শ্যামদাস দে

রূপসা নদির এপারে খুলনা শহর, ওপারে নন্দনপুর গ্রাম। ওপার থেকে ট্রেন যায় কলকাতায়, এপার থেকে তার ঝিকঝিক শব্দ শোনা যায়। ওপারের সিনেমা হাউসে বিকেল থেকে মাইকে গান হয়, এপারের মানুষ নদীতীরে বসে বসে সারা বিকেল গান শোনে। কেউ সুর মিলিয়ে শিস দেয়, কেউ হাতে তাল দিয়ে গলা মেলায়। ওপারের শহরের হাঁক-ডাক-কোলাহল, বিচিত্র যান্ত্রিক শব্দ একটু কান পাতলেই এপার থেকে শোনা যায়। মধুমতীর তুলনায় রূপসা যেন একটি ছোট চঞ্চলা বালিকা। এর কোনও হাঁক-ডাক নেই, নেই ভয়াল গর্জন, নেই নিষ্ঠুর ভাঙন।
এই গ্রামেই কিছু আম-কাঁঠাল-নারকেল গাছ সমেত বিঘেপাঁচেক বাস্তুজমি কিনে রেখে গেছিল ইন্দ্র। সেই জমিতেই শ্রীনাথ পণ্ডিতের নতুন বাড়ি তৈরি হবে। আগের বাড়ি ছিল মধুমতীর তীরে, এ বাড়ি হবে রূপসার তীরে। হোক না রূপসা ছোট নদী, তবু তো বয়ে-যাওয়া নদী। নদীতীরের মানুষদের নদীবিহীন দেশে বসবাস করতে মন চায় না কিছুতেই। নদীর একটা আশ্চর্য মায়া আছে। নদীর ভাঙনে ভিটে-ছাড়া হয়েও শ্রীনাথ পণ্ডিত তাই এলেন আর এক নদীতীরে নতুন করে বসবাস শুরু করতে।
আগের বাড়ির আসবাবপত্র সঙ্গে করেই এনেছিলেন। সঙ্গে এসেছিল ওঁর দুজন প্রাক্তন ছাত্র আর গোবরা গ্রামের পাকা মিস্ত্রি। তারা যেমন আগের বাড়ি ভাঙার কাজ করেছিল দক্ষ হাতে, তেমনি দক্ষ হাতে নতুন বাড়ি খাড়াও করে ফেলল মাত্র দু-সপ্তাহের মধ্যেই। এ-কদিন সংসারের সব কটি মানুষের কষ্টের অবধি ছিল না—না ছিল খাওয়া-দাওয়ার কোনও সুব্যবস্থা, না ছিল শোবার কোনও বন্দোবস্ত। তবু সব কষ্টেরই শেষ আছে। নতুন ঘরদোর গোছগাছ করে নিতেই সব কষ্টের অবসান হল।
পূর্বপুরুষের বাস্তুভূমি ছেড়ে এসে নতুন দেশে নতুন পরিবেশে নতুন মানুষের মধ্যে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে অনেক সময় লাগে। সে সময় আর সকলেই পেল, কিন্তু রুনু পেল না। নন্দনপুরের কাউকেই ওর জানা হল না। এ গ্রামটার সঙ্গে গোবরার কোনোই মিল নেই। এখানে নেই ছোট গাঙের মতো মুক্ত মাঠ, নেই মধুমতীর দুইতীরের অপরূপ ছবি। সেটা ছিল গাঁয়ের নদী—স্বচ্ছন্দ, স্বাধীন। কিন্তু এ নদী শহুরে, শহর যেমন প্রস্তরময়, এ নদীও প্রস্তরের বাঁধনে বাঁধা। এ গ্রামটা বড় ঘিঞ্জি, প্রচুর বনজঙ্গল, প্রচুর ঘর-বাড়ি। প্রথম দর্শনেই রুনুর ভালো লাগেনি নন্দনপুরকে। কিছুদিন থাকলে ভালো লাগত কিনা সে পরীক্ষারও তাকে কোনও সুযোগ দিলেন না শ্রীনাথ পণ্ডিত।
পরীক্ষার রেজাল্ট বেরিয়ে গেছে। কলেজগুলিতে ভর্তি শুরু হয়ে গেছে। আর তো দেরি করা যায় না। অবিলম্বে রুনুকে ভর্তি হতে হবে কলেজে। আই. এস-সিতেই ভর্তি হবে স্থির হল।
খোকাদার বড়দার বাসায় থেকে কলকাতা কলেজে পড়ার স্বপ্ন তো এককথায় খারিজ হয়ে গেছে। দাদা বলেছিল, বাড়ি থেকে যাতায়াত করেই পড়া যেত দৌলতপুর কলেজে। নদী পার হলেই তো খুলনা। খুলনা থেকে ট্রেনে দৌলতপুর আধ ঘণ্টাও নয়। এ গ্রামের অনেক ছাত্র পড়ে দৌলতপুর কলেজে। তারাই হবে রুনুর সাথী। দাদার সে প্রস্তাবও এককথায় বাবা নাকচ করে দিলেন। যাতায়াতে সময় নষ্ট, আর ট্রেন ভাড়াও অনেক। তার চেয়েও বড় কথা, দৌলতপুর কলেজের চাইতে বরিশাল বি. এম. কলেজের খ্যাতি অনেক বেশি। সেটা হল জাতির গৌরব অশ্বিনী দত্তের কলেজ। বি. এম. কলেজ হল বাংলার অক্সফোর্ড। ওখানকার অধ্যাপকরা সবাই দেশের শ্রেষ্ঠ প্রতিভা। এসব খবর বাবা পেয়েছিলেন গোপালগঞ্জের স্কুল ইনস্পেকটর সেনসাহেবের কাছ থেকে। সেনসাহেব ছিলেন বাবার বিশিষ্ট বন্ধু। তাঁরই পরামর্শে রুনুকে বি. এম. কলেজে পড়াবার পরিকল্পনা। পত্রযোগে রুনুদের স্কুলের হেডমাস্টারমশাইও এই পরিকল্পনা সমর্থন করেছিলেন। এমনকী তাঁর এক সহপাঠী তথা আত্মীয়র নামে, যিনি বি. এম. কলেজের একজন খ্যাতনামা অধ্যাপক, একখানা আলাদা চিঠিও দিয়েছেন তিনি রুনুর ফ্রিশিপের সুপারিশ করে। ওদিকে সেনসাহেবও বরিশাল শহরে তাঁর এক গুরুভাইয়ের ঠিকানায় চিঠি দিয়েছেন তাঁর বাড়িতে রুনুর থাকার অনুরোধ করে। শ্রীনাথ পণ্ডিতের মতে, এ হল 'মণিকাঞ্চনসংযোগ'। এর মধ্যে নাকি তিনি ঈশ্বরের অভিপ্রায়ের ইঙ্গিতও পেয়েছেন। তাই নির্দ্বিধায় রুনুকে সেই দূরদেশেই পাঠাবেন বলে মনস্থির করেছেন শ্রীনাথ পণ্ডিত।
তিনখানা চিঠি, পিতামাতার আশীর্বাদ আর পঞ্চাশটি টাকা সম্বল করে নন্দনপুরের নতুন বাড়ি থেকে এক শুভক্ষণে যাত্রা শুরু করল রুনু।
প্রথম চিঠিখানা লিখেছেন স্কুল ইনস্পেকটর তাঁর গুরুভাই দেবেন্দ্রনারায়ণ রায়কে। রুনু এবং শ্রীনাথ পণ্ডিতের উচ্চ প্রশংসা করে তিনি রায়মশাইকে অনুরোধ করেছেন রুনুকে তাঁর বাড়িতে গৃহশিক্ষকরূপে স্থান দিয়ে একটি দরিদ্র মেধাবী ছাত্রের উচ্চশিক্ষায় সহায়তা করতে।
দ্বিতীয় চিঠিখানা লিখেছেন স্বয়ং শ্রীনাথ পণ্ডিত। লিখেছেন তাঁর এক প্রাক্তন ছাত্র দুখীরাম বিশ্বাসকে। বিশ্বাসমশাই নাকি বরিশাল শহরের একজন বিখ্যাত উকিল। স্ত্রী-পুত্র নিয়ে বরিশালেই স্থায়ী বসবাস করছেন। মাঝে মাঝে দেশের বাড়ি গোবরার পার্শ্ববর্তী গ্রাম ভাটিয়াপাড়ায় এলে এখনও শৈশবের গুরুমশাই শ্রীনাথ পণ্ডিতকে প্রণাম করে যান। শ্রীনাথ পণ্ডিত তাঁকে লিখেছেনঃ পরমেশ্বরের কৃপায় তুমি আমার একজন কৃতি ছাত্র। জীবনে তুমি সুপ্রতিষ্ঠিত। তোমার অভাব নাই, আমার অভাবের অন্ত নাই, তবু আমার কনিষ্ঠ পুত্রটিকে উচ্চশিক্ষা দিবার বাসনায় তোমার আশ্রয়ে প্রেরণা করিতেছি। শ্রীমান তোমার গৃহে স্থান পাইলে নিশ্চিন্ত হইতে পারি। নির্বান্ধব দেশে তুমিই উহার অভিভাবকরূপে উহাকে সুপথে পরিচালনা করিবে। ভর্তি এবং পুস্তকাদি ক্রয় বাবদ আমার সাধ্যানুযায়ী উহাকে পঞ্চাশটি টাকা দিয়াছি। তুমি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাদি করিবে। কল্যাণীয়া বধূমাতা ও পুত্রকন্যাদিসহ তুমি আমার আন্তরিক স্নেহাশীর্বাদ...ইত্যাদি।
তৃতীয় চিঠিখানা শ্রীনাথ পণ্ডিতের অনুরোধে ডাকযোগে পাঠিয়েছেন গোপালগঞ্জ স্কুলের হেডমাস্টারমশাই। সে চিঠিখানা ছিল বি. এম. কলেজে তাঁর সহপাঠী অধ্যাপক জে. এন. সেনগুপ্তকে লেখা। সে চিঠিতে রুনুর সম্বন্ধে তিনি লিখেছেনঃ শ্রীমান রনজিৎ আমার স্কুলের সর্বাধিক মেধাবি ছাত্র ছিল। পরীক্ষার মুখে কয়েকমাস দূরারোগ্য টাইফয়েড রোগে ভুগিয়া এবার তাহার পরীক্ষার ফল আশানুরূপ হয় নাই। এই বিপদ না ঘটিলে শ্রীমান স্কলারশিপ পাইত বলিয়া আমার দৃঢ় বিশ্বাস। আমার স্কুলে শ্রীমান বরাবর ফ্রি পড়িয়াছে। তোমাদের কলেজেও যদি উহার ফ্রিশিপের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়...ইত্যাদি ইত্যাদি। শ্রীনাথ পণ্ডিত সম্বন্ধেও প্রচুর প্রশংসা করেছেন তিনি সে চিঠিতে।
তিনখানা চিঠিই রুনু পড়ে নিয়েছে পথে যেতে যেতে। সবচেয়ে ভালো লেগেছে হেডমাস্টারমশাইয়ের চিঠিটা। ওই গুরুগম্ভীর মানুষটির মধ্যে এই স্নেহের ফল্গুধারাটির পরিচয় অনেকেই পায় না। চিঠিখানা বারবার পড়তে পড়তে নিজেকে ভাগ্যবান মনে হয় রুনুর। মনে মনে সেই দেবচরিত্র মানুষটিকে ও বারবার প্রণাম জানায়। চিঠিখানার একটা নকল সে রেখে দিয়েছে আলাদা করে ওর ভাবী জীবনের সম্পদরূপে। তারপর একটা আলাদা খামে চিঠিটা পুরে এঁটে দিয়েছে। উপরে নিজের হাতে লিখেছেঃ Prof. J. N. Sengupta, B. M. College, BARISHAL.
যে অবস্থায় পরীক্ষা দিয়েছিল তাতে রুনুর রেজাল্ট হেডস্যারের কাছে 'আশানুরূপ' না হলেও ওর কাছে তা-ই আশাতিরিক্ত। ও প্রথম বিভাগ পেয়েছে। দুটো লেটারও পেয়েছে। এই তো যথেষ্ট। ফেল করলেও ও বিস্মিত হতো না।
মাইনরে রুনুর বৃত্তি পাওয়ার স্বপ্ন সফল হয়নি শ্রীনাথ পণ্ডিতের। স্বপ্নভঙ্গ হল ম্যাট্রিকে বৃত্তি পাওয়ারও। আর হয়তো রুনুকে নিয়ে বড় বড় স্বপ্ন দেখবেন না তিনি। নিজের অসাফল্যের জন্য যত না বেদনা, তার চেয়ে অনেক বেশি ব্যথা বোধ করে রুনু আশাহত পিতার কথা ভেবে। এই উচ্চাভিলাষী বৃদ্ধটিকে সান্ত্বনা দেবার একটিমাত্র উপায় আছে। তা হল আই. এস-সিতে বৃত্তি পাওয়া, প্রথম দশজনের একজন হওয়া। কিন্তু অতবড় সংকল্প করার মনোবল রুনু হারিয়ে ফেলেছে। সেই টাইফয়েডটা ওর অনেক অপূরণীয় ক্ষতি করে গেল। আগের সেই উদ্যম কি আর সে ফিরে পাবে এ জীবনে? পাবে ফিরে তার সেই আশ্চর্য স্মরণশক্তি?
খুলনা স্টেশন থেকে ভোর সাড়ে পাঁচটায় বরিশাল যাওয়ার স্টিমারে চড়েছিল রুনু। স্টিমারটার নাম 'লেপচা'—আজও মনে আছে। বরিশাল পৌঁছবার কথা রাত আটটায়। বড় দীর্ঘ এই জলযাত্রা, রুনুর জীবনের এই দীর্ঘতম যাত্রাপথে আজ আর কোনো সঙ্গী নেই। সঙ্গী-সাথীরা কেউই নেই। খুলনা, ফরিদপুর, যশোহর—এই তিনটি জেলা পার হয়ে যেতে হবে বরিশাল। একটানা পনেরো ঘণ্টার পথ।
বাজুনিয়ার কাকিমার মুখে বরিশালের অনেক গল্প শুনেছে রুনু। তখন মনে হতো সে একটা স্বপ্নের দেশ। সেই বিখ্যাত বালাম চাল, মুসুরির ডাল, দুর্গা-টুনটুনির গান আর নারকেল-সুপারি বাগানে ঘেরা স্বপ্নের সেই দেশেই রুনু আজ চলেছে। যাবার পথে নদীর দুই তীরে মাইলের পর মাইল নাকি কেবল নারকেল-সুপারির বাগান। পুজোর আগে আগে গেলে কোথাও কোথাও দেখা যায় লাখো লাখো নারকেলের পাহাড়। সেসব বিশাল বিশাল নৌকায় করে চালান যাবে উত্তরের নানা বন্দরে। আবার শীতকালে দেখা যাবে পাকা সুপুরির স্তূপ। গরম কালে ডাবের পাহাড়। এই গরমকালে অবশ্য ডাবের পাহাড় ছাড়া পাকা নারকেল বা সুপুরির পাহাড় চোখে পড়ার কথা নয়।
এসব দৃশ্য দেখার চেয়েও আরও একটা বড় আকর্ষণ আছে এই পথে। বেলা দশটা নাগাদ এই স্টিমার যাবে মধুমতী বেয়ে গোবরা গ্রামের পাশ দিয়ে। যে গ্রাম যে নদী ওরা জন্মের মতো ছেড়ে এসেছে, সেই গ্রাম, সেই নদীতীর, দাদার দোকানঘরের সামনের সেই বটগাছটি, ওদের পরিত্যক্ত ভিটে—সবই দেখা যাবে স্টিমার থেকে। হয়তো নদীতীরে দেখা যাবে কোনও চেনা মানুষকেও। হরেকেষ্ট, সুশীলাদি, নগরকাকা, নগরকাকার বউ অথবা...। ভাবতেই একটা রোমাঞ্চিত পুলকে রুনুর সারা গা শিউরে ওঠে। মধুমতী নদীর তীরে দাঁড়িয়ে সগর্জনে দ্রুত ধাবমান বরিশাল মেলকে ও কত বার দেখেছে, আজ দেখবে ছুটন্ত স্টিমার থেকে জম্মের মতো ছেড়ে যাওয়া জন্মভূমিকে। এই দুই দেখার মধ্যে কত তফাত! স্টিমারে চড়া অবধি ওর চোখের উপর ভাসছে গোবরা গ্রামের সম্পূর্ণ ছবিটা।
রুনুর স্যুটকেস-বিছানা নিয়ে ওর দাদা ইন্দ্র এসেছিল ওকে স্টিমারে তুলে দিতে। ইতিমধ্যে খুলনা শহরের অনেকটা দাদার চেনা হয়ে গেছে। নতুন বাড়ির জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনাকাটা করতে ইন্দ্রকে বহুবার খুলনায় আসতে হয়েছে। এ বাড়ির পজিশনটা তার খুব মনে ধরেছে। এ শহর গোপালগঞ্জ থেকে অনেক বড়। মস্তবড় বাণিজ্যকেন্দ্র। ভবিষ্যতে এই শহরেই ছোটখাটো একটা দোকান দেওয়ার কথা ইতিমধ্যেই ভাবতে শুরু করেছে ইন্দ্র। উপার্জনের একটা পথ তো অবিলম্বেই করতে হবে। বৃদ্ধ বাপ-মা যে এখন তার মুখ চেয়েই রয়েছেন। এদিকে ইন্দ্রের বিয়ের কথাটাও পাকা হয়ে আছে। মায়ের ব্যস্ততায় অধৈর্য হয়ে বাবা কথা দিয়েছেন, নতুন বাড়ি গোছগাছ করে ছয়মাসের মধ্যেই তার বিয়ে দেবেন। সে-মেয়ের বাড়িও এবার খুব কাছে হয়ে গেল। নন্দনপুর থেকে তাদের গ্রামটা জলপথে মাত্র মাইলদশের পথ। বিয়ের বাবদেও কিছু খরচপত্রের ব্যাপার আছে। কোথা থেকে আসবে সেসব টাকা, যদি না ইন্দ্র কোনও কাজের ব্যবস্থা করে। সেই কাজের ধান্দাতেই তার বারবার খুলনায় আসা-যাওয়া। সেই সুবাদে রুনুর কথা ভেবে ইন্দ্র বরিশালের অনেক খবরাখবর নিয়েছে নানা লোকের কাছে। সে শহরটাও নাকি এক নদীর তীরে। নদীটার নাম কীর্তনখোলা। সেই নদীপথে সমুদ্র নাকি খুবই কাছে—মাত্র দশ-পনেরো মাইল। দেবেন্দ্রনারায়ণ রায়ের ঠিকানা হল 'কাউনিয়া'। জায়গাটা নাকি স্টেশন থেকে মাইলচারেক দূরে। আর দুখিরাম বিশ্বাসের 'অশ্বিনী রায় রোড' স্টেশন থেকে দুমাইলের মধ্যে। শহরটা নাকি মস্ত বড়। খুলনার দ্বিগুণ। তার একপ্রান্তে স্টেশন, অন্যপ্রান্তে বি. এম. কলেজ।
স্টিমারে উঠে ডেকের একটা ভালো জায়গা দেখে ইন্দ্র নিজ হাতে রুনুর বিছানা পেতে দিল সেই দিকটাতে যে দিকে পড়বে গোবরা গ্রাম। বলল, এই রেলিং ধরে দাঁড়ালিই সব দেখতি পাবি। মালপত্তর ছাইড়ে বেশিদূর যাস নে। স্টিমারে অনেক চোর-চোট্টা থাকে। দুফরবেলায় আচ্ছা করে ঘুমোবি। বিদ্যাশ-বিঁভুয়ে রাত্তিরি কোহানে থাকবি, হয়তো ঘুমটুম হবে না।
—এহেনে দাঁড়ালি আমাগো গোবরা গ্রাম দেখতি পাব?
—তাই জন্যিই তো এই দিকে বিছানা পাতলাম। —হেসে বলে দাদা, দেহিস তো আমার দোকানডা ঠিক আছে কিনা, আমার সেই বটগাছটা এহনও আছে কিনা। এ জন্মে আর হয়তো...
স্টিমার ছাড়তে এখনও প্রায় দশ মিনিট বাকি। রুনুর হাত ধরে বিছানায় বসিয়ে ইন্দ্র ওর পিঠে হাত রেখে বসল পাশাপাশি।
—এই যে যাচ্ছিস বিদ্যাশে, আবার কদ্দিনি আমাগে দেখা হবে, কে জানে। এখন তো গ্রীষ্মের ছুটি আর পুজোর ছুটি ছাড়া...। নতুন দ্যাশে নতুন নতুন মানুষির মধ্যে থাকবি, আমাগে কথা কি আর...
বলতে বলতে দাদার গলা ভারী হয়ে আসে।
দুচোখ ছলছল করে ওঠে রুনুরও। বরিশাল থেকে যে ইচ্ছা করলেই হুট করে আসা যাবে না, একথাটা এমন করে ভাবেনি ও আগে। দাদাকে জড়িয়ে ধরে বলে, তোমারে আমি কোনোদিনও...
কথা শেষ না করে কান্নায় ভেঙে পড়ে রুনু।
ইন্দ্র সান্ত্বনা দেয় ওকে—বোকা! তুই কি এখনও বাচ্চা আছিস? বড় হইছিস না? কলেজে পড়তি যাচ্ছিস। এম.এ., বি.এ. পাশ করলি তোরে যে কেমন দেখাবে আমি ভাবতিই পারি নে। তুই বড় না হলি এ সংসারের দুঃখু ঘোচবে না। আমি মুখ্যসুখ্যু মানুষ, আমি আর কতটুকু পারব? তবে তুই যদ্দিন না দাঁড়াচ্ছিস, তদ্দিন বাপ-মারে ঠিক টাইনে যাব—এ আমার প্রিতিজ্ঞে।
এই দাদাকে রুনুর অনেক বড় মনে হয়। মনে হয় না ও কেবল চার বছরের বড়। মনে হয়, একটা সংসারকে মাথায় করে রাখবার মতো একটা পূর্ণ মানুষ তার দাদা। সেই তুলনায় রুনু কত ছোট! ওর তো কোনও সামর্থ্যই নেই। ও কি কোনও দিনও দাদার মতো বুক টান করে বলতে পারবে 'বাবা মা-র পূর্ণ দায়িত্ব আমি নিলাম'?
রুনু কেবল বলতে পারল, তুমি আমার যে কত বড় দাদা! তোমার কত সাহস! তুমিই বাবার আসল ছেলে। আমি একটা অপদার্থ।
—দূর পাগল। শোন, কাজের কতা কই। রাত্তিরি এট্টা অজানা জায়গায় যাচ্ছিস তো, তখন আর ওইসব রায় মশাই, বিশ্বেস মশায়রে খুঁজতি বার হবি না। ওসব খোঁজাখুঁজি করবি সকালে।
—তয় রাত্তিরি থাকব কোহানে?
—ইস্টিশানের ওয়েটিং রুমে। ওহেনে শুনিছি ওয়েটিং রুমডাই একটা আস্ত দোতালা দালান। অনেকে রাত্তিরি থাকে তো। ফাস্ট কেলাশের যাত্রীরা থাকে দোতালায়। তুই থাকবি একতলায়। নীচে হোটেল আছে। রাত্তিরি হোটেলে খাবি। মাছ-ডাল-তরকারি প্যাট ভরে খাবি। বারো আনা পয়সা যখন নেবেই, তখন লজ্জা না করে চাইয়ে খাবি।
—স্টেশনে তো শুনিছি ঘোড়ার গাড়ি থাকে। তুমি তো বলিছ, অশ্বিনী দত্ত রোড বেশি দূর না। তয় এট্টা ঘোড়ার গাড়িতি করে উকিলকাকুর বাসায় গেলি দোষ কী? সে ও তো চার-পাঁচ আনার বেশি না।
—ওরে বোকা, বরিশাল হল মস্ত বড় শহর। অশ্বিনী দত্ত রোডটা দুখিরাম বিশ্বেসের, তা তো তুই জানিস না। নতুন লোক, আবার ছেলেমানুষ তুই, কোনো বদমায়েশ গাড়োয়ান যদি তোরে বিপদে ফেলে? যদি তোর টাকাকয়ডা কাইড়ে নেয়?—অভিভাবকের গলায় বলে ইন্দ্র।
রুনু বলে, আচ্ছা, উকিলকাকুর বাসায় না যাইয়ে প্রথমেই যদি কাউনিয়ার সেই রায় মশায়ের বাড়ি যাই। তিনি নাকি খুব বড়লোক, বিখ্যাত লোক। তারে নিশ্চয় চেনবে সব গাড়োয়ান।
—তা না হয় চেনল, কিন্তু তুই তো চিনিস নে তেনারে। রাত-বিরেতে অনেক বিপদ হতি পারে। তুই তো বললি 'কাউনিয়ার রায়মশায়ের বাড়ি যাব', কিন্তু গাড়োয়ান যদি তোরে অঘাটে অস্থানে নিয়ে যায়, তুই ঠেকাবি কী করে? তুই তো চিনিস নে কাউনিয়া কোন দিকে। তক্কো করিস নে। যা কই শোন। রাত্তিরি ইস্টিশনেই থাকবি। স্যুটকেসটারে মাথার তলে নিয়ে শুবি। এখন নিজির দায়িত্ব তোর নিজির নিতি হবে। সবদিক বিবেচনা করে চলতি হবে। বিদ্যাশে বিপদে পড়লি কেডা তোমারে বাঁচাবে চাঁদু?
স্টিমার ছাড়ার প্রথম বাঁশি বেজে উঠল। এক্ষুনি সিঁড়ি তুলে ফেলবে। একলাফে উঠে দাঁড়াল ইন্দ্র। রুনু দাদাকে প্রণাম করল। ইন্দ্র ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল, এইবার শুরু হল তোর আসল জীবন-যাত্রা। এতদিন বাবা তোরে হাতে ধরে চালাইছেন, এইবার চলতি হবে নিজের পায়ে। তোর যাত্রা সফল হোক—তোর মুখ্যু দাদার এ-ই আশীব্বাদ। দাদারে ভুলে যাস নে। কোন বাড়িতে জায়গা পালি, কবে কলেজে ভর্তি হলি—সব খবর দিয়ে চিঠি দিবি।
কথা শেষ করেই দৌড়ে নেমে গেল দাদা।
ইন্দ্র যদি ফিরে তাকাত, দেখত, রুনুর দুচোখে নেমেছে তপ্ত অশ্রু ধারা। দাদার শেষ কথাগুলি ওর সমস্ত সত্তাটাকে যেন নাড়াচাড়া দিয়ে জাগিয়ে দিয়ে গেল। কে বলে, এই দাদা ওর মুখ্যু দাদা!
'এবার চলতি হবে নিজির পায়ে...এবার চলতি হবে নিজির পায়ে'—দাদার কথাগুলি ও মন্ত্রের মতো জপ করছিল। স্টিমারের মাথাটা ঘুরে যেতেই তীরভূমি অদৃশ্য হয়ে গেল, অদৃশ্য হয়ে গেল দাদাও।
ভোর সাড়ে পাঁচটায় খুলনা স্টেশন ছেড়েছিল বরিশাল মেল। ক্রমে ক্রমে বেলা বেড়েছে, একটা একটা করে অচেনা স্টেশন পার হয়ে এসেছে স্টিমারটা। রুনু একবার নীচে ঘুরে দেখে এসেছে, স্টিমারের বিশাল বয়লারের নীচে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। দুটো মানুষ সেই আগুনের কাছে দাঁড়িয়ে মাঝে মাঝে সেই আগুনের মধ্যে বেলচায় করে কাঁচা কয়লা ফেলে দিচ্ছে। সেই আগুনে জল ফুটছে বয়লারের মধ্যে। তারই শক্তিতে অতবড় ইঞ্জিনটা ভয়ঙ্কর গর্জন করে এতবড় জাহাজটাকে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এই যান্ত্রিক কাণ্ডকারখানা সম্পর্কে রুনুর বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না আগে। আজও কি বুঝল কিছু? শুধু বুঝল সামান্য বাষ্প থেকে কী প্রচণ্ড শক্তি সৃষ্টি করেছে বিজ্ঞান।
রুনু আবার ফিরে এসে দাঁড়াল ওর সেই নির্দিষ্ট স্থানটিতে রেলিঙ ধরে। তখন বোধ হয় বেলা দশটা হবে। স্টিমারটা মানিকদার মোড় ঘুরতেই হঠাৎ চমকে উঠল রুনু। আরে, এই তো ওর চেনা এলাকা, ওর চেনা মধুমতী! স্টিমার থেকে এত চেনা জায়গাকেও কেমন অচেনা-অচেনা লাগছে। মানিকদা ছাড়িয়ে স্টিমারটা দ্রুতবেগে এগিয়ে চলেছে দক্ষিণ দিকে, ওদের গোবরা গ্রামের দিকে। ব্যাকুল চোখে তাকিয়ে আছে রুনু, যদি কোনও চেনা মানুষ চোখে পড়ে। মিয়াপাড়ার ঘাটে কিছু মানুষ চোখে পড়ল, এত দূর থেকে কারুর মুখ অবশ্য স্পষ্ট চেনা গেল না। চোখে পড়ল, কাপালীপাড়ার কেউ কেউ মাঠে চাষবাসের কাজ করছে, কিছু উলঙ্গ, অর্ধউলঙ্গ শিশু কৌতূহলী চোখে দেখছে স্টিমারটাকে। দেখা গেল বুনোপাড়ারও কয়েকজনকে। কেউই কিন্তু তাকাল না রুনুর দিকে, কেউ চিনল না ওকে। রুনুও কাউকে চিনতে পারল না। আজন্মের চেনা গ্রামটাকে আর পাঁচটা গ্রামের মতোই অচেনা মনে হল ওর। অদ্ভুত একটা বিষাদে, একটা বিচ্ছেদ-বেদনায় ওর বুকটা ভার হয়ে এল। বুকের মধ্যে ওর মোচড় দিয়ে উঠল দাদার দোকানটা অর দোকানের সামনে দাদার নিজের হাতে লাগানো সেই বটগাছটাকে চিনতে পেরে। ওই দোকানটাকে ঘিরে দাদার কত স্বপ্ন, ওই গাছের ছায়ায় বসে দাদার কত পরিকল্পনা! স-ব ভেসে গেছে মধুমতীর স্রোতে। ওই দোকানটা এখন পরের হাতে চলে গেছে। ও হয়তো ভুলে যাবে দাদাকে, কিন্তু ওই বটগাছ? সে কি দাদাকে ভুলতে পারবে? দাদা যে ওর জন্মদাতা! ওর পত্র-মর্মরে চিরকাল কৃতজ্ঞতা জানিয়ে যাবে ইন্দ্রজিৎকে।
যতক্ষণ দেখা যায়, বটগাছটার দিকে তাকিয়ে রইল রুনু। কত স্মৃতি, কত কথা, কত মুখ ভিড় করে আসছে ওর মনে! অকারণেই দুচোখ ক্ষণে ক্ষণে ভরে আসছে জলে।
সারা স্টিমারটায় অন্তত দু-তিনশো যাত্রী। অনেকেই দলবল নিয়ে গল্প-গুজব করছে। কোথাওবা কয়েকজন গোল হয়ে বসে তাস খেলছে। কেউই রুনুর চেনা নয়। ওর কোনোসঙ্গী নেই। এ এক অদ্ভুত নিঃসঙ্গতা। জীবনে এমন অনুভূতি রুনুর আর হয়নি কোনোদিন।
একসময় শেষ হয়ে গেল রুনুর চেনা এলাকা। আর এক মাইল পরেই মোল্লারহাট, তারপর গিরিশনগর স্টেশন—ফরিদপুর জেলার শেষ স্টেশন। তার পরের স্টেশনটা পড়েছে বরিশাল জেলায়। পাটগাতি থেকেই বরিশাল জেলা শুরু। সামনের দীর্ঘপথে আর কোন চেনা মুখ দেখার আশা নেই। একটা দুর্জ্ঞেয় ভয় রুনুকে যেন ক্রমেই ঘিরে ধরছে। একটা একেবারে অচেনা জায়গায় রাত্রে পৌঁছবে ও একা। পকেটের তিনখানা চিঠি তখন কোনও কাজেই আবে না। রুনুর অভিমান হল দাদার উপর। চিরকাল দাদার উপর সব দায় ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতেই অভ্যস্ত ও। এবারও কি দাদা আসতে পারত না তার সঙ্গে? অন্তত দুটো দিনের জন্য? দাদা তো ওকে নিজের পায়ে দাঁড়াবার উপদেশ দিয়েই খালাস! কিন্তু সে পাদুখানাই যে এখন ভয়ে দুর্ভাবনায় টলমল করছে! তবু দুই তীরের দৃশ্য মাঝে মাঝে ওকে অন্যমনস্ক করে রাখছে। সত্যিই এমনি মাইলের পর মাইল যে কেবল নারিকেল-সুপুরির বাগান থাকতে পারে, এ জিনিস না দেখলে বিশ্বাসই হতো না।
স্টিমার যতই এগোচ্ছে ততই তীরের দৃশ্যপট বদলে যাচ্ছে। বদলে যাচ্ছে নদীর রূপ, বদলে যাচ্ছে সহযাত্রীদের ভাষাও। ঝালকাঠির পর থেকে যত যাত্রী উঠল তাদের সকলের ভাষাই বরিশালী। ঠিক বাজুনিয়ার সেই কাকিমার ভাষা। সে ভাষা কাকিমার মুখে মিষ্টিই শোনাত, কিন্তু পুরুষের মুখে ভাষাটা যেন কেমন রুক্ষ গোঁয়ার-গোঁয়ার মনে হয়। মনে হয়, লোকগুলো যেন রেগেই আছে সবসময়। নরম সুরে পুরুষেরা বুঝি কথা বলতেই জানে না।
একসময় রুনুর খেয়াল হল, সারা পৃথিবীরই দৃশ্যপট বদলে যাবে একটু পরেই। জলের উপর সান্ধ্য আকাশের রক্তআভা জানান দিচ্ছে, অন্ধকার ঘনিয়ে আসতে আর দেরি নেই। বুকের মধ্যে সেই অজানা ভয়টা আবার গুর গুর করে উঠল।
হঠাৎ স্টিমারের সামনের হেডলাইট জ্বলে উঠতেই দৌড়ে পালাল সামনের অন্ধকার। ঝিলমিল করে উঠল নদীর বুক। রুনু দৌড়ে গেল আলোটার কাছে। বিশাল একটা যান্ত্রিক আলোর পাশে বসে একটা মানুষ সেটাকে মাঝে মাঝে এদিক-ওদিক ঘোরাচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে দুপাশের তীরের গাছগুলি পর্যায়ক্রমে আলোকিত হয়ে উঠছে। নদীতীরে গাছগুলি পর্যায়ক্রমে আলোকিত হয়ে উঠছে। নদীতীরে মাঝে মাঝে এক-একটা সাদারঙের পোস্টের মাথায় একটা সাদা চক্র অথবা সাদা ক্রসচিহ্ন দেখা যাচ্ছে। খানিকক্ষণ লক্ষ্য করে রুনু বুঝল, তীরে আলো ফেলে ওই লোকটা নারকেল বাগানের নৈশ শোভা দেখছে না আদৌ, আলো ফেলে লোকটা ওই সাদা চিহ্নগুলি উপরের কেবিনে কর্মরত সারেঙ সাহেবকে দেখাচ্ছে। তিনি ওগুলি দেখে স্টিমারের গতি-পথের নিশানা জানাচ্ছেন নীচের কলঘরের লোকটিকে ঘণ্টা বাজিয়ে। সেই ঘণ্টার নির্দেশমতো সে জাহাজের হাল কখনও ডাইনে ঘোরায়, কখনও বাঁয়ে ঘোরায়, কখনও গতি বাড়ায়, কখনও বা গতি কমায়। এক-এক রকম ঘণ্টার এক-এক রকম নির্দেশ। উপর-নীচে বারকয়েক আসা-যাওয়া করে রহস্যটা এখন আর রুনুর কাছে রহস্য নেই।
এই আলোর খেলাও ওকে কিন্তু বেশিক্ষণ অন্যমনস্ক করে রাখতে পারল না। স্টিমারটা যতই এগিয়ে চলেছে শেষ স্টেশনের দিকে, ততই ভয়-দুর্ভাবনায় ও কালো হয়ে উঠছে।
একসময় চারিদিকে একটা শোরগোল উঠল—আইয়া পড়ছি, আইয়া পড়ছি! সব বাইন্দা-ছাইন্দা লও।
আলোর ফোকাসটা তীরে পড়তেই মস্ত জেটিঘাট, দালান-কোঠা অসংখ্য ছোট-বড় নৌকা, আর জেটির উপর অনেক মানুষের ভিড় দেখে বুঝতে অসুবিধা হল না যে, সত্যিই এবার স্টিমারটা এসে পড়ল বরিশালে। যে যার বিছানাপত্র বাঁধা-ছাঁদা শুরু করল। সারা জাহাজে একটা ব্যস্ততার সাড়া জেগেছে। বিছানাটা গুটিয়ে বেঁধে ফেলল রুনু। স্যুটকেসের উপর রাখল বিছানাটা। তারপর শুরু হল ভাবনাঃ কী করবে ও? দাদার পরামর্শমতো স্টেশনের ওয়েটিং রুমেই কাটিয়ে দেবে রাতটা? যদি ও ঘুমিয়ে পড়ে, বিপদ তো সেখানেও হতে পারে। একটা ঘোড়ার গাড়ি ভাড়া করে সরাসরি দুখিরাম বিশ্বাসের বাড়ি চলে যেতে বলেছিলেন বাবা। তিনি নাকি বরিশালের একজন বিখ্যাত উকিল। কোনও না কোনও গাড়োয়ান তাঁর বাড়ি নিশ্চয়ই চিনবে। পঞ্চাশ টাকা ছাড়াও বাবা ওকে আরও পাঁচ টাকা হাতখরচা বাবদ দিয়েছেন। খুচরো খরচের জন্য তার দুটো টাকা ভাঙিয়েও দিয়ে গেছে দাদা। গাড়িভাড়া দিতে ওর অসুবিধা হবে না। সে নাকি চাঁর-পাঁচ আনার বেশি নয়। অবশ্য কাউনিয়ার দূরত্ব বেশি, ভাড়াও বেশি। এ রাত্রে কাউনিয়া যাবার কথা রুনু ভাবছে না। তবে উকিলকাকুর বাসায় যেতে পারলে ভালো হতো। রাতটা নির্ভয়ে কাটত, দাদা যা ভয় দিয়ে গেছে! কী করবে ভেবে পাচ্ছে না রুনু। হোটেলের খরচটাও বাঁচত। কিন্তু শেষমুহূর্তে এই অবস্থাটাকেই বুঝি বলে 'কিংকর্তব্যবিমূঢ়'। এই শব্দটা রুনুর জানা, কিন্তু এর অর্থটা এমন হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করেনি আগে।
রুনুর পাশেই মস্ত একটা দল তাদের প্রচুর মালপত্তর আর গোটাতিনেক দুরন্ত বাচ্চা সামলাতে প্রচুর হই চই করছিল। ওদের কথাবার্তার মাধ্যমেই রুনু বুঝতে পারছে, মধ্যবয়সি মোটাসোটা বিশাল-ভুঁড়ি, বিস্তীর্ণ টাক, গুঁফো লোকটাই দলের কর্তা। প্রায় অনুরূপ মোটাসোটা মহিলাটি ওঁর গিন্নি। সুশ্রী অল্পবয়সি বিবাহিতা মহিলাটি হচ্ছেন গিন্নির বোন। গুঁফো ভদ্রলোকটিকে তিনি সম্বোধন করছিলেন 'জামাইদা' বলে। আর চোদ্দো-পনেরো থেকে তিন-চার বৎসরের বাচ্চাবাহিনীটা এই দুই মহিলার ছেলেমেয়ে। কর্তা সবাইকে গম্ভীর গর্জনে অনেক উপদেশ-আদেশ দিচ্ছিলেন। গিন্নির বোনটি সুচতুরা বাকপটিয়সী, কিন্তু গিন্নি স্বয়ং স্বল্পবাক।
রুনুর চোখ-মুখের দিকে তাকিয়েই বোধ হয় ওর দুরবস্থাটা আন্দাজ করেছিলেন গিন্নি। ওর কাছে এসে সস্নেহ গলায় প্রশ্ন করলেন তিনি, তুমি কনে যাইবা খোকা?
রুনু এই আচমকা প্রশ্নে থতমত খেয়ে বলে, বরিশাল।
রুনুর উত্তর শুনে সারা দলটার মধ্যে একটা হাসির রোল উঠল।
এবার এগিয়ে এলেন কর্তা বললেন, বরিশাল কি এট্টা বাড়ি, না এট্টা ঘর? বলি, বরিশালের কনে যাইবা?
—দুখিরাম বিশ্বাসের বাড়ি।
হেইডা আবার কেডা?—উপহাসের সুরে বলেন কর্তা।
—তিনি বরিশালের একজন বিখ্যাত উকিল।
—সব হালাই নিজেরে কয় বিখ্যাত। বলি, হ্যার বাড়িডা কনে?
ওর বলার ধরন দেখে মনে মনে রেগে যায় রুনু। গম্ভীর গলায় বলে, অশ্বিনী দত্ত রোডে।
ওমা, মোগো বাড়িও তো অশ্বিনী দত্ত রোডে!—এবার সাগ্রহে বলেন গৃহিণী কী নাম কইল্যা যেন? হ্যার নাম তো কই শুনি নাই।
অতঃপর দলটার দিকে তাকিয়ে বলেন গৃহিণী, তোমরা শোনছনি কেউ?
না, কেউ শোনেনি দুখিরাম বিশ্বাস নামক বিখ্যাত উকিলের নাম। সারা শরীর ভয়ে কাঁটা হয়ে উঠল রুনুর।
সইত্য কথা কও দেহি পোলা, কনে যাইবা?—এবার ধমকের সুরে বলেন কর্তা, এই তো এট্টুখানি পোলা। লগে আছে কেউ?
এই মানুষটির কথাবার্তা মোটেই ভালো লাগছে না রুনুর। ও তেজের সঙ্গে বলে, না, আমি একাই আইছি। বি. এম. কলেজ পড়তি আইছি।
এবার খিলখিল করে হেসে উঠল সেই অল্পবয়সি মহিলাটি। হাসতে হাসতে বলে জামাইদা, অর বাড়ি নিঘঘাৎ যশোহর। যশৈরা বাঙাল। শোনলা না কইল, 'পড়তি আইছি'? অরা কয়, 'খাতি নাতি বেলা গেল, শুতি পাল্লাম না।'
রুনু একবার ভাবল প্রতিবাদ করে যে, ও 'যশৈরা' নয়, 'ফরিতপুইরা' বাঙাল তারপর কী ভেবে চুপ করে গেল।
এদিকে রুনুর কলেজে পড়তে আসার ব্যাপারটা দেখা গেল ভদ্রলোকটিকে বেশ কৌতূহলী করে তুলেছে। জিগ্যেস করলেন, সইত্য কইছ? ম্যাট্রিক পাশ করছ কোন ডিবিশনে?
আমি মিথ্যা কথা বলি না। ফার্স্ট ডিভিশনে পাশ করিছি। দুটো লেটারও পাইছি। মার্কশিট আছে আমার সুটকেসে। দেখবেন?—বুক ফুলিয়ে বলে রুনু।
এবার ভদ্রলোক যেন কিঞ্চিৎ নিস্তেজ হয়ে পড়লেন। দলের প্রায় সকলেই রুনুর দিকে তাকিয়েছে ওর দৃঢ় কণ্ঠের জবাব শুনে।
গিন্নি একেবারে ওর কাছটিতে এসে কাঁধে হাত রেখে বললেন, ওমা, এ যে সোনার চাঁদ পোলা গো! অর মুখখান দেখখ্যাই বুঝছি আমি। আমার পোড়ামুহাডা তো এবারও ফেল মারল। মোগো হারাইন্যার আর এ জন্মে কলেজে পড়া হইব না। ও সোনা, তোমার নামডা কী কও তো?
নাম বলল রুনু।
—একা একা এই বিদ্যাশে পাঠাইয়া দিয়েছে তোমার মায়? হ্যার পরান পোড়ে না?
তা কি আর পোড়ে না!—বলে রুনু, কিন্তু আমার যে লেখাপড়া শিখে মানুষ হতি হবে। আমি মানুষ না হলি আমার বুড়ো মা-বাবার দুঃখু সারবে কী করে? তাই মায়ের কোল ছাইড়ে...
—আহা, কী মিষ্ট কথা! শোনলেও পেরান জুড়োয়! ও সোনা, আমার এট্টা কথা শোনবা?
—বলেন।
—তুমি আইজ রাইতে মোগো লগে চলো। রাইতটা মোগো বাড়িতে থাকো। সকাল হইলে মোর পোলা হারাইন্যা তেমার সেই উকিলবাবুরে খুঁইজ্যা দিবে। অশ্বিনী দত্তের পিঁপড়া-ডারেও চিনে আমার পোলা। কেমন, যাইবা?
রুনু যেন হাতে স্বর্গ পেল। সঙ্গে সঙ্গে ভদ্রমহিলাকে প্রণাম করে বসল। তিনি ওকে কোলের কাছে টেনে এনে মাথায় হাত রেখে বললেন, বাঁইচ্যা থাকো সোনা। শতেক পরমাই হউক।
হারাইন্যা নামক সেই ম্যাট্রিক-ফেল ছেলেটিকে না দেখে না চিনেই রুনু ওর বরিশালের প্রথম বন্ধুরূপে বরণ করল মনে মনে। আর প্রকাশ্যে এই মহিলাকে বরণ করল মাসিমারূপে। প্রাণ ভরে তাঁর আশীর্বাদ মাথায় নিয়ে রুনু এবার অসঙ্কোচে বলল, মাসিমা, আপনার এই উপকার আমি জীবনে ভোলব না। এতক্ষণ আমার যে কী ভয় করতিছিল! আপনার দয়ায় সব ভয় কাইটে গেল। কাল সকালে আমি নিজিই উকিলকাকুরে খুঁজতি পারব।
মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে এমন একটি মমতাময়ী মাসিমা লাভ করে রুনুর সারাদিনের নিঃসঙ্গতার দুঃখটা মুহূর্তে কেটে গেল।
রুনুকে একাকী যাত্রা করিয়ে দিয়ে শ্রীনাথ পণ্ডিত বলেছিলেন, জীবনে কোনও দিন ভয়কে প্রশ্রয় দিস নে বাবা। জানবি, মুশকিল যিনি সৃষ্টি করেন, মুশকিল আসানও করেন তিনিই। ওগুলি তাঁর পরীক্ষা। আর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়াই তো সার্থক জীবন। জীবন একটা যুদ্ধক্ষেত্র। এই যুদ্ধে জয়ী হতি হবে সাহস আর বুদ্ধি দিয়ে।
মনে মনে সেই মুশকিল আসান দেবতাকে ধন্যবাদ জানিয়ে এই সদ্য-পরিচিত মাসিমার পাশে পাশে নির্ভয়ে নিঃসঙ্কোচে বরিশালের মাটিতে পা রাখল রুনু। তখনও কি জানত রুনু যে, জীবনের অগ্নিপরীক্ষা এখনও অনেক বাকি!
দুখানা ঘোড়ার গাড়ির পেট-বোঝাই মানুষ আর পিঠবোঝাই মালপত্র নামল একটা দোতলা বাড়ির দোরগোড়ায়।
মাসিমা দলটিকে নামিয়েই চিৎকার শুরু করলেন, অরে হারাইন্যা, হারাইন্যা রে, ঘরে আসছ?
ঘর থেকে সাড়া এল—তোমরা আইজই আইয়া পড়লা? আওনের কথা তো কাইল।
—দরজা খুলবি তো আগে। পরে কমুহানে সব।
বলতে বলতে সামনের বিরাট দরজাটা খুলে গেল। আলোকিত হয়ে উঠল বারান্দাটা। সেই আলোয় দেখা গেল, পাজামা-পাঞ্জাবি-পরা বিশ-বাইশ বছরের একটি স্বাস্থ্যবান ছেলে নেমে আসছে সিঁড়ি বেয়ে।
হারাইন্যা নামক ছেলেটিকে এবার চিনল রুনু।
একদিন আগেই আইয়া পড়লাম রে।—বললেন মাসিমা।
—ক্যান?
—বিয়াবাড়ির ভিড়ের মইধ্যে শোওনের জায়গা নাই, বওনের জায়গা নাই, অর মইধ্যে মানুষ টেকতে পারে? নে, মালপত্তরগুলানে এট্টু হাত লাগা।
গাড়োয়ানের হাত থেকে মালপত্র সামলাতে সামলাতে হারাইন্যা মেজাজীগলায় বলে, কইছিলাম না, হগ্গোলডিরে, লইয়া যাইবার কাম নাই, কেবল বড়রা কয়জন যাও। তখন তো শোনলা না! বোঝো ঠ্যালা অখন। ওগুলান তো সব কাশতে লাগছে।
—নে, তোর আর সর্দারী করনের কাম নাই। দেখখ্যা-শুইন্যা সব তুইল্যা ফেলা।
সবার পিছনে দাঁড়িয়ে একাগ্রদৃষ্টিতে রুনু দেখছিল হারাইন্যাকে। কী উজ্জ্বল স্বাস্থ্য, কী বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা! রুনুর অন্তত চার-পাঁচ বছরের বড় তো হবেই। দাদার মতো নাকের নীচে বেশ পরিষ্কার গোঁফ দেখা যাচ্ছে। এই ছেলেটিই কি ম্যাট্রিক ফেল করেছে? কই, এর চোখে-মুখে তো ব্যর্থতার কালিমা পড়েনি এতটুকুও! হঠাৎ রুনুর চোখে চোখ পড়তেই ছেলেটি মাসিমাকে প্রশ্ন করে, এই পোলাডারে তো চেনলাম না। হেই বিয়াবাড়ির কেউ? মোগো নতুন কুটুম?
—ও এট্টা সোনার চাঁদ পোলা রে। চল, ঘরে চল, সব কমুহানে।
নতুন মাসিমার পিছন পিছন ঘরে ঢুকল রুনু দুহাতে নিজের সুটকেস-বিছানা নিয়ে।
সামনেই মস্ত একটা হলঘর। তার প্রায় অর্ধেকটা জুড়ে বিরাট ফরাস পাতা। ফরাসের উপর গোটাকয়েক মোটা মোটা তাকিয়া। ফরাসের ডান দিক দিয়ে অন্দরে যাওয়ার দরজা। সেই দরজা দিয়েই হাতে হাতে সব মালপত্র চলে গেল ভিতরে। কেবল ফরাসের এককোণে রাখতে বলা হল রুনুর জিনিসপত্র। একে একে সকলেই চলে গেল ভিতরে। বাইরের হলঘরে কেবল রুনু আর মাসিমা। ইতিমধ্যে সেই হারাইন্যা নামক ছেলেটি ভিতর থেকে মালপত্র রেখে এসে রুনুকে দেখিয়ে প্রশ্ন করে, অর কথা তো কইলা না মা?
—কমু বলিয়াই তো খাড়াইয়া আছি। জানস, মেট্রিকে ও ফাস্টো হইছে এবার। ওইটুকু পোলা মায়ের কোল ছাইড়া এই বিদ্যাশে আইছে কলেজে পড়তে। তুই তো কেবল ফেলই করতে আছস। নে হারামজাদা, অর পায়ের ধূলা নে।
রুনু সভয়ে সরে দাঁড়ায়।
বিস্ময়ভরা চোখে হারাইন্যা বলে, তু—আপনে ইউনিভার্সিটিতে ফাস্ট হইছেন এবার!
লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে রুনু বলে, দূর দূর মাসিমা কী যে বলেন! শুধু ফার্স্ট ডিভিশন পাইছি।
ওই তো হইল। ফাস্টো তো হইছ!—মাসিমা নিজের বক্তব্যে অটল।
রুনু কেবল বোকার মতো হাসল। মাসিমাকে বোঝাবার সাধ্য ওর নেই। হারাইন্যা অবশ্যই বুঝল। হেসে বলল, বোঝলাম।
এইসময় কর্তা সাজ পোশাক ছেড়ে দুভাঁজ করা ধুতি লুঙির মতো পরে তার উপর গেঞ্জি চড়িয়ে এলেন বাইরের ঘরে। ওদের কথার মাঝে বলেন, ফাস্টো ডিভিশন কি ফ্যালনা হইল? আবার দুগা লেটারও পাইছে। তুই তো তিনডা বছর মাটি কইর্যা থাড্ডিবিশানও পাইলি না।
বারবার রুনুর সঙ্গে হারানের তুলনা করায় লজ্জা পাচ্ছে রুনু। প্রসঙ্গটা এড়াবার জন্য হারানকে ও প্রশ্ন করল, আপনি দুখিরাম বিশ্বাস মশায়ের বাড়ি চেনেন? এই রাস্তায়ই তো তাঁর বাড়ি। এখেনকার একজন বিখ্যাত উকিল।
হো-হো করে হেসে উঠল হারান। সে হাসি আর থামে না।
হাসচ ক্যান মুখেপোড়া? হ্যারে চেনস?—বললেন মাসিমা।
—চিনুম না? তারক দাস উকিলের মুহুরী দুইখ্যা বিশ্বাসেরে চেনে অনেকেই। একখান চোখা মুহুরী! হ্যার চোখে মুখে কথা। কথা বেইচ্যা খায়। যা কয়, তার চৌদ্দ আনা মিছা কথা।
এবার কর্তাও হাসলেন প্রাণখোলা হাসি। প্রসন্নমুখে বললেন, কইছিলাম না, বিদ্যাশেত্তে দ্যাশে গেলেই সব হালায় বিখ্যাত হইয়া যায়। আপিসের আরদালী হয় বড়বাবু। চৌকিদার হয় দারোগাবাবু। অহন বোঝো তো পোলা, গিন্নি যদি তোমারে ধইরা না আনত আজ সারা রাইতেও তো তোমার সেই বিখ্যাত উকিলের নাগাল পাইতা না।
কথাটা মর্মান্তিক সত্য। রুনুর মুখে আর কথা নেই।
শোন হারাইন্যা,—বললেন গৃহিণী, তগো লগে ওর খাওনের ব্যবস্থা করবি। রাইতে তর ধারেই অরে শুইতে লবি। হ্যার পর কাইল দেইখ্যা-শুনিয়া সব ব্যবস্থা করন যাইব। আয় একটা সোনার চাঁদ পোলা, অর যেন কষ্ট না হয়। তুমি সোনা অখন অর লগে কথা কও। আমি কাপড়-চোপড় ছাইড়া আহি।
রাত্রে ফরাশের উপর হারানের বিছানার পাশেই পাতা হল রুনুর বিছানা। ইতিমধ্যে রুনু দেখেছে, হলঘরের এককোণে হারানের পড়ার টেবিল। দেয়ালের সঙ্গে বইয়ের তাক। টেবিলেও রয়েছে ছড়ানো কিছু বইপত্র।
খাওয়া শেষ করে আসবার সময় হারাম সন্তর্পণে অন্দরের দিকের দরজাটার শিকল টেনে দিয়ে এসেছে। এখন আর কেউ আসবে না এই ঘরে। অসঙ্কোচে টেবিলের ড্রয়ার থেকে সিগারেট দেশলাই বের করে এনে ও বসল ওর বিছানায় রুনুর মুখোমুখি।
—তোমরা তো ভালো ছাত্তোর। বিড়ি-সিগারেট খাইবা না। আমি খাইলে আপত্তি নাই তো?
—না, না, আপত্তি কী? আমার দাদা তো আপনার বয়সি। দাদাও বিড়ি খায়।
—তুমি খাও না?
—না।
হে তোমার রাঙা ঠোঁট দেইখ্যাই বুঝছি।—বলতে বলতে একটা সিগারেট ধরাল হারান।
—আপনি কি এই বাইরের ঘরেই শোন বরাবর? না, আমার জন্যি আজ...
ক্লাস টেনে উইঠ্যাই লায়েক হইছি তো!—হেসে বলে হারান, হেই থিকা এই বাইরের ঘরেই পড়ার জায়গা, শোওনের জায়গা কইরা লইছি। বুড়া-বুড়ির সামনে এইসব খাইতে-টাইতে অসুবিধা হয় তো। তবে অরা জানে।
—ওঁরা বকেন না?
—বইক্যা তো গেছিই, আর বকব কী! বন্ধুগো লইয়া আড্ডা মারনের অখন খুব সুবিধা হইয়া গ্যাছে। নেও, অখন ঘুমাইয়া পড়ো। কাইল তোমারে দুইখ্যা বিশ্বাসের চিনাইয়া দিমু।
কিন্তু বাবার বর্ণিত দুখিরাম বিশ্বাস আর হারানের বর্ণিত দুইখ্যা বিশ্বাস একই ব্যক্তি কিনা এ সম্বন্ধে রুনুর মনে একটু দ্বিধা তখনও রয়ে গেছে। ও বলল, আচ্ছা, দুখিরাম বিশ্বাস নামে একজন উকিলও তো থাকতি পারেন এই রাস্তায়। মাসিমা তো বললেন, অশ্বিনী দত্ত রোড খুব বড় রাস্তা।
—দেখো পোলা, এই বিশটা বছর ধইর্যা অশ্বিনী দত্ত রোড চইষ্যা বেড়াইতে আছি। ইয়ার পিঁপড়াডারেও আমি চিনি।
—কিন্তু বাবা যে বলিছেন, তিনি স্ত্রী-পুত্র নিয়ে এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন।
—স্ত্রী-পুত্র নিয়া! হোঃ হোঃ হোঃ! বলি, স্ত্রী-পুত্র থাকলে তো? কোনওদিন আছিল কিনা জানি না। আমরা তো চিরকাল দেইখ্যা আইলাম হ্যারে তারক উকিলের বৈঠক খানায় রাইত কাটাইতে। হ্যার হাট-বাজারও কইর্যা দেয়। এই রাস্তা দিয়াইতো প্রতিদিন বাজার করতে যায়। কাইল সক্কালেই দেখাইয়া দিমুনে দুইখ্যাদারে। হ্যাও তো তোমার মতো ফরিদপুইর্যা বাঙাল। হ্যাও কয়, 'খাতি নাতি বেলা গেল।' কেমন ঠিক কইছি না?
রুনু এবার নিঃসন্দেহ হল।
তোমার বিখ্যাত উকিল শ্রীল শ্রীযুক্ত দুখিরাম বিশ্বাসেরে লইয়া কাইল একটু মজা করন যাইব। তোমার বাবা যে চিঠি দিছেন তারে, হেইডা দিবা তার হাতে। তখন দেখবা চোখ মুখের ভাবখানা!—বলে হাসতে থাকে হারান।
রুনু সন্ত্রস্ত হয়ে বলে, না, না, ও চিঠি আমি কোনও দিনও দেবো না তাঁরে। আমি পরিচয়ই দেবো না। তিনি লজ্জা পাবেন। তার চেয়ে বরং একটা উপকার যদি...
—বলো।
—আচ্ছা, আপনি কাউনিয়া চেনেন?
—কাউনিয়া চিনুম না ক্যান? সারা বরিশাল টাউনের হগ্গল রাস্তাই আমার মুখস্থ।
—ওখানে গভর্নমেন্ট কন্ট্রাক্টার দেবেন্দ্রনারায়ণ রায় মশায়ের বাড়িটা চেনেন?
—হেইডা তো চেনলাম না। তবে আন্দাজে মনে লয়, খগেইন্যার বাপ-কাকা কেউ হইব।
—তিনি কে?
—তিনি একখান পোলা বটে! সারা শহরে বুক ফুলাইয়া বেড়ান। হ্যার পুরা নাম শুনছি খগেন্দ্রনারায়ণ রায়। নামের মিল দেখখ্যা আন্দাজে কইলাম।
—তাঁর বাড়িটা চেনেন?
—ক্যান, তারে চিন্যা কী হইব?
—ওই দেবেনবাবুর নামে একখানা চিঠি দেছেন আমাদের ওখেনকার স্কুল ইনস্পেকটরসাহেব, তাঁর বাড়িতে যাতে আমার থাকার ব্যবস্থা...তাঁর বাড়িটা যদি একটু খুঁজে দিতি সাহায্য করেন কাল।
—তা খুঁইজ্যা দেওন যাইব। দুইখ্যা বিশ্বাস তো বরবাদ হইল, অখন বুঝি হ্যাগো বাড়ি থাকনের কথা ভাবছ?
কারও বাড়িতে স্থান না পালি যে আমার কলেজে পড়া হবেই না হারানদা!—বিষণ্ণ গলায় বলে রুনু, আমি বরাবর পরের বাড়ি থাইকেই পড়িছি।
—তুমি আমারে হারানদা ডাকলা। আমি তোমারে কী কইয়া ডাকুম?
—দাদা আমারে রুনু বলে ডাকে। আপনিও তা-ই ডাকবেন।
—তুমি কি তোমার দাদার লগে আপনি কইরা কথা কও?
না,—হাসল রুনু—'তুমি' বলি। আপনারেও পরে হয়তো 'তুমি' বলতি পারব। আজ প্রথম প্রথম তো...
—আমারই বরং তোমারে 'আপনি' কওন উচিত। তুমি একচান্সে মেট্রিক ফার্স্ট ডিবিশনে পাশ করছ। আর আমি তিন-তিন বার গোত্তা খাইলাম। বয়সে আমি বড় হইলেও বিদ্যায় তুমি বড় হইলা না?
—ছিঃ, আমি সব দিক দিয়ে ছোট। আপনারা কত বড়লোক, আমার বাবা এক গরিব পাঠশালার পণ্ডিত।
দ্যাহো রুনু, সইত্য কথা কই। পড়াশুনা হয় গরিবেরই। তারাই বড় হয়, মানুষ হয়। বিদ্যাসাগরের কথা জানোই তো। আর আমার মতো সোনার চাইমচ্যা মুখে লইয়া যারা জন্মায়, তারা খালি হাতে ভিক্ষা করতে করতে মরে। আমার কিছু হইব না। হ্যা মায়-বাবায়ও বোঝে। আমিও বুইঝ্যা ফেলাইছি।—বলতে বলতে হারানের গলা ভারী হয়ে আছে।
তবে কেন চেষ্টা করেন না হারানদা?—দরদী গলায় বলে রুনু।
ওর কথায় কান না দিয়ে হারান যেন আপন-মনেই বলে চলে, জানস, এই বাড়িডা পড়াশুনা করনের বাড়িই না। এডা একটা হাটখোলা, একটা বদের আড্ডা। আমি বদ, আমার বাবায় বদ, গুষ্টিশুদ্ধ বদ। অ্যারা কেবল খায়-দায় আর ফুর্তি করে।
—বাবার সম্বন্ধে কেউ ওভাবে বলে? ছিঃ!
—বুড়া একটা হাড়কিপটা। সাত রকম বদ ব্যবসা কইর্যা কেবল কাড়ি কাড়ি পয়সা জমাইতে আছে। আমরা ভাইবোন মিলিয়ে একডজন। আবার এক মাসি আইয়া জোটছে গোডা পাঁচ-ছয় পোলা লইয়া। এই হাটখোলার মইধ্যে কারও পড়া হয়? এ-বাড়িতে দুই দিন থাকলে তুমি পাগল হইয়া যাইবা। নইলে মায়ের যা টান পড়ছে তোমার উপর...
—মাসিমা খুব ভালো। একেবারে আমার মায়ের মতো।
—এই বাড়িডার মইধ্যে ওই একটাই তো মানুষ আছে। আর সব জন্তু-জানোয়ার। হ্যায় হয়তো তোমারে এ-বাড়িতেই রাখতে চাইব।
তাহলি তো খুবই ভালো হয়। তাহলি দেখবেন, আপনারেও আমি অনেক সাহায্য—
—সাবধান, সাবধান! হ্যার মায়ায় ভোলবা না। তাইলেই মরছ। তোমরা হইল্যা ভালো ছাত্তোর। এ বাড়িটা হইল খারাপ ছাত্তোরের বাড়ি। আমি তো মেট্রিকে আইয়া ঠেকছি। পোলাপান যেগুলান ইস্কুলে যাইতে আছে, টুকুর টুকুর কইরা আমার মতো খানিক ওঠব। তারপর একখানে আইয়া ঠেইক্যা যাইব। মাইয়াগুলানের বয়সকালে বিয়া-সাদি হইব, পোলাগুলান উচ্ছন্নে যাইব। এ-ই মোগো ভাইগ্যা। জোচ্চোর-ঠকবাজের পোলারা ইয়া ছাড়া আর হইব কী?
—ছিঃ ছিঃ ছিঃ, কী যে বলেন!
—কই কি সাধে! ও বুড়ার অপকম্মের সীমা-সংখ্যা নাই। যাউকগা, ঘরের কথা পরেরে কওন ঠিক না। আইচ্ছা, আর্টস লইবা, না সায়েন্স?
—সায়েন্স।
—লেটার পাইলা কিসে?
—অঙ্কে। অঙ্কেই দুটো। কম্পালসারি আর অ্যাডিশনাল।
—তয় তো সায়েন্সই লইবা। আমি হালা অঙ্কেই ফেল মারি বরাবর। মেট্রিকটা যদি একবার তরাইতে পারতাম...আমারে যদি অঙ্কে তরাইয়া দিতে পারতা!
—আপনাদের বাড়িতে যদি—
—না, না, ও লোভ দেখামু না। আমার লগে তুমিও মাটি হইবা। তুমি গরিবের পোলা। তোমারে মানুষ হইতেই হইব। এ বাড়ি তোমার উপযুক্ত না। কইলাম না, এডা এটা বদের আড্ডা। এখানে আমরা দিনে দিনে অধঃপাতে যামু। তা-ই দেইখ্যা-শুইনা তোমারও যদি মতি-গতি...তোমার ভালো হউক। আমাগো মতো পোলার লগে...
শেষ দিকে হারানদার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে। দুহাতে চোখ ঢাকে সে।
এই ছেলেটির বয়স আর স্বাস্থ্যই শুধু দাদার মতো নয়, মনে মনে ভাবল রুনু, দাদার সঙ্গে যেন কোথায় এর একটা আশ্চর্য মিল আছে! দাদার মতো এ-ও রুনুকে দূরে দূরে রাখতে চায়, অথচ দাদার মতোই এর উপর নির্ভর করে যেন নিশ্চিন্ত হওয়া যায়।
পরদিন সকালেই কাউনিয়া রোডে রায় মশাইয়ের বাড়ির খোঁজে হারানকে সঙ্গে নিয়ে রুনু বেরিয়ে পড়ল কিছু প্রাতরাশ করেই। পথ চলতে চলতে ওদের কথা হচ্ছিল।
আচ্ছা, আপনার অনেক বন্ধু নিশ্চয়ই এখন কলেজে পড়ে, তা-ই না? প্রশ্ন করে রুনু।
—পড়ব না? হগলেই তো আমার মতো ফেলডুমার্কা ছাত্তোর না! আই. এ., আই. এস-সি., বি. এ., বি. এস-সি.—সব কেলাসেই আমার বন্ধু আছে। বরিশাল জেলা স্কুল হইল নামকরা স্কুল। প্রতিবছরই জেলার সেরা রেজাল্ট হয়। মাঝে মাঝে মেট্রিকে বৃত্তিও পায়। এবারও তো একজন বৃত্তি পাইছে।
—বৃত্তি পাইছে? তা-ই নাকি? কী নাম বলেন তো?
—দেবতোষ গুহঠাকুরতা। দারুণ ছাত্তোর। পাঁচটা লেটার। বরাবর ফার্স্টবয়।
বরাবর ফার্স্টবয় তো রুনুও ছিল। পাঁচ-ছ'টা লেটার তো সেই আশা করেছিল। কিন্তু তার সব স্বপ্নই শূন্যে মিলিয়ে গেল।
হারান এদিকে নিজের উৎসাহে বলে যাচ্ছে, পঁয়তিরিশের মধ্যে বত্রিশ জনই পাশ। ফার্স্ট ডিবিশনে গেছে বাইশ জন। তোমাগো স্কুলে ফার্স্ট ডিবিশন আছিল কয়জনের?
রেজাল্ট শুনে রুনুর ভয় ধরে যায়। ওদের স্কুল থেকে তো মাত্র পাঁচজন প্রথম বিভাগ পেয়েছে। তার মধ্যে রুনু ছাড়া আর কেউ লেটারও পায়নি। ও ম্লান মুখে বলে, আমাদের স্কুল তো এত বড় স্কুল নয়। পরীক্ষা দিছিলাম মাত্র উনিশ জন। তার মধ্যি অবশ্য আঠারো জনই পাশ। প্রথম বিভাগ মাত্র পাঁচ জন।
—ফুস! তেলাপোকাও এট্টা পাখি! জিলা স্কুলের ছাত্তোররাই তো বি. এম. কলেজের মান রাখে। সব কেলাসেই দেখবা, ফার্স্ট-সেকেন্ড থার্ড—সব জিলা স্কুলের ছাত্তোর।
ওদের স্কুলটাকে তেলাপোকার সঙ্গে তুলনা করায় রুনুর মনটা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। সমীচীন কোনও জবাব পায় না। ও মৃদু গলায় বলে, আমাদের স্কুলে ফেল মাত্র একজন। আপনাদের স্কুলে তিন জন।
—তার মইধ্যে আমি একজন। এরকম বড়লোক বাপের মুখ্যু পোলারা আরও আছে না? ফেল হ্যারাই করে। হ্যারাই তো স্কুলের নাম ডুবায়। আমারে তাড়াইতে পারলে কবে তাড়াইয়া দিত। কিন্তু হে সাধ্য নাই।
—কেন?
—বাবা যে ইস্কুলের গভর্নিং বডির মেম্বার আর আমি হইলাম ওই ইস্কুলের পিলার। এইরকম পিলার আরও কয়ডি আছে। কেউ পিলার হইয়া আছে বাপের জোরে, কেউ-বা খেলা-ধূলায় ইস্কুলের নাম রাখে বলিয়া ছাড়ে না। কলেজে গিয়া দেখবা, একটা 'পিলারস অ্যাসোসিয়েশান' আছে। কেউ কেউ দশ-বারো বছর ধরিয়াও আছে একখানে ঠেইক্যা। তারা কেউ কেউ আবার ছেলেপেলের বাপও হইছে। মস্ত দল। তারা নাটক করে, হাতে-লেখা কাগজ বাইর করে, সব খেলাধূলায় ফাংশানে মোড়লি করে।
—কাগজও বার করে?
—তয় অর কইলাম কী? কাগজটার নাম 'পিলারস পেপার।'
কলেজের প্রসঙ্গ আসতে রুনু এবার জিজ্ঞাসা করল, আচ্ছা, ও কলেজের ইংলিশের প্রফেসর জে. এন. সেনগুপ্তকে চেনেন আপনি.?
—নাম শুনছি। চউক্ষেও দেখছি। তয় হ্যারে চেনন হয় না। তুমি তিনার নাম জানলা কী কইর্যা?
—আমাগে স্কুলির হেডমাস্টারমশায়ের তিনি বন্ধু ও সহপাঠী ছিলেন। নাকি সাংঘাতিক ভালো ছাত্র ছিলেন। এম. এ.-তে ইংলিশে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট।
—অখনও সাঙ্ঘাতিক।
—তার মানে?
—সারা কলেজ তেনারে যমের মতো ডরায়। ছাত্ররা তো ভালো, স্বয়ং প্রিন্সিপ্যালও তেনার কথায় চলেন। অল্পবয়সি প্রফেসররা তেনার মুখের দিকে চাইয়া কথা কইতে ভয় পায়। ভীষণ গম্ভীর মানুষ। চক্ষু দুইডা বাঘের মতো। এক্কেরে বাঘ!
বর্ণনা শুনেই রুনুর বুক কাঁপতে থাকে। এই বাঘের সামনে সেই চিঠি নিয়ে কি কোনওদিনও দাঁড়াতে পারবে ও? অথচ সে চিঠি তো তাকেই দিতেই হবে। তা না হলে ফ্রি-শিপের আশা নেই। আর ফ্রি-শিপ না পেলে তো ওর পড়াই হবে না। জেলাস্কুলের ছাত্রদের বর্ণনা শুনে ওর দুটো লেটার পাওয়ার ভরসা ধুয়ে-মুছে গেছে। হারানদা হয়তো ঠিকই বলেছে। আরশোলা একটু উড়তে পারে বলে নিজেকে পাখি ভাবলেও আসল পাখিদের মধ্যে এলে সে বুঝতে পারে, সে এতদিন উলুবনে শিয়াল রাজা হয়ে ছিল। এইবার হবে তার যথার্থ মূল্যায়ন।
এখন ওর সম্বল রইল কেবল দারিদ্র্য—এক দরিদ্র পাঠশালার পণ্ডিতের ছেলে ও। সেই পণ্ডিত অবশ্য তুচ্ছ নন। শ্রীনাথ পণ্ডিত সম্বন্ধে অনেক কথাই লিখেছেন হেডমাস্টারমশাই তাঁর চিঠিতে। নিজের যোগ্যতা নয়, পিতার যোগ্যতার গর্ব নিয়েই সে দাঁড়াবে সেই বাঘের সামনে। যা থাকে কপালে!
প্রফেসর সেনগুপ্তর সঙ্গে মনে মনে একটা ইন্টারভিউর মহড়া দিতে দিতে পথ চলছিল রুনু।
হারান তার আন্দাজের সত্যতা প্রমাণ করে ফেলল কাউনিয়া পৌঁছে একজন পথচারীকে প্রশ্ন করেই—আচ্ছা, কয়েন তো এ রাস্তায়—কী নাম কইল্যা যেন?
রুনু মনে করিয়ে দিল—দেবেন্দ্রনারায়ণ রায়।
—হয়, কয়েন তো হেই রায় মশয়ের বাড়ি কোনডা?
—ওই যে নীলপুইল্যা বাড়িডা দেখতে আছ, ওইডাই রায়মশায়ের বাড়ি।
—তিনি কি গভর্নমেন্ট কনট্রাক্টর?
—হয়। সরকারি দালান-কোঠা, ইস্কুল, ব্রিজ, কালভার্ট, রাস্তা-টাস্তার কনট্রাক্টরি করেন।
কইছিলাম না?—সোৎসাহে বলে হারান, হেই খগেইনার কেউ হইব। ওই তো খগেইন্যার বাড়ি। ও বাড়ি কিন্তু আমি যামু না।
—কেন?
—তা কমু না। চল ওই পুলডা পর্যন্ত।
নীলপুলের অনতিদূরে দাঁড়িয়ে ওদের কথা হচ্ছিল। এমন সময় ওই বাড়ির ভিতর থেকে একটি সুদর্শন স্বাস্থ্যবান তরুণ এসে পড়ল ওই পুলের উপর। মুহূর্তে তার সঙ্গে হারানের চোখাচোখি হল। হারান যেন ভয়ে পালিয়ে যাবার মতো ব্যস্তভাবে বলল, তোমার যা কথা কইবার কইয়া লও। আমি ওই ধারে গিয়া ওই গাছটার তলায় খাড়ামু।
কথা শেষ করে আর একমুহূর্তও দাঁড়াল না হারান।
কাউনিয়া রোডের ডান দিক বরাবর যে ড্রেনটা চলে গেছে, সেটাকে ড্রেন না বলে একটা খালই বলা উচিত। সেখানে ছোটখাটো ডিঙি-ডোঙাও চলে। প্রায় বিশ হাত চওড়া। ওদিকের প্রত্যেকটি বাড়ি থেকে তাই রাস্তায় আসতে হয় কাঠের পুল, বাঁশের পুল বা কংক্রিটের পুল পার হয়ে। যে যার সামর্থ্য অনুযায়ী পুল তৈরি করে নিয়েছে।
এ বাড়ির কাঠের পুলটি বেশ চওড়া এবং শক্ত। তার উপর দিয়ে অনায়াসে একটা মোটরগাড়ি আসতে পারে। কাঠের পুলটা নীলরঙের। অনেক দূর থেকে দেখা যায় এই সুন্দর নীল পুলটি। তাই এ-বাড়ির স্থানীয় নাম 'নীলপুইল্যা বাড়ি'।
হারান হঠাৎ চলে যাওয়ায় ভারি আড়ষ্ট হয়ে পড়ল রুনু। আড়ষ্ট বোধ করছে ওই উজ্জ্বল তরুণটির সামনে। কিন্তু ফিরে গেলে তো চলবে না। চিঠিখানা রায় মশাইকে দিতেই হবে। ওই চিঠির উপরই যে নির্ভর করছে ওর ভবিষ্যৎ।
ধীরপায়ে পুলের উপর উঠে এল রুনু। দাঁড়াল সেই ছেলেটির মুখোমুখি। কয়েক মুহূর্ত কাটল। ছেলেটির চোখে-মুখে কৌতূহল। সে-ই প্রথম কথা বলল, কাকে চাই?
—এটা কি দেবেন্দ্রনারায়ণ রায় মশায়ের বাড়ি?
হ্যাঁ।—ছেলেটির সংক্ষিপ্ত উত্তর—বাবার কাছে তোমার কী দরকার?
—তাঁর নাম একখানা চিঠি...
—কে দিচ্ছেন?
—গোপালগঞ্জের স্কুল ইনস্পেকটর দাশগুপ্ত সাহেব।
—গোলাপগঞ্জের দেবেনজ্যাঠা? বাবার মিতা হন। দুজনেরই একনাম তো! তুমি তেনারে চিনলা কী কইর্যা?
—তিনি আমার বাবার বিশেষ বন্ধু।
—তোমার নাম কী?
নাম বলল রুনু।
—আর ওই হারাইন্যা হইল তোমার বিশেস বন্ধু! এই বয়সেই অর পাল্লায় পড়ছ? পড়াশুনা করো?
—আমি এবার ম্যাট্রিক পাশ করিছি প্রথম বিভাগে। দুটো লেটারও পাইছি।
—আচ্ছা! তয় তো ছাত্র ভালো। অর লগে মেশ ক্যান? —যেন কৈফিয়ত চাইছে ছেলেটি রুনুর কাছে—কদ্দিনের বন্ধু?
—ওনার সঙ্গে তো কাল রাত্রেই আমার আলাপ।
—তার মানে?
—আমি তো কাল রাত্রেই বরিশাল মেলে বাড়ির থে আইছি। ওই স্টিমারেই হারানদার বাবা-মা-র সঙ্গে আলাপ। কাল রাতে ওঁদের বাড়িতেই উঠিছি। হারানদার মা দয়া করে আমারে সঙ্গে করে না আনলি কি বিপদেই যে পড়তাম! অত রাত্তিরি আপনাদের বাড়ি আমি খুঁজেই পাতাম না।
এক রাইতেই অরে হারানদা বানাইয়া লইছ? বেশ করছ। অখন শুইন্যা রাখো, ও একখানা মার্কামারা পোলা। অর বাবাও ভুবন-বিখ্যাত চোরাকারবারী। একখান ফ্যামিলি বটে। যাউক, অর লগে আর মিশবা না। —গুরুগম্ভীর গলায় কথাগুলি বলে হাসল ছেলেটি।
হাসিটার ব্যাখ্যা করতে পারছে না রুনু। তবে বুঝতে পারছে, এই ছেলেটি দেবেন রায়ের ছেলে।
ছেলেটি আবার বলে, অর কাছে শোনো নাই আমার নাম?
—না। কী নাম আপনার?
—আমার নাম খগেন। আমারে ডাকবা খগেনদা। অখন লও, বাবার লগে আলাপ করিয়া দেই। তোমারে দেইখ্যাই আমি চিনছি।
—কী করে চিনলেন?
আবার রহস্যময় হাসি হেসে ছেলেটি রুনুর একখানা হাত ধরে পুল পেরিয়ে নিয়ে চলল বাড়ির দিকে।
পুল থেকে অর্ধোন্মুক্ত একটা বিশাল লোহার গেট দিয়ে মস্ত একখানা চৌকো উঠোন পার হয়ে ওরা একটা একতলা পাকা বাড়ির বারান্দায় উঠল উঠোন থেকে চার ধাপ সিঁড়ি ভেঙে।
বারান্দার দুই প্রান্তে দুটো কক্ষ। দরজায় মূল্যবান পর্দা ঝুলছে। মাঝের অংশটার একদিকে একখানা টেবিল ঘিরে খানকয়েক চেয়ার অন্যদিকে বিশাল সাইজের একটা কুকুর শিকল দিয়ে বাঁধা বারান্দার একটা পিলারের সঙ্গে। এত বড় কুকুর রুনু তার জীবনে দেখেনি আর কখনও।
সিঁড়ি দিয়ে বারান্দায় উঠতেই ঠিক মুখোমুখি আর একটা ভারী পর্দা। এই পর্দা তুলে খগেনদা ভিতরে চলে গেল রুনুকে একটা চেয়ারে বসতে বলে।
রুনু অবশ্য বসল না। দাঁড়িয়ে রইল একটা চেয়ারের হাতলে ভর রেখে।
অদ্ভুত একটা অস্বস্তি। মিনিটের পর মিনিট কাটছে। হাত-পা ঘেমে যাচ্ছে। এক-একবার তাকাচ্ছে কুকুরটার দিকে। কুকুরটাও ওকে সকৌতুক আলস্যে আধো-নিমিলিত চোখে দেখছে। যেন ওইটুকু একটা বালককে দেখে গর্জন করাটা হবে শক্তির অযথা অপচয়। ভিতর থেকে সরু-মোটা অনেকগুলি আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে মাঝে-মাঝে এক-একটি শিশুমুখে হঠাৎ পর্দা তুলে রুনুকে একপলক দেখে আবার পর্দার আড়ালে ডুব দিচ্ছে। ও যেন একটা প্রদর্শনী বস্তু।
কতক্ষণ পরে সে হিসেব নেই রুনুর, এক অপূর্ব সৌম্যদর্শন প্রৌঢ় পর্দা তুলে বারান্দায় এলেন। দেখলে প্রণাম করতে ইচ্ছা হয় এমনই সৌম্য মূর্তি। প্রণাম করল রুনু।
থাক, থাক। কল্যাণ হোক।—হাতের ইঙ্গিতে রুনুকে একটা চেয়ারে বসতে বলে উনি নিজে বসলেন টেবিলের ওপাশের গদি-মোড়া মূল্যবান চেয়ারখানায়।
সাদা সিল্ক টুইলের ফুলশার্টের উপর প্যান্টের মতো করে মালকোঁচা দিয়ে ধুতি পরেছেন। পায়ে চকচকে বুট। নিখুঁতভাবে কামানো মুখ। চুলে সামান্য পাক ধরেছে। ভ্রূদ্বয় মিশমিশে কালো। বড় বড় উজ্জ্বল চোখদুটো দিয়ে যেন রুনুর ভিতরটা পর্যন্ত দেখে নিচ্ছেন। আড়ষ্ট হয়ে বসে আছে রুনু।
—তুমি কাইল বরিশাল মেলে আইলা? শোনলাম সব খগেনের কাছে। তুমি তো একজন বিখ্যাত পণ্ডিতের পোলা। তোমারও বিখ্যাত হইতে হইবে। পারবা না?
—চেষ্টা করব।
—চেষ্টা নয় শুধু প্রমিজ চাই। চাই দৃঢ় প্রতিজ্ঞা। মানুষের অসাধ্য কিছু নাই। যাউক, পরে কথা হইব। দেবেনদা সবই লিখ্যা জানাইছেন। চিঠি পাইয়া ব্যবস্থাও করিয়া রাখছি। খগেন তোমারে সব দেখাইয়া-শুনাইয়া দিবে। কাইল রাইতে তোমার কষ্ট হইছে। আগে খবর দিলে খগেন তোমারে স্টেশনের থনে লইয়া আইত। যাউক, আজই খগেনেরে লইয়া তোমার মালপত্র লইয়া আইবা। আচ্ছা চলি।
রুনুকে একটা কথাও বলবার সুযোগ না দিয়ে কথা বলতে বলতেই উঠে পড়লেন রায়মশাই। বারান্দা থেকে বেরুবার আগে কুকুরটার সঙ্গে একটু আদুরে আলাপ করে দেয়াল-সংলগ্ন হ্যাটস্ট্যান্ড থেকে একটি শোলার টুপি মাথায় পরলেন। বাইরে বেরুবার সাজ সমাপ্ত হল।
উঠোনের সামনের রাস্তার দিকটায় ছ'ফুট উঁচু দেয়াল। নীল পুল বরাবর মস্ত লোহার গেট। আর ডাইনে-বাঁয়ে দুই সারি টিনের ঘর। বাঁদিকের ঘরগুলি দেখেই বোঝা যায়, টিন-সিমেন্ট-লোহা-লক্কর রাখবার গুদামঘর। ডান দিকের টিনের শেডটি পাশাপাশি অনেকগুলি কক্ষবিশিষ্ট, অনেকটা স্কুলবাড়ির মতো। সেই গুদামঘরের একপ্রান্তে একটা ছোট্ট গ্যারাজ।
উঠোনে নেমেই রায়মশাই হাঁক দিলেন—রঘু, গাড়িটা বার কর।
মুহূর্তে ভিতর থেকে একটা লোক দৌড়ে গিয়ে গ্যারেজের তালা খুলে একখানা চকচকে মোটর সাইকেল বার করে আনল উঠোনে। রুনু তার জীবনে এই প্রথম দেখল মোটর সাইকেল।
আধ মিনিটের মধ্যেই যন্ত্রটা গরগর ভটভট আওয়াজ তুলে খানিকটা ধোঁয়া ছেড়ে সোঁ-ও করে বেরিয়ে গেল নীল পুলের উপর দিয়ে।
রায়মশাই চলে যেতেই রুনুর খেয়াল হল, ইনস্পেকটর সাহেবের লেখা সেই চিঠি ওঁকে দেখানোই হল না। ইনস্পেকটর সাহেব যে আলাদা করে চিঠি লিখেছেন ওঁকে, তার জন্য তাঁকে মনে মনে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাল রুনু। এতক্ষণে ও বুঝতে পারল খগেনদা কেন বলেছিলেন, ওকে দেখেই তিনি চিনতে পেরেছেন।
এবার হাসিমুখে বেরিয়ে এলেন খগেনদা ভিতর থেকে। তার পিছন পিছন যে মহিলাটি এলেন, তিনি ছোটখাট একটি মানুষ। এঁর মুখের সঙ্গে খগেনদার মুখের আশ্চর্য মিল দেখে রুনু বুঝল, ইনি খগেনদার বড় বোন।
এ-ই আমার মা। —রুনুকে চমকে দিয়ে বললেন খগেনদা।
মা! আমি তো...কথাটা অর্ধসমাপ্ত রেখেই প্রণাম করল রুনু। তিনি সস্নেহে মাথায় হাত রাখলেন।
মায়েরে দেইখ্যা কী ভাবছিল? আমার ছোট বোন?—হেসে বলে খগেনদা।
রুনু থতমত খেয়ে যায়।
—অনেকেই ভাবে। মায় আর বুড়া হইব না কোনও দিন। অথচ সপ্ত সন্তানের জননী আমাগো মা জননী। ভাবতে পারো?
দূর মুখপোড়া!—ধমক দিতে গিয়ে হেসে ফেললেন সেই ভদ্রমহিলা। কী মিষ্টি, কী অপরূপ সেই হাসি! ঝিকমিক করছে দাঁতগুলি। পাতলা ঠোঁটগুলি যেন গোলাপের পাঁপড়ি। চোখ-মুখ-ভ্রূ যেন পটে-আঁকা প্রতিমা। অবাক চোখে চেয়ে রইল। রুনু সেই হাসি-ভরা মুখের দিকে।
কী দেখতে আছ আমার দিকে?—বলেন মহিলাটি।
রুনু থতমত খেয়ে যায়, কিছু বলতে পারে না।
কী নাম যেন তোমার?
—শ্রীরনজিৎকুমার—...
—আমি কিন্তু তোমারে রনো কইয়া ডাকুম। তুমি ডাকবা মাসিমা কেমন?
—আচ্ছা।
ইতিমধ্যে আরও দুটি ছেলে ও দুটি মেয়ে কোন ফাঁকে ঘরে ঢুকেছে। মাসিমার পাশে দাঁড়িয়ে সকৌতুকে রুনুকে দেখছিল তারা। ছেলেদের বড়টি যে খগেনদার ভাই তা মুখ দেখেই বুঝতে পারছে রুনু। মাসিমাই তাদের পরিচয় দিলেন—এই ডি খগেনের ছোট ভাই বাসু —বাসুদেব। নাইনে উঠল এবার। ওইডি আমার ছোট কইন্যা, ক্লাস ফোরে পড়ে। অর নাম সাবিত্রী, সাবু কইরা ডাকি। আর ওই দুডি আমার নাতি-নাতনী। ওই দুডিরে পড়াইতে হইবে তোমার।
—ওরা কোন ক্লাসে পড়ে?
—এর নাম মাধু—মাধুরী। এইটে উঠল এবার। উনি গোপাল।
অর্থাৎ গরুর পাল! —হেসে বলে খগেনদা, উনি এবার কোন ক্লাসে ওঠেন নাই, থিরিতেই থির হইয়া আছেন। অরে নড়াইতে পারলে বোঝব কেমন পণ্ডিতের পোলা তুমি!
এবার গোপাল নামক বালকটি খগেনদাকে ভেংচি কেটে ভিতরে চলে গেল।
রুনু বলল, গোপালকে আমি নিশ্চয়ই এবার ভালোভাবে পাশ করাব। আমি অনেক ছাত্র পড়াইছি। এ পর্যন্ত কেউ ফেল করেনি।
সাব্বাস! জিতা রহ রনজিৎ। —রুনুর পিঠ চাপড়ে বলল খগেনদা, তাইলে এ-বাড়িতে তোমার ভাত মারে কে? তবে উনি কিন্তু এ-বাড়ির আদরের গোপাল। বকোন যাইবে না, ছোঁওন যাইবে না। ওই ওনার আদরেই, বুঝলানি।
মাকে দেখিয়ে দেয় খগেনদা।
উনি মিষ্টি হেসে বলেন, না, না, পড়া না করলে আচ্ছামতো পিডাইবা। আমি কিচ্ছু কমু না।
সাবধান, সাবধান!—খগেনদার সতর্ক-বাণী—ওই মিষ্টি কথায় ভুলিয়া যদি কখনও গায় হাত তোলছ, কান্দনের ঠেলায় রায়বাড়ি ফাটিয়া চৌচির হইবে।
আমি তো আমার ছাত্রদের কখনও মারি না।—সহজ গলায় বলে রুনু।
তাইলে ভরসা আছে। আচ্ছা মা জননী, হগ্গলের তো পরিচয় করাইলা, আমি কি তোমার অযোগ্য সন্তান?—বলেন খগেনদা।
—তুই তো অর সব কথা কইলি, তর কথা আর কী কমু?
তয় আমিই কই। আমি শ্রীমান খগেন্দ্রনারায়ণ রায়, বি. এস-সি. থার্ড ইয়ার। রায়মহাশয়ের দ্বিতীয় পুত্র।
তাহলি আপনাকে আমি মেজদা বলে ডাকব। —বলে রুনু।
—উহুঁ, আমারে নাম ধরিয়া ডাকিবা।
—তবে বরং নামের সঙ্গে দাদা জুড়ে খগেনদা ডাকব।
তথাস্তু।—নাটকীয়ভাবে রুনুর মাথায় হাত রেখে বলে খগেন, যারা আমারে খগেনদা বলিয়া ডাকে, তাদের আমি আমার যোগব্যায়াম ক্লাসের ছাত্র কইর্যা লই। তোমারেও লমু।
কয় কী সব্বনাইস্যা কথা!—ধমকে বলেন মাসিমা, এই ভালো পোলাডার মাথা খাইতে চাস?
—দেখখ্যো, তিন মাসের মইধ্যেই এই তালপাতার সেপাইরে আমি তাগড়াই জোয়ান বানাইয়া দিমু। কী কও রনো, রাজি আছ?
—আপনার মতো অমন চমৎকার ফিগার আমার কোনও দিনই হবে না।
সে দেখা যাইবে। আচ্ছা, চলো এবার হারাইন্যাগো বাড়িত্তা তোমার মালপত্র লইয়া আসি।—বলতে বলতে রুনুর পিঠে হাত রেখে রওনা হল খগেন।
রুনু বাধা দিয়ে বলল, আপনার যাতি হবে না খগেনদা। হারানদা বোধ হয় এখনও সেই গাছতলায় দাঁড়ায়ে আছে আমার জন্যি।
—অখনও খাড়াইয়া আছে? তা-ই ভাবছ বুঝি? ও তৎক্ষণাৎ কাইটা পড়ছে। আমার ধারে কাছে ওর থাকনের সাহস আছে? অয় আমারে ভালো কইর্যাই চেনে।
—কিন্তু আপনাগে এ বাড়ি তো আগে হারানদা চিনত না। এরে-তারে জিগ্যেস করে তবে—
—এ বাড়ি না চিনবার পারে, বাড়ির আর কাউরেও না চিনবার পারে, কিন্তু আমারে চেনে হাড়ে হাড়ে। অরও একটা ক্লাব আছে—চিটিংবাজ ক্লাব। যত বদ কম্ম কইর্যা বেড়ায় তারা। এক্কেরে মার্কামারা চিজ সব! একবার আমার ক্লাবের লগে একহাত হইয়া গেছে। আমার শরীরখান দেখতে আছ তো? হ্যার চেহারাও তো দেখছ। ত্যাজ দেখাইতে আইছিল ছোরা-ছুরি লইয়া, হ্যাষ কালে লেজ গুটাইবার পথ পায় না। এ জীবনে আর আমার মুখোমুখি হইবে না, হে শিক্ষা হইয়া গেছে। একদম বদের হাঁড়ি। বরিশালে পাড়া দিয়াই কী কুক্ষণে যে তোমার অণ লগে ভাব হইয়া গেল!
হারানদার বদ কাজগুলি যে কী, কেন যে খগেনদা তার উপর এত ক্ষিপ্ত, সে কথা খগেনদাকে জিজ্ঞাসা করতে সঙ্কোচ বোধ করে রুনু। কিন্তু নিজের মনে বিচার করে ও কিছুতেই হারানদাকে একটা খারাপ ছেলে ভাবতে পারে না। লেখাপড়ায় ভালো না? দাদাও তো লেখাপড়ায় ভালো না। তা-ই বলে দাদা কি খারাপ ছেলে? কাল রাতে হারানদার কথা শুনতে শুনতে ওর দাদাকে বড় মনে পড়ছিল। কোথায় যেন দাদার সঙ্গে হারানদার মিল আছে। হারানদা স্পষ্ট কথা বলে, নিজের বাবারও সমালোচনা করে; কিন্তু যা বলে তা তো 'চিটিংবাজ'-এর মতো কথা নয়। একটা নিষ্ঠুর সত্য আছে হারানদার রুক্ষ কথাবার্তার মধ্যে, যেমন রুক্ষভাষিণী ছিলেন বাজুনিয়ার ঠাকুমা। কিন্তু সেই রুক্ষ আবরণের মধ্যে সে অসীম মমতায় ভরা হৃদয়খানি ছিল, তার খবর আর পেল কজন? মানুষের বাইরেটা দেখে বিচার করতে বসে কত যে ভুল করে মানুষ! এইটুকু জীবনে তেমন দৃষ্টান্ত তো কম দেখল না রুনু। ওর মনে হল, হারানদার মধ্যেও আছে আর একটা মানুষ যে মানুষটাকে ভালোবাসা যায়। সেই মানুষটিকে চকিতে কাল রাতে দেখে ফেলেছিল রুনু। সেই হারানদাকেই ও মনে রাখবে চিরকাল। মনে রাখবে সেই মাসিমাকেও। তাঁদের কাছে ওর কৃতজ্ঞতার ঋণ ও ভুলবে কী করে?
খগেনদা রুনুকে এনে সরাসরি ওর জন্যে নির্দিষ্ট ঘরটিতে তুলল। বিছানাটা রাখল ছোট একখানা চৌকির উপর, সুটকেসটা তার নীচে। ঘরের একদিকে একখানা টেবিল। টেবিলের সামনে দুখানা চেয়ার, বিপরীত দিকে একখানা চেয়ার। তার পিছনে দেয়াল-জোড়া কাঠের তক্তার তাক। দেখেই বোঝা যায়, বই রাখার তাক। এখন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। চেয়ারগুলির দুখানা ছাত্রদের। একখানা রুনু নামক মাস্টারমশাইয়ের। একেবারে সাজানো-গোছানো ঘর। বই নিয়ে পড়তে বসলেই হল।
সেদিনটা ছিল রবিবার। অতএব খগেনদার কলেজে যাবার তাড়া নেই। রুনুর খাটের উপর দুজনে মুখোমুখি বসে শুরু হল কথোপকথন। বক্তা খগেনদা, শ্রোতা রুনু।
খগেনদার মুখ থেকেই শোনা গেল, এই যে পাশাপাশি চারখানা কক্ষ-বিশিষ্ট পাঠশালা-বাড়িটা, এটাকে রায় পরিবারের বোর্ডিং হাউস বলা চলে। বর্তমানে একটা কক্ষ খালি আছে। ওটি ছিল খগেনদার দাদা দিব্যেন্দুনারায়ণের। এদের প্রত্যেক পুরুষের নামের মধ্যে 'নারায়ণ' শব্দটা থাকবেই। দিব্যেন্দু ছয় বছর আগে বি. এম. কলেজ থেকে বি. এ. পাশ করে বর্তমানে কলকাতায় ভালো চাকরি করছেন। অবশ্য বি. এ. পাশের অনেক আগেই বিয়ে করেছিলেন ঠাকুমার একান্ত ব্যস্ততার জন্য। তারই ছেলে-মেয়ে মাধুরী আর গোপাল।
—ওদের মা অর্থাৎ বউদি কোথায় থাকেন?
—এখানেই থাকেন। দাদা আসে ছুটিছাটায়।
—ঠাকুমার কথা বললেন, তিনি আছেন এখানে?
—নিশ্চয় আছেন।
ঠাকুমার কথা বেশ বিস্তারিত করে বলল খগেনদা।
নরোত্তমপুর বরিশাল জেলার একটি বিখ্যাত গ্রাম। শিক্ষায়, সংস্কৃতিতে, সামাজিক মর্যাদায়, আর্থিক কৌলিন্যে কেউ কারো চেয়ে খাটো নয়। ঠাকুমা ঢাকা জেলার বিক্রমপুরের এক জমিদার বংশের মেয়ে। নরোত্তমপুরের রায় পরিবারও প্রাচীন আমলের জমিদার। রায় পরিবারে নরনারায়ণ রায়ের সঙ্গে ঠাকুমার যখন বিবাহ হয়, তখন বরের বয়স পনেরো-ষোলো আর বধূর বয়স মাত্র নয় বৎসর। সেই নয় বৎসরের বালিকা বধূ আজ নব্বুই পেরিয়েছেন। বিধবা হয়েছেন প্রায় তিরিশ বছর আগে।
নরনারায়ণের তিন পুত্র। সকলেই এখনও জীবিত। বড়টি দেশের বাড়িতে থেকে জমিদারি দেখা-শোনা করেন। দ্বিতীয় এই দেবেন্দ্রনারায়ণ। তৃতীয় অর্থাৎ কনিষ্ঠ পুত্রটি ছিলেন ইউনিভার্সিটির একটি উজ্জ্বল রত্ন—তিনটি ভাষায় এম. এ.। বাংলা, ইংরাজি, সংস্কৃতে। তাছাড়াও হিন্দি, তামিল, তেলেগু ইত্যাদি কয়েকটি ভারতীয় ভাষায় সুপণ্ডিত। অনর্গল বক্তৃতা দিতে পারেন যে-কোনও ভাষায়।
তিনি কোথায়?—প্রশ্ন করে রুনু।
—বর্তমানে বিন্ধ্যাচলে। সেখানে তাঁর বিরাট আশ্রম। আশ্রমের নাম দিব্যধাম, আর তাঁর সন্ন্যাস নাম স্বামী দিব্যাত্মানন্দ। সারা ভারতবর্ষে তাঁর লক্ষাধিক শিষ্য।
—কত দিন হল সন্ন্যাসী হইছেন?
—সে প্রায় পনেরো বছর হইল। বিরাট চাকরি পাইছিলেন ব্যাঙ্কে। হঠাৎ একদিন সব ছাইড়্যা-ছুইড়্যা একবস্ত্রে সংসার, চাকরি ও দেশত্যাগ করেন। সাত বছর আর কোনও খবর নাই। তিনিই ছিলেন ঠাকুমার আদরের দুলাল। হয়তো ঠাকুমার টানেই বিন্ধ্যাচল ছাইড়্যা একবার তাঁর মাকে দর্শন দিতে আসেন সাত-আট বছর আগে।
—তারপর আর আসেননি?
—তারপরেত্তে বছরে একবার কইরা আসেন মায়ের পূজা করতে। তিন মাস ধরিয়া চলে সে পূজা।
—মায়ের পূজা মানে দুর্গাপূজা।
—না, নিজের মায়ের মানে আমাদের ঠাকুমার পূজা। একেবারে ফুল, বিল্বপত্র, ভোগ, রাগ, নৈবিদ্য দিয়া শাস্ত্রমতে পূজা।
—আশ্চর্য তো। এমন তো শুনিনি! ঠাকুমা বুঝি দেশের বাড়ি থাকেন?
—না, এই বাড়িতে।
আমি তাঁকে দেখতি পারব না?—সভয়ে প্রশ্ন করে রুনু।
যেন জীবন্ত দেবী-দর্শন করতে হলে যতখানি পুণ্য বল থাকা দরকার ততখানি পুণ্যবল তার আছে কিনা, তাই এই দ্বিধা। মাটির প্রতিমাকেই দেবীরূপে পূজা করতে দেখেছে ও। কোনও জীবন্ত মানবীকেও যে শাস্ত্রমতে মন্ত্রপাঠ করে, দেবীরূপে পূজা করা যায়, এমন কথা বইতে পড়লেও ওর বিশ্বাসের মধ্যে ছিল না।
ক্যান পারবা না?—হেসে বলেন খগেনদা, ঠাকুমাও এক আশ্চর্য মানুষ। মুচি-মেথর-নোমো হগ্গলেই তেনারে দেবী-জ্ঞানে প্রণাম করে। আর যে-ই প্রণাম করে হ্যার মাথায় হাতখান রাখবেন।
আমি ঠাকুমাকে আজই দেখতি পাব?—ব্যগ্রভাবে বলে রুনু।
—ব্যস্ত হইতে লাগবে না। সময়মতো ঠাকুমার দরবারে তোমারও ডাক পড়বে।
কেমন যেন রহস্যজনক শোনায় খগেনদার কথাটা।
একটা অকারণ পুলকে রোমাঞ্চিত হয়ে ওঠে রুনু। নিজেকে ওর ভাগ্যবান বলে মনে হয় এমন একটা বাড়িতে ও স্থান পেল বলে। ঠাকুমার দর্শন আজই পাওয়া যাবে। সেই প্রত্যাশিত দর্শনের জন্যে অধীর হয়ে উঠল রুনু।
খগেনদা যদিও ওর জন্যে নির্দিষ্ট পড়ার ঘরে ওকে সেই দিনই প্রতিষ্ঠিত করে দিয়েছিল, কিন্তু সম্পূর্ণ বাড়িটাকে এবং বাড়ির সবকটি মানুষকে চিনতে ওর বেশ ক'দিন সময় লাগবে।
প্রথম প্রথম তো গোলক-ধাঁধার মতোই মনে হতো। বাড়িতে অনেকগুলি ঘর এবং মানুষও অনেক। কে কোন ঘরে থাকে, কোনটা ঠাকুমার ঘর, কোনটা পিসিমার ঘর, কোনটা রায়মশাইয়ের শয়নকক্ষ, কোনটা মেয়েদের, কোনটা ছেলেদের, কোনও ঘরটা জ্যাঠামশাইয়ের, (যেটা প্রায় সারা বছই তালাবন্ধ থাকে। খোলা হয় যখন কোন মামলা-মোকদ্দমা বা অন্য কোনও বৈষয়িক প্রয়োজনে বড় রায়কর্তা নরোত্তমপুর থেকে সদরে আসেন) কোনটা ছিল ছোট রায়মশাইয়ের (যিনি বর্তমানে সন্ন্যাসী), কোনটা খাবারঘর ইত্যাদি সব মিলিয়ে বাড়িটার পূর্ণ ছবি মনের মধ্যে এঁকে নিতে সময় নেবে বইকি। এত বড় একটা বাড়ি তো এর আগে আর দেখেনি রুনু।
বাড়ির মধ্যে সর্ববৃহৎ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ ঘরখানাই ঠাকুমার ঘর। খগেনদার ভাষায় 'দরবার-কক্ষ'। অনুরূপ আর একখানি কক্ষ খাট-পালঙ্ক-আলমারি-আলনা-সোফা সেট- কার্পেট ইত্যাদিতে সুসজ্জিত হয়ে তালাবন্ধ থাকে বড় রায়কর্তার আগমন-প্রত্যাশায়। বছরে তিন-চার বার আসেন তিনি। দু-তিন দিন থেকে দু-তিন সপ্তাহ পর্যন্ত থাকেন। দারুণ ভোজনবিলাসী মানুষ। দারুণ খরুচে। যে ক'দিন থাকেন, নিজের হাতে বাজার করেন। বাড়িটাকে করে তোলেন যেন উৎসবের বাড়ি। তাঁকে খগেনদা ওরা ডাকে 'কর্তা বাবা' বলে।
বড়দার ঘরও বেশ সাজানো-গোছানো। বর্তমানে বউদি থাকেন সে ঘরে তাঁর দুই ছেলে-মেয়ে নিয়ে। ছুটিছাটায় এসে বড়দাও থাকেন সে ঘরে।
রায়মশাইয়ের বৃহৎ কক্ষটিকে বলা চলে এ-বাড়ির স্ট্রং রুম। দেয়ালে-গাঁথা লোহার সিন্দুক, মেঝের নীচেও আছে মূল্যবান বাসন-কোসন, গয়নাগাঁটি ইত্যাদি রাখবার গোপন কক্ষ। আর আছে অসংখ্য বাক্স-পেঁটরা আলমারি ইত্যাদি।
এ ছাড়াও আছে অনেকগুলি ছোট ছোট ঘর—একজন বা একাধিকের জন্যে নির্দিষ্ট।
বাড়ির সামনে বিশাল চৌকো উঠোন। উঠোনের একদিকে সেই চারকক্ষবিশিষ্ট পাঠশালা-বাড়ি-খগেনদার ভাষায় 'বোর্ডিং হাউস'। অন্যদিকে প্রথমে মোটর সাইকেলের গ্যারেজ, তারপর লোহা-লক্করের গুদাম, আবার গুদাম-সংলগ্ন একটি ছোট কক্ষ। সেটাতে থাকেন রায়মশাইয়ের একজন কর্মচারি। তিনি এ-বাড়ির স্থায়ী বাসিন্দা। এখানেই থাকা-খাওয়া। উঠোনের সামনেটায় ছ'ফুট উঁচু দেয়াল। দেয়ালের কেন্দ্রে লোহার গেট। গেটের সামনে নীল পুল। রাত্রে ওই গেটে বিশাল বিশাল দুটো তালা ঝোলে।
ঠিক হয়েছে রুনুর ছাত্রছাত্রী দুটি সকালে সন্ধ্যায় পড়তে আসবে ওর ঘরেই। সকালের জলখাবার এই ঘরেই দিয়ে যাবে গৃহভৃত্য বটুকদা। বটুকদা ছাড়াও আরেকজন গৃহভ্যৃত্য আছে—নকাইদা। সে গুদামঘরে, কাজ করে, অবসরসময় বাড়ির কাজও করে। তাছাড়া আছে রান্নার ঠাকুর। আছে দুজন ঝি—বাসন-মাজা, মশলা-পেষা আর মাসিমার ফাইফরমাস খাটার জন্যে।
বোর্ডিং হাউসে যারা থাকে, দুবেলা খেতে যাওয়া ছাড়া বাড়ির সঙ্গে তাদের বিশেষ সম্পর্ক নেই। বাড়ির সব ছেলেমেয়ে, আশ্রিত জন, কর্মচারি ইত্যাদি একসঙ্গে খেতে বসবে পুবের বারান্দায়। ওই বারান্দার সঙ্গেই সমকোণ করে টালির চালার মস্ত রান্নাঘর। বারান্দা আছে রান্নাঘরের সামনেও। সকালে বিকালে সে বারান্দায় দুখানা শিলনোড়া আর তিনখানা বঁটি নিয়ে পিসিমার পরিচালনায় বাড়ির দাসদাসীরা ওদিকটাকে কর্মে আর কোলাহলে উত্তপ্ত করে রাখে। খাবার বারান্দায় প্রতিবেলায় প্রায় তিরিশখানা আসন পড়ে।
এ বাড়ি থেকে কলেজযাত্রী যদিও একা খগেনদাই, কিন্তু স্কুলযাত্রী আছে অনেকেই। মেয়েদের আর শিশুদের জন্যে দুখানা ঘোড়ার গাড়ি ঠিক করা আছে। উপর ক্লাসের ছেলেদের প্রত্যেকেরই সাইকেল আছে। সাইকেল আছে খগেনদারও।
এত ঘর, এত মানুষজন এ-বাড়িতে, তবু যেন অদ্ভুত রকম নিঃশব্দ বাড়িটা। কেবল সকাল দশটা নাগাদ স্কুল-কলেজে যাবার তাড়ায় রান্নাঘরের দিক থেকে কিছু শোরগোল শোনা যায়। শোনা যায় পিসিমার প্রখর কণ্ঠস্বর।
পিসিমা রায়বংশের একমাত্র বোন। চারটি সন্তান নিয়ে যখন বিধবা হয়েছিলেন, তখন কোলের ছেলে নিখিলের বয়স তিন বৎসর। সেই নিখিল এবার ক্লাস সেভেনে উঠল। তার দুই দিদি, একটি সেভেনে, আরেকটি টেনে। পিসিমার বড় ছেলে বিবাহিত। কোন এক গ্রামের স্কুলের শিক্ষক। সেখানেই সস্ত্রীক থাকেন। বিধবা হওয়ার পর থেকেই পিসিমা এই সংসারে প্রতিষ্ঠিত। স্বামীর ভিটেয় আর ফিরে যাননি। পিসিমাকে ভয় করে এ-বাড়ির সকলেই। কিন্তু সেই প্রখরভাষিণী পিসিমাও খগেনদার যিনি মা এ বাড়ির সেই গিন্নিমার মুখের উপর কথা বলতে সাহস পান না। মাসিমার সামান্য একটি-দুটি কথা, চোখের কোণে সামান্য একটু স্ফুলিঙ্গ—তাতেই পিসিমা চুপ। সর্বত্র একটা অদ্ভুত শৃঙ্খলাবোধের পরিচয় দেখতে পায় রুনু। যেন কোনও অদৃশ্য নিয়ামক আড়াল থেকে এদের পরিচালনা করছেন। সেই নিয়ামক কি মাসিমা? নাকি রায়কর্তা? নাকি দুজনেরই মিলিত শক্তি?
মাসিমার মুখে একটু হাসি লেগেই আছে সবসময়। আদরেও হাসি, ধমকেও হাসি। ওই হাসিটাই কি মাসিমার শক্তির উৎস?
টকটকে লালপাড় শাড়ি আর সাদা সেমিজ-পরা ছোটখাট মানুষটি। নিটোল দুখানি হাতে একজোড়া সোনার কঙ্কন আর শাঁখা। দুই কানে একজোড়া লাল পাথর ঝিকমিক করে অন্ধকারেও। একপিঠ ঘনকৃষ্ণ কেশদাম, কপালে মস্ত একটা সিঁদুরের ফোঁটা। এ-ই হল মাসিমার সকালের রূপ। রুনুর মনে হয় বুঝি কোনও চলন্ত দেবীপ্রতিমা।
মাসিমার অপরাহ্নের সাজ আরও অপরূপ। প্রতিদিন মাসিমাকে আলতা পরাতে আসে একটা বউ। আগে মাসিমাকে পরিয়ে তারপর বাড়ির আর সব মেয়ে-বউদের পরায়। সকলে অবশ্য সবদিন পরে না। কিন্তু মাসিমাকে পরতেই হবে। সে বউটি মাসিমাকে চুলও বেঁধে দেয়। তখন মাসিমাকে পরতে হবে জরিপাড় ঢাকাই শাড়ি অথবা বেনারসি বা জর্জেট। গায়ের ব্লাউজটিও বুটিদার বেনারসী কি চিকন অথবা ঢাকাই মসলিন।
এ বাড়িতে সবচেয়ে কম সময় থাকেন স্বয়ং গৃহকর্তা। অতি প্রত্যুষে স্নান সেরে প্রায় ঘণ্টাখানেক নিত্য উপাসনা ও গীতা-পাঠ করেন। গীতা-পাঠে বইয়ের প্রয়োজন হয় না। সম্পূর্ণ অষ্টাদশ-অধ্যায় গীতাখানা ওঁর মুখস্থ। তারপর আটটা নাগাদ একটু ভারী রকমের প্রাতরাশ করে বেরিয়ে পড়েন মোটর সাইকেলে। যেদিন জলপথে কোথাও যাবার কথা থাকে, সেদিন মোটর বোটের সারেঙ যথাসময়ে হাজিরা দেয়। ওঁর নিজস্ব মোটর বোটও আছে। বাড়ি থেকে এক ফার্লং দূরে এক খালের মধ্যে নোঙর করা থাকে দুটি জলযানই। যখন যেটি প্রয়োজন, ব্যবহার করেন।
ওই যে সকাল আটটায় বেরিয়ে গেলেন, কখন ফিরবেন তার কোনও ঠিক নেই। সারা দিনের খাবার সবসময় ওঁর সঙ্গে থাকে। কোনও দিন দুপুরে, কোনও দিন সন্ধ্যায়, কোনও দিন রাত দুপুরে কর্মস্থল থেকে ফিরে আসেন রায়কর্তা। সারা জেলার বিভিন্ন স্থানে অনেকগুলি কনস্ট্রাকশনের কাজ চলছে ওঁর পরিচালনায় একসঙ্গে।
দুখিরাম বিশ্বাস শ্রীনাথ পণ্ডিতের সেই আদি যুগের ছাত্র। রুনু তাকে দেখেনি কোনও দিন। বাবার কাছেই শুনেছে, তার বর্তমান বয়স বছর ষাট-পয়ষট্টি হবে। বাবা তাঁর সেই কৃতি ছাত্র 'বিখ্যাত উকিল' বিশ্বাস মশাইয়ের উপর অনেকখানি ভরসা করেই মাত্র পঞ্চাশটি টাকা সঙ্গে দিয়ে রুনুকে এই দূর বিদেশে পাঠিয়েছেন। বলেছিলেন, ভর্তির টাকা, বই কেনার টাকা, হয়তো তিনিই দেবেন। শৈশবের গুরুর প্রতি এটুকু কর্তব্য তিনি পালন করবেন নিশ্চয়ই।
দুখিরাম বিশ্বাসকে দেখিয়ে দিয়েছিল হারানদা দূর থেকে।
—ওই যে, তোমার সেই 'বিখ্যাত উকিল' বাজারে চললেন। নিজের বাজার না কিন্তু, ওনার উকিলবাবুর বাজার।
দূর থেকেই মানুষটিকে দেখেছিল রুনু। শীর্ণ, কুব্জ, ঘোর কৃষ্ণবর্ণ একটি বৃদ্ধ লাঠিতে ভর দিয়ে চলেছেন। তাঁর চেহারা, তাঁর চলার ভঙ্গির মধ্যে একটি গৃহভৃত্যকেই দেখতে পেয়েছিল রুনু। নিজের পরিচয় দিয়ে মানুষটিকে বিব্রত করতে চায়নি আর।
থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা তো চমৎকার হল, রুনুর এবার ভাবনা হল কলেজে ভর্তির ব্যাপারটা নিয়ে। ওর সম্বল তো মাত্র পঞ্চাশটা টাকা!
সেদিন দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর আবার খগেনদার ঘরে ওরা দুজন বসল গল্প করতে। খগেনদার ঘরের দেয়ালে অনেক ব্যায়ামবীরের ছবি। দেয়ালের গায়ে, খাটের তলায় অনেক ব্যায়ামের সরঞ্জাম। আর খগেনদার গেঞ্জি-পরা দেহখানাও দেয়ালের যে-কোনও ব্যায়ামবীরের চেয়ে কম নয়। সশ্রদ্ধ বিস্ময়ে রণু দেখছিল খগেনদার শরীরখানা।
—কী দেখতে আছ?
—দেখছি, কী চমৎকার ফিগার আপনার!
—তোমারেও গইড়া-পিট্যা লমু। ভাবনা নাই।
—সে-তো পরের কথা। আগে বর্তমান ভাবনাটা...
—আবার কী ভাবনা?
—বাঃ! কলেজে ভর্তি হতি হবে না?
—ব্যস্ত কী! অখনও পনর-বিশ দিন সময় আছে।
খগেনদার সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, ভর্তি হতে প্রায় শখানেক টাকা লাগে। ফ্রিশিপের ব্যাপারটাও খুব নৈরাশ্যজনক। ফার্স্ট ইয়ারে নাকি ফ্রিশিপ কাউকে দেওয়াই হয় না নিতান্ত স্কলারশিপ-পাওয়া ছাত্র অথবা কোনও বিশেষ বড়কর্তার রেকমেন্ড-করা দরিদ্র ছাত্র ছাড়া। আর প্রফেসর সেনগুপ্তর খবর?
সে খবর আরও ভয়াবহ। নাম শুনেই খগেনদার বলে, তেনারে চেনলা কী কইর্যা?
—আমাদের স্কুলের হেডমাস্টারমশায়ের তিনি সহপাঠী ছিলেন। তাঁর নামে একখানা চিঠি দেছেন আমাদের হেডস্যার। সেই চিঠি নিয়ে তাঁর বাড়িতে দেখা করতি বলিছেন। আপনি চেনেন ওঁর বাড়ি। আমারে যদি একটু নিয়ে যান।
—কও কী! এক্কেরে বাঘ! বাড়ি গেলে প্রথম চোটেই গলাধাক্কা। আমার অত সাহস হইব না।
—কেন?
ব্যাপারটা সবিস্তারে বললেন খগেনদা। প্রফেসর সেনগুপ্ত কাগজে-কলমে ভাইস-প্রিন্সিপাল হলেও স্বয়ং প্রিন্সিপাল তাঁর কথায় ওঠেন বসেন। ছাত্র তো ছাত্র, অনেক প্রফেসরই তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে কাঁপতে থাকেন। বাড়িতে কারও সঙ্গে দেখা করেন না। তাঁর সঙ্গে যা কিছু কথাবার্তা, ওই কলেজে তাঁর ঘরে বসেই শেষ করতে হবে। বাড়িতে বউ-ছেলেমেয়ের সঙ্গেও পারতপক্ষে কথা বলেন না, সবসময় ডুবে আছেন লেখা আর পড়া নিয়ে। ইংরাজি সাহিত্যের উপর ওঁর অনেক বই বিদেশের ইউনিভার্সিটিতে পাঠ্য।
ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটিতে ওঁর কোনও বই নেই?—প্রশ্ন করে রুনু।
—আছে না? তুমি তো সায়েন্স পড়বা। তুমি পাইবা না। বি. এ., এম. এ.-তে ওনার বই আছে কয়েকখানা।
কিন্তু সেনগুপ্তসাহেবের পাণ্ডিত্যের পরিধি মেপে রুনুর ফয়দা কী? ওর আসল ভাবনা হল, যে করে হোক সেই চিঠি নিয়ে ওকে দেখা করতেই হবে তাঁর সঙ্গে। সেই চিঠিতে রয়েছে ওকে ফ্রিশিপ দেবার অনুরোধ। ফ্রিশিপ না পেলে ওর যে কলেজে পড়ার স্বপ্ন শূন্যে মিলিয়ে যাবে!
—আচ্ছা কলেজে যদি দেখা করি?
—তা অবশ্য করতে পারবা। কাইল আমার লগে কলেজে যাইবা। ওনার ঘরডা দেখাইয়া দিমু।
—আপনি যদি একটু আমার সঙ্গে—
—হেইডা আমার দ্বারা হইবে না। সেই বাঘের মতো চক্ষুদুইড্যা আর আশু মুখুজ্জে মার্কা গোঁফজোড়া দেখলেই আমার গলা শুকাইয়া যায়! সইত্য কইছি।
—কিন্তু সে চিঠি যে তাঁকে দিতেই হবে!
—সে তো এক আনার ব্যাপার! মোগো বাড়িতে বাবার অফিসের খাম আছে। চিঠিখান খামে পুইর্যা ঠিকানা লেইখ্যা ডাকে দিলেই তো চুইক্যা যায়।
ডাকে দিলেই যে রুনুর ব্যাপারটা চুকে যায় না সেটা তখনই খোলাখুলি বলতে পারছে না রুনু। ওর আর্থিক দুর্দশার কথা শুনে হয়তো খগেনদা তার বাবাকেই বলে বসতে পারে ওকে সাহায্য করতে। কিন্তু সেই সাহায্য এই প্রথম দিনেই চাওয়ার কথা ও ভাবতেও পারে না।
ভয়ে দুর্ভাবনায় দুশ্চিন্তায় সারারাত ঘুমোতেই পারল না রুনু।
পরদিন সোমবার খগেনদার সঙ্গেই তার সাইকেলের ক্যারিয়ারে বসে বি. এম. কলেজে পৌঁছল রুনু।
চারিদিকটা দেখে ও বিস্ময়ে স্তব্ধ। কী বিরাট সব দোতলা বাড়ি, কী বিশাল খেলার মাঠ, কী সুন্দর ফুলের বাগান!
মেইন বিল্ডিঙের নীচতলায় অফিসঘর। বিশাল বারান্দায় ছাত্রদের ভিড়। খগেনদা বলল, ওই কাউন্টার থিক্যা ভরতির ফর্ম বিলি হইতেছে। তুমিও একখান লইয়া ফিল আপ করিয়া দাও। তারপর পাশের কাউন্টারে টাকা জমা দিয়া আজই ভর্তি হইতে পারো। আবার দু-চার দিন পরেও ভর্তি হইতে পারো। ফার্স্ট ইয়ারের ক্লাস শুরু হইতে অখনও প্রায় দিনপনেরো বাকি। নোটিশে ভর্তির শ্যাষ তারিখটা দেইখ্যা লইও। তারিখ পার হইয়া গেলে কিন্তু কাইন্দাও কুল পাইবা না। বাঘা জে. এন. এস. -এর মায়া-দায়া নাই।
কথা শেষ করেই খগেনদা চলে গেল ক্লাসে। যাবার সময় দেখিয়ে গেল প্রফেসর সেনগুপ্তর অফিসঘর।
খগেনদা চলে যেতেই রুনুর বুকের মধ্যে একটা অদ্ভুত কাঁপুনি শুরু হল! ভারী পর্দাটা থেকে হাতদুই দূরে ও দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়াল। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে মাঝে মাঝে এক-এক জন পর্দা তুলে ঘরে ঢুকছেন কিছু কাগজ-পত্র, ফাইল ইত্যাদি হাতে নিয়ে, আবার একটু পরেই খালি হাতে নিঃশব্দে বেরিয়ে আসছেন। এঁরা প্রফেসর হতে পারেন, হতে পারেন অফিসের কোনও ক্লার্ক। ভিতর থেকে কোনও শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। কোনও ছাত্রও এ-ঘরে ঢুকছে না।
কতক্ষণ এইভাবে দাঁড়িয়ে ছিল রুনু, তা ওর খেয়াল নেই। একসময় বারান্দার সামনে একখানা ঘোড়ার গাড়ি এসে দাঁড়াল। খদ্দরের ধুতি-পাঞ্জাবি-পরা, কাঁধে একখানি ভাঁজ করা খদ্দরের উত্তরীয় একজন শীর্ণদেহী প্রৌঢ় নামলেন গাড়ি থেকে। নেমেই সরাসরি চলে এলেন সেই ভারী পর্দার মুখোমুখি। পাশে দাঁড়ানো রুনুকে দেখেই রুক্ষ গলায় বললেন, এখানে কী চাই? ভর্তি হবে? ওখানে যাও।
একমুহূর্ত মাত্র চোখাচোখি হল রুনুর সঙ্গে। তাতেই রুনু চিনে ফেলল সেই বাঘের চোখ আর 'আশু মুখুজ্জে মার্কা' গোঁফ। সন্ত্রস্ত হয়ে উঠল রুনু। সন্ত্রস্ত হয়ে উঠল সারা বারান্দাটা।
এবার শুধু বুক নয়, থরথর করে কাঁপতে শুরু করল রুনুর পা-দুটোও। নতুন করে ঘামতে শুরু করল রুনু। দু-পা সরে দাঁড়াল ও।
উনি ঘরে ঢুকতেই আবার একজন করে ও-ঘরে ঢুকতে শুরু করেছেন। এবার যাঁরা বেরিয়ে আসছেন তাঁদের হাতে দেখা যাচ্ছে সেইসব খাতা-পত্র যেগুলি নিয়ে আগে ওঁরা ঘরে ঢুকেছিলেন। এ ব্যাপারটাও চলল কিছুক্ষণ। তারপর আর কেউ ও ঘরে ঢুকছে না। ভিতর থেকেও কোনও সাড়া আসছে না। এক পা-এক পা করে পর্দার কাছে এগিয়ে এল রুনু।
এমন সময় একজন সুবেশ সুদর্শন যুবক ওই ঘরে ঢুকবার মুখে রুনুকে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে প্রশ্ন করলেন, কী চাই?
—প্রফেসর সেনগুপ্তর নামে একখানা চিঠি...
—গার্জিয়ানের চিঠি?
থতমত খেয়ে রুনু বলে, না...মানে...হ্যাঁ।
তিনি মুচকি হেসে বলেন, বুঝেছি দাও। আমি দিচ্ছি ওঁকে। উনি না ডাকলে ঘরে ঢুকবে না কিন্তু।
ধমকের সুরে কথাগুলি বলে তিনি রুনুর প্রদত্ত চিঠিখানা তাচ্ছিল্যভরে হাতে নিয়ে ভিতরে ঢুকে গেলেন। বেলা তখন প্রায় আড়াইটা।
সেই থেকে বিকেল সাড়ে চারটে পর্যন্ত দোরের আশে-পাশেই দাঁড়িয়ে রইল রুনু। খানিক বাদে সেই সুদর্শন যুবকটি বেরিয়ে এলেন। এবার তিনি ফিরেও তাকালেন না রুনুর দিকে। না, কেউ ওকে ডাকলও না। একসময় পর্দাটা নড়ে উঠতেই সরে দাঁড়াল রুনু। 'বাঘ' বেরিয়ে এলেন। গম্ভীরভাবে বারান্দা পার হয়ে এগিয়ে গেলেন নীচে দাঁড়িয়ে থাকা ঘোড়ার গাড়িটার দিকে।
বুক ফেটে কান্না এল রুনুর।
ঠাকুমার ঘরে প্রবেশ করতেই প্রথমে চোখে পড়ে বিশাল একখানা সূক্ষ্মকারুকার্য-করা মেহগনি কাঠের পালঙ্কের উপর প্রায় ছয় ইঞ্চি পুরু গদি। গদির উপর ধবধবে সাদা চাদরখানাতেও শিল্পীর পাকা হাতের কাজ সাদা সিল্কের সুতোর। সেই বিছানার কেন্দ্রে পাখির পালকের জোড়া বালিশ মাথায় দিয়ে শুয়ে আছেন ঠাকুমা মূল্যবান কাশ্মীরী শালে আবক্ষ আবৃত হয়ে। কখনও বা বসে আছেন পালঙ্কের রেলিঙে রাখা কয়েকটা বালিশে হেলান দিয়ে। পা-দুখানা জোড়া করে সামনে ছড়িয়ে রেখেছেন একটি নরম বালিশের উপর।
বিছানা থেকে চোখ তুললেই সামনের দেয়ালে দেখা যাবে কুলগুরু ভোলাগিরি মহারাজের মস্ত বড় অয়েল পেন্টিং। তার ডানদিকে ঠাকুমার সন্ন্যাসীপুত্রের দণ্ডায়মান ছবি। সে এক দিব্য মূর্তি। কী উজ্জ্বল দুটি চোখ!
বাঁদিকেও মাতৃপূজারত সেই সন্ন্যাসীপুত্র। এছাড়াও দেয়ালে আছে কালি, দুর্গা, হর-পার্বতী ইত্যাদি অনেক দেব-দেবীর ছবি।
উপরে চোখ তুললে দেখা যাবে একটা ইটালিয়ান ঝাড়-লন্ঠন। একটা সহস্রদল পদ্ম যেন। রাত্রে ঝাড়লণ্ঠনটা জ্বালা হয়। সারা ঘরখানা বিচিত্র আলোর খেলায় মায়াময় হয়ে ওঠে।
এই ঘরখানাই এ-বাড়ির ঠাকুরঘর—উপাসনা মন্দির। ঠাকুমাই সে মন্দিরের একমাত্র জাগ্রতা দেবী।
এ বাড়ির গৃহকর্তা থেকে শুরু করে তিন বছরের শিশুটিকে পর্যন্ত সকালে প্রাতঃকৃত্য সেরে পরিচ্ছন্নভাবে ওই ঠাকুরঘরে প্রবেশ করতে হবে। প্রথমে প্রণাম করতে হবে ঠাকুমাকে, তারপরে কুলগুরুকে, তারপর আর সব দেব-দেবীকে।
সারা দিন-রাত এ-ঘরে একটি বিশেষ ধূপকাঠি জ্বলে একের পর এক। সে ধূপকাঠি মহীশূর থেকে মাসে মাসে পার্সেল করে পাঠায় এক দক্ষিণ ভারতীয় ভক্ত। মহীশূর চন্দনের মন-মাতানো গন্ধে ঘরখানা ভরপুর হয়ে থাকে সারাক্ষণ। সে গন্ধ পাওয়া যায় বার থেকেও।
এ মন্দিরে নিত্য ফুল যোগাবার জন্যে একজন মালি নির্দিষ্ট আছে। সে কেবল ফুল দিয়েই যায় না, এক-এক দিন এক-এক রকমের ফুল-সাজে সাজিয়ে দিয়ে যায় ঠাকুরঘরখানাকে। যাবার সময় একগুচ্ছ ফুল দিয়ে প্রণাম করে যায় ঠাকুমাকে।
ঠাকুমার বয়স প্রায় নব্বই হয়েছে। গায়ের রঙ বিশুদ্ধ মাখনের মতো। শরীরটিও মাখনের মতো নরম, যেন হাড়গোড় নেই কোথাও। চুলগুলি চকচকে সাদা রেশমের মতো। একদা যে বেশ মোটাসোটা স্বাস্থ্যবতী মহিলা ছিলেন, দেহে এখনও রয়েছে তার আভাস। স্নিগ্ধকোমল ভাসা-ভাসা চোখদুটো থেকে যেন অবিরাম স্নেহধারা ঝরে পড়ছে। কথা বলেন খুব কম, কিন্তু যে-কটি কথা বলেন তা থেকে যেন ফোঁটা ফোঁটা স্নেহের বর্ষণ হয়। চোখের দৃষ্টি কমে গেছে, কিন্তু শ্রবণশক্তি এখনও অটুট। বস্তুত গলার স্বরেই তিনি বাড়ির লোকদের চেনেন।
ঠাকুমা তাঁর ছেলেমেয়েদের ডাকেন তাদের শৈশবের নামে। রায়মশাইকে ডাকেন ফুলু, পিসিমাকে ডাকেন মনু, বাড়ির গৃহিণীকে ডাকেন ফুলবউ,খগেনদাকে ডাকেন ধোনাই। এমনি নানান জনের নানা নাম। সে নামে একমাত্র ঠাকুমাই ডাকেন। রুনুর নাম দিয়েছেন উনি নতুনদাদা। সকলের সঙ্গেই ওনার একটিমাত্র সম্বোধন—'তুই'। পুত্র-পুত্রবধূস্থানীয়রা ডাকেন ওঁকে বড়মা বলে। 'মা'-এর সঙ্গে এই 'বড়' উপসর্গটা যে কেন যুক্ত হয়েছে, তা আজও জানে না রুনু। কিন্তু ওই 'বড়'-টুকু বাদ দিয়ে শুধু 'মা' বলে যেন ওঁকে ডাকাই যায় না। শুনে শুনে তা-ই মনে হয় রুনুর।
ঠাকুমার ঘরে যে কেউ যখন তখন হুট করে ঢুকে পড়তে পারে না। একমাত্র কর্তা-গিন্নি, এবং ঠাকুমার খাসদাসীটা ছাড়া। আর সকলের জন্যে তিনটি সময় নির্দিষ্ট আছে। প্রাতঃপ্রণাম, সন্ধ্যায় সমবেত-উপাসনা, এবং রাত্রে খাবার পরে ঠাকুমার বিশাল খাটটিতে ঠাকুমাকে ঘিরে বসে পারিবারিক আড্ডা। এ আড্ডা চলে ঘণ্টাখানেক। শরীর সুস্থ থাকলে এবং ঘুমিয়ে না পড়লে (বাচ্চা ছেলেমেয়ের বেলায়) এ আড্ডায় আসতেই হবে। ডাকতে হয় না কাউকে, সবাই এ আড্ডায় যোগ দেবার জন্যে ছটফট করে সারা দিন। এই আড্ডার আসরটাই খগেনদার ভাষায় 'ঠাকুমার দরবার' এই দরবারের আকর্ষণ দুর্বার। এখানে সবাই যেন ঠাকুমার সমবয়সি—পঁয়ষট্টি বছরের পিসিমা থেকে পাঁচ বছরের নাতনি পর্যন্ত।
সবাই তার মনের কথাটি, তার সুখ-দুঃখ-মান-অভিমানের কথাটি ঠাকুমাকে শুনিয়ে যেন একটা পরম তৃপ্তি, পরম সান্ত্বনা পায়। সারাদিনে যার যা অভিজ্ঞতা-অভিযোগ, সব শিশুর সারল্য নিয়ে শোনেন ঠাকুমা। কারো পিঠে একটু হাত বুলিয়ে দেন, কাউকে দুটো সান্ত্বনার কথা বলেন, তাদের মনের গ্লানি কেটে যায়। কেউ তার স্কুলের সদ্য-ঘটা একটা ঘটনা বলে। যেটা শুনতে শুনতে আর এক জনের হয়তো আর একটা গল্প মনে পড়ে যায়। এমনিভাবে চলতে থাকে ঠাকুমার আসর। চলতেই থাকে যতক্ষণ না-বাড়ির গৃহিণী রান্নাঘরের পাট চুকিয়ে ঠাকুমার রাতের খাবার দুধ-খই নিয়ে এ-ঘরে প্রবেশ করেন। মাসিমাকে দেখেই সবাই সুড়সুড় করে সরে পড়ে। এর পরে ও-ঘরে ঠাকুমার খাসদাসীটি ছাড়া আর কারও প্রবেশ অধিকার নেই।
ঠাকুমার দরবারে প্রথম পদার্পণের দিনটির স্মৃতি আজও অমলিন রয়ে গেছে রুনুর মনে।
ও ঠাকুমা, এই দেখো তোমার দরবারে আইজ একটা নতুন মানুষ লইয়া আইছি। —রুনুর পিঠে হাত রেখে ঠাকুমার ঘরে প্রবেশ করতে করতে বলে খগেনদা, অ্যারে চেনো?
দরবার-কক্ষ তখন প্রায় ভর্তি হয়ে গেছে। ঠাকুমা খাটের রেলিঙে হেলান দিয়ে সামনে দু-পা ছড়িয়ে বসে আছেন, আরে তাঁকে ঘিরে খাটের উপর বসে আছে বিভিন্ন বয়সের অন্তত জনাদশেক মানুষ। বসেছে ঠাকুমার মুখোমুখি।
খগেনদা প্রণাম করল ঠাকুমাকে। রুনুকে বলতে হল না। ও পাদুখানা যে প্রণাম পাবারই পা, যেন দুটি শ্বেতপদ্ম পড়ে আছে একটি পালঙ্কের বালিশের উপর। পাদুটি যখন স্পর্শ করল রুনু, একটা পরমাশ্চর্য অনুভূতিতে ওর গা শিউরে উঠল। সত্যিই যেন ফুলের উপরে হাত পড়ল। কী কোমল, কী মসৃণ!
সমস্ত দেহটি শালে আবৃত। মুক্ত আছে কেবল মুখখানা আর পা-দুখানা। প্রণাম সেরে ও এবার তাকাল সেই মুখের দিকে, সেই স্নেহভরা দুটি চোখের দিকে। চোখদুটি যেন শিশুর সারল্যে মিটি মিটি হাসছে। যেন বলছে, 'চিনি চিনি, তোকে চিনি। জন্ম-জন্মান্তর ধরে তোকে চিনি।' মুখে বললেন, তরে তো চিনলাম না দাদা। খাড়াইয়া ক্যান? বও।
ঠাকুমা হাত চাপড়ে দেখিয়ে দিলেন তাঁর বাঁ পাশটি। খগেনদা ইতিমধ্যে বসে পড়েছে ঠাকুমার ডানপাশে।
মন্ত্রচালিতের মতো রুনু বসে পড়ল ঠাকুমার বাঁপাশে। ঠাকুমা কোমলভাবে হাত রাখলেন ওর পিঠে। যেন একগুচ্ছ ফুল দিয়ে কেউ স্পর্শ করল ওকে।
ও ঠাকুমা, করলা কী! অয় যে মুসলমান!—হেসে বলেন খগেনদা।
মান থাকলেই মানুষ।—বলেন ঠাকুমা।
খাটের একপ্রান্ত থেকে চব্বিশ-পঁচিশ বছরের একটি সুন্দরী বধূ মিষ্টি হেসে বললেন, ছোটঠাকুরপো, এবার তুমি আউট। ঠাকুমা নতুন বরটিকে যেভাবে কোলের কাছে টেনে নিলেন প্রথম দর্শনেই, তাতে তো মনে হচ্ছে লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট! ঠাকুমা ওর প্রেমে পড়ে গেছেন।
ইংরাজি কথাটা না বুঝলেও বাংলা কথাটা বুঝে ঠাকুমা হেসে ফেললেন। একেবারে অকৃত্রিম শিশুর হাসি। একটি দাঁতও নেই ঠাকুমার। তবু কী অপরূপ সেই হাসি! হাসির রোল উঠল সারা আসরে। কে যেন উলুধ্বনি দিয়ে উঠল। বউটি মুখে টিপে মিটিমিটি হাসছেন রুনুর আড়ষ্ট আনত মুখের দিকে তাকিয়ে।
রুনুর লজ্জা-রাঙা মুখের দিকে তাকিয়ে খগেনদাও মজা পেয়ে বলে, তা-ই নাকি ঠাকুমা? নতুন বর পাইয়া আমারে তালাক দিবা? তা বইল্যা আমি কিন্তু ছাড়ুম না তোমার পাশটি।
বলতে বলতে আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে বলে খগেনদা ঠাকুমার পাশ ঘেঁষে। একখানা হাত তুলে ঠাকুমার গলা জড়িয়ে ধরল।
কে যেন বলে উঠল, দুই পাশে দুই কলাগাছ, মধ্যিখানে মহারাজ।
আর একজন ব্যাকরণে ভুল ধরল—মহারাজ হইব ক্যানরে? ঠাকুমা আমাগো মহারানি।
ব্যাকরণে ভুল কিন্তু ছোটঠাকুরপোই আগে করেছে।—এবার আবার সেই বধূটি ফোঁড়ন কাটলেন—যদি বলেন, 'নতুন মানুষ' তাহলে 'একে চেনো?' প্রশ্নটা করা চলে না। বরং তোমার কর্তব্য ছিল সর্বাগ্রে এই আসরে তোমার এই নতুন বন্ধুটির পরিচয় দেওয়া।
ওমা, তুমি অ্যারে চিনলা না রাঙা-বউদি? অবশ্য তুমি তো সারাদিনই গুহাবাসিনী, তুমি আর সংসারের কতটুকু খবর রাখো? ও তো অখন পুরান হইয়া গেছে গা। তরা চেনস না?—খগেনদা প্রশ্ন করল আসরকে।
ছোটদের মধ্যে অনেকেই সমস্বরে কলকল করে উঠল —চিনি, চিনি! উনি তো মোগো বাড়িতে থাকব। আমাগো মাস্টার।
খগেনদা এবার সবিস্তারে রুনুর পরিচয় পেশ করল আসরে। শেষে সেই বধূটিকে বলল, ও কোন ঘরে থাকব জানো? ঠিক আমার পাশের ঘরডায়।
অর্থাৎ তোমার নতুন বন্ধুটিকে তুমি একলাই ষোলোআনা দখল করতে চাও! সেটি হবে না ছোটঠাকুরপো। আমাদের ভাগ আছে। —হেসে বলেন বধূটি।
—এইবার তোমার ব্যাকরণেও ভুল হইল রাঙাবউদি।
—কোথায়?
—আমারে যদি ছোটঠাকুরপো ডাকো, তয় এনারে কী ডাকবা? অয় তো আমার থনে অনেক ছোট।
—'ছোট' বিশেষণটা তবু তোমারই থাক। ওকে ডাকব রাঙাঠাকুরপো বলে। দেখছ না কেমন রাঙা টুকটুকে ছেলে! তোমার আপত্তি নেই তো?
রুনু চোখ তুলল। রাঙাবউদির চোখে ওর চোখ মিলিত হল। কী জানি কী ছিল ওই চোখে, সারা দেহ যেন ওর বীণার মতো বেজে উঠল। একটা কথাও ও বলতে পারল না। বার বার ওর ঠোঁটই শুধু নড়ল।
ওমা, এ ছেলে যে কথাই কয় না! বোবা নাকি?— হেসে বলেন রাঙাবউদি, আচ্ছা, নাহয় সোনাঠাকুরপো বলেই ডাকব। এবার খুশি তো?
না, না—অপ্রত্যাশিত জোর গলায় হঠাৎ বলে বসল রুনু।
—বুঝলাম, রাঙাঠাকুরপো ডাকটাই তোমার পছন্দ।
এতক্ষণ ঠাকুমার মুখে সেই শিশুর সরল হাসিটা লেগেই ছিল। তিনি বললেন, তুই ঠিক কইছ লবু। এই টুকটুইক্যা দাদুডারে আমি ডাকুম রাঙাদাদু। অয় আমার রাঙাকত্তা, আমার নতুন বর।
বলতে বলতে ঠাকুমা তাঁর দুখানি লোলচর্ম স্থবির হাতে রুনুকে জড়িয়ে ধরলেন।
একটা মধুর উত্তেজনায় রুনুর বুকের মধ্যে যেন সাতসমুদ্রের ঢেউ উঠল।
প্রথম থেকেই রুনু লক্ষ্য করেছে, রাঙাবউদির ভাষাটা আলাদা। ও ভাষায় যেন একটা শহুরে দীপ্তি রয়েছে। বৈশিষ্ট্য কেবল ভাষায় নয়, বৈশিষ্ট্য আছে ওঁর চেহারায়, সাজসজ্জায়। এই দলের মধ্যে যেন একেবারে আলাদা।
রাঙাবউদির কোলের বাচ্চাটিও রুনুর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বছরতিনেকের মেয়েটি যেন সদ্য-ফোটা একটা গোলাপ। হাসি-ভরা দুটি টলটলে চোখ, ও যেন চোখ দিয়েই হাসে। কোমল রেশমের মতো চুলগুলি নেমে এসেছে কাঁধ পর্যন্ত একটা ছন্দময় বিন্যাসে। মাথার ঝুঁটিতে লাল ফিতে দিয়ে সুকৌশলে একটি ফুল রচনা করা হয়েছে। আঙুলগুলি যেন ফুলের কলি। টুকটুকে রাঙা ঠোঁটদুটি সদাবাঙময়। বড় চঞ্চল বাচ্চাটি। এ-কোল থেকে ও-কোলে চড়ছে, এর চুল টানছে, পিসিমার চশমা ধরতে গিয়ে ধমক খাচ্ছে, পরমুহূর্তেই আরেকজনের কোলে চড়ে চুমু খাচ্ছে। আদরে, ধমকে সবকিছুতেই ওর হাসি। এ-হাত ও-হাত ঘুরতে ঘুরতে একসময় ও এসে পড়ল রুনুর হাতের কাছে। হাত বাড়াতেই ও বসে পড়ল রুনুর কোলের উপর। সরাসরি ওর চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞাসা করল, তুমি কে?
পরীক্ষার খাতায় অনেক কঠিন প্রশ্নের উত্তর লিখেছে রুনু, কিন্তু এইটুকু বাচ্চার এই ক্ষুদ্র প্রশ্নের জবাব ও খুঁজে পেল না চট করে। ও শুধু সেই প্রশ্নটাই ফিরিয়ে দিল শিশুটিকে—তুমি কে?
—আমি হাছি...মা যাব।
ফুলের মতো সুখস্পর্শে শিশুটি রুনুকে ক্ষণতরে আচ্ছন্ন করে দিয়ে ওর সাদর আলিঙ্গন উপেক্ষা করে প্রায় নাচতে নাচতে চলে গেল রাঙাবউদির কাছে। চড়ে বসল তাঁর কোলে।
হেরে গেলে তো?—হেসে বললেন রাঙাবউদি, ওর মর্জি না হলে কেউ ওকে ধরে রাখতে পারে না। তুমি তবু ভাগ্যবান রাঙাঠাকুরপো।
কেন?—কোনওক্রমে মুখ তুলে বলল রুনু।
—প্রথম দিনেই ওর কৃপা লাভ করেছ। অনেকে তো অনেক সাধ্য-সাধনা করেও—
রাঙাবউদির কথা শেষ না হতেই মাসিমা প্রবেশ করলেন ঠাকুমার রাতের খাবার নিয়ে। সে রাতের মতো সমাপ্ত হল ঠাকুমার দরবার।
সে রাতটা ছিল রায় পরিবারে রুনুর প্রথম রাত।
দুপুরে খগেনদের সঙ্গে কলেজে ভর্তি হওয়া এবং ফ্রিশিপ পাওয়া সম্বন্ধে কথা বলে রুনুর মনটা নৈরাশ্যে ভরে গেছিল। রাতে ঠাকুমার দরবার থেকে ফিরে এসে একটা পরামাশ্চর্য প্রেরণায় ওর বুক ভরে উঠল। বার বার ওর মনে পড়তে লাগল রাঙাবউদির শেষ কথা গুলিঃ 'তুমি তো ভাগ্যবান, প্রথম দিনেই ওর কৃপা লাভ করেছ।' রুনু ভাবছে, প্রথম দিনে কি কেবল ওই ফুলের মতো মেয়ে হাসিরই কৃপা লাভ করল ও? কৃপা লাভ করল নাকি রায় পরিবারের কুল-দেবী ঠাকুমারও? সর্বোপরি রাঙাবউদির কৃপা লাভ করে কৃতার্থ হয়ে গেল নাকি ও প্রথম দিনেই? এই কৃপার ঋণ শোধ হবে কি ওর এ জীবনে?
সেই রাতেই রুনু মনে মনে সঙ্কল্প করলঃ কলেজে ভর্তি হবার জন্যে রায়মশাইয়ের কাছে অর্থ সাহায্য চেয়ে যেন ওকে আবার কৃপার পাত্র না হতে হয়; ও যেন নিজের শক্তিতেই কলেজে ভর্তি হতে পারে, যেন দাদার ইচ্ছার মর্যাদা দিতে পারে, যেন দাঁড়াতে পারে নিজের পায়ে কারও কৃপার পাত্র না হয়ে।
সেই সোমবারের পর থেকে প্রতিদিনই একবার করে কলেজে গেছে রুনু। সেই বাঘের ঘরের দোরে প্রতিদিনই কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেছে। কোনও কোনও দিন সেনগুপ্তসাহেব কলেজে আসেননি। এলে সাধারণত বারোটার আগেই আসেন। এসব খবর এর-ওর কাছে শুনে রুনুর ইতিমধ্যে জানা হয়ে গেছে। যেদিন তিনি আসেন না, সেদিন সমস্ত এলাকাটা ঘুরে ঘুরে দেখে রুনু।
এ সময়টা নতুন ছাত্ররা, যারা এবার ভর্তি হল অথবা হবে, বারান্দায় ভিড় করে। ঘুরে ঘুরে দেখে কোন ঘরে কোন ক্লাস বসে। নোটিশ বোর্ডে দেখে প্রফেসরদের ক্লাস রুটিন। তাদের পিছনে পিছনে ঘুরেছে রুনুও। কলেজের সবগুলি কক্ষই ওর চেনা হয়ে গেছে। একদিন নোটিশ বোর্ডে ফার্স্ট ইয়ারের রুটিনও ঝুলল। ভর্তির শেষ তারিখের তখন আর মাত্র একদিন বাকি।
প্রথম দিনের নৈরাশ্যের কথাটা রুনু খগেনদাকে বলেনি। কেবল বলেছে যে, ওদের হেডমাস্টারমশাইয়ের চিঠিটা প্রফেসর সেনগুপ্তকে দেওয়া হয়েছে। তিনি সময়মতো ওকে ডাকবেন।
সেই ডাকটির প্রত্যাশায় ও প্রতিদিন কলেজে এসেছে। যেদিন প্রফেসর সেনগুপ্তকে দূর থেকে তাঁর কক্ষে প্রবেশ করতে দেখেছে, সেইদিনই দোরের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে একবুক আশা নিয়ে। এক-এক দিন আগে থেকেই দাঁড়িয়ে থেকেছে ঠিক পর্দার পাশটিতে। কোনও কোনও দিন মনে হয়েছে, প্রবেশের মুহূর্তে তিনি যেন ওর দিকে একবার তাকিয়েছেনও। কখনও-বা মনে হয়েছে, তিনি ওকে চিনেওছেন। কিন্তু প্রত্যাশিত ডাকটি যে আজও এল না। আর যে মোটে একদিন সময় আছে হাতে!
রুনু খবর নিয়েছে, আই. এস-সি. ফার্স্ট ইয়ারে আর মাত্র তিনটি ভ্যাকান্সি আছে। ফার্স্ট ডিভিশন ছাড়া নেওয়া হবে না। আজ ভর্তির কাউন্টারে কোনও ভিড় নেই। বারান্দাটা প্রায় শূন্য। রুনুর ভর্তির ফর্ম ফিল আপ করা হয়ে গেছে অনেক আগেই।
হেডমাস্টারমশাইয়ের লেখা চিঠিখানা খগেনদা পড়েছিলেন পরামর্শ দিয়েছিলেন ফার্স্ট ইয়ারে ফ্রিশিপ পাবার আশা ছেড়ে দিয়ে অবিলম্বে ভর্তি হয়ে যেতে। রেজাল্ট মোটামুটি ভালো হলে ওই চিঠি নিয়ে বরং সেকেন্ড ইয়ার থেকে ফ্রিশিপ চাওয়া সহজ হবে।
ওর যে ভর্তি হবার টাকাটাও সঙ্গে নেই, সে কথা লজ্জায় ও আজও বলতে পারল না খগেনদাকে। বলবে না সে কথা কোনও দিনও অন্তত রায় পরিবারের কাউকেই। এই দুই সপ্তাহের মধ্যেই রায় পরিবারের সকলে ওকে আপনজনরূপে, বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছে। ওর ছাত্র-ছাত্রী দুটিকে ও নিয়মিত পড়াতে শুরু করেছে। একটা যেন বিশেষ সম্মানের আসন ও ইতিমধ্যেই লাভ করেছে এ পরিবারে। সেই সম্মানিত ভূমিকা থেকে ভিখারির ভূমিকায় ও নামবে না কিছুতেই। তাতে যদি বি. এম. কলেজে ওর পড়া না হয় না-ই হল। ও আবার ফিরে যাবে দেশে। কিন্তু তার আগে ওর সেই চিঠিখানা ও ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। এমন মূল্যবান চিঠির এতবড় অমর্যাদা ও হতে দেবে না। খগেনদার কথায় মনে হয়, সে চিঠিখানা 'গার্জিয়ানের চিঠি'-র গতি লাভ করেছে। গার্জিয়ানের চিঠি নিয়ে আসে ফেল করা অথবা কোনও-কারণে-অপরাধী ছাত্ররা। রুনু কি ফেল করা ছাত্র? ও কি কোনও অপরাধ করেছে ও চিঠি দিয়ে? এই চিন্তায় ওর ভিতরকার ছাত্রসত্ত্বাটা দারুণ অপমানিত বোধ করছিল।
আজ তাই একটা শেষ যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হয়েই এসেছে রুনু। ওর বিশ্বাস, গার্জিয়ানের চিঠি মনে করে সে চিঠি প্রফেসর সেনগুপ্ত আদৌ পড়েননি। ও চিঠিখানা রুনুর কাছে এক পরম সম্পদ। সে জিনিসকে এই অপমানের ধূলায় ফেলে যাবে না ও কিছুতেই। ওই চিঠি নিয়ে ও দৌলতপুর কলেজের প্রিন্সিপালের সঙ্গে সরাসরি দেখা করবে। পরের হাতে আর পাঠাবে না। ওই চিঠির বলেই ও ভর্তি হবে সেই কলেজে। 'বাংলার অক্সফোর্ড' মাথায় থাক, বাঘমশাই থাকুন তাঁর 'আশু মুখুজ্জে মার্কা গোঁফ' ফুলিয়ে। এখানে যখন পড়বেই না তখন আর বাঘকে ভয় করতে যাবে কেন?
একবুক গুমরোনো অভিমান নিয়ে রুনু আজ শক্ত পায়ে দাঁড়িয়ে আছে সেই ভারী পর্দার পাশটিতে। একসময় প্রফেসর সেনগুপ্ত এলেন। আজও তাকালেন ওর দিকে। যেন চিনলেন। রুক্ষ গলায় বললেন, আজও তুমি দাঁড়িয়ে আছ এখানে? কী চাই?
আমি ফিরে চাই আমার সেই চিঠিখানা।—অকম্পিত গলায় বলে রুনু।
—কোন চিঠি?
—যে চিঠি লিখিছিলেন আমাদের হেডমাস্টার নরেন দাশগুপ্ত মশায়।
—কাম ইন। ভিতরে এসো।
বাঁহাতের ইঙ্গিতে রুনুকে ভিতরে আসতে বলে ভিতরে প্রবেশ করলেন প্রফেসর সেনগুপ্ত।
তাঁর পেছন পেছন রুনু প্রবেশ করল তাঁর ঘরে। উনি আসন গ্রহণ করে সরাসরি প্রখর চোখে তাকালেন রুনুর দিকে—সে চিঠি তুমি ফিরে চাও কেন?
ওটা আমার একটা সম্পদ। যথাসাধ্য জোর গলায় বলে রুনু ও চিঠির এতবড় অপমান আমি হতি দেবো না। গরীবের উচ্চশিক্ষা এ কলেজে না হলিও অন্যকোনও কলেজে হয় কিনা আমার দেখতি হবে। তাই ও চিঠি আমার চাই।
সে চিঠি আমায় লিখেছিল নরেন। সে তো আমার। তুমি তা ফিরে পাবে না। যাও! গেট আউট। —বাঘের মতোই গর্জন করে ওঠেন বি. এম. কলেজের বাঘ।
অনেকক্ষণ নিজেকে সামলে ছিল রুনু। এবার আর কান্নাটাকে রোধ করা গেল না। ক্ষোভে অপমানে ধিক্কারে ওর বুকখানা যেন ফেটে যাচ্ছে। একেবারে ছেলেমানুষের মতো ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল ও। দুহাতে চোখ ঢেকে বলল, কলেজে আমাকে ভর্তি হতিই হবে। বাবার সারাজীবনের স্বপ্ন আমি এমন করে ভাঙতি পারব না। বাবা যে তাহলি...আমি এ কলেজে পড়ব না। আমার চিঠি দিন। ওই চিঠি নিয়ে আমি দৌলতপুর কলেজে...
কান্নায় ওর কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে।
—না, তুমি এই কলেজেই পড়বে। চোখ মোছ। তাকাও আমার দিকে।
চোখ থেকে হাত নামাল রুনু।
এ কী দেখছে ওর চোখের সামনে! ম্যাজিক নাকি! কে ওর সামনে বসে? এ কি সেই মহাগম্ভীর রুক্ষভাষী মানুষটি? এ যে একেবারে অন্য মানুষ! হেসে বললেন বি. এম. কলেজের বাঘ, শ্রীমান রনজিৎকুমার, তোমার বাবাকে আমার ধন্যবাদ জানিও। নামটা তোমার ঠিকই রেখেছেন তিনি। বাঘা জিতেন সেনকে রণে পরাস্ত করেছ তুমি! নরেনের স্কুলে যেমন ফার্স্ট বয় ছিলে, আমার স্কুলেও তেমনি ফার্স্ট বয় হতে হবে কিন্তু।
আনন্দে উত্তেজনায় রুনুর বুকের মধ্যে তখন যেন ঢেঁকির পাড় পড়ছে। ও কথা বলতে পারে না।
—কী কথা বলছ না যে?
আমি প্রাণপণে চেষ্টা করব স্যার।—কাঁপা গলায় বলে রুনু।
—দেখি তোমার ফর্ম দাও।
ভর্তির ফর্মটা ওর বুকপকেটের মধ্যে তখনও মাথা জাগিয়ে রয়েছে। ফর্মটার ভাঁজ খুলে এগিয়ে ধরল রুনু।
উনি ওটা হাত থেকে নিয়ে খসখস করে কী একটু লিখে ফিরিয়ে দিলেন ওর হাতে। রুনু হাতে নিয়ে দেখে, ইংরেজিতে লেখা আছেঃ ভর্তির ফিস মাপ করা হল।
—যাও, ওখানে গিয়ে জমা দিয়ে আজই ভর্তি হয়ে যাও।
হাসি ফুটল এবার রুনুর মুখেও। দু-চোখে জল, মুখে হাসি। সে এক বিচিত্র ছবি। সেই ছবিখানা ধীরে ধীরে এগিয়ে এল টেবিলের কোণ ঘুরে। নত হয়ে প্রণাম করল প্রফেসর সেনগুপ্তকে। তিনি হাত রাখলেন ওর মাথায়। নরম স্নেহভরা গলায় বললেন, ফ্রিশিপের জন্যে কাল একটা দরখাস্ত লিখে নিয়ে এসো।
সেই স্নিগ্ধ চোখ, সেই কোমল কণ্ঠস্বরই ওকে বলে দিল, ফ্রিশিপ ও পেয়ে যাবে।
আশায় আনন্দে উত্তেজনায় যেন নেশাগ্রস্তের মতো টলতে টলতে ও বেরিয়ে এল 'বাঘের ঘর' থেকে।
নদী-খাল-বিলে তো জল পাওয়া যায়ই, কিন্তু রুক্ষ মরুভূমির বক্ষ বিদীর্ণ করে যে জল পেতে চায়, তাকে তো সাধ্য-সাধনা করতেই হবে। তেমনই একটা কঠিন সাধনায় যেন আজ সিদ্ধিলাভ করল রুনু। তার উত্তেজনায় ও পাগলের মতো ছুটে এলো কলেজ থেকে কাউনিয়ার বাসা পর্যন্ত প্রায় দুই মাইল রাস্তা। এসে খগেনদা থেকে শুরু করে বাড়ির সমস্ত গুরুজনকে প্রণাম করল, সকলকেই বলল এক কথাঃ আমি আজ ভর্তি হয়ে গিছি। এক পয়সাও লাগেনি। ফ্রিশিপও পাব, বলিছেন সেনসাহেব।
তুমি তো সাঙ্ঘাতিক পোলা!—চোখ বড় বড় করে বলে খগেনদা, শ্যাষপর্যন্ত বাঘেরে সইত্যই বশ করিয়া ফেললা!
রায় পরিবারে সেদিন ছোটখাটো একটা উৎসবই হয়ে গেল রুনুকে কেন্দ্র করে।
সে রাতে শুয়ে শুয়ে ভাবছিল রুনুঃ এই যে যুদ্ধটা করল ও, সে কি ওই চিঠির জোরে, নাকি নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে? বাবার সাহায্য ছাড়া এ-ই ও প্রথম ভর্তি হল। এর আগের ভর্তির ব্যাপারগুলিতে ওর কোনও ভূমিকা ছিল না। যা করবার, যা বলবার, বাবাই বলেছেন, করেছেন। এ-ই কি নিজের পায়ে দাঁড়ানো? ওর মন বলল, এর পশ্চাতে রয়েছে ওর মা-বাবার আর্শীবাদ, ওর দাদার শুভেচ্ছা, ওর হেডমাস্টারমশাইয়ের চিঠি আর সর্বোপরি সেই অদৃশ্য বিধাতার অকৃপণ কৃপা।
সেইসব আশীর্বাদ আর শুভেচ্ছা মাথায় নিয়ে এখন থেকে ওকে এগিয়ে চলতে হবে নিজের পায়ে। মনে মনে শপথ নিল রুনু।
শারদীয়া কিশোর ভারতী ১৯৭৮
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন