিছু পারা যায় রে। উনি আবার এসব বেশি...থাকগে ওসব কথা। বড়লোক হলিই মোনডাও কি বড় হয়রে? বরং...
বড়দি ব্যস্তভাবে রান্নাঘরে চলে গেলেন। রুনু বুঝল বড়দির মনের গভীরে একটা গোপন ব্যথা আছে। তিনি তা রুনুকে জানতে দিতে চান না।
এক জোড়া শাড়ি নিয়ে রুনু এল সেজদির ঘরে।
সেদিন ওই শাড়ি পেয়ে সেজদি যে কী খুশি হয়েছিল। হেসে, কেঁদে নেচে একটা কাণ্ডই করে বসল। প্রায় পাঁচ মিনিট ধরে তো শাড়ি সমেত রুনুকে বুকেই চেপে রাখল। তারপর উচ্ছ্বাসে আবেগে কত কী যে বলে গেল একটানা। বার বার গন্ধ শুকল, বার বার পাড়টা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল।
এক সময় ভারী গলায় বলল,—আহা, মাইয়েডার জন্যিও যদি এট্টা জামাটামা আনতিরে ভাই। ওডা তো জন্মাবধি প্রায় ন্যাঙটাই রইছে। চার বছোর পার হতি চলল। সামনের আশ্বিনি পাঁচে পড়বে।
রুনু সঙ্গে সঙ্গে বলে,—আমার খেয়াল ছিল না রে সেজদি। তুই এই পাঁচটা টাকা রাখ। মিত্তির মশায়রে দিয়ে ওর জামা আনায়ে নিস।
সেজদি টাকাটা প্রায় লুফে নিল রুনুর হাত থেকে। বলল,—ঈশ! ওই শত্তুরির হাতে টাহা দেব। টাহা হাতে পালিই ও গাঁজা খাবে। তাইতো বড়দাদাবাবু ওরে দেখতি পারে না। ছেলেরাও কেউ ওর হাতে টাহা দেয় না।
—তবে? তোদের এখানে হাটটা কদ্দূর? আমিই তালি কিনে আনব।
—দূর, মাইল খানেক জল কাদা ভাঙে তুই হাটে যাবি কোন দুঃখি? রাখ, এট্যা বুদ্ধি আইছে মাথায়। শোনলাম জটিকদা আজ গোপালগঞ্জ যাবে ঘোষমশায়ের মালপত্তোর আনতি। তিনিও যাবেন। এহোন তো ছোট নাও ছাড়া গতি নাই। বর্ষাকালে বড় বড় নাও বোজাই হয়ে মাল আসবে খুলনা, কৈলকাতা বরিশাল ওই সব দ্যাশেত্তে। আবার সেই সব নাও বোঝাই হয়ে যাবে এ দ্যাশের ধান, চাল, পাট। এই তো ওনার কারবার।
—তবে তো ঘোষমশায়ের কাছে টাহাডা দিলিই...
—দূর, উনি এসব খুচরো কেনাকাটার মধ্যি নাই। টাহাডা দেবানে জটিকদার হাতে। উনি আমাগে খুব চেনা আর খুব বিশ্বেসী। তোগে মিত্তিরমশায়ের খুব বন্ধুও।
সেদিন রাত প্রায় দশটার সময় রুনু যখন শুতে যাবার জন্য তৈরি হচ্ছিল, সেজদি প্রায় নাচতে নাচতে এল ওর শোবার ঘরে। কোলে নতুন লাল টুকটুকে জামা পরা মরুণী। নিজের পরনে নতুন ব্লাউজ আর রুনুর দেওয়া শাড়ি। আজ চুলেও তেল পড়েছে। কপালে মস্ত সিঁদুরের টিপ।
—দ্যাখ দ্যাখ রুনু, তোর পাঁচ টাহায় কত জিনিস হয়ে গেল।
কতো জিনিস মানে?—প্রশ্ন করে রুনু।
—মরণীর ইজের হল, ফরখ হল। আবার আমার বেলাউজও হয়ে গেল।
—তাহলে তো খুব সস্তায় কিনিছে জটিকদা।
—বলে জিনিস কিন্তু খুব ভালো। জামাডা কী সুন্দর না? বেলাউজডাও চোমৎকার না? আবার এট্টা সিঁদুর, এট্টু নারকেল তেলও হয়ে গেল। বুড়োরে কিনতি দিলি এসব কিছু হতো না। টাহাডাই জলে যাত। নে মরুণী তোর মামারে পেনাম হর। এসব দেছে তোর মামা।
সেজদির কোল থেকে নেমেই ঢিপ করে সে প্রণাম করল রুনুকে। রুনু তাকে লুফে নিল বুকে। কী উজ্জ্বল হাসি-খুশি মুখ আজ মেয়ের।
রুনু তাকে আদর করতে করতে বলে,—মরুণী নয় রে, তোর মেয়ের নাম রাখলাম ময়না। আমার ছোট্ট পাখি ময়না। মনে থাকবে তো?
—খুব মনে থাকবে।
মরুণীকে তখুনি নামটা বার বার বলিয়ে শিখিয়ে দিল সেজদি।
সামান্য পাঁচটা টাকা যে এতখানি আনন্দ সৃষ্টি করতে পারে কে জানত? আবেগে রুনুর চোখে জল এসে গেল। সেজদির চোখেও আনন্দাশ্রু।
সেজদি রুনুকে জড়িয়ে ধরে বলে—জীবনে এত সুখ কোনওদিনও পাইনিরে ভাই। কী বলে যে তোরে আশীর্ব্বাদ দেব। শোন ভাই, কাল দুফরে তুই আমাগে ঘরে খাবি। গরিব দিদি বলে হেলাফেলা হরবি না তো?
খাব, খাব, খাব। একশো বার খাব। হল তো?—হেসে বলে রুনুঃ ময়না যে এত সুন্দর, তা তো এই কয়দিনি বুঝতি পারিনিরে সেজদি। কী মিষ্টি মুখ আর কী সুন্দর হাসিটুকু। তোকেও ভারী সুন্দর দেখাচ্ছেরে। একেবারে বদলে গিছিস।
সে রাতে ময়নাকে রুনুর কোল ছাড়া করতে আর তার গা থেকে নতুন জামা খুলতে বেশ ঝামেলা পোহাতে হয়েছিল। হয়েছিল অনেক কান্নাকাটি। কান্নাটা থামাতে হয়েছিল রুনুকেই। সেই থেকে ওর সঙ্গে দারুণ ভাব হয়ে গেল রুনুর। কান্না থামিয়ে, ঘুম পাড়িয়ে তবে রুনুর ছুটি।
রাত পোহাতেই ময়না আবার পরেছে তার নতুন জামা। তারপর বেরিয়েছে বাড়িশুদ্ধ মানুষকে তার নতুন জামা দেখাতে। সবাইকে বলেছে সগর্বে, —এই দ্যাকো তুন্দর জামা। মামা দেছে। তুন্দর মামা।
পাড়া পরিক্রমা শেষে এসেছে রুনুর কাছে। এসেই শুরু করেছে ওর হাত ধরে টানাটানি,—মামা তলো, মামা তলো।
—কোথায় যাব রে?
—মা কইছে, নিমন্ত খাবানা?
