শ্যামদাস দে

সেদিন কাউনিয়ার নীলপুলের বাড়িটা থেকে বলতে গেলে এক বস্ত্রে বেরিয়ে এসেছিল রুনু। ওর এক হাতে ছিল বেশ ভারী একটা টিনের স্যুটকেস। সেটা ভরতি ওর বই-খাতাপত্র আর সামান্য জামাকাপড়; আর বগলে ছিল এলোমেলো করে জড়ানো ওর বিছানাটা।
রায়বাড়ি থেকে নীলপুর পেরিয়ে কাউনিয়া রোডে পড়ে ডানহাতি ওর কলেজে যাবার পথ। আড়াই বছর ধরে যাতায়াত করতে করতে পথটা ওর মুখস্থ হয়ে গেছে। মুখস্থ হয়ে গেছে বছরের বিভিন্ন ঋতুতে রাস্তার দুধারের চেহারা কেমন বদলে যায়। শীতে, গ্রীষ্মে, বর্ষায়, বসন্তে আলাদা-আলাদা ছবি! কোথায় ধানের খেত, কোথায় কোন বাড়ির সামনের বাগানে কোন ঋতুতে কী ফুল ফোটে, নারকেল-সুপুরির বাগান, কোথায় কালভার্টের নীচের খালটা গ্রীষ্মে বর্ষায় কেমন রূপ ধরে, কোথায় কোন দোকানে কী কী পাওয়া যায়, যেতে যেতে পথের দুধারে কোথায় কোন বন্ধুর বাড়ি পড়ে—সব ওর নখদর্পনে।
বাঁহাতি ঘুরলে শহরে যাবার পথ। ও পথে ওর যাতায়াত প্রায় নেই বললেই চলে। ওই পথ ধরেই যেতে হয় স্টেশনে, বাজারে, পোস্ট অফিসে। বছরে দু-একবারই মাত্র ওই পথ দিয়ে যেতে হয়েছে বাড়ি যাবার সময়। আজ কোথাও যাবারই কোনও পরিকল্পনা নেই ওর মাথায়। তবু ছন্নছাড়া উদভ্রান্তের মতো এগিয়ে চলল ওর বাঁহাতি পথে শহরের দিকেই।
চলতে চলতে ওর কানের মধ্যে কেবল বাজছিল রাঙাবউদির সেই মর্মান্তিক কথাটাঃ রায়বাড়ির ভালোবাসা আর তুই ফিরে পাবি না! ওই আঘাতের তুলনায় জমিদার বাবুর অপমান, পদাঘাত সব যেন তুচ্ছ হয়ে গেছে। ওটুকু তো ওর প্রাপ্যই ছিল। কিন্তু রায়বাড়ির ভালোবাসা হারানো মানে যে রাঙাবউদি আর হাসির ভালোবাসাও হারানো। এতখানি নিঃস্বতা ও বইবে কী করে? এটা মর্মছেঁড়া সব হারানোর শূন্যতার ওর চিন্তাশক্তি যেন নিঃশেষ হয়ে গেছে। ও কেবল হেঁটেই চলেছে সামনের দিকে।
ও বলতে পারে না ওর মনে বাড়ি ফিরে যাবার ইচ্ছা ছিল কিনা। কিন্তু কোন এক অলক্ষ্য শক্তি যেন সেই চৌমাথা পর্যন্ত যাবার পর ওকে আপনা হতেই ডানদিকে ঘুরিয়ে দিল, ঠিক যেখানে স্টেশন রোড এসে মিশেছে কাউনিয়া রোডে।
খানিক দূর হাঁটার পরে খেয়াল হল ও স্টেশনের দিকে চলেছে। খেয়াল হতেই মনে পড়ল, এই পথেই তো একটু পরে যাবে একটা ঘোড়ার গাড়ি, যে গাড়িতে হাসিকে নিয়ে স্টেশনে যাবেন রাঙাবউদি। গাড়িতে নিশ্চয়ই থাকবেন জমিদার বড় রায়কর্তা ও তার ভাই রায়বাবু।
কি জানি হয়তো ইতিমধ্যেই তারা রায়বাড়ি থেকে রওনা হয়েছে। এই পথে চললে তাঁদের কেউ যাবার সময় গাড়ি থেকে ওকে দেখে ফেলতে পারেন। দেখামাত্র এক ঝলক ঘৃণা হয়তো ছুঁড়ে মারবেন ওর দিকে। না, আর ওদের দেখা দিতে চায় না রুনু। ও একটু এগিয়েই বাঁহাতি অচেনা একটা রাস্তা পেয়ে সেই রাস্তা ধরে এগিয়ে চলল। বস্তুত বরিশাল শহরে ওর চেনা বলতে কেবল কলেজে যাবার আর স্টেশনে যাবার পথ দুটি। তার ডাইনে যে কত ছোট বড় রাস্তা আর অলিগলি তার কোনওটারই খবর রাখে না ও।
এ রাস্তাটাও প্রায় স্টেশন রোডের মতোই প্রশস্ত কিন্তু এর দুধারেই ভীষণ ঘিঞ্জি। কোথাও এক ইঞ্চি ফাঁকা নেই। অসংখ্য ছোট বড় দোকান-পাট আর অসংখ্য ব্যস্ত মানুষের ভিড়। এই তাহলে বরিশালের বড়বাজার এলাকা।
মাথা নীচু করে রাস্তার এক পাশ দিয়ে হেঁটে চলেছে রুনু। লোকজন ও দেখছে না, দেখছে না দোকান-পাটও। ওর মনের মধ্যে এখন ভাসছে একটা মাত্র ছবি—স্টেশন রোড দিয়ে চলে যাচ্ছে রাঙাবউদিদের গাড়িখানা।
রাঙাবউদির কোলে ঘুমিয়ে যাচ্ছে সর্বাঙ্গে ব্যান্ডেজ বাঁধা ফুলের মতো হাসি। নাকি জেগে আছে? গাড়ির ঝাঁকুনিতে নিশ্চয় ওর ব্যথাটা বেড়েছে। হাসি কি অসহ্য ব্যথায় কাঁদছে? হয়তো বলছেঃ তা তা দাব্ব, তা তা দাব্ব।
হঠাৎও যে যেন শুনতে পেল হাসির কান্নাটা। চমকে একবার চারিদিকে তাকাল। না! ধারে কাছে কোথাও কোনও ঘোড়ার গাড়ি নেই তো! ওর বুকের মধ্যে একটা কান্না গুমরে উঠল। দুচোখ ভরে উঠল তপ্ত অশ্রুতে। যেন শুনতে পেল রাঙাবউদির ধিক্কারঃ রুনু, তুই আমার এমন সর্বনাশ করলি!
নিজের অজ্ঞাতেই হাঁটতে হাঁটতে একবার চোখ মুছল রুনু। হিসেব নেই কতক্ষণ ধরে ও হাঁটছে। স্যুটকেসের ভারে ডান হাতটা টনটন করছে।
হাত বদলের জন্যে স্যুটকেসটা রাখল একটা দোকানের সামনের চত্বরে। বিছানাটাকেও বগল থেকে নামিয়ে রাখতে যাবে স্যুটকেসের উপর, ঠিক এই মুহূর্তে সেই দোকান থেকে কে যেন কথা কয়ে উঠল,—আরে! রঞ্জিত না? তুমি এইখানে? কী ব্যাপার?
নিজের নাম শুনে চমকে দোকানটার দিকে চোখ ফেরাল রুনু। প্রায় ওর দাদার বয়সি একটা ছেলে। তারই মতো স্বাস্থ্যবান। তবে গায়ের রঙটা দাদার থেকেও ময়লা। বড় চেনা চেনা মনে হচ্ছে, কিন্তু এদিকে তো ও কোনদিন আসেইনি। এখানে ওকে কে চিনবে? দেখতে পাচ্ছে দোকানটা একটা সাইকেল রিপেয়ারিং শপ। কিছু নতুন সাইকেলও আছে একধারে সাজানো।
মনে পড়ল দাদার একটা স্বপ্নের কথা। দাদা বলেছিল হাজার তিনেক টাকা জমাতে পারলেই দাদা মিলের হাড়ভাঙা খাটুনির চাকরি ছেড়ে দিয়ে একটা সাইকেলের দোকান করবে। সে দোকানটা কি এই রকমই হবে? তিন হাজার টাকায় এতগুলো নতুন সাইকেল হয়? কিন্তু এ দোকানের ওই ছেলেটি ওকে চিনলই বা কী করে?
রুনু 'হাঁ' করে চেয়ে আছে ছেলেটির দিকে। ছেলেটির পরণে খাঁকি প্যান্টশার্ট। দুটি বস্তুই তেল-কালি মাখা। সর্বাঙ্গেও তেলকালির দাগ।
ছেলেটি ওকে বেশিক্ষণ ভাববার সময় দিল না। হাতের কাজ ফেলে একটা ময়লা ন্যাকড়ায় হাত মুছতে মুছতে হাসি মুখে এগিয়ে এসে বলল,—কীরে, হাঁ কইরা অমন চাইয়া আছস ক্যান? চেনতে পারস নাই? তা না চেননে দোষ নাই; ত্যালকালি মাইখ্যা যা একখান সাজ হইছে।
হঠাৎ রুনুর দিকে একটু নজর করে তাকাতেই তার মুখের হাসি মুছে গেল। একটু যেন ভয় পাওয়া গলায় বলল—তর কী হইছেরে রঞ্জিত, মুখচোখ এমন দেখায় ক্যান?
আপনি হারানদা, তাই না?—সন্দিদ্ধ ভাবে প্রশ্ন করে রুনু।
—তাইলে নামডা মনে আছে? এতক্ষণে চেনলা? বাক্স বিছানা দেইখ্যা ভাবলাম, তুই বুঝি বাড়ি যাইতে আছ। যাওনের পথে বুঝি আমার লগে দেখা করতে আইছ।
—আপনার সঙ্গে দেখা? আমি তো জানতামই না আপনি এখানে...
—তয় বাড়ি যাইবার পথে এদিকে আইলি ক্যান? চেহারা এমন হইছে ক্যান? যেন কত মাইর খাইছ?
সত্যি মারই খেয়েছি হারানদা।—বলতে বলতে হু-হু করে কেঁদে পড়ল রুনু।
—এ্যাঁ, কস কি? সইত্য? শালা খগেইন্যা বুঝি..., তাই বুঝি মনের দুঃখে বাড়ি যাইতে আছ? ও শালা যদি তর গায়ে হাত তুইল্যা থাকে, অর লাশ আমি...
না, না, খগেনদা না। খগেনদা মারেনি, কেউ মারেনি আমায়।
কী আবোল-তাবোল কইতে আছ। তর কি মাথা খারাপ হইছে? এই কইলি মাইর খাইছ; আবার কস কেউ মারেনি, তয় এসময় বাড়ি যাইতে আছ ক্যান? এখন তো কলেজ ছুটি না। ছুটিতো হইবে পূজার সময়।
না বাড়ি...হ্যাঁ...বাড়িই যাব। তা ছাড়া আর...।—কথা বলতে পারে না রুনু। কথা রুদ্ধ হয়ে যায় কান্নার বেগে।
—তর মুখ দেইখ্যাই বুঝছি; কী একখান কম্ম জানি হইছে। আয় ঘরে আয়। শুনি তার কথা।
হারানের পিছনে পিছনে রুনু ঢুকল তার দোকান ঘরে।
—অরে দজ্জাল, ওই বাক্স, বিছানাডা আইন্যা রাখতো এই বেঞ্চির উপর।
রুনু এতক্ষণ দেখছিল পনেরো-ষোলো বছরের দুটি ছেলে হারানদার মতোই সর্বাঙ্গে তেলকালি মেখে একখানা সাইকেলকে উলটে ফেলে টুক-টাক করে কি সব করছিল। হারানদাকেও প্রথম দেখেছিল উপর থেকে ঝুলোনো একখানা সাইকেল নিয়ে টুক-টাক করতে। সেখানা এখনও তেমনই ঝুলছে।
হারানদার হুকুম পেয়ে দুটি ছেলেই একসঙ্গে গিয়ে রুনুর স্যুটকেস আর বিছানাটা এনে রাখল একটা বেঞ্চির উপর।
তুই এই বেঞ্চিডায় একটু বও রঞ্জিত। আমি হাত-মুখটা ধুইয়া আই।—বলেই ফিরল সহকর্মী ছেলেদুটোর দিকেঃ শোন, মোগো জইন্যে দুই প্লেট মাংস পরটার অর্ডার দিয়া আয়—আধসের রসগোল্লাও বলিস। তরা আইজ চইল্যা যা। তোগো ছুটি। সন্ধ্যা তো হইল প্রায়। আমার পুরোনো বন্ধুর লগে একটু আলাপ-সালাপ কইর্যা, অরে ইস্টিমারে তুইল্যা দিয়া আমি যামুখনে। কাইল সময় মতো আসিস।
ওরা দুটিতে এবার চিৎ করা সাইকেলটাকে আর ঝুলোনো সাইকেলটাকে ঠিক করে রাখল এক ধারে। চারদিকে ছড়ানো যন্ত্রপাতি গুছিয়ে রাখল একটা কাঠের বাক্সের মধ্যে। তারপর বেরিয়ে গেল একসঙ্গে। হারানদা দোকানঘরের পিছন দিকে একটা পর্দা তুলে কোথায় যেন চলে গেল।
বেঞ্চিতে বসে অন্যমনস্ক ভাবে রাস্তার মানুষের যাতায়াত দেখতে লাগল রুনু। রায়বাড়ি থেকে বিকেল বেলায় নিরুদ্দেশ যাত্রায় বেরিয়ে এই প্রথম ও বসল একটা বেঞ্চিতে। দেখতে দেখতে ক্লান্তিতে অবসাদে অনেকটা যেন আচ্ছন্নের মতো ও এলিয়ে পড়ল বিছানায় হেলান দিয়ে।
ওর কাছে বড় আশ্চর্য লাগছে এই যোগাযোগটা। যে হারানদা ওর বরিশালের প্রথম বন্ধু, যে হারানদা ওকে একদিন রায়বাড়ি চিনিয়ে দিয়েছিল, সেই হারানদাকে ও এতদিন বেমালুম ভুলে ছিল। অথচ সেই হারানদাই রায়বাড়ি থেকে বিতাড়িত রুনুকে পরম আদরে পথ থেকে তুলে নিল তার ঘরে। যাকে প্রথম দিনেই একেবারে নিজের দাদার মতো ভালোবেসেছিল, তাকে কী করে ও ভুলেছিল? ও কী সত্যিই অকৃতজ্ঞ? এই প্রশ্নটাই সামান্য ওর জীবনে বার বার ওকে নাড়া দিয়েছে।
প্রায় পনেরো মিনিট পরে পরিষ্কার পায়জামা পাঞ্জাবি পরে ঘাড়ে গলায় পাউডার দিয়ে সিগারেট হাতে যে হারানদা দর্শন দিল পর্দার ওপাশ থেকে এসে, সেই হারানদাকে চিনতে একটুও অসুবিধা হল না রুনুর।
বাঃ! এবার আপনাকে ঠিক চিনেছি।—হেসেই ফেলল রুনু।
—তুই তো বেশ কইলকাত্তিয়া কথা কইতে শেখছস রঞ্জিত। রায়বাড়িতে শুনছি ওদেশের একটা সোন্দর বউ আছে। হ্যার কাছে শেখছ বোধহয়?
ঠিকই ধরেছেন হারানদা। তিনি সব দিক থেকেই ছিলেন আমার গুরু।—বলতে বলতে দীর্ঘশ্বাস ফেলল রুনু। দুচোখ আবার ছলছল করে উঠল।
ছিলেন মানে? বউডা কি মইরা গ্যাছে? খুব দুঃখু পাইছস বুঝি? তর মুখে যে দুঃখু একেবারে লিখা রইছে। তা মরণের উপর তো আর কারও হাত নাইরে তাই। কাইন্দ্যা কি হইব?—সান্ত্বনার সুরে রুনুর পিঠে হাত রেখে বলে হারানদা।
—ছিঃ, ছিঃ, ও কথা বলবেন না! রাঙাবউদি কেন মরবেন? কিন্তু তাঁর সর্বনাশ করে দিয়েছি আমি।
কস কিরে রনো? কী করছ কও!—সিংহের মতো ফোঁস করে ওঠে হারানদা। চোখদুটো জ্বলে ওঠে দপ করে।
ধমক খেয়ে রুনু আবার কান্নায় ভেঙে পড়ে, তাঁর একমাত্র মেয়ে। বছর তিনেক বয়স হবে। একেবারে একটা গোলাপ ফুলের মতো। তার যা সর্বনাশ...
আর কথা বলতে পারে না রুনু। প্রাণ ভরে হাউ হাউ করে খানিক কেঁদে একটু একটু করে রুনু বলে চলে সমস্ত কাহিনীটা।* (*'বৃন্তচ্যুত রুনু' কাহিনী দ্রষ্টব্য। গত বৎসর শারদীয়া কিশোর ভারতী ১৩৮৭-তে প্রকাশিত।) কাহিনি শেষ করে একসময় তাকিয়ে দেখে, হারানদার চোখের সে তীব্রতা ও রোষ কোথায়? তার পরিবর্তে সেখানে এসেছে স্নিগ্ধ মমতা আর সহানুভূতি।
কাহিনীটা শুনে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল হারানদা। এক সময় রুনুর মাথায় আস্তে আস্তে হাত বুলিয়ে বলল,—তুই আমারে মাফ কর রনো। আমি ভাবছিলাম...যাউকগা। যা হওনের তা তো হইয়া গেছেই। কাইন্দ্যা তো আর হ্যার খোঁড়া ঠ্যাঙ জোড়া লাগাইতে পারবা না। কইলকাতায় অনেক বড় ডাক্তার আছে। হ্যারা মরা বাঁচাইতে পারে। অখন ভগবানেরে ডাক যাতে মাইয়াডা সুস্থ হইয়া যায় তাড়াতাড়ি সাইকেলের উপর রাগ কইরা কী হইব ভাই। সাইকেল যারা চড়ে তারা হগলেই দু-চার বার অ্যাক্সিডেন্টও করে। আমিও করেছি কত।
—সত্যি বলছি হারানদা, আমি নিজে খোঁড়া হয়ে গেলে আমার একটুও দুঃখ হতো না, কিন্তু হাসি যদি জীবনের মতো খোঁড়া...
আর একবার কান্না শুরু করতে যাচ্ছিল রুনু, ঠিক সেই মুহূর্তে দুপ্লেট মাংস পরোটা আর মস্ত এক হাঁড়ি রসগোল্লা নিয়ে এল দুজন হোটেল বয়।
যা, ভিতরে গিয়া টেবিলে রাইখ্যা দুই গ্লাস জল ভইরা দিয়া যা।—ওদের বলল হারানদা।
—ওঠো রঞ্জিত, হাত মুখটা ধুইয়া কিছু খাইয়া লও। মুখ দেইখ্যাই বোঝাতে পারছি প্যাটে কিছু পড়ে নাই আজ।
কথাটা সত্যি। আজ দুপুরে ওকে কেউ খেতে ডাকেনি। লজ্জায় ভয়ে নিজেও খেতে যায়নি। তারপর দুপুরের সময় বড় রায় কর্তা আসতেই তো সারা বাড়িতে একটা হুলস্থুল পড়ে গেল। ওর খাওয়ার কথা তখন আর কে ভাবে। বস্তুত খাওয়ার কথা, স্নানের কথা আজ সারাদিনে ওর মনেই পড়েনি।
ছেলে দুটি যেতেই দোকান ঘরের সামনের দরজা বন্ধ করল হারানদা। তারপর রুনুর হাত ধরে নিয়ে গেল সেই পর্দাটার ওধারে। রুনু অবাক চোখে দেখছে। পর্দার এদিকে যে এতসুন্দর সাজানো গোছানো একখানা ঘর আছে, ও তো ভাবতেই পারেনি। একধারে চেয়ার, টেবল, আলমারি, আলনা আর একধারে দামি খাট বিছানা। বিছানার শিয়রের দিকের জানলায় চমৎকার পর্দাটা হাওয়ায় দুলছে। মাঝখানে বেশ খানিকটা ফাঁকা জায়গা। দু-তিনজন মানুষ তো এই মেঝেতেই শুতে পারে। বেশ বড়সড় একখানা ঘর।
এইডা আমার অফিস ঘর।—হেসে বলে হারানদা।
—অফিস ঘরে এত সুন্দর খাট বিছানা থাকে?
ওখানে দুপুরে ঘণ্টা দুই রেস্ট নেই। দুপুরে আর বাড়ি যাই না। বাড়ি যাই একেবারে রাইতে। এসব দেইখ্যা ভাবছ সেই হতভাগা হারাইন্যাডা এত কম্ম করল কবে? সব কমুহানে। আগে খাইয়া লও।—সাফল্যের গর্বিত হাসিতে হারানদার মুখ উদ্ভাসিত।
ঘরে দুখানাই মাত্র চেয়ার। চেয়ার দুখানা পাশাপাশি রেখে টেবিলে খাবার সাজিয়ে রেখে গেছে সেই হোটেল বয় দুটি। হারানদা রুনুর হাতে সাবান তোয়ালে ধরিয়ে দিয়ে পর্দা দেওয়া দরজার বিপরীত দিকের দরজাটা খুলে দিল। ঘরটা ভরে গেল মিষ্টি ঠান্ডা হাওয়ায়।
দরজা খুলতেই সামনের দৃশ্যটা চোখে পড়ল রুনুর। চোখ জুড়িয়ে গেল যেন। বিশাল একটা টলটলে পুকুর। তার চার পাড় ঘিরে সারিবদ্ধ নারকেল গাছ। হাওয়ায় তিরতির দুলছে নারকেল পাতা। দিনান্তের রাঙা আলো পড়েছে গাছের মাথার মাথায়। আর গাছগুলির উল্টো ছায়া পড়েছে রক্তাভ পুকুরের জলে। মনে হয় যেন গাছগুলি পাড় থেকে ঝুলে রয়েছে জলের মধ্যে। ফাঁকে ফাঁকে দু-চারখানা বাড়িও দেখা যাচ্ছে।
রাস্তা দিয়ে চলতে দু-ধারের ঘিঞ্জি দোকানপাটই চোখে পড়েছিল। দোকানের পিছনে যে এমন একটা মন ভুলোনো ছবি আছে—এ তো কল্পনাই করেনি ও। মুগ্ধ বিস্ময়ে চেয়ে আছে রুনু।
কী দ্যাখতে আছ?—হারানদার কথায় রুনুর চমক ভাঙলঃ খুব সুন্দর তাই না? আমিও দেখি মাঝে মাঝে বিছানায় বইয়া। এইটুকুর জন্যই তো ঘরডার উপর আমার এত মায়া। অখনই তো অন্ধকারে সবর ঢাইক্যা যাইবে। কাইল সকালে দেইখ্যো প্রাণ ভইরা। যাও, অখন তাড়াতাড়ি ওই ঘাটলায় যাইয়া হাত-মুখ ধুইয়া লও। ইচ্ছা করলে ছানও করতে পারো।
আমার কিচ্ছু ইচ্ছে করছে না হারানদা। আমি কিছু খাব না।—কান্নাভেজা গলায় বলে রুনু।
—তুমি কাঁদলেই তো হাসি ভালো হইয়া যাইব না। ঈশ্বরেরে ডাকো।
—সেই থেকে তো সমানে ডাকছি, সারাক্ষণ ডাকছি।
—তা হলেই হইবে। অখন চলো তো।
হারানদা প্রায় জোর করেই ওকে নিয়ে গেল ঘাটলায়। জোর করেই হাত-মুখ ধোয়াল। তারপর মায়ের মতো স্নেহে আদরে ওকে পাশে বসিয়ে খাওয়াল।
খেতে খেতেও রুনু মাঝে মাঝেই গুমরে উঠছিল,—আমি যে বাড়ি গিয়ে বাবাকে কী বলব হারানদা। বাবা কত আশা করে আছেন, আমি বি.এ. পাশ করব, বংশের মুখ উজ্জ্বল করব। প্রত্যেকটি চিঠিতে কত বড় বড় কথা লেখেন বাবা। এখন এই ঘটনা শুনে...।
খাওয়া বন্ধ হয়ে রুনুর। ফোঁটা ফোঁটা চোখের জল ঝরে পড়ে খাবার ডিশে।
হয়তো ওকে অন্যমনস্ক করার জন্যই হারানদা বলে,—তোমার সে সাইকেল কই? যে সাইকেল তোমার রায়বাড়ির অন্ন ঘুচাইল?
—সেটাতো ভেঙেচুরে গেছে। রাস্তাতেই পড়ে আছে বোধহয়।
—কও কী, রাস্তায় পড়িয়া আছে! তাই থাকে নাকি?
না থাকলে নেই। ওটায় তো আর এ জীবনে চড়ব না।
বেচারা সাইকেলটা কী দোষ করল? হাসির জন্য যেমন কইলকাতার বড় ডাক্তার, সাইকেলের জন্য তেমন আমার এই ডাক্তারখানা। হাসিরে সুস্থ করবে হেই ডাক্তার, ওডারে সুস্থ করবে এই ডাক্তার।—সগর্বে নিজের বুক ঠুকে হাসতে হাসতে বলে হারানদা।
ওর মজার পোজ দেখে হাসি পেয়ে যায় রুনুরও,—কিন্তু আপনার রোগীকে আপনি পাবেন কোথায়? আপনিই তো বললেন এতক্ষণ আর সেটা পথে পড়ে নেই।
—একবার খোঁজ লইতে হইবে না? জিনিসটা উদ্ধার করতে হইবে না? আচ্ছা আমি খবর লমু খগেইন্যার কাছে।
—খগেনদার বর্তমান খবর জানেন?
—সব জানি। গতবার ফেল করছে। করবে না? গুন্ডামিতে তো আমার চায়েও এক কাঠি সরেস। তারপর আমার মতোই হয়তো বাপ খেদাইয়া দিছে। অখন আমার মতোই তেল-কালি মাইখ্যা মটর রিপেয়ারিং-এর কাজ শেখতে আছে। অখন হেও মিস্ত্রি, আমিও মিস্ত্রি। অখন ভাব হইয়া গেছে। আমার এখানকার ওয়েল্ডিং-এর কাজ তো অখন ওদের কারখানাতেই করাই। মাঝে মাঝে যাইতে হয়।
—খগেনদা আসেন না এখানে মাঝে মাঝে?
—হে আইবো ক্যান? হে তো মটর মেকানিক। অখন থিকাই নিজেরে লাট-বাট ভাবতে আছে। তয়, আমার স্বাধীন ব্যবসার কথা শুইন্যা খুব খুশি হইছে। কওতো একদিন ডাইক্যা আনব।
না-না-না! কক্ষনো না!—রুনু যেন আর্তনাদ করে উঠলঃ খগেনদা এখন আমাকে দারুণ হিংসা করেন। কথাও বলেন না। এই ঘটনার পর তো আরও রেগে গেছেন। আমাকে দেখলেই...
—রাগল তো বইয়াই গেল। তার রাগের মাহা তামাক খাই আমি। আমি করি স্বাধীন ব্যবসা।
—খগেনদাও স্বাধীন ব্যবসা করতে চান শুনেছি।
কথাটা একটু বেফাঁসই বলে ফেলল রুনু। না বললেই হতো। মেজাজি হারানদার মেজাজ আরও এক ডিগ্রি চড়ে গেল।
—হে কথা আমারেও কইছে। দ্যাখা যাউক। কেবল বাপের টাকা হইলেই ব্যবসা চলে না। মগজ চাই। মাথার ঘাম পায়ে ফেলন চাই। ব্যবসা তো আমার বাপেও করে। হে করে জোচ্চুরীর কারবার, আমি করি সৎ ব্যবসা।
কথায় মোড় ঘোরাতে রুনু প্রশ্ন করে,—এ ব্যবসা আপনি কবে শুরু করলেন?
—সইত্য বলতে, এ ব্যবসা আমারে দিয়া করাইছ তুমি।
তার মানে?—রুনু অবাক চোখে তাকায় হারানদার দিকে।
—তুমি সেবার কইছিলা না, তোমার দাদা পরীক্ষায় ফেল করিয়া বাপের কাছে দশ টাকা লইয়া ব্যবসা শুরু করে। আর মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যেই হেই ব্যবসার আয়ে বুড়া বাপ-মায়েরে খাওয়ায় পরায়। হেই কথাডা আমার মনে ধরছিল।
বলেই হারানদা বলতে শুরু করল তার ব্যবসা করার লম্বা কাহিনী। ঝানু ব্যবসায়ী বাপকে পটাবার জন্য যে সব কব্জাকায়দা করতে হয়েছিল সে সব বাদ দিয়ে মূল কাহিনীটা হলঃ
স্বাধীন ব্যবসার ফন্দিটা ওর মাথায় আসতেই ও গোপনে গোপনে একটা বুড়ো মুসলমানের সাইকেলের দোকানে রিপেয়ারিং-এর কাজ শিখতে শুরু করল। ব্যবসায়ী বাপের ছেলে। তাই বুড়োকে তোয়াজ করে ব্যবসার ফন্দি ফিকিরও অনেকটা শিখে ফেলল। দোকানে কাজ করত ১৩/১৪ বছর বয়সের দুটো বাচ্চা ছেলে। তাদের সঙ্গেও দারুণ ভাব করে নিল। কথায় কথায় বুড়ো একদিন জানাল যে, সে এবার মক্কায় যাবে হজ করতে। হাজার দুই টাকার দরকার। হারানের যদি কোনও বিশ্বাসী লোক জানা থাকে যে দু-হাজার টাকা দিয়ে দোকানটা বাঁধা রাখতে পারে, অথবা যদি ন্যায্য দামে কেনার মতো খদ্দের পায় তো বেচেও দিতে পারে। খবরটা লুফে নিল হারান। সেই রাতেই বাবাকে নানা কৌশলে পটিয়ে ফেলল। দোকানে তখন রিপেয়ারিং-এর কিছু যন্ত্রপাতি ছাড়া মালপত্র বিশেষ কিছু ছিল না। কিন্তু দোকানের ওই জায়গাটুকুই যে ব্যবসায়ীর কাছে অমূল্য সম্পদ। অনেক দারাদরির পরে পাঁচ হাজার টাকায় রফা হল। এতক্ষণ আড়ালেই ছিল হারান। এবার আত্ম-পরিচয় প্রকাশ করে বুড়ো দোকানদারকে বলল, ইনি আমার বাবা। মস্ত ব্যবসায়ী। আমিও একটু স্বাধীন ব্যবসা করতে চাই চাচা। আপনি বলেন চাচা, আমি পারব না?
—তুম...আপনি কুণ্ডু মশায়ের ছেলে! কী সর্বনাশ! আপনারে এই ছয়ডা মাস আমি তুই তোকারি করিছি! হায় আল্লা! তবে, কুণ্ডু মশায়, ছেলে আপনার জাত ব্যবসায়ী। ও ছয় মাসে যা শেখছে, ওই দুই হারামজাদা তিন বছরেও তা শেখতে পারেনি। ও একাই দোকান চালাইতে পারবে।
হারাণ সঙ্গে সঙ্গে বলে,—তবে বাবা দলিলডা আমার নামেই করিয়া দিও।
সে তো ভালো কথা।—সঙ্গে সঙ্গে সায় দেয় বুড়ো। ঝানু ব্যবসায়ী কুণ্ডু মশায় শেষ পর্যন্ত নিরুপায় হয়েই ছেলের নামে দোকানটা কিনে দিলেন। আমতা-আমতা করে বললেন,—ব্যবসা করবি কি লইয়া? দোকানে তো মালপত্তর কিছু দেখি না। খালি খান কয়েক পুরোনো টায়ার টিউব।
—আমি গরিব। মাল কিনবার পয়সা কোথায় পামু, কুণ্ডু মশায়। আপনার তো অগাধ টাকা। আরও হাজার পাঁচেক দিয়া ছেলের দোকানডা সাজাইয়া দেন না।
দান চাই না, লোন—বুক ফুলিয়া সেদিন বলেছিল হারানঃ দোকানের দামও শোধ দিমু আমি। পাঁচ হাজার টাকা লোন দিলে তাও শোধ দিমু আমি দুই বছরের মধ্যেই। দোকানটা সাজাইতে চাচা আমারে এটু সাহায্য করবেন না?
নিশ্চয় করুম!—পরম স্নেহে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল বৃদ্ধের মুখখানিঃ এডা হইল আমার পরাণ। তুম...আ...আপনার হাতে এডা ভালোই থাকবে। আমি মানুষ চেনতে পারি। আমি ভাবুম এডা আমার পোলার হাতেই রইল!
চাচা!—অভিভূত হারান দুহাতে জড়িয়ে ধরেছিল বুড়োকে।
শেষ পর্যন্ত প্রায় সপ্তাহ খানেক ধরে নানা টাল বাহানার পর আরও নগদ পাঁচ হাজার টাকা হারানের হাতে ধরিয়ে কুণ্ডু মশায় মুখ ব্যাজার করে বলেছিলেন,—নে টাকাগুলান জলে দেবার সাধ হইছে, জলে দে গিয়া। তবে এই শেষ। আর যেন জীবনে হাত পাততে না আসিস। তুই তো জোচ্চোর বইলা আমারে গাইল পাড়স, অখন নিজে কইর্যা দ্যাখ গিয়া সাধু থাকতে পারস কিনা। দুই বছর নয়, পাঁচ বছরে শোধ করতে পারলেই আমি কেতাত্থ হমু। আমি চামু না, দেখুম তোর সাধুগিরি। তবে ভিক্ষাও আর দিমু না—এই আমার শ্যাষ কথা।
বাপের সঙ্গে একটা চ্যালেঞ্জ কইরাই তো দুগ্গা দুগ্গা বইল্যা সেদিন ব্যবসায় হাত লাগাইলাম। মাস খানেক ছিলেন চাচা। অনেক সাহায্য কইরা গেছেন। অনেক পরামর্শ উপদেশ এ ব্যবসার অনেক অন্ধিসন্ধির সন্ধান দিয়া গেছেন। যাবার সময় প্রণামী বাবদ একশো একটাকা দিছিলাম। কী খুশি! বুক ভইর্যা আশীর্বাদ কইরা গেছেন। তেনার আশীর্বাদেই তো বাইচ্যা আছি।—আবেগ ভরে আত্মাকহিনী শেষ করে হারানদা।
আপনি সাধু থাকতে পেরেছেন?—হেসে প্রশ্ন করে রুনু।
—পারছি বইলাই তো এই 'কুণ্ডু সাইকেল রিয়েয়ারিং'-এর এত নাম ডাক।
—বাবার কাছে যে কথা দিয়েছিলেন, সে কথা রাখতে পেরেছেন?
—কোন কথা?
—দুবছরের সব টাকা শোধ।
—পারুম বলিয়াই তো আশা করছি। আসছে পূজার দুই বছর পূর্ণ হইবে। গতবছরের আগের বছর মহাষ্টমীর দিন 'কুণ্ডু সাইকেল রিপেয়ারিং'-এর শুভ উদ্বোধন হইছিল। ইতিমধ্যে ছয় হাজার শোধ হইয়া গেছে। জানো কী অসম্ভব খাটুনি গেছে। খাটি আমি অখনও। আগের সেই দুইডা মুসলমান ছোকরারেই রাইখ্যা দিছি। একদিন তো অগো কাছেই কাজ শিখছি। মগজে কিছু ঘিলু আছিল, তাই অখন অগেও মাঝে মাঝে শিখাই। বড় ভালো। একদিন বন্ধুর মতো মিশছি। অখন মালিক হইয়াও বন্ধুর মতো আছি।
—আপনি যে তখন দজ্জাল বলে ডাকলেন, সেটা ওদের কার নাম? বড়টা না ছোটটা? নামটা তো ভারি অদ্ভুত।
অদ্ভুত!—হো হো করে হেসে উঠল হারানদাঃ ওই অদ্ভুত নামডা আমি দিছি। অরা দুই ভাই। বুড়ার দূর সম্পর্কের নাতি। বড়ডা দাবিরুদ্দিন, ছোটডা জালালদ্দিন। আমি ডাকি দবু—জালু। সন্ধি করলে দজ্জাল হয় না? হাঁস আর সজারু যদি হাঁসজারু হয়, দবু আর জালু কেন দজ্জাল হইবে না? আমিও সুকুমার রায়ের মতো ব্যাকরণ মানি না। ও শালারাও কি কম বজ্জাৎ। আগে ডাকত হারানদা, অখন ডাকে হারাধনদা। আমার নাকি খুব ধন হইছে তাই হারাইন্যা হইছে হারাধন। বলতে বলতে হারাধনদার কী হাসি।
প্রায় ঘণ্টা দেড়েক ধরে ওরা দুজনে খাওয়ার টেবলে বসে গল্পই করছিল। ছোট ছোট হাসি আর রসিকতার মধ্যে দিয়ে কখন যে রুনু স্বাভাবিক হয়ে গেছে ও টেরই পায়নি।
খাওয়া শেষ করে হাত-মুখ ধুয়ে তোয়ালেতে হাত মুছতে মুছতে হারানদা গম্ভীরভাবে বলে,—শোনো রঞ্জিত, আইজ তোমার বাড়ি যাইয়া কাম নাই। আইজ তোমার মন ভালো নয়, তোমার বুড়া বাবারে কি কইতে কি কইয়া ফ্যালবা, তিনি দুঃখু পাইবেন। আইজ তুমি আমার গেস্ট। আইজ আমিও বাড়ি যামু না। চলো তোমারে লইয়া সিনেমা দেইখ্যা আই। তারপর হোটেলে খাওয়া-দাওয়া কইরা দুই ভাই এক বিছানায় শুইয়া সারা রাইত গল্প করুম। তোমার দ্যাশ মানে তো খুলনা। রাইতের এক্সপ্রেসে ডবল ভাড়া দিয়া কাম কি।
—না, না, এক্সপ্রেসে আমি যাইব না। একটু পরেই তো এক্সপ্রেস ছেড়ে যাবার পর স্টেশনের প্লাটফর্মে গিয়ে...তারপর কাল সকালের মেইলে—
—সে দেখা যাইবে খন। অখন চলো তো। সাতটা বাজে। সাড়ে সাতটায় নাইট শো শুরু হইবে।
ব্যস্তভাবে রুনুর হাত ধরে টেনে নিয়ে বাইরে এল হারান, পেছনের দরজায় ডবল তালা লাগিয়ে। পেছন দিয়ে ঘুরে রাস্তায় এসে দোকানের সামনের দিকের দরজায় চার-পাঁচটা বড় বড় তালা টেনে টেনে দেখল।
বরিশাল টাউনে নাকি দুটো সিনেমা হাউস আছে। স্টেশনে যাবার পথে তার একটা হাউস দেখেছে রুনু।
আর একটা যে কোথায় কোন দিকে তার খবরও রাখে না।
আড়াই বছর হল রুনু আছে এখানে, ইতিমধ্যে একদিনও সিনেমা দেখার কথা ভাবেনি। অথচ খগেনদা মাঝে মাঝে সিনেমায় যেতেন জানে রুনু। রায় বাবুও যেতেন এক-একদিন বাড়ির মেয়েদের নিয়ে ঘোড়ার গাড়িতে করে। এই দলে রাঙাবউদিকে কোনওদিন যেতে দেখেছে বলে মনে পড়ে না।
আজ হারানদার সঙ্গে রুনুর জীবনের প্রথম সিনেমা দেখা। সিনেমার ছবি যে কথা বলে সেটা জানা থাকলেও প্রথম সিনেমা দেখার বিস্ময় ও আজও ভোলেনি। আজও স্পষ্ট চোখের সামনে ভাসে সমস্ত পালাটা। 'হরিশচন্দ্র' পালার কাহিনীটা মোটামুটি জানাই ছিল। পর্দার উপর সেই কাহিনীর জীবন্ত রূপ দেখতে দেখতে আজকের অভিশপ্ত দিনটার স্মৃতি ক্রমেই যেন মুছে যাচ্ছে ওর মন থেকে। মাঝে মাঝে দু-একটা দৃশ্যে উত্তেজিভাবে ওর উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছে হারানদার কাছে, কিন্তু হারানদা যেন একটু অন্যমনস্ক। হয়তো অনেক সিনেমা দেখে দেখে ওর কাছে সব পুরোনো হয়ে গেছে, হয়তো ভাবছে ওর ব্যবসার কোনও কথা।
ফিরবার পথেও সিনেমার গল্প করতে করতে কোন পথ দিয়ে কখন যে চলে এল 'কুণ্ডু সাইকেল রিপেয়ারিং'-এর সামনে খেয়ালই করতে পারেনি রুনু।
—আও ভিতরে আও। জামাকাপড় ছাইড়্যা হাত-মুখ ধুইয়া লও। তারপর হোটেলে যামু খাইতে।
বলতে বলতে হারানদা ধুতি, পাঞ্জাবি ছেড়ে একটা লুঙ্গি পরে নিল। রুনুও ধুতি ছেড়ে গেঞ্জি পায়জামা পরে বলল,—রাত্রে আর আমি কিছু খাব না হারানদা। সন্ধ্যার সময় অত খেয়েছি তো, পেট ভরে গেছে একদম।
—দুর, দুর, ওতো টিফিন, ভাত খাইবা না?
আপত্তি করা সত্ত্বেও প্রায় জোর করেই ওকে হারানদা নিয়ে গেল নিকটবর্তী একটা হোটেলে। ক্যাশবাক্স কোলে করে বসা প্রৌঢ় লোকটিকে বলল,—আমার পুরোনো বন্ধু। আমার গেস্ট। ভালো মাছ-টাছ কি আছে বুইঝ্যা শুইন্যা খাওয়াইবেন জ্যাঠা। যেন নিন্দা না হয়।
ইলিশ মাছ ভাজা, রুইমাছের কালিয়া, ভাজা মুগ ডালের মুড়িঘণ্ট ইত্যাদিতে বেশ জমাট খাওয়া হয়ে গেল রাতে।
হোটেল থেকে ফিরবার পথে হারানদা গম্ভীরভাবে বলে,—শোনো রঞ্জিত, আমি এট্টা কথা কমু তোমারে, বেশ ভাইবা চিন্তা জবাব দিবা।
—কী কথা?
কমুহানে সময় মতো। ব্যস্ত হইলা ক্যান?—গাম্ভীর্য অটুট রেখেই বলে হারানদা।
রাত্রে দুজনে পাশাপাশি শুয়েছে এক বিছানায়। শোবার সময় হারানদা তার রিস্ট ওয়াচটা খুলতে খুলতে বলল,—এগারোটা বাজে। অখনই ঘুমাইয়া পড়তে চাও? না আমার কথাডা কইয়া লমু?
রুনু জবাব দিল,—আমার একটুও ঘুম পাচ্ছে না। আপনি তো বলেছিলেন সারারাত আজ গল্প করবেন। আগে আপনার কথাটা শুনব। তারপর আপনার গল্প! এই আড়াই বছরের গল্প।
—সে গল্প তো প্রায় শুইনাই ফ্যালছ। আমার ব্যবসার গল্প।
ব্যবসার গল্প নয়, জীবনের গল্প।—হেসে বলে রুনু।
ব্যবসাই আমার জীবন।—হারানদা গম্ভীর।
সন্ধার সময় একটা ঝড়ে মার খাওয়া কাকের মতো এখানে এসেছিল রুনু। এখন রাত এগারোটা। এই কয়েক ঘণ্টা সময়ে হারানদার আশ্চর্য আন্তরিকতাপূর্ণ ব্যবহারে ওর জীবনে যেন একটা যুগান্তর ঘটে গেছে। এই মধুর বর্তমানটা ওর সদ্য-অতীত বেদনাময় অতীতটাকে যেন মুছে দিয়েছে। ও এখন স্বাভাবিকভাবে হাসতে পারছে, ভাবতে পারছে।
এই ক'ঘণ্টা ধরে হারানদা বোধহয় এইটিই চেয়েছিল। রুনুর পিঠে সস্নেহে হাত রেখে ঠিক যেমনি করে শৈশবে দাদা হাত রাখত ওর পিঠে, হারানদা ধীরে ধীরে বলল তার সেই কথাটা।
ও যে এমন একটা প্রস্তাব করতে পারে, এ তো রুনুর স্বপ্ন কল্পনারও অতীত। শুনতে শুনতে ভালোবাসার আবেগে ওর চোখে জলে এসে যাচ্ছে। আজ সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ওর চোখে প্রায় সারাক্ষণই জল ছিল। কিন্তু সে চোখের জল আর এ চোখের জলের স্বাদ যে একেবারে আলাদা! ইচ্ছা হচ্ছে নিবিড়ভাবে হারানদাকে বুকে জড়িয়ে ধরে এই আনন্দাশ্রুতে ওর বুকটা ভাসিয়ে দেয়।
হারানদা নিরুত্তাপ শান্ত গলায় তার প্রস্তাব পেশ করে বলল,—অখন তুমি ভাইব্যা দেখো, এত কষ্ট সইতে তুমি রাজি আছ কিনা। এত ঝামেলার মধ্যে পড়া চালাইয়া যাইতে পারবা কিনা। বাড়িতে গিয়া যতই কাঁদ, অখন পড়া ছাইড়্যা দিলে তোমার বুড়া বাপে যে খুব দুঃখু পাইবেন হেডা তো বোঝো। তাই আমি কই, পড়াডা ছাইড়ো না। একটু কষ্ট করো।
এরপর আর রুনু নিজেকে সম্বরণ করতে পারল না। দুহাতে সজোরে হারানদাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে হু-হু করে কেঁদে ফেলল। কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না ও।
কিছুপরে অবরুদ্ধ কণ্ঠে বলল,—হারানদা, আপনাকে সেই প্রথম দিনই আমি ভালোবেসেছিলাম। বুঝেছিলাম, আপনার মধ্যে একটা বড় প্রাণ আছে। বাইরেটা কেবল একটু রুক্ষ। আজ আর সে রুক্ষতাও নেই। আজ আপনি আমার আপন দাদার চেয়েও বেশি আপন। আমার বর্তমান সমস্যায় আমার দাদা কেবল কাঁদতেন, আপনি সবটুকু দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়ে আমাকেই কাঁদিয়ে ছাড়লেন। এর মধ্যে কষ্টটা কোথায় দেখলেন? আমার কাছে এ যে স্বর্গ! হারানদা...আপনি..আমার...।
কান্নার বেগে কথা বন্ধ হয়ে যায় রুনুর।
আরে পাগল কান্দস ক্যান। দায়ডা আমি লইলাম কই? তুই টিউশনি করবি, তোর টাকায় তুই পড়বি। আবার রাইতে আমার দোকান পাহারা দিবি। নাইটগার্ড রাখতে হইলে কমসে কম পঁচিশ টাকার ধাক্কা। তরে তো মাত্তর দশ টাকা হাত খরচা দিমু। তুই রাজি হইলে তো আমারই লাভ। তুই তাইলে রাজি?
—রাজি, রাজি, রাজি, একশোবার রাজি। তবে হোটেল আর টিভিন যদি দশ টাকায় হয়ে যায়, আর দুটো টিউশনিতে যদি কুড়ি টাকার মতো ব্যবস্থা করে দিতে পারেন, তবে কিন্তু আপনার ওটা...একটা ঘর পাব, এত সুন্দর খাট বিছানা পাব, সেই অনেক। না—না আবার কি চাই!
—আচ্ছা, সে দেখা যাইবে অখন। ভালো ছাত্রদের আবার মান অপমান জ্ঞানডা বড় বেশি থাকে। তারা কাউরে আপন ভাবতে পারে না।
ছিঃ ছিঃ ছিঃ! এই কথা বললেন আপনি—রুনুর চোখে জল এসে গেল।
—এই দ্যাখ, অমনি পোলার চক্ষে জল আইল। কিন্তু দুইডা টিউশনিতে কুড়ি টাকা কিরে? রেট কমাইবি না। পনেরো টাকার কম নয়। এবছর নাহয় এ-বেলা ও-বেলা দুইডা করলা, সামনের বছর ফাইন্যাল ইয়ার, একটা করতে পারলেই যথেষ্ট।
—আমি বরাবরই দুটো করতে পারব, আপনি যদি জোগাড় করে দিতে পারেন। রায় বাড়িতে তো দুবেলাই পড়াতে হতো দু-তিন জনকে।
—সে দেখা যাইবে। এই দোকানাদারি কইর্যা অনেক বড় লোকের লগেই তো একটু আলাপ-সালাপ আছে। আচ্ছা তুই ম্যাট্রিক ক্লাসের ছাত্র পড়াইতে পারবি?
পারব বলেই তো মনে হয়।—আত্মপ্রত্যয়ের সুরে বলে রুনু।
তাইলে কালই খবর লমু। তারা বড়লোক। শিক্ষিত পরিবার। বিদ্যার কদর বোঝে। পাশ করাইয়া দিবার চুক্তি পড়াইলে এই কয় মাসেই অন্তত তিন চারশো টাকা পাইয়া যাইবি। পারবি?
—মাত্র তো ছ'মাস সময় আছে। ছ'মাসেই তিন চারশো টাকা বলেন কি?
—চুক্তির রেট ওই রকমই হয়। দায়িত্ব আছে তো। তুই ভাইব্যা দ্যাখ।
—ছাত্রকে একটু পরীক্ষা না করে বলতে পারছি না হারানদা। তবে আমার ছাত্র এ পর্যন্ত কেউ ফেল করেনি। ক্লাস ফাইভ থেকেই তো পরের বাড়ি ছাত্র পড়িয়ে নিজের পড়াশুনো চালিয়ে এলাম। সেই বিশ্বাসেই মনে হয়, একেও পাশ করাতে পারব।
—মনের এই জোরডা ছাড়বি না। জানস তো ঈশ্বর সাহসীর সহায়।
মনে মনে ঈশ্বরকে স্মরণ করতে করতে, আর নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখতে দেখতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়েছিল রুনু।
প্রথমেই সেই বড়লোকের পুত্রের খবর নিল হারানদা।
ভদ্রলোক পেশায় উকিল। বরিশালে মস্ত পসার। দুটি ছেলে তাঁর। বড়টি বি.এস-সি পাশ করে এঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে। ছোটটিকে ভবিষ্যতে উকিল বানাতে চান। সেটি গত বছর ফেল করেছে অঙ্কে আর সংস্কৃতে। কলেজে উঠলে ও দুটো বিষয়কে ছেড়েও আই.এ., বি.এ. পাশ করা যাবে। কিন্তু ম্যাট্রিকের বেড়াটা ডিঙোতে ও দুটোতেও পাশ করা চাই। তিনি তাই পাশ করিয়ে দেবার চুক্তিতে টিউটর খুঁজছিলেন। ভালো টাকা দেবেন। কথায় কথায় একদিন বলেছিলেন হারানকে।
ওদের বাড়িতে তিন-চারখানা সাইকেল। উকিলবাবুর এবং তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্রের দুখানা সাইকেলই খুব দামি। সবগুলি সাইকেল রিপেয়ার হয় হারানের দোকানে। বরিশালের এমনি বেশ কয়েকটি পরিবার ওর বাঁধা খদ্দের হয়ে গেছে। সাইকেল রিপেয়ারিং-এর সূত্রেই উকিলবাবুর সঙ্গে হারানের আলাপ। তিনি ওর সততা ও কর্তব্যনিষ্ঠার খুব প্রশংসা করেন। স্নেহও করেন। মস্ত বড়লোকের ছেলে হয়েও নিজে সাবলম্বী হবার জন্যে এই বয়সেই যে এত পরিশ্রম করছে হারান—এইটিই তাঁকে আকৃষ্ট করেছে হারানের প্রতি।
খবর নিয়ে জানা গেল চুক্তিবদ্ধ টিউটর উনি এখনও পাননি। দায়িত্ব কেউ নিতে চান না সহজে। এখন যিনি পড়াচ্ছেন তিনি একজন স্কুলের শিক্ষক। মাসে পঁচিশ টাকা করে নিচ্ছেন।
হারানের সঙ্গে উকিলবাবুর দেখা হতেই রুনুর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে হারান বলল,—যাকে বলে সত্যিকারের ভালো ছাত্র। ক্লাস ফাইভ থিকাই পরের বাড়ির ছাত্র পড়াইয়া মানুষ। অখন বি. এ. থার্ড ইয়ার। আপনার পোলার লগে একটু আলাপ কইরা ও কইতে পারবে পাশ করানোর দায়িত্ব ও নিতে পারবে কিনা। যদি কন তো বিকালে অরে লইয়া আমু।
—খুব ভালো কথা। তাই এনো।
সেদিন বিকেলেই রুনুকে সঙ্গে নিয়ে উকিলবাবুর বাড়িতে হাজির হল হারান।
এই ছেলেটির কথা কইছিলা?—উকিলবাবু যেন বিস্মিতঃ এ যে একেবারে বাচ্চা।
—বাচ্চা হইলেও ও একখান জুয়েল। বিকাশের লগে ও একটু কথা কইতে চায়।
কিন্তু ওকে দিয়া হইবে না বাপু। ও তো প্রায় বিকুর সমবয়সি। সে ওকে মানবেই না।—এক কথায় সব নাকচ করে দেন উকিলবাবু।
রুনুর ভিতরের জেদি সত্ত্বাটা ভীষণভাবে আহত হল। অপমানিত বোধ করল সে। শান্ত গাম্ভীর্যের সঙ্গে রুনু বলে,—আমি তার সঙ্গে একটু একা কথা বলতে চাই। কারও সামনে নয়। মাত্র পাঁচ-সাত মিনিট। দয়া করে এইটুকু সুযোগ যদি—
রুনুর দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকালেন উকিলবাবু। দেখলেন ওর আপাদমস্তক। তারপর তিনিও গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,—আচ্ছা কথা বলো।
ইতিমধ্যে খেলতে যাবার সাজ করে বেরিয়ে যাচ্ছিল বিকাশ। উকিলবাবু ডাকলেন তাকে,—ওরে, শোন! শোন বিকু। এই ছেলেটি তোর লগে একটু কথা কইতে চায়। ওকে তোর পড়ার ঘরে লইয়া যা।
বিকাশ রুনুর দিকে তাকিয়ে বলে,—অরে তো আমি চিনি না। আমার লগে অর কি কথা?
এ আমার বন্ধু। বি.এ. পড়ছে। খুব ভালো ছাত্র। গতবার আই.এস.সি-তে কলেজে সেকেন্ড স্ট্যান্ড করছিল। তোমার লগে একটু প্রাইভেট কথা কইতে চায়। শোনোই না, কি বলে।—তাড়াতাড়ি বলে হারান।
ওঃ! আপনার বন্ধু?—বিকাশ ভ্রু কুঁচকে রুনুর দিকে ফেরেঃ তা আমাকে আপনি চিনলেন কী করে?
তোমাকে চিনব বলেই তো এসেছি।—হেসে বলে রুনুঃ হারানদার কাছে শুনেছি তোমার কথা। চলো ভাই তোমার পড়ার ঘরটাতে। মাত্র কয়েক মিনিট।
আচ্ছা চলুন! আমার কিন্তু বেশি সময় নাই।—বিরক্তভাবে চলতে চলতে বলে বিকাশ। পিছনে পিছনে রুনুও এগোয়।
বেশ বড় ঘর। কিন্তু বড্ড আগোছাল। বই খাতা পত্র টেবিলের উপর এলোমেলো ভাবে ছড়ানো।
বিকাশ অপ্রস্তুভাবে একখানা চেয়ার দেখিয়ে বলে,—বসুন, কি কইবেন, কন।
রুনু চেয়ারে বসেই টেবলের বইখাতা গুছোতে গুছোতে বলে,—আমার পড়ার টেবলটা কিন্তু আমি সব সময় গুছিয়ে রাখি। আহা, তুমি দাঁড়িয়ে কেন? বোসো না, বোসো।
বিকাশ অস্থিরভাবে বসল পাশের চেয়ারটায়। এই সামান্য সময়ের মধ্যেই টেবিলটা রুনুর নিপুণ হাতের স্পর্শে একটা সুন্দর চেহারা নিয়েছে। রুনুর দেখা হয়ে গেছে বিকাশের বইগুলি। দেখেছে ওর হাতের লেখা ইংরেজি বাংলা দুরকমই।
বিকাশ হাঁ করে তাকিয়ে আছে দেখে রুনু হেসে বলে,—দ্যাখো, কী সুন্দর হয়ে গেল তোমার টেবিলটা। আমার নাম রঞ্জিত কুমার। আমার ছাত্ররা আমাকে রঞ্জিতদা বলে ডাকে। অবশ্য আমার সঙ্গে তাদের সম্পর্কটা কিন্তু ছাত্রের না। তারা সবাই আমার বন্ধু। তুমিও যদি আমার বন্ধু হতে রাজি থাকো, আমাকে রঞ্জিতদা বলে ডাকতে রাজি থাকো, তাহলে আমিও একটা ব্যাপারে রাজি হতে পারি।
—কী ব্যাপার?
—আসছে টেস্ট পরীক্ষায় তুমি যাতে অঙ্কে আর সংস্কৃতে অন্তত ফিফটি পারসেন্ট নম্বর পেতে পারো, সে দায়িত্ব আমি নিতে পারি।
ফিপটি পারসেন্ট!—বিকাশের চোখ ছানাবড়া।
সিওর!—অদ্ভুত একটা জোর দিয়ে বলে রুনু।
রুনু প্রায় ওর সমবয়সি হলেও ওই 'সিওর' শব্দটার মধ্যেই যেন ছিল এটা মন্ত্রের শক্তি। হঠাৎ বিকাশ একটা প্রণাম করে বসল রুনুকে।
রুনু তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল,—তুমি পারবে বিকাশ, নিশ্চয় পারবে। নিজের উপর বিশ্বাস রাখো।
কয়েক মিনিট পরেই প্রসন্ন মুখে বেরিয়ে এল রুনু আগে। তার পিছনে বিকাশ। এ-ঘরে এসে বিকাশের কাঁধে বন্ধুর মতো হাত চাপড়ে বলে,—যাও ভাই, এবার খেলতে যাও।
বিকাশ চলে যাবার পর রুনু উকিলবাবুকে প্রণাম করে বলে,—আমি বিকাশকে পাশ করিয়ে দেবার দায়িত্ব নিলাম কাকাবাবু। আপনি আশীর্বাদ করুন।
—তা বেশ। কনট্রাক্টটা কিন্তু লেখাপড়া কইরাই করতে হইবে। আমি উকিল মানুষ। কেবল মুখের কথায়...। রেজাল্ট বেরুবার আগে কিন্তু কিছুই পাবে না। পাশ করলে কত দিতে হইবে কও। কবে থেকে পড়াইতে আইবা কও।
—আপনি যেদিন থেকে আসতে বলবেন। আর টাকা পয়সার ব্যাপারে আমার কিছুই বলবার নেই। ওটা সম্পূর্ণ আপনার ব্যাপার।
হারানদা একবার কটমট করে তাকাল রুনুর দিকে। রুনু শান্ত অচঞ্চল।
উকিলবাবুও একবার তাকালেন রুনুর চোখের দিকে। তারপর টেবিল থেকে একখানা কাগজ টেনে নিয়ে খস খস করে লিখে ফেললেন একখানা চুক্তিপত্র। রুনুর হাতে দিয়ে বললেন, পইড়া দেখো। দুকপি করতে হইবে। একটা তোমার একটা আমার। রুনু একবারও সেদিকে তাকাল না। শান্তভাবে বলল,—আমাকে কোথায় সই করতে হবে বলুন। ওটা আমার কাছে থাক। আমার কপি লাগবে না।
—একটা কপি নিবা না?
—না! আমার দায়িত্ব আমি পালন করব আমার কর্তব্যবোধে।
উকিলবাবু সপ্রশংস চোখে তাকালেন রুনুর দিকে। তারপর বললেন,—থ্যাঙ্ক ইউ। তাহলে সামনের মাসের পয়লা থিকাই আইবা। এ মাসের তো আর তিন দিন আছে। কখন আইবা? সকালে না বিকালে?
—আপনি যখন বলবেন।
—সকালেই ভালো! ওটা বড় খেলা-পাগল। বিকালে খেলার মাঠ থিকা কবে কখন ফিরবে তার কোনও ঠিক ঠিকানা নাই।
আমার তো মনে হয়, তাহলে বিকালেই ভালো।—হেসে বলে রুনু।
—বিকেলে যাতে খেলার মাঠ থেকে যথা সময়ে ফেরে সে অভ্যাসটাও হয়ে যাবে আস্তে আস্তে।
—দায়িত্ব যখন তোমার, তখন তোমার মতই বহাল রইল। সন্ধ্যা ছ'টায় আইবা। ব্যস, এই তো কথা হইয়া গেল।
উকিলবাবুর বাড়ি থেকে ফিরবার পথে হারানদা জিজ্ঞাসা করে,—টাকার ফিগারটা দেইখ্যা লইছ?
—না তো।
—তুমি একটা ভ্যাবলাকান্ত। একে তো, রেজাল্ট বার হইবার আগে হাত উবুর করবে না। তারপর যদি মাত্র শ'খানেক টাকা ঠেকাইয়া দেয়? উকিল্যা বুদ্ধি জাননা তো।
এটা আমার টিউশনি নয় হারানদা। এটা একটা লটারির টিকিট কেনার মতো। তারপর আমার ভাগ্য। শ-খানেক টাকা হলেই বা কম কি। আমার পরীক্ষার ফি-টা হয়ে যাবে।—নিরাসক্ত গলায় বলে রুনু।
এতবড় ঝুঁকি লইলা, অথচ টাকার ফিগারটা...তুমি সত্যই বড় বোকা রনো।—বিমর্ষ কণ্ঠে বলে হারানদা।
দুদিনের মধ্যেই আর একটা টিউশনি জোগাড় করে দিল হারানদা। এটি একটি অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী। একজন বস্ত্র ব্যবসায়ীর কন্যা। এই ভদ্রলোকের পুত্র ছিল হারানের সহপাঠী। এখন বাপের দোকানে বসে। তার মাধ্যমেই খবর পেয়েছিল হারানদা। এটি গতবার ফেল করেছে অঙ্কে। একেও পাশ করিয়ে দেবার প্রতিশ্রুতিতে মাসে পনেরো টাকা রেট ঠিক করে দিল হারানদা অনেক কথা খরচ করে। একেও পড়াচ্ছিল একজন টিউটর দশ টাকায়। ছাত্র টিউটরের রেট পনেরো টাকাই ছিল সর্বোচ্চ। আর কলেজের ছাত্রর জন্য যদি কোনও প্রফেসর পড়াতে সম্মত হন, সেক্ষেত্রে ৫০/৬০ টাকা পর্যন্তও উঠতে পারে কোনও কোনও ক্ষেত্রে। তবে সেসব হল উঁচু মহলের ব্যাপার।
পয়লা তারিখ থেকেই শুরু হল দুটো টিউশনি। সকালে ছাত্রী, বিকেলে ছাত্র।
এরপর হারানদার কাজ হল রুনুর সেই সাইকেলটা উদ্ধার করা। সে কর্মটিও সে অনায়াসে সাধন করে ফেলল। রুনুর কাছ থেকে সাইকেলের বর্ণনাটা নিয়ে দবিরুদ্দিনকে পাঠিয়েছিল রায় বাড়িতে খোঁজ নিতে। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, রায় বাড়ির গ্যারেজের দেওয়ালে সেটি হ্যালান দিয়ে দাঁড় করানো আছে। পেছনের চাকাটা বেঁকে চুরে গেছে। সেটি আনতে হলে পেছনের চাকাটা উঁচু করে কেবল সামনের চাকার সাহায্যে গড়িয়ে আনতে হবে।
হারান রুনুকে দিয়ে একটা চিঠি লেখাল খগেনদার নামে। ঠিকানা দিল কলেজ বোর্ডিং-এর। পত্রবাহক মারফৎ যেন ওর সাইকেলটা দয়া করে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এবং তাকে শিখিয়ে দেওয়া হল, ও-বাড়ির কেউ জিজ্ঞাসা করলে বলবে ও বোর্ডিং-এর ভৃত্য। এমন সময় তাকে পাঠানো হল, যখন খগেনদা ও-বাড়িতে অনুপস্থিত থাকে।
সাইকেলটা ঠেলতে ঠেলতে হারানের দোকানে নিয়ে এল দবিরুদ্দিন। একদিনের মধ্যেই সে নিজেই ওটাকে রিপেয়ার করে খাড়া করে তুলল। কিন্তু এ সাইকেলে রুনু আর চড়বে না বলে প্রতিজ্ঞা করেছে। কোনও যুক্তিতেই সে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করানো গেল না। হারান শেষ পর্যন্ত তার নতুন সাইকেলটাই ব্যবহার করতে দিল রুনুকে।
হারানের সাইকেলের ব্যবহার সামান্যই। কেবল দিনে একবার বাড়ি যাওয়া-আসা, আর মাঝেমধ্যে ব্যবসার প্রয়োজনে এদিক-ওদিক যাওয়া, সেটুকু রুনুর সাইকেলেই চলে যাবে। কিন্তু রুনুর এখন সাইকেলের ব্যবহার আরও বেড়ে যাচ্ছে। কেবল কলেজে যাওয়া-আসা নয়, দুবেলা দুটিকে দুটো টিউশনি। তাছাড়া কলেজের দূরত্বও আগের থেকে কমপক্ষে মাইলখানেক আরো বেড়ে গেল।
নতুন জীবন গ্রহণ করতে প্রায় সপ্তাহ খানেক কলেজ কামাই হল রুনুর। কলেজ যাতায়াত শুরু হল হারানদার ঝকঝকে নতুন সাইকেলটা হাতে আসতেই।
দুপুরবেলায় ও যখন কলেজে থাকে, তখন হারান ওর ঘরখানা ঘণ্টা-দুই ব্যবহার করে। বাকি সময়টা ওই ঘরখানা সম্পূর্ণ রুনুর দখলে। সুন্দর করে সাজিয়ে নিয়েছে টেবিল, বইয়ের আলমারি, তাক ইত্যাদি দিয়ে। সস্তা কাঠের একটা ছোট আলমারি দোকানের একধারে প্রায় অব্যবহার্য পড়েছিল। তার মধ্যে সামান্য যা জিনিসপত্র ছিল, সে সব দোকানের অন্যান্য তাকে সাজিয়ে রেখে আলমারিটা খালি করে দিয়েছিল হারানদা।
রবিবার অথবা ছুটি ছাটার দিনে ওরা প্রাণখুলে কথাবার্তা বলে হারানদার দুপুরের বিশ্রামের সময়। অন্যান্যদিন হারানদা পারতপক্ষে রুনুর ঘরে আসেই না। ভিতরের আলমারিতে যে সব মূল্যবান পার্টস রয়েছে তার কোনও একটা আবশ্যক হলে ও আসে অত্যন্ত সন্তর্পনে এবং যথাসম্ভব নিঃশব্দেন কাজ সেরে চলে যায়!
বাইরের ঘরে সকাল আটটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত সারাদিন টুকটাক ঠুং-ঠাং চলছেই। প্রথম প্রথম ওই শব্দগুলি এবং রাস্তার জনকোলাহল গাড়ি ঘোড়ার শব্দ ইত্যাদি ওর কানে আসত। তাতে পড়াশুনোর বিঘ্নও হতো। দু-তিন দিনেই সেটা সয়ে গেছে। এখন পড়ার সময় ওসব কানেও ঢোকে না।
হোটেলের সঙ্গে মাসকাবারী ব্যবস্থা হয়েছে, মাসে সাত টাকা! দুবেলা ভরপেট খাবার। মাছ, ডাল, তরকারি, ভাজা, ইত্যাদি আর সপ্তাহে একদিন মাংস। দুবেলা জলখাবারের দোকানও ঠিক করে দিয়েছে হারানদা। মাসে তিন টাকা। দুটোই হাতের কাছে—হোটেল আর খাবারের দোকান। ভোরে হাত-মুখ ধুয়েই রুনু চলে যায় তার জলখাবারের দোকানে! একটা উড়িয়ার দোকান। এখানে সকালে দই, ঘোল, গুড়মাখা খই মুড়ি আর খেজুরে গুড় ছাড়া অন্য খাবার নেই। এক আনাতেই এক বাটি মুড়কি-সহ এক গ্লাস ঘোল। বিকেলে ঘোলের পরিবর্তে এক কাপ গরম দুধ। দিনে দু-আনা! মাসকাবারীতে কনসেশন রেট তিনটাকা। তা এক আনার খাবারেই তৃপ্তির সঙ্গে জলখাবার হয়ে যায় রুনুর।
ওর খাওয়া-দাওয়ার খরচ বলতে মাসে এই দশটাকা। একটা মানুষের দিনে চারবার খাওয়া যে মাত্র দশটাকায় হয়ে যায়, এ ধারণাই ছিল না রুনুর।
কলেজে ও হাফ ফ্রি। সেখানে দিতে হয় মাসে পাঁচটাকা। সে পাঁচটাকা তো দাদা প্রতিমাসে কলেজের ঠিকানাতেই মানি-অর্ডার করে পাঠায়।
বাকি রইল খাতা পেনসিল দু-একদুখানা বইটই কেনা বাবদ সামান্য কিছু বাড়তি টাকা। রুনু হিসেব করে দেখল পেনেরো টাকার টিউশনিতেই স্বাচ্ছন্দ্যে সব খরচ মিটে যাবে।
প্রথম মাসটা হারানদার সাহায্য নিতেই হল। হোটেল আর খাবারের দোকানের দশটাকা হারানদাই দিয়ে দিল পূর্ব প্রতিশ্রুতি মতো। ওর টিউশনির ১৫ টাকা থেকে মাত্র ২/৩ টাকা খরচ হল টুকিটাকি এটা-ওটা কিনতে।
দ্বিতীয় মাসে টিউশনির টাকাটা হাতে পেতেই ও হারানদাকে জড়িয়ে ধরে বলে,—হারানদা, এ টাকা আমার নয়, তোমার। আমি তোমার আশ্রিত, তোমার ছোট ভাই। ব্যস, আমার আর কিছু চাই না। কিন্তু এর পরেও তুমি যদি আলাদা করে আমাকে টাকা দাও, আমি কিন্তু এখানে থাকবই না বলে দিচ্ছি।
বোঝলাম।—হেসে বলে হারানদাঃ ভাইডি আমার উপার্জনক্ষম হইছে। অখন আর দাদার সাহায্য চাই না। তাই তো?
তোমার সাহায্য না পেলে আমি যে এবার কোথায় ভেসে যেতাম। আমি ভাবব তুমিই আমাকে খেতে পরতে দিচ্ছ। আমাকে পড়াচ্ছ। সত্যি বলছি, এবার তুমিই আমাকে পড়াচ্ছ। মাসে মাসে এ টাকাটা আমি তোমার হাতেই দেব। হোটেল-ফোটেলে যা দেবার তুমি দিও! আমি কেবল খেয়ে যাব আর পড়ব। পড়ব তোমার মান রাখতেই।
ঠিক আছে, তর যখন তাই ইচ্ছা, তাই দিস। যখন যা দরকার চাইয়া লবি কিন্তু। লজ্জা করিস না।—দরদভরা গলায় বলে হারানদা।
এমনি করেই চলতে থাকল রুনুর পড়া আর টিউশনি।
হাফ ইয়ালি পরীক্ষা ভালোই হয়েছে ওর। পুজোর ছুটিতে এবার বাড়ি যাবার কথা মনেই এল না। দায়িত্বপূর্ণ দুটো টিউশনি হাতে। বাবাকে লিখে জানাল, ছুটিতে এবার বাড়ি যাবে না! জানাল না ওর নতুন জীবনের কথা। তিনি ভাবুন, রুনু এখনও রায় বাড়িতে আছে। যা জানবার ও পরে বাড়ি গিয়ে জানাবে। বাড়ির চিঠি তো বারবারই আসে কলেজের ঠিকানায়। কাউনিয়ার বাড়ির ঠিকানা বাবা জানলেও সে ঠিকানায় চিঠি লেখেন না। চিঠি তিনি বরাবরই লেখেন পোস্টকার্ডে। তাতে মাঝে মাঝে এমন কিছু পারিবারিক সংবাদ থাকে যা তিনি ও-বাড়িতে জানাতে চান না। তাই এ সাবধানতা।
কলেজে নিয়মিত যেতে শুরু করতেই একদিনের ভুলে যাওয়া দুর্ভাবনাটা আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। হাসির খবরটা না জানা পর্যন্ত স্বস্তি পাচ্ছে না রুনু। রাঙাবউদি অবশ্য কথা দিয়ে গেছেন, হাসির খবর ভালো হলে ওকেই প্রথম চিঠি লিখবেন কলেজের ঠিকানায়। সে কথা কি মনে থাকবে তাঁর?
খবর যদি ভালো না হয়? তাহলে কি কোনওদিনও কিছু জানতে পারবে না রুনু? ও মনে মনে স্থির করল এক মাসের মধ্যে রাঙাবউদির কোনও চিঠি না পেলে ও নিজেই যাবে খগেনদার কারখানায় হাসির খবর নিতে। খগেনদা কথা বলবে না ওর সঙ্গে? অপমানও করতে পারে? তা করুক না। হাসির সুখবর পেলে সব অপমান সইবে ও হাসিমুখে।
ও বাড়িতে নিশ্চয় এতদিনে একটা খবর এসেছে। এক্সরে হয়েছে কিনা, কোন হাসপাতালে ভরতি হল হাসি—এসব খবর নিশ্চয় এসেছে। কাজের মানুষ ছোট রায় কর্তা হয়তো এতদিনে ফিরেও এসেছেন। হয়তো রাঙাবউদি আর বড় রায় কর্তা কলকাতাতেই থাকবেন যতদিন হাসির চিকিৎসা চলবে। সে কতদিন? দু-এক মাস? ছ-মাস? এক বছর? ও-বাড়িতে গেলে হয়তো এখনই একটা খবর পাওয়া যেত। কিন্তু সে-বাড়ি ও যাবে কোন মুখে? কেউ কি ওর সঙ্গে কথা কইবে? উৎকণ্ঠা, আশঙ্কায় অস্থির হয়ে ওঠে রুনু।
এই ভাবনাটা ওকে পীড়া দেয় কেবল কলেজে যাতায়াতের পথে। বিশেষ করে কাউনিয়া রোড এসে যেখানে কলেজ রোডের সঙ্গে মিশেছে, সেই তেমাথাটায় আসামাত্র ওর চোখ চলে যায় কাউনিয়া রোডের দিকে। ওর মন চলে যায় রায়বাড়ির সেই জানালাটায়, যে জানালায় রাঙাবউদি হাসিমুখে দাঁড়িয়ে থাকতেন ওর কলেজ থেকে ফিরবার সময়। সেই ছবিখানা এ জীবনে আর দেখা যাবে না। অজান্তে একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ে রুনুর।
ওর পড়ার ঘরটিতে এলেই কিন্তু স্মৃতির জগৎ থেকে ও চলে আসে বাস্তব জগতে। ওখানে ওর সময়টুকু একেবারে ঘড়ির কাঁটায় বাঁধা। সকাল ছ'টার মধ্যেই ওর প্রাতঃকৃত্য ও জলযোগ শেষ। আটটা পর্যন্ত নিজের পড়া। তারপর সাইকেল নিয়ে পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে পড়া টিউশনিতে।
সাড়ে ন'টায় ও যখন টিউশনি থেকে ফেরে, তখন হারানদার দোকানে পুরোদমে কাজ চলছে। ও পিছন দিক দিয়ে ওর ঘরে ঢুকে স্নান সেরে নেয় চটপট। তারপর খেতে যায় হোটেলে। খেয়ে এসে কয়েক মিনিটের মধ্যেই বেরিয়ে পড়ে কলেজের পথে। কলেজ থেকে ফিরে একটু বিশ্রাম, হাতমুখ ধোয়া, জলযোগ সারা এবং তারপর বেরিয়ে পড়া সান্ধ্যা-টিউশনির উদ্দেশ্যে। সেখান থেকে রাত ৮টায় ফিরে বিছানায় একটু গড়িয়ে নেয়। রাত ন'টার মধ্যে নৈশাহার শেষ। এরপর বাকি রাতটুকু ওর নিজস্ব। এগারোটা, বারোটা, একটা —যেদিন যেমন মেজাজ থাকে।
রবিবারের বিকেলগুলো ও ব্যয় করে হারানদার কাজে। সেদিন ও হারানদার দোকানের হিসেব লেখা ও ব্যবসা সংক্রান্ত কিছু চিঠিপত্র লেখার ব্যাপারে সাহায্য করে। কোনও-কোনওদিন হারান ওকে নিয়ে যায় কোনও সিনেমার ইভনিং শো-তে। এই ব্যাপারে হারান ওর অভিভাবক। ভালো ধর্মীয় পালা অথবা শিক্ষামূলক বই ছাড়া আজেবাজে ছবিতে ওকে নেয় না। তার নিজের অবশ্য প্রতি রবিবারে সিনেমা একেবারে বাঁধা।
এই ছকে বাঁধা রুটিনের মধ্যে পড়াশুনো করেও রুনু আশ্চর্য স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছে। 'অসংখ্য বন্ধন মাঝে মুক্তি' যে কী জিনিস এতদিনে খানিকটা যেন বুঝতে পেরেছে রুনু।
বিকাশের ঠিক ছ'টায় পড়ার টেবিলে হাজির করতে প্রায় দু-সপ্তাহ সময় লেগেছিল। রুনু হাজির হতো সচেতনভাবেই ছ'টার কয়েক মিনিট আগে। ছাত্রের হাজির হতে সড়ে ছ'টা-সাতটা হয়ে যেত।
এমনি একদিন প্রায় সাতটার সময় রুনুকে একাকী বিকাশের পড়ার ঘরে বসে থাকতে দেখে উকিলবাবু বললেন,—একী! বিকু এখনও পড়তে আসেনি? আচ্ছা রাখ আজই অরে আচ্ছামতো ধমকাইয়া দিমু।
দয়া করে এ ব্যাপারে আপনারা কেউ ওকে কিছু বলবেন না। যা বলবার আমি বলব। যথাসময়ে বলব! আমি নিজেই যখন দায়িত্ব নিয়েছি;—শান্ত ভাবে বলেছিল রুনু।
—কিন্তু নিত্যই যদি এমনি দেরি করে, তো তুমি পড়াইবা কতক্ষণ?
আমার পড়াবার সময় তাকে কমবে না। দৃঢ় স্বরে বলেছিল রুনু।
আচ্ছা, ঠিক আছে। কমুনা আমরা কিছু। দেখা যাউক টেস্টে কী করে।—বিরক্তভাবে বলেছেন উকিলবাবু।
—টেস্ট পর্যন্ত আমিও নিজেকে টেস্ট করতে চাইছি। তারপর আমিই বলব আপনাকে স্টেপ নিতে।
প্রথম সপ্তাহে বিকাশের দেরিতে পড়তে আসা সম্বন্ধে একটি কথাও বলেনি রুনু। দ্বিতীয় সপ্তাহের প্রথম দিনে বিকাশকে ঘরে ঢুকতে দেখেই মৃদু হেসে বলে,—আজ কিছু তোমার মাত্র পাঁচ মিনিট লেট হয়েছে। অনেক এগিয়েছ। আচ্ছা, আমি কখন পড়াতে আসি তুমি কি সে টাইমটা জানো?
—ছ'টা দশ পনেরো হবে হয় তো।
—না। বরং ছ'টার দু-চার মিনিট আগেই আসি। তোমার হাতে ঘড়ি আছে, আমার হাতে নেই। আমি যদি অন্যের ঘড়ির সাহায্যে পাংচুয়াল হতে পারি, তুমি নিজের ঘড়ি থাকতে পারবে না কেন ভাই?
বিকাশ যেন একটু লজ্জা পেল। ম্লান হেসে বলল,—আপনি তো ভালো ছাত্র। আপনার কথা আলাদা।
—তুমি মন্দ ছাত্র কে বলল? আমি তো এই কদিনেই বুঝেছি, তোমার ব্রেইন আমার ব্রেইনের চাইতে একটুও দুর্বল নয়।
দূর! তাহলে আর ফেল করতাম না।
—তুমি কিন্তু ব্রেইনের দোষে ফেল করনি। ফেল করেছ সময়ের মূল্য দাওনি বলে। সময় বড় নিষ্ঠুর, তাকে যে অবজ্ঞা করবে, শাস্তি সে পাবেই। সময়ই তাকে শাস্তি দেবে। আমি সময় অপচয় করি না। তাই ফেল করি না। অন্তত তোমার যে ক'ঘণ্টা পড়বার সময় আছে, আমি তার থেকে প্রায় চার ঘণ্টা সময় কম পাই।
—কেন?
—সে চারঘণ্টা যায় আমার টিউশনিতে। তবু যে সময়টুকু আমি পাই তার অপচয় করি না। তুমিও কোরো না ভাই। দেখবে আমার থেকে তোমার রেজাল্ট একটুও খারাপ হবে না। তুমি হয়তো খেয়াল করোনি, এ-কদিন তুমি যে ক'মিনিট দেরিতে এসেছ, সে ক'মিনিট আমার সময় থেকে অপচয় হয়েছে। তুমি ঠিক ছ'টায় এলে আমি ঠিক আটটায় উঠতে পারতাম। এই ক-দিন তা সম্ভব হয়নি। এখন থেকে এই সাহায্যটুকু আমায় কোরো ভাই। আমাকেও তো পরীক্ষা দিতে হবে এবং ভালো রেজাল্ট করতে হবে। তা না হলে যে আমার আর পড়াই হবে না।
—অমন করে আর বলবেন না রঞ্জিতদা। আমি ভীষণ লজ্জা পাচ্ছি। এ-ক'দিন যে আপনি আমার জন্যে আপনার সময়...
—তোমার ঘড়ি দেখেই সময় হিসেব করেছি আমি প্রতিদিন। আশা করব, তোমার ঘড়ি তোমাকেও সময় হিসেব করতে সাহায্য করবে। এখন থেকে তুমি পাংচুয়ালা হবে।
আমি চেষ্টা করব। নিশ্চয় চেষ্টা করব।—মাথা নীচু করে বলে বিকাশ।
চেষ্টা যে করেছিল বিকাশ তার প্রমাণ পাওয়া গেল ঠিক পরের দিনই। একেবারে ওর ঘড়িতে কাঁটায় কাঁটায় ছ'টায় পড়ার ঘরে ঢুকে রুনুকে দেখেই ভারী অপ্রস্তুত হেসে বলে,—বাঃ, আপনি আগে এলে চলবে কেন? এই দেখুন ঠিক ছ'টা।
তোমার কাছে আমি হারতে রাজি নই।—হেসে বলে রুনু।
—কাল দেখবেন আপনাকে হারাব।
—যোগ্য শিষ্য অর্জুনের কাছে হেরে আচার্য দ্রোণ লজ্জা পাননি। আমাকে হারাতে পারলে বুঝব তুমি আমার যোগ্য শিষ্য।
তারপর থেকে দেখা গেল গুরু সত্যই মাঝে মাঝে হেরে যাচ্ছে শিষ্যর কাছে। যেদিন রুনু এসে ওকে পড়ার ঘরে দেখতে পায় সেদিন মধুর একটু হাসাহাসি হয় যেন দুই প্রতিদ্বন্দ্বী বন্ধুর মধ্যে।
বিকাশ বলে,—আজ হেরে গেছেন।
রুনু বলে,—ঘড়ির কাছে নয় তোমার কাছে। আমি কিন্তু লেট হইনি। আমি পাংচুয়াল।
এমনি করে পাংচুয়ালিটি রক্ষার একটা মধুর প্রতিদ্বন্দ্বীতার মধ্যে দিয়ে ওদের বন্ধুত্ব হল নিবিড়। পড়াটা এখন আর বিরক্তিকর নয়, আনন্দদায়ক। সংস্কৃত আর নিরস মনে হয় না, অঙ্ক মনে হয় না ভয়ঙ্কর।
বিকাশের আত্মবিশাসটাই বাড়াতে চেয়েছিল রুনু। সে চেষ্টা ওর সফল হয়েছে। সেই আত্মবিশ্বাস নিয়েই টেস্ট পরীক্ষা দিল বিকাশ।
টেস্টের রেজাল্টে দেখা গেল অঙ্ক আর সংস্কৃত দুটোতেই বিকাশ পঞ্চাশ ছাড়িয়েছে, কিন্তু ফেল করেছে বাংলায়। সাত নম্বর সর্ট।
রেজাল্ট দেখে ছাত্রর চেয়ে মাস্টারই যেন মুষড়ে পড়ল বেশি।
—এ কী করলে বিকাশ? বাংলায় ফেল।
—বাংলায় তো বারবারই পাশ করতাম। এবার গ্রামার পোর্শানটা...গ্রামারে আমার দারুণ ভয়।
—বলো কী! ছাঁকা নম্বর তো গ্রামারেই। আগে বললে গ্রামার তো তোমাকে আমি মুখে মুখেই—জানো, ওটা আমার কাছে দারুণ ইন্টারেস্টিং।
—আপনার কাছে তো সবই ইন্টারেস্টিং। আপনি অল স্কোয়ার। আমি কিন্তু এবার স্যাটিসফায়েড। অঙ্কে ফিপটি আপ জীবনে পাইনি। সংস্কৃতর ভয়ও কেটেছে।
—কিন্তু ফল তো সেই ফেলই হল। আবার একটা বছর...। আমি যে কাকাবাবুকে কি করে মুখ দেখাব।
—বাবা একটু বললেই এলাউ করবে। এবার তো মাত্র বাংলায় সর্ট। গতবার ছিল তিন সাবজেক্টে সর্ট। তবু তো বাবা...
এবারও বাবার ঠেলায় এলাউ হইতে চাও? লজ্জা করে না?—বলতে বলতে ওদের পড়ার ঘরে প্রবেশ করলেন উকিলবাবু।
রুনুর মনে হল তিরস্কারটা তাকেই করলেন উকিলবাবু। লজ্জায়, অপমানে মাথা নত করে রইল। উকিলবাবু কাছে এসে ওর পিঠে হাত রেখে বললেন,—তুমি এই দুমাসে যা করছ রঞ্জিত, এতো প্রায় অসাধ্যসাধন। এবার তোমার উপর আমার ভরসা হইল। তুমি যদি কও তো অরে এবার ছাইড়্যা দিতে বলি। কী বলো?
—আমায় কিছু বলার নেই কাকাবাবু। আমি গর্ব করে বলেছিলাম টেস্ট পরীক্ষা পর্যন্ত আমি নিজেকেই টেস্ট করব। সে টেস্টে আমি ফেল করেছি।
—এই দুমাস আমিও তোমারে টেস্ট করছি রঞ্জিত। আমার টেস্টে তুমি ফুল মার্কস পাইছ। এই নাও তোমার দুমাসের বাবদ একশো টাকা।
বলতে বলতে বুক পকেট থেকে একখানা করকরে একশো টাকার নোট রুনুর কাঁপা হাতে ধরিয়ে দিলেন উকিলবাবু।
অভিভূত রুনু প্রণাম করল উকিলবাবুকে। ওর বুক ধড়ফড় করছে। একশো টাকার নোট ও জীবনে দেখেনি। এ স্বপ্ন নয় তো?
—এবারও তরে দিব এলাউ করিয়া বিকু। ফেল করলে জীবনের মতো পড়া শেষ। বুঝব পাশ করা তর ভাইগ্যে নাই।
এলাউ করিয়ে দেবার সামর্থ যে ছিল উকিলবাবুর তা ক'দিন বাদেই জেনেছিল রুনু। জেনেছিল বিকুর কাছেই। তিনি স্কুলের গভর্নিং বডির মেম্বার।
সেদিন রুনুর হাতে একখানা একশো টাকার নোট ধরিয়ে দিয়ে আর একটা কাজও করেছিলেন উকিলবাবু। পকেট থেকে সেই চুক্তিপত্রখানা বের করে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলেছিলেন রুনুর সামনেই।
—এটা দিয়ে আর তোমার সততার অপমান করব না। মাসে মাসেই টাকাটা পাবে তুমি।
এবারও দুচোখ ছলোছলো করে উঠেছিল রুনুর। সেটা আড়াল করতেই আর একবার প্রণাম করল উকিলবাবুকে।
তিনি ওর মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন,—সংসারে মন্দর সংখ্যা ক্রমেই এত বাইড়া যাচ্ছে যে, তার মধ্যে একটি দুটি ভালো থাকলে তাদেরও আমরা চিনতে প্রায়ই ভুল করি। আমি পেশায় উকিল। মন্দদের লইয়াই আমার কাজ কারবার। তাই গোড়ায় তোমার সঙ্গে যে ব্যবহার করেছি বাবা, সে কথা ভুইলা যাও। আশীর্বাদ করি, জীবনে তুমি অনেক বড় হও।
আনন্দে আবেগে অভিভূত রুনু আর একটা কথাও বলতে পারেনি সেদিন।
সমস্ত ঘটনাটা রুনুর মুখে শুনে হারানদা বলল,—এবার কিন্তু উকিল্যা বুদ্ধির আর এক প্যাঁচ পড়ল।
তার মানে?—ভয়ার্ত গলায় প্রশ্ন করে রুনু।
—তার মানে, এবার তোমার দায়িত্ব আরও বাড়িয়া গেল। অখন অরে পাশ করাইতেই হইবে, নাইলে এ টাকা তোমার হজম হইবে না। আগে যা ছিল, ফেল করত, টাকা নিতানা; ব্যস, চুইকা গ্যাল ল্যাঠা। তখন ছিল লটারি! অখন হইল কি? উকলের লোকসান হইবে না। ফেল করলে সে টাকা তুমি ফিরাইয়া দিবা, তা সে বোঝতে পারছে। সে তোমারে চেনছে। তখন তুমি কি এই টাকা খরচ করতে পারবা? ভারিক্কি চালে বলে হারানদা।
এত কথা মাথায়ই আসেনি রুনুর। উচ্ছ্বাসে আবেগে সে এতই অভিভূত ছিল এতক্ষণ যে এর বাস্তব দিকটা ভেবেই দেখেনি। এবার হারানের কথায় ওর চৈতন্য হল। আসবার পথে যে পরিকল্পনাটা ওর মাথায় এসেছিল, সেটা মুলতুবী রাখতে হল। ও ভেবেছিল এই টাকা থেকে পঞ্চাশ টাকা ও বাবা-মাকে প্রণামী স্বরূপ পাঠিয়ে দেবে—ওর প্রথম উপার্জনের টাকা! দাদাকে লিখে দেবে, এখন থেকে আর মাসে পাঁচ টাকা তার পাঠাতে হবে না। পরীক্ষার ফিঃ নিয়েও ভাবতে হবে না। ও এখন নিজের উপার্জনেই পড়ার খরচ চালাতে পারবে। এখন বুঝতে পারছে, এ টাকা ও খরচ করতে পারবে না শেষ না দেখে। কি জানি, বিকাশ যদি শেষ পরীক্ষায় আবার অন্য কোনও বিষয়ে ফেল করে? পরীক্ষাটাও তো একটা লটারি। মাঝে মাঝে ভালো ছাত্রও ফেল করে বসে।
ভাবনায় মুখ কালো হয়ে গেল রুনুর। ওর নিজেরও তো একটা পরীক্ষা আছে প্রায় একই সময়ে। থার্ড ইয়ার থেকে ফোর্থ ইয়ারে ওঠার পরীক্ষা। ছাত্রকে পাশ করাতে গিয়ে কি শেষে নিজেই ফেল করে বসবে?
—তাহলে কী করব হারানদা? টাকাটা ফেরত দিয়ে আসব? বলব সেই চুক্তি পত্রই বহাল থাকুক। টাকা আমি আগে নেব না।
—ব্যাটা উকিল তোমার থিকা ঢের বেশি চালাক। সে তোমারে কলে ফ্যালছে। টাকাডা তুমি আমার কাছে রাইখ্যা দাও। যেমন পড়াইতে আছিলা পড়াইয়া যাও। শ্যাষে যদি গোলমাল বাধায় যা করবার আমি করব। তোমার ভাবতে হইবে না। তোমায় নিজের পড়া কিন্তু নেগলেক্ট কইরো না। হেইডাই তোমার আসল। ওডা তো লটারির টাকা। পাইলে ভালো, না পাইলে আপসোস নাই।
আমাকে আপনি বাঁচালেন হারানদা।—রুনু যেন হাঁফ ছেড়ে উদ্ধার পেল একটা মস্ত দায় থেকে।
টাকাটা হারানদার হাতে দিয়ে বলে,—এই নিন, যা করবার করুন আপনি। একশো টাকার নোট তো জীবনে হাতে করিনি, সেই থেকে আমার বুক ধড়-ফড় করছে। আমার খরচ তো সকালের টিউশনিতেই প্রায় কুলিয়ে যাবে। আবার দাদার পাঁচ টাকা তো আছেই। কোনও অসুবিধা হবে না। বুঝতে পারছি সামনের ক'মাসও পঞ্চাশ টাকা করে দেবেন। সে টাকাও দেব আপনাকে। যা ভালো বোঝেন করবেন। ও নিয়ে ভাবতে বসলে, যা বলেছেন! আমার পড়ার বারোটা বাজবে।
আমার একটা কথাও মনে হইতে আছে—বিজ্ঞ চালে বলে হারানদাঃ মনে হয় চুক্তিতে ও পাঁচশো টাকা লিখছিল, অখন কায়দা করিয়া আড়াইশো টাকায় কাম হাসিল করনের মতলব। উকিল্যা বুদ্ধি তো। তখন যদি টাকার ফিগারটা আমিও দেইখ্যা লইতাম।
আপনি থামুন তো!—ধমকের সুরে বলে রুনুঃ আপনি ভীষণ সন্দেহবাজ মানুষ। আমার তো কাকাবাবুকে আজ খুবই ভালো মানুষ বলে মনে হল। আমার এই বিশ্বাসটাকে রাখতে দিন। ওসব উল্টোপাল্টা ভাবনা আপনি ছাড়ুন তো। আমি যেমন পড়াচ্ছিলাম পড়িয়ে যাব। টাকা চাইবও না, দিলেও ফিরিয়ে দেব না, ব্যস।
বিকাশের পরীক্ষা যেদিন শেষ হল, রুনুর যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল। মনে মনে শপথ করল চুক্তির টিউশনি আর এ জীবনে নয়।
পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনও প্রশ্নপত্র নিয়ে বিকাশের সঙ্গে কোনও আলোচনা করেনি রুনু। শেষ যেদিন হল সেদিন একটি একটি প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করে বুঝেছে, নিতান্ত ভাগ্য প্রতারণা না করলে ফেল করবার কথা নয়।
পড়ার ঘর থেকে বেরিয়ে আসবার সময় উকিলবাবু মৃদু হেসে প্রশ্ন করেন,—কেমনে বোঝলা? পাশ করবে তো?
এ প্রশ্নর উত্তর আজ দেব না কাকাবাবু। উত্তরের জন্য আমি অপেক্ষা করব।—হেসে বলে রুনুঃ বিকাশ কী বলে? ওকে জিজ্ঞাসা করেছেন?
—ও তো বলে, ফাস্ট ডিভিশনও পাইতে পারে। অর কথা আমি ধরি না, তাই তোমার মতামত জানতে চাইছিলাম। তা তুমি দেখছি আমার থিকাও সেয়ানা উকিল। হাঃ হাঃ হাঃ।
গতবার পরীক্ষার পরেও কি ওইরকম বলেছিল বিকাশ?—সহাস্যে প্রশ্ন করে রুনু।
—কি কইছিল তা আর আজ মনে নাই। তবে ফাস্ট ডিভিশনের স্বপ্ন যে দেখেনি, তা সত্যি।
স্বপ্ন দেখতে দোষ কি কাকাবাবু? আমিও তো কত স্বপ্ন দেখি। সে যাকগে। বিকাশের পরীক্ষা তো চুকল। এবার আশীর্বাদ করুন যেন নিজের পরীক্ষাটা দিতে পারি ভালোভাবে। আজ আসি।
—আচ্ছা এসো বাবা। আর একটা কথা।...
—বলুন।
—বিকু পাশ করলে ওরে আই.এ.-তে ভরতি করুম। তখনও তুমি ওর পড়াইবা তো?
পাশ তো করুক আগে।—হেসেই এগিয়ে যায় রুনু প্রশ্নের জবাবটা।
মার্চের মাঝামাঝি শেষ হয়েছিল বিকুর পরীক্ষা। মে'র শেষে শেষ হল রুনুর থার্ড ইয়ারের পরীক্ষাও।
জুনের শেষ দিকে জানা যাবে বিকাশের রেজাল্ট। নিজের রেজাল্ট নিয়ে দুর্ভাবনা নেই রুনুর। ফেল যে ও করবে না তা পরীক্ষা দিয়েই বুঝেছে। ফোর্থ ইয়ারে কিছু বই কিনতে হবে অনার্সের। এ বছরটা অনার্স পেপারগুলোর উপর তেমন খাটতে পারেনি। সামনের বছর প্রচুর খাটতে হবে। অনার্স ওকে পেতেই হবে। বই কিনবার টাকার অবশ্য অভাব নেই। কিন্তু সে টাকায় হাত দিতে এখনও ভরসা পাচ্ছে না।
সামনের বছর ও একটার বেশি টিউশনি করবে না স্থির করেই রেখেছে। বিকাশ পাশ করলে ওকে এড়ানো সম্ভব হবে না। সে ক্ষেত্রে ছাড়তে হবে সকালের ছাত্রীটিকে। যাক, ওসব ভাবা যাবে যথাসময়ে। এখন যেমন চলছে চলুক।
পরীক্ষার পরে বাড়ি যাবার একটা প্রবল বাসনা হয়েছিল। একবছর ও বাড়ি যায়নি। দাদা নিশ্চয় অভিমান করেছে! সেই যে একবছর আগে দাদার সাইকেলটা নিয়ে এসে তাকে খোঁড়া করে রেখে এসেছিল, তারপর আর একটা সাইকেল দাদা আজও পর্যন্ত কিনতে পারেনি! কী অসম্ভব কষ্ট করছে দাদা একটা বছর ধরে। দাদার এতবড় ত্যাগের কী মূল্য দিয়েছে রুনু? এবার অবশ্য ওর টাকা দিয়েই দাদাকে একখানা নতুন সাইকেল কিনে দিতে পারে। হারানদার দোকানেই তো রয়েছে অনেক নতুন সাইকেল। মোটামুটি ভালো সাইকেল নাকি দেড়শো টাকাতেই হয়ে যায়। বিকাশের রেজাল্ট না জানা পর্যন্ত ও টাকাতেই হয়ে যায়। বিকাশের রেজাল্ট না জানা পর্যন্ত ও টাকায় সে হাত দিতে পারছে না। ওর উৎকণ্ঠারও অবসান হচ্ছে না, ফলে বাড়ি যাওয়াও হচ্ছে না।
এমনি উৎকণ্ঠার মধ্যেই দিন কাটছিল রুনুর। জুনের মাঝামাঝি হঠাৎই একদিন বিকাশ এল হারানের দোকান ঘরে। এসেই চিৎকার,—কই, রঞ্জিতদা কই?
গলা শুনেই বাইরে এল রুনু। বিকাশের উচ্ছসিত হাসিমুখ দেখেই বুঝেছে খবর শুভ। রুনুকে দেখামাত্র প্রকাণ্ড এক প্রণাম!
—কী খবর? এত খুশি যে?
—মারকেল্লা! মার দিয়া কেল্লা! ফার্স্ট ডিভিশন!!...
—রেজাল্ট বেরিয়েছে?
—এখনও স্কুলে আসেনি। বাবা এইমাত্র আইলেন কইলকাতা থিকা! আপনারে অখনই লইয়া যাইতে কইছেন। উনি ইউনিভার্সিটি থিকা জাইন্যা আইছেন। অঙ্কে সিক্সটি পারসেন্ট, স্যাংসক্রিটে সেভেন্টি আপ! ভাবতে পারেন! আমি তো বিশ্বাসই করতে পারি না। আপনি সত্যই একখান কাণ্ড করলেন রঞ্জিতদা।
—আমি কি করলাম? তুমি খেটেছ; ভালো রেজাল্ট করেছ, এই তো স্বাভাবিক।
—দূর দূর, খাটছিলাম তো গতবারও। ওসব কথা ছাড়েন। এবার চলেন তো।
রুনুকে প্রায় টানতে টানতেই ওদের বাড়িতে নিয়ে গেল বিকাশ। ওদে দেখামাত্র উকিলবাবু ওকে জড়িয়ে ধরলেন বুকে। আবেগ ভরে বললেন,—তুমি...তুমি সত্যিই একটা মিরাকল করছ রঞ্জিত! বিকু যে এত ভালো রেজাল্ট করবে ভাবতেও পারিনি। আর মাত্র ছয় নম্বর পাইলে তো সংস্কৃতে লেটারই পাইয়া যাইত। তোমারে যদি আরও একটা বছর আগে পাইতাম, অর একটা বছর লস হইত না।
আলিঙ্গন মুক্ত হতেই রুনু প্রণাম করল উকিলবাবুকে।
—শোনো রঞ্জিত, আমি দেখছি, এই বয়সেই সময়ের মূল্য তুমি বোঝাতে পারছ, তাই ঘড়ি তোমার হাতেই মানায়। এইডা আমি তোমার জন্য এবার কলকাতা থিকা আনছি। আমি পরাইয়া দিমু নিজ হাতে। আপত্তি করিও না বাবা!
বলতে বলতে পকেট থেকে একটি মূল্যবান রিস্টওয়াচ বের করে রুনুর হাতে পরিয়ে দিলেন উকিলবাবু।
ওর আবেগরুদ্ধ কণ্ঠে আর কথা জোগাল না। কেবল আবার প্রণাম করল। দুচোখ টলোমলো করছে আনন্দাশ্রু।
সেদিন রুনুকে কেন্দ্র করে ও-বাড়িতে যেন একটা উৎসব হয়ে গেল। কথা দিয়ে আসতে হল, ও যদ্দিন এখানে থাকবে, বিকাশকে ও পড়াবে। ফার্স্ট ইয়ারে পঞ্চাশ টাকা করেই পাবে। সেকেন্ড ইয়ারে আরও কিছু বাড়বে।
দোকানে ফিরে এসে হারানদাকে বলল সব ঘটনা! বিকাশ যখন দোকানে এসেছিল তখন হারানদা ছিল না। এবার ঘড়িটা উল্টে-পাল্টে দেখে বলল,—ঘড়িটা কিন্তু খুব ভালো দিছে রে। ওয়েস্টএন্ডের বেশ দামি মডেল।
কাকাবাবু মানুষটিও খুব ভালো হারানদা। আপনি তো কত রকমের সন্দেহ করেছেন আগে।—অনুযোগের সুরে বলে রুনু।
—দ্যাখ, বড়লোকদের আমি বিশ্বাস করি না। বাবারে দ্যাখতে আছি তো। এই একেবারে দ্যাবতা, পরক্ষণেই শয়তানের হাড্ডি। অগো ভালো হইতেও সময় লাগে না, মন্দ হইতেও সময় লাগে না। তর বরাত ভালো ছাত্র পাশ কইরা গেছে। ফেল করলেই দেখতে পাইতা ওনার অন্যরূপ। আমি কই কি অখন দুই চারদিনের জন্য বাড়ি যাইয়া মা-বাবারে প্রণাম কইরা আয়। অখন তো তুই বড়লোক। বাড়ির সকলের জন্য ভালো জামাকাপড় লইয়া যা। মিষ্টিফিষ্টি লইয়া যা।
কথাটা খুব মনে ধরল রুনুর। সেই দিনই হারানদাকে সঙ্গে নিয়ে মা বাবা দাদার জন্য ভালো ভালো জামা-কাপড় কিনে ফেলল। কিনল মস্ত এক হাঁড়ি রসগোল্লা।
কেনাকাটা শেষ করে ফিরে এসে রুনু হারানকে বলে,—আচ্ছা হারানদা, আপনি বলেছিলেন একশো পঁচিশ টাকায় একখান নতুন সাইকেল কেনা যায়, আমি এখন যদি পঁচিশ টাকা দেই আর পরে দুমাসে একশো টাকা শোধ করে দেই, তাহলে কি একখানা সাইকেল দিতে পারেন?
অখন সাইকেল কিনা করবি কি? তর সাইকেলের অভাব কোথায়?
—আমার জন্য নয়। আমার দাদার একখানা নতুন সাইকেলের খুব শখ। দাদার সাইকেলটা এনে তাকে তো খোঁড়া করে রেখে এসেছি। এবার যদি দাদাকে একখানা নতুন সাইকেল দিতে পারি, দাদা ভীষণ খুশি হবে। আপনি কি বাকিতে বিক্রি করতে পারেন হারানদা?
—তরে বিক্রি করতে আপত্তি কী? অখন বরং কিছু নাইবা দিলি। হাতে যে টাকা আছে সব বাড়ি লইয়া যা! সগলেই খুশি হইবে। যেডা তর পছন্দ লইয়া যা। তারপর মাসে মাসে শোধ দিবি।
একশো পঁচিশ টাকায় অবশ্য হল না। রুনু যেটা পছন্দ করল সেটার দাম পড়ল একশো তিরিশ টাকা। হারানদা আপত্তি সত্ত্বেও তিরিশ টাকা রুনু দিয়েই দিল। তারপরেও ওর সমস্ত সঞ্চয় একত্র করে প্রায় দুশো টাকা সঙ্গে নিয়ে বাড়ি যাবার জন্য প্রস্তুত হল।
এক বছর আগে এক দাদা একখানা সাইকেল খুলনা থেকে বরিশালে বুক করে নিয়ে ওকে স্টিমারে তুলে দিয়েছিল। একবছর পরে ওর আর এক দাদা আর একখানা সাইকেল বরিশাল থেকে খুলনা বুক করে দিয়ে ওকে স্টিমারে তুলে দিল। এই দুই দাদার মধ্যে কে যে ওর বেশি আপন, কাকে যে ও বেশি ভালোবাসে—এই প্রশ্নের মীমাংসাটা করতে পারেনি রুনু বরিশাল থেকে খুলনা আসার দীর্ঘ বারো ঘণ্টা সময়ের মধ্যেও।
বাড়ি গিয়ে বাবার পায়ের কাছে একশো টাকার একখানা নোট, মায়ের পায়ের কাছে আশি টাকা ও দাদার হাতে নতুন সাইকেলটা ধরিয়ে দিয়ে সকলকে প্রণাম করল। ওর পকেটে রইল ফিরে আসবার ভাড়া বাবদ সামান্য ক'টি টাকা।
তারপর তো সারাটা দিন কেটে গেল তার বিচিত্র টিউশনির গল্প করে আর হারানদার কাহিনি বলে। কেবল রায়বাড়ি থেকে হারানদার আশ্রয়ে আসবার ঘটনায় কিঞ্চিত মিথ্যার প্রলেপ দিতে হল। বলতে হল পড়াশুনোর সুবিধা এবং টিউশনির সুবিধার জন্যই তার স্থান পরিবর্তন। দাদাকে আশ্বাস দিল এখন থেকে আর তাকে মাসে মাসে সেই পাঁচ টাকা পাঠাতে হবে না। এখন থেকে ও প্রতিমাসে তিরিশ টাকা করে পাঠাবে বাবাকে প্রণামী বাবদ।
রুনুর কথা শুনে সেদিন আনন্দে আবেগে বাবা-মা দুজনেরই চোখে ঝরেছিল আনন্দাশ্রু। বাবা ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন—তোকে নিয়ে আমার যে কত স্বপ্ন রুনু। বি.এ. পাশ করার আগেই যে তুই এতখানি দায়িত্ব কাঁধে নিতে পারবি এ তো ভাবতেও পারিনি। তুই আমার বংশের রত্ন।
নতুন সাইকেলখানাকে চুম্বন করে দাদা বলল,—আমার সেই পুরোনো সাইকেলের বদলে তুই যে নিজের টাকা দিয়ে এত শিগগির আমাদের একখানা নতুন 'হারকিউলেস' সাইকেল কিনে দিবি, তাকি স্বপ্নেও ভাবছিরে রুনু। একখান নতুন সাইকেলের সাধ যে আমার কতদিনের।
—তোমার ভাগ্যই এটা এনে দিয়েছে দাদা। ওতে আমার কোনও বাহাদুরি নেই। তোমার সেদিনের অতবড় দানের কি কোনও মূল্যই হবে না? তাহলে যে সবই মিথ্যে হয়ে যায়। এই একটা বছর তোমার যে কী কষ্ট হল!—সেদিন ওটা নিতে দুঃখই পেয়েছিলাম, আজ এটা দিতে পেরে যে কী আনন্দ পাচ্ছি দাদা!
ইন্দ্র ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল রুনুর ঘড়িটা। তারপর রুনুর হাতে পরিয়ে দিতে দিতে বলল,—এ জিনিসের ভালো-মন্দ আমি বুঝি না, তবে উকিলবাবুর যা পরিচয় দিলি তাতে তিনি তোরে খারাপ জিনিস দিতেই পারেন না।
বাবা বললেন,—সংসারে ভালো মানুষ খুব বেশি নাইরে। তোর এইটুকু বয়সের মধ্যে অনেক ভালোমানুষের ভালোবাসা পালি। বাজুনিয়ায় তোর ঠাকুমা, তোর খোকাদা, গোপালগঞ্জ স্কুলে তোর হেডমাস্টার তারপর এই যে তোর উকিল কাকাবাবু—এঁরা সব মহৎ লোক। এদের বাইরেটা দেখে চেনা যায় না। এদের বাইরেটা দেখায় রুক্ষ, ভেতরটা মমতায় করুণায় ভরা। তোর সেই খোকাদার কথা আমি আজও ভুলিনি।
খোকাদার কথা স্মরণ করিয়ে দিতে দীর্ঘশ্বাস ফেলল রুনু। প্রথম প্রথম বাজুনিয়া থেকে, তারপর কলকাতার থেকে কত চিঠি লিখতেন খোকাদা। এক সময় রুনুই বন্ধ করে দিল পত্র প্রবাহটা, খানিকটা পড়ার চাপে, খানিকটা রাঙাবউদি আর হাসির ভালোবাসার প্রভাবে। দীর্ঘদিনের আর কোনও খবর নেই খোকাদার। ও সত্যিই বড় অকৃতজ্ঞ। এইটুকু বয়সের মধ্যে কত ভালোবাসা যে ও ভুলে গেল। কখনও মনে হয়, ভুলে যায়নি, কাউকে ভুলে যায়নি ও। সব ভালোবাসাগুলো সঞ্চিত হয়ে আছে বুকের গভীর। মাঝে মাঝে স্মৃতির পাতা উল্টালে পাওয়া যায় সে অমৃতস্বাদ। যেমন এই মুহূর্তে ও পাচ্ছে অতীত স্মৃতি চরণের মাধ্যমে খোকাদা, নরেনদা, ঠাকমা, কাকিমা, শৈলদি আর চুয়ার ভালোবাসার স্বাদ।
মায়ের স্বাস্থ্যটা এবার সত্যিই ভেঙে পড়েছে। মায়ের চুল যে প্রায় সবই সাদা হয়ে গেছে, সেটা এই প্রথম দেখল রুনু। সারাক্ষণ তো ঘোমটায় ঢাকা থাকে। দিনের রান্নাটা কোনওরকমে করতে পারলেও, রাতের রান্না কয়েকমাস ধরে দাদাকেই করতে হচ্ছে। রাত্রে নাকি মা চোখেই দেখতে পান না। দিনেও কাজ করতে হয় মোটা চশমা পরে।
মায়ের সঙ্গে কথা বলতে বলতে রুনুর চোখে জল এসে যায়।
—শোনো মা, এখন থেকে তোমার আর কোনও কাজ করতে হবে না। বাড়িতে একটা সব সময়ের লোক রাখতে হবে। সে রান্নাবাড়া করবে, তোমাদের সেবা যত্নও করবে। আমি যে টাকাটা পাঠাব তাতেই হয়ে যাবে দেখো।
—মায়না দিয়ে কাজের মানুষ রাখতি হবে ক্যান বাবা? তাচ্চে ভালো হয়, তুই যদি ইনুরে বিয়ে করতি রাজি করাতি পারিস। ওর যে ধনুক ভাঙা পণ, তুই বি.এ. পাশ না করা পর্যন্ত ও বিয়েই করবে না। ঘরে এট্টা পুতির বউ আসবে, নাতি- নাতনির মুখ দেখব, তাদের নিয়ে আমোদ-আহ্লাদ করব—এই স্বপ্ন দেখতি দেখতি বুড়ো হয়ে গেলাম। এই নিজ্জন পুরীতি আমার বুকটা খা-খা করে বাবা। তুই তো এখন কামাই করতিছিস। তুই এট্টু বুঝোয়ে ক। তোর কথা শুনতি পারে।
আচ্ছা, দাদার জন্যে সেই যে মেয়েটা দেখা হয়েছিল, তার কি বিয়ে হয়ে গেছে?—প্রশ্ন করে রুনু।
সেই মেয়ে কি আর এ্যাদ্দিন অব্বিয়েত আছে?—হতাশার সুরে বলেন মা।
—মেয়েটাকে কিন্তু তোমাদের সকলেরই পছন্দ হয়েছিল, তাই না?
—তা তো হইছিল। কিন্তু ইনুই যে হঠাৎ বাঁক্যে বসল।
—তাদের ঠিকানা জানো? সে গ্রামটা নাকি খুলনার কাছেই।
—তোর বাবা জানেন। উনি হয়তো মনে করতি পারবেন। আর ইনু তো জানেই।
বাবার কাছেই ঠিকানাটা পেয়ে গেল রুনু। পরের দিনই ভোরে রওনা হল দাদাকে কিছু না জানিয়েই। সেই দিনই সন্ধ্যায় ফিরে এল রুনু হাসিমুখে।
মায়ের সঙ্গে গোপনে কথা বলল রুনু,—জানো মা, ভগবান যেন দাদার মেয়েটাকে এখনও কুমারী রেখেছেন। আমি গিয়ে একটু মনে করিয়ে দিতেই কী আদর যত্ন। কেবল মা আর মেয়ের ছোট্ট সংসার। একেবারে নিঃস্ব দরিদ্র। ঘরে একটা ঘাই আছে, আর দশকাঠা জমির উপর একখানা কুঁড়ে ঘর। ওইটুকু জমিতেই মা-মেয়েতে প্রচুর শাক-সবজি ফলায়, আর দুধটুকু সব বিক্রি করে। গ্রামবাসীরা মাঝে মাঝে একটু সাহায্য-টাহায্য করে, তাই এখনও বেঁচে আছে। মা মারা গেলে মেয়েটাতো ভেসে যাবে। কিন্তু জানো মা, মেয়েটা দেখতে কী সুন্দর! দাদার সঙ্গে দারুণ মানাবে। আর ওরা দরিদ্র হলেও কী ভদ্র! কথাবার্তা কী মিষ্টি। মেয়েটা সত্যিই লক্ষ্মী। আমি তো প্রায় কথা দিয়েই এসেছি। এই মেয়েটাকে বিয়ে করা মানে একটা দুস্থ পরিবারকে অনাহারমৃত্যু থেকে বাঁচানো। এটা মহাপূণ্যকর্ম।
—আমি তো সেবারই মেয়ে আর মাকে এক সঙ্গেই আনতি চাইছিলাম। মাডা আমার সঙ্গী হতো। একটু কথা কওয়ার মানুষ পাতাম।
—আমি যদি দাদাকে রাজি করাতে পারি, তোমাদের আপত্তি হবে না তো? ওরা কিন্তু এক পয়সাও খরচ করতে পারবে না। বিয়ের সব খরচই আমাদের করতে হবে।
—সে তো তখনই জানতাম আমরা। ইনু রাজি হলি এক্ষুনি বিয়ে দেব। একটা সাদাসিধে বিয়েতে আর কত খরচ লাগেরে। দেড়শো দুটো টাকাই যথেষ্ট। আমরা তো আর সোনাদানা দিতি যাচ্ছি না। শাঁখা, সিঁদুর, শাড়ি আর সামান্য টুকিটাকি। খরচ হয় তো লোকজন খাওয়াতি। আমাগো আত্মীয়স্বজন এদেশে আর কয়জনই বা আছে। মারেকুটে পঞ্চাশও হবে না। আমার তো মনে হয় তুই আমাগো এবার যে পেনামি টাকা দিছিস তাতেই খুব হয়ে যাবে।
রুনু এখন উপার্জনক্ষম। দাদার চেয়ে বিদ্যান বুদ্ধিমান। এমন ভাই যদি পা জড়িয়ে ধরে দাদার বিয়ের জন্য অনুরোধ করে দাদারই পছন্দ করা মেয়েকে, সে অনুরোধ এড়ানো সহজ নয়। রুনুর ব্রহ্মাস্ত্র হলঃ তুমি বিয়ে না করলে আমি এক্ষুনি পড়া ছেড়ে দেব। এ জীবনে আর বি.এ. পাশ করা হবে না। তাহলে কি তুমি খুশি হবে?
তুই যদি এভাবে বলিস, আমি মুখ্যু-সুখ্যু মানুষ, তোর কথার কি জবাব দিতে পারি?—অসহায় ভাবে বলে ইন্দ্র।
—আসলে তুমি খুব নিষ্ঠুর দাদা। মায়ের শরীর দেখেছ? বউদি এলে মায়ের একটু সেবাযত্ন হবে, মা একটু আনন্দে থাকবে, এটাই তুমি চাও না। তুমি চাও মাকে কষ্ট দিয়ে মারতে।
—এমন কথা তুই বলতি পারলি রুনু। আমি মারে কষ্ট দিচ্ছি?
—দিচ্ছই তো।
—আমি এট্টা বিয়ে করিলেই মায়ের সব দুঃখুকষ্ট ঘুচে যাবে?
—নিশ্চয়। মা-বাবা দুজনেই সুখী হবে, শান্তি পাবে।
তাই যদি ভাবিস, তা'লি কালই আমি বিয়ে করব।—জিদের বসে বলল ইন্দ্র।
হিপ হিপ হুররে!—হাততালি দিয়ে নেচে উঠল রুনু দাদাকে জড়িয়ে ধরে। তারপর ছুটে গেল মায়ের কাছে।
ছোটাছুটি করে বামুন ডেকে, পঞ্জিকা দেখিয়ে বিবাহের দিন স্থির করে, আত্মীয়স্বজনকে নিমন্ত্রণ পত্র লিখে, তখন-তখন খুলনা থেকে বিয়ের জিনিসপত্র কেনাকাটা করে নিষ্প্রাণ বাড়িটাকে দেখতে দেখতে একটা উৎসবের বাড়ি করে তুলল রুনু। শুভদিনে ইন্দ্রর দুই বন্ধু ও রুনু, সর্বসাকুল্যে এই তিনজন বরযাত্রী-সহ ইন্দ্রজিৎ একখানা পানসি ভাড়া করে পুরোহিত ও ঢোল সানাই দল নিয়ে বিবাহ করতে যাত্রা করল।
কনের গ্রামে পৌঁছেই রুনু হয়ে গেল কনে পক্ষের লোক। প্রথমেই কনের মায়ের হাতে শাঁখা, শাড়ি, সিঁদুর ইত্যাদিতে ভরতি স্যুটকেসটি ধরিয়ে দিল কনে সাজাবার জন্য।
কয়েকদিন আগে এসে নগদ পঞ্চাশ টাকা দিয়ে গেছিল এদিকের সামান্য যা খরচ সেসব সামলাবার জন্য। তাই দিয়েই জনা বিশেক গ্রামবাসীকে নিমন্ত্রণ করা এবং বরযাত্রী আপ্যায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
দাদা আলাদা করে দিয়েছিল একশো টাকা ভাবী শাশুড়ির প্রণামী বাবদ। হয়তো সেই টাকা দিয়েই ওরা কিনেছে বরের জন্য জামাকাপড়, জুতো ইত্যাদি। কিনেছে চার আনা সোনার একটি আংটি। রুনুও তার ভাবী বউদির জন্য গড়িয়ে এনেছে আট আনার মধ্যে আংটি, কানের দুল।
ইতিমধ্যে রুনু এই পরিবারের ঘনিষ্ঠ বন্ধুই হয়ে গেছে। মেয়েটি যেমন ওকে অসংকোচে রুনুদা বলে ডাকে, রুনুও বিয়ের আগেই বউদি বলে ডাকতে শুরু করেছে। মেয়ের মা তো রুনুকে মানুষই ভাবছে না, ভাবছে একজন দেবদূত। তাঁর বিশ্বাস, এই দেবদূতের কৃপাতেই তার অভাগী মেয়েটা এমন একটা শিক্ষিত পরিবারে এমন একজন চাকুরে স্বামী পেতে যাচ্ছে।
কথায় কথায় বলছে,—আজ্জন্মে আমি তোমারে প্যাটে ধরিছিলাম বাবা। তুমি যা ক'ল্লে প্যাটের সন্তানেও এত করে না। তুমি আমার বাপ, তুমি আমার ছেলে, তুমিই আমার সব।
বস্তুত রুনু ছাড়া কনে পক্ষের প্রতিনিধি আর আছেই বা কে। অনেক খোঁজাখুঁজি করে কনের এক দূর সম্পর্কের মামাকে ধরে আনা হয়েছিল কনে সম্প্রদান করতে। যে মামাটি এ বিবাহের প্রথম যোগাযোগ করেন, তিনি তো থাকেন গোপালগঞ্জ। এত অল্প সময়ে তাঁকে খবরই বা দেবে কে?
বিয়ের আসরে কনেকে সাজিয়ে গুছিয়ে সঙ্গে করেই নিয়ে এল রুনু। নিয়ন্ত্রিতদের খাবার-দাওয়ার ব্যবস্থাতেও হাত লাগাতে হচ্ছে রুনুর। ও যেন সত্যিই কনের আপন ভাই।
কনের মায়ের সঙ্গে কথা হয়েছে দ্বিরাগমনে গিয়ে ফিরবার পথে দাদা তাঁকে সঙ্গে করেই নিয়ে আসবেন বরাবরের জন্য। ঘরখানা তখন তালাচাবি দেওয়া থাকবে। জমি ও ঘর দান করবেন কন্যাকে এবং গরুটা দান করবেন জামাতাকে। তারপর ও জমিটুকু নিয়ে মেয়ে-জামাই যা খুশি করুক।
বউভাতের এক সপ্তাহ পরে দাদা নববধূকে নিয়ে দ্বিরাগমনে যাবে বলে স্থির হয়েছে। কিন্তু অতদিন রুনুর অপেক্ষা করা সম্ভব নয়। ও বউভাতের দুদিন বাদেই রওনা হল।
আসবার সময় নতুন বউদিকে প্রণাম করতে যেতেই সে রুনুর হাত ধরে বলে,—ছিঃ-ছিঃ! তুমি আমার দাদা। আমার তো ভাই ছিল না। এবার একটা ভাই পালাম। একেবারে আপন ভাই। তুমি চিরকালই আমার দাদা হয়ে থাকবা। আমিই তোমারে পেনাম করব। বলতে বলতে রুনুকে হঠাৎ সে প্রণাম করেই বসল।
রুনু চমকে দুহাত পিছিয়ে গিয়ে বলে,—কী করলে বউদি! এতে তো তোমার পাপ হবে।
আমি তো তোমার মতো লেখাপড়া জানি না ভাই। আমার মন বলে, এর চাইয়া বড় পূণ্য আমি জীবনে করিনি!—বলতে বলতে নতুন বউদির দুচোখে জলে ভরে উঠল!
রুনু মহা অপ্রস্তুত। আমতা আমতা করে বলে,—তাহলে আসি বউদি।
তুমি চলে যাবা! বাড়িডা যে শূন্যি হয়ে যাবে, অভাগী বোনেরে ভুলে যাইওনা দাদা!—এবার আর চোখের জল রোধ করতে পারল না বউদি। টানা টানা দুটি চোখ উপছে অঝোরধারায় নেমে এল জল।
মনটা বড় ভারী হয়ে গেল রুনুর। মাত্র তো ক-দিনের পরিচয়। তবু কত আপন হয়ে গেছে এই পরের মেয়েটি ওর কাছে। এমনি করেই তো পর আপন হয়। সংসারে সৃষ্টি হয় প্রীতির বন্ধন।
মাকে প্রণাম করতে মা-ও বললেন সেই কথা,—তুই চলে যাবি, বাড়িডা খা-খা করবে। এ কয়ডা দিন যে কী আনন্দে ছেলাম। আমি যে বুড়ো হইছি তা ভুলেই গেছলাম। এখন ছুটি-ছাটায় বাড়ি আসিস বাবা। এখন তো নিজিই আয় করতিছিস। যাতায়াতে গোটা পাঁচ-ছয় টাকা খরচ করতি পারবি না?
—আসব মা, এখন সত্যিই মাঝে মাঝে আসব। তুমি তোমার বউমাকে নিয়ে কেমন সুখে সংসার করছ, দেখতে আসব। দাদার বিয়েটা সত্যিই একটা ভালো বিয়ে হল মা। বউদি খুব ভালো, তাই না?
—দেখে শুনে তো ভালোই মনে হচ্ছে। বুদ্ধি-শুদ্ধি আছে। এখন ঈশ্বরের ইচ্ছা।
বাবা আজকাল খুবই কম কথা বলেন। সারাক্ষণ যেন ধ্যানস্থ। যেন নিরন্তর জপ চলছে মনে মনে। দৃষ্টিশক্তি খুবই ক্ষীণ হয়ে গেছে। দুহাত দূরের মানুষ চিনতে পারেন না। রুনু প্রণাম করতেই মাথায় হাত রেখে বলেন,—এবার তুই একটা মহাপুণ্যের কাজ করে গেলি বাবা। এই পুণ্যের বলেই তুই অনেক বড় হবি। আমি হয়তো দেখে যাতি পারব না। আমার দিন শেষ হয়ে আইছে। পারঘাটে আসে দাঁড়াইছি। কান পাতে রইছি। ডাক শুনলিই পাড়ি দিতি হবে।...
সব শেষে রুনু বিদায় নিতে এল দাদার কাছে। দাদাকে প্রণাম করতেই ইন্দ্র ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলে,—তোর বউদি তোরে দাদা ডাকে, আমারও ইচ্ছে করে তোরে দাদা ডাকতি! এবার তো সত্যিই আমার বড় ভাই-এর কাজ করলি।
মনে থাকে যেন!—হেসে বলে রুনুঃ আমি তোমার দাদা হয়ে গেলাম আজ থেকে। দাদার কথা অমান্য করতে নেই, তা জানো?
—আগাগোড়াইতো তোর কথা মান্য করতিছি। তা না হলি তোরে বি.এ. পাশ না করায়ে আমি বিয়ে করি? তুই আমার পিতিজ্ঞে ভাঙালি।
—কিন্তু বিয়েটা তোমার খুব ভালোই হল দাদা। এমন একটা ভালো বউদি ভাগ্য বলেই পাওয়া যায়।
তুই তো ভালো বলবিই। তুই তো কানে পক্ষের লোক। ওর দাদা।—হেসে বলে ইন্দ্র।
সেই হাসির জের টেনে রুনু বলে,—ঠিক বলেছ। এবার ওর দাদা তোমাকে একটি উপহার দিচ্ছে; সেটি তোমার নিতে হবে।
বলতে বলতে রুনু তার হাতে ঘড়িটা খুলতেই দাদা ভীষণ চমকে উঠে বলে,—ওরে সব্বোনাশ! না-না-না! ওডা তোর একটা বড় সম্পদ!
বড় সম্পদ বলেই তো যাকে সত্যি বড় বলে মনে করি, তাকে দিচ্ছি!—উজ্জ্বল হাসিতে ভরে ওঠে রুনুর মুখঃ তুমি আপত্তি করলে এ ঘড়ি আমি এক্ষুনি এক আছাড়ে গুঁড়ো গুঁড়ো করব।
তোর সব কিছুতেই এত জিদ না—ইন্দ্র অসহায় ভাবে বলে।
—তোমার মতো একটা ভালো ছেলে, চাকুরে ছেলে, বিয়ে করলে অন্তত একটা ঘড়ি আর একখানা সাইকেল তো পেতেই, তাই না?
তুই তো মহা বজ্জাৎ।—ভাইয়ের কথায় হাসি দেখা দেয় ইন্দ্রর মুখেও! তাই বুঝি কনে পক্ষের হয়ে তুই আমারে সাইকেল আর ঘড়ি দিবি?
দেবই তো, আমি তো কনে পক্ষের গার্জেন।—মিটিমিটি হাসে রুনুঃ দ্যাখো দ্যাখো দাদা, তোমার চওড়া রিস্টে কী সুন্দর মানিয়েছে ঘড়িটা।
এবার আর হাসি নয়। দাদার দুচোখ ভরে উঠেছে জলে। রুনুকে ভ্রাতৃগর্বে ও আনন্দে নিবিড় ভাবে বুকে জড়িয়ে ধরে বলে,—রুনু, এইমাত্র দ্যাখলাম তোর বউদি তোরে এট্টা পেনাম করল। আমারও ইচ্ছে হচ্ছে তোরে এট্টা পেনাম করতি। তুই সত্যিই আমারও দাদা হয়ে গেলি। একটা ভালো ঘড়ি, একখান ভালো সাইকেল—এ যে আমার কত দিনির সাধ। এ জীবনে হয়তো এ সাধ আমার...তুই...রুনু...তোরে যেন ভগবান কোনও দুঃখু না দেয়। মনডা চিরকাল এমনি সোনার মতো রাখিস। তুই যে আমার কত বড় অহংকার...তোরে নিয়ে যে আমার কত আশা, কত স্বপ্ন...
রুনুকে জড়িয়ে ধরে দাদা একেবারে ছেলেমানুষের মতো হু-হু করে কেঁদে ফেলল।
এবার বাড়িতে যে-ক'দিন ছিল রুনু, ওর মনটা বাঁধা ছিল একটা উচ্চ সুরে। অনেক বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছে। মায়ের পা ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়ে দাদার ওভার টাইম খাটা বন্ধ করে এসেছে। প্রতিদিন সন্ধ্যার আগে দাদাকে ফিরতে হবে বাড়িতে। ওই নির্জন পুরীতে প্রায় অন্ধ দুজন বুড়োবুড়ি একটা বয়সের মেয়েকে পাহারা দেবার দায়িত্ব নিতে পারবে কেন? এই ছিল রুনুর যুক্তি। এ যুক্তির কাছে হার মেনেছিল দাদা।
প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছে মাসে মাসে তিরিশ টাকা পাঠাবার। এ প্রতিশ্রুতি রাখলে হলে এবং হারানদার সাইকেলের দামটা শোধ করতে হলে সকালের টিউশনিটা ছাড়া যাবে না।
দাদার বিয়ের ব্যাপারটা নিয়েই কথা হচ্ছিল হারানদার সঙ্গে। সে ভরসায় দুমাসে হারানদার একশো টাকা শোধ করে দেবে ভেবেছিল, বাড়িতে নিয়মিত টাকা পাঠাতে হলে দুমাস কেন ছ'মাসেও শোধ হবে কিনা সন্দেহ। নিরুপায় হয়ে হারানদার কাছে ছ'মাস সময় চাইল রুনু।
—আচ্ছা সে হোক, তাই দিবি।
—সকালের টিউশনিটা এখনও ছাড়া যাবে না হারানদা।
—ছাড়তে যদি না পারিস তো বাড়াইতে হইবে।
—তার মানে?
—এইটের রেট আর নাইনের রেট তো এক হইতে পারে না। আমার তো মনে লয়, ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র পড়ানোর চাইতে নাইনের ছাত্র পড়াইতে খুটুনি বেশি।
—কথাটা খুবই সত্যি হারানদা। কিন্তু গার্জিয়ানরা ভাবেন অন্যরকম। তারা স্কুলের ছাত্রর জন্য যে রেট দেন, ছাত্র কলেজে উঠলেই রেট বাড়াতে আপত্তি করেন না।
—আচ্ছা কথা কইয়া দেখি অঞ্জলির বাপের লগে। অন্তত কুড়ি টাকা দিতে রাজি না হইলে—
সেদিন বিকেলেই হারানদা অঞ্জলির বাড়িতে গেছিল রেট বাড়াবার প্রস্তাব নিয়ে, ফিরে এল আর একটা সুখবর নিয়ে।
—ভালো খবর আছে রুনু। অঞ্জলিরে তুই ছাইড়া দে। অর হাড় কিপ্টে বাপ নাকি কোথায় দশ টাকায় এক মাস্টার পাইছে। তরে আর দরকার নাই।
—এটা কি ভালো খবর হল?
—আরে না, না। ভালো খবর হইল বিকুর এক বন্ধুও তোর কাছে পড়তে চায়। সে-ও এবার ফার্স্ট ইয়ারে ভরতি হইল। থাড্ডিবিশনের ছাত্র। উকিলবাবুর মতো মোটা অবস্থা নয়। তবু তিরিশ টাকা দিতে রাজি হইছে।
রুনু মনে মনে হিসেব করে দেখল এতে ওর শ্রম কম হবে, আয় বেশি হবে। এক কথায় রাজি হয়ে গেল।
পরের দিন সকালেই গেছিল রুনু গত মাসের টাকাটা আনতে এবং অঞ্জলিকে তার শুভেচ্ছা ও আর্শীবাদ জানিয়ে আসতে।
অঞ্জলি একটা কাণ্ডই করে বসল। রুনু যেতেই তাকে একটা প্রণাম করে ঝরঝন করে কেঁদে ফেলল। কাঁদতে কাঁদতে বলল,—আমি খারাপ ছাত্রী বইলা আর আমার বাবা বেশি টাকা দিতে পারব না বইলা তো আমারে পড়াইবেন না? হারানদা বাবারে সব কথা কইছে। আমি শুনছি। আপনার এক ছাত্র নাকি ছয় মাসে তিনশো টাকা দিছে, দামি ঘড়ি দিছে। ম্যাট্রিকে গত বছর ফেল করিছিল, এবার দারুণ রেজাল্ট করছে। অখন নাকি পঞ্চাশ টাকার কমে আপনি কাউরে পড়াইবেন না। আপনার এখন খুব নাম ডাক। কত বড়লোক এখন আপনারে—আমার আর পড়া হইব না।
রুনু ভীষণ অপ্রস্তুত। এমন একটা পিরিস্থিতিতে তাকে পড়তে হবে, সে ভাবতেই পারেনি। এই স্বল্পবাক অতিনম্র স্বভাবের মেয়েটি যে এত কথা বলতে পারে, এ যেন এক নতুন বিস্ময়। আজ যেন নতুন করে দেখছে অঞ্জলিকে। ক্লাস এইটের বালিকা অঞ্জলি নাইনে উঠেই যেন সাবালিকা হয়ে গেছে। ওর চোখের জলে কোনও ছলনা নেই।
—ছিঃ ছিঃ, এইসব কথা বলেছে হারানদা? তোমাদের কাছে পঞ্চাশ টাকা চেয়েছে?
—না, একটু কমাইয়া তিরিশ টাকাই চাইছিল হারানদা। তার দোষ কি! কমই তো চাইছিল। কিন্তু আমার বাবা ওই পনেরো টাকার বেশি এক পয়সাও দিবে না। বাবায় যে গরিব।
—টাকার কথা নয় অঞ্জলি, আসল কথা হল আমার সময়। হারানদা যে কেন এসব কথা বলতে এল। আমারও তো এবছর ফ্যাইনাল ইয়ার। আমার নিজের পড়া আছে না? সন্ধ্যায় তো টিউশনি, তাই সকালটা নিজের হাতে রাখতে চাইছি।
—সকালে আপনার আইতে হইবে না। সন্ধ্যার আগে বিকালে একটু সময় দিতে পারবেন না? আধ ঘণ্টা খানেক? সন্ধ্যার টিউশনি কখন করেন?
—ধরো প্রায় ছ'টা থেকে আটটা।
—কলেজ থিকা তো সাড়ে চারটার মধ্যেই ফেরেন। ধরেন, পাঁচটা থেকে আধ ঘণ্টা খানেক...অঙ্ক...আর ইংরাজি ছাড়া আর কিছু পড়াইতে হইবে না।
—আধ ঘণ্টায় অবশ্য ওটুকুও হয় না। ঠিক আছে তাই হবে।
—কত দিতে হবে? বাবারে কমু তো।
—যা দিচ্ছিলে—
—তাইতেই হইবে?
—খুব হবে।
মুহূর্তে অঞ্জলি যেন একটা পাখির মতো উড়ে গেল ভিতরে। ধরে নিয়ে এল ওর বাবারে। তিনি ঘরে ঢুকতেই রুনু উঠে দাঁড়িয়ে যুক্ত করে তাকে প্রণাম করল।
তিনি কোনও ভূমিকা না করেই শুরু করলেন,—এই পোলাপান বয়সেই এত টাকা চিনছ? হারাইন্যা কইলো এবছর থিকা তিরিশ টাকা দিতে হইব। তা বাপু আমি দিতে পারুম না। অরে আগে যে মাস্টার পড়াইত তারে দিতাম দশ টাকা কইরা। অখনও সে দশ টাকায় পড়াইতে রাজি। অথচ মাইয়ার তারে পছন্দ নয়।
তুমি থামোতো বাবা। ধমকের সুরে রুনুর দিকে তাকিয়ে বলে অঞ্জলিঃ জানেন দাদা, তিনি আই-এ ফেল, পাঠশালার শিক্ষক একজন। নাইনের পড়া তিনি পড়াইতে পারেন? পাশ আগেও করিছি, কিন্তু এবার যেমন পাশ করিছি, যা নম্বর পাইছি, তা তো জীবনে পাইনি কোনওদিন। বাবারে বুঝাইতে পারলাম না। আপনি একটু বুঝাইয়া দেন না।
—আর বুঝাইতে লাগব না। এই মাস্টারের তর মনে ধরছে। অ ইচ্ছা দিমু, সেই পনেরো টাকাই দিমু। বাড়াইবার মতলব থাকলে বাপু অখনই সাফ কথা কইয়া দাও। আমি এক কথার মানুষ।
আমি তো তোমারে কইলামই বাবা, উনি দয়া করিয়া পনেরো টাকাতেই পড়াইবেন। তা তুমি এত কথা ওনারে শুনাইতে আছ ক্যান? উনি কি টাকার কাঙ্গাল? ওনার ছাত্ররা পঞ্চাশ টাকা করিয়া দেয়।—বিরক্ত সুরে বলে অঞ্জলি।
—হে সব হইল বড়লোকের কারবার। আমি গরিব দোকানদার। তা ওই কথাই রইল। পনেরো টাকাই দিমু।
খুব হয়েছে। অখন তোমার দোকানে যাও গিয়া।—প্রায় জোর করেই ওর বাবাকে ঘরের ভিতর ঠেলে দিল অঞ্জলি।
তিনি অদৃশ্য হতেই ছুটে এসে রুনুর পা জড়িয়ে ধরে বলে,—বাবারে আপনি ক্ষমা করেন রঞ্জিতদা। দোকানদার মানুষ, লেখাপড়া জানে না! বাবার ওই রকমই কাটা কাটা কথা! সংসারে কারও সঙ্গে একটা মিষ্টি কথা বলতি পারে না।
রুনু এতক্ষণ যেন নির্জীব পাথরের মূর্তির মতো বসেছিল। এবার অঞ্জলির হাত ধরে তাকে তুলল। কোমল কণ্ঠে বলল,—তুমি কাঁদছ কেন অঞ্জলি?
যুগপৎ দুঃখে-আনন্দে অঞ্জলি ফুলে ফুলে কেবল কাঁদছেই।
—বাবায় যে এত কথা কইবে, আমি ভাবতেও পারিনি। এই অপমানের পর কি আপনি আর আমারে পড়াইবেন! আমার আর পড়া হইবে না। আগের বুড়া মাস্টারটা ভীষণ অসভ্য। বাবারে তো সে কথা কওন যায় না। আমার পড়া শ্যাষ হইল! এখন একটা বিয়া দিয়া বিদায় করতে পারলেই বাবা বাঁচে। হয়তো সেই বুড়াডার লগেই—
রুনু আর একবার চোখ তুলে তাকায় ক্রন্দনরতা চতুর্দশী অঞ্জলির দিকে। সব দোকানদার পিতা এ কান্নার অর্থ বুঝবে না। রুনু যেন এইটুকু সময়ের মধ্যে অনেক কিছু বুঝে ফেলল। শান্ত গম্ভীর কণ্ঠে বলল,—কেঁদো না অঞ্জলি। এই পরিবেশে জন্মেও তোমার পড়ার এই আগ্রহকে আমি শ্রদ্ধা করি। সেই জন্যই তোমাকে আমি পড়াব। যতদিন সম্ভব পড়াব। তারপর টিউটর ছাড়াই যাতে তুমি পড়াটা চালিয়ে যেতে পারো সেই ভাবেই তৈরি হবে তুমি! আমারও তো টিউটর ছিল না কোনওদিন।
—আপনি তো দারুণ ভালো ছাত্র।
—তুমিও খারাপ ছাত্রী নও। কেবল আত্মবিশ্বাসটা বাড়াতে হবে। তুমি পারবে।
তা পারলে আমি শেষ পর্যন্ত পড়া ছাড়ুম না।—জোর দিয়ে বলে অঞ্জলি।
সেদিন অঞ্জলিদের বাড়ি থেকে ফিরবার পথে রুনুর একটা কথাই বারবার মনে হচ্ছিলঃ ওই বাপের এই মেয়ে! জীবনে অনেক সংগ্রাম করতে হবে ওকে। সে যুদ্ধে যেন ও জয়ী হয়!
অঞ্জলিদের বাড়ি থেকে ফিরে এসে রুনু শান্তভাবে বলে,—অঞ্জলিকে আমি পড়াব হারানদা।
—কত দিবে?
—আগে যা দিচ্ছিল। অন্য টিউশনি আর নেব না। তুমি বিকাশের বন্ধুকে বলে দিও, সে যেন অন্য ব্যবস্থা করে।
—তুই একটা আস্ত গাধা। ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র পড়াইবি গায়ে 'ফু' দিয়া, আর নাইনের ছাত্র পড়াইতে অনেক দায়িত্ব।
—তা আমি বুঝি হারানদা। গায়ে 'ফু' দিয়ে আমি কাউকেই পড়াই না। দায়িত্ব নিয়েই পড়াই। বিকাশের বন্ধু তিরিশ টাকায় অন্য টিউটর পাবে কিন্তু অঞ্জলিকে আমি ছেড়ে দিলে ওর পড়াই বন্ধ হয়ে যাবে।
—বোঝলাম। মাইয়াডা কান্নাকাটি করছে, তুমি তার চক্ষের জল দেখিয় ভোলছ।
—কথাটা মিথ্যা নয় হারানদা, কিন্তু সে কান্নার কারণ তুমি বুঝবে না। ও মানুষ হতে চায়, ওর বাবাটা ওকে জলে ভাসিয়ে দিতে চায়।
তাই তুমি মহত্ত্ব দেখাইয়া নিজের পায়ে কুড়াল মারলা!—বিরক্তভাবে বলে হারানদাঃ অখন বিকাশের বন্ধুকে কি যে কমু।
—একদিন এখানে আসতে বলো, আমিই বুঝিয়ে বলব। আমার এক বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ করে দেব। সে-ও ভালো ছাত্র। সে-ও টিউশনি করে পড়া চালাচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত এড়ানো গেল না বিকাশের বন্ধু হিমাংশুকে। হারানের কাছে সংবাদ পেয়ে রুনুর সঙ্গে দেখা করতে ওরা দুজনেই একসঙ্গে এসেছিল। এসেছিল প্রস্তুত হয়েই। রুনুকে কোনও কথা বলবার সুযোগ না দিয়েই বিকাশ বলল,—আপনার বেশি সময় নষ্ট হবে না রঞ্জিতদা। আমাদের বাড়িতেই আসবে ও। আমরা একসঙ্গে পড়ব! একই কম্বিনেশান তো। বাবা এ ব্যবস্থায় রাজি হইছেন। বলছেন, দুজনে আলোচনা কইরা পড়াশুনো করলে দুজনেই তাতে ভালো হইবে। আপনি আর আপত্তি করবেন না।
হিমাংশুর সঙ্গে আলাপ করে বুঝল ছেলেটি অধ্যাবসায়ী ও উচ্চাভিলাসী। ছেলেটিকে ভালোও লাগল রুনুর।
মনে মনে একটা হিসাবও করল রুনু। হারানদার ঋণ শোধ করতে হিমাংশুর তিরিশ টাকা কাজে লাগবে! বাড়িতে প্রতিশ্রুত টাকাটাও সহজেই পাঠাতে পারবে।
আসলে সকাল বেলাটা আমি ফ্রি রাখতে চাই বিকাশ। আগে সকালে যে টিউশনিটা করছিলাম সেটা বিকেলেই করব ভেবেছি। তাই বিকেলে আর বাড়াবার ইচ্ছা ছিল না। তবে তোমার দুজনে একসঙ্গে পড়লে কিছুটা সময় বাঁচবে ঠিকই। ঠিক আছে শুরু করা তো যাক। তারপর যদি।—কথাটা অসমাপ্ত রেখেই থেমে যায় রুনু।
সেই ভাবেই শুরু করেছিল রুনু! কলেজ থেকে সরাসরি আসত অঞ্জলিদের বাড়ি। সেখানে ঘণ্টা খানেক পড়িয়ে ঘরে ফিরে জলযোগাদি সেরে সাতটায় যেত বিকাশদের বাড়িতে।
অঞ্জলির বার্ষিক পরীক্ষা আসন্ন হতেই পুজোর পর থেকে ওকে একটু বেশি সময় দিতে শুরু করল! টেন থেকে আর যাতে টিউটর আবশ্যক না হয় সেই ভাবেই তৈরি করছিল অঞ্জলিকে। ওর অগ্রগতি হচ্ছে। আত্মবিশ্বাস এসেছে। ও নিজেই একদিন বলল,—আমি ভালোভাবে পাশ কইরা টেন-এ উঠতে পারলে আর আপনারে কষ্ট দিমু না।
এই তো আমি চাইছি অঞ্জু!—উৎসাহ দিয়ে বলেছিল রুনু অঞ্জলিকে।
নভেম্বরে অঞ্জলির পরীক্ষা শেষ হতে রুনু যেন একটা মস্ত দায় থেকে মুক্ত হয়ে নিজের কথা ভাববার অবকাশ পেল। অঞ্জলি পরীক্ষা ভালোই দিয়েছে। সানন্দে মুক্তি দিয়েছে রুনুকেও। রুনু কথা দিয়েছে, টেন-এ উঠবার পরও মাঝে মাঝে রবিবার ওকে যথাসাধ্য সাহায্য করে যাবে।
কৃতজ্ঞতায় অভিভূত অঞ্জলি সেদিনে বলেছে,—আমি যদি সত্যিই কোনওদিন গ্র্যাজুয়েট হইতে পারি, যদি নিজের পায়ে দাঁড়াইতে পারি—আপনার কথা জীবনে ভুলব না।
—আমিও তোমারই মতো দরিদ্রর সন্তান অঞ্জু। আমিও নিজের পায়ে দাঁড়াবার জন্য শৈশব থেকেই যুদ্ধ শুরু করেছি। তুমি বড় হলে আমার থেকে সুখী কেউ হবে না সংসারে। বি.এ. পরীক্ষার পরে আমার জীবনের গতি কি হবে, কোথায় যাব, কি করব কিছুই জানি না, কিন্তু তোমার কথা ভুলব না। আশীর্বাদ করি তুমি বড় হও।
যদি হইতে পারি কোনওদিন, সে আপনারই দয়ায়।—বলতে বলতে দুচোখ ছলোছলো করে উঠেছিল অঞ্জলির। রুনু আর দাঁড়াতে পারেনি।
বিকাশদের ফার্স্ট ইয়ারের পরীক্ষা শেষ হল মার্চে। এরপর থেকে রুনু একেবারে মুক্ত। ওদের সঙ্গে কথা হয়েছে, সেকেন্ড ইয়ারেও রুনুকেই ওদের পড়াবার দায়িত্ব নিতে হবে, অবশ্য রুনুর নিজের পরীক্ষা শেষ হবার পর থেকেই। বি-এর রেজাল্ট বেরুবার আগে পর্যন্ত কয়েকমাস তো ও এখানেই থাকছে, তখন যদি ওদের ছাড়াও আরও ছাত্র পড়াতে রাজি থাকে রুনু—সে ব্যবস্থাও করবে ওরা। ওদের বন্ধু মহলে টিউটর হিসেবে রুনুর এখন দারুণ খ্যাতি।
প্রস্তাবটা মনে ধরেছিল রুনুর। সত্যিই তো, তখন প্রায় ছয় মাস সময় পাওয়া যাবে, তখন টিউশনি করে কিছু টাকা সঞ্চয় করতে পারলে ওর ভবিষ্যতের এম.এ. পড়ায় সেটা সাহায্য করবে। সানন্দে রুনু বলেছিল,—কথাটা মন্দ বলোনি। বিকেলটা তোমাদের। সকালের জন্য যদি আরও একটা যোগাযোগ করতে পারো মন্দ কি! জুন-জুলাই থেকে শুরু করা যাবে। যদ্দিন বরিশাল থাকতে হবে, সময়টাকে কাজে লাগানোই তো ভালো।
ওদের পরীক্ষা শেষ হতেই এসে গেল রুনুর টেস্ট। টেস্টের রেজাল্ট হল আশঙ্কাজনক। অনার্স মাকর্স পেয়েছে বটে, কিন্তু বড় টায়টোয়। ওর অধ্যাপকদের কাছে ভর্ৎসনা শুনতে হল। অধ্যাপক সেনগুপ্ত বললেন মর্মান্তিক কথা,—আমার পেপার পাঁচ নম্বর গ্রেস দিতে হয়েছে রণজিৎ। ভেবেছিলাম দেব না, রেখেই দেব এবার তোমাকে। ইংলিশে অনার্স কি রাখতে চাও?
শেষ পর্যন্ত গ্রেস পেয়ে পাশ করতে হল ওকে। এতবড় অপমান বোধ ওর জীবনে হয়নি কোনওদিন। লজ্জায় যেন মাটির সঙ্গে মিশে গেল রুনু। চোখের জল রোধ করা কঠিন হল।
মাথা নীচু করে থাকলে চলবে না। আমার কথায় জবাব দাও। অনার্স কি রাখতে চাও?—গর্জে ওঠেন বি.এম. কলেজের বাঘ।
নিশ্চয়ই চাই স্যার।—মাথা তুলে বলে রুনুঃ সংসারের অভাবের কথা ভেবে টিউশনি করে কিছু টাকা পাঠাচ্ছিলাম বাড়িতে। এখন থেকে আর টিউশনি করব না। ফুল টাইম দিতে পারব স্যার।
—ফুল টাইম তো দিতেই হবে। আর প্রতি রবিবার যাবে আমার কাছে।
—এত বড় সৌভাগ্য...আপনার কখন সময় হবে স্যার?
—তোমার কখন সময় হবে তাই বলো।
রুনু অভিভূতভাবে অধ্যাপক সেনগুপ্তকে প্রণাম করে বলে,—সকালবেলা হলে ভালো হয় স্যার। কিন্তু আমাকে কত দিতে হবে।...
খুব টাকাপয়সার মালিক হয়ে পড়েছ, তাই না? তোমাকে টাকা দিতে বলেছি আমি? বলেছি আমার কাছে আসতে। দয়া করে আটটায় এসো বুঝলে!—বাঘের মতোই গর্জন করে ওঠেন বি.এম. কলেজের ইংলিশের হেড অফ দি ডিপার্টমেন্ট অধ্যাপক সেনগুপ্ত।
রুনুর অবরুদ্ধ চোখের জল এবার আর বাধ মানল না। শুষ্ক নিষ্করুণ মরুভূমির বুকে একটা মরুদ্যানের সন্ধান একবার রুনু পেয়েছিল কলেজে ভরতি হবার সময়। আবার পেল আজ!
কাঁদছিস কেন রে?—রুনুর পিঠে সস্নেহে হাত রেখে বলেন প্রফেসর সেনগুপ্তঃ শোন, তোর স্ট্রাগল-এর সব খবর আমি রাখি রে! তোর রায় বাড়ি থেকে চলে আসা, একটা সাইকেলের দোকানে থেকে টিউশনি করে পড়া সব, বুঝলি সব। সম্প্রতি তোর ছাত্র বিকাশের বাবা হরিপ্রসন্নর কাছেও শুনেছি তোর কথা। হরিপ্রসন্ন আমার অনেক দিনের বন্ধু। একসঙ্গে পড়েছি। একসঙ্গে স্ট্রাগল করেছি। শেষ পর্যন্ত ও গেল আইনে আর আমি এলাম এডুকেশনে। তোকেও স্ট্রাগল করেই বড় হতে হবে। যুগটা কম্পিটিশনের। অনার্স পাওয়াটা বড় কথা নয়। আসল কথা হল পজিশান। তোকে ভালো পজিশান পেতে হবে। আসিস রবিবার।
—নিশ্চয় আসব স্যার। আশীর্বাদ করুন যেন আপনার এই ভালোবাসা আর স্নেহের যোগ্য মূল্য আমি দিতে পারি।
আস্তে আস্তে দেখা গেল রবিবারের সকালে নয়, সপ্তাহে তিন-চার দিনে করে যেতে শুরু করল রুনু প্রফেসর সেনগুপ্তর বাড়িতে।
জুলাই মাসে শেষ হয়ে গেল রুনুর পরীক্ষা।
এবার কলেজ থেকে ইংলিশে অনার্স দিল একা রুনুই। শুরু করেছিল ছয়জন। তিনজন প্রথম বছরেই খসে গেছে। আর দুজন খসে গেল টেস্টে। রুনুও অবশ্য খসেই যাচ্ছিল। গ্রেস দিয়ে উতরে দিলেন প্রফেসর সেনগুপ্ত।
বস্তুত এ কলেজ থেকে গত তিন বছরে ইংলিশে অনার্স কেউ পায়নি। অথচ ফিলসফিতে পেয়েছে, বিজ্ঞান শাখার কেমিস্ট্রি, ম্যাথমেটিকস-এও পেয়েছে প্রতি বছরই কয়েকজন। অধ্যাপক সেনগুপ্ত হয়তো চাইছিলেন তাঁর বিভাগ থেকেও কেউ এবার অনার্স অর্জন করুক। তাই হয়তো রুনুর প্রতি এই বিশেষ যত্ন। গত তিন মাসে সত্যই উনি ওর অনেক মূল্যবান সময় দান করেছেন রুনুকে। এখন ও যদি অনার্স না পায় তাহলে ওর চেয়ে যে তিনিই বেশি আঘাত পাবেন এই কথাটা ভেবেই রুনুর দুশ্চিন্তার অবধি নেই। পরীক্ষা সমাপন করে মনে হচ্ছে, অনার্স হয়তো ও পেয়ে যাবে, কিন্তু ইউনিভার্সিটিতে ওর পজিশান যে কোথায় নেমে যাবে তার কোনও ধারণাই নাই ওর। মনে হচ্ছে, শেষ দিকে অধ্যাপক সেনগুপ্তর ওই সাহায্যটাই না নিলেই ছিল ভালো, তাতে অনার্স না পেলে দুঃখ হতো ঠিকই, কিন্তু লজ্জার কিছু থাকত না।
পরীক্ষার পর থেকেই মুক্তির আনন্দর সঙ্গে একটা বিষাদের সুর বেজেই চলেছে সারাক্ষণ। জীবনের চারটি বিচিত্র অভিজ্ঞতা-সমৃদ্ধ বছর ও কাটিয়ে দিল বরিশালে।
শেষ পরীক্ষা দিয়ে মনের এইরকম একটা অবস্থা নিয়ে রাস্তা দিয়ে চলতে চলতে রুনুর স্মৃতিপটে বারে বারে ভেসে উঠছে ওর বরিশাল বাসের চার বছরের কথা।
এই চার বছরে বরিশাল যেন অসংখ্য বন্ধনে আষ্টেপৃষ্ঠে ওকে বেঁধে ফেলেছে। ও কী কখনও ভুলতে পারবে রায় বাড়ির রাঙাবউদি আর হাসির বন্ধন?
হাসির কথা মনে পড়তেই ওর বুক মুচড়ে উঠল একটা অসহ্য কান্নায়। অভিমান হল রাঙাবউদির উপরও। এই দেড় বছরের মধ্যেও সেই প্রত্যাশিত চিঠিখানা এল না। তাহলে কি খবর অশুভ? তাহলে কি হাসি—! না, না, ওর মন বলছে, হাসি নিশ্চয়ই ভালো হয়ে গেছে। ভুলে গেছেন রাঙাবউদি তাঁর প্রতিশ্রুতির কথা। কিন্তু রুনু কী করল এই দেড় বছর ধরে? সে নিজেও কি যেতে পারত না অন্তত খগেনদার কারখানায়? তাহলে তো একটা খবর পেত।
আসলে অকৃতজ্ঞ ও নিজেই। গেলে ওকে কে কী বলবে, কী অপমান করবে, সেই ভয়েই আত্মগোপন করে রইল দেড় বছর। হাসির কথা যতই মনে হয় ততোই নিজেকে ধিক্কার দেয় রুনু। সত্যি, হারানদাকে দিয়েও তো একটা খবর নেবার ব্যবস্থা করতে পারত।
হারানদার দোকানের কাছে আসতে আসতেই ওর মন থেকে হাসি অদৃশ্য হয়ে গেল, সেখানে ভেসে উঠল হারানদার ছবি। যেদিন রায়বাড়ি থেকে বিতাড়িত রুনু ছন্নছাড়া দিশেহারা হয়ে বরিশাল থেকে চোখের জলে চিরবিদায় নিতেই প্রস্তুত হচ্ছিল, সেদিনে হারানদার হঠাৎ আবির্ভাব হল ওর জীবনে। সে আবির্ভাবের মূল্য যে কতখানি তা আর কেউ না জানুক, রুনু মর্মে মর্মে জানে।
ও যদি বি.এ. পাশ করে—ও যদি জীবনে মানুষ হতে পারে—তার জন্য সবটুকু কৃতজ্ঞতা তো হারানদারই পাওনা। হারানদাই ওকে ভুলিয়ে দিয়েছে কাউনিয়ার বাড়ি, ভুলিয়ে দিয়েছে অতীত, চোখ ফিরিয়ে দিয়েছে উজ্জ্বলতায় ভরা ভবিষ্যতের দিকে।
সেদিন পরীক্ষা শেষ করে ফিরে আসতেই হারানদা ওকে জড়িয়ে ধরে বলল, তুই অখন অনেক বড় হইবি, অনেক উঁচুতে উইঠ্যা যাইবি। কইলকাতা যাইবি, এম.এ. পড়বি হয়তো ডক্টেরেট করবি, হয়তো বিলাত যাইবি। তখন দোকানদার হারাইন্যারে ভুইলা যাইবি। আমি ভুলুম না রে! দু-একখান চিঠিপত্তোর লিখবি না রনো?
বলতে বলতে ছলো ছলো করে উঠেছিল হারানদার চোখ দুটি।
কিন্তু কাউনিয়ার বাড়ির স্মৃতিচারণা কিংবা ভবিষ্যতের এম.এ. পড়ার ভাবনা নিয়ে ওকে ডুবে থাকবার সুযোগ দিল না থার্ড ইয়ারের ছেলেরা। প্রতি বছর বি.এম কলেজে 'ব্রজ হতে বিদায়' নামক একটি অনুষ্ঠান হয়। ব্রজমোহেন কলেজ নাম থেকেই এই অনুষ্ঠানের নামকরণ করেছিলেন অতীতের কোন এক ছাত্র। সেই নামটিই সসস্মানে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে আজও। এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমেই বিদায় জানানো হয় ফোর্থ ইয়ারের ছেলেদের।
অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করে থার্ড ইয়ারের ছেলেরা। গত বৎসর ছিল অনুষ্ঠানের কর্ণধার। এবারও থার্ড ইয়ারের ছেলেদের অনুরোধে ওকে অনেকখানি ভূমিকা নিতে হয়েছে। এবারে অনুষ্ঠানে গান, বাজনা, আবৃত্তি ইত্যাদি-সহ অভিনীত হবে রুনুরই লেখা একটি একাঙ্ক নাটক। শরৎচন্দ্রের পথের দাবীর একটি বিশেষ অংশের নাট্টরূপ। নাটকের নাম 'শশী-তারা লজ'। পরীক্ষা শেষ হতেই সেই নাটকের রিহার্সাল নিয়ে মেতেছে রুনু। অংশগ্রহণ করেছে থার্ড ইয়ারের ছেলেরাই।
ইতিমধ্যে বরিশালের 'সপ্তক' ও 'ভোলাকল্যাণ' নামের দুটো পত্রিকায় রুনুর অনেক গল্পকবিতা ছাপা রয়েছে। কলেজ ম্যাগাজিনে তো প্রতিবছরই থাকছে ওর লেখা। কলেজের ছাত্র ও অধ্যাপক মহলেই শুধু নয়, বরিশালের অনেক শিক্ষিত মানুষই জানে এখন রণজিৎ কুমারের নাম ওর লেখার মাধ্যমে। ছাত্রদের মধ্যে নতুন নতুন যারা লিখতে শুরু করেছে, তারা অনেকেই আসে রুনুর কাছে ওর পরামর্শ ও সাহায্য নিতে।
লেখা প্রসঙ্গে ওর আবার মনে পড়ে রাঙাবউদিকে। তিনিই তো দিয়েছিলেন ওকে লেখার প্রেরণা। বলেছিলেনঃ তুই রবীন্দ্রনাথের মতো কল্পনাবিলাসী লেখক হোসনে রুনু, তোকে হতে হবে শরৎচন্দ্রের মতো মাটির মানুষের লেখক। তুইও যেন একদিন শরৎচন্দ্রের মতো বলতে পারিস,—সংসারে যারা শুধু দিলে, পেলে না কিছুই। যাদের চোখের জলের হিসাব কেউ নিলে না কিছুই। যাদের চোখের জলের হিসাব কেউ নিলে না কখনও... এদের বেদনাই দিলে আমার মুখ খুলে। এরাই দিলে আমার হাতে কলম তুলে। সেইসব বঞ্চিত, দুর্বল, শোষিত-উৎপীড়িত মানুষের কথা, সেই সব জীবনসংগ্রামী মানুষের কথাই যেন হয় তোর সাহিত্যের মূল প্রেরণা।
রাঙাবউদির কথা স্মরণ করেই তো একসময় রুনু লিখেছিলেন এই নাটক। পড়েও শুনিয়েছিলেন তাঁকে। সেইটিই কিছু পরিবর্তিত পরিবর্ধিত হয়ে এবার অভিনীত হতে যাচ্ছে।
অনুষ্ঠানের দিন স্থির হয়েছে পরীক্ষা শেষ হবার পরের রবিবারেই। বেশি দেরি করলে অনেকেই চলে যাবে তাদের দেশের বাড়িতে। পরীক্ষা শেষ হয়ে গেলে কে আর থাকতে চায় কলেজ আঁকড়ে।
শনিবার রিহার্সশাল শেষ করে পরের দিনের প্রোগ্রামের সমস্ত প্রস্তুতিপর্ব সমাপন করে বেশ উৎফুল্ল মনে কমনরুম থেকে বেরুতেই কলেজের বেয়ারা ওর হাতে দিল একখানা খাম। খামের উপর হাতের লেখাটা দেখেই ওর বুক দুরু দুরু করে উঠল। একসঙ্গে যেন শত শত মাদল বেজে উঠল বুকের মধ্যে।
এ যে রাঙাবউদির হাতের লেখা। ও হাতের লেখা কি ও এ জীবনে ভুলতে পারবে?
সেই চিঠি এল এতদিনে!
চিঠিখানা হাতে নিয়েই ও পাগলের মতো ছুটে গেল লাইব্রেরিতে ওর নির্দিষ্ট সিটটিতে। কলেজ লাইব্রেরিতে রুনুর মতো নিয়মিত পাঠক বোধহয় আর দ্বিতীয় কেউ ছিল না। কালক্রমে এক কোণের একটি টেবিল ওর জন্য নির্দিষ্ট হয়ে গেছে।
চিঠিখানা বারবার পড়ল রুনু। যতবার পড়ল ততবারই শরৎচন্দ্রের 'শ্রীকান্ত' দ্বিতীয় পর্বের সূত্রপাতী পংক্তিকটি মনে পড়েছিল ওর। প্রতিবারই রাজলক্ষ্মীর স্থানে ও রাঙাবউদি করে নিচ্ছিল মনে মনে।
সেই অবিস্মরণীয় লাইন কটি হলঃ
এই ছন্নছাড়া জীবনের যে অধ্যায়টা সেদিন 'রাঙাবউদির' কাছে শেষ বিদায়ের ক্ষণে চোখের জলের ভিতর দিয়া শেষ করিয়া দিয়া আসিয়াছিলাম, মনে করো নাই আবার তাহার ছিন্নমূল যোজনা করিবার জন্য আমার ডাক পড়িবে। কিন্তু ডাক যখন সত্যিই পড়িল, তখন বুঝিলাম বিস্ময় এবং সঙ্কোচ আমার যত বড়ই হোক, এ আহ্বান শিরোধার্য করিতে লেশমাত্র ইতস্তত করা চলিবে না।
কথাগুলি ওর জীবনে কী আশ্চর্য সত্যরূপ দেখা দিল আর দেড় বৎসর পরে!
সেই শেষ বিদায়ের ক্ষণে রুনু বলেছিল,—ভগবানে বিশ্বাস আমি কোনওদিনও হারাব না রাঙাবউদি। আমার মন বলছে হাসি ভালো হয়ে যাবে। তখন কিন্তু খবরটা দিতে ভুলো না। কলেজের ঠিকানায় চিঠি লিখো।
কোন ভরসায় কলেজের ঠিকানায় চিঠি লিখতে বলেছিল রুনু কে জানে! অথচ কথাটা যখন বলেছিল, তখন তার ভবিষ্যৎটা ঘোর অন্ধকারে ডুবে গেছে। সে তখন একটা নীড়হারা ডানাভাঙা পাখি। হারানদার স্নেহনীড়ে সে যে আবার আশ্রয় পাবে, সে যে আবার জীবন যুদ্ধে ফিরে দাঁড়াতে পারবে, তা কি কল্পনাও করতে পেরেছিল সেদিন।
রাঙাবউদিও বলেছিলেন,—খবর ভালো হলে প্রথম চিঠি লিখব তোকেই।
সেই চিঠি এল এত দিন পরে। কিন্তু কী খবর নিয়ে এল! ডান পায়ের চারটে আঙুল হারিয়ে পঙ্গু হয়ে বেঁচে রইল হাসি! এই বুঝি ভালো খবর। রুনুর ব্যাকুল প্রার্থনার কি এই মূল্য দিলেন ভগবান! ওর একখানা পা খোঁড়া করে দিয়েও যদি হাসির পা-খানা অক্ষত রাখতেন ভগবান, সে পঙ্গুতাকে ও ভগবানের আশীর্বাদ রূপেই গ্রহণ করত। কিন্তু ওর অপরাধে হাসি কেন শাস্তি পাবে? এই কি বিচার?
অথচ কী আশ্চর্য রাঙাবউদির ক্ষমা! হাসি যে প্রাণে বেঁচেছে, ও যে এখন ক্রাচ অথবা লাঠির সাহায্য ছাড়াই বেশ হাঁটাচলা করতে পারছে, এইটুকুতেই তাঁর কৃতজ্ঞতার অন্ত নেই। কৃতজ্ঞ ঈশ্বরের কাছে। কৃতজ্ঞ রুনুর কাছেও। লিখেছেনঃ হাসি যে বেঁচে উঠল, সে আমার পোড়া ভাগ্যের জোরে নয় রে, তোর বিশ্বাস আর প্রার্থনার জোরেই। সে আমি মর্মে মর্মে বুঝেছি।
এ সান্ত্বনায় রুনুর চিত্ত সান্ত্বনা পায় কই? পাবে না যে তা হয়তো রাঙাবউদি বুঝেছিলেন, তাই চিঠিটা এমন হিসেব করে পোস্ট করেছেন যাতে ওটা ওর পরীক্ষা শেষ হবার পরেই হাতে পায়। পরীক্ষা শেষ হতেই ও যদি আর পাঁচটা ছেলের মতো বাড়ি চলে যেত, এ চিঠি তো ও পেতই না। ভাগ্যে 'ব্রজ হইতে বিদায়' অনুষ্ঠানটা ওকে কদিন আটকে রেখেছিল! চিঠির ভূমিকা থেকেই বোঝা যাচ্ছে এ অনুষ্ঠানের কথা তাঁর খেয়াল আছে এবং এ অনুষ্ঠানে রুনুর যে অবশ্যই কিছু ভূমিকা থাকবে তাও তিনি জানেন।
চিঠির আরম্ভেই লিখেছেনঃ আজ তোর পরীক্ষা শেষ হচ্ছে। পরীক্ষা তুই ভালোই দিবি জানি। অনেক প্রতীক্ষার পর আমিও আজ চিঠি লিখতে বসলুম তোকে! এতদিন কেমন ছিলি, কোথায় ছিলি, সে প্রশ্ন করব না। রায় বাড়ি যে আর ফিরে আসবি না তা জানতুম। এই দেড় বছরে একদিনও আসিসনি তাও জেনেছি। কিন্তু সেদিন যে আমায় কলেজের ঠিকানায় চিঠি লিখতে বলেছিলি তাতেই বুঝেছিলাম পড়া তোর বন্ধ হবে না। এবার তো 'ব্রজ হইতে বিদায়'। তারপর? বিদায় নিয়ে কোথায় যাবি? স্থির করেছিস কিছু? আমি কিন্তু স্থির করে ফেলেছি। তোকে এম.এ. পড়তেই হবে। আসতে হবে কলকাতায়। সরাসরি চলে আসিস উপরের ঠিকানায়। হাসি স্কুলে ভরতি হয়েছে। হাসিকে নিয়ে আমার বাবার কাছে আছি। ভবিষ্যতেও—অন্তত বাবা যদ্দিন বেঁচে থাকবেন—এখানেই থাকবার পরিকল্পনা। আমিও ম্যাট্রিক পাশ করে গেছিরে। কলেজেও ভরতি হয়েছি। তুই আমাদের মা-মেয়ে দুজনের টিউটর হবি। আপত্তি নেই তো? আপত্তি করলেই বা শুনছে কে?
কলকাতায় কলেজে পড়বার আহ্বান একদা জানিয়েছিলেন খোকাদা। কথা ছিল খোকাদার দাদার বাসায় থাকবে রুনু। চুয়াকে পড়াবে এবং তার বিনিময়ে ওখানে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা।
কদিন কলকাতার স্বপ্ন দেখে দেখে একটা অসহ্য উত্তেজনাময় আনন্দে সেবার দিন কেটেছিল রুনুর। শেষ পর্যন্ত তো সে সব স্বপ্ন চূর্ণ করে দিলেন বাবা এক কথায়। বাবার চিঠি নিয়ে ওকে আসতে হল বরিশাল।
চার বছর পরে আবার সেই হারানো স্বপ্নের জাল বুনতে শুরু করল রুনু রাঙাবউদির চিঠিটা পাবার পর থেকেই। রেজাল্ট বেরুনো পর্যন্ত বরিশাল থাকা, ছাত্র পড়িয়ে টাকা উপার্জন করা, হারানদার সঙ্গে প্রতি রবিবার সিনেমা দেখা—ইত্যাদি কত পরিকল্পনা ছিল ওর। সব যেন মুহূর্তে শূন্যে মিলিয়ে গেল।
আবার হাসিকে দেখবে, আবার তাকে কোলে নিয়ে বিকেলে বেড়াতে বেরুবে, আবার হাসির গায়ে সেই মিষ্টি মিষ্টি পাউডারের গন্ধটা পাবে, রাঙাবউদির সেই হাসি ভরা কৌতুকোচ্ছল কথা আর মধুর সঙ্গ ও লাভ করবে—কত স্বপ্ন। সারারাত স্বপ্ন দেখে আর রাঙাবউদির সঙ্গে মানস সংলাপ করে করে রাতটা কেটে গেল রুনুর।
'ব্রজ হইতে বিদায়' অনুষ্ঠানে রুনু যে কবিতাটি পাঠ করল সে কবিতার নামও 'ব্রজ হইতে বিদায়।' কবিতাটা বস্তুত তার কলেজ-জীবনের এই চার বছরের স্মৃতিচারণ। তাতে ভর্তি হবার সময় 'বি.এম. কলেজের বাঘ'-এর মধ্যে যে বৃহৎ প্রাণের পরিচয় ও পেয়েছিল সেই থেকে, সব শেষে ইংলিশ অনার্স-এর প্রস্তুতির ব্যাপারেও সেই 'বাঘ' তাঁর বাহ্যতঃ রুক্ষ মরুভূমির মধ্যে যে সরস স্নিগ্ধ মরুদ্যানটি মুক্ত করে দিয়েছিলেন ও ওর কাছে—তার একটি ধারাবাহিক মধুর কাব্যময় বর্ণনা দিয়ে কবিতাটি সমাপ্ত করেছিলেন এই ক'টি লাইনেঃ
ব্রজমোহন বাঘ'—সে তো তব বাহ্যরূপ—
অন্তরেতে তুমি ব্রজেশ্বর, তুমি অপরূপ।
আজি এই স্মৃতিভরা ব্রজধাম ছেড়ে যেতে তাই
সর্বাগ্রে সশ্রদ্ধ প্রণতি আমি তোমারে জানাই।
কলেজে থেকে ফিরবার পথেই ও পরিকল্পনা ঠিক করে ফেলল। কালই বরিশাল মেইলে রওনা হয়ে যাবে ও। তার আগে কাউনিয়ার বাসায় গিয়ে যে যেমন ব্যবহারই করুক গুরুজনদের প্রণাম করবে, ছোটদের আদর করবে এবং শেষ বিদায় নেবার আগে জানিয়ে আসবে ওর বুক ভরা কৃতজ্ঞতা। হারানদা ব্যথা পাবেন, ওর ছাত্ররা ক্ষুব্ধ হবে—সবই সত্যি, কিন্তু রাঙাবউদির এ আহ্বান শিরোধার্য করতে বিন্দুমাত্র ইতস্তত করবারও শক্তি ওর নেই। এ আহ্বান অমোঘ।
বাড়িতে গিয়েও সপ্তাহ খানেক বেশি থাকবে না ও। রাঙাবউদি লিখেছেন, কলকাতা যাবার অন্তত সপ্তাহ খানেক আগে যেন দিনক্ষণ নির্দিষ্ট করে ও চিঠি লেখে। নির্দিষ্ট দিনে তিনি শিয়ালদা স্টেশনে থাকবেন ওকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতে। তা না হলে ওর পক্ষে প্রথম কলকাতায় এসে তাঁদের বাসা খুঁজে পৌঁছান সম্ভবই হবে না। সেই চিঠিটি লেখা এবং জবাব পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা।
ভাবতে ভাবতে অসীম কৃতজ্ঞতায় মাথা নুয়ে আসে রুনুর। কতখানি তিনি ভেবেছেন। সত্যিইতো, ও একা কলকাতায় গিয়ে কোথায় খুঁজে পেত রাঙাবউদিকে!
সেদিন হারানদার কাছে ওর পরিকল্পনাটা বলতেই সে যেন আকাশ থেকে পড়ল।
—কস কিরে রনো! কাইলই চইল্যা যাইবি? তর জইন্যে তিন চারডা টিউশনি ঠিক করিয়া রাখছি। অখন তো চুটাইয়া টিউশনি করবি। আর সিনেমা দেখবি। অখন বাড়ি গিয়া কি করবি?
—বউদির একখানা চিঠি পেয়েছি। যেতেই হবে।
'রাঙা টুকু উহ্য রেখে ইতি গজ' করে জবাব সারল রুনু। রাঙাবউদির চিঠিখানা যেন রুনুর কাছে এক মহার্ঘ গোপন সম্পদ। ও সম্পদের কথা ও বলতে পারবে না কাউকে।
—হয়, নতুন বউদি হইছে, আবার তারে নাকি তুমিই খুইজ্যা পাইতা আইনা দিছ। তিনি ডাকলে কি আর হারাইন্যার মায়ায় তোমারে বাইন্ধা রাখা যাইব। যাও কদিন ঘুইরাই আইস।
—না হারানদা, আর বোধহয় আসা হবে না বরিশাল। 'ব্রজ হইতে বিদায়' অনুষ্ঠানে আজ ব্রজধাম থেকে চির বিদায় নিয়ে এসেছি। জানো, বি.এম কলেজের বাঘ আজ আমায় বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। আমার কবিতা শুনতে শুনতে তাঁর দুচোখ আনন্দাশ্রুতে চিক চিক করে উঠেছিল। বাংলার হেড তো কবিতাটা লুফে নিলেন আমার হাত থেকে, এবারের ম্যাগাজিনের জন্য। ম্যাগাজিন ছাপা হলে দেখো বিকাশদের কাছ থেকে! আমার কাছে থাকলে তোমাকে পড়ে শুনাতাম।
—কবিতা-টবিতা আমি বুঝব না রে রনো! তবে যেদিন থিকা সেনগুপ্ত সাহেব নিজে উপযাচক হইয়া তরে বিনা পয়সায় পড়াইতে শুরু করেছিলেন, সেই দিনই বুঝছিলাম, ওই বাঘেরে তুই জয় করছ। তোরে বাপে তোর নামডা বড় সাত্থক রাখছিল রে! তুই সত্যই রণজিৎ। তুই যে আমারেও এমন জয় করিয়া ফেলবি, তাই কি ভাবতে পারছিলাম। তুই কাইলই চইল্যা যাইবি ভাবতে আমার...।
রুনুর বুকে মুখ গুঁজে হু-হু করে কেঁদে ফেলল লম্বা-চওড়া জোয়ান হারানদা।
বাঁধভাঙা জল নেমেছে রুনুর চোখেও। সে জলে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে স্নেহ-মমতা-ভালোবাসার অচ্ছেদ্য বন্ধন! সামনে হাতছানি দিচ্ছে স্বপ্নের শহর কলকাতা!
শারদীয়া কিশোর ভারতী ১৯৮১
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন