শ্যামদাস দে

সেদিন ওই নাটকীয় মুহূর্তে হঠাৎ খোকাদা এসে রুনুকে একটা আসন্ন বিপদ থেকে বাঁচিয়ে দেওয়ায় ওর যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল। রুনুর মতো 'ইঁচড়ে পক্ক' ছেলেকে হেডস্যার তো কেবল তিনটে বেত মেরেছিলেন। অবশ্য নরেনদা এসে তখন ওকে রক্ষা না করলে হয়তো হেডস্যার ওকে সেদিন খুনই করে ফেলতেন। কিন্তু সেদিন বাবার হাতে পড়লে ওর যে কি শাস্তি হত তা ভাবতেও গায়ে কাঁটা দেয়। সে শাস্তির নমুনা তো দেখেছে রুনু দাদার উপর অনেক বার।
শাস্তি ওর হল না, তবু যেন স্বস্তি পাচ্ছিল না রুনু মুক্তি পেয়েও। ওর যেন এখনও কিছু জানতে বাকি আছে। কে লিখেছিল সেই সাংঘাতিক ছড়াটা? তাহলে কি খোকাদা জানে? জানে বলেই কি তাকে মুক্তি দিয়ে দিল? কৌতূহলী হয়ে উঠল রুনু। চুপি চুপি ক্লাস ফাইভ-এর ঘরে ঢুকে মুলি বাঁশের বেড়ার ফাঁকে চোখ রেখে কান পেতে ওদের কথা শুনতে লাগল। ওর এই গোপন উপস্থিতি আবিষ্কার হলে কী বিপদ হবে কে জানে! তবু কৌতূহল জিনিসটা বড় সাংঘাতিক। ওর বুক কাঁপছে দুরুদুরু, তবু নড়তে পারছে না।
সেদিন বেড়ার উপর কান পেতে ও-ঘরের সব কথাই শুনেছিল রুনু। ও যে প্রশান্তর চেয়ে ভালো ছাত্র, খোকাদার এ প্রশংসায় আর এতটুকুও উত্তেজনা নেই। কী হবে আর তা শুনিয়ে শ্রীনাথ পণ্ডিতকে? তিনি তো জানলেন রুনু ফার্স্ট নয়, সেকেন্ডও নয়, হয়েছে থার্ড। কিন্তু সবচেয়ে মর্মান্তিক খবর হল ওর সেই বিখ্যাত কবিতার লেখক নাকি স্বয়ং খোকাদা। রুনুর হাতের লেখা নকল করে নাকি তিনিই লিখেছিলেন ও কবিতা। এতদিন সবার মুখে শুনে শুনে রুনুও মনে মনে যেন বিশ্বাস করত ও-ই লিখেছিল সেই ছড়াটা। হায়! যে মূল্য দিয়ে বাজুনীয়া স্কুলের বিখ্যাত কবি হয়ে পড়েছিল রুনু, সে খ্যাতির প্রাসাদ ওর ধূলায় লুটিয়ে দিল খোকাদা। এর পরে স্কুলের সবাই ওকে টিটকারি দেবে। একটা গভীর বিষাদে ওর বুক ভরে গেল। খোকাদা এসেই ওকে কোলে তুলে নিয়ে যে আশ্চর্য আনন্দটা জাগিয়েছিল ওর বুকে, ওর কবিখ্যাতি কেড়ে নিয়ে সে বুকটা ভরে দিল অসহায় বেদনায়। নরেনদা ওকে মিথ্যুক ভাববেনৃ। হেডস্যার, দ্বিজুদা, সবাই ভাববেন তাই। হায়, এ-দুঃখ ও কোথায় রাখবে! ওকে ইঁচড়ে পাকা ভাববেন শ্রীনাথ পণ্ডিতও। ওর কবি-মনটা কান্নায় ভেঙে পড়ছিল সেদিন।
শেষ পর্যন্ত যখন ওর বাজুনিয়া স্কুল ছেড়ে যাবার কথা উঠল, খুশি হয়ে উঠেছিল রুনু। মুহূর্তে ওর মনের মধ্যে মধুমতীর দুই তীরের শত শত ছবি ঝলমল করে উঠল। বাড়ি যাব, এবার আমি বাড়ি যাব। আবার দাদার সঙ্গে গ্রীষ্মের দুপুরে বনে বনে ঘোরা যাবে, আবার পাওয়া যাবে বন্ধু হরেকেষ্টকে, তাকে নিয়ে নীলকুঠির জঙ্গলে, ধোপাদের আম বাগানে, ছোট গাঙের সবুজ মাঠে আর মধুমতীর তীরে তীরে সেই সব আশ্চর্য পাখি আর প্রজাপতিদের দেখা যাবে। ওঃ, কতকাল যে তাদের দ্যাখেনি রুনু। 'বাড়ি যাব, এবার আমি বাড়ি যাব'—একটা প্রিয় গানের কলির মতো কথাগুলি ওর ছোট বুকে অহরহ ধ্বনিতে হতে থাকে। আর চোখের সামনে ভাসতে থাকে এক-একটা ছবিঃ প্রকাণ্ড বট গাছটার স্নেহশীতল ছায়ায় গোবরার পাঠশালাটা, সুশীলাদির সাজানো-গুছোনো ছোট্ট ঘরখানা, কতকাল ঘুমিয়ে থাকা পুতুলদের বিছানাটা, নীলকুঠির চৌবাচ্চা-ঘরের মেঝেতে বৈরাগী খুড়ির ঘুঁটে দেওয়া, জোয়ারের জলে বোরোর ক্ষেতের মধ্যে চকচকে মাছেদের ছুটোছুটি, ছোট গাঙে ডোবার পাড়ে মুঠো মুঠো মুড়ির মতো শামুকের ডিম আর ডোবার টলটলে জলে কলমি ফুলের উপর প্রজাপতির নাচ, লজ্জা পাওয়া লজ্জাবতী লতার সঙ্গে ফড়িংদের খেলা...
দুপুরের খাওয়া-দাওয়া শেষ করে সবার কাছে বিদায়-টিদায় নিয়ে রওনা হতে প্রায় দুটো বেজে গেছিল।
গত বছর যখন প্রথম এসেছিল এই বিলে দেশে তখন ছিল শীতকাল, এখনও শীতকাল। তখনও ছিল এই ছোট্ট ডিঙিটা আর মাঝি ছিল নগরবাসী, এখনও তাই। সেদিন প্রথম দর্শনে এই বিলে দেশটাকে ওর একটুও ভালো লাগেনি। তারপর একটা বছর ধরে এ-দেশটাকেও বড় ভালোবেসেছিল বইকি। তাই তাকে বরাবরের মতো ছেড়ে যাবার মুহূর্তে ওর বুক ফেটে কান্না আসছিল। কেঁদেও-ছিল যতক্ষণ নৌকায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখা যাচ্ছিল বাজুনিয়া গ্রামটা। হায়, চুয়াকে কি ও ভুলতে পারবে কোনও দিন! ভুলতে পারবে দিপু-নিপুর ঠাকুমাকে?
'আর কানতি হবে না ছোটোকত্তা,' এক সময় বলেছিল নগরবাসী, 'আখোন ছই-র মধ্যে যাইয়ে ঘুমোও, এডা তো পরদেশ, এর জন্যি কানতি হবে ক্যান? আখোন তো নিজির ঘরে যাচ্ছ। মা বাপ ভাই বুন সাথী সঙ্গী সব পাবা, দুঃখ থাকবে না আর।'
সত্যি সব দুঃখ ঘুচে গেছিল রুনুর যে মুহূর্তে গোপালগঞ্জের স্লুইস গেট পার হয়ে মধুবতীতে পড়ল ওদের ডিঙিখানা। এ মধুমতী অবশ্য মরা মধুমতী। তবু তো মধুমতী। কোনো এক অতীত কালে মধুমতী গোপালগঞ্জের গা ঘেঁষেই প্রবাহিত ছিল। আজ মধুমতী ঠাঁই বদল করে তার বর্তমান পথ বেছে নিয়েছে রুনুদের গ্রামের পাশ দিয়ে। এ-মধুমতীর সঙ্গে সে-মধুমতীর সংযোগ করতে হয়েছে দীর্ঘ খাল কেটে। তার নাম খাইনের খাল। মানিকদার মোড় থেকে বেঁকে সেই খাইনের খাল দিয়েই এখন স্টিমার নৌকা আসে গোপালগঞ্জে। রুনুদের ডিঙিও যাবে এখন সেই খাইনের খাল দিয়ে হরিদাসপুর হয়ে অনেকখানি ঘুরে। বর্ষাকাল হলে সোজা পথে চার মাইল গেলেই গোবরার ঘাটে পৌঁছনো যেত। এখন ঘুরতে হবে অন্তত দশ মাইল। বাড়ি যেতে কত রাত হবে কে জানে!
গেট যখন পার হল তখন ওপারে সূর্যাস্ত হচ্ছে। নদীর পারে এই র্সূযাস্ত-ছবি কতকাল দ্যাখে না রুনু। আনন্দে উত্তেজনায় বুকের মধ্যে ওর শিরশির করে উঠল।
'দ্যাখো দ্যাখো, নগরকাকা কী সুন্দর!'
এ-সুন্দরকে দেখবার চোখ নেই নগরবাসীর। এ পুলকিত বিস্ময় শুধু রুনুর।
নগরবাসী পশ্চিম আকাশে চোখ রেখে বলে, 'কি দ্যাখছো?'
কী যে দেখছে রুনু তা বোঝাবার ভাষা ওর জানা নেই।
'সমস্ত নদীর জলটা কেমন...সারা আকাশখানা কেমন...আর ওপারের ওই ধোঁয়া-ধোঁয়া ঘুম-ঘুম বন-জঙ্গল ঘেরা গ্রামগুলি...কী সুন্দর, তাই না? আর কদ্দুর?'
নগরবাসী হা-হা করে হাসে—'ছোট কত্তা বাড়ি যাবার জন্যি পাগল হইছে। আর বেশি দূর না। এই তো খালডা ঘুরলিই। বেশি রাত হবে না।
পাগল সত্যিই হয়েছে রুনু। পাগল হয়েছে অনেকদিন পরে আবার মধুমতীকে হাতে পেয়ে। নগরবাসীর বার বার বারণ সত্ত্বেও নৌকার ধারে বসে নদীর জলে হাত ডুবিয়ে বসে রইল রুনু। হাতের আঙুলগুলি দিয়ে জলের উপর দাগ কাটতে-কাটতে আর মাঝে মাঝে এক আঁজলা জল চোখেমুখে ছিটিয়ে দিতে দিতে যেন মধুমতীর সঙ্গে কথা বলতে শুরু করল রুনু।
'তুমি আমারে ভুলে গিছিলে মধুমতী? আমি কিন্তু ভুলিনি। সত্যি বলছি ভুলিনি। বিদ্যের কিরে।'
খাইনের খালেও যেন মধুমতীর গন্ধ। এ-ও তো মধুমতীরই জল।
'এখানে যাবতিয় বেনেতি ও মুদিদ্রব্য পাইকারি ও খুচরা বিক্রয়ার্থ সরবদা মজুত থাকে। পরীক্ষা প্রার্থনিয়। প্রোঃ ইন্দ্রজিৎ কুমার দে।'
রুনু বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ। পড়ার ঘরের দোরের মাথায় এই দোকান-ঘরের সাইনবোর্ড কেন?
আস্ত একটা কেরোসিন টিনের পাতের উপর দাদার আনাড়ি হাতে আলকাতরার অক্ষরে লেখা এই অদ্ভুত সাইনবোর্ডে হ্রস্বইকারের অতিশয় উদার ব্যবহার দেখে হাসি পেল রুনুর। দাদার বানানভুল আর সারবে না। কত যে মার খেয়েছে এ জন্যে পণ্ডিতমশায়ের কাছে। তবু 'পরীক্ষা' শব্দটা যে 'পরিক্ষা' হয়নি তাই রক্ষা। এটা যে গোপালগঞ্জের বিখ্যাত ইসলামিয়া স্টোর্স-এর সেই মস্ত বড় সাইনবোর্ডটার নকল তা বুঝতে পারছে রুনু। কিন্তু বুঝতে পারছে না। 'প্রোঃ' কথাটার মানে কী। সে সাইনবোর্ড-এর নীচে দিকেও ছোট অক্ষরে লেখা আছে 'প্রোঃ—সেখ সামছুল আলম।' প্রোঃ মানে কী দোকানদার? দাদা কি তাহলে দোকানদার হয়েছে? পড়ার ঘর হয়েছে দোকান ঘর?
লেখাটা একটুও সুন্দর হয়নি। কোনো কোনো অক্ষরের নীচ দিয়ে আবার লম্বা লম্বা আলকাতরার লেজ ঝুলছে। ছবিখানা যা দাঁড়িয়েছে, দেখলে না হেসে উপায় নেই। এই ছবিখানা কি বাবা দেখেছেন? এই অসহ্য বানান ভুল দেখলে পণ্ডিতমশায় কি চুপ করে থাকবেন? মনে তো হয় না রুনুর।
সকালে ঘুম থেকে উঠেই প্রথম এসেছিল রুনু পড়ার ঘরে দাদার খোঁজে। এসেই এই বিচিত্র ছবিখানা দেখে প্রথমে হাসি পেয়েছিল। কিন্তু একটু পরেই গভীর ভাবে ভাবতে শুরু করল ব্যাপারটা।
নদীর বুকের উত্তুরে হাওয়ায় কী প্রচণ্ড শীত! একখানা খদ্দরের চাদর দিয়ে সে শীতের সঙ্গে লড়াই করা যাবে কেন? প্রায় দুপুর রাতে শীতে ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে ওরা যখন বাড়ির উঠানে পৌঁছল কাল রাতে, তখন ও বাড়িতে কেউ জেগে নেই। না-না, একজন জেগে ছিল, তার নাম 'নোথা'। দাদার দেওয়া নাম। মিয়া পাড়ার কোন বাড়ি থেকে ভুলিয়ে ভালিয়ে নিয়ে এসেছিল। তখন একেবারে ছেলেমানুষ ছিল নোথা। দাদা ওকে খাইয়ে পরিয়ে মানুষ করেছে। এখন বেশ হৃষ্টপুষ্ট চেহারা। এখন ও তিন বছরের পূর্ণ যুবক। অতিশয় বিশ্বস্ত প্রহরী নোথা। সারা রাত জেগে শীতে কুঁইকুঁই করেও বাড়ি পাহারা দেয়। অত রাতেও ঠিক জেগে ছিল নোথা। নোথাই তো প্রথমে সাদর অভ্যর্থনা জানাল রুনুকে। প্রথমে অবশ্য ঘেউ ঘেউ করে উঠেছিল, কিন্তু ওই অন্ধকারেও গন্ধ পেয়ে চিনে ফেলল রুনুকে! কুঁইকুঁই শব্দ করতে করতে এক পাক নেচে ফেলল ওকে ঘিরে। তারপর দুপায়ে দাঁড়িয়ে কোমরটা জড়িয়ে ধরে ওর গায়ে হাতে মুখ ঘষে ঘষে সে কী আদর! যেন বলছে তুমি এসেছ রুনু ভাই? তুমি এলে এতদিন পরে? তুমি ভালো আছ তো?
ইতিমধ্যে পণ্ডিতমশায়ের হাঁক শুনে ঘুম ভেঙেছে মায়ের। দরজা খুলে লণ্ঠন হাতে বারান্দায় এলেন মা। রুনুকে দেখেই জড়িয়ে ধরলেন।
'ওমা-আ, রুনু আইছিস? ইস্কুল তো কবে ছুটি হইছে, অ্যাদ্দিন আসিস নাই ক্যান? ইস কী রোগা হয়ে গিছিস। ওমা-আ ঠান্ডায় যে এহেবারে...'
স্নেহের স্রোতে বাধা পড়ল পণ্ডিতমশায়ের কাঁপা গলার ধমকে।
'আদর-টাদর পরে করবা। চট করে একটু জল গরম করো তো। শীতি মলাম।'
বুকের উত্তাপে রুনুকে অনেকখানি গরম করে দিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন মা জল গরম করতে। পণ্ডিতমশায় গিয়ে বসলেন উনুনের পাশে। মা-ও বসলেন রুনুকে কোলের কাছে নিয়ে।
তারপর তো তাড়াতাড়ি দুটি ঠান্ডা ভাত মুখে দিয়ে লেপের তলায় ঘুম।
পণ্ডিত মশায় অবশ্য ঠান্ডা খাবার খেলেন না। তাঁর জন্যে দুধ গরম করা হল। চিড়েমুড়ি তো ঘরে থাকেই সব সময়।
মায়ের বিছানার এক পাশে ছিল সেজদি। মায়ের নির্দেশে সেই বিছানাতেই রুনুও গিয়ে শুয়ে পড়েছিল। সেজদির কিন্তু ঘুম ভাঙল না তাতে। রুনুর আগমনটা সেজদির কাছেও অজ্ঞাত রয়ে গেল। দাদা তো তখন বাইরের ঘরে ঘুম-নদীর গভীর অতলে ডুব সাঁতার দিচ্ছে।
ইচ্ছে করেই একটু বেশি সকালে উঠেছিল রুনু। চোখেমুখে ছিল দুষ্টু-দুষ্টু হাসি। এসেছিল দাদাকে চমকে দিতে। কিন্তু ওই বিচিত্র সাইনবোর্ড দেখে নিজেই চমকে উঠল রুনু। দাদা তাহলে দোকানদার হয়েছে? কীসের দোকান? যাবতীয় বেনেতি ও মুদিদ্রব্য? অর্থাৎ ইসলামিয়া স্টোর্স-এর সেই অতসব জিনিসের দোকান? কিন্তু এইটুকু ঘরে কী করে তা সম্ভব? সে দোকানে তো একটা ছুঁচোলো লম্বা দাড়িওয়ালা টুপি-পরা মোটা-সোটা লোক সব সময় মোটা মোটা খাতা লেখে আর দোকানের জনাদশেক কর্মচারীকে মাঝে মাঝে এটা-ওটা হুকুম করে। সেই মোটা লোকটা নিশ্চয় প্রোঃ। দাদা নিজেই যদি প্রোঃ হয় তবে হুকুম করবে কাকে? সে দোকানে তো বই-খাতা-পেনসিল, তেল-নুন-মসলা, দাও-কোদাল-কাস্তে, ধুতি-শাড়ি -গেঞ্জি , লজেন্স-বিস্কুট-বাতাস, হাঁড়ি-পাতিল-খুস্তি, এমনকী খেলার সরঞ্জাম ফুটবল-র্যাকেট, ব্যাট সবই পাওয়া যায়। তার কোনটা বেনেতি আর কোনটা মুদিদ্রব্য তা জানে না রুনু। কিন্তু সে যে অনেক টাকার ব্যাপার। দাদার কি অত টাকা হয়েছে?
ভেবেছিল ডাকবে কি দাদাকে। দাদাই প্রথম দরজা খুলে ওকে দেখে চমকে উঠবে। কিন্তু দাদার 'যাবতিয় বেনেতি ও মুদিদ্রব্য' দেখবার কৌতূহলটা ও আর দমন করতে পারছে না। এক সময় চেঁচিয়ে ডেকে উঠল, 'দাদা, ও দাদা।'
বার কয়েক ডাকতেই ঘুম ভাঙল দাদার। কেবল একটা ময়লা গেঞ্জি গায়ে শীতে কাঁপতে-কাঁপতে ঘুম-ঘুম চোখে দরজা খুলল ইন্দ্রজিৎ। সামনেই হাসি-মুখ রুনুকে দেখে একটু যেন লজ্জা পেল ইন্দ্র। বিছানা থেকে একটা কাঁথা টেনে গায়ে জড়াতে-জড়াতে বলল, 'এত সকালে কী করে আসলি রে?'
'আইছি তো কাল রাত্রেই। বাবার সঙ্গে আইছি।'
'সে কী রে? বাবা নিয়ে আসল তোরে? তোর তো দারুণ ভাগ্যি। আয় আয়, ঘরে আয়। ক' দেহি সব শুনি।'
রুনু এসে ঘরে ঢুকে চারিদিক তাকিয়ে একেবারে চমকে উঠল। দাদা যেন আরও লজ্জা পেল।
'ও সব দেখবি পরে। আগে তোর কথা ক'। বাবা তো কইছিল এবার আর তোরে আনবে না। একেবারে বই-টই কিনে দিয়ে আসবে। এবার বুঝি সব বিষয়ে ফাস্টো হইছিস?'
মাথা নীচু করল রুনু। দু-চোখ ছলছল করে উঠল। ভারী গলায় বলল, 'বাজুনীয়ায় আর পড়ব না। এখন থেকে গোপালগঞ্জ স্কুলে পড়ব।'
'কেন রে? তুই মাইনর বৃত্তি পরীক্ষা দিবি না?' ইন্দ্র যেন কিছুই বুঝতে পারছে না। রুনু কি ওর সঙ্গে তামাশা করছে? তাহলে মুখ ভার কেন?
আস্তে-আস্তে সব কথা বলল রুনু। বলল স্কুল ছাড়ার সেই গল্প।
সব শুনে ইন্দ্র বলল, 'তোর খোকাদা তো অদ্ভুত মানুষ রে। ওই সময় না আস্যে পড়লি তোর কম্মোসারা হইছিল। বাবা তোরে খুনই করে ফেলত। যাক বাঁচিছিস।'
সেই বেঁচে যাওয়ার মধ্যেও যে ওর একটা মৃত্যু হয়ে গেছে সেকথা কি ও বুঝিয়ে বলতে পারবে দাদাকে?
একটু পরে বলল, 'কিন্তু আমি পড়ব কোন ঘরে বসে? তুমি যে আমাগে পড়ার ঘরডারে এহেবারে...তুমি আর পড়বা না?'
ভারি লজ্জা পেল দাদা। মুখ নীচু করে বলল, 'দূর, পড়তি-টড়তি আমার ভালো লাগে না। আমি ব্যবসা করব। শুনিস নাই বাবা বলে, বাণিজ্যে বসতি লক্ষ্মী। টাকা আয় করতি হলি ব্যবসাই হল আসল। ব্যবসায় তো আর বেশি বিদ্যে লাগে না, লাগে বুদ্ধি। যোগ-বিয়োগডা জানলিই হল। তাতে আমি...'
হ্যাঁ, দাদা যে অঙ্কে পাকা তা জানে রুনুও। দাদার যত ভয় ব্যাকরণ আর ভূগোল। ব্যবসায় ও দুটো লাগে না নিশ্চয়।
নিজের অবস্থাটাকে যথাসাধ্য গৌরবজনক প্রমাণ করতে দাদা সেদিন আরও অনেক কথা বলেছিল। বলেছিল গোপালগঞ্জের অনেক বড় বড় দোকানদারের সঙ্গে ও ভাব করে ফেলেছে। শিখে ফেলেছে অনেক ফন্দি-ফিকির। সব কথা রুনুর কানেও যায়নি, ও গভীর কৌতূহল দেখছিল রূপান্তরিত পড়ার ঘরখানাকে। বাঁশের বেড়াগুলি খবরের কাগজ দিয়ে মোড়া হয়েছে। সামনের দরজার পাল্লায় সদ্য আলকাতরার রং চড়েছে পেছনের বেড়ার গায়ে দুখানা কাঠের তাক ঝুলছে হাতখানেক ব্যবধানে। তাকের উপর সারি সারি কৌটো। প্রতিটি কৌটোর গায়ে কাগজের টুকরো সেঁটে লেবেল লাগানো হয়েছে। জিরা, হলুদ, লঙ্কা, ধনে, চিনি, বাতাসা, বিস্কুট ইত্যাদি।
যে চৌকিখানায় ওরা দু-ভাই শুত বরাবর, সেখানা এখন হয়েছে প্রোঃ মহাশয়ের গদি। মাঝখানে মাত্র হাত দেড়েক চওড়া একটা ছোট-খাট বিছানা পাতা। ওইটুকু বিছানাতেই কি রাত্রে শুয়েছিল দাদা? বিছানার চারপাশে অনেকগুলি মাটির মালসা, টিন, কৌটো ইত্যাদি সাজানো রয়েছে।
রুনুর পর্যবেক্ষণ চলতে চলতেই দাদা বিছানাটা সুন্দর করে গুটিয়ে রেখে দিল খাটের তলায় একটা বস্তার উপর। তারপর সুন্দর করে ঝাঁট দিল।
রুনু দেখছে বেড়ার গায়ে খবরের কাগজের উপর আলাদা কাগজ লাগিয়ে দাদা অনেক ভালো ভালো কথা লিখে রেখেছে। গোপালগঞ্জের সব ক'টা দোকানের সবক'টা বাণীই বুঝি খুঁজলে পাওয়া যাবে দাদার বেড়ার গায়ে। 'আজ নগদ কাল ধার', 'সততাই মূলধন', 'স্বাগতম', 'বাণিজ্যে বসতি লক্ষ্মী' এবং আরও অনেক।
রুনুর দৃষ্টি অনুসরণ করে দাদা লাজুক গলায় বলে, 'আমার হাতের ল্যাখা যা বিচ্ছিরি। তোর তো ল্যাখা সুন্দর। এবার তোরে দে ল্যাখাব। ওসব ফেলে দেব। সাইনবোটটাও কিন্তু সুন্দর করে লেখতি হবে। তুই যে-যে রং চাস আমি সব আনে দেব। দাঁড়া, আমি হাতমুখ ধুয়ে আসি। তারপর গঙ্গাজল, ধূপধুনো...এখন অনেক কিছু করতি হবে। ধর্মে মতি না হলি ব্যবসায় উন্নতি হয় না।'
ব্যস্তভাবে চলে গেল ইন্দ্র।
দাদা উন্নতি করতে চায় ধর্মে মতি রেখে ব্যবসা করে। জলধরও উন্নতি করতে চায় লেখাপড়া শিখে। সেই লম্বা জলধর বলেছিল, 'আমি উন্নতি করিব। বিদ্যালাভ না করিলে উন্নতি হয় না।' সে চায় বিদ্যালাভ করে উন্নতি করতে, দাদা চায় বিদ্যা ত্যাগ করে উন্নতি করতে। দুই প্রান্তে দুজন। দুজনের পথ আলাদা। তবু দুজনকেই ভালো লাগে রুনুর। দুজনকেই ও শ্রদ্ধা করে।
দাদার যে ধর্মে মতি হয়েছে সে তো দেখতেই পাচ্ছে রুনু। দরজার মাথায় দুপয়সা দামের এক মাটির গনেশ ঠাকুর বসানো হয়েছে। তার গলায় ফুলের মালা পায়ের কাছে ধূপদানি। গনেশ ঠাকুরের দুধারে পুরোনো পঞ্জিকার পৃষ্ঠা থেকে উঠে এসে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কালী মাতা, শ্রীশ্রীদুর্গা সকলেই স্থান নিয়েছেন সসম্মানে।
কৌতূহলবশে তাকের উপরের গোটাকয়েক কৌটো খুলে দেখল রুনু। প্রায়ই শূন্য, যদিও লেবেলের উপর নাম একটা আছে। হয়তো এগুলি এক সময় ভরতি ছিল, সব বিক্রি হয়ে গেছে। আবার ভরতি হবে।
তাকের এক কোণে কিছু বর্ণবোধ, বাল্যশিক্ষা, নব ধারাপাত, লক্ষ্মীর পাঁচালি, আবার শ্লেট, পেনসিল, সাদা কাগজও আছে। বিদ্যা একেবারে ত্যাগ করেনি দাদা। তবে এ বিদ্যা 'বিক্রয়ার্থ মজুত থাকে'। খাটের উপর মাটির মালসাগুলিতেও কিছু কিছু 'বেনেতি ও মুদিদ্রব্য' আছে দেখা গেল। সর্বসাকুল্যে পাঁচ টাকার মালও হবে না হয়তো।
প্রথম থেকেই একটা ভয় বাসা বেঁধেছে রুনুর বুকের মধ্যে। ও ভাবছে দাদার বহুবিধ গোপন কর্মের মতো এই দোকান-দোকান খেলাটাও একটা গোপন কর্ম। বাবা জানলে এ খেলাঘর এক মুহূর্তে ভেঙে দেবেন। দাদা মুখ ধুয়ে আসতেই ও প্রশ্ন করে। 'তুমি যে এই সব কম্মো করতিছ, বাবা জানলি...'
'বারে, বাবাই তো আমারে ব্যবসা করতি বলিছে।' সগর্বে বলে ইন্দ্র, 'বাবাই তো মূলধন দশ টাকা দেছে আমারে, বলিছে এক বছরের মধ্যি, একশো টাকা জমাতি হবে। আমি হিসেব করে দেখিছি, ছয় মাসও লাগবে না।'
কথা বলতে বলতেই গঙ্গাজল ইত্যাদির ব্যাপারটা শেষ করল দাদা। একে একে সমস্ত দেব-দেবীকে প্রণাম করে শান্ত ভাবে গদিতে উঠে বসল। রুনু বিস্মিত হল দাদার মুখে সংস্কৃত শ্লোক শুনে। গনেশের প্রণাম মন্ত্র। বাবা নাকি মুখস্থ করিয়েছেন। সে কী গম্ভীর মন্ত্রপাঠ দাদারঃ খর্বং স্থূলতনুং গজেন্দ্রবদনং লম্বোদরং সুন্দরম...পুরো চার লাইন সংস্কৃত শ্লোক মুখস্থ বলে গেল হাত জোড় করে। রুনুর দস্তুরমতো ভক্তি হল দাদার উপর।
গদি মানে অবশ্য দুভাজ করা একটা বস্তা। সামনে একখানা ছোট্ট জলচৌকি। জলচৌকির কেন্দ্রে ইঞ্চিখানেক লম্বা একটা ছিদ্র। ওই ছিদ্রপথে পয়সা গলিয়ে দিলে নীচে রাখা একটা কৌটার মধ্যে ঠুক করে পড়বে।
সবশেষে সেই জলচৌকিখানাকেও তিনবার স্পর্শ করে প্রণাম করল ইন্দ্র। তারপর বসল গম্ভীর হয়ে। ব্যস, দোকানদার এবার প্রস্তুত। এখন ক্রেতা এলেই ব্যবসা শুরু হবে।
কিন্তু কোথায় ক্রেতা? কে খরিদ্দার? ঘণ্টাখানেকের মধ্যেও কেউ এল না দোকানের ধারে কাছে? খরিদ্দারের অভাবে কেবল দোকানদারের নয়, রুনুরও ভারী দুঃখ হল। এখন সময় রান্নাঘর থেকে সেজদির ডাক এল।
'ফ্যানা ভাত হয়ে গেছে রুনু। গরম গরম খাবি তো আয় তোরা।'
সেজদি রুনুর দু-বছরের বড়। তারও দু-বছরের বড় ইন্দ্র। সেজদির 'তোরা' শব্দে অবশ্যই ইন্দ্রও বাদ পড়ল না। তবু রুনুর কানে যেন একটু খটকা লাগল। পূর্বেও রান্নাঘর থেকে সেজদির ডাক শোনা গেছে অনেক বার। তখন বলত, 'দাদা, রুনু, তোরা খাতি আয়'। আজ দাদাকে কেন বাদ দিল সেজদি?
'তুই খাইয়ে আয় যা,' বিষণ্ণ গলায় বলল ইন্দ্র, 'আমি বউনি না করে ওঠব না।'
ইন্দ্রর করুন মুখের দিকে চেয়ে বড় মায়া হল রুনুর। হঠাৎ একটা বুদ্ধি এল ওর মাথায়। বলল, 'আচ্ছা তোমার দোকানে লজেন্স আছে?'
'আছে। খুব ভালো লজেন্স আছে।'
'আর বিস্কুট?'
'একেবারে সদ্য গরম বিস্কুট আছে। মুড়ির মতো মুড়মুড়ে।'
'আমারে এক পয়সার লজেন্স আর এক পয়সার বিস্কুট দেবা?'
'সত্যি কিনবি?' খুশি হয়ে উঠল ইন্দ্র।
'সত্যি। এই ন্যাওনা দুই পয়সা।' পকেট থেকে দুটো পয়সা বের করল রুনু।'
'রাখ, আগে মাল দেব, পরে দাম নেব। এই হল নিয়ম।'
যথা নিয়মে এক পয়সার বিস্কুট ও এক পয়সার লজেন্স ক্রেতার হাতে দিয়ে দাম নিল দোকানি। পয়সাদুটো কপালে ছুঁইয়ে জলচৌকির উপর বার বার ঠুকে সেই ছিদ্রপথে গলিয়ে দিল ইন্দ্র। ঠুক করে একটু শব্দ হল নীচের কৌটোয়। আজকের তহবিলের প্রথম জমা।
'তোরে দিয়েই আজ বউনি হল।' করুণ সুরে বলে দাদা, বউনির খদ্দের না হলি তোরে দু-একখানি বিস্কুট এমনি দিতাম। তোরে কেনা দামেই দেলাম।'
রুনু দেখল দাদা চারখানা বিস্কুট আর পাঁচটা লজেন্স দিয়েছে। এ জিনিস বাজুনিয়ার দোকানে আরও বেশি পাওয়া যেত। বিস্কুট পাঁচখানা আর লজেন্স আটটা। তা হোক, ওতে দুঃখ নেই রুনুর। দাদা যখন দোকান দিয়েছে তখন লাভ তো একটু করতেই হবে।
দাদার দিকে একখানা বিস্কুট আর একটা লজেন্স বাড়িয়ে ধরে রুনু বলল, 'তুমি এই বিস্কুট আর লজেন্সটা খাও দাদা। মারে আর সেজদিরেও একটা করে দেবানে।'
'দূর, তোর কেনা জিনিস আমি খাব ক্যান?'
'বাঃ, আমি তো নিজিই দিচ্ছি। আমি দিলি তুমি নেবানা? তাহলি তুমি কিছু দিলিও কিন্তু আমি নেব না।' অভিমান ভরে বলে রুনু।
'সত্যি সত্যি দিলি তো?' কেমন একরকম মুখ করে বলল ইন্দ্র। তারপর হাত বাড়িয়ে নিলও।
দুপুরে খাওয়া-দাওয়া করেই পণ্ডিতমশায় চলে গেলেন গোপালগঞ্জ। সম্ভবত রুনুকে স্কুলে ভরতি করার ব্যাপার নিয়ে হাইস্কুলের হেডমাস্টারমশায়ের সঙ্গে কথা বলতে। ওরা দুভাই বসে গেল দোকান সাজাবার কাজে।
রুনু ঠিক করেছে প্রথমে ওইসব মহাজন-বাণীগুলি লিখে ফেলতে হবে বড় বড় করে, সুন্দর করে। শেষে ধরবে সাইনবোর্ডটা।
শুরু হল 'স্বাগতম' দিয়ে। ওটা থাকবে দরজার বাইরের দিকে। ওটা ভিতরে থাকার মানে হয় না। 'স্বাগ' পর্যন্ত দেখেই ইন্দ্র একেবারে লাফিয়ে উঠল। 'বাঃ, খুব সুন্দর হচ্ছে তো। বাজুনে যাইয়ে তোর তো খুব উন্নতি হইছেরে। আচ্ছা তুই বসে বসে ল্যাখ। আমি এট্টু পাড়াডা ঘুরে আসি।'
ইন্দ্ররও যে অনেক কাজ। বসে থাকলে চলবে কেন ওর? একেবারে নতুন দোকান। পাড়ায় পাড়ায় প্রচার প্রয়োজন। কায়েত পাড়া, কাপালি পাড়া, বুনো পাড়া এমনকী মালো পাড়ায়ও প্রচার করতে হবে। যদিও মালো পাড়ায় গোপাল মালোর মস্ত বড় দোকান আছে।
ঘাড় গুঁজে সারা দুপুর সমানে লিখে চলেছে রুনু। তখনও গোটা কয়েক বাণী লিখতে বাকি। এরপর আবার লিখতে হবে লেবেলগুলিও। সাইনবোর্ড এখন অনেক দূর।
পাবলিসিটি শেষ করে ফিরে এসেই ইন্দ্র প্রশ্ন করে, 'দোকানে কোনও খদ্দের আইছিল নাকি রে?'
'না তো।' করুণ গলায় বলে রুনু।
'আসবে, আসবে।' উৎসাহের সহিত বলে ইন্দ্র 'এই তো সবাইরি কয়ে আলাম। একে একে আসবে। পেথম কিছুদিন সস্তাদরে দেব। তখন দেখবি সব মালো পাড়ার দোকান ছাড়ে আমার বান্ধা খদ্দের হয়ে যাবে। তারপর আস্তে আস্তে দর চড়াব।' পাকা ব্যবসায়ীর মতো চোখটিপুনি দিল ইন্দ্র।
দাদার প্রচারের সুফল দেখা গেল সন্ধ্যার সময়। বুনো পাড়ার দুজন আর কাপালি পাড়ার তিনজন খদ্দের এল পরপর। প্রত্যেককে একেবারে গুরুদেবের মতো সাদর আপ্যায়ন করল দাদা।
'আসো আসো খুড়ো, এহেবারে তোমাগো হাতের কাছে দোকান। ছাইছাতাটুকু কিনতি আর মালো পাড়া যাতি হবে না। দামেও সস্তা, মালও খাঁটি। কি চাই কও?'
একটা জিনিসই চাইছে সকলে। এক পয়সার বাতিতেল। কেউ কেউ আবার সেই সঙ্গে দু-পয়সার মিঠাতেলও কিনল।
একজনে চাইলে ডাঁটা তামাক আর চিটা গুড়। জিনিসটা না দিতে পারলেও ইন্দ্র তাকে ভরসা দিয়ে রাখল—'কালই পাবা খুড়ো। মাইডা ফুরোয়ে গেছে। কালই আনব। সব পাবা আমার দোকানে। দূরি আর যাতি হবে না।'
'গামছা আছে বড় কত্তা?' প্রশ্ন করল একজন?
'কী দামের চাও! দুই আনাত্তে আট আনার মধ্যি আছে।'
'চার আনার মধ্যি দেখাও তো?'
'সে তো খুব ভালো গামছা হবে। চার হাত গামছা কাছা দিয়ে পরতি পারবা।'
'কই দেহাও তো।'
'এখন দেখাতি পারব না খুড়ো। গামছার গাঁটটা খোলা হয় নাই। ও সব মাল মিলেতি হবে, পড়তা করতি হবে, তারপর তো বিক্রি। দিন দুই পরে পাবা।'
লোকটা চলে যেতেই রুনু প্রশ্ন করে, 'গামছার গাঁটটা কই দাদা? খাটের তলায় বুঝি? আস না আমরা এখন খুলি।'
ইন্দ্রর চোখে রহস্যজনক হাসি—'তুই যেমন বোকা। একগাঁট গামছার দাম কত জানিস? অন্তত পঁচিশ টাকা। আমার তো মাত্র দশটাকা পুঁজি।'
'তুমি যে বললে? মিথ্যে কথা বললে?'
'মিথ্যে হবে ক্যান? এক সময় তো সবই আনব। ওসব বলে খদ্দের হাতে রাখতি হয়।'
'আর চিটে গুড়?'
'যে ঘোড়ার ডিমও নাই। আনতি হবে সের দুই। মালো পাড়ার দোকানেই পাওয়া যাবে। এক আনা সের দরে। পাইকেরি কিনলি তিন পয়সা পড়ে।'
ওদের কথাবার্তার মধ্যেই এল বুনো পাড়ার গুঙ্গী বুড়ি। তাকে দেখেই ইন্দ্র আঁতকে উঠল, 'এইরে, হইছে কম্মোসারা। বুড়িডা সব জিনিস দর করবে অথচ একটা পয়সাও ছাড়বে না। তুই যা হয় করে বিদায় দে। আমি পালাই।'
ইন্দ্র টুক করে খাটের তলায় ঢুকল। দোকানদার হয়ে বসল রুনু।
গুঙ্গী বুড়ি এসেই চাইল এক পয়সার দোক্তাপাতা আর ওমনি একটা ছুঁচ।
ওসব 'দ্রব্য' এ দোকানে আছে বলে তো মনে হয় না রুনুর। ও বুদ্ধি খাটিয়ে বলে, 'আগে পয়সা দাও তবে জিনিস পাবা।'
'হামি কি পালাঞ্চ যেছি রে মুখপোড়া? পুইসা তো দিব বটে। আগে পাতাটা দেখাবি তো। শুখা পাতা নাই হবেক তো নাই লিব। আর সুঁইঠো দিবি তো?
পাঁচটা ছুঁচের দাম এক পয়সা জানে রুনু। কাকিমার জন্যে বাজুনিয়ার দোকান থেকে কয়েকবার কিনেছে। সেক্ষেত্রে একটা ছুঁচের দাম কী নেওয়া উচিত? নাঃ, দোকানদারি তো বড়ো ঝামেলা। দাদার পরামর্শ মনে পড়ল রুনুর। বলেছিল বুড়িকে যাহক কিছু বলে বিদায় দিতে। তাই বলল, 'ও সব জিনিস নাই এখন' শেষে দাদার মতো করে বলল, 'কালই পাবা।'
'তো আগে কেনে পুইসা মাঙলি মুখপোড়া? কেনে তখন হামাক দাঁড়াঞা রাখলি গুয়ের বেটা?' বকবক করতে-করতে গাঁট থেকে একটা পয়সা বের করে রুনুর চোখের সামনে ঘুরিয়ে বলে, 'এই দ্যাখ পুইসা মুখপোড়া। ছাইটুকু যদি না রাখবি দুকানে তো কেনে দুকান দিলি? মুয়ে আগুন দুকানের।'
পয়সাটা হাতছাড়া করবার ইচ্ছা নাই নতুন দোকানির। আবার বুদ্ধি খাটাতে হল। দাদার কাছ থেকে শুনে আসতে হয়। তামাক পাতা আছে কিনা। থাকলে কোথায় আছে এবং এক পয়সায় কয়টা পাতা দেওয়া যায়। বলল, 'দাঁড়াও বুড়ি, খাটের তলায় তামাক পাতা আছে। আনে দিচ্ছি।'
রুনুর প্রস্তাব শুনেই খাটের তলা থেকে চেঁচিয়ে উঠল ইন্দ্র।
'এহানে আসিস না আসিস না। পিঁপড়ের কাপড়ে মরে যাবি। ও বুড়িরে আমি কিছু দেব না। আমার দোকানরে যে গাল দেয় তার মুখে আমি লাথি মারি। বদমাস বুড়ি।'
'হুঁ-উ বঠে, হামাক দেখি খাটের তলায় চুপাইছিস। আবার গাল পাড়ছিস মুখপোড়া? হামি পণ্ডিতরে লালিস দেবে। দেখবি মজা। মুখপোড়া ঢ্যামনা কমনেকার!'
পাড়া মাতিয়ে চিৎকার শুরু করল বুড়ি।
অনেক পিঁপড়ের কামড় খেয়ে সারাগায়ে প্রচুর ঝুলকালি মেখে শেষ পর্যন্ত আত্মপ্রকাশ করল ইন্দ্র। ঝুল ঝাড়তে ঝাড়তে বলল, 'খাটের তলায় মালপত্র সব ঠিক করে রাখছিলাম। বুড়ির জ্বালায়...দে বুড়ি পয়সা দে।'
'আগে সাদা তো দিবি।'
'এই নে।' রুনুর হাতের পাশেরই একটা কৌটো থেকে দুটো তামাক পাতা তুলে ধরল ইন্দ্র।
'মোটে দু-পাতা? চার পাতা তো দিবি। আর একটা সুঁই।'
'রাত্রে সুঁই বিক্রি হয় না, তা জানিস না?' ধমক দিয়ে বলে ইন্দ্র।
'রাত কই হল? সনঝে তো জ্বালিসনি?'
'তোর জ্বালায়ই তো...নিবি তো নে। আর এক পাতাও দেব না।' বলতে বলতে সন্ধ্যা জ্বালল ইন্দ্র। ধুপ জ্বেলে প্রণাম করলে।
দরাদরি করতে-করতে শেষ পর্যন্ত আর একটা পাতাও দিতে হল। তৃতীয় পাতাটা হাতে নিয়েই হাঁটতে শুরু করল বুড়ি।
'পয়সাটা দিলিনে? ও বুড়ি।'
'কাল সোকালে দিব। তখন সুঁইঠোও লিব।' বলতে বলতে অদৃশ্য হল বুড়ি।
ইন্দ্র মুখখানা মুহূর্তে কালো হয়ে গেল।
'দেখলি তো বুড়ির বজ্জাতি। সুঁচটা ফাউ না নিয়ে ও পয়সা দেবে না। কেবল সন্ধ্যে দেলাম, আর ওমনি ধারে বিক্রি।' মুখ ভার করে মাটির প্রদীপের শিখাটির দিকে তাকিয়ে রইল ইন্দ্র।
একটু পরে বলে, 'তোর কাছে একটা পয়সা আছে রুনু?'
'আছে।'
'তালি তুই একটা পয়সা দে। তামাক পাতাডা তোর নামে বিক্রি লিখে রাখি। বুড়ি পয়সাডা দিলি তোরে দিয়ে দেব। সন্ধ্যের সময় বাকি-বিক্রি করতি নাই।'
দাদার মুখে হাসি ফোটাতে পকেটের সব কয়টা পয়সা দিয়ে দিতেও রুনুর আপত্তি ছিল না। সানন্দেই সেদিন দিয়ে দিল পয়সাটা। ইন্দ্র খাতায় লিখেও রেখেছিল। কিন্তু গুঙ্গী বুড়ির কাছ থেকে সে পয়সাটা আজও আদায় করতে পারেনি ইন্দ্র।
দাদা তো গুরুগম্ভীর দোকানদার হয়েছে, কিন্তু সেজদি এত গম্ভীর কেন? এই যে সারাটা দিন ওরা এত কাণ্ড করল দোকান নিয়ে, সেজদি তো একবার উঁকি দিতেও এল না। সেজদি তো এমন ছিল না। বিশেষ করে রুনু এতদিন পরে বাড়ি এসেছে তা বলে যে সেজদির এতটুকু তাপ উত্তাপ নেই। কী হল সেজদির?
সকাল বেলায় যখন লজেন্স আর বিস্কুট দিতে গেছিল সেজদিকে তখনই এক কড়া ধমক খেয়ে এসেছে রুনু। ও তখন ঘাটে বাসন মাজছিল। রুনু হাত বাড়িয়ে জিনিসগুলি দিতে যেতেই সেজদি চোখ গোল করে বলেছিল, 'বিরক্ত করিস না যাঃ। ওর দোকানের ছাইটুকুও আমি ছোঁব না।'
দাদার উপর হয়তো কোনও কারণে রাগ হয়েছে সেজদি। তা ওদের তো ঝগড়া প্রায়ই হয়, তাই বলে রুনুকে অমন করে চোখ পাকিয়ে ধমকাবে? দুঃখে অভিমানে কেঁদে ফেলেছিল রুনু। রাগের মাথায় বিস্কুট লজেন্স ছুঁড়ে ফেলেছিল ছাইয়ের গাদায়। ভেবেছিল এবার নিশ্চয় দুঃখ পাবে সেজদি। নিশ্চয় ওকে আদর করবে। সেই আশায় দাঁড়িয়েও ছিল কিছুক্ষণ। হায়, ফিরেও তাকাল না সেজদি। আরও জোরে জোরে কেবল বাসনই মাজতে থাকল। এক সময় বাসনের বোঝাটা কাঁখে তুলে দুম-দাম করে রান্নাঘরে যেতে যেতে বলল, 'ইশ, আবার রাগ দেখানো হচ্ছে। আমার বয়ে গেল।'
সেজদির রাগের কারণটা কিছুই বুঝতে পারছে না রুনু। কিন্তু সেজদি যে বদলে গেছে সেটা তো চোখের সামনেই দেখছে রুনু। কী লম্বা হয়েছে সেজদি, আর কত ফর্সা। সেই রুক্ষ জংলা চুল—যার জন্যে দাদা ওর নাম রেখেছিল 'জুংলী'—সেই চুল এখন কী কালো আর কী চকচকে হয়েছে। সেজদি যেন সুশীলাদির মত বড় হয়ে গেছে, সুশীলাদির চেয়েও সুন্দর।
কত বয়স হল সেজদির? রুনুর থেকে দু-বছরের বড়। রুনুর যদি বারো হয় তো সেজদির এখন চোদ্দো। রুনু তো এখনও ছেলেমানুষ রয়ে গেছে, ও এত বড় আর এত সুন্দর হল কী করে? তাই কি ওর অহঙ্কার? তাই কি রুনুকে এত অবহেলা করল?
অভিমানে সারাদিনে আর একটা কথাও বলেনি রুনু। কথা বলতে আসেনি সেজদিও। সেইখানেই তো আরও দুঃখ।
সারাদিনে ও দেখেছে দাদাও একটা কথা বলেনি সেজদির সঙ্গে। বলেনি সেজদিও। যদিও লেখা নিয়ে খুব ব্যস্ত ছিল রুনু, তবু মনের মধ্যে সারাদিন গুরগুর করেছে প্রশ্নটা। কী হয়েছে ওদের? কেন ওঁরা কথা কয় না?
সন্ধ্যের পরে দাদাকে একা পেয়েই ধরে বসল রুনু।
'সেজদি তোমার সঙ্গে কথা কয় না দাদা?'
'নাঃ।' ছোট্ট একটু জবাব দিয়ে চুপ করল ইন্দ্র।
'কেন?'
'জানি না যাঃ।' বিরক্ত গলায় বলে দাদা। প্রসঙ্গটা এড়িয়ে যেতে চায় ইন্দ্র। ফলে রুনুর কৌতূহল আরও বেড়ে যায়।
'কওনা দাদা কি হইছে। না কলি আর এক অক্ষরও ল্যাখব না আমি। ছোঁবোও না সাইনবোর্ড।'
ইন্দ্র পড়ল উভয় সঙ্কটে। সাইনবোর্ডটা সত্যই জরুরী, আর রুনু যে দারুণ জেদি ছেলে তাও সত্য। ঘটনাটা না শুনে ও যে সত্যই কলম ধরবে না তা এবার বুঝল ইন্দ্র, বলতেই হবে ওকে। তাছাড়া বললে দোষই বা কি? এক সময় তো জানবেই।
'শোন তয়,' গম্ভীরভাবে শুরু করল ইন্দ্র, 'ও একখান চিঠি লিখিছিল পাঁচু মুহুরীকে।'
'পাঁচু মহুরী মানে পাঁচু ডাক্তার তো?'
'ডাক্তার না হাতি! একখান সাইকেল কিনেই এহেবারে বড় ডাক্তার হইছেন! গোটা কয়েক হোমোপাতি শিশিতে সাদা জল রাখিছে, আর বোকা লোকগুলনরে ঠগাচ্ছে।'
'দিদি চিঠি লিখিছে তুমি জানলে কী করে?'
'মুহুরীডা আজকাল পেরায়ই আমাগো উঠনের উপর দিয়ে যাওয়া আসা করত। ওরা চাওয়া-চাওয়ি হাসা-হাসি করত। আমিও তাকে তাকে ছেলাম। একদিন ধরে ফেল্লাম। চিঠিখানা রাখিছিল ওই ডালিমগাছের তলায় এট্টা ঢ্যালা চাপা দিয়ে। কী বুদ্ধি!'
'কি লিখিছিল সেজদি?'
'থিরি কেলাশের বিদ্যে তো। লিখিছিল, আমি আপনারে 'খুব' ভালোবাসি। 'খুব' বুঝলি তো? আরও কত কথা লিখিছিল ধ্যাবড়া ধ্যাবড়া অক্ষরে। ''আপনারে দেখিতে ইচ্ছা করে সরবদা। আপনার জন্য পেরাণ পোড়ে। কিন্তু ভয় করে। বাবা জানিলে খুন করিবে। আপনি আর চিঠি লিখিবেন্না।'' এই সব কথা।'
'সে চিঠি আছে তোমার কাছে?'
'আমি তক্ষুনি তা বাবার হাতে দিয়ে দিছি।'
সারা গায়ে শিউরে উঠল রুনু—'কী সর্বনাশ, বাবার হাতে দিলে কেন? তারপর?'
'তারপর এমন হাড়মাস-গুঁড়ো-করা মার লাগাল বাবা যে সাত আট দিন আর বিছেনাত্তে নড়তি পারেনি জুংলী।'
শুনতে শুনতে কান্নায় বুক ভেঙে আসে রুনুর। দাদাকে মনে হয় দারুণ নিষ্ঠুর। সেজদির দোষ কি? সে তো মুহুরীকে চিঠি লিখতে নিষেধই করেছে। বেশি দোষ তো মুহুরীর। সে-ই তো আগে চিঠি লিখেছে। সেজদির হয়ে দাদার সঙ্গে রীতিমতো তর্কযুদ্ধ শুরু করল রুনু। খানিক তর্ক করে দাদা ওকে এক ধমক দিয়ে বলে, 'আরে বলদ, তুই ওসব বুঝবি না। জুংলিটা অসভ্য হতি যাচ্ছিল তাইতো বাবা ওরে...'
'খুব বুঝি।' রেগে বলে রুনু, 'আসল অসভ্য ওই মুহুরীটা। বাবা ওকে কেন মারল না?'
'তারে বুঝি ছাড়ে দেছে বাবা!' বিজ্ঞ ব্যক্তির গলায় বলে ইন্দ্র, 'তার কম্মো এহেবারে সারা। তারে এহেবারে দ্যাশ ছাড়া করিছে বাবা। ছোট কাছারীতে এখন আইছে এক নতুন বুড়ো মুহুরী।
এবার দাদার চেয়েও বেশি রাগ হল রুনুর বাবার উপর। দাদার কাছে সব শুনে বুঝতে পারছে পাঁচু মুহুরী সেজদিকে খুব ভালোবাসত। কেমন ওকে একবার চোখের দেখা দেখবার জন্যেই বারবার রুনুদের উঠোন দিয়ে যাতায়াত করত। পাঁচু মুহুরীর চিঠি নাকি সেজদি উনুনে পুড়িয়ে ফেলেছে। সেও নিশ্চয় লিখেছিল সেজদিকে সে খুব ভালোবাসে। ভালোবাসবেই তো! কী সুন্দর হয়েছে এখন সেজদি! রুনুরই তো বারবার ওকে দেখতে ইচ্ছা করছে। ইচ্ছা করে সেজদিকে আরও বেশি করে ভালোবাসতে। তা পাঁচু মুহুরী সেজদিকে ভালোবাসলে দোষ কি—রুনুও তো চুয়াকে ভালোবাসে—খুব ভালোবাসে—সব সময় তাকে দেখতে ইচ্ছা করে। কই, সেজন্যে তো চুয়ার মা রুনুকে বকেননি। চুয়া যে রুনুকে খুব ভালোবাসে সেজন্যে চুয়াকে তো বকেননি তিনি। দাদা বলল, ভালোবেসে দিদি নাকি পাপ করেছিল। কাউকে ভালোবাসলে বুঝি পাপ হয়। এ সব কথার মানেই বুঝতে পারে না রুনু, কেবল সেজদির জন্যে গভীর সমবেদনায় ওর বুকের মধ্যে টনটন করে ওঠে। এখন বুঝতে পারছে দাদার দোকানের জিনিস কেন ছোঁয় না সেজদি। আড়ি দেবেই তো। দাদা তো ওর শত্রু। তা বলে রুনু কেন শত্রু হবে? কেন আড়ি দেবে সেজদির সঙ্গে? মনস্থির করে ফেলল রুনু। আজ রাতেই ও সেজদির সঙ্গে ভাব করে ফেলবে।
কিন্তু সেজদির সঙ্গে ভাব রাখার সর্তটা বড় কঠিন। অনেক সাধ্য সাধনার পরে সেজদি সেদিন বলেছিল, 'আমার সঙ্গে ভাব করতি হলি ওই অসভ্যডার সাথে তুই কথা বলতি পারবিনা।'
তখনও মা রান্নাঘরের কাজ সেরে আসেনি। রুনু অনেক আগেই খাওয়া সেরে মায়ের বিছানায় শুয়ে পড়েছে, কিন্তু জেগে আছে সেজদি আসার অপেক্ষায়। বাবা তখনও ফেরেননি গোপালগঞ্জ থেকে। রান্নাঘরে গোছগাছ করছে মা। এক সময় সেজদি এল। এসে নিঃশব্দে শুয়ে পড়ল আলাদা একটা কাঁথা মুড়ি দিয়ে বিছানার অন্য প্রান্তে। যেন রুনুকে ও চেনেই না। রুনু আর ধৈর্য রাখতে পারল না। গড়িয়ে-গড়িয়ে চলে এল দিদির কাঁথার মধ্যে। তবুও সাড়া নেই সেজদির।
'আমি তো তোর সঙ্গে আড়ি দেইনি সেজদি! আমি তোরে খুব ভালোবাসি।'
সেজদি তবু ফেরে না!
'ও সেজদি, কথা বলবি না? আমার সঙ্গে কথা বলবি না?'
'বিরক্ত করিস না।' গা ঝাড়া দিয়ে বলে সেজদি।
'তোর পায়ে ধরি সেজদি। এত দিন পরে বাড়ি আলাম, আর তুই...আমি সত্যি তোরে ভালোবাসি।'
'আমারে যদি ভালোবাসিস, তয় ওর সঙ্গে কথা কতি পারবি না। ওর ঘরে যাবি না। আমি তো ওর ঘরে বাও পাও ছোঁয়াই না।'
দারুণ সমস্যায় পড়ল রুনু। এখনও যে সাইনবোর্ডে লিখতে বাকি। তাছাড়া একদিনেই দাদার দোকানটাকে দারুণ ভালোবেসে ফেলেছে রুনু। দাদার সঙ্গে কথা না বলে কি পারবে ও! এ বাড়িতে দাদাই যে ওর একমাত্র বন্ধু ও উপদেষ্টা! একটু ভেবে অন্য কৌশলে কথাটা বলল রুনু!
'কিন্তু ওই ঘরেই আমার শুতি হবে, পড়তি হবে!'
'শুবি কোথায়? ও তো ছাইছাতা দিয়ে ভরে ফেলিছে ঘরখান!'
'কেন, নীচে শোবো!'
'ইস, ওর কাছে তোমারে শুতি দেবে কিনা বাবা! ওরে তো বাবা একঘরে করিছে। শুনিসনি তো সে সব কাণ্ড।'
সে কাণ্ডও শুনল রুনু সেজদির কাছে। এবারও ক্লাস সিকস-এ ফেল করায় বাবা নাকি মেরে ওর হাড় গুঁড়ো করে দিয়েছে! তারপর দশটা টাকা দিয়ে ওকে দোকান করে দিয়েছে! কে বছর দেখবে বাবা। দোকানও যদি ফেল করে তো ওকে বাড়ি থেকেই তাড়িয়ে দেবে বাবা!
ঘটনাটা শুনে রুনুর সবটুকু সমবেদনা গিয়ে পড়ল আবার দাদার দিকে। এবার সেজদিকে মনে হল বেশি নিষ্ঠুর। অতবড় দুর্ভাগ্যটাকে দাদা কেমন হাসিমুখে গ্রহণ করেছে। কত আগ্রহে, কত মমতায় আঁকড়ে ধরেছে দোকানটাকে! ঠাকুর, দাদার দোকান যেন ফেল না করে। এক বছরেই যেন দারুণ উন্নতি করে ফেলে দাদা। যেন অনেক টাকা হয় দাদার।
দাদার উন্নতি কামনা করতে করতেই সেদিন ঘুমিয়ে পড়েছিল রুনু।
না, রুনুর ভরতির ব্যাপারটা পাকা করে আসতে পারেননি শ্রীনাথ পণ্ডিত। তবে গোপালগঞ্জ পাবলিক স্কুলের হেডমাস্টার মশায়ের বাসায় গিয়ে কথাবার্তা সব ঠিক করে এসেছেন। স্কুল খুলবে আরও এক সপ্তাহ পরে। বুকলিস্ট পাওয়া যাবে তখন। শ্রীনাথ পণ্ডিতের বৃত্তি পাওয়া ছেলেকে সানন্দে ফ্রি পড়তে সম্মত হয়েছেন তিনি। এখন স্কুল খুললে একদিন গিয়ে শুভদিন দেখে ভরতি করা হবে রুনুকে ক্লাস সিক্স-এ। বাজুনিয়া স্কুলে থার্ড হওয়ার কলঙ্ক যদি এবার মোচন না করতে পারে রুনু তবে যে ওর পিঠের চামড়া থাকবে না সে কথা ওকে বার বার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন শ্রীনাথ পণ্ডিত।
এবারও যে এক বোঝো বই নিয়ে আসেননি তাতেই যেন রক্ষা পেয়ে গেল রুনু। অন্তত একটা সপ্তাহ তো পড়া থেকে মুক্তি পাওয়া গেল।
দোকান ঘরের মেঝেয় বসে গভীর মনোযোগে একটা বাণী লিখছিল রুনু। তখন ঠিক দুপুর। ইন্দ্র ওর পাশে বসে ওকে উৎসাহিত করছিল। এ সময়ে কোনও খদ্দের থাকে না। ওরা গল্প করে আর টুকিটাকি কাজ করে। এমন সময় মা এলেন ওদের ঘরে। রুনুর লেখাগুলি দেখে মা বললেন, 'তোর হাতের লেখা তো খুব সুন্দর হইছেরে রুনু।'
ইন্দ্র সঙ্গে সঙ্গে বলে, 'ও তো সব দোয়াতের কালি দিয়ে লেখিছে। কাল দেখবা রঙ দিয়ে ছাইনবোট লেখাব। যা একখান জিনিস হবে।'
'তা না হয় বোঝলাম বাপু। কিন্তু এ ঘরডারে যা করিছিস এর মধ্যি তো রুনুর পড়াও হবে না, শোয়াও হবে না।'
'কেন, এই নীচেয় বসে পড়ব আমি। এখানেই শোবো।' বলল রুনু।
'দুর, তাই কি হয়? তোর জন্যি এট্টা আলাদা ব্যবস্থা করতি হবে। হঠাৎ আস্যে পড়লি তো। কথা ছিল এ বছরডা তুই বাজুনেই পড়বি। থাক, আইছিস ভালো করিছিস। এ দ্যাশের সব উপরের ক্লাসের ছাত্রই তো গোপালগঞ্জে পড়ে। হাঁট্যে যায়, আসে দল বান্ধ্যে। তুই পারবি না?'
'খুব পারব। আমি তো হরেকেষ্টর সাথেই যাতি পারব। কিন্তু এইঘরে পড়তি...'
'এর মধ্যি তোর পড়া হবে না বাবা। তুইও কি দোকানদার হতি চাস? ওডার তো লেখাপড়া হবে না। গোল্লায় গেছে।'
দাদার মুখের উপর এমন করে বলায় দাদার চেয়ে যেন বেশি দুঃখ পেল রুনুই। মাথা নীচু করে বলে, 'তাহলি কোথায় বসে পড়ব আমি?'
'উনিই এট্টা ব্যবস্থা করে দেবেন। আগে ভর্তি-টর্তি তো হ। ওনার সে খেয়াল আছে, তোর ভাবতি হবে না।'
ভাবতে হবে না বলে আরও ভাবনায় ফেলে দিয়ে গেলেন মা। ও কি তাহলে বড়ঘরে বাবার কাছে বসেই পড়বে? কী সর্বনাশ।
একটা গানের আসরের নিমন্ত্রণ সেদিনই নিয়ে এসেছিলেন শ্রীনাথ পণ্ডিত। গোপালগঞ্জের কয়েকটি বাড়িতে এখনও তাঁর ওস্তাদজি রূপেই পরিচয়। সে এক আলাদা সমাদর। বিকেলেই চলে গেলেন তিনি বেশ শৌখিন সাজগোজ করে মস্ত গানের খাতাখানা বগলে করে। ফিরতে নাকি অনেক রাত হবে।
এসব রাতে সারা বাড়িতে একটা মুক্তির আনন্দ বইতে থাকে। মা গল্প বলেন অনেক রাত অবধি। কত যে গল্প জানেন মা। অনেক গল্পই রুনুর মুখস্থ হয়ে গেছে।
আজ কিন্তু মা-কে দিয়ে গল্প বলানো গেল না। বস্তুত এবার বাড়ি এসে অবধি রুনু দেখছে মায়ের মুখখানা যেন সব সময়ই ভার ভার। কারও সঙ্গেই তেমন কথা বলেন না।
শীতের রাত। ওরা তিন ভাইবোন সকাল সকাল খেয়েদেয়ে যে-যার মতো শুয়ে পড়ল। মা বসলেন মাটির প্রদীপ জ্বেলে মহাভারত নিয়ে। রুনু আর সেজদি শুয়েছে ভিতরের ঘরে। দাদা চলে গেছে দোকান ঘরে। ঘরের দোরটা ভেজিয়ে দিয়ে মা বসেছেন বারান্দায়। ওঁকে জেগে থাকতে হবে। শ্রীনাথ পণ্ডিত না আসা পর্যন্ত উনি খাবেন না। তিনি এলে জল গরম করতে হবে, খাবার গরম করতে হবে। তিনি খাবেন, তবে খেতে বসবেন মা। তাতে যদি রাত ভোরও হয়ে যায়, তবু এ নিয়মের ব্যতিক্রম হবে না।
এক সময় সেজদি রুনুকে জড়িয়ে ধরে বলে, 'মা তো আর গল্প বলেনা, আয় আমরা নিজিরা গল্প বলি।'
'মা গল্প বলবে না কেন? মা অমন গম্ভীর হয়ে গেছে কেন রে দিদি?
'জানিস তো না, বাবা যা নিষ্ঠুর। বাবার জন্যিই তো...'
বাবা লোকটা যে মাঝে-মাঝে খুবই নিষ্ঠুর হতে পারে তা জানে রুনু, কিন্তু বাবার সম্বন্ধে সরাসরি এমন অভিযোগ করার সাহস তো দুঃসাহসী দাদারও নেই। সেজদি এ সাহস পেল কোথায়! একটা অজানা ভয়ে গায়ে কাঁটা দিল রুনুর।
ওরা কথা বলছিল ফিস ফিস করে লেপমুড়ি দিয়ে, যাতে বারান্দা থেকে মা শুনতে না পায়। ঘরে তখন ঘোর অন্ধকার।
'বাবাই তো আমার সব্বোনাশ করল। জম্মের মতো কপাল পোড়ায়ে দেল।' রাগী গলায় বলছে সেজদি।
এ সব কী সাংঘাতিক কথা বলছে আজ সেজদি। ওর কি প্রাণের ভয় নেই?
মাঝে মাঝে চোখের জল ফেলে, মাঝে মাঝে সংসারের সবাইকে প্রাণভরে গালাগাল করে আর দীর্ঘশ্বাস ফেলে সেজদি যে কাহিনীটা বলল তাতে রুনুরও অন্তরাত্মা বিদ্রোহী হয়ে উঠল বাবার বিরুদ্ধে। ও এখন দিদির সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত। 'বাবাটা সত্যিই খুব নিষ্ঠুর তো!' দিদির গলা জড়িয়ে ধরে সমবেদনা জানায় রুনু।
সেজদির সেই চিঠি পড়ে বাবা সেজদিকে বেদম মার মেরে আর মুহুরীকে দেশছাড়া করেই কর্তব্য শেষ করেনি। সেজদির একটা বিয়েও ঠিক করে ফেলেছে। মাঘমাসটা পাত্রের জন্মমাস বলে দিন ঠিক হয়েছে ফাল্গুনের এগারো তারিখ। না হলে তো মাঘেই হয়ে যেত। সে পাত্র তো রুনুর চেনাই। বড় জামাইবাবুর নৌকার মাঝি। ওদের নৌকার মাঝি যেমন নগরবাসী। তবে নগরবাসী হল বুনো, আর সে বুড়োটা নাকি মুখ্যি কুলীন। গ্রাম সম্পর্কে জামাইবাবুর জ্যাঠা।
দিদি কাঁদতে-কাঁদতে বলে, 'সে শালা বুড়োর নাকি আগে গোডা পাঁচেক বিয়ে আছে, গুটিকখানেক ছেলে-পেলে আছে। সেইগুলনরে দেখা-শোনা করাতি নেবে আমারে। ওই হাড়হাবাতে বুড়োরে তুই কোনও দিন দাদাবাবু বলে ডাকতি পারবি?'
'কক্ষনো না। ঘেন্না আঃ!' সঙ্গে সঙ্গে বলে রুনু, 'তুই তারে কিছুতেই বিয়ে করবিনা সেজদি। তুই আচ্ছা-মতো কাঁদবি। আমিও কাঁদব।'
'কাঁদলি বুঝি বাবার পাষাণ পেরান গলবে ভাবিছিস। পেরাণ ভরে এট্টু কানতিও পারিনারে রুনু এ পোড়া বাড়িতি। বাবা শুনলি ভাববে আমি বুঝি ওর জন্যি...' বলতে বলতে হু-হু করে কেঁদে পড়ল সেজদি।
'তুই কাঁদিস না সেজদি। মা তো নিষ্ঠুর না, আমি খুব করে কাঁদব মায়ের কাছে। মা নিশ্চয়..।'
'মা তো সে ঘাটের মড়াডারে দুচক্ষি দেখতি পারে না। মা কত কান্নাকাটি করিছে। বাবার এহেবারে ধনুক-ভাঙা পণ। সেই শালা মুখ্যিকুলিনের সাথেই...তার আগে আমি দেহিস গলায় দড়ি দিয়ে মরব সেই রাজুর খুড়ির মতো। তখন তোরা কাঁদবি।'
সেদিন পর্যন্ত সবুর করল না রুনু। দিদিকে জড়িয়ে ধরে তখুনি কান্না শুরু করল। কাঁদল সেজদিও।
একটু পরে রুনু ফিসফিস করে প্রশ্ন করে, 'আচ্ছা, সেজদি তুই কি মুহুরী বাবুরে খুব ভালোবাসিস?'
সুমি চুপ করে রইল একটু সময়। তারপর ভারী গলায় বলল, 'তা শুনে আর করবি কি ভাই! সে তো আর এ দ্যাশে নাই!'
'সে কি তোরে বিয়ে করতি চাইছিল?'
'মা-র কাছে সে কত কাকুতি মিনতি করল। মা তারে ভালোওবাসত। মা-র মতও হইছিল। কিন্তু বাবা...'
'কেন? মুহুরীবাবু কালো হলিও কত সুন্দর দেখতি। তাছাড়া সে ডাক্তার, তার সাইকেল আছে। অনেক টাকা আছে। সে জামাইবাবু হলি খুব মজা হতো। মুহুরীবাবু আমারেও খুব ভালোবাসত রে দিদি। আমারে কতদিন সাইকেল চড়াইছে। মুহুরীবাবু খুব ভালো।'
'হলি কি হবে, সে যে ছোট কায়েত। সে জামাই হলি নাকি বাবার মান যাবে।'
ছোটো কায়েত আর মুখ্যি কুলিনের মানে বোঝে না রুনু, কিন্তু বড় জামাইবাবুর বুড়ো নৌকার মাঝির চেয়ে ওই স্বাস্থ্যবান যুবক যে সেজদির অনেক ভালো বর হতো এটা তো সত্যি। সেজদি যদি তাকে ভালোবাসে তাতে দোষ কি? তাকে তো সকলেই ভালোবাসত। ভালোবাসত রুনুও।
'তুই সত্যি কথা কতো রুনু। তারে কি ছোটলোকের মতো দেখায়? আর সে যে কী ভালোবাসত আমারে; এহেবারে ছোটেকালেত্তে। পথে ঘাটে দেখা হলিই এমন ভাবে তাকাত, আমার ভারী মায়া হতো।'
'তুইও তারে খুব ভালোবাসতি, না দিদি?'
সুমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর হুহু করে কেঁদে পড়ল।
দিদির গল্প শুনতে-শুনতে রুনুর বারবার মনে পড়ছে চুয়ার কথা। মনে পড়ছে তার মিষ্টি মুখখানা, দুষ্টু মুখখানা। ও কি চুয়াকে তেমন ভালোবাসে যেমন ভালোবাসত মুহুরীবাবু দিদিকে? চুয়াও কি এখন শুয়ে শুয়ে কাঁদছে দিদির মতো রুনু দূর দেশে চলে গেছে বলে?
কিন্তু সেই মুহুরীবাবু? সে ও কি এখন দূর দেশে বসে কাঁদছে না তার সুমির জন্যে? যেমন কান্না পাচ্ছে রুনুর, চুয়ার কথা ভেবে? দিদির দিক থেকে রুনুর সমবেদনাটা কখন যে সেই মুহুরী বাবুর দিকে মোড় ফিরিয়েছে ও বুঝতেও পারেনি।
গল্প শেষ করে সেজদি রুনুর হাতখানা চেপে ধরে ব্যাকুল ভাবে বলে, 'কাউরে কবি না তো? তালি তোরে একটা জিনিস দ্যাখাব।'
'কি দ্যাখাবি রে দিদি?'
'আগে বল কাউরে কবি না। বল, বিদ্যের কিরে।'
'বিদ্যের কিরে, বিদ্যের কিরে, বিদ্যের কিরে। তিন সত্যি করলাম। কাউরি কবো না।'
রুনুকে দিয়ে তিন সত্যি করিয়েও সাহস হয় না সুমির। সে জিনিস কি ওকে দেখানো ঠিক হবে? ও ছেলেমানুষ, কী বুঝতে কী বুঝবে কে জানে! আবার কোনোদিন রাগের মাথায় হয়তো ওই চির শত্রু ইন্দ্রকেই বলে দেবে। তাহলে তো সর্বনাশ! একটু ভেবে বলে, 'আমি খুব গোপন জায়গায় রাখিছি। এখন দেখাতি পারব না। আর এক সময় দেখাব।'
'কি জিনিস বল না দিদি?'
'এখন কবো না, আর একদিন কবো।'
রুনুর জিদ আর সুমির দ্বিধা কতক্ষণ চলত কে জানে, কিন্তু হঠাৎ দুজনেই একটা প্রবল ঝাঁকুনি খেয়ে পাথর হয়ে গেল। উঠোন পার হয়ে, বারান্দা পেরিয়ে কখন যেন ঘরের মধ্যে এসে পড়েছেন বাবা! অথচ ওরা কিছুই ঠিক পায়নি। কি করে পাবে? ওরা যে লেপ মুড়ি দিয়ে গল্পে মশগুল ছিল।
ভেজানো দরজাটা খোলার সঙ্গে সঙ্গে বারান্দার মাটির প্রদীপ থেকে এক চিলতে আলো ছুটে এল ঘরের মধ্যে। ওরা লেপের মধ্যে থেকে মুখ বের করে সেই আলোয় দেখল যেন ওদের সামনে একটা জীবন্ত ভূত! ভয়ে চোখ বুজল রুনু। শক্ত করে জড়িয়ে ধরল সেজদিকে। আর সুমি? তার কী অবস্থা তখন?
'উঠে আয় রুনু।' মেঘের আওয়াজে বললেন শ্রীনাথ পণ্ডিত।
বেত পাতার মতো কাঁপতে কাঁপতে লেপের তলা থেকে বেরিয়ে এল রুনু।
'সুমির কাছে তুই শুবি না। ওর সঙ্গে কথাও বলবি না। মনে থাকবে তো?'
'থাকবে।' কাঁপতে-কাঁপতে বলে রুনু।
'বারান্দার ছোট খোপে ওর বিছানা পাত্যে দেও।' বললেন মাকে। 'ধোয়া কাচা তো হয়ে গেছে।'
দক্ষিণের বারান্দার দুই প্রান্তে দুই কুঠুরি। পুবেরটা বড় খোপ, সেখানে থাকেন বাবা। পশ্চিমেরটা ছোট খোপ। মাঝখানে খানিকটা খোলা বারান্দা। যদিও রাত্রে সে জায়গাটাও খোলা থাকে না সামনের সদর দরজা বন্ধ হলে। ছোট খোপটা অতিথিদের জন্যে। এখন হল রুনুর ঘর।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঘরটা সাফসুফ করে রুনুর বিছানা পেতে দিলেন মা। এই বিছানাতেই তো এক বছর ধরে শুয়েছে রুনু, বাজুনিয়া থাকতে। এ বিছানা ওর নিজস্ব। এখনও ওর গায়ের গন্ধ লেগে রয়েছে। সেই আপন বিছানায় শুয়েও সে রাতে ঘুম আর এল না রুনুর। সারা রাত কেবল ভাবল আর ভাবল।
সেজদি ওকে বারণ করেছে দাদার সঙ্গে কথা বলতে। বাবা বারণ করলেন সেজদির সঙ্গে কথা বলতে। মা তো কারও সঙ্গেই প্রায় কথা বলে না। এ বাড়িতে তবে রুনু কথা বলবে কার সঙ্গে? দাদার মতো রুনুকেও কি এক-ঘরে করে দিলেন বাবা! এই কি ওর থার্ড হবার শাস্তি?
এ বাড়িটাকে আর আপন বাড়ি মনে হচ্ছে না রুনুর। অতিথি খোপে শুয়ে মনে হচ্ছে রুনুও এ-বাড়িতে একজন অচেনা অতিথি।
এই এক বছরে দাদা বদলেছে, সেজদি বদলেছে, মা-ও বদলেছে। আর মধুমতী? হায়, বদলে গেছে মধুমতীও! কোথায় হারিয়ে গেল উত্তরের সেই নরম কাদার চর, সেই স্নিগ্ধ সবুজ ঝাউবন? কোথায় গেল সেই সব বোরো ধানের খেত, সেই ধানখেতের গন্ধ, সেই ধানের চারার সঙ্গে মাছদের খেলা? হায়, কোথায় সেই নৃত্য-পরা খরলা মাছের ঝাঁক?
মধুমতী যেন বড় গম্ভীর হয়ে গেছে। ওর দিকে তাকাতে এখন ভয় করে। ওকে আর ভাবা যায় না খেলার সাথী। ওর এখন রাক্ষসী রূপ! এ পাড়ে আর নরম চরের চিহ্ন মাত্র নেই। একটা ভয়ঙ্কর দৈত্যের মতো প্রচণ্ড আক্রোশেও যখন তখন লাথি মেরে পাড় ভেঙে ফেলছে। উপড়ে ফেলছে তীরের গাছপালা, আখের খেত, তরমুজের ক্ষেত। মস্ত মস্ত এক একটা মাটির চাঙড়া যখন ভেঙে পড়ে কী গা-কাঁপানো শব্দ হয় তখন! ওর তীর ঘেঁষে আর দাঁড়াবার সাহস নেই রুনুর।
পাড় থেকে অনেকটা দূরে দাঁড়িয়ে ভাবছে রুনু। দুই তীরের সঙ্গে যেন মধুমতীর চিরকাল যুদ্ধ চলছে। এ পাড়টা যখন জিতে যায়, বিষম রাগে ওপাড়টা তখন ভাঙতে থাকে মধুমতী। ওর স্বভাবটাই চঞ্চল, নিষ্ঠুর। অথচ এতদিন কী ভুল করে ওকে স্নিগ্ধ স্নেহময়ী, শান্ত সুশীলা ভেবে এসেছে রুনু। ওর দয়ামায়া নেই। ও রাক্ষসী ইতিমধ্যেই দক্ষিণের কাপালী পাড়াটার প্রায় অর্ধেক খেয়ে ফেলেছে। এই কায়েত পাড়াটাও হয়তো খেয়ে ফেলবে একদিন। আগে ছিল ওর ওপারের দিকে লোভ, এবার মুখ ফিরিয়েছে এপারের দিকে। কী জানি কবে ওর ক্ষুধা মিটবে।
হায়, এই মধুমতীর কথা ভেবে ভেবে কত রাত ও ঘুমোতে পারেনি। কত রাতে কত স্বপ্ন দেখেছে মধুমতীর কত রূপের! সেই রূপমতী মধুমতী আজ হয়েছে কোপমতী! এ মধুমতীর সঙ্গেও ওর আড়ি।
তারপর হরেকেষ্ট।
হরেকেষ্টদের উঠোনে পা দিয়েই যেন কান্না পেয়ে গেল রুনুর। হায়, এ কি চেহারা হয়েছে ওদের বাড়িটার। বাড়ি মানে অবশ্য ছোট একটা কুঁড়ে ঘর, আর সামনে একটু শাক-সবজির খেত। কিন্তু কী ঝকঝকে তকতকে থাকত বাড়িটা। বারান্দাটা সব সময় থাকত আয়নার মতো পালিশ। কতদিন তো খালি বারান্দায়ই গড়িয়েছে রুনু, একটুও ধুলো লাগেনি গায়ে। সেই বারান্দা এমন এবড়ো-খেবড়ো হয়ে গেল কেন? ঘরের বেড়া ঝরঝরে হয়ে গেছে, চালে জায়গায় জায়গায় ছন উঠে গেছে। এ কী হতশ্রী চেহারা হয়েছে ঘরখানার?
তেমনই হতশ্রী হয়ে গেছে সবজি খেত, ফুলের বাগান সব। কেউ যেন আর দেখবার নেই। এরা সব গেলই বা কোথায়? বারান্দার উনোনটা থেকে এখনও সামান্য ধোঁয়া উঠছে। দেখে মনে হয় একটু আগেই ও উনোনটা নেবানো হয়েছে। তা হলে বোধ হয় নিকটেই কোথাও আছে কেউ।
রুনু চিৎকার করে ডাকল হরেকেষ্টর নাম ধরে। বার কয়েক ডাকার পরে নীল কুঠির জঙ্গলের মধ্যে থেকে সাড়া পাওয়া গেল। হরেকেষ্ট বরাবরই বনে-জঙ্গলেই ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসে। রুনুর গলা পেয়েই বন থেকে বেরিয়ে এল হরেকেষ্ট ছুটতে ছুটতে। রুনুকে দেখে দারুণ খুশি হল।
'বসো বসো রুনু। কবে আইছ?'
ঘর থেকে একটা ছেঁড়া মাদুর এনে রুনুকে সাদর অভ্যর্থনা করে বসাল হরেকেষ্ট। ওর কোরোচ ভরতি তখন অনেক মালপত্র। ঢালল বারান্দায়। দেখা গেল নানা রকম শাক, কিছু ডুমুর আর গোটা কয়েক পেয়ারা আছে।
দুজনে পাশাপাশি বসে পেয়ারা খেতে খেতে অনেক কথা হল। রুনু যে এবার থেকে গোপালগঞ্জ পাবলিক স্কুলে পড়বে, এ খবর শুনে হরেকেষ্ট দারুণ খুশি হল।
'কী মজা, আমরা একসঙ্গে ইস্কুলি যাব-আসব। এই সামনের সোমবারেই তো ইস্কুল খোলবে। তুমি সেই দিনই ভর্তি হবা?'
'এখনও ভর্তির দিন ঠিক করে নাই বাবা। শীগগিরই হব।'
'জানো রুনু ভাই,' আবেগভরে বলে হরেকেষ্ট, 'এই এক বছোর তোমারে ছাড়ে থাকতি আমার খুব কষ্টো হইছে। কতদিন কাঁদিছি। তোমার কষ্টো হয় নাই?'
উত্তর দিতে একটু ভাবল রুনু। প্রথমদিকে অবশ্য খুবই মনে পড়ত হরেকেষ্টকে, কিন্তু একসময় ও হরেকেষ্টকে প্রায় ভুলেই গেছিল। বিশেষ করে চুয়ার সঙ্গে ভাব হবার পর থেকে। কিন্তু সেকথা বললে হরেকেষ্ট দুঃখ পাবে। তাই বলল, 'কষ্ট আবার হয় নাই? খুব হইছে। তোমার কথা প্রায়ই মনে পড়ত।'
'আমার মনে পড়ত সব সময়। আমি যে কতদিন তোমারে স্বপ্নে দেখিছি। তুমি দ্যাখো নাই?'
অকৃতজ্ঞ রুনু মনে করতে পারে না হরেকেষ্টকে ও কোনওদিন স্বপ্নে দেখেছে কিনা।
কথা বলতে-বলতে হরেকেষ্ট বঁটি পেতে বসল শাক কুটতে। সগর্বে বলল, ও এখন সব কিছু রান্না করতে পারে। সকালের রান্না তো হরেকেষ্টই করে। বৈরাগী খুড়ো আর বৈষ্ণবী খুড়ি তো বেরিয়ে যায় ভিক্ষা করতে।
'ওরা কখন ফিরবে?'
'আজকাল আর মা বেশিদূর হাঁটা চলা করতি পারে না। সব দিন তো যায়ও না। মা-র শরীর তো ভালো না। তাই ছুটির এ কয়দিন আমি দুই বেলাই রাঁধি।'
'কেন কী হইছে খুড়ির?'
'কী যে হইছে কে জানে। আগুনির কাছে বসলিই মাথা ঘুরোয়। মা যা রোগা হয়ে গেছে, দেখলিই কান্না পায়। মা বোধহয় আর বেশিদিন বাঁচবে না রুনু ভাই। মা মরে গেলি কী যে হবে!'
কথা বলতে-বলতে দু-চোখ ছলো ছলো করে ওঠে হরেকেষ্টর।
রুনু প্রায় ধমক দিয়ে ওঠে, 'দূর, ওই সব অমঙ্গুলে কথা বলতি নাই। ক্যান মরবে খুড়ি?'
খুড়ির যে ঢলো ঢলো ছবিটা ওর মনে পড়ে, যে টানা টানা সর্বদা হাসিভরা। চোখ দুটি ওর মনে পড়ে,—তাকে রোগা ও ভাবতেই পারছে না। রুনুর মনে সে সেই রকমই আছে।
'সত্যি মরবে রুনু ভাই। তুমি দেখলি চিনতি পারবা না। দেখতি দেখতি চুল পাকে গেল সব। কথা-বার্তা কয় না বড়। সব সময় মনমরা। ঘরে মন টেকে না, তাই ভিক্ষে করতি যায় বাবার সঙ্গে।'
'খুড়ির বুঝি খুব বড় অসুখ হইছে। সেবার আমার যেমন হইছিল। আমি তো ভালো হয়ে গেলাম গোঁসাইজির মন্তরবলে। 'গোঁসাইজিরে দেখাও না। খুড়িও ভালো হয়ে যাবে।' ভরসা দেয় রুনু।
'সে গোঁসাইজি কি আর এদ্যাশে আছে। তিনি যে কোথায় চলে গেছেন কেউ জানে না।'
'গোঁসাইজি নাই!' একটা যেন সাংঘাতিক দুঃসংবাদ শুনে চমকে উঠল রুনু। তাই কি এ দেশটার সব শান্তি, সব সুখ চলে গেছে? তাই কী মধুমতীর অমন রাক্ষসী রূপ হয়েছে? তাই কি রুনুদের বাড়ির সবাই আজ অসুখী?
কিন্তু খুড়ির অসুখটা যে কী বুঝতে পারছে না রুনু। বড় অসুখ হলে তো লোকে বিছানায় শুয়ে থাকে। ভিক্ষা করতে বের হয় কী করে?
খানিক পরে আসল কথা বলল হরেকেষ্ট।
'আমার দিদিরে তো তুমি কতবার দেহিছ। এহেবারে লক্ষ্মী পিতিমার মতো দেখতি ছিল না? সেই দিদি গলায় দড়ি দিয়ে...তার পরেত্তেই মা-র যেন কী হয়ে গেল। সেই যে মুখ বন্ধ করিছে, আর কথা নাই। মা-র হইছে মনের অসুখ। ও অসুখ আর সারবে না।'
মস্ত একটা জ্ঞানের কথা বলল যেন হরেকেষ্ট। রুনু কিছুই বুঝতে পারেনা। মনের অসুখ? সে আবার কেমন? তবে হরেকেষ্টর দিদি যে লক্ষ্মীপ্রতিমার মতো সুন্দরী ছিল সে তো দেখেছেই রুনু। যে মানুষটা তাকে বিয়ে করেছিল তাকেও দেখেছে। তাদের নাকি খুব অবস্থা ভালো। নলিতাদিকে নাকি সে বাড়িতে সবাই খুব ভালোবাসে। এইটুকুই জানে রুনু। সেই নলিতাদি হঠাৎ গলায় দড়ি দিয়ে মরল কেন? সে কথাও বলল হরেকেষ্ট।
'সে শালা মাতাল পিতিদিন দিদিরে মারত। দিদি তউ সয়েছিল। শেষে সে শালা আবার এট্টা বিয়ে করে দিদিরে বাড়িতে তাড়ায়ে দিছিল। দিদি কানতি কানতি আমাগে কাছে আসল একদিন। তারপর একদিন যখন বাবা-মা কেউ ঘরে নাই, তখন ওই ঘরের মধ্যি আড়ায় ঝুলে...তারপরেতে মা আর ও ঘরেই ঢুকতি পারে না। বারান্দায় শুয়ে শুয়ে দিন রাত্তির কাঁদে। আমারও ঘরে ঢুকতি গেলিই কেমন যেন গা কাঁপে।'
দুঃখের কাহিনী শুনে মাথা নীচু করে রইল রুনু। কী বলে যে হরেকেষ্টকে সান্ত্বনা দেবে সে ভাষা ওর জানা নেই। ফোঁটা ফোঁটা জল পড়ছে। হরেকেষ্টর চোখ দিয়ে। একমনে সে ডুমুর কেটে যাচ্ছে। গভীর দুঃখের বুঝি কেনা ভাষা নেই। কথা নেই আর হরেকেষ্টর মুখেও। এতদিন বাদে দুই বন্ধুতে দেখা, এইটুকু সময়ের মধ্যেই ওদের সব কথা ফুরিয়ে গেল।
খানিক পরে হাতের পিঠ দিয়ে চোখ মুছে হরেকেষ্ট বলে, 'এ বাড়িতে আর সুখ নাই রুনু ভাই।'
সুখ যে ওদের বাড়িতেও নেই সেকথা আর বলল না রুনু। তাহলে যে অনেক কথা বলতে হয়। সব কথা কি বলা যায় হরেকেষ্টকে? রুনু তো এখন আর ছেলেমানুষ নেই। ও এই কদিনেই অনেক কিছু বুঝে ফেলেছে। বুঝেছে সুখ জিনিসটা বড় ক্ষণস্থায়ী। বুঝেছে জীবনটায় দুঃখই বেশি। এবং দুঃখের ভাগটা মেয়েদের ভাগ্যেই বেশি।
সাইনবোর্ড লেখার পরিকল্পনাটা পেশ করেছিল রুনু। টিনের পাতের যে পিঠে আলকাতরার আলপনা এঁকেছে দাদা ও পিঠটা তো বরবাদ হয়ে গেছে। অন্য পিঠটা নেবে রুনু। প্রথমে সমস্ত পাতটায় এক পোচ সাদা রঙ, সেটা শুকোলে আর এক পোচ। লেখাটা হবে কালো অক্ষরে। তারপর চারদিকে থাকবে লাল রঙের চওড়া বর্ডার।
'কেমন হবে বল তো দাদা?'
'খাসা হবে রে, খাসা হবে।' রুনুর পিঠ চাপড়ে বলেছিল দাদা। তদনুযায়ী লাল, সাদা, কালো তিনটে রঙই মালো-পাড়ার বড় দোকান থেকে এনে রেখেছে দাদা।
সকালে হাত মুখ ধুয়েই দারুণ উৎসাহে রঙ গুলতে বসে গেছিল রুনু। পুরোপুরী পরিকল্পনাটা মাথায় নিয়ে প্রথম পোচটা প্রায় শেষও করে এনেছিল, এমন সময় শোনা গেল বাবার ডাক। সঙ্গে সঙ্গে সাড়া দিল রুনু, 'আজ্ঞে!'
'এদিকে এসো।' 'আয়' না বলে 'এসো' বলাতেই কেঁপে উঠল রুনু। সম্বোধনের গুরুত্ব থেকেই বুঝল ব্যাপার গুরুতর। ভয়ে ভয়ে বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
'তুমিও কি দোকানদার হতি চাও?'
তুই না বলে তুমি বলাটা বিপদের পূর্বাভাস। অনেকবারই দেখেছে রুনু। একটা দুর্জ্ঞেয় আশঙ্কায় ও থর থর করে কাঁপতে থাকে। শীতের সকালেও বুক কপাল ঘেমে যায়। মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। মুখে কথা নেই।
'কী, কথা কওনা ক্যান? জবাব দ্যাও।' ঘর কাঁপানো গলায় বলেন শ্রীনাথ পণ্ডিত।
'না।' রুনুর আড়ষ্ট উত্তর।
'তাহলি ও ঘরে আড্ডা দেওয়া চলবে না। ইন্দিরের সাথে কথা কবা না। ওরে ওর মনে কাজ করতি দাও, তুমি তোমার কাজ করো।'
সেদিন সেজদির সঙ্গে কথা বারণ হবার পর থেকেই এই রকম একটা ভয় করছিল রুনু। ঠিক তাই হল। দাদার সঙ্গেও ওর কথা বলা বন্ধ হয়ে গেল। এ-বাড়িতে ওরা তিনটে ভাইবোন। পিতৃ আজ্ঞায় কেউ কারও সঙ্গে কথা বলতে পারবে না। পিতা দশরথ রামচন্দ্রকে বনবাস দিয়েছিলেন, কিন্তু ভাই লক্ষ্মণকে রাম থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেননি। তাই তো বনবাসেও স্বর্গবাসের সুখ ছিল ওদের। রাম-লক্ষ্মণের ভ্রাতৃপ্রেমের চেয়ে রুনু-ইনুর ভ্রাতৃপ্রেম একটু কম নয়। ওরাও তো কেউ কাউকে ছেড়ে থাকতে পারে না। কেবল দাদা আছে বলেই এই নিরানন্দ বাড়িটা তখনও রুনুর কাছে বাসযোগ্য ছিল। এবার সত্যই ওকে বনবাস দিলেন বাবা। কিন্তু দাদার সঙ্গে কথা না বলে ও থাকবে কী করে? অসম্ভব, অসম্ভব। রুনুর সমস্ত অন্তরাত্মা বিদ্রোহী হয়ে উঠল, অথচ এই কঠোর শাস্তি ওকে গ্রহণ করতেই হবে। এ-বাড়িতে শ্রীনাথ পণ্ডিতের কথার উপর কথা বলবার সাহস নেই মারও। রুনু তো তুচ্ছ। এ-বাড়িটাও শ্রীনাথ পণ্ডিতের একটা পাঠশালা।
রুনুর কাজেরও ব্যবস্থা করে ফেলেছেন শ্রীনাথ পণ্ডিত। স্কুল খুলতে না হয় কদিন দেরি আছে, তা বলে এ কদিন রুনু কি কেবল আড্ডা মেরে বেড়াতে? ও না পণ্ডিতের ছেলে? ওকে না পণ্ডিত হতে হবে? 'ছাত্রাণামধ্যয়নং তপঃ' বাণীটা বার বার ওকে স্মরণ করিয়ে দিলেন শ্রীনাথ পণ্ডিত। কিন্তু কি অধ্যয়ন করবে রুনু। ক্লাস সিক্স-এর বই কোথায়?
সে ব্যবস্থাও হয়ে গেছে ইতিমধ্যে। এ গ্রাম থেকে যারা গোপালগঞ্জ স্কুলের বিভিন্ন উঁচু ক্লাসে পড়ে তারা তো সকলেই শ্রীনাথ পণ্ডিতের ছাত্র ছিল একদা। তাদেরই একজন,—যে এবার সিক্স থেকে সেভেন-এ উঠল, তার পরিত্যক্ত বইগুলি চেয়ে এনেছেন পণ্ডিতমশায়। যদ্দিন বই-টই না কেনা হচ্ছে তদ্দিন এ বইগুলিই পড়ুক না রুনু। ও তো দোকানদার নয়, ও হল ছাত্র। ওর কাজ হল কেবল পড়া। পড়ার তপস্যা করা। ও ওর তপস্যা করুক। এ বাড়িতে যে যার কাজ করে যাবে নীরবে। কারও সঙ্গে কারও কথা নয়। দাদা দোকান করবে, রুনু পড়বে, মা রান্না-বাড়া করবে, আর সেজদি? সেজদি বিয়ে করবে। জেলখানার কয়েদিরা নাকি কেউ কারও সঙ্গে কথা বলতে পারে না। তারা যে যার ঘানি টানে, মাটি কোপায়, জল তোলে। শ্রীনাথ পণ্ডিতের এ জেলখানায়ও ওা চার কয়েদি যে যার নির্দিষ্ট কাজ করে যাবে। হায়, এই জেলখানায় আসবার জন্যেই কি এত অস্থির হয়ে উঠেছিল রুনু!
কিন্তু হঠাৎ কেন এত কঠোর হয়ে উঠলেন শ্রীনাথ পণ্ডিত সবার উপর? সে কি রুনুর থার্ড হওয়া? দাদর ফেল করা? না কি সেজদির চিঠি লেখা? হয়তো এই সবক'টা কারণই একসঙ্গে বাবাকে এত নিষ্ঠুর করে তুলেছে। গোবরা পাঠশালার অবাধ্য ছাত্রদের শাস্তি কঠোর। সে তো জানেই রুনু। এ পাঠশালার সবক'টা ছাত্রই কি অবাধ্য? তাই কি সকলেরই এমন শাস্তির বিধান করলেন পণ্ডিতমশায়?
কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্য লাগছে রুনুর দাদাকে। বাবার বিরুদ্ধে ওর মুখে একটা কথাও শোনেনি এ পর্যন্ত। এত দুঃসাহসী দাদাও নীরবে গ্রহণ করেছে তার প্রাপ্য শাস্তি। স্বীকার করে নিয়েছে সেজদি। প্রতিবাদ নেই মায়ের মুখেও। কিন্তু রুনুর মন কেন বিদ্রোহী হয়ে ওঠে? ওর যে আর এক মুহূর্তও থাকতে ইচ্ছা করছে না এ-বাড়িতে। আহা, কী আনন্দে, কী সুখেই না ছিল ও বাজুনীয়ায়! সেখানে দিপু নিপু ঠাকমা কাকিমা সব ভালো। আর সবচেয়ে ভালো চুয়া। চুয়ার কথা মনে পড়তেই ওর বুকের মধ্যে হু-হু করে ওঠে। এ জীবনে কি আর কোনওদিন চুয়াকে দেখতে পাবে রুনু?
ওরা কি পালিয়ে যেতে পারে না এ কারাগার থেকে? একবার তো দাদা বলেছিল সেই দূর দক্ষিণে সমুদ্রতীরে এক সুন্দর দেশে পালিয়ে যাবার কথা। সেখানে পড়া নেই, স্কুল নেই, কিছু নেই, আছে কেবল আনন্দ। দাদা কি ভুলে গেল সেই অঢেল মাছ, অন্তহীন সবুজ ধানের খেত, বনে বনে মধুভরা মৌচাক, আর সীমাহীন নীল জল, নীল আকাশের দেশের কথা? গোপনে একবার মনে করিয়ে দেবে নাকি দাদাকে? কিন্তু দোকান নিয়ে যা মেতে উঠেছে দাদা, ও কি আর এখন দোকান ফেলে যেতে চাইবে সে দেশে? তাহলে? তাহলে কী করবে রুনু?
এ কংসের কারাগার থেকে মুক্তির যে কোনও পথই নজরে পড়ে না ওর!
মধুমতী যত ভয়ঙ্কর মূর্তিই ধরুক, স্নান তো ওই নদীতেই করতে হবে। খাবার জলও আনতে হবে ওই নদী থেকেই। তাই কায়েত পাড়ায় সবাই মিলে একটা ঘাট করেছে মাটি কেটে কেটে। যদিও রুনুদের ছোটখাটো একটা পুকুর আছে, তাকে পুকুর না বলে ডোবাই বলা উচিত। জল থাকে প্রায় সারা বছরই। কোনো কোনো বছর চৈত্র-বৈশাখে শুকিয়েও যায়। এখনও সে ডোবায় বেশ টলটলে জল আছে। ওখানেই কাপড় কাচে, বাসন মাজে সেজদি। নদীর ঘাটে যাওয়া বারণ হয়ে গেছে সেজদির। সে স্নানও করে ওই ডোবায়। বাড়ির আর সবাই স্নান করে নদীর ঘাটে। খাবার জল এখন মাকেই আনতে হয় দু-বেলা।
গোবরা পাঠশালা আজ খুলবে। শ্রীনাথ পণ্ডিত তাই সকাল সকাল স্নান করতে গেলেন। এই ফাঁকে রুনু চুপিচুপি এল দাদার ঘরে। কাঁদতে কাঁদতে বলল বাবার হুকুমের কথা।
'আরে তুই থো-দেহি। সব আমি শুনিছি। ও তো আমি জানতামই।' চোখের একটা ইঙ্গিত করে বলে দাদা, 'বাবা তো একটু পরেই ইস্কুলি যাবে। তারপর?'
'সেজদি যদি বলে দেয় বাবাকে?'
'সে গুড়ি বালি। বাবার সাথে ও তো কথাই কয় না।'
তবু ভয় কাটে না রুনুর। বাবা নিশ্চয় জানতে পারবে। বাবা সব জানতে পারে। তখন যে কী দুর্দশা হবে কে জানে!
'বাবা ইস্কুলে গেলিই সাইনবোটটা ধরবি।' চোখ টিপে বলে দাদা।
সাহস পায় না রুনু। বাবার অবাধ্য হবার সাহস হবে না ওর কোনওদিন।
'বাবা দেখলি আমারে খুন করবে। আমার হাতের লেখা দেখলিই...'
এদিকটা আগে ভেবে দ্যাখেনি ইন্দ্র। মুখ ভার করে বলে, 'থাক তালি সাইনবোট। কিন্তু কথা আমরা ঠিক কবো দেহিস।'
'কী করে?'
'তুই তো ইস্কুলি যাবি। আমিও গোপালগঞ্জ যাব দোকানের মাল কিনতি। সারাপথ যদি আমরা কথা কই কেডা ঠেকাবে? আমি তো আর লক্ষ্মণ বর্জন করি নাই।' হাসতে থাকে দাদা, 'জানলি মারবে? মারিরি আমি ভয় করি না।'
দাদার প্রতি অদ্ভুত একটা শ্রদ্ধায় রুনুর চোখে জল আসে।
ইন্দ্র গম্ভীরভাবে তার কথাটার ব্যাখ্যা করে।
'কৈকেয়ী রামের বনবাস দিল, লক্ষ্মণরে তো দেয় না। কতজনে তো লক্ষ্মণরে বারণ করিছিল বনে যাতি, ঠেকাতি পারল? কিন্তু রাম যেদিন নিজিই লক্ষ্মণ বর্জন করল, সেদিন আর লক্ষ্মণের মুখে কথাডি নাই। তুই হলি আমার লক্ষ্মণ ভাই। ছোটকালে আমাদের দুডিরে সবাই রাম-লক্ষ্মণ বলত না? এখনও আমরা রাম-লক্ষ্মণ। বুড়ো দশরথটা কবে যে...!'
গা শিউরে উঠল রুনুর। দাদাও! দাদা তাহলে ভিতরে ভিতরে বাবার উপর বিদ্রোহী?
হঠাৎ বাবার সাড়া পেতেই টুক করে ওঘর থেকে পালিয়ে গেল রুনু।
স্নান করে এলেন বাবা। এবার আহ্নিক করবেন। প্রায় আধঘণ্টার ব্যাপার। আহ্নিকে বসবার আগেই হুকুম হল, 'রুনু স্নান করে খাওয়া-দাওয়া করেনে। আমার সঙ্গে পাঠশালায় যাবি। বাড়ি বসে বসে কি করবি? গিয়ে বরং নীচের ক্লাসে পড়াবি। তাতে তোরই লাভ। বিদ্যা, যতই করিবে দান তত যাবে বেড়ে, পড়িস নাই?'
এই অপ্রত্যাশিত সম্মান লাভে এক মুহূর্তে বাবার উপর সব অভিমান ওর ঘুচে গেল। বাবার সঙ্গে সঙ্গে রুনুও পণ্ডিতি করবে? পড়বে না, ও আজ পড়াবে। কিন্তু বাবার সামনে বসে পড়াতে পারবে কি ও?
এক লাফে স্নান করে এল রুনু। খেয়ে নিল চটপট। তারপর বাবার আগেই ও পৌঁছে গেল পাঠশালায়।
পাঠশালায় যাবার ওই পথটা, পাঠশালাটাকে প্রকাণ্ড ছাতার মতো স্নিগ্ধ ছায়ায় ঢেকে রাখা ওই বিশাল বটগাছটা, পাঠশালার ওই টিনের ঘরখানা, সবাই যেন রুনুর অভাবে মলিন হয়েছিল। আজ রুনুকে দেখে সবাই সাদর অভ্যর্থনা জানাল যেন। যেন ওরা ওদের ভাষায় বলছে, 'এসো এসো রুনু, কতদিন তোমায় দেখি না।' সেকথা বলছে যেন ওই জোড়া মন্দিরও। পেছনের ওই ভয়-ভরা বাগানটা যেন আজও হাতছানি দিয়ে ডাকল ওকে!
রুনুকে দেখে পাঠশালার সব ছেলে কলরব করে উঠল। গতবার ও যাদের ক্লাশ থ্রির বেঞ্চে দেখে গেছিল, এবার তারা এসে বসেছে ফোর-এর বেঞ্চে। তালপাতাওয়ালারা স্লেট ধরেছে, স্লেটওয়ালারা উঠে এসেছে প্রথম শ্রেণীতে। এসে গেছে কিছু কিছু নতুন মুখও।
সবই তো ঠিক আছে, কিন্তু নেই কেবল একখানি প্রিয়মুখ। তার কি এখনও আসার সময় হয়নি? পণ্ডিতমশায়, বলেছিলেন তাকে দিয়ে বৃত্তি না পাইয়ে ছাড়বেন না। তারপর তাকে পড়াবেন গোপালগঞ্জের গার্লস স্কুলে। ম্যাট্রিক তাকে পাশ করতেই হবে। তারপর সে দাঁড়াবে তার নিজের পায়ে। সুশীলাদিকে মানুষ করে তুলবেনই তিনি, তাতে যদি অনন্তকালও তাকে চতুর্থ শ্রেণিতে থাকতে হয়, থাকতেই হবে। তাহলে কি এবারই বৃত্তি পরীক্ষা দিল সুশীলাদি?
পাশের একটি ছেলেকে প্রশ্ন করল রুনু, 'সুশীলাদি কি এবার বৃত্তি পরীক্ষা দেছে?'
'ইশ, তার তো বিয়ে হয়ে গেছে।'
'বিয়ে হয়ে গেছে? কবে?'
'পরীক্ষের আগে আগেই।'
'সুশীলাদি এখন কোথায়?'
'তার শ্বশুর বাড়ি। সেই কোন দ্যাশে যেন।'
'আর শশীদা? শশীদাকে রান্না করে দেয় কে?'
'কে আবার, নিজি নিজিই করে।'
পাঠশালায় আসার সব উৎসাহ কে যেন এক ফুঁতে নিবিয়ে দিল। আজ যে এমন করে পাঠশালায় ও ছুটে এসেছে সে তো কেবল সুশীলাদিকে দেখবার জন্যেই। তার আদরটুকুর লোভেই। সেই সুশীলাদি নেই? সুশীলাদি এদেশেই নেই! কত কথা যে জমে আছে রুনুর বুকে, সে সব কথা সুশীলাদিকে না বলে ও বাঁচবে কীকরে? সুশীলাদির সেই চিঠির কথা, সেই আস্ত একটা টাকা, সেই এক হাঁড়ি মোয়া—হায় সুশীলাদির সে চিঠির উত্তর যে আজও দেওয়া হয়নি! জানানো হয়নি একটু কৃতজ্ঞতাও কী অকৃতজ্ঞ রুনু, কী অকৃতজ্ঞ!
রুনু প্রথম প্রথম ভেবেছিল এই এক বছরে গোবরা নামক পৃথিবীটাই বদলে গেছে। সে পৃথিবী থেকে ওর সব কিছু হারিয়ে গেছে। কিন্তু না, হারিয়ে যায়নি তো ওর ছোট গাঙ। এই এক বছরে একটুও তো বদলায়নি ছোট গাঙ। বদলায়নি ডিস্ট্রিক বোর্ডের রাস্তাটাও। রাস্তার ধারে ধারে সেই স্বচ্ছ জলের ছোট ছোট ডোবাগুলিতে এখনও কলমি ফুল ফোটে। এখনও নানা রঙের প্রজাপতি আর ফড়িং ছোট গাঙের বিচিত্র ঘাসফুলে আর কলমি ফুলে খুশি মেজাজে নেচে বেড়ায়। সেই ফকির সাহেবের কবরের উপর হিজল গাছটা এখনও তেমনই হেলে রয়েছে। আর ছোট গাঙের সবুজ ঘাসে অসংখ্য গরু-ছাগল আজও চরে বেড়ায় মনের আনন্দে। একটুও বদলায়নি ছোট গাঙ।
আজ রবিবার। আজ গোপালগঞ্জ গেছেন শ্রীনাথ পণ্ডিত পাঠশালার জনাচারেক ছাত্রকে সঙ্গে নিয়ে। নতুন বছরের নতুন বই ছাত্রদের জন্যে উনিই কিনে আনেন একসঙ্গে। বইয়ের দোকানদার ওঁকে সম্মান করেন। কিছু কমিশানও দেন। তাতে বই-এর দাম কম পড়ে। গরিব ছাত্রদের সুবিধা হয়। তারা নিজে কিনতে গেলে অনেক বেশি দাম লাগত। বিশেষ করে অর্থ বইগুলির দাম তো ডবলেরও বেশি লাগত। প্রতি বছরই এই ব্যবস্থা করেন শ্রীনাথ পণ্ডিত। বইয়ের বোঝা বয়ে আনবার জন্যেই ছাত্রদের সঙ্গে নিয়ে গেছেন। জানে রুনু।
বাবার অনুপস্থিতিতে স্বাধীন চিত্ত রুনু বেড়াতে এসেছে গাঙে। প্রথমে সেই হেলা হিজল গাছে চড়ে খানিক দোল খেল। রুনুর অতি প্রিয় খেলা ছিল একদা। আজ তেমন ভালো লাগল না। ডোবার জলে মাছেদের খেলা দেখল, লজ্জাবতী লতাকে জল ছিটিয়ে ছিটিয়ে লজ্জা দিল, একটা প্রজাপতির পেছন পেছনে খানিক ছুটলও। কোনো খেলাই যেন ভালো লাগছে না আজ।
মাঝে মাঝে একটা চিন্তা উঁকি মারছে মনে। কাল থেকে ও গোপালগঞ্জ স্কুলে যাবে। সেই প্রকাণ্ড পাকা বাড়িটা। সেই স্কুলেই তো ওদের প্রাইমারি পরীক্ষার সেন্টার হয়েছিল। কেমন একটা ভয়-ভয় গাম্ভীর্য যেন বাড়িটার। কী জানি কেমন হবে এ স্কুলের মাস্টারমশায়রা।
অন্যমনস্কভাবে এগিয়ে চলল রুনু উত্তর দিকে। এসে পড়ল ভাসাদার ঘানি ঘরের দরজায়। এই ঘানিঘরটা ওকে বরাবর দারুণ আকর্ষণ করত। বাড়ি থেকে যেদিনই তিল কিংবা সরষে ভাঙিয়ে তেল করতে আনত ওরা, রুনু আর ইন্দ্রতে সেদিনই ঝগড়া লেগে যেত, কে ঘানির উপর বসবে তাই নিয়ে। এক-একদিন ভাসাদাই মিটিয়ে দিত, 'ছোটকত্তা দশ ঘুল্লি, বড়কত্তা দশ ঘুল্লি'। তাতেও মিটত না। কে আগে চড়বে? কোনো কোনো দিন অন্য লোকের তেল করবার সময়ও ভাসাদা দয়া করে রুনুকে ঘানিতে চড়তে দিত। রুনুর মনে হতো ভাসাদা ওকেই বেশি ভালোবাসে। আজও রুনুকে দেখে ভাসাদা একেবারে হইহই করে ওকে সাদর অভ্যর্থনা করল।
'আরে আরে রুনু ভাই যে। কবে আইছ? কেমন আছ?' কাজ ফেলে হাসিমুখে ছুটে এল রুনুর কাছে। কী সুন্দর সরল হাসি। রুনুর প্রায় ডবল বয়সের জোয়ান মর্দ ছেলে, অথচ ব্যবহার করে যেন রুনুরই সমবয়সি এক বন্ধু। সেই ছোটকাল থেকেই। কিন্তু আজ তেমন করে হাসতে পারছে কই রুনু? কী যে এক বিষণ্ণতা ওকে ঘিরে ধরেছে। ওর মুখ দেখেই বুঝেছে ভাসাদা।
'কি হইছে রুনু ভাই? মুখ কালা ক্যান?'
কথা বলতে পারে না রুনু। কেন যেন কান্না আসে।
ঠিক তেমনই আছে ভাসাদা। একটুও বদলায়নি ওর অতি আদরের গরুটা। এখনও তেমনই চোখে ঠুলি বেঁধে সমানে ঘুরছে ঘানিগাছটা কাঁধে নিয়ে। বদলায়নি ঘানিটাও। তেমনই ফোঁটা ফোঁটা তেল পড়ছে ওর জিভ বেয়ে। বদলায়নি হাট-ঘাট, দোকান-পাট, হাটতলায় বড় বট। এ পৃথিবীটা আগের মতোই আছে। শুধু কি ওদের বাড়িতেই সব ওলট-পালট হয়ে গেল? হারিয়ে গেল সব হাসি আনন্দ! না, আরও একটা কুঁড়েঘরেরও হাসি আনন্দ হারিয়ে গেছে। হরেকেষ্টদের ছোট্ট কুঁড়েঘরখানা। হরেকেষ্ট আর হাসে না। সে একটা গম্ভীর মানুষ হয়ে গেছে। একটা দুঃখী মানুষ। সেই দুঃখী হরেকেষ্টকে যেন আরও বেশি করে ভালোবাসল এবার রুনু। রুনুও কি তারই মতো একটা গম্ভীর মানুষ হয়ে যাচ্ছে?
ঘানিঘরের সামনেই মাঠের মধ্যে বসল ওরা। তখন ঘানিঘরের ছায়া পড়েছে সামনের সবুজ ঘাসের কার্পেট পাতা মাঠের উপর। ওখান থেকেই ভাসাদা মাঝে মাঝে গরুটাকে এক একটা ধমক দিচ্ছে আর রুনুর সঙ্গে গল্প করছে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বাজুনীয়া সম্বন্ধে অনেক খবর নিল ভাসাদা।
গল্প করতে করতে কখন যে মধুমতীর ওপারে সূর্য ডুবে গেছে কখন যে ছোট গাঙের সবুজ বুক ঢেকে ফেলে অন্ধকারটা ওদেরও ঢেকে ফেলেছে সে খেয়ালও নেই ওদের।
'কেডা কথা কয়? রুনু নাকি রে?' পেছন থেকে হঠাৎ বাবার গলা পেয়ে চমকে উঠল রুনু।
'হয় পনিমশা। রুনু ভাইয়ের কাছে বাজুনের গল্প শুনছিলাম।' উত্তর দিল ভাসাদা।
'বাজুনে স্কুলেত্তে ওরে নিয়ে আলাম ভাসা। এখন গোপালগঞ্জেই পড়বে।'
'শোনলাম রুনু ভাইয়ের কাছে। খুব ভালো করিছেন। এইটুকু বাচ্চা কি মা-বাপ ছাড়্যে বিদ্যাশে থাকতি পারে? এহোন বেশ বাড়িতি থাকবে, বাড়িতে ইস্কুলি যাবে-আসবে। এ দ্যাশের সব্বাই তো যায়।'
'না না, ওর বরাত ভালো, হেসে বলেন পণ্ডিতমশায়, 'ওর সে কষ্ট করতি হবে না। গোপালগঞ্জেই ওর থাকার ব্যবস্থা-ট্যাবস্থা করে আলাম।'
'সে তো, আরও ভালো হল পনিমশা। আপনার মাহির কথায় সব হয়। আপনার কথা কেউ ফেলতি পারে? কোনো বড়লোকের বাড়ি বুঝি?'
'তা একটু বড়লোক তো বটেই। তয় মাঙনা খ্যাতি পরতি দেবে না। তাগে ছেলেমেয়ে পড়াতি হবে। কি বলিস, পারবি না রুনু? ক্লাস টু-থ্রির গোটা দুই বাচ্চা। প্রায় সোমনাথের ছেলেদের মতো।'
'পারব।' সাগ্রহে বলে রুনু। পরের বাড়ি থাকার ভয় ওর কেটে গেছে। এখন বরং নিজের বাড়িটাই ওর কাছে পরের বাড়ি হয়ে গেছে।
'পারবি না ক্যান? জানো ভাসা, ছেলে পড়ানোতে বাজুনেয় ওর বেশ নাম ডাক হইছিল। দুডো ছেলেরে পড়াত, দুজনেই এবারে কেলাশে ফাস্টো হইছে।'
'তা হবে না? ও যে পণ্ডিতের ছেলে!' বলল ভাসা।
পন্ডিতের ছেলে—এই বিশেষণটা ওকে অতীতে অনেক পীড়া দিয়েছে, আজ যেন ভাসাদার মুখ থেকে ও বিশেষণটা ওকে একটু নতুন মর্যাদা দিল। খুশি হল রুনু। খুশি হলেন শ্রীনাথ পণ্ডিতও।
বাবার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ি আসার পথেই শুনল রুনু ওর থাকার ব্যবস্থা আজই করে এসেছেন উনি সেই যোগেন ডাক্তারের বাসায়। সে বাড়িটা তো রুনুর চেনাই। উচ্চ প্রাইমারি বৃত্তি পরীক্ষা দিতে গিয়ে সেবার চারদিন সেই বাড়িতেই তো ছিল ওরা।
'এখন একটা ভালো দিন দেখে তোকে ওদের বাসায় দিয়ে আসব। সেইদিন ভরতিও করে দেব পাবলিক স্কুলে। সে স্কুলও তো তুই দেখিছিস।'
'হ্যাঁ দেখিছি। খুব বড় দালান।'
'তোর আপত্তি নাই তো?'
আপত্তি! রুনু তো হাতে স্বর্গ পেল যেন। হঠাৎ যেন ওর হাত পায়ের বাঁধন খুলে দেওয়া হল। ওই পশ্চিমের খোপে চব্বিশ ঘণ্টা বাবার সামনে বসে ওর তো পড়াই হত না ভয়ে। যে-বাবা স্বেচ্ছায় এত তাড়াতাড়ি ওর কারামুক্তির ব্যবস্থা করলেন সে-বাবা নিশ্চয় তত নিষ্ঠুর নয়, যত নিষ্ঠুর তাকে ভেবেছিল রুনু সেজদির কথায়।
তবু কিন্তু একটু অভিমান, একটু নৈরাশ্য মিশেই রইল এ আনন্দের সঙ্গে। ভেবেছিল হরেকেষ্টর সঙ্গে প্রতিদিন গল্প করতে করতে স্কুলে যাবে আসবে, মুখস্থ করে ফেলবে এই চার মাইল রাস্তাটাকেও। যেমন মুখস্থ হয়ে গেছে গোবরা পাঠশালা যাবার পথটুকু। একটা পথকে পুরো মুখস্থ করতে যে কতদিন লাগে। প্রতিদিন দুধারে চোখ মেলে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার পরেও হঠাৎ এক-একদিন মনে হয়, এ গাছটা তো আগে দেখিনি, এটা কি বরাবরই এখানে ছিল? আহা, ওই কালো গরুটার লেজ কাটা নাকি? প্রায়ই তো দেখি ওটাকে, আগে তো লক্ষ্য করিনি। ওই বাঁশঝাড়ের মধ্যেও একটা গাবগাছ আছে নাকি? আগে দেখেছি বলে মনে পড়ে না তো। ওইটুকু পথের মধ্যে এতদিন দেখেও কত কিছু যে না-দেখা ছিল। হয়তো এখনও রয়ে গেছে কিছু না-দেখা লতাপাতা, অচেনা বন্যফুল, অপরিচিত গাছপালা।
ভেবেছিল দাদার দোকানটার উন্নতির জন্যে ও প্রাণপণ সাহায্য করবে। গোপনে গোপনে সাইনবোর্ডটা লিখে ফেলবার আশাও ছিল।
এমন অনেক আশাই তো অপূর্ণ থেকে যাবে ও গোপালগঞ্জ চলে গেলে। এ সংবাদে দাদাও নিশ্চয় দুঃখ পাবে। একেবারে যে একা হয়ে যাবে দাদা। কেউ যে কথা কয়না ওর সাথে।
পরদিন সকালেই এল রুনু হরেকেষ্টকে সংবাদটা দিতে।
হরেকেষ্টও পড়ে পাবলিক স্কুলে। বৃত্তি যদিও পায়নি হরেকেষ্ট, তবু হরেকেষ্টও ছাত্র ভালো। তাকেও ফ্রি পড়াবার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন শ্রীনাথ পণ্ডিত। এবার নাকি ক্লাশে থার্ড হয়ে সিক্স-এ উঠেছে। রুনুও তো থার্ড। তবে আর ওর প্রাইমারিতে বৃত্তি পাওয়ার গৌরব রইল কোথায়।
প্রথমেই দেখা হয়ে গেল কুড়ির সঙ্গে। দেখেই চমকে উঠেছে রুনু। একী! এই চেহারা নাকি খুড়ির? তবে তো ঠিকই বলেছিল হরেকেষ্ট। এক বছরে মানুষ কি এত বদলে যেতে পারে? একটুও তো বদলায়নি বাবা-মা। খুড়ির কত বয়স জানে না রুনু। মায়ের চেয়ে অনেক কম নিশ্চয়। কিন্তু এখন যে মায়ের চেয়েও অনেক বুড়ি দেখাচ্ছে। কোথায় গেলে সেই ভাসা-ভাসা হাসিভরা চোখ, সেই ঢলোঢলো লাবণ্য, সেই একপিঠ ঘনকৃষ্ণ কুঞ্চিত কেশদাম! কী উজ্জ্বল দাঁত ছিল খুড়ির, হাসির সঙ্গে দাঁতগুলিও যেন হাসত। তার যে অনেকগুলিই পড়ে গেছে। কী বিশ্রী তোবড়ানো হয়ে গেছে সেই সুন্দর মুখখানা। আর শরীরে তো হাড় ছাড়া কিছু নেই। গর্তে বসা চোখ দুটো যেন মরা মাছের চোখ। তাতে প্রাণ নেই, আনন্দ নেই। অভ্যর্থনা নেই!
'কেমন আছ বাবাজি! বসো বসো!' হাসতে চেষ্টা করল খুড়ি। সে হাসি বড় ম্লান, বড় করুণ।
'তোমার কি হইছে খুড়ি!?' দরদ-ভরা গলায় প্রশ্ন করে রুনু।
'আমারে কালে ধরিছে বাবা। বাঁচবনা। কবে যে গৌরহরি পায়ের তলায় থান দেবেন, সেই আশায় পথ চাই আছি।' দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল খুড়ি।
খুড়ির যে খুবই অসুখ করেছে সে তো দেখাই যাচ্ছে। কিন্তু কী অসুখ? রুনু আবার প্রশ্ন করে, 'তোমার কী অসুখ হইছে খুড়ি?'
'সুখির কপালে আগুন জ্বালে দেছেন গৌরহরি, তাই তো অসুখ। এ অসুখির কি আর নাম আছে বাবা!'
এ সব যেন অন্যরকম কথা! বুঝতে পারে না রুনু। কেবল ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকে খুড়ির ম্লান বিষণ্ণ মুখখানার দিকে। হঠাৎ প্রশ্ন করে বসে, 'নলিতাদির জন্যি খুব দুঃখ পাইছ তাই না?'
'ওরে আমার নলিরে!' একটা বুককাটা আর্তনাদ করে বারান্দা লুটিয়ে পড়ল খুড়ি। রুনু একেবারে হতভম্ব।
'কী হল, কি হল খুড়ি?' রুনু হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল বৈষ্ণবীর পাশে। বার বার ডাকল, ধাক্কা দিল। কোনো সাড়া নেই। তবে কি মরে গেল খুড়ি? থরথর করে কেঁপে উঠল রুনু একটা অজানা ভয়ে। তারপর একেবারে গলা ছেড়ে কান্না জুড়ল।
এমন সময় দেখা গেল নীলকুঠীর জঙ্গল থেকে গাড়ু হাতে ছুটে আসছে বৈরাগী খুড়ো। ছুটতে ছুটতেই রুনুকে অভয় দিচ্ছে, 'ভয় নাই, ভয় নাই ছোটবাবু। কানতি হবে না। ভালো হয়ে যাবেনে।'
খুড়োকে দেখে সাহস পেল রুনু। কান্না বন্ধ হল। খুড়ো এসে ঘর থেকে এক ঘটি ঠান্ডা জল এনে চোখেমুখে ছিটে দিতে লাগল। আর সঙ্গে মিষ্টি মৃদু কণ্ঠে চলল হরিনাম। খুড়ির মাথাটা তুলে নিল নিজের কোলের উপর।
খুড়োর চোখে-মুখে কিন্তু উদ্বেগের ছায়ামাত্র নেই। কথার সঙ্গে সেই সাবেক হাসিটুকু লেগেই আছে। খুড়ো একটুও বদলায়নি।
'ওর চিরিৎকার শুনে তুমি বুঝি খুব ভয় পাইছিলে ছোটবাবু?'
'হ্যাঁ, হঠাৎ কেন যে অমন করে...'
'জঙ্গলে বসে আমিও শুনিছি। ভয় নাই। এই তো হচ্ছে আজ ছয় মাস ধরে। নলির মরার পরেত্তেই কী যে হল...নলির নাম শুনলিই...তুমি বুঝি নলির কথা শুধোইছিলে?'
অপরাধটা বুঝতে পেরে মাথা নীচু করে থাকে রুনু। তাতে কিন্তু খুড়োর কথা বন্ধ হয় না।
'খুব দুঃখ পাইছে তো। নাড়ির টান কি যে-সে টান তা দুঃখু করে কি হবে কও? সবই তো তেনার ইচ্ছে! গৌরহরি দেছেলেন দয়া করে, আবার নিয়েও গেলেন দয়া করে। এই কাঙ্গালের কুঁড়েয় কি অমন সোনার পিতিমে মানায়! যার জিনিস তিনি নিয়ে গেলি নালিশ করব কার কাছে? ও অবুঝ তাই দুঃখু পায়। তাই কাঁদে। দ্যাহো না শরীলডারে কি করিছে। ওরও দিন ফুরোয়ে আইছে! জয় গৌর, জয় গৌর।'
খুড়িরও দিন ফুরিয়ে এসেছে। এমন কথাও কত সহজ গলায় বলছে বৈরাগী খুড়ো। এ কেমন মানুষ! অথচ খুড়োকে নিষ্ঠুরও ভাবতে পারছে না রুনু। ও তো দেখেছে একটা বিড়ালছানাকে একটু ব্যথা দিলেও খুড়োর চোখ ছলছল করে ওঠে। বলে, 'হায় হায়, কৃষ্ণের জীব কৃষ্ণের জীব, মারতি নাই।' অসাবধান পায়ের চাপে একটা যদি পিঁপড়েও মরে, হায় হায় করে ওঠে খুড়ো। ওর কাছে সব কৃষ্ণের জীব। কারও এতটুকু দুঃখ কষ্ট দেখতে পারে না খুড়ো। সেই মানুষ নিজের মেয়ের মৃত্যুটাকে, নিজের স্ত্রীর এতবড় অসুখটাকে কী করে যে এত সহজে মেনে নিতে পারল! এই বৈরাগী খুড়োকে বুঝতে পারে না রুনু। তবু যেন শ্রদ্ধায় মাথা নোয়াতে ইচ্ছে করে ওর পায়ে।
অনেকক্ষণ জলের ছিটে দেওয়ার পরে চোখ মেলল খুড়ি। তার মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে খুড়ো বলে 'নাম করো, নাম করো। নামৈব কেবলম। গৌরহরি সব দুঃখু-কষ্টো ঘুচোয়ে দেবেন।' বলতে বলতে খুড়ির হাত ধরে তাকে বসিয়ে দিল খুড়ো। গামছা পরম যত্নে মুছিয়ে দিল চোখ-মুখ। তারপর ঘরে গিয়ে একতারাটা নিয়ে এল। খুড়ির পাশে বসেই শুরু হল নামকীর্তন। একটু বাদে খুড়িও চোখ বুজে তার সঙ্গে গলা মিলিয়ে দিল। অবসন্ন গলা, তবু কী মিষ্টি গলা খুড়ির।
অভিভূত রুনু পাশে বসেই সব দেখছে। শুনছে ওদের গান। ওরা যেন এই পৃথিবীর মানুষ নয়। যেন কোন সুদূর লোক থেকে ভেসে আসছে একটা অপার্থিব সুর। যেন ওদের ভিতর থেকে গাইছে আর কেউ। গান যে এমন করে মনকে নাড়া দেয়, এমন করে সব ভুলিয়ে দেয়, এ তো জানতই না রুনু। একটা আশ্চর্য অভিজ্ঞতা হল ওর আজ। এ জিনিস ও কাউকে বুঝিয়ে বলতে পারবে না।
কতক্ষণ এমনি তন্ময়তায় কেটেছিল কারও খেয়াল নেই।
এক সময় খুড়ি উঠে দাঁড়িয়ে বলল, 'চলো যাই।' যেন একেবারে অন্য মানুষ।
'থাক আজ আর না গেলে। আমি একাই এট্টু ঘুরে আসি।' স্নেহভরা গলায় বলল খুড়ো।
'না না, আমি একা একা এ শ্মশানে থাকতি পারব! না।' প্রবলভাবে মাথা ঝাঁকিয়ে বলে খুড়ি।
'তয় চলো। জয় গৌর, জয় গৌর!'
ভিক্ষের ঝুলিটা বারান্দার আড়া থেকে টেনে নিয়ে কাঁধে ঝুলোল বৈষ্ণবী খুড়ি। বৈরাগী খুড়ো কাঁধে নিল জীর্ণ নামাবলীটা। একতারা তো হাতেই ছিল। 'জয় গৌর' বলে দুজনেই এক সঙ্গে পা বাড়াল উঠোনে। দরজাটা যেমন খোলা ছিল তেমনিই পড়ে রইল। রুনুর অস্তিত্ব যেন ওরা ভুলেই গেছে।
'দরজা যে খোলা রইল খুড়ো!' পেছন থেকে বলল রুনু।
'তাতে কি হবে?' অদ্ভুত একটু হেসে বলল খুড়ো, 'ওয়ার মধ্যি কী সম্পত্তি বা আছে? যার জিনিস তিনিই পাহারা দেবেন। তাছাড়া কেষ্টাও আস্যে পড়বেনে এখুনি।'
'কোথায় গেছে হরেকেষ্ট?'
'গেছে এট্টু মালোপাড়া। তেল নুন-টুন আনতি। এহোন তো সোংসার ও-ই দ্যাহে শোনে। হরিবোল, হরিবোল!'
একতারায় মিঠে আওয়াজ তুলে দ্বৈতকণ্ঠে হরিনাম করতে করতে ওরা এগিয়ে চলল। রুনু বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে রইল একজোড়া আশ্চর্য মানুষের দিকে।
এবার যেন বিদেশে যাবার কোনো ব্যাপারই নয়। গোপালগঞ্জ তো হাতের কাছে। মাত্র চার মাইল পথ। তাও একটানা ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের রাস্তা। সারা বৎসরই হাঁটা-পথ থাকে। বর্ষার কমাস অবশ্য মাঝে গোটাচারেক বাঁশের সাঁকো পার হতে হয়। চোত-বোশেখে সেসব খালে জল থাকে না সাঁকোও থাকে না। একেবারে গোপালগঞ্জের কাছে গিয়ে পড়ে একটা বড় কাঠের পুল। সেটা পার হতে হবে বারো মাসই। মস্ত চওড়া গভীর খাল। সারা বছর নাও চলাচল করে। এ পথে কয়েকবার তো আসা-যাওয়া করেছেই রুনু। চেনা পথ। যখন খুশি বাড়ি আসতে পারবে।
মা বলেছিলেন, 'প্রতি শনিবারে ছুটির পর বাড়ি আসিস রুনু।' রুনু উত্তর দেবার আগেই পণ্ডিতমশায় বেশ চড়া সুরে বললেন, 'বাড়ি তো পলায়ে যাচ্ছে না। পড়াশুনো ফেলে বাড়ি আসার দরকার কি? এবার সব বিষয়ে ফার্স্ট হতি হবে মনে তাকে যেন। কোনো আড্ডাবাজি চলবে না।'
আড্ডাবাজি বলতে বাবা যে দাদার সঙ্গে মেলামেশার কথা বুলেছেন সেটা বুঝতে পারে রুনু। বাড়ি আসা তো কেবল দাদার জন্যেই। দাদার সঙ্গেই যদি মিশতে না পারলে তবে কী হবে বাড়ি এসে? এ বাড়িতে ওকে আর ভালোবাসে কে? তাছাড়া এ বাড়ি তো একটা জেলখানা। এ কারাগার থেকে মুক্তি পেলে কেই-বা শখ করে এখানে ফিরে আসে। রুনুর বাড়ি আসার তেমন গরজ নেই। বন্ধু হরেকেষ্ট? তার সঙ্গে তো প্রতিদিন স্কুলেই দেখা হবে। বাড়ি আসার গরজ না থাকলেও বাবার কথাটার দারুণ অভিমান হল ওর মনে। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, বাবা নিজে গিয়ে সেধে না আনলে ও কোনোদিনও বাড়ি আসবে না। নিজের বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে ও মনে মনে তখন পৌঁছে গেল গোপালগঞ্জের সেই যোগেন ডাক্তারের বাসায়।
সেবার অবশ্য একমাত্র ডাক্তারবাবু ছাড়া ও বাড়ির আর কারও সঙ্গে আলাপ পরিচয় হয়নি রুনুর। তখন তো মাথার মধ্যে কেবল পরীক্ষার ভাবনা। মাথা তুলে তাকাবারই ফুরসৎ ছিল না। শুধু খাবার জন্যে দুবার ছাড়া বাড়ির মধ্যে ঢুকতে হয়নি। ওরা থাকত একখানা বাইরের ঘরে।
রুনু ছাড়াও সেবার আরও তিনজন ছাত্র ছিল ও বাড়িতে। তারাও এসেছিল পরীক্ষা দিতে। রুনুর সঙ্গে ছিলেন পণ্ডিতমশায়, ওদের সঙ্গেও ছিলেন একজন শিক্ষক। ভিতরের একটা লম্বা বারান্দায় ওরা একসঙ্গে খেতে বসত। খাবার সময় দেখা যেত একটি সুন্দর বউকে, দেখা যেত কয়েকটি ছোট ছোট ছেলেমেয়েকেও। তবে দিপু নিপুর বয়সি কোনো ছেলেকে দেখেছিল বলে মনে করতে পারে না রুনু। কে জানে তাদের কাকে কাকে ওর পড়াতে হবে। তারা যেন দিপু নিপুর মতো লক্ষ্মী ছেলে হয়, মনে মনে কামনা করে রুনু।
সেবার বাজুনিয়া যাবার সময় যেমন কান্নায় বুক ফেটে যাচ্ছিল রুনুর এই বাড়িটাকে ছেড়ে যেতে, এবার তেমন কিছুই হচ্ছে না। না ভয়, না উৎকণ্ঠা, না কোনো দুঃখ। এই এক বছরে ওর অনেক সাহস বেড়েছে। বুঝি অনেক বড়ও হয়ে গেছে সেজদির মতো। বড় হওয়াটা যদিও বুঝতে পারে না রুনু, কিন্তু পরের বাড়িতে থাকার ভয় যে ওর কেটে গেছে, সেটা বুঝতে পারছে। পরের বাড়ি বলতে ওর মনে একটাই ছবি ভাসে—যে বাড়িতে দিপু নিপুর মতো বন্ধু থাকে, থাকে ঠাকুমার মতো স্নেহময়ী কোনো বুড়ি আর কাকিমার মতো একটা সুন্দরী বউ। তেমন একটা সুন্দর বউ তো সেবার দেখেই এসেছে যোগেন ডাক্তারের বাড়িতে। তাকেও কি ডাকতে হবে কাকিমা বলে? আর পরের বাড়িতে একটা মানুষ থাকে না, সে হল বাবা! আনন্দ তো সেইখানে। কী আনন্দেই যে ছিল রুনু একটা বছর দিপুদের বাড়িতে, সে তো বাবা ছিল না বলেই।
নিজেই উদ্যোগ করে বিছানা বেঁধেছে রুনু। গুছিয়ে নিয়েছে টিনের সুটকেসটাও। এবার আর নৌকো নয়। খাইনের খাল ঘুরে নৌকায় যেতে অনেক সময় লেগে যাবে। হেঁটে গেলে বড়জোর দেড় ঘণ্টা। পণ্ডিতমশায় তো বরাবর এক ঘণ্টায় যান। ঠিক হয়েছে নগরবাসী মাথায় করে নিয়ে যাবে ওর সুটকেস বিছানা। ও যাবে নগরবাসীর সঙ্গে গল্প করতে করতে। নগরবাসীও রুনুর একজন প্রিয় বন্ধু।
আয়োজন সমাপ্ত হয়েছে। খাওয়া-দাওয়া শেষ হয়েছে। মা ঠাকুরের আসন থেকে ফুল এনে রুনুর মাথায় ছুঁইয়ে পকেটে দিয়ে দিয়েছেন। ঠাকুরের আসনে প্রণাম করেও এসেছে রুনু। এবার আর মায়ের চোখে জল নেই। জল নেই রুনুর চোখেও।
মায়ের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে সেজদি। মুখখানা ভারী বিষণ্ণ। সেজদির চোখে চোখ পড়তেই রুনুর চোখও ছলোছলো করে উঠল। সত্যি, সেজদির ভারী দুঃখ হবে। দাদা তো তার দোকান নিয়ে মেতে থাকতে পারবে, সেজদি থাকবে কী নিয়ে!
'দুর্গা দুর্গা' বলে বেরিয়ে এলেন বাবা। সেজদি টুক করে ঘরে ঢুকে পড়ল। বাবাকে নাকি মুখ দেখাবে না আর, শুধু যন্ত্রের মতো বাবার আদেশ পালন করে যাবে। সেজদি একটা যন্ত্র হয়ে গেছে!
'আমি রওনা দিলাম রুনু। এট্টু আগেই যাচ্ছি। তুই প্রণাম-ট্রণাম করে ধীরে সুস্থে আয়। নগরবাসীর সঙ্গে সঙ্গে যাবি। সে বাড়ি চিনে যাতি পারবি তো?'
'হুঁ-উ পারব।'
'এট্টু আগে যাইয়ে ওগে সংবাদ দিতে পারবানে। এহেবার হট করে হাজির হওয়াডা ভালো দেখায় না।' বলতে বলতে রওনা দিলেন বাবা।
এ ভালোই হল, ভাবল রুনু। বাবার সঙ্গে সঙ্গে যেতে হলে ওর দম বেরিয়ে যেত। একটা কথাও বলতে পারত না সারা পথে। এখন নগরবাসীর সঙ্গে বেশ গল্পে গল্পে যাওয়া যাবে।
বাবা চলে যেতেই সেজদি আবার এল সামনে। দাদা কিন্তু এবারও এল না ওর সামনে বিদায়ক্ষণে। আজ যে রুনু যাবে সে কথা হরেকেষ্টও জানে। সেবারের মতো হরেকেষ্টও এল না এবার। রুনু যে চলে যাচ্ছে পরের বাড়ি এতে যেন কারণ কিছু ক্ষতি বৃদ্ধি নাই আর। ও মনে মনে এবারও মায়ের চোখে একটু জল দেখবে আশা করেছিল। মা-ও যেন কেমন হয়ে গেছে। কেবল সেজদির চোখ দুটি যেন বড় করুণ। ভারি মায়া হল সেজদির উপর। ও সেজদিকেই প্রণাম করল আগে।
সেজদি চমকে দু-পা পিছিয়ে গেল। এই অপ্রত্যাশিত সম্মানের জন্য সেজদি যেন প্রস্তুতই ছিল না।
হঠাৎ হেসে ফেলে রুনুকে জড়িয়ে ধরে বলল, 'দূর বোকা, আমারে আবার পেনাম করিস ক্যান? পেনাম করবি মারে।'
'তা তো করবই।' বলে রুনু প্রণাম করল মাকেও। মা সস্নেহে ওর মাথায় হাত রেখে বললেন, 'পণ্ডিত যা বললেন মনে রাখিস বাবা। আমি আর কি কব? বাঁচে বর্তে থাক, সুখি থাক। এ পোড়া বাড়িতে তো আর সুখ নাই। ওখানেই সুখী থাকবি।'
এতক্ষণে ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন মা। মায়ের মুখে বিদ্রোহের সুর এই প্রথম শুনল রুনু। তাহলে কি সেজদির মতো মা-ও...!
কিন্তু রুনুর প্রণাম লাভ করে সেজদি যে খুশি হয়েছে সেটা বুঝতে পেরেছে রুনু। এমনি করে দাদাকেও কি খুশি করা যায় না? এ বাড়ি থেকে চিরবিদায়ের আগে ও সবাইকে খুশি করে যেতে চায়। এ বাড়িতে আর ওর ফিরে আসার ইচ্ছা নেই। শেষ পর্যন্ত মা-ও বাবার কথাটাই স্মরণ করিয়ে দিলেন! অর্থাৎ সব বিষয়ে ফার্স্ট না হয়ে বাড়ি আসার নামও কোরো না। তাই করবে রুনু। বাড়ি আসার নামও করবে না কোনোদিন। ও কেবল পড়বে আর পড়বে।
দাদার ঘরে ঢুকেই দাদাকে একটা প্রণাম করল রুনু।
'আরে আরে করিস কি, করিস কি! আমি খারাপ ছেলে, আমার আবার কিসির পেনাম?' বলতে বলতে রুনুকে সজোরে বুকে জড়িয়ে ধরল দাদা।
'জানিস রুনু', ব্যথা-ভরা গলায় বললে ইন্দ্র, 'জানিস, এ বংশে একমাত্র তুই-ই ভালো ছেলে। আমি খারাপ, সুমি খারাপ, তাই তো বাবা আমাগে কাছেত্তে তোরে দূরি সরায়ে দেলো। শনি রবিবারও আসতে দেবে না , তাও শোনালাম। আমাগে সাথে মিশে যদি খারাপ হয়ে যাস! তুই যেন কোনো দিন খারাপ হোসনে রুনু। আমার মতো যেন ফেল করিস না। বরাবর ফাস্টো হওয়া চাই? পারবি না?'
'খুব চেষ্টা করব দাদা।'
'পারতিই হবে। যখন খুব বিদ্বান হবি, খুব বড় অফিচার হবি এস-ডি-ওর মতো, তখন ওই রকম সাহেব সাজ্যে থাকবি। আমি কক্ষনো যাব না, তোর কাছে।'
'কেন? কেন যাবা না?' নিজেকে সাহেব-সাজা এস-ডি-ও রূপেই বুঝি কল্পনা করল রুনু।
'দোকানদারের ভাই বলে পরিচয় দিতে তোর লজ্জা করবে না? আমি তোরে কোনোদিনও লজ্জা দেব না রুনু। তুই যেন খুব বিদ্বান হয়ে বাবারেও ছাড়ায়ে যাতি পারিস। একেবারে এমে বিয়ে পি আর এস হয়ে যাবি। তখন আর বাবার অত অহঙ্কার থাকবে না। তোর কাছে মাথা নোয়াতি হবে। তুই-ই আমাগে বংশের, আমাগে সব ভাইবুনির মান রাখবি। তখন আমরা বড় গলা করে সব্বাইরি কয়ে বেড়াব, দ্যাখো দ্যাখো ওই বড় অফিছার আমাগে ভাই, আপন ভাই। আমাগে বংশের আলো!'
বলতে বলতে দাদার চোখ দুটি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। রুনু মুগ্ধ বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে সেই চোখের দিকে।
এ সব কী কথা বলছে দাদা! যেন অনেক বড় একটা মানুষ অনেক জ্ঞানের কথা বলছে। সব কথা বুঝতেও পারেনা রুনু। কেবল ওই আশ্চর্য কথাগুলি শুনতে শুনতে রুনুর দুচোখ ভরে যায় জলে।
'পারবি না রুনু, ছিনাথ পণ্ডিতের অহঙ্কার তুই চূর্ণ করতি পারবি না? পারবি না আমার এই স্বপ্ন...!'
কথা বলতে পারে না রুনু। ওর ঠোঁট কাঁপে শুধু। আর ওর চোখের জলে দাদার বুক ভিজে যায়।
'নাঃ, তুই আমারে কাঁদায়েই ছাড়লি।' কাঁদতে কাঁদতে বলে দাদা, 'ওই জন্যিই তো সামনে যাতি চাইনি।'
'এবার রওনা দিতি হয় ছোট কত্তা।' বাইরে থেকে ডাকে নগরবাসী।
অত্যন্ত কোমলভাবে দাদার আলিঙ্গন মুক্ত হয়ে চোখ মুছতে মুছতে ওঘর থেকে বেরিয়ে আসে রুনু। দাদার উপর অভিমানের কণামাত্র রইল না। রইল শুধু শ্রদ্ধা।
সেজদি যে জিনিসটা দেখাবে বলেছিল তা আর কিছুতেই দেখাল না পরে। বলল হারিয়ে গেছে। জিনিসটা যে কি তা-ও বলল না। একখানা চিঠি? একখানা ফটো? না আর কিছু? পাঁচু মুহুরীর কোনো স্মৃতিচিহ্ন? ওটা চিরকালই গোপন থাকবে।
লেখা হল না দাদার সাইনবোর্ডও।
জীবনে যে কত আশা অপূর্ণ থেকে যায়! কত কিছু গোপন থেকে যায়। থেকে যায় চিরদিনের মতো অজানা।
অনেক আশা অপূর্ণ রেখে, অনেক অজানা রহস্য পেছনে ফেলে, রুনু, বিষণ্ণ মনে এগিয়ে চলল আর এক অজানার অভিমুখে। কে জানে সেখানে কোন ভবিষ্যতৎ ওর অপেক্ষায় আছে!
কিশোর ভারতী। মে-জুন ১৯৭৪
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন