শ্যামদাস দে

দেখতে দেখতে বরিশাল শহরের কাউনিয়া পাড়ার রায়পরিবারে দুটি বছর পার হয়ে গেল রুনুর। ও আর এখন এ-বাড়িতে একটি বহিরাগত ছেলে নয়, এই পরিবারেই একজন হয়ে গেছে।
ইতিমধ্যে ওর রুনু নামটা এ-বাড়িতে কেবল রাঙাবউদির মুখে টিকে আছে, আর সকলের কাছে 'রণজিৎ' হয়ে গেছে 'রঞ্জিত'। কলেজেও রঞ্জিত রায়। বাড়ির ছোটরা কেউ ডাকে রঞ্জিতদা বলে, কেউ ডাকে কাকু, হাসি ডাকে তাতা। ওর ছাত্রী প্রতিমা ডাকে ওকে রাঙাদা বলে, আর ঠাকুমা তো সেই প্রথম দিনেই ওকে রাঙাদাদু সম্বোধন করে বিশেষ স্নেহের মর্যাদা দান করেছেন। এখন এ-বাড়িতে অচেনা কেউ এলে ওকে রায়মশাইয়ের ছোটছেলে বলেই ভাবে এবং তদনুযায়ী ওর প্রাপ্য সম্মানও দেয়।
রাঙাবউদি প্রথম দিকে ওকে ডাকতেন রাঙাঠাকুর বলে, পরে কবে যে ও তাঁর কাছে 'রুনু' হয়ে গেছে, আজ মনেও করতে পারে না।
যদি বলা যায়, রুনু তার সরলতা আর মিষ্টি ব্যবহার দিয়ে এ-বাড়ির সবকটি মানুষকে জয় করেছে, তাহলে এ কথাও বলতে হবে যে, হাসি তার প্রাণ-কাড়া হাসি আর কথার ফুলঝুরি দিয়ে জয় করেছে রুনুকে। হাসির কাছে ও পরাজিত। হাসির মায়ায় এখানে যেন ও বাঁধা পড়ে গেছে।
এই দুবছরে হাসিরও যে বয়স দুবছর বাড়ল, এটা যেন বিশ্বাসই হয় না রুনুর। ও যেন আজও ঠিক সেই প্রথম দিনের মতোই একটি তাজা গোলাপ ফুল। তেমনই নরম, তেমনই মসৃণ পেলবতা ওর সর্বাঙ্গে। তেমনই একটা পবিত্র দুধ-গন্ধ আর পাউডারের মিষ্টি মিশ্র গন্ধ পাওয়া যায় আজও ওর গা থেকে সব সময়। বাইরের পরিবর্তনটা চোখে না পড়লেও হাসির জ্ঞানভাণ্ডারের পরিমাণের বিপুলতা দেখে মাঝে মাঝে চমকে ওঠে রুনু। ইতিমধ্যে কত কথা যে শিখে ফেলেছে ওইটুকু মেয়ে! জেনে ফেলেছে কত ব্যাপার, কত বিষয়, ভাবতে অবাক লাগে রুনুর। শহরের শিশুরা বুঝি এমনি দ্রুতই শিখে ফেলে সব কিছু। ও একদিন প্রশ্ন করল, লেলগাড়ি যে চালায় সে হল ডাইভার, এলেপেন যে চালায়, সে হল পাইলট, ইত্তিমার যে চালায়, সে কী বলো তো?
উত্তর দেবে কী, প্রশ্ন শুনেই তো রুনু থ। ড্রাইভার, পাইলট, এ শব্দগুলো তো রুনু তার স্কুল জীবনে শোনেইনি। শিখল তো কলেজের বই থেকে। কিন্তু হাসি শিখল কোথা থেকে? শুধু কি এইসব বড় বড় শব্দ? কত ছড়া, কত গল্প যে ওর মুখস্থ হয়ে গেছে!
বাইরের পরিবর্তন কিছুই হয়নি রাঙাবউদিরও। আজও ঠিক সেই প্রথম দিনের রাঙাবউদি। তবে সেদিনের গম্ভীর রাঙাবউদি আজ প্রাণোচ্ছল হাসি-খুশী।
কিন্তু এই দুই বছরে রুনুর পরিবর্তনটা হয়েছে চোখে পড়ার মতো। প্রথম বছরে বিশেষ নজরে না পরলেও আই. এসসি-র শেষ পরীক্ষা দিয়ে বাড়ি যাবার জন্য যখন প্রস্তুত হচ্ছে রুনু, তখন কথাটা রাঙাবউদিই প্রথম বললেন।
—এবার বাড়ি গেলে দেখবি, তোর মা-বাবা তোকে চিনতেই পারবেন না।
—কেন?
—তুই যে একটা লম্বা-চওড়া পুরুষ হয়ে গেছিস! শ্রীমানের গোঁফের রেখাও এখন আর রেখা নেই, এখন প্রায় একটা গোঁফেশ্বর হয়ে গেছিস। এবার বিজয়ায় ওই কম্মটি না করলে...
বাক্য অসম্পূর্ণ রেখে মিটি মিটি হাসেন রাঙাবউদি।
মনে পড়ল ঘটনাটা রুনুর। লজ্জা পেয়ে গোঁফ ঢাকা দিল। অভিমানী গলায় বলল, আপনার জন্যেই তো! নাহলে কলেজে তো গোঁফ না কামিয়েই...
'এ বারের বিজয়া' বলে যে ঘটনাটা ইঙ্গিত করলেন রাঙাবউদি, সে বিজয়া দুর্গাপূজার পরের বিজয়ার ব্যাপার নয়, সে বিজয়া শরৎচন্দ্রের নাটক 'বিজয়া'।
সে 'বিজয়া'-র সঙ্গে রুনুর গোঁফের সম্পর্ক কী? ঘটনাটা তাহলে বলতে হয়।
অ্যানুয়াল সোশ্যাল আর 'ব্রজ হইতে বিদায়'—এই দুটিই বি.এম.কলেজের শ্রেষ্ঠ উৎসব। অ্যানুয়াল সোশ্যাল হয় পূজার ছুটির আগে। দুইদিনব্যাপী উৎসব। প্রথম দিন থাকে কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের গান, বাজনা, আবৃতি, স্বরচিত রচনা পাঠ এবং কিছু হাস্যকৌতুক ইত্যাদি। দ্বিতীয় দিনে হয় ছাত্রদের পরিচালনায় একটি পূর্ণাঙ্গ নাটক। কোনও কোনও বৎসর আবার আর্টস শাখার একটি ও সায়ান্স শাখার একটি নাটকও থাকে পরপর।
'ব্রজ হইতে বিদায়' মানে হল ব্রজমোহন কলেজ থেকে বিদায়। এ অনুষ্ঠানটি হয় বি.এ. পরীক্ষা শেষ হবার পরপরই। এ অনুষ্ঠানে বিদায়ী ছাত্রদের প্রতি প্রীতিশুভেচ্ছা জ্ঞাপনটাই মূল লক্ষ্য। তবে ছাত্রদের কবিতা, প্রবন্ধ, বক্তৃতা এবং প্রফেসরদের গুরু-গম্ভীর ভাষণে অনুষ্ঠানটি স্মরণীয় হয়ে থাকে দীর্ঘদিন।
আই. এস-সি দ্বিতীয় বর্ষে পাঠকালে কলেজে রুনুর পরিচয়-ক্ষেত্র অনেক ব্যক্ত হয়ে গেছে। বিজ্ঞানের ছাত্র হলেও কলা বিভাগের একটি বিশেষ অনুষ্ঠান আছে—প্রতি শনিবারের সাহিত্য-বাসর। এ বৈঠকটি পরিচালনা করেন বাংলার সিনিয়র প্রফেসর ব্রজেশ্বর চক্রবর্তী। এ বৈঠক বিজ্ঞান, কলা উভয় শাখাই সাহিত্য-অনুরাগী ছাত্রছাত্রীদের মিলন-কেন্দ্র। রুনু ছাড়াও বিজ্ঞান শাখার আরো কয়েকটি ছাত্র নিয়মিত আসে এ বৈঠকে। এখানে স্বরচিত গল্প-কবিতা বেশ কয়েকবার পাঠ করেছে রুনু। ওর কয়েকটি লেখা খুব প্রশংসিত হয়েছে। একটা ব্যাপারে বৈঠকের সকলেই একমত—রুনুর পাঠটি সুন্দর। পাঠের মাধ্যমেই ওর অভিনয়-দক্ষতার আভাস পাওয়া গেছে। তাই এবারের অ্যানুয়াল সোশ্যালে যে নাটকটি হবে, তাতে তীব্র প্রতিযোগিতার মাধ্যমেই রুনু পেয়ে গেল একেবারে নাম-ভূমিকাটা, অর্থাৎ বিজয়ার ভূমিকা। এবারের নাটক শরৎচন্দ্রে 'বিজয়া'। কলা, বিজ্ঞান উভয় শাখার মিলিত প্রয়াস হবে এটি।
সেকালে যাত্রা-থিয়েটারে মেয়েদের পার্ট ছেলেরাই করত। বি.এম. কলেজে কলা বিভাগের চার ক্লাসে সর্বসাকুল্যে তখন বিশ-বাইশটি ছাত্রী। তাদের কেউ কেউ অ্যানুয়াল সোশ্যালে একক গান এবং বাজনা-টাজনা পরিবেশন করে থাকে বটে, কিন্তু ছেলেদের সঙ্গে একত্রে নাটকে অংশগ্রহণের সাহস সেকালে কোনও মেয়েরই ছিল না।
রুনুদের গ্রামের মালোপাড়ার থিয়েটার ক্লাবে পাঠশালা-জীবনে অংশগ্রহণের সুযোগ রুনু না পেলেও অষ্টম ও নবম শ্রেণীতে পড়বার সময় দুবার স্টেজে নেমেছিল ও। একবার 'হরিশচন্দ্র' পালায় রোহিতাশ্ব ও পরের বার 'শক্তির মন্ত্র' নাটকে নায়িকা সুনন্দার ভূমিকায়। সেই অভিজ্ঞতা ওকে বিজয়ার ভূমিকা লাভ করতে অবশ্যই সাহায্য করেছে।
সেবার বি.এম. কলেজে 'বিজয়া' সত্যিই সারা শহরে যেন একটা সাড়া জাগাল। পুরুষ চরিত্রে দয়াল এবং স্ত্রী চরিত্রে বিজয়া শ্রেষ্ঠ অভিনেতা ও অভিনেত্রীর পুরস্কার পেল। রাতারাতি রঞ্জিত একটা বিখ্যাত ছেলে হযে গেল। এ ফাংশানে উপস্থিত ছিলেন বরিশালের সকল গণ্যমান্য ব্যক্তি, ছিল খগেনদা- সহ রায় পরিবারের অনেকেই। যাননি কেবল রাঙাবউদি, ঠাকুমা আর পিসিমা।
ওদিকে রায়মশাইদের নরোত্তমপুরের বাড়িতেও প্রতি বছর পূজার সময় একটা নাটক মঞ্চস্থ করে ওখানকার উৎসাহী যুবকেরা। তাদের অনেকেই বিদেশে কেউ চাকরি করে, কেউ পড়াশুনো করে। যে যেখানেই থাকুক, পূজার সময় তারা সকলেই দেশে আসে।
নরোত্তমপুর নাট্য ক্লাবে প্রেসিডেন্ট হলেন জমিদার অনিন্দ্যনারায়ণ রায়, অর্থাৎ বড় রায়কর্তা। জমিদারবাড়ির পূজামণ্ডপ ও নাট্যমন্দির-সংলগ্ন পাকা স্টেজ এবং সিন-সিনারি ইত্যাদি তিনিই করিয়েছেন। যৌবনে তিনিও ছিলেন দক্ষ অভিনেতা। তবে তিনদিক ঘেরা স্টেজের চেয়ে চারদিকে খোলা যাত্রার আসরেই নাকি তাঁর পার্ট জমত ভালো। এখন অভিনয় না করলেও মনপ্রাণে নাট্যোৎসাহী তিনি।
এই ক্লাবের সেক্রেটারি এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট দুজনেরই কর্মস্থল কলকাতা। তাছাড়া ক্লাবের অধিকাংশ সভ্যই থাকে কলকাতায়। নাটক নির্বাচন করে তারাই। কলকাতাতেই রিহার্সাল চলতে থাকে। তারপর ছুটিতে বাড়ি এসে স্থানীয় কয়েকজনকে নিয়ে পুরোদমে স্টেজ রিহার্সাল চলে সপ্তাহখানেক।
কেবল নরোত্তমপুর নয়, আশপাশের ঘাভা, বানরীপাড়া, চাখার প্রভৃতি জমিদার-প্রধান সমৃদ্ধ গ্রামগুলি সারা বছর খাঁ-খাঁ করলেও পূজার মাসখানেক আগে থেকেই নানাদিক থেকে মানুষ আসতে শুরু করে। পূজার সময় তো একেবারে লোকে-লোকারণ্য! প্রায় একটা শহরের চেহারা নেয় গ্রামগুলি! ৺বিজয়ার পর থেকেই আবার খালি হতে শুরু করে। কালীপূজার পরে আবার সেই খাঁ-খাঁ।
এবার পুজোর ছুটির কয়েকদিন আগে খগেনদা একটা চিঠি পেলেন কলকাতা থেকে। লিখেছেন নরোত্তমপুর ক্লাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট, অর্থাৎ বড়দা।
বড়দা লিখেছেন, তিনি খবর পেয়েছেন কলেজের ফাংশানে রুনু নাকি বিজয়ার পার্ট খুব ভালো করেছে। এবার ওদের ক্লাবও নির্বাচন করেছে 'বিজয়া' নাটক। তিনি ওখান থেকেই খগেনদাকে হুকুম করেছেন, এবার পূজার ছুটিতে রুনুকে নিয়ে নরোত্তমপুর যেতে। ওঁদের সঙ্গেও রুনুকে 'বিজয়া' করতে হবে। সে যেন প্রস্তুত থাকে।
চিঠি পড়েই খগেনদা ছুটে এল রুনুর পড়ার ঘরে—রঞ্জিত, তুমি যে বিজয়া কইর্যা বিখ্যাত হইয়া গেছ। কইলকাতা পর্যন্ত তোমার নাম ছড়াইছে। পইড়া দেখো বড়দার এই চিঠি।
—চিঠিখানা পড়ে রুনু সত্যই খুব উল্লসিত হয়ে উঠল। ওর প্রথম প্রশ্নই হল—আচ্ছা, কলকাতায় বসে বড়দা এ খবর জানলেন কী করে?