—রান্না হবে, তবে তো খাব। আগে রান্না হোক, তার পর যাব।
—না না না, একুনি যাতি হবে। মা কইছে।
রুনু ওকে রাগবার জন্যে বলে,—এখন যাব না। দুপুরে যাব।
শুরু হল কান্না। এবার হার মানতে হল। ময়নাকে কোলে নিয়ে চলল রুনু সেজদির ঘরের দিকে। তখন বোধহয় আটটাও বাজেনি। ইতিমধ্যে সেজদিও সব-বাড়িতে ওর শাড়ি-ব্লাউজের প্রদর্শনী করে এসেছে এবং মেয়ের নতুন নামটা সর্বত্র প্রচার করে দিয়েছে।
সেদিন সেজদির ঘরের মোটা চালের ভাত, পাতলা মুসুড়ির ডাল, একটু শুক্তো, একটু পুঁটি মাছের ঝোল একটু আলু ভাজা, একটু শুকনো কুলের অম্বল খেয়ে যে তৃপ্তি পেয়েছিল রুনু, তার শতাংশও পায়নি বড়দির বাড়ির রাজভোগ খেয়ে।
সেজদির বাড়িতে নিমন্ত্রণ খেয়ে, সারাদিন ওদের সঙ্গে গল্পগুজব করে সন্ধ্যার আগে বড়দির বাড়িতে ফিরে এসেছিল রুনু।
কেন এমন হয়? মনে মনে বিশ্লেষণ করে রুনু।
ও বাড়ির খাদ্যের সঙ্গে যেন একটা অহঙ্কারের ঝাঁঝ মেশানো। বস্তুগুলি যেন সদম্ভে ঘোষণা করে দ্যাখো আমরা কী মূল্যবান। ওখানে হৃদয় নেই, ভালোবাসা নেই।
সেজদির যে ভালোবাসার মশলায় রান্না। তাইতো এর স্বাদই আলাদা। এই তৃপ্তির স্বাদটুকু মুখে নিয়েই সাতপাড়া থেকে বিদায় নিতে হবে। এখানে আর নয়। এবার যেতে হবে মেজদির ওখানে।
মন স্থির করে রাত্রেই স্যুটকেস গুছিয়ে রেখেছিল রুনু। ভোরে উঠেই জটিকের সঙ্গেও কথা বলে রেখেছে।
সকালে জলযোগ শেষ করেই বড়দি ও দাদাবাবুকে প্রণাম করল রুনু।
কী ব্যাপার? এই সহালেই এট্টা পেনাম?—প্রশ্ন করেন ঘোষমশায়। বড়দির চোখেও সেই প্রশ্ন।
—এখুনি রওনা হব বড়দি। জটিকদার সঙ্গে কথা হয়ে গেছে। এখন নাকি ঘাগর যাতি হবে অনেক ঘুরে। জটিকদা কলো, এখন রওনা না দিলি সন্ধ্যার আগে পৌঁছনো যাবে না।
বড়দি যেন আকাশ থেকে পড়লেন।
—তুই কৈস কি রুনু। সুরিরি দেখতি যাবি, সে তো ভালো কথা। সে ও তো আমাগে মতোই নিব্বাসনে পড়ে রইছে। তা আজই জাতি হবে ক্যান?
তারপরেও বড়দির সঙ্গে একটা কথার যুদ্ধ চলেছিল কিছুক্ষণ। শেষ পর্যন্ত রুনুর জিদই রইল।
সকাল নটার আগেই ওরা রওনা হয়ে গেল।
যতক্ষণ ওদের নৌকোটা দেখা যাচ্ছিল, সেজদি ময়নাকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল কুলতলায়। ময়না ভীষণ কাঁদছিল। কাঁদছিল সেজদিও।
কুবীর রায় নামটি রুনুর মনে আছে, মানুষটির চেহারাও মোটামুটি মনে আছে।
রায়-মশায়ের সঙ্গে গোপালগঞ্জ স্কুলে পড়ার সময় অনেকবার দেখা হয়েছে। তাকে যে প্রায়ই আসতে হয় কোর্ট-কাছারীতে মামলা-মোকদ্দমা প্রসঙ্গে। ওদেশের জমিজমা সংক্রান্ত যে-কোনও মামলায় তিনি কোনও-না-কোনও ভাবে জড়িত। নিজেরও কিছু জমিজমা আছে। তার অধিকাংশই অনেক কৌশলী মামলায় হস্তগত হয়েছে ওঁর। বস্তুতঃ মামলার পরামর্শ দিতে, সাক্ষী তৈরি করতে এবং সাক্ষী দিতে ওঁর একটা সহজাত দক্ষতা আছে। মামলা ওঁর একটা নেশা এবং পেশাও। এ বাবদে ওদেশে রায়মশায়ের সুনাম দুর্নাম দুই-ই আছে।
এসব খবর এবার এদেশে আসার আগে দাদার কাছেই শুনে এসেছে রুনু। এই রায়মশায়ই মেজদির স্বামী কুবীর রায়।
কিন্তু সেই মামলাবাজ কুবীর রায়কে এহোন আর পাবি না।—বলেছিল দাদাঃ মানুষটা এহেবারে বদলে গেছে।
—কেন?
হেসে বলেছিল দাদা,—মেজদির তো ছেলেপুলে ছেল না। কত যে তাবিজ, কবচ, ধর্ণা, মানত করিছে তার আর ঠিক-ঠিকানা নাই। খবর পাইছি, বছর দুই হল কোন এক পীরসাহেবের জলপাড়া খাইয়ে মেজদির এট্টা ছেলে হইছে। সেই ছেলে হবার পরেতে কুবীর রায় মামলার নেশা ছাড়্যে দিয়ে ছেলের নেশায় ডুবে আছে। এখন নাকি ছেলে থুয়ে এক পা-ও নড়ে না ঘরেত্তে। এমনকী নিজের চাষবাসও ঠিক মতো দেহাশুনো হরে না।
ঘাগরের পথে যেতে যেতে এই 'ছেলে-পাগল' রায়মশায়ের একটা ছবি আঁকছিল রুনু মনে মনে।
এক সময় জটিককে প্রশ্ন করল,—আগে তুমি ঘাগর গেছ কোনও দিন জটিকদা?
—না রে ভাইডি, ঘাগর অবধি যাওয়া হয় নাই। পুব দ্যাশে খুব কম গিছি। বার দুই গিছি বাজুনে, একবার গিছি মাঝি গাতি। তয় পথঘাট মোটামুটি চিনি। তোমার মেজদাদাবাবুর নামডা কি কও দেহি?
—কুবীর রায়। নাম শুনিছ?
—না, ওনামডা শুনি নাই। তয় গেরাম গায়ে এট্টা মানুষরে খুঁজে নিতি কতক্ষণ?
রায়মশায়র এদেশে সবাই চেনে। খুব নামকরা লোক।—সগর্বে বলে রুনু। অবশ্য কি বাবদে তিনি নামকরা লোক তা বলল না রুনু।
সন্ধের একটু আগে ঘাগরের খালে পড়ে প্রথম যে লোকটিকে জিজ্ঞাসা করল কুবীর রায়ের বাড়ির কথা, তার কাছেই পাওয়া গেল পথের নিশানা।
কুবীর রায়ের বাড়ির ঘাটে পৌঁছতে অবশ্য আরও বার কয়েক একে ওকে জিজ্ঞাসা করতে হল। শেষ পর্যন্ত ওরা যখন পৌঁছল তখন সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হয়ে গেছে।
বাঁশ বাগান আর বিবিধ গাছপালায় ঘেরা বেশ বড়সড় একখানা চৌচালা খড়ের ঘর। দক্ষিণদ্বারী ঘর। সামনে প্রশস্ত বারান্দা। বারান্দার পুব কোণে একটি ছোট কুঠুরী, পশ্চিম দিকে অনেকটা জায়গা শক্ত বাঁশের বেড়ায় ঘেরা। সেই ঘেরা জায়গাটায় মানুষ সমান উঁচু করে প্রচুর ধানের বস্তা সাজানো।
সামনের উঠোনটা মস্ত বড়। উঠোনের পুব-পশ্চিম দুদিকেই ছোটখাটো দুখানা খোড়ো ঘর। উঠোনের একদিকে মস্ত খড়ের পালা, আর এক দিকে ধানের গোলা।
উঠোনে এসেই বোঝা যাচ্ছে রায়মশায় বেশ ধানী পানি গৃহস্থ। পশ্চিম দিকের গোয়াল ঘরে কয়েকটা গরু আছে। পুব দিকের ঘরখানার কেবল একটা কোণ দেখা যাচ্ছে, বাকিটা পড়ে গেছে ধানের গোলার আড়ালে।
বাঁশ ঝাড়ের মাথায় অন্ধকার নেমে এসেছে। বারান্দার কোণে অস্পষ্ট একটু আলো। সেদিক থেকে শোনা যাচ্ছে একটা শিশুর কান্না।
নিঃশব্দে উঠোন পেরিয়ে বারান্দায় উঠে এল রুনু। তখন পিদীমের অস্পষ্ট আলোয় চোখে পড়ল দৃশ্যটা।
পঞ্চাশোর্ধ এক বৃদ্ধ একটা বস্তা পেতে বসেছেন বারান্দার পুবদিকের কুঠুরীর দোর গোড়ায়। কোলে তাঁর একটি বাচ্চা। বাচ্চাটিকে ঝিনুক দিয়ে তিনি দুধ খাওয়াচ্ছেন। সেটা তারস্বরে চিৎকার করছে আর বৃদ্ধটি বিচিত্র সুরে ছড়া গেয়ে তাকে শান্ত করতে চেষ্টা করছেন।
সবৎস কুবীর রায়কে চিনতে অসুবিধা হল না রুনুর। মনে পড়ল দাদার বর্ণনা—'ছেলের নেশায় ডুবে আছে কুবীর রায়'। দৃশ্যটা দেখে ভারি মজা পেল রুনু। একটা পুরুষ মানুষ যে এমন করে বাচ্চাকে দুধ খাওয়াতে পারে, কে জানত।
মিটি মিটি হাসতে হাসতে নিঃশব্দে এগিয়ে এল রুনু আলোর বৃত্তের মধ্যে। নরম সুরে ডাকল,—দাদাবাবু।
রায়মশায় চমকে উঠলেন,—কেডা? কী চাই?
চিনতি পারলেন না?—হেসে বলে রুনু। তারপর নত হয়ে প্রণাম করে।
এবার আলোটা উঁচু করে তুলে ধরলেন রুনুর মুখের কাছে। ওকে দেখে বাচ্চাটার কান্নাও থেমে গেল। হয়তো দুধ খাওয়ানো বন্ধ হতেই ওর কান্না থেমেছে।
—চিনতি পাল্লাম না তো। কেডা তুমি?
—কী আশ্চর্য, ভাগ্নে তো ঠিক চিনিছে। ওই দ্যাহেন কান্না থামায়ে টুল টুল করে আমার দিকি চাইয়ে আছে। আমি রুনু। আপনাগে সাথে দেহা করতি আলাম। ভালো আছেন দাদাবাবু? মেজদি কোথায়?
—কী কাণ্ড! আমাগে সেই ছোট শালা এহোন এই হইছে! কদ্দিন পরে দ্যাখলাম কও তো। পেরায় পাঁচ-ছয় বছোর। এ যে এহেবারে আলাদা মানুষ। এহেবারে এক রাজপুত্তুর।
রায়মশায় বাচ্চা কোলে উঠে দাঁড়িয়ে হাঁক-ডাক শুরু করলেন—ওগো শোনছ। দেহে যাও কেডা আইছে। এহেবারে যারে কয় মাটিতি চাঁদের উদয়। বসো ভাইডি, আমি ওরে রান্নাঘরেত্তে ডাহ্যে আনি।
রায়মশায় যাচ্ছিলেন উঠোন পেরিয়ে রান্নাঘরের দিকে। ধানের গোলার পেছনের সেই খোড়ো ঘরটাই ওঁদের রান্নাঘর।
ইতিমধ্যে একটা কেরোসিনের প্রদীপ হাতে ধানের গোলার আড়াল থেকে উঠোনে এসে পড়েছে মেজদি।
প্রদীপের অস্পষ্ট আলোয় মেজদির মুখের দিকে তাকিয়ে একটা অদ্ভুত অনুভূতি হল রুনুর। মনে হল ঠিক যেন মা ওর সামনে দাঁড়িয়ে। সেই মুখ, সেই স্নেহভরা চোখ।
মাতৃজ্ঞানেই মেজদিকে প্রণাম করল রুনু।
মেজদিও ঠিক মায়ের মতোই উচ্ছ্বাসে আবেগে ওকে জড়িয়ে ধরে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল।
—ওরে আমার সোনা ভাই, এ-জম্মে আর যে তোগে মুখ দেখতি পাব ভাবি নাই। যদ্দিন গোবরার আগের বাড়ি ছেল, বাবা পিতি বছর লক্ষ্মী পুজোর সময় নিয়ে যাতো। সে বাড়িও পোড়া নদীর প্যাটে গ্যালো, আমাগেও বাপের বাড়ি যাওয়া ঘুচে গেল। তারপর তো তোরা কোন সেই দূর দ্যাশে চলে গেলি।
—সে বাড়িতে আমি তো এ্যাদ্দিন ছেলাম না রে মেজদি। পড়তাম বরিশাল কলেজে। ওই ছুটি, ছাটায় মাঝেমধ্যি...
—এ্যাদ্দিনি বোধহয় বি.এ. পাশ করিছিস, তাই না?
—পরীক্ষা দিছি। পাশও করব হয়তো।
পাশ তো করবিই। তোর মতো কয়ডা ছল আছেরে দ্যাশে? তা, এ্যাদ্দিন পরে আলি তো দুই ভাই এক সাথে ক্যান আলি না? আগে ইন্দর পিতি বছর ঘাগরের মেলায় আসত। তাই খবরডা-আশটা পাতাম। এই পাঁচ-ছয় বছরের মধ্যি সে-ও আর এ মুহো হয় নাই।—চোখ মুছতে মুছতে বলে মেজদি।
—দাদা তো বাবা মারে ফেলে দূরি কোথাও যাতি পারে না রে মেজদি। বাবা যে প্রায় অন্ধ হয়ে গেছেন। মাও তো বুড়ো হইছে। এখন আর তেমন খাটা-পেটার শক্তি নাই। একা বউদিই সব দিক সামলায়।
—কেমন হইছেরে ইন্দিরের বউ? দেখার ভাগ্যি তো হবে না। কী নিব্বাসনেই যে দিয়ে থুইছে বাবা।
সব বোনেরই এক অভিযোগ। এর কোনো জবাব নেই। মেজদির প্রথম প্রশ্নের জবাব দিল রুনু। বলল,—বউদি খুব ভালোরে মেজদি। খুব হাসি-খুশি আর দারুণ খাটতে পারে।
—বাবা মা-রে ভক্তি, ছেদ্দা হরে তো?
—খু-উ-ব। বাবা মা-ও খুব ভালোবাসেন তারে। ভাই বোনকে কথায় মগ্ন দেখে রায় মশায় বলেন,—আমি দেহি তো রান্নাঘরে কি চাপায়ে আইছ। তা আবার পুড়ে-ঝুড়ে গেল নাকি কেডা জানে?
ডালডা সেদ্ধ হয়ে গেলি নামায়ে রাইহো। আমি আস্যে সোম্বার দেবানে।—বলে মেজদি।
—ক্যান, আমি কি সোম্বার দিতি জানি না? তাড়াতাড়ি আইসো। নতুন কুটুমরি কি খালি ডাল-ভাত খাওয়াবা? হাঁসের ডিম আছে না?—জিয়েল মাছও তো বুঝি আছে কয়ডা।
তোমার ওসব ভাবতি হবে না। তুমি যাইয়ে ডালডা নামাও গে আমি আসতিছি।—ব্যস্ত ভাবে বলে মেজদি।
বাচ্চাটকে মেজদির কোলে দিয়ে রায়মশায় মেজদির হাতের প্রদীপটি নিয়ে গেলেন রান্নাঘরে।
রায়মশায় কি রান্না করতিও পারেন?—হেসে বলে রুনু।
ও সব পারে। তয় কম্মোর চাইয়ে অকম্মোই বেশি করে। এডারে তো সব সময় উনিই সামলায়। —বাচ্চাটাকে ঘুম পাড়াতে পাড়াতে হেসে বলে মেজদিঃ —ওর কথা থো। তোগে কথা ক। বাড়ির সবাই ভালো আছে তো?
—হ্যাঁ, মোটামুটি।
—এহোন তুই এট্টা বিয়ে হর। সেই সুবাদে আবার যদি আমরা সব কয়ডা ভাইবুন একোত্তের হতি পারি। ইন্দিরির বিয়ের সময় তো একখান পত্তোর দিয়েই কতব্য শ্যাষ করিছে বাবা। তোর বিয়েতে কিন্তু আমাগে সব বুনিরি নিতি হবে। সেইডেই তো বাবার জীবনের শ্যাষ কাজ। বিয়েতে দেহিস খুব হই হই হবে। মস্তো ব্যান পাটি আসবে, কত আলোর রোশনাই হবে...
এক নাগাড়ে দীর্ঘক্ষণ ধরে রুনুর বিবাহের এক অপরূপ স্বপ্নময় ছবি এঁকে যাচ্ছিল মেজদি। ওদিকে কখন যে আকাশ ঘন মেঘে ছেয়ে গেছে সেদিকে কারও খেয়াল নেই। খেয়াল হল ঝম ঝম করে প্রবল বর্ষণ শুরু হতেই।
মেজদি রুনুর কোলে ঘুমন্ত বাচ্চাটাকে দিয়ে এক দৌড়ে বেরিয়ে গেল বৃষ্টির মধ্যে। আর সেই মুহূর্তেই রুনুর স্যুটকেসটা মাথায় নিয়ে ভিজতে ভিজতে বারান্দায় উঠে এল জটিক মাঝি।
—আমার কথা কি ভুলে গিছিলে ভাইডি? অন্ধকারে মশার কামড় খাতি খাতি...বিষ্টি নামতি শ্যাষে দৌড়ায়ে আলাম।
স্যুটকেসটা বারান্দার এক কোণে রাখতে রাখতে অভিমানী সুরে বলে জটিক মাঝি।
রুনু অপ্রস্তুতের একশেষ। ও ঘাটে নামতে নামতে বলেছিল, তুমি এট্টু বসো জটিকদা। তামাক-টামাক খাও। আমি এট্টু খবর-টবর নিয়ে আসি।
তারপর কত সময় পার হয়েছে কে জানে। দাদাবাবু আর মেজদির সঙ্গে কথা বলতে বলতে ও ভুলেই গেছিল জটিকের কথা।
আমারে মাপ করো জটিকদা।—অপরাধী গলায় বলে রুনু।
—আচ্ছা বোঝলাম। নতুন কুটুমগি পাইয়ে...কোলের এডি বুঝি ভাগনে? তা তোমার দিদি-দাদাবাবুরা কই?
এই সময় অন্ধকার ফুঁড়ে ভিজতে ভিজতে ছুটে এলেন দাদাবাবু। জটিককে দেখে বলেন,—ইনি কেডা?
রুনু জটিককে বলে,—এই আমার দাদাবাবু, আর...জটিকের পরিচয় জটিকই দিল,—পেন্নাম হই রায়মশায়। আমি জটিক, জটিক মাঝি। আপনার শালারে আমিই তো নিয়ে আলাম সাতপাড়াত্তে। এনার বড়দির বাড়িত্তে।
কী সব্বোনাশ! তোমরা এহন সাতপাড়াত্তে নৌকোয় আইছ? আমি তো ভাবলাম রুনু বুঝি গোপালগঞ্জেত্তে হাট্যে আইছে। তা কতি হবে তো। শোনছো,—রান্নাঘরের উদ্দেশ্যে বলেন রায়মশায়ঃ আর এক জনের চাল নিও।
ব্যস্ত হবেন না রায়মশায়। আস্যে যহোন পড়িছি কুটুমবাড়ি,—হেসে বলে জটিকঃ তহোন খাওয়ার ব্যবস্তাও হবে। খুড়িমারে ডাহেন। পেনাম হরি।
খুড়িমা? খুড়িমা কেডা?—অপ্রস্তুত ভাবে বলেন রায়মশায়।
—এনার বড়দি আমার খুড়িমা হলি মেজদিও খুড়িমা হবেন।
—তাই নাকি? খুব ভালো। তোমার বাড়িও বুঝি সাতপাড়া!
—না, সাতপাড়ায় আমাগে অনেক আত্ম-কুটুম আছে। আমাগে বাড়ি হল দিঘেলে। নাম শুনিছেন?
—শুনেছি। দিঘেলে তো শুনিছি বেশ বড় গেরাম। বসো বাবাজী বসো। আমি দেহি বাচ্চাডারে—খোকার মা-র কী বুদ্ধি দেহিছ? কতোকাল পরে ভাই আইছে, অমনি তার কোলে বাচ্চাদের চাপায়ে দেছে।
তাতে কি হইছে?—হেসে বলে রুনুঃ ও তো বেশ ঘুমোচ্ছে।
বাচ্চাটাকে রুনুর কোল থেকে নিয়ে রায়মশায় ভিতরে চলে গেলেন প্রদীপটা হাতে নিয়ে। যেতে যেতে বললেন,—আমি ওরে শোয়াইয়ে থুয়ে আসি। তোমরা এট্টু অন্ধকারেই বসো ভাইডি। আমি হারিকেনডা জ্বালায়ে আনি।
অন্ধকারে জটিক আর রুনু বসে রইল মুখোমুখি।
বৃষ্টির ছাট লাগছে গায়ে। মশার কামড় খেতে খেতে আর বৃষ্টির ঝুমঝুম শব্দ শুনতে শুনতে রুনুর মনটা চলে গেল ওর শৈশবের দিনগুলিতে। এমনি কত অন্ধকার বর্ষার রাতে ওরা ক' ভাইবোন মাকে ঘিরে বসে গল্প শুনেছে। সুয়োরানি-দুয়োরানির গল্প, পক্ষীরাজের গল্প, সীতার বনবাসের গল্প। সেদিনগুলি আর এ জীবনে ফিরে আসবে না। অথচ বছরে বছরে ফিরে আসে এমনি মায়াময় অন্ধকারে ঢাকা ঝুমঝুম বাদল-সঙ্গীত মুখরিত বর্ষা রাত।
রুনুর মধুর স্বপ্নটাকে ভেঙে দিলেন রায়মশায় একটা হারিকেন হাতে বারান্দায় এসে। ব্যস্ত হয়ে বললেন,—তোমরা তাড়াতাড়ি হাত মুখ ধুয়ে নেও। ঐ কলোসটায় জল আছে। তারপর চাড্ডি খাওয়া-দাওয়া করে শুয়ে পড়ো। ওরে সব্বোনাশ, সেই সাতপাড়াত্তে ঘাগর, সে কি কম পথ। সারাদিন তোমার খুব খাটনি গেছে জটিক। দ্যাহোদেহি কী লজ্জার কথা। ভাইডি তোমার কথা যদি আগেই কথো তো প্যাট ভরে চিড়ে-মুড়ি...
কুটুম বাড়ি চিড়ে-মুড়ি খাব ক্যান?—হেসে বলে জটিকঃ খাব মাছ-মাংস-ভাত। খাব পিঠে পায়েস।
—তাই খাবা বইকি। কয়দিন আছ তো ভাইডি।
এই দুর্যোগের রাতে এইটুকু সময়ের মধ্যে কী করে যে মেজদি এত সব রান্না করে ফেলল, ভাবতেই পারে না রুনু।
বেগুন ভাজা, তেল-কৈ, সিঙ্গি মাছের ঝোল, কুমড়ো ঘণ্ট, কৈ মাছ ভাজা, লাউ-এর চাটনি, দুধ, দই এবং সুগন্ধ গাওয়া ঘি।
তবু মেজদির আফসোসের অন্ত নাই।
—পোড়া বিষ্টিডা না নামলি এট্যা হাঁস কাট্যে মাংস করা যাতো। এ দ্যাশে তো সপ্তাহে মাত্তোর দুই দিন হাট বসে। ঘাগরের হাট। পরশু হাট গেছে। আবার কাল হাট। কাল হাটেত্তে ভালো মাছ, তরকারি আনবা কিন্তু। আর গুড়, চিনি আনবা। ভাইরি এট্টু পিঠে, পায়েস খাওয়াব না?
রুনু বলে,—আজ তো হাটবার না, এত মাছ পাল্যে কোথায়?
—এডা তো মাছের দ্যাশ। তয় তোগে নদীর মাছ তো নাই। সব বিলে মাছ।
তরিতরকারিগুলি নাকি মেজদির নিজের হাতে করা। বাস্তু সংলগ্ন পাঁচ-সাত কাঠা জমিতে সারা বছর নানা তরিতরকারি করে মেজদি। পয়সা দিয়ে তরকারি ওদের প্রায় কিনতেই হয় না।
জটিক সত্যিই খুব ক্ষুধার্ত ছিল। খেলও প্রায় রাক্ষুসে খাওয়া। খাওয়া শেষ করে হাত চাটতে চাটতে বলে,—আজ যা খালাম খুড়িমা এহেবারে অমর্ত। সারা জীবন মোনে থাকবে। আপনার বড়দিরা বড়লোক, তেল মসল্লা খাটায় খুব, কিন্তু তেনাগে রান্নায় এমন স্বোয়াদ নাই। ও আমাগে প্যাটে সয় না।
খেতে খেতে ঠিক এই কথাটা মনে হচ্ছিল রুনুরও। হৃদয়ের স্নেহ প্রীতি যুক্ত না হলে কি সব রান্নাই বিস্বাদ লাগে? খাদ্যের স্বাদের সঙ্গে হৃদয়ের কি একটা সংযোগ আছে?
রুনুর শোবার ব্যবস্থা হল মেজদির সঙ্গে একই বিছানায়। একদিকে তার বাচ্চা, একদিকে রুনু।
মেজদির পাশে শুতে গিয়ে রুনুর আবার মনে পড়ল মায়ের কথা। সে কত কাল আগের কথা। তখন মায়ের এক পাশে শুতো ও, আর এক পাশে সেজদি। মা কার দিকে ফিরে শোবে তাই নিয়ে ওদের কত ঝগড়া হতো। তারপর ও বড় হল। মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ওর আলাদা বিছানা হল। তারপর থেকে আজ পর্যন্ত ও একা এক বিছানায় শুতেই অভ্যস্ত।
আজ যে রুনু বিশ বছরের একটা জোয়ান ছেলে, সে বোধও বুঝি নেই মেজদির। মেজদির কথায় মনে হল রুনুও তার দু-বছরের বাচ্চার মতো একটা বাচ্চা। শুতে শুতে মেজদি বলে,—তুই আমাগে ছোট ভাই। ছোটকালে তোরে কোলে হরে শোয়ার জন্যি বড়দির সাথে কত মারামারি হরিছি।
বলতে বলতে রুনুকে বুকের মধ্যে টেনে এনে ঠিক মায়ের মতো দুহাতে ওকে জড়িয়ে ধরল মেজদি। রুনু যেন মুহূর্তে ওর শৈশবে ফিরে গেল। ঠিক মায়েরই গন্ধ পেল মেজদির গায়ে। মুহূর্তে ওর সব সংকোচ জড়তা কেটে গেল।
মেজদি, তোমার গায়ে ঠিক মায়ের গায়ের গন্ধ। তুমি ঠিক মায়ের মতো।—অভিভূত গলায় বলে রুনু।
—মা-ই তো। বড় বুন তো মায়ের মতোই। সময় মতো ছেলে হলি তোর বয়সিই তো হতো। তোত্তে আমি ষোলো বছরের বড়। বড়দিদি আমারও দুই-তিন বছরের বড়।
—এ দেশে স্কুল নাই? রুনু জিগ্যেস করে।
—পাঠশালা এট্টা আছে এই গেরামেই। সোমেগে বাড়ি। কাল তোর দাদাবাবুর সাথে সব বেড়ায়ে-টেড়ায়ে দেহিস।
—আর বড় স্কুল?
—ধারে-কাছে নাই। তয় তিন মাইলির মধ্যি কাজুলে ইস্কুল আছে। তোর দাদাবাবুর তো এই ছলই হইছে ধ্যান জ্ঞান। কয় যথাসব্বস্ব খরচ করতি হলিও ছেলেরে বি.এ. পাশ না করায়ে ছাড়বে না।
খুব ভালো কথা।—উৎসাহ দিয়ে বলল রুনু।
কিন্তু সময় পাবে তো। আমরা তো বুড়ো হয়ে গিছিরে ভাই। ছলডা যদি সময় মতো হতো।—দীর্ঘশ্বাস ফেলল মেজদি।
রুনুর কাছে মেজদি খুটিয়ে খুটিয়ে শুনল বড়দি আর সেজদির কথা অনেকক্ষণ ধরে। সেজদির দুঃখ-কষ্টের কথা শুনে বলে,—বাবার জেদেই মাইয়েডার জীবনডা মাটি হলোরে ভাই।
দাদা-বউদি, মা-বাবা সকলের খবর একে একে নিল মেজদি। তারপর এক সময় বলল,—খুলনে শুনিছি মস্ত শহর। আমাগে নতুন বাড়ি তো কলি খুলনেয়। সেডা কি শহরের মধ্যি?
—না, একটা ছোট নদীর এপার ওপার। আমাগে বাড়ি বসেই ওপারের সিনেমার গান শোনা যায়। মা তো পাড়ার মেয়ে বউদির সঙ্গে প্রায়ই সিনেমায় যায়।
—মা-র বড় ভাগ্যি। শ্যাষ বয়সে তবু শহর-টহর দেখতি পাচ্ছে। সিনেমা দেখতি পাচ্ছে। এ পোড়া দ্যাশে খালি নামই শোনলাম সিনেমার, তাতে নাকি ছবিতি কতা কয়, গান গায়। তোর বিয়ের সময় যদি যাই, তয় কিন্তু আমারে সিনেমা দেহাতি হবে ভাই।
—তা অবশ্যই দেখাব, কিন্তু তার যে এখনও অনেক দেরি। এখনও যে পড়াশুনো অনেক বাকি।
—ও মা, আরও পড়বি। তুই তো বাবারেও ছাড়ায়ে গিছিস। আর কত পড়বি?
—পড়ার কি শেষ আছেরে মেজদি।
সে রাতে মেজদির সংসারের কথা, সুখ, দুঃখের কথা শুনতে শুনতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল রুনু সে খেয়ালও নেই ওর।
—হাঁট্যে যাবা না নায়ে যাবা?
পরদিন একটু বেলা পড়তেই রুনুকে প্রশ্ন করলেন রায়মশায়।
সকালে জলযোগের পরে রুনু প্রথমে দেখল মেজদির তরি-তরকারির খেত। তারপর সারা গ্রামটা ওকে ঘুরিয়ে দেখিয়েছেন রায়মশায়। রুনুর সম্বন্ধে যে সব উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন তাতে রুনু লজ্জায় রাঙা হয়ে গেছে বার বার। এখানে এসে রুনু জানতে পারল এদেশে এককালে শ্রীনাথ পণ্ডিতের কত বড় সম্মান ছিল।
সারা গ্রাম ঘুরে প্রায় গোটা চল্লিশেক প্রণাম সেরে এক বিভিন্ন বাড়িতে কিছু মিষ্টিমুখ করে ওদের ফিরতে ফিরতে প্রায় দুপুর হয়ে গেছিল।
কথা হয়েছিল বিকেলে রুনুকে ঘাগরের হাটে নিয়ে যাবেন। হাটে যাবার গরজ রুনুরও ছিল। এখন হাটে যাবার জন্য প্রস্তুত হয়ে প্রশ্ন করলেন রুনু কি হেঁটে যাবে না নৌকায় যাবে।
—সকালে অনেক হাঁটিছি দাদাবাবু। যদি নায়ে যাওয়া যায়...
এই সময় প্রতিবাদ করে উঠল মেজদি।
—তোমার কি মাথা খারাপ হইছে? সকালে ছ্যামডারে হাঁটায়ে মারছ। আবার এহোন জলকাদার মধ্যি হাঁটাতি চাও?
—তা বটে। আমরা ভাইডি গেরাম গাঁয়ে থাঁহি তো। পাঁচ-দশ মাইল হাঁটা গায়ও লাগে না। তয় নৌকাডা যখন আছে, মাঝিরি ডাহো।
জটিককে ডাকতে হল না। সে-ই এসে তাড়া ছিল।
—কই, হাটে যাবেন তো নায় উঠে পড়েন খুড়োমশায়।
হাটে যাব, তা তুমি জানলে কি ভাবে?—হেসে বলেন রায়মশায়।
—বাঃ, কাল রাতিই তো খাবার সময় কলেন, আজ হাটবার। তা নতুন কুট্যুম বাড়ি আইছে হাট কত্তি হবে না? খুড়িমাও তো কলেন গুড় চিনি আনতি।
—তোমার দেহি বেশ মোনে আছে। তয় চলো রুনু নায়েই যাই। ভালো হল। এক বস্তা ধান আর সেরদশেক তিলও নিতি পারবানে নায়। গো ধান তিলডা বার হরে দেও। আজই নিয়ে যাই।
রায়মশায়ের উদ্বৃত্ত ধান ও অন্যান্য ফসল বাড়ি এসেই কিনে নিয়ে যায় পাইকেড়রা। মাঝে মাঝে দু-চার বস্তা ধান উনি হাটেও বিক্রি করেন সংসারের প্রয়োজনে। যদিও কুলি খরচ হয়, তবু তাতে লাভ থাকে। আজ অবশ্য কুলি খরচও লাগছে না।
মেজদি নিজেই এক বস্তা ধান নামাল বারান্দায়। বিস্মিত হল রুনু মেজদির এ বয়সেও এত শক্তি আছে। তিলটা ছিল একটা কাপড়ের থলিতে। সে থলিটাও এনে রাখল বস্তার উপর।
দুটো বস্তুই জটিক তুলে নিল তার নায়ে। তারপর রুনু ও রায়মশায় নৌকায় উঠতেই নাও ছেড়ে ছিল।
এদেশের ধান-চালের দর, অন্যান্য জিনিসপত্রের দর নিয়ে রায়মশায় আর জটিক মাঝি আলোচনা করতে করতে এগিয়ে চলল হাটের পথে সেই সরু খাল বেয়ে?
গল্প করতে করতেই ঘাগর নদীর তীরে হাটখোলার ঘাটে এসে নাও বাঁধল জটিক মাঝি।
হাটে পৌঁছে রুনু বলে,—দাদাবাবু তো প্রথমে ধান আর তিল বিক্রি করবেন তারপর হবে কেনা-কাটা। আমি ইতিমধ্যে হাটটা একটু ঘুরে দেখি। কতকাল যে গ্রামের হাট দেখিনি। জটিকদা তো নায়েই থাকবা। এইখানেই থাকবা তো?
—হয়, এইখানেই। তোমরা তাড়াতাড়ি আইসো।
রায়মশায় একটা লোক ডেকে তার মাথায় ধানের বস্তাটা তুলে দিলেন এবং তিলের থলিটা নিলেন নিজের হাতে।
হাটের ভিড়ির মধ্যি আবার হারায়ে যাবা না তো ভাইডি?—যেতে যেতে বলেন রায়মশায়।
কী যে বলেন!—হেসে বলে রুনু।
ওরা দুজনে দুদিকে চলে গেল। জটিক বসল তামাক খেতে।
বড় দেখে একটা কাপড়ের দোকানে ঢুকল রুনুর প্রথমে কিনল মেজদির বাচ্চার জন্য জামা প্যান্ট, তারপর কিনল মেজদির জন্য ভালো তাঁতের শাড়ি সবশুদ্ধু দশ টাকাও লাগল না।
তাড়াতাড়ি চলে এল ও নৌকায়। কাপড়ের প্যাকেটটা জটিকের হাতে দিয়ে বলল,—একটু আড়ালে লুকিয়ে রাহতো জটিক দা। মেজদির জন্য একখানা শাড়ি আর ভাগ্নের জন্য একটু জামা-টামা কিনলাম।
আমি জানতাম, কী মতলবে তুমি হাটে আইছ।—মিটিমিটি হেসে বলে জটিক।
—কী করে বুঝলে?
—বাঃ, সাতপাড়ায় দিদিগে শাড়ি দিলে, আর এই দিদিরে দেবা না? তাই কি হয়? তয় এটা সত্যি কথা কই ভাইডি, তোমার তিন দিদিরেই তো দ্যাখলাম। সাতপাড়ায় দুইজনরে তো আগেই চেনতাম এনারে এই পেত্থম দ্যাখলাম। এনার তুলুনা হয় না। এহেবারে মা নককী।—তরকারির বাগান খান দেহিছ? এহেবারে সোনা ফলিছে। ঘর দুয়রেও এট্টা নককী শ্রী আছে।...
—সত্যি বলেছ জটিকদা। আমার মেজদি ঠিক আমার মা-র মতো।
রায়মশায় এলেন প্রায় ঘণ্টা দেহেক পরে। থলি ভরতি অনেক বাজার করেছেন। ডান হাতে ঝুলছে বিশাল এক শোল মাছ, বাঁ বগলে একটি নধর পাঁঠা।
পাঁঠাটাকে নৌকার খোলে দাঁড় করিয়ে দিয়ে দাদাবাবু উচ্ছ্বাসভরে বলেন,—খোকার মা কইছিল ভাইডিরি হাঁসের মাংস খাওয়াবে। তা হাঁসতো বাড়িতে আছেই। পাঁঠাডা পালাম সস্তায়। এহেবারে কচি পাঁঠা। কাল কয়জন বন্ধু-বান্ধব ডাকে এট্টা ভোজ দেব। কী কও জটিক বাবাজি, ভালো হল না?
খুব ভালো খুব ভালো। কত কাল যে পাঁঠার মাংস খাই না।—লোভী গলায় বলে জটিক।
—খাবা। কাল প্যাট ভরে খাবা। ন্যাও, এবার নাও ছাড়ো।
সেদিন সুন্দর শাড়ি পেয়ে মেজদি যত না খুশি হয়েছিল তার শতগুণ খুশি হয়েছিলেন রায়মশায় বাচ্চায় জামা-প্যান্ট দেখে।
বাচ্চাকে জামা-প্যান্ট রুনুই পরিয়ে দিল। রায়মশায়ের খুশি আর ধরে না।
—ওরে সব্বোনাশ, এহেবারে যে রাজপুত্তুর বানায়ে দিলে খোকারে। অতটুকু বাচ্চারও যে পোশাক হয় তা তো জানতামই না। এ দ্যাশে তো পাঁচ-সাত বছর পর্যন্ত সব বাচ্চাই ল্যাংটা থাহে। ও সব দেখিছি শহরে।
আমার ভাইডিও তো শহরে ছেলে।—সগর্বে বলে মেজদিঃ দ্যাহো দি কী বাহারের শাড়ি কিনিছে। কত দাম নেলোরে ভাইডি?
—তা দিয়ে তুমি করবা কি? তোমার পছন্দ হইছে তো?
—খুব, খুব। এমন একখান শাড়ি তো এ জনোমে পরি নাই রে ভাই। তুই এত টাহা পালি কোহানে?
—বরিশালে আমি কয়েকটা ছাত্র পড়াতাম। তারা টাকা দিত। সেই টাকায় বাবা মারে কাপড় দিছি, দাদা বউদিরে দিছি, দিদিগেও দেলাম। টাকাডা সাত্থক হল না?
আনন্দে আবেগে মেজদির চোখে জল এসে গেল। রুনুকে বুকে চেপে ধরে বলেন,—তুই হলি বাবার উপযুক্ত ছল। বাবা-মা-র সাত জন্মের পুণ্যিতি এমন ছল হয়। এতবড় আত্মা হয়।
তিন দিন ধরে সারা বাড়িটাকে উৎসব মুখর করে রেখেছিল রুনু।
গ্রামের ছেলে-মেয়ে, বুড়ো-বুড়ি, বউ-ঝি বোধহয় কেউই বাকি ছিল না যে অন্তত একবারও এসে রুনুকে দেখে যায়নি।
আজ ওদের রওনা হবার দিন।
সকাল থেকে সকলেই ব্যস্ত।
মেজদি একবার বড়ঘরে একবার রান্নাঘরে ছুটোছুটি করছে। রুনু তার স্যুটকেস গুছোতে ব্যস্ত।
বাচ্চাটা তারস্বরে কাঁদছে রায়মশায়ের কোলে। সে ক্ষুধার্ত। কিন্তু মেজদির তার দিকে নজর দেবার ফুরসৎ নেই।
রায়মশায় বললেন—শোনছ, ওরে এট্টু শান্ত হর।
তুমি যাও তো এহানতে। ওরে ক্ষিরীর কাছে নিয়ে যাও। সে ওরে শান্ত হরবেনে। আমার সময় নাই।—রেগে বলেন মেজদি।
রায়মশায় বললেন—জটিকরি আবার সাতপাড়া ফিরে যাতি হবে। তা না হলি তোমাগে কতাম পাটগাতি হয়ে খুলনে যাতি।
—পাটগাতি স্টেশনে হয়েও যাওয়া যায় নাকি এখান তে? প্রশ্ন করে রুনু।
—এহানতে খুলনে যাবার সেইডেই তো সোজা পথ। ঘাগর নদী দিয়ে পাটগাতি যাতি বড়জোর ঘণ্টা দুই আর এহোন গোপালগঞ্জ যাতি লাগবেনে অন্তত ঘণ্টা পাঁচেক।
এরপর যহোন এ দ্যাশে আসবা পাটগাতি হয়ে আসবা। বেলা দশটায় ইস্টিশনে নামবা, বারডায় মধ্যিই চলে আসতি পারবা।
নানা কাজের মধ্যেও রায়মশায়ের শেষ কথাটা ঠিক কানে গেছে মেজদির। সঙ্গে সঙ্গে বলে,—আবার কবে আসবি ভাইডি? ওই তো শুনলি পথের কথা। এহেবারে জুতো পরে ঘাটে নামবি। এক পা-ও হাঁটতি হবে না। এহানে সোমেগে বাড়ির যারা বিদ্যাশে চাকরি-বাকরি হরে পড়াশুনো হরে, তারা সব ছুটিছাটায় ওই পথেই আসে।
কিন্তু নিশ্চিত করে বলতে পারে না রুনু আবার কবে এদেশে আসা হবে। এড়িয়ে যাওয়া গোছের জবাব দেয়—আগে কলকাতা যাই। এম. এ.-তে ভরতি হই, তারপর কখন কি ছুটিছাটা হবে এখনও জানি না তো।
পুজোর ছুটি তো থাহেই।—বলেন রায়মশায়ঃ কোর্ট-কাছারী সব ছুটি থাহে। আর তোমাগে কলেজ ছুটি থাকবে না?
পুজোর ছুটিতি তালি আসতি হবে ভাইডি। এবার ইন্দিররেও আসতি কবি। আসবি তো? কথা দে।—মেজদির কণ্ঠে করুণ মিনতি।
আচ্ছা দেখব চেষ্টা করে। —এবারও স্পষ্ট কথা দিতে পারল না রুনু। কিন্তু মেজদি ওইটুকুই বিশ্বাস করে তৃপ্ত হল।
যথাসময়ে আহারাদি সমাপ্ত করে জটিক আর রুনু তৈরি হয়েছে যাত্রার জন্যে, এমন সময় মস্ত একটিন সদাভাজা মুড়ি আর বিশাল এক মাটির হাড়ি ভরতি চিঁড়ে জটিকের সামনে রেখে মেজদি বলল,—কডা চিড়ে-মুড়ি মা-বাবারে খাতি দেলাম জটিক। নৌকোয় তুলে নেও। তুমি কিন্তু এসব সাবধানে ইস্টিমারে তুলে দেবা।
ওরে সর্বনাশ!—রুনু প্রায় আর্তনাদ করে ওঠেঃ এত সব বোঝা-বিড়ে আমি নিতি পারব না। রাখ রাখ জটিকদা। ওসব থাক।
মেজদি হাউ হাউ করে কেঁদে পড়ল,—তুই কোস কি রুনু! আমি সারা রাত জাগ্যে মুড়ি-চিড়ে ভাজলাম তয় কার জন্যি? তুই না নিলি আমি যথাসব্বস্ব জলে ঢাল্যে দেব।
—তবে অল্প করে দেও যাতে আমার স্যুটকেসে ধরে।
—ওই তো এক ফোট্টা সুটকেস, ওর মধ্যি যা ধরে তার ব্যবস্থাও হরিছি। কয়ডা তিলির নাড়ু, আর এক শিশি ঘি দেবানে।
—কী সর্বনাশ! শেষে তোমার ঘি-তে আমার সব জামা-কাপড়, বই-টই...
—ভয় নাই। আমি কায়দা হরে সাজায়ে দেবানে। দেহিস এক ফোটাও ঘি পড়বে না। যাবি তো নৌকোয়—ইস্টিমারে।
স্টিমারে না হয় তুলে দিল জটিকদা। কিন্তু স্টিমারেত্তে নাম্যে যে মাইল খানেক হাঁটতি হবে। ও সব বইবে কে?
ক্যান, এট্যা কুলি নিবি। খুলনে তো বড় শহর। কুলি পাবি না?—এক কথায় সমাধান করে দেয় মেজদি।
রুনুর কোনো আপত্তিই টিকল না। কান্নার জোরেই জিতে গেল মেজদি। কাঁদতে কাঁদতে বলে,—হয়, তুই তো এট্টা বি.এ. পাশ বাবু হইছিস। এ সব ছাতা-মাতা জিনিস ছুতি তোর ঘেন্না হরে? আগে তবু ইন্দির মাঝে মাঝে আসত। সে তো আর তোর মতো বাবু না। তারে আমি যা গোছায়ে দেতাম নাচতি-নাচতি মাথায় হরে নিয়ে যাত।
ঘেন্না করে তাই বুঝি বলিছি।—মুখ ভার করে বলে রুনু।
—রাগ করিস না ভাইডি। মা-বাবা আমার হাতের জিনিস খুব ভালোবাসে। আগে পিতি বছর এই সব বাটা ঘি দিছি। বাবা খাইয়ে কত সুখ্যাত করিছে। কতো কাল বাবা মা-রে কিছু দিতি পারি না। প্রাণডা বড় কাঁদেরে ভাইডি। এ দুঃখু তোরা বুঝবি না। বাবা মা-রে নিজির হাতের এট্টু জিনিস দিতি যে কী আনন্দ তার তুই কি বুঝবি? তুই তো আর আমাগে মতো নিব্বাসনে থাকবি না। তোরা তো স্বাধীন। পরের বুড়ির দাসী হবি না। আমাগে জীবনডা বড় দুঃখের রে।
শেষ পর্যন্ত নিতে হল সবই। তার পরও নিতে হল মস্ত এক পোটলা পথের খাবার।
জটিক মাঝির হাতে ঘড়ি না থাকলেও সময় জ্ঞান ওর টনটনে। দশটার মধ্যেই তাড়াহুড়ো করে সব কিছু তুলে ফেলল নৌকায়।
বিদায় কালে রুনু দেখছে জটিকের চোখেও জল। এ কদিন জটিক মেজদিকে মা বলে ডেকেছে ভক্তিভরে। মেজদিও তাকে সস্নেহে সমাদরে একেবারে আপনজন করে নিয়েছে। যাবার সময় আলাদা করে তাকেও কিছু চিড়ে, মুড়ি, নাড়ু দিয়েছে তার ছেলেমেয়েদের জন্য।
রুনু যেমন প্রথম দর্শনেই মেজদির মধ্যে মাকে দেখেছিল, জটিকও কি তেমন কিছু দেখেছিল?
জটিক মেজদিকে প্রণাম করে উঠতেই পরস্পরের চোখে চোখ পড়ল, মেজদির চোখদুটিও অশ্রুসজল হয়ে উঠল।
জটিক আবেকভরে বলে—কতকাল আগে আমার মা মরিছে, মনেও পড়ে না। আপনারে এহেবারে নিজির মা মনে হরিছি। আপনাগে কথা ভুলতি পারব না।
মেজদি চোখ মুছতে মুছতে বলে,—এদিকি আবার আসলি আমাগে সাতে দেহা হয়ে যাইও বাবা। ভাইডিরি যত্ন হরে নিয়ে যাবা। ইস্টিমারে সব সাবধানে তুলে দেবা।
সে আর কতি হবে না মা জননী। এই এট্টা সপ্তাহ ওনার সঙ্গে আছি। এই কয়ডা দিনির মধ্যি উনি আমারে এহেবারে কিনে নেছেন। আজ যে ওনার সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাবে, সে কথা ভাবতি...। —চোখ মুছতে মুছতে রায়মশায়কে প্রণাম করে মাথা নিচু করে নায়ে চড়ল জটিক।
দিদি-দাদাবাবুকে প্রণাম করলে রুনু। সেই যে কান্না শুরু করেছিল মেজদি রুনুকে খেতে বসিয়ে দিয়েই, সে কান্না আর থামল না। ওঁর আচলের কোণ ইতিমধ্যে ভিজে জবজবে হয়ে গেছে।
এইসব ভালোবাসাগুলি, এই মুখগুলি, এই ঘর দোর উঠোন, এই ধানের গোলা, খেড়ের পালা, ওই অন্ধকারাচ্ছন্ন কুহেলিকাময় বাঁশঝাড় আর মেজদির নিজের হাতে তৈরি লঙ্কা বেগুন কুমড়ো শশা ডাটা ইত্যাদির খেত—এসব যেন রুনুর কত আপন। অথচ এ-বাড়িতে এই তো প্রথম এল ও।
কেন এমন হয়? অথচ কেন তখন প্রাণখুলে মেজদিকে কথা দিতে পারল না?
নৌকায় দাঁড়িয়ে ক্রন্দনরতা মেজদির দিকে তাকিয়ে এবার অকপট সারল্যে বলল রুনু—আমি আবার আসব মেজদি। সামনে পুজোর ছুটিতেই আসব। কেঁদ না।...
শারদীয়া কিশোর ভারতী ১৯৮৪

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন