পুনরাগত রুনু

শ্যামদাস দে

বরিশাল থেকে খুলনা

চার বছর আগে একবার কলকাতার স্বপ্ন দেখেছিল রুনু। স্বপ্ন দেখেছিল একই বাড়িতে থাকবে ও চুয়ার সঙ্গে। একসঙ্গে পড়াশুনো করবে। আবার চুয়াকে পড়াবার জন্য মাসে মাসে পনেরো টাকা পাবে। তাতেই চলে যাবে ওর হাতখরচ। খোকাদা আর শৈলদি ওর কলকাতায় কলেজে পড়ার ব্যবস্থা একেবারে পাকা করে ফেলেছিলেন।

সেই পাকা ব্যবস্থাটা বাবার এক কথায় কেঁচে গেল সেবার। কলকাতাটা নাকি বড় খারাপ শহর। ওখানে নানা প্রলোভন, অধঃপতনের নানা পথ খোলা। ওখানে একই বাড়িতে ওর প্রায় সমবয়সি একটা শহুরে মেয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ মেলামেশায় নাকি ওর পড়াশুনো হবে না, বরং হতে পারে অধঃপতন। ছেলেমেয়েদের এই বয়সটা নাকি খুবই বিপজ্জনক।

তারপর দীর্ঘ চার-চারটে বছর পার হয়ে গেল হু-হু করে। সেই ষোলো বছরের কিশোর রুনু আজ বিশ বছরের এক স্বাস্থ্যোজ্জ্বল তরুণ। এবার সে বি.এ. পরীক্ষা দিল। বাবা এখন নিশ্চয়ই ওকে আর সেদিনের মতো বালকবৎ শাসন করবেন না। তাছাড়া এম.এ. পড়তে হলে কলকাতা তো যেতেই হবে। এবারও কি ওর কলকাতা যাওয়ার ব্যাপারে কোনও আপত্তি তুলবেন শ্রীনাথ পণ্ডিত?

রাঙা বউদির কথা তিনি প্রায় কিছুই জানেন না। এবার কলকাতা যেতে হলে তো রাঙা বউদি আর হাসির কথা বলতেই হবে।

চুয়ার সঙ্গে একসঙ্গে ছাত্রজীবন কাটাবার আনন্দময় কল্পনার মধ্যে একটা অস্বস্তি ছিল খোকাদার, বড়দার অস্তিত্ব, চুয়া যাঁকে ডাকত বড়মামা বলে, সেই মোটা সোটা গুরুগম্ভীর মানুষটিকে একবারই মাত্র দেখেছিল রুনু। সেবার তাঁকে দেখে বেশ ভয়ই পেয়েছিল সে। তিনি কলকাতার একটা কলেজের অধ্যাপক। এই ভয় ভয় অস্বস্তিটা সেবার ওর কলকাতা যাবার সুখ-স্বপ্নটাকে মাঝে মাঝে ভেঙে দিচ্ছিল। এবারও তেমনি একটা অস্বস্তি হচ্ছে রাঙাবউদির বাবার কথা ভেবে। এই মানুষটিকে রুনু দেখেনি। তিনিও চুয়ার বড়মামার মতো তেমনি গুরুগম্ভীর কিনা অথবা রাঙাবউদির জমিদার শ্বশুরের মতো বদরাগী কিনা কে জানে।

রাঙাবউদির চিঠিখানা বারবার পড়েও বুঝতে পারছে না রুনু, তিনি শ্বশুর বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক চিরতরে ছিন্ন করেছেন কিনা। অমন জাঁদরেল শ্বশুরও যে সেই থেকে তাকে আর দেশে ফিরিয়ে আনতে পারেননি এবং তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধেই যে রাঙাবউদির কলকাতায় পিতার বাসায় থেকে পড়াশুনো করার ঝোঁক হয়েছিল, এটুকু বোঝা যাচ্ছে চিঠি থেকেই। সে পড়া যে কেবল শখের পড়া নয় তার প্রমাণ তো তার প্রাইভেটে ম্যাট্রিক পাশ করা এবং কলেজে ভরতি হবার সংবাদেই রয়েছে। এতে রাঙাবউদির প্রতি ওর শ্রদ্ধা আরও গভীর হল।

কলেজের ছাত্রী রাঙাবউদির ছবিটা নানাভাবে কল্পনা করতে চেষ্টা করতে থাকে রুনু। বরিশালের রায় বাড়িতে রাঙাবউদির একটি বেশই দেখেছে রুনু বারবার। চওড়া পাড় সাধারণ তাঁতের শাড়ি, মাথায় সামান্য ঘোমটা আর কপালে মস্ত একটি সিঁদুরের ফোটা, অলঙ্কার বলতে দুহাতে দুগাছি সোনার বাঁধানো শাঁখার বালা। কানে একজোড়া সাধারণ কানপাশা।

অথচ খগেনদার কাছে শুনেছিল রুনু, রাঙাবউদি নাকি বিয়েতে প্রায় পঞ্চাশ-ষাট ভরি সোনার গহনা পেয়েছিলেন। রাঙাদার বিলেতে গিয়ে মেম বিয়ে করার সংবাদ পেয়ে একে একে সব অলঙ্কার বর্জন করে সেই যে নিরাভরণা বিষাদমূর্তি ধারণ করেছিলেন, তারপর আর কোনও উপলক্ষ্যেই তাঁকে সালঙ্কারা করা যায়নি। কিন্তু সেই সাধারণ বেশেও তাঁকে দেখাত ঠিক যেন এক দেবী প্রতিমা। সেই দেবী প্রতিমা শহুরে সাজে এখন কেমন দেখতে হয়েছে—কল্পনা করতে চেষ্টা করে রুনু। ছবিটা স্পষ্ট হয় না কিছুতেই।

রাঙাবউদিকে ছেড়ে ওর মন কখন যে আজকের চুয়ার ছবি আঁকতে বসেছে, ও খেয়ালও করেনি। চুয়ারওতো এখন কলেজে পড়বার কথা। নিজের বয়স থেকে হিসেব করে বুঝতে পারে চুয়ার বয়স এখন ১৬/১৭ বছর। বি.এম. কলেজের যতগুলি ছাত্রীর চেহারা মনে পড়ে রুনুর, তাদের কারও সঙ্গেই ওর কল্পনার চুয়ার মিল নেই!

চুয়ার কথায় মনে পড়ে খোকাদাকেও। প্রায় দু-বছর হল খোকাদার সঙ্গে পত্র-সংযোগ নেই। পত্র-প্রবাহ বন্ধ করেছিল তো রুনুই। সেই যে হাসিকে নিয়ে সাইকেল-দুর্ঘটনা, তার কয়েকদিন আগেই পেয়েছিল খোকাদার একখানা চিঠি। সে চিঠির আর জবাব দেওয়া হয়নি। তারপরই তো ওর জীবনের চরম দুঃসময়। শুরু হল নতুন এক সংগ্রামমুখর জীবন। সে জীবনের কথা তো বাড়িতেও সবটুকু বলেনি রুনু। সে জীবনে ওর অতীতটা যেন ধুয়ে মুছে গেল মুহূর্তে। কেবল কঠিন সমস্যাসঙ্কুল বর্তমান।

আজ বরিশাল থেকে খুলনা পর্যন্ত দীর্ঘ বারো ঘণ্টার স্টিমার যাত্রাপথে একাকী ওর বিছানায় শুয়ে শুয়ে অতীতচারণা করছে রুনু। মনে পড়ছে অতীতের অনেক মুখ, অনেক সুখ-দুঃখের কথা। মনে পড়ছে গোবরা পাঠশালার বন্ধুদের কথা—বিশেষ করে সুশীলাদি আর হরেকেষ্টর কথা। এ জীবনে হয়তো আর ওদের সঙ্গে দেখা হবে না। সুশীলাদির বিয়ে হয়ে গেছে, হয়তো সুখেই আছে। হরেকেষ্ট একটা স্টিলের স্যুটকেস বাক্স তৈরির কারখানায় কাজ পেয়েছিল ম্যাট্রিক পাশ করার সংবাদ পাবার আগেই। এই খবর দিয়ে সে খুলনার বাড়িতে রুনুকে একটা চিঠিও লিখেছিল। সে চিঠির আসল খবর ছিল তার মায়ের মৃত্যু সংবাদ। লিখেছিল, 'মায়ের মৃত্যুর পর এদেশের উপর বাবার আর একটুও মায়া নাই। আমরা শীঘ্রই অন্য কোথাও চলিয়া যাইব। খুব সম্ভব গোপালগঞ্জের ধারে কাছে কোথাও। নতুন ঠিকানা জানাইয়া চিঠি লিখব।...' সেই নতুন ঠিকানাযুক্ত চিঠি আর কোনওদিন আসেনি। এমনি করেই তো অতীতের ভালোবাসার বন্ধনগুলি একে একে ছিন্ন হয়ে যায়।

স্টিমারটা যখনই খুলনার দিকে এগিয়ে আসছে ততোই যেন বরিশালও অতীতের গর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। সামনে এসে পড়ছে খুলনার নতুন বাড়ি—দাদা, বউদি, বাবা, মা।

বউদিকে সেই অল্প ক'দিনের দেখা। তারপর প্রায় এক বছর অতীত হয়ে গেল। মায়ের কাছে, বউদির কাছে সেবার কথা দিয়ে এসেছিল রুনু, কলেজ ছুটি হলেই ও বাড়ি যাবে। সে প্রতিশ্রুতি ও রাখতে পারেনি ওর ছাত্রছাত্রীদের প্রতি দায়িত্ববোধ তথা নিজের পড়ার চাপেও। বিশেষ করে সেনগুপ্ত স্যারের অপ্রত্যাশিত প্রস্তাবে (১) (তাঁর বাড়িতে গিয়ে তাঁর কাছে ইংলিশ অনার্সের প্রস্তুতির সাহায্যের আশ্বাস। 'রুনু হল রণজিৎ' শারদীয় কিশোর ভারতী ১৩৮৮ দ্রষ্টব্য।) ওর সমস্ত পূর্ব পরিকল্পনা বানচাল হয়ে গেছিল। একটা যেন নেশার ঘোরে কেটে গেল কয়েকটা মাস।

সেনগুপ্ত স্যার ওর জীবনের এক পরমাশ্চর্য অভিজ্ঞতা। সেই 'বি.এম.কলেজের বাঘের বাহ্যতঃ খরতপ্ত মরুভূমির মধ্যে অমন স্নিদ্ধ শীতল মরুদ্যানটির সন্ধান বোধহয় একা রুনুই পেয়েছিল। উনি স্বতঃ প্রণোদিত হয়ে রুনুকে যে character certificate দিয়েছেন সে তো ওর জীবনের এক পরম সম্পদ। অনার্স না পেলে অবশ্য ও জিনিস ও কারও সামনে বের করতেই পারবে না, আর যদি ভাগ্যক্রমে পেয়ে যায়, তবে ওই সার্টিফিকেট দেখেই ইউনিভার্সিটি ওকে সাদরে গ্রহণ করবে এম.এ.-তে। তিনি লিখেছেন, 'দীর্ঘদিন বাদে আমি একটি একনিষ্ঠ অনুরাগী ছাত্র হাতে পেয়েছিলাম। শ্রীমানকে পড়িয়ে আমি আনন্দ পেয়েছি।...আমার দৃঢ় বিশ্বাস শ্রীমান রণজিৎ অবশ্যই অনার্স পাবে, অন্তত হাই সেকেন্ডক্লাশ। ফাস্ট ক্লাস পেলেও বিস্মিত হব না।'

অমন দৃঢ় বিশ্বাস অবশ্য রুনুর নেই। পরীক্ষা ব্যাপারটার মধ্যেই একটা অনিশ্চয়তা থেকে যায় বারবার। পাশ ফেলটা মোটামুটি আঁচ করা গেলেও ২/১ নম্বরের জন্য প্রথম দ্বিতীয় ইত্যাদি স্থানের হেরফের, অথবা ২/৪ নম্বরের জন্য অনার্সে প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে নেমে আসার মধ্যে একটু যেন ভাগ্যের খেলাও আছে। ওর বিশ্বাস ইউনিভাটির যে-কোনও পরীক্ষার প্রথম দশজন অথবা যে-কোনও বিষয়ে প্রথম শ্রেণির অনার্স যারা পায় তারা সকলেই সমমেধার ছাত্র। কে জানে ওর ভাগ্যে এবার কী লেখা আছে!

স্টিমারটা যতই ওদের বাড়ির দিকে এগিয়ে আসছে ততোই যেন দাদা ওকে বেশি করে অধিকার করে বসছে। কিছুদিন আগে দাদার একটা চিঠিতে সংবাদ পেয়েছিল, বউদির মা নাকি কিছুতেই ওদের বাড়িতে থাকতে সম্মত হননি। সেই প্রথমবার এসে মাত্র সপ্তাহখানেক ছিলেন মেয়ের কাছে। তারপর ফিরে গেছেন তাঁর স্বামীর ভিটেয়। মা এতে ভীষণ রেগে গেছেন। বলেছেন বউদিকে আর কোনওদিও পাঠাবেন না বাপের বাড়ি। সেই থেকে মাতা-কন্যার আর দেখা সাক্ষাৎ নেই। অবশ্য বউদি তার কর্মদক্ষতা ও মিষ্ট ব্যবহারে শ্বশুর-শাশুড়ির মন জয় করেছে। কিন্তু মায়ের জন্য গোপনে মাঝে মাঝে অশ্রুপাত করে। দাদাও গোপনে মাঝে মাঝে তার অভাগী দীনদরিদ্র শাশুড়িকে পাঁচ টাকা করে পাঠিয়ে যাচ্ছে সেই থেকে। এ সংবাদের মধ্যে যে বেদনাটুকু রয়েছে দাদার চিঠিতে তা গোপন থাকেনি।

দাদা আরও লিখেছিলঃ 'তোর উপর আমার শাশুড়ি ও তোর বউদির অগাধ বিশ্বাস। তুই আসিয়া যদি এ ব্যাপারে একটা শান্তির ব্যবস্থা করিতে পারিস তাহা হইলে তোর বউদি অন্তত মাঝে মাঝে তার দুঃখী মা-টাকে দেখিয়া আসিতে পারে। আমি তো মায়ের অমতে কিছু করিতে সাহস পাই না। তাই সে তোর মুখ চাহিয়া আছে। তোর কথা খুব বলে।...'

সে চিঠি পেয়েও বাড়ি যাওয়া সম্ভব হয়নি রুনুর। সামনেই যে টেস্ট, অভিমান করে দাদাও আর চিঠি লেখেনি।

অভিমান করেছে নিশ্চয় বউদিও। বউদির অভিমান ভাঙার ব্যবস্থা করেছে এবার রুনু। তার জন্য কিনেছে সুন্দর শাড়ি-ব্লাউজ, কিনেছে আলতা-সিঁন্দুর আর এক কৌটা সুগন্ধী পাউডার। পাউডার বস্তুটি হয়তো এখনও চেনেই না বউদি। এটি পেলে নিশ্চয় খুব খুশি হবে। তারপর বউদির বাপের বাড়ি যাবার ব্যাপারে আগে মায়ের কাছে শুনতে হবে সব কথা। তারপর ভাবা যাবে সমাধানের পন্থা।

সেই ভোর পাঁচটায় স্টিমার ছেড়েছিল। সারাটা দিন কত স্টেশান পেরিয়ে, নদীর দুই তীরের কত বিচিত্র ছবি দেখতে দেখতে আর মনে মনে অতীতের নানা ছবি আঁকতে আঁকতে, এদিকে কখন যে সূর্যটা পশ্চিমে হেলে পড়ল, গাছপালার মাথায় নেমে এল দিনান্তের রক্তাভা আর মধুমতী ছেড়ে স্টিমারটা প্রবেশ করল রূপসা নদীতে সে খেয়ালও ছিল না রুনুর। খেয়াল হল যাত্রীদের বিছানাপত্র মোটঘাট বাঁধার ব্যস্ততা দেখে।

রুনুও বেঁধে ফেলল তার বিছানা। সুটকেসটা তো হাতের কাছেই রয়েছে।

গৃহাগত রুনু

খুলনা পৌঁছে ওদের স্টিমারটা ভিড়ল দু-নম্বর জেটিতে। তখন এক নম্বর জেটিতেও একটা স্টিমার নোঙর করা ছিল। বরিশাল মেইলের অনেক যাত্রী ছোটাছুটি করে গিয়ে উঠছিল সেই স্টিমারটায়।

রুনুর ব্যস্ততা নেই। ও ধীরেসুস্থে একটা কুলি ঠিক করল। একদল কুলি স্টিমারটা জেটিতে ভিড়তেই উঠে এসেছিল উপরে। অনেক মালপত্র যাদের তাদের সঙ্গে কুলিদের দরকষাকষি চলছিল, কথা কাটাকাটি হচ্ছিল। রুনুর মাল সামান্যই—একটা মাঝারি মাপের স্যুটকেস আর একটা বিছানা, দুটো মিলে ২৫/৩০ সেরের বেশি হবে না, তবু যেতে হবে প্রায় আধ মাইল হেঁটে খেয়াঘাটে। মালটা তুলে দিতে হবে প্রায় আধ মাইল হেঁটে খেয়াঘাটে। মালটা তুলে দিতে হবে খেয়া নৌকায়। সে বাবদ কুলিটা আট আনা চাইল। রুনুর জীবনে এই প্রথম একটা কুলি নেওয়া। ওর মনে হল কুলিটা খুব দয়ালু। এতটা বোঝা এতদূর পথ নিয়ে যেতে মাত্র আট আনা চাইল। ও এক কথায় রাজি হয়ে গেল।

কুলির মাথায় মাল চালিয়ে গুরুগম্ভীর চালে তার পেছনে চলতে চলতে নিজেকে বেশ বাবু বাবু মনে হচ্ছিল ওর।

তখনও একটু দিনের আলো আছে। খেয়া নৌকাটা যদি বেশি দেরি না করে তবে হয়তো অন্ধকার হবার আগেই বাড়ি পৌঁছতে পারবে।

সময়মতো যদি দাদাকে চিঠি লিখত, দাদা নিশ্চয় স্টেশনে থাকত সাইকেল নিয়ে। ওর আট আনা পয়সা বেঁচে যেত, কারণ, বোঝাটা দাদা সাইকেলেই তুলে নিত, এমনকী ওকে হয়তো জোর করে তুলে নিত; তারপর এ পথটুকু যেতে পারত ওরা গল্প করতে করতে। কিন্তু এবার বাড়ি আসার সিদ্ধান্তটা যে একেবারে হঠাৎই করে বসল রুনু রাঙাবউদির চিঠিখানা পেয়েই। কলকাতা যাবার মায়াময় স্বপ্ন দেখতে দেখতে ও অস্থির হয়েই তো পরের দিন যাত্রা করল বরিশাল মেইলে। হারানদা কত অভিমান করল। সব গুলিয়ে দিল একখানা চিঠি।

কুলির পিছনে পিছনে নিঃশব্দে চলতে চলতে দেখল একটা লম্বা সিটি বাজিয়ে মাদারীপুরগামী একনম্বর জেটির স্টিমারটা ছেড়ে যাচ্ছে। মুহূর্তে রুনুর মনও ছুটতে শুরু করল ওই স্টিমারের পেছনে পেছনে। মনে মনে পৌঁছে গেল গোপালগঞ্জের যোগেন ডাক্তারের বাড়িতে। এই চার বছরের মধ্যে ওর তিন ছাত্রী কমলা, প্রমীলা আর পুষ্পের কথা মাঝে মাঝে ওর মনে পড়েছে বইকি। কিন্তু তারা ওর মনকে বেশিক্ষণ অধিকার করতে পারেনি। রায় পরিবারের মানুষগুলি* যতই ওর কাছে এসেছে ওরা ততোই দূরে সরে গেছে। এইমুহূর্তে কিন্তু তারাই যেন ওর সমস্ত মনটাকে অধিকার করে বসল।

কমলা কি ম্যাট্রিক পাশ করেছে, নাকি তার আগেই তার বিয়ে হয়ে গেছে? প্রমীলারও তো একবার ম্যাট্রিক দেবার কথা। সেই গোলগাল আদুরে মেয়ে পুষি নিশ্চয়ই আর ছোট্টটি নেই। বয়স অন্তত তেরো বছর হল।

ওর ম্যাট্রিক পরীক্ষার বছর কমলার সেই প্রাণঢালা সেবার কথা** মনে পড়তেই ওর বুকের মধ্যে একটা অপরাধ বোধের বেদনা মোচড় দিয়ে উঠল। ও কথা দিয়েছিল ওর রেজাল্ট বেরুবার আগের কয়েকমাস ও খুব যখন করে কমলাকে পড়াবে এবং সেইভাবে তার সেবার ঋণ পরিশোধ করবে। এমনকী খোকাদার ডাকে বাজুনিয়া যাবার সময়ও কথা দিয়েছিল, বাজুনীয়ায় ও দিন সাতেকের বেশি থাকবে না এবং সেখান থেকে ফিরে এসেই শুরু করবে কমলাকে পড়াতে।

কিন্তু বাজুনিয়ায় গিয়ে ঠাকুমার মৃত্যু, তারপর বাবার সেই রহস্যজনক চিঠি ওর সব পরিকল্পনা গুলিয়ে দিল। ওকে চলে আসতে হল গোবরার বাড়িতে। এসে শুনল বাড়িতে ডাকাতির খবর এবং বাবার দেশত্যাগের সঙ্কল্পের কথা। শেষ পর্যন্ত গোবরার বাড়িঘর ভেঙে খুলনায় চলে আসা এবং খুলনা থেকে সরাসরি এসে বরিশাল বি.এম. কলেজে ভর্তি হওয়া। এইসব বিচিত্র ঘটনা পরম্পরায় কমলা প্রায় হারিয়ে গেল ওর স্মৃতি থেকে। একখানা চিঠি লিখে সব কথা জানিয়ে ও যদি কমলার কাছে ক্ষমা চাইত, হয়তো সে ওকে ক্ষমা করত। সে হয়তো ওর পথ চেয়েই থেকেছে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, তারপর একসময় হয়তো ঘৃণায়, ধিক্কারে, অভিমানে...। ভাবতে ভাবতে রুনুর বুকটা কেমন শিউরে উঠল।

আজ সেদিনের কমলার আচরণগুলি তার ছোট ছোট কথাগুলি, বিদায়ক্ষণে তার অশ্রুসজল চোখদুটির কথা যতই মনে পড়ছে রুনুর, ততোই তার বহু ইংরাজি বাংলা গল্প-উপন্যাস পড়া পরিণত মন তাকে ধিক্কার দিচ্ছে। যেন সোচ্চরে বলছে,—তুমি একটা মহামূর্খ, একটা নিষ্ঠুর হৃদয়হীন স্বার্থপর ছেলে। কমলা তোমাকে কোনওদিনও ক্ষমা করবে না।

কমলার কথা ভাবতে ভাবতে কখন যে ও খেয়াঘাটে চলে এসেছে কুলিটার পেছনে পেছনে সে খেলাও নেই।

খেয়া নৌকাটা ঘাটে বাঁধাই ছিল। কুলিটা ওর স্যুটকেস, বিছানা নৌকোর উপর নামিয়ে রেখে হাত বাড়িয়ে সসম্ভ্রমে বলে,—দ্যান খোকাবাবু।

রুনু নিঃশব্দে তার প্রসারিত হাতের উপর একটা আধুলি দিল।

ও সব্বোনাশ, এইটুকু মালের জন্যে এহেবারে এক আধলি। কোহানতে আসেন খোকাবাবু?—প্রশ্ন করল নৌকার একজন যাত্রী।

স্টিমার ঘাট থেকে।—বিরক্তভাবে বলল রুনু। বারবার 'খোকাবাবু' সম্বোধনটা ওর মোটেই ভালো লাগছিল না। বি.এ. পাশ করতে চলল, এখনও খোকাবাবু!

ইতিমধ্যে কুলিটা একলাফে নৌকা থেকে পাড়ে নেমে ছুটতে শুরু করেছে। নৌকা থেকে কিছু লোক চিৎকার করছে,—ধর শালারে ধর, এহেবারে দিনি ডাকাত!

হঠাৎ ছুটন্ত কুলিটার মুখোমুখি এসে পড়ল ইন্দ্র তার সাইকেলে চেপে। মিলের কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরছিল ইন্দ্র। পাকা হাতে ব্রেক না কষলে ধাক্কা খেয়ে ধুলোয় গড়িয়ে পড়ল।

এ শালা কি কানা নাকি? এক্ষুনি তো মারা পড়ছিলি। ঠ্যাঙ ঠোঙ ভাঙল নাকি দ্যাখ।—সাইকেল থেকে নেমে ধমকের সুরে বলে ইন্দ্র কুলিটাকে। সে ইন্দ্রের কথায় কান না দিয়ে ধুলো ঝাড়তে ছাড়তে আবার ছুটল। মুহূর্তে সে উধাও হয়ে গেল। রুনুর এবার দৃষ্টি পড়ল দাদার দিকে।

ব্যাপারটা দেখে ইতিমধ্যে খেয়া নৌকার লোকগুলির মধ্যে একটা হাসির রোল উঠেছে। রুনুর সেদিকে ভ্রুক্ষেপও নেই। সে চিৎকার করে উঠল,—দাদা, দাদা, শিগগির এসো। নৌকা ছেড়ে দেবে এক্ষুনি।

ইন্দ্রও রুনুকে দেখামাত্র সাইকেল-সহ ছুটে এল খেয়া নৌকায়। ওকে দূর থেকে দেখতে পেয়েই অপেক্ষা করছিল মাঝি! মাসকাবারী যাত্রী তো। তাছাড়া তারসঙ্গে মাঝির খুব ভাব। ইন্দ্র উঠতেই নৌকাটা ছেড়ে দিল সে।

রুনু ইন্দ্রকে প্রণাম করতেই সে ওকে সজোরে বুকে জড়িয়ে ধরল।

—কেমন আছিস?

ভালো। তুমি ভালো আছ তো?—আলিঙ্গন মুক্ত হয়ে বলে রুনু।

দৃশ্যটি দেখে নৌকার মাঝি বলল,—ও সব্বোনাশ, এই সুন্দর খোকাবাবু বুঝি আপনার সেই বি.এ. পাশ ভাই! তা অতবড় পাশ দিলি কি হবে, ভাইটি কিন্তু আপনার আচ্ছা বোকা ইন্দিরদা।

—কও কি চরোণদা। আমার ভাই-এর মতো এট্টা ছেলে দেখাও তো ধারে কাছের মধ্যে? এই বয়সেই বি.এ. পাশ! জজ মেজিস্টর তো হল বলে। তখোন দ্যাখবা সবাই স্যার স্যার করবে। তা তুমি আমার ভাইরে বোকা ভাবল্যে কিসি?

—বোকা না? এইটুকু মাল আনতি কুলিডারে এট্যা আধুলি দিয়ে দিল! বড় জোর দুই আনা দিলেই যথেষ্ট।

ও-ও, তাই বুঝি ও শালা আমার ভাইরি ঠগায়ে ওভাবে দৌড়োয়ে পালাচ্ছিল?— শেষে ইন্দ্র রুনুকে সমর্থন করে বলেঃ—বেশ করিছে, এক আধুলি তো ভালো, এট্টা টাহা দিলিও দোষ হতো না। ওর দিলডা কত বড় জানো? এই যে নতুন সাইকেল দেখতিছ, এই যে আমার হাতে এমন দামি ঘড়ি দেখতিছ, সব দেছে আমার এই ভাই। ওরে আর খোকাবাবু ডাকবা না। ওরে ডাকবা রুনুবাবু।

বলতে বলতে আর একবার রুনুকে বুকে জড়িয়ে ধরে অভিমান ভরে বলে দাদা,—সত্যি, তুই এট্টা বড়বাবু হইছিস রে রুনু। এহোন আর আমাগো কথা মনেও পড়ে না। চিঠি দিলিও উত্তর পাই না। তুই সত্যিই বড় নিষ্ঠুররে রুনু, বড় নিষ্ঠুর! তোর বউদি ঠিকই কইছে, তুই ভারী নিষ্ঠুর!

অশ্রুভারে রুনুর দুই চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। মনে পড়ে ক্ষণপূর্বে কমলা সম্বন্ধে তার আত্মধিক্কারের কথা। এইটুকু জীবনে কতজনের মুখে যে এই কথাটা শুনতে হল রুনুর। ও ভারী গলায় বলে,—তুমি ঠিকই বলেছ দাদা, আমি সত্যিই নিষ্ঠুর, বড় অকৃতজ্ঞ। তোমরা আমাকে ক্ষমা করো, ক্ষমা করো। বলতে বলতে ও ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে।

—আর দূর বোকাডা, তাই বলে কাঁদতি হবে ক্যান। আমি কি এ জীবনে তোর উপর রাগ করতি পারব। তুই যে আমার কত বড় অহঙ্কার! যাকগে, পরীক্ষাডা ভালো হইছে তো?

—ভালো হয়েছে বলেই তো মনে হয়।

—শরীর ভালো আছে তো?

—হ্যাঁ, দাদা।

—কিন্তু তোর চোখ-মুখ দেখে তো ভালো মনে হচ্ছে না। দেখে মনে হয় কত মার খাইছিস।

এইমাত্র যে বিবেকের মার খেয়েছে রুনু, সেই মারের ছায়াটা কি পড়েছে ওর চোখে-মুখে? রুনু অপরাধী গলায় বলে,—সত্যি বলছে দাদা, এইমাত্র মনের কাছে অনেক মার খেয়েছি। তুমি ক্ষমা করলেও মন যে আমাকে ক্ষমা করছে না। বলতে বলতে পকেট থেকে রুমাল বের করে চোখ মুছল রুনু।

খেয়া নৌকাটা ঘাটে ভিড়তেই ও প্রসঙ্গটা আর এগুলো না। রুনুর স্যুটকেস বিছানা সাইকেলে চাপিয়ে সাইকেলের আলো জ্বেলে ওরা হেঁটে চলল অন্ধকার পথে বাড়ির দিকে।

দুই বেয়ানের দ্বন্দ্ব

বরিশালের মুসুরির ডাল খুব ভালোবাসেন মা-বাবা দুজনেই, এবার তাই পাঁচ সের এক নম্বর মুসুরির ডাল এনেছে রুনু। তা ছাড়া জামাকাপড় তো এনেছে সকলের জন্যই। বাবার জন্য বিশেষ করে এনেছে হরিণের চামড়ার চটি এক জোড়া আর দাদার জন্য ভালো প্যান্টের কাপড়। দাদা বরাবর খাঁকি হাফপ্যান্ট আর খাঁকি হাফ শার্ট পরে মিলে যায়। এবার রুনু দেখতে চায় ভালো প্যান্ট পরলে কেমন দেখায় দাদাকে।

রুনুর আনা প্রত্যেকটি জিনিস সকলেরই খুব পছন্দ হয়েছে। মা তো সেই রাতেই মুসুরির ডাল রাঁধতে দিলেন বউদিকে। বলে দিলেন সোম্বার দেবার সময় তাঁকে যেন ডাকা হয়। রাতে আগুনের কাছে যাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন মা অনেকদিন আগেই। রাতে ভালো দেখতে পান না চোখে। তবু রুনুর সম্মানার্থেই যেন আজ তিনি নিজেই ডালের সোম্বার দিতে চান।

বাবা ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেন,—আমার সারা জীবনের স্বপ্ন এতদিনে পূর্ণ হল। আমাদের যেখানে যত আত্মীয় কুটুম আছে তার মধ্যি তুই-ই প্রথম বি.এ. পাশ করতি যাচ্ছিস। প্রথমে ভয় ছিল, শেষ পর্যন্ত তোর পড়ার খরচ চালাতি পারব তো? ততদিন বাঁচব তো? তা, তুই তো নিজের শক্তিতেই পড়া শেষ করলি।

শেষ হল কোথায়?—সসঙ্কোচে বলে রুনুঃ এম.এ. পড়তে হবে না?

তদ্দিন কি আর বাঁচব? এই যেটুকু হল এতেই আমি তৃপ্ত। এখন সুখি মরতি পারব।—আবেগভরে বলেন শ্রীনাথ পণ্ডিত।

মরতির আপনারে দেচ্ছে কেডা?—বলেন মাঃ রুনুর বিয়ে দেব, ঘরে টুকটুকে শিক্ষিত বউ আনব, তার সেবা পাবেন। তার আগে ওসব অলুক্ষণে কথা মুখিও আনবেন না।

মুখি না আনলেও যে বুকির মধ্যে যে ছুটির ঘণ্টা বাজে, তা তুমি থামাবা কি দিয়া?—দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন পণ্ডিতমশায়।

মৃত্যুর এই বিশ্রী প্রসঙ্গ বন্ধ করতেই রুনু হঠাৎ প্রশ্ন করল বাবাকে,—ওদেশ থেকে চলে আসার পর যোগেন ডাক্তারবাবুদের আর কোনও খবর পাইছেন বাবা?

—যোগেন ডাক্তার?...ও যোগেন...গোপালগঞ্জের যোগেন? না-রে বাবা। এই অশোককাননে নির্বাসনের পর আমার সেই সুখের অযোধ্যার কোনও খবরই পাই নাই। না গোবরার, না গোপালগঞ্জের। ইন্দির হয়তো খবর-টবর রাখে। ওর নামে দেখিছি মাঝে মাঝে দু-একখানা চিঠিপত্র আসে। কোথা থেকে কে লেখে কেডা জানে!

তাই কি সম্ভব?—বলে রুনুঃ গোবরা আপনার কাছে কৃতজ্ঞ থাকবে চিরকাল। প্রায় অর্ধ শতাব্দী কাল ধরে ওই গ্রামটাকে আপনি সেবা করে এসেছেন। অশিক্ষা অজ্ঞতার চিরঅন্ধকরে ডুবে থাকা একটা অঞ্চলে আপনি শিক্ষার মশাল জ্বেলে দিয়ে এসেছেন। গোবরা আপনার কাছে চিরঋণী থাকবে বাবা।

—মানুষ অতীতকে বড় সহজে ভুলে যায়রে। তাই তো কালের ধর্ম। মহাকাল অতীতকে পিছনে ফেলে এগিয়ে চলে ভবিষ্যতের দিকে বর্তমানের গাড়িতে চেপে। একমাত্র বর্তমানই জীবন্ত। অতীত মৃত, ভবিষ্যৎ অজ্ঞাত। এখন তোরাই তো বর্তমান, তোরাই তো ভবিষ্যৎ। তোরই তো কর্তব্য ছিল তাদের সঙ্গে চিঠিপত্রে যোগাযোগ রাখা। যোগেন ডাক্তারের কাছে তোর যে অনেক ঋণ। সেবার তো তিনিই তোরে মৃত্যুর দরজা থেকে ফিরিয়ে আনলেন। তাছাড়া পাঁচ-পাঁচটা বছর তাদের অন্ন খাইছিস। তুই তারপর আর যোগাযোগ রাখিস নাই?

না বাবা,—অপরাধী গলায় বলে রুনুঃ বরিশাল যাওয়ার পরে গোপালগঞ্জের কথা প্রায় ভুলেই গেছিলাম।

—খুব অন্যায় করিছিস। গম্ভীরভাবে বলেন শ্রীনাথ পণ্ডিত।

—সত্যিই খুব অন্যায় হয়ে গেছে। ওঁরা নিশ্চয় খুব অভিমান করেছেন। আমি ভাবছি একবার গোপালগঞ্জ যাব। ওদের সঙ্গে দেখাশুনো করে আসব। হেডমাস্টার মশায়কেও একবার প্রণাম করে আসব। তাঁর সেই চিঠিখানার বলেই তো কলেজে ভরতি হওয়া এবং ফ্রি পড়া সম্ভব হল। আপনি কি বলেন?

—খুব ভালো। এডা তো তোর কর্তব্যই। তাছাড়া চাকরি বাকরি একটা পালি ওদেশ হয়তো আর যাওয়াই হবে না। এই সময়ে ঘুরে আসাইতো ভালো।

রাত্রে খাওয়া-দাওয়ার পরে দাদার কাছে আবার সেই একই প্রশ্ন করল রুনু,—যোগেন ডাক্তারদের কোনও খবর রাখো দাদা?

যোগেন ডাক্তার মানুষটির মনে করতেই অনেকক্ষণ লেগে গেল দাদার। নাঃ, তাদের কারও খবর রাখে না দাদা। খুলনায় আসার পর গোপালগঞ্জের কারও চিঠিই পায়নি দাদা। দাদার বর্তমান সমস্যা বউদিকে নিয়ে। রুনু শুনল সে সমস্যার কথা। দাদা সখেদে বললঃ—ও বেচারা কারও মুখির উপর কিছু বলতিও পারে না, আমার দুঃখুও সহ্য করতি পারে না। কেবল আমার কাছে ঘ্যানর ঘ্যানর। তা আমার সঙ্গেও তো রাত দশটার আগে কথা কওয়ার সুযোগ নাই।

—কেন, দিনের বেলায় বলা যায় না?

—দিনি আর সময় কখন? আমি তো নয়টায় বার হই, ততক্ষণ তো সে রান্নঘরে। আর ফিরি আজ যেমন আলাম, সন্ধ্যার পর। তাও সপ্তাহে তিনদিন।

—কেন, আর চারদিন কি কর?

—এট্টু ওভারটাইম না খাটলি সংসার চলবে ক্যান। খচর বাড়িছে না? ওই কয়দিন ফিরতি রাত দশটা হয়ে যায়।

—ওভারটাইম খাটতে তোমাকে বারণ করেছিলাম না?

—মাস তিনিক সে চেষ্টা করিছিলাম। তারপর দ্যাখলাম সবদিক সামলাতি হলি আরও কিছু বাড়তি টাকা চাই।

—বুঝলাম। কিন্তু বউদি রাত দশটার আগে কেন তোমার সঙ্গে কথা বলতে পারে না? সর্বক্ষণ তো আর রান্নাঘরে....দিনের বেলায় যখন...

—ওরে সব্বোনাশ। এডা কি কলকাতা শহর পাইছিস? এডা পাড়াগা না? দিনির বেলায় মা-বাবার সামনে আমার সঙ্গে কথা কলি সবাই বলবে বেলজ্জা বেহায়া। এই এক বছরে দিনির বেলায় কোনওদিন তার মুখ দেহিছি বলে মনে পড়ে না। সর্বক্ষণ ঘোমটা টানা। একেবার জেলখানার কয়েদির মতো। সেইডেই তো ওর বড় দুঃখু। তাছাড়াও দুই বেয়ানের ঝগড়ায় শাস্তি পাচ্ছে ওই বেচারা।

দুই বেয়ান মানে?—অবাক হয়ে প্রশ্ন করে রুনু।

তাও বুঝলি না? বি.এ. পাশ করে এইটুকু বুদ্ধি হইছে?—হেসে বলে ইন্দ্র। শেষে ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দেয়,—বরের মা আর কনের মা হল পরস্পরের বেয়ান, তেমনি বরের বাপ, আর কনের বাপ পরস্পরের বেয়াই। আমাগো মা আর তোর বউদির মা হল দুই বেয়ান। বুঝলি?

—বুঝলাম। তা ঝগড়াটা কী নিয়ে? বিয়ের সময় তো কথাই হয়ে গেছিল বউদির মা এসে এই বাড়িতেই থাকবেন। তাঁর জমিটুকু আর গাভীটা দান করবেন মেয়ে জামাইকে বিবাহের যৌতুক স্বরূপ। তুমি লিখেছিলে, গরুটা নাকি তুমিই নিতে চাওনি। কেন?

—এর মধ্যি অনেক কথা আছেরে রুনু। আজ তো কেবল বাড়ি আইছিস। আজ থাক। ধীরে-সুস্থে সব কথা শুনিস তোর বউদির কাছে আর মার কাছে। তারপর তুই যদি দুই বেয়ানের মধ্যি ভাব করে দিতি পারিস, সব দিকি শান্তি হবে। সারাদিন খাটা-খাটনির পর রাত্রি খাওয়ার পরই ঘুম আসে। মাঝে মাঝে জাগ্যে থাকলিও ঘাপটি মার্যে পড়ে থাকি। ভালো লাগে না ওর ঘ্যান-ঘ্যান, প্যান-প্যান শুনতি। ওদিকে আমি মারে একদিন এট্টু বলতি যাইয়ে আচ্ছামতন গাল খাইছি। আমারে নাকি তোর বউদি আর তার মা ভ্যাড়া বানাইছে। এখন নাকি আমি আর মা বাবারে দেখি না।—বলতে বলতে দাদার গলা ভারী হয়ে আসে।

রুনুর মনটা গুমরে উঠল দাদার প্রতি সমবেদনায়। কথা বলতে পারে না সে।

—অনেক রাত হল ভাই। যা শুয়ে পড় গে। তুই না গেলি তোর বউদিও এ ঘরে আসতি পারতিছে না।

—কেন? আমি তো বউদির সঙ্গে কথা বলব বলেই তো দেরি করছি। এসে কেবল একটা প্রণাম করতে গেছিলাম। বউদি পালিয়ে গেল।

—তুই এট্টা মহা বোকা। সে কি আমার সামনে তোর সঙ্গে কথা কবে? এডা পাড়াগা না? কাল কথা কস আমি চলে গেলি।

—বউদির সঙ্গে আমিও কথা বলতে পারব না?

—তা পারবি না ক্যান? তুই তো শহরের ছেলে। বি.এ. পাশ ছেলে। তোর কথা আলাদা। তাছাড়া তোরে তো ও দেবতার মতো ভক্তি শ্রদ্ধা করে।

অদ্ভুত একটা বিষণ্ণতা নিয়ে শুতে চলে গেল রুনু।

মা স্বাধীন হইছে।

দুই ভাইতি তো এতক্ষণ খুব গল্প হচ্ছিল। আমার কথা কারও মনেও নাই, কেউ কথাও কয় না।—অভিমানী গলায় এই কথা কটি বলে রুনুকে অভ্যর্থনা করল বউদি তারজন্য নির্দিষ্ট শয়ন কক্ষে।

তারপর মুখ না তুলে বলল,—শহরের বাবুমানুষির আবার গেঁয়ো বউদির বিছানা পাতা পছন্দ হবে না হয়তো। তা এ বাড়িতি তো বাড়তি বিছানাও নাই কিছু পরিষ্কার, তাই নিজের ময়লা বিছানা মশারিতেই চলুক আজ। কাল কাচ্যে দেওয়া যাবে।

বউদির এই মুখ নত করে থাকা ও ভাববাচ্যে কথা বলার মধ্যেই তার অভিমানটুকু স্পষ্ট। কিন্তু রুনুর ময়লা বিছানাই বউদির সযত্ন হাতে একটা বেশ পরিপাটি চেহারা নিয়েছে। ওর বালিশের ঢাকাটা দারুণ ময়লা হয়ে গেছিল, তার পরিবর্তে দেখছে একখানা সূক্ষ্ম হাতের কাজ করা সুন্দর ছোট্ট কাঁথা। ও সম্পত্তিটি হয়তো বউদির নিজস্ব। হয়তো ওর মায়ের হাতের কাজ। কাঁথাখানা বেশ আগ্রহ সহকারে দেখল রুনু ঝুঁকে পড়ে। দেখল শিয়রে এক গ্লাস জলও ঢাকা রয়েছে। কিন্তু দেখতে পাচ্ছে না বউদির মুখখানা। ঘোমটাটা বেশ লম্বা করে টানা।

রুনু হেসে বলে,—শহরের এই বাবুমানুষটি যে তোমার ঠাকুরপো তাকি ভুলে গেলে বউদি? বেশ তো পরপর ভাবে কথা বলা হচ্ছে। আমি যেন কোন অচেনা অতিথি। তা এ অতিথিটি কিন্তু এমন পরিপাটি বিছানায় কখনও শোয়নি। তাছাড়া ওই চমৎকার বালিশের ঢাকাটা এল কোথা থেকে? ওটা তো আমার বিছানায়...

—ঢাকার কথা দিয়ে নিজির নিষ্ঠুরতা ঢাকা হচ্ছে তো? সত্যি, তুমি কী নিষ্ঠুর ঠাকুরপো! বলতে বলতে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল বউদি। কাঁদতে কাঁদতে চলে যাচ্ছিল এ-ঘর থেকে। রুনু পিছন থেকে আঁচলটা টেনে ধরতেই ঘোমটাটা খসে পড়ল। বউদি চট করে ফিরে দাঁড়াল রুনুর মুখোমুখি।

প্রদীপের মায়াময় আলোকে এবার চোখে পড়ল বউদির অশ্রু-সজল মুখখানা। রুনু সবিস্ময়ে দেখল, এই এক বছরের মধ্যে কত সুন্দর হয়ে উঠেছে বউদি। রঙ তো ফর্সা ছিলই, এখন যেন তার সঙ্গে একটা উজ্জ্বল রক্তাভা যুক্ত হয়েছে। স্বাস্থ্যও অনেক ভালো হয়েছে। কোথায় যেন রাঙাবউদির সঙ্গে একটা মিল। সেই বিষাদখানা স্নিগ্ধ সুন্দর মুখ।

বউদি, তুমি কী সুন্দর!—উচ্ছ্বসিতভাবে বলে রুনুঃ কাঁদলেও মানুষকে এত সুন্দর দেখায়!

—থাক আর মোন-রাখা কথা বলতি হবে না। আমার সব চেনা হয়ে গেছে। তোমরা সবাই নিষ্ঠুর। এ-বাড়ির সবাই নিষ্ঠুর!

আমি তো কেবল এই এলাম বাড়িতে, এরি মধ্যে আমার নিষ্ঠুরতার কি দেখলে বউদি? বাপ, মুখখানা যা গোমড়া করে আছো, কথা বলতেই ভয় করছে। কি জানি চড়-চাপড়ই মেরে বসবে নাকি?—মিটি মিটি হেসে বলে রুনু।

অত কায়দা করে কথা বলে আর সাধু সাজতি হবে না,—মুখ ভার করেই বলে বউদিঃ সেই যে পিতি মাসে একবার আসার কথা কয়ে চলে যাওয়া হল, একটা বছরের মধ্যে আর...। আমার দুঃখুর কথা শোনার এট্টা মানুষ নাই সংসারে। উনি তো শুতি না শুতি ঘুমোয়ে কাদা। বাবা তো সারাদিন কথাই প্রায় কন না, আর মা তো আমারে দুই চক্ষি দেখতি পারেন না। এই নির্জন পুরিতি সারাডা দিন আমি একা একা...। বলতে বলতে আবার চোখে আঁচল চাপা দিল বউদি।

রুনু এগিয়ে এসে বউদির কাঁধে একখানা হাত রেখে অন্যহাতে তার আঁচল দিয়ে তার চোখ-মুখ মুছিয়ে দিয়ে স্নেহকোমল কণ্ঠে বলে,—রাগ করো না লক্ষ্মী বউদি, সোনা বউদি আমার। ক্ষমা করো আমাকে। এখন শুতে যাও। কাল সারাদিন তোমার সঙ্গে কথা বলব। অনেক অনে-এ-ক কথা।

—আমারও যে অনেক অনে-এ-ক কথা আছে ছোড়দা। সব জমায়ে রাখছি তোমারে কবো বলে। তারপর তুমি যা ব্যবস্থা করবা, যেমন করতি বলবা, তাই করব আমি।

'ছোড়দা' সম্বোধনেই রুনু বুঝেছিল বউদির রাগ পড়ে গেছে। যাবার মুহূর্তে সুন্দর একটু হাসির প্রসাদ দান করে ওকে আরও নিঃসন্দেহ করে দ্রুত ছুটে গেল বউদি।

দাদার কথায়, বউদির কথায় একটা সাংসারিক সমস্যায় ইঙ্গিত পাচ্ছে রুনু। সে সমস্যার গভীরতা যে কতখানি, দুই বেয়ানের মনোমালিন্য যে কতদূর পৌঁছেছে, কে জানে। কিন্তু বাবা তো রয়েছেন বাড়িতে। এমন কি সমস্যা আছে যা বাবাও মীমাংসা করতের পারেননি?

দাদা তো পরিষ্কারই বলল, বাবার দ্বারা নাকি এর বিহিত হবে না। উনি আর এখন সংসারের কোনও কথায় থাকেন না। দুবেলা দুটি খাওয়া, এইটুকু মাত্র সম্বন্ধ। বাকি সময়টা মোটা চশমা পরে খুব মাথা নুইয়ে কীসব ধর্মগ্রন্থ-ট্রন্থ পড়েন, আর ধ্যান জপ করেন। সকালে বিকালে লাঠি হাতে নদীর পাড়ে একটু পায়চারি করেন। কারও সঙ্গে কথাও বলেন না, কারও কথায় থাকেনও না। দাদা শেষ মন্তব্য করেছিল, আমার তো মনে হয় প্রায় মাসখানেক পরে আজ আবার বাবার গলার আওয়াজ শোনলাম তোর সঙ্গে কথা কওয়ার সময়।

আর মা? মা তোমাদের সঙ্গে কথা-টথা বলে তো?—প্রশ্ন করেছিল রুনু।

—মা-র কথা আর কি কব। কদিন বাড়িতি থাক, নিজেই বুঝবি।

—কী বুঝব? তুমি একটু পূর্বাভাষ দাও না।

মা এখন স্বাধীন হইছে!—একটু যেন বিদ্রূপের সুরে বলেছিল দাদাঃ তোর বউদি আসার পর সংসারের যাবতীয় কাজকম্মো সেই করে। মা-র বিশেষ কাজকম্মো নাই। পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়ায়। পাড়ার সব বউ-ঝি, বুড়ি-টুড়ির সঙ্গে মা-র এখন খুব ভাব। বাবার জন্যি এ-বাড়িতে তো আর আড্ডা জমে না, এখানে সবাই বাবারে ভয় করে, ভক্তি শ্রদ্ধা করে। তাই মায়ের আড্ডা এখন পাড়ায় পাড়ায়। এদেশে মা-রে আর কেউ 'গুরুমা' বলে ডাকে না। প্রায় সবাই ডাকে 'দিদিমা' বলে। কেউ কেউ মাসি, পিসি জেঠি-ফেঠিও ডাকে।

—তাহলে মা এখানে এসে বেশ আনন্দেই আছে, কি বল!

—আনন্দে আছে না? সারা গ্রামডার সঙ্গেই তো ভাব হইছে। ভাব নাই কেবল নিজের বউমার সঙ্গে।

বউদি যদিও দাদার মতো এত কথা বলেনি কিন্তু 'মা তাকে দুচক্ষে দেখতি পারেন না'—এইটুকু কথাতেই অনেক বলা হয়ে গেছে।

রুনু সারারাত ধরে দাদা আর বউদির কথাগুলি নিয়ে নানাভাবে বিচার বিশ্লেষণ করে স্থির করল আগে বউদির কাছ থেকে সমস্ত ব্যাপারটা পুরোপুরি জেনে নিতে হবে। দাদা তো বাইরেই থাকে বেশি সময়, ভিতরের খবর সবটা হয়তো জানেও না। হয়তো বউদির কাছ থেকে একটু-আধটু শুনেই মায়ের সম্বন্ধে বিরূপ ধারণা করে নিয়েছে। বউদিও হয়তো নিজের মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার বেদনায় শাশুড়িকে এখনও আপন করে নিতে পারছে না।

মায়ের সম্বন্ধে দাদা-বউদির সঙ্গে একমত হতে পারছে না রুনু। মায়ের কথাও শুনতে হবে আলাদা করে।

ওর মনে পড়ে দাদার বিয়ের পরে যে দু-তিনদিন ও বাড়িতে ছিল সেই কদিনের মায়ের আচরণ। বউদির স্নিগ্ধ রূপটি দেখে, তার নম্র মিষ্টি ব্যবহার দেখে মায়ের দুচোখ দিয়ে যেন স্নেহ-মমতা ঝরে পড়ছিল। এক বছরের মধ্যে এমন কি ঘটল ওদের মধ্যে যাতে মা বউদিকে দুচক্ষে দেখতে পারে না?

মা দুর্গার কোলে লক্ষ্মী।

ভোরে উঠে বাবার সঙ্গে নদীর পাড়ে বেড়াতে বেড়াতে যেমন নিজের কলেজ জীবনের অনেক কথা শোনাল রুনু বাবাকে, তেমনি এ-বাড়ির অনেক কথা জেনেও ফেলল কথায় কথায়।

প্রথম কথাই হল, মা নিজে স্বাধীন হননি, স্বাধীনতা দান করেছেন বাবাই। উনি এখন টাকাপয়সা স্পর্শ করেন না। দৈনিক হাট-বাজার করা, সংসার চালানো, সব দায়িত্ব মায়ের। বাবা নাকি এখন চশমা খুললেই অন্ধ। মাকে এদেশের মানুষ ভালোবেসেছে। তাদের সঙ্গে মেলামেশা করে যদি সে একটু আনন্দে থাকে তো থাকুক না। সারাটা জীবন তো কেটেছে মায়ের চার দেয়ালের মধ্যে বন্দী হয়ে। এখন বৃদ্ধ বয়সে একটু মুক্তি তাঁর প্রয়োজন দৈহিক এবং মানসিক উভয় দিক থেকেই।

বাবার এ যুক্তি খুব সমীচীন বলে মনে হল রুনুর।

বাড়ি এসে দেখল সকাল ন'টার মধ্যেই দাদা স্নানাহার সেরে বেরিয়ে গেল এবং একটু পরে মা বেরিয়ে পড়লেন দুধের ঘটি আর বাজারের থলি হাতে নিয়ে।

এতদিন পর রুনু বাড়ি এসেছে। ও পিঠে ভালোবাসে, তাই মা দুধ, গুড়, নারকেল ইত্যাদি জোগাড় করতে বেরুলেন। প্রয়োজনীয় বাজারও করে আনবেন। কাল রাতেই চাল ভেজানো হয়েছিল। যাবার সময় বউদিকে বলে গেলেন,—চাল কয়ডা তাড়াতাড়ি বাট্যে রাখ্যো সীতা।

দাদা ও মা বেরিয়ে যেতে বাড়িটা নিঃশব্দ হয়ে গেল।

প্রাতভ্রমণ সেরে এসে বাবা সামান্য জলযোগ করে উঠোনের কোণে একটা মোড়ায় নিঃশব্দে বসেছিলেন চশমা খুলে। প্রায় ঘণ্টাখানেক পরে ঘরে গিয়ে নিজের শয্যায় আশ্রয় নিলেন। হয়তো জপ ধ্যান চলবে, হয়তো বা একটু তন্দ্রাচ্ছন্নও হবেন।

রুনুও জলযোগ সেরে দাদার বিছানায় শুয়ে একখানা ইংরাজি উপন্যাস পড়ছিল।

দাদা চলে যাবার খানিক পরে রান্নাঘর থেকে বউদির চাল বাটার শব্দ ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই। ঠাকুরপোকে পিঠে খাওয়াবার জন্য মহা উৎসাহে চাল বেটে চলেছে। ভোর থেকেই রান্নাঘরে কাজ করছে বউদি। ঘুম থেকে উঠে এ পর্যন্ত বউদির মুখ একবারও দেখেনি রুনু, একবারও শোনা যায়নি তার গলার আওয়াজ। ঠিক যেন যন্ত্র। এই যন্ত্র জীবন তার কাছে যন্ত্রণাদায়ক হবে না কেন? বউদির জন্য অদ্ভুত একটা সমবেদনায় বুকটা ভারী হয়ে উঠল রুনুর।

আরও একটা ব্যাপারে সূক্ষ্ম একটু বেদনা বোধ করছে রুনু। কাল রাতে ওর দেওয়া জামা, কাপড়, চটি ইত্যাদি সকলেরই খুব পছন্দ হয়েছিল, কিন্তু একবারও কেউ প্রশ্ন করল না ওর বউদির জন্য কিছু এনেছে কিনা। ধরেই নিয়েছে যে কিছু আনেনি। ভেবেছে হয়তো, ও ছেলেমানুষ, সামাজিকতার বুদ্ধি-শুদ্ধি এখনও হয়নি, এখন প্রশ্ন করলে লজ্জা পাবে। ভেবেছে নিশ্চয় বউদিও। অভিমান তো হবারই কথা। বারে বারে রুনু বউদির কাছ থেকে একটি প্রশ্ন আশা করছিল,—'সবার জন্য তো কত কিছু এনেছ আমার জন্যে কি এনেছ?' এবং সে প্রশ্নের কী উত্তর দেবে তা-ও মহড়া দিয়ে রেখেছিল। কিন্তু একটি বার সে প্রসঙ্গ তুলল না বউদি। এ সংযম সত্যিই প্রশংসনীয়।

কিন্তু রুনু যে আর সংযম রক্ষা করতে পারছে না। বউদির জিনিসগুলি একটা প্যাকেটে মুড়ে প্যাকেটটা দুহাতে পেছনে লুকিয়ে রেখে চুপি চুপি ও ঢুকল রান্নাঘরে। চাল বাটার ছন্দে বউদির সমস্ত শরীরটা দুলছে তালে তালে। পরিশ্রমে সর্বাঙ্গ ঘেমে গেছে। মাথায় ঘোমটা নেই। সারা পিঠে ঢেকে ছড়িয়ে আছে ঘনকৃষ্ণ একরাশ চুল। পেছন থেকে ওর কর্মরত এই অপরূপ রূপটি হয়তো এমন করে কেউ দেখেনি কোনওদিন। অত্যন্ত মৃদু পায়ে আরও কাছে এগিয়ে এল রুনু। বাঁহাতে প্যাকেটটা লুকিয়ে রেখে ডান হাতে একগুচ্ছ চুল ধরে ছোট্ট একটা টান দিল। চমকে পিছন ফিরল সীতা। রুনুকে দেখেই জিভ কেটে পিটুলি মাখা হাতে ঘোমটা টানতে গিয়ে মাথার চুলে মুখে-টুখে সাদা পিটুলি মেখে-টেখে একাকার।

হো হো করে হেসে পড়ল রুনু।

—সারা মুখে পাউডার মেখে তোমাকে তো বেশ দেখাচ্ছে বউদি। এ সময়ে একটা ক্যামেরা থাকলে যা একখানা ফটো হতো!

'ক্যামেরা' বস্তুটা সীতার অচেনা হলেও 'ফটো' কথাটা অজানা নয়। লজ্জায় ঘর্মাক্ত মুখখানা রাঙা হয়ে উঠল।

তুমি তো ভীষণ অসভ্য। দুষ্টু কোথাকার!—বলতে বলতে আঁচল দিয়ে মুখ মুছতে গিয়ে দৃশ্যটা আরও হাস্যকর করে তুলল। ফলে রুনুর হাসিটা আরও এক পর্দা চড়ল।

হাসির সংক্রামকতায় এবার হেসে পড়ল বউদিও।

—আমারে হাসায়ে রাগ ভাঙাতি চাও? তা হবে না, তোমার উপর আমার ভীষণ রাগ। সাড়া না দিয়ে মেয়েদের ঘরে আসতি আছে?

—মেয়েদের ঘর কোথায়? এটা তো রান্নাঘর।

—রান্নাঘরেই তো মেয়েদের সারা জীবন কাটে। আমি তো সারাদিন—এই ঘরেই...যাও যাও, বাইরে যাও, অসভ্য। ধমকের সুরে বলল বউদি।

এই তিরস্কারের মধ্যেও বউদির চোখে-মুখে একটা খুশির উজ্জ্বলতা দেখা যাচ্ছে। এ বাড়িতে এসে হয়তো এমনি করে হাসেনি কোনওদিন। হাসি মুখেই বলছে,—ও হাতে আবার কী লুকোয়ে রাখা হইছে? কী মতলব?

—তোমার রাগ ভাঙাবার মতলব। বলো তো কী আছে এতে?

বলতে বলতে কাগজে মোড়া প্যাকেটটা সীতার সামনে তুলে ধরল রুনু।

—জানি না যাও। এখন আমার কত কাজ। বিরক্ত করো না। মা আসার আগে চাল বাটা শেষ না করতি পারলি মা আমারে আস্ত রাখবে না।

—ভয় নেই। তোমাকে আস্ত রাখার জন্য আমি তোমার হয়ে মায়ের সঙ্গে লড়ে যাব। সকালেই স্নান করেছ, সে তো চুল ছাড়া দেখেই বুঝতে পারছি। এবার দয়া করে মুখখানা এবং পা-দুখানা ভালো করে ধুয়ে মুছে এসো তো।

—এখন আবার পা ধুতি হবে ক্যান?

—আমি ধুতে বলছি, তাই ধুতে হবে।

—এ আবার কী জ্বালা। এখন কাজ-কম্মো থুয়ে হাত-পা ধুয়ে পাটরানি হয়ে বসতি হবে?

—হ্যাঁ, এখন পাটরানিই সাজতে হবে।

—তারপর আমার চালবাটা?

—ও আমি করে দেব। তোমার থেকেও ভালো করব। বলতে তো পারলে না। এই দ্যাখো তোমার জন্য কী এনেছি।

প্যাকেটটা খুলে ফেলল রুনু সীতার সামনে।—এই দ্যাখো তোমার শাড়ি, তোমার আলতা, সিঁদুর, স্নো, পাউডার! শাড়িটা পছন্দ হয়েছে তো?

নারীর সঙ্গে শাড়ির সম্বন্ধ অচ্ছেদ্য। একখানা সুন্দর শাড়ি পেলে খুশি হয় না এমন মেয়ে জগতে বিরল। সীতা যে খুশি হয়েছে তা তার চোখে-মুখেই ফুটেই উঠেছে। উচ্ছ্বসিতকণ্ঠে সে বলল,—ওমা-আ, কী সুন্দর! এমন শাড়ি তো আমি জন্মেও দেখিনি। কত দাম?

—তোমার মুখের হাসির চেয়ে অনেক কম দাম।

—বি.এ. পাশ বাবুর সঙ্গে আমি কথায় পারব কেন? আমি গেঁয়ো মেয়ে।

—অতএব বি.এ. পাশ বাবুর হুকুম শুনতে হবে। যাও হাত মুখ-টুখ ধুয়ে এসো। আমি তোমাকে এক্ষুনি সাজাব।

—কী সর্বনাশ! আগে চাল বাটা তো শেষ করি। তারপর না হয়...

—ও তো আমাকে পিঠে খাওয়াবার জন্য। ও পিঠে আমি ছোঁবও না, যদি আমার কথা না শোনো। পা দেখে তো মনে হয় সেই বিয়ের দিনের পর আর আলতা ছোঁয়াওনি। আজ আমি তোমাকে আলতা পরিয়ে দেব।

শেষ পর্যন্ত সীতার শত আপত্তি অগ্রাহ্য করে প্রায় জোর করেই তার প্রসাধন পর্বে হাত লাগাল রুনু। সত্যই পা চেপে ধরে আলতা পরিয়ে দিল। ঘাড়ে, গলায়, মুখে দিল পাউডারের প্রলেপ। কপালে এঁকে দিল সিঁদুরের টিপ।

প্রসাধন সমাপ্ত হতেই রুনুকে হঠাৎ প্রণাম করে বসল সীতা। তার চোখ-মুখ খুশির আনন্দে ঝলমল করছে।

এই মুহূর্তে উঠোনে মায়ের সাড়া পেয়ে সীতা একেবারে ভয়ে কাঁটা। এদিকে বউদিকে প্রণাম করতে রুনুও হাত বাড়িয়েছিল। মায়ের সাড়া পেয়ে দুজনে থমকে গেল।

এখন কী হবে!—চোখ বড় বড় করে বলে সীতাঃ এই সাজে মায়ের সামনে যাব কী করে? মা আমারে আজ...তোমার পাল্লায় পড়ে...

প্রসাধন পর্বটি হচ্ছিল দাদার ঘরে বসে আয়নার সামনে।

বউদিকে চুপ করে থাকতে বলে রুনু বেরিয়ে এল আগে। মায়ের হাত থেকে বাজারের থলি আর দুধের ঘটি নিয়ে বলল,—ঘাট থেকে তোমার পা-টা এক্ষুনি ধুয়ে এসো তো মা জননী। আমি এগুলি বউদিকে দিয়ে আসি রান্না ঘরে।

—পা তো ধুতিই হবে। অনেক ধুলো ঘাট্যে আলাম তো। পা না ধুয়ে ঘরে ঢুকতি পারি না আমি। তা আমার পা ধোয়াবার জন্যি তোর এত তাড়া কেন?

আগে ধুয়ে এসো, তারপর বলব।—মিটিমিটি হেসে বলে রুনু।

—পা ধুতি ঘাটে যাতি হবে কেন? ওই যে ঘড়াডা দেখতিছিস,—ওইডেতেই আমার হাত-পা ধোবার জল থাকে। যত বার বাইরে যাই, ততবারই হাত-পা ধুয়ে ঘরে ঢুকি। বলতে বলতে উঠোনের কোণে একটা মাটির ঘড়ার জলে পা ধুতে শুরু করলেন মা।

না, মাকে একটু বাইরে পাঠাবার এ চালটা ব্যর্থ হল। বউদির বন্দীত্ব ঘুচানো গেল না। রুনু এবার দুঃসাহসী হয়ে ওঠে,—পা ধুয়ে এসে ওই মোড়াটায় বসবে। তারপর আমি যা বলব শুনতে হবে।

—কী পাগলামি শুরু করলি দুফরডার সময়।

—আগে বসো তো মোড়াটায়।

—ও মা, ওই মোড়ায় আমি বসতে পারি! ওডা হল ওনার মোড়া। আমি মাঝে মাঝে বসি বারান্দার ওই জলচকিটায়।

তবে তাই বসো।—বলতে বলতে মায়ের হাত ধরে টেনে এনে রুনু তাঁকে বসিয়ে দিল জলচৌকিতে। উঠোনের তারের উপর থেকে গামছাটা নিয়ে সযত্নে মুছে দিল মায়ের পা দুখানা। ভিজে গামছা দিয়ে মুছে দিল সদ্য-ধৌত মুখখানাও।

রুনুর এইসব ছেলেমানুষি কাণ্ডখারখানার কোনও মানে বুঝতে পারছেন না মা, তবু এই আদরটুকু বড় ভালো লাগছে। পা মুছতে মুছতে রুনু বলে,—বিয়ের পরে কি আর এ পায়ে আলতা পরেছ কোনওদিন?

রান্নাঘর, গোয়ালঘর আর ঢেঁকিঘর—এই নিয়েই তো জীবনটা কেটে গেল বাবা। আলতা আমারে কেই বা দেবে আর কখনই বা পরব।—বিষাদভরা গলায় বলেন মাঃ এখন তো বুড়ো হইছি, এখন আর...

—এখন তো স্বাধীনও হয়েছ। হাতে দুটো পয়সাকড়িও আছে। এখনও কি একদিন একটু আলতা পরতে ইচ্ছা করে না তোমার এত সুন্দর পা দুখানায়? হেসে বলে রুনু।

—দূর পাগল। এখন আমি আলতা পরলি লোকে হাসবে না?

—আজ তোমাকে আমি আলতা পরাব। দেখ কে হাসে। আমি তো বরিশালে দেখেছি তোমার চেয়েও বুড়িরা আলতা পরে।

—তারা হল শহুরে মানুষ। তাগে সব মানায়।

—তুমিও তো এখন শহুরে মানুষ হয়েছ। স্বাধীনতা পেয়েছ। তোমাকেও সব মানায়। আমি দেখতে চাই তোমাকে আলতা পরিয়ে আমার সেই লালপাড় শাড়িটা পড়লে কেমন দেখায়।

—দ্যাখোতো ছেলের পাগলামি। এখন কি আমার সাজা-গোজার বয়েস? তাছাড়া অমন ভালো শাড়িখানের ভাজ ভাঙব ক্যান? কোথাও যাতি-টাতি হলি...

—ওসব কথা আমি শুনি না। তোমাকে আমি আজ প্রাণভরে সাজাব। তারপর দেখব কে বেশি সুন্দর। মাতা কৌশল্যা না পুত্রবধূ সীতা?

—ওরে বজ্জাৎ, আমারে নিয়ে ঠাট্টা! সর সর, আমার কাজ আছে।

মা উঠতে যাচ্ছিলেন। পা চেপে ধরে বসিয়ে রাখল রুনু। দক্ষ শিল্পীর হাতে মায়ের পায়ে আলতা পরাল। আলতার শিশির সঙ্গে তুলি একটা থাকে, কিন্তু সে তুলির ব্যবহার জানে কয়জন? রুনুর মধ্যে একটা সহজাত শিল্পীভাব লুকিয়ে আছে। ড্রইং-এ ও বারবার ফার্স্ট হয়েছে। সেই শিল্পী হাতে আলতা পরাতেই মায়ের মধ্যে যেন একটা দেবী প্রতিমা দেখতে পেল রুনু। মুখে পাউডার পাফটা বুলিয়ে দিল নরম হাতে। তারপর হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল বড় ঘরে।

কাল যে শাড়িটা এনেছি, সেটা এক্ষুণি পরতে হবে।—হুকুমের সুরে বলে রুনু।

কী জ্বালা। এই কি শাড়ি পরার সময়? বিকেলে পরবানে। কত বেলা হল, যা তুই ছান করে আয়। সীতে কি করতিছে। চাল বাটা হইছে? রুনুরি তেল গামছা দেও,—মা বলছেন নিঃশব্দ রান্নাঘরটাকে সম্বোধন করে।

ওদিকে সীতার তখন 'ধরণী দ্বিধা হও' দশা। পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে দাদার ঘরে।

—বউদির কাজ বউদি ঠিক করেছে। এবার তুমি শাড়িটা পরো তো। না হলে আমি চানও করব না, খাবও না। পাঁচ মিনিট সময় দিলাম।

এক দৌড়ে ছুটে এল রুনু দাদার ঘরে।

এখন কী হবে ঠাকুরপো।—চোখ গোল করে বলে সীতা।

—কিছু হবে না। দেবর লক্ষণ তো তোমার পাশেই রয়েছে। ভয় কি। তুমি মায়ের কপালে সিঁদুর পরিয়ে দিয়ে একটা প্রণাম করবে, ব্যস।

—এই সাজে মায়ের সামনে যাব আমি! আমার কপালে আজ...চাল বাটা শেষ হয় নাই। কী যে বলব মাকে। তোমার পাল্লায় পড়ে...

—কিচ্ছু বলতে হবে না। যা বলবার আমি বলব। আমি ডাকলে আসবে। মা ডাকলে নয়।

রুনুর জিদের কথা মা-ও জানেন। শাড়ি না পরলে যে ও ছাড়বে না বুঝেই শাড়িখানা পরেছেন।

—আরেব্বাস একেবারে দুর্গা প্রতিমা!

সত্যি বলতে এখন একখানা চওড়া লালপাড় তাঁতের শাড়ি মা হয়তো তাঁর এই ষাট বছরের জীবনে কখনও পরেননি। মুখে পাউডার তো নিশ্চয়ই না। দরিদ্র শ্রীনাথ পণ্ডিত তাঁকে বারো আনা দামের জোলাই শাড়ি অথবা বড়জোর এক টাকা পাঁচসিকে দামের মিলের শাড়িই পরাতে পেরেছেন। এখন মাকে দেখাচ্ছে যেন এক লাজনম্র নববধূ। মায়ের হাত ধরে বাইরে নিয়ে আসছিল রুনু।

—দাঁড়া, আগে ওনারে পেনাম করি। নতুন কাপড় পরে আগে গুরুজনরে পেনাম করতি হয়।

বাবা তখন বারান্দার চৌকিতে শুয়ে জপ করছিলেন। মা শিয়রে দাঁড়িয়ে নরম গলায় বললেন,—শোনছেন, এই দ্যাহেন রুনু আমারে কি সুন্দর শাড়ি দেছে। এট্টু উঠে বসেন। পেনাম করব।

বাবা উঠে বসলেন। মা পাদস্পর্শ করে প্রণাম করলেন। বাবা মায়ের জপমালাসহ হাত রেখে বললেন,—কল্যানস্তু। বেশ বেশ। ভালো শাড়ি দেবেই তো। ও আমার বংশের মুখ উজ্জ্বল করা ছেলে। আমারেও খুব ভালো চটি দেছে। অমন জিনিস জীবনে পরিনি। কিন্তু আমার সীতা মারেও যদি একখানা ভালো শাড়ি দিত রুনু।

আমার এইখানাই দেবানে তারে। সঙ্গে সঙ্গে বলেন মাঃ এই বয়সে আমি এই শাড়ি পরলি লোকে হাসবে না? আজ পরলাম রুনুর মান রাখতি।

এই বয়সেই এই শাড়ি মানায়,—বলল রুনুঃ বউদিকে যা মানায়...ও বউদি, কোথায় গো। একবার এসো। বাবা-মাকে তোমার শাড়ি দেখিয়ে যাও।

—ও সীতের জন্যিও শাড়ি আনিছিস? কাল রাত্রে তো দেখালি না।

—এখন দিনের আলোতে দেখবে বলে তখন দেখাইনি।

নব সাজে সজ্জিতা বউদি এল এ-ঘরে নতমস্তকে। এসেই বাবাকে প্রণাম করল। তারপর মায়ের কপালে সিঁদুর পরিয়ে ও শাঁখায় সিঁদুর ছুঁইয়ে মাকেও প্রণাম করল।

মা সবিস্ময়ে তাকিয়ে আছেন বউদির দিকে।

—ওমা, কী সুন্দর শাড়ি। একেবারে লক্ষ্মী পিতিমের মতো দেখাচ্ছে।

সস্নেহে বউদিকে বুকে জড়িয়ে বলেন,—রুনু আমার সোনার ছেলে। এই মেয়ের মধ্যি যে এতরূপ ছিল, অ্যাদ্দিন তো বুঝতেই পারিনি। তুই সাজায়ে দিছিস, তাই না?

রুনু কেবল মিটিমিটি হাসে।

—তুমিও তো দুর্গা প্রতিমা। মা দুর্গার কন্যাই তো লক্ষ্মী। দেখো তো মা, তোমার কোলে কেমন মানিয়েছে লক্ষ্মী বউদিকে।

ঠিকই কইছিস রুনু। সীতামা বড় লক্ষ্মী মেয়ে। সত্যি লক্ষ্মী প্রতিমা। চোখি তো আর তেমন দেখতি পাই না,—দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন বাবাঃ তবু মনের চোখে দেখতিছি আমার সামনে মা দুর্গা দাঁড়িয়ে আছেন লক্ষ্মীরে কোলে নিয়ে। আজ আমার বড় আনন্দ। তবু এমন মাডারে কেন যে তোর মা ভালো নজরে দেখতি পারে না, বুঝি না।

ওরে ভালো নজরে দেখি না আপনারে কেডা কলো?—প্রতিবাদের সুরে বলেন মাঃ দেখতি পারি না ওর মাডারে। সেডার বড় অহঙ্কার। আমি হলাম ছেলের মা, সে হল মেয়ের মা। সে যদি আমার উপর মাতব্বরী করতি চায়, এই অবস্থায় মেয়ে নিয়ে তার কাছে রাখতি চায়, এ আবদার আমি শোনব ক্যান? আমার প্রথম নাতি আমার বাড়িতিই হবে, এই আমার সাফ কথা।

বাবার সঙ্গে মাকে এই সুরে কথা বলতে রুনু এই প্রথম শুনল। সত্যই এ বাড়িতে এসে মা স্বাধীন হয়ে গেছেন।

মায়ের কথার ভিতর থেকেই বোঝা গেল দুই বেয়ানের মনোমালিন্যের কারণটা। আরও জানা গেল সে শীঘ্রই 'কাকা' হতে চলেছে। অথচ এতবড় খবরটা এ পর্যন্ত কেউ বলেনি ওকে। বউদির দিকে উজ্জ্বল হাসিভরা চোখে তাকাতেই লজ্জায় রাঙা হয়ে সে ছুটে পালাল।

মুহূর্তে কাপড় ছেড়ে রান্নাঘরে গিয়ে চাল বাটতে শুরু করল।

চাল বাটার শব্দ শুনেই এ-ঘর থেকে মা বলেন,—ওমা! চাল বাটা শ্যাষ হয়নি এখনও?

ও-ঘর থেকে ভয়ার্ত কণ্ঠে বউদি বলে,—এক্ষুনি হয়ে যাবে মা। ঠাকুরপোর পাল্লায় পড়ে কাপড় ছাড়াছাড়ি করতি...

—আগে ওনারে খাতি দাও। বেলা হইছে। তারপর ধীরে-সুস্থে করবা। রুনু যা, ছান করে আয়।

—আগে তোমরা দুজন খেতে বসবে, তারপর আমি চান করতে যাব। তুমিও খেয়ে নাও মা। পরে আমি আর বউদি একসঙ্গে খাব।

তা হালি তাই করো সীতে। ও যা কয় তার তো আর নড়চড় করার জো নাই। আমারেও দ্যাও। তারপর খাওয়া-দাওয়া সার্যে আমরা ধীরে সুস্থে পিঠে বানাবোনে।—অসহায়ভাবে বলেন মা।

না তাও হবে না।—জেদি গলায় বলে রুনুঃ খাওয়ার পরে তোমাদের বিশ্রাম। পিঠে বানাব আমরা। তুমিই তো ছোটকালে শিখিয়েছ। এখনও ভুলিনি। চুষি পিঠে, পুলি পিঠে, পাটিসাপটা—সব মনে আছে। তোমার চেয়েও ভালো করব। বউদির সঙ্গে পাল্লা। কার চুষি আর কার পুলি ভালো হয়েছে তুমি বিচার করবে। তোমার বিচারে যে ফাস্টো হবে তাকি কি দেবে বলো!

তারে আমি কোলে করব,—হেসে বলেন মাঃ জানি তুই ফাষ্টো হবি।

মুহূর্তে রুনু মাকে কোলে তুলে নিয়ে এক পাক নেচে ফেলল। বলল,—তার আগে আমিই তোমাকে কোলে করে নিলাম। এখন তো আমি বাবা, তুমি আমার ছোট্ট মেয়ে। আমার সোনা মা, লক্ষ্মী মা, এখন মা-টা আর কার আছে? এবার যাও তো লক্ষী মেয়েটির মতো খেয়ে দেয়ে শুয়ে পড়বে। তোমার খাওয়া না হলে কিন্তু আমি খেতে বসব না বলে দিচ্ছি।

মাকে কোল থেকে নামিয়ে স্নান করতে ছুটল রুনু।

রুনুর চলে যাওয়ার দিকে সস্নেহে তাকিয়ে থেকে মা বলেন,—ছ্যামড়া বাড়ি আসতিই বাড়িডা যেন আনন্দে ভরে গেছে। শোনছেন, এহন ওরে এট্টা বিয়েটিয়ে দিয়ে বাড়ি রাখার ব্যবস্থা করেন। কত বিদ্যে শিখিছে। এতবড় খুলনা শহর, এখানেই দ্যাখবেন কতজনে ওরে সাধ্যে চাকরি দেবে। ওরে আর বিদেশে পাঠাব না। ও বাড়ি থাকলিই আনন্দ, সুখ, শান্তি সব হবে।

আমি তো পাটে বসিছি,—নিরাসক্ত গলায় বলেন শ্রীনাথ পণ্ডিতঃ যা করবার তোমরাই করবা। হ্যাঁ, বিয়ে তো দিতিই হবে। তবে আগে একটা চাকরি-টাকরি পাক, তারপর দ্যাখবা কত পাত্রীপক্ষ আস্যে তোমার কাছে করজোড়ে দাঁড়াবে। তোমারে কবে ভাগ্যবতী জননী।

অসাধ্য সাধন

রুনু বাড়ি আসার পর মায়ের প্রধান কাজ হল এক-একদিন এক-একরকম করে রুনুর প্রিয় খাদ্যগুলি তাকে খাওয়াবার ব্যবস্থা করা। এক সপ্তাহ ধরে চলল এই খাওয়ানো পর্ব। অনেক পিঠে, পায়েস, মাছ, মাংস, দুধ, দই, ছানা ইত্যাদি খেল রুনু। তারপর একদিন সবিনয়ে বাবাকে বলল,—আমি ভাবছি কাল গোপালগঞ্জ রওনা হব। ডাক্তারবাবুর বাড়ি সবার সঙ্গে আর হেডমাস্টার মশায়ের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ করে সপ্তাহখানেকের মধ্যেই ফিরে আসব।

—তোর মাকে বলেছিস?

—বলব। আগে আপনার মত...

এ বাড়িতে এখন ওর মতেই মত। আমি তো একটা জড়বস্তু হয়ে গেছি—উদাস সুরে বলেন বাবা।

মায়ের মত আদায় করাও কঠিন হল না, কিন্তু বাধা এল দাদা আর বউদির কাছ থেকে।

দাদা বলল,—তোর বউদির সমস্যাডা না মিটিয়ে কোথাও যাওয়া চলবে না। ওর অবস্থা তো শুনিছিস। এ সময় সব মেয়েই তার মায়ের কাছে থাকতে চায় কয়েক মাস। ওখানে নাকি ওর অনেক বন্ধু আছে, তারা দেখাশুনা করবে। নাকি পাড়ার পিতিবাসীরা ওদের খুব ভালোবাসে। মাসে মাসে গোডা পেনেরো টাকা পাঠালিই চলবে। সে ব্যবস্থা আমি করব। এখানে তো এক মুহূর্তও বিশ্রাম নাই। মারে তো দেখতিছিস, ঘরে প্রায় থাকেই না, আমি থাকি সারাদিন বাইরে, আর বাবা তো এখন এ্যাক্কেরে জবুথুবু। আমার মন কয়, এসময় ওর মা-র কাছে ও নির্ভয়ে থাকবে। অথচ মায়ের জিদ, ওরে সে বাড়ি পাঠাবেই না। এখন তোরেই সামলাতি হবে।

সমস্যাটা সত্যই জটিল। রুনু কোনও সহজ সমাধান খুঁজে পায় না। খানিক ভেবে বলে,—আচ্ছা বউদির মাকে আমি যদি হাতে, পায়ে ধরে দু-তিন মাসের জন্যে এখানে নিয়ে আসতে পারি?

—তিনি এখানে থাকতি পারেন না। সে চেষ্টা তো গোড়ার দিকেই হয়ে গেছে। গরিব হলেও তাঁর আত্মসম্মান জ্ঞানটা খুব কড়া। তাছাড়া নিজির ঘরদোর থাকতি কেউ পরের দাসী বান্দী হয়ে থাকতি পারে? সেখানে তাঁর স্বাধীনতা আছে। তাঁরে ভালোবাসে সকলে। আর এখানে থাকতি হবে মায়ের পায়ের তলায়।

রুনু একটু ভেবে বলে,—কিন্তু বউদিরই বা এত ভয় কেন? মা তো তাকে খুব ভালোবাসে দেখছি। মা যদি দায়িত্ব নেয়...

দায়িত্ব খালি মুখি মুখি নিলিই তো হয় না, কাজেকম্মেও এট্টু হাত লাগাতি হয়। দেখতিছিস তো, সেই ভোর পাঁচটাত্তে রাত দশটা পর্যন্ত তোর বউদি নিশ্বেস ফেলার অবসর পায়? রান্না করা, বাসন মাজা, কাপড় কাচা, ঘরদোর ছোপ-ছোপ করা—সব এক হাতে। মা তো এখন পেনশান নেছে।—অভিযোগের সুরে বলে ইন্দ্র।

—আচ্ছা আমি যে সেবার একটা কাজের লোক রাখতে বলে গেলাম, আমি তো সেই বাবদেই তিরিশ টাকা করে পাঠাচ্ছিলাম।

—ওসব বাবুগিরি পাড়াগাঁয়ে চলে না রে ভাই। বাড়িতে বউ থাকতি একটা বাইরের মানুষেরে কেউ খাতিপরতি দেবে আর মাসে মাসে তিন-চার টাকা মায়না দেবে? ওসব শহরে মোকামে চলে।

—তাহলে আমি যে টাকাটা মাকে পাঠাচ্ছিলাম...

—তার এট্টা টাকাও সংসারের জন্যি ব্যয় হয় না। মা সেই টাকায় তার সব বুড়ি বন্ধুদের নিয়ে খুলনায় যায় সিনেমা দেখতি প্রায়ই। দোকানে বসে তাদের নিয়ে মিষ্টি ফিষ্টিও খাওয়া হয়। অবশ্য আমাগে জন্যিও মাঝে মাঝে রসগোল্লা, জিলেপি-টিলেপি নিয়ে আসে। বাবা তো এখন পয়সা-কড়ি ছোঁন না, তাই মহা স্বাধীন। হাটবাজার সব মায়ের হাতে। আমি কেবল খুলনাতে মাসকাবারী চাল-ডাল-তেল-নুনডা আন্যে দেই। কড়ায় গণ্ডায় তার হিসেব বুঝোয় দিতি হয়। তোর বউদির কোনও সাধ-আহ্লাদ মিটোতি পারি না। আজ পর্যন্ত একখানা শাড়িও কিনে দিতি পারিনি ওরে! এবার তুই ওরে যে শাড়ি দিছিস ও সব তো আমি স্বপ্নেও ভাবতি পারিনি। এখন ওর শখ হইছে সাজে-গুজে ওর মা-রে সব দেখায়ে আসবে। দ্যাখ, তুই যদি ব্যবস্থা করতি পারিস।

দাদার কথা শুনতে শুনতে রুনুর মাথায় একটা পরিকল্পনা এল। পরিকল্পনাটা ও দাদার কাছেও গোপন রাখল। গোপালগঞ্জ যাওয়া মুলতুবী রইল। আগে বউদির সমস্যাটার একটা সুরাহা করা দরকার।

রুনু এল মায়ের দরবারে,—আমাকে তো অনেক পিঠে-পায়েস খাওয়ালে মা, এবার বলো তোমার কি খেতে ইচ্ছে করে?

—তুই যে টাকাডা পাঠাচ্ছিলি তাই দিয়ে তো এই এক বছর কত কি খালাম বাবা। আমার আর কিছু খাওয়ার সাধ নাই। এখন তোর জন্যি একটা টুকটুকে বউ আনতে পারলি আমার সব সাধ মেটে।

—ও বাবা, আবার একটা পরের মেয়ে এনে তোমার জেলখানায় পুরতে চাও? তাকেও তো চব্বিশ ঘণ্টা খাটাবে। সে যদি বউদির মতো লক্ষ্মী মেয়ে না হয়? সে যদি যখনতখন বাপের বাড়ি যেতের চায়?

—যায় যাবে, তুই নিয়ে যাবি নিয়ে আসবি।

—তুমি কি আর তখন যেতে দেবে। একবার তোমার জাঁতাকলে পড়লে এখান থেকে আর কারও নড়ন-চড়ন নেই। এক-একটা বনের পাখি ধরে এনে তোমার খাঁচায় পুরবে, তারপর তার ডানা কেটে দেবে। এইতো দেখছি বউদিকে। সেই যে দ্বিরাগমন করে এসেছিল, এক বছরের মধ্যে আর ওমুখো হতে দিলে না।

আমি দিলাম না? সেই নালিশ করিছে বুঝি মুখপুড়ি?—মুহূর্তে দারুণ রেগে উঠলেন মা।

—না, না, বউদি কিছু বলেনি। দাদা বলল কথায় কথায়।

ওডা তো বউয়ের আঁচলধরা হয়ে গেছে,—এবার মায়ের রাগটা পড়ল দাদার উপরঃ বউয়ের নাকে কাঁদুনি শুনতি শুনতি এখন মায়ের তে শাশুড়ি ওর আপন হইছে। মাসে মাসে তেনারে গোপনে টাকা পাঠানো হয়। তাই তো তেনার এত তেজ। আমার মুখির উপর কয়ে গেল, এ-বাড়িতে আর পদাপ্পণ করবে না। আমিও কয়ে দিছি, মাইয়ের মুখও আর এ জীবনে দেখতি হবে না। এ বাড়িতে খাটতি খাটতি নাকি মাইয়ের সোনার অঙ্গ কালী হয়ে যাবে, শরীল অদ্ধেক হয়ে যাবে। তুই ক তো বাবা, সীতেরে যা দেখে গিছিলি এখন তাচ্চে ওর স্বাস্থ্য ভালো হইছে না? খাটুনি-পিটুনিতেই তো শরীল ভালো থাকে। ওনারে দেখতিছিস না? খাটুনিও ছাড়িছেন, শরীলও ভাঙিছে।

—ঠিকই বলেছ মা। একেবারে খাঁটি বিজ্ঞানের কথা। খাটলে-পিটলেই স্বাস্থ্য ভালো থাকে। বউদির স্বাস্থ্য তো সত্যিই ভালো হয়েছে এখানে এসে। তাছাড়া তুমি হলে ছেলের মা, তিনি তো মেয়ের মা। তুমি ছেড়ে কথা কইবে কেন? বেশ বলেছ?

তয় দ্যায় দেখি। ইন্দিরডা খালি আমারে দোষে। তুই ঠিক বুঝিছিস।—এতক্ষণে রুনুর উপর প্রসন্ন হলেন মা। মুখে স্নিগ্ধ হাসি ফুটল। এই সুযোগে কথাটা বলে ফেলল রুনু,—আমার একটা সাধ মেটাবে মা?

—তোর আবার কী সাধ?

—এবার আমি বউদিকে যে শাড়ি দিয়েছি না, তুমি তো দেখেছ, কী সুন্দর মানিয়েছে। বউদিকে আমি ওইভাবে সাজিয়ে-গুজিয়ে নিয়ে তার মায়ের উপর বলে আসব,—এই দেখুন মেয়ের শরীর খাটতে খাটতে অদ্ধেক হয়েছে, না আরও ভালো হয়েছে?

—বলতি পারবি?

—নিশ্চয় পারব। আমার মাকে যে অপমান করে গেছে তাকে আমি ছেড়ে কথা কইব? তারপর এবার সেই গরুটাও নিয়ে আসব। তিনি কথা দিয়েছিলেন গরুটা মেয়ে জামাইকে দান করবেন। বউদির ছেলে হলে তার জন্য তো দুধও দরকার হবে।

—নিয়ে আসতি পারবি গরুডা? ইন্দির তো শাশুড়ির উপর দরদ সেডা আর আনলই না। তুই আনতি পারবি তো?

—আনবই। ও বাড়িতে জলগ্রহণও করব না। যে নৌকায় যাব সেই নৌকাতেই গরু নিয়ে চলে আসব। আমার জিদ তো জানোই। কালই তাহলে বউনিকে নিয়ে রওনা হই। কি বলো মা? যাব আর আসব। ভোরে রওনা হব, সন্ধ্যার মধ্যেই ফিরে আসব।

—গরুডা কিন্তু আনা চাই। সীতের ছেলে দুধ পাবে না?

—অবশ্যই। ওই জন্যেই তো যাওয়া, একটা দিন তুমি দাদার অফিসের ভাতটা...

—খুব পারব। আমার রত-বল এখনও যায়নি।

মায়ের মত আদায় করে দাদার কাছে ছুটে এল রুনু।

—মাকে রাজি করে ফেলেছি দাদা। কালই রওনা হব বউদিকে নিয়ে। শুভস্য শীঘ্রম।

যা বলিছিস।—হেসে বলে ইন্দ্রঃ মার মত পালটাতে কতক্ষণ? একেবারে রাত থাকতি রওনা হয়ে যাবি।

—সকালে রান্নাটা মা-ই করবে। সপ্তাহখানেক রাতের রান্নাটা যদি তুমি...

—সে তো আমি আগেও করিছি। ও আমি খুব পারব। অন্তত এক সপ্তাহের জন্যিও যে মা ওরে পাঠাতি রাজি হইছে, তাতেই ধন্য হয়ে যাবে তোর বউদি। তুমি সত্যি একটা অসাধ্য সাধন করলি। এখবর শুনলি দেখবি তোর বউদি তোরে আর এট্টা পেনাম করবে।

—সাবধান, এখবর বউদিকেও নয়, মাকেও নয়। মা জানে কাল সন্ধ্যায়ই ফিরে আসব আমরা। সত্যিই যখন আসব না, তখন মা দেখবে তোমাকে খবর নিতে। তুমি গড়িমসি করে, ছুটি না পাবার অজুহাত দেখিয়ে শেষ পর্যন্ত যাবে এক সপ্তাহ পরে।

—তুই তো দারুণ চাল চালিছিস। শেষ পর্যন্ত সামলাতি পারবি তো?

—অবস্থা বুঝে তুমি বাবাকে গোপনে একটু আভাস দিতে পারো, কিন্তু মাকে নয়। এ বয়সে বাবার মানসিক অস্থিরতায় খুব ক্ষতি হতে পারে। মাকে যা বলবার আমি ফিরে এসে বলব।

—তা আমি আর যাব ক্যান? সপ্তাহ খানেক পরে তুই নিজেই ওরে নিয়ে আসতি পারবি।

—না, না, তোমাকে একবার যেতেই হবে। ওখানকার পরিবেশ পরিস্থিতি বুঝে আমরাই কর্তব্য স্থির করব—বউদিকে ওখানে রাখা, না ফিরিয়ে আনা—কোনটা ঠিক হবে।

সীতাকে চমৎকারভাবে সাজিয়ে-গুজিয়ে প্রায় একটা শহুরে মেয়ে বানিয়ে ফেলল রুনু। তারপর শুভক্ষণে যাত্রা করল মা-বাবাকে প্রণাম করে।

ও বাড়িতে যেহেতু ওরা জলগ্রহণও করবে না, সুতরাং সারাদিনের পথের খাবারের জন্য প্রচুর পরিমাণে চিড়ে, মুড়ি, নারকেল নাড়ু, পাটালি গুড় ইত্যাদি নিজের হাতে গুছিয়ে দিয়েছেন মা।

সীতা জানাল, আজ সন্ধ্যার মধ্যেই তাকে ফিরে আসতে হবে। তবু যে একটি দিনের জন্যেও এই জেলখানা থেকে মুক্তি পাওয়া গেল তাতেই খুশিতে ঝলমল করে উঠেছিল সে। এ বাবদে রুনুকে যে কতবার কৃতজ্ঞতা জানাল সীতা।

নৌকাটা যতক্ষণ দেখা যাচ্ছিল, ঘাটে দাঁড়িয়ে ছিলেন মা। রুনু আর সীতাও তাকিয়েছিল মায়ের দিকে। একটা মোড় ঘুরতেই ঘাটটা আড়াল হয়ে গেল। মা অদৃশ্য হতেই ঘোমটাটা নামিয়ে ফেলে সীতা হাফ ছেড়ে বলে,—বাব্বাঃ, একবচ্ছর পরে দিনের বেলা এই প্রথম ঘোমটা খুললাম। বউ হওয়ার যে এত শাস্তি, কে জানত? সত্যি, তুমি একটা অসাধ্য সাধন করলে ঠাকুরপো। তুমি আমার কাছে দেবতা। কিন্তু আজই ফিরে আসতি হবে? একটা দিনও মায়ের কাছে...

অন্তত এক সপ্তাহ।—মিটিমিটি হেসে বলে রুনু।

—অ্যাঁ, সত্যি!!!

বিস্ময়ে, পুলকে, উচ্ছ্বাসে সীতা আর কথা বলতে পারে না। প্রাণভরে প্রণাম করে রুনুকে।

রুনু এবার আর আপত্তি করে না। হেসে বলে,—হে বালিকা, বয়সে যখন অন্তত দু-বছরের বড় তখন দাদা হতে দোষ কি। দাদা হয়েই তোমার প্রণাম নিলাম।

—দাদাইতো। তাইতো ছোড়দা বলে ডাকি।

—তাহলে আমি কী বলে ডাকব?

—নাম ধরে ডাকবা।

—না, আমি ডাকব জনক-নন্দিনী বলে।

—সত্যিই ছোট বোনটির মতো সীতাকে সস্নেহে আদর করে বলে রুনু।

যাবার পথে খুলনার একটা ঘাটে নৌকাটা ভিড়িয়ে এক হাঁড়ি রসগোল্লা কিনে নিল রুনু। আর কিনল একখানা সাদা থান কাপড়।

দৈব সমাধান।

পরদিন সকাল সাড়ে আটটার মধ্যেই রুনুকে একা ফিরে আসতে দেখে এবং ওর চোখমুখের চেহারা দেখে ইন্দ্র চমকে উঠল।

—কী হইছেরে রুনু? এত সকালে আলিই বা কী করে? কোনও বিপদ-আপদ হল নাকি? এক রাতির মধ্যিই একেবারে ঝোড়োকাক হয়ে গেছিস। মনে হয় সাঙ্ঘাতিক কিছু...

ইন্দ্র তখন বেরুবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল। সাইকেলটায় পাম্প ছিল না তাই পাম্প করতে ক'মিনিট দেরি হল। না হলে হয়তো রুনুর সঙ্গে দেখাই হতো না।

রুনু তখনও দারুণভাবে হাঁপাচ্ছে। প্রায় টলে পড়তে যাচ্ছিল। ইন্দ্র ওর হাত ধরে নিয়ে এল। বিছানায় বসিয়ে দিয়ে পাশে বসে উৎকণ্ঠিতভাবে বলে,—ব্যাপার কী ক তো?

—ব্যাপার সাঙ্ঘাতিক দাদা। সেই রাত থাকতে দৌড় শুরু করেছি তোমায় ধরব বলে। রাস্তা বোধহয় ১২-১৪ মাইলের কম না। ট্রেনের খবর নিয়েছিলাম। ট্রেন এলে দশটার আগে বাড়ি আসতে পারতাম না। নৌকায় এলে তো আরও দেরি হতো।

—এতখানি পথ তুই দৌড়য়ে আইছিস! কী সর্বনাশ। তোর বউদির কিছু...

—না, বউদির মা-র...

—কী হইছে তার?

—সাঙ্ঘাতিক অসুখ। বাঁচার আশা নাই। প্রলাপ বকছেন। সারারাত আমি আর বউদি ঠায় বসে।

—কোনো ডাক্তার টাক্তার...

—ওদেশে কি ধারে-কাছে ডাক্তার আছে। আমি গিয়েই অবস্থা দেখে খোঁজ খবর নিয়ে তিন মাইল দৌড়ে গিয়ে এক হাতুড়ে ডাক্তার আনতে আনতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। তিনি দেখেশুনে কয়েক পুরিয়া কি ওষুধ দিলেন। বললেন, এক্ষুনি খুলনার বড় হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। সারারাত দু'ঘণ্টা অন্তর সেই ওষুধ খাইয়েছি। ভোরের দিকে একটু জ্ঞান হতে আমাদের চিনতে পারলেন। তারপর আমার হাত ধরে সে কী কান্না—আমারে বাঁচাও বাবা!....আমি খানিক ভরসা-টরসা দিয়েই ছুটে এসেছি। আজ আর তোমার কাজে যাওয়া চলবে না দাদা। মায়েমার একটা ব্যবস্থা তো করতে হবে। দশটায় একটা ট্রেন আছে। সেই ট্রেনেই যেতে হবে।

হাঁপাতে হাঁপাতে একটানা কথা বলছিল রুনু।

হাসপাতালে আনা, ভর্তি করা, সে তো অনেক টাকার ব্যাপার। আমার হাতে তো পয়সাকড়ি নাই।—নৈরাশ্যভরা গলায় বলে ইন্দ্র।

—আমার কাছে কিছু আছে। এখনকার মতো চলবে। আশা দেয় রুনু। আর সময় নাই দাদা। তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নাও।

—মা-বাবারে বলতি হবে তো? তুই কিছু খাইয়ে-টাইয়ে নিবি তো?

—ও যা বলবার আমি বলছি। তুমি জামাকাপড় বদলে ফেলো।

রুনু অবস্থাটা বুঝিয়ে বলল মা-বাবাকে। বাবা মাকে বললেন,—শোনো, এই বিপদের সময় মনে কোনও মান-অভিমান রাখতি নাই। তুমিও যাও।

আপনি একলা থাকবেন বাড়িতে?—মা বলেন চিন্তিতভাবে।

—আমার জন্যি ভাবতি হবে না। রাত্রে খাই তো চাড্ডি দুধ খই। মাথার কাছে তুমি থুয়ে যাও। এক্ষুনি রওনা হও। যদি সম্ভব হয় তো তেনারে নৌকোয় করে এ- বাড়ি নিয়ে আইসো। এখানে অনেক সুবিধা। হাতের কাছে খুলনা শহর। অনেক বড় বড় ডাক্তার আছে। ওষুধপাত্তির সহজে মেলবে। তাছাড়া বড় কথাঃ রুনু এসময় বাড়ি আছে। এখানেই তেনার চিকিৎসা ভালো হবে।

মাকে আর কথা বলবার সুযোগ না দিয়ে রুনুর মতোই ব্যস্ত হয়ে পড়লেন বাবা। মা তবুও অভিমানী গলায় বলেন,—আমি তো তেনারে বারবারই এখানে রাখতি চাইছিলাম।

—ইশ্বর হয়তো এবার তোমার ইচ্ছাই পূর্ণ করবেন। দুর্গা, দুর্গা।

ট্রেনে যেতে যেতেই ওরা আলোচনা করে স্থির করল, ট্রেন থেকে নেমে একটা পালকি ঠিক করতে হবে। সেই পালকিতে মা যাবেন। ফেরার ট্রেন সন্ধ্যা ছ'টায়। ফিরবার সময় সেই পালকিতে মা এবং মায়েমা একসঙ্গে আসবেন। তারপর ট্রেনে খুলনা স্টেশান। সঙ্গে সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে হাসপাতালে, একটু সুস্থ হলে তারপর বাড়ি আনার কথা ভাবা যাবে।

মৌভোগ স্টেশানে নেমে পালকি জোগাড় করতে অনেকটা সময় লেগে গেল। শেষ পর্যন্ত বেলা দুটোর সময় ওরা যখন পৌঁছাল তখন সব শেষ হয়ে গেছে। ছোট্ট উঠোনটায় গ্রামের অনেক মানুষের ভিড়। ভিতর থেকে বুকফাটা কান্নার আওয়াজ শুনে কারও আর বুঝতে বাকি রইল না কিছু।

গ্রামবাসীদের সাহায্যে মায়ের ব্যক্তিত্বপূর্ণ নেতৃত্বে এবং উদারহস্তে অর্থব্যয়ে সৎকার কর্মটি বেশ ভালোভাবেই নিষ্পন্ন হয়ে গেল রাত দশটার মধ্যেই।

এখানে মায়ের যেন এক অন্যরূপ দেখছে রুনু। মা যে এত টাকাপয়সা সঙ্গে এনেছিলেন ওরা কেউ ভাবতেই পারেনি।

ওরা পৌঁছবার প্রায় ঘণ্টাখানেক আগেই মৃত্যু হয়েছিল, কিন্তু রুনু ফিরে না আসা পর্যন্ত সীতা কেবল কেঁদেছে এবং মৃতদেহ কাউকে স্পর্শ করতে দেয়নি। মৃত্যুর কয়েক মিনিট আগে, নাকি একবার জ্ঞান ফিরেছিল। রোগী মাথা চাপড়ে বলেছিল,—'মাথা গেল, বুক গেল।' সেই গ্রাম্য ডাক্তারটিকে ডেকে এনেছিল গ্রামের লোকেরা। তিনি বলেছিলেন মাথায় জলপটি দিয়ে এবং অনবরত মাথায় হাওয়া কারতে। তারপর দিয়েছিলেন ঘুমের ওষুধ। সেই ঘুমই হল শেষ ঘুম! সীতা বুঝতেও পারেনি। তার কোলে মাথা রেখেই ঘুমিয়েছিলেন। সে সমানে হওয়া করে যাচ্ছিল। এক সময় ওর পা অবশ হয়ে আসতে মাথাটা আস্তে কোল থেকে নামাতে গিয়ে দেখল শরীরটা কাঠের মতো শক্ত আর বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে গেছে! সেই যে কান্না জুড়েছিল সীতা, সেই কান্না শুনেই একে একে ছুটে এসেছে সব গ্রামবাসী।

সেই কান্না শুনেই তো রুনু ওরা একসঙ্গে প্রবেশ করেছিল ঘরে। তখনই দেখল রুনু মায়ের আশ্চর্য রূপটা। তিনি নিঃশব্দে সীতার কোল থেকে তার মায়ের মাথাটি নামিয়ে রেখে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। পাশে দাঁড়ানো সীতারই সমবয়সি একটি মেয়েকে বললেন,—কাঁথাখানা দিয়ে শরীরটা ভালো করে ঢেকে দাও তো মা। তারপর সঙ্গে আনা নতুন থানখানা শবদেহে সযত্নে পরিয়ে গ্রামের লোকজন ডেকে তাদের হাতে প্রয়োজনীয় টাকাপয়সা দিয়ে শবযাত্রার ব্যবস্থা করে দিলেন।

এক সময় সীতাকে বুকে চেপে ধরে সাশ্রুনেত্রে বললেন,—কাঁদিসনে মা, তোর মা তো ভাগ্যবতী। সংসারে কত দুঃখ কষ্ট পাইছেন, এবার সব দুঃখ শেষ হল। ঈশ্বর তারে নিজের কোলে টেনে নিলেন। সেখানে কোনও শোক, দুঃখ, অশান্তি নাই। চির শান্তি।

মা, মা গো—ও!—বলে নিবিড়ভাবে শাশুড়িকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদতে থাকে সীতা।

—তোর দুঃখু কিসির রে মা। এট্টা মা গেছে, এই মা-ডা তো আছে। তোর সব দুঃখু-কষ্ট আমার বুকি ঢাল্যে দে মা। আমি তো আছি।

দেখতে দেখতে কী এক আশ্চর্য সান্ত্বনায় কান্না থেমে গেছিল সীতার।

রুনু আর ইন্দ্রও শবযাত্রী হল। সীতাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইলেন মা। সীতা তার হারিয়ে যাওয়া মাকে যেন এই মায়ের মধ্যে খুঁজে পেয়েছে। ওর আর শাশুড়ির উপর কোনও অভিমান নেই। এখন ও দাঁড়িয়ে আছে যেন জননী মেনকার কোলে পরম নির্ভয়ে হিমালয়কন্যা উমা।

দুই বেয়ানের দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বের অবসান হল এতদিনে দৈব বিধানে।

সীতের কী ভাগ্যি

পরদিন ওদের রওনা হতে বেলাই হয়ে গেল।

সীতার মায়ের সম্পত্তি বলতে দশ কাঠা জমির উপর একটা কুঁড়ে ঘর একটা গরু। এই সম্পত্তির উত্তরাধিকারী এখন তার একমাত্র কন্যা সীতা।

গরুটার একটা বাছুরও ছিল। সীতার মা অসুস্থ হবার পর অযত্নে অবহেলায় বাছুরটা একদিন হারিয়ে গেল। হারিয়ে গেল তো গেলই। আর খোঁজ পাওয়া গেল না, খোঁজ করবেই বা কে?

গরুটা এখন গাভীন। মাস তিনেক পরে বাচ্চা হবে। দুধ দিতে শুরু করবে।

এ সব খবরই মা নিলেন গ্রামের বৃদ্ধ মোড়ল মশায়ের কাছে। গরুটা নাকি ভালো জাতের। দুবেলা ৩/৪ সের দুধ দিত আগে। সীতাই ওটার যত্নআত্তি করত। সীতার বিয়ের পর আর তেমন যত্ন হয়নি। দুধও কমে গেছিল। আবার পেট ভরে খেতে পেলে ভালো দুধ দেবে।

তা গরুর সেবা কী করে করতে হয় মা সেটা ভালোই জানেন। গোবরার বাড়িতে বরারর গরু ছিল। কখনও বাছুর সমতে তিন-চারটে গরুও থাকত গোয়ালে। ওদেশে ঘরে কোনওদিন দুধ-দইয়ের অভাব হয়নি। এদেশে এসে গরু আর কেনা সম্ভব হয়নি বলে মায়ের মনে বড় ক্ষোভ ছিল। এতদিনে আবার একটা গরু পোষার সুযোগ এল। সীতার বড় আদরের গরু। সীতাও দেখাশুনো করতে পারবে অবসর সময়ে।

স্থির হল গরুটা এবার সঙ্গে করেই নিয়ে যেতে হবে।

তারপর জমিটুকুর ব্যবস্থা। মা মোড়ল মশায়কে বললেন,—আপনাদের এট্টা অনুরোধ করব দাদা। এই জমিটুকু আর এই কুঁড়ে ঘরটুকু, কীই-বা এর মূল্য, অত দুরিতি কেই বা এর দেখাশুনো করবে। খদ্দের পালি দরদাম বুঝে বিক্রির ব্যবস্থা করবেন।

খদ্দের ওখানেই পাওয়া গেল। তিনি স্বয়ং মোড়ল মশায়। আরও দু'-একজনেরও লোভ ছিল জমিটুকুর উপর। তারাও উচিত মূল্যে কিনতে চায়। কথায় কথায় একটা নীলামের মতোই হয়ে গেল। সর্বোচ্চ মূল্য ১০১ টাকায় শেষ পর্যন্ত মোড়ল মশাই-ই জয়ী হলেন। ওইখানেই কাগজপত্র লেখা হয়ে গেল। সীতা একটা সই করল। সাক্ষী হিসাবে সই করল ইন্দ্র এবং ওই গ্রামের আর একটি লোক। টাকাটাও নগদই পাওয়া গেল। সেই টাকা থেকে আবার কুড়ি টাকা মোড়ল মশায়ের হাতে দিয়ে মা বলেন,—আর একটা অনুরোধ দাদা, কাল যারা শবযাত্রী গেছিল তাদের তো আপনি চেনেন। তাদের সবাইরি ডাকান। এই টাকা দিয়া তাদের সবাইকে দই-চিড়ে, মিষ্টি-টিষ্টি খাওয়াবার ব্যবস্থা করেন। এখানে কি কোথায় পাওয়া যায় আমরা তো জানি না, নিজির কাজ মনে করে আপনাগেই সব করে-কম্মে নিতি হবে। কেনাকাটা করতি আমার দুই ছেলেরেও সঙ্গে নেবেন। ওরাও সাধ্যমতো সাহায্য করবে। তারপর আনুষ্ঠানিক শ্রাদ্ধক্রিয়াদি আমার বাড়িতেই হবে। সেদিনও আপনাগে যাতি হবে। আগাম নিমন্ত্রণ করে যাচ্ছি।

দেখতে দেখতে ছোট্ট উঠোনটায় যেন একটা মহোৎসব শুরু হয়ে গেল। কেউ গেল কলার পাতা কাটতে, কেউ দই-চিড়ে কিনতে, কেউ নারকেল, চিনি ইত্যাদি কিনতে, কেউ গেল পাড়ার নিমন্ত্রণ করতে।

মা সীতাকে নিয়ে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বাসন-কোসন কি আছে সব গুছোতে শুরু করলেন। ওদিকে সব বাঁধাছাঁদা হচ্ছে, এদিকে উঠোনে সব কলার পাতা পেতে বসে গেছে চিড়ে, দইয়ের ফলার সারতে।

বেলা বারোটার মধ্যেই সমস্ত ব্যাপার সুন্দরভাবে মিটে গেল। ইতিমধ্যে দাদা একখানা বড় নৌকা ভাড়া করে এনে মালপত্র সব তুলে ফেলবার ব্যবস্থা করছে। ক্ষুদ্র কুঁড়ে ঘর হলেও তার মধ্যে একটা সংসারের মালপত্র খুব কম হল না। নৌকার ভিতরে মা ও সীতার জন্য বিছানা পাতা হয়েছে। রুনু ও ইন্দ্র সব গুছিয়ে-গাছিয়ে তুলে সব শেষে তুলল গরুটাকে।

বেলা দুটো নাগাদ ওরা দুর্গা, দুর্গা বলে রওনা হল। ঘাটে দাঁড়িয়ে ওদের বিদায় জানাল প্রায় সমস্ত গ্রামবাসী।

ক্লান্ত অবসন্ন সীতাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে নিয়ে এক সময় শুয়ে পড়লেন মা। কাল দুপুর থেকে মায়ের উপর দিয়েও কম ঝড় বয়ে যায়নি। ক্লান্ত তিনিও! হয়তো একটু পরে ঘুমিয়েই পড়লেন।

অবসাদমাখা বিষণ্ণমুখে বসে আছে ইন্দ্র। চিরকালের মতো মৌভাগ গ্রাম ছেড়ে চলে যাচ্ছে ওরা। এ জীবনে আর শ্বশুর বাড়ি যাওয়া হবে না দাদার।

নৌকাটা মন্থর গতিতে এগিয়ে চলেছে খুলনা অভিমুখে। নিস্তরঙ্গ নদীর স্নিগ্ধ সজলরূপ, দুই তীরের শ্যামশোভা, কিছুই চোখে পড়ছে না রুনুর। ও সবিস্ময়ে ভাবছে, এবার বাড়ি এসে দাদা ও বউদির কাছে নানা কথা শুনে, এমনকী বাবারও দু-একটা কথায় মায়ের প্রতি ওর মনটা একটু বিরূপ হয়ে উঠেছিল। বস্তুত এবার ওর পরিকল্পনা ছিল—অর্থাৎ বউদিকে ৩/৪ মাসের জন্য তার মায়ের কাছে রেখে যাওয়া—সে তো সরাসরি মায়ের বিরুদ্ধাচরণ। তখন মাকে মনে হয়েছিল, অনুদার, সঙ্কীর্ণমনা। কিন্তু এইখানে এবার মায়ের ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, মমতাময়ী, উদার হৃদয়টির পরিচয় পেল রুনু। এ তো ছিল ওর কল্পনাতীত। কত সহজে সবদিক সুন্দরভাবে সাজিয়ে ফেললেন মা। একটি দিনের মধ্যেই যেন সারাটা গ্রামকে জয় করে ফেললেন। একটি মানুষ তাঁর একটি কথায় প্রতিবাদ করেনি।

মা যেন তাদের সকলেরই মা । কী সম্ভ্রমবোধ তাদের। আসবার সময়ে মোড়লমশায় সমেত যারা ওখানে উপস্থিত ছিল তারা সকলেই দেবীজ্ঞানে মাকে প্রণাম করেছে। সীতের কী ভাগ্যি! এমন শাশুড়ি শত জন্মের পূণ্যি না থাকলি পায় না কেউ।

রুনুও ভাবছে, সত্যই, বউদির কী ভাগ্য। সকাল থেকে আর তার মুখে শোকের ছায়া দেখা যায়নি। মায়ের সঙ্গে সমান উৎসাহে কাজ করেছে। নিমন্ত্রিতদের নিজ হাতে দই মিষ্টি পরিবেশন করেছে হাসিমুখে ওর সমবয়সী বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলেছে। সহজ আন্তরিকতার সঙ্গে একেবারে স্বাভাবিকভাবে। যেন মা ওর মরেইনি। এই মায়ের মধ্যেই বেঁচে রয়েছেন সেই মা। ওর আর দুঃখ কী।

রুনু দেখছে, কত সহজ সুন্দরভাবে সীতা ঘুমোচ্ছে মায়ের বুকের মধ্যে। কে বলবে ও সদ্য মাতৃবিয়োগ শোকে কাতর একটি মেয়ে। সেই মাকে হারিয়ে এই মাকে এতদিনে নিবিড় করে পেল বউদি। বউদি সত্যই ভাগ্যবতী।

দুই বেয়ানের সমস্যাটা আকস্মিভাবে মিটে যেতে রুনু একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। বউদি অশৌচন্ত হবার পর চতুর্থীর কাজটা শান্তিপূর্ণভাবে নিষ্পন্ন হয়ে যেতে এবার ও মায়ের কাছে পেশ করল গোপালগঞ্জ বেড়াতে যাবার প্রস্তাব।

—ও দ্যাশ তো আমরা জন্মের মতো ছাড়্যে ছুড়ে আইছি, আবার আসা-যাওয়ার কতগুলন টাকা খরচ কি হবে? কদ্দিন পরে বাড়ি আইছিস। তুই বাড়ি থাকলি বাড়িডা আনন্দে ঝলমল করে। সীতের মুখি হাসি ফোটে। দেহিস ও-ও তোর যাতি দেবে না।

—আবার সীতাকে দলে টানছ কেন? আসলে তুমিই আঁচলছাড়া করতে চাও না। আচ্ছা আমি কি এখনও দুধের বাচ্চা নাকি? পাঁচ-পাঁচটা বছর তাঁরা আমাকে খেতে পরতে দিয়েছে, তাঁদের প্রতি একটা কৃতজ্ঞতা থাকবে না আবার? তাছাড়া এইসঙ্গে দিদিদেরও একবার দেখে আসব।

এইবার মায়ের মন গলল। দিদিদের কথায় দুচোখ ছল ছল করে উঠল।—কত কাল ওগো দেখি না। এ জীবনে হয়তো আর...। আচ্ছা, আয় তাহলি একবার ঘুরে আয়। দিদিগে জন্যি কাপড়-চোপড় কিনে নিয়ে যাস। পয়সা-কড়ির দরকার হলি বলিস।

ডাক্তারবাবুর বাড়ির সকলের জন্যও কাপড় কিনে নেবার কথা বলেছিলেন বাবা। মনে মনে হিসেব করে রুনু বলে,—দশ-পাঁচ টাকা দরকার হতে পারে। কিন্তু তোমার কাছে কত টাকা আছে মা? এখানেও তো দেখলাম বেশ খরচ করে এলে। তুমি তো দেখছি বেশ একটা বড়লোক এখন।

তা তো হইছিই।—হেসে বলেন মাঃ আমার তো পরের ধনে পোদ্দারি। তুই যে তিরিশ টাকা করে দিতিস, তার কয়ডা টাকা খরচ করিছি? সবই তো প্রায় ধরা রইছে তোর জন্যি। সেই টাকাতেই তো ওখানে খরচ করলাম। আবার ওখানে জমি বেচা টাকাও তো পালাম কিছু। সব তোর জন্যি জমা রাহিছি।

—আমার জন্যে? কেন?

—বরিশালে তো টিউশনি করিছিস। এখানে আস্যেই তো আর টিউশনি পাবি না। তাছাড়া চাকরি-পাতিও দেরি হতি পারে। এইসব ভবিষ্যৎ চিন্তা করেই...

বাবার সামনে বসেই কথা হচ্ছিল। এতক্ষণে কথা বললেন বাবা।

—তুমি এতদূর ভাবিছ? তাই তো কই তুমি এ-বাড়ির লক্ষ্মী। তুমি যদ্দিন আছো, এ-বাড়ির কেউ কোনও কষ্ট পাবে না।

প্রশংসায় বিব্রত মা চট করে উঠে পড়লেন। উঠতে উঠতে বললেন,—অনেক বেলা হল, এবার ছান করে নেন। রুনুও যা ছান করে আয়। তোরা তাড়াতাড়ি খাইয়ে-দাইয়ে নিলি সীতে একটু বিশ্রাম পায়। এই কয়দিন ওর শরীডার উপর কি কম ধকল গেল। ওর এখন কয়দিন বিশ্রাম দরকার। ভাবছি এই কয়মাস একবেলা আমিই রান্না করব।

বউদির বিশ্রামের জন্যে মাকে অমন করে ভাবতে এই প্রথম দেখল রুনু এবার এসে। রুনু আবার ভাবল, বউদির কী ভাগ্য! এমন শাশুড়ি পায় কটা বউ?

আবার এলো রুনু গোপালগঞ্জে

তিন দিদির জন্য তিনখানা সাধারণ শাড়ি, এটা তো সোজা হিসেব। কিন্তু রুনুর মস্ত ভাবনার বিষয় হল ডাক্তারবাবুর বাড়ির কার জন্য কি কেনা উচিত। বাবা বলেছিলেন ডাক্তারবাবুর জন্য একটা ধুতি ও তাঁর স্ত্রীর জন্য একটা শাড়ি কিনলেই যথেষ্ট। বাবার হয়তো খেয়ালই নেই যে ডাক্তারবাবুর দুই স্ত্রী। আবার রয়েছে ওদের তিনটি মেয়ে, কমলা, প্রমীলা আর পুষ্প—রুনুর তিন ছাত্রী। মনে মনে হিসেব করে দেখেছে, কমলার বয়স এখন ১৭/১৮, প্রমীলার ১৫/১৬ আর পুষ্পর ১২/১৩-র কম নয়। গ্রামের মেয়ে হলে পুষ্প এখন নিশ্চয় শাড়ি পরত কিন্তু শহরে মেয়েরা কি এ বয়সে শাড়ি পরে? কতটা লম্বা হয়েছে পুষ্প? কী মাপের ফ্রক কেনা উচিত। অনেক ভেবেও পুষ্প বর্তমান চেহারাটা কল্পনা করতে পারে না। অথচ অনেকটা কল্পনা করতে পারে চার বছর পরের কমলা প্রমীলার চেহারা। ওরা নিশ্চয় আরও সুন্দর দেখতে হয়েছে। আরও একটু লম্বা হয়েছে। কিন্তু শাড়ি কিনতে ভাবনা নেই। সব মেয়েরাই এক মাপের শাড়ি পরতে পারে। কমলা কালো, প্রমীলা ফর্সা। কোন রঙ মানাবে? অনেক ভেবে শেষ পর্যন্ত ডাক্তারবাবুর জন্য কিনল ভালো ধুতি, দুই মাসির জন্য একই ডিজাইনের একজোড়া লাল পাড়ি তাঁতের শাড়ি আর কমলা প্রমীলার জন্যও একই ডিজাইনের সবুজ পাড় কমলা রঙের তাঁতের শাড়ি এক জোড়া।

এক স্যুটকেস ভর্তি জামাকাপড় ও মস্ত এক প্যাকেট সন্দেশ নিয়ে এক শুভদিনে মা, বাবা ও দাদাকে প্রণাম করে গোপালগঞ্জগামী স্টিমারে চড়ে বসল রুনু।

স্টিমারের ডেকে দাঁড়িয়ে যে গোপালগঞ্জকে ও দেখছে, এই চার বছরে সে গোপালগঞ্জ তো একটুও বদলায়নি। সেই সব বাঁধা ঘাট, নদীতীর বরাবর সেই রাস্তা, সেই মিশন স্কুল কোর্ট, কাছারি, এস.ডি.ও.-র বাংলো জেলখানার উঁচু ঢেউ খেলানো প্রাচীর আর সামনের লোহার গেট এবং শহরের দক্ষিণ প্রান্তে স্টেশানের জেটি—সব ঠিক যেমনটি ছিল তেমনই আছে।

স্টেশনটা যতই এগিয়ে আসছে ততোই একটা অদম্য উত্তেজনায় রুনু যেন অস্থির হয়ে উঠছে। বারবার মনে ভেসে উঠছে কমলার কথা—বড় অপরাধী মনে হচ্ছে নিজেকে। বস্তুত সেবার যে ও মাট্রিক পাশ করল তার পিছনে কমলার অবদান অনেকখানি। আর সেই কমলাকে এই চার বছরে একখানা চিঠি লিখেও যে কৃতজ্ঞতা জানাল না রুনু, এ যে কতবড় হৃদয়হীনতা—এইসব ভাবতে ভাবতে আত্মধিক্কারে জর্জরিত হচ্ছিল রুনু।

হঠাৎ একটা ঝাকুনি দিয়ে স্টিমারটা জেটিতে ভিড়ল। মুহূর্তে আরোহী এবং অবরোহী যাত্রীদের চিৎকার, চেঁচামেচিতে ওর কল্পনা সূত্রটা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল।

একটা কুলির মাথায় মালপত্র চাপিয়ে স্বাস্থ্যবান সুবেশ এক উজ্জ্বল তরুণ যখন যোগেন ডাক্তারবাবুর বাড়ির দোরগোড়ায় পৌঁছল তখন বেলা সাড়ে দশটা। এসময় ডাক্তারবাবু সাধারণতঃ বাড়ি থাকেন না। 'কল' থেকে ফিরতে তাঁর বারোটা একটা হয়ে যায়। কিন্তু বাড়িতে আর কেউ আছে বলেও মনে হচ্ছে না। একেবারে নিঃশব্দ, নিঝুম যেন। সামনের বৈঠকখানার দরজা বন্ধ। জানলা দুটো অবশ্য খোলাই আছে। কিন্তু জানলা দিয়ে কী দেখছে রুনু! ওষুধের আলমারি দুটো প্রায় শূন্য। একটা আলমারির একখানা কাচ নেই। অন্যটার দুখানা কাচই ভাঙা। ধুলোর আস্তরণ পড়েছে সর্বত্র; সমস্ত বৈঠকখানা ঘরেই একটা শ্রীহীন দীনতার ছাপ। তবে কি ডাক্তারবাবু আর প্র্যাকটিস করেন না?

ভিতরের রান্নাঘর থেকে অবশ্য মাঝে মাঝে টুকটাক শব্দ শোনা যাচ্ছে। তবেকি সবাই এখন রান্নাঘরে খেতে বসেছে? সাতপাঁচ নানারকম ভেবে কড়া নাড়ল রুনু প্রথমে খুব আস্তে। ক্রমে শব্দটা একটু জোরাল হতেই ভিতর থেকে একটা কর্কশ কিশোরী কণ্ঠে জবাব এল,—ডাক্তারবাবু বাড়ি নেই! এক সপ্তাহ পরে আসবেন।

এ যে একেবারে অচেনা কণ্ঠস্বর! কমলা প্রমীলার তো নয়ই। পুষ্পরও নয়। তবে কে ওই কণ্ঠের অধিকারণী?

শেষ পর্যন্ত কুলিটাই ওকে উদ্ধার করল। সে মহা বিরক্ত হয়ে চিৎকার করে উঠল,—দরজাডা খোলেন। দ্যাহেন আপনাগে কুটুম আইছে।

ওমা, কুটুম? কে গা? আমি ভাবলাম বাবার কোনও রোগী বুঝি—বলতে বলতে সেই কণ্ঠটা এগিয়ে এল। বৈঠকখানার দরজাটা খুলে গেল।

রুনুর মুখোমুখি বিস্ময়ভরা চোখে দাঁড়িয়ে পড়ল বারো-তেরো বছরের ফুটফুটে ফ্রক পরা একটি মেয়ে। সে-ই প্রথম চিনল রুনুকে,—ওমা, রুনুদা। এসো এসো, ভিতরে এসো।

এবার রুনু চিনতে পেরেছে ওকে—পুষ্প।

কুলিকে বিদায় দিয়ে রুনু ঘরে ঢুকল পুষ্পর পিছনে পিছনে। ঢুকতে ঢুকতে বলে সে,—কমু, প্রমী ওরা কোথায়?

পুষ্প কোনও কথা না বলে ডানদিকের খাটের দিকে রুনুর দৃষ্টি আকর্ষণ করল! চমকিত রুনু দেখল, বিছানায় শুয়ে আছে শয্যালীন শীর্ণকায়া কমলা! মাথায় কি একটা ওষুধের প্রলেপ। টানাটানা চোখদুটো গর্তে বসে গেছে। চোখের নীচে গভীর কালি। তার চারখানা হাত পা-ই খাটের রেলিং-এর সঙ্গে শক্ত দড়ি দিয়ে বাঁধা।

বিস্ময়-বিমূঢ় চোখে তাকিয়ে আছে রুনু! সমস্ত কথা যেন রুদ্ধ হয়ে গেছে।

দেখ, বড়দির কি দশা হইছে। বলতে বলতে হু-হু করে কেঁদে পড়ল পুষ্প।

—কী হয়েছে কমলার?

—বড়দি পাগল হয়ে গেছে। ওষুধের জোরে ঘুমোচ্ছে। জাগে উঠলিই...

—পাগল! কী বলছ? কবে থেকে?

সেই তুমি চলে যাবার মাস ছয়েক পরেই।—ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে পুষ্প।

ওদের কথাবার্তা শুনে এবার রান্নাঘর থেকে এ-ঘরে এলেন মাসিমা। মাসিমাকে দেখেও অবাক রুনু। এই কবছরের মধ্যে অমন সুন্দরী স্বাস্থ্যবতী মাসিমা যে এমন বৃদ্ধ হয়ে যেতে পারেন, এ ওর সুদূরতম কল্পনাতেও ছিল ছিল না। রুনু প্রণাম করতেই মাসিমা ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন।

—ওরে রুনু, তুই বড় নিষ্ঠুর রে। এই চার-চারটে বছর গেল, এর মধ্যি একটা বারও আমাদের কথা মনে পড়ল না? একখানা চিঠি দিয়েও খবর নিলি না। কতবার তো বরিশাল থেকে দেশে আসা-যাওয়া করলি।

—আমাদের সে গোবরার বাড়ি তো নেই মাসিমা, আমাদের বাড়ি এখন অনেক দূরে, খুলনায়।

সব খবর আমরা রাখিরে রুনু, কিন্তু তুই সেই যে বাজুনে যাবার নাম করে চলে গেলি...আমরা সবাই পথ চেয়ে চেয়ে....দ্যাখ, কমুর কী দশা হইছে? কেবল তোর উপর অভিমান করে করে মেয়েডা আমার....সারাদিনি রাত্রি চোখি ঘুম নাই। ওই যে দেখতিছিস, ও ওষুধের ঘুম।

মাসিমা বারে বারে চোখ মোছেন। আস্তে আস্তে মাসিমা ও পুষ্পর মুখ থেকে এই চার বছরের অনেক ঘটনা শুনল রুনু। মিষ্টির প্যাকেটটা পুষ্পর হাতে ধরিয়ে দিল।

প্রথম খবর হল বড় মাসিমা বরাবরের মতো চলে গেছেন এখান থেকে দিলীপের কাছে। সে এখন ভালো চাকরি করে।

শুনল তারপর কমলার পাগল হয়ে যাবার ইতিহাস।

বাজুনিয়া থেকে রুনুর দিন পনেরোর মধ্যেই ফেরার কথা ছিল। প্রায় মাসখানেক পর্যন্ত কমলা তার অস্থিরতাটা অতিকষ্টে সামলেছিল। তারপর আর কারও বুঝতে বাকি রইল না কেন সে সারাদিন জানালায় বসে থাকে পথের দিকে চেয়ে। এক এক সময় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে উঠল, 'নাঃ, রুনুদা আজও এল না।' ডাক্তারবাবু ও মাসিমা এবার ওর বিয়ে দেবার জন্য পাত্রের সন্ধান শুরু করলেন। কমলা সেটা জানতে পেরে শুরু করল অনশন। ছেড়ে দিল স্কুলে যাওয়া। কথা প্রায় বলেই না কারও সঙ্গে। কেবল নিঃশব্দে নিজের কাজটুকু করে যায়। এমনি করে কেটে গেলে প্রায় এক বছর। একসময় ওর আচরণে অস্বাভাবিতা দেখা দিল। কখনও হুঁ-হুঁ করে কেঁদে পড়ে, কখনও হাতের কাছে যা পায় ভেঙেচুরে ফেলে। ওদিকে পাত্রের সন্ধানটা চলছিলই। ইতিমধ্যে প্রমীলা উঠল ক্লাস নাইনে। প্রমীলার বিয়ে হয়ে গেল। আছে নারায়ণগঞ্জে তার শ্বশুরবাড়িতে। প্রমীলা তবু বকেঝকে ভালোবেসে ওকে খানিকটা সামলে রাখত। সে ছিল খুব বুদ্ধিমতী মেয়ে। সে চলে যেতে কমলা সত্যি সত্যি পাগল হল। যখন তখন বেসামাল বেশে রাস্তায় ছুটে যায়। আবোল-তাবোল বকতে বকতে ছুটতে থাকে রাস্তায়। তখন ওকে ধরে আনতে পাড়ার ছেলেদের ডাকতে হয়। ডাক্তারবাবু বাধ্য হলেন হাত পা বেঁধে রাখতে, আর সাধ্যমতো চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে। এই কবছরে কত টাকা যে জলে গেল, কত বকম চিকিৎসা যে হল, হল কত ঝাঁড়-ফুক-তাবিজ-কবজ। শেষ পর্যন্ত স্থির হয়েছে, ওকে রাঁচি পাগলা গারদেই ভরতি করতে হবে। সেই ব্যবস্থা করতেই ডাক্তারবাবু গেছেন কলকাতায় ওর কয়েকজন ডাক্তারবাবুর সঙ্গে পরামর্শ করতে। কমলাকে সামলাতে ডাক্তারবাবুর নিজের প্রাকটিস প্রায় বন্ধ হবার দশা।

ওদের বর্ণনা শুনতে শুনতে বারে বারে চোখ মুছেছে রুনু তারপর কখন যে কমলার পাশটিতে বসে সন্তর্পণে তার মাথায় হাত বুলোতে শুরু করেছিল, তা ওর খেয়ালই নেই।

এক সময় দেখা গেল রুনু যেন অন্যমনস্ক ভাবেই খুলতে শুরু করল কমলার হাতের দড়িটা।

কী করছ? করছ কি রুনুদা!—ফিসফিস করে বলে পুষ্প।

তবু শেষ পর্যন্ত বাঁধনটা খুলেই দিল। ফিস ফিস করে বলল,—এভাবে হাত টান টান করে বাঁধা থাকলে কেউ আরামে ঘুমোতে পারে?

হাত দুখানা মুক্ত হতে ঘুমন্ত কমলা আলগোছে তার হাত দুখানা বুকের উপর রাখল। রুনু দেখছে তার দুহাতের কব্জিতেই কালো কালো দাগ পড়ে গেছে। সে আলতো ভাবে সেই ক্ষতস্থানে হাত বুলোতে শুরু করল। মনে হল কমলা যেন আরও শান্তিতে ঘুমোচ্ছে এবার সেবাটুকু পেয়ে।

মাসিমা ও পুষ্প এবার নিঃশব্দে দেখছে দৃশ্যটা, কারও মুখে কথা নেই। একটু পরে রুনু বলে,—পায়ের বাঁধনটা খুলে দাও না পুষ্প।

—কী সর্বনাশ। জেগে উঠলেই দৌড় দেবে কিন্তু।

—যাবে কোথায়? আমরা তো রয়েছি। ধরে ফেলব।

—ধরতে গেলে এমন ছুটতে থাকবে, তারপর ধরে ফেললে আঁচড়ে কামড়ে...

ভয় নেই, বললাম তো। আমি দায়িত্ব নিচ্ছি।—দৃঢ়তার সঙ্গে বলে রুনু।

পুষ্প তাকাল তার মায়ের দিকে।—কী করব মা?

দে, যা দেখ না একবার। রুনু যখন বলতিছে।—বললেন মাসিমা।

পুষ্প সভয়ে ধীরে ধীরে খুলে দিল পায়ের বাঁধন।

পা দুখানা মুক্ত হতেই কমলা যেন আরও আরামে ঘুমিয়ে পড়ল গভীর ঘুমে। রুনু ওর একখানা শীর্ণ হাত ধরেছে নিজের হাতে, অন্য হাতে কমলার মাথায় কপালে কোমলভাবে হাত বুলিয়ে দিতে থাকল।

এ দৃশ্য দেখে মাসিমা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পুষ্পকে বললেন,—তোরা বস একটু। আমি বরং বাইরের দরজায় একটা তালা লাগায়ে দিচ্ছি। একটু আরামে ঘুমোচ্ছে ও, ঘুমোক।

যা করবার আমরা করব মাসিমা। আপনি বরং রান্নাঘর সামলান গিয়ে। ওই মিষ্টি থেকে আমাদের দিন, আর একটা বাটিতে কমলার জন্য...। দেখি জেগে উঠলে যদি ওকে খাওয়াতে পারি।—রুনু আশ্বাস দিল মাসিমাকে।

রুনু দেখতে পাচ্ছে কমলার মেরুদণ্ডের গিঁঠগুলি এবং পিঠের হাড়গুলি এক এক করে গুনে ফেলা যায়। ওর গায়ের রঙটা যেন ছাই মাখা হয়ে গেছে।

রুনুর মনে জাগে আত্মধিক্কার। তার দুচোখে নামল অশ্রুধারা। পুষ্প বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। সে দিকে ভ্রূক্ষেপও নেই রুনুর। ও কমলার কানের কাছে মুখ নামিয়ে কোমল কণ্ঠে বলছে,—ওঠো, জাগো কমলা। জাগো। দেখো বোন, আমি এসেচি। সেবার তুমি তোমার প্রাণঢালা সেবা দিয়ে আমায় বাঁচিয়েছিলে, এবার আমি বাঁচাব তোমাকে আমার হৃদয়ভরা স্নেহ ও সেবা দিয়ে। এই সুযোগটুকু আমাকে দাও কমলা।

এমনি ভাবতে ভাবতে সে অজান্তে কমলার ঘুমন্ত শরীরটাকে একটা বড় রকমের ঝাঁকুনি দিল। সেই প্রবল ঝাঁকুনিতে ঘুম ভেঙে গেল কমলার। চোখ মেলে তাকাল সে। চোখে তার বিভ্রান্ত দৃষ্টি। রুনু ব্যাকুলভাবে কমলার চোখে চোখ রাখল। রুনুর চোখে জিজ্ঞাসা, কমলার চোখে বিস্তৃতির অতল থেকে কীসের যেন ব্যাকুল সন্ধান।

—আমাকে চিনতি পারছ না কমু? আমি, আমি রুনু।

কমলার চোখে কোনও সাড়া নেই।

রুনু এবার সমস্ত শক্তিতে মাথা ধরে ঝাঁকুনি দিতে দিতে বলে,—তোমাকে মনে করতেই হবে, কমলা। মনে করো। মনে করে দেখো। সেই যে বাজুনিয়া যাবার সময় বলেছিলাম, আমি শিগগিরই ফিরে আসব। এই তো ফিরে এলাম।

—তুমি...তুমি...থরথর করে ঠোঁট কাঁপছে কমলার। চোখের দৃষ্টি যেন হয়ে এসেছে স্বাভাবিক।

—আমি রুনু। তোমার রণুদা।

রুনুদা!!!—একটা গলাফাটা আর্তনাদ করে ওঠে কমলা। তারপর হাউহাউ করে তার সে কী কান্না! সে কান্না আর থামে না।

কান্না শুনে রান্নাঘর থেকে ছুটে এলেন মাসিমা। তিনি অবাক হয়ে গেছেন। কমলাকে এমনি করে কেউ কোনওদিন কাঁদতে শোনেনি। স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন মাসিমা।

ও কাঁদে ক্যান? এক সময় প্রশ্ন করেন মাসিমা।

কাঁদুক মাসিমা। কাঁদতে দিন ওকে। চার বছরের জমানো কান্না সব যে বেরিয়ে আসছে।—শান্তভাবে বলে রুনু।

—ও কামু, আর কাঁদিস না মা। দ্যাখ, রুনু আইছে। ওকি তোমারে চিনতে পারিছে?

—পেরেছে।

সঙ্গে সঙ্গে অদ্ভুত একটা প্রসন্নতা ফুটে উঠল মাসিমার চোখে-মুখে। তিনি দৌড়ে গেলেন রান্নাঘরে রুনুদের জন্য মিষ্টি আনতে।

রুনু শান্তভাবে মাথায় হাত বুলোতে থাকে কমলার। তার চোখও ভিড়ে উঠছে। কাঁপা গলায় সে বলে,—আর কাঁদে না লক্ষ্মী বোন। এই তো আমি এসেছি।

—তুমি রুনুদা?

—হ্যাঁ।

—তুমি কী নিষ্ঠুর রুনুদা।—বলতে বলতে আবার অঝোরে কান্না।

ক্ষমা করো কমলা আমায়। তোমায় সুস্থ না করে কোত্থাও যাব না আমি। দ্যাখো তো, কী রোগা হয়ে গেছো তুমি।—কমলার একখানা শীর্ণ হাত রুনু তুলে ধরল ওর চোখের সামনে।

অনেকক্ষণ ধরে সেই হাতখানার দিকে তাকিয়ে থেকে ও যেন হঠাৎ সম্বিত ফিরে পেল। যেন দীর্ঘকাল একটানা ঘুমের পরে জেগে উঠল কমলা। এক লাফে উঠে বসল সে বিছানার ওপর। দেখতে দেখতে তার চোখে-মুখে ফিরে এল স্বাভাবিক লজ্জা, সংকোচ।

মৃদু হেসে রুনু বলে,—এই তো লক্ষ্মী মেয়ে।

এরমধ্যে ঘরে ঢুকলেন মাসিমা। তাঁর দুহাতে দু-ডিশ ভর্তি খাবার। তারপর কমলার বিছানার উপরই একটা যেন আনন্দ আসর বয়ে গেল।

মাসিমাকেও হাত ধরে বসাল রুনু,—আমাদের সঙ্গে আপনাকেও মিষ্টি খেতে হবে মাসিমা।

একসময়, দেখা গেল এতদিনের একটা নিরানন্দ বাড়িতে যেন আনন্দের হাট বসেছে। রুনু তার বরিশাল কলেজের 'বাঘের' গল্প বলতে বলতে সকলকে হাসিয়ে ছাড়ল। একসঙ্গে খেতে খেতে গল্প চলছিল।

একসময় মাসিমা আবেগরুদ্ধ কণ্ঠে বলেন,—রুনু, তুই মানুষ না। তুই কে রে?

—আমি আপনার একটা ছেলে। বলতে বলতে ও প্রণাম করল মাসিমাকে।

তারপর স্যুটকেস থেকে শাড়িগুলি বের করে সেই এক জোড়া লালপাড় শাড়ি মাসিমার পায়ের কাছে রেখে আর একটা প্রণাম করতেই মাসিমা ব্যাকুল আবগে ওকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।

তাঁতের শাড়ি দুখানা ও পুষ্প আর কমলার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে,—দেখো তো এ শাড়ি তোমাদের পছন্দ হয় কিনা?

সবশেষে ডাক্তারবাবুর ধুতি ও পাঞ্জাবির কাপড়টা মাসিমার হাতে দিয়ে রুনু বলে—এগুলি মেসোমশায়ের।

শাড়িগুলি সত্যই ওদের পছন্দ হয়েছিল। সকলেই একবাক্যে রুনুর পছন্দের তারিফ করল। মাসিমা বললেন,—এ যে অনেক টাকার জিনিস। তুই কি চাকরি-টাকরি করিস নাকি?

—না মাসিমা, এসব আমার টিউশনির টাকায় কেনা।

রুনুরে, তোরে যতই দেখতিছি, ততই ভাবতিছি, তুই কে রে!—মাসিমার চোখে দেখা দিল আনন্দশ্রু।

ও প্রসঙ্গ আরনয় মাসিমা। এবার স্নান করব। তারপর পেট ভরে খাব এবং নাক ডেকে ঘুমোব।—হাসতে হাসতে বলে রুনু।

এক সপ্তাহ নয়, রুনু, রুনু আসার ঠিক বারো দিন পরে ডাক্তারবাবু ফিরে এলেন কলকাতা থেকে কমলাকে পাগলা গারদে ভর্তির ব্যবস্থা পাকা করে। প্রচুর ওষুধপত্রও এনেছেন সঙ্গে অন্তত দু-সপ্তাহের মতো।

ডাক্তারবাবুর সাড়া পেয়ে তাঁকে সর্বাগ্রে হাসিমুখে প্রণাম করল সুস্থ স্বাভাবিক কমলা। তারপর প্রণাম করল রুনু। তিনি একবার রুনুর মুখের দিকে, একবার কমলার মুখের দিকে তাকিয়ে বিস্ময়ে হতবাক। কমলা লজ্জা পেয়ে মাথা নত করল।

ডাক্তারবাবুর বিস্ময়ভরা মুখের দিকে তাকিয়ে মাসিমা বলেন,—এই অসাধ্যসাধন করিছে রুনু। ও মানুষ না। ভগবান ওরে পাঠায়ে দেছেন ঠিক সময় মতো।

ডাক্তারবাবু সাম্বিত ফিরতেই সজোরে রুনুকে বুকে চেপে ধরেন,—কবে এলে বাবা?

এ প্রশ্নের উত্তর দিলেন মাসিমা,—তুমি যাওয়ার পরের দিনই। আমার কান্না শুনে তিনি ওরে পাঠায়ে দিলেন। এ কয়দিন তো ও একাই কমুর সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিয়ে, সব করিছে এক হাতে। কমু এখন সুস্থ। আর ভয় নাই।

ডাক্তারবাবু কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থেকে বললেন,—ঈশ্বর এমনি করেই যার কাজ তাকে দিয়ে করিয়ে নেন। আমরা কেবল ভেবে মরি।

—এইটুকু না করতে পারলে মেসোমশায়, এ জীবনে আর আপনাদের সামনে মুখ তুলে দাঁড়াতেই পারতাম না।

রুনুকে আবার বুকে জড়িয়ে ধরলেন ডাক্তারবাবু। দুচোখ তাঁর আশ্রুসজল। সেই উত্তপ্ত স্নেহস্পর্শে রুনুর চোখও ছলো ছলো।

সেই রাত্রেই বাবাকে ডাক্তারবাবুর বাড়ির সংবাদ জানিয়ে চিঠি লিখল রুনু। দাদাকে আলাদা চিঠিতে লিখল, ওর নামে কলকাতা অথবা বরিশাল থেকে কোনও চিঠিপত্র এলে তা যেন অবিলম্বে ডাক্তারবাবুর ঠিকানায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

চিঠি লিখতে লিখতে রুনুর বারবার মনে পড়ছিল ওর স্বপ্নের কলকাতার কথা, চুয়ার কথা, রাঙাবউদির কথা। কত আশা করেছিল বাড়িতে সপ্তাহখানেক থেকেই ও চলে যাবে কলকাতায়। কিন্তু ঈশ্বর ওকে আবার এনে বন্দী করলেন যোগেন ডাক্তারবাবুর বাসায়। কে জানে কতদিন পরে ওর মুক্তি হবে।

পরদিন চিঠি দুটো পোস্ট করতে গিয়ে নিজের মনেই কথা বলে চলে রুনু—হে মোর স্বপ্নের কলকাতা, তুমি আর কিছুদিন আমার স্বপ্নেই থাকো। যাব, শিগগিরই আমি ছুটে যাব তোমার উষ্ণ পরশ পেতে। তুমি দেবে আমাকে নতুন জীবনের সন্ধান।

শারদীয়া কিশোর ভারতী ১৯৮২


* 'রায় পরিবারে রুনু' শারদীয়া কিশোর ভারতী ১৩৮৬ দ্রষ্টব্য।

** 'ঘরে ঘরে রুনু' শারদীয়া কিশোর ভারতী ১৩৮৩ দ্রষ্টব্য।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%