—দিচ্ছে কেউ না কেউ খবরডা। সেদিন তো ফাংশানে হাজার হাজার লোক হইছিল। তাদের কেউ নিশ্চয় খবর দিছে বড়দারে।
ওই চিঠি নিয়ে সারাবাড়ি তোলপাড় করে তুলল খগেনদা। এই নাটকে যেহেতু রুনুর অভিনয় দেখা যাবে, তাই স্থির হল এবার ঠাকুমা শুদ্ধ রায়বাড়ির সকলেই যাবে পূজার তিনদিন আগেই। কেবল দুজন দারোয়ান থাকবে বাড়ি পাহারার জন্য।
কথায় কথায় রুনু শুনল, বড়দাও নাকি ভালো অভিনেতা। আর ক্লাবের সেক্রেটারি তিনু রায় তো খ্যাতনামা অভিনেতা তথা নাট্য-পরিচালক। কলকাতায়ও নাকি তাঁর একটা নাট্যদল আছে। মাঝে মাঝে এক-একটা রঙ্গমঞ্চ ভাড়া নিয়ে সে দলের অভিনয় হয়। কলকাতার প্রায় সবকটি নাট্যসংস্থার সঙ্গেই তিনু রায়ের যোগাযোগ আছে। তিনু রায়কে এক ডাকে চেনে সবাই। তিনুদা নরোত্তমপুরের গর্ব। খগেনদার মুখে তিনুদার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা শুনতে শুনতে তাঁকে না দেখেই মনে মনে দেবতার আসনে বসিয়ে নিল রুনু।
গতবার বড়দা এসেছিলেন পূজার প্রায় মাসখানেক আগে। কাউনিয়ার বাড়িতে মাত্র একদিন থেকে নিজের বউ-ছেলে-মেয়েদের নিয়ে চলে যান নরোত্তমপুরে। সেই প্রথম তিনি মেয়ে-জামাই নিয়ে দেশে গেলেন। কিছুদিন আগেই তাঁর মেয়ে মাধুরীর বিয়ে হয়ে গেছে।
বড়দার জামাইয়ের কর্মস্থল কলকাতা। আসবার সময় জামাইকে সঙ্গে নিয়েই এসেছিলেন বড়দা। বিয়ের পর দ্বিরাগমন সেরে মাধুরী এত দিন রায়বাড়িতেই ছিল। এই প্রথম স্বামীর সঙ্গে দেশের বাড়ি যাচ্ছে এবং সেখান থেকে চলে যাবে কলকাতার বাসাবাড়িতে।
বড়দা সেবার মেয়ে-জামাই নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। রুনুর সঙ্গে বিশেষ আলাপ হয়নি তাঁর। তাঁর চিঠিটা পড়েই বোঝা যায়, রুনুর নামটাও তিনি ভুলে গেছেন। রুনুকে বোঝাতে গিয়ে তিনি লিখেছেনঃ 'যে ফুটফুটে ছেলেটা আমাদের বাড়িতে থেকে আই.এস-সি পড়ছে।' রুনু শুনেছে, ওদেশে বড় রায়কর্তার পরেই বড়দার সম্মান। চাকরি পাবার আগে পর্যন্ত তো তিনি দেশেই ছিলেন। ওখানেই পড়াশুনো করেছেন। বড় রায়কর্তার মৃত্যুর পরে বড়দাই হবেন জমিদারবাবু! প্রজারা তা জানে এবং তদনুযায়ী সম্মান দিয়ে ওঁকে ডাকে ছোট রায়কর্তা বলে। সেই ভাবী জমিদার বড়দার কাছে এতখানি মর্যাদা পেয়ে রুনু যেন কৃতার্থ হয়ে গেল।
জমিদারের মতোই চেহারা বড়দার। যেমন ফরসা, তেমনি লম্বা-চওড়া মস্ত জোয়ান। মেজাজটাও জমিদারী। অল্পেই রেগে যান। বড়দা এলে বাড়ির সবাই ভয়ে-ভয়ে থাকে। চিঠি পড়তে পড়তে বড়দার সেই গুরু-গম্ভীর মূর্তিটাই মনে পড়ছিল রুনুর। সেবার আর সকলের মতো রুনুও তাঁকে ভয়ে-ভয়ে এড়িয়ে চলেছিল, কিন্তু এবার আর ভয় হল না। এবার যে তিনিই ওকে সাদরে নিমন্ত্রণ করেছেন।
নির্দিষ্ট দিনে সকাল সাতটায় কাউনিয়ার 'লালপুইল্যা বাড়ি' শূন্য করে রায়মশাইয়ের একখানা মোটরবোট আর একখানা আট-দাঁড়ির পানসি রওনা হল নরোত্তমপুরের পথে প্রচুর মালপত্র, বাক্স-বিছানা ইত্যাদিতে বোঝাই হয়ে। অনেক নদী-নালা খাল-বিল পেরিয়ে বেলা একটার মধ্যেই মোটরবোটখানা পৌঁছে গেল নরোত্তমপুর রায়বাড়ির 'বান্ধাঘাট'-এ। এই বোটেই আছেন ঠাকুমা, রায়মশাই, মাসিমা (রায়মশাইয়ের স্ত্রী), রাঙাবউদি, হাসি, আরো কয়েকটি ছোট-ছোট ছেলেমেয়ে-সহ দুজন রান্নার ঠাকুর। আট-দাঁড়ির পানসি তখন অনেক পেছনে। সে পানসিতে আছেন বড়দার পরিবার, পিসিমার পরিবার, জনাকয়েক দাসদাসী এবং বহুবিধ মালপত্র।
প্রথম দলটা এসে পড়তেই নরোত্তমপুরের রায়বাড়ি জমজমাট হয়ে উঠল। জমিদারবাবু ইতিমধ্যে চারদিক সাফ-সুতোর করিয়ে, পূজামণ্ডপ, নাটমন্দির ও প্রাচীর-সহ সম্পূর্ণ বাড়িটায় নতুন রং করে বাড়িটাকে সত্যিই রাজবাড়ি করে তুলেছেন। প্রতিবছরই নাকি পূজার আগে এসব করা হয়।
রাজবাড়ির সিংদরজা বলতে যে কী বোঝায়, রুনু এই প্রথম দেখছে। খালের ঘাট থেকে প্রায় বিশফুট চওড়া রাস্তা চলে গেছে 'রাজবাড়ির' দিকে। খানিকটা এসে রাস্তাটা সমকোণে বাঁক নিয়ে সরু হয়ে গেছে। সেই সরু অংশের দুধারে দুটো বিশাল পুকুর। বাঁদিকের পুকুরটার তিনদিকেই আম, কাঁঠাল, নারকেল ইত্যাদির বাগান, ডানদিকের পুকুরটার উত্তর পাড়ের এক কোণে একটি সতী-মন্দির। রায়বংশেরই কয়েক পুরুষ আগের এক জমিদার-পত্নী নাকি সতী হয়েছিলেন, অর্থাৎ পতির সঙ্গে সহমরণ বরণ করেছিলেন। তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যেই ওই সতী-মন্দির। দুটো পুকুরেরই রাস্তা-সংলগ্ন পাড়ে বাঁধানো ঘাটলা। ডানদিকের পুকুরটায় আরো কয়েকটা বাঁধা ঘাট আছে। পুকুর শেষ হতেই সামনে পড়ে মস্ত খেলার মাঠ। এই মাঠ শেষ হতেই মাঠের এক প্রান্ত জুড়ো পূজামণ্ডপ, নাটমন্দির, অতিথিশালা, পাকা স্টেজ, ইত্যাদি। নাটমন্দিরের ভিতর দিয়েই সরাসরি প্রবেশ করা যায় 'রাজবাড়ি'-তে। কোনও অশ্বারোহী অথবা হস্ত্যারোহী এলে তাকে পূজামণ্ডপ, নাটমন্দির প্রদক্ষিণ করে আসতে হয়। নাটমন্দির থেকে নামলে সামনে পড়ে 'রাজবাড়ি'-র সিংহদুয়ার। সে দুয়ার প্রায় দশ হাত চওড়া। দরজার দুধারে প্রায় তিনতলা সমান উঁচু দুটি সূক্ষ্মকারুকার্য করা বিশাল স্তম্ভ। দুই স্তম্ভের মাথায় দুটি প্রকাণ্ড সিংহ মুখোমুখি হয়ে পরস্পরকে আক্রমণোদ্যত। স্তম্ভের পাদদেশে দুধারে দুটি সশস্ত্র সৈনিক উন্মুক্ত তরবারি হস্তে অপলক তাকিয়ে আছে সামনের দিকে। যদিও সবই কংক্রিটের তৈরি, তবু সদ্য রঙ করানোতে দেখাচ্ছে যেন জীবন্ত।
গোটা রায়বাড়িটা প্রায় দশফুট উঁচু প্রাচীরে ঘেরা।
স্তব্ধ বিস্ময়ে রুনু দেখতে থাকে রায়বাড়ির বিশালতা। প্রথম বিস্ময়ের ঘোর কাটতে রুনু আবিষ্কার করল, এত রং-চং করেও রায়বাড়ির প্রাচীনতা ঢাকা যায়নি। বিশাল লোহার গেটটার জীর্ণদশা রঙে ঢাকা পড়েনি, প্রাচীরের এখানে-সেখানে ফাটল ধরেছে, নোনা ধরেছে, সশস্ত্র সৈনিকদুটির সাজ-পোশাক ক্ষত-বিক্ষত, সিংহদুটিও কালের দংশনে খানিকটা বিকলাঙ্গ হয়ে পড়েছে।
সিংদরজার লোহার পাল্লাদুটির একটিই মাত্র খোলা রয়েছে। অবশ্য সেই পথেই একটা হাতি ভেতরে ঢুকে যেতে পারে অনায়াসে।
সিংদরজা পেরিয়ে একটি ফুলের বাগান। বাগানটি যে খুব সযত্নে লালিত, তা কিন্তু মনে হল না। বাগানের মাঝখান দিয়েই মূল বাড়িতে প্রবেশ করতে হয় মাঝের প্রায় পাঁচ-ছ হাত চওড়া রাস্তা দিয়ে।
রায়বাড়ির পোঁতাটা প্রায় ছয়-সাত ফুট উঁচু দশ ধাপ সিঁড়ি ভেঙে উঠতে হয়। সামনেই পড়ে প্রায় দশ ফুট চওড়া লম্বা বারান্দা। এইটিই জমিদারি সেরেস্তা। সারি সারি আলমারি-ভরতি মোটা মোটা লাল খেরোয় বাঁধানো খাতা দেখা যাচ্ছে। সেরেস্তা এখন বন্ধ। কয়েকখানা ডেস্ক এককোণে জড়ো করা। বোঝা যাচ্ছে ওগুলি সামনে রেখে সেরেস্তার কর্মচারীরা কাজে বসেন। বিশাল খাটের উপর অন্তত দশ ফুট বাই চল্লিশ ফুট একটানা ফরাশ খাতা। জনাপঞ্চাশ লোক হেসে-খেলে শুতে পারে ওই ফরাশের ওপর।
সেরেস্তার বাঁ-প্রান্তে একটি কক্ষ। মূল্যবান পর্দা ঝুলছে সেই কক্ষের দরজায়। ওটি নাকি জমিদারবাবুর খাসকামরা। বিনা অনুমতিতে সে কামরায় কারো প্রবেশাধিকার নেই।
ডানদিকের পেছনের দেয়ালে একটি দরজা খোলা রয়েছে। পর্দাটা গুটোনো। ওই দরজা দিয়েই প্রবেশ করতে হয় অন্দরে। বাড়ির অন্দরেও মস্ত চতুষ্কোণ প্রাঙ্গণ। প্রাঙ্গণের পূর্ব দিকে বেষ্টনী প্রাচীর, উত্তরে ফলের বাগান আর পশ্চিম দিকটায় রন্ধনশালা। ফলের বাগানের আগে অবশ্য রয়েছে লম্বা একটি টিনের চালার ঘর। তার অনেকগুলি ছোট ছোট কক্ষ। ওটার ঠাকুর-চাকরদের থাকবার ঘর। বাড়ির ঝি-দের থাকবার জন্যও রন্ধনশালার গা ঘেঁষে রয়েছে অনুরূপ কয়েকটি কক্ষ।
অন্দর থেকে মেয়েরা যাতে সরাসরি স্টেজে অথবা পূজামণ্ডপে আসতে পারে, সেজন্য প্রাচীরের সেটজসংলগ্ন অংশে ও মণ্ডপ-সংলগ্ন অংশে দুটি ছোট দরজা আছে। মেয়েরা তো আর সেরেস্তাঘরের ভিতর দিয়ে আসতে পারে না। এখন অবশ্য পূজার ছুটি চলছে বলে সেরেস্তার কাজ বন্ধ। এখন ও-পথে মেয়েদের আসতে বাধা নেই।
এ-ই হল নরোত্তমপুরের বড় রায়কর্ত্তার জমিদারবাড়ি।
কাউনিয়া থেকে রায়মশাই যে আজ সপরিবারে আসছেন, সে সংবাদ পূর্বেই দেওয়া হয়েছিল বড় রায়কর্তাকে। রান্নাবান্না করিয়ে প্রস্তুত হয়েই ছিলেন তিনি।
বড় রায়গিন্নি গত বছর দেহরক্ষা করেছেন। রায়কর্তা এ-বাড়িতে বস্তুত একাই থাকেন। অবশ্য কিছু দূরসম্পর্কের আত্মীয়ও থাকে তাঁকে আশ্রয় করে। আর থাকে জনা আট-দশ ঝি-চাকর।
রুনু এই প্রথম দেখছে বড় রায়কর্তাকে। তাঁর যৌবনে ফটো অবশ্য দেখেছে কয়েকটি বিভিন্ন পোজের, কিন্তু চোখের সামনে যাঁকে দেখছে তাঁর সঙ্গে সেসব ফটোর মিল খুঁজে পাওয়া দায়। এখন চুল প্রায় সব সাদা, গোঁফ আধা-পাকা। শক্ত সমর্থ সুঠাম চেহারা। চোখদুটি যেমন বিশাল, তেমনি উজ্জ্বল। সে চোখের দিকে তাকিয়ে শ্রদ্ধায় নয়, ভয়েই সেদিন মাথা নত করল রুনু।
প্রথমে বড় রায়কর্তা প্রণাম করলেন ঠাকুমাকে। ঠাকুমা তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে পিসিমার কাঁধে ভর রেখে এবং অন্দর থেকে আগত একজন দাসীর সাহায্য নিয়ে অন্দরে চলে গেলেন। তারপর শুরু হল বড় রায়কর্তাকে প্রণামের পালা। রায়মশাই থেকে শুরু করে কাউনিয়ার বাসার ঠাকুর-চাকর সকলেই প্রণাম করল তাঁকে। সকলেই তাঁর চেনা। সকলেরই নাম ধরে কুশলাদি নিলেন তিনি। একমাত্র রুনুই তাঁর অচেনা। সে প্রণাম করল সব-শেষে! এতক্ষণ সভয়ে একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল সে। এবার এগিয়ে এসে প্রণাম করতেই ওকে দেখিয়ে বড় রায়কর্তা রায়মশাইকে প্রশ্ন করেন, এডি কে?
—ওই যে ছেলেডির কথা কইছিলাম সেবার! প্রায় দুবছর হইল আছে আমার ওখানে। কলেজে পড়ে।
খুব ভালো ছেলে বাবা। আমার সঙ্গে খুব ভাব! উচ্ছ্বাসিতভাবে বলেন পাশে দাঁড়ানো রাঙাবউদি, হাসি ওর দারুণ ভক্ত।
নিজের পুত্রবধূর সঙ্গে একটা বাইরের ছেলের 'খুব ভাব' বলতে বড় রায়কর্তা কী বুঝলেন কে জানে! চোখ দুটো যেন মুহূর্তে একটু বাঁকা হয়ে উঠল তাঁর। সামলে নিয়ে রুনুকে খুব তাচ্ছিল্যের সুরে প্রশ্ন করলেন,—কোন কেলাসে পড়স তুই?
আই.এস-সি-সেকেন্ড ইয়ার।—নম্র কণ্ঠে বলে রুনু।
—বাংলা করিয়া ক, আমার ইংরাজি মাড়াও ক্যান?
কথাটা যেন একটা প্রকাণ্ড চাবুকের মতো কানে লাগল রুনুর। বাংলা করে যে কী বলা যায়, মাথায় এল না। ঠোঁট কাঁপতে থাকে তার, চোখ-মুখ লাল হয়ে ওঠে। এই সুরে রায়পরিবারের কেউ আজ পর্যন্ত ওর সঙ্গে কথা বলেনি। নিজেকে দারুণ অপমানিত মনে হল রুনুর।
শেষ পর্যন্ত মান রাখলেন মেসোমশাই (রায়মশাই)। তিনি খানিকটা রুক্ষ স্বরে বলেন, তোমার কিচ্ছু মনে থাকে না দাদা। এইমাত্র কইলাম না, ও কলেজে পড়ে? এইবার আই. এস-সি দিবে। অর আর বাংলা করবেডা কী? আমার খগেন যে আই.এস-সি পাশ করছে, এবার বি.এস-সি দিবে, হেইডা কি খেয়ালে আছে তোমার?
ও-ও-ও! বোঝলাম।—বাঁকা চোখেই ব্যঙ্গভরে বললেন জ্যাঠামশাই।
চোখে প্রায় জল এসে গেছে রুনুর। হয়তো-বা রাঙা বউদিরও। রুনু অবশ্য চোখ তুলে দেখতে পারেনি সেটা তবে অনুভব করল, রাঙাবউদি তাঁর কোমল হাতখানি ওর পিঠে রেখে মৃদু আকর্ষণ করে স্নেনভরা গলায় বললেন, চল চল ঘরে চল। জামা-কাপড় ছেড়ে চান করে খেয়ে নে। খিদেয় যে তোর মুখ শুকিয়ে গেছে। বিকেলে বাবার সঙ্গে আলাপ হবে।
রুনুর কাঁধে হাত রেখেই ওকে ভিতর মহলে নিয়ে গেলেন রাঙাবউদি।
জ্যাঠামশাই পূর্ববৎ বাঁকা চোখেই দেখলেন দৃশ্যটি।
নরোত্তমপুর রায়পরিবারের প্রথম পুরুষ জমিদার অনিন্দ্যনারায়ণ রায়ের সঙ্গে রুনুর প্রথম পরিচয়টা ওর বুকের মধ্যে যেন একটা গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করল।
দক্ষিণমুখী বিশাল নাটমন্দিরের পূর্ব প্রান্তে পূজা মণ্ডপ আর পশ্চিম প্রান্তে পাকা স্টেজ। নাটমন্দিরে প্রায় হাজার খানেক দর্শকের বসবার ব্যবস্থা আছে।
স্টেজের দুধারে দুটো হ্যাজাগ জ্বালিয়ে একদিন পরেই শুরু হয়ে গেল পুরোদমে রিহার্সাল। তখন অবশ্য স্টেজে সিন-টিন টাঙানো হয়নি। সেবে হবে অভিনয়ের আগের দিন। পূজার ক'দিন রিহার্সাল সম্ভব হবে না বলেই ষষ্ঠীর রাত পর্যন্ত প্রতিদিন ফুল রিহার্সাল হবার কথা হল।
প্রথম দিনটা অবশ্য মাত্র কয়েকটি নির্বাচিত সিনই রিহার্সাল হল। উদ্দেশ্য রুনুর সঙ্গে অন্যান্য অভিনেতার পরিচয় করানো। নায়ক নরেনের ভূমিকা যাঁর, তিনি এফ.আর.সি.এস করে পাঁচ বছর পরে সদ্য বিলেত থেকে দেশে ফিরেছেন। দেখতে একেবারে সাহেবের মতো। যেমন তাঁর সুরেলা উদাত্ত গলা, তেমনি অভিনয়-দক্ষতা। বড়দা করবেন বিলাস। বড়দার চেহারাও স্টেজ ফিটিং, গলাটি দরাজ। আর দয়াল যিনি করবেন, তিনি নাকি এই অঞ্চলের শ্রেষ্ঠ অভিনেতা। স্থানীয় একটি স্কুলের হেডমাস্টার তিনি, এম.এ.বি.টি। ক্লাবের সেক্রেটারি তিনু রায় নিয়েছেন ছোট একটি রোল। তাঁর আসল ভূমিকা পরিচালকের। ছোটখাটো রোল যাঁরা করছেন, তাঁরাও প্রায় সকলেই গ্র্যাজুয়েট। খগেনদাও পেলেন এক সিন-এ দু-নম্বর পার্টের একটি রোল—বিজয়ার বাড়ির দারোয়ান। তা দারোয়ান হিসাবে খগেনদাকে যে দারুণ মানাবে, তাতে সন্দেহ নেই। খগেনদা তাঁর জীবনে এই প্রথম স্টেজে নামতে যাচ্ছেন। তিনিও বি.এস-সি-র ছাত্র। যে ছেলেটি পরেশের রোল করবে, সে-ই কেবল ক্লাস সেভেনের ছাত্র। সে ছাড়া আর সকলেই শিক্ষায় রুনুর অনেক উঁচুতে। আভিজাত্যে, বংশ-মর্যাদায় তো বটেই। এই দলের মধ্যে নিজেকে বড় বেমানান মনে হচ্ছে রুনুর।
কলেজে সহপাঠিদের সঙ্গে অভিনয় করতে ওর সঙ্কোচ ছিল না। কিন্তু এই জমিদারি পরিবেশে এইসব অভিজাত যুবকের সঙ্গে একটা ফিমেল রোল করতে ওর ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছে। বারবার মনে হচ্ছে, এখানে নাটক করতে না এলেই ছিল ভালো।
প্রথম দিনের রিহার্সালে ও কিছুতেই ওর আড়ষ্টতা কাটিয়ে উঠতে পারল না। ওর অভিনয় পছন্দ হল না কারোই। কেবল খগেনদাই বারে বারে বললেন, দ্যাখবা, দুদিনেই ওর লজ্জা ভাঙলে দারুণ করবে। কলেজের ফাংশানে ও বিজয়া করিয়া শ্রেষ্ঠ অভিনেতার মেডেল পাইছিল।
কথাটা অবশ্য মিথ্যা নয়। কলেজের ফাংশানে দয়ালের ভূমিকা যে করেছিল সে পেয়েছিল শ্রেষ্ঠ অভিনেতার সম্মান। আর বিজয়ার ভূমিকার জন্য রুনু পেয়েছিল শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর সম্মান।
বস্তুত সেদিনে রুনুর জড়তার আসল কারণটি হচ্ছে জমিদারবাবুর ব্যবহার। সে আঘাতটা ও কিছুতেই ভূলতে পারছে না।
দ্বিতীয় দিন রিহার্সাল শুরু হবার খানিক পরেই দেখা গেল, স্বয়ং জমিদারবাবু এসেছেন ওদের রিহার্সাল দেখতে বাড়ির মেয়েদের সঙ্গে নিয়ে। আশপাশের বাড়ির কিছু বাচ্চা-কাচ্চা ও বয়স্ক মানুষ তো সন্ধ্যা থেকেই জড়ো হয়েছেন। দেখা গেল, রাঙাবউদিও এসেছেন ওঁদের সঙ্গে হাসিকে কোলে নিয়ে। সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজন ভৃত্য ছোটাছুটি করে বিশ-পঁচিশখানা চেয়ার সাজিয়ে দিল। একজন নিয়ে এল গড়গড়া সাজিয়ে। স্টেজের সামনেই অর্ধচন্দ্রকারে ওঁরা সকলে বসলেন।
জমিদারবাবুকে দেখেই রুনু একেবারে পাথর হয়ে গেল। ওর সিন আসতেই ও জড়সড় হয়ে বলল, আমার শরীর ভালো লাগছে না। আজ আমি রিহার্সাল—
ওর কথা শেষ হতেই জমিদারবাবু উদার হাস্যে বললেন, কও কী রে পোলা? তর পার্ট দ্যাখতেই তো আইলাম রে! খগেইন্যা কইল, তুই নাকি দারুণ পার্ট করছ তগো কলেজে।
আপনাকে দেখে ও ভীষণ আড়স্ট হয়ে গেছে বাবা।—মিষ্টি হেসে বললেন রাঙাবউদি, আপনি প্রথম দিনেই ওকে যা ভয় দিয়েছেন!
মোরে দেইখ্যার ভয় পাইছ রে পোলা?—হো-হো করে হেসে পড়েন জমিদারবাবু, সে হাসিতে যাত্রাগানের অট্টহাস্যের সুর—আও, অভয় দিত্যাছি। বলে হাতের ইঙ্গিতে তিনি কাছে ডাকেন রুনুকে।
হাসির মধ্যে প্রশ্রয়ের আভাস পেলেও কাছে যাবার সাহস পায় না রুনু। ওর মনের অভিমানটা বুঝতে পেরেছেন রাঙাবউদি। তিনি উঠে এসে ওর হাত ধরে নিয়ে যেতে যেতে বলেন, বাবা কেবল ভয় দিতেই পারেন না, ভালোবাসতেও পারেন। জানো, উনিও দারুণ অভিনয় করতেন এক সময়। এই স্টেজে অনেক নাটক করেছেন উনি। এ স্টেজ তো ওঁরই সৃষ্টি। পাড়াগাঁয়ে এমন চমৎকার স্টেজ দেখেছ কোথাও? উনি বরাবর বীররসের অভিনেতা। দুর্যোধন, কংস, রাবণ—এসব রোলে ওঁর জুড়ি ছিল না।
বলতে বলতে রুনুকে প্রায় ধরে নিয়ে এলেন রাঙাবউদি জমিদারবাবুর হাতের কাছে।
জুড়ি অখনও নাই রে, অখনও নাই।—সগর্বে বলেন বড় রায়কর্তা, তবে তগো ওই পিনপিন্যা কাঁদুইনা সামাজিক নাটকের মধ্যে আমি নাই।
রুনু কাছে আসতে সস্নেহে তার পিঠে হাত রেখে কথা শেষ করেন তিনি। এইটুকু স্নেহস্পর্শেই সব অভিমান জল হয়ে যায় রুনুর।
সামনের বছরে তোমারে লইয়া আমরা 'কর্ণার্জুন' করুম জ্যেঠু। তুমি করবা তোমার ফেমাস দুর্যোধন। কোনও আপত্তি চলব না, কইয়া রাখলাম। তোমরা সব সাক্ষী রইলা।—সহাস্যে বলেন বড়দা।
আরে বাপু, সামনের বছর যা হইব, তো হইব। অখন তগো রিহার্সাল শুরু কর। দেখি তগো রঞ্জিতবাবু মাইয়ার পার্ট কেমন করে। ভালো করলে অরে দিয়া নিয়তি করামু। ভালো নিয়তি না হইলে 'কর্ণার্জুন' জমব না।
মানুষটি যে সত্যিই নাট্য রসিক, এবার বুঝতে পারছে রুনু। ওঁর বিচারে নিয়তি হবার যোগ্যতা প্রমাণের জন্যই ও এবার মনে-প্রাণে সিরিয়াস হবার শপথ গ্রহণ করল।
ওদিক থেকে নাট্য-পরিচালক তিনুদা ডাকছেন রুনুকে—এসো রঞ্জিত, শুরু করি আমরা। আজ কিন্তু লজ্জা করলে চলবে না। স্বয়ং জ্যাঠাবাবু এসেছেন আমাদের রিহার্সাল দেখতে। আমাদের কী সৌভাগ্য!
যাও পোলা, শুরু করো গিয়া।—রুনুর পিঠে আদুরে চাপড় মেরে বলেন জমিদারবাবু।
রুনু তাঁকে প্রণাম করে বলল, আপনি আশীর্বাদ করুন।
তগো আশীর্বাদ করতেই তো আইলাম!—রুনুর মাথায় হাত রেখে বলেন কর্তাবাবু।
আপনি নিজে এলেন না, আমরা ধরে আনলাম? হেসে বলে রাঙাবউদি।
এই কইলকাতার মাইয়ার লগে কথায় পারুম না। হাঃ হাঃ হাঃ!
হাসির তোড়ে রুনুর মনের মেঘটুকু কোথায় উড়ে গেল। রাঙাবউদির শেষ কথাটায় ওর মনে হল, ওর বুকের মধ্যে জমে থাকা মেঘটুকু উড়িয়ে দেবার জন্যেই এই মধুর মিলনের পরিকল্পনাটা করেছেন তিনি অনেক ভেবে-চিন্তে। কি জানি, কোন মন্ত্রবলে তিনি রুক্ষ জমিদারবাবুকে রাতারাতি এমন স্নিগ্ধ কোমল করে ফেললেন! রাঙাবউদির প্রতি অপরিসীম কৃতজ্ঞতায় ওর হৃদয় ভরে উঠল।
প্রায় তিন সপ্তাহ ছিল সেবার রুনু নরোত্তমপুরে। এ সময়ে ও লক্ষ্য করেছে, সারাবাড়ির মধ্যে একমাত্র রাঙাবউদির সঙ্গেই হেসে কথা বলেন জমিদারবাবু। ওঁর রুক্ষ বুকের মধ্যে সামান্য যেটুকু স্নেহ-মমতা আছে, তার সবটুকুই উনি উজাড় করে দিয়েছেন ওঁর ভাগ্য-বিড়ম্বিতা এই পুত্রবধুটিকে। সে স্নেহের প্রসাদ পায় হাসিও মাঝে মাঝে।
পুজোর ক'টা দিন কেটে গেল রায়বাড়ির ছেলেমেয়ে দলের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে, গাভা, নরোত্তমপুর আর বানরীপাড়া—এই তিনটি পরস্পর সংলগ্ন গ্রামের অসংখ্য পুজো দেখে। তিনটিই সমৃদ্ধ গ্রাম। জমিদারদের মধ্যে রেষারেষি আছে। কার প্রতিমা কত বড়, কোন মণ্ডপে ক'টা ঢাক বাজে, কোন জমিদার কত কাঙালি ভোজন করায়—এইসব নিয়েই পুজোর ক'দিন উত্তপ্ত আলোচনা পথে-ঘাটে-হাটে বাজারে।
নির্দিষ্ট দিনে সকাল থেকেই শুরু হয়ে গেল স্টেজে সিন, উইংস ইত্যাদি টাঙানো। আট-দশটা ডে লাইট রেডি করা, নাটমন্দিরে মেয়ে-পুরুষের আলাদা ব্যবস্থা করা ইত্যাদি জরুরি কাজে দলের সকলেই কর্মব্যস্ত।
এদিকে অন্দরমহলে বিজয়ার সাজ-পোশাক, গয়নাপাতির ব্যাপার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন রাঙাবউদি। এ-বাড়িতে উনিই একমাত্র কলকাতার মেয়ে। একমাত্র উনিই দেখেছেন কলকাতার বিভিন্ন রঙ্গমঞ্চে অনেক নাটক। সুতরাং মেয়েদের সাজ-সজ্জার ব্যাপারে উনিই বিশেষজ্ঞ। বড়দা তাঁর উপরেই রুনুকে সাজাবার এবং বিভিন্ন সিনে ওর সাজ বদলের দায়িত্ব দিয়েছেন। এই উদ্দেশ্যে রাঙাবউদি পর পর তিন দিন ওদের রিহার্সালও দেখেছেন।
পাঁচবার শাড়ি বদলের জন্য পাঁচখানা শাড়ি নির্বাচন করতে প্রায় শখানেক শাড়ি ঘাঁটা হয়ে গেছে। প্রতিটি শাড়ির উপর পিন দিয়ে স্লিপ লাগিয়ে দিয়েছেন রাঙা বউদি কোন অঙ্কের কোন দৃশ্যে কোনটি পড়তে হবে খেয়াল রাখার জন্যে।
এবার গয়না।
নরোত্তমপুনরের জমিদার বড় রায়কর্তার একমাত্র পুত্রবধূ হিসেবে রাঙাবউদির নিজেরই আছে প্রচুর গয়নার একটা বাক্স। তার ওপর জ্যেঠিমার মৃত্যুর পর তাঁর শেষ ইচ্ছানুযায়ী তাঁর সমস্ত অলঙ্কারসামগ্রীর বিরাট বাক্সটিও পেয়েছেন রাঙাবউদি।
দুটো বাক্সই খুলে রাঙাবউদি বিছানার উপর ঢাললেন সব গায়না। ব্যাপার দেখে রুনু একেবারে স্তম্ভিত। হীরা, মণি, মুক্তা সেট-করা জড়োয়ার হারই তো পাঁচগাছা! তাছাড়া কত যে চুড়ি, বালা, কঙ্কণ, হার, দুল, বাউটি, আরো কী সব নাম—সব ছাই মনেও নেই রুনুর। হায়, এত যাঁর অলঙ্কার তিনি সব সময় কেমন দীনবেশে থাকেন! গলায় একগাছা সরু হার, কানে সাদাসিধে একজোড়া ফুল আর দুহাতে শাঁখার সঙ্গে মাত্র একগাছি করে সরু চুড়ি।
আপনার এত গয়না! লাখ-লাখ টাকা দাম, তা-ই না?—সবিস্ময়ে প্রশ্ন করে রুনু।
—আমার কাছে এর দাম কানাকড়িও নয়। দেখ তো, এর মধ্যে কোন জড়োয়া হারগাছা তোর পছন্দ?
—আমি এসবের কী জানি? এসব আমি জীবনে দেখিইনি কোনও দিন।
জানিস, কত কাল এসব গয়না ঘুমিয়ে ছিল অন্ধকারে! আজ তোর জন্যে এরা আলোর মুখ দেখল—বলতে-বলতে গলা ভারী হয়ে আসে রাঙাবউদির।
দুচোখ ছলছল করে ওঠে রুনুরও!
রাঙাবউদি নিজেই বেছে বেছে চুড়ি, হার, দুল, বালা ইত্যাদি রুনুর হাতে, গলায়, কানে পরিয়ে দেখলেন। শেষে নিজেই ঠিক করে নিলেন কোন সিনে কী কী পরাবেন। গয়না মাত্র একবার বদল হবে। সেজন্যে দুটো আলাদা প্যাকেট করে রাখলেন। দামি অলঙ্কারের প্যাকেটটা রইল শেষ সিনে বিজয়ার বিয়ের কনের সাজের জন্যে।
রাঙাবউদির কাণ্ড দেখে বাড়ির অন্য মেয়েরা রুনুকে রীতিমতো হিংসা করা শুরু করল। এসব শাড়ি-গয়নার প্রতি তাদেরও কম লোভ নেই, কিন্তু সাহস করে তারা কোনও দিন চাইতে পারেনি।
শাড়ি-গয়না তো হল। এবার বিজয়ার লেডিজ শু অথবা শৌখিন স্যান্ডাল। ওর পায়ের মাপের সে বস্তু খুঁজে পাওয়া গেল না সারা রায়বাড়িতে। দারুণ দুর্ভাবনায় পড়লেন রাঙাবউদি। ছুটে এলেন বড়দার কাছে। সম্পর্কে ভাসুর। জীবনে বোধহয় কোনও দিন মুখ তুলে কথা কননি। কিন্তু, তো লজ্জা করলে চলবে না, এক্ষুনি যে বানরীপাড়া বাজার থেকে বিজয়ার স্যান্ডাল আনাতে হবে।
রাঙাবউদির সমস্যার কথা শুনে বড়দা হেসে বলেন, বিজয়ার জোতা লইয়া ভাবনায় পড়ছ? লাগব না, লাগব না। ওই খালি পায়েই চলব। ভালো কইরা আলতা পরাইয়া দিও। পা তো শাড়িতেই ঢাকা থাকব!
ছিঃ, তা-ই হয় নাকি? অসম্ভব। শিক্ষিত, অভিজাত ব্রাহ্ম মেয়ে বিজয়া। কলকাতায় ব্রহ্ম মেয়েদের ড্রেস দেখেছেন? খালি পায়ের ব্রাহ্ম মেয়ে তো ভাবাই যায় না! সেই রোল নিয়ে খালি পায়ে ও স্টেজে উঠবে? হাসাহাসি পড়ে যাবে প্রথম সিনেই।—দৃঢ় স্বরে বলেন রাঙাবউদি।
কোন শালায় হাসব? হাসুক তো দেখি! হ্যার মুণ্ডটা ছিরা ফালামু না?—খেপে উঠলেন বড়দা।
ওখানে সুবিধা হবে না বুঝে রাঙাবউদি আবার খানাতল্লাশ শুরু করলেন। খুঁজতে খুঁজতে পাওয়া গেল একজোড়া হরিণের চামড়ার শৌখিন স্যান্ডাল। পড়ে ছিল রাঙাবউদিরই খাটের তলায় এক কোণে। রাঙাদা পুরী থেকে কিনে দিয়েছিলেন তাঁর মাকে। সে বস্তু তাঁর পায়ে বড় হতো বলে কোনও দিন পরেননি। সেটি রুনুর পায়ে বেশ ফিট হল। দীর্ঘদিন অব্যবহার্য পড়ে থাকার চামড়াটা প্রায় হাড়ের মতো শক্ত হয়ে গেছে। সে বস্তুকে জলে ভিজিয়ে, সাবান দিয়ে, আরো কী সব প্রক্রিয়া করে অনেকটা নরম করে আনলেন রাঙাবউদি।
শেষ সমস্যা দাঁড়াল মাথার পরচুলাটা নিয়ে। সেটা একটা যাত্রার দলের সখীর মাথায় হয়তো মানাত। কিন্তু বিজয়ার মতো অভিজাত মেয়ের মাথায় এই সখী-মার্কা চুল! রাঙাবউদি প্রায় কেঁদে ফেললেন।
সব তো সামলেছিলাম রে রুনু, কিন্তু এই চুল পরলে তুই যে আর বিজয়া থাকবি না!—সখেদে বলেন রাঙাবউদি।
বিজয়াকে নিয়ে আপনি যা কাণ্ড করছেন, তাতে মনে হয়, বিজয়ার পার্ট আপনি করলেই ভালো হতো।—হেসে বলে রুনু।
—এই পাড়াগাঁ না হলে করতাম বইকি। কলকাতায় আমাদের স্কুলের ফ্যাংশানে 'কর্ণ-কুন্তী-সংবাদ'-এ আমি কুন্তী করেছি, 'সীতার বনবাস'-এ সীতা করেছি, জানিস?
—তা-ই নাকি! এত দিন বলেননি তো!
বলে আর কী লাভ ভাই, সে সব পাট তো চুকে গেছে!—দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন রাঙাবউদি। তারপর লেগে যান পরচুলার পরিচর্যায়। সেটায় তেল মাখিয়ে, ক্রিম মাখিয়ে, ক্লিপ এঁটে, ব্রাশ করে, বার-বার রুনুর মাথায় পরিয়ে কিছুতেই আর মনোমতো করে উঠতে পারলেন না। শেষে হতাশ কণ্ঠে বললেন, বিজয়া যদি বউ হতো, তো মিটে যেত। ঘোমটা দিয়ে এ উৎপাত ঢেকে দিতাম।
'বিজয়া' নাটকে বিজয়া ছাড়া আর একটি ফিমেল ক্যারেক্টার হল নলিনী—বিজয়ারই সমবয়সি একটি স্মার্ট মেয়ে। সে পার্ট করবে এই গ্রামেই ছেলে নিমাই। এবার সে বি.এ. পরীক্ষা দেবে। এখানকার বিখ্যাত ফিমেল আর্টিস্ট সে। সে-ও বড় ঘরের ছেলে। কলকাতার একটা কলেজে পড়ে। তার রোলটাও ফেলনা নয়। সে হল চঞ্চল হাসি-খুশি বুদ্ধিদীপ্ত একটি শিক্ষিত শহুরে মেয়ে। বিজয়া অভিজাত বংশের শান্ত-গম্ভীর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মেয়ে। নলিনীর রোলটা যেমন নিমাইয়ের স্বভাবানুগ হয়েছে, তেমনি বিজয়াও হয়েছে রুনুর স্বভাবানুগ।
রুনু বলেছিল, আমার ড্রেস নিয়ে তো আপনি খুব মাথা ঘামাচ্ছেন। নিমাইদার ড্রেস কে করবে?
—তার ড্রেস নিয়ে তোর ভাবতে হবে না। সে কলকাতার কলেজে পড়া পাকা ছেলে। তোমার মতো হাঁদা নয়। তার দিদিরা আছে, বউদিরা আছে। তারা দেখবি, তাকে কী দারুণ সাজিয়ে দেবে।
নিমাই লম্বায় রুনুর থেকে সামান্য একটু বেশি। গায়ের রংটা তার রুনুর অনেক ফর্সা। তবে রুনুর চেহারায় যে গ্রাম্য স্নিগ্ধ কোমলতাটা আছে, নিমাইয়ের তা নেই, কেমন যেন একটু শহুরে রুক্ষতা আছে তার চেহারায়। 'দারুণ' সাজিয়ে দিলে সেই নিমাইকে কেমন দেখাবে, কে জানে! তাকে যদি সত্যিই খুব সুন্দর দেখায়, তবে কি দর্শকেরা উপেক্ষা করবে রুনুকে? ড্রেস করলে ওকেই বা কেমন দেখাবে বুঝতে পারছে না রুনু।
ওদিকে নায়ক নরেনের পার্ট যিনি করবেন, বিনা মেকআপেই তিনি পরম সুপুরুষ। ড্রেস করলে যে তাঁকে কত সুন্দর দেখাবে, কে জানে! তাঁর পাশে রুনুকে কি খুব বেমানান দেখাবে? এইসব ভাবতে ভাবতেই রুনু সসঙ্কোচে প্রশ্ন করল, একটা কথা বলব রাঙাবউদি?
—বল।
—যিনি নরেন করবেন, তাঁর তো দারুণ সুন্দর চেহারা। ড্রেস, পেইন্ট করলে নিশ্চয়ই একেবারে দেবদূতের মতো দেখাবে। তাঁর পাশে আমাকে খুব বেমানান দেখাবে, তা-ই না? ওকে দেখতে যে আমার কী ভালো লাগে! যখন রিহার্সালের সময় আমার সঙ্গে পার্ট করেন, তখনই আমার...
তখনই কী হয়? বুক ধড়ফড় করে?—খিলখিল করে হেসে ওঠেন রাঙাবউদি।
ধুৎ?—রাঙা হয়ে ওঠে রুনু।
রাখ, ধূর্জটি ডাক্তারও যাতে তোকে দেখে থ হয়ে যায় সেই ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। এমন একখানা মেকআপ দিয়ে দেব না! ওমা, এ কী কাণ্ড! তুই বিজয়া হবি কী করে?— একেবারে সুর পালটে কপাল চাপড়ে বলেন রাঙাবউদি।
রুনু ভীষণ ঘাবড়ে গেল—কেন, কী হল?
তুই যে বিজয়ার বদলে বিজয়বাবু হয়ে গেছিস! অ্যাদ্দিন তো লক্ষ্য করিনি তো!—সকৌতুকে রুনুর মুখের দিকি চেয়ে আছেন রাঙাবউদি।
—কী বলছেন! কী হয়েছে আমার?
—বিজয়বাবুর যে বেশ চিকেন কালো গোঁফ হয়েছে। ওটি নিয়ে তো বিজয়া সাজা চলবে না।
বাঃ!—সভয়ে গোঁফ ঢেকে বলে রুনু, কী এমন গোঁফ হয়েছে! এই নিয়ে তো কলেজে ফাংশানে...
—সে ফাংশান তো আমি দেখতে যাইনি। ওখানে ধুতি-পাঞ্জাবি পরেও বিজয়ার পার্ট করা চলত। কিন্তু নরোত্তমপুরের স্টেজে গুপো বিজয়া চলবে না। এখানকার দশর্ক তো আর ক'টা কলেজের ছাত্র নয়। যাঁরা আসবেন, তাঁরা সব শহুরে মানুষ। জানিস না তো, পুজোর সময় এসব গ্রাম শহর হয়ে যায়। অন্য সময় খাঁ-খাঁ। এসব গ্রামের অধিকাংশ মানুষই দেশ-বিদেশে চাকরি-বাকরি করেন। পুজোর ছুটিতে সব দেশে আসেন। দেখবি, তাঁদের কী সাজ-গোজ! শহরের সিনেমা-থিয়েটার দেখে-দেখে ঝুনো হয়ে গেছেন তাঁরা। গুপো নায়িকা দেখলে হাততালি দেবেন না?
অতঃপর অবিলম্বে খগেনদাকে সমন পাঠালেন রাঙাবউদি এবং রুনুর গুম্ফ সংহারের হুকুম দিলেন।
খগেনদা, বছর খানেক হল, দাড়ি কামাতে শুরু করেছেন। অস্ত্রপাতি তাঁর সব রেডি আছে। রুনুর কোনও আপত্তি টিকল না রাঙাবউদির জেদের কাছে। একটানে রুনুর সদ্যেজাত কোমল গুম্ফরাজি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজেরই কেমন বিশ্রী লাগল রুনুর। নিজের প্রতিবিম্ব বলে মনেই হয় না, যেন অচেনা কেউ।
ইশ, কী বিশ্রী দেখাচ্ছে!—মুখ ভার করে বলে রুনু।
এই বিশ্রী রণজিৎবাবুকেই এমন সুশ্রী বিজয়া বানিয়ে দেব যে, তোদের নরেনবাবুর মুন্ডু ঘুরে যাবে।—হেসে বলেন রাঙাবউদি।
সন্ধ্যা হতে না হতেই মেক-আপ ম্যান এসে গ্রিনরুমে বসে গেল মেক-আপ করতে। স্টেজের ভিতরে দুদিকে দুটো এবং বিশাল প্যান্ডেলে আট-দশটা ডে-লাইট জ্বলছে। গ্রিনরুমেও জ্বলছে দুটো হ্যাজাক।
শুরু হল দর্শকদের আসা। প্রথমে তো ছোট ছোট ছেলেমেয়েরাই সামনের দিকটা ভরে ফেলল। বাঁদিকে কোণাকুণি করে দুসারি চেয়ার সাজানো আছে রায়বাড়ির বউদের ও অন্যান্য সম্ভ্রান্ত মহিলার জন্য। ডান দিকেও রয়েছে অনেকগুলি চেয়ার সম্ভ্রান্ত পুরুষদের জন্যে। একটা মস্ত গদিমোড়া চেয়ার নির্দিষ্ট রয়েছে স্বয়ং জমিদারবাবুর জন্যে। সেটাকে চেয়ার না বলে সিংহাসনই বলা উচিত। তার সামনে পা রাখার পাদানি এবং গড়গড়া রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। মাঝখানটায় বিরাট বিরাট শতরঞ্চি পাতা হয়েছে একেবারে পূজামণ্ডপ পর্যন্ত।
ওদিকে রাঙাবউদিও তাঁর ঘরের দোর বন্ধ করে বসে গেছেন রুনুকে সাজাতে। এ সময়ে উনি কাউকে আসতে দেবেন না ঘরে। একেবারে ফিনিশ হয়ে গেলে রুনুকে উনি নিয়ে যাবেন স্টেজে পিছনের দরজা দিয়ে। এইরকমই কথা হয়েছে বড়দার সঙ্গে।
ভিতরে সাজ করতে করতে রুনু শুনতে পাচ্ছে বাইরের কোলাহল। প্রচুর দর্শক এসে গেছে নিশ্চয়ই। রুনু শুনতে পেল, পর পর দুবার কনসার্ট হয়ে গেল। তৃতীয় বার কনসার্ট শেষ হতেই বই শুরু হবে। এ কনসার্ট পার্টিও নামকরা। মিউজিক যাতে পরিবেশানুগ হয় তার জন্য এদের সঙ্গেও দুবার ফুল রিহার্সাল হয়ে গেছে।
তৃতীয় বার কনসার্ট শুরু হতেই রাঙাবউদির মেকআপ শেষ হল। এবার রুনুকে ঘরের ড্রেসিং টেবলের বড় আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে তিনি বললেন, দেখ তো কেমন হল।
বড় আয়নার নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে রুনু তো থ! তার বিস্ময়ের ঘোর কিছুতেই কাটে না। এ কাকে দেখছে সে আয়নায়! এ যে একেবারে রাঙাবউদি স্বয়ং! এবার রুনুর মুখের পাশে মুখ রেখে দাঁড়ালেন রাঙাবউদি। দুখানা মুখের ছবির ফুটে উঠল আয়নায়। এই দুখানা মুখ দেখে কে না বলবে যে, এরা দুটি আপন বোন? রাঙাবউদির আয়নার মুখ মিটিমিটি হাসছে। একসময় সেই হাসি ভরা মুখ বলে উঠল, কী রে, নিজেকে চিনতে পারছিস না?
—সত্যি চিনতে পারছি না। এ যে আপনার মুখ!
আমার নয়, আমার বোনের মুখ।—রুনুর গাল টিপে দিয়ে বলেন রাঙাবউদি, দেখলি তো, ওই গোঁফখানা তোকে আর আমাকে আলাদা করে রেখেছিল। আসলে তোর আর আমার মুখের গড়ন ঠিক একরকম। এটা আমি সেই প্রথম থেকেই লক্ষ্য করেছি। এবার প্রমাণ করে দিলাম।
নিজেকে দেখে রুনুর যে বিস্ময় জেগেছিল, রাঙাবউদি ওকে গ্রিনরুমে পৌঁছে দিতেই ওকে দেখে গ্রিনরুমে যারা ছিল, তাদেরও চোখে-মুখে দেখা গেল বিস্ময়।
বড়দা তো উচ্ছ্বাসভরে চিৎকারই করে উঠলেন—ওমা-মা! করছে কী রাঙাবউদি! এক্কারে যে নিজের মুখখানই বসাইয়া দিছ অর ধড়ের উপর! আর মুখখান কললা কী?
সেখানা আমার ঘরে লুকিয়ে রেখেছি।—হেসে বলেন রাঙাবউদি, নাটক শেষ হলে ফেরত পাবে।
নরেনবেশী ধূর্জটি ডাক্তারও সকৌতুকে দেখছেন রুনুর মেক-আপ। রুনুকে তাঁর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে বড়দা বলেন, কও ভাইগ্ন্যা, কেমন দ্যাখতে আছ তোমার বিজয়ারে? পছন্দ হয়?
মার্ভেলাস! রাঙামামিমা যে একটা মিরাকল করে ফেলেছেন দেখছি! দিন দিন, পায়ের ধুলো দিন।—স্মিত মুখে বলেন ধূর্জটি ডাক্তার।
হইব না? কইলকাতার মাইয়া।—সোচ্ছ্বাসে বলেন বড়দা।
এই বিজয়ার পাশে মেক-আপ ম্যানের সাজানো নলিনীকে যেন বড় নিষ্প্রভ লাগছে। মেক-আপ ম্যানকে ডেকে ধূর্জটি ডাক্তার বলেন, দেখুন তপেশদা মেক-আপ কাকে বলে। রাঙামামীমার কাছে আপনার এখনও লেসন নিতে হবে পাক্কা দশটি বছর।
আমি রাজি আছি।—হেসে বলেন তপেশবাবু, উনি রাজি আছেন তো? সত্যি বলছি, এ জিনিস আমাদের হাতে হবে না। একেবারে ন্যাচারাল নারীমূর্তি!
কেবল নারীমূর্তি নয়, বলুন মহীয়সী নারীমূর্তি।—কথায় পিঠে কথা জুড়ে দেন বিলাত-ফেরত ধূর্জটি ডাক্তার।
আপনার পছন্দ হয়েছে?—মিষ্টি হেসে বলেন রাঙাবউদি।
—পছন্দ হবে না? আমি তো সত্যিই ভেবেছিলাম আপনার আপন বোন। দারুণ পছন্দ হয়েছে।
—বোন না হলেও ভাই তো বটে। রুনুকে আমি আমার আপন ভাই-ই মনে করি।
কথাটা শুনে রুনুর চোখদুটো ছলছল করে ওঠে গভীর শ্রদ্ধায় ও মমতায়। সঙ্গে সঙ্গে সে মাথা নত করে প্রণাম করে রাঙাবউদিকে, বড়দাকে এবং ধূর্জটিবাবুকেও।
রাঙাবউদি ওর মাথায় হাত রেখে বলেন, ভালো করে পার্ট করা চাই। আমার সারা দিনের পরিশ্রম যেন মাটি না হয়। তাহলে কিন্তু কপালে দুঃখ আছে।
বিজয়া নাটক সেদিন সত্যিই ভালোভাবে উতরেছিল। রুনু সত্যিই সেদিন আপন সত্ত্বা হারিয়ে মনে-প্রাণেই বিজয়া হয়ে গেছিল।
আর সকলে তো প্রশংসা করলই, স্বয়ং জমিদারবাবু পর্যন্ত নাটক শেষ হতে গ্রিনরুমে এসে বিজয়-বেশী রুনুর পিঠে হাত রেখে সস্নেহে বললেন, তুই যে এক্কারে বাজিমাত করছ রে পোলা! কে কইব যে, এইডা পুরুষ পোলা? আমি তো তিন-চাইর সিন পর্যন্ত ধরতেই পারি নাই। ভালো ভালো, খুব ভালো করছ তুই।
এই সাফল্যের পশ্চাতে রাঙাবউদির প্রেরণার অবদান কি রুনু ভুলতে পারবে কোনও দিন?
এ-ই হল রুনুর গোঁফ-সংহার কাহিনী।
সেই পুজোর পর কেটে গেছে বেশ কয়েক মাস। তখন অবশ্য সত্যিই 'চিকন কালো' গোঁফ ছিল না ওর। কিন্তু সেই কামাবার পর থেকে ওটা দ্রুত বাড়তে শুরু করল যে, মাসে অন্তত বার দুই কামাতেই হচ্ছিল। মাস তিনেক পরে বিরক্ত হয়ে ও গোঁফকে স্বাধীনতা দান করে। ফলে তিনি বাড়তে বাড়তে এমন চেহারা নিয়েছেন যে, এখন ওকে 'গোঁফেশ্বর' বলা যায় বইকি!
নরোত্তমপুর ভ্রমণের অভিজ্ঞতা এবং 'বিজয়া' নাটক করতে গিয়ে একদল উচ্চশিক্ষিত মানুষের সঙ্গে পরিচয়ের প্রতিক্রিয়া রুনুকে পড়াশুনো করার নতুন উদ্দীপনা দিল। বিশেষ করে বানরীপাড়া গ্রামের ঘরে ঘরে গ্র্যাজুয়েট এবং অধিকাংশ পরিবারে এক বা একাধিক মহিলা গ্র্যাজুয়েট দেখে এসে গ্র্যাজুয়েট হবার একটা প্রবল আকাঙ্ক্ষা ওকে পেয়ে বসল।
আই. এস-সি-তে ভালো রেজাল্ট করতে পারলে এই কলেজেই হয়তো ফ্রিশিপ পাওয়া যাবে। ফ্রিশিপ না পেলে তো ওর পড়াই হবে না। গতবার বাবা সে কথা পরিষ্কার বলে দিয়েছেন। তিনি ভারী গলায় বলেছিলেন, আমার যেটুকু সামর্থ্য ছিল, তা শেষ হয়ে গেছে বাবা। কোনওক্রমে টেনে-টুনে পরীক্ষার ফিসটা দিতি পারব! তারপর বি.এ, এম.এ.. পাশ করতি হবে তোমার নিজির চেষ্টায়। সংকল্পে অটল থাকবা। তা হলেই সিদ্ধি অনিবার্য।
সেই সংকল্পটাকে আবার শক্ত করে আঁকড়ে ধরে পরীক্ষার প্রস্তুতি চালিয়েছে রুনু।
পরীক্ষা মোটামুটি ভালোই দিল রুনু। পরীক্ষা সমাপ্ত হতেই যেন একখানা ভারী পাথর নেমে গেল ওর বুকের উপর থেকে। এবার ও মুক্তপক্ষ বিহঙ্গ। এবার ওর মনে পড়ল বাড়ির কথা, মা-বাবার কথা, দাদার কথা। রুনু অস্থির হয়ে উঠল বাড়ি যাবার জন্যে।
এবার আর ওকে একবোঝা বইপত্র নিয়ে যেতে হবে না। ওর ছোট টিনের সুটকেসে ওর সামান্য জামা-কাপড়, গামছা ইত্যাদি গুছিয়ে নিয়ে সেদিন বিকেল পাঁচটায় রওনা দেবার জন্যে প্রস্তুত হল রুনু।
বাড়ির সকল গুরুজনকে প্রণাম করে ও সবশেষে এল রাঙাবউদির ঘরে। সারাক্ষণ ওর কোলেই ছিল হাসি। এবার হাসিকে রাঙাবউদির কোলে বসিয়ে দিয়ে প্রণাম করল তাঁকে।
বাড়িতে কদ্দিন থাকবি?—প্রশ্ন করেন রাঙাবউদি।
—এখনও ঠিক বলতে পারছি না। একটা মতলব আছে।
—কী মতলব?
—দাদার সাইকেল আছে। এই ছুটিতে দাদার কাছে সাইকেল চড়া শিখব। তারপর দাদার ঘাড় ভেঙে যদি একখানা সেকেন্ডহ্যান্ড সাইকেল—
—উত্তম মতলব। সাইকেল চড়া শিখতে তো এক সপ্তাহ। আমি তবু দু-সপ্তাহ সময় দিলাম। দু-সপ্তাহ পরেই চলে আসবি। শ্রীমতীকে যা করে তুলেছ, তুমি না থাকলে ওকে সামলাব কী করে?
মায়ের কথা, দাদার কথা ভেবে ভেবে নিজেকে এতক্ষণ অন্যমনস্ক রাখতে চেষ্টা করেছে রুনু, হাসিকে বুঝতেই দেয়নি যে, ও আজ বাড়ি চলে যাচ্ছে। এবার রাঙাবউদির কথায় বুঝে ফেলল হাসি। মেয়ে যে দারুণ বুদ্ধিমতী হয়ে গেছে! ও একলাফে নেমে এসে জড়িয়ে ধরল রুনুকে—তাতা বাড়ি যাবে না, যাবে না। আমি কানব।
—না, না, বাড়ি যাচ্ছি না, বেড়াতে যাচ্ছি নদীর পাড়ে। বাড়ি গেলে তো সেবারের মতো ঘোড়ার গাড়ি আসত।
আমিও তোমাত্তাতে বেলা যাব।—জিদ ধরে হাসি। শেষে সত্যিই কান্না জুড়ে দেয়।
আচ্ছা, যাবি যাবি।—বলেন রাঙাবউদি, আগে দুধ-ভাতটা খেয়ে নিবি তো।
এই মিষ্টি বন্ধনটুকু ছিঁড়তে চেষ্টা করেও নিজের চোখকে স্বাভাবিক রাখতে পারছে না রুনু। রাঙাবউদি দুধ খাওয়াবার নাম করে হাসিকে রান্নাঘরে নিয়ে যেতেই ছুটে বেরিয়ে এল রুনু।
কাউনিয়ার রায়বাড়ি থেকে স্টিমারঘাট প্রায় দু-মাইল রাস্তা। সমস্ত পথটাই রুনুর কানে বাজতে থাকে হাসির কথাগুলি, চোখের উপর ভাসতে থাকে রাঙাবউদির করুণ মুখ, হাসির অশ্রুসজল মুখ। ফিরে এসে ওকে না দেখে কী কাণ্ডটাই করবে হাসি! ভাবতে গিয়ে বারে বারে চোখ মোছে রুনু।
ভোর পাঁচটায় বাড়ি পৌঁছোল রুনু। তখনও সূর্যোদয় হয়নি। দেখা গেল বাবা তাঁর প্রিয় মোড়াটিতে পূর্বাস্য হয়ে বসে সূর্যস্তব করছেন। বাড়ির আর কেউ তখনও ওঠেনি।
রুনুর পদশব্দ পেয়ে চোখ মেললেন বাবা। ও কাছে এসে নিঃশব্দে প্রণাম করে উঠে দাঁড়াতেই তিনি জড়িত কণ্ঠে বলেন, কেডা রে?
—সে কী! আপনি আমাকে চিনতে পারছেন না?
—চোখি আর তেমন দেখতি পাই না বাবাজি। সব আবছা-আবছা দেখি। ইন্দিরের কোন বন্ধু বুঝি? কী নাম তোমার?
—বাবা, আমি রুনু। আমার চিঠি পাননি? আমি তো লিখেছিলাম, এই সপ্তাহে বাড়ি আসব।
—ও-ও, রুনু আইছিস? না, চিঠি তো পাই নাই। তা বেশ করিছিস। এক বছর পরে আলি তো, অনেক যেন লম্বা হয়ে গিছিস। গলার স্বরডাও বদলাইছে। ভাষাও অন্যরকম। ও ভাষা শিখলি কোহান তো? ও তো কলকাতার ভাষা।
সত্যি, এই দুবছরের রাঙাবউদির সঙ্গে কথা বলতে বলতে রুনুর ভাষাটাও যে পালটে গেছে, সে খেয়ালই ছিল না ওর। ওর ভাষাকে আরো প্রভাবিত করেছে 'বিজয়া' নাটকখানা। ও বইখানা ওর আগাগোড়া মুখস্থ হয়ে গেছে। বহুবার রিহার্সাল দিয়ে এবং দুবার অভিনয় করে ওর বাগভঙ্গীরও পরিবর্তন হয়ে গেছে।
ইতিমধ্যে বাবা হাঁক-ডাক করে দাদা আর মা-র ঘুম ভাঙিয়ে দিয়েছেন। রুনুকে দেখে মা, দাদা উভয়ের চোখেও যেন সেই অপরিচয়ের বিস্ময়।
মাকে প্রণাম করতে মা আর আগের মতো ওকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন না। সবিস্ময়ে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বলেন, ও মা, তুই যে মস্ত বড় এট্টা মানুষ হয়ে গিছিস! ভালো আছিস তো?
দাদারও সেই কথা—ও রুনু, এডা করিছিস কী? একজোড়া গোঁফ যা বাগাইছিস, এহোন তো তোরেই আমার দাদা বুলে ডাকতি হবে।
বাঁ হাতে গোঁফ ঢাকা দিয়ে কেবল মিটিমিটি হাসে রুনু। সত্যিই, ওর চেহারায় এখন আর নেই শৈশবের স্নিগ্ধতা, কৈশোরের কোমলতা। ও এখন দাদার মতোই লম্বা। দাদার চেয়েও স্বাস্থ্যবান এবং ওর সাজপোষাকেও এগেছে শহরের আভিজাত্য। রাঙাবউদির সুকৌশল সুপারিশে এবার পুজোর রায়মশাই ওকে যে ধুতি-পাঞ্জাবি এবং পাম্পশু দিয়েছেন, সেগুলি বেশ দামি জিনিস। সেই সাজ পরেই বাড়ি এসেছে রুনু। ওর বাঁ-হাতে পরা রয়েছে সেই আংটিটি, যেটা 'বিজয়া' নাটকের সময় ওকে পরিয়ে দিয়ে শেষে আর কিছুতেই ফিরিয়ে নেননি রাঙাবউদি। হেসে বলেছেন, ওটা হল তোর শ্রেষ্ঠ অভিনয়ের পুরস্কার।
এ বাড়ির সকলের মনে ওর যে ছবিখানা ছিল এতদিন, দু-বছরের কলেজ জীবন তথা শহর-জীবন যে ছবি বুঝি নির্মমভাবে মুছে দিল আজ। রাঙাবউদি সত্যি কথাই বলেছিলেন, এবার বাড়ি গেলে, দেখবি তোকে কেউ চিনতেই পারবে না।
সত্যি, কেউই খুঁজে পেল না তাদের চেনা রুনুকে এই শহুরে রঞ্জিত-এর মধ্যে।
গতবারেই দেখে গেছে রুনু, দাদার খুলনা টাউনে দোকান করার সাধ পূর্ণ হয়নি। মাসে মাসে একটা নির্দিষ্ট ভাড়া দেবার সাহস অবশ্য ছিল দাদার, কিন্তু পছন্দমতো একখানা দোকানঘর ভাড়া নিতে হলে প্রথমেই যে কয়েক হাজার টাকা সেলামি দিতে হয়, এ ধারণা ছিল না দাদার। অনেক ঘোরাঘুরি, অনেক দরাদরি করে নিরাশ হয়ে শেষ পর্যন্ত দাদাকে চাকরি নিতে হয়েছে খুলনা পি.সি. কটন মিলে। মিলের শ্রমিক সে, সোজা কথায় তাঁতীর কাজ। কাজটা দারুণ খাটুনির মজুরিটা হিসেব করে দেওয়া হয় প্রতি শনিবার। প্রথম দিকে দাদার সাপ্তাহিক আয় পাঁচ-ছ টাকার বেশি হতো না। এখন দক্ষতা বেড়েছে। ওভার টাইম খেটে যাচ্ছে প্রাণপণে। এখন সপ্তাহে পনেরো-ষোলো টাকা পর্যন্ত হয়। তাতে অবশ্য তিনটে মানুষের সংসার কোনওরকমে চলে যায়। কিন্তু এই উপার্জন সম্বল করে বিয়ে করার আর সাহসই হল না দাদার। মা-বাবাও বিয়ের জন্য পীড়াপীড়ি করেন না।
বিয়ের ব্যাপারে দাদার মনে হয়তো একটু অভিমান জমে আছে। একসময় মনটা বিবাহের জন্যে প্রস্তুত হয়েছিল। অনেক সুখের স্বপ্নও ছিল হয়তো। কিন্তু এই আয় নিয়ে সে স্বপ্ন দেখে আর লাভ কী?
কথাটা রুনু তুলেছিল সেবার। দাদা ওকে ধমক দিয়ে বলেছে, আরে, রাখ তোর বিয়ে! আগে তো বুড়ো বাপ-মায়ের সেবা। তারপর তোর পড়ার খরচ আছে। আমি সাধ্যমতো দিয়ে যাব। বি.এ., এম.এ. তোর পাশ করতিই হবে। এ সময়ে এট্টা বউ আনলি তার চে যদি কিছু টাকা জমাতি পারি, আবার এট্টা দোকান দেব।
দোকান দেবার স্বপ্নে আজও ছাড়েনি দাদা। স্বাধীন ব্যবসার স্বাদ যে একবার পেয়েছে, তার পক্ষে এই কঠিন দাসত্ব সয়ে যাওয়া সহজ নয়, দাদা সইছে কেবল একটা স্বপ্ন বুকে নিয়ে। এ দাদাকে অনেক বড় মনে হয় রুনুর।
রুনুর কাছে কিছুই গোপন করল না দাদা। বলল, জানিস, নিজির সব সুখ-সুবিধে বিসর্জন দিয়ে মাসে মাসে কিছু টাকা জমায়ে যাচ্ছি পোস্টাফিসি। অন্তত হাজার আড়াই হলিই ও শালার তাঁতীগিরি ছাইড়ে দিয়ে আবার নামব ব্যবসায়।
—অ্যাদ্দিনে কত জমেছে তোমার?
—তোর কাছে গোপন করব না। গোবরার দোকান বেচা টাকা বাড়ি-ঘর বানাবার পরও কিছু ছিল। সেডা আর খরচ করিনি। তারপর এট্টু-এট্টু বাড়তি বাড়তি এহোন দেড় হাজার ছাড়াইছি। বড় জোর আর দুই বছর চাকরি করব। তারপর...ভাবতিছি, প্রথমে এট্টা সাইকেল রিপেয়ারিং-এর দোকান করব। অল্প টাকাতেই শুরু করা যাবে। তারপরে আস্তে আস্তে সাইকেলের ব্যবসা। দারুণ লাভ। টুকিটাকি রিপেয়ারিং-এর কাজ নিজের সাইকেলের উপর দিয়েই প্রায় শিখে ফেলিছি।
সাইকেলের প্রশ্ন উঠতে রুনু বলে, একটা কথা বলব দাদা?
—বল না!
—তোমার সাইকেলে আমাকে সাইকেল চড়াটা শিখিয়ে দেবে?
—তুই কিন্তু ভারী সুন্দর কলকাতার কথা শিখে গিছিস। আমার শুনতি ভালো লাগে, কিন্তু বলতি পারি না। কোহান তে শিখলি?
প্রফেসরদের মুখে শুনতে শুনতে।—সংক্ষেপে সারে রুনু।
তুইও, দেখবি, এট্টা পেফেসার হবি।—সগর্বে বলে দাদা।
—ওই দেখ, তুমি আসল কথাটা চেপে যাচ্ছ। সাইকেল শেখাবে তো?
শিখেতি তো আপত্তি ছিল না, কিন্তু সাইকেল নিয়েই তো আমি মিলি যাই। নদী পার হয়ে প্রায় পাঁচ মাইল রাস্তা। হাঁইটে যাতি হলি...হাঁটলিও হবে না, ছয়টায় হাজরে দিতি হলি সারা পথ দৌড়োতি হবে।
—সপ্তাহে তোমাদের একদিনও ছুটি থাকে না?
—তা থাকে। আমি সে ছুটি নেই না। আমি ওভারটাইম খাটি যে!
রুনুর পীড়াপীড়িতে ঠিক হল, অন্ততঃ দুটো রবিবার ছুটি নেবে দাদা। দাদার আসল ডিউটি হল সকাল ছ'টা থেকে বিকেল দুটো। বাড়ি থেকে বের হতে হয় ভোর পাঁচটায়। ওভারটাইম না খাটলে বিকেল তিনটের মধ্যেই ফেরার কথা। কিন্তু ফেরার পথে আবার অনেকখানি ঘুরে বাজার করে আসতে হয়। বস্তুত, দাদা সন্ধ্যার আগে কোনও দিনই আসতে পারে না। কোনও কোনও দিন রাত আটটা-ন'টাও হয়ে যায়।
রুনুর জন্যে আরও একটু ত্যাগ স্বীকার করল দাদা। একটা সপ্তাহ ও ওভারটাইম খাটবে না। তাহলে বিকেল চারটের মধ্যেই ফিরতে পারবে এবং বিকেলে অন্তত ঘণ্টাখানেক সাইকেল চড়া শেখানো যাবে রুনুকে।
দাদার এক সপ্তাহ ওভারটাইম বর্জনের প্রস্তাবে মা-ও খুব খুশি। তিনি রুনুকে ধন্যবাদ দিয়ে বলেন, তুই অসাধ্য সাধন করলি রে রুনু! আমি কত কইছি, ও পোড়া ওবরটাইম তোর খাটতি হবে না, সন্ধের আগেই বাড়ি ফিরবি। তা আমার কথায় কান দিলি তো? খাটতি খাটতি শরীরডার কী ছিরি হইছে দেহিছিস? আমার দুই বুড়ো-বুড়ি রক্ত চুষে খাচ্ছি!
দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফের বলেন মা, তুই যে কবে চাকরি বাকরি হরবি, তহোন যদি ও এট্টু বিশ্রাম পায়।
আমি তো এখুনি দাদার সঙ্গে মিলে কাজ করতে পারি মা। তুমি বাবাকে বলো না। দাদার এত কষ্ট!—দাদার প্রতি মমতায় উচ্চ শিক্ষার সংকল্প ত্যাগ করতেও রাজি আছে রুনু।
কিন্তু রুনুর প্রস্তাব শুনে হায়-হায় করে ওঠে মা—ও সব্বনাশ! ওই খাটনির কাজ কি তোর শরীরে সবে? তুই করবি বাবুর চাকরি। বড় চাকরি। তুই আয় করবি অনেক টাকা। তখন ইন্দরের বিয়ে দেব, ঘর-দোর বানাব। ওরে এট্টু বিশ্রাম দেব। শরীরডা ওর মাটি হয়ে গেল আমাগে জন্যি!—বলতে বলতে মায়ের দুচোখে নামে জলের ধারা!
চোখ ছলছল করে ওঠে রুনুরও। সত্যি, দাদা যেন মাতৃ-পিতৃ-সেবার একটা সাধনা করে চলেছে। এই ছেলেকেই তো বাবা একবার বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন ক্লাস সিক্সে দুবার ফেল করার অপরাধে। ক্লাসের পরীক্ষায় ফেল করলেও জীবনের পরীক্ষায় দাদা ফুল মার্কস পেয়ে গেছে। বাবা-মায়ের সবটুকু স্নেহের অধিকারী এখন তাঁদের বড়ছেলে ইন্দ্রজিৎ। এ বাড়িতে কলেজে পড়া রণজিৎ যেন একজন বহিরাগত আগন্তুক। তাই তো বাবা ওকে চিনতেই পারেননি প্রথমে। এই দাদাকে সত্যিই হিংসে হয় রুনুর। এ দাদা ওর থেকে কেবল চার বছরের বড় নয়, অনেক-অনেক বড়।
রুনুকে সাইকেল শেখাতেও উঠে পড়ে লেগে গেল দাদা। প্রতিদিন পাঁচটায় ক্লান্ত দেহে ফিরে এসেও দাদার ক্লান্তি নেই। যা হয় কিছু মুখে দিয়েই সে নদীর পাড়ের একটা মাঠে নিয়ে যায় রুনুকে সাইকেলে তালিম দিতে।
এক সপ্তাহও নয়, মাত্র তিন দিনের মধ্যেই সিটে বসে একটু-একটু প্যাডল ঘোরাতে শিখে ফেলল রুনু। তারপর দাদার সাহায্য ছাড়াই একা-একা চলে যেত দাদা বাড়ির ফেরার সঙ্গে সঙ্গেই সাইকেল নিয়ে। অনেক আছাড় খেয়ে, শরীরের কয়েক জায়গায় ক্ষত সৃষ্টি করে তিন সপ্তাহ পরে ও নিজেকে এক্সপার্ট ভাবতে শুরু করল। তখন ও একটানা আধঘণ্টা ধরে মাঠের মধ্যে রাউন্ড দিতে পারে। ব্রেক করে নামতে পারে, উঠতেও পারে সহজেই।
সাইকেল যে একবার শিখেছে, সাইকেল দেখলেই তার হাত-পা নিশপিশ করে। চেনা-অচেনা নির্বিচারে যে কোনও সাইকেল হাতের কাছে পেলেই একপাক ঘুরে আসা চাই। কেবল সাইকেল চড়ার নেশাতেই দাদার পেছনে বসে রুনু মিলের গেট পর্যন্ত চলে যায়। দাদা ভিতরে যায় ওর হাতে সাইকেল ছেড়ে দিয়ে। অবশ্য ভিড়ের রাস্তায় ওর সাইকেল চেপেই ওর খেয়াঘাটে আসা চাই। ইতিমধ্যে পথচারীদের ধমক-টমকও রুনু খেয়েছে কয়েকবার। তবে আস্তে আস্তে ওর হাতে যে পেকে যাচ্ছে, সেটা ও নিজেই টের পাচ্ছে। বিকেলে আবার দাদাকে ক্যারিয়ারে বসিয়ে আনবার দুঃসাহসিক প্রস্তাবও রয়েছে রুনু কয়েকবার। দাদা ধমকে উঠেছে—ভিড়ের রাস্তায় ডবলক্যারি করতি চাস, তোর তো সাহস কম না! অন্তত ছয় মাস সাইকেল চালা, তারপর।
কিন্তু সাইকেল আমি পাব কোথায়? বরিশালে আমাকে তো কেউ সাইকেল দেবে না! একটা সাইকেল থাকলে কলেজে যাতায়াতের ভারী সুবিধা হতো।—মলিন মুখে বলে রুনু।
—কলেজ কি অনেক দূর পড়ে?
প্রায় তিন মাইল।—একটু বাড়িয়ে বলে রুনু।
—তয় তো এট্টা সাইকেল হলি ভালোই হয়। বাবারে বল না। গোটা পঞ্চাশেক টাকা হলি আমি তোরে ভালো সেকেন্ডহ্যান্ড সাইকেল কিনে দেব।
কথাটা সেদিন ওই পর্যন্তই এগিয়ে রইল। কিন্তু বাবার কাছে সাইকেল কেনার জন্যে টাকা চাইবার সাহস রুনুর হবে না কোনও দিন। অথচ সাইকেলের নেশাটা ওকে দারুণভাবে পেয়ে বসেছে। প্রতিদিন অন্তত ঘণ্টাখানেক সাইকেলের উপরে থাকে রুনু। এই নেশাতেই ও ভুলে গেল যে, মাত্র দু-সপ্তাহ ওকে ছুটি দিয়েছেন রাঙাবউদি। সে কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন রায়মশাইও ওকে বারবার। বলেছেন মাসিমাও। ও না গেলে যে ওর ছাত্রছাত্রীদের হাফইয়ার্লি পরীক্ষাই মাটি হবে! তাঁরা অবশ্য সময় নির্দেশ করে দেননি। বলেছেন তাড়াতাড়ি আসতে।
প্রায় দেড় মাস পরে একখানা চিঠি এল রুনুর নামে। লিখেছেন স্বয়ং রায়মশাই। ছাত্রছাত্রীদের প্রতি শিক্ষকের দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে প্রায় আদেশের সুরে লিখেছেন 'বাটিতে যাইয়া তুমি তোমার কর্তব্য ভুলিয়া যাইবে, ভাবি নাই। ওদের পড়াশুনার খুব ক্ষতি হইতেছে। আশা করিয়াছিলাম, মাস খানেকের মধ্যেই তুমি ফিরিয়া আসিবে। তোমার শরীর ভালো থাকিলে পত্রপাঠ চলিয়া আসিবে।'
শেষদিকে অবশ্য রুনুকে স্নেহাশীর্বাদ জানিয়েছেন রায়মশাই এবং নমস্কার জানিয়েছেন ওর পিতামাতাকে।
চিঠি পড়ে রুনু সত্যিই ভয় পেয়ে গেল। শ্রীনাথ পণ্ডিতও চিঠির বক্তব্য শুনে ওকে ভর্ৎসনা করলেন। শিক্ষকের দায়িত্ব জিনিসটাকে তিনি যে সারা জীবন বড় বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন! তিনি ক্ষুব্ধ স্বরে বলেন, একমাস পরে তোর যাবার কথা, একথা আমাকে আগে বলিস নাই ক্যান? আমি সময়মতো মনে করায় দেতাম। যাক, অন্যায় যখন করিছ, তখন যাইয়েই তেনার কাছে চাবা। তিনি দেবতুল্য মানুষ। তোমার উপর খুবই অসন্তুষ্ট হইছেন।
শেষ পর্যন্ত পুত্রের হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করে চিঠি লিখলেন শ্রীনাথ পণ্ডিতমশাই। এক দীর্ঘ পত্র লিখে দিলেন তিনি রুনুর হাতে। উদ্দেশ্য—রুনুকে যাতে মুখে বিশেষ কিছু বলতে না হয়। হয়তো কথা গুছিয়ে বলতে পারবে না রুনু, তার ফলে হয়তো ও-বাড়ি থেকে রুনুর অন্ন ঘুচে যাবে।
রুনু যেন রক্ষা পেয়ে গেল। রায়মশায়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সে কোনও কথাই বলতে পারত না। বাবা রুনুর অপরাধটা নিজের কাঁধে নিয়ে লিখেছেন যে, বার্ধক্যহেতু তিনি বিবিধি রোগে শয্যাশায়ী, এবং তাঁর সেবা-পরিচর্যার জন্যেই তিনি এত দিন রুনুকে আটকে রেখেছেন। কথাটা অবশ্য মিথ্যাও নয়। শ্রীনাথ পণ্ডিত এখন দু-বেলা মকরধ্বজ এবং স্বর্ণসিঁদুর সেবন করেন। নানা অনুপান-সহযোগে ওষুধ মেড়ে সময়মতো খাওয়াবার কাজটা আগে মা-ই করে যাচ্ছিলেন। রুনু এসে অবধি ও কাজটা নিজের হাতে নিয়েছে। তা ছাড়া প্রতি সপ্তাহে একবার কবিরাজ মশাইয়ের বাড়ি যাওয়া এবং ওষুধপত্র আনা ইত্যাদিও করছিল রুনু। কিন্তু সে আর কতটুকু সময়? আসলে যে ওকে আটকে রেখেছে সাইকেলটা একথা তো আর রায়মশাইকে বলা যাবে না।
শুভ দিন দেখে বাবার চিঠি পকেটে নিয়ে যাত্রা করল রুনু। এবার স্টেশনে এল ও দাদার সাইকেলের পেছনে বসেই। স্টিমার ছাড়ার প্রায় ঘণ্টাখানেক আগেই পৌঁছোল ওরা। রুনুকে বুকিং কাউন্টারের সামনে নামিয়ে দিয়ে দাদা সাইকেলটা নিয়ে যেন কোথায় গেল। যাবার সময় বলে গেল, তুই টিকিট কাইটে এখানে দাঁড়া। আমি পাঁচ দশ মিনিটের মধ্যে ফিরে আসব। আমি আইসে তোরে ইস্টিমারে তুলে দেবানে।
টিকিট কেঁটে দাঁড়িয়ে আছে রুনু। প্রায় পনেরো মিনিট পরে ফিরে এল দাদা। দেখা গেল, সাইকেলের গলায় একখানা চৌকো টিন-প্লেট ঝুলছে। তার উপর কালো রঙ দিয়ে কী সব লেখা।
সাইকেলে ওটা কী ঝুলিয়েছ?—প্রশ্ন করে রুনু।
—সাইকেলটা তোর নামে বুক করে দেলাম। সঙ্গেই নিয়ে যাবি।
সাইকেলটা আমি নিয়ে যাব।—সবিস্ময়ে প্রশ্ন করে রুনু।
তয় আর কচ্ছি কী? এডা তোরে আমি দান করলাম।
অভিভূত রুনু দাদাকে কেবল একটা প্রণামই করতে পারল। কৃতজ্ঞতা প্রকাশের কোনও ভাষাই জোগাল না ওর মুখে।
যথাসময়ে দাদাই সাইকেলটা তুলে দিল স্টিমারে। রুনুর বসবার জায়গা ঠিক করে ওর শতরঞ্জিটা পেতে সুটকেসটাকে বালিশের মতো সাজিয়ে দিল। সাইকেলটাকে রেলিঙের সঙ্গে তালা-চাবি দিয়ে আটকে চাবিটা দিয়ে দিল রুনুর হাতে—এই নে সাইকেলের চাবিডা। সারারাত তো আর জাইগে থাকতি পারবি নে। তয় মাঝে মাঝে এট্টু নজর দিস। অবশ্য ভয় নাই। কত হাজার হাজার টাকার মাল তো বুক হয়ে যাচ্ছে! আমি চললাম। যাইয়ে চিঠি দিস।
দাদার গলা বিদায়-বেদেনায় ভারী। রুনুর কাঁধে হাত রেখে সে আবার বলে, এবার বি.এ. পড়তি যাচ্ছিস। ক-ত বড় হবি তুই! মুখ্য দাদারে ভুলিস নে।
রুনুর দু-চোখে নামল অশ্রুধারা। একটা দুর্জ্ঞেয় ব্যথায় বুকখানা ভারী হয়ে উঠল। দাদাকে প্রণাম করে বলে, সাইকেল ছাড়া তোমার যে খুব কষ্ট হবে দাদা। এ সাইকেল তুমি নিয়ে যাও।
আরে, আমার জন্যে ভাবিস নে। দূর বোকা, কানতি হবে না। এবার দেখিস, আমি এট্টা নতুন সাইকেল কেনব। তাইতো পুরোনোডা তোরে দিয়ে দেলাম।—রুনুকে আশ্বাস দিয়ে বলে দাদা।
এ আশ্বাস যে কত অসার আশ্বাস, তা জানে রুনু তাইতো ওর আরও বেশি করে কান্না পেল।
আই. এস-সির রেজাল্ট বেরুতে এখনও মাসখানেক বাকি। এ সময়টা রুনুর একমাত্র কাজ হল ছাত্রদের দুবেলা পড়ানো। তারপর তো ওর অখণ্ড অবসর। না, অবসর আর কোথায়, ওর সাইকেল আছে না? আর আছে হাসি।
এবার সত্যিই হাসিও ভর্তি হল রুনুর পাঠশালায়, হল ওর তিন নম্বর ছাত্রী। গোপাল আর প্রতিমা তো বরাবরই আছে। কিছু যে ছাত্রী কোলে চড়তেই অভ্যস্ত তাকে পড়ানো বড় সোজা কথা নয়। সে গল্প শুনতে রাজি আছে, ছবি আঁকতে রাজি আছে, ছবি দেখে দেখে ছড়া মুখস্থ করতেও তার আপত্তি নেই, কিন্তু অ লিখতে তার ঘোরতর আপত্তি। ইতিমধ্যে অনেক ছড়া তার মুখস্থ হয়ে গেছে, এবং সে সব ছড়া শুনিয়ে বাড়ির সবাইকে তাক লাগিয়েও দিয়েছে, কিন্তু অক্ষর চিনবার আগ্রহ নেই আদৌ।
হাসিকে পড়াবার কোনও নির্দিষ্ট সময় নেই। সকালে ঘণ্টাদুই গোপাল আর প্রতিমাকে পড়িয়ে রুনুর একবার যাওয়া চাই রাঙাবউদির ঘরে। তখন যদি হাসিকে পড়ানোর মুডে পাওয়া যায়, তো আধঘণ্টাটাক চলতে পারে। যেদিন ও বেঁকে বসবে, সেদিন আর হবে না। তখন রাঙাবউদির আলমারি থেকে কোনও পূর্ব-পঠিত অথবা তখনও অপঠিত কোনও বই হাতে নিয়ে আসি-আসি করেও কোনও-কোনও দিন প্রায় বারোটা পর্যন্ত গল্প চলে। তারপর রাঙাবউদি যাবেন স্নান করতে এবং স্নান করতে যাবে রুনুও।
এ সময়টা রায়বাড়ি বড় নিঃশব্দ থাকে। রাঙাবউদি মাসিমা ধীরে-সুস্থে স্নান করেন। রুনুও স্নান সেরে অপেক্ষা করে তার ঘরে। তারপর ঠাকুর ওকে ডাকবে এবং বাড়ির সকলের সঙ্গে এক ঘরে বসে গল্প করতে করতে দুপুরের খাওয়া চলবে অনেকক্ষণ ধরে! রাত্রে অবশ্য ছাত্র-ছাত্রীদের দলে বসেই খেতে হয় ওকে।
এবার বাড়ি থেকে এসেছিল রুনু বড় ভয়ে ভয়ে। কী জানি এত দেরি করে আসায় এবং ওকে চিঠি লিখে আনতে হল বলে রায়মশাই হয়তো খুবই রেগে আছেন ওর উপর। রেগে আছেন হয়তো মাসিমাও।
দুরু দুরু বক্ষে ও প্রথমে প্রণাম করেছিল রায়মশাইকে। তিনি প্রসন্ন হাস্যে ওর কুশলাদি জিজ্ঞাসা করেছেন। সস্নেহে ওর মাথায় হাত রেখে বলেছেন, বাড়ির সবাই তো ভালো আছে বুঝলাম, কিন্তু তোমার নিজের শরীর যে খারাপ হয়ে গেছে। আবার নিয়মিত এক্সারসাইজ আরম্ভ করে দাও।
রুনুর দেরিতে আসা সম্বন্ধে একটি কথাও জিজ্ঞাসা করলেন না রায়মশাই। ফলে বাবার যে চিঠি ওর পকেটেই রয়ে গেল। মাসিমাকে প্রণাম করতে তিনিও খুশি হয়ে বললেন, আইয়া পড়ছ? বেশ বেশ। ভালো করছ।
চিঠির কথা তিনিও তুললেন না। দেরি হল বলে কৈফিয়ত চাইলেন না।
প্রায় দিন পনেরো পরে রুনু জেনেছিল যে, সে চিঠি লিখেছিলেন রাঙাবউদিই রায়মশাইয়ের হাতের লেখা নকল করে। ব্যাপারটা জেনে হেসে ফেলেছিল রুনু এবং সাইকেলের নেশায় যে ওর আসতে দেরি হয়েছে, সে কথাও স্বীকার করেছিল অকপটে।
রাঙাবউদি মুখ ভার করে বলেছিলেন, বুঝলাম। চিঠি না লিখলে বোধহয় পুরো তিনমাসই সাইকেল চড়ে যাও, সাইকেল নিয়ে থাক গে। ওটিই তোমার বড় বন্ধু। রাঙাবউদি তো পর!
সাইকেলটাই যেন রাঙাবউদির বড় শত্রু। প্রায়ই অভিমান করে বলেন, ওই সাইকেলটা তোকে ক্রমেই দূরে সরিয়ে দিচ্ছে আমাদের কাছ থেকে। তা কি স্বীকার করিস?
এ বড় কঠিন প্রশ্ন। রুনু জবাব দিতে পারে না। অথচ বিকেল হতে না হতেই ওর সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়া চাই। শহর ছাড়িয়ে এক-এক দিন এক-এক রাস্তা ধরে দশ-বারো মাইল পর্যন্ত নানা অজানা গ্রামের পথে চলে যায় সে। এই পরিক্রমা পর্বেই শহরের চারিদিকের অনেক গ্রাম ওর চেনা হয়ে গেল।
সাইকেলে এখন ওর পাকা হাত। হাসি প্রায়ই বায়না ধরে, ওর সঙ্গে সাইকেলে চড়ে বেড়াতে যাবে। এ প্রস্তাবে রুনু সানন্দে রাজি, কিন্তু আপত্তি আছে মাসিমার। রাঙাবউদিরও। ফলে প্রতিদিন বিকেলেই হাসিকে কাঁদিয়ে রেখে ওকে বেরুতে হয়। তারপর সন্ধ্যায় ফিরে এসে হাসির মান ভাঙাতে প্রায় যায়।
বস্তুত, রুনুর সাইকেল কেবল রাঙাবউদিরই শত্রু নয়, শত্রু হাসিরও। ওটার জন্যেই তো তার বিকেলে রুনুর কোলে চড়ে বেড়ানো বন্ধ হয়েছে। হাসি তাই সুযোগ পেলেই সাইকেলটাকে লাঠি-পেটা করে। গালাগাল করে বলে, দুত্তু তাইকেল, তুই মর, তুই মর!
ইতিমধ্যে খগেনদার বি. এস-সি. পরীক্ষাও সমাপ্ত হয়ে গেছে। তিনি প্রায়ই বন্ধুদের সঙ্গে সিনেমা দেখেন, আড্ডা মেরে বেড়ান আর নেতিয়ে-পড়া জিমনাস্টিক ক্লাবটাকে চাঙ্গা করে তোলেন। বিকেলে না হলেও সকালের দিকে রুনুও এখন নিয়মিত যাচ্ছে খগেনদার আখড়ায়।
একদিন খগেনদা তাঁর ক্লাবের সভ্যদের নিয়ে একটা পিকনিকের প্রোগ্রাম করলেন। রুনুকে নিয়ে মোট সভ্যসংখ্যা দাঁড়াল তেরো। চাঁদা মাথা পিছু দুটাকা। মেনু হল—মুরগির মাংস, আলু-কপির ডালনা, ছোলার ডাল, চাটনি আর চারটে করে বড় সাইজের রসগোল্লা। (তখন টাকায় ষোলোটা পাওয়া যেত।)
স্থান নির্বাচিত হল কীর্তনখোলা নদীর ওপারে একটা নির্জন বালুচরের উপর। শহর থেকে মাইল চারেক দূরে। তার চারদিকে আধমাইলের মধ্যে কোনও জন-বসতি নেই। কেবল ধানের খেত। অবশ্য ধান তখন কাটা হয়ে গেছে।
পিকনিক মানেই হইল গিয়া হই-হই আমোদ-ফূর্তির ব্যাপার। ধারে-কাছে মানুষজন থাকলে জমব না।—বলেন খগেনদা।
নেতার মতই আমাদের মত।—সমস্বরে সমর্থন জানায় সমবেত সভ্যবৃন্দ।
আধ মাইল দূরে ধানখেতের ওধারে যে গ্রামটা, সেই গ্রামের একটি ছেলে খগেনদার ক্লাবের সভ্য। তার ইচ্ছা, তাদের বাড়ির পুকুরপাড়ে আমবাগানের মধ্যে স্থান নির্বাচন করা। তাতে নাকি অনেক সুবিধে পাওয়া যাবে। হাঁড়ি, কড়াই, বাসন-কোসন টানতে হবে না। সুবিধার চেয়ে অসুবিধাটা বেশি হবে সেটা বুঝিয়ে দিলেন খগেনদা। অর্থাৎ বন্ধুর বাপ-মা খুড়ো-জ্যাঠা প্রমুখ গুরুজনদের উপস্থিতিতে 'আমোদ জমব না'। তার চেয়ে নদীর পারে খোলা জায়গায় নাচো, গা-ও, হাসো, কুস্তি করো; তারপর নদীতে প্রাণ ভরে সাঁতার কাটো। বস্তুত, জলক্রিড়ার সুবিধার জন্যে তা নদীতীরে স্থাননির্বাচন।
স্থির হল, একখানা ডিঙি নৌকোয় সমস্ত মালপত্র তুলে সবাই একসঙ্গে নৌকো বাইচ করে যাওয়া হবে পিকনিক স্পটে।
কিন্তু নদীর পারের হু-হু হাওয়ায় ধূলাবালি ওড়বো। আর দুফরের ঠা-ঠা রৌদ্রে মাথা ফাটব! হেইডার কী করবা?—প্রশ্ন করে একজন।
হেইডার ব্যবস্থাও ভাবিয়া রাখছি।—বাহাদুরী হাসি হাসেন খগেনদা।
—কী ভাবছ?
—নৌকাডারে টানিয়া তোলবো পাড়ে। ঠ্যাকনা দিয়া খাড়া কইর্যা দিমু। হাওয়াও ঠেকাইবে, রোদও ঠেকাইবে।
আইডিয়াটায় অভিনবত্ব আছে বইকি। বেশ একটা অ্যাডভেঞ্চার হবে, ভাবে সকলে।
নির্দিষ্ট দিনে সকাল সাতটায় কাউনিয়া খাল থেকে নৌ-যাত্রা শুরু হল। হাল ধরেছেন দলপতি খগেনদা। তালে তালে নৌকোর খোলে পদাঘাত করছেন দলপতি, আর সেই তালে বারোখানা বৈঠা চলছে। সঙ্গে সঙ্গে চলছে হই-হই আওয়াজ! সে একটা দেখার মতো নৌকো-বাইচ। আটটার আগেই পিকনিক পার্টি পৌঁছে গেল যথাস্থানে।
আগে নামানো হল মালপত্র।
রায়বাড়ি থেকেই এসেছে বড় বড় হাঁড়ি, কড়া, গামলা, বালতি, হাতা, খুন্তি, ইত্যাদি। এসেছে খন্তা, কোদাল, কাটারিও। গোটাকয়েক খোটা পুঁতে নৌকোটাকে হেলান দিয়ে রাখতে এসব অস্ত্রপাতি প্রয়োজন হবে। মুরগি কাটতে এবং তরকারি কুটতে দুখানা বঁটি এসেছে। এসেছে ধারালো ছুরিও।
আলু, কপি, টমেটো, কলার পাতা, বাটা মশলা, চাল, ডাল, রসগোল্লার হাঁড়ি ইত্যাদি ঝুড়ি, কড়াই, গামলায় সাজিয়ে রাখা হল। শুকনো কাঠের বোঝাটাও নামানো হল। নামল তেল, ঘি ইত্যাদিও। তারপর সবাই মিলে একটানে নৌকোটাকে পাড় তুলে, অনেক কসরত করে গোটাকয়েক খোঁটার সাহায্যে কায়দামতো খাড়া করা হল খগেনদার ডিরেকশানে, যাতে বাতাসও আড়াল হয় এবং সারাদিন ছায়াও পাওয়া যায়।
প্রাথমিক আয়োজন সমাপ্ত করেই খগেনদা কাজ ভাগ করে দিলেন কে তরকারি কুটবে, কে কোন আইটেম রান্না করবে, কে প্রয়োজন মতো নদী থেকে বালতি বালতি জল যোগান দেবে ইত্যাদি, ইত্যাদি।
স্থির হল, ঠিক ন'টার সময় গুড়-নারকেলকোরা সহযোগে মুড়ি দিয়ে প্রাতরাশ করা হবে। সে বাবদে বড় বড় চারটে নারকেল কুড়িয়ে আনা হয়েছে, এসেছে একটিন মুড়ি ও মস্ত একভাঁড় গুড়। গুড় অবশ্য চাটনিতেও লাগবে। হিসেব করেই এনেছেন খগেনদা।
মুরগি কাটা এবং মাংস রান্নার দায়িত্ব নিয়েছেন স্বয়ং দলপতি।
ছুরি, বঁটি, কাটারি নিয়ে যে যার কাজে বসে গেল।
তিনটে বড় সাইজের মুরগি এসেছে। তিনটের পা একসঙ্গে বাঁধা আছে। সেই মুরগির বান্ডিল একহাতে এবং একখানা বঁটি অন্য হাতে নিয়ে খগেনদা চলে গেলেন নৌকোর উলটো দিকটাতে সবার আড়ালে। প্রাণীহত্যা কর্মটি আড়ালেই করতে চান উনি। তাছাড়া হাওয়ায় মুরগির পাখা উড়ে আসতে পারে খাবার জিনিসের মধ্যে, তাই এ সতর্কতা। হঠাৎ খগেনদার দিক থেকে একটা চিৎকার শোনা গেল—আরে আরে, গেল, গেল! ধর ধর ধর! পরক্ষণেই দেখা গেল, ছুটন্ত একটা মুরগির পেছনে ছুটছেন খগেনদা।
আর সবাই হাতের কাজ ফেলে সেদিকে দৃষ্টি দিতেই দেখতে পেল, খোলা খেতের ভিতর দিকে তিনটে মুরগিই ছুটে চলেছে তিন দিকে। এক-এক দল-একটার পেছনে ছুটতে শুরু করল। মুক্ত মাঠে মানুষ আর মুরগির এই দৌড়ের পাল্লায় মুরগিরাই কিন্তু জিতে গেল। ওরা গ্রামের মধ্যে ঢুকে পড়ে কে যে কোথায় লুকোল, ঘণ্টাখানেক খোঁজাখুজি করেও আর কারো পাত্তা পাওয়া গেল না।
শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে খগেনদার সেই বন্ধুর বাবা দয়া করে দুটি বড় সাইজের হাঁস দান করলেন খগেনদাকে। মুরগি তিনি পোষেন না।
হাঁসদুটিকে হাতে ধরে ওজন আন্দাজ করে খগেনদা সানন্দে বলেন, এ খুব ভালো জিনিস হইল কাকাবাবু। সে হালার তিনডার থিকা এই দুইডাতেই মাংস বেশি হইব।
'প্যাকপ্যাক'মান দুই হংসীকে বগলদাবা করে খগেনদার দলটি খোশ-মেজাজে রওনা হল পিকনিক সাইটের দিকে। ইতিমধ্যে অন্য দুটি দলেও হতাশ হয়ে ফিরবার পথে মিলিত হল খগেনদার সঙ্গে। সবাই একসঙ্গে ছুটতে আরম্ভ করল। ছুটতে ছুটতে খগেনদা সবাইকে আশ্বাস দিচ্ছেন, এতক্ষণ আর সব তো হইয়া গেছে। অখন সবাই মিল্যা এই দুইডারে বানাইয়া মাংস পাকাইতে বড় জোর ঘণ্টাখানেক। অখন গিয়া আগে আমরা টিফিনডা সাইর্যা ফালামু।
ওরা ফিরে এসে নৌকোর ছায়ায় যে দৃশ্যটা দেখল, তাতে সকলেরই চক্ষুস্থির। মাথা চাপড়াতে গিয়ে খগেনদার দুবগল থেকে হাঁস দুটো গেল পড়ে। মুক্তি পেয়েই তারা দুটিতে মহানন্দে কথা বলতে বলতে সামনের দিকে এগিয়ে চলল! সকলের চোখ সামনের দৃশ্যটার দিকে। সে দৃশ্য আকর্ষণ করেছে হাঁস দুটিকেও।
সামনে তখন একটা বিরাট ভোজসভা বসেছে। হাঁসদুটোও বসে গেল ভোজে। এরা সকলে মাথায় হাত দিয়ে বসে নিরাসক্ত চোখে দেখছে সেই পঙক্তিভোজন দৃশ্য। একসঙ্গে খেতে বসেছে দুটো মোষ, পাঁচটা গরু, গোটা দশেক ছাগল, সাত-আটটা কুকুর আর শত শত কাক। আলূ, কপি, চাল, ডাল, টমেটো ইত্যাদি দখল করেছে গরু-মোষরা। কুকুরেরা বুদ্ধি করে রসগোল্লার হাঁড়িটা ঢেলে নিয়েছে কলপাতার উপর। ছাগলেরা নিয়েছে নারকেলকোরা আর গুড়। আর কাকেরা কী করে মুড়ির টিনটা ঢেলে নিতে পারল, কে জানে! হয়তো কুকুরদের সহায়তা ছিল। সকলেরই মুখ চলছে সমানে। গরু, মোষ, ছাগলেরা খেতে খেতে আবার বিপরীত প্রাকৃতিক ক্রিয়াগুলিও করে যাচ্ছে যত্র-তত্র।
কয়েকজন ছুটে যাচ্ছিল পঙক্তি-ভোজনরত প্রাণীগুলিতে তাড়াতে, খগেনদা বাধা দিয়ে বলেন, খাক, অরাই খাক। আজ অগোই পিকনিক।
মোরা খামু কোন পোড়া ছাই!—আর্তনাদ করে ওঠে একজন ক্ষুধার্ত সভ্য।
ক্ষুধায় তৃষ্ণায় তখন অবশ্য সকলেরই প্রাণ ওষ্ঠাগত। খগেনদার মুখের দিকে চেয়ে কারো মুখে আর কথা ফোটে না। ওরা পরস্পরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে। ওরা সকলেই সমান অপরাধী, অথবা সমান নিরপরাধ। কারণ পাহারা দেওয়ার ডিউটি যে কাউকেই তখন দেননি খগেনদা! তিনি বলেছেন, 'ধর, ধর, ধর!' ওরা তো সবাই মুরগি ধরার জন্যেই ছুটেছিল নেতার আদেশে।
প্রসন্ন মনে ভোজ করে গরু-মোষ-ছাগলেরা যে যার বাড়ি-ঘরে চলে গেল। কুকুরগুলোও বোধহয় মানুষ দেখে আস্তে আস্তে সরে গেল। কিন্তু কাকাগুলোর আর ফূর্তি থামে না। ওদের দল ক্রমেই বাড়ছে।
অসহায় চোখে এই দৃশ্য দেখতে দেখতে একসময় নেতার নজরে পড়ল, কাঠের বোঝাটা ঠিক আছে, আর আছে তেল-ঘির বোতলগুলি। খগেনদা ধীরে ধীরে উঠে এলেন। রোদের তাপে ঘি-টা গলে টলটল করছে। শুকনো কাঠের উপর ঘিটা ঢেলে দিয়ে দেশলাই জ্বেলে দিলেন খগেনদা। দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠল। সেই আগুনের উপর ঢাললেন সরসের তেলটা। সে কী ভয়াবহ অগ্নিশিখা!
এইডা কী করলা খগেনদা?—প্রশ্ন করে একজন।
মুরগিমেধ যজ্ঞ হইতে আছে। যজ্ঞ করলে হোমাগ্নি জ্বালতে হইবে না?—বৈরাগ্যের সুরে বলেন খগেনদা।
তার চেয়ে বলুন, পিকনিকের শবদাহ হচ্ছে।—বলল রুনু, দাহ হয়ে গেলে স্নান করতে হয় তো। আসুন, আমরা সবাই নদীতে স্নান করে ঘরে ফিরে যাই।
কথাটা মনে ধরল খগেনদার। সবাই একসঙ্গে নেমে পড়ল জলে। পেট ভরে কীর্তনখোলা নদীর জল খেয়ে নৌকোখানাকে টেনে নামাল জলে। আবার একসঙ্গে একডজন বৈঠা পড়ল জলে। এবার আর বৈঠার তেমন জোর নেই।
আই.এস-সির রেজাল্ট বেরিয়েছে। ফার্স্ট ডিভিশন পেলেও বি.এম. কলেজের ছাত্রদের মধ্যে রুনু প্রথম হতে পারেনি। হয়েছে থার্ড। ফার্স্ট হতে পারলে কলেজ থেকেই একটা স্কলারশিপ পেত এবং সে টাকায় ওর বি.এ. পড়ার খরচটা বেশ কুলিয়ে যেত। থার্ড হওয়ায় ও কেবল বই কেনা বাবদ একশো টাকা পাবে।
রেজাল্ট শুনে বেশ মন খারাপ হয়ে গেল রুনুর। এবার কলেজে ফার্স্ট হবার জন্যে সত্যিই ও প্রাণপণ খেটে ছিল। টেস্টে মাত্র এক নম্বর কম পেয়ে সেকেন্ড হয়েছিল ও। এবার মার্কশিটে দেখা গেল, কলেজে ফার্স্ট যে হয়েছে তার সঙ্গে টোটালে ওর ব্যবধান বারো নম্বর। বস্তুতঃ, রুনুকে মেরে দিয়েছে সে কেমিস্ট্রি প্র্যাকটিক্যালে। ওই বিষয়টা ওকে বারবার প্রতারণা করল। নমস্কার বাবা, আর নয়!—মনে মনে বলে রুনু, এবার তো পড়ব আর্টস। কেমিস্ট্রির ফর্মুলা মুখস্থ করা আর প্রাকটিক্যালে আননোন সল্ট আবিষ্কার করার দায় থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে।
মনে-প্রাণে রুনু সাহিত্যের ছাত্র, এই সত্যটা ওকে দেখিয়ে দিয়েছেন রাঙাবউদি। তিনিই ওকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, এবার সায়ান্স ছেড়ে আর্টস নিতে। বলেছিলেন, ওকে হতে হবে শরৎচন্দ্রের মতো মানব দরদী কথা-সাহিত্যক। শরৎচন্দ্র পড়েছেন সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস আর দুচোখ খুলে দেখেছেন দেশের উপেক্ষিত অবহেলিত মানুষকে, হৃদয় দিয়ে অনুভব করেছেন মানবচরিত্রের বিচিত্র গতি-প্রকৃতি।
এবার বাড়িতে গিয়ে বি.এ. পড়ার জন্যে পিতার সম্মতিও নিয়ে এসেছে রুনু। এখন ভাবনা হলঃ বি.এ-তে কী কী বিষয় নেবে ও? ইংলিশে অনার্স তো ঠিকই আছে। সাহিত্য-সাধনাই যদি ওর জীবন-ব্রত হয় তবে ইংরাজি সাহিত্যের বিশাল ভাণ্ডার ওর জানতেই হবে। অন্য দুটো বিষয় প্রসঙ্গে রাঙাবউদি ও রায়মশাইয়ের সঙ্গে আলোচনা করে স্থির হল, ওর নির্বাচিত পাশ সাবজেক্টদুটো হবে ইকনমিকস আর স্পেশাল বেঙ্গলি।
তদনুযায়ী বি.এ.-তে ভর্তি হল রুনু।
এবার তো আর খগেনদার বইয়ের সাহায্য পাওয়া যাবে না, বই এবার কিছু কিনতেই হবে। তবে যতটা সম্ভব সেকেন্ডহ্যান্ড বই কিনেই চালাতে হবে। বইয়ের সন্ধানে উঠে-পড়ে লেগে গেল রুনু।
ইতিমধ্যে বি.এস-সির রেজাল্ট বেরিয়েছে। ভারী মর্মান্তিক খবর—খগেনদা পাশ করতে পারেননি। পাশ করতে পারেনি টেস্টেও। কেবল ভালো জিমনাস্ট বলে কলেজে তাঁর খুব খাতির, এবং সেই সুবাদে অনেকের সুপারিশে ওঁকে টেস্টে অ্যালাউ করা হয়।
বাড়ির আর সকলের মর্মাহত হলেও রায়মশাই কিন্তু নির্বিকার। তিনি হেসে বলেন, পাশ করলেই আমি অবাক হইতাম। ওইটুকু পড়িয়া সাইন্স গ্র্যাজুয়েট হওন যায় না রে পোলা। খেলা আর আড্ডা ছাড়িয়ে যদি পড়তে চাও, তো আবার পড়ো, নাহয় ওসব জলাঞ্জলি দিয়া কাজে-কম্মে হাত লাগাও। কাজ তোমারে আমিই দিমু। আমার লগে লগে কিছু দিন ঘোর, কাজ দেখ, কাজ শেখ। পড়াশুনা তোমার হইব না। এক সপ্তাহ সময় দিলাম। ভাবিয়া জবাব দিবা।
এক সপ্তাহ কেন, এক মিনিটও ভাববার সময় নিলেন না খগেনদা। উনি সঙ্গে সঙ্গে জবাব দেন, আমি জীবনদার কারখানায় লেদ মেশিনের কাজ শিখুম। ওইডায় আমার খুব শখ। তুমি ওনারে একটু কইয়া দিবা?
—তেল-কালি মাখিয়া কারখানায় মিস্ত্রি হইতে চাও?
শোলার টুপি পরিয়া কুলি খাটানোর থিকা হেডা মন্দ কিসে?—প্রতিপ্রশ্ন করেন খগেনদা।
রায়মশাই যেন একটু থমকে যান। তারপর গম্ভীর ভাবে বলেন, কইয়া দিমু জীবনেরে যে, পোলায় আমার মিস্ত্রি হইতে চায়।
—মিস্ত্রি না কইয়া মেকানিক কইতে পার না?
রায়মশাই হাসলেন।—মেকানিক। আচ্ছা, তা-ই কমু। হ্যাতে যদি সম্মান বাড়ে, তো বাড়ুক। তবে কামটা মন দিয়া শিখতে চাও তো?
—জীবনদা যেদিন ফিট সার্টিফিকেট দিবেন, সেই দিন আমারে এট্টা লেদ মেশিন কিন্যা দিবা তো? তোমার কাঠের গোডাউনডা তো প্রায় খালিই পড়িয়া থাকে। ওইডারে মেশিনঘর বানামু।
পোলায় তো অনেক দূর ভাবিয়া রাখছে দেখি!— হেসে বলেন রায়মশাই, ভালো কথা। স্বাধীন ব্যবসা করতে চাও? বেশ বেশ। দেখা যাউক পরীক্ষা করিয়া। যেদিন নিজের হাতে পার্টস তৈরি করিয়া আমার মোটর-সাইকেল থরো রিপেয়ার করতে পারবা, সেদিন বোঝব, তুমি তৈরি হইছ। দিমু তখন লেদ মেশিন কিনিয়া।
মনে থাকে যেন।—প্রতিজ্ঞার সুরে রায়মশাইয়ের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন খগেনদা।
এরপর থেকেই খগেনদার পথ আর রুনুর পথ গেল আলাদা হয়ে। খগেনদা সকাল আটটার সময় খাকি হাফপ্যান্ট আর খাকি হাফশার্ট পরে বেরিয়ে যান স্টেশনের এক দিকে ওঁদের আত্মীয় জীবন বসুর 'বোসেস ইঞ্জিনিয়াররিং ওয়ার্কশপ'-এ মেকানিকের কাজ শিখতে। আর রুনু বের হয় দশটায় কলেজের পথে। দুজনের পথ একেবারে উলটো। শহরের যে প্রান্তে স্টিমার স্টেশন, তার ঠিক বিপরীত প্রান্তে বি. এম. কলেজ।
এবার শুরু হল রুনুর নতুন প্রোগ্রাম। আগে সপ্তাহে দুদিন প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসের জন্যে এবং কলেজ থেকে সারাপথ হেঁটে আসার জন্যে ওর ফিরতে অন্ধকার হয়ে যেত। অন্যান্য দিনও ফিরতে সন্ধ্যা হতো। এখন সাইকেল আছে এবং প্রাকটিক্যাল ক্লাশ নেই, সুতরাং সাড়ে চারটের মধ্যেই ফিরে আসে রুনু। কোনও-কোনও দিন বিকেলের দু-একটা পিরিয়ড না থাকায় আগেও ফিরে আসে। বিকেলটায় এখন ওর অবাধ মুক্তি।
এখন আর হাসিকে সাইকেলের সামনে বসিয়ে বিকেলে বেড়াতে বাধা দেন না রাঙাবউদি। বস্তুত, হাসির কান্নাকাটিতেই মত দিতে বাধ্য হয়েছেন উনি। কোনও-কোনও দিন পেছনের ক্যারিয়ারেও বসিয়ে নেয় হাসিকে। হাসি সামনের রডের উপর বসার চেয়ে পেছনের ক্যারিয়ারের বসতেই বেশি আরাম পায়। ইতিমধ্যে সাইকেল চাপতে হাসিও বেশ এক্সপার্ট হয়ে গেছে। সামনে ও বসতেই চায় না আর।
অবশ্য ওকে নিয়ে বারবারই আস্তে সাইকেল চালায় রুনু। চলতে চলতেই গল্প হয়। গল্পচ্ছলেই অঙ্ক, ভূগোল, ইতিহাস কিছু কিছু শেখানোও হয়ে যায়।
বস্তুত, বিকেলে ওই বেড়ানোর সময়টাই হাসিকে পড়ানোর সময় করে নিয়েছে রুনু। সে ভ্রাম্যমান পাঠের অগ্রগতিও সাগ্রহে লক্ষ্য করেছেন রাঙাবউদি। সে বাবদে রুনুকে বহুবার ধন্যবাদ দিয়েছেন। পাঠে অগ্রগতি হলেও লেখার ব্যাপারে কিন্তু এখনও হাসিকে ঠিক বাগে আনা সম্ভব হয়নি। লিখতে অবশ্য শুরু করেছে। ১ থেকে ১০০ বেশ লিখতেও পারে, কিন্তু অ-আ-ক-খ বর্ণমালার সব অক্ষর এখনও ধাতস্থ হয়নি।
দেখতে দেখতে থার্ড ইয়ারের হাফ-ইয়ার্লি পরীক্ষা এসে গেল। পড়ার চাপে হাসিকে নিয়ে বিকেলে বেড়ানোটা প্রায় বন্ধ হবার দশা। ওদিকে বেড়ানোর নেশাটা যে হাসিকেও পেয়ে বসেছে! বিকেল হলেই ও খুঁতখুঁত শুরু করে। নেশাটা তো রুনুরও ছাড়া সহজ নয়। ওই সময়টুকু ওরও যে বড় মধুর সময়, তাই শনি-রবিবার অপরাহ্নগুলি ও হাসিকে না দিয়ে পারে না।
সেদিনটা ছিল শনিবার। গত সপ্তাহে বেড়ানো সম্ভবই হয়নি বৃষ্টি-বাদলের জন্যে। আজ আকাশ পরিষ্কার। হাসিও সেজে-গুজে তৈরি। এসেই ওকে তাড়া দিতে শুরু করল—তাতা, বেলা যাবে না? চলো না, চলো চলো না তাতা!
আজ দুটোয় ফিরেছে রুনু কলেজ থেকে! সেই থেকে বই-খাতা নিয়ে বসেছে রুনু। এখন প্রায় চারটে বাজে। খানিক ঠেলাঠেলি করে কান্না জুড়ে দিল হাসি। অগত্যা উঠতে হল রুনুকে।
সাইকেলের ক্যারিয়ারে হাসিকে যাথারীতি বসিয়ে দিয়ে সাইকেল ঠেলে লাল পুল পায় হয়ে এল রুনু। কাউনিয়া রোডে এসে ও সাইকেলে চাপল। ওর মাথায় তখনও এইমাত্র-পড়া ইকনমিকসের ডিমিনিশিং ইউটিলিটি থিওরিটা ঘুরছে। স্লো স্পিডে চলছে সাইকেল চলছে সাইকেল। কাউনিয়া শ্মশানের পাশ দিয়ে যে কাঁচা রাস্তাটা পুব দিকে গ্রামের মধ্যে গেছে খাল পাড় দিয়ে, সেই রাস্তা ধরে চলেছে রুনু। চলতে চলতে হু্যাঁ-হুঁ করে হাসির নানা প্রশ্নের জবাব দিয়ে যাচ্ছে। আজ আর ওকে পড়ানোতে মন নেই। মন রয়েছে ইকনমিক্সে।
একসময় আকাশের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠল রুনু। ভয়ংকর ঘন মেঘ ছেয়ে গেছে উত্তরের আকাশটা। ছুটে আসছে সে মেঘ মাথার উপর। দূরের গ্রামের মাথায় দেখা যাচ্ছে, বৃষ্টি নেমেছে। সে বৃষ্টি এক্ষুনি ওদের আক্রমণ করবে। সঙ্গে সঙ্গে সাইকেল ঘুরিয়ে ফুলস্পিডে ঘরমুখো ছুটল রুনু।
কাঁচা রাস্তা থেকে কাউনিয়া রোডে উঠতে বেশ খানিকটা চড়াই ভাঙতে হয়। ফুলস্পিডে ওই চড়াই পার হতে দিয়ে টায়ারের নীচে বোধ হয় একখানা রাস্তার বড় খোয়া পড়ল। দারুণ একটা ঝাঁকুনি খেয়ে সাইকেলটা উঠল বড় রাস্তায়। সেই মুহূর্তে পেছনে ধপাস করে একটা শব্দ। তারপর সাইকেলের স্পোকের মধ্যে কিছু ঢুকে গেলে যেমন ঘষটানো শব্দ হয়, তেমন শব্দ। মুহূর্তে সাইকেলে ব্রেক কষে নেমে পড়ল রুনু। নেমে পেছন ফিরে যে দৃশ্যটা ও দেখল, তাতে সর্বাঙ্গ ওর থর থর করে কেঁপে উঠল। সাইকেলের স্পোকের মধ্যে হাসির ডান পাখান দুমড়ে-মুচড়ে রয়েছে! প্রায় পাঁচ হাত পথ সে ওকে টেনে-হিঁচড়ে এনেছে সাইকেলটা, সে চিহ্ন রয়েছে রাস্তার নরম মাটিতে। জামা-টামা ছিঁড়ে গেছে। শরীরের নানা স্থান দিয়ে রক্ত গড়াচ্ছে। তারস্বরে কাঁদছে হাসি। কাঁদছে আর বলছে, 'আর করব না তাতা, আর করব না!' যেন ও-ই কী একটা মস্ত অপরাধ করে ফেলেছে, তাই রুনু ওকে এই শাস্তি দিল।
হাসি কাঁদছে, কাঁদছে রুনুও। ওদের কান্না শুনে রাস্তায় লোক জড়ো হয়ে গেল। তাদেরই কেউ কোথা থেকে হাতুড়ি বাটালি, আরো কী সব যন্ত্রপাতি এনে নানা কসরত করে চারটে স্পোক ভেঙে উদ্ধার করল হাসির ক্ষত-বিক্ষত পা-খানা। ওর তখন আর বুঝি কাঁদবারও শক্তি নেই। হাসি মুক্ত হতেই তার রক্তাক্ত দেহটা বুকে জড়িয়ে ধরে পাগলের মতো ছুটল রুনু। ফিরেও তাকাল না ওর বুকের ধন সাইকেলটার দিকে।
রুনুর পেছনে পেছনে একদল কৌতুহলী মানুষও ছুটে এল রায়বাড়িতে। তাদেরই একজন ঠেলে এনেছে সাইকেলটা। সরাসরি রাঙাবউদির ঘরে হাসিকে পৌঁছে দিয়ে তাঁর পায়ের উপর আছাড় খেয়ে পড়ল রুনু। একটা কথাই বলতে পারল, সর্বনাশ করেছি রাঙাবউদি!
সে সর্বনাশের গুরুত্ব যে কতখানি, তা তখনও স্পষ্ট হয়নি রাঙাবউদির কাছে।
হাসির ওই দুর্দশা দেখে বাড়ির মধ্যে একটা হুলুস্থূল কান্নাকাটি পড়ে গেল। রাঙাবউদি অজ্ঞান হয়ে পড়েছেন হাসির রক্তমাখা দেহটা দেখেই।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই ডাক্তার এল। হাসিকে প্রয়োজনীয় ফাস্ট-এইড দিয়ে ওকে ঘুমের ইনজেকশান দেওয়া হল। তারপর ওর প্রায় সমস্ত শরীরটাই ঢাকা পড়ল সাত-আটটা ব্যান্ডেজে। ইতিমধ্যে জ্ঞান ফিরেছে রাঙাবউদির। রুনুর দিকে একবারও ফিরে তাকননি তিনি। একটা প্রশ্নও করেননি।
ডাক্তারবাবুও রুনুকে কোনও প্রশ্ন করেননি। ঘটনার বিবরণ তো রাস্তার লোকেরাই সবিস্তারে শুনিয়েছে সকলকে। প্রত্যক্ষদর্শী যে নয়, সে-ও প্রত্যক্ষদর্শীর বাহাদুরী নেবার জন্যে অনেক বাড়িয়ে বলেছে, রুনুর মুর্খামির প্রচুর নিন্দা করেছে।
জ্ঞান ফিরতে রাঙাবউদি প্রথম প্রশ্ন করলেন ডাক্তারবাবুকে, আমার মেয়ে বাঁচবে তো?
ভয় নেই।—গম্ভীর গলায় বলেন ডাক্তার।
ব্যাপারটা যে কী করে হল, তার বর্ণনা হয়তো কিছুটা দিতে পারত হাসি। রুনু তো দেখল সর্বনাশটা ঘটে যাবার পর। রাস্তার লোকেরা ঘটনার যে বীভৎস বর্ণনা দিল, তাতেই চতুর্দিক থেকে রুনুর সাইকেলে আনাড়িত্ব, বুদ্ধির অভাব, অসাবধানতা এবং সর্বোপরি দায়িত্বজ্ঞানের অভাবের চূড়ান্ত প্রমাণ হয়ে গেল। সবার চোখে কেবল ধিক্কার আর ধিক্কার। একটা শিশুর প্রাণ নিয়ে যে এমন ছিনিমিনি খেলতে পারে, সে কি মানুষ? সে তো জানোয়ার! ও জানোয়ারটাকে এক্ষুনি এ-বাড়ি থেকে গলা ধাক্কা দিয়ে তাড়ানো হোক। কেউ বলল, ওকে আচ্ছা করে জুতোপেটা করা হোক।
সত্যি-সত্যি এখন যদি কেউ চাবুক মেরে রুনুর সারা গায়ে ছাল তুলে দেয়, তাতেও হয়তো ওর মনের গ্লানি মুছবে না। সে শাস্তি রুনু পাচ্ছে তার বুকের মধ্যে, চাবুক মেরে বা জুতোপেটা করে কি তার চেয়ে বেশি শাস্তি দেওয়া যাবে?
কেউ বুঝল না ওর মনের ব্যথাটা। না, রাঙাবউদিও না। সেই যে ঘৃণায় ধিক্কারে মুখ ফিরিয়েছেন তিনি, আর একবারও ওর দিকে তাকাননি।
হাসিকে ঘুম পাড়িয়ে প্রেসক্রিপশান লিখে দিয়ে চলে গেলেন ডাক্তার। একে একে সবাই চলে গেল ওঘর থেকে। কেবল দুই হাঁটুর মধ্যে মাথা গুঁজে দোরগোড়ায় বসে রইল রুনু। ও যে এ-বাড়িতে একটা অনাবশ্যক বস্তু হয়ে গেছে।
এক সময় রাঙাবউদি বললেন, থাক, আর নাটক করতে হবে না। আমার মেয়ে যদি খোঁড়া হয় যায়...
আমাকে তুমি শাস্তি দাও রাঙাবউদি, যে-কোনও শাস্তি। সত্যি বলছি, আমাকে তুমি জুতোপেটা করো!—ক্ষুব্ধ গলায় বলে রুনু।
রাঙাবউদির মুখ থেকে আর একটি কথা বের হল না।
একসময়ে নিঃশব্দে ও-ঘর থেকে বেরিয়ে এল রুনু।
সেদিন রায়মশাই বাড়ি ফিরলেন রাত নটায়। এসেই নানা মুখ থেকে নানাভাবে হাসির দুর্ঘটনার খবর শুনলেন। সর্বাঙ্গে ব্যান্ডেজ-বাঁধা ঘুমন্ত হাসিকে দেখলেন উৎকণ্ঠা ভরা চোখে। সকলে একবাক্যে রায় দিল রুনুর বিরুদ্ধে। রুনুর বিচার পরে হবে। ধুলো পায়ে উনি মোটর-সাইকেলে ছুটলেন টেলিগ্রাফ অফিসে। এক্সপ্রেস টেলিগ্রাম চলে গেলে নরোত্তমপুরে জমিদারবাবু অর্থাৎ হাসির ঠাকুর্দার কাছে। টেলিগ্রাম করে রায়মশাই এলেন ডাক্তারবাবুর বাড়িতে। তাঁর সঙ্গে আলোচনা করে বুঝলেন, শরীরের অন্যান্য ক্ষত নিয়ে ভাবনা নেই, কিন্তু অবিলম্বে রোগীকে কলকাতার পি.জি. অথবা অন্য কোনও বড় হাসপাতালে ভর্তি না করলে এবং এক্স-রের ব্যবস্থা না করলে ডান পা-টা হয়তো...
স্থির হল, কালই কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হবে হাসিকে। ডাক্তারবাবুও সঙ্গে যাবেন পি.জি.-তে ভর্তির ব্যবস্থা করে দিতে। ডাক্তারবাবুর ওখান থেকে রায়মশাই ছুটলেন স্টিমার স্টেশনে। বরিশাল এক্সপ্রেসে একটা প্রথম শ্রেণির চার বিছানার কেবিন রিজার্ভ করে এলেন পরদিনের জন্যে।
পরদিন বিকেল তিনটেয় এসে পৌঁছোলেন বড় রায়কর্তা। হাসির ব্যান্ডেজমোড়া মূর্তিটা দেখেই প্রথমে একটা বুকফাটা আর্তনাদ করে উঠলেন তিনি। ওই মেয়েটুকুই যে তাঁর বংশের একমাত্র প্রদীপ! পুত্রকে ত্যাজ্যপুত্র করলেও নাতনি যে তাঁর বুকের ধন, চোখের মণি।
কী সর্বনাশ হইল রে, ওরে আমার কী সর্বনাশ হইল! আমার বংশ বাতি দিতে কেউ আর রইল না রে-এ!—বুকে চাপড়ে মেঝেতে গড়াগড়ি করছেন জমিদার অনিন্দ্যনারায়ণ রায়। এ একটা দৃশ্য বটে। তাঁকে সান্ত্বনা দিতেই বাড়ির লোক হিমসিম খেয়ে গেল।
খানিক পরে প্রকৃতিস্থ হয়ে বড় রায়কর্তা শুনলেন ব্যাপারটা নানা মুখ থেকে। কেউ একটা কথা বলল না রুনুর পক্ষে।
সব শুনে জমিদারবাবু সিংহের মতো গর্জন করে উঠলেন—কই, সে হারামজাদা শুয়ারের বাচ্চা কই? অর মুণ্ডুডা ছিড়িয়া ফালাইমু আমি! সাইকেল চড়া জন্মের মতো ঘুচামু!
তাকে কেউ 'শুয়ারের বাচ্চা' সম্বোধন করছে, এই প্রথম শুনল রুনু তার জীবনে। বুকের মধ্যে যেন আগুন জ্বলে উঠল ওর।
ওদিকে বিশাল শরীরটা নিয়ে জমিদারবাবু প্রায় লাফাতে লাফাতে ছুটে এলেন রুনুর পড়ার ঘরে। পেছনে পেছনে এলেন রায়মশাই, রাঙাবউদি এবং বাড়ির আরো অনেকে। রাগলে উনি যে চণ্ডাল হয়ে যান এবং একটা মানুষকে খুনও করতে পারেন, একথা ওঁদের সকলেরই জানা।
এদিকে রুনুও উঠে দাঁড়িয়েছে দৃঢ় প্রতিবাদের ভঙ্গীতে। সে ওই সিংহের চোখে চোখে রেখে বলল, আমাকে শুয়ারের বাচ্চা বলে আপনি আমার বাবাকে অপমান করেছেন। জানেন, দেশ-শুদ্ধ মানুষ তাঁকে দেবতার মতো সম্মান করে। আপনি আমাকে যে-কোনও শাস্তি দিতে পারেন, কিন্তু আমার বাবাকে অপমান করতে পারবেন না।
হারামজাদার পো আবার ত্যাজ দেখাইতে আছে। তোর ত্যাজ আমি জন্মের মতো—রুনুর ঘাড়টা সিংহের থাবায় চেপে ধরলেন জমিদারবাবু—বল হারামজাদা, কেন এই সর্বনাশ করলি আমার? তরে আমি খুন করুম!
তাই করুন জ্যাঠাবাবু।—শান্ত কণ্ঠে বলে রুনু, অনুতাপে আমি পুড়ে মরছি। আমার আর কিছু বলবার নেই।
পরক্ষণেই প্রচণ্ড এক চড়ে ভুলুণ্ঠিত হয়ে পড়ল রুনু। একটা লাথিও তুলেছিলেন জমিদারবাবু, রাঙাবউদি ছুটে এসে রুনুকে জড়িয়ে ধরতে লাথিটা পড়ল রাঙাবউদির পিঠেই। তিনি সেদিকেই ভ্রূক্ষেপ না করেই ধমকের সুরে বললেন, কী করছেন বাবা! আপনি কি পাগল হয়ে গেলেন? জানেন, এ সংসারে ওর চেয়ে বেশি ভালোবাসে না কেউ হাসিকে। হাসি ওর প্রাণ। ও কি ইচ্ছে করে করেছে? আমারই যে পোড়াকপাল! প্রথমে কপাল পুড়িয়ে গেছে আপনার ছেলে। তারপর যেটুকু বাকি ছিল...
বলতে-বলতে হু-হু করে কেঁদে উঠলেন রাঙাবউদি।
ওরে ছাড় দাদা।—ধীর গম্ভীর কণ্ঠে বললেন রায়মশাই, রাঙাবউ সত্য কথাই কইছে। অরে মাইরা কি হাসিরে বাঁচানো যাইব? অখন তারে বাঁচাইবার কথা ভাব। আমরা আজই হাসিরে লইয়া কইলকাতায় রওনা হমু বরিশাল এক্সপ্রেসে। লালু ডাক্তার যাইবে, তুমিও যাইবা। আমি ফার্স্ট ক্লাসে রিজার্ভ করিয়া রাখছি। কইলকাতার বড় হাসপাতালে অরে কাইলই ভর্তি করতে হইব। তুমি তাড়াতাড়ি বেডি হইয়া লও।
প্রথমে রুনুর প্রতিবাদেই একটু থমকে গেছিলেন জমিদারবাবু। তারপর রাঙাবউদির কথায় একেবারে স্তম্ভিত। আজ পর্যন্ত বোধ হয় ওঁর মুখের উপর এই সুরে কথা বলার সাহসই হয়নি রাঙাবউদির। পরিশেষে রায়মশাইয়ের কথা শুনে তিনি যেন একেবারে অন্য মানুষ হয়ে গেলেন। চোখের আগুনটা প্রায় নিভে এল তাঁর। নরম সুরে রুনুকে বললেন, যা হারামজাদা, বাঁচিয়া গেলি। তয় এই শ্যাষ কথা কইয়া যাই, এ বাড়ির অন্ন তোর আজই ঘুচল। যা, বাইর হইয়া যা।
এ কথার পর কেউ কোনও মন্তব্য করল না। সবাই একে একে চলে গেল ঘর ছেড়ে। সবশেষে রাঙাবউদি চোখ মুছতে মুছতে বলেন, তুই তা-ই কর রুনু। রায় বাড়ির ভালোবাসা আর তুই ফিরে পাবি না।
সে আমি বুঝেছি রাঙাবউদি।—ভারী গলায় বলে রুনু, আমি আজই চলে যাব এ-বাড়ি থেকে। কিন্তু হাসির খবর আমি পাব কী করে? আমি যে সারারাত জেগে প্রার্থনা করলাম ঈশ্বরের কাছে, তার কি কোনও মূল্য দেবেন না ভগবান?
ওরে, আমার যে বড় পোড়া কপাল! তাই ভয় হয়! আমার ভাগ্যে তোর ভগবান যে একটুও সুখ লেখেনি!—দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন রাঙাবউদি।
—ভগবানে বিশ্বাস আমি কখনো হারাব না রাঙাবউদি। আমার মন বলছে, হাসি ভালো হয়ে যাবে। তখন কিন্তু খবরটা দিতে ভুলো না। কলেজের ঠিকানায় চিঠি লিখো।
খবর ভালো হলে প্রথম চিঠি আমি তোকেই লিখব।—বলেন রাঙাবউদি, কিন্তু তুই এখন যাবি কোথায়?
কিছু জানি না। রায়বাড়ির অন্ন ঘুচল, এইটুকুই শুধু জানি।—কথা বলতে বলতে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল রুনু। সেই চোখের জলে ভিজিয়ে দিল রাঙাবউদির পা দুখানা।
ওঁরা কলকাতা রওনার হবার আগেই রুনু তার সুটকেস-বিছানা নিয়ে নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল রায়বাড়ি থেকে। মনে মনেই প্রণাম জানাল রায়মশাই, মাসিমা, পিসিমা প্রমুখ গুরুজনদের। কারো সামনে গিয়ে রাঙাবউদির ভাষায় 'নাটক করতে' আর সাহস হল না ওর।
ও মনে মনে ভাবছে, আজ ভাগ্যবিপর্যযে এ-বাড়ির অন্ন ঘুচলেও রায়বাড়ির কাছে ও সারা জীবন কৃতজ্ঞ থাকবে। এত ভালোবাসা ও আর কবে পেয়েছে কোথায়? বিশেষ করে রাঙাবউদির অকৃত্রিম ভালোবাসা ওর জীবনের এক পরমাশ্চর্য সঞ্চয়। আর হাসি? হায় হাসি! এত ভালোও যেমন সে কাউকে বাসেনি এ জীবনে, তেমনি এত বড় শাস্তিও পায়নি কেউ তার কাছে। এ দুঃখের বুঝি শেষ নেই।
আজ ঠাকুমা এ-বাড়িতে থাকলে রুনুর এই শাস্তি হতো কিনা, কে জানে! বড় রায়কর্তার রায়ের বিরুদ্ধে আর কেউ প্রতিবাদ করার সাহস না পেলেও তিনিও কি...যাকগে, সে কথা ভেবে আর লাভ কী? হায়, তিনি যে তখনও রয়ে গেছেন নরোত্তমপুরে!
শারদীয়া কিশোর ভারতী ১৯৮০
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন